কত অজানা রে

71946068_1338812139627865_3484388348838019072_n দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর কেটে গেলেও, অতনু কিন্তু সেদিনের সেই লোকটাকে আজও ভুলতে পারেনি। অল্প কিছু সময়ের পরিচয়, কিন্তু তারমধ্যেই তার সহানুভুতি অতনুকে অবাক করেছিল।

আঠারো বছর বয়সের অতনু, অপঘাতে মৃত কুড়ি বছরের এক নিকটাত্মীয়র মৃতদেহ নিয়ে সারাদিন মর্গ বা অন্যান্য ঝামেলা মিটিয়ে, অল্প কিছু সহযাত্রীর সাথে স্থানীয় এক শ্মশানঘাটে এসে হাজির হলো। শ্মশানের সাথে পরিচয় তার বছরখানেক-বছর দেড়েক, তবে সেগুলো তো নেহাতই সন্ধ্যা বেলা কলেজের ক্লাস কেটে, তিন-চারজন সহপাঠীর সাথে গঙ্গার ধারে, বা বৈদ্যুতিক চুল্লিবিহীন স্থানীয় শ্মশান ঘাটে আড্ডা মেরে। একবার অবশ্য কলকাতার এক মহাশ্মশানে মৃতদেহ সৎকার করতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তার হয়েছিল। তবে সেখানে আরও অনেকের সাথে সঙ্গী হিসাবে যাওয়া, ও বৈদ্যুতিক চুল্লিতে মৃতদেহ দাহ করার প্রথম চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা লাভ করা।

প্রায়ই সে তার বন্ধুদের সাথে কলেজের কাছেই গঙ্গার ধারে যে শ্মশান ঘাটে আড্ডা দিতে যায়, আজকের এই শ্মশানটাও তারই মতো শুধুমাত্র কাঠের চুল্লিতেই শবদেহ দাহ করা হয়, তবে এটা গঙ্গার ধার থেকে বেশ কিছুটা দূরে ও অপরিস্কার। একটা চুল্লিতে শবদাহ প্রায় শেষের দিকে, আগুন প্রায় নিভে এসেছে। একজন, যাকে সকলে ডোম বলে, হাতে একটা বাঁশ নিয়ে আগুনের মাঝে নেড়েচেড়ে খুঁচিয়ে, দাহকার্য সুসম্পন্ন করতে ব্যস্ত। বেশ কিছু মানুষ সেই আগুনের পাশে অন্তিম কাজের জন্য অপেক্ষারত, তবে তাদের মধ্যে কয়েকজন যুবক কিভাবে খোঁচালে সুবিধা হবে, এরপরে কি করা উচিৎ, ইত্যাদি ডোমকে পরামর্শ দিচ্ছে। তাদের আচরণ ও কথাবার্তা শুনে মনে হতেই পারে, যে তারা কোন আনন্দানুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছে। নেশার ঝোঁকে এদের অনেকেরই সুষ্ঠুভাবে দাঁড়াবার ক্ষমতা পর্যন্ত নেই। এদের কাজ শেষ হলে অতনুদের নিয়ে আসা মৃতদেহের চিতা সাজানো হবে। এখনও কাজ শুরু হতে দেরি আছে, তাই অতনুর সাথে আসা কাছেপিঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সঙ্গীরা কেউ ফিরে আসেনি। দীর্ঘক্ষণ মৃতদেহ আগলে, অতনু কাজ শুরু হওয়ার অপেক্ষায় বসে আছে।

কিছুক্ষণ পরে সেই একই ব্যক্তি একটা একটা করে কাঠ সাজিয়ে চিতা সাজাতে শুরু করলে, একে একে প্রায় সকলেই ফিরে এসে মৃতদেহের কাছে দাঁড়ালো। চিতা সাজাবার সময় বেশ কয়েকবার একটা বোতল থেকে পানীয় গলায় ঢালায়, কাজটা ভালভাবে শেষ করতে পারবে কী না ভেবে অতনু চিন্তায় পড়লো। অতনু তাকে একবার ভালভাবে চিতা সাজাবার কথা অনুরোধ করায়, সে টলমলে পায়ে অতনুর কাছে এসে তার কাঁধে একটা হাত রেখে দাঁড়ালো। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল, মুখ দিয়ে পানীয়র উগ্র উৎকট গন্ধ। সে সামান্য জড়ানো গলায় অতনুকে বললো, “খোকাবাবু চিন্তা করো না, তোমার জন্মের আগের থেকে আমি এই কাজ করছি। ডেডবডি চিতায় তোলার আগে পুরুত মশাইকে ডেকে তাঁর কাজটা শেষ করে নাও”।

তাই করা হলো। মৃতদেহ চিতায় শোয়ানো হলো। এই পর্বের সবথেকে কঠিন কাজ, অতি আপনজনের মুখে জ্বলন্ত পাটকাঠির আগুন স্পর্শ করার কাজটাও কাঁপা হাতে সজল চোখে, অতনুকেই করতে হলো। চিতায় আগুন দেওয়ার পরে একসময় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করলে, সবাই পাশের একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলো। চিতার একটু দূরে, অতনু একা বসে। ডোম তার কাজের ফাঁকে ফাঁকে পানীয়র বোতল থেকে তরল পানীয় গলায় ঢালছে।

অনেকক্ষণ পরে সে এসে অতনুর ঠিক পাশে বসে জড়ানো গলায় বলে, “খোকাবাবু মন খারাপ করো না। আমরা সবাই একটা নির্দিষ্ট আয়ু নিয়ে এই পৃথিবীতে আসি। সেটা কারও ক্ষেত্রে খুব কম, কারও ক্ষেত্রে বেশি। জন্মাবার সময়েই বিধি মানুষের কপালে সেটা লিখে দেন। সেই ললাট লিখন কখনও মোছা যায় না, বদলানোও যায় না। আমরা কিছু বই পড়ে বিদ্যান হয়ে সেকথা ভুলে যাই, অস্বীকার করি। কিছুক্ষণ আগে ওই জোয়ান মরদগুলোকে দেখলে না? আমরা দুপাতা বই পড়ে উন্নতির পিছনে, সুখের পিছনে ছুটি। আকাঙ্ক্ষা শুধু একটাই, আরও টাকা, আরও সুখ স্বাচ্ছন্দ, আরও উন্নতি। কিন্তু তাই কি হয়? সবকিছুর একটা শেষ আছে, তারপর ধ্বংস হয়ে আবার নতুন করে শুরু হয়। আচ্ছা, এই যে তোমার দেহ, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পরে একটা পিঁপড়ে যদি তোমার পা বেয়ে উঠতে থাকে, তাহলে সে কোথায় যাবে”?

এর উত্তর অতনুর জানা নেই। ভাববার মতো মানসিক অবস্থা বা ইচ্ছা, এই মুহুর্তে কোনটাই তার নেই, তাই সে চুপ করে থাকলো। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সে আবার শুরু করলো, “পিঁপড়েটা কখনও ধীরে, কখনও দ্রুত, ওপরে উঠতে শুরু করবে এবং একসময় সে সর্বোচ্চ চূড়ায়, অর্থাৎ তোমার মাথায় এসে পৌঁছবে। তারপরে কিন্তু আর ওঠা সম্ভব নয়। তখন তাকে আবার মাটিতে নেমে আসতে হবে, আবার নতুন করে শরীর বেয়ে ওপরে উঠতে হবে। আমরা এখন সেই উন্নতির চরম জায়গায় এসে পৌঁছেছি, এবার আমাদের পতনের পালা, এবার আবার নতুন করে শুরু করার পালা”।

সে উঠে গিয়ে বাঁশ হাতে নিয়ে আবার তার কাজ শুরু করলো। অতনু আগুনের দিকে তাকিয়ে বসে বসে ভাবলো, এসব কথা কি এরই মস্তিষ্কপ্রসূত, না অন্য কারও কাছ থেকে শোনা? সে যাইহোক না কেন, এই অশক্ষিত বেহেড মাতালের মুখে সেটা কি সত্যিই বেমানান? অভিজ্ঞতাও যে একটা শিক্ষা, সেকথা বোধহয় অস্বীকার করা যায় না।

একসময় কাজ শেষ হলে তার পাওনা মিটিয়ে নাভিকুণ্ডলি নিয়ে, আর সকলের সাথে অতনু গঙ্গার ঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো।

সুবীর কুমার রায়

১৩-০১-২০২০

 

ভেস্তে যাওয়া পাকাদেখা {লেখাটি Sahitya Shruti পত্রিকায় প্রকাশিত।}

72610647_1338811582961254_5215569123303489536_n আজ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতার কথা শোনাবো, অনেকদিন আগে এক পাত্রী দেখতে যাওয়া, হয়তো বা পাকাদেখাও বলা যেতে পারে। তবে বিধিবাম, তাই শেষপর্যন্ত আর বাস্তবে রূপায়িত হওয়ার সুযোগ না পেয়ে, অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল। না, আমি নিজে পাত্র নই, বরং বরকর্তাই বলা যেতে পারে।

ভারতীয় স্টেট ব্যঙ্কে কর্মরত আমার ভাইয়ের জন্য, উত্তর কলকাতায় আমরা চারজন একটি পাত্রী দেখতে গিয়েছিলাম। আমি, আমার স্ত্রী, আমার ছোট বোন, ও ভাবী পাত্র স্বয়ং। আমাদের মিঞাবিবি দুজনের পছন্দ-অপছন্দ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, আবার সবসময়েই দুই মেরুতে বসবাস করে, আজও করে। আমি মিষ্টি খাওয়া কোনকালেই পছন্দ করি না, চপ্-কাটলেটই আমাকে বেশি আকর্ষণ করে। আমার উনি আবার মিষ্টি খাওয়ার জন্যই বোধহয় এই ধরাধামে আবির্ভুত হয়েছেন। পারলে ঠাকুর পূজার নকুলদানাও তিনি সাবাড় করে দিতে কিছুমাত্র কুন্ঠাবোধ করেন না। ভাবী পাত্রীর ভাবী স্বামী, ভাসুর, জা, ও ননদের পদধুলির কল্যানে তাঁরা ধন্য হয়ে যারপরনাই মিষ্টান্নর আয়োজন করবে, এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি আধপেটা খেয়ে আমাদের সাথে গেলেন। তখন মোবাইলের প্রচলন হয়নি, হাতেগোনা কিছু বাড়িতে দশফুটোর কালো রঙের ল্যান্ড ফোনের দেখা মিলতো। খবরের কাগজ দেখে সম্বন্ধ, তাই উভয় পক্ষের চিঠি আদান প্রদানের মাধ্যমে, আজ সেখানে যাওয়ার আয়োজন।

ঠিকানা জানা ছিল। নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থেকে নেমে, রাস্তার পাশে একটা দোকানে খোঁজ করে আমরা নির্দিষ্ট বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা ধরলাম। রাস্তার ডানপাশে চাষের জমির মতো বিশাল জলাজমি, বাঁপাশে সুউচ্চ লম্বা পাঁচিল, যাতে হাজার হাজার ঘুঁটে দেওয়া, সম্ভবত কোন বড় কারখানা। অনেকটা পথ পার হয়েও রাস্তার দুপাশে কোন বাড়িঘর তো দূরের কথা, একজন লোকের দেখাও পেলাম না। আরও কিছুটা পথ হাঁটার পর, একজনের দেখা পেয়ে জিজ্ঞাসা করায় তিনি জানালেন, যে আর সামান্যই পথ। ঠিক পথে অগ্রসর হচ্ছি জানতে পেরে উল্লাসিত হয়ে আর সামান্য পথ অগ্রসর হতেই এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে জানালেন, যে তিনি আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছেন, তিনি কন্যার পিতা। সুবিধাই হলো, আমরা তাঁর সাথে এগিয়ে গিয়ে তাঁর বাসায় হাজির হলাম।

ছোট্ট বাড়ি, দরজা দিয়ে ঢুকে পরিপাটি করে সাজানো প্রথম ঘরটিতেই আমাদের বসানো হলো। বেশ বড় একটা খাট ও চেয়ারে আমরা চারজন ভাগ করে বসলাম। ভদ্রলোক কিন্তু নিজে না বসে, আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। যে দরজা দিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম, তার উলটো দিকে বাড়ির ভিতরে অন্যান্য ঘরে যাওয়ার জন্য অপর একটি দরজা। আমাদের সবাইকে এক কাপ করে চা ও দুটো করে ভগবতী বিস্কুট দেওয়া হলো। তখনও বিস্কফার্ম বা এখনকার মতো বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি ভালো বিস্কুট বাজারে আসেনি। একমাত্র ব্রিটানিয়া ও পার্লের বিস্কুটই বাজারে সমাদ্রিত ছিল। তবু কেন আমাদের মতো মহামান্য অতিথিদের কপালে ভগবতী ভর করলো, বলতে পারবো না। ভদ্রলোক একাই  দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের সাথে কথা বলে যাচ্ছেন। অপর দিকের দরজায় এক ভদ্রমহিলা ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন, মাঝেমাঝেই তাঁর পাশে কিছু মহিলা এসে চিড়িয়াখানায় আসা নতুন পশু পাখি দেখার আগ্রহ নিয়ে দেখার মতো, উকিঝুঁকি দিয়ে আমাদের দেখে যাচ্ছেন। এক ভদ্রমহিলা ট্রেতে করে চার প্লেট খাবার নিয়ে আসলেন। ভদ্রলোক তাঁর হাত থেকে খাবারের প্লেটগুলো নিয়ে আমাদের এগিয়ে দিতে সাহায্য করলেন। দুটি করে সিঙ্গাড়া ও দুটি করে রসগোল্লা। ভোজনপর্ব শেষে আমরা মেয়েটিকে নিয়ে আসতে অনুরোধ করলাম। ভদ্রলোক এবার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রমহিলাকে মেয়েকে এঘরে নিয়ে আসতে বললেন। তাঁর সম্বোধনে এতক্ষণে বোঝা গেল, যে উনি তাঁর স্ত্রী। দরজার কাছ থেকে তিনি কিন্তু নড়লেন না। দুজন ভদ্রমহিলা মেয়েটিকে আমাদের বসার ঘরে নিয়ে আসলেন। খাটের ওপর আমার স্ত্রী ও বোন বসছিল, মেয়েটিকে নিয়ে এসে সেখানেই বসানো হলো। আমার বোনই প্রথম কথা শুরু করলো। সে বললো, “আমরা কিন্তু তোমায় দেখতে বা ইন্টারভিউ নিতে আসিনি, আমরা তোমার সাথে আলাপ করতে এসেছি”। মেয়েটি যথেষ্ট শিক্ষিত, খোলামেলা কথা বলে, অনেকটা লম্বা, ও দেখতেও বেশ সুন্দর। প্রথম দর্শনেই আমাদের বেশ পছন্দ হয়ে গেল। ভাইয়ের মুখ দেখে মনে হলো, তারও পছন্দ। অল্প কিছুক্ষণ একথা সেকথার পর মেয়েটির বাবা জানালেন, যে মেয়েটি ভালো গানও গায়। আমার বোন দীর্ঘদিন গান শেখে, গায়ও মন্দ নয়। সে মেয়েটিকে হারমোনিয়াম নিয়ে আসতে বললো। মেয়েটি উঠে গিয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে আসলো। তার নার্ভাসনেস্ কাটানোর জন্য, আমার বোন প্রথমেই পরপর দুটো গান গাইলো। এরপর মেয়েটিও গান গাইলো, এবং বেশ ভালোই গাইলো। আমাদের বাড়িতে শুধু আমরাই নই, বাবাও গানবাজনা খুব পছন্দ করেন, কাজেই বাবাও খুব খুশি হবেন। আমরা মনে মনে মোটামুটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম। আমাদের কথার ওপর ভিত্তি করে এরপর একদিন বাবা-মা এসে সম্বন্ধ পাকা করে যাবেন।

এবার ওঠার পালা, আমরা অনুমতি চাইলাম। আমাদের হাবভাবে ভদ্রলোকও বোধহয় আাঁচ করতে পেরেছেন, যে তাঁর কন্যাকে আমাদের পছন্দ হয়েছে। আনন্দের আতিশয্যে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা উৎফুল্ল হয়ে আমায় বললেন, “আর একবার চা হলে হতো না”। হতো তো বটেই, আমি কখনও চায়ের অফার ছাড়ি না। তাছাড়া সিঙ্গাড়া খাওয়ার পরে মনটা কিরকম চা চা করছিল। আমি অবশ্যই এই প্রস্তাবে রাজি হতাম, কিন্তু সেই সুযোগ আমি পেলাম না। আমার হ্যাঁ বলা বা সম্মতিসুচক মাথা নাড়ার আগেই, ভদ্রলোকের স্ত্রী বেশ জোর গলায় বলে উঠলেন, “আমি আর চা করতে পারবো না”। আমরা অবাক হলাম সন্দেহ নেই, কিন্তু লজ্জায় ভয়ে ভদ্রলোকের মুখের রঙ কিরকম ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সম্মতি জানাবার সুযোগ পাইনি বলে নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে হলো। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অবস্থার সামাল দিতে ভদ্রলোক আবার বললেন, তাহলে একটু কফিই হয়ে যাক। কিন্তু এবার গলার স্বরের রেগুলেটরের নব কয়েক পর্দা বাড়িয়ে প্রায় চিৎকার করে তাঁর স্ত্রী বললেন, “আমি কফি করতে পারবো না, আমি কি ঝি নাকি যে বারবার চা কফি করবো”। ইচ্ছা করছিল, দুজনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতির সামাল দিয়ে গৃহশান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি, কিন্তু সেটা তো আর বাস্তবে সম্ভব নয়, সাহসেও কুলালো না। বাধ্য হয়ে আরও কিছুক্ষণ বসে সময় কাটিয়ে, আমরা উঠে পড়লাম।

ভদ্রলোক অনেকটা পথ আমাদের সাথে গেলেন ও ইনিয়ে-বিনিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করলেন, যে আমরা যেন  তাঁর স্ত্রীর ব্যবহারে কিছু মনে না করি। কিন্তু আমাদের মতো তিনিও বেশ ভালোই বুঝতে পারলেন, যে জেতা গেম তাঁর হাতের বাইরে চলে গেছে। ভদ্রলোক ফিরে গেলে, আমরা নিজেদের মধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। আমার বোন বললো, “মেয়েটির মা’র সম্ভবত মাথার ব্যারাম আছে”। আমার কিন্তু মনে হলো, আজ পর্যন্ত হয়তো অনেক পাত্রপক্ষ মেয়েটিকে দেখতে এসে খেয়েদেয়ে ফিরে গিয়ে বিভিন্ন কারণ দর্শীয়ে নাকোচ করে দিয়েছেন, তাই ভদ্রমহিলা অত ফ্রাসট্রেশনে ভুগছেন। আমার স্ত্রী কিন্তু সম্বন্ধ ভেঙে যাওয়ার থেকেও বেশি দুঃখ পেলো, আশানুরূপ মিষ্টি না খাওয়ানোর জন্য।

যাইহোক বাড়ি ফিরে বাবাকে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে বললাম, “তুমি লিখে দাও, যে মেয়ের বিয়ে দিতে গেলে অত ভেঙে পড়লে বা উত্তেজিত হলে চলে না, ধৈর্য ধরতে হয়”। বাবা কিন্তু তাতে রাজি হলেন না, পরিবর্তে  অন্যান্য অসুবিধার কথা জানিয়ে, ব্যাপারটার সেখানেই ইতি টানলেন।

সুবীর কুমার রায়

০১-০১-২০২০

 

রতনের রক্তদান {লেখাটি প্রতিলিপি বাংলা, Sahitya Shruti, ও বইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত।}

16 স্ত্রী নমিতা, ও ছোট ছোট তিনটি শিশু সন্তানকে নিয়ে অটলবাবু ফুলবাড়ি গ্রামের একবারে শেষপ্রান্তে, অভাবের সংসারেও দিব্যি ছিলেন। চাকরিসূত্রে তাঁকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরের একটা মহকুমা শহরে থাকতে হতো। একটা হোটেলে তিনি কাজ করতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার হোটেল বন্ধ থাকায়, বুধবার বেশ রাতে বাড়ি ফিরে শুক্রবার খুব ভোরে কর্মস্থলে ফিরে যেতেন।

হোটেলে তাঁর বড় ছেলে সনাতনের বয়সি, বছর দশেক বয়সের রতন নামে একটা ছেলে কাজ করতো। বিভিন্ন কারণে ছেলেটিকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন। অভাবের তাড়নায় বহু দূরের এক গ্রাম থেকে কাজ করতে আসা অতি দরিদ্র এক ভদ্র পরিবারের ছেলেটি তাঁর বড় ছেলের বয়সি, সৎ ও পরিশ্রমী। অতি লোভী ও সুযোগ সন্ধানী হোটেল মালিক, সুযোগ পেয়ে তাকে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সমস্ত কাজ করিয়ে নেয়। মাইনে-কড়ি সেরকম না দিলেও, পান থেকে চুন খসলেই প্রহারের ব্যাপারে কখনও কার্পণ্য করেন না। পরিবর্তে রতনের কপালে উচ্ছিষ্ট খাবার, আর রাতে খাবার টেবিলে হাঁটুমুড়ে মশার কামড়ের মধ্যে ঘুমবার সুযোগ মেলে। ছুটি না মেলায় সে তার ইচ্ছামতো নিজের গ্রামেও যেতে পারে না, আর গ্রামে যেতে না পারায়, মাইনের সব টাকাটাই বাড়ি যাওয়ার সময় একসাথে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মালিক তাঁর নিজের কাছেই রেখে দেন।

বেশ চলছিল, কিন্তু একদিন খাবার টেবিল থেকে গায়ে বেশ জ্বর নিয়ে কাপ-ডিশের ট্রে রান্নঘরে রাখতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে বেশ কয়েকটা কাপ-ডিশ ভেঙে ফেলায়, কপালে প্রচণ্ড প্রহার জোটে। অভুক্ত অবস্থায় সারারাত টেবিলের ওপর শুয়ে থেকে সে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ঘটনাটা অটলবাবুর খুব খারাপ লাগলেও নিজের চাকরি রক্ষার্থে মুখ বুজে ছিলেন। তারপর দুটো দিন সে গায়ে বেশ জ্বর নিয়ে আচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়ে থাকে। বুধবার দুপুরের পর থেকে তাকে কিন্তু আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। আপদ বিদায় হয়েছে ভেবে কেউ আর সেভাবে তার খোঁজও করলো না।

বুধবার রাতের দিকে অটলবাবু বাড়ি ফেরার জন্য রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখেন, প্ল্যাটফর্মের ওপর রতন গায়ে বেশ জ্বর নিয়ে কুকুরকুণ্ডলী হয়ে শুয়ে আছে। অটলবাবু তাকে সাথে করে নিজের বাসায় নিয়ে যেতে আর দ্বিধা করেননি। সেই থেকে রতন, অটলবাবুর বাড়ির একজন সদস্য হয়ে গিয়ে আজও আছে। অটলবাবু তাকে সনাতনের সাথে লেখাপড়াও শেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দু’-তিন বছর স্কুলে গিয়ে, সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়ে একটা কারখানায় কাজ করতে শুরু করে, ও সন্ধ্যার পর বাড়ির সমস্ত কাজে সাহায্য করে। অটলবাবু কিন্তু আগের মতোই হোটেল বাড়ি করেন। বাজার দোকান ঘরের কাজ নিয়ে নমিতাকে এখন আর কোন চিন্তা করতে হয় না। এখন অটলবাবুর সুখের সংসারে অসুবিধা হয় তখন, যখন রতন তার গ্রামের বাড়িতে যায়। তা সেও তো দু’-তিনমাস অন্তর দিন দশ-পনেরোর জন্য। এইভাবে বেশ চলছিল। এখন রতনকে ছাড়া একটা দিনও নমিতার নিশ্চিন্তে বা শান্তিতে কাটে না।

অন্যান্য বারের মতো একদিন গ্রামের বাড়িতে দিন পনেরোর জন্য গিয়ে, রতন আর ফিরে এলো না। অটলবাবু বা তার কারখানার মালিক, কেউই তার গ্রামের বাড়ি চিনতেন না। এইভাবে একদিন সকলেই  ধরে নিলো যে রতন আর ফিরবে না। মাস দুয়েক পরে এক সন্ধ্যায়, প্রবল ঝড়বৃষ্টির মধ্যে রতন অটলবাবুর বাড়িতে ফিরে এলো। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই, যে তার মাথায় ছাতা না থাকলেও সে বিশেষ ভেজেনি। সে যাইহোক, রতন জানালো, যে একটা পথ দুর্ঘটনায় ভীষণরকম আঘাত পেয়ে তাকে কাছের এক শহরের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। সেখানেই জানা যায়, যে তার ব্লাডগ্রূপ নাকি এবি নেগেটিভ। ফলে রক্তের প্রয়োজন হলেও ওই বিশেষ গ্রুপের রক্ত না পাওয়ায়, ডাক্তাররা খুব অসুবিধায় পড়েন। যাইহোক এই কারণেই সে সময়মতো ফিরতে পারেনি। পরদিন সকালে রতন কারখানায় গিয়ে তার সময়মতো ফিরে না আসার কারণ, সবিস্তারে জানালো। সে যে খুব সৎ, কর্মঠ, ও ভালো কর্মী, এটা তার কারখানার মালিকও বুঝতেন। ফলে সেখানে কাজ ফিরে পেতেও তার কোন সমস্যা হলো না, বরং সে ফিরে আসায়, মালিকটি খুশি ও নিশ্চিন্ত হয়ে, তাকে এই দুই মাসের মাইনেও নিজেহতেই দিয়ে দিলেন।

এইভাবে দীর্ঘ অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। রতন কিন্তু আর কোনদিন তার গ্রামের বাড়িতে যায়নি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও, রতনের চেহারার কোন পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু তার কর্মক্ষমতা যেন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘরের ও কারখানার সব কাজ সে খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিখুঁতভাবে গুছিয়ে করে ফেলে। কারখানার এখন বেশ উন্নতি হওয়ায় ও আয় বৃদ্ধি হওয়ায়, মালিক খুশি হয়ে তার মাইনেও অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছেন।

খুব হইচই করে একদিন পূর্ণিমা নামে একটি মেয়ের সাথে সনাতনের বিয়ে হয়ে গেল। বরকর্তা অটলবাবু হলে কি হবে, প্রকৃত বরকর্তার কাজটা রতনই একা হাতে সামলেছে। শুধু কি তাই? তার জমানো প্রায় সমস্ত টাকাই সে সনাতনের বিয়েতে খরচা করে ফেলেছে। অটলবাবু, নমিতা ও সনাতনের তীব্র আপত্তিতে সে শুধু বলেছে, “আমার আর টাকা কিসের দরকার বলো? প্রয়োজন হলে তখন তোমরা তো আছোই, আমি জানি তোমরা আমায় দেখবেই”।

দেখতে দেখতে আরও দুটো বছর কেটে গেল। আসন্ন সন্তান সম্ভবা পূর্ণিমাকে, মহকুমা শহরের একটা নার্সিং হোমে ভর্তি করা হলো। কিন্তু অবস্থার জটিলতা দেখা দেওয়ায় টাকা ও রক্তের প্রয়োজন দেখা দিলো। অটলবাবু তাঁর হোটেল মালিকের কাছে কিছু টাকা ধার চাইলেন, কিন্তু হোটেল মালিক নানা অজুহাত দেখিয়ে একটা টাকাও ধার দিতে অস্বীকার করলেন। রাগে দুঃখে অটলবাবু এককথায় এতদিনের চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। রতনের কারখানার মালিক কিন্তু রতনের অনুরোধে, এক কথায় মাসে মাসে তার মাইনে থেকে কেটে নেওয়ার শর্তে বেশ কিছু টাকা ধার দিয়ে দিলেন। টাকার সমস্যা মিটলেও, রক্তের ব্যবস্থা কিন্তু করা গেল না। কারণ সেই একই, সনাতনের স্ত্রী পূর্ণিমার ব্লাড গ্রূপ এবি নেগেটিভ।

কোনভাবেই রক্তের ব্যবস্থা করতে না পারায়, ও রতন এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব থাকায়, অটলবাবু ও নমিতা সেই অগতির গতি রতনকেই রক্ত দেওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু এই প্রথম সে তাঁদের সাহায্য করতে অস্বীকার করলো। চোখের সামনে সনাতনের স্ত্রী ও বাচ্চার মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা বুঝিয়েও কোন লাভ হলো না। ডাক্তারও তাকে অনেকভাবে বোঝালেন, যে রক্তদান করলে কারও ক্ষতি হয় না। তার রক্ত অত্যন্ত মূল্যবান, কারণ এবি নেগেটিভ রক্তের গ্রূপের মানুষের সংখ্যা খুব কম। যদিও রতন একবার বললো, যে সে এটা ভালভাবেই জানে, তবু এরপরেও সে তার শরীর থেকে এক ফোঁটাও রক্ত দিতে রাজি হলো না। এর পরেও কোনভাবে রক্ত জোগাড় না হওয়ায়, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সকলেই ঠিক করলেন, যে দু’-দুটো মানুষকে আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে, জোর করে রতনের দেহ থেকে আপাতপ্রয়োজনে রক্ত নিয়ে সনাতনের স্ত্রী পূর্ণিমাকে দেওয়া হবে।

পরিকল্পনামাফিক জোর করে শুইয়ে চেপে ধরে রক্ত নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে, রতনকে কিন্তু কোন বাধা দিতে দেখা গেল না। ডাক্তার তার শরীর থেকে রক্ত নিতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলেন, যে রতনের শরীরে কোন রক্ত নেই। বিষ্ময়ের আরও বাকি ছিল। দেখা গেল রতনের শরীরটা ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর থেকে কর্পূরের মতো উবে গেল। যাহোক শেষপর্যন্ত অনেক চেষ্টায় রক্তের সংস্থান হওয়ায়, কোন সমস্যা ছাড়াই সনাতনের স্ত্রী একটি সুস্থ ফুটফুটে পুত্র সন্তান প্রসব করে বটে, কিন্তু আর মাত্র চারটি ঘটনায় অটলবাবুর পরিবারকে যারপরনাই বিষ্মিত হতে হয়।

এতোগুলো বছর পরে অনেক খোঁজখবর করে রতনের গ্রামে গিয়ে জানা যায়, যে বহু বছর আগে সেদিনের সেই পথ দুর্ঘটনায় রতনের মৃত্যু হয়। মহকুমা শহরের অটলবাবু যে হোটেলটায় কাজ করতেন, সেটি হঠাৎ আগুনে পুড়ে সম্পূর্ণ ভষ্মীভুত হয়ে হোটেলের মালিক সর্বস্বান্ত হন। রতনের কারখানার মালিক, সকলকে টপকে একটা অনেক টাকার টেন্ডার পান, ও কোন পূর্বাভাস ছাড়াই সনাতনের চাকরিতে বেশ বড়সড় একটা পদোন্নতি হয়।

সুবীর কুমার রায়

২৬-১১-২০১৯

 

 

ভৌতিক সাহিত্যচর্চা {লেখাটি গল্পগুচ্ছ, প্রতিলিপি বাংলা, ও Sahitya Shruti পত্রিকায় প্রকাশিত}

72395822_1338804236295322_8003158745590792192_n গত ডিসেম্বরে কাঞ্চনগড় থেকে অসুস্থ হয়ে ফিরে বহু চিকিৎসার পর সুস্থ হলেও, অতনুবাবু আজ দীর্ঘ দুমাস হলো পূর্ব স্মৃতিশক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে বাড়িতে বসে আছেন। ডাক্তারদের অভিমত, তিনি এখন শারীরিক ভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ, রোগটা তাঁর মনের। সেইমতো বেশ কয়েকজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখিয়েও, বিশেষ কোন ফল পাওয়া যায়নি। শেষপর্যন্ত ডাক্তার মন্দার বাসুর চিকিৎসায় এখন তিনি তাঁর নাম মনে করতে পারলে বা বাড়ির সবাইকে চিনতে পারলেও, তাঁর ঠিক কি হয়েছিল বা আদৌ কিছু হয়েছিল কী না, এখনও মনে করতে পারেন না। এই অবস্থায় আরও বেশ কিছুদিন কাটার পর, বিছানার পাশের টেবিলে রাখা একটা মাসিক ম্যাগাজিনের বিশেষ একটি পাতায় চোখ পড়ায়, ধীরে ধীরে তাঁর কাঞ্চনগড়ের সব ঘটনা মনে পড়ে যায়, ও নতুন করে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

ব্যাপারটা তাহলে খুলেই বলা যাক। ডাকসাইটে সরকারি অফিসার, অতনু চৌধুরীর দাপটে অফিসের সবাই সর্বদা তটস্হ। বলা যায় তাঁর দাপটে বাঘে গরুতে এখনও একঘাটে জল খায়। ছ’ফুটের ওপর লম্বা, সুন্দর স্বাস্থ্য, অত্যন্ত সাহসী, অনর্গল বাংলা ইংরেজি ও হিন্দীতে কথা বলতে পারা এহেন মানুষটি, সারাদিন অফিসের কাজে ডুবে থাকতে ভালবাসেন। অবসর সময় বই পড়ে ও গল্প উপন্যাস লিখে সময় কাটান। দু’-চারটে বই প্রকাশ ছাড়া, অনেক পত্রিকাতেও তাঁর লেখা বেশ সমাদৃত হয়েছে। মাস তিনেক আগে অফিসের কাজে তাঁকে বাংলার শেষপ্রান্তে যেতেই হলো। দিন পাঁচেক সেখানে থেকে কাজ মিটিয়ে ফিরে আসার কথা। এই জাতীয় অফিস ট্যুর তাঁকে মাঝেমাঝে করতেই হয়। তিনি নিজে গেলে কাজটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তাই সাধারণত তাঁকেই পাঠানো হয়।

তৃতীয় দিন হাতে বিশেষ কোন কাজ না থাকায়, ওখানকার অফিসের একজন পদস্থ অফিসার, সুবিমল সমাদ্দার তাঁকে অফিসের গাড়ি নিয়ে ‘মিঠেপাতা’ গ্রামে ঘুরে আসতে বলেন। জায়গাটা নাকি খুব সুন্দর। অতনুবাবু সকালের দিকে তৈরি হয়ে, অফিসের একটি গাড়ি নিজেই চালিয়ে মিঠেপাতা গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। কথা ছিল পনেরো কিলোমিটার দূরের গ্রামটা ঘুরেফিরে দেখে, দুপুরে সুবিমলবাবুর সাথেই লাঞ্চ সারবেন। কিন্তু দুপুর পেরিয়ে বিকেল, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে, এমনকী রাতেও না ফেরায়, সকলেই চিন্তান্বিত হয়ে পড়লেন। তাঁর মোবাইলে বারবার যোগাযোগ করা হলেও, সেটা বেজে বেজে একসময় থেমে যাচ্ছে।

পরদিন সকালেই পুলিশে খবর দেওয়া হয়। মোবাইল টাওয়ার থেকে জানা যায়, যে মিঠেপাতা থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে, কাঞ্চনগড় এলাকায় তাঁর মোবাইলটি বাজছে। কাঞ্চনগড় একটি অতি প্রাচীন গ্রাম, তিনি হঠাৎ সেখানে কেন গেলেন বোঝা গেল না। যাইহোক, পুলিশের গাড়ির সাথে সুবিমলবাবু দুজন অফিসকর্মী নিয়ে অপর একটি গাড়ি নিয়ে কাঞ্চনগড়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন।

কাঞ্চনগড়ে এসে জানা গেল, গতকাল দুপুরের দিকে এক ভদ্রলোক একটি সাদা গাড়ি নিয়ে এখানে আসেন এবং কাল থেকে আজ এখন পর্যন্ত গাড়িটি পরিত্যক্ত রাজবাড়ির সামনে দাঁড় করানো আছে। প্রায় আড়াইশ’ বছরের পুরাতন রাজবাড়িটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ন’মাসে ছ’মাসে বড়রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে, কেউ কেউ রাজবাড়িটির কাছে গাড়ি থামিয়ে ঘুরেফিরে দেখেন, ছবি তোলেন বটে, কিন্তু এই জঙ্গলে ভরা দোতলা বাড়িটিতে বাদুড় চামচিকে, ও সাপখোপ বাস করলেও, কোন মানুষকে কখনও রাত্রিবাস করতে দেখা যায়নি।

অতনুবাবুর সন্ধানে এখানে আসা পুলিশ ও অফিস কর্মীরা স্থানীয় কিছু মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িটিতে প্রবেশ করেন। বেশ কিছু জায়গায় মেঝেতে ফাটল ধরে গাছ গজিয়ে গেছে। ঘরগুলোর কড়িকাঠ থেকে কিছু বাদুড়কে ঝুলতেও দেখা গেল বটে, কিন্তু যাঁর সন্ধানে ভিতরে প্রবেশ, সেই অতনু চৌধুরীর দেখা মিললো না। ভাঙাচোরা সিঁড়ি ভেঙে ভ্যাপসা গন্ধযুক্ত দোতলার প্রথম ঘরটিতে প্রবেশ করেই, অচৈতন্য অতনুবাবুর দেখা পাওয়া গেল। এক ইঞ্চি পুরু ধুলোমাখা একটা ভাঙা, উইপোকায় খাওয়া তক্তপোশে তিনি চিৎ হয়ে কড়িকাঠের দিকে বিস্ফারিত ভয়ার্ত দৃষ্টিতে চেয়ে শুয়ে আছেন। ব্রিফকেসটা পাশে খোলা পড়ে আছে। তার পাশে একটা দামি ক্যামেরা, রাইটিং প্যাড ও একটা কলম। প্যাডের বেশ কিছু লেখা ও সাদা ছেঁড়া পাতা সারা ঘরে  ছড়ানো। পরীক্ষা করে দেখা গেল, সেগুলো অফিসের কাজকর্ম ও হিসাব সংক্রান্ত কিছু লেখা।

স্থানীয় একজন ডাক্তারকে ডেকে আনার পর দেখা যায়, যে তাঁর রক্তচাপ অস্বাভাবিক রকম বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেক চেষ্টার পরে জ্ঞান ফিরলে, অযথা আর সময় নষ্ট না করে, তাঁকে কলকাতার একটা বড় হাসপাতালে নিয়ে এসে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা হয়। কিছুদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠলেও, অতনুবাবু কিন্তু অতীতের কোন ঘটনাই মনে করতে পারলেন না। সেই থেকে তিনি মন্দার বাসু নামে একজন নামজাদা মানসিক চিকিৎসকের চিকিৎসাধীন।

আজ এই ম্যাগাজিনটির পাতা ওলটাতে ওলটাতে তিনি হঠাৎ ধীরে ধীরে পূর্বস্মৃতি ফিরে পেয়ে, নতুন করে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে চিকিৎসক ডাক্তার মন্দার বাসু, সব কাজ ফেলে নিজে তাঁর বাড়িতে এসে উপস্থিত হলেন। ম্যাগাজিনটি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে মন্দারবাবু তাঁকে বেশ কিছু প্রশ্ন করেন। এইভাবে দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়ার পর, অতনুবাবু সেদিনের ঘটনা খুলে বলতে সক্ষম হন।

পরিতক্ত রাজ বাড়িটির সন্ধান পেয়ে তিনি মিঠেপাতা গ্রামে অল্প সময় কাটিয়ে কাঞ্চনগড়ে এসে হাজির হন। রাজ বাড়িটি ঘুরেফিরে দেখা, ও কিছু ছবি তোলার জন্য তিনি একাই বাড়িটির ভিতরে প্রবেশ করেন। একতলার সমস্ত ঘরগুলো বেশ কিছুক্ষণ সময় ধরে ঘুরেফিরে দেখে, ছবি তুলে, ও ফিরে এসে নতুন লেখার রসদের প্রয়োজনে, তাঁর রাইটিং প্যাডে বাড়িটির বেশ কিছু নকশা ও প্রয়োজনীয় তথ্য নোট করেন। এরপর তিনি সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে গিয়ে একইভাবে ঘরগুলো দেখে, ছবি তুলে, ও প্রয়োজনীয় নকশা এঁকে প্রথম ঘরটিতে প্রবেশ করেন।

ডিসেম্বর মাস, বেলা বেশ ছোট হয়ে যাওয়ায় এরমধ্যেই বেশ আলো কমে এসেছে। তিনি ঘরে প্রবেশ করার সাথে সাথেই বেশ কয়েকটা বাদুড় ডানা ঝাপটিয়ে কড়িকাঠ থেকে উড়ে প্রায় তাঁর মুখের ওপর দিয়েই খোলা দরজা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে চলে যায়। বাদুড়গুলো উড়ে যাওয়ার ঠিক পরেই বাইরে কোন ঝোড়ো বাতাস না বইলেও, দরজাটা দড়াম করে বন্ধ হয়ে যায়। ঘরটা আরও অন্ধকার হয়ে যাওয়ায়, ফটো তোলার স্বার্থে তিনি দরজার পাল্লাদুটো টেনে খুলে দেন, আর ঠিক তখনই জনাপাঁচেক সাদা কাপড় পরিহিত মানুষ, তাঁকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। নিজেকে সামলে নিয়ে তাদের দিকে চোখ ফেরাতেই তিনি লক্ষ্য করেন, যে তাদের মুখ ও হাতে কোন মাংসের চিহ্ন নেই। তার পরিবর্তে জায়গাগুলো ঘোলাটে সাদা রঙের হাড় দিয়ে তৈরি, আর চোখের জায়গায় চোখের পরিবর্তে বিশাল দুটো গর্ত। ওই ঠান্ডাতেও ভয়ে তাঁর গোটা শরীর ঘামে ভিজে প্রায় জ্ঞান হারাবার উপক্রম হয়।

অশরীরীদের একজন তাঁকে বলে, যে তারা তাঁর কোন ক্ষতি করবে না। একজন ক্যামেরাটা নিয়ে ছবি তুলতে শুরু করে দেয়। অপর একজন প্যাডটা তার চোখের গর্তদুটোর কাছে মেলে ধরে কিছুক্ষণ দেখে বলে, “লেঁখালেখিঁর সখ আছে মনে হঁচ্ছে, সাঁহিত্যিক নাকি? তাঁ শুধু ঘঁরের বিবরণ লিঁখে কি হবে, বঁলি এই বাঁড়ির ইঁতিহাস কিছু জানা আঁছে? ইঁতিহাস না জানা থাকলে লিখবেটা কি? আমার কঁতদিনের সখ, এই বাড়ির ইঁতিহাস নিয়ে একটা কিছু লিখি। কিন্তু আঁমার সেই ক্ষমতা না থাকায় এতগুলো বঁছরেও তা সম্ভব হয়নি। আমি বঁলে যাঁচ্ছি, তুমি নিজের মতো করে লিঁখে যাও”। অতনুবাবু মিনতি করে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, “সন্ধ্যা হয়ে গেছে এখন আমাকে ছেড়ে দিন”। উত্তরে অশরীরীটি শুধু বললো, “এটাইতো লেঁখালেখিঁর আঁদর্শ সময়, কেন তুঁমি কি চোঁখে ভালো দেখো না? ওরে ও গোপলা এঁর চোঁখদুটো একটু দেঁখে দেতো বাঁবা”। চোখ হারাবার ভয়ে, ওই অবস্থাতেও তিনি লিখতে রাজি হলেন। সে এই বাড়ির অদ্ভুত ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বলে যেতে লাগলো, আর ইচ্ছা না থাকলেও অতনুবাবু তাঁর প্যাডের পাতায় লিখে যেতে বাধ্য হলেন। তাঁর ঘাড়ের ওপর দিয়ে অপর তিনজন ঝুঁকে পড়ে করোটি বাড়িয়ে, তিনি কি লিখছেন, ঠিক লিখছেন কী না, বানান ও ব্যাকরণ মেনে লেখা হচ্ছে কী না, লক্ষ্য করতে লাগলো। ঘাড়ের ওপর তাদের বরফের মতো ঠান্ডা নিঃশ্বাস পড়তে লাগলো।

এইভাবে লেখা শেষ হলে, বাড়ির ইতিহাস যে শোনাচ্ছিল, সে তার চোখের গর্তদুটোর কাছে প্যাডটা তুলে  অনেকক্ষণ মেলে ধরে খোনা গলায় উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠে, “আমার অনেক দিনের একটা সখ মিটলো” বলে, প্যাডের পাতাগুলো ছিঁড়ে নিয়ে অতনুবাবুকে ঘর ছেড়ে চলে যেতে হুকুম করলো। সুযোগ পেয়ে তাড়াতাড়ি দৌড়ে পালাতে গিয়ে তিনি ভাঙা চৌকিটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। তারপর তাঁর আর কিছু মনে নেই।

অতনুবাবু এবার ডাক্তার মন্দার বাসুকে বললেন, “আজ এখন দেখছি, এই ম্যাগাজিনে আমার লেখাটা ভূতনাথ সিকদার নামে একজন নিজের নামে প্রকাশ করেছে। আমার তোলা ওই বাড়ির কিছু ছবিও লেখার সাথে দিয়েছে। লেখার শেষে একটা মোবাইল নাম্বার দেওয়া আছে। অনেকবার ফোন করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কলার টিউন হিসাবে সেই খোনা গলায় হাড় হিম করা ভয়ংকর হাসিটা বেজে বেজে, একসময় ফোনটা কেটে যাচ্ছে, কেউ ধরছে না”।

গোটা ঘটনা শুনে চিকিৎসক মন্দার বাসু তাঁর ব্যাগ গুছিয়ে, ফিজ নিয়ে, “গয়ায় গিয়ে একটা পিণ্ড দিয়ে আসুন” উপদেশ দিয়ে, বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। অতনুবাবু একবার জিজ্ঞাসা করলেন, “তাদের একজনের নামও তো আমার জানা নেই, পিণ্ডটা দেবো কার নামে”? সেকথার কোন জবাব না দিয়ে, মন্দারবাবু দ্রুত পায়ে ঘর ত্যাগ করে উর্ধ্বশ্বাসে বিদায় নিলেন। এরপর থেকে তাঁকে আর কোনদিন এই বাড়ির আশেপাশে দেখা যায়নি।

সুবীর কুমার রায়

০২-১১-২০১৯

দ্বিজেন বাবু (স্মৃতির পাতা থেকে)

72610647_1338811582961254_5215569123303489536_n

স্কুলে দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য নামে একজন ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। অজাতশত্রু কথাটা বইতে পড়া যায়, বা অভিধানে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে কেউ অজাতশত্রু হতে পারে না। কারণ একজন ব্যক্তি কখনই সকলের প্রিয় হতে পারে না। শত্রু মাত্রই তো আর খুনোখুনি, রক্তারক্তি কাণ্ড করে না। একজন যদি অপর একজনকে পছন্দ না করে, তবে দুজনে দুজনের মিত্র, একথা নিশ্চই বলা যায় না। কিন্তু সৌম্যদর্শন শিবতুল্য এই মানুষটি ছিলেন স্কুলের সবার প্রিয়, সবার মিত্র, সবার ভালবাসা ও শ্রদ্ধার পাত্র। তিনি ছিলেন সত্যিকারের শিশুসুলভ নিষ্পাপ, নিষ্কাম এক আদর্শ পুরুষ।

দ্বিজেন বাবুরা ছিলেন বারো ভাইবোন। বেনারসে বাড়ি। তাঁর কাছ থেকে তাঁর বাড়ির কথা শুনতাম। তাঁর বড় ভাইবোনেরা ছিলেন কেউ ঈশান স্কলার, কেউ ডক্টরেট্, প্রথম বিভাগে প্রথম বা দ্বিতীয় স্থানাধিকারী। দ্বিজেন বাবু ছিলেন, এদের মধ্যে অতি সাধারণ, ইংরেজিতে এম.এ.। ছাত্রদের তিনি আদর করে ছাওয়াল বলতেন। ইংরেজি ভাষায় এতো পাণ্ডিত্য সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু তাঁর একটাই দোষ ছিল, তিনি থামতে জানতেন না। আমাদের সময় যতদূর মনে পড়ে, সম্ভবত দুশ’ নম্বরই আনসিন্ ছিল। কোন টেক্সট্ বই ছিল কী না সঠিক মনে করতে পারছি না।

একটা স্টোরি লিখতে হতো একশত কুড়ি শব্দের মধ্যে। একটা কুকুর মুখে করে মাংস খণ্ড নিয়ে নদীর ওপর ব্রিজ দিয়ে পার হবার সময়, নদীর জলে তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখে কী করলো, এই গল্পটা তিনি আমাদের লিখে দিলেন। তাঁকে কোন কিছু লিখে দিতে বললেই, তিনি ডিক্টেট্ করতেন, আমরা লিখতাম। পরে অন্য কোনদিন, সেই লেখাটাই নিজে লিখেছি বলে তাঁকে দেখালে, তিনি অনেক শব্দই পরিবর্তন করে দিয়ে বলতেন, এই জায়গায় এই শব্দটা ঠিক ভালো লাগছে না, বরং এই শব্দটা লিখলে অনেক বেশি ভালো শোনাচ্ছে।

যাহোক্‌ কুকুরের মাংস নিয়ে নদী পর্যন্ত আসতেই, বোধহয় দুশ’ শব্দ লেখা হয়ে গেল। এর মধ্যে পঁচিশ শতাংশ শব্দ,  জীবনে কোনদিন শুনিনি। ফলে পরবর্তীকালে আমরা নিজে লিখে তাঁকে দিয়ে শুদ্ধ করাতাম। তাঁর একটা বড় গুণ ছিল, তিনি কখনও ছাত্রদের গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা, বকাবকি পর্যন্ত করতেন না। দরকারও হতো না। লেখায় কোন রকম ভুলভ্রান্তি হলে, বড়জোর গাধা বলতেন। অন্য যে কোন শিক্ষক, এমনকী আমার বাবাকেও দেখেছি, ইংরেজি লেখায় কোন ভুল পেলে রাগারাগি করতেন এবং ক্রমে ক্রমে নাউন, প্রোনাউন কয় প্রকার, ভার্ব, অ্যাডভার্ব, টেন্স্, জেন্ডার, সব একে একে টেনে এনে তালগোল পাকিয়ে, জানা জিনিসকে অজানা করে ছাড়তেন। দ্বিজেন বাবু ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। আমি ভালো ছেলে, এটা যদি ইংরেজিতে কেউ আই ইজ এ গুড বয় লেখে, তাহলেও তিনি বিরক্ত না হয়ে বাক্যটা ঠিক করে দিয়ে বলতেন, আই এর পরে ইজ হয় গাধা? ফলে তাঁর কাছে নিজে লেখার সাহস এবং লেখার ক্ষমতা, উভয়ই জন্মাতো। তিনি সব সময় একটা উপদেশ দিতেন— simple sentence এ বাক্য লেখ, বেশি জটিলতায় যেও না। কিন্তু মুশকিল হলো, তাঁকে খাতা দেখাতে গেলে, তিনি প্রায় অধিকাংশ শব্দই পরিবর্তন করে দিয়ে বলতেন, এটা লিখলে শুনতে ভালো লাগবে। তাঁর স্টক্ অফ্ ওয়ার্ডসের ভাণ্ডারও ছিল সমুদ্রের মতো বিশাল। কিন্তু পরীক্ষার খাতায় কেউ কোনদিন তাঁর হাতে ভালো নম্বর পায়নি। তার প্রধান কারণ ছিল, সমস্ত শিক্ষকরা যখন পরীক্ষার খাতা দেখে স্কুলে জমা দিয়ে দিতেন, তখনও তাঁর খাতা দেখা শুরুই হতো না। শেষে স্কুল থেকে তাড়া খেয়ে, লাল পেন্সিল নিয়ে খাতা দেখতে বসতেন। তাঁর স্বভাব ছিল প্রতিটি খাতার প্রতিটি লাইন লাল দাগ দিয়ে খুঁটিয়ে পড়া, এবং বেশির ভাগ শব্দে লাল গোল পাকিয়ে তার মাথায় অন্য কোন সমার্থক ভালো শব্দ লাল পেন্সিলে লেখা। এরপর গোটা খাতা লাল দাগে ও লাল রঙের শব্দে ভরে গেলে, নোংরা করসে, ভালো লেখে নাই, ভালো শব্দ প্রয়োগ করে নাই, ইত্যাদি মন্তব্য করে, কম করে নম্বর দিতেন। তাঁর দেখা ইংরেজি খাতায় প্রত্যেক ছাত্রকে গ্রেসমার্ক দিতে হয়েছে, এমন ঘটনাও ঘটেছে।

এখনকার মতো প্রথম বিভাগে বেশির ভাগ ছাত্রের পাস করা, বা অধিকাংশ বিষয়ে লেটার পাওয়া বা স্টার পাওয়ার কথা, সেই সময় ভাবাই যেত না। কোন স্কুলে আট-দশটা ছাত্রছাত্রী প্রথম বিভাগে পাস করলে, স্কুলে হইচই পড়ে যেত। এখনকার ছেলে-মেয়েদের এতটুকু ছোট না করে বলতে পারি, সেই সময়ের ছেলে-মেয়েরাও কিন্তু কম ভালো ছিল না। বেশ মনে পড়ে, সাতের দশকের শেষে সম্ভবত মলবিকা চক্রবর্তী নামে একটি মেয়ে, হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায়, কলা বিভাগে প্রথম হয়। তার প্রাপ্ত মোট নম্বর, বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম ছেলেটির প্রাপ্ত মোট নম্বরের থেকেও বেশি ছিল। মেয়েটি বাংলা ও ইংরেজি, উভয় বিষয়েই লেটার মার্কস্ পেয়েছিল। এটাও একটা অসাধারণ ও বিরল ঘটনা হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল। তার মেধা নিয়ে খবরের কাগজে খুব লেখালিখিও হয়েছিল।

যাহোক্, দ্বিজেন বাবু বলতেন, “আমার হাতে কেউ ত্রিশ পেলে, ফাইনাল পরীক্ষায় সে পঞ্চাশ পাবে”। কিন্তু তাঁর দেওয়া নম্বর দেখে বাবার হাত থেকে বাঁচলে, তবে তো ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। তিনি ছিলেন ভবঘুরে প্রকৃতির মানুষ। যদিও তিনি একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন, কিন্তু সে বাসায় তিনি প্রায় থাকতেনই না। তিনি অবিবাহিত ছিলেন, ফলে একাই থাকতেন। তাই বোধহয় তাঁর নিজের বাসার প্রতি কোন টান বা আকর্ষণও ছিল না। তার বাসায় ঢুকতে গেলে মাকড়সার জাল সরিয়ে, ধুলো মেখে ঢুকতে হতো। তাঁকে লেখা তাঁর বাবার কোন কোন চিঠি তিনি পড়ে শোনাতেন। তাঁর বাবা ঠিক কি করতেন, এতদিন পরে মনে করতে পারি না। সম্ভবত বেনারস হিন্দু ইউনিভর্সিটির প্রফেসার ছিলেন। তাঁর বাবা অদ্ভুত কবিতার ছন্দে, ছেলেকে চিঠি লিখতেন। একটা চিঠি একদিন তিনি পড়ে শুনিয়েছিলেন। তাতে অদ্ভুত কবিতার ছন্দে তাঁকে তাঁর বাবা যা লিখেছিলেন, তার সারমর্ম— তিনি একটা পাকা আমের মতো বৃন্তে ঝুলছেন। যে কোন মুহুর্তে বৃন্ত থেকে খসে পড়তে পারেন। কাজেই তিনি তাঁর ছেলেকে হাত পুড়িয়ে খাবার হাত থেকে মুক্তি দেবার জন্য, বিবাহ করার উপদেশ দিয়েছিলেন, এবং সেটা তিনি দেখে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবা বোধহয় জানতেন না, যে তাঁর পুত্রের হাত পুড়বার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। কারণ তাঁর পুত্র রান্নাঘরের ধারেকাছেও যেতেন না। আর যাবেনই বা কেন? সেখানে তো রান্নার কোন ব্যবস্থাও ছিল না। তাঁর ওই বাসায় কখনও-সখনও পড়তে গিয়ে দেখেছি, ধুলোয় ভরা ঘরটা তিনি কিভাবে নিজে না থেকে, শত শত মাকড়সাদের অবাধে থাকার সুবন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। তাঁর বাবার কবিতার ছন্দে লেখা চিঠির প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, তাঁর খুব অল্প বয়সে একবার কঠিন অসুখ করেছিল। তাঁর বাবা তাঁকে নিজ হাতে ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ খাওয়াতেন। কোন একটা ওষুধে বোধহয় অ্যালকোহলের মিশ্রণ ছিল। সেই ওষুধটা তাঁকে খাওয়াবার সময়, তাঁর বাবা তাঁকে বলেছিলেন— “নিজ হাতে খাওয়ায় দারু, এমন পিতা দেখেছ কারু”? ইংরেজিতে অনুবাদ করতে।

তাঁকে কতবার দেখেছি স্কুলে এসে ধুতি পরেই টিউবওয়েলের জলে স্নান করে নিতে, অথবা দুপুরের খাবার হিসাবে মুড়ি, আর ঠান্ডা আলুর চপ্ খেয়ে নিতে। তাঁর ভবঘুরে জীবনের আর একটা নমুনা দিয়ে এবং তাঁর নীচের দুই ভাইয়ের কথা বলে, তাঁর প্রসঙ্গ শেষ করবো। তিনি কখন যে কোথায় থাকতেন, কী খেতেন, কেউ জানতো না। একদিন বেশ রাতে কোথা থেকে ঘুরে ফিরে পণ্ডিত স্যারের বাড়িতে এসে উপস্থিত। এরকম আমার বড়িতেও অনেক রাতে পড়াতে চলে আসতেন। ইচ্ছা না থাকলেও অত রাতে তাঁর কাছে ইংরেজি নিয়ে বসতে হতো। অত রাতে আমাকে পড়িয়ে, তিনি যে কোথায় থাকতেন কে জানে। আমার ও তাঁর বাড়ির মধ্যে দূরত্ব, প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার তো বটেই। যাহোক্, তাঁর ডাকে পণ্ডিত স্যারের ছেলে দরজা খুলে দিতে, তিনি শোবার ঘরে গিয়ে বললেন, “অনেক রাত হয়ে গেছে, একটু সরে সরে শোও দেখি, এখানেই শুয়ে পড়ি”।

দ্বিজেন বাবুর ছোট এক ভাই একবার আমাদের স্কুলে তার দাদার সাথে দেখা করতে এসেছিল। সে শিবপুর বি.ই. কলেজে পড়তো। ওই সময়ে অত আধুনিক পোষাকে তাকে দেখে আমরা অবাক হয়ে গেছিলাম। হাতে বালা, বিরাট জুলপি, পকেটে চিরুনি বা ছুড়ি জাতীয় কিছু একটা হবে। অবাক হয়েছিলাম, কারণ সে দ্বিজেন বাবুর ভাই। তার নাম সম্ভবত বুধেন্দ্র নারায়ণ ছিল। পরবর্তীকালে সে খুব ব্রিলিয়্যান্ট্ রেজাল্ট করে ইঞ্জিনিয়ার হয়।

দ্বিজেন বাবুর একবারে ছোট ভাইয়ের নাম ছিল ধ্রুব, সম্ভবত ধ্রুবেন্দ্র নারায়ণ। সে ছিল বংশের কুলাঙ্গার। কি কারণে বলতে পারবো না, ধ্রুবকে আমাদের স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছিল। একবার, সম্ভবত সপ্তম শ্রেণীতে সে সমস্ত বিষয় মিলে মোট সতেরো নম্বর পেয়ে রেকর্ড করেছিল। বিশ্ব রেকর্ডও হতে পারে। হাফ ঈয়ার্লি পরীক্ষা, গ্রীষ্মকাল সম্বন্ধে রচনা লিখতে দেওয়া হয়েছিল। ধ্রুব লিখেছিল—গ্রীষ্মকালে ভীষণ গরম পড়ে, মাঠ ঘাট গরমে ফেটে যায়, পুকুরের জল শুকিয়ে যায়। এরপরই আসে বর্ষাকাল। বৃষ্টির জলে মাঠ, ঘাট, পুকুর জলে ভর্তি হয়ে যয়। চারিদিক জল কাদায় ভরে যায়। যে দিন সারাদিন ধরে খুব বৃষ্টি হয়, ছাতা নিয়েও স্কুলে যাওয়া যায় না, সেদিন আমাদের স্কুলের হেড মাস্টার মশাই রেনি ডে দিয়ে দেন। তিনি খুব ভালো ও দয়ালু লোক। এরপর এক পাতা হেড মাস্টার মশাই এর গুণকীর্তন।

এ হেন ধ্রুব হঠাৎ একদিন কোথা থেকে একটি মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে, তার দাদাকে শুধু ছ’টি শব্দ ব্যয় করে, জীবনের একটা বড় অধ্যায়কে কত সহজে ব্যাখ্যা করে দিল— “বিস্কুট কিনতে গিয়ে বিয়ে হয়ে গেল”। কথায় বলে লাখ কথার কমে বিয়ে হয় না। কিন্তু কোন কথা না বলে, শুধু দোকান থেকে বিস্কুট কিনতে গিয়ে বিয়ে হয়ে যাওয়ার নমুনা বোধহয়, ভূভারতে আর কোথাও পাওয়া যাবে না। এর কয়েক মাস পরে ধ্রুবকে লাল কাপড় ও লাল চাদর গায়ে, সাধু হয়ে যেতে দেখেছিলাম। তার জীবনে হঠাৎ আসা স্ত্রী, তাকে হঠাৎই ছেড়ে চলে যায়। পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ, দ্বিজেন বাবুদের আত্মীয় ছিলেন বলে শুনেছিলাম। এক পরিবারে দু’-দুজন সন্ন্যাসী, ভাবা যায়? স্কুল ছেড়ে আসার বেশ কয়েক বছর পরে শুনেছিলাম নিতান্ত অসহায়, নিঃসঙ্গ জীবন শেষ করে, দ্বিজেন বাবু ইহলোক ত্যাগ করেছেন। পোস্ট্ অফিস ও ব্যাঙ্কে প্রচুর টাকা সঞ্চিত থাকলেও, তাঁর চিকিৎসা সেভাবে করা হয়নি। আজ এতদিন পরে তাঁকে আবার স্মরণ করে, আমার অন্তরের শ্রদ্ধা জানালাম। সারাজীবন কষ্টে থাকা মানুষটি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন, আনন্দে থাকুন।

সুবীর কুমার রায়

২০-১০-২০১৯

বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি {লেখাটি বেড়ানোর মজা পত্রিকায় প্রকাশিত।}

71946068_1338812139627865_3484388348838019072_n

আজ ২০১৯ সালের সতেরোই জানুয়ারী। কথামতো আমাদের আজ ‘হা’ শহর থেকে ফিরে আগামীকাল তাক্তসাং, যা টাইগারস্ নেস্ট্ নামে পরিচিত, যাওয়ার কথা। কিন্তু গতকাল চেলেলা পাসের ওপর দিয়ে ‘হা’  শহরে যাওয়ার সময় বরফে ঢাকা রাস্তায় বারবার গাড়ির চাকা পিছলে যাওয়ায়, আমাদের গাড়ির ড্রাইভার ওই রাস্তায় গাড়ি নিয়ে আর এগতে সাহস করে না। এখান থেকে ‘হা’ শহর আরও প্রায় উনচল্লিশ কিলোমিটার পথ। শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে, আমরা চেলালা থেকে প্রায় বারো-তেরো কিলোমিটার আগে, বরফের ওপর কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে পারো শহরে ফিরে আসি।

পরিবর্তিত পরিকল্পনামতো, আজ তাই বেশ ভোরে আমাদের টাইগারস্ নেস্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার কথা হলেও, প্রচন্ড ঠান্ডায় সময়মতো সবাই তৈরি হতে না পারায়, হোটেলের নীচে গাড়ি অপেক্ষা করা সত্ত্বেও, বেরোতে একটু দেরিই হয়ে যায়। পারো শহর থেকে প্রায় বারো কিলোমিটার পথ দূরে, সম্ভবত ‘রামথাংখা’ নামক জায়গা থেকে টাইগারস্ নেস্টের উদ্দেশ্যে হাঁটা পথের শুরু। প্রায় ঘন্টাখানেক সময় পরে আমরা যখন নির্দিষ্ট স্থানে এসে উপস্থিত হই, তখন বেলা অনেকটাই বেড়ে গেছে। সমস্যা একটাই, আমাদের সাথে তিনজন মহিলা আছে, যাদের মধ্যে দুজনের প্রায় ষাটের কাছাকাছি বয়স, এবং হাঁটুর রীতিমতো সমস্যা। শুধু তাই নয়, তিনজনের মধ্যে দুজন আগে কিছু ট্রেক করে থাকলেও, একজন আবার ট্রেকের সাথে পূর্বপরিচিত নয়। আমি জীবনে হয়তো কিছু ট্রেক করেছি, কিন্তু বাইপাস অপারেশন করা সাড়ে ছেষট্টি বছর বয়সে, মনোবল এখনও কিছু সঞ্চিত থাকলেও, শারীরিক বল যে তলানিতে এসে ঠেকেছে, অস্বীকার করি কিভাবে?

যাইহোক, গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই কাউন্টার থেকে মাথাপিছু পাঁচ শত টাকা করে টিকিট কিনে নিলাম। টিকিট ছাড়া ওপরে যাওয়া যায় কী না জানি না। যাওয়া হয়তো যায়, কিন্তু টিকিট ছাড়া তাক্তসাং অর্থাৎ টাইগারস্ নেস্টের মঠের ভিতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় কী না, বা ওপরে টিকিট কাটার কোন ব্যবস্থা আছে কী না, জানা নেই। এরপরে লাঠি পিছু পঞ্চাশ টাকা ভাড়ায় বেশ শক্তপোক্ত পাঁচটা লাঠি নিয়ে নেওয়া হলো। ফেরার পথে ফেরৎ দিয়ে দিতে হবে। একশ’ টাকা দিলে অবশ্য লাঠির মালিকানা পাওয়া যায়।

কেউ বললো এখান থেকে প্রায় চার মাইল পথ, কেউ বললো সাড়ে চার কিলোমিটার পথ, কেউ আবার বললো ছয় কিলোমিটার পথ হেঁটে, প্রায় তিন হাজার ফুট উচ্চতা অতিক্রম করে, ১০২৩২ ফুট উচ্চতায় এই বিখ্যাত মঠটি অবস্থিত। এটাকেই ভুটানের বৌদ্ধ ধর্মের জন্মস্থান বলে মনে করা হয়। তিব্বতি ভাষায় তাক্তসাং কথার অর্থ নাকি বাঘের গুহা, বাঘ নিয়ে অবশ্য অনেক গল্প শোনা যায়। অষ্টম শতাব্দীতে গুরু পদ্মসম্ভব (গুরু রিনপোচে) তিব্বত থেকে বাঘিনীর পিঠে করে নাকি এই তাক্তসাং গুহায় এসে তিন বৎসর, তিন মাস, তিন সপ্তাহ, তিন দিন, তিন ঘন্টা তপস্যা করেন। পরবর্তীকালে ১৬৯২ সালে এই মঠটির প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে প্রচলিত। বাঘ নিয়ে আরও গল্প আছে, সেকথা থাক, তবে এতটা পথ এই খাড়াই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হবে শুনে, মহিলাদের মুখ চোখে বেশ দুশ্চিন্তার মেঘ চোখে পড়লো। আমরা এগিয়ে চললাম, ড্রাইভার সোনম, নীচে গাড়ি নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে বলে জানালো। সামান্য একটু পথ ওপরে উঠে একটু সমতল মতো জায়গায় দেখলাম, কয়েকটা ঘোড়া নিয়ে মালিকরা যাত্রীর আশায় দাঁড়িয়ে আছে। মাঝ রাস্তায় অসুবিধায় পড়লে ঘোড়া পাওয়া যাবে কি যাবে না ভেবে, তাদের সাথে কথা বললাম। জানা গেল, মোটামুটি মাঝামাঝি দূরত্বে ক্যাফেটারিয়া পর্যন্ত ঘোড়া যায়, তারপরে আর যেতে দেওয়া হয় না। ঘোড়াকে যেতে দেওয়া হয় না, না ঘোড়া যেতে পারে না, ঠিক বোঝা গেল না। তবে ফেরার পথে কোন অবস্থাতেই ঘোড়ার পিঠে মানুষ তোলা হয় না। প্রতিটি ঘোড়ার জন্য ছয় শত টাকা করে ভাড়া দিতে হবে। ঘোড়া যাওয়া আসার গল্প শুনে, রাস্তা সম্বন্ধে একটা সম্যক ধারণা করে নিয়ে, তিনজন মহিলার জন্য তিনটি ঘোড়া পনেরোশ’ টাকায় ঠিক করে দেওয়া হলো। একটা ঘোড়ার দায়িত্ব আবার একটা দশ-বারো বছরের বাচ্চার হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো। যাহোক্ ওরাও খুশি, আমরাও খুশি। ঘড়িতে এখন সকাল পৌনে দশটা, ওদের ঘোড়া এগিয়ে চললো, আমরা ক্যাফেটারিয়ার কাছে আমাদের জন্য ওদের অপেক্ষা করতে বলে দিলাম।

আমি আর তরুণ ধীরে সুস্থে এগিয়ে চললাম। অল্প রাস্তায় অনেকটা ওপরে উঠতে হওয়ায়, স্বাভাবিক ভাবেই রাস্তা বেশ খাড়াই। প্রচুর গাছপালাযুক্ত লালচে মোরাম জাতীয় রাস্তা হলেও, ছোট বড় মেজ সেজ পাথরে ভর্তি। রাস্তায় অনেক বিদেশি ও বিদেশিনীর দেখা পেলাম। কেউ ঘোড়ার পিঠে, কেউ আবার নিজের পায়ে, তবে হেঁটে যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদের প্রায় সকলের দলের সাথেই সেই আলখাল্লার মতো ওদের জাতীয় পোষাক পরিহিত গাইড আছে। বুঝতে পারছি, আমার হাঁটার মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্যের এবার বেশ অভাব। পিঠে যেটুকু মাল আছে, সেটাই বেশ ভারী ও কষ্টকর বলে মনে হচ্ছে। তরুণ আমার থেকে প্রায় বছর ছয়েকের ছোট, কাজেই ওর কষ্ট আমার মতো না হলেও, ওর হাঁটার মধ্যেও কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। মাঝে মাঝেই দাঁড়িয়ে পড়ে লজেন্স মুখে দিয়ে এগতে হচ্ছে। একটা অল্প বয়সি ছেলে মেয়ের বেশ বড় একটা দলকে দেখছি, বারবার রাস্তার পাশে পাথরের ওপর বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। যদিও বিশ্রামের থেকে নিজেদের মধ্যে গুলতানি করতে ও সেলফি তুলতেই তারা বেশি ব্যস্ত। একসময় আমাদের অতিক্রম করে তারা আবার এগিয়েও যাচ্ছে। বয়স বোঝা মুশকিল, তবে খুব বেশি বয়স নয়, এমন এক বিদেশি যুগলকে বারকতক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এগতে দেখার পর দেখলাম, সম্ভবত স্ত্রীকে গাইডের সাথে এগিয়ে যেতে দিয়ে, হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে, ভদ্রলোক ফিরে গেলেন। যাঁরা বেশ ভোর বেলা বেরিয়েছিলেন, তাঁদের এখনও কিন্তু ফেরার সময় হয়নি। তবে মাঝেমাঝেই উলটো দিক থেকে কিছু যাত্রীকে নীচের দিকে নেমে যেতে দেখছি, জানি না, তাঁরা শেষপর্যন্ত যেতে অক্ষম হয়ে মাঝপথ থেকে ফিরে যাচ্ছেন কী না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই দশ-বারো বছরের ছেলেটাকে, যে আমাদের দলের একজনের ঘোড়ার সাথে ওপরে গিয়েছিল, তার ঘোড়া নিয়ে নীচে ফিরে যেতে দেখলাম। সে জানালো, যে আমাদের দলের তিনজনকেই তারা ক্যাফেটারিয়ার কাছে ভালভাবে নামিয়ে দিয়েছে। এইভাবে গাছপালা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এবড়ো খেবড়ো পাথুরে রাস্তা ভেঙে, একটা জায়গায় এসে আমরা একটা অল্পবয়সি ছেলে মেয়ের দলের সাক্ষাৎ পেলাম। এরা সবাই বাংলাদেশ থেকে এসেছে। অনেকগুলো ছেলেমেয়ে, সবাই ওদের দেশে আই.টি. সেক্টরে কাজ করে। তারা জানালো, যে তারা থিম্পুতে একটা কনফারেন্সে যোগ দিতে এসেছিল। টাইগারস্ নেস্ট্ না গেলে ভুটান আসা সার্থক হয় না, তাই তারা টাইগারস্ নেস্ট্ দেখে দেশে ফিরে যাবে। অনেকক্ষণ তাদের সাথে কথা বলে সময় কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম। এইভাবে আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে, আমরা ক্যাফেটারিয়া অঞ্চলে এসে পড়লাম। উজ্জ্বল নানা রঙের রঙিন কাপড়ের টুকরো দিয়ে গোটা জায়গাটা সাজানো। কাপড়ের ওপর সংস্কৃত ও অন্য কোন ভাষায়, সম্ভবত বুদ্ধের বাণী লেখা। বামদিকে টাইগারস্ নেস্ট্ যাওয়ার রাস্তা, ডানদিকের বাঁধানো সরু রাস্তা কিছুটা নীচে ক্যাফেটারিয়া পর্যন্ত গেছে। রঙিন কাপড় দিয়ে সাজানো অঞ্চলে নিজ দলের কাউকে না দেখে, কিছু ছবি তুলে ক্যাফেটারিয়া পর্যন্ত হেঁটে গিয়েও কারো সন্ধান পেলাম না। ক্যাফেটারিয়ায় জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, ওখানে তিনজন মহিলার কোন দল আসেনি। এবার চিন্তা শুরু হলো। ওরা গেল কোথায়? এতক্ষণে আমরা অর্ধেক পথ মাত্র এসেছি, এই পথটা ওরা ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাইয়ের মতো ঘোড়ায় চেপে আসলেও, বাকি অর্ধেক পথ ও গোটা ফেরার পথটা কিন্তু হেঁটে যেতে হবে। তরুণের কথায় এগিয়ে চললাম। বেশ কিছুটা পথ ভেঙে ওপরে উঠে দেখলাম, দুটো বেঞ্চিতে ওরা বসে আছে। আমরাও বসে সবাইকে কমলা লেবু দিলাম। আরও কিছুক্ষণ বসে, ওদের তাড়া দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চললাম। ওদের মুখ চোখ, ওদের হাঁটার গতি ও চলার ছন্দ জানিয়ে দিচ্ছে, যে ওরা বেশ ক্লান্ত। পাথুরে রাস্তা ভেঙে ওদের সাথে সাথে কখনও হাত ধরে সাহায্য করে, কখনও মৌখিক উৎসাহ দিয়ে, ওদের এগিয়ে নিয়ে চলেছি। ধীরে ধীরে ওদের গতি কমতে শুরু করলেও, বেলা বাড়তে লাগলো। হঠাৎ উলটো দিক থেকে একটা বাঙালি ছেলেদের দল এসে হাজির হলো। মুখোমুখি এসেই তাদের কথা শুরু হলো। এক শ্রেণীর মানুষ আছেন, অন্যকে নিরুৎসাহ করার মধ্যেই যারা নিজেদের ভ্রমণ, বিশেষ করে ট্রেকিং-এর সার্থকতা খুঁজে পান। এরাও দেখলাম সেই প্রজাতির মানুষ। মহিলাদের খুব কষ্ট করে চড়াই ভাঙতে দেখে তারা সাহেবি কেতায় শুরু করে দিল— “আপনাদের হ্যাটস্ অফ্! ধীরে ধীরে এগিয়ে যান। খুব কষ্টকর রাস্তা কাকিমা। সামনেই  সাতশ’ ষাটটা সিঁড়ি ভেঙে আপনাদের মন্দিরে যেতে হবে”, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার বাড়িতে চুয়ান্নটা সিঁড়ি  ভেঙে আমার ফ্ল্যাটে উঠতে হয়। দিনে বেশ কয়েকবার আমাকে উপর নীচে যাতায়াত করতে হলেও, আমার উনি সিঁড়ি ভাঙার ভয়ে, নানা অজুহাতে নীচে নামতে চান না। এহেন একজন মানুষকে হঠাৎ সাতশ’ ষাটটা সিঁড়ি ভাঙার গল্প শোনালে, তার মানসিক অবস্থাটা সহজেই অনুমেয়। তাদেরকে কোনরকমে বিদায় করে আমরা এগিয়ে চললাম।

ধীরে ধীরে হাত ধরে, প্রয়োজন মতো সাহায্য করে, একসময় আমরা সেই জায়গাটায় এসে পৌঁছলাম, যেখান থেকে মঠগুলোর গঠনশৈলী সবথেকে পরিস্কারভাবে দেখে মুগ্ধ হতে হয়, আবার শ’য়ে শ’য়ে পাথুরে সিঁড়ি নীচে নেমে যেতে দেখে আতঙ্কিতও হতে হয়। একটা নিরেট তেলতেলে শক্ত পাথরের প্রায় খাঁজহীন পাহাড় যেন অনেক ওপর থেকে সোজা নীচ পর্যন্ত নেমে গেছে, আর তার প্রায় মাঝামাঝি জায়গায়, কেউ যেন কিছুটা জায়গা তরোয়াল দিয়ে কেটে সমান করে এমন ভাবে মঠগুলো তৈরি করেছে, যে দেখে মনে হবে, মঠগুলো পাহাড়ের গায়ে ঝুলে আছে। আতঙ্কের আরও কারণ আছে। অনেক সিঁড়ি নামার পর, সংখ্যায় কিছু কম হলেও, আবার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে মঠের কাছে যেতে হবে। আহা! আমাদেরও যদি একটা করে বাঘ বা বাঘিনী, নিদেন পক্ষে গুপি-বাঘার মতো জুতো থাকতো, তাহলে বেশ হতো। বিভিন্ন রঙের রঙিন কাপড় বাঁধা একটা ব্রিজ মতো পার হয়ে, আমরা গুনে গুনে সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে শুরু করলাম। বাঁপাশে একটা ঝরনার জল, অনেকটা জায়গায় বেশ উঁচু বরফ হয়ে জমে আছে। অল্প কিছু সিঁড়ি ভেঙে নামার পরেই, মহিলাদের সিঁড়ি ভাঙায় সাহায্য করতে গিয়ে, সিঁড়ির সংখ্যা গোনার কথা ভুলে গেলাম। আগেই শুনেছিলাম সাতশ’ সিঁড়ি ভাঙতে হয়, একটু আগে বাঙালি ছেলেদের দলটার কাছে শুনলাম, সাতশ’ ষাটটা সিঁড়ি। এখন তো মনে হচ্ছে সংখ্যাটা কিছু বেশি হলেও হতে পারে।

ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময় নিয়ে পাশের রেলিং ধরে বা আমাদের কাঁধ ও হাতের ওপর চাপ দিয়ে নামতে সাহায্য করে, একসময় আমরা ওদের দু’জনকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামা পর্ব শেষ করতে সমর্থ হলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে, এবার শুরু হলো সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠার পালা। ওদের অবস্থা দেখে খারাপ লাগছে, কষ্টও হচ্ছে, কিন্তু আমি জানি, এই কষ্টের রেশ কয়েকদিন পরেই মুছে যাবে, কিন্তু সারা জীবন এই জায়গায় আসা ও তার আনন্দের রেশ বেঁচে থাকবে। হাত ধরে টেনে টেনে বিকেল প্রায় সোয়া তিনটে নাগাদ ওদের ওপরে উঠিয়ে নিয়ে আসতেও সমর্থ হলাম। বেশ বিকেল হয়ে গেছে, ফেরার পথে এবার আবার অনেক বেশি সংখ্যক সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে হবে। তাছাড়া ফেরার পথে সমস্ত পথটাই ওদের হেঁটে যেতে হবে। তাই এখানে আর বেশি সময় ব্যয় করা চলবে না। কাউন্টারে টিকিট দেখাতে, আমাদের হাতে একটা ছোট তালা দিয়ে পাশের লকারে ক্যামেরা, মোবাইল ইত্যাদি সবকিছু রেখে, তালা দিয়ে দিতে বলা হলো। অনেকগুলো লকার, কিন্তু অধিকাংশেরই তালা দেওয়ার আঙটাটি ভাঙা। যাইহোক মালপত্র ভিতরে রেখে ওপরে উঠে, একে একে সবক’টা মঠ দেখে নিলাম। মূল মঠটির বিরাট বুদ্ধমুর্তিটির মাথা ছাড়া বাকি অংশটি সোনার তৈরি বলে মনে হলো। এত শান্ত পরিবেশে আরও বেশ কিছুটা সময় কাটাবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু উপায় না থাকায়, ওদের একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দিয়ে, কাউন্টারের কাছে নেমে এলাম। লকার থেকে মালপত্র বের করে নিয়ে চাবি ও তালা ফেরৎ দিয়ে দিলাম। সঙ্গে অল্প জল থাকলেও, কিছুটা জল ভরে নেবার ইচ্ছা ছিল। পাশে ‘হোলি ওয়াটার’ লেখা খাবার জলের জায়গা থাকলেও, জুতো খুলে সেখান থেকে মগে করে জল ভরে আনা  অসুবিধাজনক। ঘড়িতে এখন প্রায় পৌনে চারটে বাজে, তাই ফেরার পথ ধরলাম। এখানে খাবার জলের ব্যবস্থাটা অনেক সহজলভ্য হওয়া উচিৎ বলে মনে হলো।

এবারও প্রথমে সিঁড়ি ভেঙে নামতে হবে, তবে পরবর্তী পর্যায়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ির দিকে চোখ পড়তে, ওদের কথা ভেবে শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। মন্দির অঞ্চলে এক অল্প বয়সি স্বামী স্ত্রী ছাড়া, অল্প কয়েকজনকে দেখা গেল। তবে তারা স্থানীয় মানুষ বলেই মনে হলো। একদল অবাঙালি যাত্রীকে এতক্ষণে ওপরে উঠে আসতে দেখলাম। আসার পথে অনেককেই দেখেছিলাম, যাদের আর এখানে আসতে দেখলাম না। অনেকেই মাঝপথ থেকে বা শেষ প্রান্ত থেকে, ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। নীচে নামার সিঁড়িও একসময় শেষ হলো, আমাদের বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মতো সমান উচ্চতার সিঁড়ি হলেও তবু একরকম ছিল, কিন্তু এই সিঁড়ির উচ্চতা তো একেকটা একেক মাপের। এবার ওঠার পালা, নিজে প্রায় পিছন ফিরে হেঁটে, স্ত্রীর হাত ধরে টেনে ওপরে তোলা শুরু করলাম। তরুণেরও প্রায় একই অবস্থা। ও নিজেও সীমার হাত ধরে প্রায় একই প্রক্রিয়ায় ওপরে উঠছে। ওরা আমাদের থেকে সামান্য এগিয়ে গেছে। তরুণের কন্যা পুপু অনেকটা এগিয়ে গেছে, ও এখন নজরের বাইরে। ধীরে ধীরে রোদের তেজ কমছে, অন্ধকার হয়ে গেলে বিপদের সম্ভবনা প্রবল, তাই সঙ্গিনীকে একটু দ্রুত পা চালাতে বললাম। যদিও জানি, বাস্তবে সেটা প্রায় অসম্ভব। অনেকটা সময় ধরে অনেক কসরত করে অনেক সিঁড়ি ভাঙার পর, ওপর থেকে তরুণ জানালো, যে সিঁড়ি ভাঙা পর্ব শেষ। তাতে উপকার কতটুকু হলো জানি না, তবে মনে হলো ওর মুখে শুধু ফুল চন্দন নয়, সাথে কিছু গুঁজিয়াও পড়ুক।

বেশ বুঝতে পারছি যে বেলা ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে, দিনের আলো দ্রুত কমতে শুরু করে দিয়েছে, কিন্তু করার কিছু নেই। বারবার ‘আর একটু গতি বাড়াও’ বলতে বলতে, আমরা দুটি মাত্র প্রাণী, খুব ধীর গতিতে এগিয়ে চলেছি। সীমার হাঁটুর অবস্থাও বেশ খারাপ, কিন্তু ওর যেটা আছে, সেটা বেড়াবার প্রবল আগ্রহ ও অসম্ভব মনের জোর। তাছাড়া ওর এর আগের কিছু ট্রেকিং-এর অভিজ্ঞতাও আছে। ওদের গতি আমাদের থেকে কিছু বেশি হওয়ায়, ধীরে ধীরে ওরাও চোখের আড়ালে চলে গেছে। এইভাবে বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে গেলাম। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে এলেও আর চার দিন পরেই পূর্ণিমা, তাই হালকা একটা আলোর ভাব আছে। তবে তা এই ভাঙাচোরা পাথুরে নির্জন জঙ্গলের পথ চলার পক্ষে পর্যাপ্ত মোটেই নয়। পিছন থেকে কারও গলার আওয়াজ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না। শেষ অবাঙালি দলটার ফিরতে দেরি আছে, কিন্তু সেই অল্প বয়সি দম্পতি এখনও কেন এসে পৌঁছলো না, বুঝতে পারছি না।

এইভাবে আরও কিছুটা পথ পার হয়ে দেখলাম একটা বেশ বড় পাথর, আর রাস্তাটা যেন তার দুদিক দিয়ে দুটো ভাগ হয়ে গেছে। সঙ্গিনীকে দাঁড়াতে বলে, সরেজমিনে পরীক্ষা করে বাঁদিকের রাস্তাটাই আমাদের পথ বলে স্থির সিদ্ধান্তে এসে, বাঁদিকের পথ ধরে আবার এগিয়ে চললাম। এখানে কয়েকটা এবড়ো খেবড়ো সিঁড়ির মতো ধাপ থাকায়, আরও নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। স্ত্রীর হাত বেশ শক্ত করে ধরে, আমার দেখানো জায়গায় পা ফেলে ফেলে নামতে বলে কয়েক পা মাত্র নেমেছি, এমন সময় নীচে, খুব কাছ থেকেই তরুণের ডাক শুনতে পেলাম। বুঝলাম ওদের দেখা না গেলেও, ওরা খুব কাছাকাছিই আছে। ওদের দাঁড়াতে বলে সামান্য পথ এগিয়েই ওদের দেখা পেলাম ও তরুণের মুখে সেই ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক বাক্যটি শুনলাম— “সুবীরদা, আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি”। এই অন্ধকারে জঙ্গলের পথে পথ হারানোর সব রকম বিপদের কথা ছেড়ে, আমার যেটা প্রথম মনে হলো— আবার সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে হলে কি করবো? তরুণ জানালো, সামনে কোন রাস্তা নেই। আমি সবাইকে দাঁড় করিয়ে, কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেখলাম যে, ডানদিকে একটা সরু রাস্তার মতো পথ, আগাছার জঙ্গলে গিয়ে মিশেছে। বামদিকের রাস্তাটা অধিকতর চওড়া হলেও সেটা একটু এগিয়েই শেষ, কাজেই সেটা আমাদের ফেরার রাস্তা হতে পারে না।

প্রায় সাত দিন হলো ভুটানে আছি। সন্ধ্যার পর থেকে সর্বত্র ভীষণ ঠান্ডা, সকালে রাস্তার পাশে ও গাড়ির ওপর বরফ জমে থাকে। একমাত্র পুনাখার উত্তাপ সামান্য কিছু অধিক হলেও, সন্ধ্যার পর রাস্তায় হাঁটা খুব একটা সুখের ছিল না। অন্ধকারে তরুণের মোবাইলের আলোয় দাঁড়িয়ে, কি করা উচিৎ ভাবছি। এখনও ক্যাফেটারিয়ার কাছে এসে পৌঁছতে পারিনি, অর্থাৎ এখনও নীচে গাড়ির কাছে পৌঁছতে অর্ধেকের বেশি পথ বাকি। এমন সময় নীচ থেকে পুপুর চিৎকার শুনলাম। সে জানতে চাইছে, আমরা কোথায় আছি। জানা গেল, সে ক্যাফেটারিয়ার কাছে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। চিৎকার করে তাকে জানালাম যে আমরা পথ গুলিয়ে ফেলেছি, সে যেন ওখানেই অপেক্ষা করে। পাহাড়ি হাঁটা পথে যেখানে ঘোড়ার যাতায়াত আছে, সেখানে ঘোড়ার মল পথ চিনতে সাহায্য করে। ক্যাফেটারিয়ার আগে সে সুযোগ পাওয়ার সম্ভবনা নেই, ক্যাফেটারিয়ার পরেও এই অন্ধকারে সেই দুর্মূল্য বস্তুটির দেখা পাওয়ার আশা কম।

শেষপর্যন্ত আবার সেই ওপরের বড় পাথরটার কাছে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এগতে যাবো, এমন সময় আমাদের ঠিক পিছনে, অর্থাৎ আমরা যে পথ ধরে এখানে এসে হাজির হয়েছি, একজনকে মোবাইল জ্বালতে দেখা গেল। ভদ্রলোক আমাদের ঠিক পিছনে বাঁকের মুখে থাকায়, তাঁকে দেখতে পাওয়া যায়নি, তবে ওই পথ দিয়ে আমরাও এসেছি, কাজেই উনি এইমাত্র এখানে এসে উপস্থিত হয়েছেন বোঝা গেল। পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় আমার স্ত্রী তাঁকে ভাইসাব বলে ডাকায় তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁকে আমাদের বিপদের কথা বলাতে তিনি জানালেন যে আমরা ঠিক রাস্তাতেই এসেছি, তবে ভুল করে বাইপাস দিয়ে আসায়, চিনতে অসুবিধা হচ্ছে। তিনি আমাদের এগিয়ে যেতে বলে জানালেন, যে তিনি বাজার আনতে নীচে যাচ্ছেন। তাঁর জন্য নীচে গাড়ি অপেক্ষা করছে। বাজার নিয়ে তিনি আবার ওপরে ফিরে যাবেন। এপথে তিনি প্রায় রোজই যাতায়াত করেন এবং নীচে নামতে তাঁর পৌনে এক ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা সময় লাগে। আমার স্ত্রী আমাদের একটু সাহায্য করতে বলায়, তিনি দাঁড়িয়ে গিয়ে তাঁর সাথে এগিয়ে যেতে বললেন। কিন্তু তিনি সম্ভবত বাঘের গুহা থেকে আসছেন, কাজেই তাঁর চিতা বাঘের মতো গতির সাথে আমরা তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারবো কেন? যথারীতি আমরা কিছুটা পিছিয়ে পড়ায়, তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে আমার স্ত্রীকে বললেন আপনি খুব পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। আমাকে স্ত্রীর হাত ছেড়ে দিতে বলে তিনি আমার স্ত্রীকে বললেন, যে ঠিক তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে দুহাতে তাঁর কাঁধের দুদিকে শক্ত করে ধরতে। এবার স্বাভাবিক ভাবে তাঁর গতি অনেক কমে গেলেও, ইঞ্জিন যেমন করে রেলের কামরা টেনে নিয়ে যায়, সেইভাবে আমার স্ত্রীকে নিয়ে এগতে শুরু করলেন।

এতক্ষণ নিজে ব্যস্ত থাকায়, তরুণকে কোনরকম সাহায্য করার সুযোগ ছিল না। ঠিকভাবে ও ঠিক জায়গায় পা না ফেলার জন্য, একটু আগেই সীমা একবার লালচে ঢালু জমির ওপর গড়িয়ে পড়ে গেছে। আমি আর তরুণ চেষ্টা করেও তাকে সোজা করে দাঁড় করাতে পারছিলাম না। শেষে অনেক চেষ্টায় পিছন থেকে বগলের তলা দিয়ে তার হাত চেপে ধরে দাঁড় করাতে হয়েছে। সীমার অবস্থাও বেশ খারাপ, তরুণকে সীমার হাত ছেড়ে দিতে বলে, আমি তার হাত শক্ত করে চেপে ধরলাম। আমি নিজে দীর্ঘ দিনের স্পন্ডিলোসিসের রোগী, ডান হাতে এমনিই একটা যন্ত্রণার ব্যাপার আছে, তার ওপর এতক্ষণ ডান হাতের ওপর অত চাপ পড়ায়, যন্ত্রণাটা বেশ বেড়েছে। ভদ্রলোক মোবাইলের আলোয় পথ দেখিয়ে আমার স্ত্রীকে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন, মাঝেমাঝে শুধু পা সোজা ও শক্ত রাখতে বলছেন। ওদের গতি আগের তুলনায় বেশ বেড়েছে, হাঁটার ভঙ্গিমাও বেশ সাবলীল বলে মনে হলো। সীমাকে শক্ত করে ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চললাম। ওই ভদ্রলোকের কায়দায় তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও, সেই শক্তি বা দম আমার কোথায়?

একসময় ক্যাফেটারিয়ার কাছে চলে এলাম। এখানেই পুপু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, এবার সেও আমাদের সঙ্গী হলো। ওই ভদ্রলোকের মোবাইলে নীচ থেকে বারবার ফোন আসলেও তিনি কিন্তু বিরক্ত হননি, বা আমাদের ছেড়ে চলে যাননি, বরং নিজে থেকে বললেন যে “ভয় পেয় না, দরকার পড়লে আমি পিঠে করে নীচে নামিয়ে নিয়ে যাব”। পুপুর কাছে জানা গেল, যে অনেক্ষণ আগে সোনম একবার ফোন করে  জানতে চেয়েছিল যে আমরা এখন কোথায়। পুপু জানিয়েছিল, যে সে নিজে ক্যাফেটারিয়ার কাছে থাকলেও, সঙ্গীরা এখনও এসে পৌঁছয়নি। সোনম জানিয়েছিল এরপর অন্ধকার নেমে আসবে, আমরা যেন ক্যাফেটারিয়ায় থাকার ব্যাপারে একটু কথা বলে চেষ্টা করে দেখি।

আরও অনেকটা পথ এইভাবে নেমে আসার পর সোনম আবার ফোন করলো। আমরা তাকে একবার ওপরে চলে আসতে বললাম। সত্যি কী না জানি না, তবে সে জানালো, যে সে নাকি দুবার অনেক ওপর পর্যন্ত উঠে এসেও, আমাদের সাক্ষাৎ পায়নি। ওই ভদ্রলোক জানালেন যে তিনি অধিকাংশ বাইপাস ব্যবহার করায় সোনম আমাদের খুঁজে পায়নি। ভদ্রলোকটির হাতে মোবাইলটা দিয়ে সোনমের সাথে একটু কথা বলে আমরা ঠিক কোথায় আছি তাকে একটু জানাতে বললাম। উনি নিজেদের ভাষায় কথা বলে সোনমকে আমাদের অবস্থানটা জানিয়ে দিলেন। আমরা আবার এগিয়ে চললাম। জঙ্গলের পথ, প্রচন্ড ঠান্ডা হলেও উত্তেজনা ও শারীরিক পরিশ্রমে ঠান্ডা সেরকম অনুভুত হচ্ছে না।

এইভাবে আরও কিছুটা পথ চলার পরে টর্চ হাতে সোনম এসে হাজির হলো। সে এত দ্রুত কিভাবে চলে এলো বুঝলাম না। তাহলে কি ও আমাদের সাহায্য করতে এসে কাছেপিঠেই কোথাও ছিল, নাকি আমরা নীচে রাখা গাড়ির কাছাকাছি কোথাও এসে গেছি? মনে মনে প্রার্থনা করলাম, দ্বিতীয়টাই যেন সত্য হয়।

সোনম এসেই সীমাকে অনেকটা ওই ভদ্রলোকের কায়দায় ধরে, নীচে নামতে শুরু করলো। বারবার সে সীমাকে পা সোজা করে হাঁটতে বলছে। সেই একবারে ওপর থেকে এতটা পথ নিজের হাতের ওপর ওদের চাপ সহ্য করে এসে, আমি নিজেও বেশ ক্লান্ত। তবে মাইলের পর মাইল উতরাইয়ের পথ হাঁটতে, আমার কোনদিনই তেমন বিশেষ কষ্ট হয় না। ভারমুক্ত হয়ে আমার হাঁটায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে পেলাম। এতক্ষণ পর্যন্ত আলোর প্রয়োজনে আমি নিজের মোবাইল ব্যবহার করিনি। না, এখন দিবসও নয়, বা মনের হরষেও আলো জ্বালার প্রয়োজন অবশ্যই নয়, আলো না জ্বালায় স্বল্পালোকে হাঁটতে কিছু অসুবিধাও হচ্ছিল একথা সত্য। কিন্তু আমি চাইছিলাম না, যে সবক’টা মোবাইলের ব্যাটারি এক সাথে শেষ হয়ে যাক, কারণ এখনও কতটা পথ, বিশেষ করে কতক্ষণ সময় আলো জ্বেলে হাঁটতে হবে কে জানে?

আসার পথে বারবার লক্ষ্য করেছি, যে সোনমের কথা বুঝতে না পারলে, বা ওর ইচ্ছা বা বক্তব্যকে উপেক্ষা করলে, ও ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়। এখনও সে বারবার আমায় মোবাইল জ্বালতে বলছে। ‘পড়েছি সোনমের হাতে, মোবাইল জ্বেলে চলো সাথে’ পন্থাই অবলম্বন করা শ্রেয় বিবেচনা করে, মোবাইলের টর্চ জ্বেলে ওদের সাথে চললাম। আরও বেশ কিছুক্ষণ এইভাবে এঁকেবেঁকে হাঁটতে হাঁটতে, একসময় মনে হলো নীচে নেমে এসেছি। কিন্তু গাড়ি রাখার বড় ফাঁকা অঞ্চলটা তখনও চোখে না পড়ায় বুঝলাম, আমরা শেষপ্রান্তে এসে পড়লেও এখনও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় এসে পৌঁছইনি।

এইভাবে নেমে এসে আমরা একসময় আধো-অন্ধকারে সেই ফাঁকা নির্জন জায়গাটার একপাশে আমাদের সাদা গাড়িটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আর কোন গাড়িতো দূরের কথা, একটা মানুষ পর্যন্ত কোথাও নেই। ধীরে ধীরে সেই ঘেরা জায়গাটার ভিতর দিয়ে, যার সামনে থেকে যাওয়ার সময় লাঠি ভাড়া করেছিলাম, যার ভিতর দিয়ে ওপরে ওঠার পথে যাওয়ার সময়, মেলার মতো বিভিন্ন পসরা নিয়ে মেয়েদের বিক্রি করতে দেখেছিলাম, হেঁটে গিয়ে গাড়ির সামনে হাজির হলাম। কেউ কোথাও নেই যে লাঠিগুলো ফেরৎ দেবো। সোনম আমাদের পাঁচটা লাঠি একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। আমি এবার ভদ্রলোকের কাছে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটা চাইলে, তিনি জানালেন তাঁর কোন হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার নেই। তাঁর নাম জিজ্ঞাসা করাতে, তিনি প্রথমে এড়িয়ে গিয়েও শেষে বললেন ‘প্রেমা’। তাঁর নাম বলার ভঙ্গী দেখে, তিনি সত্যই তাঁর সঠিক নাম বললেন বলে মনে হলো না। আমি তাঁকে আমাদের এইভাবে সাহায্য করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে তিনি শুধু বললেন, “ধন্যবাদ কিস্ লিয়ে, এ তো হামারা ফর্জ থা”। আমি আর কোন প্রশ্ন করলাম না। আমার হৃদয়ে তিনি মানব প্রেমের প্রতীক হয়েই চিরদিন অবস্থান করুন।

আমাদের সাথে এখন কোন লাগেজ নেই, তাই গাড়ির ছ’টা সিটই এখন ফাঁকা। ওই ভদ্রলোকের সাথে নিজেদের ভাষায় সোনমের কিছু কথা হলো। বুঝলাম তাঁর গন্তব্য স্থলে সোনম তাঁকে পৌঁছে দিয়ে যাবে। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি ছেড়ে দিল। আমাদের যাওয়ার পথে একসময় একটা বড় হোটেলের মতো বাড়ির সামনে তিনি নেমে গেলেন। জানি না তাঁর কথামতো আজই আবার ওপরে ফিরে যাবেন কী না। তাঁর একটা ছবি নেওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তাঁর মতো প্রচার বিমুখ একজন মানুষের, যিনি নিজের নাম পর্যন্ত বলতে চান না, ওই রাতে ওই অবস্থায় ছবি তোলার কথা বলাটা কিরকম হাস্যকর মনে হলো।

রাত প্রায় পৌনে ন’টার সময় আমরা হোটেলের সামনে নামলাম। সোনমকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভদ্রলোক তার পরিচিত কী না। সোনম জানলো, উনি তাক্তসাং গুহার একজন লামা। সোনম গাড়ি নিয়ে চলে গেল। আমাদের হোটেলে কোন খাবার না পাওয়ায়, আমি আর তরুণ একটু দূরের ‘হোটেল ড্রাগন’-এ গেলাম রাতের খাবার কিনে আনতে।

সুবীর কুমার রায়

০৯-০২-২০১৯

লক্ষ্মীবাঈ ও মহারাণা প্রতাপ {লেখাটি প্রতিলিপি বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত।}

36271711_998507660324983_1780579280690872320_n

বিয়ের অল্প কয়েক মাস পরে আমরা দুজন হিমাচল প্রদেশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে গেলাম। আমার সাথে আমার এক সহকর্মী, বছর তিনেকের শিশুকন্যা সহ তার স্ত্রী, ও তার এক অবিবাহিতা শ্যালিকা সঙ্গী হলো। হিমাচল আমার আগে ঘোরা, তবে আমার স্ত্রীর দেখা না হওয়ায়, ও বন্ধু ও বন্ধু পত্নীর বিশেষ অনুরোধে তল্পিতল্পা নিয়ে রওনা হলাম।

বেশ কিছু জায়গা ঘুরে খাজিয়ার এসে পৌঁছলাম। খাজিয়ার আমার আগে দেখা হলেও, আগেরবার এই জায়গায় থাকার সুযোগ হয়নি। খাজিয়ারের অসাধারণ সৌন্দর্য আমায় যারপরনাই মুগ্ধ করায়, এবার ওখানে থাকার ব্যবস্থা পাকা করে গিয়েছি। এখন খাজিয়ারের যেসব ছবি দেখি বা লেখা পড়ি, তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় না, যে সেখানে সৌন্দর্যায়নের জন্য অনেক কিছুই হয়েছে। ঢালু গামলার মতো সবুজ ঘাসে ঢাকা বিশাল মাঠ ও ছোট্ট পুকুরের মতো তাল সংস্কার করে, আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে। থাকা বা খাওয়ার সুবন্দোবস্তও যথেষ্টই হয়েছে। তবে আজ থেকে ছত্রিশ বছর আগে কিন্তু তার সৌন্দর্য বৃদ্ধির ওপর কারও বিশেষ মাথাব্যথা ছিল বলে মনে হয়নি। হিমাচল ট্যুরিজমের গেস্ট্ হাউসটিই একমাত্র রাত্রিবাসের জায়গা ছিল। একপাশে পর্দা দেওয়া কাচের দেওয়াল দিয়ে তৈরি গেস্টহাউসটি সত্যিই সুন্দর ছিল। পর্দা সরিয়ে ঘরে বসেই বিস্তীর্ণ প্রান্তরের অনেকাংশই দেখা যেত। দুটো ঘরে মালপত্র গুছিয়ে রেখে স্থানীয় একটা ঝুপড়িতে চা জলখাবার খেয়ে, দুপুরে বাঙালিমতে ডাল, ভাত, আলুর ছক্কা, ও ডিমের অমলেট রান্নার রেসিপি ভালভাবে বুঝিয়ে দিয়ে, আমরা সবাই মাঠের একধারে ছোট্ট তালটার কাছে এসে হাজির হলাম।

যাহোক্, অনেকক্ষণ মাঠে হেঁটে হইচই করে সময় কাটলো। মাঠের মধ্যে দিয়ে একটু জোরে হাঁটলে বা ছুটলে, সবুজ মখমলের মতো ঘাসের ভিতর থেকে দলবেঁধে সবুজ রঙের গঙ্গাফড়িং উড়ে যাওয়ার দৃশ্য একটা উপরি পাওনা বলে মনে হলো। রান্না শেষ হতে দেরি আছে, অনেকক্ষণ সময় এইভাবে কাটিয়ে আমরা মাঠের পাশেই গেস্টহাউসের কাছে এসে জড়ো হলাম।

নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব ঠাট্টা তামাশায় মশগুল, এমন সময় দুটো ছেলে “ঘোড়ায় চাপবেন নাকি বাবু” বলে দুটো ঘোড়া নিয়ে এসে হাজির। আমার স্ত্রী ছাড়া আর কেউই কোন আগ্রহ প্রকাশ করলো না। কি আর করা যাবে, বিয়ের পর বেড়াতে এসে মুনি ঋষিরাই নতুন বউকে চটাতে চায় না, আমি তো কোন ছার। ইচ্ছা না থাকলেও, বাধ্য হয়ে রাজি হতেই হলো। উনি তো হাসিমুখে ছেলেটির দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরে, ঘোড়ার পিঠে ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের মতো স্টাইলে উঠে বসলেন। ছেলেটি ঘোড়ার ফিতে ধরে হেঁটে হেঁটে মাঠ ভেঙে এগতে শুরু করলো। আমরা পাঁচজনই একমাত্র ট্যুরিস্ট, কাজেই খদ্দেরের অভাবে দ্বিতীয় ছেলেটি আমাদের এক নাগাড়ে ঘোড়ায় চাপার জন্য অনুরোধ শুরু করলো। একমাত্র আমার আনুকূল্যে তার সঙ্গীটি একজন খদ্দের পাওয়ায়, সে আমাকে বোধহয় দয়ার সাগর ভেবে বসে, আমায় তার ঘোড়াটায় চাপার জন্য অনুনয় বিনয় করতে শুরু করলো।

আমি কিছুতেই রাজি না হওয়ায় ছেলেটি যখন হাল ছেড়ে দিয়েছে, তখন আমার বন্ধুটি বললো, “তোর শুধু বড় বড় কথা, তোর বউকে দেখে তোর শেখা উচিৎ। ঘোড়ার পিঠে চাপার তোর সাহস নেই স্বীকার করতে লজ্জা কিসের? টাকার অভাব হলে বল্, আমি ঘোড়া চাপার খরচ দিয়ে দিচ্ছি”। ব্যাস ঘোড়ার মালিক নতুন উদ্দমে আবার ঘোড়ায় চাপার অনুরোধ শুরু করে দিলো। তার অনুরোধের আগুনে সকলের সামনে বন্ধুর ব্যঙ্গ্যোক্তি ঘিয়ের কাজ করলো। এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ কাটার পর সে আমাকে ভীরু কাপুরুষ ইত্যাদি চোখা চোখা বিশেষণে ভুষিত করায় ভীষণ রাগ হলো। ঘোড়ার মালিককে ঘোড়াটা নিয়ে আসতে বললাম।

হিন্দী ফিলমের নায়কের কায়দায় ঘোড়াটার পিঠে চেপে বসে লক্ষ্য করলাম আমার উনি মাঠের বেশ কিছুটা দূরে চলে গেছেন। ঘোড়া ও ঘোড়ার মালিক ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে। এবার আমার ঘোড়ার মালিক মুখে নানারকম শব্দ করতে করতে প্রথমে ধীরে, তারপর ক্রমশঃ গতি বাড়িয়ে ঘোড়াটাকে ছেড়ে দিলো। ঘোড়াটা চেতকের প্রেতাত্মা কিনা জানি না, তবে সে বোধহয় আমাকে মেওয়ারের রাজা মহারাণা প্রতাপ ভেবে ও বিশাল মাঠটাকে হলদিঘাটের রণপ্রান্তর ভেবে এবার শুরু করলো দৌড়। মুহুর্তের মধ্যে আমি আগের ঘোড়াটাকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেলাম। আমি ঘোড়ার গলার ফিতে ধরে টেনে, কিছুক্ষণ আগে শোনা শব্দগুলো মুখ দিয়ে করেও তার তীব্র গতি রোধ করতে পারলাম না। হাঁটু দিয়ে তার পেটের কাছে আঘাত করেও কিছু সুবিধা তো হলোই না, বরং গতি কিছু বৃদ্ধি পেলো বলেই মনে হলো। ঘোড়ার মালিক আমায় ঘোড়ার গতি কমাবার, বা ঘোড়াকে দাঁড় করাবার মন্ত্র বা কায়দা শিখিয়ে দেয়নি। এবার সত্যিই ভয় পেলাম। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়ার বিপদের আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। দুদিকে যে লোহার ক্লিপের মধ্যে পা ঢুকিয়ে বসেছিলাম, তার থেকে পা বার করে নিলাম, কারণ চিন্তা করে দেখলাম ওই ক্লিপের ভিতর পা আটকে থাকা অবস্থায় পড়ে গেলে আর রক্ষে নেই। যতক্ষণ না ঘোড়া দয়া করে দৌড় বন্ধ করবে, ততক্ষণ আমাকে মাঠের ওপর ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে যেতে হবে। পা বের করে নেওয়ার একমাত্র কারণ, প্রয়োজনে ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ দিয়ে, নিজেকে ক্র্যাশ ল্যান্ডিং করে নেওয়ার চেষ্টা করা যাবে। পা বের করে নেওয়ার পর পাদুটো নিয়ে অসুবিধা হওয়ায়, ঘোড়ার পিঠে বসে আধশোয়া হয়ে ঘোড়ার গলা জড়িয়ে ধরে আত্মরক্ষার চেষ্টা করলাম। সবই আমার কপাল। লোকে নতুন স্ত্রীর কন্ঠলগ্ন হয়, আমি এক তাগড়াই হতভাগা ঘোড়ার।

অবশেষে মালিকের কাছে ফিরে আসার পর তিনি স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। কোনরকমে পিঠ থেকে নেমে বুঝলাম, আমার দুই পায়ের ঊরু থেকে প্রায় পাতা পর্যন্ত ছড়ে গিয়ে রক্ত বার হয়ে গেছে।

সুবীর কুমার রায়

০১-১০-২০১৯