ডিজিটাল ভারত {লেখাটি প্রতিলিপি বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত।}

36271711_998507660324983_1780579280690872320_n   মেনকা নামে খোনা গলায় কথা বলা এক অত্যন্ত দরিদ্র মহিলা আমাদের বাড়িতে দীর্ঘদিন কাজ করেছিল। কোন শব্দ ‘র’ দিয়ে শুরু হলে, সে উচ্চারণ করতে পারতো না। কিন্তু শব্দের মাঝে বা শেষে ‘র’ থাকলে  দিব্যি উচ্চারণ করতে পারতো। শুধু এই কারণে, সে রাম বলতে না পারলেও মরা বলতে পারতো। তাকে আমি খুব দ্রুত মরামরামরামরা বলতে বললে দিব্যি বলতে পারতো, কিন্তু মরামরার ম এর পরে একটু শ্বাস নিতে বললে কিন্তু মআ হয়ে যেত। এতে ওর ভবিষ্যতে স্বর্গবাসে, বা ভূতের ভয় পেলে, অসুবিধা দেখা দেবে কী না জানি না, তবে আমাদের কোন অসুবিধার কারণ হতো না। কিন্তু আম অর্থাৎ রাম, দেবতা হয়েও, হয়তো বা এহেন চরম অপরাধের জন্যই তাকে নির্মম বিপদে ফেললেন। আমাদের বাড়ি রামরাজাতলা নামে একটা জায়গায় ছিল। এখানে বছরের কয়েক মাস ধরে বিরাট ধুমধাম করে রাম পূজো হয়। সকলের মুখে মুখে রামরাজাতলা একদিন রামতলা নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করেছিল।

সে যাহোক এহেন মেনকাদি একদিন কি কারণে হাওড়া গিয়েছিল। রামতলা থেকে বাস ও মিনিবাস হাওড়া যায়, কাজেই তার কোন অসুবিধা হয়নি। ফেরার পথে লোককে জিজ্ঞাসা করে করে সে মিনিবাসে ওঠে। টিকিট কাটার সময় সে কন্ডাক্টারকে একটা আমতলার টিকিট দিতে বললে, কন্ডাক্টার তাকে টিকিটও দেয়। আমতলায় তাকে নামতে বললে সে জানায় এখানে নয়, যে আমতলায় আম পূজো হয়, সেই আমতলায় যাবো। হাওড়া থেকে আমতলা ও.পি. পর্যন্ত এই মিনিবাসটা রামতলার প্রায় কাছে, সাঁত্রাগাছি মোড় নামে একটা জায়গা থেকে, বাঁদিকে ঘুরে আমতলা আউট পোস্ট পর্যন্ত যেত। যাহোক শেষপর্যন্ত তার বিবরণে আমতলা রহস্য সমাধান করতে পারায়, দয়ালু কন্ডাক্টার তাকে মিনিবাস থেকে নামতে বারণ করে, এবং ফেরার পথে রামতলার কাছাকাছি স্টপেজ, সাঁত্রাগাছি মোড়ে নামিয়ে দিয়ে যায়।

কথাপ্রসঙ্গে একদিন মেনকাদিকে মা হঠাৎ বলে যে “দাদা চাঁদে জমি কিনছে, ওখানেই বাড়ি করবে”। মেনকাদি প্রথমে অবিশ্বাসের সুরে বলে, “চাঁদে কেউ জমি কেনে নাকি, ওখানে কি মানুষ থাকে”? আমরা ওর কথা শুনে খুব হাসাহাসি করলাম। ও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “কিন্তু আমি তাহলে কি করে ওখানে কাজ করতে যাবো”? মা বললেন, “চিন্তা করছো কেন, দাদাতো সিঁড়ি করে দেবে”। উত্তরে সে শুধু বললো, “রোজরোজ আমি অতো সিঁড়ি ভাঙতে পারবুনি বাপু, তোমরা তাহলে অন্য কোন কাজের লোক দেখে নিও”।

এই মেনকা দি মাঝেমধ্যেই সামান্য কিছু টাকা পয়সা চাইতো। অত্যন্ত গরীব হওয়ায়, ও মাকে তাঁর কাজে সাহায্য করায়, আমরা দিয়েও দিতাম। সত্যিকথা বলতে কি, আমাদের সে খুব ভালোওবাসতো। তাকে মাঝেমাঝে মাথা বেছে দিতে বলতাম। মাথা বেছে দেওয়া মানে, চুলটা একটু নেড়েচেড়ে দেওয়া। মুশকিল একটাই ছিল, ও কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর নিজের দুই আঙুলের নখ দিয়ে উকুন মারার মতো করতো, যে কেউ দেখলে ভাবতেই পারে, যে আমার মাথায় উকুনের চাষ আছে। তবে দশ-পনেরো মিনিট মাথা বাছার পরে, দুঃসাধ্য যেকোন পড়া অবলীলাক্রমে মুখস্থ করে ফেলা, বা  যেকোন কঠিন অঙ্কের সমাধান করে ফেলা, কিছুমাত্র কঠিন কাজ বলে মনে হতো না।

একদিন সে আমাকে বললো, “আঙা সনকার বিয়ে ঠিক হয়েছে, তোকে কিন্তু বরের আংটিটা দিতে হবে”।

অলকা আর সনকা নামে ওর দুটো মেয়ে আছে শুনেছিলাম, তাই জিজ্ঞাসা করলাম, “অলকার বিয়ে না দিয়ে সনকার বিয়ে ঠিক করতে গেলে কেন”?

উত্তরে সে শুধু বললো, “আমি কি আর ঠিক করেছি? দুই মেয়ের মধ্যে সনকা তো একটু চাখাচোখা, তাই ঘটক ওকেই বিয়ের জন্য পছন্দ করেছে। তোকে কিন্তু বরের আংটিটা দিতেই হবে?”

জিজ্ঞাসা করলাম “ঘটক নিজেই ওকে বিয়ে করছে”?

“না, তা কেন? ঘটক নিজে ওর সম্বন্ধ এনেছে। আংটি দিবি তো আঙা”?

“পাত্র কি করে”?

“তা আমি কি করে জানবো, আমি কি তোদের মতো নেকাপড়া শিকেচি”?

“পাত্রের বয়স কতো, দেখতেই বা কেমন”?

“আমি কি পাত্রকে দেখেছি যে বলবো? ঘটক তো বললো দেখতে বেশ ভালো, তোমার সনকার সাথে মানাবে”।

“পাত্র থাকে কোথায়”?

“ঘটক তো বললো ওদের বাড়ি আছে, মাটির ছোট বাড়ি হলেও নিজেদের”।

“হ্যাঁগো, জামাই বেঁচে আছে তো”?

ও বোধহয় বলতে যাচ্ছিল যে তা আমি কি করে জানবো, ঘটক জানে। কিন্তু শেষপর্যন্ত নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,   “যাঃ, কি যে বলিস, বেঁচে না থাকলে ঘটক কি আর বিয়ের সম্বন্ধ করতো”?

মেয়ের বিয়ের জন্য কয়েকদিন কামাই করে যেদিন সে আবার কাজে যোগ দিলো, সেদিনই তার কাছ থেকে জানতে পারলাম যে জামাই নাকি চোর, বিয়ের আসর থেকেই পুলিশ তাকে বালা পরিয়ে ধরে নিয়ে গেছে। আংটি না দেওয়ার জন্য নিশ্চিন্ত বোধ করলাম।

এরও কয়েক মাস পরে শুনলাম, বর এখনও জেলে থাকায় সনকা নাকি আবার কাকে বিয়ে করেছে। এবারের সম্বন্ধটাও ঘটকের দেওয়া কী না জিজ্ঞাসা করলাম না, সেটাও সম্ভবত ঘটক জানে।

আমি চাকরি বাকরি করে আধবুড়ো হয়ে যাওয়ার পরও কিন্তু, মেনকাদি তার এই আঙাকে ভোলেনি। মাঝেমাঝে আমার বাড়িতে এসে মাথায় মাখার জন্য একটু নারকেল তেল, বা সামান্য কিছু সাহায্য চাইতো। সামান্য কিছু খাবার ও সাহায্য, সাথে মাথায় মাখার একটু নারকেল তেল পেয়ে তার মুখটা কিরকম উজ্জ্বল হয়ে যেত, আজও ভুলতে পারলাম কই? জানি না সে আজও বেঁচে আছে কী না। যে লোকেই থাকুক, সে ভালো থাকুক, শান্তিতে থাকুক।

সুবীর কুমার রায়

৩০-১২-২০১৮

 

Advertisements

দুই মেরু

43951291_1089996314509450_8725371820129124352_n   কাশী নামে একটা বছর দশ-বারো বয়সের ছেলে আমাদের বাড়িতে এসে জুটলো। কোথা থেকে কার সৌজন্যে তার এই বাড়িতে প্রবেশ, আজ আর মনে করতে পারি না। তবে ছেলেটা বেশ ভালো ছিল, ও টুকটাক ফাইফরমাশ খাটা, হঠাৎ প্রয়োজনে কাছাকাছি দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এনে দেওয়া, সে হাসিমুখে করতো। ও আমাদের বাড়ির ছেলের মতো ছিল, এবং আমাদের খুব ভালওবাসতো।

আমাদের বাড়ি থেকে বড়রাস্তা পাঁচ মিনিটেরও পথ নয়। লোক বসতি ও যানবাহন প্রচুর হলেও, সামান্য বৃষ্টি হলেই,  নির্দিষ্ট বেশ কিছুটা রাস্তায় এক কোমড় জল জমে যেত। এই বড় রাস্তার ওপর ‘কর কাফে’ নামে একটা রেস্টুরেন্ট ছিল। এখনকার মতো তখন আধুনিক কায়দার রেস্টুরেন্ট, বা আধুনিক সব অদ্ভুত নামের খাবার পাওয়া যেত না। রেস্টুরেন্ট বলতে এই ‘কর কাফে’, ও আরও কিছু দূরে একই মালিকের ‘ওরিয়েন্টাল কেবিন’ ছাড়া আর কিছু ছিল না। এই দুই দোকানের কিমা কাটলেট্ ও ব্রেস্ট কাটলেট্ সম্ভবত পঁয়ত্রিশ পয়সা ও পঁচাত্তর পয়সা দাম ছিল, ও খেতেও মন্দ ছিল না। এছাড়া বড় রাস্তার ওপর উনুন জ্বেলে গরম তেলে ভাজা রামপ্রসাদের আলুর চপ, বেগুনি, পেঁয়াজি বা ফুলুরি,  সে তো অমৃত ছিল।

যাহোক, সপ্তাহে প্রায় দু’-তিন দিন এই কিমা কাটলেট, না পেলে ব্রেস্ট কাটলেট বা মোগলাই পরোটা, সাথে গরম গরম চা, আমাদের ভাই-বোনেদের সান্ধ্য আড্ডার আসর মাতাতো। কাশীর ওপরেই এইসব অমৃত আহরণ করার দায়িত্বটা পাকাপাকি ভাবে অর্পণ করা হয়েছিল। প্রায় রোজই করকাফে তে যাওয়ার ফলে, দোকানের লোকজনও তাকে নিয়মিত ও বড় খদ্দের হিসাবে চিনে ফেলেছিল। সে কোন্ বাড়ি থেকে খাবার কিনতে আসে তা তারা জানতো না ঠিকই, জানার প্রয়োজনও ছিল না, কারণ কাশী প্রতিদিনই নগদ টাকায় খাবার কিনতো। তবে যে বাড়ি থেকেই তার আগমন হোক না কেন, তারা যে এই দোকানের বড় খদ্দের, ও ধার বাকির রাস্তায় হাঁটেন না, এইটুকু বৈষয়িক বুদ্ধি দোকানের সকলেরই অবশ্যই ছিল। আর তাই কাশীর পছন্দের চাহিদা মতো চপ বা কাটলেট না থাকলে, তারা নিশ্চিন্তে ও নির্ভয়ে অধিক মূল্যের কোন খাদ্যবস্তু তার হাতে দিয়ে বাকি টাকা পরে এসে দিয়ে যেতে বলতো।

এক প্রচন্ড দুর্যোগের দিনে, সন্ধ্যার পর দাদা ক্যানিং থেকে কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফিরলো। বিকাল থেকে বিদ্যুৎ নেই। ভালো করে স্নান সেরে চা জলখাবার খেয়ে মোমবাতির আলোয় গুছিয়ে বসে কিছুক্ষণ পরে দাদা হঠাৎ বলে বসলো, “এই ওয়েদারে চপ্-কাটলেট কিছু খেতে পারলে বেশ হতো, কিন্তু সারাদিন যা বৃষ্টি হয়েছে, তাতে কর কাফের কাছে যা জল জমে, এতক্ষণে বোধহয় জলে ডুবে গেছে। মোমবাতির আধো আলো আধো অন্ধকারে এই আবহাওয়ায় বসে, ওর বোধহয় মনে মনে ক্যান্ডেল লাইট চপাহারের বাসনা জেগেছে।

কাশীর ‘কর কাফে’ যাওয়ার ব্যাপারে কোনদিনই আগ্রহের অভাব লক্ষ্য করিনি, আজও নয়। সেটাই স্বাভাবিক, আমাদের যদি চপ কাটলেটে এতো আসক্তি থেকে থাকে, তাহলে ওর দোষটা কোথায়? সেও তো প্রায় সমপরিমাণে ভাগ পেয়ে থাকে। অতি উৎসাহে সে বেশ চিৎকার করেই বলে উঠলো, “আমি একবার গিয়ে দেখবো বড়মামা, দোকান খোলা থাকলে আমি ঠিক নিয়ে আসবো”।

ওর কথা শুনে ভিতরের ঘর থেকে বাবা ওকে এই ওয়েদারে দোকানে পাঠাতে বারণ করলেন। আবহাওয়াটা কোন সমস্যা নয়, আসল সমস্যা জল জমা। অভিজ্ঞতা বলছে, সারাদিন যা বৃষ্টি হয়েছে, তাতে কর কাফের কাছে কাশীর গলা পর্যন্ত জল জমে থাকতে বাধ্য। ইচ্ছা থাকলেও আমরাও ওকে দোকানে পাঠাতে সাহস করছিলাম না। কিন্তু কাশীর উৎসাহ ও বার বার “কিচ্ছু হবে নাগো, আমি মাথার ওপরে হাত তুলে ঠিক নিয়ে আসতে পারবো, দেখো একটুও ভিজবে না” বলায়, আমরাও শেষপর্যন্ত রাজি হয়ে গেলাম। কাশী ছাতা নিয়ে ব্যাগ হাতে দশ টাকার একটা নোট নিয়ে দুগ্গা দুগ্গা করে বেড়িয়ে গেল।

বাবাকে আর জানাতে সাহস হলো না, যে কাশীকে দোকানে পাঠানো হয়েছে। আমরা মোমবাতির আলোয় আধো আলো আধো অন্ধকারে কাশীর প্রতীক্ষায় বসে থাকলাম। ধীরে ধীর ঘড়ির ছোট কাঁটা সাতের ঘর ছেড়ে আটের ঘরে গিয়ে ঠেকলো, কাশীর দেখা নেই। ধীরে ধীরে ঘড়ির ছোট কাঁটাটা যখন নয়ের ঘর ছুঁই ছুঁই করছে, তখন আমরা রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলাম, কারণ কাশী মোটেই পালাবার ছেলে নয়। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, বাবা যাতে জানতে না পারেন, তাই চুপিসারে কাশীর খোঁজে বেরোবো বলে ছাতা নিয়ে তৈরি হয়েছি, এমন সময় শ্রীমান কাশী একটা আধভেজা বিশাল ঠোঙা, ও একটা পাঁচ টাকার নোট হাতে ফিরে এসে আমাদের আসন্ন বিপদের হাত থেকে রক্ষা করলো।

জানা গেল যে কর কাফের ভিতর জল ঢুকে যাওয়ায়, সে প্রায় তার বুক সমান জল পেরিয়ে অনেক কসরত করে স্টেশনের কাছ থেকে পাঁচ টাকার আলুর চপ কিনে, ওই একই ভাবে জল ভেঙে ফিরে এসেছে। তখন দশ পয়সা আর পাঁচ পয়সা মূল্যের দু’রকম সাইজের আলুর চপ সর্বত্র পাওয়া যেত। দশ পয়সা মূল্যের আলুর চপ পাওয়া যায়নি বলে,  সে পাঁচ পয়সা দামের পাঁচ টাকার চপ নিয়ে এসেছে। পাঁচ টাকার, অর্থাৎ মাত্র একশ’টা বরফশীতল আলুর চপ, সে এরকম একটা ভয়ঙ্কর দুর্যোগের দিনে রাত প্রায় সোয়া ন’টার সময় এনে হাজির করেছে।

একসাথে অতগুলো চপ কিনলে ফুচকা খাওয়ার মতো দু-চারটে ফাউ পাওয়ার হক, অবশ্যই আশা করা যেতে পারে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সংখ্যাটা সেঞ্চুরির থেকে অনেকটাই কম। কারণ হিসাবে কাশী জানালো, চপওয়ালার কাছে আর চপ ছিল না। সে একটা দশ টাকার নোট নিয়ে চপ কিনতে গিয়েছিল। আমাদের সকলের, হয়তো বা চপওয়ালারও গত জন্মের অনেক পুণ্যের ফল, যে তার কাছে ওই কয়েকটাই অবিক্রিত ঠান্ডা চপ পড়ে ছিল।

এতক্ষণের টেনশনে দাদা এতটাই ভীত ও উত্তেজিত হয়ে ছিল, যে হাতের কাছে কিছু না পেয়ে, টেবিল থেকে প্রায় শেষ হয়ে আসা জ্বলন্ত মোমবাতিটা নিয়ে, দশ-বারো ফুট দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কাশীকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলো। মোমবাতিটা কৃত্রিম উপগ্রহের মতো যাত্রা শুরু করেও, মাঝপথে নিভে গিয়ে গোটা বাড়ি তমসাচ্ছন্ন করে দিয়ে, যুদ্ধ সমাপ্তির পথ সুগম করে দিল। শেষে অনেক খুঁজেপেতে দেশলাই বার করে মোমবাতি জ্বালা হলো। বারো-চোদ্দটা মতো ঠান্ডা চপ গলাধঃকরণ করে, বাকিগুলো ফেলে দিয়ে, সেদিনের চপ ভক্ষণ পালার সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো।

*************************************************************************************

একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় বাবা একটা বছর বারো-তেরোর ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে হাজির করলেন। জানা গেল যে সে হাওড়া স্টেশনে বাবার কাছে ভিক্ষা চাওয়ায়, বাবা ছেলেটির দুঃখ, কষ্ট, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে এতটাই উতলা ও চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, যে ছেলেটিকে সঙ্গে করে একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়ে না নিয়ে আসা ছাড়া, দ্বিতীয় কোন উপায় খুঁজে পাননি।

বাবা নিজেই ছেলেটির পরিচয় দিয়ে জানালেন, যে এই উড়িয়া ছেলেটির নাম শিবো, ভদ্র ঘরের ছেলে, তবে খুবই গরীব। তাঁর কাছে কিছু সাহায্য চাওয়ায় তিনি সাহায্যের ভাণ্ডার উজাড় করে তাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। আমাদের বাড়িতে থাকবে, মা’কে হাতে হাতে তাঁর কাজে একটু সাহায্য করবে। এখানেই শেষ নয়, তিনি ছেলেটিকে সাহায্যের জন্য এক বিশাল পরিকল্পনাও অতটুকু সময়ের মধ্যেই বানিয়ে নিয়ে এসেছেন। তিনি শিবোকে লেখপড়াও শেখাতে চান।

আমরা সবাই আপত্তি জানিয়ে বললাম, যে অজানা অচেনা একটা ছেলেকে হুট করে বাড়িতে নিয়ে এসে স্থান দেওয়া খুবই ঝুঁকি সম্পন্ন। যেকোন সময় বাড়ির কিছু হাতিয়ে নিয়ে কেটে পড়বে, চাই কি আরও বড় কোন ক্ষতি করাটাও অসম্ভব নয়। কোন বড় অসামাজিক দল, একে এই জাতীয় কাজে ব্যবহার করছে, তাও হতে পারে, ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রয়োজনে তাকে কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হোক। আমাদের এই যুক্তি ধোপে টিকলো না। একনায়কতন্ত্র শাসনের এটাই সমস্যা। বাবা জানালেন, অহেতুক কাউকে আগেই সন্দেহ করাটা ঠিক নয়। দু’-চার দিন দেখাই যাক না, সেরকম বুঝলে চলে যেতে বললেই হবে। অতএব পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই, শিবো এই বাড়ির নাগরিকতা পেয়ে গেল।

নতুন একটা সাবান দিয়ে তাকে ভালো করে স্নান করে আসতে বলা হলো। পুণ্যস্নান সেরে বাইরে আসলে, তাকে আমাদের একটা হাফপ্যান্ট ও টিশার্ট পরতে দেওয়া হলো। আর সকলকে নির্দেশ দেওয়া হলো যে আজ যেন তাকে কেউ কোন কাজ করতে না বলে, কারণ ছেলেটি অভুক্ত ও ক্লান্ত, তার একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। সেইমতো শিবো নতুন ঢাউস প্যান্ট ও টিশার্ট পরে, মাদুর পেতে শুয়ে পড়ে বিশ্রাম নিতে শুরু করলো। আমাদের খাওয়ার আগে তাকে ডেকে তুলে রুটি তরকারি খেতে দেওয়া হলো। পারলে বাবা হয়তো নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তার খাওয়ার তদারকি করতেন, কিন্তু আমাদের অপছন্দের কারণ হতে পারে ভেবে, আর সেটা করলেন না। শিবো চন্দ্র খানপাঁচেক রুটি, তরকারি সহযোগে উদরস্থ করে, আবার তার মাদুরে পরিপাটি করে শুয়ে পড়লেন, এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার যোগনিদ্রায় নিমগ্ন হলেন। বাবা শুধু বললেন “দেখছিস ও কতটা ক্লান্ত, সন্ধ্যে থেকে এক নাগাড়ে ঘুমিয়ে যাচ্ছে”।

পরদিন সকালে উঠে শ্রীমান শিবো চন্দ্র দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে চা বিস্কুট খেয়ে, উচ্চৈঃস্বরে “হাগুচি হাগুচি হাগুচি, মরি মরি পাতালগুচি, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ” বলে পড়ে যাওয়ার মতো করে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। এর অর্থ আমাদের জানা নেই, তবে এতক্ষণে প্রকাশ পেলো, যে তিনি নাকি ওড়িয়া যাত্রায় অভিনয় করতেন। এহেন একজন যাত্রা সম্রাটের দেখা দৈবাৎ মেলে। আমাদের বাড়িতে তিনি অবস্থান করছেন ভেবে বেশ গর্বও হলো।

বাবা অফিসে চলে গেলে বাধা দেবার কেউ নেই বুঝে, মা তাকে টুকটাক ফাইফরমাশও করলেন। সকালের জলখাবার, দুপুরের আহার সেরে, তিনি আবার একপ্রস্থ নিদ্রামগ্নও হলেন, তবে এই সময়ের মধ্যে আরও বার দু’-তিন হাগুচি হাগুচি শোনার ও দেখার সৌভাগ্যও আমাদের সকলের হলো। আহা, কি বলিষ্ঠ অভিনয়! সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফেরার পথে বাবা না আবার অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির কিছু বই তার উচ্চ শিক্ষার্থে কিনে নিয়ে আসেন, আমরা সেই আশঙ্কায় সারাটা দিন কাটালাম।

সন্ধ্যার বেশ কিছু পরে বাবা অফিস থেকে ফিরে প্রথমেই তার কুশল সংবাদ নিলেন। এরও বেশ কিছুক্ষণ পরে বাবা শিবোর হাতে একটা সিকি দিয়ে চীপ ভ্যারাইটি স্টোরের পথ নির্দেশ ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, “আমার জন্য এক বান্ডিল বিড়ি নিয়ে আসতে পারবি? সবুজ সূতোর বিড়ি চাইবি। হারিয়ে যাবি নাতো”? চীপ ভ্যারাইটি স্টোর, আমাদের বাড়ি থেকে হেঁটে পাঁচ মিনিটেরও পথ নয়, তাছাড়া শিবোও হারিয়ে যাবার পাত্র বলে মনে হয় না। শিবো সম্মতি জানিয়ে পয়সা নিয়ে চলে গেল।

সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত বাড়তে লাগলো, শিবো ফিরে এলো না। ক্রমে রাত আটটা, ন’টা পার হয়ে যখন দশটা বাজলো, তখন সবাই একটা বিষয় একমত হলাম, যে শিবো সিকিটা নিয়ে পগার পার হয়ে গেছে। বাবা মানসিক ভাবে বেশ ভেঙে পড়ে বার বার বলতে লাগলেন, “ছেলেটা চার আনা পয়সার লোভ সামলাতে পারলো না? সত্যি মানুষকে বিশ্বাস করা যায় না”।

রাত যখন প্রায় এগারোটা বাজে, শিবো আর কিছু নিয়ে পালিয়ে গেছে কী না, তার সন্ধানে আমরা লেগে পড়লাম। রাত প্রায় সোয়া এগারোটার সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলে দেখা গেল শিবো চন্দ্র দাঁড়িয়ে আছেন। মুঠো করা হাতের আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত একটা বিড়ি। মুঠো করা হাতেই বিড়িটা বার দু’-তিন সুখটান দিয়ে ফেলে দিয়ে, সে ভিতরে ঢুকলো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম “কোথায় গিয়েছিলি, এতটুকু ছেলে তুই বিড়ি খাস, তোর লজ্জা করে না”? উত্তরে সে পরিস্কার জানালো, “তাতে কি হয়েছে? আমরা বলে মায়ের পেট থেকে পড়েই বিড়ি খাই”।

এতক্ষণে গোটা ঘটনাটা জানা গেল। শিবো এখান থেকে বড় রাস্তায় গিয়ে জুয়া খেলেছে। একটা কাঠের গোল চাকতির একবারে শেষপ্রান্তে ছোট ছোট পেরেক মারা, মাঝে একটা জিভছোলা লাগানো। প্রতিটা পেরেকের মাঝে কিছু না কিছু আঁকা বা লেখা আছে। কোন কোন পেরেকের মাঝে পয়সার উল্লেখ করা আছে। চাকতিটাকে জোরে ঘোরালে, থামার সময় জিভছোলাটা যে ঘরে এসে থামবে, সেই ঘরে কোন পয়সার উল্লেখ থাকলে, জুয়ারি ততো পয়সা পাবে। শিবো ওই সিকি দিয়ে এই খেলা খেলে, যা পয়সা লাভ করেছে, তাই দিয়ে এক বান্ডিল বিড়ি কিনে, শ্যামলী সিনেমা হলে নাইট শোয়ের টিকিট কেটে সিনেমা দেখে ফিরে এসেছে।

সব শুনে বাবাতো তাকে তখনই বাড়ি থেকে ঘাড় ধরে বার করে দিতে গেলেন। আমরাই এবার বাবাকে বারণ করলাম। এতো রাতে সে কোথায় যাবে ইত্যাদি বোঝাতে, তিনি রাজি হলেন বটে, তবে হুকুম হলো কাল সকালেই যেন তাকে বার করে দেওয়া হয়। হলোও তাই, আমরা এক মহান যাত্রা সম্রাটের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হলাম।

সুবীর কুমার রায়

২৬-১২-২০১৮

 

 

মূর্খ পণ্ডিত {লেখাটি প্রতিলিপি-বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত।}

36271711_998507660324983_1780579280690872320_n চাকরির শুরু থেকে সেভিংস্, কারেন্ট, ড্রাফ্ট্, পে অর্ডার, এম.টি., এফ.ডি., ইত্যাদি নিয়ে এগারোটা বছর বেশ ছিলাম। কিন্তু ওই যে, ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়’, কবি বাক্য তো আর মিথ্যা হতে পারে না। দুনিয়ায় এতো লোক থাকতে শনির দৃষ্টি আমার ওপরেই পড়লো। প্রমোশন নিয়ে গ্রামে যেতেই হলো। তা আবার যে সে পোস্ট নয়, একবারে রুরাল ডেভেলপমেন্ট অফিসার, অনেকে আবার বলেন ফিল্ড অফিসার, স্থানীয় মানুষদের কথায় ফিলটার বাবু। আমার মতো একজন বিশেষজ্ঞ মানুষের অভাবে, একটা গোটা ব্লকের দু’-দু’টো অঞ্চলের প্রায় আশিটা গ্রাম, ও অপর  একটা অঞ্চলের একটা গ্রামের অসংখ্য মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা নাকি প্রায় স্তব্ধ হয়ে মুখ থুবড়ে দাঁড়িয়ে গেছে। আমার মতোই ওই জেলার বিভিন্ন শাখায়, প্রায় পঁচাত্তর জন করণিক প্রমোশন নিয়ে বিভিন্ন গ্রামের উন্নতি সাধন করতে গেছে।

প্রথম দিন অফিসে ঢোকার আগেই ভিতর থেকে তাঁত চলার মতো কিসের একটা আওয়াজ পেলাম। আগেই শুনেছিলাম, যে অফিসের ওই ছোট্ট বাড়িটা নাকি, আগে একটা বইয়ের দোকান ছিল।  ভিতরে ঢুকে দেখি বাড়িটা ছোট হলেও, তার ভিতরে আগ্রা বা রাজস্থানের ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মোটা মোটা থামের মতো খান তিনেক থাম। গ্রামের লোক যাতে অতি সহজেই তাদের প্রয়োজনীয় ফিলটার বাবুটির সাথে সাক্ষাৎ করতে পারে, তাই আমার বসার জায়গাটা একবারে দরজার কাছে। গোটা এলাকায় বিদ্যুৎ না আসায়, গোটা বাড়িটায় মাদুরের চারপাশে কঞ্চির ফ্রেম দিয়ে বাঁধানো পাখা, দড়ি দিয়ে পালা করে দু’জন ছেলে টেনে যাচ্ছে। প্রতিটা মাদুরের পাখায় এমনভাবে দড়ি বাঁধা, যে ছেলেটি তার হাতের দড়ি ধরে টানলে, সবকটা পাখা একসাথে দুলে দুলে কর্মচারীদের হাওয়া খাওয়ার ব্যবস্থা করবে। বাইরে থেকে এটার আওয়াজকেই তাঁত চলার আওয়াজ ভেবেছিলাম। একবারে রাজারাজরা জমিদারদের মতো সুব্যবস্থা। কিন্তু এইজাতীয় কাজে ধারণাহীন আমার সমস্যাটা দেখা দিলো অন্যভাবে।

যে অঞ্চলে যে কর্মীটি তার কপাল গুণে বা দোষে পোস্টিং পেলো, তার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই ধরে নেওয়া হলো, যে সে ওই অঞ্চলের প্রচলিত ব্যবসা বা চাষাবাদ সম্বন্ধে একজন যথার্থ বিশারদ। যেমন যে কর্মীটি ফুল চাষের জন্য বিখ্যাত কোন অঞ্চলে পোস্টিং পেলো, ধরে নেওয়াই হলো, যে তার মতো ফুল চাষে পাণ্ডিত্য, দুনিয়ায় আর দ্বিতীয় কারো নেই।

আমি কপালগুণে যেখানে পোস্টিং পাই, সেটা একটা নদী ও মোহানা এলাকায় অবস্থিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার অত্যন্ত গরীব মানুষগুলো নদী বা সমুদ্রে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো, এবং এরজন্য তাদের নাইলন জাল ও নৌকার প্রয়োজন হতো। এছাড়া পান চাষ, শুয়োর পালন, বিভিন্ন রকম সামগ্রীর দোকান করা, ইত্যাদি ছিল গরীব মানুষগুলোর একমাত্র রুজি রোজগারের উপায়।

আমি কিছু শুয়োর দেখে থাকলেও, কোনদিন শুয়োরের মাংস খাইনি। পান সিগারেটের দোকান থেকে কিছু পান কিনে খেলেও, পান চাষের পদ্ধতি বা কি কি করণীয়, সে বিষয় কোন ধ্যানধারণা আমার ছিল না। ছিপ দিয়ে কিছু পুঁটি, বাটা, বা তেলাপিয়া মাছ ধরে থাকলেও, এবং বেশ কয়েকবার নৌকা চেপে থাকলেও, নৌকা চেপে জাল নিয়ে মাছ ধরতেও যাইনি। অভিজ্ঞতাহীন এহেন আমাকে কোনরকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই, বিস্তীর্ণ এলাকার অতগুলো গ্রামের দারিদ্রসীমার নীচের গরীব মানুষগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থার প্রভুত উন্নতি সাধনে, যোগ্যতম ব্যক্তি হিসাবে চুন চুনকে চয়ন করা হলো।

কথামতো তফসিলি জাতি, উপজাতি, বা সংখ্যা লঘু অঞ্চলে, বছরে নয়শত আই.আর.ডি.পি সরকারি ঋণ দিতে হবে। আমার দু’টো অঞ্চল, ও অপর অঞ্চলের গ্রামটি এই শ্রেণীভুক্ত হওয়ায়, নিয়ম অনুযায়ী আমাকে ওই নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক বৎসরে নয়শত নতুন ঋণ দিতে হবে। গত বছরের প্রচুর লোন প্রপোজ্যাল এখনও বিতরণের অপেক্ষায় পড়ে আছে, তার ওপর এ বছরের বান্ডিল বান্ডিল লোন প্রপোজ্যাল অনুমোদনের অপেক্ষায় পড়ে আছে। কাজে যোগ দেওয়ার সাথে সাথেই, এই গন্ধমাদন পর্বতের বোঝা আমার কাঁধে এসে পড়ায়, ভয় পেয়ে গেলাম। কি করতে হয়, তাও আমার জানা নেই, দেখিয়ে বা বুঝিয়ে দেওয়ার লোকও নেই।

দিনকতক পরেই গ্রাম সেবকের সাথে জমে থাকা নতুন কিছু লোন প্রপোজ্যাল ইনসপেকশন করতে একজনের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। সেখানে ওই অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের বেশ কিছু লোন আবেদনকারী এসে হাজির হয়েছে। আমাকে দেখেই তারা দাঁড়িয়ে উঠে হাতজোড় করে “নতুন ফিলটার বাবু আয়েটে” বলে অভ্যর্থনা করলো। একসাথে এতোগুলো গরীব গ্রাম্য মানুষের সাথে এই আমার প্রথম পরিচয়। বি.ডি.ও. অফিস থেকে লোন আবেদন আমাদের কাছে পাঠানো হয়। আবেদন পত্রে সবকিছু বর্ণনা করা থাকে। আমার কাজ আবেদনকারীর সাথে কথা বলে বিচার করে দেখা, যে ওই জাতীয় কাজে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে কী না, সে সত্যিই ওই কাজ করতে চায় কী না, বা করতে পারবে কী না, ইত্যাদি ইত্যাদি। যাতে সে টাকাগুলো নষ্ট না করে লোনের টাকায় নিজের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে পারে ও ব্যাঙ্কের ঋণ শোধ করতে সক্ষম হয়।

বেশ চলছিল, বিশেষজ্ঞের মতো কিছু প্রশ্ন করে তাদের বাজিয়ে নিয়ে মনের কথা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। প্রশ্নোত্তরের নির্দিষ্ট ফর্মে প্রতিটা প্রশ্নের উত্তরে আবেদনকারীর বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা হলে, নিজে সাক্ষর করে আবেদনকারীকে দিয়ে সাক্ষর করিয়ে, গ্রাম সেবককে সাক্ষর করার জন্য দিচ্ছিলাম। যাইহোক একসময় একজন আবেদনকারীর সাথে আমার কথোপকথন শুরু হলো। আমার পাণ্ডিত্বের নমুনা দিতেই এতো কথার অবতারণা।

“কিসের ব্যবসা করতে চাও”?

“আঁজ্ঞে মুরগির ব্যবসা হুজুর”।

“মুরগির ব্যবসা কতদিন করছো”?

“আঁজ্ঞে অনেক বছর ধরে হুজুর”।

“বাড়িতে এখন কতগুলো মুরগি আছে”?

“তা হুজুর বিশ-পঁচিশটা হবে”।

“বাড়ি গেলে মুরগিগুলো দেখাতে পারবে? এইক’টা মুরগি নিয়ে কি ব্যবসা হয় নাকি”?

“আঁজ্ঞে নিশ্চই পারবো ফিলটারবাবু। টাকা পেলে বড় করে করবো”।

এইভাবে দীর্ঘ প্রশ্নপত্রের উত্তর লিপিবদ্ধ করে তাকে দিয়ে সাক্ষর করিয়ে যখন গ্রামসেককে দিলাম, তখন তিনি বললেন, “এটা ভুল হয়েছে স্যার, ও মুরগির ব্যবসা করে না ও মুগরির ব্যবসা করে”।

বোঝ ঠ্যালা, মুগরিটা আবার কি পদার্থ? এতক্ষণে জানা গেল মুগরি হচ্ছে বাঁশ কেটে সরু সরু কাঠি তৈরি করে, তাই দিয়ে মাছ ধরার ফাঁদ তৈরি করা। আমাদের এখানে যাকে ঘুর্ণি বলে। ফর্মটা ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে ফর্ম পুরণ করলাম।

মাঝে মাঝে নৌকার ইনসপেকশনে যেতে হতো। প্রায় মোহানার কাছে নদীর পাড়ে, পরপর অনেক নৌকা বাঁধা থাকতো। মাছ ধরার প্রকৃত সময়, নৌকার মালিকরা নদীর পাড়ে বাঁশ হোগলা ইত্যাদি দিয়ে, পরপর ঘর তৈরি করে থেকে যেত। আমি সেখানে গিয়ে নৌকা দেখতে চাইলে, “হাই সেটা আমার নৌকা” বলে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিত। সেটা যে ওর নৌকা, বোঝার কোন উপায় ছিল না। তাছাড়া নৌকার কাছে যেতে গেলে, এক হাঁটু জল কাদা ভেঙে যেতে হবে। ফলে বিশ্বাস করা ছাড়া, দ্বিতীয় কোন উপায় ছিল না। নিয়ম রক্ষার জন্য তাদের কথা মতো অনুসন্ধান রিপোর্ট লিখে রাখতাম। নৌকা মাপার একককে পদ বলে, এটাই ছিল আমার নৌকা সম্বন্ধে জ্ঞানের দৌড়। কিন্ত এই আমাকেই, নাইলন জাল বা নৌকা তৈরির জন্য নাইলন সুতো বিক্রেতা বা নৌকা প্রস্তুতকারককে ডেলিভারি অর্ডার দিতে হতো।

একদিন এক ঋণ গ্রহীতা এসে আমায় ধরলো, তাকে তার নৌকায় লাগাবার জন্য একটা ভুটভুটি মেশিন, অর্থাৎ মোটর কেনার লোন দিতে হবে। পূর্বের নৌকার লোনের টাকা সে প্রায় নিয়মিত পরিশোধ করে, কাজেই ভুটভুটি কেনার লোন তাকে দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, তার নৌকায় কি জাতীয় মোটর লাগাতে হবে, তার দামই বা কতো হওয়া উচিৎ, কার কাছে জানতে যাবো। অনেকভাবে কাটাবার চেষ্টা করেও যখন সফল হলাম না, তখন বাধ্য হয়ে বললাম, যে তার নৌকাটা আগে একবার দেখাতে হবে। সে তো সাথে সাথে রাজি হয়ে গিয়ে বললো কবে ‘ইনকুমারি’  করতে যাবেন বলুন। নৌকা কোথায় আছে জানতে চাওয়ায়, সে জানালো যে তার নৌকা জলদা খটিতে আছে। আমাকে প্রতিদিন নদী পেরিয়ে অফিস যাতায়াত করতে হতো। আমি পরিস্কার জানিয়ে দিলাম যে আমার পক্ষে জলদা খটিতে গিয়ে নৌকার ইনকোয়্যারি করতে যাওয়া সম্ভব নয়, তাকে এই নদীতে তার নৌকা নিয়ে আসতে হবে। সে অনেকভাবে তার অসুবিধার কথা জানিয়ে, শেষে নিমরাজি হয়ে ফিরে গেল। আমিও নিশ্চিন্ত হলাম এই ভেবে, যে জলদা খটি থেকে এই নদীর যা দূরত্ব, তাতে ‘ভিক্ষা চাইনা মা কুত্তা সামলাও’ নীতি মেনে, সে আর এই ঝামেলায় যাবে না।

ব্যাপারটা ভুলেই গেছিলাম। দিন কতক পরে অফিস আসার পথে আমি আর আমার এক সহকর্মী নদী পার হওয়ার জন্য মৃগেনের নৌকায় উঠতে যাবো, এমন সময় পিছন থেকে “ও ফিলটারবাবু  নৌকা দেখবেন বলেছিলেন যে” শুনে পিছন ফিরে দেখি একজন আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে এসে সে বললো নৌকা দেখবেন বলেছিলেন, তাই নিয়ে এসেছি। আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কার নৌকা? সে আমাকে দিন কতক আগের কথোপকথন উল্লেখ করে, জলদা খটি থেকে তার নৌকা নিয়ে আসার কারণ ব্যাখ্যা করলো। বাধ্য হয়ে তার নৌকার দিকে এগিয়ে গেলাম। সহকর্মীটি এই নৌকায় যেতে রাজি হলো না, সে মৃগেনের নৌকাতেই নদী পার হয়ে অফিস যাবে বলে জানালো। আমি নৌকায় গিয়ে ওঠার পর লোকটি আমায় বললো “ফিলটারবাবু চলেন আপনাকে আমার নৌকায় খানিকটা ঘুরিয়ে আনি। এটাতো আপনাদেরই দয়ায় পাওয়া”। কে কবে  একে নৌকাটা দিয়েছিল জানি না, শুধু জানি যে এই মানুষটা ঋণের টাকা শোধ করে। আমি বললাম যে আমার হাতে অত সময় নেই, অফিস যেতে হবে, তুমি ওপারের ঘাটে নৌকা লাগাও।

যদিও এটা শখের বোটে চড়া নয়, তবু নৌকা বিশেষজ্ঞ ফিলটারবাবুটি যখন ভুটভুটি দেওয়া যাবে কী না দেখবার জন্য তার নৌকায় উঠেছে, তখন ‘ইনকুমারি’ তো একটা করতেই হয়। তাই বিদ্যে বোঝাই বাবু মশাইয়ের মতো এটা সেটা কিছু প্রশ্ন করে, গম্ভীর গলায় সর্বজ্ঞের মতো জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমার এটা কতো পদের নৌকা”?

“আঁজ্ঞে এগারো পদ বাবু”।

আমার তো নৌকাটা দেখে খুব একটা বড় বলে মনে হলো না, তাই বিজ্ঞের মতো বললাম,  “অসম্ভব, এটা নয় পদের বেশি হতেই পারে না”।

“কি বলছেন বাবু? মেপে দেখেন, এটা এগারো পদের নৌকা”।

মনে মনে নৌকাটা কতটা লম্বা হতে পারে একটা হিসাব করে নিয়ে বললাম, “মেপে দেখার দরকার নেই, তোমায় ঠকিয়েছে এটা নয় পদের বেশি হতেই পারে না”।

“না বাবু, এটা এগরো পদের নৌকা, ঠিক আছে আমি আপনাকে মেপে দেখাচ্ছি”। সে নৌকার ওপর  পাতা পাটাতনগুলো সরিয়ে, আমাকে গুণে দেখাতে শুরু করলো। আমার ধারণা ছিল নৌকা কতটা  লম্বা, তার ওপর কত পদের নৌকা নির্ভর করে। যদিও কতটা লম্বা হলে কত পদের হয়, তাও আমার জানা ছিল না। কিন্তু এখন বুঝলাম, যে পরপর ছয় বা আট ইঞ্চি মতো যে তক্তাগুলো জুড়ে জুড়ে নৌকাটা তৈরি হয়, নীচ থেকে নৌকার ওপর পর্যন্ত তক্তার সংখ্যা বা উচ্চতার ওপর নৌকার মাপ বা পদ নির্ভর করে। তবু ফিলটারবাবু এই সহজ ব্যাপারটা না জানলে বিপদ আছে, তাই “হ্যাঁ তাই তো দেখছি, তবু তুমি অন্য কাউকে দিয়ে একবার ভালো করে মাপিয়ে নিও” বলে,  ‘ইনকুমারি’ পর্বের ইতি টানলাম। ভুটভুটি কেনার টাকা তাকে দিয়েছিলাম, ঋণের টাকার কিস্তিও সে মোটামুটি নিয়মিত শোধও করতো।

দিন যায়, হঠাৎ একদিন একজন কাগজে মোড়া কি একটা জিনিস নিয়ে এসে, মোড়ক থেকে বার করে আমার টেবিলে রাখলো। চুনমাখা গয়না পরা লোমশ কি একটা পদার্থ দেখে, তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কি? “শুয়োরের কান বাবু, শুয়োরটা মরে গেল, তাই কানটা কেটে নিয়ে এলাম। আপনি যা ব্যবস্থা করার করেন”।

শুয়োরের লোন দেওয়ার সময় বীমা করাতে হয়। বীমা কোম্পানি থেকে প্রতিটা শুয়োরের কানে একটা করে ট্যাগ পাঞ্চ করে লাগিয়ে দিয়ে যায়। কোন কারণে শুয়োর মরে গেলে, ব্যাঙ্কের মাধ্যমে ওই ট্যাগ সমেত দরখাস্ত করে ক্ষতিপুরণ চাইতে হয়। আমার মতো শুয়োর বিশেষজ্ঞ একজন দক্ষ ফিলটারবাবুর, শুয়োরের জীবনচক্র সম্বন্ধে হাতের তালুর মতো পরিস্কার ধারণা থাকা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। একটা শুয়োর কত বছর বয়সে বাচ্চা দেয়, এক একবারে কতগুলো বাচ্চা হয়, কতদিন অন্তর শুয়োরের বাচ্চা হয়, বাচ্চা কত বড় হলে কেটে খাবার উপযুক্ত হয় বা বিক্রি করা লাভজনক হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি, আমার কাছে জলের মতো পরিস্কার হওয়া প্রয়োজন।

একটা কাগজে কানের ট্যাগটার নাম্বার লিখে রেখে, যদিও সেটা ঋণ গ্রহীতার লেজারের পাতায়ও লেখা আছে, কাটা কানটা একটা ছোট খামে ঢুকিয়ে, আঠা দিয়ে মুখ বন্ধ করে সেই খামটা আবার অপর একটা খামে রেখে, সেটার মুখও বন্ধ করে দিলাম। শাখার আর্মড গার্ড, নীমা তামাং কার্সিয়াং-এর বাসিন্দা। তার সাথে আমার বেশ মধুর সম্পর্ক। সে আমায় বললো, তাদের ধর্মে শুয়োর ছোঁয়া নিষিদ্ধ, তা নাহলে সে পোস্ট অফিসে গিয়ে বীমা কোম্পনিতে সেটা পাঠাবার ব্যবস্থা করে দিয়ে আসতো। অন্য কেউ এই উৎকৃষ্ট কাজটা করতে না চাওয়ায়, বাধ্য হয়ে খামটা আমার অফিস ব্যাগে পুরে রাখলাম।

পরের দিন থেকে শুয়োরের কানটা আমার সাথে আমার ব্যাগের ভিতর করে চোদ্দ কিলোমিটার বাস, তারপরে নদী পার হয়ে চার কিলোমিটার রাস্তা ভ্যান রিক্সায় যাতায়াত শুরু করলো। কানটাকে যথাস্থানে আর পাঠানোর সময় করে উঠতে পারি না। শেষে একদিন সম্ভবত কানের দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে, অফিস আসার পথে কান সমেত ব্যগটা আমায় না জানিয়ে আমায় ছেড়ে যেদিকে দু’চোখ যায় চলে গেল। মহা ঝামেলায় পড়লাম। আবেদন পত্রের সাথে ট্যাগ সমেত কান জমা না দিলে তো ক্ষতিপুরন পাওয়া যাবে না। ব্যাগ ফিরৎ পাওয়ার আশায় ও কি করা যায় ভাবতে ভাবতেই, আরও কয়েকটা দিন কেটে গেল।

বীমা কোম্পানির এজেন্ট ছেলেটির সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, আজ ছাব্বিশ সাতাশ বছর পরে এখনও আছে। তাকে সমস্ত ঘটনাটা খুলে বললাম। সে আমাকে পরামর্শ দিল যে আমি যেন ব্যাঙ্কের প্যাডে ঋণ গ্রহীতার নাম, ট্যাগ নম্বর উল্লেখ করে, আমার কাছ থেকে ট্যাগটা হারিয়ে গেছে জানিয়ে ইনসুরেন্স কোম্পানিকে একটা চিঠি লিখি। যেহেতু আজ পর্যন্ত কোন ক্লেম এই শাখা থেকে করা হয়নি, তাই তারা ক্ষতিপুরনের টাকা দিয়ে দিতেও পারে। তাই করা হলো, এবং শেষপর্যন্ত টাকা পাওয়াও গেল। টাকা না পাওয়া গেলে আমার পকেট থেকেই টাকাটা গুনাগার দিতে হতো।

সবশেষে আর একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করি, যদিও এই ঘটনাটা লিখতে নিজেরই খারাপ লাগছে, লজ্জা করছে। তবু ঘটনাটা না বললে ব্যাঙ্কের গ্রামের শাখায় ডেভেলপমেন্ট অফিসারদের, যারা দু’দিন আগেও শহরের বুকে ডেবিট-ক্রেডিট, ড্রাফ্ট-পে অর্ডার, ক্যাশ-ক্লিয়ারিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতো, কাজের ধরণের বর্ণনাটা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

একদিন এক ঋণ গ্রহীতা এসে আমায় বললো ফিলটারবাবু, আপনার সাথে একটা কথা আছে। আমি একটা বিপদে পড়েছি, আপনিই পারেন আমায় সুপরামর্শ দিতে। জানা গেল, লোকটির একটি ডেয়ারি লোন আছে। লোকটি আমায় বললো ফিলটারবাবু, আমার গরুটা কিছুতেই গাভিন হচ্ছে না। অনেক চেষ্টা করেও কিছু না হওয়ায়, এ. আই. পর্যন্ত করালাম, কিন্তু তাতেও কিছু ফল না হওয়ায়,  ভাবছি একটা ষাঁড় দেই। আপনি অভিজ্ঞ মানুষ, তাই ভাবলাম আপনার কাছ থেকে সুপরামর্শ নিয়ে আসি। কাজের চাপে দম ফেলার সময় নেই, তারমধ্যে অতগুলো গ্রাম পেরিয়ে উনি আর কোন পরামর্শদাতা খুঁজে পেলেন না, আমার কাছে এসেছেন পরামর্শ করতে। এতো রাগ হলো, যে ভাবলাম বলি, না মনের কথাটা আর বললাম না, পাঠক-পাঠিকারাই বুঝে নিন।

এরও অনেক পরে, ফিরে আসার পর একদিন বাড়ির কাছের বাজারে গিয়ে একজন সবজি বিক্রেতাকে বললাম, “লাউ কতো করে”? লোকটি বেশ গম্ভীর হয়ে বললো “এটা লাউ নয়, এটা  চালকুমড়ো”। কথাটা শুনে হাসি পেল, এই বিদ্যে নিয়ে আমি প্রায় আশিটা গ্রামের প্রভুত উন্নতি করে এসেছি, বলা ভালো করতে বাধ্য হয়েছি, তাও আবার পান, নৌকা, জাল, শুয়োর, ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়। এটা শুধু আমার নয়, অধিকাংশ কর্মীর কপালেই এই দুর্ভাগ্য জুটেছিল। এটাই সিস্টেম,  আমরা সেই হাস্যকর সিস্টেমের দাস মাত্র।

সুবীর কুমার রায়

২২-১২-২০১৮

পটু সুন্দরী (স্মৃতির পাতা থেকে)

Tajpur মা’র কাজের সুবিধার জন্য, সম্ভবত স্বামী পরিতক্তা একটা বউকে, দিদি হাসনাবাদ থেকে নিয়ে এল। যতদূর মনে পড়ে, তার নাম বোধহয় মালতী ছিল। তবে আমরা তাকে পটু বলে ডাকতাম। সুকুমার রায়ের কুমড়ো পটাশ এর মতো অনেকটা দেখতে হওয়ায়, যদিও তার কানদুটো হিজিবিজবিজের কানের আকৃতির ছিল, পটাশ থেকে আদর করে পটু নামকরণ। যেমন নোংরা, তেমনি বিদঘুটে দেখতে, আর তেমনি তার গায়ে দুর্গন্ধ। এই পটুকে কিছু বললে খুব রেগে যেত, ও বিড়বিড় করে কী সব বলতো। হয়তো বলা হলো— “ভালো করে স্নান করতে পারো না, গায়ে এত গন্ধ”?

সঙ্গে সঙ্গে ও বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল, “আসে আসে আমার আসে”। মাঝে মাঝে ঠোঁট উলটে কাঁদতেও বসতো। তার খাওয়া ছিল রাক্ষসের মতো। তিন-চারজনের খাবার সে একাই খেত।

গরমের সময় আমরা রাতে বাইরের বারান্দায় শুতাম। ঘরেও অবশ্য কেউ কেউ শুতো। পটু রাতে ভিতরের লম্বা ডাইনিং স্পেসে শুতো। ওই ডাইনিং স্পেসে একটা বিরাট মিটসেফ ছিল। এই মিটসেফের ওপরে চালের টিন, মুড়ির টিন ইত্যাদি থাকতো। আর তার ওপর দাঁড়িয়েই ছোটবেলায় আমি মধু চুরি করে খেতে গেছিলাম। সেই টিনগুলোই কী না জানি না, তবে এখনও তিনটে টিন থাকে। ট্রেনে যেমন ঝালমুড়ি বিক্রেতাদের ঢাকনা দেওয়া মুড়ির টিন হয়।

প্রায়ই ভোরবেলা ডাইনিং স্পেসে মুড়ি পড়ে থাকতে দেখা যেত। সন্দেহটা স্বাভাবিক ভাবেই পটুর ওপর গিয়ে পড়লো। ওকে হাতে নাতে ধরার জন্য আমি আর ভাই, রাতে তাড়াতাড়ি আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে ঘুমের ভান করে পড়ে থেকেও, অকৃতকার্য হলাম। বহু চেষ্টা করেও তাকে বামাল সমেত ধরতে না পেরে, শেষে আমার বুদ্ধিমতো অন্য ভাবে চেষ্টা শুরু হলো।

মিটসেফটা বেশ উঁচু, তার ওপর মুড়ির টিন, সেটাও বেশ উঁচু। একটা পিন দিয়ে ঢাকনা ও মুড়ির টিনের গায়ে দুটো তীর চিহ্ন এঁকে দিয়ে ঢাকনা ও টিনের গায়ের তীর চিহ্ন দুটো মুখোমুখি রেখে, ঢাকনা বন্ধ করে রখা হলো। ঠিক হলো, রাতে পটু ঢাকনা খুলে মুড়ি খেয়ে ঢাকনা বন্ধ করলে তীর চিহ্ন দুটো কিছুতেই মুখোমুখি থাকবে না। যদিও এই পন্থায় চুরি ধরা পড়লেও চোর ধরা সম্ভব নয়, তবু এতেও কিছু সুফল পাওয়া গেল না। পটু অনেক সাবধানী হয়ে গেছে। শেষে শেষ চেষ্টা হিসাবে এক মক্ষম পন্থা আবিস্কার করলাম। এটা দীর্ঘমেয়াদি পন্থা। যেদিন যখন ও মুড়ি চুরি করতে যাবে, তৎক্ষণাত ও ধরা পড়বেই।

একটা ভারী চামচের হাতলে একটা আধহাত সুতো বেঁধে, সুতোর অপর প্রান্তে একটা দেশলাই কাঠি বাঁধা হলো। এবার মুড়ির টিনটা সামনের দিকে হেলিয়ে, টিনের পিছন দিকে দেশলাই কাঠিটা টিনের নীচে রেখে, টিনটা সোজা করে দেওয়া হলো। এবার মিটসেফের পিছন দিক দিয়ে চামচটা ঝুলিয়ে দিয়ে, মিটসেফের নীচের তাকে বাসন রাখার জায়গায় আর সব বাসনের মধ্যে একটা পেতলের বড় পাত্রকে এমন ভাবে রাখা হলো, যে ওপর থেকে চামচটা পড়লে, ঠিক ওই পিতলের পাত্রের ভিতরেই পড়বে। টিনের নীচের সরু বিটটায় দেশলাই কাঠিটা আটকে থাকায়, টিনটা সামনের দিকে কাত না করলে নিজে থেকে চামচটা নীচে পড়ে যাবার কোন সম্ভবনাই রইলো না। রাতে ঐ ভারী চামচ ওপর থেকে পেতলের পাত্রে পড়লে, ভীষণ জোরে শব্দ হবে। আসলে মুড়ির টিনটা সোজা অবস্থায় থাকলে, তার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে মুড়ি বার করা পটুতো কোন ছাড়, একটা লম্বা লোকের পক্ষেও সম্ভব নয়। কাজেই পটুকে মুড়ি খেতে হলে ঢাকনা খোলা বা মুড়ি বার করার জন্য টিনটাকে সামনের দিকে কাত করতেই হবে, আর সঙ্গে সঙ্গে চামচের টানে দেশলাই কাঠিটা টিনের তলার সরু বিটের থেকে মুক্ত হয়ে যাবে, এবং চামচটা সজোরে নীচে নেমে এসে পাত্রে পড়বে। নিস্তব্ধ গভীর রাতে অত ভারী একটা চামচ, পাঁচ-সাড়ে পাঁচ ফুট ওপর থেকে পেতলের পাত্রে পড়লে, বাড়ির সকলের ঘুম ভেঙ্গে যেতে বাধ্য।

কিন্তু এই খুড়োর কল দেখে আমার ভাই এতটাই উচ্ছাসিত হয়ে পড়লো, যে জোরে জোরে “তোর কী বুদ্ধিরে রাঙাদা, কী একটা জব্বর প্ল্যান করেছিস রে” ইত্যাদি বলতে শুরু করলো। আর তার ফল? সম্ভবত কিছু সন্দেহ হওয়ায়, পটু মুড়ি খাওয়া বন্ধ করে দিল। শেষে পটুকে একদিন বলা হলো, “পটু, রাতে উঠে তুমি মুড়ি খাও”? পটু তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বললো, “না আমি রাতে উঠে মুড়ি খাই না”। আবার বলা হলো, “হ্যাঁ তুমি রাতে উঠে মুড়ি খাও”। পটু এবার একটু চুপ করে থেকে বললো, “কে বলেছে মুড়ি খাই”? “কেন কাল রাতে তো তুমি ঘুমের মধ্যে বলছিলে, কখন উঠে মুড়ি খাব, কখন উঠে মুড়ি খাব”। শুনে পটু শুধু বললো “বলসিলাম নাকি”?

এই পটুর মাথায় প্রায়ই উকুন হতো। তাকে এই নিয়ে খুব কথাও শুনতে হতো। আমরা বলতাম “সারা মাথায় উকুন আর উকুনের ডিমে ভরা, লজ্জা করে না”? তারপরে কী ভাবে উকুনের ডিমটা ক্রমে মুরগির ডিম, কাকের ডিম, ইত্যাদি হতে হতে ছাগলের ডিম, বাঁদরের ডিমে গিয়ে যখন পৌঁছালো, পটু ক্ষোভে দুঃখে ডিম খাওয়াই প্রায় ছেড়ে দিল।

তবে হ্যাঁ, এই পটুর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। সারাদিন পড়াশোনা না করে আড্ডা ও অন্যান্য নানা ভাবে সময় কাটতো, রাতেও রেডিও নিয়ে সময় কেটে যেত। খুব বেশি রাত জাগতেও পারতাম না। একদিন বুঝলাম অনার্স না রাখতে পারলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এই বোধহয় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার প্রথম ভাবনা চিন্তা। কাজেই ঠিক করলাম রাতে পড়তে হবে। কিন্তু রোজই একটু রাত হলেই ঘুম পেয়ে যায়, প্রতিজ্ঞা করতাম কাল থেকে ঠিক পড়বো। মাসের পর মাস কেটে যায়, কিন্তু সেই কাল আর আমার জীবনে আসে না। রাতে শুতে যাবার আগে পটু সুন্দরী হঠাৎ রোজ মন্দিরে যাওয়া শুরু করলেন, আর তারপর তার পেটাতরের সুগন্ধে, পরবর্তী ঘন্টা তিনেক ঘুম তো দূরের কথা, বাড়িতে টেকাই দায় হয়ে উঠতো। ফলে রাত জাগতে আমার আর কোন অসুবিধাই হতো না।

মুণি, ঋষি ও গুরুজনেরা যতই বলুন, ভোরে উঠে পড়াশোনা করা সবচেয়ে ভালো, আমি বিশ্বাস করতাম, রাতে পড়াই সব থেকে ভালো। কারণ রাতে কারো সাথে কথা বলার, গল্প করার বা আড্ডা মারার সুযোগ নেই। আমাদের সময় ইন্টারনেট বা টি.ভি. তো দূরের কথা, রাত এগারোটায় রেডিওর অনুষ্ঠানও শেষ হয়ে যেত। এখনকার মতো চব্বিশ ঘন্টা রেডিওর অনুষ্ঠান, তখন কেউ কল্পনাও করতে পারতো না। মোবাইল তো দূরের কথা, দশ ফুটোর চাকা লাগানো একমাত্র কালো ফোন আছে, এমন বাড়ি খুঁজে বার করাও বেশ মুশকিল ছিল। কাজেই পড়া ছেড়ে অন্য কোনভাবে সময় কাটানোর কোন সুযোগ না থাকায়, আমি রাত সাড়ে এগারোটা-বারোটায় পড়তে বসে, গভীর রাত পর্যন্ত পড়া শুরু করলাম। পটুর কৃপায় রাত জাগতে আর অসুবিধা হতো না। ফলে আমি পাশ করেছিলাম, অনার্সও পেয়েছিলাম।

শেষে পটু একদিন তার বাড়ি ফিরে যাবার জন্য পাগল হয়ে গেল। তার বাড়ি হাসনাবাদে। শ্যামবাজারে গিয়ে হাসনাবাদের বাসে তাকে তুলে দিয়ে আসতে কেউ রাজি না হওয়ায়, ভাঙ্গা কুলো এই আমাকেই, তাকে বাসে তুলে দিয়ে আসতে শ্যামবাজার যেতে হলো। হাওড়া স্টেশনে গিয়ে পটুকে বাসের সামনের দরজা দিয়ে উঠিয়ে, আমি পিছনের দরজা দিয়ে বাসে উঠে দাঁড়ালাম। বাড়ি থেকে বেরোবার আগেই তাকে বলে দিয়েছিলাম, যে রাস্তায় বা বাসে সে যেন আমার সাথে একটাও কথা না বলে। শেষে শ্যামবাজারে তাকে বাস থেকে নামিয়ে, একসাথে না হেঁটে আগে আগে হেঁটে গিয়ে, হাসনাবাদ যাবার বাসে তুলে দিয়ে, বাস কন্ডাক্টারকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে, তাকে হাসনাবাদে নামিয়ে দিতে বললাম। পরে খবর পেয়েছিলাম যে সে ভালোভাবে বাড়ি ফিরে গেছে।

সুবীর কুমার রায়

১৪-১২-২০১৮

 

 

অভিভাবকহীন প্রথম দূর পাল্লার ভ্রমণের অংশ বিশেষ (স্মৃতির পাতা থেকে) {লেখাটি যাযাবর পত্রিকায় প্রকাশিত।}

43951291_1089996314509450_8725371820129124352_nপ্রাণের বন্ধু মাধবের বড়মামা ডাক্তার। মধ্য প্রদেশের ডোঙ্গরগড়ে রেলে চাকরি করেন। বি.কম. পার্ট ওয়ান পরীক্ষার শেষে বেড়াতে যাওয়া ও প্রচন্ড নকশাল আন্দোলনের ঝামেলা থেকে কিছুদিন মুক্তি পাওয়ার আশায়, আমি ও মাধব ডোঙ্গরগড়ে যাওয়া ঠিক করলাম। যদিও বড়মামাকে খুব গম্ভীর ও রাশভারি মানুষ বলেই মনে হতো। যাইহোক্, সেইমতো আমার ও মাধবের ওখানে যাওয়া পাকা হয়ে গেল।

যেদিন আমাদের যাওয়ার কথা, ঠিক তার আগের দিন রাতে দোতলায় সামনের বারান্দায় পরপর মশারি খাটিয়ে আমরা শুয়ে আছি। আমাদের বাড়ির সামনে একটা মাঝখানে টিনের দরজা দেওয়া অল্প উচ্চতার পাঁচিল ছিল। গভীর রাতে, তখনও ভোর হতে অনেক দেরি আছে, টর্চের তীব্র আলো আমাদের বারান্দায় পড়তে, আমাদের ঘুম ভেঙে গেল। বাবা ও মা’রও ঘুম ভেঙ্গে গেছে। নীচের রাস্তায় ভারী বুটের আওয়াজ। হঠাৎ শুনলাম কে যেন বললো, “এই বাড়ি স্যার”। টিনের দরজা না খুলে, পাঁচিল টপকে বেশ কয়েকজন লাফিয়ে ভিতরে প্রবেশ করায় বুঝলাম পুলিশ এসেছে। বাবা বললেন ওদের একটু বুঝিয়ে বলবো, যে এ বাড়ির কেউ নকশালী করে না”? আমি ফিস্ ফিস্ করে আলো জ্বালতে ও কথা বলতে বারণ করলাম। আমি জানি এত রাতে কথা বলতে গেলে, আমরা কেন এত রাতে জেগে আছি, সে কৈফিয়ৎ দিতে হবে। বাবারও সত্যবান চক্রবর্তীর মতো অবস্থা হবে। সত্যবান চক্রবর্তী একজন নিরীহ প্রৌঢ় ভদ্রলোক, কিছুদিন আগে তাঁর বাড়িতে পুলিশ এসে কাউকে না পেয়ে তাঁর ওপর অকথ্য অত্যাচার করে গেছে। আবার এও বুঝতে পারছি,  যে ওরা ওপরে উঠে এলে, আমার ও গোবিন্দর অবস্থা কাহিল হয়ে যাবে, কারণ এই বাড়িতে যুবক বলতে আমরা দু’জনই বাস করি। এইসময় হঠাৎ শুনলাম ওদের মধ্যে কে একজন বললো, “এই বাড়ি নয় স্যার, প্রদীপদের পাশের বাড়ি”। প্রদীপ নকশাল হিসাবে পরিচিত ছিল। ওদের বাড়িটা ছিল, আমাদের বাড়ির ঠিক দু’টো বাড়ি আগে। আমাদের বাড়ির রঙ সাদা, আমাদের একটা বাড়ি আগের বাড়িটার, অর্থাৎ প্রদীপদের বাড়ির ঠিক পাশের তিনতলা বাড়িটার রঙও সাদা। ওই লোকটার কথা শোনার সাথে সাথে সবাই আবার পাঁচিল টপকে লাফ দিয়ে রাস্তায় নেমে, প্রদীপদের পাশের বাড়িটার উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললো।

নিদ্রাহীন সারাটা রাত কাটিয়ে খুব ভোরে দাঁত মাজার অছিলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক ঝলক তাকিয়ে দেখলাম, রাস্তায় সার সার অবাঙ্গালি সি.আর.পি. তে ভর্তি। একজন মহিলা, লোকের বাড়ি কাজ করতে যাবার সময়, তাকে ওরা বাধা দিল। ভয়ে ভয়ে সে জানালো, যে সে লোকের বাড়ি কাজ করতে যাচ্ছে। কিন্তু ওদের একজন গম্ভীর গলায় জানালো— “অটোর নেই”। অর্থাৎ অর্ডার নেই। পরে শুনেছিলাম ওদের কাছে খবর ছিল, প্রদীপের পাশের বাড়িতে অনেকে লুকিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। যদিও সেই বাড়িতে কাউকেই পাওয়া যায় নি। একটু বেলা হলে সকলে ফিরে গেলে, আবার সব স্বাভাবিক হলো। আজই আমাদের ডোঙ্গরগড় যাবার দিন, আজ কোন ঝামেলা হলে সব পন্ড হয়ে যেত।

এই প্রথম একা একা দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া। বেশ একটা হীরো হীরো, সাবালক সাবলক ভাব নিয়ে দু’জনে গীতাঞ্জলীতে ডোঙ্গরগড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। যাওয়ার আগে মাকাকে লালু-ভুলুর যত্ন নিতে বলে গেলাম। লালু-ভুলু সাদা খরগোশ। লালু মেয়ে, আমার খরগোশ। ভুলু ছেলে, ভাইয়ের খরগোশ। একটা ফাঁক ফাঁক কাঠের বাক্সে, যাতে করে কেক, পাঁউরুটি নিয়ে যাওয়া হয়, খরগোশ দু’টোকে রাখা হতো।

অবসন্ন বিকেল কেটে, একসময় রাত নেমে এল। টু-টায়ার বগিতে মুখোমুখি একদিকে মাধবের, উল্টোদিকে আমার আপার বার্থ। সারাদিন মুখোমুখি কখনও জানালার ধারে, কখনও প্যাসেজের দিকে বসেই কেটেছে। বেশ মনে আছে, অনেক রাত পর্যন্ত নীচে একপাশে কোনমতে বসে গল্প করে কাটালাম। ওপরের বার্থে কেউ নেই, বার্থের লোক নিশ্চই ট্রেন মিস্ করেছে, ইত্যাদি নানারকম আলোচনার পর, দু’জন ওপরে উঠে শুয়ে পড়লো। দেখলাম, দেখেও চুপ করে থাকলাম। আরও অনেক পরে ওই দু’জনকে ডেকে নীচে নেমে আসতে বললে, ওরা অবাক হয়ে গেল। গোটা ট্রেনটায় অন্ধকারে সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। আমরা রিজার্ভ করা বার্থ থাকতেও কষ্ট করে কেন জেগে বসেছিলাম, ওরা ভেবে না পেয়ে নীচে নেমে এলো।

বড়মামার কোয়ার্টার্সটা বিশাল। সামনে ও দু’পাশে পুরো ফাঁকা জায়গা। পিছনটা পাঁচিল ঘেরা ছোট্ট জায়গা, কিছু শাকসবজি লাগানো হয়েছে। বড়মামার বড় মেয়ে তার দাদুর কাছে বম্বেতে থাকে। ছোট মেয়ে মুনা ও বাবুল, দু’জনেই বেশ ছোট। ওখানে পৌঁছে কিরকম একটা মন খারাপ করা অস্বস্তি হতে লাগলো। কাউকে চিনি না, বড়মামাও বেশ গম্ভীর রাশভারী মানুষ বলে জানি। একটু পরেই বড়মামা অফিস থেকে এসে, আমাদের দেখে খুব খুশি হলেন। ডানদিকের একটা ঘর আমাদের দু’জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ঘরটার একদিকের দরজা দিয়ে অন্যান্য ঘরে যাওয়া যায়। অন্য একটা দরজা দিয়ে পিছনের ঘেরা সবজি বাগানটায় যাওয়া যায়। বাড়ির ভিতরে একটা বাথরূম-পায়খানা, আর একটা পায়খানা ওই ঘেরা সবজি বাগানটার একপাশে। এটা কিন্তু আমাদের এখানকার খাটা পায়খানার মতো। একটা সিমেন্টের সিঁড়ি দিয়ে অনেকটা উঁচুতে উঠে, এই পায়খানাটায় ঢুকতে হতো।

প্রথম দিন নতুন পরিবেশে ভালোই কাটলো। সন্ধ্যার আগে আমি আর মাধব ঘুরতে বেরলাম। একটু দূরে বোমলাই পাহাড় নামে একটা পাহাড় ছিল। চারিদিকের অন্যান্য পাহাড়গুলোর তুলনায় এই পাহাড়টা অনেকটাই উঁচু। এই পাহাড়টার ওপরে একটা মন্দির আছে। সম্ভবত মন্দিরের দেবীর নাম বোমলাই। আশেপাশে কয়েকটা ছোট ছোট ঢিবি পাহাড় আছে, দূরে সাতপুরা রেঞ্জ। রাতে বড়মামা ও মামি, আমাদের লুডো খেলতে ডাকলেন। আমি আবার আসার সময় সঙ্গে করে একটা চাইনিজ চেকার নিয়ে এসেছি। এই খেলাটা আমার খুব প্রিয় ছিল। একসময় অনেকেই আমাকে হারাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। বেশ মনে আছে, এই খেলায় আমাকে কেউ হারাতে পারে না শুনে বাকসাড়ার একটা ছেলে, এতদিন পরে আর তার নাম মনে করতে পারছি না, আমাকে চ্যালেঞ্জ করে বসলো। আমাকে কেউ হারাতে পারে না, একথা আমি নিজে কোনদিন বলিনি। তবে ব্যাতড়ে আড্ডা মারতে গিয়ে মাঝে মধ্যে খেলা হতো, একথা সত্যি আমাকে কেউ কোনদিন হারাতে পারেনি। ওরাই আমার খেলার প্রশংসা করে একথা বলতো, আর তাতেই গ্যাস খেয়ে, উত্তেজিত হয়ে এই ছেলেটা আমাকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। ব্যাতড়েই একজনের বাড়িতে খেলা হবে। ঠিক হলো, যে হারবে সে মুরগির দাম দেবে। যারা দর্শক, অর্থাৎ আমার ফ্যানেরা, তেল, মশলা, চাল ইত্যাদির দাম দেবে। দু’জনের খেলা অনেকক্ষণ চলার পর, আমিই জয়ের হাসি হেসেছিলাম। মুরগির ঝোল, ভাতও সেদিন কথামতো হয়েছিল। যাহোক্, বড়মামাকে চাইনিজ চেকার খেলার কথা বলতে, তাঁরা লুডো খেলাতেই আগ্রহ প্রকাশ করলেন।

পরদিন সকালে চা খেয়ে বাথরূমে যাবার আগে মাধবকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কোন বাথরূমটায় যাব”? মাধব জানালো দিনের বেলায় ছেলেরা বাইরের বাথরূমটা ব্যবহার করে। সেইমতো আমিও সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে ভিতরে ঢুকে লক্ষ্য করলাম, নীচে কোন টব বা গামলা জাতীয় কিছু নেই। গর্তের নীচে পরিস্কার চকচকে লাল সিমেন্টের মেঝে। আবার বাইরে এসে মাধবকে ব্যাপারটা জানাতে, ও বললো কোন অসুবিধা নেই ওখানেই যা। বুঝতে পারছি না যে ও আমার সাথে ইয়ার্কি করছে কী না। যদিও ওর এই জাতীয় ইয়ার্কি করার স্বভাব নয়, তবু ভয় হচ্ছে ওখানে যাবার পর আবার না লজ্জায় পড়তে হয়। শেষপর্যন্ত ওর জোর গলায় অভয়বাণী শুনে ও প্রাকৃতিক ডাকে, যা আছে কপালে ভেবে ওখানেই গেলাম। একটু ভয় ভয় ভাব নিয়ে সবে বসেছি, বস্তুটা শরীর ত্যাগ করে লাল মেঝেয় পড়ার আগেই নীচে কিরকম একটা আওয়াজ হওয়ায়, নীচে তাকিয়ে দেখি দুটো শুয়োর গর্তের নীচে, আর একটা গুঁতোগুঁতি করে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। একটা তো পারলে প্রায় বস্তুটা মাটিতে পড়ার আগেই শরীর থেকে টেনে নিতে চায়। ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কী করবো ভাবছি। এই অবস্থায় বাইরে যাওয়াও সম্ভভব নয়। বাধ্য হয়ে আবার বসলাম। বস্তুটা মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেঝে আবার আগের মতো লাল চকচকে। পরে মাধব জানালো এখানে এটাই ব্যবস্থা, সব বাড়িতেই এই একই ব্যবস্থা। জিজ্ঞাসা করলাম, “কোনদিন শুয়োরগুলোর যদি খিদে না থাকে, বা শরীর খারাপ করে”? মাধব জানালো শুয়োরের অভাব নেই, কারো না কারো খিদে থাকবেই, কাজেই চিন্তার কোন কারণ নেই। এরপর থেকে এই অদ্ভুত ব্যবস্থায় আমি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম।

বেশ কাটছিল। সকালে চা জলখাবার খেয়ে দু’জনে ঘুরতে বেরোতাম। চারিদিক ঘুরে ফিরে বাড়ি ফিরে স্নান করা। দুপুরে ভালোমন্দ খেয়ে একটু ভাতঘুম। বিকালে আবার বেরোনো। পাহাড়ে ওঠা, রেল লাইন ধরে হাঁটা, এবং শেষে একটা দোকানে গরম গরম সিঙাড়া ও চা খেয়ে বাড়ি ফেরা। ইতিমধ্যে আমার অনুরোধে বড়মামা ও মাইমাও চাইনিজ চেকার খেলা শুরু করেছেন। এখন লুডো খেলা প্রায় বন্ধ। অনেক রাত পর্যন্ত চাইনিজ চেকার খেলা হতো। বড়মামার এই খেলাটাতে কিরকম নেশা ধরে গেছিল।

একদিন ওখানকার সবথেকে উঁচু পাহাড়টায় যাওয়ার প্ল্যান করলাম। বড়মামা জানালেন ওই পাহাড়ে প্রচুর বড় বড় বুনো মৌমাছির চাক আছে, কাজেই সতর্ক হয়ে যেতে হবে। মৌমাছির ঝাঁক আক্রমণ করলে, মুখটা ঢাকা দিয়ে মুখটাকে বাঁচাতে হবে। সকালবেলা চা, জলখাবার খেয়ে দু’জনে বোমলাই পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বোমলাই ঢিবি পাহাড় হলেও বেশ উঁচু। দু-চারটে মৌমাছিকে ভোঁ ভোঁ শব্দ করে ঘুরপাক খেতেও দেখলাম। কিন্তু কোন মৌচাক নজরে পড়লো না। ফেরার পথে আমি ও মাধব, একে অপরের সিগারেট মুখে ফিল্মী কায়দায় ছবি তুললাম। দু’একদিনের মধ্যে সেইসব ছবি হাতেও পেয়ে গেলাম। মাধবের অসতর্কতায় সেই দু’টো ছবি বড়মামার হাতে চলে গেল। অনেক ছবির মধ্যে থেকে সেই দুটো ছবি বার করে নিতে ভূলে গিয়ে, সব ছবি মাধব বড়মামাকে দেখতে দিল। বড়মামা, মাইমা, মুনা ও বাবুল গোল হয়ে বসে সেই সব ছবি দেখতে শুরু করলো। বিপদ বুঝে আমি মাধবকে ইশারা করলাম, কিন্তু তখন আর ছবিগুলো ফেরৎ নেবার উপায় নেই। বিপদ বুঝে আমি পাশের নিজেদের ঘরে চলে গেলাম। মাধব বোকার মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পরেই বড়মামাকে একটু জোর গলায় ধমকের সুরে কথা বলতে শুনে ঘাবড়ে গেলাম। পরে মাধবের কাছে শুনলাম, ওই ফটোদুটো মুনা ও বাবুলকে দেখতে না দেওয়ায়, তারা দেখতে চাইছিল। তাই বড়মামা তাদের ধমক দিচ্ছিলেন। তিনি কিন্তু আমাদের এ বিষয়ে একটি কথাও বললেন না।

একদিন হরকিষাণ নামে একটা পয়েন্টসম্যান এসে খবর দিল, মার্টিন একটা বাঘ মেরেছে। হরকিষাণ দিনে অনেকবার বড়মামার বাড়িতে আসতো। সে বড়মামর অনেকটা ব্যক্তিগত খানসামা গোছের ছিল। বড়মামা আমাদের বাঘটা দেখতে যেতে বললেন। আমরা হরকিষাণকে বাঘ না বনবিড়াল জিজ্ঞাসা করায়, সে বেশ জোর গলায় জানালো—“না বাবু শের”। বড়মামা জানালেন, পাশ দিয়ে সাতপুরা রেঞ্জ যাওয়ায় বাঘ আসার সম্ভাবনা আছে।

আমরা বাঘ দেখতে যাওয়ার জন্য তৈরি হলাম। বড়মামা বললেন, এখানকার সব লোক তাঁকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। বাঘের চামড়াটা চাইলে হয়, মার্টিন তাঁকে বাঘের চামড়াটা দিয়ে দিতে পারে।

আমরা দু’জনে হরকিষাণের সাথে মার্টিনের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মার্টিন একজন খৃষ্টান মেথর। তার নাকি বন্দুক আছে এবং তার বন্দুকের নিশানাও নাকি অব্যর্থ। কয়েক দিন ধরেই এর ছাগল, তার মুরগি খোয়া যাচ্ছিল। আধ খাওয়া ছাগল পড়ে থাকতেও দেখা গেছে। গতকাল রাতে বাঘের ডাকের আওয়াজ শুনে, মার্টিন অন্ধকারে আওয়াজ লক্ষ্য করে আন্দাজে গুলি চালায়। তাতেই বাঘটা মারা গেছে।

শুনে তো আমরা অবাক। এখানে এমন একজন জিম করবেটের ছোট ভাই আছে, ভাবতেই পারছিলাম না। প্রচন্ড অবিশ্বাস নিয়ে মার্টিনের কোয়ার্টার্সের কাছে গিয়ে দেখি বেশ ভিড়। নিশ্চিত হলাম বাঘ না হলেও, কিছু একটা মেরেছে। কিন্তু ততক্ষণে মার্টিনের কোয়ার্টার্সের বাইরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাইরে তখনও অনেক কৌতুহলী লোকের ভিড়। দরজাটার নীচের দিকে চৌকাঠ না থাকায় অনেকটা ফাঁক। প্রায় শুয়ে পড়ে ওই ফাঁক দিয়ে দেখলাম, একটা প্রকান্ড চিতাবাঘ শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে আবার দরজা খুলে দিলে ভিতরে গিয়ে দেখি, বাড়ির দালানে বাঘটা পাশ ফিরে পড়ে আছে। গলার কাছে একটা গুলি লাগার গর্ত, সেখানে কালো হয়ে রক্ত জমে আছে। লেজটা বেশ মোটা। হাত দিয়ে দেখে বোঝা গেল, বড় বড় লোমের জন্য লেজটা অত মোটা মনে হয়। বড় বড় গোল গোল কালো রঙের ছোপগুলো দেখে মনে হচ্ছে যেন তুলি দিয়ে আঁকা। একটু পরে বাঘটাকে বাইরে নিয়ে আসা হলে, মার্টিন বাঘের গায়ে পা দিয়ে, বন্দুক কাঁধে ছবি তুললো। কিন্তু বড়মামার বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে পুলিশের গাড়ি এসে বাঘ ও মার্টিন, উভয়কেই তুলে নিয়ে গেল।

এরমধ্যে আমার জন্মদিন এল। কথায় কথায় মাধবকে বলেছিলাম, ও বোধহয় মাইমাকে বলেছিল। ওই দিন দেখলাম বড়াখানার ব্যবস্থা হয়েছে, এবং আমাকে একটা বেশ বড় মাছের মুড়ো দেওয়া হয়েছে। মাছের মুড়ো আমি পছন্দও করি না, গুছিয়ে খেতেও পারি না। বিপদ বুঝে অনেক চেষ্টায় মাধবকে মুড়োটা তুলে দিয়ে বিপদমুক্ত হলাম। মাইমা বোধহয় ভাবলেন, আমাকে একা মুড়োটা দেওয়ায় লজ্জা পেয়েছি। ফলে বিপদ বাড়লো। এরপর থেকে বেশ কয়েকবার আমাদের দু’জনকে দুটো মাছের মুড়ো দেওয়া হলো।

এই জাতীয় বিপদ আমার জীবনে বার বার আসে। আগেও এসেছে, এখনও আসে। আমি কোনকালে ঘড়ি পরি না, মিষ্টি খেতে মোটেই ভালোবাসি না, অথচ যত রাজ্যের লোক দেখি সবাইকে ছেড়ে আমার কাছে ক’টা বাজে জানতে চায়, আমাকে আদর করে মিষ্টি খেতে দিয়ে বিব্রত করে। একবার মামার বাড়ি সোদপুরে গেছি, দুপুরে খাবার পাতে দাদুকে একটা মাছের মুড়ো দেওয়ায়, দাদু সেটা আমার পাতে তুলে দেন। আমি বিপদ বুঝে নানা যুক্তি খাড়া করে সেটা পুনরায় দাদুর পাতে ফেরৎ পাঠাতে চেষ্টা করি।

যুক্তিগুলো অবশ্য বেশ হাস্যকর ছিল। যেমন, অল্প বয়সে মাছের মুড়ো খেয়ে কী হবে? মাছের মুড়ো খেলে চোখ ভালো থাকে, সেটা আমার থেকে তাঁর খাওয়া বেশি প্রয়োজন। বুড়ো বয়সে পুষ্টির প্রয়োজন অনেক বেশি, তাই মুড়োটা দাদুরই খাওয়া উচিৎ। কিন্তু বাস্তবে কোন যুক্তিই কাজে না লাগায়, মুড়োটা আমার পাতেই স্থান পায়। বাধ্য হয়ে মুড়োটাকে ছোট ছোট অংশে ভেঙ্গে থালার চারপাশে ফেলে, মুড়োটা খেয়েছি ভান করতে হয়।

একদিন আমি আর মাধব রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কয়েক কিলোমিটার পথ পার হয়ে এসে, একটা জায়গায় একটা হনুমানকে রেললাইনের ধারে বসে টিক গাছের পাতা খেতে দেখলাম। এই এক অদ্ভুত জীব। এরা টিক পাতা খায়, পেঁপে পাতা খায়, অথচ আতার মতো সুস্বাদু ফল খায় না। এই এলাকায় প্রচুর আতা হয়। এখানকার লোকেদের ধারণা, ফলটার নাম সীতাফল বলে, হনুমান এই ফল খায় না। এখানকার সাধারণ লোকের বুদ্ধিও জীবটার মতোই, এবং সাধারণ লোকের সংখ্যাই বেশি। আমাদের হঠাৎ কী দুর্বুদ্ধি হলো, হনুমানটাকে কে টিপ করে পাথর ছুঁড়ে মারতে পারে, তার প্রতিযোগীতা শুরু করলাম। একটা করে রেললাইনের পাথর ছোঁড়া হচ্ছে, এবং যথারীতি অধিকাংশই লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে। যে দু’-একটা তার গায়ে লাগার মতো সঠিক নিশানায় যাচ্ছে, হনুমানটা তার শরীরটকে অদ্ভুত ভাবে বাঁকিয়ে, সেগুলো থেকে আত্মরক্ষা করছে। অদ্ভুত ব্যাপার, হনুমানটা কিন্তু ওই জায়গা থেকে এক ইঞ্চিও সরছে না, বা আমাদের আক্রমণ করার চে্ষ্টাও করছে না। হঠাৎ দেখি ছোট ছোট গাছের আড়ালে, প্রচুর হনুমান। আমরা ভয় পেয়ে দ্রুত পা চালালাম। এইভাবে আরও অনেকক্ষণ রেল লাইন ধরে এগিয়ে যাবার পর, আকাশ কালো করে মেঘ জমতে শুরু করলো। একটু পরেই ঠান্ডা বাতাস, বুঝলাম কোথাও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমরা দ্রুত ফেরার পথ ধরলাম। কিন্তু আমরা ততক্ষণে বেশ কয়েক কিলোমিটার পথ পার হয়ে চলে এসেছি। সামান্য পথ ফেরার পরেই, বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হলো, তার সাথে তীব্র হাওয়া। আমরা ওই অবস্থায় লাইন ধরে হেঁটে ফিরছি। বৃষ্টির ফোঁটা চোখে মুখে সুচের ফলার মতো বিঁধছে, কোথাও একটা দাঁড়াবার মতো জায়গা নেই। আরও কিছুটা পথ আসার পর, পিছন থেকে একটা মালগাড়ি আসতে দেখলাম। মালগাড়িটা আমাদের অতিক্রম করে যখন চলে যাচ্ছে, তখন গার্ডের বগিটাতে একজনকে বসে থাকতে দেখে হাত নাড়লাম। উনিই সম্ভবত গার্ড। আমরা কোথায় যাব জিজ্ঞাসা করায়, জানালাম ডোঙ্গরগড় রেলওয়ে স্টেশনে যাব। তিনি গাড়িটা দাঁড় করিয়ে দিয়ে আমাদের তাঁর বগিতে তুলে নিলেন। বাকি পথ আমরা কোথায় থাকি, কী করি, এখানে কার কাছে এসেছি, ইত্যাদি গল্প করতে করতে ডোঙ্গরগড় রেলওয়ে স্টেশনে গাড়ি এলে, গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমাদের নামিয়ে দিলেন। কষ্ট অনেকটা লাঘব হলেও, একবারে ভিজে কাক হয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি ফেরার পথে অবশ্য ভিজে পোষাকেই অন্যান্য দিনের মতো সিঙাড়া আর চা খাওয়া হলো।

সুবীর কুমার রায়

০৫-১২-২০১৮

ভ্যাট {লেখাটি আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য একাডেমী, বইপোকার কলম, উই পোকার কলম, বাংলায় লিখুন, Creative Eye ও গল্পগুচ্ছ পত্রিকায় প্রকাশিত।}

44197881_1089998384509243_8502252572659154944_n

বড় রাস্তা থেকে বেঁকে চওড়া গলিটার ওপর দোতলা ঝকঝকে বাড়িটার ঠিক সামনেই, রাস্তার পাশে একটা লাইট পোস্ট, আর তার প্রায় গা ঘেঁষে মিউনিসিপ্যাল্ কর্পোরেশনের একটা সিমেন্ট বাঁধানো মাঝারি আকারের ভ্যাট। অনেকটা অঞ্চল জুড়ে এই একটা মাত্র ভ্যাট থাকায়, এই ভ্যাটটা প্রায় প্রতিদিনই আবর্জনায় ভর্তি হয়ে রাস্তায় উপচে পড়ে দুর্গন্ধ ছড়ায়। দু’একদিন পর পর কর্পোরেশনের গাড়ি এসে আবর্জনা তুলেও নিয়ে যায়। সম্ভবত এবার কয়েকদিন কর্পোরেশনের গাড়ি জঞ্জাল তুলে নিয়ে যায়নি, তাই ভ্যাট উপচে নোংরা জঞ্জাল, রাস্তার অনেকটা অংশ দখল করে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, আর তারই ভিতর খাবারের লোভে কয়েকটা কুকুর নিজেদের ভিতর লড়াই করছে।

কুকুর তাড়িয়ে, একটা লোহার শিক দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে, কপির ডাঁটা, স্যানিটারি ন্যাপকিন, ফেলে দেওয়া পচা খাবারের অংশ, ইত্যাদি সরিয়ে সরিয়ে, একটি লোক ঠান্ডা পানীয়র বোতল, প্ল্যাস্টিক ক্যারিব্যাগ, বড় বড় থার্মোকলের টুকরো, পিচবোর্ডের বাক্স, ছেঁড়া কাপড় জামা, লোহালক্কড়, ইত্যাদি প্রচুর জিনিস তুলে, পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা ভ্যান রিক্সায় রেখে, ভ্যাট প্রায় অর্ধেক খালি করে ফেললো। সম্ভবত এগুলো বিক্রি করেই তার সংসার চলে। হঠাৎ দোতলা বাড়ির বারান্দা থেকে পরপর চারটে ময়লা ও আবর্জনা ভর্তি পিচবোর্ডের তৈরি বিস্কুটের বাক্স, বোমার মতো নীচের ভ্যাটের মাঝখানে এসে আছড়ে পড়লো। লোকটি একবার ওপরের বারান্দার দিকে তাকিয়ে, লোহার শিকটা দিয়ে পিচবোর্ডের বাক্সগুলো কাছে নিয়ে এসে, ময়লা ঝেড়ে তার ভ্যান রিক্সায় রাখলো।

দোতলা বারান্দার সেই সুবেশা মহিলা ততক্ষণে নীচে নেমে এসে, এই চারটে ও অন্যান্য পিচবোর্ডের বাক্সগুলোর জন্য মূল্য চেয়ে বসলো। লোকটা অবাক হয়ে বললো, “এই বাক্সগুলোতো আমি ভ্যাট থেকে নোংরা ঘেঁটে কুড়ালাম, তাছাড়া আপনি তো মোটে চারটে বাক্স ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেললেন, অন্য বাক্সগুলোর মূল্যই বা চাইছেন কেন”?

“কয়েকদিন কোন কাগজওয়ালার দেখা না পেয়ে, আজ চারটে বাক্স ফেলেছি, বাকিগুলো গতকাল  ফেলেছিলাম। বাক্সগুলো তো আমি বিক্রিই করতাম, কাজেই ওগুলো নিতে গেলে কাগজওয়ালার মতোই তোমায় পয়সা দিয়ে কিনতে হবে, নাহলে নিতে দেবো না। আরে বাবা, বিনা মুলধনে কি আবার ব্যবসা হয় নাকি? তুমি আমার এই জিনিসগুলো বিক্রি করে টাকা কামাবে, আর আমি সেই টাকার কোন ভাগ পাবো না, তাই আবার হয় নাকি? লোক ঠকিয়ে এই ব্যবসা করা কতদিন চলছে”?

ধীরে ধীরে কথোপকথন বিবাদের আকার নিলে, কিছু পরোপকারী সমাজসেবি যুবকের ভিড় জমে গেলো। পৃথিবীতে এমন কি কোন মূর্খ আছে, যে সুন্দরী যুবতী বধূর পক্ষ না নিয়ে, কাগজ কুড়ানো নোংরা অসভ্যের পক্ষ নেবে? এক্ষেত্রেও সকলেই যুবতী বধূর পক্ষ নিয়ে, কাগজ কুড়ানো লোকটার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে রুখে দাঁড়ালো।

লোকটি রাগে গজগজ করতে করতে, ভ্যান রিক্সা থেকে সবকিছু আবার ভ্যাটে ফেলে দিয়ে, ভ্যান নিয়ে চলে গেল। ভ্যাট আবার আগের চেহারা নিলো। আগের মতো অন্যান্য আর সব কিছুর সাথে চকচকে ফাঁকা চারটে পিচবোর্ড বাক্সও, ভ্যাট উপচে রাস্তায় গড়াগড়ি খেতে লাগলো। যুবকরা যুদ্ধ জয় করে ফিরে গেল, কৃতজ্ঞ যুবতী বধূটিও তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে, চারটি বাক্সের শোক ভুলে, দোতলায় ফিরে গেল।

ভ্যাটের কাছে মানুষের ভিড় না থাকায়, কুকুরগুলো মনের সুখে নিশ্চিন্তে আবার আগের মতোই খাবারের আশায় ভ্যাটের জঞ্জাল মুখ দিয়ে টেনে রাস্তায় নামাতে শুরু করে দিলো।

সুবীর কুমার রায়

১৯-১১-২০১৮

 

তোমার হলো শুরু

44197881_1089998384509243_8502252572659154944_nসকাল বেলা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে আমি তো অবাক। ছয় বছরের নাতনি তার স্কুলের প্রজেক্ট নিয়ে মায়ের সাথে এতো ব্যস্ত, যে আমার আগমনে দু’জনের কেউই বিশেষ খুশি হলো বলে মনে হলো না।  একটা খাতায় পাঁচটা ফল, পাঁচটা ফুল, ও পাঁচটা পাখির ছবি এঁকে রঙ করে আগামীকাল স্কুলে নিয়ে যেতে না পারলে নাকি দেশ, দশ, তার, ও তার স্কুলের ভবিষ্যৎ এক্কেবারে অমাবস্যার মতো অন্ধকার হয়ে যাবে।

আজ কপালে এক কাপ চাও জুটবে না বুঝে, চুপ করে বসে, তাদের কর্মযজ্ঞ অবলোকন করতে লাগলাম। বাচ্চাটা এই বয়সেই বেশ ছবি আঁকে। গোলাপ, জবা, ও পদ্ম ফুল আঁকা ও রঙ করা হয়ে গেছে, এখন গাঁদা ফুল আঁকার পর্ব চলছে। ছবি দেখে আমি তো রীতিমতো বিষ্মিত। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, যে হাজার চেষ্টাতেও ওই গোলাপ আমি আঁকতে পারতাম না। আমার আঁকা গোলাপকে লাল বা গোলাপি রঙ না করে সাদা রঙ করলে, স্বচ্ছন্দে গন্ধরাজ বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

মেয়ের উদ্বিগ্নতা দেখে মনে মনে ভাবলাম, ‘তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা’। কিছু কিছু কাজ আছে, যা ন্যায় বা অন্যায় যাই হোক না কেন, অবস্থা ও পরিস্থিতির চাপে নতি স্বীকার করে আমাদের বাধ্য হয়ে করে যেতেই হয়। চোখের সামনে অনেকগুলো বছর আগের ঘটনাগুলো এক এক করে ভেসে উঠলো।

কর্মসূত্রে আমি তখন অন্য একটা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে থাকি। প্রতি শনিবার রাতে বাড়ি এসে,  সোমবার কাক ডাকার আগেই ফেরার বাস ধরতে হয়। আমার স্ত্রী, তার ছয় বছরের মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে একাই থাকে। এক শনিবার রাতে বাড়ি ফিরতেই মেয়ের কান্না শুরু হলো। কারণ, তাকে নাকি সোমবার হাতের কাজ স্কুলে জমা দিতেই হবে। একটা টবে রঙিন কাগজ দিয়ে একটা গাছ তৈরি করে লাগাতে হবে, যাতে শুধু পাতা থাকলেই চলবে না, একটা ফুল ও একটা কুঁড়ি থাকাও বিশেষ প্রয়োজন। আমার স্ত্রী আবার ভারত স্বাধীন হলে, মালদা স্বাধীন হবেই জাতীয় আদর্শে বিশ্বাসী। সে খুব ভালো করেই জানে, যে এহেন বিপদ, ত্রাতা হিসাবে আমাকেই সামলাতে হয়, তাই গাছ ফুল লতা পাতা তৈরি তো দূরের কথা, ওগুলো তৈরি করার উপকরণগুলো পর্যন্ত যোগাড় করে রাখার প্রয়োজনবোধ পর্যন্ত করেনি। আজ অনেক রাত হয়ে গেছে, পথশ্রমে শরীরও বড় ক্লান্ত, মেয়েকে আগামীকাল তৈরি করে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আশ্বস্ত করে কোনমতে কান্না থামালাম।

পরদিন সকালে উঠে সারা সপ্তাহের আমিষ ও নিরামিষ বাজারসহ, মুদিখানা স্টেশনারি দশকর্মা ইত্যাদি দোকানপাট সেরে, গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো মেয়ের জন্য বিভিন্ন রঙের কাগজ, সরু তার, আঠার টিউব, মাটির ছোট্ট টব, ইত্যাদি কিনে বাড়ি ফিরলাম। চা জলখাবার মাথায় উঠলো, শুরু হয়ে গেল ফুল গাছ সমেত ফুলের টব তৈরির কর্মযজ্ঞ।

মাটির টবে আঠা দিয়ে রঙিন কাগজ সেঁটে, সুন্দর একটা টব, ও তিন চারটে সরু তার পাকিয়ে গাছের কান্ড ও শাখা প্রশাখা তৈরি সমাপ্ত। কারুশিল্পে নিজের এতো প্রতিভা ও নৈপুণ্য দেখে নিজেই অবাক হয়ে, নতুন উৎসাহে একদিকে আঠা মাখানো সবুজ রঙের সরু কাগজ দিয়ে তারের তৈরি গাছের কান্ড ও শাখা প্রশাখা মুড়তে গিয়ে, প্রথম ধাক্কাটা খেলাম। আঠা মাখানো সবুজ কাগজ, তারের তৈরি গাছের কাঠামোয় জড়িয়ে হাত সরিয়ে নিতে গেলেই, হাতের সাথে অর্ধেক কাগজ উঠে চলে আসছে। শেষে আধুনিক প্রযুক্তির তৈরি দামি আঠা ছেড়ে, পুরাতন ও সনাতন পদ্ধতি, ভাত দিয়ে দিব্য একটি তরতাজা গাছ তৈরি করে, শুকাতে দিয়ে অন্য কাজে মন দিলাম।

সন্ধ্যার পর টিভিতে একটা ভালো সিনেমা দেখে, নতুন উদ্দমে কয়েকটা পাতা, ফুল, ও কুঁড়ি তৈরির কাজে হাত দিয়ে, বেশ রাতেই মিশন ফুলগাছ পর্ব সমাপ্ত হলো। আমার হাতের নিপুণ কাজ দেখে, সব কাজে খুঁত ধরা স্ত্রী পর্যন্ত মুগ্ধ, নিশ্চিন্ত আমার ছয় বছরের একমাত্র সন্তান।

পরের দিন কাকভোরে তৈরি হয়ে বিদায় নেবার আগে লক্ষ্য করলাম, যে ফুলের একটা পাপড়ি ও ফুল ফোটার আগেই ফুলের কুঁড়িটা ঝরে পড়ে মেঝেতে শুয়ে আছে। অফিস যাওয়া মাথায় উঠলো। অত ভোরে শুরু করে, ফুল ও কুঁড়ি মেরামত পর্ব যখন সম্পন্ন হলো, তখন আমার বাস আমায় ফেলে অনেক দূরে চলে গেছে।

স্কুল থেকে ফিরে পলিথিন ব্যাগ থেকে ফুলের টব বার করে মেয়ে জানালো, “দিদিমণি বলেছেন কাল দেখবেন”। দেখলাম ফুল পাতা ও কুঁড়ির বেশিরভাগ অংশই, গাছের সঙ্গ ছেড়ে পলিথিন ব্যাগে আশ্রয় নিয়েছ। সারাদিন ধরে সবকিছু আবার মেরামত করে আগের অবস্থা ফিরিয়ে এনে, চড়া সুরে মেয়েকে বললাম যে কালও যদি দিদিমণি না দেখে, তাহলে দিদিমণিকে বলবি বাড়িতে এসে দেখে যেতে। যাহোক পরের দিন আর নতুন করে কোন সমস্যা হয়নি।

তখন কি ছাই জানতাম, যে কারও পৌষমাস কারও সর্বনাশ কথাটা কতটা সত্যি। একটু ঠান্ডা পড়তেই হুকুম হলো, উলের বটুয়া তৈরি করতে হবে। সারা বছর কোন উলের কাজ স্কুলে হয়েছে বলে তো মনে পড়লো না, কারণ আমাকে অন্তত কোন উলের গোলা কিনে দেওয়ার কথা ফরমাশ করা হয়নি। আমার কপাল ভালো, স্ত্রী জানালেন যে ওটা কোন ব্যাপার নয়, দুটো সোজা একটা উলটো ঘর বুনে আমি করে দেবো। তুমি শুধু দু’টো উলের কাঁটা ও উল কিনে এনে দিও। নির্দেশ  মতো উল ও কাঁটা কিনে এনে দিয়ে, পরের দিন ভোরে নিশ্চিন্ত মনে অফিস চলে গেলাম।

পরের শনিবার ফিরে এসে দেখলাম বটুয়া তৈরি হয়ে গেছে, তবে স্কুল থেকে জানানো হয়েছে, যে বটুয়ার গায়ে চুমকি দিয়ে কাজ করতে হবে, আর বটুয়ার মুখ বন্ধ করার উলের দড়ির দু’পাশে  উলের ফুল করতে হবে। শাস্ত্রে পরিস্কার বলা আছে, ‘সংসার সুখের হয় ভাঙা কুলোর গুণে’, কাজেই  কোন বাড়িতে আমার মতো একজন ভাঙা কুলো থাকলে, সেই বাড়িতে দুশ্চিন্তা ঢুকবার প্রবেশদ্বার পর্যন্ত খুঁজে পায় না। যথারীতি এবারেও দায়িত্বটা, এই অধমের ওপরেই বর্তালো। তাছাড়া জামা প্যান্টের বোতাম ছিঁড়ে গেলে আমি যখন নিজেই লাগাই, তখন বটুয়ায় চুমকি লাগানোটা আমার কাছে স্রেফ নস্যি। তবে বটুয়ার উলের দড়ির দুপাশের উলের ফুলটা কাকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায়, ভেবে দেখতে হবে।

পরদিন বাজার থেকে ফেরার পথে, ঠোঙায় করে বেশ খানিকটা চুমকি কিনে বাড়িতে ফিরে এলাম। এবারের হাতের কাজের সিংহভাগ তো শেষ হয়েই আছে, কাজেই বাকি সামান্য অসমাপ্ত কাজের জন্য, হাতে অনেকটাই সময় আছে। ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে চা জলখাবার খেয়ে, প্রফুল্ল মনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে কাজে বসলাম। কাজ শুরু করার আগে চুমকি জিনিসটা কি একবার পরখ করে দেখার জন্য চুমকির ঠোঙাটা খুলে, আনন্দে মন ভরে গেল। চুমকি যে আবার এতো রঙের হয়, জানা ছিল না। সত্যি কতো কিছুই না, জানার ও শেখার আছে। এই জন্যই ছোট্ট বয়স থেকে আর কিছু শিখুক না শিখুক, হাতের কাজ শেখানোটা, অন্তত করানোটা বাধ্যতামুলক হওয়া উচিৎ। আমাদের সময় আমরা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায়, বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই হয়ে জীবনখানা ষোল আনাই মিছে করে বসে আছি।

বটুয়ায় একটা ফুলগাছ এঁকে, গাছের কান্ড ও পাতা সবুজ রঙের, ফুলগুলো লাল রঙের, ও কুঁড়িটা হালকা গোলাপি রঙের চুমকি দিয়ে করবো ঠিক করে ফেললাম। পরিকল্পনা মাফিক একটা হলুদ রঙের খড়ি দিয়ে মেরুন রঙের বটুয়ার ওপর ফুলগাছ আঁকতে গিয়ে প্রথম ধাক্কাটা খেলাম। মেঝেতে বটুয়াটাকে টানটান করে রেখে যদিও বা অনেক পরিশ্রম করে একটা আবছা ফুলগাছ আঁকা সম্পন্ন হলো, কিন্তু তাকে হাতে করে ওপরে তুললেই, গাছের চেহারার আমুল পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে ফুলগাছের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে, সস্তায় পুষ্টিকর একটা তারা এঁকে, তাতেই চুমকি লাগাবার জন্য সুচে মেরুন রঙের সুতো পড়িয়ে চুমকি লাগাতে গিয়ে, দ্বিতীয় ও মক্ষম ধাক্কাটা খেলাম। চুমকিতে আবার বোতামের মতো দু’টো বা চারটে ফুটোর পরিবর্তে একটা মাত্র ফুটো থাকে, এই গোপন রহস্য কে জানতো? ফলে চুমকির একদিক দিয়ে সুচ ঢুকিয়ে অপরদিক দিয়ে বার করে আনলেই, সুতো সমেত সুচ বটুয়ামুক্ত হয়ে হাতে ফিরে আসছে। ভুলটা আমারই, রিক্সা চালাতে পারলেই যে এরোপ্লেন চালানো যায় না, এটা আগেই বোঝা উচিৎ ছিল। শেষে আর সময় নষ্ট না করে, চুমকির ফুটো দিয়ে সুচ ঢুকিয়ে চুমকির পাশ দিয়ে সুচকে ফিরিয়ে এনে, আবার সেই চুমকির একমেবাদ্বিতীয়ম ফুটো দিয়ে সুচ ঢুকিয়ে কোনরকমে সেলাই করে করে, নির্দেশমতো বটুয়াকে চুমকি দিয়ে তারকাখচিত করলাম। সান্তনা একটাই, একটু মন দিয়ে ও কবির দৃষ্টি দিয়ে দেখলেই, সেটাকে একটা তারা বলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। যাহোক আমার স্ত্রীর অনুরোধে, নীচের ফ্ল্যাটের নন্দী গৃহিণী দু’পাশে উলের ফুল লাগানো বটুয়ার মুখ বন্ধ করার উলের দড়ি তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়ায়, পরদিন আমি চিন্তামুক্ত হয়ে গ্রামে ফিরে গেলাম। ওম শান্তি ওম।

কথায় বলে সুখ স্বপনে, শান্তি শ্মশানে। সংসারও করবো, আবার শান্তির মুখও দেখবো, তাই কখনও হয় নাকি? কয়েক বছর পরে, তখন আমি একটা একতলা বাড়িতে থাকি। যদিও কর্মসুত্রে বর্ধমান জেলার শেষ প্রান্তে, তখনকার বিহার, বর্তমানের ঝাড়খন্ড রাজ্যের ঠিক পাশে একটা কোলিয়ারি অঞ্চলে সোম থেকে শুক্রবার থেকে, শনিবার রাতে বাড়ি ফিরি। এক শনিবার রাতে বাড়ি ফিরে মেয়ের কাছে সুসংবাদটা শুনে বুঝলাম, হাতের কাজের উৎপাত এবার প্রকৃতিকে জানার উৎপাতের রূপ ধরে হাসিমুখে আমার সংসারে ফিরে এসেছে। একটা প্র্যাকটিকাল খাতা দেখিয়ে মেয়ে জানালো যে, এই খাতায় সাত আট রকমের গাছ ও পাতা সেলোটেপ দিয়ে লাগিয়ে, পাশে সেই গাছ বা পাতার বিবরণ লিখতে হবে। কোন্ কোন্ গাছ বা পাতা, তাও উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে, তবে  গাছ বা পাতাগুলো শুকনো হওয়া বাঞ্ছনীয়। পরদিন বাজারে গিয়ে গ্রাম থেকে শাকপাতা বিক্রি করতে আসা বয়স্কা মহিলাদের কাছ থেকে মটর শাক ছাড়া, আর সব প্রয়োজনীয় শাকপাতা পেয়ে গেলাম। মটর শাক না পাওয়ায় চিন্তায় পড়ে গেলাম, হাতে সময় থাকলেও নাহয় মটর ভিজিয়ে মাটিতে পুঁতে মটর শাকের ব্যবস্থা করে নেওয়া যেত, কিন্তু এখন তো হাতে সে সময়ও নেই। এছাড়াও সমস্যা দেখা দিলো দু’টো। প্রথমত, স্বাভাবিক ভাবেই আমি ছাড়া ভূভারতে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি শুকনো শাকপাতা কিনতে রাজি হবে না, তাই বাজারের সব শাকপাতা কীটনাশক বা বিষাক্ত সার দেওয়া হলেও, টাটকা। আর দ্বিতীয়ত, আমার চাহিদা মতো তারা আমায় শাকপাতা দিলেও, আদপে সেগুলো সত্যিই সেই শাক কী না, আমার সঠিক জানা নেই। যাইহোক নেই মামার চেয়ে কানা মামা যদি ভালো হয়ে থাকে, তাহলে শুকনো শাকপাতার চেয়ে টাটকা শাকপাতার ভালো হওয়া আটকায় কোন হালায়? সবকিছু গুছিয়ে কিনে ফেরার পথে একজনের দয়ায় মটর শাকের সন্ধানও পাওয়া গেল।

ছোলা ও মটরগাছ, এবং লাউ ও বেলপাতা, বাজার থেকে ফেরার পথে নিয়ে এসেছি। দূর্বা, তুলসী গাছ, ও জবা পাতা বাড়ির সামান্য জমি থেকেই সংগ্রহ করে, শুকোনোর জন্য, ছাদের চড়া রোদে রেখে এলাম। বিকালের দিকে গাছ ও পাতা নিয়ে এসে দেখলাম, সেগুলো একটু নেতিয়ে পড়লেও, শোকাবার কোন লক্ষণ নেই। তখন বাধ্য হয়ে বেশ মোটা করে খবর কাগজ নিয়ে তার মধ্যে সেগুলোকে রেখে ভালো করে অনেকক্ষণ গরম ইস্ত্রি চালিয়ে, মোটামুটি একটা বাসি বাসি অবস্থায় নিয়ে আসা গেল। মানে ড্রাই শাকপাতা না হলেও রোস্টেড শাকপাতা অবশ্যই বলা যায়।

সমস্যা সমস্যা সমস্যা, সমস্যার কি আর শেষ আছে? প্র্যাকটিকাল খাতার পাতায় সেলোটেপ দিয়ে সাঁটতে গিয়ে দেখা দিলো নতুন সমস্যা। ছোলা, মটর, তুলসী, ও দূর্বার ক্ষেত্রে নাকি শিকড় সমেত লাগাতে হবে। পাতার ক্ষেত্রে অবশ্য এই কঠোর ধারা প্রযোজ্য নয়। বাজার থেকে আনা এক আঁটি ছোলাগাছে শিকড় থাকলেও, মটর শাকগুলো শিকড়হীন। বেল পাতা, লাউ পাতা, জবা পাতা, খাতার পাতায় সেলোটেপ দিয়ে সেঁটে, শিকড় সমেত দূর্বা ও ছোলা গাছও লাগানো হয়ে গেল। পড়ে রইলো মটর গাছ। তবে দৈনন্দিন চলার পথে যেমন সমস্যা আছে, সমস্যার সমাধানও আছে। খাতার পাতায় মটর গাছকে শুইয়ে, শিকড়ের জায়গায় নিপুণ হাতে দূর্বার শিকড়কে রেখে, সেলোটেপ মেরে দিলাম। অবশ্য তার আগে শিকড়গুলোকে কাগজের তলায় রেখে বারকতক ইস্ত্রি করে নিতে ভুল করিনি। পরের সপ্তাহে বাড়ি ফিরে শুনলাম খাতা জমা দেওয়াতে বিন্দুমাত্র সমস্যা হয়নি।

এরও বেশ কয়েক বছর পরে, আবার নতুন সমস্যা দেখা দিলো। এবারের হাড়হিম করা সমস্যার ধরণটা একটু অদ্ভুত, ও অন্যরকম। এবার একটা চওড়া ফিতে দেওয়া কাঁধে ঝোলানো শান্তিনিকেতনি ব্যাগ, বর্তমানের কবিদের কাঁধে যে ব্যাগ শোভা পায়, তৈরি করতে হবে। তবে ব্যাগটার দুপাশেই রঙিন সুতো দিয়ে কাঁথা স্টিচের কাজ করা ছবি থাকতে হবে, আর ব্যাগের মুখে চেন লাগাতে হবে। হাফ্ ইয়ার্লি পরীক্ষার সময় ব্যাগের একপিঠে রঙিন সুতোয় সেলাই করা ছবি জমা দিতে হবে। অ্যানুয়াল পরীক্ষায় অপর পিঠের ছবি, কাঁধে ঝোলানোর ফিতে, ও চেন লাগিয়ে সম্পূর্ণ সমাপ্ত ব্যাগটা জমা দিতে হবে। ঈশ্বরের অশেষ কৃপা, অনেক সময় পাওয়া গেছে, ও মেয়ে অনেকটা বড় হয়ে যাওয়ায়, মোটামুটি গোটা অধ্যায়টা সে নিজেই সামলাতে পারবে, কাজেই আমি চিন্তামুক্ত। ব্যাগের দু’পাশে কি ছবি আঁকা হবে ঠিক হওয়ার আগেই, অতি উৎসাহে মেয়ে নিজেই একটা গোলাপি রঙের কাপড়, বিভিন্ন রঙের কয়েকটা শিল্ক জাতীয় নরম সুতো কিনে নিয়ে আসলো। বুঝলাম ছবির সাথে মানানসই রঙের সুতো আবার কিনে দেওয়া ছাড়া, আমার আর কোন ঝামেলা নেই, ওটা মেনে নিতেই হবে।

পরের সপ্তাহে এসে দেখলাম আমার এক বৌদিকে দিয়ে কাপড়টাকে দু’ভাঁজ করে মানানসই জায়গায় দু’টো ছবি আঁকিয়ে এনে অনেকটাই রঙিন সুতো দিয়ে সেলাই করা হয়ে গেছে। কাপড়ের একপিঠে নির্দিষ্ট জায়গায় নীল রঙের পেন্সিল দিয়ে বেশ বড় বড় ছবি। শ্রীকৃষ্ণ বাঁশি বাজাচ্ছেন আঁকা ছবি দু’টো সত্যিই বেশ সুন্দর হয়েছে। কাঁথা স্টিচ না কম্বল স্টিচ জানি না, তবে বেশ সুন্দর সেলাই করেছে সন্দেহ নেই।

এইভাবে একদিন একপিঠের ছবি সেলাই শেষ হলো। হাফ্ ইয়ার্লি পরীক্ষায় সেই হাতের কাজ জমাও দেওয়া হলো, এবং নির্দিষ্ট সময়ের পর স্কুলের রাবার স্ট্যাম্প লাগানো সেই অর্ধসমাপ্ত ব্যাগ স্কুল থেকে ফেরৎও দেওয়া হলো। আমি মনে মনে ভাগ্যদেবতাকে ধন্যবাদ জানালাম।

শুরু হলো দ্বিতীয় পিঠের ছবিতে সেলাই করা। এবারের গতি অনেকটাই কম, তবে অ্যানুয়াল পরীক্ষার আগেই সুতোর কাজ শেষ, এবার শুধু কাঁধে ঝোলাবার ফিতে ও ব্যাগের মুখে চেন লাগিয়ে স্কুলে জমা দেওয়া। কাপড়টা দু’ভাঁজ করে ফিতে লাগাতে গিয়ে, নজরে পড়লো সেই ভয়ঙ্কর ত্রুটিটা। কাপড়ের দুই মাথার দিকে দুই কৃষ্ণের মাথার দিক আঁকা উচিৎ ছিল, অর্থাৎ কাপড়ের ওপরের দিকের কৃষ্ণ আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে মাটির দিকে পা, ও নীচের দিকের কৃষ্ণ মাটির দিকে মাথা করে আকাশের দিকে পা। কিন্তু কাপড়ে নির্দিষ্ট জায়গা ছেড়ে পরপর দুটো সোজা কৃষ্ণ আঁকায় কাপড়টা ভাঁজ করলেই একদিকের কৃষ্ণের মাথা ওপরে ও অপর দিকের কৃষ্ণের মাথা মাটির দিকে হয়ে যাচ্ছে। উলটো দিকের মাথা কৃষ্ণ যেহেতু এবারের পরীক্ষার ভাগে পড়েছেন, তাই সমস্যাটা আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এখন নতুন করে আর একটা ব্যাগ তৈরি করার সময়ও নেই, আর করলেও হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার স্কুলের রাবার স্ট্যাম্প দেওয়া অংশটার কি হবে?

শেষে আর কোন উপায় না থাকায় অগতির গতি, এই আমাকেই হাত লাগাতে হলো। কাপড়টাকে সমানভাবে দু’ভাঁজ করে মাঝখান থেকে ধারালো কাঁচি দিয়ে কেটে, দ্বিতীয় পিঠটা উলটো করে নিয়ে, দুটো অংশ খুব মজবুত ও সুন্দর করে সেলাই করে দিলাম। এমনভাবে সেলাইটা করা হলো, যাতে সেলাইটা ব্যাগের ভিতর দিকে থাকে, বাইরে থেকে দেখা বা বোঝা না যায়। এবার ব্যাগের বাকি কাজ সমাপ্ত হলে সেলাই করে জোড়া অংশটা খুব ভালো করে ইস্ত্রি করে দিলাম। আমি নিশ্চিত ব্যাগটা ওপর ওপর দেখে, ছবির সেলাইটা ভালো করে দেখা হবে, কাজেই এই ত্রুটি ধরা পড়ার সম্ভবনা প্রায় নেই। বাস্তবে হলোও তাই।

মেয়েকে আজ বোঝাবার ইচ্ছা ছিলো, যে অতটুকু বাচ্চাকে নিয়ে অহেতুক এতো টেনশন না করাই ভালো। এতে বাচ্চারও মনের ওপর অত্যধিক একটা চাপ পড়ে। প্রাকৃতিক নিয়মেই বাচ্চারা ঠিক সময় সবকিছু শেখে, আমরা হয়তো সেটা একটু ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাঁচ ছয় বছরের বাচ্চাকে রাতারাতি একাধারে রবীন্দ্র নাথ, যামিনী রায়, লতা মঙ্গেশকর, শচীন তেন্ডুলকর, চুনী গোস্বামী, বা মেরিকম তৈরি করতে গেলে, মঙ্গলের থেকে অমঙ্গলই দেখা দেবে বেশি, ফল ভালো হবে না, হতে পারে না। কিন্তু শুনছেটা কে? অধিকাংশ বাচ্চার অভিভাবকরা দোকান থেকে কিনে বাচ্চার হাতের কাজ হিসাবে স্কুলে জমা দেন। স্কুলও কোন বাচ্চার নিজ হাতে তৈরি করা কোন জিনিসের থেকে, দোকান থেকে কেনা জিনিসটির সৌন্দর্যের মানের তুলনা বিচার করে, তাদেরই অধিক নম্বর দেন। অনেক আগে এক ডাক্তার ভদ্রলোককে এই ব্যাপারে খবরের কাগজে একটি বাচ্চার হয়ে তীব্র প্রতিবাদ করতে দেখেছিলাম। তাঁর দাবি ছিল তিনি ওই বাচ্চাটাকে সঙ্গে করে স্কুলে নিয়ে যাবেন। সেখানে বাচ্চাটা তার জমা দেওয়া হাতের কাজটা সকলের সামনে বসে করে দেখাবে। যারা সুন্দর হাতের কাজের জন্য অনেক বেশি নম্বর পেয়েছে, তাদেরও ডাকা হোক, তারাও সকলের সামনে বসে করে দেখাক। তাঁর কথা স্কুল শোনেনি, শিক্ষা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রকরা শোনেনি। কেউ শোনে না, মেয়েই বা শুনবে কেন? এক কাপ চা খেয়ে মনের কষ্ট মনেই রেখে ফিরে এলাম।

সুবীর কুমার রায়

২৭-১০-২০১৮