পাখি {লেখাটি ইচ্ছামতী ও দাশুর ডাইরি থেকে, সন্দেশ , Sahitya Sarani (সাহিত্য সরণি) , সুপ্ত প্রতিভা-Supta Protibha , প্রতিলিপি , বই পোকার কলম, বাংলায় লিখুন ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত।}

Self (42)ছোটবেলা থেকেই আমার পাখি পোষার ভীষণ সখ। লাভবার্ড, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, বা পেঙ্গুইন পেলিক্যান নয়, যে কোন একটা পাখি হলেই হ’ল। এমনকি চড়াই বা গোলা পায়রা হলেও আপত্তি নেই।

আমাদের বাড়ির কাছেই একটা জুটমিলের জমিতে একটা শাল কাঠের খুঁটির ওপর কে বা কারা জানিনা, একটা হাল্কা কাঠের বাক্স লাগিয়ে ছিল। তাতে অনেক পায়রার বাস ছিল। বেশির ভাগই অবশ্য গোলা পায়রা। গোটা দু’তিন সাদা বা লালচে খয়েরী। সুযোগ বুঝে কতবার ওখানে খুঁটি বেয়ে উঠে, পায়রা ধরে আনার পরিকল্পনা করেছি। কিন্তু হয় আশেপাশে লোক থাকে, না হয় লোকজন না থাকলেও, পায়রারা বাসায় না থাকায়, পরিকল্পনা মনের মধ্যেই থেকে যায়। একদিন সুযোগ বুঝে খুঁটি বেয়ে পায়রা ধরতে উঠলাম। তারা আমার মতো একটা আনাড়ী চোরকে দেখে ঘাবড়ে গিয়ে, ফড়ফড়্ করে আওয়াজ করে উড়ে গেল। একটা লোক, কোথায় ছিল কে জানে, আমার কান্ডকারখানা দেখে এগিয়ে এল। তাকে দেখে খুব ভয় পেয়ে গেলাম। সে কিন্তু খুব নরম সুরে আমায় জিজ্ঞাসা করলো—“পায়রা ধরে কী করবে”? বললাম পায়রা পুষবো।

গোলা পায়রা আবার কেউ পোষে নাকি? ঠিক আছে, কাল সন্ধ্যার সময় এস, পায়রা ধরে দেব।

পরদিন আশায় আশায় ওখানে গিয়ে, লোকটাকে আর দেখতে পেলাম না। অন্য একজনকে তার বিবরণ দিয়ে এবং আমার আসার কারণ জানাতে, সে মুহুর্তের মধ্যে একটা নীলচে কালো গোলা পায়রা ধরে আমার হাতে দিয়ে বললো—“সাবধানে নিয়ে যাও”।

বাড়ি ফিরে একটা ঝুড়ি চাপা দিয়ে, ঝুড়ির তলায় কিছু চাল ও মুড়ি দিয়ে, তাকে খাটের তলায় রেখে দিলাম। পরদিনই বাড়ির পাঁচিলে একটা কাঠের বাক্স টাঙ্গিয়ে, তাতে পরম যত্নে পায়রাটাকে রাখলাম। কিন্তু পায়রাটার কপালে বোধহয় ভালো বাসা লেখা ছিল না। বাক্সে রেখে হাত ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, সে তার ডানা নেড়ে আমাকে টাটা করে, উড়ে চলে গেল।

আমার দিদির শ্বশুর বাড়ি ছিল পাশের রেলওয়ে স্টেশনের কাছেই। বোধহয় দু’শ বছরের পুরানো জমিদার বাড়ি, আর ঐ বাড়িতেই ছিল পায়রার আড়ৎ। সেখান থেকে একটা পায়রা ধরে আনলাম। প্রথম দিনই সেটা বাক্সে একটা ডিম পাড়লো। আমাদের বাড়িতে মুরগী ছিল। তারা ডিম পাড়লে, রোজ তুলে রাখা হ’ত। ডিম পাড়া বন্ধ হলে, সব ডিম একসাথে মুরগীর খাঁচায় রেখে দেওয়া হ’ত। মুরগীটার তখন একমাত্র কাজ ছিল সারাদিন ডিমের ওপর গ্যাঁট হয়ে বসে, ডিমে তা দেওয়া। বেশ কিছুদিন পরে ঐ ডিমগুলো থেকে ছোট্ট ছোট্ট, গোল গোল বাচ্চা জন্মাতো। সেই মতো পায়রার ডিমটাও অন্যত্র তুলে রাখলাম। পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত আর ডিম না পাড়ায়, ডিমটা বাক্সে রাখতে গেলাম। মনে একটা খুশি খুশি ভাব— একটা পায়রা এনে, কত অল্পদিনে দু’টো পায়রার মালিক হব। হায়! ডিমটা বাক্সে রাখা মাত্র, পায়রাটা উড়ে গেল, আর তার পা লেগে ডিমটা মাটিতে পড়ে ভেঙ্গে গেল। সকলে বললো ডিমে নোনা লেগে গেছে, ওটা থেকে বাচ্চা জন্মাতো না। তাই পায়রাটা ডিম ফেলে দিয়ে চলে গেছে। ডিমে হাত দিলে নাকি নোনা লেগে যায়। দুই প্রজাতির পাখির ক্ষেত্রে দু’রকম নিয়ম হবে কে জানতো, তবে আমার পায়রা পোষার পর্ব, সেখানেই শেষ হয়ে গেল।

বাড়িতে তখন গরু ছিল। তার খাবার খোলচুনি বা ভাঙ্গা ডাল, একটা মুখ কাটা তেলের টিনে রাখা হ’ত। মোবাইল ফোনের টাওয়ারের কল্যানে, চড়াই পাখি শেষ হতে বসেছে। অথচ তখন প্রতি বাড়িতেই প্রচুর চড়াই পাখির দেখা মিলতো। যাহোক্, আমার বাড়ির টিনে তাদের পর্যাপ্ত খাবারের সন্ধান, তারা কী ভাবে পেয়েছিল। সারাদিন আট-দশটা চড়াই, পাঁচিল থেকে টিন আর টিন থেকে পাঁচিল করে কাটিয়ে দিত। বাবার হুকুমে টিনটার ওপর ঢাকা দিয়ে রাখা হ’ত, যাতে গরুর খাবার নষ্ট করতে না পারে।

রবিবার বা স্কুল ছুটির দিনে দুপুরে সবাই ভাত ঘুম দিলেই, আমি আমার পাখি শিকারের অস্ত্র নিয়ে তৈরী হয়ে যেতাম। অস্ত্র বলতে এয়ার গান, তীরধনুক, এমন কী গুলতি পর্যন্ত না। আমার একটা মোক্ষম অস্ত্র ছিল। সেটা একটা নারকেল দড়ির তৈরী গোল পাপোশ্। টিনের ঢাকনা খুলে একটু আড়ালে চুপ করে অপেক্ষা করা ও টিনের দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা। মূহুর্তের মধ্যে কী ভাবে সংবাদ পেয়ে দশ-বিশটা চড়াই চলে আসতো। আমি চুপ করে আড়াল থেকে তাদের খাওয়া দেখতাম। দুপুর রোদে ঘুরে ঘুরে খাবারের সন্ধান করতে না হওয়ায়, এবং একই জায়গায় এত সুখাদ্যের ব্যবস্থা করায়, তারা আমাকে বোধহয় দু’হাত, সরি দু’পা তুলে আশীর্বাদ করতো। কিছুক্ষণ সময় তাদের নির্বিঘ্নে খাওয়ার সুযোগ দিয়ে, আমি আমার অস্ত্র নিয়ে তৈরী হ’তাম। আট-দশটা চড়াই একসাথে টিনের মধ্যে ঢুকে মনের সুখে খাবার খেতে শুরু করলেই, আমি পা টিপেটিপে গিয়ে টিনের মুখে পাপোশ্ চাপা দিয়ে দিতাম। তারপর হাত ঢুকিয়ে একটা একটা করে পাখি ধরা।

একটা বড় জুতোর বাক্সের দু’দিকে ছুঁচ দিয়ে পরপর ফুটো করে, মোটা মোটা ঝাঁটার কাঠি ঢুকিয়ে, একটা খাঁচা তৈরী করাই ছিল। এবার পাখিগুলোকে একটা একটা করে জুতোর বাক্সে পোরা। জায়গা অনুপাতে পাখির সংখ্যা খুব বেশী হয়ে যেত। কিন্তু বাবার জন্য এত দামী পাখি পোষা থেকে প্রতিবারই আমি বঞ্চিত হতাম। পাখি পোষার প্রধান অন্তরায় ছিলেন আমার বাবা। একেই বোধহয় ঘরের শত্রু বিভীষণ বলে। পাখিগুলোকে সন্ধ্যার আগেই ছেড়ে দিতে হ’ত। অনেকদিন সন্ধ্যার পর বাবা অফিস থেকে ফিরে, পাখি ধরার জন্য তিরস্কার করতেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর পাখিগুলোকে ছেড়ে দিলে বিড়ালের কবলে পড়তে পারে বলে পরদিন সকালে ছেড়ে দেবার নির্দেশ দিতেন। আর সেই রাত্রিটা আমার খুব আনন্দের হ’ত। সামান্য পড়াশোনার পর অনেকটা সময় আমি পাখিগুলোকে সঙ্গী হিসাবে পেতাম। বারবার জুতোর বাক্স থেকে কাঠি খুলে বার করতে গিয়ে দু’একটা উড়েও যেত। সারারাত অন্ধকারে কোথায় থাকবে, বা এত রাতে অন্ধকারে নিজের বাসা চিনে ফিরে যেতে পারবে কী না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তাও কম হ’ত না।

একদিন ছোট একটা দড়ি দিয়ে দু’টো চড়াই পাখির পা বেঁধে দিয়ে ছেড়ে দিলাম। ভেবেছিলাম তারা একে অপরকে হারিয়ে ফেলবে না, সব সময় একসঙ্গে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে ফল হ’ল উল্টো। পাখিদুটো ছাড়া পেয়ে হুস করে উড়ে গিয়ে, যে যার পথ দেখলো। ফলে দড়ি টানাটানি করে ঝপ করে মাটিতে পড়ে গেল। দ্বিতীয় বারও একই ফল হ’ল, তবে মাটিতে না বসে, বাড়ির ছাদের কার্নিশে গিয়ে বসলো। বুঝলাম এভাবে দড়ি বাঁধা থাকলে, দুটোই মরে যাবে। শুরু হ’ল তাদের মুক্ত করার প্রচেষ্টা। ওরা দড়ি টানাটানি করে একবার এখানে বসে, একবার ওখানে পড়ে যায়, কিন্তু দু’জনে একসঙ্গে একবারও উড়তে পারলো না। শেষে অনেক চেষ্টার পর ওদের ধরে, বাবার দাড়ি কামানোর বাক্স থেকে ব্লেড নিয়ে, খুব সাবধানে দুটোরই পায়ের দড়ি কেটে দিলাম। ওরা মহানন্দে উড়ে গেল বটে, কিন্তু দাড়ি কামানোর নতুন ব্লেডে কে হাত দিয়েছে, তাই নিয়ে বাড়িতে কুরুক্ষেত্র হয়ে গেল। যখন বুঝলাম চড়াইপাখি পোষার যোগ্য নয়, তখন অন্য কোন পাখির সন্ধানে লেগে পড়লাম।

তখন কিছু উৎসাহী যুবক বাচ্চাদের নিয়ে খেলাধুলার ব্যবস্থা করে আনন্দ পেতেন। বাচ্চাদের জন্য রুমাল চোর, সামরেস, দড়ি টানাটানি, এ ধরণের অনেক রকম খেলার ব্যবস্থা করতেন। ঐ যুবক থাকতেন খেলা পরিচালনার কাজে। খেলাধুলার সাথে শরীর গঠন, ব্যায়াম ও নানারকম শিক্ষামুলক কাজও করানো হ’ত। আমাদের পাড়ায় সনতদা এইসব খেলাধুলার ব্যবস্থা করতেন। বিকাল হতেই, আমাদের ছোট্ট মাঠটায় যাবার নেশায় পেয়ে বসতো। সনতদা ছিলেন আমার বোনের বন্ধুর দাদা। ফলে তার ওপর আমার, বা আমার ওপর তার, হয়তো আলাদা একটা স্নেহ, ভালবাসা বা অধিকার ছিল।

সে যাহোক্, কোথাও কোন পাখির ব্যবস্থা করতে না পেরে, শেষে সনতদাকেই ধরলাম একটা পাখি দেবার জন্য। তিনি “পাখি কোথায় পাব? আমার কী পাখির ব্যবসা আছে”? ইত্যাদি অনেক কিছু বলে, শেষে বললেন তাঁদের বাড়ির ভেন্টিলেটারে একটা শালিক বাচ্চা পেড়েছে। শালিক পাখি পুষলে তিনি দিতে পারেন।

হাতে যেন চাঁদ পেলাম। শালিক পাখি যদি লোকে না পুষবে, তাহলে পুষবেটা কী? সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেলাম। পারলে তখনই তাঁর সাথে তাঁর বাড়ি গিয়ে পাখি নিয়ে আসি। কিন্তু সনতদা ছিলেন খুব ডিসিপ্লিনড্। সন্ধ্যাবেলা পড়ার সময়, কাজেই ধমক দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন।

পরের দিন সকাল থেকে বিকালের জন্য অপেক্ষা করে রইলাম। জুতোর বাক্স ভালভাবে পরিস্কার করে রাখতেও ভুললাম না। রুমাল চোর খেলার থেকে পাখি হাতে পাওয়াটা সেদিন আমার কাছে অনেক বেশি জরুরী বলে মনে হ’ল। স্কুল থেকে ফিরেই ছুটলাম পাশের ছোট্ট মাঠটাতে। বাচ্চারা সব এসে গেছে, কিন্তু সনতদার টিকি দেখা গেল না। শেষে তিনি মাঠে এসেই আমাদের খেলার ব্যবস্থা করলেন। আমি পাখির কথা বলতেই তিনি বললেন “একদম ভুলে গেছিরে, কাল ঠিক নিয়ে আসবো। এখন জায়গায় গিয়ে বোস্”।

পরদিনও পাখি এল না। এইভাবে চার পাঁচ দিন কাটার পর, শালিকের আশা ছেড়ে দিলাম। বুঝলাম এ জগতে কেউ কারো নয়। নিজের পাখি নিজেকেই জোগাড় করতে হবে। এই জন্যই বলে— সেল্ফ্ হেল্প্ ইজ দি বেষ্ট হেল্প্।

দিন ক’য়েক পরে, সেদিন টেনিস বলে ফুটবল খেলা চলছে। সনতদা রেফারী। খেলা বেশ জমে উঠেছে। আমাদের সাথে সনতদাও গলায় বাঁশী ঝুলিয়ে, সারা মাঠ দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। অনেকক্ষণ খেলা চলার পর হঠাৎ সনতদা বাঁশী বাজিয়ে খেলা বন্ধ করতে বলে আমায় ডাকলেন। আমি কাছে যেতেই বললেন “একদম ভুলে গেছিলাম রে, ছি ছি ছি”। বলেই প্যান্টের পকেট থেকে একটা শালিক বাচ্চা বার করলেন। পাখিটার অবস্থা তখন খুব খারাপ। ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা করলে বোধহয় ভাল হয়।

আমি আর এক মূহুর্ত সময় নষ্ট না করে, পাখি নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটলাম। বাড়ি এসেই একটা কাপে একটু দুধ নিয়ে, ড্রপারে করে খাওয়াবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সব দুধ তার ঠোঁটের পাশ দিয়ে বার হয়ে আসলো। জুতোর বাক্সে কাপড় পেতে পাখিটাকে রেখে দিলাম। এবারও এক নম্বর শত্রুর ভূমিকা বাবা নিজেই নিলেন। কড়া গলায় হুকুম হ’ল, “পাখি রেখে বই নিয়ে এস”। কী আশ্চর্য, পড়াশোনার জন্য সারা জীবন পরে আছে, কিন্তু এই পাখিতো আর ততদিন বাঁচবে না। জীবনে এত সহজে দ্বিতীয়বার পাখি পাওয়ার ভাগ্য আর নাও আসতে পারে। কোনটার গুরুত্ব আগে? এই সহজ তথ্যটা কেন তিনি বুঝতে চান না বুঝি না।

রাতের পড়াশোনার পাট শেষ করে, ছাতু মেখে, ছোট ছোট গুলি তৈরী করে, পাখিটার ঠোঁট ফাঁক করে, একটা একটা করে ছাতুর গুলি ওর গলার মধ্যে দিতে শুরু করলাম। পাখিটাও আজ এই “মুখে ছাতুর” শুভ রাতে পরমানন্দে সেগুলো খেতে শুরু করলো। ভাবলাম তাহলে বোধহয় শালিকপাখি গরুর দুধ খায় না। খুশী হয়ে একটা একটা করে অনেকগুলো ছাতুর গুলি, ঠোঁট ফাঁক করে করে, তার গলায় ফেললাম। কিছুক্ষণ পরে মনে হ’ল পাখিটা যেন খুব সুস্থ নয়, কী রকম নেতিয়ে পড়েছে। ঠোট ফাঁক করে নতুন গুলি গলায় দিতে গিয়ে দেখি, গোল গোল ছাতুর গুলি তার প্রায় ঠোঁট পর্যন্ত জমে আছে। অবস্থা খারাপ বুঝে, ছোট একটা ঝাঁটার কাঠির টুকরো দিয়ে গেঁথে গেঁথে, একটা একটা করে উল্টো প্রক্রিয়ায় তার গলা থেকে বার করতে শুরু করলাম। ঠোঁটের কাছটা টিপে ধরে ঠোঁট ফাঁক করে দেখি, গলার ভিতর আরও অনেক ছাতুর গুলি আছে। একই প্রক্রিয়ায় আরও অনেক ছাতুর গুলি বার করে, রাতের মতো পরিষেবা শেষ করে, তাকে বাক্সে রেখে দিলাম।

 রাতে শুতে যাবার আগে দেখলাম পাখিটা মাথা নীচু করে চোখ বুঁজে বসে আছে। পরদিন ঘুম থেকে উঠেই জুতোর বাক্সের কাছে গিয়ে দেখি, আদরের পাখি পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমচ্ছে। ভাতঘুমের মতো ছাতুঘুম তার আর কোনদিন ভাঙ্গে নি।

শুরু হ’ল নতুন পাখির সন্ধান। একদিন দিদির বাড়ি গিয়ে দেখি, সেখানে একজন একটা পাখি ধরেছে। কী পাখি জানি না, জানার প্রয়োজনও নেই। অনেক অনুরোধ করে, বোধহয় ভিক্ষা করে বললে ঠিক বলা হয়, পাখিটাকে হস্তগত করে, একটা কাগজের ঠোঙায় করে নিয়ে, হাসিমুখে বাড়ি ফিরে এলাম। অনেকে দেখে বললো ওটা চাতক পাখি। চাতক পাখি আমি চিনি না। চিন্তা হ’ল— চাতক পাখি তো বৃষ্টির জল ছাড়া জল খায় না শুনেছি, সারা বছর রোজ তো আর বৃষ্টি হবে না, অন্তত এখন তো হচ্ছে না, তাহলে পাখিটা কী জল না খেয়ে মরে যাবে?

শুরু হ’ল নতুন উদ্দমে পাখির পরিচর্যা। চাল দিলাম খেল না। গম দিলাম, তাও খেল না। টমেটো, আপেল, পেয়ারা, ফুলকপির টুকরো, কিছুই খেল না। পিঁপড়ে ধরে দিলাম, তাও খেল না। সারারাত না খেয়ে থাকলো। পরদিন পুকুর পাড়ে মাটি খুঁড়ে কেঁচো এনে দিলাম, না ইনি তাও খান না। ছোট মাছ খেতে দিলাম, তাও তার না পসন্দ্। শেষ পর্যন্ত সে দিনটাও সে কী খায়, আবিস্কার করার চেষ্টায় কেটে গেল। পরদিন তিনি আমাকে এত বড় একটা আবিস্কারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, ইহলোক ত্যাগ করলেন।

আবার জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো, যদি কোন পাখি দয়া করে। কিন্তু আমার সেই “বিভীষণ”, আবার শত্রুতা করলেন। বাবা বদলী হয়ে কলকাতা চলে এলেন। আমরা হাওড়ার কাছাকাছি একটা রেলওয়ে স্টেশনের কাছে বাড়িভাড়া নিয়ে বসবাস করতে লাগলাম। তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র।

স্টেশন থেকে রেল লাইনের পাশ দিয়ে একটা ইঁটপাতা রাস্তা গেছে। রাস্তার পাশে রেলের ঝিল। ঝিল আর রাস্তার মধ্যের ঢালু অংশটা, ছোট ছোট গাছপালা জঙ্গলে ভরা। সেখানে কত বিচিত্র সব পাখির আনাগোনা লক্ষ্য করতাম। স্কুল যাতায়াতের পথে সজাগ দৃষ্টিতে পাখির বাসার সন্ধান করতাম। একদিন ঐ পথ দিয়ে যাবার সময়, রাস্তার পাশে ঝিলের কাছাকাছি জঙ্গলের মধ্যে, হঠাৎ আমি পরশমণির সন্ধান পেলাম। একটা বেশ বড়সড় পাখি, বড় মানে বেশ বড়, জটায়ুর বংশধর হলেও হতে পারে। জঙ্গল ভেঙ্গে কাছে গিয়ে দেখি, একটা বেশ বড় পাখি পড়ে আছে। দুটো ডানা আছে, তাই পাখি বলে বুঝতে সুবিধা হ’ল। নয়তো কোন জন্তু ভাবলেও, দোষ দেওয়া যেত না। যাহোক্, কাছে গিয়ে পাখিটাকে ধরতে যেতেই, কী রকম একটা আওয়াজ করে ঠোকরাতে গেল। আবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তার কাছে যাবে কার সাধ্য।

আমার এক মাসতুতো ভাই একই বাড়ির অন্য অংশে ভাড়া থাকতো। সে আমার থেকে বছর খানেকের বড় ছিল। কিন্তু সে ছিল আমার প্রাণের বন্ধু। বাড়ি ফিরে তাকে সব কথা বলে, তাকে সঙ্গে নিয়ে আবার পাখির কাছে ফিরে এলাম। মনে বড় ভয় ছিল, পাখিটা না পালিয়ে যায়। আমার প্রাণের ভাইটির কিন্তু পাখির প্রতি কোন উৎসাহ দেখলাম না। তাই হয়, দুনিয়ায় ভাল জিনিসের কদর ক’জন করতে জানে? যাহোক্, সেও কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে পাখিটাকে দেখে, কী পাখি চিনতে পারলো না। আশ্চর্যের ব্যাপার, পাখিটা কিন্তু দাঁড়িয়ে বা বসে নেই। শুয়ে থাকার মতো কাত হয়ে পড়ে আছে। এবার পাখিটা কিছু করার আগেই, মূহুর্তের মধ্যে তার ডানা ধরে এক ঝটকায়, ওপরের রাস্তার দিকে ছুঁড়ে ফেললাম। ওঃ, মনে হ’ল এক মণ ওজনের কিছু একটা তুলে ফেললাম। পাখিটা একবারে ইঁটের রাস্তার ওপর গিয়ে পড়লো। কিন্তু উড়ে চলে না গিয়ে, আগের মতোই শুয়ে থাকলো। পাখিকে কখনও শুয়ে থাকতে দেখি নি। পাখিটা শুয়ে শুয়ে মুখ দিয়ে একটা হিংস্র আওয়াজ বার করতে লাগলো।

একটু আগে হাওড়া থেকে একটা আপ ট্রেন স্টেশনে এসে পৌঁছেছে। তখনও ই.এম.ইউ. কোচ চালু হয় নি। প্রচুর লোক অফিস ফেরৎ, ঐ ইঁটপাতা রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছে। তারা আমাদের কাছে আসলে, পাখিটাকে দেখে একজন মুখ বেঁকিয়ে বলতে শুরু করলো— “ছি ছি ছি খোকা, শকুন ধরেছো? তোমার সাহস তো কম নয়, শকুন কেউ ধরে? রাস্তা থেকে নামাও। বাড়ি ফিরে ভালো করে স্নান করে নেবে”। একটু থেমে আবার শুরু হ’ল “তোমার কী পড়াশোনা, খেলাধুলা বলে কিছু নেই? নামাও, নামাও”। এবার রীতিমতো আদেশের সুর।

এতক্ষণে পাখিটার বংশ পরিচয় জানতে পারলাম। পাখি রাস্তায় তুলেছি আমি, কাজেই রাস্তা থেকে নামানোর দায়িত্বও আমার ওপর বর্তালো। কিন্তু তখন আর পাখি, পাখি নেই, সে প্রায় সিংহ হয়ে গেছে। আমি তার ডানার কাছে একবার হাত নিয়ে যাই, আর তার ভয়ঙ্কর চিৎকারে পিছিয়ে আসি। আশপাশে অনেক লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে, এবং কী ভাবে তাকে ধরতে হবে, আমাকে গাইড করছে। আর তার সাথে সমান তালে চলছে, জ্ঞান ও কটুক্তি। এইভাবে হঠাৎ যে কায়দায় ওটাকে রাস্তায় তুলেছিলাম, সেই ভাবেই আবার এক ঝটকায় জঙ্গলে ফেরৎ পাঠালাম। জনগনের মুখেই জানলাম শকুনটা নাকি অসুস্থ। অসুস্থ হয়ে শকুন মাটিতে পড়ে গেলে, সে নাকি আর বাঁচে না। আমার আর তার বাঁচা-মরায়, কোন আগ্রহ নেই। বিফল মনোরথে বাড়ির রাস্তা ধরলাম।

তখন আমি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। অনেক নতুন নতুন বন্ধু হয়েছে। গাছে চড়া, সাঁতার কাটা, ফুটবল, ক্রিকেট, সাতগুটি, হুস্-হুস্, শীরগিজ, এইসব নিয়েই সারাদিনের অবসর সময় কাটে। একদিন একটা দেবদারু গাছের বেশ ওপরের ডালের একটা কাকের বাসা থেকে, একটা কোকিল ছানা নামিয়ে আনলাম। গায়ে সাদা ছিট্ ছিট্ দাগ। বন্ধুরা জানালো ওটা স্ত্রী কোকিল, ডাকে না। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এ কোকিলও পোষা হ’ল না। কিন্তু কোকিলের নেশা আমায় পেয়ে বসলো।

একটা বড় পুকুরে আমরা স্নান করতাম। রোজ দেখতাম দু’তিনটে কাক যাতায়াতের পথে আমার মাথার ওপর দিয়ে ছোঁ মেরে ঠুকরে দেবার চেষ্টা করতো। অথচ আর কোন ছেলেকে তারা এটা করতো না। সেই দেবদারু গাছটার পাশ দিয়ে পুকুরে যেতে হ’ত। কাকগুলো বোধহয় আমাকে চিনে রেখেছিল। শেষে একটা গামছা দিয়ে পাগড়ীর মতো মাথায় জড়িয়ে যাতায়াত শুরু করলাম।

অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই নতুন কাকের বাসার সন্ধান পাওয়া গেল। বাড়ির পাশেই, একটু দুরে একটা মঠ ছিল, শঙ্করাচার্যের মঠ। শঙ্করমঠ নামেই পরিচিত। চারিদিকে মাঠ, খোলা জমি, আম, জাম, জামরুল, নারকেল, আরও চেনা অচেনা প্রচুর বড় বড় গাছ। মাঠের ধারে একটা বেল গাছের ডালে কাক-কাকীনীর ছোট্ট বাসা। বেল গাছটার একটা জায়গা থেকে ইংরাজী ওয়াই(Y) অক্ষরের মতো, দুটো ডাল দু’দিকে বেঁকে গেছে। আর ঠিক সেই জায়গাটার একটা ডালে তাদের সুখের সংসার। একদিন, তখন বেশ গরম, ভরদুপুরে মাঠ ঘাট ফাঁকা দেখে, বেলগাছে উঠে কাকের বাসায় উকি দিলাম। তিন-চারটে বাচ্চা আমায় দেখে ঠোঁট ফাঁক করে, বোধহয় খাবারের আশায় হাঁ করে রইলো। আমি ওয়াই এর মতো দুটো ডালের সংযোগ স্থলে দাঁড়িয়ে, আলু বাছার মতো, বাচ্চাগুলোর মধ্যে থেকে বহুকাঙ্খিত পুরুষ কোকিল ছানা বাছছি। আর ঠিক তখনই তাদের বাবা-মা কোথা থেকে এসে হাজির হ’ল। দু’জনে ওয়াই এর মতো দুটো ডালের দু’দিকে বসলো। বাঁ দিকেরটাকে তাড়াতে গেলে, ডান দিকেরটা মাথায় ঠোক্কর মারে, আর ডান দিকেরটাকে তাড়াতে গেলে, বঁ দিকেরটা। এই ভাবে ঐ গরমে, চড়া রোদের মধ্যে, বেল গাছের মগডালে দাঁড়িয়ে, কয়েকটা মিঠেকড়া ঠোক্কর খেয়ে, দেখি মাথা থেকে রক্ত বেরতে শুরু করেছে। অথচ কাঁটার জন্য বেল গাছ থেকে এক নাগাড়ে কাক তাড়িয়ে, চটপট্ নেমে আসতেও পারছি না।

এরমধ্যে আবার তাদের এরকম চরম বিপদ দেখে, অল্ ইন্ডিয়া কাক এসোসিয়েশনের মেম্বাররা এসে, গাছের চারপাশে চিৎকার করে ডেকে ডেকে উড়ে বেড়াতে লাগলো। ঘাড় বেয়ে রক্ত পড়তে দেখে, রাগে একে একে সবক’টা বাচ্চাকে ওপর থেকে মাটিতে ফেলে দিলাম। ফলে তারা অবস্থাটাকে আরও উত্তপ্ত করে তুললো। কাকের চিৎকার ও আকাশে ঘুরপাক খাওয়া দেখে, দু’চারজন গাছতলায় এসে উপস্থিত হ’ল। তারা সকলেই আমাকে চেনে। বাচ্চাগুলোকে ঐ ভাবে মেরে ফেলায়, তারা আমায় তিরস্কার করতে শুরু করলো। একজন আবার আমাকে সঙ্গে করে আমার বাড়ি নিয়ে গিয়ে, নালিশ করার প্রস্তাবও পেশ করলো। কপালে দুঃখ আছে বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে গাছ থেকে নেমে, মাথা নীচু করে মাঠ ছেড়ে বাড়ির পথ ধরলাম। আমার বিপদের সময় কিন্তু এদের একজনকেও সাহায্যের হাত বাড়াতে দেখি নি।

কোকিল ছেড়ে আবার অন্যান্য পাখির সন্ধান শুরু হ’ল। রোজ স্কুল যাবার পথে একটা সরু, ভীষণ উচু নারকেল গাছের প্রায় পাতার কাছাকাছি একটা গর্তে, টিয়া পাখিকে ঢুকতে বেরতে দেখি। একদিন গাছটায় উঠে প্রায় গর্তের কাছাকাছি পৌঁছেছি, ততক্ষণে নীচে বেশ ভিড় জমে গেছে। হাওড়া ব্রীজে ওঠা পাগলের মতো আমি গাছ জড়িয়ে বসে আছি। গাছের তলার লোকগুলোর ধারণা ছিল, আমি নারকেল চুরি করতে গাছে উঠেছি। পরে তারা যখন শুনলো আমার নারকেলের প্রতি কোন আসক্তি নেই, আমি টিয়াপাখির সন্ধানে গাছে উঠেছি, তখন তারা জানালো পাখির গর্তে সাপের উপদ্রব হয়। তাদের আপত্তিতে ও নির্দেশে, শেষ পর্যন্ত দু’হাত দুরের পাখির ছানা ছেড়ে, আমায় গাছ থেকে নেমে আসতে হ’ল। আমাকে এতক্ষণে হাতের কাছে পেয়ে, তারা খুব চিৎকার চেঁচামাচি করতে শুরু করলো। আমার মনে হয় না এদের একজনও ঐ গাছের মালিক। মনের দুঃখে প্রায় দেড়-দু’ মাইল পথ হেঁটে বাড়ি ফিরে এলাম।

বাস স্ট্যান্ড থেকে যে রাস্তায় আমাদের বাড়ি যেতে হয়, তার এক জায়গায় একটু ফাঁকা মতো। সেখানে একটা মাটির বাড়িতে, বাঁশের খুঁটিতে একটা বড় গোল দাঁড়ে, বেশ বড় একটা টিয়া পাখি ঝোলানো থাকতো। একটা বিধবা বুড়ি ঐ বাড়িতে একা থাকতো বলেই জানতাম। তখন শীতকাল, সন্ধ্যার মুখে কী রকম একটা ধোঁয়াশা গোছের হয়ে আছে। চারিদিক একবারে ফাঁকা। মাটির বাড়িটার কাছে এসে হঠাৎ মনে হ’ল, এ বাড়িতে এই পাখি মানায় না। টপ্ করে পাখিটা দাঁড় সমেত খুলে নিয়ে চলে গেলে, কেউ জানতেও পারবে না। যেমন ভাবা তেমন কাজ। রাস্তার পাশে বাড়িটার বারান্দা থেকে, দাঁড়টা একটানে ওপর দিকে উঠিয়ে নিয়ে চলে আসতে গিয়েও পারলাম না। সেটা বোধহয় কোন তার দিয়ে বাঁধা আছে। মাঝ থেকে পাখিটা ভয় পেয়ে, শিকল সমেত দাঁড়ের চারদিকে ঘুরপাক খেতে লাগলো। আমিও বিপদের গন্ধ পেয়ে, খুব দ্রুত আমার রাস্তা ধরলাম।

দু’তিন দিন পরেই সুযোগ পেয়ে দাঁড়টা খুলে নিয়ে পাখি সমেত মনের আনন্দে বাড়ির পথ ধরলাম। ভগবান এতদিনে মুখ তুলে চেয়েছেন। বাড়ি গিয়ে কী গল্প বলা যায়, ভাবতে ভাবতে বাড়ির কাছে চলে এলাম। বাড়ি ফিরে এসে হাসি মুখে জানালাম এক বন্ধুর পাখি, তারা নতুন এক জোড়া টিয়া খাঁচা সমেত কিনেছে, তাই এই পাখিটা আমাকে দিয়ে দিল।

দু’টোর জায়গায় তিনটে পাখি রাখতে তাদের কী অসুবিধা ছিল, আমাকেই বা পাখিটা কেন দিল, এ সব নিয়ে কেউ কোন প্রশ্ন তুললো না। নিজের বুদ্ধির তারিফ নিজে না করে পারলাম না। কী আনন্দ, এতদিনে আমি একটা গোটা টিয়ার মালিক, তাও আবার দাঁড় সমেত। সন্ধ্যা থেকে প্রায় মাঝ রাত পর্যন্ত পাখি সেবা চললো। পরদিন স্কুলে যাবার ইচ্ছা না থাকলেও যেতে হ’ল। ফিরে এসে কিছুক্ষণ পাখি নিয়ে কাটলো। এর মধ্যে এক বন্ধু এসে খবর দিল কিছুটা দুরে, লেভেল্ ক্রসিং এর কাছে দুটো মোষ একসাথে রেলে কাটা পড়েছে। সবাই দেখতে গেছে। আমিও তার সাথে ঘটনা স্থলে গেলাম। গিয়ে দেখি বেশ ভিড়। দুটো মোষ রক্তাক্ত অবস্থায় রেল লাইনের ওপর পড়ে আছে। আমরা খুব বিজ্ঞের মতো, মোষের মালিকের মোষ বেঁধে রাখা উচিৎ ছিল, কী ছিল না, রেল কোম্পানী মোষের দাম দিয়ে দিতে বাধ্য কী না, পুলিশ মোষের মালিককে হাজতে পুরবে কী না, এই সব গুরুত্ত্বপূর্ণ আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

হঠাৎ পরিচিত একটা ছেলে আমায় জানালো, যে আমাকে একজন খুঁজছে। কে খুঁজছে জিজ্ঞাসা করায়, সে জানালো যে, একজন বুড়ো মতো লোক আমাদের বাড়ির কাছে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

আমায় আবার কোন বুড়ো মতো লোক খুঁজতে পারে, ভাবতে ভাবতে বাড়ির কাছে এসে, বাড়িতে ঢোকার মুখে ধুতি পাঞ্জাবী পরা এক বৃদ্ধ, চোখে কাচের গ্লাশের পিছনের অংশের মতো মোটা কাচের চশমা, আমাকে ডাকলেন— “এই খোকা শোন”।

এই বৃদ্ধকে রাস্তাঘাটে প্রায়ই দেখি। “আমায় ডাকছেন”?

“হ্যাঁ বাবা, তোমাকেই বলছি”।

“বলুন”।

“বাবা, পাখিটা কোথায়’?

শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। তার মানে সাক্ষী রয়ে গেছে। “কোন পাখির কথা বলছেন”?

“তুমি জান বাবা, কোন পাখির কথা বলছি। দেখ, বিধবা বুড়ির আর কেউ নেই। ঐ পাখিটাকে সন্তানের মতো মানুষ করেছে। বহুদিনের পাখি, ওটা দিয়ে দাও। বাবা-মাকে বল, তাঁরা নিশ্চই তোমায় পাখি কিনে দেবেন”। বৃদ্ধের মুখ থেকে কথাগুলো যেন বিনয়, ভদ্রতা ও করুণা ধারায় সিক্ত হয়ে বার হয়ে এল।

এই সব কথা বলতে বলতে, তিনি ক্রমশঃ আমাদের বাড়ির দরজার কাছাকাছি এগিয়ে এসেছেন। তাঁকে আর এগতে দেওয়া যায় না। এত জোরে কথা বলছেন, যে বাবার কানে যাবার উপক্রম।

আপনি একটু অপেক্ষা করুন বলে পাখিটা নিয়ে আসতে গেলাম। চটপট্ একটা গল্পও তৈরী করে ফেললাম। মা কে বললাম, “যে বন্ধু পাখিটা দিয়েছিল, সে তার বাবাকে না বলে আমাকে পাখিটা দিয়েছিল। তার বাবা এখন পাখিটা ফেরৎ চাইছেন”। আর কথা না বাড়িয়ে, পাখিটা নিয়ে এসে বৃদ্ধকে ফেরৎ দিয়ে দিলাম। বৃদ্ধ পাখি নিয়ে ফিরে যাবার আগে, আবার বাবা-মা’র কাছে পাখি কিনে দেবার কথা বলতে বলে গেলেন।

আমি আবার পাখিহারা হয়ে গেলাম। যাতায়াতের পথে দেখতাম আমাকে নিঃস্ব করে, পাখি তার নিজস্ব ভিটেয় নির্বিঘ্নে অবস্থান করছেন।

আমার সাথে শ্যামা নামে একটা ছেলে, আমার স্কুলে একই শ্রেণীতে পড়তো। তার বাবা ছিলেন অত্যন্ত বদরাগী। সে আমার বাড়ির প্রায় পাশেই থাকতো। শ্যামার চেহারার সাথে আমার চেহারার খুব মিল ছিল। গায়ের রঙও প্রায় একই রকম। একদিন শ্যামা স্কুল যাবার পথে, হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করে বসলো— “কী ব্যাপার বলতো, ষষ্ঠীতলা দিয়ে গেলেই, দলে দলে বাচ্চা ছেলে আমার পিছন পিছন হাততালি দিয়ে, পাখি চোর, পাখি চোর বলতে বলতে যায়”?

শুনে আঁতকে ওঠার মতো কথা হলেও, বোকার মতো মুখ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। যেন কিছুই বুঝতে পারছি না। মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালাম, প্রায় আমার মতোই দেখতে এ জগতে আরও একজনকে প্রায় একই সময় সৃষ্টি করে, আমার বাড়ির কাছাকাছি পাঠাবার জন্য। এ লান্ছনা তো আমারই প্রাপ্য ছিল।

 

সুবীর কুমার রায়।

২৩-০৬-২০০৬

 

Advertisements

4 thoughts on “পাখি {লেখাটি ইচ্ছামতী ও দাশুর ডাইরি থেকে, সন্দেশ , Sahitya Sarani (সাহিত্য সরণি) , সুপ্ত প্রতিভা-Supta Protibha , প্রতিলিপি , বই পোকার কলম, বাংলায় লিখুন ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত।}

    • শীরগিজ খেলাটার সঠিক নিয়ম-কানুন এত বছর পরে, এই বুড়ো বয়সে আর মনে করতে পারি না। তবে মাঠে দাগ কেটে বেশ বড় বড় ঘর কেটে, একদিক থেকে অপর দিকে অপর পক্ষের ছোঁয়া বাঁচিয়ে যেতে হতো। এই খেলাটা ভিন্ন নামে অন্যত্র পরিচিত ছিল। মেয়েদের যেমন এক্কাদোক্কা খেলাটা অত্যন্ত প্রিয় ছিল, অল্প বয়সে এই শীরগিজ, সাতগুটি, পিট্টু, হুসহুস খেলাগুলো আমাদের প্রাণ ছিল। আজ মাঠ বা খোলা জায়গার অভাবে ছেলেরা এই খেলাগুলো ভুলতে বসেছে, কিন্তু মেয়েরা কেন আর এক্কাদোক্কা খেলে না বুঝতে পারি না। একসময় এই খেলাটাতো মেয়েদের জাতীয় খেলা ছিল বললেও ভুল বলা হয় না। খেলতেও সামান্য জায়গা লাগে, বাড়ির দালানেও খেলা যায়। ভাবলে খারাপ লাগে, খারাপ লাগে কারণ এই খেলা যে ছোট বোনেদের সাথে আমরাও খেলেছি। আমরা বোধহয় আজ সত্যিই সাহেব হয়ে গেছি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s