বড়দিনের শুভেচ্ছা {লেখাটি ভালোবাসা, ও গল্পগুচ্ছ পত্রিকায় প্রকাশিত।}

71946068_1338812139627865_3484388348838019072_n

আজ পঁচিশে ডিসেম্বর, আজ বড় শুভদিন। একে বড়দিন, তার ওপর প্রভু যীশুর জন্মদিন। এই দিনটি নিয়ে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে একটু লোক দেখানো মাতামাতি করার অভ্যাস আছে। বাড়িতে ডাঁটা চচ্চরি খেলেও, সন্ধ্যায় পার্ক স্ট্রীট অঞ্চলে গিয়ে কিছু খেয়ে ছবিসহ তাৎক্ষণিক প্রচার না করলে, সমাজে নাকি স্টেটাস রক্ষা করাই দায় হয়ে পড়ে, সমাজচ্যুত হওয়ার ভয়ও হয়তো থাকে। আজ এই শুভদিনে হঠাৎ একজনের কথা খুব মনে পড়ছে। না, তিনি প্রভু যীশু নন, কোন বন্ধুবান্ধব বা পরমাত্মীয়ও নন। একটি অচেনা অজানা অপরিচিতা অল্পবয়সি মেয়ে, যার মুখটা আজ আর মনেও পড়ে না।

আজ থেকে ঠিক এগারো বছর আগে, অর্থাৎ পঁচিশে ডিসেম্বর, ২০০৮ সালে আজকের সন্ধ্যায় আমাকে কলকাতার মুকুন্দপুরে একটি হাসপাতালের আই.সি.সি.ইউ. বেডে কাটাতে হয়েছিল। ঠিক দুদিন আগে আমার বাইপাস অপারেশন হয়েছে, প্রচণ্ড যন্ত্রনায় চিৎ হয়ে শোয়ার ক্ষমতা নেই। হেলান দিয়ে আধ বসা আধ শোয়া অবস্থায় বাড়ির লোকের আসার অপেক্ষায় আছি। দিনে ঠিক দুজনকে আমার সাথে দেখা করতে দেওয়া হবে, তাও আবার অনেক সাবধানতা অবলম্বন করে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে, বাড়ির লোকের দেখা নেই। এরপর ভিজিটিং আওয়ার্স পার হয়ে গেলে হয়তো দেখা করতেও দেবে না। যাইহোক, শেষপর্যন্ত আমার কন্যা ও জামাতা এসে উপস্থিত হলো। জানা গেল, যে সায়েন্স সিটিতে মান্না দে ও সন্ধ্যা মুখার্জীর সঙ্গীতানুষ্ঠান থাকায় রাস্তা বেশ জ্যাম ছিল, তাই এতো বিলম্ব।

এই হাসপাতালটিতে অনেক নার্স বা অন্যান্য কর্মচারী খৃস্টান ধর্মাবলম্বী, কেরালার অধিবাসী। আমার বেডের ঠিক পাশেই একটি টেবিলে একজন নার্সের পোষাক পরিহিতা একটু বয়স্কা ভদ্রমহিলা বসে আছেন, বাকি কয়েকজন অল্পবয়সি নার্স রোগীদের দেখভাল করছে। অন্যান্যদের কথায় বুঝতে পারছি যে, যে মেয়েটি মূলত আমায় দেখভাল করছে, সে খৃস্টান ধর্মাবলম্বী। সন্ধ্যার পর একে একে প্রায় সব নার্স চলে গেলেও, এই মেয়েটি চলে যেতে পারছে না। সম্ভবত এর রিলিভার না আসায়, বা অন্য কোন কারণে সে বাড়ি যেতে পারছে না। এই মেয়েটির আজ উৎসব, ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। অন্যান্য নার্সরা মৌখিক সহানুভতি দেখালেও, তার সাহায্যে কাউকে কিন্তু এগিয়ে আসতে দেখিনি। সারাদিন তার কাজ, রোগীদের প্রতি তার সাহায্য ও সহানুভুতি, আমায় মুগ্ধ করেছিল। ধীরে ধীরে অনেক সময় কেটে গেল, এই মেয়েটি একাই সব সামলাচ্ছে। ওই অবস্থাতেও আমার মেয়েটির জন্য বড় মায়া হোল, কষ্ট হলো। আর সকলের তো বছরে অনেক উৎসবের দিন আছে, এই মেয়েটির কিন্তু সারাবছরে এই একটিই উৎসবের দিন, অন্তত প্রধান উৎসবের দিন। তাদের একজনও কি পারতো না, একটা দিন নিজে একটু বেশিক্ষণ থেকে এই মেয়েটিকে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ করে দিতে? মেয়েটি ঠায় আমার বেডের পাশে একটা টুল নিয়ে বসে থাকলো। শেষে আমি তাকে বললাম, “তুমি চলে যেতে পারো, আমার কোন অসুবিধা হবে না। সে বললো, “আপনি চিন্তা করবেন না, আপনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও আমি এটাই করতাম”। আরও অনেক পরে অন্য কয়েকটি নার্স এসে উপস্থিত হওয়ায়,  এই মেয়েটি মুক্তি পেলো ও আমার ভালো থাকার কামনা করে, শুভরাত্রি জানিয়ে চলে গেল।

পরের দিন সকালে আমাকে অন্য ঘরে স্থানান্তরিত করা হলো, ফলে তার সাথে আর আমার দেখা হয়নি। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় ইচ্ছা ছিল তাকে কিছু টাকা     উপহার হিসাবে দেওয়া। কিন্তু ওই  

হাসপাতালের কর্মচারীদের রোগী বা রোগীর বাড়ির লোকের কাছ থেকে কোন টাকা নেওয়া শুধু খাতাকলমে বারণ ছিল না, বাস্তবে এটাই ঘটনা ছিল। তাছাড়া মেয়েটির নামও জানতাম না, তাই উপহার নাহোক সামান্য একটা শুকনো ধন্যবাদ জানাবার সুযোগও হয়নি। অনেকে হয়তো বলতেই পারেন, যে এই টাকা দেওয়াটা ঠিক নয়, এতে ওদের চাহিদা ও লোভ বেড়ে যায়। আমিও তাই মনে করি, কারণ বহুবার সরকারি হাসপাতাল বা নামীদামি বেসরকারি হাসপাতালেও রোগীর কথা ভেবে বাধ্য হয়েছি উপহার নয়, ঘুষ হিসাবে টাকা দিতে। একবালপুরের এক নামী হাসপাতাল নামের নার্সিং হোম থেকে, মার মৃতদেহ নিয়ে আসার সময়েও এই চাহিদার হাত থেকে মুক্তি পাইনি।

মেয়েটির নাম জনি না, তার মুখ বা চেহারাটাও আজ এতগুলো বছর পরে আর মনে করতে পারি না। তবু আমার সেই অতি কষ্টের একটি দিনে, তার সেবা যত্ন সহানুভুতির কথা এই দীর্ঘ এগারো বছরেও ভুলতে পারলাম কই? আজ সেই একই উৎসবের দিনে তাকে আমার প্রাণভরা স্নেহ, ভালবাসা, শুভেচ্ছা, এমনকী শ্রদ্ধা জানালাম। সে ভালো থাকুক, সুখে থাকুক, আনন্দে থাকুক।

সুবীর কুমার রায়

২৫-১২-২০১৯

মাস্ক বিভ্রাট {লেখাটি প্রতিলিপি বাংলা, বইপোকার কলম, ভলোবাসা, ও গল্পগুচ্ছ পত্রিকায় প্রকাশিত।}

44227056_1089998187842596_993178936290574336_n

শান্তশিষ্ট স্বভাবের নারায়ণকাশিতবাবু মানুষটিকে আশেপাশের সকলেই খুব পছন্দ করতেন। আর্থিক অবস্থা সচ্ছল না হলেও, তিনি কারও কাছে কোনদিন সাহায্য চেয়েছেন, যদিও তাঁর কোন শত্রু নেই, তবু থাকলে তিনিও হয়তো একথা স্বীকার করতেন না। মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই টাকার অভাবে সংসার চালাতে হিমশিম খেলেও, তিনি সবসময় তাঁর ক্ষমতা অনুযায়ী নগদে বাজার দোকান করতেন। বাজারের সবজি বা মাছ বিক্রেতারাও তাঁকে কোনদিন ধার চাইতে ও দরাদরি করতে না দেখায়, তাঁকে বেশ পছন্দও করতেন। কতবার পছন্দের মাছ কিনতে গিয়ে দাম শুনে পিছিয়ে আসায়, মাছ বিক্রেতা তাঁকে সুবিধা মতো পরে দাম দিয়ে যেতে বলে, মাছটা নিয়ে যেতে বলেছেন। কিন্তু নারায়ণবাবুর যুক্তি হচ্ছে, তিনি নুন ভাত খেয়ে থাকতেও রাজি আছেন, কিন্তু বাকিতে কিছু কিনতে তিনি রাজি নন। ধার করে ঘি খাওয়া তিনি আদপেই পছন্দ করেন না।

এরমধ্যে শুরু হলো করোনার ঝামেলা। বিপদটার গুরুত্ব কতখানি বোঝা না গেলেও, আশেপাশের শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে বেশি করে চাল, আটা, তেল, নুন, মশলাপাতি, ও বাজার করে বাড়িতে জমা করে রাখার কথা বলে সতর্ক করে জানালেন, যে যেকোন মুহুর্তে বাজার দোকান সব বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পরের দিনই নারায়ণবাবু বাজারে গিয়ে সমস্ত বাজার করে, এক মাছ বিক্রেতার কাছে যান। লোকটা ভালো, সঙ্গে তার ছেলেকে নিয়ে বসে মাছ বিক্রি করে, কিন্তু তিনি মাছ পছন্দ করার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে  মাটিতে পড়ে গেলেন। বাজারের সকলেই তাঁকে চেনেন, তাই অনেকেই ছুটে এসে তাঁকে তুলে চোখেমুখে জল দিয়ে কিছুটা সুস্থ করে তুললেন। ওই মাছ বিক্রেতা তাঁর আপত্তি সত্ত্বেও বেশ কিছু মাছ তাঁর মাছের ব্যাগে দিয়ে, বাজারের ব্যাগ ও মাছের ব্যাগ সমেত তাঁকে রিকশায় তুলে দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার সময় বললো, “সাবধানে বাড়ি ফিরে যান। সুস্থ হয়ে যখন আবার বাজারে আসবেন, তখন মাছের দাম সাতশ’ টাকা দিয়ে যাবেন। তাড়াহুড়ো করে শরীর খারাপ নিয়ে এরমধ্যে যেন মাছের দাম দিতে আসবেন না”। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও নারায়ণবাবু এই প্রথম বাকিতে কিছু কিনতে বাধ্য হলেন।

রিকশাচালক তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে, তাঁর স্ত্রীকে আজকের সমস্ত ঘটনার কথা বলে ফিরে গেল। ডাক্তার দেখানো হলো এবং ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওষুধপত্রও খাওয়া শুরু হলো। একটু সুস্থ হয়েও কিন্তু তাঁর পক্ষে বাজারে গিয়ে মাছের দাম পরিশোধ করা সম্ভব হলো না, কারণ ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যে সত্য সত্যই লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। ঋণ পরিশোধের চিন্তায় অসুস্থ নারায়ণবাবু আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

দিন পনেরো পরে স্ত্রীর কথা অগ্রাহ্য করেই তিনি বাজারে চললেন ঋণ পরিশোধ করতে। বাইরে গিয়ে তাঁর বহু বছরের চেনা শহরটাকে কেমন যেন অপরিচিত মনে হলো। সমস্ত দোকানপাট বন্ধ, রাস্তায় কোন টোটো বা রিকশা নেই, মানুষজনও প্রায় নেই বললেই চলে। যে ক’জন মানুষকে দেখা যাচ্ছে, তাদের সকলের মুখেই মাস্ক বাঁধা, সহজে চেনার উপায় নেই। তাঁর মনে হলো মাস্ক ছাড়া তাঁর রাস্তায় বেরোনোটা উচিৎ হয়নি। তিনি ঠিক করলেন ফেরার সময় মাস্ক কিনে নিয়ে যাবেন। অন্যান্য দিন যেটা বিশেষ দেখা যায় না, আজ দেখলেন রাস্তার দুপাশে কিছু সবজি বিক্রেতা সামান্য কিছু সবজি নিয়ে মুখে মাস্ক বেঁধে বসে আছে। দু’-চারজন মাছ নিয়েও বসেছে। নিজেকে মাস্কহীন অবস্থায় নিজেরই যেন কিরকম অস্বস্তিবোধ ও লজ্জা করতে লাগলো। নারায়ণবাবুর আজ মাছ বা বাজার, কোনটারই প্রয়োজন নেই, তাই দ্রুত পা চালালেন। এমন সময় রাস্তার বাঁপাশ থেকে মুখে বেশ শক্তপোক্ত মাস্ক পরা একজন চিৎকার করে বললো, “বাবু কেমন আছেন? মাছ লাগবে নাকি? নিয়ে যান, একবারে টাটকা মাছ আছে”। নারায়ণবাবু লক্ষ্য করলেন, যে তাঁর পরিচিত সেই মাছ বিক্রেতা আজ এখানে বসে মাছ বিক্রি করছে। তিনি এগিয়ে গিয়ে তাকে বললেন, “আজ এত লোক মাছ ও সবজি নিয়ে রাস্তার দুপাশে কেন বসেছে”? উত্তরে মাছ বিক্রেতা মাস্কের ভিতর থেকে অস্পষ্ট গলায় জানালো, “বাজারে সবাইকে বসতে দেওয়া হচ্ছে না, তাই অনেকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাস্তার দুপাশে বসেছে”। নারায়ণবাবু আর কথা না বাড়িয়ে মানিব্যাগ থেকে সাতশ’ টাকা বার করে দুবার গুণে নিয়ে তার হাতে দিয়ে বললেন, “শরীরটা সুবিধের নেই বলে কয়েকদিন বাড়ি থেকে বেরোইনি। আজ তোমার কাছেই যাচ্ছিলাম, সেদিনের মাছের দামটা রেখে দাও”। মাছ বিক্রেতা হাসি মুখে টাকাটা পকেটে রেখে দিলো। নারায়ণবাবু একবার বললেন, “টাকাটা গুণে নাও”। উত্তরে মাছ বিক্রেতা বললো, “কি যে বলেন বাবু, আপনার মতো মানুষ আমাকে কম টাকা দিয়ে ঠকাবে”?

এই মাস্ক বিক্রেতার মাস্কটা তাঁর বেশ পছন্দ হয়েছে, এরকমই একটা মাস্ক কেনার জন্য তিনি ওষুধের দোকানের দিকে পা চালালেন। বাজারের কাছে এসে অভ্যাসবশত মাছের বাজারের কাছে গিয়ে তিনি আঁতকে উঠলেন। তাঁর পরিচিত মাছওয়ালার ছেলেটা কাছা পরে সামান্য কিছু মাছ নিয়ে বসে আছে। তিনি ভাবলেন, বাড়িতে এরকম একটা অঘটন ঘটেছে, অথচ ওর বাবা তো কিছু বললো না? দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, “তোর এরকম পোশাক কেন, কে মারা গেছে”? ছলছল চোখে ছেলেটা উত্তর দিলো, “বাবা মারা গেছে”। নারায়ণবাবুর চোখের সামনে গোটা পৃথিবীটা যেন দুলে উঠলো। চোখে অন্ধকার দেখে তাঁর  মাথাটা কিরকম ঘুরতে শুরু করলো। কোনরকমে একবার জিজ্ঞাসা করলেন, “কি করে মারা গেল? কবে মারা গেল”? ছেলেটি উত্তর দিলো “গত শনিবার রাতে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে, আগামী রবিবার কাজ। বাবা আপনাকে খুব ভালবাসতেন, শ্রদ্ধা করতেন, আপনি তো আমাদের বাড়ি চেনেন, ওইদিন আপনি যদি একবার আমাদের বাড়িতে পায়ের ধুলো দেন, তাহলে বাবার আত্মা শান্তি লাভ করবে”।

মানিব্যাগ হাতড়ে ছেলের হাতে সাতশ’ টাকা দিয়ে, তিনি বাড়ির পথ ধরলেন। মনে মনে ভাবলেন, এমাসে আর মাস্ক কিনে কাজ নেই, যেটুকু টাকা পড়ে আছে, সামনের রবিবার ফুল ও ধুপকাটি কিনতে চলে যাবে। যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে আগের সেই মাছ বিক্রেতা বসার জায়গাটা আড়চোখে একবার দেখলেন। জায়গাটা ফাঁকা, দুটো কুকুর নিশ্চিন্তে শুয়ে ঘুমচ্ছে।

সুবীর কুমার রায়

২০-০৬-২০২০

হাসি {লেখাটি প্রতিলিপি-বাংলা, ও গল্পগুচ্ছ পত্রিকায় প্রকাশিত।}

72478165_1338803969628682_6661569837455638528_n

হারাধন বাবুর পঁয়ত্রিশ বছরের উপর শিক্ষকতার জীবনে বহুবার তাঁর স্কুলটির গঠন পালটেছে, প্রতিবছর পাস করে চলে যাওয়া, ও নতুন নতুন ছাত্রের আগমনে ছাত্র সংখ্যা ও ছাত্রদের চরিত্র পালটেছে, পালটেছে স্কুল পরিচালনার নিয়ম কানুন। কিন্তু যেটা কখনোই পালটায়নি, সেটা তাঁর হাসিখুশি স্বভাব ও ছাত্রদের সাথে সম্পর্ক। পঁচাত্তর বছর বয়সেও তাঁর রসিকতা বোধ ও কথা বলার ধরণ, সকলকে হাসতে বাধ্য করতো। তাঁর মতে প্রাণখুলে হাসতে পারলে, যেটা মানুষের জীবনে আজ বড়ই অভাব, শরীর ও স্বাস্থ্য ভালো থাকে। পাড়ার সকলে হারাধন বাবুকে ভালবাসেন, সম্মান করেন। স্বাস্থ্য সচেতন স্থানীয় লাফিং ক্লাবের বয়স্ক সদস্যরা নিজেরা তাঁকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে ক্লাব সভাপতির পদে বসিয়ে সম্মানিত করতে দ্বিধা করেননি। তিনি রোজ ক্লাব প্রাঙ্গণে গিয়ে তাঁর বয়সি সদস্যদের সাথে গল্প করে ও স্বাস্থ্য সচেতন বেশ কিছু মানুষের কৃত্রিম হাসির মহড়া দেখে, অনেকটা সময় আনন্দে কাটান। তাঁর অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথায় তাঁর সমবয়সি বৃদ্ধদের হাসির আওয়াজে, লাফিং ক্লাবের অন্যান্য সদস্যদের কৃত্রিম হাসির আওয়াজ প্রায়শই ঢাকা পড়ে যায়।

এহেন হারাধন বাবু আজ হঠাৎ একটু অসুস্থ হয়ে, ডাক্তার দেখাবার জন্য চড়া রোদে অনেকটা পথ হেঁটে গিয়ে বাসে উঠলেন। বাসে বেশ ভিড়, তিনি বরিষ্ঠ নাগরিকদের আসনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ওই আসনে দুটি যুবক কানে মোবাইলের তার গুঁজে নিজেদের মধ্যে হাসি মশকরা গল্পগুজবে ব্যস্ত। তারা হারাধন বাবুকে দেখেও একইভাবে বসে থাকলো। বেশ কিছুক্ষণ এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর তিনি যুবক দুটির উদ্দেশ্যে মৃদু স্বরে বললেন, “আমাকে একটু বসতে দেবে বাবা, আমি বড় অসুস্থ”।

যুবক যুগল কোন উত্তর দিলো না।

হারাধনবাবু আবার বললেন, “আমি আর দাঁড়াতে পারছি না বাবা, আমি বড় অসুস্থ। দয়া করে আমাকে একটু বসতে দাও”।

“ঘ্যানর ঘ্যানর করবেন নাতো, অসুস্থ তো ফুলবাবু সেজে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন কেন”?

যুবকটির কথা শুনে হারাধন বাবুর কান লাল হয়ে গেলেও, বাসের অনেকেই উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলো, কিন্তু কারও কোন প্রতিবাদ লক্ষ্য করা গেল না। হারাধন বাবু আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে, অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও বাসের মেঝেতেই বসে পড়লেন। বাসের লোক চলাচলের জায়গায় বসে পড়ায় বেশ অসুবিধা দেখা দেওয়ায় অনেকেই, এমনকী কন্ডাক্টার পর্যন্ত তাঁকে উঠে দাঁড়াতে বললেন। হারাধন বাবুর শরীর তখন ঘামে ভিজে গেছে। বাধ্য হয়ে তিনি কোনক্রমে আবার উঠে দাঁড়ালেন।

যুবক দুটির একজন একটা গা জ্বালানো হাসি হেসে বললো, “একেই বলে শক্তের ভক্ত”।

সামনে পিছন থেকে আবার একবার হাসির রোল ভেসে আসলো।

হারাধন বাবু পরের স্টপেজে নামবেন। নামার সময় জামার হাতায় কপালের ঘাম মুছে যুবক দুটিকে বললেন, “ভালো থেকো বাবারা”।

“দিব্যি তো চলে আসলেন, শুধু শুধু অসুস্থতার ভান করেন কেন? অনেক তো বয়স হলো, এবার সুযোগ নেওয়ার স্বভাবটা ছাড়ুন না। এইজন্যই দেশটার আজ এই অবস্থা”।

আবার একবার হাসির রোল।

হারাধন বাবু বাস থেকে নামার সময় শুধু একবার বললেন, “তাহলে আমার অনেক বয়স হয়েছে বলছো”?

বেশ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাস থেকে নেমে হারাধন বাবুর হঠাৎ মনে হলো, তাঁর যথেষ্ট কষ্টের মাঝেও তাঁর কথায় তো বেশ কিছু লোকের হাসির উদ্রেক হয়েছে। মানুষ আজ হাসতে ভুলে গেছে, এটাই তো একটা বড় পাওয়া। ধীরে ধীরে তিনি ডাক্তারের চেম্বারের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন।

সুবীর কুমার রায়

০৬-০৫-২০২০

জ্যোৎস্না মাসি { লেখাটি প্রতিলিপি-বাংলা, ও Sahityashruti পত্রিকায় প্রকাশিত।}

14

এমন একটা সময় ছিল, যখন কর্মসূত্রে সপ্তাহের পাঁচটা দিন স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে ছেড়ে অন্য এক জেলায় গিয়ে থাকতে হতো। বিদ্যুৎ ও টেলিফোন যোগাযোগহীন, মোহনার নিকটবর্তী এই অঞ্চলটিতে জীবনের বেশ কয়েকটি বছর কাটাতে হয়েছিল। দিনের বেলাটা অফিসের কাজ, গ্রামে গ্রামে সাইকেল নিয়ে সরকারি অনুদানযুক্ত ঋণ আবেদনের তত্ত্বানুসন্ধান ও ঋণ পরিশোধের জন্য তাগাদায় যাওয়া, ইত্যাদি নিয়ে সময় কেটে গেলেও, সন্ধ্যার পর থেকে অন্ধকারে সময় আর কাটতে চাইতো না। বিকালের পর থেকে নিকটবর্তী শহরের সাথেও প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই জায়গায়, অফিস থেকে ফিরে আমাদের একমাত্র বিলাসিতা ছিল, মাদুর পেতে ছাদে শুয়ে থাকা, ও মাঝেমধ্যে তাস পেটানো। আমাদের বাড়িওয়ালার ছেলে মাঝেমাঝে তাস খেলার অছিলায় দোতলা থেকে একতলায় আসতো, যদিও আসার মূল কারণ ছিল, চা খাওয়া ও বিড়ি সিগারেট ফোঁকা। তাস খেলায় খেলোয়ারের অভাব হলে তাকে আমরা খেলতে নিতাম, এমনকী ওপর থেকে ডেকেও নিয়ে আসতাম। গরমের সময় প্রচণ্ড গরম, শীতে বেশ ঠান্ডা, ও বর্ষাকালে জলকাদা ও ভয়ংকর সাপের উপদ্রব নিয়ে দিন কেটে যেতো।

আমরা একই অফিসের পাঁচজন, একটা দোতলা বাড়ির একতলায় মেস করে থাকতাম। জ্যোৎস্না নামে একজন বয়স্কা রান্নার মাসি দুবেলা রান্না করে দিয়ে যেত। ওই অঞ্চলে পয়সা খরচ করে বাড়িতে রান্না করে দিয়ে যাবার জন্য রান্নার লোক রাখার মতো বসবাসকারী মানুষ বিশেষ ছিল না বললেই চলে। আমাদের মতো কর্মসূত্রে যারা বাইরে থেকে আসতো, তারা কাজের শেষে অধিকাংশই নিজ নিজ বাসায় ফিরে যেত, অথবা নিজের রান্না কোনমতে নিজেই করে নিতো। গরিব এলাকা, কাজেই খোঁজ করলে হয়তো অন্য রান্নার লোক পাওয়া গেলেও পাওয়া যেতে পারতো, কিন্তু আমাদের রান্নার মাসির মতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও এহেন সুস্বাদু রান্নার হাতের একজন দ্বিতীয় মাসির সন্ধান পাওয়া শুধু শক্ত নয়, হয়তো অসম্ভবই ছিল। স্বাভাবিকভাবে মেসের এক একজন এক এক প্রকৃতির হলেও, পাত্রের অভাবে তেল ও জল একই পাত্রে সহাবস্থান করতে বাধ্য হতো। দীর্ঘদিন আগে মাসির স্বামী বসন্ত, স্থানীয় এলাকার আরও অনেকের মতোই মাসিকে ছেড়ে অন্য একটি মহিলার সাথে বসবাস করতে শুরু করে। এটা ওই অঞ্চলে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও নির্দোষ কর্ম বলেই প্রচলিত ও বিবেচিত ছিল। অনেকটা লাক্স ছেড়ে সিন্থল সাবান ব্যবহার করার মতোই স্বাভাবিক ব্যাপার। ফলে মাসির কপালে বসন্তের দেওয়া উপহার স্বরূপ একটি কন্যা সন্তান, ও তাকে মানুষ করা ছাড়া, এই সুদীর্ঘ জীবনে আর কোন সুখের মুখ দেখার সৌভাগ্য হয়নি। উপায় না থাকায় মাসি তার মেয়ে জামাইয়ের কাছে তাদের কাজের লোকের মতোই থাকতো। অনেক সময় মেয়ে ও জামাই তার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে বলে শুনতাম। জামাই তাকে তার বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবার কথা বললেও, আমার ভয়ে সে খুব একটা বাড়াবাড়ি করার সাহস দেখাতো না, কারণ অল্প টাকা হলেও, আমার ব্যাঙ্কে তার নামে একটা সরকারি লোন ছিল। কাজেই একমাত্র আপনার লোক হলেও, তার স্বামী, কন্যা, বা জামাতা, কেউই তার প্রকৃত আপনার লোক ছিল না। ত্রিভূবনে তার আপনার বলতে ছিল খানকয়েক ছাগল। অধিকাংশ দিনই সন্ধ্যায় মাসি আসতে বেশ দেরি করে দিতো। চায়ের আশায় অন্ধকারে আমরা পাঁচজন তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে বসে থাকতাম। ঘরের ভিতর থেকেই আমরা মাসির আগমন বার্তা পেয়ে যেতাম। সমগ্র পৃথিবীর প্রতি বিড়বিড় করে বিষোদগার করতে করতে ঘরে ঢুকতো। রাগ ক্ষোভ দুঃখ, অভিমান, সবকিছু একটাই কারণে, আর সেটা তার ছাগল খুঁজে না পাওয়া। প্রায় রোজই যুক্তি করে কোন না কোন ছাগল আমাদের অসুবিধায় ফেলার জন্য আত্মগোপন করে কেন থাকতো জানার সুযোগ হয়নি।

আমাদের মেসের রান্নার জায়গায় দুটো কাঠের তাকে বিভিন্ন কৌটোয় ডাল তেল নুন মশলা ইত্যাদি রান্নার উপকরণ রাখা থাকতো, মাসিই গুছিয়ে রাখতো। মাসির ফরমাশ মতো আমরা শুধু কিনে এনে দিয়েই আমাদের দায়িত্বে ইতি টানতাম, কোন কৌটোয় কি আছে বা কতটা আছে খোঁজ রাখারও প্রয়োজন বোধ করতাম না। মেস জীবনের সাথে যারা পরিচিত তারা জানেন, যে মেসের বিভিন্ন সদস্যের পছন্দ অপছন্দ, খাদ্যরুচি, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, ইত্যাদি ভিন্ন ধরণের হয়। আমাদের মেসও তার ব্যতিক্রম ছিল না। একফালি রান্নার জায়গাটার ঠিক পাশেই ছিল আরও ছোট একটা বাথরূম ও পায়খানা। বাথরূমটা ভাতের ফেন গালা ছাড়া, অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা হতো না। হতো না, কারণ জলের অভাব। মাসি প্রতিদিন কলসি করে খাবার ও রান্নার জল নিয়ে এসে রেখে দিতো। বাড়ির ঠিক পিছনে একটা ছোট্ট ডোবা ছিল, যদিও তাতে জলের চেয়ে পাঁকের পরিমাণই বেশি ছিল। বাথরূমে একটা ছোট চৌবাচ্চা ছিল। সেই ডোবা থেকেই স্নান করার সময় আমরা বালতি করে জল বয়ে এনে চৌবাচ্চা ভরে রাখতাম। মাসি ছিল অসম্ভব পরিষ্কার, কিন্তু শুচিবাইগ্রস্ত আদপেই নয়। ফলে মাসির কঠোর শাসনে হাওয়াই চটি পায়ে রান্নাঘর লাগোয়া বাথরূম পায়খানা ব্যবহার করা ছিল বড়ই পীড়াদায়ক। মেসের আর সকলের থেকে মাসি কিন্তু আমায় একটু বেশিই ভালবাসতো। আমার একটু বেশি জল খাওয়া অভ্যাস বলে মাসি আমাকে কখনও ফর্সা বাবু, কখনও বা জল বাবু বলে ডাকতো। সকালে ও সন্ধ্যায় সবার অলক্ষ্যে শুধুমাত্র আমার জন্য দ্বিতীয় দফার এক কাপ চা সরিয়ে রাখতো।

এরমধ্যে আমাদের অফিসেরই নতুন একজনকে মেসে জায়গা দেওয়া হলো। তিনি আবার এক অদ্ভুত মানসিকতার মানুষ। আমরা সকালে খেয়েদেয়ে অফিস চলে যেতাম। মাসি তার দিনগত কাজকর্ম সেরে, খেয়েদেয়ে অথবা নিজের খাবার নিয়ে বাড়ি চলে যেত। এই নতুন সদস্যটির সন্দেহ হলো, যে মাসি তেল মশলা ইত্যাদি সরিয়ে রেখে, নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়। এটা যে বাস্তবে সত্য, এটা আমরা সকলে বুঝলেও চুপ করে মেনে নিতাম। এই নিয়ে ভাবার পিছনে সময় ও আলোর অভাব একমাত্র অন্তরায় ছিল। যাইহোক, এই নতুন সদস্যটি এক সোমবার বাড়ি থেকে ধুয়ে মুছে একটি কাচের শিশি সঙ্গে করে নিয়ে এলেন। জানা গেল, আমাদের রান্নার জন্য প্রতিদিন পঁচাত্তর গ্রাম সরষের তেলের বরাদ্দ হওয়া উচিৎ, তাই তিনি অনেক খুঁজে পেতে ঠিক পঁচাত্তর গ্রাম তেল ধরে, এমন একটি শিশি চুনচুনকে নিয়ে এসেছেন। পরের দিন থেকে তিনি ওই বিশেষ শিশিটিতে তেল ভর্তি করে রেখে, তেল রাখার মূল পাত্রটি মাসির নাগালের বাইরে রেখে যেতে শুরু করলেন। অন্যান্য সমস্ত রন্ধন সামগ্রী একই প্রক্রিয়ায় মাসিমুক্ত করা অসম্ভব ও পরিশ্রম সাধ্য, তাই আপাতত তারা স্ব স্ব স্থানেই অবস্থান করতে থাকলো। ভগবান মঙ্গলময়, তাঁর অশেষ কৃপা, তাই বোধহয় তিনি নতুন সদস্যটিকে নিজ চাকরিটি ছেড়ে মাসির তেলমশলা চুরি রোধে নিযুক্ত না করে, তার নিজ সংসার ও আমাদের কল্যানার্থে চাকরিটি বহাল রাখাই মনস্থ করলেন, যদিও তার ফল হলো ভয়ংকর। নিজের বাড়ির জন্য তেল মশলা যোগানের সহজ পথটি বন্ধ হওয়ায়, আমাদের মেসের রান্নার ওপরেও মাসির প্রভাব পড়তে বিলম্ব হলো না। রান্নায় মিষ্টির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করায় উত্তর পাওয়া গেল, “কি করবো? তেল কম, তাই বেশি করে মিষ্টি দিতে হচ্ছে”। চিনি যে সরষের তেলের বিকল্প, সেদিন প্রথম জানতে পারলাম।

সে যাইহোক, সন্ধ্যার সময় অতো দেরি করে আসা নিয়ে সকলের মধ্যে ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বললেও, তার বহিঃপ্রকাশ খুব একটা ছিল না। কারণ ওই সময়টাতে অশান্তি করার থেকে এক কাপ চা হাতে পাওয়া অনেক জরুরী ছিল। আমার নিজেরও খুব রাগ হতো, কিন্তু অসহনীয় গরম বা অত্যন্ত শীতেও মাসিকে একটা ছোট কুপির স্বল্পালোকে মুখবুজে উনুন জ্বেলে চা করে রান্নার আয়োজন করতে দেখলে, রাগকে দূর করে মায়া সেই স্থান দখল করতো। কিন্তু সবকিছুরই তো একটা সীমা থাকা প্রয়োজন, উচিৎও বটে।

একদিন এক প্রচণ্ড শীতের সন্ধ্যায় অন্ধকারে মশার কামড় খেয়ে মাসির আগমনের অপেক্ষায় বসে আছি, মাসির দেখা নেই। ক্রমশঃ রাত বাড়ছে, আশেপাশে কোন দোকানও নেই যে চা খেয়ে আসবো। ভয় হচ্ছে শেষপর্যন্ত মাসি আসবে তো? ভরসা একটাই, মাসি খুব একটা দূরে থাকে না ও একদিনও কামাই করে না। অবশেষে বাইরে থেকে মাসির সেই বিড়বিড় করে ক্ষোভ প্রকাশের আওয়াজ পাওয়া গেল। অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ একটু বেশি রাত করে এসেছে বলেই বোধহয়, আজ গলার আওয়াজও দুই পর্দা চড়ায় বাঁধা। ঠিক করলাম আর নয়, আজই এর একটা বিহিত হওয়া প্রয়োজন। আমি জানতাম, যে সকলের মধ্যে মাসি আমাকে বেশি ভালবাসে, মাঝেমধ্যে সামান্য হলেও আমার কাছ থেকে আর্থিক সাহায্যও পেয়ে থাকে, কাজেই যা করার আমাকেই করতে হবে।

ঘরে ঢুকতেই আমি মাসির হাত ধরে দরজার কাছে নিয়ে গিয়ে বললাম, “মাসি, তুমি বাড়ি ফিরে গিয়ে ছাগল নিয়ে থাকো, তোমায় আর রান্না করতে হবে না”। মাসি একটু অবাক হয়ে গিয়ে আমায় কিছু বলতে চাইছিলো, কিন্তু আমি তাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে দিলাম। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল। মেসের সকলে খুব ভয় পেয়ে গিয়ে আমায় বললো, বাড়ি তো ফিরিয়ে দিলেন এবার কি হবে? আমি তাদের আশ্বস্ত করে বললাম, “ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। আমাদের যেমন মাসিকে ছাড়া চলবে না, মাসিরও তেমনি আমাদের ছাড়া চলবে না। আজ যদি কোন কারণে ও না আসতো, তাহলে কি হতো? একটা দিন আমরা নিজেরা চালিয়ে নিতে পারবো না? আজ রাতে ভাত ডাল আলুভাতে দিয়ে চালিয়ে নেবো। কাল দেখা যাবে”। চালিয়ে তো নেবো, কিন্তু চালিয়ে নেওয়ার মূল সমস্যাটা যে উনুন ধরানোয় কেন্দ্রিভুত, আগে বুঝিনি। অনিল জানালো, যে সে ভাত রান্না করতে জানে। মহা খুশি হয়ে বললাম, “তাহলে তো সমস্যার সমাধান হয়েই গেল। তুই ভাতটা করে ফেল, আমি ডাল আর মচমচে করে আলুভাজা করে ফেলছি। গরম গরম ফার্স্ট ক্লাস খাওয়া হবে। তবে সবার আগে উনুন ধরিয়ে চা করতে হবে”।

উনুন ধরানো যে যুদ্ধ বিমান চালানোর চেয়েও শক্ত কাজ, তখন কি আর জানতাম ছাই। উনুনে খানকতক ঘুঁটে দিয়ে তার ওপরে কয়লা দিয়ে নীচের গর্তে দুটো ঘুঁটে রেখে, তাতে বেশ করে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিলাম। মুহুর্তের মধ্যে গোটা বাড়ি ধোঁয়ার আবরণে ঢেকে গেলেও, উনুন কিন্তু জ্বললো না। নীচের গর্তে ঘনঘন হাওয়া করায় ধোঁয়ার উড়ে বেরানোয় কিছু সুবিধা হল বটে, কিন্তু উনুন জ্বালানোয় কোন উপকার হলো না। এবার ঘাবড়ে গেলাম, ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে জল বেরোনোর সাথে সাথে ওই শীতের রাতেও ঘামতে শুরু করলাম। এমন সময় দোতলা থেকে বাড়িওয়ালার ছেলে এসে হাজির হলো। মাসি তাদের আত্মীয় হলেও, মাসিকে তারা বিশেষ পছন্দ করতো না। সে বোধহয় সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে গোটা নাটকটাই দেখেছে বা শুনেছে। সে শুধু বললো “মাসিকে তাড়িয়ে দিয়েছেন তো, বেশ করেছেন”। আমি আর এই ব্যাপারে কথা বাড়তে না দিয়ে উনুন ধরানোয় মনোনিবেশ করলাম। সে আমাকে সরে যেতে বলে উনুন থেকে সমস্ত কিছু বার করে বাথরূমে ফেলে, নতুন করে ঘুঁটে কয়লা দিয়ে সাজিয়ে, উনুনে আগুন দিয়ে হ্যারিকেনগুলো জ্বালিয়ে দিলো। এবার কিন্তু উনুন ধরতে খুব বেশি সময় লাগলো না। চা তৈরি হলো, আজ তার কদরই অন্যরকম। আমাদের সাথে চা খেয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে সে বললো, “আজ তো আর তাস খেলার কোন সুযোগ নেই। আপনারা রান্না করুন, কোন প্রয়োজন হলেই আমায় ডাকবেন”।

সে চলে যাবার পর অনিল ভাত বসিয়ে দিলো। আমি মচমচে আলুভাজার জন্য সরু সরু করে আলু কাটতে শুরু করে দিলাম। ভাত হলেই ডাল বসিয়ে দেবো। তারপরে আলু ভাজা হলেই গল্প শেষ। কতক্ষণের আর মামলা? কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর অনিল গিয়ে ভাতের কতদূর দেখে আসছে। সে গ্রীন সিগনাল দিলেই আমি ডাল রাঁধার প্রস্তুতি নেবো। ছেলেরা চুল বাঁধে না, চুল আঁচড়ায়। তা নাহলে গর্ব করে বুক ফুলিয়ে বলতে পারতাম, যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে অনিল বাথরূমে ভাতের হাঁড়ি নিয়ে গিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে হাঁড়ির দুদিকে কাপড় দিয়ে কাত করে ধরে, ফেন গালতে শুরু করলো। এবার আমার খেলা শুরু। জীবনের প্রথম ডাল রান্নার দিনেই যে এই শর্মা আলোড়ন ফেলে দিতে পারে, সে ধারণা বোধহয় এদের করোরই নেই। মুসুর ডাল কি করে রাঁধে সঠিক ধারণা নেই। মাকে দেখেছি শুকনো কড়ায় মুগ ডাল ভেজে রান্না করতে। ডাল ভাজাটাও ভারী সুন্দর খেতে লাগে। উনুনে কড়া বসিয়ে এ কৌটো ও কৌটো খুঁজেও মুগ ডালের সন্ধান পেলাম না। শেষে খুঁজে পেলাম বটে কিন্তু তার পরিমাণ খুবই অল্প। নিশ্চই অন্য কোন কৌটোয় আছে ভেবে খোঁজার আগে যতটুকু পেয়েছিলাম কাজ এগিয়ে রাখার জন্য উনুনের ওপর কড়ায় দিয়ে দিলাম। কড়াটা এত গরম হয়ে গেছে, যে ডালগুলো কড়ায় ঢালার সাথেসাথেই মোটামুটি ষাট শতাংশ ডাল গরম সহ্য করতে না পেরে,  লাফ দিয়ে কড়ার বাইরে চলে গেল। সোনা মুগের ডাল কেন বলে জানি না, সম্ভবত সোনার মতো রঙ ধারণ করে বলে। যারা কড়ার বাইরে লাফিয়ে চলে গেল, তাদের গাত্রবর্ণ আর দেখা সম্ভব হলো না, কিন্তু অবশিষ্ট চল্লিশ শতাংশ ডাল, যারা পালাবার সুযোগ না পেয়ে কড়ার ভিতর রয়ে গেল, তাদের একজনেরও গায়ের রঙের সাথে সোনার মিল খুঁজে পেলাম না। বরং তাদের সাথে আলকাতরা, কয়লা, বা অমাবস্যার রাতের কোথায় একটা যেন মিল খুঁজে পেলাম। কি করবো ভেবে না পেয়ে চটপট্ কড়ায় জল ঢেলে দিলাম। মাসির স্বভাব ছিল কোন কিছু শেষ হবার আগেই আমাদের জানানো, অতএব মুগের ডালের দ্বিতীয় কোন কৌটো অবশ্যই আছে। তাই আদা জল খেয়ে মুগের ডালের উৎস সন্ধানে লেগে পড়লাম। একে একে এ কৌটো ও কৌটো হাতড়েও মুগের ডালের সন্ধানে ব্যর্থ হলাম বটে, তবে মুসুর ডালের সন্ধান পেলাম। ঈশ্বর করুণাময়, মুসুর ডাল রন্ধনের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি শুকনো কড়ায় ভেজে নেওয়ার নির্দেশ দেননি। আন্দাজ মতো মুসুর ডাল, মুগের ডালের ফুটন্ত কড়াইয়ে দিয়ে দিলাম। এবার কি করা উচিৎ ভেবে না পেয়ে তাতে সামান্য হলুদ গুঁড়ো, নুন, ও চিনি দিয়ে দিলাম।

এদিকে অনিল তখনও ভাতের হাঁড়ির দুদিকে কাপড় দিয়ে ধরে ফেন গেলেই যাচ্ছে। আর কতক্ষণ ফেন গালতে লাগবে জিজ্ঞাসা করায় সে উত্তর দিলো, “ও সুবীরদা, ফেন তো বেড়িয়েই যাচ্ছে শেষ হচ্ছে না যে”!  মাসিকে আমি তাড়িয়েছি, তাই দায় আমার। আর সকলে চৌকিতে শুয়ে বসে গুলতানি করলেও, আমার উপায় নেই। হাঁড়ি সোজা করে স্বল্প আলোতেও যেটা নজরে পড়লো সেটা আঁৎকে ওঠার মতো। হাঁড়িতে বোধহয় শুধুই মাড়, ভাত বিশেষ চোখে পড়ছে না। ওই অবস্থায় অবশিষ্ট ভাতের রেস্ট্ ইন পিস কামনা করে তাকে একপাশে রেখে দিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে দেখলাম ডাল সিদ্ধ হয়ে গেছে। ডাল রান্নাটা অন্তত ভালোই হয়েছে বলে মনে হলো, কারণ কিছু কালো কালো স্পট্ থাকলেও, মোটের ওপর ডালের রঙ বেশ হলুদ হয়েছে। অবশ্য সেটা ডালের ধর্মে না হলুদ গুঁড়োর আধিক্যে, ঠিক বোঝা গেল না। ডাল একটা পাত্রে ঢেলে রেখে, কড়াইটা ভালো করে ধুয়ে সাধের মচমচে আলু ভাজার জন্য তাকে উনুনে বসালাম, এমন সময় বাড়িওয়ালার ছেলে সম্ভবত বিড়ির লোভে এসে হাজির হলো। কড়াইতে সবে তেল ঢেলেছি, আমার ইচ্ছা ছিল তেল বেশ গরম হলে নুন হলুদ মাখানো আলুগুলো অনেক বেশি যত্ন নিয়ে ধীরে ধীরে ভাজবো, কারণ আজ রাতে ওটাই আমার তুরুপের তাস। কাটা আলুর পাত্র হাতে আমায় দেখে সে বললো “কি করছেন, আলু ভাজছেন? দিন আমি ভেজে দিচ্ছি”। এরপর কিছু বোঝার আগেই সে আমার হাত থেকে আলুর পাত্রটা নিয়ে  কড়াইতে ঢেলে দিলো। আলুর সাথে বেশ কিছুটা হলদেটে জলও গরম কড়াইয়ের ঠান্ডা তেলে আশ্রয় পেয়ে ধন্য হলো। ঠান্ডা তেল না তার হাতের গুণে জানি না, আলুভাজাটা একটা মাঝারি আকারের বলের রূপ ধারণ করলো। ভয় পেলে সজারু যেমন নিজেকে গুটিয়ে ফেলে বলের আকৃতি ধারণ করে, অনেকটা সেরকম। রাতে প্রায় স্ট্র দিয়ে খাওয়ার মতো ভাত ও অসাধারণ সুস্বাদু ডাল, সাথে ওই আলুর বল ভেঙে খানিকটা করে তেলমাখা আলুভাজা খেয়ে ও খাইয়ে আমার কি অবস্থা হয়েছিল, সেকথা আর নাই বা বললাম।

পরদিন সাতসকালে মাসি এসে হাজির হয়ে উনুন ধরিয়ে চা করে সকলকে দিয়ে গেল। পরিস্থিতি ঠান্ডা হলো। বেশ কিছুদিন মাসির ছাগলগুলো আমাদের ভয়ে সুবোধ ছাগলের মতো সন্ধ্যার আগেই মাঠ থেকে ফিরে আসা শুরু করলো। মাসি কিন্তু আগের মতো দুবেলাই তার ফর্সা বাবুর জন্য এক কাপ করে অতিরিক্ত চা আলাদা করে সরিয়ে রাখতো। মাসিকে নিয়ে কত ঘটনা, লিখতে গেলে রামায়ণ হয়ে যাবে।

এর অনেক পরে আমি বদলি হয়ে আবার নিজের শহরে ফিরে আসি। চলে আসার আগে মাসির জন্য ভালো শাড়ি কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাকে শাড়ি ও কিছু টাকা দিতে সে আমার হাতদুটো চেপে ধরে শিশুর মতো কেঁদেছিল। কতো স্মৃতি! তখন কষ্ট হতো, বড় অসহায় ছিল প্রাত্যহিক জীবন। আজ কিন্তু সেদিনের সেই স্মৃতিগুলো মন্দ লাগে না, একবার ঘুরে আসতে ইচ্ছা করে। অনেকগুলো বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। জানি না মাসি কেমন আছে, বা আদৌ বেঁচে আছে কী না। প্রার্থনা করি মাসি যেখানেই থাকুক, শেষ বয়সে একটু সুখে থাকুক, শান্তিতে থাকুক, আনন্দে কাটুক তার বাকি জীবন।

সুবীর কুমার রায়

১৪-০৬-২০২০

গুরু-শিষ্য পরম্পরা { লেখাটি প্রতিলিপি-বাংলা, ও অন্যনষাদ গল্পগুচ্ছ পত্রিকায় প্রকাশিত।}

16

অবিবাহিত মুকুন্দবাবু মানুষটা একটু অদ্ভুত ধরণের। অর্ডার সাপ্লাই-এর ব্যবসা করে যেক’টা টাকা উপায় করেন, তাতে তাঁর একার সংসার সচ্ছলভাবে না চললেও ভালভাবেই চলে যায়। না, ভুল বললাম। একার নয়, বোধহয় দুজনের সংসার বললেই ঠিক বলা হবে। প্রায় চল্লিশ বছর বয়স হয়ে গেলেও, আজও তাঁর বিয়ে করার সুযোগ হয়নি। হয়নি, কারণ তাঁর গুরুদেবের বারণ।

তাঁর গুরুদেব, স্বামী পরমানন্দজী। কলকাতার বুকে বিরাট একটা দোতলা বাড়িতে তিনি বসবাস করেন। তিনি সংসার করেননি, ব্রহ্মচর্য পালন ও মানব সেবাই তার একমাত্র কারণ। প্রচুর শিষ্য-শিষ্যার প্রতিনিয়ত তাঁর বাড়িতে আগমন হলেও, বাড়ির একতলার একটি বেশ বড় হল ঘর, ও অপর একটি বড় ঘরেই তাঁদের আসা যাওয়া সীমাবদ্ধ ছিল। শোনা যায় তারাপীঠে পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে তিনি তপস্যা করে সিদ্ধি লাভ করেন, যদিও কিছু শিষ্য-শিষ্যা বলেন, যে তারাপীঠ নয়, তবে অন্য কোন শ্মশানে পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে তিনি সিদ্ধি লাভ করেন। পরনে টকটকে লাল ধুতি ও চাদর, বড় বড় গোঁফ দাড়িতে ঢাকা ফর্সা মুখটার, নাকের কাছ থেকে প্রায় চুল পর্যন্ত লাল সিঁদুরের চওড়া টিপ। দেখলেই ভয় না শ্রদ্ধায় বুঝতে না পারলেও, মুকুন্দবাবুর মাথাটা সম্ভবত শ্রদ্ধায় নীচু হয়ে যায়। মুকুন্দবাবুর সবথেকে বিশ্বাস ও আস্থা, এই গুরুদেবের ওপর। গুরুদেবের ইচ্ছায়, তিনি তাঁর মতোই নিষ্কাম নির্লোভ জীবন যাপন করার জন্য, নিজে বিয়ে পর্যন্ত করেননি। পঞ্চ মকারের প্রথম দুটি, অর্থাৎ মদ ও মাংসের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ থাকলেও, এবং প্রতি শনিবার রেসের মাঠে গেলেও, তাঁর অন্য কিছু পার্থিব জিনিসের ওপর বিন্দুমাত্র লোভ নেই। গুরুদেবের আদেশ ও ইচ্ছা পালন করবার জন্য, প্রতিমাসে মানব সেবার জন্য ক্ষমতার অধিক অর্থ গুরুদেবের হাতে হাসিমুখে তুলে দিতে গিয়ে তাঁর ভবিষ্যতের জন্য কোন সঞ্চয় না হলেও, প্রায় প্রতি মাসে ঋণের পরিমাণ বেড়েই যায়। তবু এই নিয়ে তাঁর মনে কোন দুঃখ ছিল না। গুরুদেব তাঁকে বারবার উপদেশ দিয়েছেন, “বেটা ল্যাংটা অবস্থায় এসেছিস। সময় হলে ডাক আসলেই, ল্যাংটা অবস্থাতেই পরম পিতার কাছে খালি হাতে ফিরে যেতে হবে। শুধু শুধু এইক’টা দিন অর্থ ও অন্যান্য পার্থিব জিনিসের ওপর লোভ করে নরকবাস করবি কেন? যতদিন এই ধরায় আছিস, নিষ্কাম নির্লোভ জীবন যাপন কর। গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বর, এই গুরুর ওপর আস্থা রাখ, আমিই তোকে পুণ্যের পথ, স্বর্গের পথ দেখাবো”। সকলের চোখের অলক্ষ্যে মাঝেমধ্যে সন্ধ্যার পর সস্তার বারে গিয়ে বাদাম ও ভিজে ছোলা দিয়ে দু-এক পাত্র বাংলা মদ পান করে ও প্রতি শনিবার রেসের মাঠে গিয়ে তিনি বেশ সুখেই ছিলেন।

এক শনিবারে রেসের মাঠে গিয়ে হঠাৎ তাঁর অনেকগুলো টাকা প্রাপ্তি হয়। মুকুন্দবাবুর স্থির বিশ্বাস, তাঁর এই রেসের মাঠে আসার নেশার কথা গুরুদেবের অজানা হলেও, গুরুদেবের আশীর্বাদেই তাঁর এই আকস্মিক ও অস্বাভাবিক অর্থ প্রাপ্তি। তিনি তখনই মনে মনে স্থির করে ফেলেন, যে আগামীকাল সকালেই গুরুদেবের বাড়ি গিয়ে এই টাকার একটা বড় অংশ গুরুদেবের চরণে দিয়ে প্রণামটা সেরে আসবেন। প্রফুল্ল মনে আজ আর পরিচিত সস্তার বারটায় না গিয়ে, ট্যাক্সি নিয়ে পার্ক স্ট্রীটের খরচাসাপেক্ষ ওয়াইল্ড লাইফ বার কাম রেস্তোরাঁয় হাজির হলেন। স্বল্পালোকে বারের ভিতরটা একটা মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। কোণের দিকে একটা ফাঁকা টেবিলে বসে স্কচের অর্ডার দিয়ে, মাংসের কি কি পদ নেওয়া যায় দেখার জন্য তিনি মেনু কার্ডে মনোনিবেশ করলেন। বেয়ারা এসে তাঁর টেবিলে একটা বাদাম ভাজার প্লেট ও স্কচের গ্লাসটা রেখে দিতে, তিনি চিকেনের দুটো প্রিপারেশন ও একপ্লেট স্যালাডের অর্ডার করলেন। বেয়ারা চলে গেল।

মুকুন্দবাবু সবে গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে দুটো বাদাম মুখে পুরেছেন, এমন সময় তাঁর নজর গেল সামনের একটা টেবিলের ওপর। বিশাল বিশাল দুটো চিকেন রোস্ট্ ও হুইস্কির গ্লাস নিয়ে একজন সৌম্য চেহারার ব্যক্তি একজন তন্বী যুবতীকে প্রায় জড়িয়ে ধরে বসে আছেন। ভদ্রলোকের পরনে নীল রঙের সুট, লাল টাই, গোঁফ দাড়ি কামানো, ব্যাক ব্রাশ করা চুলে ফর্সা সুন্দর মুখটা আরও সুন্দর লাগছে। আঁটসাঁট পোশাক পরিহিতা যুবতীটি ভদ্রলোকটির গায়ে প্রায় হেলান দিয়ে কাত হয়ে বসে আছেন আর মাঝেমাঝে চিকেন রোস্টে কামড় ও পানীয় গ্লাসে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে এত নীচু গলায় কথাবার্তা বলে হাসাহাসি করছেন, যে তাঁদের একটি কথাও তাঁর কানে পৌঁছচ্ছে না। ইতিমধ্যে খাবার দিয়ে গেছে। গুরুর আদেশ, তাই তাঁদের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিজের খাবারে মন দিলেন। কিন্তু কি কারণে বুঝতে না পারলেও, তাঁর দৃষ্টি বারবার সামনের টেবিলেই চলে যাচ্ছে। কোথায় যেন ভদ্রলোককে দেখেছেন। রেসের মাঠে বা ব্যবসা সংক্রান্ত কোন কাজে? নাঃ, কিছুতেই মনে করতে পারলেন না।

বেয়ারাকে বিল দিতে বলে, আজকের সুন্দর দিনটার কথা ও আগামীকালের কাজের একটা পরিকল্পনা স্থির করতে করতে ধীরে ধীরে বারকয়েক নতুন করে নেওয়া পানীয়র গ্লাস ও খাবার শেষ করে, তিনি একটু টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। বেশ কিছুক্ষণ আগেই সামনের টেবিলের দুজন খাওয়া শেষ করে তাঁর পাশ দিয়ে একটু বেসামাল ভাবেই চলে গেছেন। বেয়ারা এখনও বিল দিয়ে না যাওয়ায়, কাউন্টারে গিয়ে বিল মেটাতে গিয়ে তিনি তো অবাক। কাউন্টারের ভদ্রলোক অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাঁকে জানালেন, “আপনার বিল তো পেমেন্ট হয়ে গেছে স্যার, রতনবাবু আপনার বিলের টাকা মিটিয়ে দিয়েছেন”। মুকুন্দবাবু একটু অবাক হয়ে জড়ানো গলায় বললেন, “আমার বিলের টাকা রতনবাবু মিটিয়ে দিয়ে গেছেন? কে রতনবাবু? আপনার বোধহয় কোথাও ভুল হচ্ছে”।

“না স্যার আমার কোন ভুল হচ্ছে না। আপনার বিলের টাকা উনি মিটিয়ে দিয়ে বলে গেছেন, যে আমি যেন আপনার কাছ থেকে বিলের টাকা আর গ্রহণ না করি”। অগত্যা বেয়ারার হাতে কিছু টিপস দিয়ে, মৌরি মুখে দিয়ে মুকুন্দবাবু বার থেকে বেরোতে যাবেন, এমন সময় কাউন্টারের ভদ্রলোক তাঁকে ডেকে তাঁর হাতে একটা খাম দিয়ে বললেন, “রতনবাবু এই খামটা আপনাকে দিতে বলে গেছেন। আসলে ওনার মতো একজন সম্ভ্রান্ত রেগুলার খদ্দেরের অনুরোধ আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। ভালো থাকুন, আবার দেখা হবে, শুভ রাত্রি”।

বার থেকে বেরিয়ে কৌতুহল মেটাতে খামটা খুলে তাঁর চোখ তো কপালে উঠে গেল, নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না। খামের মধ্যে একতাড়া দুহাজার টাকার নোট ও একটা চিরকুট। তাতে লেখা টাকাটা রেখে দিলে খুশি ও নিশ্চিন্ত হতাম, ইতি-রতন চন্দ্র মালাকার।

বাড়ি ফিরে মুকুন্দবাবু খামটা খুলে টাকাগুলো গুণে দেখলেন, পঞ্চাশটা দুহাজার টাকার নোট। হাজার চেষ্টা করেও তিনি রতন চন্দ্র মালাকার নামে কারও কথা মনে করতে পারলেন না। শেষে অনেক ভেবে ঠিক করলেন, যে আগামীকাল সন্ধ্যায় ওই বারে গিয়ে টাকাটা ফেরৎ দিয়ে আসবেন।

গতকাল রেসের মাঠে টাকাটা পেয়েই তিনি ঠিক করেছিলেন, যে আজ রবিবার ছুটির দিন, আজ তিনি গুরুদেবের বাড়িতে গিয়ে গুরুদেবকে বেশ কিছু টাকা দিয়ে প্রণাম করে আসবেন। সেইমতো তিনি গুরুদেবের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। তিনি ঠিক করলেন, যে গতকাল রাতের এক লাখ টাকাটার ব্যাপারে কি করা উচিৎ, গুরুদেবের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করে আসবেন।

আজ রবিবার, গুরুদেবের বাড়িতে অন্যান্য দিনের তুলনায় ভক্ত সমাগম অনেক বেশি হয়। বড় হলটার ভিতর ভীষণ ভিড়, তিল ধারণের জায়গা পর্যন্ত নেই। অন্যান্য দিনের মতো গুরুদেবের বসার আসনটি ফুল দিয়ে সাজানো থাকলেও, গুরুদেব এখনও সেই আসন গ্রহণ করেননি। কিছুক্ষণ পরে ভিতর থেকে একজন এসে তাঁকে ডেকে নিয়ে ভিতরে গেলেন। লোকটিকে তিনি চেনেন, প্রতিবার তাঁকে গুরুদেবের পায়ের কাছে বসে থাকতে দেখেছেন। তিনি মুকুন্দবাবুকে নিয়ে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি ধরলেন। মুকুন্দবাবু আজ পর্যন্ত কোনদিন দোতলায় ওঠেননি, অন্য কোন শিষ্যকেও দোতলায় উঠতে দেখেননি। তিনি লোকটিকে এ বিষয় কোন প্রশ্ন করার আগেই লোকটি তাঁকে বললেন, গুরুদেব আপনাকে একবার দোতলায় তাঁর ঘরে নিয়ে যেতে বলেছেন।

লোকটি তাঁকে গুরুদেবের ঘরে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেলেন। ঘরটি বিশাল ও খুব সুন্দর সুন্দর আসবাব দিয়ে সাজানো। গুরুদেব তাঁকে তাঁর কাছে একটি চেয়ারে বসতে বললেন। মুকুন্দবাবু ব্যাগ খুলে প্রণামী বাবদ নিয়ে আসা টাকাটা বের করলেন। গুরুদেব তাঁকে হাতের ইশারায় নিরস্ত করে খুব নীচু গলায় বললেন, “মুকুন্দবাবু, টাকাটা পেয়েছেন তো? দয়া করে আপনি গতকাল সন্ধ্যার ঘটনাটা ভুলে যান। এবিষয়ে কাউকে কিছু বলবেন না। আপনি মুখ খুললে আমার ব্যাবসা রাতারাতি লাটে উঠে যাবে। আমি আপনার জন্যই এখনও নীচে না গিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। আপনি টাকাটা রেখে দিন, আরও চাইলে আমি দিতে প্রস্তুত। আশা করি আপনি আমার অনুরোধটা রক্ষা করবেন। আপনি এখন ফিরে যান, বিস্তারিত ভাবে পরে কথা হবে।

মুকুন্দ বাবু উঠে দাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি তাহলে…”

কথার মাঝখানে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে গুরুদেব বললেন, “হ্যাঁ, আমিই রতন চন্দ্র মালাকার, ওরফে আপনার প্রাক্তন গুরুদেব, স্বামী পরমানন্দজী। গতকাল সন্ধ্যায় ওয়াইল্ড লাইফ বার কাম রেস্তোরাঁর মতো একটা নির্জন জায়গায়, সামনের টেবিলে তোকে, মানে আপনাকে দেখবো আশা করিনি। আমায় ক্ষমা করে দিন। আপনি এখন মুক্ত, তবে ভবিষ্যতে যেকোন প্রয়োজনে, আমার দোতলার এই ঘরটি আপনার জন্য খোলা থাকবে। অনুগ্রহ করে আপনি এখন ফিরে যান।

মুকুন্দবাবু চেয়ার থেকে উঠে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। রতনবাবু তাঁর সাথে হাত মিলিয়ে বাইরে অপেক্ষমাণ লোকটিকে ডাকলেন। লোকটি ভিতরে ঢুকে তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বড় রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে আসলেন।

ধীরে ধীরে প্রাক্তন গুরুদেবের অসীম কৃপায় মুকুন্দবাবুর সমস্ত ঋণ শোধ হয়ে আর্থিক সচ্ছলতা দেখা দিলো। সামনের মাঘে তাঁর বিয়ের দিনও পাকা হয়ে গেছে।

সুবীর কুমার রায়

১০-০৬-২০২০

 

অভিভাবকহীন প্রথম দূরপাল্লার ভ্রমণের অংশ বিশেষ (স্মৃতির পাতা থেকে)

71946068_1338812139627865_3484388348838019072_n

প্রাণের বন্ধু মাধবের বড়মামা ডাক্তার। মধ্য প্রদেশের ডোঙ্গরগড়ে রেলে চাকরি করেন। বি.কম. পার্ট ওয়ান পরীক্ষার শেষে বেড়াতে যাওয়া ও প্রচন্ড নকশাল আন্দোলনের ঝামেলা থেকে কিছুদিন মুক্তি পাওয়ার আশায়, আমি ও মাধব ডোঙ্গরগড়ে যাওয়া ঠিক করলাম। যদিও বড়মামাকে খুব গম্ভীর ও রাশভারী মানুষ বলেই মনে হতো। যাইহোক্, সেইমতো আমার ও মাধবের ওখানে যাওয়া পাকা হয়ে গেল।

যেদিন আমাদের যাওয়ার কথা, ঠিক তার আগের দিন রাতে দোতলায় সামনের বারান্দায় পরপর মশারি খাটিয়ে আমরা শুয়ে আছি। আমাদের বাড়ির সামনে একটা মাঝখানে টিনের দরজা দেওয়া অল্প উচ্চতার পাঁচিল ছিল। গভীর রাতে, তখনও ভোর হতে অনেক দেরি আছে, টর্চের তীব্র আলো আমাদের বারান্দায় পড়তে, আমাদের ঘুম ভেঙে গেল। বাবা ও মা’রও ঘুম ভেঙে গেছে। নীচের রাস্তায় ভারী বুটের আওয়াজ। হঠাৎ শুনলাম কে যেন বললো, “এই বাড়ি স্যার”। টিনের দরজা না খুলে, পাঁচিল টপকে বেশ কয়েকজন লাফিয়ে ভিতরে প্রবেশ করায় বুঝলাম পুলিশ এসেছে। বাবা বললেন “ওদের একটু বুঝিয়ে বলবো, যে এ  বাড়ির কেউ নকশালী করে না”? আমি ফিস্ ফিস্ করে আলো জ্বালতে ও কথা বলতে বারণ করলাম। আমি জানি এত রাতে কথা বলতে গেলে, আমরা কেন এত রাতে জেগে আছি, সে কৈফিয়ৎ দিতে হবে। বাবারও সত্যবান চক্রবর্তীর মতো অবস্থা হবে। সত্যবান চক্রবর্তী একজন নিরীহ প্রৌঢ় ভদ্রলোক, কিছুদিন আগে তাঁর বাড়িতে পুলিশ এসে কাউকে না পেয়ে তাঁর ওপর অকথ্য অত্যাচার করে গেছে। আবার এও বুঝতে পারছি,  যে ওরা ওপরে উঠে এলে, আমার ও পাশের ফ্ল্যাটের গোবিন্দর অবস্থা কাহিল হয়ে যাবে, কারণ এই বাড়িতে যুবক বলতে আমরা দু’জনই বাস করি। এইসময় হঠাৎ শুনলাম ওদের মধ্যে কে একজন বললো, “এই বাড়ি নয় স্যার, প্রদীপদের পাশের বাড়ি”। প্রদীপ নকশাল হিসাবে পরিচিত ছিল। ওদের বাড়িটা ছিল, আমাদের বাড়ির ঠিক দু’টো বাড়ি আগে। আমাদের বাড়ির রঙ সাদা, আমাদের একটা বাড়ি আগের বাড়িটার, অর্থাৎ প্রদীপদের বাড়ির ঠিক পাশের তিনতলা বাড়িটার রঙও সাদা। ওই লোকটার কথা শোনার সাথে সাথে সবাই আবার পাঁচিল টপকে লাফ দিয়ে রাস্তায় নেমে, প্রদীপদের পাশের বাড়িটার উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললো।

নিদ্রাহীন সারাটা রাত কাটিয়ে খুব ভোরে দাঁত মাজার অছিলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক ঝলক তাকিয়ে দেখলাম, রাস্তায় সার সার অবাঙালি সি.আর.পি. তে ভর্তি। একজন মহিলা, লোকের বাড়ি কাজ করতে যাবার সময়, তাকে ওরা বাধা দিল। ভয়ে ভয়ে সে জানালো, যে সে লোকের বাড়ি কাজ করতে যাচ্ছে। কিন্তু ওদের একজন গম্ভীর গলায় জানালো— “অটোর নেই”। অর্থাৎ অর্ডার নেই। পরে শুনেছিলাম ওদের কাছে খবর ছিল, প্রদীপের পাশের বাড়িতে অনেকে লুকিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। যদিও সেই বাড়িতে কাউকেই পাওয়া যায় নি। একটু বেলা হলে সকলে ফিরে গেলে, আবার সব স্বাভাবিক হলো। আজই আমাদের ডোঙ্গরগড় যাবার দিন, আজ কোন ঝামেলা হলে সব পণ্ড হয়ে যেত।

এই প্রথম একা একা দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া। বেশ একটা হীরো হীরো, সাবালক সাবলক ভাব নিয়ে দু’জনে গীতাঞ্জলীতে ডোঙ্গরগড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। যাওয়ার আগে ভাইকে লালু-ভুলুর যত্ন নিতে বলে গেলাম। লালু-ভুলু সাদা খরগোশ। লালু মেয়ে, আমার খরগোশ। ভুলু ছেলে, ভাইয়ের খরগোশ। একটা ফাঁক ফাঁক কাঠের বাক্সে, যাতে করে কেক, পাঁউরুটি নিয়ে যাওয়া হয়, খরগোশ দু’টোকে রাখা হতো।

অবসন্ন বিকেল কেটে, একসময় রাত নেমে এল। টু-টায়ার বগিতে মুখোমুখি একদিকে মাধবের, উল্টোদিকে আমার আপার বার্থ। সারাদিন মুখোমুখি কখনও জানালার ধারে, কখনও প্যাসেজের দিকে বসেই কেটেছে। বেশ মনে আছে, অনেক রাত পর্যন্ত নীচে একপাশে কোনমতে বসে গল্প করে কাটালাম। ওপরের বার্থে কেউ নেই, বার্থের লোক নিশ্চই ট্রেন মিস্ করেছে, ইত্যাদি নানারকম আলোচনার পর, দু’জন ওপরে উঠে শুয়ে পড়লো। দেখলাম, দেখেও চুপ করে থাকলাম। আরও অনেক পরে ওই দু’জনকে ডেকে নীচে নেমে আসতে বললে, ওরা অবাক হয়ে গেল। গোটা ট্রেনটায় অন্ধকারে সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। আমরা রিজার্ভ করা বার্থ থাকতেও কষ্ট করে কেন জেগে বসেছিলাম, ওরা ভেবে না পেয়ে নীচে নেমে এলো।

বড়মামার কোয়ার্টার্সটা বিশাল। সামনে ও দু’পাশে পুরো ফাঁকা জায়গা। পিছনটা পাঁচিল ঘেরা ছোট্ট জায়গা, কিছু শাকসবজি লাগানো হয়েছে। বড়মামার বড় মেয়ে তার দাদুর কাছে বম্বেতে থাকে। ছোট মেয়ে মুনা ও বাবুল, দু’জনেই বেশ ছোট। ওখানে পৌঁছে কিরকম একটা মন খারাপ করা অস্বস্তি হতে লাগলো। কাউকে চিনি না, বড়মামাও বেশ গম্ভীর রাশভারী মানুষ বলে জানি। একটু পরেই বড়মামা অফিস থেকে এসে, আমাদের দেখে খুব খুশি হলেন। ডানদিকের একটা ঘর আমাদের দু’জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ঘরটার একদিকের দরজা দিয়ে অন্যান্য ঘরে যাওয়া যায়। অন্য একটা দরজা দিয়ে পিছনের ঘেরা সবজি বাগানটায় যাওয়া যায়। বাড়ির ভিতরে একটা বাথরূম-পায়খানা, আর একটা পায়খানা ওই ঘেরা সবজি বাগানটার একপাশে। এটা কিন্তু আমাদের এখানকার খাটা পায়খানার মতো। একটা সিমেন্টের সিঁড়ি দিয়ে অনেকটা উঁচুতে উঠে, এই পায়খানাটায় ঢুকতে হতো।

প্রথম দিন নতুন পরিবেশে ভালোই কাটলো। সন্ধ্যার আগে আমি আর মাধব ঘুরতে বেরলাম। একটু দূরে বোমলাই পাহাড় নামে একটা পাহাড় ছিল। চারিদিকের অন্যান্য পাহাড়গুলোর তুলনায় এই পাহাড়টা অনেকটাই উঁচু। এই পাহাড়টার ওপরে একটা মন্দির আছে। সম্ভবত মন্দিরের দেবীর নাম বোমলাই। আশেপাশে কয়েকটা ছোট ছোট ঢিবি পাহাড় আছে, দূরে সাতপুরা রেঞ্জ। রাতে বড়মামা ও মামি, আমাদের লুডো খেলতে ডাকলেন। আমি আবার আসার সময় সঙ্গে করে একটা চাইনিজ চেকার নিয়ে এসেছি। এই খেলাটা আমার খুব প্রিয় ছিল। একসময় অনেকেই আমাকে হারাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। বেশ মনে আছে, এই খেলায় আমাকে কেউ হারাতে পারে না শুনে বাকসাড়ার একটা ছেলে, এতদিন পরে আর তার নাম মনে করতে পারছি না, আমাকে চ্যালেঞ্জ করে বসলো। আমাকে কেউ হারাতে পারে না, একথা আমি নিজে কোনদিন বলিনি। তবে ব্যাতড়ে আড্ডা মারতে গিয়ে মাঝে মধ্যে খেলা হতো, একথা সত্যি আমাকে কেউ কোনদিন হারাতে পারেনি। ওরাই আমার খেলার প্রশংসা করে একথা বলতো, আর তাতেই গ্যাস খেয়ে, উত্তেজিত হয়ে এই ছেলেটা আমাকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। ব্যাতড়েই একজনের বাড়িতে খেলা হবে। ঠিক হলো, যে হারবে সে মুরগির দাম দেবে। যারা দর্শক, অর্থাৎ আমার ফ্যানেরা, তেল, মশলা, চাল ইত্যাদির দাম দেবে। দু’জনের খেলা অনেকক্ষণ চলার পর, আমিই জয়ের হাসি হেসেছিলাম। মুরগির ঝোল, ভাতও সেদিন কথামতো হয়েছিল। যাহোক্, বড়মামাকে চাইনিজ চেকার খেলার কথা বলতে, তাঁরা লুডো খেলাতেই আগ্রহ প্রকাশ করলেন।

পরদিন সকালে চা খেয়ে বাথরূমে যাবার আগে মাধবকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কোন বাথরূমটায় যাব”? মাধব জানালো, দিনের বেলায় ছেলেরা বাইরের বাথরূমটা ব্যবহার করে। সেইমতো আমিও সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে ভিতরে ঢুকে লক্ষ্য করলাম, নীচে কোন টব বা গামলা জাতীয় কিছু নেই। গর্তের নীচে পরিস্কার চকচকে লাল সিমেন্টের মেঝে। আবার বাইরে এসে মাধবকে ব্যাপারটা জানাতে, ও বললো কোন অসুবিধা নেই ওখানেই যা। বুঝতে পারছি না, যে ও আমার সাথে ইয়ার্কি করছে কী না। যদিও ওর এই জাতীয় ইয়ার্কি করার স্বভাব নয়, তবু ভয় হচ্ছে ওখানে যাবার পর আবার না লজ্জায় পড়তে হয়। শেষপর্যন্ত ওর জোর গলায় অভয়বাণী শুনে ও প্রাকৃতিক ডাকে, যা আছে কপালে ভেবে ওখানেই গেলাম। একটু ভয় ভয় ভাব নিয়ে সবে বসেছি, বস্তুটা শরীর ত্যাগ করে লাল মেঝেয় পড়ার আগেই নীচে কিরকম একটা আওয়াজ হওয়ায়, নীচে তাকিয়ে দেখি দুটো শুয়োর গর্তের নীচে, আর একটা গুঁতোগুঁতি করে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। একটা তো পারলে প্রায় বস্তুটা মাটিতে পড়ার আগেই শরীর থেকে টেনে নিতে চায়। ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কী করবো ভাবছি। এই অবস্থায় বাইরে যাওয়াও সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে আবার বসলাম। বস্তুটা মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে, মেঝে আবার আগের মতো লাল চকচকে। পরে মাধব জানালো এখানে এটাই ব্যবস্থা, সব বাড়িতেই এই একই ব্যবস্থা। জিজ্ঞাসা করলাম, “কোনদিন শুয়োরগুলোর যদি খিদে না থাকে, বা শরীর খারাপ করে”? মাধব জানালো শুয়োরের অভাব নেই, কারো না কারো খিদে থাকবেই, কাজেই চিন্তার কোন কারণ নেই। এরপর থেকে এই অদ্ভুত ব্যবস্থায় আমি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম।

বেশ কাটছিল। সকালে চা জলখাবার খেয়ে দু’জনে ঘুরতে বেরোতাম। চারিদিক ঘুরে ফিরে বাড়ি ফিরে স্নান করা। দুপুরে ভালোমন্দ খেয়ে একটু ভাতঘুম। বিকালে আবার বেরোনো। পাহাড়ে ওঠা, রেল লাইন ধরে হাঁটা, এবং শেষে একটা দোকানে গরম গরম সিঙাড়া ও চা খেয়ে বাড়ি ফেরা। ইতিমধ্যে আমার অনুরোধে বড়মামা ও মাইমাও চাইনিজ চেকার খেলা শুরু করেছেন। এখন লুডো খেলা প্রায় বন্ধ। অনেক রাত পর্যন্ত চাইনিজ চেকার খেলা হতো। বড়মামার এই খেলাটাতে কিরকম নেশা ধরে গেছিল।

একদিন ওখানকার সবথেকে উঁচু পাহাড়টায় যাওয়ার প্ল্যান করলাম। বড়মামা জানালেন ওই পাহাড়ে প্রচুর বড় বড় বুনো মৌমাছির চাক আছে, কাজেই সতর্ক হয়ে যেতে হবে। মৌমাছির ঝাঁক আক্রমণ করলে, মুখটা ঢাকা দিয়ে মুখটাকে বাঁচাতে হবে। সকালবেলা চা, জলখাবার খেয়ে দু’জনে বোমলাই পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বোমলাই ঢিবি পাহাড় হলেও বেশ উঁচু। দু-চারটে মৌমাছিকে ভোঁ ভোঁ শব্দ করে ঘুরপাক খেতেও দেখলাম। কিন্তু কোন মৌচাক নজরে পড়লো না। ফেরার পথে আমি ও মাধব, একে অপরের সিগারেট মুখে ফিল্মী কায়দায় ছবি তুললাম। দু’একদিনের মধ্যে সেইসব ছবি হাতেও পেয়ে গেলাম। মাধবের অসতর্কতায় সেই দু’টো ছবি বড়মামার হাতে চলে গেল। অনেক ছবির মধ্যে থেকে সেই দুটো ছবি বার করে নিতে ভূলে গিয়ে, সব ছবি মাধব বড়মামাকে দেখতে দিল। বড়মামা, মাইমা, মুনা ও বাবুল গোল হয়ে বসে সেই সব ছবি দেখতে শুরু করলো। বিপদ বুঝে আমি মাধবকে ইশারা করলাম, কিন্তু তখন আর ছবিগুলো ফেরৎ নেবার উপায় নেই। বিপদ বুঝে আমি পাশের নিজেদের ঘরে চলে গেলাম। মাধব বোকার মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পরেই বড়মামাকে একটু জোর গলায় ধমকের সুরে কথা বলতে শুনে ঘাবড়ে গেলাম। পরে মাধবের কাছে শুনলাম, ওই ফটোদুটো মুনা ও বাবুলকে দেখতে না দেওয়ায়, তারা দেখতে চাইছিল। তাই বড়মামা তাদের ধমক দিচ্ছিলেন। তিনি কিন্তু আমাদের এ বিষয়ে একটি কথাও বললেন না।

একদিন হরকিষাণ নামে একটা পয়েন্টসম্যান এসে খবর দিল, মার্টিন একটা বাঘ মেরেছে। হরকিষাণ দিনে অনেকবার বড়মামার বাড়িতে আসতো। সে বড়মামর অনেকটা ব্যক্তিগত খানসামা গোছের ছিল। বড়মামা আমাদের বাঘটা দেখতে যেতে বললেন। আমরা হরকিষাণকে বাঘ না বনবিড়াল জিজ্ঞাসা করায়, সে বেশ জোর গলায় জানালো—“না বাবু শের”। বড়মামা জানালেন, পাশ দিয়ে সাতপুরা রেঞ্জ যাওয়ায় বাঘ আসার সম্ভাবনা আছে।

আমরা বাঘ দেখতে যাওয়ার জন্য তৈরি হলাম। বড়মামা বললেন, এখানকার সব লোক তাঁকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। বাঘের চামড়াটা চাইলে হয়, মার্টিন তাঁকে বাঘের চামড়াটা দিয়ে দিতে পারে।

আমরা দু’জনে হরকিষাণের সাথে মার্টিনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মার্টিন একজন খৃষ্টান মেথর। তার নাকি বন্দুক আছে এবং তার বন্দুকের নিশানাও নাকি অব্যর্থ। কয়েক দিন ধরেই এর ছাগল, তার মুরগি খোয়া যাচ্ছিল। আধ খাওয়া ছাগল পড়ে থাকতেও দেখা গেছে। গতকাল রাতে বাঘের ডাকের আওয়াজ শুনে, মার্টিন অন্ধকারে আওয়াজ লক্ষ্য করে আন্দাজে গুলি চালায়। তাতেই বাঘটা মারা গেছে।

শুনে তো আমরা অবাক। এখানে এমন একজন জিম করবেটের ছোট ভাই আছে, ভাবতেই পারছিলাম না। প্রচন্ড অবিশ্বাস নিয়ে মার্টিনের কোয়ার্টার্সের কাছে গিয়ে দেখি বেশ ভিড়। নিশ্চিত হলাম বাঘ না হলেও, কিছু একটা মেরেছে। কিন্তু ততক্ষণে মার্টিনের কোয়ার্টার্সের বাইরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাইরে তখনও অনেক কৌতুহলী লোকের ভিড়। দরজাটার নীচের দিকে চৌকাঠ না থাকায় অনেকটা ফাঁক। প্রায় শুয়ে পড়ে ওই ফাঁক দিয়ে দেখলাম, একটা প্রকান্ড চিতাবাঘ শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে আবার দরজা খুলে দিলে ভিতরে গিয়ে দেখি, বাড়ির দালানে বাঘটা পাশ ফিরে পড়ে আছে। গলার কাছে একটা গুলি লাগার গর্ত, সেখানে কালো হয়ে রক্ত জমে আছে। লেজটা বেশ মোটা। হাত দিয়ে দেখে বোঝা গেল, বড় বড় লোমের জন্য লেজটা অত মোটা মনে হয়। বড় বড় গোল গোল কালো রঙের ছোপগুলো দেখে মনে হচ্ছে, যেন তুলি দিয়ে আঁকা। একটু পরে বাঘটাকে বাইরে নিয়ে আসা হলে, মার্টিন বাঘের গায়ে পা দিয়ে, বন্দুক কাঁধে ছবি তুললো। কিন্তু বড়মামার বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে পুলিশের গাড়ি এসে বাঘ ও মার্টিন, উভয়কেই তুলে নিয়ে গেল।

এরমধ্যে আমার জন্মদিন এল। কথায় কথায় মাধবকে বলেছিলাম, ও বোধহয় মাইমাকে বলেছিল। ওই দিন দেখলাম বড়াখানার ব্যবস্থা হয়েছে, এবং আমাকে একটা বেশ বড় মাছের মুড়ো দেওয়া হয়েছে। মাছের মুড়ো আমি পছন্দও করি না, গুছিয়ে খেতেও পারি না। বিপদ বুঝে অনেক চেষ্টায় মাধবকে মুড়োটা তুলে দিয়ে বিপদমুক্ত হলাম। মাইমা বোধহয় ভাবলেন, আমাকে একা মুড়োটা দেওয়ায় লজ্জা পেয়েছি। ফলে বিপদ আরও বাড়লো। এরপর থেকে বেশ কয়েকবার আমাদের দু’জনকে দু’টো মাছের মুড়ো দেওয়া হলো।

এই জাতীয় বিপদ আমার জীবনে বার বার আসে। আগেও এসেছে, এখনও আসে। আমি কোনকালে ঘড়ি পরি না, মিষ্টি খেতে মোটেই ভালবাসি না, অথচ যত রাজ্যের লোক দেখি সবাইকে ছেড়ে আমার কাছে ক’টা বাজে জানতে চায়, আমাকে আদর করে মিষ্টি খেতে দিয়ে বিব্রত করে। একবার মামার বাড়ি সোদপুরে গেছি, দুপুরে খাবার পাতে দাদুকে একটা মাছের মুড়ো দেওয়ায়, দাদু সেটা আমার পাতে তুলে দেন। আমি বিপদ বুঝে নানা যুক্তি খাড়া করে সেটা পুনরায় দাদুর পাতে ফেরৎ পাঠাতে চেষ্টা করি।

যুক্তিগুলো অবশ্য বেশ হাস্যকর ছিল। যেমন, অল্প বয়সে মাছের মুড়ো খেয়ে কী হবে? মাছের মুড়ো খেলে চোখ ভালো থাকে, সেটা আমার থেকে তাঁর খাওয়া বেশি প্রয়োজন। বুড়ো বয়সে পুষ্টির প্রয়োজন অনেক বেশি, তাই মুড়োটা দাদুরই খাওয়া উচিৎ। কিন্তু বাস্তবে কোন যুক্তিই কাজে না লাগায়, মুড়োটা আমার পাতেই স্থান পায়। বাধ্য হয়ে মুড়োটাকে ছোট ছোট অংশে ভেঙ্গে থালার চারপাশে ফেলে, মুড়োটা খেয়েছি ভান করতে হয়।

যাইহোক, একদিন আমি আর মাধব রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কয়েক কিলোমিটার পথ পার হয়ে এসে, একটা জায়গায় একটা হনুমানকে রেললাইনের ধারে বসে টিক গাছের পাতা খেতে দেখলাম। এই এক অদ্ভুত জীব। এরা টিক পাতা খায়, পেঁপে পাতা খায়, অথচ আতার মতো সুস্বাদু ফল খায় না। এই এলাকায় প্রচুর আতা হয়। এখানকার লোকেদের ধারণা, ফলটার নাম সীতাফল বলে, হনুমান এই ফল খায় না। এখানকার সাধারণ লোকের বুদ্ধিও জীবটার মতোই, এবং সাধারণ লোকের সংখ্যাই বেশি। আমাদের হঠাৎ কী দুর্বুদ্ধি হলো, হনুমানটাকে কে টিপ করে পাথর ছুঁড়ে মারতে পারে, তার প্রতিযোগিতা শুরু করলাম। একটা করে রেললাইনের পাথর ছোঁড়া হচ্ছে, এবং যথারীতি অধিকাংশই লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে। যে দু’-একটা তার গায়ে লাগার মতো সঠিক নিশানায় যাচ্ছে, হনুমানটা তার শরীরটাকে অদ্ভুত ভাবে বাঁকিয়ে, সেগুলো থেকে আত্মরক্ষা করছে। অদ্ভুত ব্যাপার, হনুমানটা কিন্তু ওই জায়গা থেকে এক ইঞ্চিও সরছে না, বা আমাদের আক্রমণ করার চে্ষ্টাও করছে না। হঠাৎ দেখি ছোট ছোট গাছের আড়ালে, প্রচুর হনুমান। আমরা ভয় পেয়ে দ্রুত পা চালালাম। এইভাবে আরও অনেকক্ষণ রেল লাইন ধরে এগিয়ে যাবার পর, আকাশ কালো করে মেঘ জমতে শুরু করলো। একটু পরেই ঠান্ডা বাতাস, বুঝলাম কোথাও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমরা দ্রুত ফেরার পথ ধরলাম। কিন্তু আমরা ততক্ষণে বেশ কয়েক কিলোমিটার পথ পার হয়ে চলে এসেছি। সামান্য পথ ফেরার পরেই, বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হলো, তার সাথে তীব্র হাওয়া। আমরা ওই অবস্থায় লাইন ধরে হেঁটে ফিরছি। বৃষ্টির ফোঁটা চোখে মুখে সুচের ফলার মতো বিঁধছে, কোথাও একটা দাঁড়াবার মতো জায়গা নেই। আরও কিছুটা পথ আসার পর, পিছন থেকে একটা মালগাড়ি আসতে দেখলাম। মালগাড়িটা আমাদের অতিক্রম করে যখন চলে যাচ্ছে, তখন গার্ডের বগিটাতে একজনকে বসে থাকতে দেখে হাত নাড়লাম। উনিই সম্ভবত গার্ড। আমরা কোথায় যাব জিজ্ঞাসা করায়, জানালাম ডোঙ্গরগড় রেলওয়ে স্টেশনে যাব। তিনি গাড়িটা দাঁড় করিয়ে দিয়ে আমাদের তাঁর বগিতে তুলে নিলেন। বাকি পথ আমরা কোথায় থাকি, কী করি, এখানে কার কাছে এসেছি, ইত্যাদি গল্প করতে করতে ডোঙ্গরগড় রেলওয়ে স্টেশনে গাড়ি এলে, গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমাদের নামিয়ে দিলেন। কষ্ট অনেকটা লাঘব হলেও, একবারে ভিজে কাক হয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি ফেরার পথে অবশ্য ভিজে পোষাকেই অন্যান্য দিনের মতো সিঙাড়া আর চা খাওয়া হলো।

সুবীর কুমার রায়

০৫-১২-২০১৮

মধ্যপ্রদেশে কয়েকটা দিন {লেখাটি Beyond weekend beyond boundary, Tour & Tourists, পত্রিকায় প্রকাশিত।}

72258471_1338803766295369_1646103854653112320_n

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায় কথাটা সেই ছেলেবেলা থেকে শুনে ও পড়ে এসেছি। দুনিয়ার এতো প্রাণী ছেড়ে হঠাৎ উলুখাগড়ার ওপরেই বা কোপ কেন পড়ে জানার সুযোগ হয়নি। তবে এই বুড়ো বয়সে এসে নিজেকে উলুখাগড়ার ভুমিকায় দেখে, এতদিনে প্রবাদ বাক্যটার প্রকৃত অর্থ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করলাম। অন্যান্যবারের মতোই আমরা পাঁচজন গত বৎসর, অর্থাৎ ২০১৯ সালের ছাব্বিশে ডিসেম্বর মধ্যপ্রদেশ ঘুরে দেখার জন্য চারমাস আগে প্রয়োজনীয় সমস্ত ট্রেনের টিকিট কেটে ফেললাম। আমার ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধু তরুণের কন্যা সম্পূর্ণার ইঞ্জিনিয়ারিং সেমিস্টার পরীক্ষা তার আগে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। তরুণের পুত্রবধু অনিশা বর্তমানে এদেশের থানেতে কর্মসূত্রে বসবাস করলেও, তার স্বামী কানাডায় বসবাস করে। আগামী এপ্রিলে সে এদেশের পাট চুকিয়ে কানাডায় চলে যাবে। তার ইচ্ছা, বিদেশে ফিরে যাবার আগে আমাদের সাথে একটা জঙ্গল সাফারি করে। ছুটির অভাবে মাত্র চারদিনের জন্য সে মাঝপথে আমাদের সাথে যোগ দিয়ে আবার তার কর্মস্থলে ফিরে যাবে। সেইমতো ট্যুর চার্ট সাজানো হলো, বান্ধবগড়ের জন্য মগলি রিসর্টে তিনটি কটেজ বুক করা হলো। কথামতো জানুয়ারীর ষোল তারিখে আমাদের বাড়ি ফিরে আসার কথা। সব ব্যবস্থা পাকা, এবার শুধু নির্দিষ্ট দিনে হাওড়া থেকে ২২৯১২ নম্বর শিপ্রা এক্সপ্রেসে গিয়ে বসার অপেক্ষা। সম্পূর্ণার দুটো পরীক্ষা হয়েও গেল, এমন সময় নাগরিকত্ব বিল নিয়ে শুরু হলো কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে মতবিরোধ। উত্তাল হয়ে উঠলো এই রাজ্য। সমস্ত পরীক্ষা স্থগিত রেখে ঘোষণা করা হলো জানুয়ারী মাসের সাত তারিখ থেকে স্থগিত পরীক্ষাগুলো নেওয়া শুরু হবে, অর্থাৎ বাড়া ভাতে ছাই। আমরা যাবার পরে শুরু হয়ে ফিরে আসার আগে আপাতস্থগিত পরীক্ষাগুলো শেষ হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে প্রায় আট হাজার টাকা ক্যানসেলেশন চার্জ দিয়ে সমস্ত কনফার্ম রেলওয়ে টিকিটগুলো ক্যানসেল করে, ঘুরতে যাওয়া বাতিল করতে বাধ্য হলাম। বান্ধবগড়ের তিনটি কটেজের জন্য অগ্রিম বাবদ ১৮৭৫ টাকা ও জঙ্গলে ঢোকার পারমিটের জন্য ১৫৫০ টাকাও জলাঞ্জলি দিতে হলো। অনিশাকেও তার যাতায়াতের বিমানের টিকিট অনেক টাকা ক্ষতি করেও ক্যানসেল করতে হলো।

নতুন করে পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করার পর, তড়িঘড়ি করে আবার টিকিট কাটা শুরু হলো। তবে এবারের ট্যুরটা কিছুটা ছোট করতে হলো। অনিশার ছুটির কথা মাথায় রেখে, ও জব্বলপুরে পূর্ণিমা রাতে ভেরা ঘাট থেকে নৌকা বিহারের দিন স্থির করে, কিছুটা অসুবিধাজনক ট্যুর চার্ট তৈরি করতেও বাধ্য হতে হলো। আবার নতুন করে খরচ করে বান্ধবগড় জঙ্গলে প্রবেশের পারমিট করাও সম্পন্ন হলো। মগলি রিসর্ট গতবার বুকিং করার সময়েই পঁচিশ শতাংশ অফেরৎযোগ্য টাকা, অর্থাৎ ১৮৭৫ টাকা পাঠাতে বলেছিল। কোন লাভ হবে না জেনেও, নতুন করে একদিনের জন্য তিনটে কটেজ বুক করার সময় গতবারের অগ্রিম বাবদ দেওয়া ১৮৭৫ টাকার কথা উল্লেখ করা হলে, তারা জানালো, যে ওই টাকাটা এবার অ্যাডজাস্ট্ করে দেওয়া হবে। যাক, অন্তত কাঁধ থেকে ১৮৭৫ টাকা ক্ষতির বোঝা কমলো। যাওয়ার সময় তিনটে বাতানুকূল টু টায়ার, ও দুটো বাতানুকূল থ্রী টায়ারের সাতনার টিকিট পাওয়া গেল। ফেরার সময় বিলাশপুর থেকে পাঁচটা বাতানুকূল থ্রী টায়ারের টিকিট কাটা হলেও তার দুটো বার্থ কনফার্ম ও তিনটে ওয়েটিং লিস্ট হওয়ায়, সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স হিসাবে, তিনটে সাধারণ থ্রী টায়ারের কনফার্ম টিকিট কাটা হলো। অবশ্য কনফার্ম হলেও এই তিনটে বার্থ আবার দুটো ভিন্ন বগিতে অ্যালোটেড হলো। বাকি অন্যান্য জায়গার অবশ্য কনফার্ম টিকিট পাওয়া গেল। যাহোক্, ঘরপোড়া গরুর মতো বাকি দিনগুলো আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখা যাওয়ার আশংকায় কাটিয়ে অবশেষে নির্দিষ্ট দিনে, অর্থাৎ ত্রিশে জানুয়ারী, ২০২০ সালে হাওড়া স্টেশনে বিকাল ৫-৪৫ এর শিপ্রা এক্সপ্রেসে দুটো বগিতে ভাগাভাগি করে সাতনা স্টেশনের উদ্দেশ্যে চেপে বসলাম। ঘড়ি ধরে ট্রেনও ছেড়ে দিল। শুরু হলো এবারের বহু প্রতীক্ষিত মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণ অভিযান। কখনও একই বগিতে বসে, কখনও আলাদা আলাদা দুটোতে সময় কাটিয়ে, রাতের খাবার খেয়ে বিছানা নিলাম।

আজ জানুয়ারী মাসের একত্রিশ তারিখ, ঘুম ভাঙলো বেশ ভোরে। কথামতো আমাদের আজ সকাল এগারোটা কুড়ি মিনিটে সাতনা স্টেশনে নামার কথা। এ সেই সাতনা স্টেশন, যেখানে আজ থেকে দীর্ঘ আটত্রিশ বছর আগে খাজুরাহো দর্শনে এসে নেমেছিলাম। আজ কিন্তু শিপ্রা এক্সপ্রেস ভারতীয় রেলের ঐতিহ্যের তোয়াক্কা না করে প্রায় সঠিক সময় ছুটছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত জাত যাওয়ার ভয়ে, না একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয়ে জানি না, ভারতীয় রেলের আনুগত্য রক্ষার্থে প্রায় এক ঘন্টা বিলম্বে সাতনা স্টশনে এসে হাজির হলো। কোথাও কোন বুকিং না থাকলেও, ট্রেন থেকেই আমাদের পছন্দের ‘হোটেল সূর্য’কে আমাদের পৌঁছনো সংবাদ জানালে, তারা নির্দিষ্ট সময় স্টেশনে গাড়ি পাঠিয়ে দেবার কথা জানিয়ে দিলো।

মালপত্র নিয়ে স্টেশনের বাইরে এসে দেখি আমাদের গাড়ি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ঝাঁচকচকে বড় রূপালি গাড়িটা দেখে আশ্বস্ত হলাম। ড্রাইভারটিও বেশ ভদ্র। আমাদের কাছ থেকে সমস্ত মালপত্র নিয়ে একে একে গাড়ির ছাদে গুছিয়ে রেখে বেঁধে ফেললো। ট্রেনেই জলখাবারের পাট চুকিয়ে ফেলায় অযথা সময় নষ্ট না করে, প্রায় ১১৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য আমরা এগিয়ে চললাম। বেশ সুন্দর রাস্তা ধরে পান্না টাইগার রিজার্ভ ফরেস্টের পাশ দিয়ে আমাদের গাড়ি একসময় নির্দিষ্ট হোটেলের সামনে গিয়ে দাঁড় করালো। ড্রাইভারটি জিজ্ঞাসা করলো, আমরা আজ ঘুরতে যাবো কী না। তাকে পরে জানাবো বলে হোটেলের রিসেপশন কাউন্টারে গিয়ে উপস্থিত হলাম। হোটেলটা বেশ বড়, অনেকগুলো ঘর। আমাদের জন্য নির্দিষ্ট একটি তিনজনের জন্য ও একটি দুজনের জন্য দুটো ঘর দেখেও বেশ পছন্দ হয়ে গেল। ভাড়াও দেখলাম বেশ কম। দুদিনের জন্য মোট ৩৬০০ টাকা চাওয়া হলো। আমরা এখান থেকে পরশুদিন উজ্জয়িণী চলে যাবো, তবে ট্রেন সেই রাত সাড়ে এগারোটায়। রিসেপশন কাউন্টারের অতিশীর্ণ বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি দেখলাম সকল রকম সমাধানের ডালি গুছিয়ে নিয়ে বসে আছেন। আমাদের সমস্যার কথা সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করার আগেই গুগলদাদার মতো সমাধান জানিয়ে দিলেন, “ট্রেনতো আপনাদের রাত সাড়ে এগারোটায়, নতুন কাস্টোমার আসলে কাউন্টারের পাশে মালপত্র রেখে দুপুরে খেয়েদেয়ে ঘুরতে যান, আর না আসলে একটা ঘরে সমস্ত মালপত্র জড়ো করে লক্ করে রেখে, অপর ঘরটা খুলে রেখে দেবেন। সন্ধ্যাবেলা ফিরে এসে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে খেয়েদেয়ে রাত ন’টা নাগাদ খাজুরাহো স্টেশনের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়বেন। সব সমস্যার সমাধান, অতএব মাভৈঃ মাভৈঃ বলে নির্দিষ্ট ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলাম। মহিলাদের তৈরি হয়ে নিতে বলে, আমরা হোটেলটা একবার ঘুরে দেখলাম। হোটেলটা যতটা বড় মনে হয়েছিল, বাস্তবে দেখলাম তার থেকে অনেকটাই বড়। পিছনে ফুলগাছ দিয়ে সজানো বিশাল বাগান, ও তার দুপাশে অনেকগুলো ঘর। বহু মানুষের ভিড়, একবারে শেষে একটা বিরাট ঘরে রান্নার আয়োজন চলছে। জানা গেল কুণ্ডু স্পেশাল তাদের যাত্রী নিয়ে এসেছে। আমরা কাউন্টারে গিয়ে ওই ড্রাইভারটির সাথে ফোনে যোগাযোগ করে ডেকে পাঠালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে এসে উপস্থিত হলো। আজ কিছু দ্রষ্টব্যস্থান ঘুরে দেখার ব্যাপারে কথাবার্তা পাকা করে, আমরা ঘরে ফিরে গেলাম। মহিলারা স্নান সেরে তৈরি হয়ে গেছে, আমরা দুজনেও স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিলাম।

আজ হাতে বিশেষ সময় নেই, তাই আর এক প্রস্থ টিফিন করে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। অল্প সময়ের মধ্যে খাজুরাহোর পূর্বাঞ্চলীয় বামন মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হলাম। আটত্রিশ বছর আগে দেখা খাজুরাহোর রাস্তাঘাট, হোটেলের মতো মন্দিরটিও, একেবারে অচেনা মনে হলো। আগেরবারের মতো এবারেও মনে হলো খাজুরাহো মন্দিরের মূর্তির বিবরণ দেওয়া অসম্ভব, এ শুধু প্রাণভরে দুচোখ দিয়ে দেখতে হয়, ছবি তুলে সেই সৌন্দর্য করায়ত্ত করা নিতান্তই অসম্ভব। ঘুরে ঘুরে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে দেখে আমরা জাভারী মন্দিরে গেলাম। এখানেও বেশ কিছুটা সময় ধরে ঘুরেফিরে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে দেখে, আমরা কিছুটা দূরের পার্শ্বনাথ জৈন মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হলাম। বেশ লাগলো মন্দিরটি, তবে পার্শবর্তী আদিনাথ মন্দিরটি ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। মন্দিরটির অবস্থান এমন, যে বাইরে থেকে তার কিছুই দেখা সম্ভব নয়। এবার আমরা সাউন্ড অ্যান্ড লাইট দেখার জন্য পশ্চিমাঞ্চলের নির্দিষ্ট জায়গায় এসে উপস্থিত হলাম। সাড়ে ছ’টা থেকে ইংরেজিতে প্রথম শো শুরু হয়ে গেছে, শেষ হবে রাত সাতটা পঁচিশে। আমাদের শো হিন্দীতে, এবং শুরু হবে রাত সাতটা চল্লিশে। হাতে অনেকটা সময়, বাইরে ঠান্ডার প্রকোপও যথেষ্ট। গাড়ির ড্রাইভার জানালো, আমাদের শো শেষ হলে এখানেই দাঁড়াতে, সে ঠিক সময় চলে আসবে। ঠিক পাশেই একটা বিরাট লেক। লেকের পাশে ঘেরা জায়গায় একটা চা জলখাবারর দোকান, বিশাল লেকের অপর পাড়ে আলো দিয়ে সাজানো ততোধিক বিশাল ‘খাজুরাহো টেম্পল ভিউ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ অবস্থিত। আমরা চা ও কেক খেয়ে চায়ের দোকানের চেয়ারে বসে হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় দ্বিতীয় শোয়ের অপেক্ষায়। আগের শো শেষ হওয়ার আগে কাউন্টারের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। যদি টিকিট না পাওয়া যায়? অন্তত এতদিন যেখানে যত লাইট অ্যান্ড সাউন্ড দেখার সুযোগ হয়েছে, অতীত অভিজ্ঞতা সেই কথাই বলে। আড়াইশ’ টাকা করে টিকিট, সামান্য কয়েকজন টিকিটের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। টিকিট কাটার কিছুক্ষণ পর আগের শো শেষ হলো। হাতে গোনা কিছু দর্শক বেড়িয়ে আসার পর আমাদের ব্যাগ ও দেহ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে ভিতরে যাবার অনুমতি দেওয়া হলো। খোলা আকাশের নীচে শিশির ভেজা ফাঁকা মাঠে সামান্য কয়েকটা চেয়ার পাতা। পাশে আরও কিছু চেয়ার একটার ওপর একটা করে সাজিয়ে রাখা আছে। প্রয়োজনে পেতে দেওয়া হবে। আমাদের পাঁচজনকে নিয়ে জনা পনেরো দর্শক আসন গ্রহণ করলো। আমাদের পিছনে আরও চার পাঁচজন এসে বসলো। অনুষ্ঠান শুরু হলো। অমিতাভ বচ্চনের গলায় হিন্দীতে অতীত ইতিহাসের সাথে খানপাঁচেক মন্দিরে রঙিন আলো। পঞ্চান্ন মিনিটের অনুষ্ঠান, মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমাদের পিছনের দর্শকরা মাঠ ছেড়ে চলে গেল। বাকি সকলকেই দেখে মনে হলো, অতগুলো টাকার মায়ায় বাধ্য হয়ে ঠান্ডা সহ্য করে বসে আছে। একসময় অনুষ্ঠান শেষও হলো। দর্শকরা চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াবার সাথে সাথেই একজন চেয়ারগুলো ভাঁজ করে সাজিয়ে রেখে দিলো। একেই বোধহয় শতরঞ্চির জন্য অপেক্ষা করা বলে। টিকিটের মূল্য কিছু কম হলে, আদপে কর্তৃপক্ষের কিছু বেশি অর্থের সমাগম হতো বলে মনে হয়। যাইহোক বাইরে এসে গাড়িতে চেপে বসলাম। হোটেলের কাছে ফিরে গাড়ি চলে গেল। ও আগামীকাল সকালে আবার আসবে। সকলেই বেশ ক্লান্ত, তাই রাতের খাবার খেয়ে বিশ্রামের আশায় নিজ নিজ ঘরে ফিরে এলাম।

আজ পয়লা ফেব্রুয়ারী। তরুণের ডাকে ঘুম ভাঙলো বেশ সকালে, সীমার তৈরি চা নিয়ে সে দরজায় দাঁড়িয়ে। গাড়ি এসে গেছে। তৈরি হয়ে নিয়ে দুইশয্যা বিশিষ্ট ঘরটায় সমস্ত মালপত্র জড়ো করে রেখে তালা দিয়ে, বড় ঘরটা খুলে রেখে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। প্রথমেই একটা দোকানে গিয়ে আলুর পরোটা, জিলিপি, আর চা খেয়ে আবার আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। এই সুদূর খাজুরাহোতেও দেখলাম বাংলায় লেখা ‘দাদা বৌদির হোটেল’।

আজ যাবো পশ্চিমাঞ্চলের মন্দিরগুলো দেখতে। যদিও এই পশ্চিমাঞ্চলেই অধিকাংশ মন্দিরগুলি অবস্থিত, তবে  এই মন্দিরগুলি দেখার জন্য মাথাপিছু চল্লিশ টাকা করে টিকিট কাটতে হয়। বিদেশিদের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ অনেকটাই বেশি। তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, যে এরা এই পয়সা হজম করে না দিয়ে মন্দিরগুলির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যয় করে, যেটা অনেক প্রাচীন স্থাপত্যের ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায় না। টিকিট কাটার সময়েই বুঝে গেলাম, যে গাইডহীন এইসব মন্দির দেখার চেষ্টা করা মূল্যহীন, এলোপাথাড়ি এদিক ওদিক বোকার মতো ঘুরে বেড়ানো আর কিছু ছবি তোলা ছাড়া কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই আটশ’ টাকা খরচ করে একজন গাইডকে সঙ্গে নিয়ে নিলাম। একে একে আমরা লক্ষ্মণ মন্দির, কান্ডারিয়া মহাদেব মন্দির, জগদম্বী বা জগদম্বা মন্দির, বরাহ মন্দির, ও বিশ্বনাথ মন্দির ঘুরে ঘুরে খুঁটিয়ে দেখলাম। না, বোধহয় ভুল বললাম, ঠিকমতো খুঁটিয়ে দেখতে গেলে তিনদিনের কম সময়ে কিছুতেই সম্ভব নয়। গাইড বিশেষ বিশেষ কিছু মূর্তির বৈশিষ্ট উল্লেখ করে দিচ্ছিলেন, যেমন একটি নারীমূর্তির কথা বলি, পাশ থেকে দেখলে মুখে চোখে খুশির ভাব স্পষ্ট, অথচ সোজাসুজি দেখলে তার মুখে চোখে বিরক্তি ও ক্রোধের ভাব বুঝবার জন্য কারও সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। লক্ষ্মণ মন্দিরটি দেখতে গেলে অনেকটা ওপরে উঠতে হয়, তবে এই মন্দিরের ব্রহ্মা, বিষ্ণু, বা লক্ষ্মী মূর্তিগুলি বিষ্মিত করে। সম্ভবত এই মন্দিরটিই সবথেকে সুরক্ষিত বলে মনে হলো। এখানে দেবদেবী ও নরনারীর দৈনন্দিন কার্জকলাপের মূর্তির মাঝে, প্রচুর প্রেম ও শারীরিক মিলনের মূর্তি দেখা যায়, তবে সাধারণ মানুষের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার ধৈর্যের বড় অভাব বেশ চোখে পড়র মতো। তাদের আগ্রহ বিশেষ করে শারীরিক মিলন সংক্রান্ত মূর্তি ও সেলফি তোলার প্রতি। প্রতিটা মন্দিরকে নিয়ে আলাদা করে বলতে গেলে সে এক মহাভারত হয়ে যাবে, তবে গোটা অঞ্চলে সবচেয়ে উঁচু মন্দির কিন্তু কাণ্ডারিয়া মহাদেব মন্দিরটি। এই মন্দিরটির বেশ কিছু মূল্যবান মূর্তি নষ্ট হয়ে গেলেও, মূর্তি সংখ্যা প্রচুর ও বিষ্মিত করার মতো। জগদম্বা মন্দির, বরাহ মন্দির, চিত্রগুপ্ত মন্দির, ও বিশ্বনাথ মন্দিরটিও খুবই সুন্দর। সকাল থেকে অনেকটা সময় এই পশ্চিমাঞ্চলের মন্দিরগুলোয় কেটে গেল। আরও কিছু সময় থাকার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আমাদের হাতে সময় বড় কম, এখনও অনেকগুলো জায়গা দেখার বাকি। ড্রাইভারও বারবার সময় সংক্ষেপ করার কথা বলে ফোন করছে, তা নাহলে বাকি সমস্ত স্পট্ ঘুরে দেখার সময়ের অভাব হবে। আজ রাতেই আমাদের খাজুরাহো ছেড়ে উজ্জয়িণীর পথে পাড়ি জমাতে হবে।

বাইরে এসে গাড়িতে গিয়ে বসলাম, এবার আমাদের নিশানা পান্না জাতীয় উদ্যানের উত্তরে কেন ও খুদার নদীর সংযোগস্থল, রেনে জলপ্রপাত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর প্রায় কুড়ি কিলোমিটার সুন্দর দীর্ঘ পথ পার হয়ে আমরা এসে পৌঁছলাম রেনে জলপ্রপাতের প্রবেশ পথে। পথে ড্রাইভারের কথায় জানতে পারলাম, যে অনেকটা পথই নাকি পান্না জাতীয় উদ্যানের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। সেই অপরাধে কিনা বলতে পারবো না, প্রবেশ পথের বাইরে টিকিট কাউন্টার থেকে সাতশ’ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হলো। তবে সান্ত্বনা একটাই, নাকের বদলে নরুন হিসাবে একজন গাইডকে সঙ্গে সেঁটে দেওয়া হলো। জঙ্গুলে পথ ধরে অনেকটা যাওয়ার পরে আমরা সেই জলধারার সামনে এসে উপস্থিত হলাম। রঙিন পাথরের দেওয়ালের ওপর থেকে নেমে এসেছে এই সুন্দরী জলপ্রপাত। বহু নীচে পাথরের গভীর গিরিখাত, কোথাও আকাশের মতো নীল, কোথাও পান্না সবুজ জলধারা রঙিন পাথুরে পথে নদীর আকারে বয়ে যাচ্ছে। বর্ষায় এর জলোচ্ছ্বাস নাকি দেখার মতো, তবে এখন শীতের সময়, তাই জলোচ্ছ্বাস অনেকটাই কম। তবে শীতে একটা অতিরিক্ত পাওয়া আছে, বিভিন্ন রঙের পাথরের তৈরি ভরতের মিনি গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন গিরখাত দর্শন, বর্ষায় যাকে এই রূপে দেখা যায় না। গাইড জানালেন, লক্ষ লক্ষ বছর আগে এখানেই নাকি আগ্নেয়গিরি ছিল। গাইড এও জানালেন, যে তাঁদের নাকি কোন মাসিক মাইনে নেই। টিকিটের ওপর একটা সামান্য কমিশন ও ট্যুরিস্টদের সাহায্যের ওপর তাঁদের সংসার চলে। সত্যি কী না জানি না, তবে এই কারণেই বোধহয় তাঁর ঘুরিয়ে দেখানোর থেকে ট্যুরিস্টদের ছবি তুলে দিয়ে তাদের মন জয় করার আগ্রহ অনেক বেশি। যাইহোক এখানেও বেশ কিছুটা সময় ব্যয় করে পাশেই একটা চায়ের দোকানে কফি খেয়ে, গাড়ির কাছে ফিরে আসলাম। গাইডকে কিছু টাকা টিপস্ দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। এবার আমাদের গন্তব্য স্থল, খাজুরাহোর তৃতীয় ও শেষ অর্থাৎ সাউদার্ন গ্রূপের মন্দিরগুলি। এটা শহর থেকে অনেকটাই দূরে অবস্থিত। একসময় আমরা চতুর্ভূজ মন্দিরের সামনে এসে হাজির হলাম। মন্দিরটি ছোট হলেও বেশ সুন্দর, মূর্তিগুলোও সুন্দর, তবে পূর্ব বা পশ্চিম গ্রুপের মতো এখানে শারীরিক মিলনের মূর্তি চোখে পড়লো না। তার বদলে এখানে যেটা চোখের আরাম দিলো, সেটা সবুজ চাষের জমি। হাতে সময় কম, তাই আমরা দুলাদেও মন্দিরে এসে উপস্থিত হলাম। এই মন্দিরটি সংলগ্ন মাঠ বেশ সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। মূর্তিগুলোও বেশ সুন্দর ও উজ্জ্বল। এখানে একটা বেশ বড় শিবলিঙ্গও আছে। এবার ফেরার পথ ধরতে হবে, তবে যাওয়ার পথে একবার আদিনাথ মন্দিরটা ঘুরে দেখে যেতে হবে। গতকাল সন্ধ্যায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেখার সুযোগ হয়নি। একসময় গতকালের অদেখা সেই আদিনাথ মন্দিরের সামনে এসে উপস্থিত হলাম। মন্দিরটি ও মূর্তিগুলি খুব সুন্দর। অনেক সময় নিয়ে ঘুরেফিরে আদিনাথ ও পার্শ্বনাথ, পাশাপাশি দুটো মন্দিরই দেখলাম, ছবি তুললাম, এবার হোটেলে ফেরার পালা। অবশেষে একসময় আমরা হোটেলে ফিরে এলাম।

আমাদের খুলে রেখে যাওয়া ঘরটা খোলাই আছে দেখলাম। লক্ করে যাওয়া ঘরটা খুলে, দুই ঘরে ঢুকে একে একে সকলে তৈরি হয়ে নীচে নেমে আসলাম। রিসেপশন কাউন্টারের সামনে চেয়ার ও সোফাগুলোয় দেখলাম বেশকিছু ট্যুরিস্ট্ বসে আছেন। পাশে তাদের মালপত্র জড়ো করে রাখা আছে। এরা সম্ভবত ওই স্পেশালের লোক, আজ আমাদের মতোই অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। কাউন্টারের ভদ্রলোকটিকে খাজুরাহো রেলওয়ে স্টেশনে যাবার জন্য একটা গাড়ির কথা বললে তিনি শুধু বললেন, রাতে স্টেশনে যাবার জন্য গাড়িভাড়া একটু বেশিই চাইবে। যাইহোক উনি দুজায়গায় ফোন করে জানালেন, ছয়শত টাকার কমে কেউ রাজি হচ্ছে না। আমরা রাজি না হয়ে দুটো অটোর খোঁজে গেলাম। দুটো অটোর কাছে ভাড়া জেনে এসে মালপত্র নীচে নামিয়ে আনার জন্য আবার হোটেলে ফিরে এলে কাউন্টারের ভদ্রলোকটি অটোর ভাড়া জেনে বললেন, “রাত সাড়ে এগারোটায় আপনাদের ট্রেন, রাত দশটা নাগাদ আপনারা এখান থেকে রওনা হলেই হবে। তবে অত রাতে অটোয় না যাওয়াই ভালো, ঠান্ডা লেগে যাবার ভয় আছে”। আমরা গাড়িতে যাওয়া পাকা করে রাতের খাবার খেতে গেলাম। ফিরে এসে দেখি কাউন্টারের কাছে বসে থাকা সকল যাত্রী চলে গেছে। রাত ন’টা নাগাদ গাড়ি এসে হাজির হলে আমরা মালপত্র নিয়ে খাজুরাহো স্টেশনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। দূরত্ব খুব বেশি না হলেও এই রাস্তাটা খুব একটা প্রসস্থ নয়, ভালোও নয়। যাইহোক অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেশনে এসে পৌঁছানো গেলেও গাড়ি পার্কিং করার জায়গাটা স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা দূরে। অত মালপত্র নিয়ে আমাদের স্টেশন পর্যন্ত যাওয়া অসুবিধাজনক বুঝে, ড্রাইভার নিজে কিছু মালপত্র স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেল। মালপত্র নিয়ে ওভারব্রিজ ভেঙে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখি আমাদের বগি অনেকটা দূরে পড়বে। প্ল্যাটফর্মটাও ভাঙাচোরা, তবে মেরামতির কাজ চলছে। ১৯৬৬৪ নাম্বার ইন্দোর এক্সপ্রেসের নির্দিষ্ট বাতানুকূল বগিতে উঠে মনে হলো, অল্প কয়েকজন লোক ছাড়া আমরাই বোধহয় একমাত্র যাত্রী। লোয়ার বার্থগুলোয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে সাদা চাদরে মোড়া মৃতদেহের মতো কিছু ঘুমন্ত যাত্রী ছাড়া, গোটা বগি ফাঁকা। অহেতুক বিলম্ব না করে বিছানা পেতে শুয়ে পড়লাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের দুই তারিখ। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। ট্রেন উজ্জয়িনী স্টেশনে দশটা নাগাদ পৌঁছানোর কথা, তবে ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগে ছুটছে। প্রায় ঘন্টাখানেক আগে আমাদের ট্রেন এসে উজ্জয়িনী হাজির হলো। অনেকগুলো হোটেলের নাম ও ফোন নাম্বার লিখে এনেছিলাম, ট্রেনে বসেই কথা বলে তাদের মধ্যে ‘মানসরোবর গেস্ট হাউস’ নামে একটা হোটেলের সাথে পাকা কথা বলে নিলাম। স্টেশন থেকে দুটো অটোয় একশ’ চল্লিশ টাকা ভাড়া দিয়ে হোটেলে এসে পৌঁছলাম। স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা দূরে হলেও হোটেলটা বেশ ভালো ও নিরিবিলি। আমরা দলে পাঁচজন, আর ঠিক পাঁচজনের জন্যই একটা অ্যাটাচড বাথ ডরমিটরি এগারোশ’ পঞ্চাশ টাকায় নিয়ে নিলাম। হোটেলটায় অন্য কোন বোর্ডার নেই, মালিক জানালেন, ঠিক ওপরের তলাতে পরপর দুটো পায়খানা বাথরূম আছে, ওগুলোও আপনারা ব্যবহার করতে পারেন। মালিক পরিবার নিয়ে ওপরেই থাকেন। একটা দিন মাত্র থাকবো, আমাদের দুটো পরিবারে মধ্যে আজ পর্যন্ত ঘর বাছাবাছি, বা ওই জাতীয় কোন সমস্যা দেখা দেয়নি। কাজেই ডরমিটরি আমাদের কাছে কোন সমস্যা হতে পারে না। আসবার সময় অটো দুটোর সাথে সাতশ’ টাকা ভাড়ায় উজ্জয়িনী শহরের দ্রষ্টব্য স্থলগুলো ঘুরতে যাওয়ার কথা পাকা করে নেওয়া হয়েছে। জলখাবারের জন্য আলুর পরোটা অর্ডার করে একে একে স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিতে শুরু করলাম। আমরা দুজন ঘরের বাইরে সোফায় বসে গরম গরম আলুর পরোটা ভক্ষণে মননিবেশ করলাম। মহিলারা একে একে তৈরি হয়ে এসে আমাদের সাথে যোগ দিলো। এখানে জলের কোন অভাব নেই, ছাদের ওপরে হোটেল মালিক তাঁর নিজের না আমাদের, কার সুবিধার্থে জানি না, প্রচুর দড়ি টাঙিয়ে রেখেছেন। ফলে মহিলারা মনের সুখে, প্রাণ ভরে, কাচাকাচি করে ছাদের দড়িতে রোদে মেলে দিয়ে আসলেন।

অটো দুটো এসে গেছে। আমরা ঘর লক্ করে নীচে নেমে এসে অটোয় চেপে বসলাম। যাওয়ার পথে নর্মদার পরিস্কার নীল জল দেখে মনটা বেশ ভালো হয়ে গেল। মনে হয় আমাদের মতো গঙ্গাকে শুধু মা বলে দায়িত্ব শেষ না করে, নর্মদাকে ওরা সত্যিই মা হিসাবে শ্রদ্ধা ও যত্ন করে। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে আমরা শিপ্রার তীরে ভার্থারি গুহার সামনে এসে পৌঁছলাম। বিখ্যাত সংস্কৃত কবি ভার্থারি, যিনি বিক্রমাদিত্যের সৎ ভাই ছিলেন, এখানে নাকি দীর্ঘ বারো বৎসর তপস্যা করেছিলেন। গুহার অনেকটা অংশই মাথা নীচু করে বেশ কসরত করে প্রবেশ করতে হয়। গুহার ভিতরে কিছু মূর্তি ও ছবি আছে, তবে মূর্তির থেকে পাশাপাশি গুহাদুটির আকর্ষণ অনেক বেশি বলে মনে হলো। আর আছে গুহার ঠিক পাশে একটি বড় গোশালা। এখান থেকে আমরা গড়কালিকা মন্দির দেখতে গেলাম। জানা গেল মন্দিরটি সপ্তম শতাব্দীতে সংস্কার করা হয়, তবে মন্দির ও মূর্তি দেখে এর সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ থেকেই যায়।  যাইহোক, শুনলাম সম্রাট বিক্রমাদিত্য ও মহাকবি কলিদাস দ্বারা নাকি এই দেবী পূজিত হয়েছিলেন।

আমাদের অটোযুগল এবার আমাদের নিয়ে কাল ভৈরব মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হলো। এই কাল ভৈরব নাকি উজ্জয়িনী শহরের পাহারাদার। রাজা ভদ্র সেন এই মন্দিরটি নির্মান করেন। পূজা দেওয়ার জন্য বেশ বড় লাইন। মন্দিরের অপরদিকে পূজার সামগ্রী বিক্রয়ের দোকান। সব জায়গায় দেখেছি ডালায় করে ফুল মিষ্টি বা যে দেবতা যা খেতে ভালবাসে, সাজিয়ে দেওয়া হয়। এখানে দেখলাম ফুল, ‘কাল ভৈরব মহাপ্রসাদ’ লেখা  বাক্সে কিছু লাড্ডু, ইত্যাদি দিয়ে রেডি করা আছে। এইপর্যন্ত ঠিকই আছে, কিন্তু কাল ভৈরব মহাদেব সিদ্ধি বা গঞ্জিকা খান কী না জানি না, তবে এনার আবার কারণ সুধার ওপর বেশি আসক্তি, হয়তো গিন্নীর কাছ থেকে নেশাটার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করেছেন। প্রসাদে মদের বোতল দিতেই হবে। সঙ্গের মহিলারা এত খরচা করে এত কষ্ট করে মহাদেবের রেঞ্জের মধ্যে প্রবেশ করেও, শুধুমাত্র একটা মদের বোতলের জন্য তাঁকে ঘাঁটানো সমীচীন মনে না করায়, দুটো পূজোর ডালার জন্য দুটো বোতলও কিনতে হলো। নিজের একালটা তো ঝরঝরে হয়েই গেছে, একটা বোতলের কার্পণ্যে পরকালটা আর বিপদগ্রস্ত করতে সাহসে কুলালো না। লজ্জার কিছু নেই, প্রসাদের দোকানে প্রকাশ্যে তিন চার রকম দেশি বিদেশি বোতল বিক্রি হচ্ছে, যে যার নিজের বা মহাদেবের ইচ্ছামতো বোতলও প্রসাদের সাথে কিনে নিচ্ছে। দাম অবশ্য এখন দিতে হলো না, পূজা দিয়ে ফেরার পথে ডালা ফেরৎ দেবার সময় দিতে হবে। ডালা কেনার সাথে সাথে দুই অটো ড্রাইভার আবদার করে অনুরোধ করলো, নিজেরা না খেলে যেন বোতলদুটো তাদের দিয়ে দেওয়া হয়। নানা প্রকার বোতলের ককটেলে পরমারাধ্য মহাদেবের শরীর খারাপ না হয়, এই প্রার্থনা করতে করতে মহিলাদের সাথে লাইনে গিয়ে দাঁড়াতেই হলো। পূজা দেওয়ার সময় দেখা গেল বোতলের ঢাকনায় একটা ফুটো করে প্রসাদে একটু ঢেলে দিয়ে বোতল ও প্রসাদ ফেরৎ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেকে আবার দেখলাম একসাথে রথ দেখা কলা বেচার বাসনায় নিজেদের পছন্দের বড় বড় মূল্যবান বোতল নিয়ে পূজা দিতে এসেছেন। জয় পাতাল ভৈরবের জয়। পূজা দিয়ে ভিড় ঠেলে রাস্তায় এসে দেখা গেল লাড্ডু আর হুয়িস্কি মাখামাখি। ড্রাইভাররা বোতল পেয়ে খুব খুশি। নতুন উদ্দমে তারা আমাদের সন্দীপনি আশ্রমে নিয়ে চললো।

সন্দীপনি আশ্রমটি শিপ্রা নদীর তীরে মঙ্গলনাথ মন্দিরের কাছে অবস্থিত। আশ্রমের ভিতর গোমতি কুণ্ড নামে একটি কুণ্ড আছে। ভগবান কৃষ্ণ, বলরাম, ও সুদামাকে সন্দীপনি গুরুর কাছে অধ্যায়ন করার জন্য ছোটবেলায় এখানে পাঠানো হয়েছিল বলে কথিত। অনেকটা এলাকা নিয়ে এই আশ্রম। অনেক রঙিন ছবি দিয়ে সাজানো। দর্শন শেষে আমরা গেলাম মঙ্গলনাথ মন্দিরে। শিপ্রা নদীর ধারে অবস্থিত এই নবগ্রহ মঙ্গলনাথ মন্দিরেও শিব আরাধ্য দেবতা। এই মন্দিরের মাহাত্ম্যে সমস্ত অমঙ্গল দূর হয়ে ভক্তের মঙ্গল হয়। বাইরে পূজা দেওয়ার জন্য ফুলের দোকানগুলি দেখার মতো, তবে ডালা নেবার সময় মঙ্গলনাথের মাহাত্ম্য নিয়ে বিনাপয়সায় গল্প শোনাটা মনে হলো বাধ্যতামূলক। এই মন্দিরের বিশাল চত্বরে দেখলাম বহু ভক্তকে বসিয়ে অমঙ্গল দূর করে মঙ্গলের আগমনের জন্য পূজা করানো হচ্ছে। এখান থেকে হোটেলে ফেরার পথে একটা বেশ বড় কাপড়ের দোকানে মুরগি হয়ে আমাদের অটো পরিক্রমা এবারের মতো শেষ করে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। একটু দূরেই একটা দোকানে খাবার খেয়ে মহিলারা ঘরে চলে গেল, আমরা দুজন হোটেল মালিকের সাথে সন্ধ্যার পোগ্রাম নিয়ে ও আগামীকাল এখান থেকে একটা গাড়ি নিয়ে বাঘ গুহা যাওয়ার ব্যাপারে কথা বলতে বসলাম। আমাদের পরিকল্পনা মতো আগামীকাল সকালে একটা বড় গাড়ি নিয়ে আমরা ধার হয়ে বাঘ গুহা যাবো। সেখান থেকে সোজা মাণ্ডু গিয়ে রাত্রিবাস। পরেরদিন মাণ্ডু ঘুরে ওমকারেশ্বরে গিয়ে রাত্রিবাস। তার পরেরদিন ওমকারেশ্বর ঘুরে ইন্দোর যাওয়ার পথে দ্রষ্টব্য স্থলগুলো ঘুরে দেখে ইন্দোর পৌঁছে গাড়ি ছেড়ে দেবো। সেইমতো একটা বড় গাড়ির ব্যবস্থাও করা হলো।

জানা গেল সন্ধ্যায় নর্মদা নদীতে আরতি হয়, আরও একটা আরতি হয় হরসিদ্ধি মন্দিরে। হোটেল মালিক জানালেন, যে দুটো আরতিই সুন্দর ও দেখার মতো। দুটো আরতি যেহেতু সামান্য সময় আগে পরে অনুষ্ঠিত হয়, তাই হাঁটুর সমস্যা নিয়ে মহিলাদের পক্ষে দুটো আরতি দেখতে গেলে অসুবিধায় পড়তে হতে পারে। তিনি আমাদের হরসিদ্ধি মন্দিরের আরতি দেখার পরামর্শ দিলেন। ওটা নাকি অনেক বেশি সুন্দর। আরতি দেখে বড়া গণপতি মন্দির ঘুরে মহাকালেশ্বর শিব মন্দির দেখে, হোটেলে ফিরে আসতে বললেন। সেইমতো আমরা হরসিদ্ধি মন্দিরে গিয়ে আরতি দেখার জন্য আসন গ্রহণ করলাম। এখনও অন্ধকার না হওয়ায় অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। বিয়ে বা অন্যান্য শুভ কাজের সময় মহিলারা যেমন শ্রী তৈরি করেন, মন্দিরের ঠিক সামনের চত্বরে পাশাপাশি অনেকটা সেই আকৃতির বেশ বড় ও উঁচু দুটো তৈলাক্ত কালো স্তম্ভ। প্রতিদিন আরতির সময় তেল বা ঘিয়ের ধকল সহ্য করে করে সম্ভবত স্তম্ভদুটির ওই গাত্রবর্ণ। স্তম্ভদুটির ওপর থেকে একবারে নীচ পর্যন্ত একই উপাদানের পাকাপাকি ভাবে তৈরি অসংখ্য প্রদীপ। গেরুয়া পোশাক পরা মন্দিরের কয়েকজন যুবক, প্রদীপগুলোর ওপর পা দিয়ে দিয়ে স্তম্ভদুটির ওপর উঠে প্রদীপগুলোয় শুকনো তুলোর সলতে লাগিয়ে দিতে দিতে নীচে নেমে আসলো। বৈদ্যুতিক নয়, তেল সলতের প্রদীপ, তাই কিভাবে ওগুলো জ্বালানো হবে ভাবতে বসলাম। নির্দিষ্ট সময় প্রদীপ জ্বালাবার জন্য দুটো স্তম্ভের উপর ওই যুবকরা একই প্রক্রিয়ায় উঠে প্রদীপগুলো দ্রুত জ্বালতে জ্বালতে নীচে নেমে এলো। আগুন ছোঁয়াবার সাথে সাথে এত দ্রুত প্রদীপগুলোয় আগুন ধরে যাচ্ছে, যে দেখে মনে হবে প্রদীগুলোয় পেট্রল দেওয়া আছে, অবশ্য নীচের দিকের প্রদীপগুলোয় দেখলাম অনেক পূণ্যার্থী নিজেদের সঙ্গে বোতলে করে নিয়ে আসা তেল ঢেলে পূণ্যার্জন করছেন। আজ এক অসাধারণ মূহুর্তের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ হলো। বেশ কিছুক্ষণ এই দৃশ্য উপভোগ করে মন্দিরের আরাধ্য দেবতার সন্দর্শনে এগলাম।

বড়া গণপতি মন্দিরটিও খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর। মূর্তিগুলোও সুন্দর। এখানে সম্ভবত খুব অল্প টাকার বিনিময়ে ভালো ভোগ খাওয়া যায়। সেই একঘেয়ে আলুর পরোটা, আলু জিরা, আর পনির খেয়ে খেয়ে হাঁপিয়ে উঠে বন্ধুটির বোধহয় খুব ইচ্ছা ছিল একবার বড়া গণপতির ভোগ খেয়ে জীবন ধন্য করে। কিন্তু এখনও আমাদের উজ্জয়িনীর বিখ্যাত মহাকালেশ্বর মন্দির দেখা বাকি, তাই ভোগের লোভ পরিত্যাগ করে একটা ভ্যান রিক্সা থেকে তাগড়াই তাগড়াই ভুট্টা কিনে বড় রাস্তা দিয়ে খেতে খেতে, মহাকালেশ্বরের সাথে দেখা করতে চললাম। এখানে প্রবেশ করতে গেলে মাথাপিছু আড়াইশ’ টাকার টিকিট কাটতে হবে। গেটের কাছে একজন দয়ালু ভদ্রলোক জানালেন, যে অপর একটা গেট দিয়ে প্রবেশ করলে বরিষ্ঠ ব্যক্তিদের জন্য কোন টাকা লাগে না। মহাকালেশ্বরের অশেষ কৃপা, আমাদের পাঁচজনের দলের চারজনই বুড়ো বুড়ি। জয় মহাকালেশ্বরের জয়। কিন্তু দেখা করবো বললেই তো আর দেখা করা যায় না। এই মন্দিরের আরাধ্য দেবতাটি আবার আবার জেড প্লাস নিরাপত্তায় বসবাস করেন। স্বাভাবিক, একে মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির এবং বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে এটি নাকি অন্যতম ও দক্ষিণমুখী। শুধুমাত্র চটিজুতা নয়, ক্যামেরা মোবাইল ব্যগ সবকিছু বাইরে রেখে দেখা করতে যেতে হবে। শেষে নীলকন্ঠের মতো সবার সবকিছু বহ্য দ্রব্য নিজের কাঁধে নিয়ে পাশের দোকানদারদের শত আপত্তি সত্ত্বেও আমি বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাকি চারজন সাক্ষাত করে দীর্ঘক্ষণ পরে ফিরে এলে আমি ভারমুক্ত হলাম। রাস্তার পাশে একটা বিশাল স্ক্রিনে অবশ্য বিগ্রহের ছবি দেখানোর ব্যবস্থা করা আছে। এবারের মতো উজ্জয়িনী দর্শন শেষ। একটা দোকানে বসে পরম তৃপ্তিতে আলুর পরোটা, ধোসা, বড়া, দই ফুচকা, জিলিপি ও কফি খেয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের তিন তারিখ। ভোরবেলা সীমার তৈরি চা খেয়ে তৈরি হয়ে নীচের রিসেপশন কাউন্টারে গিয়ে বিল মিটিয়ে দিলাম। হোটেল মালিকই আমাদের গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আজ সকালে একটা বড় গাড়ি রওনা হয়ে বাঘ গুহা দেখিয়ে মান্ডু, মহেশ্বর, ওমকারেশ্বর, ও ইন্দোর ঘুরিয়ে পরশু সন্ধ্যার সময় আমাদের ইন্দোরের হোটেলে ছেড়ে দেওয়ার জন্য মাত্র সাত হাজার আটশ’ টাকা নেবে শুনে একটু  অবাকই হয়েছিলাম। যাইহোক একটা বেশ ভালো গাড়ি এসে হাজির হওয়ায় নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। হোটেল মালিক হাত মিলিয়ে দুই পরিবারকে দুটি মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের বাঁধানো ফটো উপহার দিয়ে বিদায় জানালেন। ড্রাইভারকে ভাড়া হিসাবে পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে দিলাম। আমাদের গাড়ি এগিয়ে চললো।

দুটো জায়গা নির্বিঘ্নে ভালভাবে ঘুরতে পারায় মনটাও বেশ ফুরফুরে। কিছুটা পথ যাওয়ার পর ড্রাইভার গাড়িতে তেল ভরে নিলো। ড্রাইভার ছেলেটি বেশ ভদ্র ও ভালো, তবে একটু কম কথা বলে। কোন একটা ভালো জায়গায় জলখাবার খাওয়ার জন্য গাড়ি দাঁড় করাতে বলে দেওয়া হলো। সুন্দর রাস্তা ধরে আমরা অনেক্ষণ যাবার পর সে একটা দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করালো। দোকানটা বেশ বড় হলেও বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না এবং খাবারের মানও খুবই খারাপ। ইচ্ছা না থাকলেও এখানেই কিছু চা জলখাবার খেয়ে নিয়ে দাম মিটিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। গাড়ির ট্যাঙ্ক ভর্তি, আমাদের উদরও খালি নয়, অতএব গাড়ি গতি নিলো। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর বড়নগর নামে একটা জায়গায় স্বামী বিবেকানন্দের একটা মূর্তি দেখে ভালো লাগলো। একসময় রাস্তার বাঁদিকে একটা মন্দির দেখিয়ে ড্রাইভার জিজ্ঞাসা করলো, আমরা মন্দরটি দেখতে চাই কী না। গাড়ি থেকেই মন্দিরটা দেখে বেশ ভালো লাগলো। গাড়ি থেকে নেমে আমরা গেট পার হয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলাম। অনেকটা জায়গা নিয়ে ‘ভক্তমার’ নামে এই মন্দির, তবে মূল মন্দিরটি এখনও সম্পুর্ণ হয়নি। বাম পাশে আরও একটি মন্দির, ছোট হলেও এটি খুবই সুন্দর। এর পাশে একটি স্কুলও আছে। ডানদিকে আর্য বজ্রস্বামী প্রবচন হল লেখা আর একটি মন্দির মতো, তবে এখানেই বর্তমানে পূজাঅর্চা হয় বলে মনে হলো। এই মন্দিরটির ভিতরে সুন্দর একটি ঝাড়বাতি আছে। একটি ঘরে ছোট ছোট সুন্দর মূর্তি, বিক্রির জন্য সাজানো আছে। দিনের প্রথম দ্রষ্টব্য স্থান দর্শন, তাই খুঁটিয়ে দেখতে ও ছবি তুলতে গিয়ে একটু বেশি সময়ই ব্যয় করে ফেললাম।

‘ধার’ হয়ে বাঘ গুহা যেতে হয় জানা ছিল। উজ্জয়িনীর হোটেল মালিককেও গাড়ি বুক করার সময় সেকথা জানিয়েছিলাম। একটু এগিয়েই সেই ধার নামক জায়গাটায় এসে পৌঁছানো গেল। ড্রাইভারের পাশে আমি বসে। এখানে পৌছে আমরা এখন কোনদিকে যাবো জিজ্ঞাসা করায়, সে জানালো আমরা মাণ্ডু যাচ্ছি। বাঘ গুহা যাওয়ার কথা শুনে সে তো অবাক হয়ে গেল, শুধু তাই নয় বাঘ গুহার নামও আগে কখনও শুনেছে বলে মনে হলো না। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ড্রাইভার, পথচারী, বা কোন দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করেও কোন লাভ হলো না। শেষে ড্রাইভার জিপিএস দেখে তার বুদ্ধিমতো গাড়ি এগিয়ে নিয়ে চললো। এবার একটা ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে গিয়ে বেশ উঁচুতে একটা চওড়া সুন্দর রাস্তায় গিয়ে পড়লো। এটা সম্ভবত এন. এইছ. ৪৭, একটু এগিয়ে গিয়েই সে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললো, ধার থেকে বাঘ ৯১ কিলোমিটার রাস্তা, সেখান থেকে বাঘ গুহা আরও ছয় কিলোমিটার পথ। অর্থাৎ যাওয়া আসা নিয়ে এই ১৯৪ কিলোমিটার পথ তাকে তেল পুড়িয়ে অতিরিক্ত যেতে হবে, যেটা উজ্জয়িনীর হোটেল মালিক তাকে আদৌ বলেননি। সম্পূর্ণা তার মোবাইল থেকে দূরত্বটা কনফার্ম করলো। ড্রাইভার রাস্তায় নেমে হোটেল মালিককে ফোন করার চেষ্টা শুরু করে দিলো। তরুণ গাড়ি থেকে নেমে তার কাছে যাওয়ার সময় আমি তরণকে একটা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে তাকে পুষিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটা বোঝাপড়ায় আসার পরামর্শ দিলাম। ড্রাইভারের গলা পেলাম, সে ফোনে হোটেল মালিককে বলছে, যে এতটা পথ অতিরিক্ত যেতে হলে তার অনেক টাকা ক্ষতি হয়ে যাবে। তরুণ তার থেকে ফোনটা নিয়ে কথা বলা শুরু করলো। সময় নষ্ট ও একটা জায়গা দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবার আশংকায় আমি তরুণকে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এ আসার জন্য আবার পরামর্শ দিলাম। শেষপর্যন্ত তাই হলো, ড্রাইভার গাড়িতে এসে উঠে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো। আমি তার হাতে একটা লজেন্স তুলে দিলাম। তরুণ জানালো হোটেল মালিক ভুল স্বীকার করে নিয়ে জানিয়েছে, যে বাঘ গুহা সম্বন্ধে তার কোন ধারণা ছিল না, আমরা যেন একটু অ্যাডজাস্ট করে নেই। ধারের ওপর দিয়ে যাবার সময় কোন ড্রাইভার বা দোকানদারই বাঘ গুহার নাম শোনেনি, আর অত কিলোমিটার দূরে থেকে সে বাঘ গুহার খবর রাখবে আশা করাই তো অন্যায়। দুশ্চিন্তা হতে শুরু করলো, শেষপর্যন্ত সে সময়মতো চিনে নিয়ে যেতে পারবে তো? ওখানে ঘুরে দেখে আজই আমাদের মাণ্ডু চলে যেতে হবে। জনমানবহীন শুনশান রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, শেষপর্যন্ত অনেকটা সময় পরে বাঘ নামক জায়গাটায় এসে পৌঁছলো। আরও কিছু পরে আমরা বাঘ গুহার টিকিট কাউন্টারের সামনে এসে উপস্থিত হলাম। একবারে ফাঁকা, কোন ট্যুরিস্ট নেই। তাই হয়, ২০১১ সালের ডিসেম্বরে গুজরাটের ভুজ থেকে ‘ধোলাভিড়া’ গিয়েও একই দৃশ্য দেখেছি। অথচ ধোলাভিড়া কিন্তু হরপ্পা মহেঞ্জদারোর সমবয়সি। এই জাতীয় ঐতিহাসিক স্থল, বিশেষ করে ভগ্নস্তুপের ওপর আমাদের আগ্রহ ও ভালবাসা থাকলে, প্রাচীন শহরগুলো আবিস্কৃত হওয়ার পরে স্থাপত্য, মূর্তি, বা চিত্রগুলি হয়তো এভাবে দিনে দিনে নষ্ট হয়ে যেত না। যাইহোক মাথাপিছু পঁচিশ টাকা করে টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। ড্রাইভার আমাদের সমস্ত মালপত্র নিয়ে গড়িতে বসে থাকলো। একটা বড় জলাশয়, নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে, তবে আর কোন লোকজন না থাকায়, তার নাম বা উৎস অজানাই রয়ে গেল। এই জলাশয়ের উপর দিয়ে একটা বড় ব্রিজ পার হয়ে গুহাগুলোর কাছে যেতে হয়।

মধ্যপ্রদেশের ধার জেলার বাঘ নামক জায়গায়, বিন্ধ্য পর্বতমালায় খাড়া বেলেপাথরের গায়ে এই গুহাগুলি অবস্থিত। এটা বাঘ গুহা নামে কেন পরিচিত জানি না, হয়তো নিকটবর্তী বাঘ শহরের নামানুসারে বাঘ গুহা নামে পরিচিতি লাভ করেছে। পঞ্চম থেকে সপ্তম শতাব্দীতে পাহাড় কেটে মোট নয়টি গুহা নির্মান করা হলেও, বর্তমানে পাঁচটি গুহা কোনমতে তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করে ভগ্নশরীরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় দু’দশক আগে এই গুহা আবিস্কৃত হয় বলে জানা গেল। যদিও এই গুহাগুলি মূলত দেওয়াল চিত্রের জন্য বিখ্যাত বলা হয়, কিন্তু বর্তমানে দেওয়াল চিত্রের অস্তিত্ব প্রায় নেই বলা যায়। অনেক জায়গাতেই জল গড়িয়ে পড়ায় হয়তো ছবিগুলি গুহাগুলির মতোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা এখনও হচ্ছে। গুহার অপরদিকে দেখলাম একটি মিউজিয়াম আছে। মিউজিয়ামের দরজা ভেজানো থাকলেও কোন রক্ষী বা কর্মচারীর দেখা পাওয়া গেল না। মিউজিয়ামের বাইরে ও ভিতরে কিছু মূর্তি ও ছবি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। অনেকটা সময় নিয়ে নিজেরাই মূর্তি ও ফটোর ফ্রেমে বাঁধানো ছবিগুলো দেখলাম। বহু প্রাচীন দুস্প্রাপ্য ছবি, কাজেই তার একটা অন্য মূল্য আছে, তা নাহলে বর্তমানে অধিকাংশ ছবির যা অবস্থা, অনেকেই সেগুলোর জন্য সময় ব্যয় করতে রাজি হবে কী না সন্দেহ থেকেই যায়। গুহাগুলি কিন্তু দেখার মতো, তবে আলোর ব্যবস্থা না থাকায়, বেশ কিছু জায়গায় ঘুটঘুটে অন্ধকার, ও মেঝেতে বড় বড় পাথর পড়ে থাকায় আছাড় খেয়ে হাত পা ভাঙার সম্ভবনা যথেষ্ট। ক্যামেরা নিয়ে আমি নিজেও একবার আছাড় খেয়ে পড়ায় হাত পা কেটে গেল। যাইহোক অনেকক্ষণ পরে ফিরে আসার সময় কয়েকজন যুবককে বাঘগুহা দর্শনে আসতে দেখলাম বটে, তবে তারা গুহার অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে বাইরে বাইরে ঘুরে বিভিন্ন পোজে সেলফি তোলাতেই ব্যস্ত দেখলাম। হয়তো গুহার ভিতর আলোকাভাব সেলফি তোলার অন্তরায় এর একমাত্র কারণ। এবার ফেরার পালা, গেট থেকে বেরিয়ে আমরা গাড়িতে এসে বসলাম।

দীর্ঘ পথ পার হয়ে ‘মানবর’ নামক একটা জায়গার উপর দিয়ে সন্ধ্যার পর আমরা মাণ্ডুর ‘হোটেল ভিরাসত’ এর সামনে এসে উপস্থিত হলাম। ফোনে কথা বলাই ছিলো, ঘরগুলো স্বচক্ষে দেখে রাতটা থাকা পাকা করা মাত্র। রিসেপশন কাউন্টার ও ঠিক পাশের বিশাল ডাইনিং হল্ দেখে বুঝলাম, যে হোটেলটা আমাদের পক্ষে একটু ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। কিন্তু আগেই বলেছি যে এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রদেশের যে দুটো জায়গায় হোটেলে থেকেছি, অনেক জায়গার থেকে তুলনামূলকভাবে ভাড়া অনেকটাই কম। একটা চারশয্যার বিরাট ঘর ও আরেকটা দুইশয্যার ঘর আমাদের দেওয়া হলো। দ্বিতীয় ঘরটা কেন যে অত বড় করা হলো বুঝলাম না। ঘরগুলোর বিছানা, কম্বল, পরদা, ও বাথরূম, রীতিমতো আভিজাত্যের ছাপ আছে। মহিলাদের ফ্রেশ হয়ে নিতে বলে, আমি ও তরুণ নীচে নেমে রাতের খাবারের কথা বলে দিলাম। সম্পূর্ণাকে ফোন করে রিসেপশনে খাবারের অর্ডার দিয়ে দিতে বললাম। এদিক ওদিক একটু ঘুরে ঘরে ফিরে এসে শুনলাম, যে রিসেপশনের ভদ্রলোক রাতের খাবার আমাদের ঘরে পৌঁছে দেবার কথা বললেও তারা নীচের ডাইনিং হলে গিয়ে খাবার খেতে যাওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছে। স্নান করতে গিয়ে দেখলাম আমার ঘরটার বাথরূমের নালায় সম্ভবত কিছু আটকেছে। নালা দিয়ে সহজে জল যেতে না পারায়, অনেকক্ষণ জল জমে থাকছে। যাইহোক, স্নান সেরে তৈরি হয়ে নীচের ডাইনিং হলে খেতে গেলাম। রিসেপশন কাউন্টারে বাথরূমের কথা জানাতে, তিনি অন্য ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে চাইলেন। কিন্তু একটা রাতের জন্য নতুন করে আর ঝামেলায় না গিয়ে খাবার টেবিলে চলে গেলাম। ডাইনিং হলের টেবিল চেয়ারের সংখ্যার আধিক্যে একটু অবাক হতেই হলো। জানি না এই হোটেলের কত বোর্ডার এই হোটেলেই খাবার খান। হয়তো বিশেষ কোন রিসেপশন পার্টি থাকলে এই হোটেল ও ডাইনিং ভাড়া দেওয়া হয়। যাইহোক স্বাভাবিক ভাবেই আজ সবাই বেশ ক্লান্ত, তাই খাওয়া সেরে মৌড়ি চিবোতে চিবোতে যে যার ঘরে গিয়ে ঢুকলাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের চার তারিখ। ঘুম ভাঙলো বেশ ভোরে। রোজ সকালের মতো আজও তরুণ সীমার তৈরি চা ঘরে দিয়ে গেল। রোজ ভোরে চা তৈরি করা যেন সীমার একটা দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে, তরুণের যেমন আমার ঘরে চা পৌঁছে দেওয়া। সকাল বেলা সেই চা খাওয়া আমার অধিকার না কর্তব্য অবশ্য সঠিক বলতে পারবো না, তবে একেই বোধহয় ডিভিসন অফ লেবার বলে। সে যাইহোক্, রিসেপশনে এসে হোটেল ভাড়া বাবদ আড়াই হাজার টাকা ও কাল রাতের খাবারের বিল মিটিয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। মাণ্ডু, রূপমতী-বাজবাহাদুরের মাণ্ডু শহরে দেখবার জিনিসের অভাব নেই। সারাদিন ঘুরে দেখে আজ ওমকারেশ্বর চলে যাবো। সেখানেই রাত্রিবাস।

আমাদের গাড়ি আমাদের নিয়ে সেই রূপমতী মহলের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললো। এই মাণ্ডু বা মাণ্ডগড়, ধার   জেলাতেই অবস্থিত। ধার শহর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৩৫ কিলোমিটার। মধ্যপ্রদেশের পশ্চিমাংশে অবস্থিত মালওয়ার অঞ্চল প্রায় সাতশ’ বছর আগে থেকে বিভিন্ন বংশ শাসন করেছিলেন। তারও কয়েকশ’ বছর আগে থেকেই মাণ্ডু একটি উন্নত শহর হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছিল, এবং একসময় ধার থেকে রাজধানী মাণ্ডুতে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৪০১ সাল থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সুলতান রাজত্ব করে থাকলেও, বর্তমানে মাণ্ডু শহরের আনাচে কানাচে বাজ বাহাদুরের কাহিনীই বেশি প্রাধান্য লাভ করে থাকে। বিশেষ করে বাজ বাহাদুর ও রূপমতীর প্রেম কাহিনী। বাজ বাহাদুরের রাজত্বকাল মাত্র ছয় বছরের, ১৫৫৫ থেকে ১৫৬১ পর্যন্ত। ১৫৬২ সালে নতুন করে রাজত্ব লাভ করলেও, তা খুবই অল্প সময়ের জন্য। অতীব সুন্দরী রূপমতী ছিলেন একাধারে সুগায়িকা ও কবি। তাঁর অসাধারণ সৌন্দর্যই বোধহয় তাঁর সুন্দর জীবনে চরম বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মুঘল সম্রাট আকবর আধম খাঁকে মাণ্ডু আক্রমন করে রূপমতী ও বাজ বাহাদুরকে ধরে আনার জন্য পাঠান। মাণ্ডুর পতন সংবাদ পেয়ে রূপমতী বিষ পান করে আত্মহনন করেন, বাজ বাহাদুর পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পবিত্র নর্মদাকে দেখা যায় এমন কোন স্থানে রূপমতীর থাকার বাসনা থাকায়, বাজ বাহাদুর রেওয়া কুণ্ড তৈরি করেন। রূপমতী প্যাভেলিয়ান, রেওয়া কুণ্ড, বাজ বাহাদুর প্যালেস, জাহাজ মহল ইত্যাদির আনাচে কানাচে আজও নাকি রূপমতীর গাওয়া রাগ রাগিনীর সুর ভেসে বেড়ায়। বাজ বাহাদুর রূপমতীর করুণ পরিণতি আজ এতগুলো বছর পরেও মানুষের মনকে নাড়া দিয়ে যায়। বাজ বাহাদুর রূপমতীকে নিয়ে অনেক রকম গল্পগাথা থাকলেও সেইসব গল্প এখন থাক, আমরা বরং আবার রূপমতী মহলে ফিরে আসি।

নর্মদা নদীর পাশে অবস্থিত, বিশাল এই রূপমতী মহল মূলত সৈনদের চারিদিক পর্যবেক্ষণ, ও শত্রুর হাত থেকে রাজ্য রক্ষা করার জন্য তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে রূপমতী প্যাভিলিয়ান নামেই এটি অধিক পরিচিত। এখানে প্রবেশ করার জন্য মাথাপিছু পঁচিশ টাকা করে টিকিট কাটতে হয়। আমরা দেখার সুবিধর্থে একজন গাইডের সাহায্য নিলাম। নীচে কিছুটা দূরে অবস্থিত বাজ বাহাদুর মহল, জাহাজ মহল, বা রেওয়া কুণ্ড, বিশাল এই দুর্গের থেকে লক্ষ্য করা যায়। এখানে সৈনদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা, সৈনদের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা ইত্যাদি দেখবার মতো, তবে বিস্তীর্ণ এই স্থাপত্যের বর্ণনা দেওয়ার মতো কলমের জোর আমার নেই।

গাইডের সাথে রূপমতী প্যাভিলিয়ানে অনেকটা সময় কাটিয়ে আমরা নীচে নেমে এলাম। এখানে একটা দোকানে বেশ বড় বড় একরকম ফল বিক্রি হচ্ছে দেখে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, যে এগুলো অন্য কিছু নয়, এগুলো নাকি তেঁতুল। যাইহোক আমরা গাড়িতে চেপে বসলাম। গাড়ির ছাদে বা ভিতরে মূল্যবান জিনিসপত্র, অচেনা অজানা স্বল্পপরিচিত একজন ড্রাইভারের জিম্মায় রেখে কতো নিশ্চিন্তে আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি ভাবতেও অবাক লাগে। এবারেই প্রথম নয়, অতীতেও অন্যান্য অনেক রাজ্যে একইভাবে ঘুরে বেড়িয়েছি। যাইহোক, আমরা বাজ বাহাদুর মহলে এসে উপস্থিত হলাম। এই মহলের বিশালত্বও অবাক করার মতো। এর হলঘরগুলো, থাম, খিলান, বিভিন্ন নয়নাভিরাম খোলা অংশ দেখবার মতো। এই প্রাসাদটি ঘুরে দেখতে অনেকটা সময়ের প্রয়োজন। এরপর রূপমতীর জন্য বাজ বাহাদুরের তৈরি রেওয়া কুণ্ড। রূপমতী প্যাভিলিয়ানে জল সরবরাহের জন্য তিনি এই বিশেষ কুণ্ডটি প্রতিষ্ঠা করেন।

জাহাজ মহলে প্রবেশ করার আগে, পাশের ‘শ্রী তমন্না রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড ধাবা’য় কিছু খেয়ে নিলাম। জাহাজ মহলটি ভারী সুন্দর। এখানেও মাথাপিছু পঁচিশ টাকার টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়। মুঞ্জ আর কাপুর তালাও-এর মাঝে মহলটি জাহাজের মতো অবস্থান করছে। দোতলার খোলা জায়গায় দাঁড়ালে একদিকে মুঞ্জ তালাও ও অপরদিকে কাপুর তালাওয়ের জলের দিকে তাকালে মনে হবে কোন জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছি। নীচের তলায় বড় বড় হলঘর। খিলান দেওয়া করিডোরগুলি দেখলে বোঝা যায় যে কত অর্থ, কত যত্ন, ও কত পরিশ্রমের ফসল এই জাহাজ মহল। গোটা অঞ্চলটি সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ ও ফুলগাছ দিয়ে সাজানো। আসলে এইসব স্থাপত্ব দুচোখ ভরে দেখতে হয়, ক্যামেরার লেন্স্ বা কলমের আঁচড়ে এর সৌন্দর্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে এই জাহাজ মহলটি সম্ভবত ১৪৬৯ থেকে ১৫০০ সালে গিয়াসউদ্দিন শাহ তাঁর বিশাল হারেমের জন্য তৈরি করেন, এটি বাজ বাহাদুরের তৈরি নয়। আমার তো মনে হয় কলঙ্কহীন বাজ বাহাদুরের চরিত্র একবারে ভিন্ন ঘরানায় তৈরি। এখানেও অনেকটা সময় ব্যায় করে বাইরে এসে কফির কাপে চুমুক দিয়ে সামনের দ্রষ্টব্য স্থলগুলোর জন্য শক্তি সঞ্চয় করে নিলাম।

কাছেই জামি বা জামা মসজিদ, মসজিদের ঠিক উলটো দিকে আশরাফি মহল। যদিও আশরাফি না আশারফি, বোর্ডগুলো দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া মুশকিল, তবে কবি তো বলেইছেন, যে নামে কিবা আসে যায়। মহলটি একটি মাদ্রাসা কলেজ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এবং ছাত্রদের এখানে থাকার ব্যবস্থাও ছিল। ১৪০৫ সাল থেকে ১৪২২ সাল পর্যন্ত সময় নিয়ে হোসাং সাহ এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ঠিক উলটো দিকে জামি মসজিদটি তৈরি হওয়ায় এখান থেকে মসজিদটি দেখা যেত, বা এখনও যায়। পরবর্তীকালে মহম্মদ খিলজি এখানে একটি সাত তলা বিজয় স্তম্ভ স্থাপন করেন, যদিও সেটির এখন আর কোন অস্তিত্ব নেই। মহম্মদ খিলজির কবরটি এখানেই অবস্থিত। এখনও মহলটি ঘুরে দেখলে তার বিশালত্ব সহজেই আন্দাজ করা যায়। শোনা যায়, যে রানীদের স্থূলতা কমাবার জন্য গিয়াসউদ্দিন খিলজি একটি অদ্ভুত পন্থা আবিস্কার করেছিলেন। তিনি রানীদের প্রতিদিন সিঁড়ি দিয়ে ওঠা নামা করবার পরামর্শ দেন। রানীদের উৎসাহ দানের জন্য তিনি নাকি প্রতিটি সিঁড়ির জন্য একটি করে আশরাফি, অর্থাৎ স্বর্ণমুদ্রা উপহারের প্রতিশ্রুতি দেন। রোজ চুয়ান্নটা সিঁড়ি ভেঙে আমায় আমার ফ্ল্যাটে ওঠানামা করতে হয়। একাধিক রানী তো দূরের কথা, একটি মাত্র ওনাকে রোজ ওঠানামার জন্য আশরাফি নাহোক এক টাকার কয়েন দিতে গেলেও মাসে ৩২৪০ টাকার প্রয়োজন। অতএব আদার ব্যাপারী আদা নিয়েই বেশ আছি, জাহাজের খোঁজখবর আর নাই বা রাখলাম।

আশরাফি মহল থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে ঠিক উলটো দিকে জামা বা জামি মসজিদের টিকিট কাউন্টারে গেলাম। এখানেও প্রবেশ করার জন্য মাথাপিছু পঁচিশ টাকার টিকিট কাটতে হয়। বর্তমানে পরিতক্ত এই মসজিদটি আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার রক্ষণাবেক্ষণে আছে। কোথাও জানা গেল ১৪৪০ সালে মসজিদটি তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়, কোথাও বা জানা গেল ১৪৫৪ সাল। সে যাইহোক্, মাথার ওপর তিনটি বিশালাকৃতির ও আটান্নটি ছোট গম্বুজ নিয়ে মন্দিরটি এখনও অতীতের সাক্ষ বহন করে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। উঁচু ও সুন্দর খিলান দেওয়া করিডোরগুলো দিয়ে যাওয়ার সময় অবাক হতে হয়। খোলা জায়গাগুলো সুন্দরভাবে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয়েছে। বোঝা যায় মসজিদটিকে বেশ যত্ন করা হয়।

আমাদের হাতে আর বিশেষ সময় নেই। আজ আমাদের ওমকারেশ্বরে রাত্রিবাস, আমরা মহেশ্বর দেখে ওমকারেশ্বর চলে যাবো। তাই আর সময় নষ্ট না করে রাস্তা থেকে কিছু ফল কিনে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলাম আমাদের পরিকল্পনা মতো মাণ্ডুর শেষ দ্রষ্টব্য নীলকান্ত মন্দিরটি দেখবার জন্য। ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট আকবরের একজন গভর্নর, সম্রাট আকবরের হিন্দু পত্নী যোধাবাই-এর জন্য এই শিব মন্দিরটি স্থাপন করেন। সিঁড়ি ভেঙে অনেকটা নীচে নেমে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। এখানে আর অযথা সময় ব্যয় না করে আমরা মহেশ্বরের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম।

নর্মদা নদীর উত্তর পারে একবারে নদীর পাশে মহেশ্বর মন্দির। মন্দির ও নর্মদা নদীর মাঝখান দিয়ে সরু রাস্তা। গাড়ি থেকে নেমেই রঙিন কাজ করা দেওয়ালের ধারে এক দম্পতি পরম যত্নে তাগড়াই তাগড়াই ভুট্টা বিক্রি করছে দেখে চরম লোভ হলো, কিন্তু সময় লাগবে বুঝে লোভ সংবরণ করে নদীকে ডানপাশে রেখে রাস্তার ওপর বিভিন্ন পসরা নিয়ে বসা দোকানগুলোর পাশ দিয়ে এগিয়ে চললাম। আবার বাধা, এক বয়স্কা মহিলা আরও অনেক খাদ্য সামগ্রীর সাথে আঁখের রস বিক্রি করছেন। সবাই সিদ্ধান্ত নিলো, আঁখের রস না খেলেই নয়। কিন্তু আঁখ পিষিয়ে রস না করে মহিলাটি তাঁর ছেলের উদ্দেশ্যে চিৎকার শুরু করে দিলেন। সমস্যাটা হচ্ছে আঁখ পেষাই করার যন্ত্রের মোটরটি বিদ্যুৎ চালিত, এবং সেটার চামড়ার ফিতেটি ঘন ঘন মোটর থেকে খুলে যায়। যাইহোক শেষপর্যন্ত অভিজ্ঞ ছেলেটির তৎপরতায় এক গ্লাস করে রস পান করে শরীর ও মন উভয়ই তৃপ্ত হলে, আমি তরুণ ও সীমা মন্দিরের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম। বাকি দুজন আঁখের রস বিক্রেতার দোকানে বসে থাকলো।

রাজমাতা অহিল্যাবাঈ হোলকার নদীর পারে এই দুর্গসম প্রাসাদটি সহ নদীর পারে বাঁধানো ঘাট, ইত্যাদি তৈরি করেন। এই প্রাসাদটি সম্ভবত ১৭৬৬ সালে প্রতিষ্ঠা হয়। মূল মন্দিরটি সারানো হচ্ছে, তাই বিগ্রহটি মন্দিরের কাছেই অন্য ঘরে রাখা হয়েছে। বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে বিশাল প্রাসাদটির একবারে ওপরে দুর্গ ও রাজবাড়ি। শোনা যায় রাজমাতা অহিল্যাবাঈ হোলকার নিজে কিন্তু একটা ছোট ঘরে অতি সাধারণভাবে জীবন যাপন করতেন। এই মন্দির ও প্রাসাদ নর্মদার বন্যার জলোচ্ছাসে ১৯৩০ ও ১৯৩৩ সালে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খুব একটা উল্লেখযোগ্য না হলেও, এই মন্দিরে বেশ কিছু পাথরের মূর্তি আছে। অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে ঘুরে মন্দির ও মন্দির সংলগ্ন অহিল্যা বাঈ রাজবড়া দেখে আমরা অহিল্যাবাঈ মন্দিরটি দেখতে গেলাম, তবে অনেক ওপরের দুর্গ ও রাজবাড়িটি আর দেখতে যাওয়া হলো না। রাজবড়ার ভিতর রাজবাড়ির ব্যবহৃত পালকি, ও ঢাল তলোয়ার ইত্যাদি কিছু অস্ত্রশস্ত্র সাজানো আছে। বাইরে ডানদিকে রাজমাতার মূর্তি, ও বাঁদিকে মন্দির। ধীরে ধীরে আমরা বেরিয়ে এসে নদীর পারে এলাম, এবার ফিরে যাবার পালা। নদীটি বেশ পরিস্কার ও জলের রঙ নীল। নদীর পার সুন্দরভাবে বাঁধানো। একসময় আমরা সেই আঁখের রস বিক্রেতার দোকানের কাছে এসে, আমাদের বাকি দুই সদস্যার সাথে মিলিত হলাম। ওরা নদীতে নৌকা চাপার ইচ্ছা প্রকাশ করলে আড়াইশ’ টাকা দিয়ে একটা মোটর বোটে নর্মদার ওপর কিছুক্ষণ নৌকা বিহারও করে নেওয়া গেল। আজকের মতো ভ্রমণ সাঙ্গ অতএব হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে। গাড়ির উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম। আজ আমাদের এখান থেকে ৬৬ কিলোমিটার দূরের ওমকারেশ্বরে রাত্রিবাস করতে হবে। গাড়ির প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছি, এমন সময় সেই মকাই দম্পতি আমাদের হিপনোটাইজ করে তাদের পাশের ভুট্টার উনুনের কাছে টেনে নিয়ে এলো। তাঁদেরকেই বা অখুশি করি কেন, তাই প্রত্যেকে এক একটা তেল লেবু নুন মাখানো গরম ভুট্টা হাতে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। গাড়ি ওমকারেশ্বরের উদ্দেশ্যে ছুটে চললো।

একসময় আমাদের গাড়ি ‘হোটেল ওম শিভা’ নামক হোটেলের সামনে নির্বিঘ্নে এসে পৌঁছলো। পথেই গাড়ি থেকে হোটেলে ফোন করে কথা বলে রাখা হয়েছে, ঘর পছন্দ হলে ঘর নিয়ে নেওয়া হবে। ঘরগুলো একটু ছোট কিন্তু বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, কাজেই দুটো ঘরের জন্য দু’হাজার টাকা ভাড়ায় পাকা করে মালপত্র ঘরে নিয়ে আসা হলো। যদিও ড্রাইভারের সাথে তার থাকা খাওয়ার ব্যাপারে কোন চুক্তি হয়নি, কিন্তু গতকাল ও আজ গাড়ি পার্ক করা যায় এমন হোটেলে উঠেছি, সারাদিন মোটামুটি মূল খাবারের সময় তাকেও সঙ্গে নিয়েছি, তবে গতকালের মতো আজও তাকে রাতের খাবারের জন্য একটা টাকা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মহিলারা ফ্রেশ হয়ে নেওয়ার ফাঁকে আমি ও তরুণ গিয়ে কাছের একটা হোটেলে গিয়ে খাবারের কথা বলে এলাম। একটু রাতের দিকে পাঁচজনে গুটগুটি পায়ে গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে এলাম। সবাই মোটামুটি ক্লান্ত, তাই অল্প কিছুক্ষণ পরে যে যার বিছানায় আশ্রয় নিলাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের পাঁচ তারিখ। ভোরবেলা সীমার তৈরি চা খেয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। আজ মামলেশ্বর মন্দিরে ওমকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ দেখে আমাদের প্রায় পঁচাত্তর কিলোমিটার দূরে সোজা ইন্দোর চলে যাওয়ার কথা। পথে ইন্দোরের দ্রষ্টব্য স্থলগুলো দেখে নেওয়ার কথা। আজ সন্ধ্যায় ইন্দোর পৌঁছে আমাদের গাড়িটাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা। হোটেল থেকে জানা গেল, যে আমাদের হোটেল থেকে ওমকারেশ্বর মন্দির সামান্যই পথ। ড্রাইভার স্নান সেরে তৈরি হতে গেল, আমরা পায়ে হেঁটে ওমকারেশ্বর মন্দিরের উদ্দেশ্যে এগলাম। সামান্য পথ এগিয়েই নর্মদার ওপারে মন্দির যাওয়ার জন্য ব্রিজের মুখে এসে হাজির হলাম। ভারী সুন্দর ব্রিজ, নর্মদার জলও একবারে পরিস্কার ও নীল রঙের। ব্রিজ পার হয়ে জুতো খুলে রেখে বামদিকে নদীর পার ধরে বেশ কিছুটা পথ গিয়ে মন্দির। জুতো পরে মন্দির পর্যন্ত যাওয়ার বাধানিষেধ সম্ভবত শুধুমাত্র দর্শনার্থী ট্যুরিস্টদের জন্য, কারণ মন্দির সংক্রান্ত অনেক ব্যক্তিকেই দেখলাম দিব্য জুতা পায়ে মন্দির-ব্রিজ করে বেড়াচ্ছেন। পূর্বে এই মামলেশ্বরের নাম নাকি অমরেশ্বর ছিল। হতেই পারে, মহাকবি তো বলেইছিলেন, ‘নামে কিবা আসে যায়’? তবে পূর্ণার্থীদের কাছে ওমকারেশ্বর ও মামলেশ্বরের প্রায় সমান কদর বলে মনে হলো। মহারানী অহিল্যাবাঈ হোলকারের সময় বাইশ জন ব্রাহ্মণ প্রতিদিন এই জ্যোতির্লিঙ্গ পূজা করতেন। পরবর্তীকালে পূজারি ব্রাহ্মণের সংখ্যা কমে এগারো, ও বর্তমানে প্রতিদিন পাঁচজন ব্রাহ্মণ এই জ্যোতির্লিঙ্গ পূজা করে থাকেন। মন্দিরের পাথরের স্তম্ভ ও অন্যান্য জায়গার কাজ খুবই সুন্দর, তবে ফটো তোলায় যথেষ্ট বাধানিষেধ আছে। মহিলারা ওমকারেশ্বর ও মামলেশ্বর, উভয় জায়গায় পূজা দিয়ে আমাদের সাথে ব্রিজ পার হয়ে মন্দিরে ফিরে এলো।

আমাদের গাড়ির ড্রাইভার প্রস্তুত হয়েই ছিল, সে আমাদের সমস্ত লাগেজ যত্ন করে গাড়ির ছাদে গুছিয়ে রেখে গাড়ি ছেড়ে দিলো। এখান থেকে প্রথমেই আমরা শ্রী গজানন মহারাজ সংস্থানে গিয়ে উপস্থিত হলাম। মামলেশ্বর মন্দিরের কাছে অনেকটা জায়গা নিয়ে এই অলাভজনক আশ্রম। এখানকার মন্দিরটি সত্যিই দেখবার মতো। এতো যত্ন ও পরিশ্রম করে আশ্রমটিকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে ভাবা যায় না। তেমনি সুন্দর এই আশ্রমটির বাড়িগুলি। এখানে থাকা ও খাওয়ার জন্য দেখলাম কোন পয়সা নেওয়া হয় না। তবে কেউ কোন ডোনেশন দিলে তা গ্রহণ করা হয়। মন্দিরের ভিতরে ছবি তুলতে দেওয়া হয় না। ঘুরেফিরে কিছুটা সময় কাটিয়ে বাইরে এসে রাস্তার অপর পারে প্রাতরাশ সেরে নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলাম।

ইন্দোর যাওয়ার পথে প্রথম যেখানে গাড়িটা দাঁড় করালো, জায়গাটার নাম বাইগ্রাম। সেখানে একটা বিশাল শনি নবগ্রহ মন্দির আছে। মন্দিরটি বেশ বড় সন্দেহ নেই, তবে মোটেই উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। এখানে একটা বড় চায়ের দোকানে আর একপ্রস্ত চা খেয়ে আমরা এগিয়ে চললাম।

একসময় আমরা অন্নপূর্ণা মন্দিরের সামনে এসে উপস্থিত হলাম। এই মন্দিরটির প্রধান উপাস্য দেবতা দেবী অন্নপূর্ণা। আরও বেশ কিছু দেবদেবী এখানে পূজিত হয়ে থাকেন। যদিও দেখে বোঝার উপায় নেই, তবে এই মন্দিরটি নাকি ইন্দোরের প্রাচীনতম মন্দির, নবম শতাব্দীতে প্রস্তুত হয়। মন্দিরটি বেশ সুন্দর, বাইরে প্রবেশ পথের সামনে বড় বড় চারটে হাতির মূর্তি আছে, তবে নীল রঙের।

অন্নপূর্ণা মন্দির থেকে আমরা সোজা লালবাগ নেহেরু সেন্টারে এসে হাজির হলাম। এটা এখন একটা মিউজিয়াম হিসাবে ব্যবহৃত হয়। প্রায় বাহাত্তর একর জমির ওপর এই লালবাগ সেন্টার, এবং এই জমির ওপর প্রায় চার একর জায়গা জুড়ে এই প্রাসাদ। হোলকার রাজবংশের দ্বিতীয় তুকোজি রাও এর উন্নতি সাধন করলেও, তৃতীও তুকোজি রাও এর পরিপূর্ণ রূপ দেন। তিনি নিজে এই প্রাসাদে প্রায় চল্লিশ বছর বসবাস করে ১৯৭৮ সালে মারা যান। মাথাপিছু মাত্র দশ টাকা করে টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করা গেল। বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেড়োর প্রকৃষ্ট নমুনা এখানে দেখার সুযোগ হলো। কারও কারও কাছ থেকে ক্যামেরা ও মোবাইল জমা রেখে, আবার আমার মতো কারও কারও কাছে মোবাইল ও ক্যামেরা, উভয় আছে দেখেও নিয়ে যেতে বাধা না দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হলো। তবে ভিতরে ছবি তোলা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ।

ভিতরে ঢুকে বোঝা গেল রাজ প্রাসাদ কাকে বলে। ইটালিয়ান মার্বেলে মোড়া চোখ ধাঁধানো প্রতিটি অংশ প্রাশ্চাত্য কায়দায় সুসজ্জিত বাড়িটির একতলায় দরবার হলের দুদিকে অফিস, লাইব্রেরী, লাউঞ্জ, বিলিয়ার্ড রূম, ব্যাংকুয়েট হল ও নাচঘর। শয়ন কক্ষ, অতিথিশালা ইত্যাদি ওপরের তলায় অবস্থিত। মণিমুক্ত খচিত রাজমুকুট ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার, এমনকী চুলকাটার সেলুন পর্যন্ত ভিতরেই আছে। তবে অনেক কিছুই ফসিলের আকার ধারণ করেছে। আর আছে শিকার করে স্টাফড্ করে রাখা প্রকাণ্ড কয়েকটি বাঘ। শিকারীর নাম লেখা থাকলেও, তা এতো নীচে ও এতো ছোট ছোট হরফে লেখা, যে নীচু হয়ে পড়ে দেখা সম্ভব হয়নি। তবে প্রচণ্ড বিলাসিতার নিদর্শনের মাঝে যে জিনিসটি সবথেকে বেশি নজর কাড়ে, তা সেই সময়ের (১৮৪৪-১৯০৫) বিখ্যাত ফটোগ্রাফার লালা দীন দয়ালের তোলা বেশ কয়েকটা বাঁধানো ফটো। লালা দীন দয়াল হায়দ্রাবাদের ষষ্ঠ নিজাম ও ভারত বর্ষের ভাইসরয়ের ফটোগ্রাফার নিযুক্ত হয়েছিলেন। এখানে একটা মিনি  প্ল্যানেটরিয়ামও আছে দেখলাম। তবে কলকাতার বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামের পরে এই জাতীয় প্ল্যানেটরিয়াম দেখার ইচ্ছা হলো না। দশ টাকার বিনিময়ে অনেক কিছু দেখার সুযোগ হলো, তাছাড়া এখনও অনেক কিছু দেখার বাকি আছে। সন্ধ্যার মধ্য ইন্দোর পৌঁছে ড্রাইভারকে ছেড়ে দিতে হবে। অতএব এখানে আর সময় নষ্ট না করে রাজবাড়ি থেকে বেড়িয়ে গাড়িতে বসা গেল।

এবার সোজা বড়া গণেশ মন্দির। মন্দিরটি সেরকম উল্লেখযোগ্য না হলেও, সুসজ্জিত বিশাল গণেশ মূর্তিটি মাটিতে বাঁ পা রেখে বেদীর ওপর ডান পা তুলে শিবদূর্গার ছবি লাগানো একটা জামা পরে খোশ মেজাজে বসে আছেন। এখানেও দেখলাম ছবি তোলা নিষেধ লেখা আছে, তবে না গণেশ না পুরোহিত বা অন্য কারোর ছবি তুলতে দিতে আপত্তি দেখলাম না। বাইরে বেরিয়ে এসে সবাই মিলে জমিয়ে চা খেয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। ইন্দোর শহরে যে জিনিসটা সবচেয়ে ভালো লাগলো, ত হলো রাস্তার ধারে ধারে যেখানে সুযোগ আছে লোহার শিক বা জালের বেড়া। বেড়ার ভিতর সুন্দরভাবে ছোট ছোট গাছের টব লাগানো।

আমরা এবার কাচ কা মন্দির দেখতে গেলাম। বেশ লাগলো, সমস্ত মন্দিরটার ভিতরে রঙিন কাচ কেটে কেটে কি যে সুন্দর কাজ ভাবা যায় না। তেমনি সুন্দর এর কাচের তৈরি বিশাল ঝাড়বাতিটি। ঘুরে ঘুরে অনেকটা সময় নিয়ে মন্দিরটার কাচের কাজ দেখলাম ও ছবি তুললাম। আজ আর আমাদের দেখার কিছু নেই, তাই গাড়িতে বসে ফোনে কথা বলে প্রাথমিকভাবে ঠিক করা ‘হোটেল নীলম’-এ গিয়ে উপস্থিত হলাম। স্টেশনের কাছেই অবস্থিত এই হোটেলটা খুব একটা উল্লেখযোগ্য কিছু না হলেও, দুটো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ঘর দু’হাজার টাকা ভাড়ায় নিয়ে, মালপত্র ঘরে তুলে ড্রাইভারকে আরও চার হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিলাম। একটা মাত্র রাত এখানে থাকা। কাল ভোর ছ’টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ১৯৩২৩ ভোপাল ইন্টারসিটি এক্সপ্রেসে ভোপাল চলে যাবো। সকাল থেকে সেই অর্থে কিছুই খাওয়া হয়নি। একটু এগিয়েই একটা হোটেলে গিয়ে একটা করে ধোসা খেয়ে মহিলারা ফ্রেশ হবার জন্য হোটেলে ফিরে গেল, আমি ও তরুণ একবার স্টেশনে গিয়ে কাল ভোরের গাড়ির খোঁজখবর নিয়ে আসলাম। হোটেলে ফিরে খুব ভালো করে স্নান সেরে নিয়ে ক্যামেরা মোবাইল ইত্যাদি চার্জে বসিয়ে দিলাম। বেশ কিছু পরে তরুণ ও সীমা সম্পূর্ণাকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে গেল। আমরা দুজন আর গেলাম না। একসময় তরুণরা ফিরে এলো। তরুণ ও সীমাও আমাদের মতো কিছু খায়নি। আজ রাতে ও কাল সকালের প্রয়োজনে কিছু ফল কিনে নিয়ে আসতে ভোলেনি। সারাদিনের পথশ্রমে স্বাভাবিকভাবেই সবাই বেশ ক্লান্ত, তাছাড়া কাল ভোরে সমস্ত মালপত্র নিয়ে স্টেশনে গিয়ে ছ’টা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন ধরতে হবে। তাই বেশি রাত না করে বিছানা নিলাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের ছয় তারিখ। মোবাইলে এলার্ম দেওয়া ছিল। বেশ ভোরে উঠে তৈরি হয়ে নিলাম। আজ আর সকালে চা খাওয়ার কোন সুযোগ নেই। মালপত্র নিয়ে নীচে রিসেপশনে এসে দেখি একজন বসে আছে বটে, তবে সে ভাড়ার ব্যাপারে কিছুই জানে না। বাইরে যাবার গেটে তখনও তালা দেওয়া। আমরা চলে যাবো শুনে, সে গেট খুলে দিলো। বাইরে বেরিয়ে দেখি তখনও বেশ অন্ধকার। একটা খালি অটোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। ঘুম থেকে উঠেই মাল বয়ে স্টেশনে যাওয়ার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া গেল। প্রথম দফায় অধিকাংশ মালপত্র নিয়ে তরুণ ও দুজন মহিলা চলে গেল। আমি ও সম্পূর্ণা হোটেলের বিল মিটিয়ে দ্বিতীয় দফায় যাবো বলে ঠিক হলো। কাছেই স্টেশন, তাই অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই অটোটা চলে এলো। আমরাও শেষপর্যন্ত দু’হাজার টাকা জমা দিতে সমর্থ হয়ে, বাকি মালপত্র নিয়ে অটোয়  চেপে বসলাম। স্টেশনে এসে এক জায়গায় মালপত্র জড়ো করে রেখে চা খেয়ে ট্রেনের অপেক্ষায় বসে রইলাম। সামান্য কিছু বিলম্ব করে ট্রেন এসে হাজির হলো। একমাত্র ফেরার ট্রেন ছাড়া বাকি আর চারটে জায়গার আমাদের কনফার্ম টিকিট আছে। আমরা এ.সি. চেয়ার কারে আমাদের পাঁচজনের জন্য নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে মালপত্র গুছিয়ে রেখে আসন গ্রহণ করলাম। সঙ্গে কেক বিস্কুট ইত্যাদি ড্রাই ফুড আছে। তাই দিয়ে সামান্য প্রতরাশ সেরে, আর এক দফা চা খেয়ে গুছিয়ে বসলাম। প্রায় চার ঘন্টার জার্নি, সকাল দশটা পঞ্চাশ মিনিটে ভোপাল পৌঁছনোর কথা। ট্রেনে বসেই ভোপাল স্টেশনের কাছাকাছি হোটেল ‘মনজিৎ’-এর সাথে প্রাথমিক ভাবে পাকা কথা সেরে নেওয়া হলো। এখান থেকেও আমাদের বান্ধবগড় যাওয়ার জন্য আগামীকাল রাত এগারোটা আটাশ মিনিটের ১৮২৩৩ নম্বর নর্মদা এক্সপ্রেস ধরে উমারিয়া যেতে হবে। যাইহোক, নির্দিষ্ট সময়ের বেশ কিছু পরে আমরা ভোপালে এসে পৌঁছলাম। হোটেলে ফোন করতে তারা হোটেলের অবস্থানটা পরিস্কার করে বুঝিয়ে দেওয়ায়, আমরা দুটো অটো নিয়ে নির্বিঘ্নে হোটেলে গিয়ে হাজির হলাম। হোটেলটা খুবই ভালো, সার্ভিসও খুব ভালো, তবে তুলনামূলক ভাবে ভাড়াটা একটু বেশি, যদিও ঘরের মান অনুযায়ী মোটেই বেশি নয়। একটা ঘরের জন্য প্রতিদিন ১৬৫০.০০ টাকা, জি. এস. টি. অতিরিক্ত, অপর ঘরটার জন্য প্রতিদিন ১৩৫০.০০ টাকা, জি. এস. টি. অতিরিক্ত।

ঘরে মালপত্র তোলার পর অযথা সময় নষ্ট না করে, সামনেই বড় রাস্তার ওপরে একটা ছোট হোটেলে দলবেঁধে জলখাবার খেতে গেলাম। খাওয়ার পরিমাণটা একটু বেশিই হয়ে গেল। ভোপাল ঘুরে দেখার জন্য আজ আর আগামীকাল, এই দুটো মাত্র দিন হাতে আছে। কাজেই জলখাবার খেয়ে মহিলাদের হোটেলে পাঠিয়ে দিয়ে স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিতে বলে, আমরা দুজন গেলাম ভোপাল পরিক্রমার বাহনের সন্ধানে। অবশ্য তার আগে হাতের পাঁচ হিসাবে একটা নড়বড়ে গাড়ির সাথে কথা বলে, তাকে একটু পরে জানাবো বলে তার মোবাইল নম্বর নিয়ে রেখেছি। বড় রাস্তার পাশে পরপর অনেকগুলো ছোট বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলেও একটাতেও ড্রাইভার বা অন্য কারও দেখা মিললো না। ইচ্ছা না থাকলেও বাধ্য হয়ে গাড়িগুলোর কাছেই একটা ট্যুর অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির অফিসে গিয়ে হাজির হলাম। এদের সাথে কথা বলে আজ ও আগামীকাল মিলে দেড়দিনে ভোপাল ঘুরে দেখার জন্য একটা বড় গাড়ি ঠিক করে নিলাম। ঠিক হলো গাড়ি ও আজকের ট্যুর যদি ভালো হয়, তাহলে আগামীকালও ঘুরবার জন্য এখান থেকেই গাড়ি নেবো। নবাব নামে ড্রাইভার গাড়িটা দেখালো। গাড়িটার সাস্থ্য বেশ ভালো ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। গাড়িটাকে ঘন্টাখানেক পরে আমাদের হোটেলে আসতে বলে আমরা হোটেলে ফিরে গেলাম।

কথামতো ঘন্টা খানেক পরে ড্রাইভারকে ফোন করলে সে জানালো, যে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সে গাড়ি নিয়ে আসছে। আমরা নীচে নেমে এলাম। একটু পরেই নবাব তার গাড়ি নিয়ে হাজির হলো। সে জানালো, যে সে প্রথমে আমাদের সাঁচি স্তুপ নিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি ছুটে চলেছে, নবাবের সাথে কথা বলে বেশ ভালো লাগলো,  মানুষটা বেশ ভালো ও ভদ্র। অবশেষে একসময় আমরা রায়সেন জেলার সাঁচি স্তুপে এসে পোঁছলাম। খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় অব্দে মৌর্য্য সম্রাট অশোক নির্মিত সেই সাঁচি স্তুপ, ছোটবেলা থেকে যার ছবি দেখে আসছি। সেই সাঁচি স্তুপ, দীর্ঘ অনেকগুলো বছর যাকে দেখার বাসনা নিয়ে অপেক্ষা করে আছি। গৌতম বুদ্ধের দেহাবশেষের ওপর এই অর্ধগোলকাকারের এই স্তুপটির ওপরে একটি ছত্র আছে। মাথাপিছু চল্লিশ টাকা করে টিকিট কেটে অসাধারণ একটি তোরণের ভিতর দিয়ে আমরা সাঁচি স্তুপটির সামনে এসে দাঁড়ালাম। ভাবতেও খারাপ লাগছিল, যে সুদূর অতীতে এই অমূল্য সম্পদটিকে লোভের বশে খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়, ও শুধুমাত্র রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য স্তুপটির অনেকাংশ বিনষ্ট করা হয়। অবশ্য পরবর্তীকালে স্তুপটির পুননির্মাণ ও আয়তন বৃদ্ধি করা হয়। ভোপালের শেষ নবাব, এখানে একটি মিউজিয়াম তৈরি করেন। ভাবতেও ভালো লাগে, যে এই সংগ্রহশালার সুপারিন্টেন্ডেন্টের দায়িত্বে ছিলেন বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ বিপিনবিহারী ঘোষাল। দীর্ঘক্ষণ সময় নিয়ে বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্থাপত্বগুলি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, ছবি তুলে, একসময় ধীরে ধীরে গাড়িতে এসে বসলাম। নবাবের একটা বড় গুণ দেখলাম, সে অহেতুক ফিরে আসার জন্য তাড়া দেয় না।

একসময় আমরা উদয়গিরি গুহার কাছে এসে পৌঁছলাম। এই গুহাগুলি দেখার জন্য মাথাপিছু কুড়ি টাকার টিকিট কাটতে হয়। এই গুহাগুলি বিদিশা থেকে নয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে, গুপ্ত বংশের রাজারা এই গুহার স্থাপত্যকলা নির্মানে উদ্যোগি হন। এখানে সম্ভবত কুড়িটি গুহা আছে। এখানকার বিষ্ণু মূর্তিটি বিখ্যাত। এখানকার পাহাড় কেটে দেওয়াল আলমারির মতো ছোট ছোট জায়গা তৈরি করে, তার ভিতরে খোদাই করে ছোট ছোট মূর্তি বানানো হয়েছিল। দীর্ঘ এলাকা জুড়ে এই উদয়গিরি গুহা। তবে এর অনেকাংশই নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক মূর্তির সামনে রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে জাল দিয়ে ঘিরে দেওয়ায়, ছবি তুলতে বা ভালভাবে দেখতে বেশ অসুবিধা হয়। এঁকেবেঁকে গুহাগুলি দেখতে দেখতে পাহাড়ের ওপরে সমভূমিতে চলে যাওয়া যায়। যাইহোক, এখানেও অনেকটা সময় কেটে গেল। আর কিছুক্ষণ পরেই অন্ধকার হতে শুরু হবে, কাজেই আজ আর অন্য কোন স্পট দেখার সুযোগ হবে বলে মনে হয় না। ধীরে ধীরে অনেকটা পথ পাহাড় ও গুহার পাশ দিয়ে হেঁটে এসে গাড়িতে বসা গেল। একটা ভাঙাচোরা গ্রামের রাস্তা ধরে এসে একটা রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে, একসময় আমরা আবার পাকা রাস্তায় পড়লাম। এখন বেশ অন্ধকার নেমে এসেছে, নবাব গাড়িটাকে রাস্তার পাশে দাঁড় করালো। এখান দিয়ে ট্রপিক অফ ক্যানসার, বা কর্কটক্রান্তি রেখা গেছে। জায়গাটা বোঝাবার জন্য একটা বোর্ডও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। নবাব জানালো, যে যাওয়ার সময় এখানে দাঁড়ালে আমাদের উদয়গিরি দেখতে অসুবিধা হতো, তাই ফেরার পথে দেখিয়ে দিলো। আরও অনেকটা সময় পরে আমরা আমাদের হোটেলের সামনে এসে উপস্থিত হলাম। নবাব আজকের গাড়িভাড়া নিয়ে, আগামীকাল সকাল সকাল তৈরি হয়ে থাকতে বলে, গাড়ি নিয়ে চলে গেল। আমরা বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে বসে কাটিয়ে একসময় রাতের খাবার খেয়ে বিছানা নিলাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের সাত তারিখ। অভ্যাস মতো ভোরবেলা ঘুম ভাঙলো তরুণের ডাকে। সীমার তৈরি চা হাতে দরজার বাইরে সে দাঁড়িয়ে। ধীরে ধীরে আমরা সবাই তৈরি হয়ে নিলাম। আজ তরুণ সীমা ও সম্পূর্ণাকে অন্যান্য দিনের চেয়ে অন্য মেজাজে দেখলাম। আজ সেই দিন, আজ তরুণের পুত্রবধু অনিশা, থানে থেকে শুধুমাত্র একটা জঙ্গল সাফারি করার আকর্ষণে তিন দিনের জন্য আমাদের সাথে মিলিত হবে। আজ সারাদিন ভোপাল ঘুরে বিকেলের শেষভাগে ওকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আসার কথা। সেইমতো নবাবকেও জানিয়ে দেওয়া হলো। আজই রাত এগারোটা আটাশ মিনিটে ১৮২৩৩ নম্বর নর্মদা এক্সপ্রেস কাম প্যাসেঞ্জারে আমরা ছ’জন বান্ধবগড়ের উদ্দেশ্যে উমাড়িয়া চলে যাবো। হোটেল মনজিৎকেও সেইমতো বলা আছে, যাতে ওই কয়েক ঘন্টা হোটেলের ঘরে আমাদের সাথে ওকে থাকতে দিতে আপত্তি না করে।

যাইহোক, নবাব আমাদের নিয়ে তার গাড়ি ছেড়ে দিলো। নবাব জানালো, যে আজ প্রথমেই ভীমবেটকা যাওয়া হবে। যাওয়ার পথে কিছু স্পট দেখাতে দেখাতে নিয়ে যাবে, বাকিটা ফেরার পথে ও বিমান বন্দরে যাওয়ার সময় দেখাবে। আমরা তাকে যাওয়ার পথে জলখাবার খাওয়ার জন্য কোথাও গাড়ি দাঁড় করাতে বলে দিলাম। সেইমতো আমাদের গাড়ি যাওয়ার পথে একে একে কালী মন্দির, গভর্ণমেন্ট হাসপাতাল, প্যারেড গ্রাউন্ড, ছোটা তালাও বা লোয়ার লেক, পুরাতন বিধান সভা, গভর্ণর হাউস, বিড়লা মন্দির, নতুন বিধান সভা, প্ল্যানেটরিয়াম, বল্লভ ভবন, হাবিব গঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন দেখিয়ে, আবদুল্লা গঞ্জ নামক একটা জায়গায় একটা বড় ধাবায় নিয়ে গিয়ে জলখাবার খাওয়ার জন্য গাড়ি দাঁড় করালো। এখানে জলখাবার খেয়ে এক কাপ করে গরম কফি পান করে শরীর ও মন চাঙ্গা হয়ে গেল। নবাবকেও আমাদের সাথে জলখাবার খাওয়ানোয় সে খুব খুশি হলো। এখান থেকে আমরা একসময় রাইসেন জেলার রাতাপানি অভয়ারণ্যের অন্তর্গত ভীমবেটকায় এসে উপস্থিত হলাম। মাথাপিছু ত্রিশ টাকা করে টিকিট কেটে ঢোকার সময়েই বুঝে গেলাম, যে গাইড ছাড়া এই গুহা দেখতে যাওয়া নিরর্থক। এই পর্বত শিলা বা তার গুহাগুলি আর পাঁচটা পাহাড়ি অঞ্চলের মতো নয়, এমনকী বিদিশায় গতকালের দেখা বহু প্রাচীন উদয়পুর গুহার মতোও নয়। এগুলো অনেক, অনেক প্রাচীন। পাগৈতিহাসিক এই অঞ্চলের গুহাগুলি শুধুমাত্র পাহাড়ের অংশ ছিল না, প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে প্রস্তর যুগ থেকে মধ্যযুগের মানবদের এই গুহাগুলি ছিল ঘরবাড়ি, বন্য জীবজন্তু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করার আশ্রয় স্থল। ঘন জঙ্গল ও জলের অভাব না থাকায়, দীর্ঘদিন তারা এইসব গুহায় গাছের ফলমূল খেয়ে ও শিকার করে জীবন ধারণ করেছিল। বেলেপাথরের এইসব গুহায় তাদের দৈনন্দিন জীবন ধারা, জীবজন্তু শিকারের পদ্ধতি, ইত্যাদি নানাবিধ কাজের, প্রাকৃতিক রঙ দিয়ে আঁকা চিত্রগুলি আজও তার জীবন্ত নিদর্শন বহন করে চলেছে। লক্ষাধিক বছর আগেকার নিদর্শন, এই ভীমবেটকা ভারতবর্ষের প্রাচীনতম মানব জাতীর ইতিহাস হিসাবে মনে করা হয়। ২০০৩ সালে ইউনেসকো ভীমবেটকাকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে ঘোষণা করে। প্রায় ত্রিশ হাজার বছর আগেকার আঁকা কিছু শিলা চিত্র এখনও জীবন্ত হয়ে আছে। এর মূল কারণ হয়তো গুহাগুলির গঠন। গুহার ওপরের ছাদের মতো অংশের গঠনের জন্য বৃষ্টির জল ছবিগুলোকে নষ্ট করতে পারেনি, যেটা বাঘ গুহার ছবিগুলিকে নষ্ট করে দিয়েছে। এই অঞ্চলে নাকি সাতশ’র কিছু বেশি গুহা আবিস্কৃত হয়েছিল, এবং অধিকাংশতেই গুহা চিত্র লক্ষ্য করা যায়, তবে বর্তমানে খুব সামান্য কয়েকটি গুহা, সম্ভবত পনেরোটি গুহা দেখার সুযোগ পাওয়া যায়, এবং সেইসব গুহাগুলি দর্শনের পথে কিছু বোর্ডে গুহা বা গুহাচিত্রের কিছু বর্ণনা লেখা আছে। ধন্যবাদ ভারতীয় রেলওয়েজকে, এইসব গুহার কাছ দিয়ে রেললাইন পাতার জন্য। এই ভীমবেটকার নাম ভারতীয় পুরাতত্ত্বে ১৮৮৮ সালে নথিভুক্ত হলেও ১৯৫৭ সালে অতি প্রাচীন এই ভারতীয় ‘আলতামিরা’ গুহার প্রকৃত সন্ধান দেন এক ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ, শ্রী বিষ্ণুশ্রীধর ওয়াকাঙ্কার। তিনি ট্রেনে করে যাওয়ার সময় এই অঞ্চলের পাহাড়ের গঠনে আদিম মানবের মিল, আশ্রয় স্থলের মিল লক্ষ্য করেন। প্রথমেই যে বিশাল গুহাটি দেখা যায় সেটি সম্ভবত সভাগৃহ বা ওই জাতীয় কোন কাজে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। দেওয়ালের গায়ের চিত্রগুলি মূলত সাদা রঙে আঁকা। চুনা পাথর গুঁড়ো করে ছবিগুলো আঁকা বলে জানা যায়। এছাড়া যথেষ্ট লাল রঙের ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। তবে হলুদ বা সবুজ রঙের ব্যবহারের কথা জানা গেলেও, বিশেষ নজরে পড়লো না। মাশরুমের আকারের বোর রক নামের পনেরো নম্বর গুহাটিতে, লাল রঙের একটি বিশাল বন্য শুয়োরের চিত্র আছে। এছাড়া ঘোড়ার পিঠে অস্ত্র হাতে বসা বা হাতির পিঠে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো মানুষের ছবি, হাত ধরে মানুষের নৃত্য, সাথে একজনের ঢোল বা মাদল জাতীয় কিছু বাজানোর ছবিগুলো সত্যিই অবাক করে। সম্ভবত ঝড় জল হাওয়ায় ক্ষয়ে যাওয়া খোলা জায়গার কচ্ছপের রূপ নেওয়া বিশাল পাথরটি বেশ লাগলো। এখানে চামচিকে ও বাদুড়ের বাস প্রচুর। তারা দলবেঁধে একসাথে গলা সেধে তাদের গুহায় আমাদের বরণ করে নিলো না বিদায় হতে বললো জানি না, তবে সচরাচর এই সুযোগ পাওয়া যায় না। একসময় গাইড আমাদের সাথে হাত মিলিয়ে, ছবি তুলে, তার প্রাপ্য নিয়ে চলে গেল। আমরা আরও বেশ কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে দেখে, ছবি তুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। সেই ১৯৮২ সালে অজন্তা ইলোরার পরে আজ এই ভীমবেটকা আমায় মহিত করলো। না, এই মুহুর্তে ধারের বাঘ গুহা বা বিদিশার উদয়গিরিও এর ধারেকাছে স্থান পায় বলে মনে হলো না। এটা অবশ্য সম্পূর্ণ আমার মতামত, অনেকের মতের সাথে নাও মিলতে পারে।

এবার ফেরার পালা। এখান থেকে ভোপাল শহর সম্ভবত ৪৫ কিলোমিটার পথ। এখন আমাদের গন্তব্য, ভোজপুর শিব মন্দির বা ভোজেশ্বর মন্দির। একাদশ শতাব্দীতে রাজা ভোজ এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করলেও, মন্দির প্রতিষ্ঠাকালেই তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে মন্দিরটি ও আশেপাশের অনেক কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকে। আজও মন্দিরটি অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই আছে। তবে বর্তমানে আরকিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার রক্ষণাবেক্ষণে এই মন্দিরটি সুরক্ষিত। একটি মাত্র পাথর কেটে নির্মিত একটি বিশাল উচ্চতার শিবলিঙ্গ মন্দিরটির ভিতরে আজও পূজিত হয়। শিবলিঙ্গটি আরকিওলজিকাল সার্ভে মেরামত করে ও প্রকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে শিবলিঙ্গটি রক্ষা করার জন্য ওপরে একটি ছাদ নির্মান করে। পাথরের সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটিই চাতালের ওপর মন্দিরটি গঠিত। জানা গেল যে লিঙ্গটির উচ্চতা নাকি প্রায় আঠারো ফুট ও পরিধি সাড়ে সাত ফুট। মন্দিরের আশেপাশে এখনও অনেক মূর্তি পড়ে আছে, যেগুলো মন্দিরের শোভবর্ধনের জন্য তৈরি হয়ে থাকলেও কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় পড়ে থেকে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘক্ষণ সময় নিয়ে ঘুরে ফিরে প্রাচীন এই মন্দিরটি দেখে নীচে নেমে এসে গাড়িতে উঠে বসলাম।

অনেকটা পথ ভীমবেটকা আর ভোজ রাজার ভোজপুর শিব মন্দিরের জাবর কাটতে কাটতে চলে এলাম। এখানে নির্জন রাস্তার পাশে পাশে প্রচুর কুল গাছ, তাতে কুলও হয়ে আছে যথেষ্ট। কুল নিয়ে আমাদের আলোচনা ও হইচই দেখে, নবাব গাড়ি দাঁড় করিয়ে একগাদা কুল পেড়ে এনে দিলো। তার আন্তরিক ইচ্ছার সম্মানার্থে দু’-একটা করে কুল চিবোলাম, যেমন টক তেমনি কষা স্বাদ। দেখতে দেখতে আমরা বড়া তালাওয়ের কছে এসে হাজির হলাম। শহরের কেন্দ্রস্থলে রাজা ভোজ এর তৈরি করা সমুদ্রের মতো বিশাল এই লেক, আপার লেক বা ভোজ তাল নামেও পরিচিত। এরপর মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন, অল ইন্ডিয়া রেডিও, নবাব পতৌদির এলাকা, রবীন্দ্র ভবন, রাজা ভোজ সেতু, রাজা ভোজের মূর্তি, ইত্যাদি দেখে আমরা রাজা ভোজ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। তাজ উল মসজিদের কথা মনেও ছিল না, নবাব নিজে থেকে নিয়েও গেল না, তাই ভারতবর্ষের সর্ববৃহত মসজিদটি এ যাত্রায় আর দেখার সুযোগ হলো না। অনিশার বিমান কিছু বিলম্বে আসার খবর পেয়ে বিমান বন্দরের কিছুটা আগে একটা ধাবায় বসে চা ও সিঙ্গাড়া খেয়ে কিছুটা সময় কাটালাম। একসময় আমরা বিমান বন্দরে গিয়ে আমাদের দলের ষষ্ঠ সদস্যা, তরুণের পুত্রবধু অনিশাকে আমাদের গাড়িতে তুলে আমাদের হোটেলে ফিরে এলাম। নবাবকে তার প্রাপ্য মিটিয়ে বিদায় জানালাম। আজই রাত এগারোটা আটাশ মিনিটের ১৮২৩৩ নম্বর নর্মদা এক্সপ্রেস কাম প্যাসেঞ্জার ট্রেনে আমরা বান্ধবগড়ের উদ্দেশ্যে উমাড়িয়া চলে যাবো।

সন্ধ্যের পর থেকে ওরা দিব্যি গুলতানি করে সময় কাটাতে লাগলো। আমি আর তরুণ একবার স্টেশনে গিয়ে গাড়ির খোঁজখবর নিয়ে আসলাম। একটু পরে ঘরে বসেই রাতের খাওয়া সেরে নীচে নেমে রিসেপশনে গিয়ে হোটেলের বিল মিটিয়ে দিয়ে আসলাম। মালপত্র গোছানোই ছিল, ধীরে ধীরে নিজেরা তৈরি হয়ে নিলাম। একসময় হোটেলকে বিদায় জানিয়ে অটো ধরে মালপত্র নিয়ে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে এসে মালপত্র জড়ো করে রেখে গাড়ির অপেক্ষা করা শুরু হলো। সবকিছুরই একটা শেষ আছে, অপেক্ষারও একসময় শেষ হলো। নির্দিষ্ট বাতানুকুল বগিতে উঠে মালপত্র গুছিয়ে রেখে শোয়ার ব্যবস্থা করে নেওয়া গেল। শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম,    এবার একটা অন্য স্বাদের সন্ধানে আমরা যাচ্ছি। জীবনে অনেক জঙ্গলে ঘুরেছি। আমার যদিও মনে হয় জঙ্গলের নিজস্ব সৌন্দর্যের আকর্ষণেই জঙ্গলে যাওয়া উচিৎ, কোন জীবজন্তু, এমনকী একটা পাখি বা প্রজাপতির দেখা পেলেও সেটা অতিরিক্ত পাওয়া। তবু মনে মনে বন্য পশুর দেখা পাওয়ার একটা সুপ্ত বাসনা তো মনের গভীরে থেকেই যায়। কোন জঙ্গলেই পশু পাখিরা আমায় কোনদিন সেই অর্থে বঞ্চিত করেনি, তবে রাজাবাদশারা কোনদিন আমার মতো তুচ্ছ প্রাণীকে দর্শন দেননি। রণথম্বরে হাড়কাঁপানো তীব্র ব্যাঘ্রগর্জন শুনেই তৃপ্ত হতে হয়েছিল। “এখনো তারে চোখে দেখিনি, শুধু বাঁশি শুনেছি— মন প্রাণ যাহা ছিল দিয়ে ফেলেছি”   বলা যেতেই পারে। গিরের জঙ্গলে গিয়ে সম্রাটের সাক্ষাৎপ্রার্থী আশপাশের সকলেই প্রায় গির জঙ্গলের সম্রাটের সাথে দেখা করে আসলেও, তিনি আমায় সাক্ষাৎ দেননি। এবার কি হবে জানি না।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না, ঘুম ভাঙলো বেশ সকালে। আজ ফেব্রুয়ারী মাসের আট তারিখ। আজ কোন তাড়া নেই, তাই চা খেয়ে আরও অনেকক্ষণ নিজের বার্থে শুয়ে কাটালাম। গাড়িটা রাতের বেলা এক্সপ্রেস হলেও দিনের বেলা প্যাসেঞ্জার হয়ে যায়। ফলে রাতের দিকে বিফোর টাইমে ছুটেও দিনের বেলা প্রতি স্টেশনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রায় আধ ঘন্টা বিলম্বে, এগারোটা নাগাদ উমাড়িয়া এসে হাজির হলো। সকালের দিকে বান্ধবগড়ের মগলি রিসর্ট থেকে ফোন করে জানতে চেয়েছিল, আমরা আজ কথামতো সেখানে যাচ্ছি কী না। ওদের দোষ নেই, ডিসেম্বরে ওখানে একদিন থাকার কথা ছিল, নিয়ম মাফিক ভাড়ার পঁচিশ শতাংশ টাকা অনলাইনে বুক করার সময় পাঠিয়েও ছিলাম। কথামতো ওই টাকা ফেরৎযোগ্য নয়, তবু আমাদের সেইসময় না যাওয়ার কারণ জানিয়ে এবার আবার বুক করার সময় আমাদের অনুরোধে ওই টাকাটা এবার ভাড়া থেকে অ্যাডজাস্ট করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায়, এবারের বুকিংয়ের জন্য আমরা আর কোন অগ্রিম টাকা পাঠাইনি। যাইহোক, আমরা ট্রেনে আছি ও আজ তাদের রিসর্টে যাচ্ছি জানিয়ে তিনটে কটেজ রেখে দেওয়ার কথা জানিয়ে দেওয়া হলো। উমাড়িয়া থেকে বান্ধবগড়ের তালা গেটের কাছাকাছি মগলি রিসর্ট প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার পথ। দুটো অটোয় মালপত্র চাপিয়ে আটশ’ টাকা ভাড়ায় রফা করে মগলি রিসর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

গাছপালা জঙ্গলে ঘেরা প্রায় সতেরো একর জমির ওপর এই রিসর্টের সামনে গাড়ি পার্কিং করার জায়গায় আমাদের অটো দুটো যখন এসে দাঁড়ালো, তখন ওদের কর্মচারী আমাদের ওখানেই মালপত্র রেখে রিসেপশনে চলে যেতে বললো। আমরা অটোর ভাড়া মিটিয়ে রিসেপশনে আসার সাথে সাথে, একজন মাথায় ফেট্টি বাঁধা যুবক এগিয়ে এসে করমর্দন করে আমাদের বসতে বলে, একজনকে ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস্ নিয়ে আসতে বললেন। সম্ভবত ইনি এই রিসর্টের ম্যানেজার। আমরা সোফায় বসলাম। এখানে সোফা ও অনেক কিছুর রঙই বাঘের চামড়ার মতো দেখতে। একজন কর্মী একটি ট্রেতে করে গরম জলে ভেজানো ভাঁজ করা ছোট ছোট তোয়ালে নিয়ে এসে স্টিলের চিমটে দিয়ে ধরে হাত মোছার জন্য প্রত্যেকের হাতে একটা করে তোয়ালে দিলেন। অপর একজন কর্মচারী প্রত্যেককে একগ্লাস করে অরেঞ্জ স্কোয়াশ দিয়ে গেলেন। এই ম্যানেজার ভদ্রলোকটির আতিথেয়তা ও আন্তরিকতা দেখলে মনে হতেই পারে, যে এই রিসর্টের বোর্ডারদের জন্য তাঁর নিবেদিত প্রাণ। তিনি আমাদের কটেজের সামনে গিয়ে সাজানো মাঠটায় একটু বসতে বললেন, কারণ কটেজগুলো পরিস্কার করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমাদের সমস্ত মালপত্র রিসর্টের একজন কর্মচারী একটা ট্রলি করে নিয়ে এসে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট কটেজগুলোর কাছে রেখে এলো। ডিসেম্বরে যখন বান্ধবগড়ে আসার কথা ছিল, তখন জঙ্গল সাফারির জন্য জিপসির কোন অগ্রিম টাকা পাঠাতে না হলেও, তালা গেট দিয়ে বান্ধবগড় ন্যাশনাল পার্কে জঙ্গল সাফারির জন্য নাম রেজিস্ট্রেশন বা অনুমতির জন্য, এক হাজার পাঁচশ’ পঞ্চাশ টাকা পাঠাতে হয়েছিল। এই টাকাটা আর ফেরত পাওয়া যায়নি। তাই অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন করে দ্বিতীয়বার জঙ্গল সাফারির জন্য নাম রেজিস্ট্রি করার সময় তালা গেট দিয়ে আগামীকালের তারিখে, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারী মাসের নয় তারিখে ঢোকার সমস্ত জিপসি বুক হয়ে যাওয়ায় খিতাউলি গেট দিয়ে প্রবেশ করার জন্য নতুন করে আবার পনেরোশ’ পঞ্চাশ টাকা পাঠিয়ে নাম রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল। যাইহোক আমাদের কটেজগুলোর কাছে যাওয়ার সময় একটা বোর্ডে দেখলাম আজকের তারিখ দিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করার তিনটি গেট, অর্থাৎ তালা, মাগধি, ও খিতাউলি গেটের জঙ্গলে কোথায় কোথায় বাঘ দেখা গেছে উল্লেখ করা আছে। মাগধি ও খিতাউলিতে একটি করে বাঘ দেখা গেলেও, তালা গেট দিয়ে প্রবেশ করা যাত্রীদের আজ কোন বাঘ দেখার সুযোগ হয়নি। এই ব্যবস্থাটা দেখে বেশ ভালো লাগলো। জানা গেল, কোন কোন যাত্রী আজ বিকালেও জঙ্গলে ঢোকার অনুমতি নিয়ে রেখেছেন। কেউ কেউ আবার তিনদিন তিনটি গেট দিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আমরা আজ একবার ঢোকার ব্যবস্থা করা যায় কী না জিজ্ঞাসা করায়, ম্যানেজার জানালেন এতো পরে আর সেটা ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে না।

আমরা আমাদের জন্য নির্দিষ্ট নয়, দশ ও এগারো নম্বর কটেজের কাছে গিয়ে দেখলাম, কটেজের সামনে আমাদের সমস্ত মালপত্র জড়ো করে রাখা আছে। কটেজের ঠিক সামনে একটা মাঠ মতো, সেখানে বসার জন্য দোলনা ও চেয়ারের ব্যবস্থা করা আছে। আমরা সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে একটু বসলাম। নয় আর দশ, একটা দোতলা কটেজের একতলার দুটো অংশ মাঝখানে একটা পার্টিশন। ত্রিশ চল্লিশ ফুট দূরে, এগারো নম্বর একতলা কটেজটা। সম্পূর্ণা প্রথমেই তার বৌদিকে নিয়ে থাকার জন্য এগারো নম্বর কটেজটা বেছে নিলো। অল্প সময়ের মধ্যেই ঘরগুলো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়ে গেলে, কোন লাগেজটা কোন ঘরে রাখা হবে জেনে নিয়ে গুছিয়ে রেখে দিলো। আমরা স্নান সেরে তৈরি হবার জন্য নিজ নিজ কটেজে প্রবেশ করলাম। পাথরের খিলান দেওয়া দুটি অংশ, তার মাঝখান দিয়ে পার্টিশন। একদিকে নয়, অপর দিকে দশ। ছোট্ট ছিমছাম একটু জায়গা, দুটো কাঠের চেয়ার ও দেওয়ালে একটা ফটো দিয়ে সাজানো। এই জায়গাটা থেকে দরজা দিয়ে ঢুকে একটা মাঝারি ঘর, সোফা ও কাঠের একটা সেন্টার টেবিল দিয়ে সাজানো। এই ঘরটি বৈঠকখানা। পাশের দরজা দিয়ে ঢুকলে বেডরূম। চওড়া খাট, পরিস্কার ধবধবে সাদা চাদর বালিশ, পরিস্কার লেপ। খাটের একপাশে এ.সি, ঠিক তার পাশে একটা ছোট রূম হিটার। অন্যপাশে একটা ছোট্ট টুলের ওপর একটা বাঘের চামড়ার মতো দেখতে কভার দেওয়া টেবিল ল্যাম্প ও একটা ট্রে তে একটা ইলেকট্রিক কেতলি ও কিছু চা কফি চিনি গুঁড়ো দুধের স্যাশে। পায়ের দিকের দেওয়ালে একটা এল.ই.ডি. টিভি। কটেজটার পিছন দিকে পর্দার আড়ালে একটা দরজা আছে দেখলাম, সেটা খুললে একটা ছোট বারান্দা, সেখানে দাঁড়ালে পাশের সুইমিং পুলটা পরিস্কার দেখা যায়। পায়ের দিকে সরু প্যাসেজের পাশে বেশ বড় সুন্দর ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বাথরূম। বাথরূমের একপাশে একটা বড় আয়না, ও আয়নার নীচে একটা সাদা রঙের গোল বেসিন। বেসিনের পাশে একটা ছোট ট্রেতে মগলি লেখা ছোট ছোট শিশিতে শ্যাম্পু ও প্রসাধন। দেখে খুব ভালো লাগলো, অবাকও কম হলাম না। জঙ্গল এলাকার হোটেল ও রিসর্টের ভাড়া একটু বেশি হয়, খাওয়া দাওয়ার খরচও তুলনামূলক ভাবে একটু বেশি হয়। এই কটেজগুলোর প্রতিদিন মাত্র আড়াই হাজার টাকা ভাড়া।

স্নান সেরে আমরা রিসর্টের ক্যান্টিনটায় খেতে গেলাম। ক্যান্টিনটা রিসেপশন সংলগ্ন, আমাদের কটেজগুলো থেকে খুব একটা দূরে নয়। লাল-সাদা কাপড় পাতা প্রতিটা টেবিলে কাঠের তৈরি সুন্দর চারটে করে চেয়ার। খাবার বা রান্না খুব একটা উল্লেখযোগ্য না হলেও, ভালোই বলা চলে। এখানে দেখলাম বোর্ডারদের রিসর্ট ঘুরে দেখার সুবিধার্থে কয়েকটা সাইকেল রাখা আছে। যে খুশি ওই সাইকেল চেপে ঘুরে বেড়াতে পারে। খেয়েদেয়ে সম্পূর্ণা তার বন্ধুসম বৌদিকে নিয়ে রিসর্ট দর্শনে গেল, মহিলা দুজন তাদের হাঁটুকে বিশ্রাম দেবার অছিলায় কটেজের সামনের মাঠে চেয়ারে বসে বিশ্রাম নিতে শুরু করলো, আর আমরা দুই বুড়ো দুটো সাইকেল নিয়ে রিসর্টের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। সুইমিং পুলের কাছে কিছুটা সময় কাটিয়ে ছবি তুলে গেলাম সেই বড় ঘেরা ঘরের মতো জায়গাটায়, যেখানে বোর্ডারদের অবসর বিনোদনের জন্য বিলিয়ার্ড, টেবিল টেনিস, ক্যারাম বোর্ড, ইত্যাদি রাখা আছে। আমি ও তরুণ কিছুক্ষণ ক্যারাম পিটে সাইকেলে চেপে কটেজের কাছে গিয়ে দেখি সঙ্গীরা দোলনা ও চেয়ারে তখনও বসে আছে, আর একপাশে কয়েকজন ছেলে ব্যাট বল উইকেট নিয়ে দিব্যি ক্রিকেট খেলা শুরু করেছে। শেষে একসময় আমরা আবার সকলে মিলে কটেজের পিছনে সুইমিং পুলের কাছে গেলাম। সেখানে বিশ্রাম নেবার যথেষ্ট ব্যবস্থা আছে। একটু পরে ঘরে ফিরে এসে কফি তৈরি করে খাওয়া হলো।

ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এলে আমরা চারজন সম্পূর্ণা ও অনিশার ডাকে দলবেঁধে ক্যান্টিনে গিয়ে দেখি টেবিলের ওপর প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা প্লেটে মুখোরোচক খাবার সাজানো আছে। জানা গেল অনিশার পছন্দে ও স্পনসরশিপে আজকের এই সান্ধ্যভোজের আয়োজন। ডান হাতের কাজ সেরে আমরা মাঠে ফিরে এলাম। ওই ঠান্ডায় স্বল্প আলোয় জোর কদমে ক্রিকেট খেলা চলছে। আলো আঁধরিতে চেয়ার ও দোলনায় কিছুক্ষণ বসার পর, মহিলারা ঘরে চলে গেল। আমি ও তরুণ আরও কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে সুইমিং পুলের কাছে কিছুটা সময় কাটিয়ে ঘরে ফিরে এলাম। কথামতো রাতে খেতে যাবার সময় রিসেপশনে কালকের জঙ্গল সাফারির জিপসি ভাড়ার তিন হাজার টাকা জমা দিয়ে, আগামীকাল দুপুরের দিকে জব্বলপুর চলে যাবার জন্য একটা বড় গাড়ির ব্যবস্থা করে দেবার কথা বললাম। জানি এখান থেকে এদের দিয়ে গাড়ির ব্যবস্থা করলে খরচা একটু বেশিই পড়বে, তবু এছাড়া উপায়ও তো নেই। কাজ সেরে ক্যান্টিনে গিয়ে রাতের খাবার সেরে ঘরে ফিরে এলাম। কাল ভোরে রিসর্টের গাড়ি পার্কিং এলাকায় জিপসি আসবে। ভোর সাড়ে ছ’টা থেকে সকাল সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত সাফারির সময় উল্লেখ করা আছে। ভোরে উঠে তৈরি হতে হবে, কাজেই আজ একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়তে হলো।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের নয় তারিখ। বেশ ভোরে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে রিসেপশনে এসে উপস্থিত হলাম। কাউন্টার থেকে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট জিপসির নাম্বার দিয়ে আমাদের পার্কিং প্লেসে চলে যেতে অনুরোধ করলো। ওরা এটাও জানিয়ে দিলো, যে দুপুরের দিকে আমাদের জব্বলপুর পৌঁছে দেবার জন্য একটা বড় গাড়ি আসবে তবে চার হাজার আটশ’ টাকার কমে গাড়ি পাওয়া গেল না। রাজি হওয়া ছাড়া এই মুহুর্তে আমাদের হাতে আর দ্বিতীয় কোন পথ খোলা নেই। গুটি গুটি পায়ে পার্কিং প্লেসে গিয়ে দেখি এই রিসর্টের যাত্রীদের জন্য কয়েকটা জিপসি দাঁড়িয়ে আছে। আমরা গাড়ির নাম্বার মিলিয়ে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট খোলা জিপসিটায় উঠে বসলাম। সামনে ড্রাইভারের পাশে গাইড। আমাদের সিটগুলোর ওপর ছ’জনের জন্য ছ’টা হালকা কম্বল ভাঁজ করা আছে। একে শীতকালের ভোর তার ওপর জঙ্গল, কাজেই বেশ ঠান্ডা। আমরা গুছিয়ে বসে কখনও চাদরের মতো করে কম্বল গায়ে দিয়ে, কখনও ঠান্ডার হাত থেকে ক্যামেরাটাকে বাঁচাতে কম্বলের নীচে রেখে এগিয়ে চললাম। একসময় আমরা খিতাউলি গেট দিয়ে ঢুকবার সেই জায়গাটায় এসে পৌঁছলাম, যেখানে আমাদের প্রত্যেকের আইডেন্টিটি কার্ড পরীক্ষা করে দেখা হলো। এবার আমরা প্রকৃত জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। গাইড আমাদের বেশি জোরে কথা না বলতে নির্দেশ দিলো।

মোরাম ঢালা লালচে রঙের মতো রাস্তা, দুপাশে হালকা জঙ্গুলে পথ দিয়ে খুব ধীরে আমাদের জিপসি এগিয়ে চলেছে। পরিস্কার আকাশ সুন্দর আবহাওয়া। অল্প কিছুটা পথ এগিয়েই, আমরা একটা শিয়াল ও দু’-তিনটে সম্বর হরিণের দেখা পেলাম। অনেকেই হয়তো শিয়ালের গল্প শুনে মুখ বাঁকাবেন, কিন্তু ছেলেবেলায় একসাথে অনেক শিয়ালের ডাক শুনে ভয় পাওয়া, বা শিয়ালকে দেখার যাঁদের সৌভাগ্য, হ্যাঁ আবার বলছি সৌভাগ্য হয়নি, তাঁরা জীবনের একটা সুন্দর স্মৃতি থেকে অবশ্যই বঞ্চিত হয়েছেন। এখন এই প্রাণীটিকে তো আর দেখাই যায় না। যাইহোক তিনি রাস্তা পার হওয়ার সময় আমাদের দিকে একবার মুখ তুলে তাকিয়ে চলে গেলেন। এরপর দু’-চারটে হরিণ ও পাখি ছাড়া বিশেষ কিছুই দেখার সুযোগ হলো না। একটা নীলগাইয়ের দেখা পেলাম, গাইডই সেটা আমাদের দেখালো। গির অরণ্যে যে নীলগাই দেখেছিলাম, সত্যিই সে নীল, রবিন ব্লুয়ের মতো নীল। জানি না সে মেকআাপ টেকআপ করে এসেছিল কী না, তবে এখানকার নীলগাইয়ের রঙ কিন্তু মোটেই অত তীব্র নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই, যে গাইডের তীক্ষ্ণ চোখ, জন্তু জানোয়ারের অবস্থান ও গতিবিধি সম্বন্ধে সম্যক ধারণা সত্যিই অবাক করার মতো।

কিছুটা পথ একা একা এগিয়ে যাওয়া, কখনও বা অন্য জিপসিদের পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া, আবার কখনও বা সামনের জিপসিদের এগিয়ে যেতে বলে নিজে একা জিপসি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া, এইভাবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। একটা জিনিস আমাদের চোখে পড়লো, অনেক জিপসিতেই ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্য কম্বল দেওয়া হয়নি। গতকাল এই খিতাউলি গেট ও মাগধি গেট দিয়ে যাঁরা জঙ্গল সাফারি করেছিলেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গেই মামা দেখা করেছিলেন। সব গেটের ট্যুরিস্টরাই সমমূল্য দিয়ে জঙ্গলে তাঁদের সাথে দেখা করতে আসেন এই বোধটা যদি মামাদের চরিত্রের মধ্যে বিরাজ করে, তাহলেই মুশকিল। আজ হয়তো তাঁরা তালা গেট দিয়ে প্রবেশ করা ভাগ্নে ভাগ্নীদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য সেই অঞ্চলে অবস্থান করছেন। একসময় উলটো দিক থেকে আসা একটা জিপসি এসে নিজেদের ভাষায় বিড়বিড় করে কি বললো কে জানে, আমাদের জিপসি হঠাৎ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বেশ খানিকটা পথ একা পরিক্রম করে একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। আর ঠিক তার পরেই মামার তীব্র কন্ঠস্বর কানে এসে বাজলো। একবার নয়, বার তিন-চার, আর তারপরে সব চুপচাপ। এ অভিজ্ঞতা আমার রণথম্বর জঙ্গলে হয়েছে, কাজেই না আঁচালে বিশ্বাস নেই। আরও বেশ কিছু সময় এখানে কাটিয়ে, গাইডের নির্দেশে জিপসি এগিয়ে চললো। উলটো দিক থেকে আগত জিপসিগুলোর ট্যুরিস্টদের নিরাশ মুখগুলো দেখে খারাপ লাগছে। ছোটছোট করে কাটা সাদা চুলের দুজন সাহেব মেম, দুজনে একটা জিপসি নিয়ে গাইড ও ড্রাইভারের সাথে ঘুরছেন। আমাদের গাইডের কাছে বাঘের গর্জনের কথা শুনে, তাঁদের জিপসি সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লো। আরও কিছুটা পথ পার হয়ে উলটো দিক থেকে আসা একটা জিপসির সাথে কথা বলে, আমাদের জিপসি হঠাৎ তার গতি অসম্ভব বাড়িয়ে দিলো। কি কথা হলো বুঝলাম না, তবে মনে হলো আশার আলো দেখা গেছে। কিছুটা পথ যাওয়ার পর দেখলাম এক জায়গায় চার-পাঁচটা জিপসি ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের জিপসিও সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পরেই কিছু হনুমান বা বাঁদরের ঘন ঘন ডাক শোনা গেল। রণথম্বরে দেখেছিলাম বাঘের গর্জনের ঠিক পূর্ব মুহুর্তে হঠাৎ সমস্ত পশুপাখির ডাক একসাথে বন্ধ হয়ে গিয়ে জায়গাটায় একটা শ্মশানের নীরবতা এনে দিয়েছিল। ওখানেই শুনেছিলাম যে বাঘ দেখা গেলে, সমস্ত পশুপাখি ভয় পেয়ে ডাকাডাকি বন্ধ করে দেয়। এখানে আবার আমাদের গাইড খুব নীচু গলায় জানালো বাঁন্দর ডাকছে, শের আসলে ওরা সবাইকে সাবধান করে দেয়। বাঁন্দরের মুখে ফুল কলা পড়ুক বলে প্রার্থনা করবো কী না ভাবছি, এমন সময় মামা তাঁর আগমন বার্তা শোনালেন। সবক’টা জিপসির আরোহী দম বন্ধ করে তাঁর আগমনের অপেক্ষা করছি, এমন সময় তিনি ডানদিকের জঙ্গলের গাছপালার পাশ থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে রাস্তায় উঠে জিপসিগুলোর মাঝখান দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে বামপাশের জঙ্গলে প্রবেশ করলেন। হাঁটার গতি এতটুকু কমালেন না, একবার মুখ তুলে আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করলেন না পর্যন্ত। প্রায় সকলেই দাঁড়িয়ে পড়ে ছবি তোলার চেষ্টা করলেও কারও ক্যামেরায় তিনি ধরা দিলেন, কারও ক্যামেরায় নয়। গাইড বাঘটার বংশ পরিচয় দিয়ে জানালো, যে বাঘটার বয়স চার, মোটামুটি ছয় বছর বয়সে ওরা পূর্ণতা পায়। গায়ের হলুদ রঙও আরও ঘন হয়ে যাবে। আমরা এগিয়ে গেলাম। জানা গেল একটি বাঘিনী ও তার চারটে বাচ্চাকেও নাকি প্রায়ই দেখা যায়। এরাস্তা ওরাস্তা ঘুরে ঘুরে নতুন করে বাঘের সন্ধান করে বিফল মনোরথে আমরা একটা মাঠের মতো ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়ালাম। আমাদের আগেই কয়েকটা জিপসি এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। খড় বা ওই জাতীয় কিছুর ছাউনি দেওয়া বেশ বড় দুটো দোকান। সামনে ট্যুরিস্টদের বসবার জন্য দিব্যি কাঠির খুঁটির ওপর তক্তা লাগানো কয়েকটা বেঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। কি না পাওয়া যায় সেখানে, আর পাওয়া যাবে নাই বা কেন, বাঘ দর্শনের থেকে চিপসের প্যাকেট কেনা, বা গরম চাউ খাওয়াতে তো সবার অনেক বেশি আগ্রহ লক্ষ্য করলাম। আমরা এখানে চা খেলাম। জিপসিগুলোর কিন্তু এই জায়গা ছেড়ে যাবার বিশেষ আগ্রহ দেখলাম না। অবশ্য জিপসির আরোহীদেরও যে কতটা আগ্রহ ভেবে বলতে হবে।

এখানে আরও কিছুটা সময় কাটিয়ে আমাদের জিপসি আবার এগিয়ে চললো। আমাদের গাইড অনেকবার একই কথা বলে গেল, যে সে আমাদের বাঘ দেখাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। সে সব সময় চায় যে তার সাথে যেসব ট্যুরিস্ট জঙ্গল সাফারিতে যায়, তাদের জীবজন্তু বিশেষ করে বাঘ দেখাতে। আমাদের আজ যে সে বাঘ দেখাতে সক্ষম হয়েছে, তাতে সে খুব খুশি। আরও অনেক জঙ্গুলে রাস্তা ও জলাশয়ের পাশ দিয়ে ঘুরেফিরে, আমরা এগিয়ে যাওয়ার সময় উলটো দিক থেকে আসা জিপসিতে সেই ছোট ছোট করে কাটা সাদা চুলের বিদেশি দুজনের সাথে আবার দেখা হলো। ওরা প্রায় আমাদের সাথে সাথেই ঘুরেছে, কিন্তু ওদের কপাল মন্দ ওরা আজ ব্যাঘ্র দর্শন না করেই ফিরে যাচ্ছে। আমরাও বুঝে গেলাম যে আজকের মতো আমাদের বন্যপশু দেখার পালা শেষ। তাও কোন গাছের উঁচু ডালে পেঁচা বসে আছে, কোথায় কোন জলাশয়ের ধারে অদ্ভুত দর্শন এক পাখি খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোথায় কোন গাছের ওপর ঈগল বসে আছে, গাইডই আমাদের খুঁজে খুঁজে সব দেখালো। এটা স্বীকার করতেই হবে, যে আমাদের আজকের সফরে পশুপাখি দেখাবার ব্যাপারে তার চেষ্টার কোন খামতি ছিল না। প্রায় সাড়ে দশটা পৌনে এগারোটা নাগাদ খিতাউলি গেটের কাছে এসে পৌঁছলাম। বান্ধবগড়ের জঙ্গল আমায় জীবনে প্রথম জঙ্গলে বাঘ দেখার সুযোগ করে দিয়েছে এটা সত্য, তবু একটা কথা কিন্তু আমার মনে হলো, এই জঙ্গল করবেট, রণথম্বর, এমনকী আমাদের উত্তর বঙ্গের অনেক জঙ্গলের থেকে সৌন্দর্যে পিছিয়ে আছে। একসময় আমাদের জিপসি মগলির পার্কিং এলাকায় এসে দাঁড়ালো। জিপসি থেকে নেমে কম্বলটা ভাঁজ করে রাখার জন্য হাতে তুলে নিলাম। এখন বুঝতে পারলাম জিপসিতে বসে গায়ে দেবার জন্য ওগুলো ঠিক গায়ে দেওয়ার শালের মাপে তৈরি। জিপসি থেকে কম্বলগুলো তুলে নেওয়ার সময় একজন আমাকে জানালো, যে সে ভাঁজ করে দেবে আমায় আর কষ্ট করে এই কাজটা করতে হবে না। এতক্ষণে জানলাম যে কম্বলগুলো মগলি রিসর্টের বোর্ডারদের রিসর্ট থেকে দেওয়া হয়েছিল। এবার কিন্তু সত্যিই আবার মনে হলো যে দুজনের জন্য আড়াই হাজার টাকা দৈনিক নিয়ে এতো কিছুর ব্যবস্থাটা একটু অস্বাভাবিকই বটে। আমরা নিজ নিজ ঘরে চলে গেলাম।

একে একে চটপট্ স্নান সেরে তৈরি হয়ে, ক্যান্টিনে চা জলখাবার খেতে গেলাম। মালপত্র গোছানোই আছে কাজেই চিন্তা নেই। গাড়ি আসলেই জব্বলপুরের পথে পাড়ি দেবো। এখান থেকে জব্বলপুর ১৭০ কিলোমিটার মতো পথ শুনলাম। কাজেই গাড়ি এসে গেলে অযথা এখানে আর সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না। সাথে যথেষ্ট ড্রাই ফুড আছে, কাজেই যাওয়ার পথে কোন ধাবায় খেয়ে নেওয়া যাবে। রিসেপশনে ফাইনাল বিল মেটাতে গিয়ে শুনলাম গাড়ি এসে গেছে। বিল মিটিয়ে ঘরে ফিরে এলাম। রিসর্টের লোক ট্রলি করে আমাদের সমস্ত মালপত্র গাড়ির কাছে নিয়ে গেল। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন গাড়িটা দেখে বেশ পছন্দ হলো। ড্রাইভার ভদ্রলোকটিও বেশ ভদ্র। তিনি একে একে সমস্ত মালপত্র গাড়ির ছাদে গুছিয়ে রেখে গাড়ি ছেড়ে দিলেন। বিদায় বান্ধবগড় বিদায়, বিদায় মগলি রিসর্ট বিদায়, বিদায় মামাবাবু বিদায়, তোমাদের কথা সারাজীবন মনে থাকবে।

দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য রাস্তায় কোন একটা ধাবা বা হোটেলে গাড়ি দাঁড় করাবার কথা ড্রাইভারকে বলে দেওয়াই ছিল। আমাদের সাথে টুকটাক যথেষ্ট ড্রাইফুড থাকলেও, অনিশা মাঝ রাস্তায় একটা দোকানের কাছে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে গিয়ে একগাদা চিপস্, কোল্ড ড্রিঙ্কস্ ইত্যাদি কিনে নিয়ে এলো। এরপরে আর দুপরের খাবার খাওয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হলো না। তবু একসময় আমাদের নির্দেশ মতো ‘শ্রী ছায়া প্যালেস, হোটেল অ্যান্ড ভেজ রেস্টুরেন্ট’ নামে একটা হোটেলের সামনে ড্রাইভার তার গাড়ি দাঁড় করালো। সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে আমরা আবার এগিয়ে চললাম। অন্যান্য সব জায়গার মতো গাড়িতে বসেই জব্বলপুরেও একটা হোটেলের সাথে প্রাথমিক ভাবে কথা বলে ফাইনাল করা হলো। এখানেও স্টেশনের কাছেই হোটেল পছন্দ করা হলো, কারণ এখান থেকেই আমরা পাঁচমারি যাওয়ার জন্য পরশু দিন ট্রেনে পিপারিয়া চলে যাবো। আগামী কাল বিকালে জব্বলপুর থেকে সন্ধ্যার ফ্লাইটে অনিশার মুম্বাই ফিরে যাবার কথা ও টিকিট কাটা আছে। ইতিমধ্যে সম্পর্ণাকে তার কলেজের বন্ধুরা জানিয়েছে, যে আমাদের ফেরার আগেই তার কোন পরীক্ষার তারিখ পড়েছে। তারও ফিরে না গেলেই নয়, অতএব তারও একই দিনে আধঘন্টা আগেপরে কলকাতা যাওয়ার ফ্লাইটের টিকিট এরমধ্যে কেটে নেওয়া হয়েছে। কাজেই জব্বলপুরের পর থেকে আমরা চরজন বুড়োবুড়ি পাঁচমারি ও অমরকন্টক ঘুরে দেখবো। আমরা প্রায় জব্বলপুর পৌঁছে গেছি এমন একটা সময় ড্রাইভার জানতে চাইলো কোন হোটেলের সামনে সে গাড়ি নিয়ে যাবে। তরুণের কাছে হোটেলর নাম শুনে ড্রাইভার জানালো যে হোটেলটা ভালো, কিন্তু আজ রবিবার ওই রাস্তায় হাটের মতো বসে। আজ ওই রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করানো মুশকিল আছে। মুহুর্তের মধ্যে জ্যাম হয়ে যাবে। তরুণ ফোনে হোটেলের সাথে কথা বলতে শুরু করলে সে মোবাইলটা নিয়ে নিজে কথা বলে অসুবিধার কথা বললো। হোটেল থেকে জানালো, যে রাস্তার মোড়ে গাড়ি দাঁড় করালে হোটেলের ছেলেরা মালপত্র হোটেলে নিয়ে যাবে। আমরা আর এই হোটেলের সাথে কথা না বাড়িয়ে, ‘হোটেল অঙ্কিত’-এর সাথে থাকার ব্যাপারটা পাকা করে নিলাম। আমাদের গাড়ি একসময় হোটেল অঙ্কিতের সামনে এসে দাঁড়ালো। মালপত্র নামিয়ে গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হলো। হোটেলটা শুধু বড়ই নয়, বেশ ভালোও বটে। আজ আমাদের তিনটে ঘর লাগবে। আগামীকাল বিকালের দিকে অনিশা ও সম্পূর্ণা, দেশের পশ্চিম ও পূর্ব, দুজনে দুপ্রান্তে চলে যাবে। আগামীকাল চেক আউটের সময় একটা ঘর ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে বাকি সময়টা ওরা আমাদের সাথেই হোটেলে কাটিয়ে বিকেলে চলে যাবে, এই ব্যাপারটা হোটেলের সাথে পরিস্কার ভাবে কথা বলে নেওয়া হয়েছে। তিনতলার ওপর ব্যঙ্কোয়েট হলের পাশে পরপর তিনটি ঘর আমাদের দেওয়া হলো।

আজ মাঘী পূর্ণিমা। জব্বলপুরের ভেড়া ঘাটে পূর্ণিমার চন্দ্রালোকে নৌকাবিহারের স্বপ্ন দীর্ঘদিনের। আজ রাতে ভেড়া ঘাটে নৌকাবিহার করে সেই স্বপ্ন পূরণের আশা নিয়ে নৌকা বিহার কতক্ষণ খোলা থাকে খোঁজখবর নিতে একটু নীচের রিসেপশন কাউন্টারে গেলাম। কাউন্টারের ভদ্রলোক জানালেন, খোলা থাকে তবে সকালের দিকে যাওয়াই ভালো। রাতে কতক্ষণ খোলা থাকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি জানালেন অনেকক্ষণই খোলা থাকে। ওনার কথা বলার ভঙ্গি দেখে মনে হলো, উনি আন্দাজে বলছেন। আগামীকাল আর সম্ভব হবে না, তাই যেতে হলে আজই যেতে হবে। এদিকে অনিশার হঠাৎ শরীরটা খারাপ হয়ে জ্বর এসে যাওয়ায়, অনিশার বারণ সত্ত্বেও সীমা তার সাথে হোটেলেই থেকে যাওয়া মনস্থ করলো। আমি ও তরুণ রাস্তায় গিয়ে একটা গাড়ির সাথে কথা বললাম। সেও জানালো বোট রাইডিং খোলা থাকে। শেষপর্যন্ত তার সাথে পাকা কথা বলে, তার মোবাইল নাম্বার নিয়ে, একটু পরেই আমরা আসছি জানিয়ে হোটলে ফিরে আসার সময় ড্রাইভার জানালো, যে সে আর কোন খদ্দের না নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে।

হোটেলে ফিরে নেট খুলে ভালোভাবে পড়ে দেখা গেল, সন্ধ্যা সাড়ে ছটা পর্যন্ত বোট রাইডিং খোলা থাকে। এরপরে আর অত টাকা খরচা করে ঝুঁকি নেওয়ার কোন মানে হয় না, তাই ফোন করে গাড়িটাকে আজ আর না যাওয়ার কারণ জানিয়ে বারণ করে দিলাম। ঠিক হলো আগামীকাল সকালে আমরা সবাই একসাথেই যাবো, ওখানে স্পটে গিয়ে যদি দেখি রাতে খোলা থাকে, তবে সন্ধ্যার পরে অনিশা ও সম্পূর্ণাকে বিমান বন্দরে ছেড়ে দিয়ে ফিরে এসে, আমরা চারজন ভেড়া ঘাটে একটা গাড়ি নিয়ে চলে যাবো। ব্যাস আজ আর হাতে কোন কাজ রইলো না। বেড়াতে এসে এইভাবে হোটেলের ঘরেও বসে থাকতে ভালো লাগে না। আমি ও তরুণ রাস্তায় খানিক ঘোরাফেরা করে হোটেলে ফিরে এলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম কোন বাস বা গাড়ি ভাড়া করে পাঁচমারি চলে যাবো। কিন্তু শেষপর্যন্ত ১৭৭ কিলোমিটার দূরের পিপারিয়া পর্যন্ত ট্রেনে চলে গিয়ে, সেখান থেকে কোন গাড়ি নিয়ে পাঁচমারি চলে যাওয়াই কম খরচায় আরামদায়ক যাওয়া ও বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে স্থির করা হলো। সেইমতো সকাল ছ’টা চল্লিশের ১১২৭২ নম্বর বিন্ধ্যাচল এক্সপ্রেসের তিনটি সাধারণ থ্রী ট্যায়ার স্লীপারে ক্লাসের কনফার্ম টিকিট তিনশ’ আটাত্তর টাকা দিয়ে হোটেলে বসেই কেটে ফেলা হলো। সকাল দশটা বেজে চার মিনিটে পিপারিয়া পৌঁছনোর কথা। সকালবেলা সাড়ে তিন ঘন্টার জার্নির জন্য স্লীপার ক্লাসের প্রয়োজন না থাকলেও, সকালবলায় ভীড় হলে মালপত্র নিয়ে সাধারণ কামরায় ওঠা ঝুঁকিসম্পন্ন হতে পারে। আজ অনেক ভোরে ওঠা ও সারাদিনের জার্নিতে কমবেশি সবাই বেশ ক্লান্ত। তার ওপর ওষুধ খাওয়ার পরেও অনিশার জ্বরটা কমেনি। একসময় রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে একটু তাড়াতাড়িই যে যার বিছানায় চলে গেলাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের দশ তারিখ। সকালে উঠেই খবর নিয়ে জানলাম যে অনিশা এখনও ঘুমচ্ছে, তার গায়ে যথেষ্ট জ্বর আছে। সীমা আগে একবার জব্বলপুর এসেছে, ভেড়া ঘাটে নৌকাবিহারও করেছে। তাই আজ সে অনিশার কাছেই থেকে যাওয়া স্থির করলো। অনিশা এখনও ঘুমচ্ছে, তাছাড়া সন্ধ্যার ফ্লাইটে তাকে একা একা মুম্বাই গিয়ে সেখান থেকে থানে যেতে হবে। কাজেই তার একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। শেষপর্যন্ত আমরা চারজন জব্বলপুর ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত পাকা করে জলখাবার খেয়ে একটা অটো ঠিক করে ঘুরতে বেড়লাম। অল্প বয়সি ছেলে, আটশ’ টাকা ভাড়া চেয়েছিল, তবে শেষপর্যন্ত সাতশ’ টাকায় রফা হলো। সে আমাদের সময় নিয়ে ভালভাবে ঘুরিয়ে দেখাবার প্রতিশ্রুতি দিলো।

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আমাদের ব্যালেন্সিং রকে নিয়ে গিয়ে হাজির করলো। এইজাতীয় ব্যালেন্সিং রক্ আগেও কয়েক জায়গায় দেখার সুযোগ হয়েছিল। পাশে এই রক্ সম্বন্ধে দুচার কথায় বক্তব্য লেখা একটা বোর্ডও টাঙানো আছে দেখলাম। ঘুরেফিরে দেখে অটোতে চেপে বসলাম। এবার সে সোজা ভেড়া ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। বেশ খানিকটা পথ যাওয়ার পরে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুলিশ আমাদের অটোটাকে বাঁদিকে একটা খোলা জায়গায় অটো নিয়ে যাবার জন্য নির্দেশ দিলো। এখানেই ভেড়া ঘাট থানা। খোলা জায়গাটার বাঁদিকে সম্ভবত কোন বিমান সংস্থার অফিস। তার বাইরে লাল রঙ দিয়ে ইংরেজিতে TRAFFIC POLICE JABALPUR লেখা হলুদ রঙের বোর্ড দাঁড় করানো আছে। বাইরে খোলা জায়গাটায় একটা টেবিল চেয়ারে একজন ডাকাতে কালীর পূজারীর মতো ষণ্ডা মার্কা (?)মানুষ, পুলিশের পোষাক পরে মিঠেকড়া রোদে মকড়সার মতো জাল বুনে খাতা পেন রসিদ ইত্যাদি নিয়ে দোকান খুলে বসেছেন। কথাবার্তায় মনে হলো লোকটির নাম বা পদবি পান্ডে, এবং তিনি বাঁহাতে শুধু ঘুষই নেন না, লেখেনও বটে। ব্যবসাটা ঠিক সাদা নয়, তাই বোধহয় বোর্ডটার সব অক্ষর লাল রঙে লেখা থাকলেও, JABALPUR এর প্রথম A অক্ষরটি সুন্দরভাবে কালো রঙে লেখা। তা সে যাইহোক, গতকালই বাঘ দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। বাঘে ছুঁলে শুনেছি আঠারো ঘা, তাও খিদে না পেলে সে আবার নাকি ছোঁয়ও না, এবং সেটা সর্বত্র প্রযোজ্য। কিন্তু সারাটা দেশে এই নেকড়ের মতো ওত পেতে বসে থাকা জীবটির আবার সুযোগ পেলেই খিদে পায়, আর ছুঁলেও নকি ছত্রিশ ঘা। ফলে জালে পড়া সমস্ত অসহায় গাড়ি ও বাইককে এই মাকড়সাটিকে প্রণামী দিয়ে ছাড়া পেতে হচ্ছে। তবে এই লোকটির শরীরে শুধু লোভ নয়, লেশমাত্র দয়ামায়াও আছে। তাই টাকা নিয়ে সবটা নিজের পকেটে না পুরে, প্রসাদ হিসাবে সামান্য টাকার একটা রসিদও কেটে দেন। দেখা গেল এই খবর করোনা ভাইরাসের থেকেও দ্রুত ছড়িয়ে পরে। মুহুর্তের মধ্যে স্বচ্ছ ভারত অভিযানের দাপটে রাস্তার দুদিক থেকেই অটো যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের অটোটার কাগজপত্রে কিছু গোলমাল ছিল, তাই তার কাছ থেকে পাঁচশ’ টাকা জরিমানা করে দু’শ টাকার একটা রসিদ দেওয়া হলো। অটো চালকের হাতে যথেষ্ট টাকা না থাকায়, আমাদের কাছ থেকে সাতশ’ টাকা ভাড়ার মধ্যে পাঁচশ’ টাকা অগ্রিম নিয়ে নেকড়ে দেবতাটিকে খুশি করে অটোয় ফিরে এসে চলকের আসনে বসলো। ধন্য রাজা, ধন্য দেশ, ধন্য দেশের শ্বাপদের ন্যায় রক্ষাকর্তার জাত। একসময় আমরা ভেড়া ঘাটের কাছে গিয়ে উপস্থিত হলাম।

এখানে এসে প্রথম যে খবরটা পাওয়া গেল, ত্রিশ মিনিটের জন্য বোট রাইডিং হয় এবং প্রতিদিন সন্ধ্যা ছ’টায়  শেষ বোট রাইডিংয়ের জন্য টিকিট দেওয়া হয়, অর্থাৎ সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টার পরে কাউকে নৌকায় থাকতে  দেওয়া হয় না। এখন একমাত্র অক্টোবর মাসের পূর্ণিমায়, রাতে নৌকাবিহারের অনুমতি দেওয়া হয়। ফেব্রুয়ারী ছাড়া প্রতিমাসের পূর্ণিমার রাতে অনুমতি দিলেও আমাদের কোন লাভ নেই, তবে মনে হলো ওরা অক্টোবর মাস বলতে পূজোর সময়ের কথা বলতে চেয়েছে। বোর্ডে দেখলাম নিজেরা ছোট বোট রিজার্ভ করলে আধ ঘন্টার জন্য আটশ’ টাকা ভাড়া লাগে। একটু দরদাম করে বুঝলাম এই আটশ’ টাকা থেকে আট পয়সাও কমানো সম্ভব নয়, অতএব চার জনের জন্য আটশ’ টাকাতেই রাজি হতে হলো। ছয়জন আসলেও ওই একই টাকা ভাড়া দিতে হতো। ঘাটের পাশেই একটা দোকান থেকে চা খেয়ে বোটে গিয়ে গুছিয়ে বসলাম। দুটি অল্প বয়সি ছেলে দাঁড় টানছে, অপরদিকে একজন হাল ধরে বসে আছে। তাদের মধ্যে একজন কবিতার ছন্দে দুপাশের বিশেষ বিশেষ দেখার জায়গাগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে দিতে যাচ্ছে। সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু নয়, একজায়গায় পাথরটা অনেকটা একটা উলটে যাওয়া মারুতি গাড়ির মতো, কোথাও একটা ব্যাঙের মতো, বা কোথাও খাজুরাহোর মন্দিরের মতো ইত্যাদি ইত্যাদি। দুপাশের পাহাড়ের গঠন ও রং সত্যিই অসাধারণ, তবে আমার ধারণা ছিল, যে পাথরের রঙে আরও বৈচিত্র দেখা যাবে। সাদা রঙের পাথরেও শুনলাম আগের মতো ঔজ্জ্বল্য নেই। একটা জায়গা পর্যন্ত গিয়ে নৌকার মুখ ঘোরাতে শুরু করলেই আমরা আরও খানিকটা নিয়ে যেতে অনুরোধ করলাম, মাঝিরা জানালো যে যাত্রীদের এই পর্যন্ত নিয়ে আসার কথা এবং সেই হিসাবেই নৌকার ভাড়া ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এরপর নিয়ে গেলে মাথাপিছু অতিরিক্ত একশ’ টাকা করে লাগবে। উপায় নেই, দীর্ঘদিনের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সাড়ে সাতষট্টি বছর বয়সে এই জায়গায় আসার সুযোগ হয়েছে, এখন সামান্য টাকার জন্য ফিরে যেতে মন চাইলো না। একটা জায়গায় জোরে চিৎকার করলে ইকো হয় শুনে, মনের আনন্দে ফুল ভলিউমে দু’কলি গাইতে গিয়ে গলা ভেঙে গেল। এক জায়গায় দেখলাম অনেকটা ওপরে পাথরের ওপর কয়েকটা বাচ্চা ছেলে বসে আছে। পয়সা দিলে ওরা ওই উচ্চতা থেকে জলে ঝাঁপ দিয়ে পর্যটকদের খুশি করে, আনন্দ দেয়। রুজি-রোজগারের জন্য মানুষকে কি না করতে হয় ভেবে অবাক হলাম। এই জাতীয় মরণঝাঁপ অবশ্য আমি আগেও অন্যত্র দেখেছি। যাইহোক,  একসময় আমরা আবার ঘাটে ফিরে এসে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। এখানে আমার ওনার কল্যানে তিন-তিনটে সাদা পাথরের গণেশ চন্দ্র আমার ঘাড়ে চাপলেন। আরও কিছু হয়তো সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার বাসনায় দোকানে দোকানে ঘুরঘুর করছিলেন, কিন্তু আমার তাড়া খেয়ে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে চলে আসলেন। কাছেই একটা দোকানে দেখলাম গরম গরম আলুর বড়া ভাজছে, তাই খানিক কিনে খাওয়া হলো, শরীরটাকে তো রাখতে হবে। অটোয় গিয়ে বসলাম, আমাদের গন্তব্য এবার চৌষট্টি যোগিনী মন্দির। মন্দির অনেকটা ওপরে তাই বেশ কিছুটা হাঁটতে হবে। কেউই সেখানে যেতে বিশেষ উৎসাহ না দেখানোয় খানিক ঘুরেফিরে অটোয় গিয়ে বসলাম। এবার আমরা আজকের শেষ দ্রষ্টব্য, ধুয়াধার ফলস্ দেখতে যাবো।

একসময় আমরা ধুয়াধার জলপ্রপাতের কাছে এসে নামলাম। ভেড়া ঘাটে মার্বেল রকের মধ্যে দিয়ে নর্মদা নদীর যাত্রাপথে প্রায় ত্রিশ মিটার ওপর থেকে এই জলধারা আছড়ে পড়ছে। বেশ কিছুটা দূরত্ব থেকে এই জলধারার গর্জন শোনা যায়। এই জলপ্রপাতের অঞ্চলটা ধোঁয়ার মতো দেখতে লাগে। এখানে রোপওয়ের ব্যবস্থাও আছে। নর্মদার পূর্ব তীর থেকে ধুয়াধার জলপ্রপাত দেখে পশ্চিম তীরে গিয়ে নামা, আবার একইভাবে ফিরে আসার ব্যবস্থা। অসাধারণ সুন্দর এই জলপ্রপাত। আমাদের দেশের অনেক পার্বত্য এলাকাকে ভারতের সুইৎজারল্যান্ড আখ্যা দেওয়ার মতো কিনা জানি না, তবে ধুয়াধার জলপ্রপাতকে নাকি ভারতের নায়াগ্রা বলে উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘক্ষণ এখানে কাটিয়ে দিলাম। এখান থেকে ফিরে, আমাদের স্নান সেরে খেয়েদেয়ে তৈরি হয়ে জব্বলপুর বিমান বন্দরে অনিশা ও সম্পূর্ণাকে পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে। এখানকার রোপওয়ে দুপুরের দিকে আধ ঘন্টা মতো বন্ধ থাকে, তাই আর সাহস করে চাপার ঝুঁকি না নিয়ে, আমরা হোটলের পথ ধরলাম। একসময় আমরা নির্বিঘ্নে হোটেলে এসে পৌঁছলাম। বেচারা অটো ড্রাইভারের স্বচ্ছ ভারতের ধারক, বাহক, ও রক্ষক পূজার প্রসাদ খাতে অনেকগুলো টাকা ব্যয় হয়ে গেছে, তাই কথামতো সাতশ’ টাকার পরিবর্তে তাকে আটশ’ টাকাই দিয়ে দিলাম।

হোটেলে ফিরে শুনলাম অনিশার শরীর অনেকটা ভালো। হোটেলের একটা ঘর সকালেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা স্নান সেরে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। বিকালের দিকে দুমনা বিমান বন্দরে যাওয়ার জন্য একটা ওলা না উবের বুক করা হলো। গাড়ি এসে গেলে ওদের দুজনের মালপত্র নিয়ে গাড়িতে উঠতে গিয়ে কলকাতার ট্যাক্সি ড্রাইভারের মতো এক পরিচিত গল্প শুনলাম, বিমান বন্দরে গেলে ফাঁকা ফিরতে হবে, তাই ওদিকে যাবো না। সময় নষ্ট না করে তিনশ’ টাকা ভাড়া দিয়ে একটা অটো নিয়ে আমি ও তরুণ ওদের দুজনকে নিয়ে রওনা দিলাম। বেচারা অনিশা অতো টাকা খরচা করে মাত্র তিন দিনের জন্য এসেও জব্বলপুর ঘুরে দেখতে পারলো না। তবু একটাই সান্ত্বনা, ওর যে কারণে এতদূরে আসা, সেই বান্ধবগড় জঙ্গলে ওর মামার সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয়েছে। একসময় আমরা দুমনা বিমান বন্দরে গিয়ে হাজির হলাম। এখান থেকে হোটেলে ফেরার গাড়ি পাওয়া মুশকিল, অটোটাও খদ্দের পাবে বলে মনে হয় না, তাই তাকে একটু অপেক্ষা করতে বললাম। ওরা দুজনে বিমান বন্দরের ভিতরে ঢুকে গেলে আমরা অটোয় চেপে হোটেলের পথ ধরলাম, ফেরার সময় ও অবশ্য দুশো টাকায় রাজি হয়ে গেল।

সকালেই জানা হয়ে গেছে, যে সন্ধ্যার পরে ভেড়া ঘাটে গিয়ে নৌকা চাপার কোন সুযোগ নেই, কাজেই ফিরে এসে চা খেয়ে টুকটাক গিফ্ট্ আইটেম কেনার জন্য আমরা চারজন একটা অটো ধরে সদর মার্কেটে গিয়ে হাজির হলাম। আমাদের কপাল মন্দ। আজ সোমবার, আজ সদর মার্কেট এলাকার সব দোকান বন্ধ থাকে। কি আর করা যাবে, তবু যদি কিছু পাওয়া যায় ভেবে, একটা দোকান থেকে গরম গরম শিঙাড়া, শনপাপড়ি, আর চা খেয়ে হাঁটতে হাঁটতে এগলাম। কিছুটা এগিয়ে আলো দিয়ে সাজানো একটা মসজিদ দেখলাম, তবে তার সামনের অংশে মেরামতির কাজ হওয়ায় ভালো করে দেখা বা ছবি তোলার সুযোগ হলো না। এবার আমরা পাশেই একটা কালী মন্দিরে গেলাম। মন্দিরটা বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, ও সুন্দর। বিরাট দলবল নিয়ে রীতিমতো ঢাক ঢোল পিটিয়ে ফুল দিয়ে সাজানো একটা গাড়ির পিছন পিছন অনেকে এসে হাজির হলো। হাতে বেশ কিছু সুতোয় বাঁধা ফোলানো বেলুন নিয়ে বর গাড়ি থেকে নেমে কালী মূর্তিকে প্রণাম করে বিয়ে করতে গেল। আমাদের সেরকম কিছুই কেনার সযোগ হলো না। এখান থেকে আমাদের হোটেল খুব একটা দূরে না হলেও, দুজন হাঁটু সংক্রান্ত রোগিণীকে নিয়ে হেঁটে ফেরা বেশ অসুবিধাজনক। এদিকটায় আজ দোকানপাট বন্ধ বলে গাড়ির সংখ্যাও বেশ কম, শেষে একটা অটো ধরে হোটেলে ফিরে এলাম। মহিলারা হোটেলে ঢুকে গেলে আমি ও তরুণ গেলাম জব্বলপুর রেলওয়ে স্টেশনে কাল ভোরের ট্রেনটা সম্বন্ধে একটু খোঁজখবর নিতে। স্টেশনটি বেশ সাজানো গোছানো। ঠিক সামনে, রাস্তার পাশে একটা রেল ইঞ্জিনকে রঙিন আলো দিয়ে সাজিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে, আর তার পাশেই একটা সুন্দর ফোয়ারা। বিভিন্ন রঙের রঙিন আলোয় ফোয়ারাটা ওই অঞ্চলটাকে আলোকোজ্জ্বল করে রেখেছে। হোটেলে ফিরে এসে সব মালপত্র গোছগাছ করে রাখলাম। কাল খুব ভোরে ট্রেন, তাই আজ একটু তাড়াতাড়িই খেয়েদেয়ে বিছানা নিলাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের এগারো তারিখ। বেশ ভোরে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে মালপত্র নিয়ে একতলায় রিসেপশনে এলাম বিল মেটাতে। বিল মিটিয়ে একটা অটো ধরে জব্বলপুর রেলওয়ে স্টেশনে এসে ট্রেনের প্রতীক্ষা। বোর্ডে দেখলাম ছ’টা বেজে চল্লিশ মিনিটের ১১২৭২ নম্বর বিন্ধ্যাচল এক্সপ্রেস সামান্য বিলম্বে  দৌড়াচ্ছে। খুব ভালো কথা, ট্রেন তার মর্জিমতো দৌড়াক, কিন্তু একই বোর্ডে বিলম্বের পরিমাণ হিন্দীতে একরকম ও ইংরেজিতে ভিন্নরকম কেন দেখাচ্ছে, আজও জানার সুযোগ হলো না। শেষপর্যন্ত ট্রেন এসে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালে আমরা নির্দিষ্ট জেনারেল থ্রী টায়ার স্লীপার বগিতে গিয়ে উঠলাম। সাড়ে তিন ঘন্টারও যাত্রাপথ নয়, সকাল দশটা বেজে পাঁচ মিনিটে আমাদের গন্তব্য স্টেশন, পিপারিয়াতে পৌঁছনোর কথা, তবু মালপত্র নিয়ে ট্রেনে উঠে বসার জায়গা না পেলে বিপদ হতে পারে ভেবে, থ্রী টায়ার স্লীপারের টিকিট কাটা। যাহোক্, শেষপর্যন্ত গুছিয়ে বসা গেল। আমাদের অধিকারে জমিজমা অনেক হলেও, বাস করার লোক সংখ্যা মাত্র চার। সেই সুযোগে আমাদের জমিতে দিব্য জায়গা করে একজন স্থানীয় দেহাতি মহিলা গেড়ে বসেছেন। তা বসেছেন বসুন আপত্তি করার কোন প্রশ্নই ওঠে না, কারণ প্রতি স্টেশনে পিলপিল করে এই রিজার্ভ বগিতে লোক উঠছে আর এই মহিলাটি রীতিমতো ব্ল্যাক ক্যাটের মতো তাদের প্রতিরোধ করে, পাশের থ্রী টায়ার স্লীপার বগিতে চলে যেতে বাধ্য করছেন। যাঁরা যাচ্ছেন না, তাঁদের আমাদের জায়গায় বসা থেকে তিনিই বিরত করছেন। কাজেই ট্রেনে বেশ ভিড় হলেও আমাদের কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। মাত্র ১৭৭ কিলোমিটার পথ, দেখতে দেখতে একসময় আমরা পিপারিয়া পৌঁছে গেলাম। দুজন যুবকের সাহায্য নিয়ে মালপত্র সমেত নির্বিঘ্নে স্টেশন প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়লাম। প্রতিবারের মতো এবারেও কয়েকটা হোটেলের সাথে কথা বলে, শেষপর্যন্ত ‘হোটেল হিমালয়া’ নামক একটা হোটেলের সাথে মোটামুটি একটা পাকা কথা হলো।

পিপারিয়া থেকে পাঁচমারি সম্ভবত বাষট্টি কিলোমিটার মতো পথ। হোটেল মালিক আমাদের জানালেন যে স্টেশনের বাইরে কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে, তবে আমরা বললে তিনি ফোন করে ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। তাই হলো, অনেক দরদাম করে নয়শত টাকা ভাড়ায়, আমরা যে প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থেকে নেমেছি, ওভারব্রিজ পার হয়ে তার অপর দিকে একটা বড় গাড়িতে গিয়ে বসলাম। গাড়িটা বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, ড্রাইভরটিও বেশ ভদ্র। গাড়ি ছাড়ার সময় তাকে কোন একটা জায়গায় জলখাবার খাওয়ার জন্য গাড়ি দাঁড় করাতে বলে দেওয়া হলো। প্রায় দশ-বারো কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে, মাতকুলি নামে একটা জায়গায় ‘সাই ফ্যামিলি ধাবা’ নামে একটা ধাবায় গাড়ি দাঁড় করানো হলো। সুন্দর বাগান ও বিভিন্ন ফুলগাছ দিয়ে সাজানো বেশ বড় এই ধাবাটা দেখে ভালো লাগলো। খাবার তৈরি হওয়ার ফাঁকে, বাগানটা ঘুরে দেখে কিছু ছবি তুলে এলাম। গরম গরম রুটি দুরকম সবজি আর স্যালাড দিয়ে প্রাতরাশ সারা হলো। এখন পর্যন্ত সর্বত্র দেখেছি, রুটি পরোটা নিলে না চাইতেই এক প্লেট স্যালাড দেওয়া হয়। না, আমার কথা এখনও শেষ করিনি। স্যালাড বলতে কিন্তু শসা, গাজর, বিট, টম্যাটো লেটুস ইত্যাদি নয়, স্যালাড বলতে শুধু একগাদা মোটা মোটা করে কাটা সাদা রঙের মুলো। খুব দয়ালু ব্যক্তির দোকান হলে, ভালো করে খুঁজে দেখলে, টম্যাটোর কিছু অণু পরমাণু পাওয়া গেলেও যেতে পারে। এই ধাবাটার খাবার কিন্তু খুবই ভালো। খাওয়াদাওয়া শেষে আবার গাড়িতে গিয়ে বসা। পথে একটা নদী পড়লো, ড্রাইভার জানালো নদীটির নাম ‘দেনবা’। একসময় আমরা পাঁচমারির হোটেল হিমালয়ার সামনে এসে দাঁড়ালাম।

হোটেলটার মালিক একজন মুসলিম। ব্যবহার বেশ ভালো। ভদ্রলোক একটা বছর বারোর আদিবাসী বাচ্চা ছেলেকে ডেকে, আমাদের দোতলায় পাশাপাশি দুটো ঘরে নিয়ে যেতে বললেন। আটশো টাকা করে প্রতিদিন ভাড়ার ঘরগুলো চলনসই বলা-ই বোধহয় ঠিক হবে। গিজার লাগানো অ্যাটাচড্ বাথ ঘরদুটো এমনি বড়, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, চব্বিশ ঘন্টা অফুরন্ত জলের ব্যবস্থা থাকলেও, এ যাবৎ যতগুলো হোটেলে থেকেছি, তার মধ্যে নিকৃষ্টতম। হয়তো ওই বাচ্চা ছেলেটাকে ফাইফরমাস খাটা থেকে ঘরদোর পরিস্কার পর্যন্ত একাহাতে সব সামলাতে হয় বলেই, কিছু কিছু সমস্যা থেকে গেছে। আমরা যদিও আজ ও কাল, এই দুটো দিন এখানে থাকবো, তবু পাঁচমারি ঘুরে দেখার পক্ষে সময়টা যথেষ্ট নয়। কাজেই হোটেলের পিছনে বৃথা সময় নষ্ট না করে, মহিলাদের স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিতে বলে, আমি ও তরুণ নীচের রিসেপশন কাউন্টারে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করতে গেলাম। হোটেল মালিকের সাথে পাঁচমারি ঘুরে দেখার ব্যাপারে কথা হলো। এখানেও সমস্যা, যদিও আগে কোথাও পড়িনি বা শুনিনি, এখানে এসে শুনলাম যে বুধবার আবার সাতপুরা টাইগার রিজার্ভ অর্ধদিবস খোলা থাকে। আজ মঙ্গলবার, জঙ্গল ঘুরে দেখার পক্ষে যথেষ্ট সময় হাতে নেই, তাই আজ কিছু দ্রষ্টব্য স্থল ঘুরে দেখার পরিকল্পনা পাকা করে ফেলা হলো। আগামীকাল জঙ্গলের পথে যতটুকু দেখা যায় দেখে, বাকিটা ঘুরে দেখার কথা পাকা করে ঘরে ফিরে এলাম। যত শীঘ্র সম্ভব সকলে স্নান সেরে তৈরি হয়ে নীচে নেমে দেখলাম রিসেপশন ফাঁকা, হোটেল মালিকও নেই, গাড়ি বা গাড়ির ড্রাইভারও নেই। সবেধন নীলমণি সেই বাচ্চা ছেলেটা একা কুম্ভের মতো, হোটেল আলো করে সোফায় বসে হোটেল পাহারা দিচ্ছে। গাড়ির ব্যাপারে সে কিছু বলতে না পারায়, হোটেল মালিককে ফোন করা হলো। তিনি জানালেন, যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই হোটেলের সামনে জিপসি এসে পৌঁছে যাবে।

অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই সেলিম নামে এক যুবক তার জিপসি নিয়ে হাজির হলো। মুর্শিদাবাদে বাড়ি, বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন, অবসরের পর পাঁচমারিতেই পাকাপাকিভাবে বসবাস করেন। সেলিম এই জিপসিটার মালিক, নিজেই চালায়। বাংলায় কথা বলার সুযোগ পেয়ে ভালো লাগলো। সময় নষ্ট না করে সে গাড়ি ছেড়ে দিলো। অত বড় জিপসিতে সেলিম ছাড়া আমরা মাত্র চারজন, হাত-পা ছড়িয়ে আয়েশ করে বসে প্রথমেই গেলাম ‘হান্ডি খো’। গভীর ঘন জঙ্গলে ঢাকা প্রায় তিনশ’ ফুট এই গর্ত বা চৌবাচ্চার মতো ভয়ংকর খাদটি দেখলে, অনেকেরই মাথা ঘুরতে পারে। শোনা যায় অতীতে এখানে একটি লেক বা জলাশয় ছিল, এবং ভগবান শিবের পূজা হতো। তবে এখানে এসে সেলিম এটাকে সুইসাইড পয়েন্ট হিসাবে পরিচয় দিল। হান্ডি নামে এক অত্যাচারী ইংরেজের অত্যাচারে এখানে অনেকেই নাকি ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। আবার এও শোনা গেল, যে হান্ডি বা হাড়ির মতো আকৃতির এই খাদে হান্ডি নামক ইংরেজটি পড়ে গেছিলেন। এটাও হতে পারে, কারণ এই খাদের দিকে ঝুঁকে তাকালে মাথা ঘুরে নীচে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। ঘটনা যাই হোক না কেন, হান্ডি খো নিঃসন্দেহে একটা মনে রাখার মতো স্পট।

এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রিয় দর্শিনী স্পটটি পড়লো, এটি ইকো পয়েন্ট নামেও পরিচিত। জানা গেল এই স্থানটি থেকে সূর্যদয় ও সূর্যাস্ত দেখার মতো। প্রাক্তন প্রধান মন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এখানে এসেছিলেন, তাই জায়গাটার নাম নাকি প্রিয়দর্শিনী রাখা হয়। সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত, কোনটাই আজ আর যখন দেখার সুযোগ নেই, তখন এগিয়ে যাওয়াই সমীচীন বলে মনে হলো।

অল্প বয়সি সেলিম নামে ছেলেটি বেশ ভদ্র ও মিশুকে। হয়তো বাংলায় কথা বলার সুযোগ পেয়ে সেও খুশি। সে জানালো, যে সে আমাদের এখন গুপ্ত মহাদেব দেখতে নিয়ে যাচ্ছে। সেরেছে, আবার মহাদেব? তাও আবার জাগ্রত নয় সুপ্ত নয় একবারে গুপ্ত? প্রোটিন খাওয়া ভালো ও শরীরের পক্ষে বিশেষ প্রয়োজন বলে শুনি, তার সাথে এও শুনি যে অতিরিক্ত প্রোটিন আবার শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। এবার মধ্যপ্রদেশ ট্যুরে আমাকে এতো বেশি দেবদেবীর সান্নিধ্যে আসতে হয়েছে, যে শরীরে ভক্তি রসের মাত্রাটা যেন প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে। উপায় নেই, পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। জিপসি এগিয়ে চললো। অল্প কিছুক্ষণ পরে আমরা গুপ্ত মহাদেবের আশ্রয়স্থলে এসে হাজির হলাম। গাড়ি দাঁড়ানোর জায়গা থেকে মহাদেবের আশ্রয় স্থলটি, বেশ কিছুটা হেঁটে যেতে হয়। কাছে গিয়ে মনে হলো মহাদেববাবুর বোধহয় জানা ছিল না, যে ‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে’। জায়গাটাতে বেশ কিছু নরনারীর জটলা। পাহাড়ের গায়ে বেশ কিছুটা উপর থেকে দাঁড়াবার জায়গা পর্যন্ত একটা খুব সরু ফাটলের মতো। বাঁপাশে একটু ওপরে বেদির মতো একটা জায়গায় গেরুয়া রঙের একটা হনুমানের মূর্তি। খালি পায়ে ফাটলের ভিতর দিয়ে কিছুটা গেলেই, একটা বদ্ধ গুহার মতো ঘর। গুহার শেষ প্রান্তে একটা শিবলিঙ্গের সামনে একজন বসে আছেন। তিনি ওই শিবলিঙ্গের মালিক না পুরোহিত বলতে পারবো না, তবে তাঁর সাহস আছে। ফাটলের মুখ থেকে দুপাশে পাহাড়ের দেওয়ালটা ঘরের মতো গুহাটা পর্যন্ত এতোটাই সরু, যে একজন একজন করে লাইন দিয়ে, তাও আবার পাশ ফিরে কোনরকমে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। পায়ের নীচের অংশ ঠিক সমতল না হলেও মসৃণ পাথরের হওয়ায়, সাবধানে হাঁটলে হোঁচট খাওয়ার বিশেষ একটা ভয় নেই। তবে দুপাশের পাথরে অনবরত বুকে পিঠে ঘষা খেতে হয়। পায়ের কাছ দিয়ে ভিতর পর্যন্ত অনেক তার ফেলে রাখা আছে। বিদ্যুৎ আছে, না বিদ্যুৎ আনার কাজ চলছে, ঠিক বোঝা গেল না। ভিতরের ভদ্রলোক কয়েকজনকে ভিতরে প্রবেশ করতে বলছেন, একে একে লাইন দিয়ে তারা প্রবেশ করলে, আগের কিছু দর্শনার্থীকে বেরিয়ে যেতে বলছেন। ভিতরের গুহায় লোকসংখ্যা খুব বেশি হলে অক্সিজেনের অভাব হতে পারে, তাই এই ব্যবস্থা। তবে ভিতরে ঢুকে একটা কথা মনে হচ্ছিলো, যে ভিতরে কিছু মানুষ থাকা অবস্থায় যদি ভূমিকম্প বা অন্য কোন করণে ফাটলের মুখ দু-চার ইঞ্চিও কমে যায়, তাহলে পাহাড় ফাটিয়ে তাদের বার করা ছাড়া, দ্বিতীয় কোন পথ খোলা আছে বলে মনে হয় না। ভিতরের ছবি তোলায় কোন বাধা নিষেধ না থাকলেও, ভিতরটা এতো অন্ধকার ও এতো অল্প সময় থাকার সুযোগ পাওয়া যায়, যে একবারে ফাঁকা সময়ে না গেলে, আমার মতো আনাড়ি ফটোগ্রাফারের পক্ষে পরিস্কার ছবি তোলা বেশ মুশকিল। যাইহোক একে একে আমরা নির্বিঘ্নে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাইরের গেরুয়া রঙের হনুমানেরও ছবি তুললাম। অনেকেই দেখলাম ফিরে না গিয়ে আরও বেশ কিছুটা পথ ভেঙে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন বড়া মহাদেবের মন্দিরে। জয় বড়া মহাদেবের জয়, কিন্তু তখনও কি স্বপ্নেও ভেবেছিলাম, যে সামনেই স্বয়ং আদি মহাদেব অপেক্ষা করে আছেন আমাদের পাকড়াও করার জন্য। এতদিন শুনে এসেছি শিবের আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য প্রয়োজন, নিষ্ঠা ভক্তি বিশ্বাস ইত্যাদি ইত্যাদি। সন্ধ্যার পর পূজা শেষে লুচি বা পরোটা, ফুলকপির তরকারি, নিজের জন্য কিনে আনা মিষ্টি ছাড়াও শিবের প্রসাদের ফলমূল মিষ্টি খেয়ে থাকলেও, শিবরাত্রির দিন সকাল থেকে জল পর্যন্ত পান না করে মহিলারা শিবের আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য সন্ধ্যার পরে শিব পূজা করেন। এখানে এসে বুঝলাম ওগুলো কোন ব্যাপারই নয়, শিবকে পেতে গেলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বারবার চটি জুতো খুলে হাঁটার কষ্ট স্বীকার করা ও ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়া।

আমরা আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম। একটা জায়গায় সেলিম আমাদের গ্রীন ভ্যালি দেখাবার জন্য গাড়ি দাঁড় করালো। বিস্তীর্ণ অঞ্চল সবুজ চাদরে ঢাকা অঞ্চল এই গ্রীন ভ্যালি। সবুজ বনাঞ্চলের প্রয়োজনীয়তা এই গ্রীন ভ্যালির সামনে দাঁড়ালে উপলব্ধি করা যায়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে প্রাকৃতিক শোভা দেখে ছবি তুলে আমরা আবার এগিয়ে চললাম, এগিয়ে চললাম উত্তর পাঁচমারির জটাশঙ্কর প্রাকৃতিক গুহা দর্শনে। জটাশঙ্কর গুহাটি খুব সুন্দর শুনেছিলাম, শঙ্কর বা শিব এখানকার আরাধ্য দেবতা। গাড়ি থেকে নেমে অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হয়। সুন্দর রাস্তা, পাহাড়ি নৈসর্গিক শোভাও খুব সুন্দর, কিন্তু সেই কাকভোরে উঠে বিশ্রামহীন সারাদিনের পথ চলায় সকলেই, বিশেষ করে মহিলারা যারপরনাই ক্লান্ত। তাছাড়া আজই তো প্রথম নয়, প্রায় বারোদিন ধরে একনাগাড়ে সময়মতো প্রয়োজনীয় খাদ্য, বিশ্রাম, ও ঘুমহীন এই একই রূটীন চলছে। তার উপর তাদের পক্ষে হাঁটার রাস্তা এবার বেশ কষ্টকর বলে বুঝতে পারায়, শেষপর্যন্ত গুহার প্রায় মুখ থেকেই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ফেরার পথে কলকাতা থেকে ঘুরতে আসা দুই বাঙালি মহিলার সাথে আলাপ হলো। জানা গেল যে বেশ বড় একটা দলের সাথে বড় গাড়ি নিয়ে তাঁরা ঘুরতে বেড়িয়েছেন, তবে তাঁদের দলের আর কেউ এই জটাশঙ্কর গুহা দেখতে না আসায়, তাঁরা দুজনেই চলে এসেছেন। তাঁদের কাছে জটাশঙ্কর গুহার সৌন্দর্যের কথা শুনে খারাপ লাগলেও, এই ট্যুরের সামনের অদেখা জায়গাগুলোর কথা ভেবে নিজেদের নেওয়া সিদ্ধান্তকেই সঠিক বলে বিবেচনা করলাম। ধীরে ধীরে একসময় জিপসির কাছে ফিরে এলে সেলিম গাড়ি ছেড়ে দিলো।

একসময় সেলিমের জিপসি অম্বামাই মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালো। অসাধারণ সুন্দর এই মন্দিরটিতে বিভিন্ন দেবদেবী স্থান পেয়েছেন। মূর্তিগুলি আকারে ছোট হলেও, রঙিন আলো দিয়ে খুব সুন্দর ভাবে সাজানো। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যেটা চোখে পড়ার মতো, সেটা এই মন্দিরের পরিচ্ছন্নতা। এখানে দেখলাম ফটো তুলতে দেওয়ার ব্যাপারে কোন অ্যালার্জি নেই। হোটেলে ফেরার সময় হয়ে গেছে, তাই ঘুরে ঘুরে অনেকক্ষণ ধরে দেখে ও ফটো তুলে সময় কাটিয়ে ফিরেই আসছিলাম, কিন্তু বেগম প্যালেসের বোর্ডটা দেখে ও সেলিমের কাছ থেকে বেগম প্যালেসের গল্প শুনে বুঝলাম, যে না দেখে ফেরা মুর্খামি। নীচে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এটার কিছুই  দেখা যায় না। ধীরে ধীর ওপরে উঠে প্যালেসের কাছে গিয়ে হাজির হলাম। দোতলা এই বাড়িটি যে বহু প্রাচীন বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না, তবে বর্তমানে এটি পরিতক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কোন ভৌতিক ছায়াছবির শুটিং-এর জন্য, এর থেকে ভালো স্পট পাওয়া যাবে বলে মনে তো হয় না। এই বাড়িটির ইতিহাস ঠিক পরিস্কার করে জানা না গেলেও যেটুকু শুনলাম বা বুঝলাম, সম্ভবত নরসিংগড়ের রানী বা বেগম দীর্ঘদিন আগে এই বাড়িটিতে একা বসবাস করতেন। তাঁর কোন সন্তান ছিল না, এমনকী তাঁকে দেখাশোনা করার জন্যও সেরকম কেউ না থাকায় তিনি তাঁর সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পদ, তাঁর কোন এক মন্ত্রী বা সেনাপতিকে দান করে দেন। কিন্তু যেকোন কারণেই হোক, এই সম্পত্তি দেখভাল বা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অযত্নে পড়ে থেকে থেকে, আজ এই অবস্থা হয়ে এক ভৌতিক বাড়ির রূপ নিয়েছে। তার ওপর গুপ্তধনের সন্ধানে এই বাড়ি বা তার আশেপাশে খোঁড়খুঁড়িও নাকি কম হয়নি। পুরাতত্ত্ব বিভাগ বর্তমানে বাড়িটির দেখভাল করলেও, বাড়িটি আজও অবহেলিত অবস্থাতেই পড়ে আছে, কারণ এই সম্পত্তিটির মালিকানা নিয়ে আজও নাকি আদালতে মামলা চলছে। এই গল্পের সত্যতা আমার জানা নেই, কাজেই বেগম সাহেবা   তাঁর বেগম প্যালেসে শান্তিতে থাকুন কামনা করে, ধীরে ধীরে নেমে এসে গাড়িতে উঠে বসলাম। ফেরার পথে একটা জায়গাকে সেলিম ইকো পয়েন্ট হিসাবে পরিচিত করিয়ে দিয়ে হোটেলের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছোটালো।

আগামীকাল সকাল সকাল তার গাড়ি নিয়ে হোটেলে আসতে বলে, আমরা হোটেলের ঠিক আগে গাড়ি ছেড়ে দিলাম। টুকটাক কিছু চা জলখাবার খেতে আমাদের এখানেই আবার আসতে হবে। তাছাড়া রাতের খাবারের ব্যাপারেও একটু খোঁজখবর করে যাওয়া প্রয়োজন। শহরটা এক চক্কর ঘুরে সব দেখেশুনে একটা জিনিস বেশ বোঝা গেল, এতো উপাদেও ও এতো রকমের জলখাবারের আয়োজন, রাস্তার বাঁদিকে একটা দোকানের মতো গোটা পাঁচমারিতে আর কোথাও নেই। সদ্য গরম তেলের বাথটবে স্নান সেরে আসা সামোসা, গাজরের হালুয়া, ও চা খেয়ে রাতের খাবারের হোটেলের সন্ধানে বেরোলাম। পাঁচমারিতে হিন্দুর সংখ্যা বেশি, তারওপর আবার স্বয়ং মহাদেব চন্দ্রের এলাকা, কিন্তু বাস্তবে দেখছি শহরাঞ্চলে প্রচুর মুসলিমের বাস। গোটা শহরটাই শাকাহারী। কিছু মুসলিম হোটেলে আমিষ খাবার পাওয়া গেলেও, হোটেলগুলো এতো ফাঁকা, যে বিক্রি হয় কী না, বা খাবারগুলো টাটকা কী না, ইত্যাদি চিন্তা করে পিছিয়ে গেলাম। জৈনদের হোটেল আছে বটে, কিন্তু সেগুলোও তো নিরামিষ। শেষপর্যন্ত আরও কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে আমিষের আশা ত্যাগ করে, কিছু শুকনো খাবার কিনে হোটেলে ফিরে এলাম। বেশ কিছুক্ষণ গুলতানি, মোবাইল ও ক্যামেরায় চার্জ দেওয়া, ও বিশ্রাম পর্বের শেষে আমি ও তরুণ আবার একবার বাইরে গিয়ে একটা হোটেল থেকে রুটি ও দুরকমের সবজি কিনে নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। মধ্যপ্রদেশের অনেকগুলো শহরই ঘুরে দেখা হলো, ডিম ছাড়া অন্য কিছু আমিষ খাদ্য খাওয়ার সুযোগ বিশেষ হয়নি। যাইহোক, সঙ্গে কাগজের থালা আছে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে খাওয়া দাওয়া সেরে নেওয়া গেল। কাল সকালে বেরোতে হবে, তাই আরও কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে বিছানায় আশ্রয় নিলাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের বারো তারিখ। তরুণের ডাকে ঘুম ভাঙলো বেশ ভোরে, সে চায়ের কাপ নিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে। মনে হলো আমার ভাণ্ডারে আর যতটুকু আয়ু আছে, তার অর্ধেক ওকেই আয়ু ট্রান্সফার করে দেই। ধীরে ধীরে একে একে সকলেই তৈরি হয়ে নীচে নেমে এলাম। হোটেলের মালিককে হোটেলে বিশেষ দেখা যায় না। ওনার দেখলাম অনেক রকম ব্যবসা, ফলে খুব ব্যস্তও বটে। ওনার ছেলে কাউন্টারে বসে। অল্প বয়সি ছেলেটির ব্যবহার, তার চেহারা ও মুখশ্রীর মতোই সুন্দর। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেলিম তার গাড়ি নিয়ে এসে হাজির হলো। আমরা উঠে বসলে গাড়ি ছেড়ে দিলো। এরপর কখন সুযোগ পাওয়া যাবে জানা নেই, তাই কোথাও একটা খেয়ে নেবার কথা তাকে প্রথমেই জানিয়ে রাখলাম। কথামতো সেলিম আমাদের একটা খাবারের দোকানে নিয়ে গেল। এই দোকানে খাদ্য বলতে একমাত্র ভাজাভুজিই পাওয়া যায়। খাবারের চাহিদা দেখে অবাক হয়ে গেলাম, রীতিমতো লাইন দিয়ে খাবার কিনতে হয়। আমরা পাঁচজন কিছু খেয়ে নিয়ে, জমিয়ে এক গ্লাস করে কফি খেয়ে যাত্রা শুরু করলাম।

আজ প্রথমেই সে আমাদের বী ফলস্ দেখাবার জন্য বাইসন লজ্ লেখা একটা গেটের কাছে একশ’ টাকা দিয়ে

জিপসি প্রবেশের অনুমতিপত্র নিয়ে, গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো। ভিতরে ঢুকে বাইসন লজ মিউজিয়াম লেখা একটা বোর্ডের পাশে, টিকিট কাউন্টারের সামনে নিয়ে গেল। আজ অর্ধেক সময় খোলা, তাই গাইডের কি প্রয়োজন জানি না, তবু কান্তি লাল গুপ্তা নামে একজন গাইডের চার্জ, ও বি ফলস্ দেখার অনুমতির জন্য কাউন্টারে মাত্র সাতশ’ ত্রিশ টাকা জমা দিতে হলো। গলায় মোটা চেন ও পান্না দিয়ে মোড়া হাতের মালিক, বিশাল চেহারার এই গাইডটি গাড়ির সামনে সেলিমের পাশে গিয়ে বসলো। তার নাকি পান্নার গহনা পরার সখ, বাড়িতে তাঁর কে কে আছেন, বা তাঁর আয়ের সোর্স বা অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন জানি না, তবে এটা মানতেই হবে যে তিনি তাঁর সখ পুরো মাত্রায় মিটিয়েছেন, এবং এখনও মেটাচ্ছেন। নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে জিপসিটা দাঁড়ালো, এখান থেকে হেঁটে যেতে হবে। বেশ জঙ্গুলে রাস্তা, গাইড কান্তি লাল গুপ্তা গভীর জঙ্গল ও এই বি ফলস্ নিয়ে আমাদের অনেক কিছু তথ্য জানাতে জানাতে সঙ্গে চললেন। এই ফলসের জল থেকেই নাকি সমস্ত পাঁচমারি শহরের খাবার জল সরবরাহ করা হয়। এখানে প্রচুর শাল গাছ আছে, আরও বেশ কিছু গাছের কথা উল্লেখ করে তিনি জানালেন, যে এই অঞ্চল থেকে প্রচুর ধুনো সংগ্রহ করা হয়। এখানকার গাছের ছাল নাকি খুব পুরু হয়, এবং গাছ এই ছালের মাধ্যমে অসময়ের জন্য জল সঞ্চয় করে রাখে। ফলে বৃষ্টি বা জলের অভাবে গাছগুলোর কোন ক্ষতি হয় না। প্রায় পঁয়ত্রিশ মিটার উচ্চতা থেকে নেমে আসা এই জলধারার একটা সরু অংশ, বিভিন্ন রঙের ছোট বড় পাথরের ওপর দিয়ে পার্বত্য নদীর মতো  বয়ে গেছে। এই জলধারার ওপর দিয়ে একটা কাঠের সাঁকো পেরিয়ে আমরা অপর পারে গেলাম। এই জলধরায় অজস্র ছোট ছোট মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাঁচমারিকে নাকি সাতপুরা রেঞ্জের রানী বলা হয়, এতক্ষণে এই বিশেষণের একটা কারণ খুঁজে পাওয়া গেল। যদিও গুপ্তাজী জানিয়েছিলেন যে এই জলধারার শব্দ অনেকটা দলবদ্ধ মৌমাছির গুঞ্জনের মতো হওয়ায়, এই জলধারা বি ফলস্ নামে পরিচিত, তবে একটা বোর্ডে, হৃদয়ের, রক্তচাপের, বা সুগারের সমস্যাযুক্ত মানুষদের নীচে নেমে ফলসের জলধারার কাছে যাওয়া নিষেধের সাথে সাথে, মৌমাছির আক্রমণ থেকেও সাবধান করা হয়েছে দেখলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ আমরা এই জলধারার আশ্চর্য সৌন্দর্য উপভোগ করলাম, ছবি তুললাম। গুপ্তাজী আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে অনেক কথা বললেন, অনেক গল্প শোনালেন। একসময় তাঁর পান্নাশোভিত মহামূল্যবান অঙ্গুলি উঁচিয়ে দূরের সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ার দিকে নিশানা করে জানালেন, যে ওটা ‘হাসতা হুয়া ফলস্’। কোন জলধারা নজরে পড়লো না, তবে অনেক খুঁজে লক্ষ্য করলাম যে পাহাড়ের একটা অংশ একটা মানুষের মুখের মতো, এবং সেই মুখটা যেন হাসছে মনে হয়। মনে পড়ে গেল লেহ-লাদাখ ট্যুরের সেই বিখ্যাত মন্যাস্টারি লামায়ুরুর কথা, পাহাড়ের গায়ে এমনভাবে গর্তগুলো রয়েছে বা করা হয়েছে, যে বহু নীচ থেকে দেখলে নরকঙ্কালের করোটি মনে হয়। যাইহোক, আরও কিছু পরে আমরা সেই কাঠের সাঁকোর ওপর ফিরে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। বামপাশে ঠিক সাঁকোর নীচে জলধারার পাশে কিছু ট্যুরিস্টদের ঘোরাফেরা করতে দেখলাম। দেখে তো মনে হলো জায়গাটা বনভোজনের জন্য আদর্শ, জানি না অনুমতি দেওয়া হয় কী না। আমরাও এখানে অনেকটাই সময় কাটালাম। এবার ফেরার পালা, হাঁটতে হাটতে আবার সেই জিপসি রাখার জায়গায় এসে হাজির হলাম। আমাদের জিপসিতে দেখলাম এক ভদ্রলোক সম্ভবত তাঁর পরিবারকে নিয়ে উঠলেন। পাশেই একটা ছোট্ট দোকান, সেলিম আমাদের দশ মিনিট অপেক্ষা করতে বলে জানালো, যে সে এনাদের বাইসন লজ মিউজিয়ামের কাছে ছেড়ে দিয়েই ফিরে আসছে। কিছু বোঝার আগেই সে গাড়ি নিয়ে চলে গেল। ভাবলাম সামান্য সময় পরে গেলে যদি তার দুটো পয়সা অতিরিক্ত আয় হয়, তো হোক না, অসুবিধার তো কিছু দেখি না। দেখতে দেখতে অনেকটা সময় কেটে গেল, সেলিমের পাত্তা নেই। সেলিমের মোবাইল নাম্বার সেভ করে রাখা হয়নি। গুপ্তাজী, দোকানের কেউ, এমনকী দাঁড়িয়ে থাকা অন্য কোন জিপসি ড্রাইভারও সেলিমের মোবাইল নাম্বার বলতে পারলো না। আরও বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল, কিন্তু ‘সেলিম দ্যাট ভেরি গান, গান গানা গান, নেভার রিটার্ন’। ভয় হচ্ছে কেটে পড়লো নাতো? ভরসা একটাই, আজকের ট্যুরের জন্য তাকে এখন পর্যন্ত একটা পয়সাও দেওয়া হয়নি। যাহোক শেষপর্যন্ত সে তার জিপসি নিয়ে ফিরে এসে আমাদের নিশ্চিন্ত করলো।

গাড়ি ছেড়ে দিল। গুপ্তাজীও গাড়িতে উঠে বসলেন। আমাদের সকলের চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ, গুপ্তাজীর মধ্যে কিন্তু কোন হেলদোল লক্ষ্য করলাম না। বাইসন লজ গেট অল্পই রাস্তা, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা গেটের সামনের টিকিট কাউন্টারে এসে পৌঁছলে, গুপ্তাজী হাত মিলিয়ে চলে গেলেন। এতক্ষণে সেলিম মুখ খুললো। সে জানলো, যে ওই ভদ্রলোক বনবিভাগের একজন অতি উচ্চপদস্থ অফিসার, তিনি বি ফলস্ ঘুরতে এসেছিলেন। তাঁর ইচ্ছায় সে ওই অফিসারকে নির্দিষ্ট জায়গায় ছেড়ে দিয়ে আসতে গেছিল। এটা না করলে আগামীকাল থেকে এই সাতপুরা রেঞ্জের অধীনস্থ এলাকায় তার গাড়ি নিয়ে ব্যবসা করা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সম্ভবত আসার সময়েও তিনি একই পন্থায় অন্য কারও জিপসিতে এসেছিলেন। শুনেছিলাম সুদূর অতীতে বাইসন লজ মিউজিয়াম নাকি কোন এক ক্যাপটেনের থাকার জায়গা ছিল, জানি না ওখানে আজও থাকার কোন ব্যবস্থা আছে কী না, থাকলে আজ এত পরিশ্রমের পর তিনি নিশ্চয় সপরিবারে সেখানে রাত্রিবাস করে বিশ্রাম নেবেন। ঝাড়খণ্ডের বেতলা ন্যাশনাল পার্কে একটু অন্যরকম হলেও, অন্যকে বঞ্চিত করে বনবিভাগের অফিসারকে প্রায় এই জাতীয় ফুর্তি করতে দেখেছিলাম। ভারতে মহা জাতীর উথ্থান দেখে জগজন বিষ্ময় মানছেন কিনা জানি না, তবে বিবিধের মাঝে এই মহান মিলন দেখে আমরা ভারতীয় জনগণ বেশ ক্লান্ত, এটা বোধহয় বলা যেতেই পারে।

আমরা একসময় রীচগড়ের প্রবেশদ্বারের সামনে এসে হাজির হলাম। এই রীচগড় ভ্রমণ জীবনের এক বিষ্ময়কর অভিজ্ঞতা। এখানে প্রবেশ করার জন্য কোন টিকিট কাটার প্রয়োজন হয় না। জানা গেল যে স্থানীও ভাষায় রীচের অর্থ ভালুক। একসময় এখানে নাকি প্রচুর ভালুকের বসবাস ছিল। পাথুরে রাস্তা দিয়ে সেলিম আমাদের নিয়ে চললো। আমরা ধীরে ধীরে একটা গুহামুখের সামনে এসে পৌঁছলাম। আমরা গুহার ভিতর না ঢুকে চারপাশের ছবি তুলতে শুরু করে দিলাম। পাথরের রঙ ও বিভিন্ন রকম দাগ সত্যিই দেখবার মতো। সেলিম জানালো, যে এই প্রাকৃতিক গুহা নাকি দুদিকের পাহাড়কে সংযুক্ত করে রেখেছে। সে আরও জানালো যে কথিত আছে সুদূর অতীতে এই পাহাড় জলের তলায় ছিল, জলের স্রোতের কারণে এই গুহার সৃষ্টি, ও পাথরের গায়ে এই অদ্ভুত সব দাগ। কিছুক্ষণ গুহার বাইরে ঘুরেফিরে, সেলিমের ডাকে গুহামুখে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেলিম নিজে গুহার মুখ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে আমাদেরও ভিতরে প্রবেশ করার আহ্বান জানালো। গুহায় প্রবেশ করার আগে সে আমাদের টর্চ বা মোবাইলের আলো ফেলে ভিতরে প্রবেশ করতে বললো। ধীরে ধীরে বেশ শারীরিক কসরত করে আমরা ক্রমশ গুহার ভিতরে এগিয়ে চললাম। এইমুহুর্তে আমরা ছাড়া গুহার ভিতর আর কোন পর্যটক নেই, তবে গুপ্ত মহাদেবের আস্তানার মুখে সরু ফাটল দিয়ে একসাথে বেশি লোকের প্রবেশ প্রতিরোধ করার মতো, এখানে কিন্তু কেউ নেই। গুহাভ্যন্তরে একসাথে বেশি লোক সমগম হলে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিপদ হলেও হতে পারে। যদিও ভিতর দিয়ে বেশ ঠান্ডা বাতাস বয়, তবু গুহার গঠন ও আয়তনের কথা ভেবে, খুব ভিড়ের সময় একসাথে অনেক মানুষের গুহার ভিতরে না যাওয়াই ভালো, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের। মোবাইলের আলো জ্বেলে গুহার ভিতরে কিছুটা ঢোকার পর ঝামেলাটা মালুম হলো। গভীর অন্ধকারে এক হাতে মোবাইল নিয়ে কখনও মাথা নীচু করে, কখনও বা প্রায় বসে পড়ার মতো শরীরটাকে করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। পায়ের নীচে চলার পথটা সেরকম অসুবিধাজনক না হলেও, চটি জাতীয় কিছু না পরে যাওয়াই শ্রেয়। সীমার হাঁটু ও হাতে কিছু সমস্যা থাকায় ওর বেশ অসুবিধা হচ্ছে দেখে, সেলিম আমাদের যে পথে এসেছি সেই পথেই ফিরে যেতে বললো। ফিরেই আসছিলাম, ফেরার পথে সেলিমকে জিজ্ঞাসা করলাম যে কতটা পথ যেতে হবে, ও অপরদিকে দেখারই বা কি আছে?  সেলিম জানালো এটা একটা ছোট ট্রেকিং রূট বলতে পারেন। গুহার ভিতর দিয়ে রাস্তাও খুব বেশি নয়। গুহার ভিতর দিয়ে অপর দিকে গেলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুব সুন্দর, ও সেখানেই ইকো পয়েন্ট। ওখানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলে নিজের গলার স্বরের প্রতিধ্বনি কয়েকবার শোনা যায়। এই ট্যুরে ইকো পয়েন্টের অভাব লক্ষ্য করিনি, তবু জায়গাটা একবার চাক্ষুষ দেখার, বিশেষ করে এই অন্ধকার গুহার ভিতর দিয়ে হাঁটার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। সীমাও দেখলাম হাঁটু ছেড়ে হাঁটাকেই বেছে নিলো। তাই আমরা আবার নতুন উদ্যমে ইকো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। সেলিম অনেক অভিজ্ঞ, তাই সেলিম এবার এগিয়ে এসে সীমার হাত ধরে সাহায্য করলো। অদ্ভুত এক সুড়ঙ্গপথের একবারে শেষে একসময় আলো দেখা গেল। আমরা ধীরে ধীরে একসময় গুহা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। সামনেই ঘন জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়, এখানেই সেলিমের নির্দেশে চিৎকার করে এই ইকো পয়েন্টের মাহাত্ম্য অনুভব করলাম। ঘন জঙ্গল এলাকার এই গুহামুখে দাঁড়িয়ে একটা কথা বার বার মনে হলো — এই গুহায় একসময় প্রচুর ভালুকের বাস ছিল, এখন হয়তো তাদের কেউ এখানে আর বসবাস করে না, কিন্তু জায়গাটা তো সাতপুরা রেঞ্জের অন্তর্গত, এই বিশাল জঙ্গলে কি কোন ভালুক বসবাস করে না? তাদের একটারও মনে যদি পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি দেখার বাসনা জাগে, তাহলে সেই অবস্থায় এই সরু অপ্রশস্ত অন্ধকার গুহার দর্শনার্থীদের অবস্থা কি দাঁড়াতে পারে। এখান থেকে সূর্যাস্ত নাকি দেখবার মতো। ইচ্ছা থাকলেও সেই সুযোগ নেই, কারণ সূর্যদেবের বাড়ি ফিরতে এখনও বেশ কয়েক ঘন্টা বাকি। বাধ্য হয়ে একসময় পাহাড়ি লালচে পাথুরে পথ ধরে, ধীরে ধীরে আমরা আমাদের জিপসির কাছে ফিরে এলাম।

এবার আমাদের গন্তব্যস্থল, রাজেন্দ্রগিরি উদ্যান। ভারত বর্ষের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের নামে এই উদ্যান, এবং এখানে তাঁর একটি মূর্তিও আছে। উদ্যানটি সম্ভবত ২০১৩ সালের তেরোই ফেব্রুয়ারী উদ্বোধন হয়। শুনলাম এখানে ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ এসেছিলেন এবং তিনি এখানে একটি বৃক্ষ রোপণ করেন। অনেকখানি জায়গা নিয়ে নির্মিত এই উদ্যানটি বিভিন্ন রকম গাছ ও প্রচুর ফুলগাছ দিয়ে সাজানো। সমস্ত উদ্যানটি ভালো করে ঘুরে দেখলে বোঝা যায়, যে উদ্যানটি সুন্দর রাখার জন্য কতো যত্ন ও পরিশ্রম করা হয়। উদ্যানের একটা দিক গোল করে বাঁধানো রেলিং দিয়ে ঘেরা খানিকটা জায়গায় দাঁড়িয়ে, যে যার নিজ নিজ পছন্দমতো দূরের পাহাড়ের ছবি তোলে। ধুপগড় নামক দ্রষ্টব্যস্থল থেকে নাকি অসাধারণ সূর্যাস্তের রূপ দেখা যায়। রাস্তা মেরামতির জন্য ধুপগড় যাওয়ার রাস্তা সাময়িকভাবে বন্ধ আছে, তাই ধুপগড় যাওয়ার সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। তবে এই রাজেন্দ্রগিরি উদ্যানের এখান থেকে সূর্যাস্ত দেখলে, সেই দুঃখ থেকে অনেকটাই ভুলে থাকা যায় বলে শুনেছিলাম। এই উদ্যান থেকে সূর্যাস্তের রূপও নাকি অসাধারণ, কিন্তু এখান থেকেও সূর্যাস্ত দেখার আমাদের কোন সুযোগ নেই, কারণ সূর্যাস্ত হতে এখনও অনেক দেরি। এখানে এক মহিলাকে মোটামুটি একটা শক্তিশালী টেলিস্কোপে চৌরাগড় শিব মন্দির দেখাতে দেখলাম। এই উদ্যানের এক প্রান্তে অবস্থিত এই ঘেরা জায়গা থেকে দূরের পাহাড়ের সারি সত্যিই সুন্দর দেখা যায়। ফেরার পথে একটা জায়গায় দেখলাম সামনে নানারকম ফুলগাছ ও অন্যান্য গাছপালা দিয়ে সাজানো একটা খুব সুন্দর কটেজ। এটা সম্ভবত উদ্যানের উচ্চপদস্থ অফিসার, বা ভি.আই.পি. সম্প্রদায়ের জন্য সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়ে থাকে। গেট দিয়ে বেরিয়ে আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। এবার আমাদের গন্তব্যস্থল চম্পক লেক। গাড়ি ছাড়ার আগে অবশ্য গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য কুড়ি টাকা চাঁদা দিতে হলো।

যাওয়ার পথে একটা বিস্তীর্ণ মাঠের মতো জায়গার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম, যে ওখানে একটা হেলিপ্যাড তৈরি করা আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা চম্পক লেকের কাছে এসে পৌঁছলাম। সুন্দরভাবে সাজানো বিস্তীর্ণ এলাকার মাঝে চারিপাশে গাছপালা দিয়ে ঘেরা, সুবিশাল এই নীল রঙের জলের লেক, চম্পক লেক। গভীরতা কতো জানি না, তবে দেখে তো মনে হলো ভালোই গভীর। এখানে দেখলাম বোটিংয়ের ব্যবস্থা আছে। সামনেই খানিকটা ঘাটের মতো বাঁধানো চত্বরের সামনে বেশ কয়েকটা নৌকা। এখানে কিছু পর্যটকের ভিড়, এবং এরই মাঝে মনে হলো বি ফলস্ থেকে আমাদের জিপসি জবরদখল করে বাইসন লজ গেটের সামনে আসা বনবিভাগের সেই অফিসার মহাপুরুষটিও আছেন। জয় ভি.আই.পি. মহাপুরষদের জয়। এরকম সুন্দর পরিবেশে এতো বিশাল ও সুন্দর লেকের জলে যদি না একটু নৌকাবিহার করলাম তো আসা কি জন্যে? হতে পারি চারজনই বুড়োবুড়ি, কিন্ত প্রতিদিন যে গল্প শুনি— বয়সটা একটা সংখ্যা মাত্র, সেটা কি শুধুই একটা কথার কথা? সুতরাং গুটিগুটি পায়ে ডানদিকের টিকিট কাউন্টারের কাছে এগলাম। ভেবেছিলাম অনেক টাকা ভাড়া হবে, কিন্তু বাস্তবে দেখলাম সেরকম কিছু নয়। কাউন্টারের ভদ্রলোকটির ব্যবহারও দেখলাম খুব ভদ্র। আমরা চারজন আছি শুনে এবং সবাই বয়স্ক শুনে তিনি জানালেন, যে আমাদের পক্ষে প্যাডেল বোট নেওয়াটা ঠিক হবে না। কাছেই একটা সাদা রঙের ছোট্ট মোটর বোট দাঁড়িয়েছিল, তিনি আমাদের ওই বোটটি নিতে পরামর্শ দিলেন। জানা গেল সময়টা কোন ব্যাপার নয়, লেকটা একবার প্রদক্ষিণ করে ঘুরিয়ে আনতে মাথাপিছু একশ’ টাকা, অর্থাৎ মোট চারশ’ টাকা লাগবে, আমরা ইচ্ছা করলে অন্য কোন যাত্রীকেও তুলতে পারি। আমরা চারশ’ টাকা দিয়ে টিকিট কাটলাম। কাউন্টারের ভদ্রলোক দুজনকে ডেকে আমাদের সাথে যেতে বলে, নিজেও আমাদের সাথে নৌকাটার কাছে গেলেন। অন্য ছেলেদুটি এসে প্রথমে আমাদের লাইফ জ্যাকেট পরতে সাহায্য করে, নৌকা ধরে আমাদের নৌকায় উঠতে সাহায্য করার সাথে সাথে আমরা চারজন চটপট নৌকায় উঠে বসলাম। এই লেকটি বা নৌকাটি বনবিভাগের আওতায় পড়ে কিনা জানা নেই, তাই সেই মহামানবটির কুদৃষ্টি পড়ার আগেই নিজেদের অধিকার কায়েম করে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হলো। কাউন্টারের ভদ্রলোকটি এবার নৌকার চালককে আমাদের সাবধানে ও ধীরে ধীরে সময় নিয়ে লেকটি ঘুরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়ে ফিরে গেলেন। নৌকা ছেড়ে দিলো। আমরা বেশ অনেকটাই সময় নিয়ে গাছপালা ঘেরা নীল জলের বিশাল লেকটায় নৌকা বিহার করে, ছবি তুলে ফিরে এলাম। ফেরার পথে দুজনকে লেকের পাড়ে ছিপ ফেলে বসে থাকতে দেখলাম। জানি না এরা মাছ পায় কিনা বা নিজেরা মাছ খায় কী না। ফিরে এসে আরও কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে, ছবি তুলে, গাড়িতে গিয়ে বসলাম। এখানেও পার্কিং চার্জ দশ টাকা নেওয়া হলো।

আমরা এবার পাণ্ডব গুহার উদ্দেশ্য যাত্রা করলাম। স্থানীয় মানুষের মতো অনেকেই এই পৌরানিক কাহিনী বিশ্বাস করেন, যে পাণ্ডবরা পাঁচ ভাই ও দ্রৌপদি, তাঁদের নির্বাসিত জীবনের অনেকটা সময় নাকি এই গুহায় বসবাস করে কাটিয়ে ছিলেন। এখানে পাঁচটি গুহা থাকায় এই জায়গার নাম পাঁচমারি। কিন্তু এখানে একটি বোর্ডের লেখা থেকে জানা যায়, যে এগুলি বৌদ্ধগুহা এবং বাস্তবে এই গুহাগুলি গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময় চতুর্থ থেকে পঞ্চম শতাব্দীতে ভগবক নামে কোন সন্ন্যাসীর তৈরি। গাছপালা ও নানা ধরণের ফুলের বাগান পেরিয়ে সিঁড়ি ভেঙে এই পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত এই গুহাগুলিতে যেতে হয়। একটু উচ্চতায় অবস্থিত হলেও, পথ খুব একটা কষ্টকর নয়। সঙ্গের মহিলা দুজন পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে ও গুহায় যাওয়ার সিঁড়ির নমুনা দেখে, রণে ভঙ্গ দিয়ে বাগানের ভিতর একটা বেঞ্চে বসে থাকাই শ্রেয় বিবেচনা করলে, আমি ও তরুণ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠা শুরু করলাম। ধীরে ধীরে গুহাগুলিতে প্রবেশ করে দেখতে দেখতে, একসময় আমরা একবার ওপরে রেলিং দিয়ে ঘেরা অংশটায় উঠে এলাম। একটি গুহায়, সম্ভবত তিন নম্বর গুহাটিতে দরজা জানালারও ব্যবস্থা ছিল বোঝা গেল। তাছাড়া পাথরের পিলার বা থামের ব্যবহার ও বারান্দাও চোখে পড়লো। এই গুহা পাহাড়ের এখানে দাঁড়ালে, নীচের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দেখা যায়। নীচের এই বিশাল বাগান ও পার্কের অংশটি যে কতো যত্ন ও পরিচর্যায় লালিত বোঝা যায়। এখানে শুধু ফুল দেখার, বিশেষ করে গোলাপ ফুল দেখার জন্যই বারবার আসা যায়। পাহাড়টির একবারে ওপরের কিছুটা অংশ প্রাচীন ইঁটের নির্মিত। কিন্তু আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার অনুরোধ এবং জরিমানা ও কারাবাসের হুমকিও এই প্রাচীন ইঁটের ওপর দিয়ে দর্শকদের হেঁটে যাতায়াত বন্ধ করতে না পারায়, ওই অঞ্চলটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশাল বাগান বা এই পাণ্ডব গুহার নীচের সমস্ত অঞ্চলের পরিচর্যা বা রক্ষণাবেক্ষণ খুব সুন্দর হলেও, যে কারণে এই জায়গাটা দর্শনীয়, যার জন্য এই গোটা অঞ্চলটার নাম পাঁচমারি, সেই প্রাচীন ঐতিহাসিক ঐতিহ্যটি রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারি নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। এই গুহার শক্ত পাথরের গায়ে দেখলাম কোন এক হরদীপ নামের প্রেমিক যে কাউকে ভালবাসেন, লাভ চিহ্ন দিয়ে তিনি সেকথা খোদাই করে গোটা মানব সমাজকে জানিয়ে গেছেন। সাধারণ বুদ্ধিতে কিন্তু বিশ্বাস করা বেশ কষ্টকর, যে কাজটা খুব সহজে ও অল্প সময়ে সম্পন্ন হয়েছিল। পাণ্ডবগুহা দর্শন শেষ, এবার ফেরার পালা। ধীরে ধীরে নীচে নেমে এসে বাগানের সেই বেঞ্চের কাছে সঙ্গিনীদের কাছে ফিরে এলাম। এখানে সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে গাড়ির কাছে ফিরে চললাম। দুপাশে তারের জাল দিয়ে ঘেরা ফুলবাগানের মধ্যে দিয়ে এসে, একসময় আমরা গাড়িতে এসে বসলাম। গাড়ি ছেড়ে দিলো।

ক্যাথলিক চার্চটা একবার ঘুরে দেখার ইচ্ছা ছিল, এখানকার মাদার মেরির চিত্রটি নাকি দুর্মূল্য ও খুবই সুন্দর, কিন্তু এই চার্চটি শুধুমাত্র রবিবার খোলা থাকায়, বাইরে থেকে দেখতে যাওয়ার আর ইচ্ছা হলো না। ডাচেস্ ফলসটি দেখারও সুযোগ হলো না। ফলসটি দেখতে গেলে পাহাড়ি উঁচুনীচু পথ ভেঙে অনেকটা ট্রেক করে যেতে হয়। ফলসটি দেখতে যাওয়ার মতো হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই, তাছাড়া ক্লান্ত শরীরে আর হাঁটাহাঁটি করার ইচ্ছা ও ক্ষমতার অভাব ক্রমশঃ সকলের মধ্যেই দেখা দিচ্ছে। পাহাড়ের ওপর অনেক উঁচুতে চৌরাগড় শিব মন্দিরটি রাজেন্দ্রগিরি উদ্যান থেকে দেখেছিলাম। ইচ্ছা ছিল কাছ থেকে মন্দিরটি দেখার। এই অবেলায় অতটা পথ ভেঙে কেউই আর উপরে ওঠার ইচ্ছা প্রকাশ না করায়, আমরা হোটেলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আগামীকাল আমাদের এখান থেকে পিপারিয়া হয়ে এবারের ট্যুরের শেষ গন্তব্যস্থল, অমরকন্টকের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা। পিপারিয়া থেকে এখানে আসার সময় গাড়ি ও ড্রাইভার, উভয়ই খুব ভালো ছিল। ভাড়া লেগেছিল নয় শত টাকা। ভাবলাম সেলিমের গাড়িতে পিপারিয়া চলে গেলে হয়। সেলিমকে জিজ্ঞাসা করায় সে জানালো, যে সে তার জিপসি নিয়ে আমাদের পৌঁছে দিয়ে আসতে পারে, তবে ভাড়া লাগবে এক হাজার টাকা। আমরা আর এই প্রসঙ্গে কথা না বড়িয়ে কালকের মতোই হোটেলের কিছু আগে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। সেলিমের জিপসি ভাড়ার কিছুটা আমাদের হোটেল মালিককে দেওয়া আছে, বাকি টাকা হোটেল মালিকের হাতেই দিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়ে সে আমাদের সাথে হাত মিলিয়ে চলে গেল। আজ আমরা জৈন হোটেলে খাবার খেতে ঢুকলাম। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হোটেলটির খাবারের মান বেশ ভালো। রুটি সবজি স্যালাড খেয়ে দাম মিটিয়ে আমরা হোটেলে ফিরে কাউন্টারে আগামীকাল পিপারিয়া ফিরে যাওয়ার জন্য গাড়িটার কথা বলে, ওপরে চলে এলাম।

এবার বিশ্রামের পালা, সুযোগ পেয়ে যে যার বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। মহিলারা জানালেন, যে বাড়ি ফিরে গিয়ে দেওয়ার মতো টুকটাক কিছু উপহার, রাতে তাঁরা কিনতে বেরোবেন। কাজেই বাইরে থেকে খাবার কিনে এনে হোটলে বসে খাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে হলো। বেশ কিছুক্ষণ পরে তৈরি হয়ে মহিলাদের আজ্ঞা পালন করতে হোটেল থেকে বেরোলাম। প্রথমেই সেই বিখ্যাত দোকান থেকে চা খেয়ে শক্তি সঞ্চয় করে, বিভিন্ন দোকান ঘুরে ঘুরে প্রয়োজনীয় উপহার সামগ্রী কেনা হলো। আমার কপালে নতুন করে আবার তিনটে গণেশ মূর্তি জুটলো। এবার রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। এই তিনজন গণেশ খুব জাগ্রত কিনা, বা স্বয়ং সিদ্ধিদাতার আশীর্বাদে কিনা জানি না, তবে হঠাৎই একটা দোকান থেকে আটচল্লিশ টাকা দিয়ে আটটা কাঁচা ডিম কেনার সুযোগ পেয়ে গেলাম। এরপরে কেক, কলা, ও গাজরের হালুয়া কিনে, মহানন্দে হোটেলে ফিরে এলাম। অতীত অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তরুণ তার ইলেকট্রিক কেতলিতে ডিমগুলো সেদ্ধ করার ব্যবস্থা করে ফেললো। আমরা হাত মুখ ধুয়ে পোশাক বদল করে খাটে গোল হয়ে বসে মহানন্দে মহাভোজ সম্পন্ন করলাম। আগামীকাল আমাদের এই ট্যুরের শেষ দর্শনীয় স্থল, অমরকন্টকের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা। কাল সকালটায় হাতে কোন কাজ না থাকায়, সকাল সকাল ওঠারও কোন তাড়া নেই। শেষে একসময় যে যার বিছানায় আশ্রয় নিলাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের তেরো তারিখ। একটু বেলার দিকেই পিপারিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হবো। পিপারিয়া থেকে আমাদের ট্রেন, ১২৮৫৪ নম্বর অমরকন্টক এক্সপ্রেস সন্ধ্যা ছ’টা বেজে চল্লিশ মিনিটে আমাদের নিয়ে পেনড্রা রোড স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। বাতানুকূল স্লীপার ক্লাসে কনফার্মড টিকিট আছে, কাজেই অসুবিধা হবার বিশেষ কোন কারণ নেই। অসুবিধা একটাই, এই ঠান্ডায় ট্রেনটা রাত তিনটে বেজে পাঁচ মিনিটে পেনড্রা রোড স্টেশনে পৌঁছবে। এখন শুধু একটাই দুশ্চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, আমাদের এই ট্যুরের শেষ ট্রেন, অর্থাৎ বিলাশপুর থেকে সাঁত্রাগাছি যাওয়ার ট্রেনে থ্রী টায়ার বাতানুকূল স্লীপার ক্লাসে মহিলাদের দুটো কনফার্মড টিকিট থাকলেও, আমার ও তরুণের নাম এখনও ওয়েটিং লিস্টে আছে। বাধ্য হয়ে আমাদের দুজনের অর্ডিনারি স্লীপার ক্লাসে দুটো টিকিট কেটে রেখেছি, তবে কনফার্মড টিকিট হলেও দুজনের দুটো বগিতে বার্থ পড়েছে। ট্রেনটা বিলাশপুরে পনেরো মিনিট দাঁড়ালেও, অত মালপত্র নিয়ে মহিলাদের তাদের বগিতে তুলে দিয়ে নিজেরা নিজেদের আলাদা আলাদা দুটো বগিতে অতো অল্প সময়ের মধ্যে গিয়ে ওঠা বেশ অসুবিধাজনক হতে পারে। যাইহোক, নীচে রিসেপশন কাউন্টারে গিয়ে গাড়ির ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, যে আগের দিনের সেই গাড়িটা পাওয়া যাবে না, অন্য একটা গাড়ি আসবে তবে এক হাজার টাকার কমে কিছুতেই রাজি করানো সম্ভব হয়নি। কিছু করার নেই, আমাদের চেক আউট সময়ের পরেও অনেকক্ষণ এই হোটেলেই কাটাতে হবে, তাই এই গাড়ির ভাড়া সমেত হোটেলের সমস্ত প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে, আমি ও তরুণ গেলাম জলখাবার কিনে আনতে।

জলখাবার খেয়ে স্নান সেরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে নিলাম। আরও বেশ কিছু সময় কাটিয়ে বাচ্চা ছেলেটার সাথে হাতে হাতে মালপত্র নীচের রিসেপশন কাউন্টারের কাছে জড়ো করে রাখলাম। মেয়েরা ওপরেই গাড়ির অপেক্ষায় রইলো। হাতে অনেকটাই সময় আছে, কাজেই গাড়িটা যত দেরিতে আসে ততই মঙ্গল। হোটেল মালিকের ছেলেটার সাথে কথা বলে আরও অনেকক্ষণ সময় কাটলো। ছেলেটা সত্যিই খুব ভদ্র, কথাবার্তাও খুব সুন্দর। এইভাবে আরও অনেকটা সময় কেটে গেল। একসময় কথামতো অন্য একজন ড্রাইভার অন্য একটা গাড়ি নিয়ে এসে হাজির হলো। এই গাড়িটাও বেশ ভালো, মালপত্র গাড়িতে গুছিয়ে তুলে চিরতরে পাঁচমারি ছেড়ে এগিয়ে চললাম।

মাতকুলিতে দুপুরের খাবার খাওয়র জন্য ড্রাইভারকে গাড়ি দাঁড় করাবার কথা বলেই রেখেছিলাম। সেই চেনা রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়ে আমাদের গাড়ি মাতকুলিতে একটা খাবারের জায়গায় দাঁড় করালো বটে, তবে অন্য একটা হোটলে। এটাও ভালো, তবে যাবার সময়ের সেই ‘সাই ফ্যামিলি ধাবা’ অনেক বড়, সুন্দর, ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ছিল। খাওয়া হয়ে গেলে গাড়িতে উঠে বসলাম। জব্বলপুর থেকে পিপারিয়া আসার সময় আমাদের ট্রেনটা যে প্ল্যাটফর্মে এসেছিল, আজও আমাদের ট্রেন ওই একই প্ল্যাটফর্মে আসবে। পিপারিয়া স্টেশনের উভয়দিকেই পাকা গাড়ি চলার রাস্তা থাকলেও, গাড়ির জন্য আমাদের ওভারব্রিজ পার হয়ে মালপত্র নিয়ে অপরদিকে আসতে হয়েছিল, কারণ গাড়িটি ওইদিকের রাস্তায় দঁড়িয়েছিল। আজ তাই আগেভাগেই ড্রাইভারকে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের দিকের রাস্তায় গাড়িটা দাঁড় করাবার কথা বলে দিলাম। ড্রাইভার জানালো, যে ওইদিকের রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করলে চল্লিশ টাকা পার্কিং চার্জ দিতে হয়। আমরা জানালাম, যে আমরা পার্কিং চার্জ দিয়ে দেবো। একসময় গাড়ি এসে পিপারিয়া স্টেশনের পাশে দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে মালপত্র নামিয়ে দিয়ে ড্রাইভার কথামতো পার্কিং চার্জ বাবদ চল্লিশ টাকা চেয়ে নিলো। আমরা মালপত্র গোছগাছ করে এক জায়গায় রাখার ফাঁকে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চলে গেল। প্রথম দিনে সামান্য কিছু সময় প্ল্যাটফর্মে বসে সময় কাটিয়ে, ওভারব্রিজ পার হয়ে অন্যদিকে গিয়ে গাড়িতে মালপত্র গুছিয়ে তোলার কাজে ব্যস্ত থাকায়, স্টেশন চত্বরটা দেখার সুযোগ হয়নি। এবার মালপত্র নিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে বুঝলাম, ড্রাইভারটা আমাদের সেই আগের দিনের গাড়িতে ওঠার দিকেই নামিয়ে দিয়ে চল্লিশটা টাকা নিয়ে কেটে পড়েছে। এও বুঝলাম, পাঁচমারি ভিন্ন রাজ্যে হলেও ভরতবর্ষের অন্তর্গত, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাইব্রিড সবজি বা মাছের মতো এই জাতীয় মানুষ দেখতে আমরা অভ্যস্ত, তাই হাসি মুখে লটবহর নিয়ে ব্রিজ পেরিয়ে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে এসে উপস্থিত হলাম।

আমাদের ট্রেন ১২৮৫৪ নম্বর অমরকন্টক এক্সপ্রেস সন্ধ্যা ছ’টা বেজে চল্লিশ মিনিটে এখান থেকে ছেড়ে, রাত তিনটে বেজে পাঁচ মিনিটে পেন্ড্রা রোডে স্টেশনে পৌঁছানোর কথা। বাতানুকূল থ্রী টায়ার স্লীপার ক্লাসে কনফার্মড টিকিটও আছে, কিন্তু উভয় স্টেশনেই মাত্র দুমিনিটের জন্য দাঁড়ায়, এটাই চিন্তার বিষয়। দেখতে দেখতে গাড়ি আসার সময় হয়ে গেল, কিন্তু সারা প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাত্রী থাকলেও, ঠিক আমাদের বগিটার কাছে মহিলা, পুরুষ, ও বাচ্চার একটা বেশ বড় দলের বিশাল মালপত্র নিয়ে জটলা। তারা বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছে। তা যাক্, কিন্তু দুমিনিট সময়ের মধ্যে এতোগুলো লোক এতো মালপত্র নিয়ে উঠত পারবো কিনা সংশয় থেকেই যাচ্ছে। ট্রেন আসার সাথে ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গেল। বিপদটা আরও একমাত্রা বাড়ার কারণ, আমাদের বগিটার একদিকের দরজা আবার ভিতর থেকে লক্ করা। যাহোক সমস্ত মালপত্র গেটের কাছে জড়ো করে দুদলের সকলেই কোনরকমে উঠতে সক্ষম হলাম। সবশেষে আমি আমার মেরুন রঙের ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে কোনরকমে ওঠার সময় অন্য দলের এক ভদ্রলোক আমার হাত থেকে ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে সাহায্য করলেন। ট্রেনে উঠে বুঝলাম ওটা আসলে ওনাদের ব্যাগ, আমার মতোই উনিও বোধহয় আমার ব্যাগটা নিজের ভেবে ভুল করেছিলেন। চারটে বার্থই বরিষ্ঠ নাগরিকের জন্য কাটা হলেও, আমাদের আবার একটাও লোয়ার বার্থ কপালে জোটেনি। যাইহোক উভয়পক্ষই উভয়পক্ষের সাহায্যে মালপত্র গুছিয়ে রাখা হলো। রাত তিনটেয় নামতে হবে, তাই সঙ্গে সামান্য কিছু ড্রাইফুড থাকলেও, রাতের জন্য কোন খাবার কেনা হয়নি। অন্য দলটার মালপত্র ঠিকমতো সাজিয়ে রাখার ব্যাপারে আমি তাঁদের অনেক সাহায্য করলাম। করলাম তার অনেকগুলো কারণ অবশ্য আছে। প্রথমত, তাঁদের বিশাল দলে পুরুষের সংখ্যা খুবই কম। দ্বিতীয়ত, অন্যান্য বগিতেও তাঁদের দলের অনেকের বার্থ পড়ায় দলের পুরুষদের আবার কেউ কেউ সেইসব বগিতে সাহায্য করতে গেছেন। তৃতীয়ত, ওনারা আমাদের আগে মালপত্র নিয়ে এসে উপস্থিত হওয়ায় ও আশেপাশে বেশ কয়েকটা বাচ্চা থাকায়, সবার সবকিছু মালপত্র গুছিয়ে খাটের তলায় রাখা বেশ অসুবিধাজনক। সর্বোপরি, সীমার জন্য আমাদের অন্তত একটা লোয়ার বার্থের বিশেষ প্রয়োজন, যেটা একমাত্র তাঁরাই সাহায্য করলেও করতে পারেন।

অল্পকিছু সময়ের মধ্যেই দু’দলের মহিলাদের মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেল। তাঁদের দলের একজনের জন্মদিন থাকায় কেক কাটা হলো, এবং আমরাও সেই কেকের অংশীদার হলাম। জানা গেল, তাঁরা তাঁদের পরিবারের একটি মেয়ের বিয়ে দিতে নিয়ে যাচ্ছেন, পাত্রী পাশের বগিতে আছে। রাতের খাবারের জন্য তরুণ জব্বলপুর স্টেশনে একবার নামলো। তাকে কেক ও কলা কিনে নিয়ে আসতে বললাম। সুযোগমতো অন্য দলটার একজনকে আমাদের অসুবিধার কথা জানিয়ে, একটা লোয়ার বার্থের কথা বলায়, তাঁদের কেউই কোন আপত্তি করলেন না। কিছুক্ষণ পরে পাশের বগি থেকে পাত্রীটি তার মায়ের সাথে আমাদের বগিতে এসে হাজির হলে আমাদের বগির মহিলারা আমাদের সাথে পাত্রী ও তার মায়ের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এইভাবে ধীরে ধীরে ওই অল্প সময়ের মধ্যেই ওদের সাথে আমাদের একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। রাত বাড়ছে, আমাদের আবার রাত তিনটের সময় নামতে হবে, তাই না ঘুমালেও একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। ওই পক্ষের এক ভদ্রলোক এসে আমায় বললেন, যে তাঁদের সাথে অনেকগুলো বাচ্চা আছে আমাদের যদি একটা লোয়ার বার্থ ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে কি খুব অসুবিধা হবে? এমনভাবে কথাগুলো বললেন, যে তাঁরা যেন খুব অন্যায় কিছু করছেন। আমরা হাতে চাঁদ পেলাম, আমাদের একটা অন্তত লোয়ার বার্থ না পেলে সত্যিই খুব বিপদে পড়তে হবে। আমরা ওই ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে মোবাইলে এলার্ম দিয়ে বিছানা করে নিলাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের চোদ্দ তারিখ। বেশ ঠান্ডার মধ্যে রাতের অন্ধকারে মালপত্র নিয়ে পেন্ড্রা রোড স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। ধীরে ধীরে আপার ক্লাস ওয়েটিং রূমে মালপত্র নিয়ে চারজন এসে হাজির হলাম। ওয়েটিং রূম একবারে ফাঁকা, ইচ্ছা করলে বেঞ্চগুলোয় শুয়ে পড়াও যায়। প্রথমে বসে বসে কিছুটা সময় কাটিয়ে, বেঞ্চে শুয়ে শুয়ে মোবাইল ঘেঁটে সময় কাটতে লাগলো। ভোরের আলো না ফুটলে বাইরে গিয়ে গাড়ির সন্ধান করাও সম্ভব নয়। শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম, যে এই পেন্ড্রা রোডে আমি আগে কখনও না আসলেও সুদূর অতীতে এই জায়গার সাথে আমাদের পরিবারের একটা খুব দুঃখজনক, বঞ্চনা, ও অবহেলার ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে। একসময় দেখলাম মহিলারা ঘুমিয়ে পড়েছে। এইভাবে একটু ভোরের আলো ফুটলে, আমি ও তরুণ একবার বাইরে বেরিয়ে গাড়ির সন্ধানে গেলাম। স্টেশন চত্বরে কিছু অটো ও গাড়ির মাঝে একটা লজঝড়ে মারুতি ওমনি দাঁড়িয়ে আছে। সকলেই জানতে চায় আমরা কোথায় যাবো, আমাদের গাড়ি লাগবে কী না। ওই মারুতি ওমনির বৃদ্ধ ড্রাইভারটিও একই কথা জানতে চাইলেন। একটা অটোয় আমাদের প্রয়োজন মিটবে না। অন্যান্য গাড়িগুলোও ছোট, আমাদের চারজনের জায়গা হলেও, মালপত্র রাখায় সমস্যা হবে। এখান থেকে অমরকন্টক বত্রিশ-তেত্রিশ কিলোমিটার মতো রাস্তা। কাজেই ওই মারুতি ওমনির কাছেই এগিয়ে গেলাম। বৃদ্ধ ড্রাইভারটির শারীরিক অবস্থা, গাড়ির শারীরিক অবস্থার মতোই। সে যাইহোক, ছয় শত টাকা থেকে দরদাম করে পাঁচশ’ টাকায় যাওয়া পাকা করে ফেললাম। সকাল আটটা নাগাদ আমরা স্টেশন থেকে গাড়িতে এসে উঠবো জানিয়ে স্টেশনে ফিরে এলাম। দাঁত ব্রাশ করে মুখ ধুয়ে স্টেশনের টি স্টল থেকে সদ্য ভাজা গরম গরম সামোসা ও চা নিয়ে এসে খাওয়া হলো। এর আগে অন্যান্য জায়গার মতো তরুণ নেট ঘেঁটে অমরকন্টকের বিভিন্ন হোটেলের সাথে কথা বলেছিল। এখানে হোটেল ভাড়া একটু বেশি, তাছাড়া মেল্ বা হোয়াটস্ অ্যাপে ভোটার ও আধার কার্ডের কপি পাঠালে, তবে আমাদের জন্য ঘর রাখা হবে। এই নেটের মাধ্যমেই সে অমরকন্টকে সর্বদয়া জৈন ধর্মশালার খোঁজ পেয়ে আমাকে দেখিয়েছিল। ভাড়া খুবই কম এবং ছবি দেখে মনে হয়েছিল, যে এই ধর্মশালায় থাকার ব্যবস্থাটা বেশ রাজকীয়, এবং সেটা অনেক হোটেলকেই ছাপিয়ে যাবার মতো। এখনও আটটা বাজতে ঢের দেরি আছে। আর সময় নষ্ট না করে তরুণ ফোনে তাদের ওখানে একটা দিন থাকার ব্যাপারে কথা বললো। জানা গেল ঘর আছে এবং আমাদের চারজনের জন্য দুটো ঘর রেখে দেওয়া হবে। আমরা যেন ধর্মশালায় পৌঁছে তাদের অফিসের সাথে কথা বলে ব্যাপারটা পাকা করে ফেলি।

আর একটু বেলা হলে, আমরা আর এক দফা চা খেয়ে মালপত্র নিয়ে গাড়িটার উদ্দেশ্যে স্টেশনের বাইরে গিয়ে দেখলাম, গাড়ির চালক আমাদের খোঁজে স্টেশনের দিকেই আসছেন। মালপত্র গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তিনিও হাত লাগালেন। মালপত্র গাড়িতে গুছিয়ে তুলে গাড়ি ছেড়ে দিলো। ড্রাইভারের পাশে বসে তাঁর সাথে অমরকন্টকের ব্যাপারে অনেক কথা হলেও বেশ বুঝতে পাচ্ছি অন্যান্য দিনের মতো মনে সেই পুলক, নতুন জায়গা দেখতে যাওয়ার সেই আনন্দ, আজ আর নেই। আজই আমাদের শেষ দর্শনীয় স্থান দেখা। আগামীকাল আবার সেই বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা, এবং সেই যাত্রায় আবার চারজন মানুষের তিনটি বগিতে বার্থ হওয়ায় দুশ্চিন্তা। অনেকটা পথ পার হয়ে এসে ড্রাইভার ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, আমরা দূর্গীধারা আশ্রম দেখতে আগ্রহী কী না। সেখানে কি আছে জানতে চাওয়ায় তিনি জানালেন যে খুব জাগ্রত দেবী, একটা ছোট ফলস্ও আছে। জনমানবহীন একবারে নিরিবিলি জায়গায় আশ্রমটি। দেবী আশ্রমের ভিতরে তাঁর কক্ষে অবস্থান করলেও তিনি সদা জাগ্রতা। ঘুমিয়ে থাকলেও নাহয় ঝুঁকি নিয়ে কেটে পড়া যেত, জাগ্রতা দেবীকে অবজ্ঞা করে তাঁর নাকের ডগা দিয়ে কেটে পড়া সমীচীন হবে কী না ভেবে শেষপর্যন্ত গাড়ি থেকে নেমে ভিতরে প্রবেশ করা হলো। মন্দির না আশ্রম জানি না, তবে ছোট্ট হলেও বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। ঠিক পিছনে একটা ছোট জলধারা নেমে এসে একটা ছোট জলাশয়ের সৃষ্টি করেছে। ঘুরেফিরে দেখে ছবি তুলে গাড়িতে ফিরে এলাম। ড্রাইভার ভদ্রলোক আমার হাতের তালুতে কয়েকটা বীজ দিয়ে দুহাত দিয়ে ঘষতে বললেন। তাঁর কথামতো তাই করলাম। মুহুর্তের মধ্যে আমার দুহাতের তালু কমলা বা গেরুয়া রঙ ধারণ করলো। তিনি কয়েকটা কাঁটা কাঁটা ফল আমার হাতে দিয়ে বললেন, এই ফল দিয়ে দেবীর সিঁদুর তৈরি করা হয়, বীর হনুমানের রঙও এই ফল দিয়ে করা হয়। গাছ থেকে এই ফল তুলতে দেখলে ঠাকুর মশাই রেগে যাবেন, তাই লুকিয়ে লুকিয়ে তুলে এনে আপনাকে দিলাম। এহেন মূল্যবান ফল আমি নিয়ে কি করবো জানি না, তবে তাঁকে খুশি করতে রেখে দিলাম।

নির্জন ফাঁকা রাস্তা ধরে দীর্ঘক্ষণ এসে আমরা প্রায় অমরকন্টক পৌঁছে গেছি, এমন সময় দেখলাম প্রচুর অল্প বয়সি যুবক রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছে। কোথাও আবার পিঠে ব্যাগ নিয়ে ওই বয়সি ছেলেদের জটলা। এরা কোথা থেকে এসেছে, কেনই বা এসেছে বোঝা গেল না। কয়েকজনের একটা দল আমাদের গাড়ির ড্রাইভারকে পেন্ড্রা রোড যাবে কী না জিজ্ঞাসা করলো। ড্রাইভার ভদ্রলোক তাদের ওখানেই অপেক্ষা করতে বলে জানালেন, যে তিনি আমাদের নামিয়ে দিয়ে ফেরার সময় তাদের তুলে নেবেন। ড্রাইভার ভদ্রলোক ফেরার পথে খদ্দের পেয়ে গেলেন দেখে খুশি হলাম। এতক্ষণে জানা গেল, যে এখানে সেনা বিভাগে চাকরির ফাইনাল ইন্টারভিউ বা পরীক্ষা কিছু একটা চলছে। গাড়ি ঘোড়াহীন এরকম একটা পাণ্ডব বর্জিত এলাকায় কেন এই ব্যবস্থা বোঝা গেল না। যারা হেঁটে যাচ্ছে, তারা কি হেঁটেই পেন্ড্রা রোড যাওয়ার পরিকল্পনা নিতে বাধ্য হয়েছে? কে জানে, ভাবতেও অবাক লাগে। শেষে অমরকন্টকের বিখ্যাত জৈন মন্দিরের ঠিক বিপরীতে সর্বোদয়া জৈন ধর্মশালার সামনে এসে পৌঁছলাম। কয়েকজন ছেলে এগিয়ে এসে গাড়িটাকে ভাড়া নেওয়ার জন্য অনুরোধ করলে ড্রাইভার জানালেন, যে তাঁর গাড়ি ভাড়া হয়ে গেছে। আমাদের কাছ থেকে ভাড়ার টাকা নিয়ে গাড়ি ফিরে গেল।   ধর্মশালায় ঘর নেওয়ার আগে চারিদিকে সেনা বাহিনীতে চাকরির আশায় আসা অল্পবয়সি ছেলেদের ভিড় দেখে প্রথমেই যেটা মনে হলো— অমরকন্টক ঘুরে দেখার জন্য গাড়ি ভাড়া পাওয়া যাবে তো?

অমরকন্টকের নির্মীয়মাণ অসাধারণ জৈন মন্দিরটির ঠিক বিপরীতে, সর্বোদয়া জৈন ধর্মশালাটি অবস্থিত। গেট দিয়ে ঢুকেই ডানদিকে অফিস ঘর। একজন ভদ্রলোক ভিতরে বসে আছেন। অনেকটা জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই ধর্মশালাটির যতটুকু দেখা যায়, কোথাও কোন সন্ন্যাসী জাতীয় পোশাক পরা মানুষ চোখে পড়লো না। ভদ্রলোকটিকে আমাদের ফোনের কথা উল্লেখ করে আজ আমাদের এখানে আসা ও থাকার কথা জানাতে, তিনি একটা বেশ বড় রেজিস্টার খুলে আমরা কতজন আছি ও কতদিন থাকবো জানতে চাইলেন। আমরা জানালাম, যে আমরা দুটো পরিবারের মোট চারজন সদস্য ও আজকের দিনটা থেকে আগামীকাল ফিরে যাবো। তিনি বললেন, যে দুটো দুই শয্যার ঘর খালি নেই, ইচ্ছা করলে আমরা একটা দুই শয্যার ও একটা তিন শয্যার ঘর নিতে পারি। রাজি হয়ে গিয়ে ঘরদুটো দেখতে চাইলাম। তাঁর নির্দেশে একজন চাবি নিয়ে আমাদের ঘর দেখাতে চললেন। আমি ও তরুণ তার সাথে চললাম। এখানে অনেক লোকের থাকার ব্যবস্থা আছে দেখলাম, কিন্তু কোথাও কোন মানুষ চোখে পড়লো না, হয়তো সবাই ঘুরতে বেরিয়েছে। যাইহোক, সঙ্গের লোকটি প্রথম বাড়িটি ছেড়ে দ্বিতীয় বাড়িটির সাদা মার্বেল মোড়া সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলেন। উপরে সিঁড়ি উঠে গেছে, সিঁড়ির দুপাশে দুটো দরজা, দুটোতেই দুটো ক্ষুদ্রাকৃতির তালা লাগানো। ডানদিকের দরজার তালাটা খুলে তিনি আমাদের ভিতরে প্রবেশ করতে বললেন। ভিতরে প্রবেশ করে একটু অবাক হলাম। মুখোমুখি দুদিকে দুটো বেশ বড় তিন শয্যার সুবিশাল ঘর, দুটো বাথরূম, কালো মার্বেলের রান্নার তাক সমেত একটা বেশ বড় রান্নাঘর, ও একপাশে গ্রীল দেওয়া একটা ব্যালকনি ঘেরা একটা বৈঠকখানা জাতীয় সুবিশাল ঘরের একপ্রান্তে একটা লাল রঙের প্লাসিকের টেবিল ও দু’-তিনটে চেয়ার। টেবিলের ওপর একটা বিশাল ওয়াটার বটল্। এছাড়া ফুটবল মাঠের মতো বৈঠকখানা জাতীয় ঘরটাতে আর কোন আসবাব নেই। দুই বেডরূমের মাঝে একটা ভারতীয় ধাঁচের ও একটা ঘরের ভিতর একটা পশ্চিমী ঘরানার অ্যাটাচড্ বাথরূম। সমস্ত এলাকাটা সাদা পাথরের মেঝে। এছাড়া বাথরূমে গিজার, একটা ঘরে এ.সি. ও অপর ঘরটায় বেশ বড় একটা এয়ার কুলার লাগানোর ব্যাপারেও ত্রুটি দেখা গেল না। ঘর দুটোর বিছানা, কম্বল, এমনকী কম্বলের ঢাকা পর্যন্ত বুঝিয়ে দেয়, যে ঘরগলোর প্রতি কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট নজর দিয়ে থাকেন।

হাজার হোক ধর্মশালা, কাজেই ঘর কেমন হবে ভেবে আতঙ্কিত হচ্ছিলাম, এখন ঘরের নমুনা দেখে ভাড়ার কথা ভেবে দ্বিগুণ আতঙ্কিত হয়ে গুটিগুটি পায়ে অফিস ঘরে ফিরে এলাম। আমাদের ঘর পছন্দ হয়েছে শুনে পূর্বের সেই ভদ্রলোক রেজিস্টারের ঘরগুলো পূরণ করতে বলে, আমাদের সকলের পরিচিতি পত্র নিয়ে জেরক্স করে ফেরৎ দিয়ে দিলেন। এবার জানা গেল একদিনের জন্য আমাদের পনেরোশ’ টাকা ভাড়া দিতে হবে। শুনে তো ভদ্রলোককে একটা প্রণাম ঠুকে দেবো কী না ভাবতে হচ্ছে। জয় মহামানব মহাবীরের জয়। খাতা পূরণ করে ধর্মশালার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তাঁকে এখানে খাওয়া দাওয়ার কোন ব্যবস্থা আছে কী না জিজ্ঞাসা করায় তিনি পাশেই একটি দোকানের কথা উল্লেখ করে জানালেন, যে ওখানে ঘরোয়া খাবার পাওয়া যাবে। ঠিক এইসময় একটা বাচ্চা মেয়েকে ধর্মশালার ভিতরে যেতে দেখে তাকে ডেকে আমাদের খাওয়ার কথা বলে দিয়ে জানালেন, যে এর দোকানের কথাই তিনি বলছিলেন। আমরা মালপত্র নিয়ে নিজেদের ঘরে গিয়ে মহিলাদের দ্রুত স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিতে বলে, আমি ও তরুণ গেলাম খাবারের ব্যবস্থা করতে ও গাড়ির সন্ধানে। একেবরেই ছোট্ট জায়গা। এই জায়গাটা বাস স্ট্যান্ড থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে দোকানপাট নেই বললেই চলে। তবু থাকার পক্ষে এই জায়গাটাই সেরা। গোটা অঞ্চলটায় ইতস্তত সেনা বাহিনীতে চাকরির আশায় আগত অল্প বয়সি ছেলেদের ভিড়। একটা মাত্র গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। নির্দিষ্ট ছোট্ট দোকানটায় গিয়ে দেখি চার-পাঁচজন বয়স্ক পুরুষ মহিলা খাবারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। বাচ্চা মেয়েটা, আর সম্ভবত তার মা খাবার তৈরি করতে ব্যস্ত। জানা গেল এখানে একমাত্র পুরি ও সবজিই পাওয়া যাবে। চারজনের জন্য তাই অর্ডার করে এক কাপ করে চা খাওয়ার সময় জানা গেল, যে ওই চারজন খান্ডোয়ার বাসিন্দা, অন্যান্য কিছু জায়গা ঘুরে এখানে এসেছেন। তাঁরা খাবার খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটা করে স্থানীয় দ্রষ্টব্য স্থলগুলো ঘুরতে যাবেন। তাঁরা উলটো দিকের একটা চায়ের দোকান দেখিয়ে জানালেন, যে ওই দোকানের ভদ্রলোক তাঁদের এই গাড়িটার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমরাও সেইমতো উলটো দিকের দোকানটায় গিয়ে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে অনুরোধ জানালাম। ভদ্রলোকটি জানালেন, যে আজ গাড়ির চাহিদা খুব বেশি, তাই আমাদের চারজনের জন্য তিনি একটা অটোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। গাড়ির যে অভাব, তা আমরা নিজেরাই বুঝতে পারছি, কাজেই এই অবস্থায় আর বাছাবাছির কোন সুযোগ নেই। ঘুরবার জন্য আজকের দিনটাই আমাদের হাতে আছে, কাজেই অটো, টোটো, রিক্সা, মোটর, ঠেলা, যা পাওয়া যায় তাতেই রাজি। তিনি ফোন করে একটা অটো ঠিক করে দিলেন। আমরা ঘরে ফিরে এসে চটপট্ তৈরি হয়ে নিয়ে খাবারের দোকান থেকে আটটা করে পুরি ও সবজি খেয়ে সাড়ে তিনশ’ টাকা বিল মিটিয়ে উলটো দিকের দোকানটায় গিয়ে জানতে পারলাম, যে একটা গাড়ি পাওয়া গেছে। গাড়ি এসে গেল। বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বড় গাড়িটার ড্রাইভার জানালো, যে তার নাম মাকখন। সে আরও জানালো, যে সে আমাদের সমস্ত দ্রষ্টব্যস্থল ভালভাবে ঘুরিয়ে দেখাবে, তবে তাকে আটশ’ টাকা ভাড়া দিতে হবে। বাছাবাছির কোন সুযোগ নেই, ঘরে বসে থাকা ছাড়া দ্বিতীয় কোন অপশনও নেই, কাজেই গাড়িতে উঠে বসলাম।

মাকখন নামে ছেলেটি বেশ ভালো ও ভদ্র। জৈন মন্দিরের সামনেই আমাদের ধর্মশালা এবং আমরা এখন প্রায় তার কাছেই আছি। কাজেই ফেরার সময় জৈন মন্দির দেখার পরিকল্পনা করে আমরা কপিল ধারা দেখতে চললাম। শুনলাম কপিল ধারার দূরত্ব নর্মদা মন্দির থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার মতো। গাড়ি একসময় একটা বড় গেটের কাছে এসে আমাদের নামিয়ে দিলো। লালচে মোরাম ঢালা রাস্তার মতো পথ ভেঙে ডানদিকে নালার মতো জলধারাকে পাশে রেখে আমরা এগিয়ে চললাম। দুপাশে কতকিছুই না বিক্রি করার জন্য মানুষ বসে আছে। শুনলাম এটা নর্মদা নদী, এখানেই কপিল মুনি তপস্যা করেছিলেন। নালার মতো রূপ হলেও জলের রঙ কিন্তু বেশ নীল, চারিপাশে আর যেটা চোখে পড়ার মতো, সেটা সবুজের প্রাধান্য। নদীর পার লাল রঙের পাথরে সিঁড়ির মতো করে বাঁধানো। এখানে বসে সৌন্দর্য উপভোগ করা, ও বিশ্রামের জন্য বেশ কিছুটা জায়গা বাঁধিয়ে দেওয়া ও বসবার জন্য কিছু বেঞ্চি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। তবে এখানে খুব বাঁদরের উৎপাত। নদীর ওপরের ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে গেলাম। জলপ্রপাতটি ছোট, তবে বেশ সুন্দর। বেশ বোঝা যাচ্ছে যে বর্ষার সময় এর সৌন্দর্য অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়।

মাকখন জানিয়েছিল, যে কপিল ধারা থেকে দুধ ধারা প্রায় এক কিলোমিটার মতো পথ, তবে রাস্তা সেরকম ভালো নয়, অনেক সিঁড়ি ভেঙে নামতে হবে। সিঁড়ি ভেঙে নামার ব্যাপার যখন আছে, তখন ফেরার পথে সিঁড়ি ভেঙে ওঠার যন্ত্রণাও অবশ্যই আছে। সঙ্গের দুজন মহিলাই নিজ নিজ হাঁটুর কথা ভেবে আর দুধ ধারা যেতে রাজি হলো না। তাদেরকে কপিলধারার বেঞ্চগুলোয় বসে অপেক্ষা করতে বলে, আমি ও তরুণ গুটি গুটি পায়ে দুধ ধারার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। একসময় সিঁড়ি ভেঙে অনেকটা নীচে নামার সময় দেখলাম দুটো অল্প বয়সি ছেলে একটা বড় হোল্ডঅলের মতো ব্যাগ দুজনে দুদিকে ধরে একপ্রকার প্রায় ছুটেই সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে আসছে। আমাদের দুজনকে নামতে দেখে একজন অপরজনকে হিন্দীতে বললো, আঙ্কেলরা আসছেন, একপাশে সরে দাঁড়া। কাছে এসে তাদের একজন জানালো সামান্যই রাস্তা ধীরে ধীরে নেমে যান। ছেলেটি আরও জানালো, যে সে সেনা বাহিনীতে নির্বাচিত হয়েছে। আমরা তাকে অভিনন্দন জানালে, ছেলেটি জানালো, যে তার সঙ্গীটি তার ভাই, সেও প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হলেও ডাক্তারি পরীক্ষায় চোখে পাওয়ার ধরা পড়ায় সুযোগ পায়নি। ছেলেটার মুখ দেখে খুব খারাপ লাগলো। মনে হয় ওরা দুজন সম্ভবত তুত ভাই। আমরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে একসময় দুধ ধারার সামনে এসে হাজির হলাম। এখানে জলধারা আবার দুভাগে বিভক্ত হয়ে নীচে নেমেছে, এবং জলের রঙ দুধের মতো সাদা। পাশেই দেখলাম মহাঋষি দুর্বাসার প্রাচীন গুহা, অবশ্য গুহার দরজা বন্ধ থাকায় ভিতরে ঢুকে দেখার সুযোগ হলো না। বাইরে দেখলাম লেখা আছে বাবা নরেন্দ্র গিরি নামে একজন এখানকার পূজারি। শুনলাম এখানে নাকি ঋষি দুর্বাসা তপস্যা করেছিলেন। এই জল ধারার নাম আগে নাকি দুর্বাসা ধারা নামে পরিচিত ছিল। এখানে অনেক মানুষের আগমন দেখলাম। তবে চারিদিক ঘুরে দেখার থেকে দুধ ধারার বয়ে যাওয়া জলে ও তার আশপাশে দাঁড়িয়ে ফটো তোলায়, বিশেষ করে সেলফি তোলায় তাদের আগ্রহ অনেক বেশি বলে মনে হলো। ওই জলে আবার একটা সাপকেও সাঁতার কেটে একপাশে যেতে দেখলাম। অনেকগুলো জায়গা দেখতে হবে, এখান থেকে গাড়ির কাছে যেতেও অনেকটা সময় লেগে যাবে। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে এখন বেশ কষ্ট হয়, বুঝতে পারছি বয়স বাড়ছে। যাহোক ধীরে ধীরে একসময় কপিল ধারার কাছে এসেও, দলের দুজনকে দেখতে পেলাম না। গাড়ির কাছে ফিরে এসে ওদের দেখা পেলাম। গাড়িতে উঠে বসলে গাড়ি ছেড়ে দিলো।

মাকখন জানলো, যে সে এবার আমাদের নর্মদার উৎসস্থল দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার পথেই সে আমাদের পুস্কর ড্যাম, সন্ত কবীর সরোবর দেখিয়ে দিলো। একসময় আমরা নর্মদার উৎসস্থলে এসে হাজির হলাম। ছোট্ট বাঁধানো জায়গা, তবে এখানে ভক্ত সমাগম বেশ ভালোই। ছোট্ট একটা বাঁধানো চৌবাচ্চার মতো জায়গা, খুব ধীরে সেখানে জল বার হচ্ছে। জুতো খুলে সেখানে গেলাম। চৌবাচ্চায় জলের থেকে খুচরো পয়সার পরিমাণ বেশি। এই স্থানটার ফটো তোলা নিষেধ, তবে বিশেষ কড়াকড়ি চোখে পড়লো না। বাঁধানো জায়গাটায় ও তার সংলগ্ন সিঁড়িগুলোয় বেশ কিছু নরনারী বসে গান গাইছেন। কয়েকজনকে দেখলাম এগিয়ে গিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে, বাঁপাশে জঙ্গল ঘেরা পথ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে যথেষ্ট বয়সের বেশ কিছু নরনারীও আছেন। মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন হয়েছেন প্রাতঃ স্মরণীয়…… কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের ঘটি লক্ষ্য করে এগিয়ে যাবার মতো, সেই পথ লক্ষ্য করে আমরাও তাদের অনুসরণ করে এগিয়ে চললাম। ডানপাশে ওই জঙ্গলের মধ্যেও দামি সাদা রঙ করা একটা সুবিশাল অট্টালিকা দেখলাম। ওটা কারও বাড়ি, না হোটেল বা গেস্ট হাউস বোঝা গেল না, কারণ এই ব্যাপারে দেখলাম নানা মুনির নানা মত। নির্জন জঙ্গুলে পথ দিয়ে আগের দলকে অনুসরণ করে বেশ কিছুটা এগিয়ে যাবার পর উলটো দিক থেকে একটা অল্প বয়সি কিশোরীকে আসতে দেখা গেল। সে জানালো, যে এই দিকে কিছুই দেখার নেই, আমরা যেদিক থেকে এসেছি, সেই দিকেই কিছুটা দূরে উদগম স্থল আছে এবং সেখানে গাড়িও যায়। আমরা সবাই আবার তার পিছু পিছু আগের জায়গায় ফিরে এলাম। মেয়েটা সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আঙুল দিয়ে আমরা যে রাস্তায় গাড়ি নিয়ে এসেছিলাম, সেই দিকে পথ নির্দেশ করলো। সামনের দলটার সবাই দেখলাম একে একে মেয়েটিকে প্রণাম করতে শুরু করলো। এখন দেখি যাবার সময় দেখা বাঁধানো জায়গা ও সিঁড়িতে প্রচুর নরনারীর সমাগম হয়েছে, ও উচ্চৈঃস্বরে গান গাওয়া শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ সময় সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে,  আমরা আমাদের গাড়ির কাছে ফিরে গেলাম।

এখান থেকে আমরা শ্রী যন্ত্র মন্দির যাবো। যাওয়ার পথে সোন ভদ্র উদগম কেন্দ্র, বা সোন মূড়া  নামক জায়গাটা    দেখে যাবো। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই আমরা মহারাজা সোন উদগম কেন্দ্রের সামনে এসে উপস্থিত হলাম। জায়গাটা সোন মূড়া নামেও পরিচিত। গাছপালা ঘেরা কিছুটা পথ সিঁড়ি ভেঙে পায়ে হেঁটে, এই উদগম কেন্দ্রের কাছে আসতে হয়। ছোট্ট জায়গায় ছোট ছোট কয়েকটি মন্দিরের মতো স্থানে কয়েকটি মূর্তি আছে। সোন উদগম স্থলটিতে একটি চৌবাচ্চার মতো বাঁধানো ঘেরা উদগম কুণ্ডটিতে খুব ধীরে জল পড়লেও, খুচরো পয়সা বা অন্যান্য জিনিস ফেলে ভক্তি প্রদর্শনের ঠেলায়, পবিত্র জায়গাটি অপবিত্র আকার ধারণ করেছে। এই স্থান থেকেই সোন নদীর জন্ম বলে জানা গেল। এখানেও সবুজের প্রাধান্য লক্ষ্য করার মতো। গাছপালা ঘেরা বেশ কিছুটা পথ নীচে নেমে ভালো লাগলো। নীচে দূরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বেশ সুন্দর। আমার চোখে তো নর্মদার উৎসস্থলের থেকে সোন নদীর উৎসস্থলটি অনেক বেশি সুন্দর বলে মনে হলো। তবে এই জায়গাটা মনে হয় আরও একটু যত্ন আশা করতেই পারে। এখানে বাঁদরের উৎপাত বেশ বেশি, এবং তার জন্য বাঁদরের থেকে বাঁদরকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেওয়া মানুষরাই দায়ী। এখানে আসার সময় যেমন মহানন্দে সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে এসেছিলাম, ফেরার সময় সেই একই পথকে আর সেরকম সুখকর মনে হলো না। ধীরে ধীরে গাড়ির কাছে ফিরে এলাম।

গাড়ি ছেড়ে দিলো এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা শ্রী যন্ত্র মন্দিরের কাছে এসে উপস্থিত হলাম। বাদামি রঙের বেশ উঁচু মন্দিরের আকারের প্রবেশ দ্বারটির একবারে উপরে, চার মাথা বিশিষ্ট বিশাল মূর্তিটি দেখবার মতো। জানা গেল, যে ওগুলো লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী, ও ভূবনেশ্বরীর মুখ। বিশাল আকৃতির এই চারটি মাথার ঠিক নীচে অনেকগুলি মূর্তি আছে। প্রতিটা মূর্তিই খুব সুন্দর, শুনলাম চার মাথার নীচে অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট মূর্তিগুলি চৌষট্টি যোগিনীর। মন্দিরটি এখনও অসম্পূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, এবং এটি সম্পূর্ণ হতে নাকি এখনও দশ বছর সময় লাগবে। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে মূর্তিগুলি দর্শন করে ও ছবি তুলে, যদিও সেই মূহুর্তে সূর্যদেবের অবস্থান আমার মতো একজন আনাড়ি ফটোগ্রাফারের পক্ষে খুব সুখকর ছিল না, গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে গিয়ে জানা গেল, যে সরকারি নির্দেশে দীর্ঘদিন মন্দিরটি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। দর্শনার্থী জনগণকে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না। কেন দেওয়া হয় না, কেনই বা কাজ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে জানা গেল না, কারণ মন্দির কর্তৃপক্ষের কোন লোককে কাছেপিঠে দেখা গেল না। যাঁরা ভিড় করে আছেন, তাঁরা আমাদের মতোই দর্শনার্থী। কোথাও কোন বোর্ডে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে কোন নোটিশ চোখে পড়লো না। বাইরে থেকে যেটুকু দেখা গেল, তাতে বেশ বোঝা যায় যে ভিতরে অনেকখানি জায়গা নিয়ে এই মন্দির এবং তা বেশ সাজানো গোছানো। বাইরে বেরিয়ে গাড়ির কাছে এসে একটা বোর্ডে আবার দেখলাম লক্ষ্মী মাতা মন্দির বলে উল্লেখ করা আছে।

গাড়ি ছেড়ে দিলো। আমরা প্রাচীন মন্দিরের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম। প্রাচীন মন্দিরের গেটে পৌঁছে মাথাপিছু পঁচিশ টাকা করে টিকিট কেটে আমাদের ভিতরে ঢুকতে হলো। অন্যান্য অনেক জায়গার মতো এখানেও দেখলাম ভিডিও ফটোগ্রাফির জন্য পঁচিশ টাকা চার্জ নেওয়া হয়, মোবাইলে ভিডিও ছবি তুললে এই আইনের আওতায় পড়ে না। মন্দির প্রাঙ্গণে যাওয়ার আগে লক্ষ্য করলাম, যে এখানে প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা আছে। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এখানে অনেকগুলো প্রাচীন মন্দির আছে, তাই বোধহয় এটা গ্রূপ অফ্ টেম্পলস্ নামেও পরিচিত। কথিত আছে অষ্টম শতাব্দীতে আদি শঙ্করাচার্য নর্মদা নদীর উৎসস্থল হিসাবে একটি সূর্য কুণ্ড স্থাপন করেন। তিনি এখানেও একটি শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে কালচুরি রাজবংশের রাজা, কর্ণদেব (১০৪১-১০৭২) এখানে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্দিরের গর্ভগৃহটি প্রায় দেড় মিটার (১.৪০) নীচে প্রতিষ্ঠা করার কথা ছিল, তাই এই মন্দিরটি পাতালেশ্বর মন্দির নামেও পরিচিত। এই মন্দিরটিই কালচুরি রাজবংশের রাজা কর্ণদেবের প্রতিষ্ঠিত শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য বলা হয়। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বহু মন্দির থাকলেও প্রধানত পাতালেশ্বর, শিব, ও কর্ণ মন্দির উল্লেখযোগ্য। আমরা একে একে সময় নিয়ে শিব মন্দির, বিষ্ণু মন্দির, শ্রীপতি নারায়ণ ভগবান ওঙ্কার স্থান, নর্মদা মন্দির, প্রাচীন কুণ্ড, কর্ণ মন্দির ঘুরে ঘুরে দেখলাম, ছবি তুললাম। শিব মন্দির ও বিষ্ণু মন্দির দুটি একবারে পাশাপাশি অবস্থিত। কর্ণ মন্দিরটি দেখলাম ত্রিমুখী মন্দির নামেও পরিচিত। এই মন্দিরটির দরজায় তারের জাল লাগানো আছে। এর ভিতরে নাকি তিনটি গর্ভগৃহ আছে। নরেশ কর্ণ দেব এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পঞ্চমাথা মন্দিরটি পাঁচটা মন্দিরের সমন্বয়। এই প্রাচীন মন্দিরের প্রাঙ্গন থেকে বহুদূরে আমাদের সর্বোদয়া জৈন ধর্মশালার কাছে জৈন মন্দিরটি দেখে, দূর থেকে কলকাতার ফরটি টু বিল্ডিংটি দেখার কথা মনে পড়ে গেল। প্রাচীন মন্দিরের এই বিস্তীর্ণ এলাকা, ও তার মাঝে এতগুলো মন্দির দেখে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, যে ওরা প্রাচীন ঐতিহ্যকে যত্ন ও রক্ষা করতে জানে। দেখা শেষ এবার ফিরতে হবে, তবে অত ঘটা করে ইংরেজিতে Lunch Area ও হিন্দীতে অল্প ভোজন স্থল লেখা জমকালো রঙিন পাথরের ফলকটার কাছে কারা বসে অল্প ভোজন করে জানতে না পারায়, মনের দুঃখে বাইরে বেরিয়ে আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। এবার আমরা নর্মদা নদীর মূল মন্দিরটি দেখতে যাবো।

নর্মদা মুখ্য মন্দিরটি খুব বেশি দূরে নয়, আমরা নর্মদা মন্দিরের গেটের কাছে এসে গাড়ি থেকে নামলাম। এই মন্দির প্রাঙ্গণ শুনলাম সকাল সাড়ে ছ’টা থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত খোলা থাকে। দুপুর বারোটার সময় ভোগ খাওয়া যায় এবং সকাল ও সন্ধ্যার সময় আরতি হয়। ভিতরে একটি কুণ্ড আছে যেখানে থেকে জল কপিল ধারা পর্যন্ত বয়ে যায়। ভিতরে অনেকগুলো মন্দির আছে। সাদা রঙের এই উজ্জ্বল মন্দিরগুলির গঠনশৈলী খুব একটা উল্লেখযোগ্য না হলেও, মন্দির চত্বরকে শুধুমাত্র ব্যবসাক্ষেত্র না ভেবে কিভাবে পবিত্র ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়, এই মন্দির কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শিখতে হয়। বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রতিটা মন্দির, কুণ্ড, হাঁটার রাস্তায় কোথাও তেলকালি, জঞ্জাল, বা ধুলো মাখা অপরিচ্ছন্নতা দেখবার দুর্ভাগ্য হয়নি। মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে একটা হাতির মূর্তি আছে, যার পায়ের তলা দিয়ে একপাশ থেকে অপর পাশে গেলে, পূণ্য সঞ্চয় হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। ছোট্ট এই হাতির পায়ের তলা দিয়ে পূণ্যের আশায় মানুষ দণ্ডী কাটার মতো করে বহু কষ্টে একপাশ থেকে অপর পাশে গিয়ে শান্তি লাভ করেন। মন্দিরটি ঘুরে দেখতে অনেকক্ষণ সময় লাগে। অন্য সময় কি হয় জানি না, তবে আমরা বেশ ফাঁকায় ফাঁকায় ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তবে এই মন্দিরের দুটো জিনিস অনায়াসে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান করে নিতে পারে, তা হোল মন্দির চত্বরে শিব লিঙ্গ ও বাঁদরের সংখ্যা। যাইহোক, বাইরে বেরিয়ে ধীরে ধীরে গাড়িতে ফিরে এলাম। এবার জৈন মন্দির দেখে ধর্মশালায় ফেরার কথা।

বিকালের দিকে আমাদের ধর্মশালার গেটের কাছে মাকখন তার গাড়ি দাঁড় করালো। রাস্তার উলটো দিকেই জৈন মন্দির, কাজেই তাকে আর আটকে রাখার কোন মানে হয় না। ছেলেটা বড় ভালো ও ভদ্র, তাছাড়া এখানে যে কারণেই হোক, গাড়ির দেখলাম বেশ অভাব। তাই তার সাথেই আগামীকাল পেন্ড্রা রোড চলে যাবো ঠিক করলাম। প্রস্তাবটা শুনে সে এক কথায় রাজি হয়ে গিয়ে জানালো, যে দুপুর সাড়ে এগারোটা নাগাদ একটা MEMU পেন্ড্রা রোড স্টেশন থেকে ছাড়ে, ওই গাড়িতে বিলাসপুর চলে যাওয়া আমাদের পক্ষে সুবিধাজনক হবে। ঘন্টা আড়াই মতো সময় লাগে বটে, তবু মালপত্র নিয়ে যাওয়া, তাই গাড়িটায় কিরকম ভিড় হয় জানতে চাইলে সে জানালো, যে ট্রেনটা পেন্ড্রা রোড স্টেশন থেকেই ছাড়ে, তাছাড়া আমরা হাতে একটু সময় রেখেই ওখানে পৌঁছাবো, কাজেই কোন সমস্যা হবে না। বিলাসপুর স্টেশনে গিয়ে আমাদের বাড়ি ফেরার ট্রেনের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে বটে, তবু শেষ দিনটায় কোন ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া বিলাসপুর থেকে সাঁত্রাগাছি ফেরার ১৯৬৬০ নম্বর শালিমার এক্সপ্রেসে আমাদের আবার চারজনের মধ্যে দুজনের বাতানুকূল থ্রী টায়ার স্লীপার ক্লাসের কনফার্মড টিকিট, ও দুজনের জেনারেল থ্রী টায়ার স্লীপার ক্লাসের কনফার্মড টিকিট আছে, কিন্তু তাও আবার তিনটে বগিতে। বাতানুকূল থ্রী টায়ারে চারজনের মধ্যে দুজনের নাম এখনও ওয়েটিং লিস্টে একবারে প্রথমে জ্বলজ্বল করছে, কাজেই ওই সাড়ে এগারোটার MEMUতেই যাওয়া স্থির করে ফেলা হলো। মাকখন জানালো যে তাকে আটশ’ টাকা ভাড়া দিতে হবে। সে জানালো যাওয়ার পথে সে আমাদের অন্য পথে নিয়ে গিয়ে, বিখ্যাত অমরেশ্বর মন্দিরটা দেখিয়ে দেবে। আলাদা করে এখান থেকে অমরেশ্বর মন্দির দেখতে গেলে অনেক টাকা ভাড়া লেগে যায়, তবে আমাদের আর অতিরিক্ত কোন টাকা দিতে হবে না। এই পনেরো দিন ধরে মহেশ্বর, ওমকারেশ্বর, মামলেশ্বর, ইত্যাদি সবার সাথেই দেখা সাক্ষাৎ করে এসেছি, কাজেই অমরেশ্বরকেই বা বঞ্চিত করি কেন? তাই তাঁকেও একবার দেখে যাওয়া স্থির হলো। জয় অমরেশ্বরের জয়। আগামীকাল সময়মতো গাড়ি নিয়ে চলে আসতে বলে মাকখনকে বিদায় জানিয়ে, ধর্মশালায় নিজেদের ঘরের দিকে এগলাম। যাওয়ার পথে ডানদিকে বিশাল ক্যান্টিন, সেখানে দেখলাম বিশাল খাওয়া দাওয়ার পর্ব চলছে। কি কি রান্না হয়েছে জানি না, তবে খাওয়ার বা খাবার পরিবেশন করার লোকের অভাব নেই। এরা সকলেই সেনা বাহিনীর বা সেনা বাহিনীতে চাকরির আশায় আসা অল্প বয়সি ছেলেরা। মনে হয় এতো বড় ক্যান্টিন যখন আছে, তখন এই ধর্মশালায় খাওয়ার ব্যবস্থাও হয়তো আছে। মনে হয় এই বিশেষ দলটার খাওয়ার ব্যবস্থা করায় বা খাওয়ানোর দায়িত্ব পড়ায়, সাধারণ বোর্ডাররা এখন এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ঘরে গিয়ে তরুণের কাছে প্রথম যে সুসংবাদটা পেলাম, সেটা ভারতীয় রেলওয়ে না অমরেশ্বরের কৃপায় জানি না, তবে আমাদের দুজনের বাতানুকূল থ্রী টায়ারের টিকিট ওয়েটিং লিস্ট থেকে কনফার্মে উন্নীত হয়েছে। মনটা খুশিতে ভরে গেল, এবার নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। মনের আনন্দে সামান্য সময় বিশ্রাম নিয়ে আবার বেরোলাম উলটো দিকের বিখ্যাত জৈন মন্দির দেখতে। সকালবেলা খাবারের অর্ডার ও গাড়ির ব্যবস্থা করতে যাওয়ার সময় আমি ও তরুণ একবার ঢুঁ মেরে এসেছিলাম।

শুনলাম বিগত কুড়ি বছর ধরে নাকি মন্দিরটা তৈরি হচ্ছে। মন্দিরটা এখনও অসমাপ্ত, এবং এখনও হয়তো অনেকগুলো বছর কেটে যাবে সম্পূর্ণ হতে। প্রায় চার একর জমির ওপর একশ’ চুয়াল্লিশ ফুট উঁচু, চারশ’ চব্বিশ ফুট লম্বা, ও একশ’ এগারো ফুট চওড়া এই পাথরের মন্দিরটি তৈরির কাজ এখনও পুরোদমে চলছে। তাই অসমাপ্ত মন্দিরটার কাছে যেতে গেলে, বা ভিতরে ঢুকতে গেলে, পাথর ফেলা এবড়ো খেবড়ো জায়গার ওপর দিয়ে সাবধানে যেতে হবে। তাছাড়া সম্ভবত পাথর কাটা বা পালিশ করার জন্য, সমস্ত এলকাটা ধুলোয় ভরা। মন্দিরের মুখোমুখি দুটো অংশের কাজ একসাথে চলছে। জানা গেল, যে এখানে রাজস্থানের অনেক শ্রমিক পাথর কাটা, পাথরের ওপর কাজ, বা মূর্তি তৈরির কাজ করেন। ঢুকবার মুখে একটা অনেক উঁচু, অনেকটা শহিদ মিনারের গঠনের মতো অংশ, কলকাতা বিয়াল্লিশের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নীচ থেকে ঘাড় উঁচু করে দেখে মনে হলো, সম্ভবত এগারো তলা একটা মিনার তৈরি হচ্ছে। মিনারটির একবারে ওপর কাচ দিয়ে ঘেরা একটা মন্দির মতো। তবে মিনারটির নীচ থেকে একবারে ওপরে কাচ ঘেরা অংশের নীচ পর্যন্ত, আগাগোড়া বাঁশ দিয়ে ঘিরে মিনারটি তৈরির কাজ চলছে। এর ঠিক উলটো দিকে প্রকৃত মূল মন্দিরটি অবস্থিত। খুব সাবধানে পা ফেলে ফেলে মন্দিরটির কাছে এগিয়ে চললাম। মন্দিরটি দেখলে গুজরাটের অক্ষরধাম মন্দিরের কথা মনে পড়ে যায়। মন্দিরটির বাইরে ও ভিতরের দেওয়ালে সুন্দর সুন্দর পাথরের মূর্তি, এবং ছাদের কাজও দেখার মতো। মন্দিরটির ভিতরের অংশের কাজ এখনও শেষ হয়নি, কিন্তু এখনই এর ভিতরের চোখ জুড়িয়ে যাওয়া সৌন্দর্য ও নিপুণ হাতের কাজ দেখলে, মন্দিরটির নির্মাণ কার্য শেষ হলে যে কি দাঁড়াবে, আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না। মন্দিরটির বাঁপাশে অনেকটা অংশ জুড়ে কোন একটা বাড়ি বা ওই জাতীয় কিছু তৈরির কাজ চলছে। ভিতের ঠিক ওপরে চৌবাচ্চার মতো অংশ থেকেই বড় বড় পাথর বসিয়ে সেটার নির্মাণ কাজ দেখে মনে হলো, এই অংশটিও পাথর দিয়ে তৈরি করা হবে। এখানে কিছু শ্রমিকের কথা মতো ওটা মন্দিরের সন্ন্যাসী বা মন্দির সংক্রান্ত অন্যান্য মানুষের থাকার জায়গা তৈরি হচ্ছে। মন্দিরটি তৈরি করতে নাকি কুড়ি কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। মন্দিরটির ভিতরে শেষ প্রান্তে ভগবান আদিনাথের একটি মূর্তি আছে, যদিও মূর্তিটি পলিথিন দিয়ে মুড়ে রাখা আছে বলে ভালভাবে দেখার সুযোগ হলো না। তবে শুনলাম পৃথিবীর সর্ববৃহত এই দশ ফুট উঁচু মূর্তিটি নাকি অষ্টধাতুর তৈরি, এবং মূর্তিটির ওজন নাকি চব্বিশ টনের ওপর।

দীর্ঘক্ষণ ঘুরে ঘুরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, ছবি তুলে, বেঁচে থাকলে মন্দিরটির নির্মাণ কার্য শেষ হলে আবার একবার এসে দেখে যাবার বাসনা নিয়ে, বাইরের রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। আমাদের এবারের ট্যুরের পরিকল্পনা মতো সমস্ত দেখা শেষ, অবশ্য মাকখনের কথামতো আগামীকাল ফেরার পথে অমরেশ্বর মন্দির দেখার কথা। এখানে দেখলাম আঁখের রস বিক্রি হচ্ছে। আমার মতো সকলেরই দেখলাম এই আঁখের রসের প্রতি যথেষ্ট আসক্তি। আঁখের রস খেয়ে মন প্রাণ জুড়িয়ে গেলে, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও স্থানীয় মার্কেটে একবার যেতেই হলো। টুকটাক কিছু উপহারের জিনিস নাকি এখনও কিনতে বাকি রয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ দোকানগুলোয় ঘুরে ঘুরে সময় ব্যয় করলাম। অন্ধকার নেমে এসেছে, মন্দির ও মিনারের চূড়ায় দেখলাম আলো জ্বলে উঠেছে। এবার ধর্মশালায় ফেরার পালা। ঘরে এসে শুয়ে বসে গুলতানি করে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে, আমি ও তরুণ গেলাম বাইরে থেকে কিছু রাতের খাবার কিনে আনতে। আগেই বলেছি, যে এই অঞ্চলটা বাস স্ট্যান্ড বা প্রকৃত শহর থেকে অনেকটাই দূরত্বে। এখানে হোটেলের খুব অভাব, দু-একটা ছোট ছোট চায়ের দোকান ছাড়া খাবারের সেরকম কোন দোকান নেই। বেড়াতে গিয়ে যাঁদের কাছে ভালো বা পছন্দের খাবার খাওয়াটাও একটা মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে বলে মনে হয়, তাঁদের এই জায়গাটায় না থাকাই শ্রেয়। যাঁরা ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে নিরিবিলি স্থানে থাকতে পছন্দ করেন, বা যাঁরা দু-একটা দিন যাহোক পেট ভরানোর মতো কিছু খাবার পেলেই খুশি, তাঁদের পক্ষে এই এলাকাটা অবশ্যই থাকার পক্ষে উপযুক্ত বলে মনে হবে। যাইহোক, রুটি আর একটা ভাজা কিনে নিয়ে ঘরে ফিরে এলাম।

আজ ফেব্রুয়ারী মাসের পনেরো তারিখ, আজই আমাদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার দিন। চা খেয়ে সমস্ত মালপত্র গুছিয়ে নিলাম। পেন্ড্রা রোড থেকে সাড়ে এগারোটার সময় ট্রেন, কাজেই তার বেশ কিছু আগেই আমাদের পেন্ড্রা রোড স্টেশনে গিয়ে পৌঁছতে হবে। বিলাসপুর থেকে ফেরার ট্রেনের বাতানুকূল থ্রী টায়ারের চারটে টিকিটই কনফার্মড হয়ে যাওয়ায়, এখন আমরা অনেকটাই চিন্তা মুক্ত। স্নান সেরে ধীরে ধীরে নিজেরা তৈরি হয়ে নিয়ে মাকখনকে ফোন করে জানা গেল, যে সে গাড়ি নিয়ে ধর্মশালার গেটের কাছে অপেক্ষা করছে। একসময় মালপত্র নিয়ে নীচে নেমে এলাম। ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে যাবার সময় আজও প্রায় বিয়ে বাড়ির ব্যস্ততা চোখে পড়লো। অফিস ঘরে ঘরের চাবি ফেরৎ দিয়ে, একটা দোকান থেকে চা বিস্কুট খেয়ে, আমরা মাকখনের গাড়িতে আশ্রয় নিলাম। আমাদের গাড়ি এগিয়ে চললো। জানি না এই জীবনে আর দ্বিতীয়বার এখানে আসার সুযোগ হবে কী না। বিদায় অমরকন্টক, বিদায়।

বেশ কিছুক্ষণ পরে কথামতো আমাদের গাড়ি অমরেশ্বর মন্দিরের গেটের বাইরে এসে দাঁড়ালো। অতি সাধারণ মন্দিরের গেট দেখে মোটেই ভালো লাগলো না। মন্দিরের প্রবেশ পথের সামনেই একটা বেশ বড় বৃষ মূর্তি। বাইরের গেটের মাথায় শিবদূর্গার ছবি, মন্দিরটির নাম অমরেশ্বর মন্দির, কাজেই বৃষ মূর্তি থাকাটাই স্বাভাবিক। আমরা মন্দিরে প্রবেশ করলাম। ভিতরে প্রবেশ করে প্রথম যে কথাটা মনে হলো— এই মন্দিরটা না দেখে ফিরে গেলে অমর কন্টক দেখা হয়তো অপূর্ণই থেকে যেত। মন্দিরের গেট ও বাইরের অংশটি অতি সাধারণ হলেও, মার্বেলে মোড়া ভিতরের ঝকঝকে বিশাল অংশটি সত্যিই খুব সুন্দর। দুপাশে পরপর অনেকগুলো দেবদেবীর মূর্তি ও শিবলিঙ্গ দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো মন্দিরটির একবারে শেষপ্রান্তে মন্দিরের আকারে ঘেরা অংশটির ভিতরে কালো রঙের বিশাল শিবলিঙ্গটি, এই জাতীয় অনেক মন্দিরেরই ঈর্ষার কারণ হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। এই মূর্তিটির ঠিক নীচে একজন বেশ সৌম্য চেহারার পুরোহিত বসে আছেন। তিনি জানালেন যে ইন্দোরের এক মহারাজ, ২০১৮ সালের সাতাশে এপ্রিল এটি প্রতিষ্ঠা করেন। স্বামী প্রেমানন্দজী মহারাজ নামে এক ভদ্রলোকের ছবি পাশে রাখা আছে দেখলাম, জানি না এই ভদ্রলোকই পুরোহিত উল্লিখিত ইন্দোরের সেই মহারাজ কী না। মহিলারা শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালার ইচ্ছা প্রকাশ করলে, তিনিই জলপূর্ণ তামার ঘটি তাদের হাতে দিয়ে তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। মূর্তিটি এতটাই উঁচু, যে মহিলাদের শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালার জন্য, পাশের সিঁড়ি দিয়ে প্রায় দোতলা সমান উচ্চতায় ঘটি হাতে উঠতে হলো। শুনলাম মূর্তিটি কষ্টিপাথরের তৈরি। আমরা ছাড়া মন্দিরে আর কোন দর্শনার্থী নেই। পুরোহিত ভদ্রলোক আমাদের একবার মন্দিরের ছাদে গিয়ে ঘুরে দেখতে বললেন। মন্দিরের বাইরে দিয়ে ছাদে ওঠার সিঁড়ি। আমরা বাইরে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠলাম। পরপর অনেকগুলো ছোট ছোট মন্দির দিয়ে ছাদটি সাজানো। কিছু ছবি তুলে আমরা নীচে নেমে এলাম। জায়গাটা একবারে ফাঁকা, খুব বেশি লোকজনের বাস বলেও মনে হলো না। তবে যে কয়জন মানুষ চোখে পড়লো, তারা যে দারিদ্র সীমার নীচে অবস্থান করেন, তা বুঝবার জন্য কোন শংসাপত্রের প্রয়োজন হয় না। মন্দিরটির কাজ এখনও শেষ হয়নি। শেষ হলে হয়তো দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়বে, আর দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লে হয়তো তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার কিছু উন্নতি হবে।

আমরা পেন্ড্রা রোডের রাস্তা ধরলাম। একসময় আমরা পেন্ড্রা রোড স্টেশনের পাশে গাড়ি রাখার জায়গায় এসে মালপত্র নিয়ে নামলাম। আমাদের দেখে এখান থেকে অমরকন্টক যাওয়ার সেই লজঝড়ে মারুতি ওমনির বৃদ্ধ ড্রাইভার ভদ্রলোক এগিয়ে এসে করমর্দন করে বললেন, আমায় ফোন করলেন না কেন আমিই নিয়ে আসতাম। আমরা তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে স্টেশন প্ল্যাটফর্মে এসে হাজির হলাম। টিকিট কাটতে গিয়ে জানা গেল, যে বিলাসপুরগামী একটা MEMU এগারোটা পঁচিশ মিনিটে আছে বটে, তবে সেটা শাহদল থেকে ছেড়ে এসে এখানে দু’মিনিট দাঁড়িয়ে একশ’ এক কিলোমিটার দূরের বিলাসপুর পৌঁছায় দুপুর একটা পঞ্চান্ন  মিনিটে। চারটে টিকিট একশ’ টাকা দিয়ে কাটার সময় ভদ্রলোক জানালেন, যে এই ট্রেনটায় বিশেষ ভিড় হয় না, কাজেই আমরা বসবার জায়গা পেয়ে যাবো। বিলাসপুর পৌঁছে দুপুরের খাবার খাওয়া হবে, তাই আমি ও তরুণ বাইরে গিয়ে কিছু জলখাবার কিনে নিয়ে এলাম। প্ল্যাটফর্মে ভিড় ক্রমশঃ বাড়ছে দেখে চিন্তা বাড়ছে। শেষে ট্রেন এসে হাজির হলে উঠে পড়লাম। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসার জায়গাও পাওয়া গেল। মোটামুটি প্রায় ঠিক সময়েই এসে আমরা বিলাসপুর স্টেশনে নামলাম। এখন প্রায় দুটো বাজে, আর এখান থেকে আমাদের যাওয়ার ট্রেন ছাড়ার সময় প্রায় রাত দশটায়। প্রায় আটটা ঘন্টা আমাদের ট্রেনের প্রতীক্ষায় এই স্টেশনে বসে কাটাতে হবে। মালপত্র নিয়ে আমরা আপার ক্লাস প্রতীক্ষালয়ে গিয়ে হাজির হলাম। কপাল ভালোই বলতে হবে, পায়ের কাছে সমস্ত মালপত্র সাজিয়ে রেখে আমরা চারজন পাশাপাশি বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। পাশেই পরপর কয়েকটা খাবারের দোকান ছাড়াও রয়েছে রেলওয়ে ভোজনালয়। দুজন দুজন করে গিয়ে খাওয়া দাওয়ার পর্বও চুকিয়ে ফেলা গেল। এবার শুধু প্রতীক্ষা আর প্রতীক্ষা। মহিলাদের জিম্মায় মালপত্র রেখে, আমি আর তরুণ গেলাম স্টেশন ও স্টেশনের বাইরেটা ঘুরে দেখে আসতে। এখানে দেখলাম ওভারব্রিজে ওঠার জন্য লিফট্ ও এক্সকালেটরের ব্যবস্থা আছে, কাজেই কষ্ট করে মালপত্র বয়ে নিয়ে ট্রেনের কাছে যাওয়ার চাপ নেই।

বিলাসপুর রেলওয়ে স্টেশনটা দেখলাম খুব সুন্দর ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। তাছাড়া নানারকম ছবি দিয়ে সাজানোও বটে। স্টেশনের বাইরের অংশটাও খুব সন্দর। স্টেশনের পাশে অনেকটা জায়গা রেলের অধিকারে। ছোটখাটো দোকানগুলো পর্যন্ত স্টেশন থেকে অনেক দূরে। এদিক ওদিক বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে প্রতীক্ষালয়ে ফিরে এলাম। বসে বসে মাঝে মাঝে চা কফি খেয়ে সময় কাটতে লাগলো। দুপুরে অনেক বেলায় খাওয়া হয়েছে, তাছাড়া আজ সারা রাত ট্রেন জার্নি আছে, তাই কিছু ড্রাই ফুড ও কলা কিনে নিয়ে এসে রাতের খাবার খেয়ে নেওয়া হলো।

সব কিছুর একটা শেষ আছে, প্রতীক্ষারও শেষ আছে। একসময় আমাদের ট্রেন, ১৯৬৬০ নম্বর শালিমার এক্সপ্রেসের আগমন বার্তা ঘোষণা করা হলো। আমরা নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে গিয়ে হাজির হলাম। আমাদের চারজনের আবার দুটো বগিতে জায়গা পাওয়া গেছে। একসময় ট্রেন এলে যে যার নিজ নিজ বগিতে গিয়ে জায়গা দখল করলাম। কিছু করার নেই, তাই কিছুক্ষণ পরে শয্যা নিলাম।

ঘুম ভাঙলো বেশ ভোরে। তরুণরা আমাদের বগির ঠিক একটা পরের বগিতে আছে। ফোনে কথা বলা ছাড়াও, ও একবার আমাদের বগিতে ঘুরেও গেল। আরও কিছুক্ষণ পরে ওরা দুজনে মালপত্র নিয়ে আমাদের বগিতে চলে এলো। আন্দুলে ট্রেনটা দাঁড়াতে, আমরা খুব দ্রুত নেমে পড়লাম। ওদের বেশ সুবিধাই হলো, কারণ ওদের এখানেই বাড়ি। সুবিধা আমাদেরও হলো, সাঁত্রাগাছিতে নামলে মালপত্র নিয়ে ওভারব্রিজ ভেঙে ট্রেনের জন্য আসতে হতো। কিন্তু এই স্টেশনে নেমে পড়ায়, পিছনে আসা ই.এম.ইউ. তে উঠে পড়লাম। তরুণরা আমাদের তুলে দিয়ে নিজেদের পথ ধরলো। আমরাও নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরে এলাম। শেষ হয়ে গেল দীর্ঘদিনের মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণ পর্ব।

সুবীর কুমার রায়

১৮-০৩-২০২০

 

 

 

কত অজানা রে

71946068_1338812139627865_3484388348838019072_n দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর কেটে গেলেও, অতনু কিন্তু সেদিনের সেই লোকটাকে আজও ভুলতে পারেনি। অল্প কিছু সময়ের পরিচয়, কিন্তু তারমধ্যেই তার সহানুভুতি অতনুকে অবাক করেছিল।

আঠারো বছর বয়সের অতনু, অপঘাতে মৃত কুড়ি বছরের এক নিকটাত্মীয়র মৃতদেহ নিয়ে সারাদিন মর্গ বা অন্যান্য ঝামেলা মিটিয়ে, অল্প কিছু সহযাত্রীর সাথে স্থানীয় এক শ্মশানঘাটে এসে হাজির হলো। শ্মশানের সাথে পরিচয় তার বছরখানেক-বছর দেড়েক, তবে সেগুলো তো নেহাতই সন্ধ্যা বেলা কলেজের ক্লাস কেটে, তিন-চারজন সহপাঠীর সাথে গঙ্গার ধারে, বা বৈদ্যুতিক চুল্লিবিহীন স্থানীয় শ্মশান ঘাটে আড্ডা মেরে। একবার অবশ্য কলকাতার এক মহাশ্মশানে মৃতদেহ সৎকার করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তার হয়েছিল। তবে সেখানে আরও অনেকের সাথে সঙ্গী হিসাবে যাওয়া, ও বৈদ্যুতিক চুল্লিতে মৃতদেহ দাহ করার প্রথম চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা লাভ করা।

প্রায়ই সে তার বন্ধুদের সাথে কলেজের কাছেই গঙ্গার ধারে যে শ্মশান ঘাটে আড্ডা দিতে যায়, আজকের এই শ্মশানটাও তারই মতো শুধুমাত্র কাঠের চুল্লিতেই শবদেহ দাহ করা হয়, তবে এটা গঙ্গার ধার থেকে বেশ কিছুটা দূরে ও অপরিস্কার। একটা চুল্লিতে শবদাহ প্রায় শেষের দিকে, আগুন প্রায় নিভে এসেছে। একজন, যাকে সকলে ডোম বলে, হাতে একটা বাঁশ নিয়ে আগুনের মাঝে নেড়েচেড়ে খুঁচিয়ে, দাহকার্য সুসম্পন্ন করতে ব্যস্ত। বেশ কিছু মানুষ সেই আগুনের পাশে অন্তিম কাজের জন্য অপেক্ষারত, তবে তাদের মধ্যে কয়েকজন যুবক কিভাবে খোঁচালে সুবিধা হবে, এরপরে কি করা উচিৎ, ইত্যাদি ডোমকে পরামর্শ দিচ্ছে। তাদের আচরণ ও কথাবার্তা শুনে মনে হতেই পারে, যে তারা কোন আনন্দানুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছে। নেশার ঝোঁকে এদের অনেকেরই সুষ্ঠুভাবে দাঁড়াবার ক্ষমতা পর্যন্ত নেই। এদের কাজ শেষ হলে অতনুদের নিয়ে আসা মৃতদেহের চিতা সাজানো হবে। এখনও কাজ শুরু হতে দেরি আছে, তাই অতনুর সাথে আসা কাছেপিঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সঙ্গীরা কেউ ফিরে আসেনি। দীর্ঘক্ষণ মৃতদেহ আগলে, অতনু কাজ শুরু হওয়ার অপেক্ষায় বসে আছে।

কিছুক্ষণ পরে সেই একই ব্যক্তি একটা একটা করে কাঠ সাজিয়ে চিতা সাজাতে শুরু করলে, একে একে প্রায় সকলেই ফিরে এসে মৃতদেহের কাছে দাঁড়ালো। চিতা সাজাবার সময় বেশ কয়েকবার একটা বোতল থেকে পানীয় গলায় ঢালায়, কাজটা ভালভাবে শেষ করতে পারবে কী না ভেবে অতনু চিন্তায় পড়লো। অতনু তাকে একবার ভালভাবে চিতা সাজাবার কথা অনুরোধ করায়, সে টলমলে পায়ে অতনুর কাছে এসে তার কাঁধে একটা হাত রেখে দাঁড়ালো। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল, মুখ দিয়ে পানীয়র উগ্র উৎকট গন্ধ। সে সামান্য জড়ানো গলায় অতনুকে বললো, “খোকাবাবু চিন্তা করো না, তোমার জন্মের আগের থেকে আমি এই কাজ করছি। ডেডবডি চিতায় তোলার আগে পুরুত মশাইকে ডেকে তাঁর কাজটা শেষ করে নাও”।

তাই করা হলো। মৃতদেহ চিতায় শোয়ানো হলো। এই পর্বের সবথেকে কঠিন কাজ, অতি আপনজনের মুখে জ্বলন্ত পাটকাঠির আগুন স্পর্শ করার কাজটাও কাঁপা হাতে সজল চোখে, অতনুকেই করতে হলো। চিতায় আগুন দেওয়ার পরে একসময় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করলে, সবাই পাশের একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলো। চিতার একটু দূরে, অতনু একা বসে। ডোম তার কাজের ফাঁকে ফাঁকে পানীয়র বোতল থেকে তরল পানীয় গলায় ঢালছে।

অনেকক্ষণ পরে সে এসে অতনুর ঠিক পাশে বসে জড়ানো গলায় বলে, “খোকাবাবু মন খারাপ করো না। আমরা সবাই একটা নির্দিষ্ট আয়ু নিয়ে এই পৃথিবীতে আসি। সেটা কারও ক্ষেত্রে খুব কম, কারও ক্ষেত্রে বেশি। জন্মাবার সময়েই বিধি মানুষের কপালে সেটা লিখে দেন। সেই ললাট লিখন কখনও মোছা যায় না, বদলানোও যায় না। আমরা কিছু বই পড়ে বিদ্যান হয়ে সেকথা ভুলে যাই, অস্বীকার করি। কিছুক্ষণ আগে ওই জোয়ান মরদগুলোকে দেখলে না? আমরা দুপাতা বই পড়ে উন্নতির পিছনে, সুখের পিছনে ছুটি। আকাঙ্ক্ষা শুধু একটাই, আরও টাকা, আরও সুখ স্বাচ্ছন্দ, আরও উন্নতি। কিন্তু তাই কি হয়? সবকিছুর একটা শেষ আছে, তারপর ধ্বংস হয়ে আবার নতুন করে শুরু হয়। আচ্ছা, এই যে তোমার দেহ, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পরে একটা পিঁপড়ে যদি তোমার পা বেয়ে উঠতে থাকে, তাহলে সে কোথায় যাবে”?

এর উত্তর অতনুর জানা নেই। ভাববার মতো মানসিক অবস্থা বা ইচ্ছা, এই মুহুর্তে কোনটাই তার নেই, তাই সে চুপ করে থাকলো। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সে আবার শুরু করলো, “পিঁপড়েটা কখনও ধীরে, কখনও দ্রুত, ওপরে উঠতে শুরু করবে এবং একসময় সে সর্বোচ্চ চূড়ায়, অর্থাৎ তোমার মাথায় এসে পৌঁছবে। তারপরে কিন্তু আর ওঠা সম্ভব নয়। তখন তাকে আবার মাটিতে নেমে আসতে হবে, আবার নতুন করে শরীর বেয়ে ওপরে উঠতে হবে। আমরা এখন সেই উন্নতির চরম জায়গায় এসে পৌঁছেছি, এবার আমাদের পতনের পালা, এবার আবার নতুন করে শুরু করার পালা”।

সে উঠে গিয়ে বাঁশ হাতে নিয়ে আবার তার কাজ শুরু করলো। অতনু আগুনের দিকে তাকিয়ে বসে বসে ভাবলো, এসব কথা কি এরই মস্তিষ্কপ্রসূত, না অন্য কারও কাছ থেকে শোনা? সে যাইহোক না কেন, এই অশক্ষিত বেহেড মাতালের মুখে সেটা কি সত্যিই বেমানান? অভিজ্ঞতাও যে একটা শিক্ষা, সেকথা বোধহয় অস্বীকার করা যায় না।

একসময় কাজ শেষ হলে তার পাওনা মিটিয়ে নাভিকুণ্ডলি নিয়ে, আর সকলের সাথে অতনু গঙ্গার ঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো।

সুবীর কুমার রায়

১৩-০১-২০২০

 

ভেস্তে যাওয়া পাকাদেখা {লেখাটি Sahitya Shruti, ভালোবাসা, ও গল্পগুচ্ছ পত্রিকায় প্রকাশিত।}

72610647_1338811582961254_5215569123303489536_n আজ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতার কথা শোনাবো, অনেকদিন আগে এক পাত্রী দেখতে যাওয়া, হয়তো বা পাকাদেখাও বলা যেতে পারে। তবে বিধিবাম, তাই শেষপর্যন্ত আর বাস্তবে রূপায়িত হওয়ার সুযোগ না পেয়ে, অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল। না, আমি নিজে পাত্র নই, বরং বরকর্তাই বলা যেতে পারে।

ভারতীয় স্টেট ব্যঙ্কে কর্মরত আমার ভাইয়ের জন্য, উত্তর কলকাতায় আমরা চারজন একটি পাত্রী দেখতে গিয়েছিলাম। আমি, আমার স্ত্রী, আমার ছোট বোন, ও ভাবী পাত্র স্বয়ং। আমাদের মিঞাবিবি দুজনের পছন্দ-অপছন্দ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, আবার সবসময়েই দুই মেরুতে বসবাস করে, আজও করে। আমি মিষ্টি খাওয়া কোনকালেই পছন্দ করি না, চপ্-কাটলেটই আমাকে বেশি আকর্ষণ করে। আমার উনি আবার মিষ্টি খাওয়ার জন্যই বোধহয় এই ধরাধামে আবির্ভুত হয়েছেন। পারলে ঠাকুর পূজার নকুলদানাও তিনি সাবাড় করে দিতে কিছুমাত্র কুন্ঠাবোধ করেন না। ভাবী পাত্রীর ভাবী স্বামী, ভাসুর, জা, ও ননদের পদধুলির কল্যানে তাঁরা ধন্য হয়ে যারপরনাই মিষ্টান্নর আয়োজন করবে, এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি আধপেটা খেয়ে আমাদের সাথে গেলেন। তখন মোবাইলের প্রচলন হয়নি, হাতেগোনা কিছু বাড়িতে দশফুটোর কালো রঙের ল্যান্ড ফোনের দেখা মিলতো। খবরের কাগজ দেখে সম্বন্ধ, তাই উভয় পক্ষের চিঠি আদান প্রদানের মাধ্যমে, আজ সেখানে যাওয়ার আয়োজন।

ঠিকানা জানা ছিল। নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থেকে নেমে, রাস্তার পাশে একটা দোকানে খোঁজ করে আমরা নির্দিষ্ট বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা ধরলাম। রাস্তার ডানপাশে চাষের জমির মতো বিশাল জলাজমি, বাঁপাশে সুউচ্চ লম্বা পাঁচিল, যাতে হাজার হাজার ঘুঁটে দেওয়া, সম্ভবত কোন বড় কারখানা। অনেকটা পথ পার হয়েও রাস্তার দুপাশে কোন বাড়িঘর তো দূরের কথা, একজন লোকের দেখাও পেলাম না। আরও কিছুটা পথ হাঁটার পর, একজনের দেখা পেয়ে জিজ্ঞাসা করায় তিনি জানালেন, যে আর সামান্যই পথ। ঠিক পথে অগ্রসর হচ্ছি জানতে পেরে উল্লাসিত হয়ে আর সামান্য পথ অগ্রসর হতেই এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে জানালেন, যে তিনি আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছেন, তিনি কন্যার পিতা। সুবিধাই হলো, আমরা তাঁর সাথে এগিয়ে গিয়ে তাঁর বাসায় হাজির হলাম।

ছোট্ট বাড়ি, দরজা দিয়ে ঢুকে পরিপাটি করে সাজানো প্রথম ঘরটিতেই আমাদের বসানো হলো। বেশ বড় একটা খাট ও চেয়ারে আমরা চারজন ভাগ করে বসলাম। ভদ্রলোক কিন্তু নিজে না বসে, আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। যে দরজা দিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম, তার উলটো দিকে বাড়ির ভিতরে অন্যান্য ঘরে যাওয়ার জন্য অপর একটি দরজা। আমাদের সবাইকে এক কাপ করে চা ও দুটো করে ভগবতী বিস্কুট দেওয়া হলো। তখনও বিস্কফার্ম বা এখনকার মতো বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি ভালো বিস্কুট বাজারে আসেনি। একমাত্র ব্রিটানিয়া ও পার্লের বিস্কুটই বাজারে সমাদ্রিত ছিল। তবু কেন আমাদের মতো মহামান্য অতিথিদের কপালে ভগবতী ভর করলো, বলতে পারবো না। ভদ্রলোক একাই  দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সাথে কথা বলে যাচ্ছেন। অপর দিকের দরজায় এক ভদ্রমহিলা ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন, মাঝেমাঝেই তাঁর পাশে কিছু মহিলা এসে চিড়িয়াখানায় আসা নতুন পশু পাখি দেখার আগ্রহ নিয়ে দেখার মতো, উকিঝুঁকি দিয়ে আমাদের দেখে যাচ্ছেন। এক ভদ্রমহিলা ট্রেতে করে চার প্লেট খাবার নিয়ে আসলেন। ভদ্রলোক তাঁর হাত থেকে খাবারের প্লেটগুলো নিয়ে আমাদের এগিয়ে দিতে সাহায্য করলেন। দুটি করে সিঙ্গাড়া ও দুটি করে রসগোল্লা। ভোজনপর্ব শেষে আমরা মেয়েটিকে নিয়ে আসতে অনুরোধ করলাম। ভদ্রলোক এবার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রমহিলাকে মেয়েকে এঘরে নিয়ে আসতে বললেন। তাঁর সম্বোধনে এতক্ষণে বোঝা গেল, যে উনি তাঁর স্ত্রী। দরজার কাছ থেকে তিনি কিন্তু নড়লেন না। দুজন ভদ্রমহিলা মেয়েটিকে আমাদের বসার ঘরে নিয়ে আসলেন। খাটের ওপর আমার স্ত্রী ও বোন বসছিল, মেয়েটিকে নিয়ে এসে সেখানেই বসানো হলো। আমার বোনই প্রথম কথা শুরু করলো। সে বললো, “আমরা কিন্তু তোমায় দেখতে বা ইন্টারভিউ নিতে আসিনি, আমরা তোমার সাথে আলাপ করতে এসেছি”। মেয়েটি যথেষ্ট শিক্ষিত, খোলামেলা কথা বলে, অনেকটা লম্বা, ও দেখতেও বেশ সুন্দর। প্রথম দর্শনেই আমাদের বেশ পছন্দ হয়ে গেল। ভাইয়ের মুখ দেখে মনে হলো, তারও পছন্দ। অল্প কিছুক্ষণ একথা সেকথার পর মেয়েটির বাবা জানালেন, যে মেয়েটি ভালো গানও গায়। আমার বোন দীর্ঘদিন গান শেখে, গায়ও মন্দ নয়। সে মেয়েটিকে হারমোনিয়াম নিয়ে আসতে বললো। মেয়েটি উঠে গিয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে আসলো। তার নার্ভাসনেস্ কাটানোর জন্য, আমার বোন প্রথমেই পরপর দুটো গান গাইলো। এরপর মেয়েটিও গান গাইলো, এবং বেশ ভালোই গাইলো। আমাদের বাড়িতে শুধু আমরাই নই, বাবাও গানবাজনা খুব পছন্দ করেন, কাজেই বাবাও খুব খুশি হবেন। আমরা মনে মনে মোটামুটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম। আমাদের কথার ওপর ভিত্তি করে এরপর একদিন বাবা-মা এসে সম্বন্ধ পাকা করে যাবেন।

এবার ওঠার পালা, আমরা অনুমতি চাইলাম। আমাদের হাবভাবে ভদ্রলোকও বোধহয় আাঁচ করতে পেরেছেন, যে তাঁর কন্যাকে আমাদের পছন্দ হয়েছে। আনন্দের আতিশয্যে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা উৎফুল্ল হয়ে আমায় বললেন, “আর একবার চা হলে হতো না”। হতো তো বটেই, আমি কখনও চায়ের অফার ছাড়ি না। তাছাড়া সিঙ্গাড়া খাওয়ার পরে মনটা কিরকম চা চা করছিল। আমি অবশ্যই এই প্রস্তাবে রাজি হতাম, কিন্তু সেই সুযোগ আমি পেলাম না। আমার হ্যাঁ বলা বা সম্মতিসুচক মাথা নাড়ার আগেই, ভদ্রলোকের স্ত্রী বেশ জোর গলায় বলে উঠলেন, “আমি আর চা করতে পারবো না”। আমরা অবাক হলাম সন্দেহ নেই, কিন্তু লজ্জায় ভয়ে ভদ্রলোকের মুখের রঙ কিরকম ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সম্মতি জানাবার সুযোগ পাইনি বলে নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে হলো। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অবস্থার সামাল দিতে ভদ্রলোক আবার বললেন, তাহলে একটু কফিই হয়ে যাক। কিন্তু এবার গলার স্বরের রেগুলেটরের নব কয়েক পর্দা বাড়িয়ে প্রায় চিৎকার করে তাঁর স্ত্রী বললেন, “আমি কফি করতে পারবো না, আমি কি ঝি নাকি যে বারবার চা কফি করবো”। ইচ্ছা করছিল, দুজনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতির সামাল দিয়ে গৃহশান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি, কিন্তু সেটা তো আর বাস্তবে সম্ভব নয়, সাহসেও কুলালো না। বাধ্য হয়ে আরও কিছুক্ষণ বসে সময় কাটিয়ে, আমরা উঠে পড়লাম।

ভদ্রলোক অনেকটা পথ আমাদের সাথে গেলেন ও ইনিয়ে-বিনিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, যে আমরা যেন  তাঁর স্ত্রীর ব্যবহারে কিছু মনে না করি। কিন্তু আমাদের মতো তিনিও বেশ ভালোই বুঝতে পারলেন, যে জেতা গেম তাঁর হাতের বাইরে চলে গেছে। ভদ্রলোক ফিরে গেলে, আমরা নিজেদের মধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। আমার বোন বললো, “মেয়েটির মা’র সম্ভবত মাথার ব্যারাম আছে”। আমার কিন্তু মনে হলো, আজ পর্যন্ত হয়তো অনেক পাত্রপক্ষ মেয়েটিকে দেখতে এসে খেয়েদেয়ে ফিরে গিয়ে বিভিন্ন কারণ দর্শীয়ে নাকোচ করে দিয়েছেন, তাই ভদ্রমহিলা অত ফ্রাসট্রেশনে ভুগছেন। আমার স্ত্রী কিন্তু সম্বন্ধ ভেঙে যাওয়ার থেকেও বেশি দুঃখ পেলো, আশানুরূপ মিষ্টি না খাওয়ানোর জন্য।

যাইহোক বাড়ি ফিরে বাবাকে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে বললাম, “তুমি লিখে দাও, যে মেয়ের বিয়ে দিতে গেলে অত ভেঙে পড়লে বা উত্তেজিত হলে চলে না, ধৈর্য ধরতে হয়”। বাবা কিন্তু তাতে রাজি হলেন না, পরিবর্তে  অন্যান্য অসুবিধার কথা জানিয়ে, ব্যাপারটার সেখানেই ইতি টানলেন।

সুবীর কুমার রায়

০১-০১-২০২০

 

রতনের রক্তদান {লেখাটি প্রতিলিপি বাংলা, Sahitya Shruti, ও বইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত।}

16 স্ত্রী নমিতা, ও ছোট ছোট তিনটি শিশু সন্তানকে নিয়ে অটলবাবু ফুলবাড়ি গ্রামের একবারে শেষপ্রান্তে, অভাবের সংসারেও দিব্যি ছিলেন। চাকরিসূত্রে তাঁকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরের একটা মহকুমা শহরে থাকতে হতো। একটা হোটেলে তিনি কাজ করতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার হোটেল বন্ধ থাকায়, বুধবার বেশ রাতে বাড়ি ফিরে শুক্রবার খুব ভোরে কর্মস্থলে ফিরে যেতেন।

হোটেলে তাঁর বড় ছেলে সনাতনের বয়সি, বছর দশেক বয়সের রতন নামে একটা ছেলে কাজ করতো। বিভিন্ন কারণে ছেলেটিকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন। অভাবের তাড়নায় বহু দূরের এক গ্রাম থেকে কাজ করতে আসা অতি দরিদ্র এক ভদ্র পরিবারের ছেলেটি তাঁর বড় ছেলের বয়সি, সৎ ও পরিশ্রমী। অতি লোভী ও সুযোগ সন্ধানী হোটেল মালিক, সুযোগ পেয়ে তাকে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সমস্ত কাজ করিয়ে নেয়। মাইনে-কড়ি সেরকম না দিলেও, পান থেকে চুন খসলেই প্রহারের ব্যাপারে কখনও কার্পণ্য করেন না। পরিবর্তে রতনের কপালে উচ্ছিষ্ট খাবার, আর রাতে খাবার টেবিলে হাঁটুমুড়ে মশার কামড়ের মধ্যে ঘুমবার সুযোগ মেলে। ছুটি না মেলায় সে তার ইচ্ছামতো নিজের গ্রামেও যেতে পারে না, আর গ্রামে যেতে না পারায়, মাইনের সব টাকাটাই বাড়ি যাওয়ার সময় একসাথে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মালিক তাঁর নিজের কাছেই রেখে দেন।

বেশ চলছিল, কিন্তু একদিন খাবার টেবিল থেকে গায়ে বেশ জ্বর নিয়ে কাপ-ডিশের ট্রে রান্নঘরে রাখতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে বেশ কয়েকটা কাপ-ডিশ ভেঙে ফেলায়, কপালে প্রচণ্ড প্রহার জোটে। অভুক্ত অবস্থায় সারারাত টেবিলের ওপর শুয়ে থেকে সে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ঘটনাটা অটলবাবুর খুব খারাপ লাগলেও নিজের চাকরি রক্ষার্থে মুখ বুজে ছিলেন। তারপর দুটো দিন সে গায়ে বেশ জ্বর নিয়ে আচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়ে থাকে। বুধবার দুপুরের পর থেকে তাকে কিন্তু আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। আপদ বিদায় হয়েছে ভেবে কেউ আর সেভাবে তার খোঁজও করলো না।

বুধবার রাতের দিকে অটলবাবু বাড়ি ফেরার জন্য রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখেন, প্ল্যাটফর্মের ওপর রতন গায়ে বেশ জ্বর নিয়ে কুকুরকুণ্ডলী হয়ে শুয়ে আছে। অটলবাবু তাকে সাথে করে নিজের বাসায় নিয়ে যেতে আর দ্বিধা করেননি। সেই থেকে রতন, অটলবাবুর বাড়ির একজন সদস্য হয়ে গিয়ে আজও আছে। অটলবাবু তাকে সনাতনের সাথে লেখাপড়াও শেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দু’-তিন বছর স্কুলে গিয়ে, সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়ে একটা কারখানায় কাজ করতে শুরু করে, ও সন্ধ্যার পর বাড়ির সমস্ত কাজে সাহায্য করে। অটলবাবু কিন্তু আগের মতোই হোটেল বাড়ি করেন। বাজার দোকান ঘরের কাজ নিয়ে নমিতাকে এখন আর কোন চিন্তা করতে হয় না। এখন অটলবাবুর সুখের সংসারে অসুবিধা হয় তখন, যখন রতন তার গ্রামের বাড়িতে যায়। তা সেও তো দু’-তিনমাস অন্তর দিন দশ-পনেরোর জন্য। এইভাবে বেশ চলছিল। এখন রতনকে ছাড়া একটা দিনও নমিতার নিশ্চিন্তে বা শান্তিতে কাটে না।

অন্যান্য বারের মতো একদিন গ্রামের বাড়িতে দিন পনেরোর জন্য গিয়ে, রতন আর ফিরে এলো না। অটলবাবু বা তার কারখানার মালিক, কেউই তার গ্রামের বাড়ি চিনতেন না। এইভাবে একদিন সকলেই  ধরে নিলো যে রতন আর ফিরবে না। মাস দুয়েক পরে এক সন্ধ্যায়, প্রবল ঝড়বৃষ্টির মধ্যে রতন অটলবাবুর বাড়িতে ফিরে এলো। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই, যে তার মাথায় ছাতা না থাকলেও সে বিশেষ ভেজেনি। সে যাইহোক, রতন জানালো, যে একটা পথ দুর্ঘটনায় ভীষণরকম আঘাত পেয়ে তাকে কাছের এক শহরের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। সেখানেই জানা যায়, যে তার ব্লাডগ্রূপ নাকি এবি নেগেটিভ। ফলে রক্তের প্রয়োজন হলেও ওই বিশেষ গ্রুপের রক্ত না পাওয়ায়, ডাক্তাররা খুব অসুবিধায় পড়েন। যাইহোক এই কারণেই সে সময়মতো ফিরতে পারেনি। পরদিন সকালে রতন কারখানায় গিয়ে তার সময়মতো ফিরে না আসার কারণ, সবিস্তারে জানালো। সে যে খুব সৎ, কর্মঠ, ও ভালো কর্মী, এটা তার কারখানার মালিকও বুঝতেন। ফলে সেখানে কাজ ফিরে পেতেও তার কোন সমস্যা হলো না, বরং সে ফিরে আসায়, মালিকটি খুশি ও নিশ্চিন্ত হয়ে, তাকে এই দুই মাসের মাইনেও নিজেহতেই দিয়ে দিলেন।

এইভাবে দীর্ঘ অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। রতন কিন্তু আর কোনদিন তার গ্রামের বাড়িতে যায়নি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও, রতনের চেহারার কোন পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু তার কর্মক্ষমতা যেন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘরের ও কারখানার সব কাজ সে খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিখুঁতভাবে গুছিয়ে করে ফেলে। কারখানার এখন বেশ উন্নতি হওয়ায় ও আয় বৃদ্ধি হওয়ায়, মালিক খুশি হয়ে তার মাইনেও অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছেন।

খুব হইচই করে একদিন পূর্ণিমা নামে একটি মেয়ের সাথে সনাতনের বিয়ে হয়ে গেল। বরকর্তা অটলবাবু হলে কি হবে, প্রকৃত বরকর্তার কাজটা রতনই একা হাতে সামলেছে। শুধু কি তাই? তার জমানো প্রায় সমস্ত টাকাই সে সনাতনের বিয়েতে খরচা করে ফেলেছে। অটলবাবু, নমিতা ও সনাতনের তীব্র আপত্তিতে সে শুধু বলেছে, “আমার আর টাকা কিসের দরকার বলো? প্রয়োজন হলে তখন তোমরা তো আছোই, আমি জানি তোমরা আমায় দেখবেই”।

দেখতে দেখতে আরও দুটো বছর কেটে গেল। আসন্ন সন্তান সম্ভবা পূর্ণিমাকে, মহকুমা শহরের একটা নার্সিং হোমে ভর্তি করা হলো। কিন্তু অবস্থার জটিলতা দেখা দেওয়ায় টাকা ও রক্তের প্রয়োজন দেখা দিলো। অটলবাবু তাঁর হোটেল মালিকের কাছে কিছু টাকা ধার চাইলেন, কিন্তু হোটেল মালিক নানা অজুহাত দেখিয়ে একটা টাকাও ধার দিতে অস্বীকার করলেন। রাগে দুঃখে অটলবাবু এককথায় এতদিনের চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। রতনের কারখানার মালিক কিন্তু রতনের অনুরোধে, এক কথায় মাসে মাসে তার মাইনে থেকে কেটে নেওয়ার শর্তে বেশ কিছু টাকা ধার দিয়ে দিলেন। টাকার সমস্যা মিটলেও, রক্তের ব্যবস্থা কিন্তু করা গেল না। কারণ সেই একই, সনাতনের স্ত্রী পূর্ণিমার ব্লাড গ্রূপ এবি নেগেটিভ।

কোনভাবেই রক্তের ব্যবস্থা করতে না পারায়, ও রতন এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব থাকায়, অটলবাবু ও নমিতা সেই অগতির গতি রতনকেই রক্ত দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু এই প্রথম সে তাঁদের সাহায্য করতে অস্বীকার করলো। চোখের সামনে সনাতনের স্ত্রী ও বাচ্চার মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা বুঝিয়েও কোন লাভ হলো না। ডাক্তারও তাকে অনেকভাবে বোঝালেন, যে রক্তদান করলে কারও ক্ষতি হয় না। তার রক্ত অত্যন্ত মূল্যবান, কারণ এবি নেগেটিভ রক্তের গ্রূপের মানুষের সংখ্যা খুব কম। যদিও রতন একবার বললো, যে সে এটা ভালভাবেই জানে, তবু এরপরেও সে তার শরীর থেকে এক ফোঁটাও রক্ত দিতে রাজি হলো না। এর পরেও কোনভাবে রক্ত জোগাড় না হওয়ায়, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সকলেই ঠিক করলেন, যে দু’-দুটো মানুষকে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে, জোর করে রতনের দেহ থেকে আপাতপ্রয়োজনে রক্ত নিয়ে সনাতনের স্ত্রী পূর্ণিমাকে দেওয়া হবে।

পরিকল্পনামাফিক জোর করে শুইয়ে চেপে ধরে রক্ত নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে, রতনকে কিন্তু কোন বাধা দিতে দেখা গেল না। ডাক্তার তার শরীর থেকে রক্ত নিতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলেন, যে রতনের শরীরে কোন রক্ত নেই। বিষ্ময়ের আরও বাকি ছিল। দেখা গেল রতনের শরীরটা ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর থেকে কর্পূরের মতো উবে গেল। যাহোক শেষপর্যন্ত অনেক চেষ্টায় রক্তের সংস্থান হওয়ায়, কোন সমস্যা ছাড়াই সনাতনের স্ত্রী একটি সুস্থ ফুটফুটে পুত্র সন্তান প্রসব করে বটে, কিন্তু আর মাত্র চারটি ঘটনায় অটলবাবুর পরিবারকে যারপরনাই বিষ্মিত হতে হয়।

এতোগুলো বছর পরে অনেক খোঁজখবর করে রতনের গ্রামে গিয়ে জানা যায়, যে বহু বছর আগে সেদিনের সেই পথ দুর্ঘটনায় রতনের মৃত্যু হয়। মহকুমা শহরের অটলবাবু যে হোটেলটায় কাজ করতেন, সেটি হঠাৎ আগুনে পুড়ে সম্পূর্ণ ভষ্মীভুত হয়ে হোটেলের মালিক সর্বস্বান্ত হন। রতনের কারখানার মালিক, সকলকে টপকে একটা অনেক টাকার টেন্ডার পান, ও কোন পূর্বাভাস ছাড়াই সনাতনের চাকরিতে বেশ বড়সড় একটা পদোন্নতি হয়।

সুবীর কুমার রায়

২৬-১১-২০১৯