“মিঠুকাকা” {লেখাটি বেড়ানোর গল্পছবি, ‎Right There Waiting for you…., Tour Picture & Tour Information… , Tour & Tourists , সুপ্ত প্রতিভা-Supto Protibha, ও প্রতিলিপি পত্রিকায় প্রকাশিত।}

Self (15)না তার নাম কী আমার জানা নেই, তবে মিঠু নয়। আর সে আমার কাকা-ও নয়। তবে গোটা এলাকা তাকে মিঠুকাকা নামেই চেনে, ঐ নামেই সে পরিচিত, কারণ সে মিঠুর কাকা। মিঠু তার ভাইঝি, বাড়ি নেপালে। সান্দাকফু-ফালুট যাবার পথে, ১৯৮৫ সালে আমি ও আমার দুই সঙ্গী, পীযুষ দা ও দিলীপের সাথে মানেভঞ্জন-এ মিঠুকাকার প্রথম আলাপ। অল্প বয়স, হয়তো বছর বাইশ-তেইশ হবে। কর্মসুত্রে মানেভঞ্জনেই বসবাস করে। সে আমাদের গাইড কাম কুলি হিসাবে আমাদের সাথে সান্দাকফু হয়ে ফালুট যাবে। আমাদের সাথে তার যাওয়া পাকা হলে, সে কাঠ ও প্রয়োজনীয় টুকিটাকি কিছু কেনার জন্য কিছু টাকা নিয়ে পরদিন সকালে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে গেল। তাকে আজ ঊনত্রিশ বছর পরেও ভুলতে না পারার কারণ, এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

আমরা সকালে বেশ বেলায় মানেভঞ্জনে এসে পৌঁছেছি। প্রথম দর্শনেই জায়গাটা বেশ ভালো লেগে গেল। আজ আমরা এখানেই থাকবো। থাকার ব্যবস্থা পাকা করে, রাস্তার পাশের এক টিবেটিয়ান মহিলার দোকানে চা খেয়ে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে, স্নান সেরে ঐ দোকানেই দুপুরের আহার সারতে গেলাম। আমাদের ডাল, ভাত, সবজী, আর ডিমের কষা পরিবেশন করা হ’ল। ভারী উপাদেয় খাবার, খুব তৃপ্তি সহকারে খাওয়া শেষ করে, ঘরে ফিরে এলাম। বিকালে চা খেয়ে জায়গাটা এক চক্করে ঘুরে নিলাম।

রাতে ঐ দোকানেই রাতের খাবার খেতে গিয়ে রুটি আর অতি উপাদেও সেই ডিম কষার অর্ডার দিতে গিয়ে জানা গেল, ডিম কষা পাওয়া যাবে না। আমরা রুটি মাংসের অর্ডার দিয়ে বসে আছি। কিছুক্ষণ বাদে বাদেই স্থানীয় মানুষ দোকানে ঢুকে তাদের ভাষায় কী বলছে বুঝতে পারছি না, কিন্তু লক্ষ্য করছি বাঁশকে কেটে ফুলদানির আকারে তৈরী করা পাত্রে জোয়ানের মতো একরকম বীজ দিয়ে, তাতে গরম জল ঢেলে তাদের দেওয়া হচ্ছে। স্ট্র দিয়ে পরম তৃপ্তিতে তারা সেই পানীয় পান করছে। শেষ হয়ে গেলে ঐ পাত্রে আবার নতুন করে গরম জল ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। অনেকক্ষণ পরে আমাদের রুটি মাংস পরিবেশন করা হ’ল। অনেকগুলো করে মাংসের টুকরো, খেতেও মন্দ না। হঠাৎ নজরে পড়লো পায়ের কাছে বেঞ্চের নীচে একটা কুকুর শুয়ে আছে। আগে লক্ষ্য করিনি, করলে কখনই ঐ জায়গায় বসতাম না। কারণ তার যা গতর, কামড়ালে সাত চোদ্দং আটানব্বইটার কম ইঞ্জেকশনে কিছু কাজ হবে বলে মনে হয় না। কুকুরটাকে পায়ের কাছ থেকে সরিয়ে দেবার জন্য মহিলাটিকে বলেও কোন লাভ হ’ল না। খদ্দেরের থেকে তার কুকুর প্রীতি অনেক বেশী বলে মনে হ’ল। তিনি দৃঢ়তার সাথে জানালেন, এ কুকুর কামড়ায় না।

যাহোক রুটি মাংস যখন প্রায় শেষ করে এনেছি, তখন মাংসের প্লেটের দাম শুনে জানা গেল এটা গরুর মাংস। কোনরকম রাখঢাক না করে মহিলাটি পরিস্কার জানালো যে এটা বীফ আছে, এ অঞ্চলে সর্বত্রই বীফ দেওয়া হয়, কেউ স্বীকার করে কেউ করে না। আমাদের প্রত্যেকের পাতেই তখনও দু’এক টুকরো করে মাংস আছে। পীযুষদা খুব চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো কী করা উচিৎ। আমার এটা অনেকদিন আগেই জেনে বুঝে চেখে দেখা আছে, তাই বললাম “জাত যদি যাবার হয় তাহলে এক টুকরো খেলেও জাত যাবে, সবটা খেলেও যাবে। কাজেই ঐ দু’এক টুকরো ফেলে রেখে লাভ নেই, ওতে জাতও যাবে পয়সাও যাবে”। আমরা আবার খাওয়া শুরু করলাম। আমি এবার ঐ বাঁশের পাত্রে পরিবেশন করা পানীয়টি দেখিয়ে মহিলাটিকে জিজ্ঞাসা করলাম ওটা কী? মহিলাটি জানালো ওটা তুম্বা আছে। তুম্বা কী জিনিস বুঝতে না পারায়, মহিলাটি এবার অপর কী একটা নাম বললো। বোঝ, এত “আদ্যানাথের নাম শোননি? খগেনকে তো চেনো?……” গোছের ব্যাপার দেখছি। শেষে জানা গেল এটা একটা নেশার বস্তু। মুনিয়া পাখির খাদ্য কাই দানার মতো একপ্রকার  বীজে গরম জল ঢেলে জলটা স্ট্র দিয়ে পান করা হয়। আরও জানা গেল যে, এটা হোমিওপ্যাথি ওষুধের  মতো যত ডাইলিউট্ হয়, তত নেশার মাত্রা বাড়ে। তাই একবার জল শেষ হলে আবার নতুন করে জল ঢেলে ঢেলে, বার বার খাওয়ার প্রথা প্রচলিত। সব শুনে একটা তুম্বার অর্ডার পেশ করলাম। কষা কষা হাল্কা  গরম জল স্ট্র দিয়ে খেয়ে, তুম্বার কোন খাদ্যগুণ বা মাহাত্ম্য বুঝলাম না। ঘরে ফিরে এসে মালপত্র গোছগাছ করে শুয়ে পড়লাম।

বেশ সকালে মিঠুকাকা এসে হাজির হ’ল। আমরাও তৈরী। আর এক দফা চা খেয়ে মালপত্র নিয়ে রাস্তায় নামলাম। সারাদিন পথ চলে পড়ন্ত বিকেলে আমরা সান্দাকফু টুরিষ্ট লজে এসে পৌঁছলাম। সারাটা দিন মিঠু কাকা আমাদের মালপত্র পিঠে নিয়ে, কথা বলতে বলতে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। ছেলেটা বেশ ভালো ও ভদ্র। আমাদের তাকে বেশ পছন্দও হয়েছে। টুরিষ্ট লজটা বেশ ভালো। দরজা দিয়ে ঢুকে একটা লম্বা বারান্দার মতো প্যাসেজ। প্যাসেজের ঠিক ডান পাশে একটা দরজা দিয়ে ঢুকে, একটা বেশ বড় ঘর। বাইরের  দরজার ঠিক সামনে, প্যাসেজটাতে আর একটা দরজা। ঐ দরজা দিয়ে ঢুকে আর একটা ঘর। প্যাসেজের একবারে বাঁপাশে একটা ঘর দেখলাম সবাই রান্নাঘর হিসাবে ব্যবহার করে। মিঠুকাকা রান্নাঘরে কাঠের টুকরো ও অন্যান্য রান্নার সাজ সরঞ্জাম গুছিয়ে রেখে এল। আমরা ততক্ষণে ডানপাশের বড় ঘরটায় জায়গা দখল করে গুছিয়ে বসেছি। রেলের থ্রী টায়ার বগির মতো বিছানার ব্যবস্থা। অনেকগুলো বেড। অর্থাৎ প্রতিটা সিঙ্গল বেড কী সুন্দর আরামে তিনজনের রাতে শোবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গোটা টুরিষ্ট লজটায় আমরাই তিনজন টুরিষ্ট।

হঠাৎ বাইরে হৈচৈ শুনে কী হয়েছে দেখতে যাবার আগেই, এক দঙ্গল বাচ্চা বাচ্চা ছেলে হৈহৈ করে প্যাসেজে ঢুকে এল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এরা কোন স্কুল থেকে এসেছে। একটু পরেই একজন যুবক এসে ঢুকলেন। বাচ্চাগুলো দার্জিলিং এ কোন স্কুলে পড়ে, যুবকটি ঐ স্কুলের শিক্ষক, বাচ্চাগুলোকে নিয়ে সান্দাকফু ট্রেক  করতে এসেছেন। যুবকটি আমাদের পাশের, অর্থাৎ প্যাসেজে ঢোকার দরজার ঠিক সামনের ঘরটায় বাচ্চাগুলোকে নিয়ে ঢুকলেন। পরমুহুর্তেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের বললেন, “সঙ্গে অনেকগুলো বাচ্চা আছে, আপনারা যদি পাশের ঘরটায় চলে যান তাহলে এই ঘরটায় সবকটা বাচ্চা নিয়ে থাকতে পারি”। আমরা মালপত্র নিয়ে পাশের ঘরে চলে এলাম। এই ঘরটায় একটু দুরত্বে পাশাপাশি দুটো বেড ও তারপাশে একটু নীচের দিকে দরজার দিকের দেওয়ালের কাছে আর একটা বেড। অর্থাৎ ন’জনের শোবার ব্যবস্থা। এই বেডটার অপর দেওয়ালে একটা বন্ধ দরজা ও তারপাশে একটা আলমারি রাখা আছে। একবারে ডান পাশের বেডটার দোতলায়, বা মিডল্ বার্থটা পীযুষদা দখল করে নিল। ঠিক তার পাশের বেডটার মাঝের বার্থের দখল আমি নিলাম। আমার পায়ের নীচে দরজার দিকের দেওয়ালের কাছের বেডটার মাঝের বার্থটা দিলীপ নিল ও দিলীপের বেডের একতলা বা লোয়ার বার্থটা মিঠুকাকা দখল করলো।

সন্ধ্যার পর মিঠুকাকা কাঠের আগুনে আমাদের কফি করে দিয়ে খিচুড়ি বসালো। আমরা তিনজন কফির পেয়ালা হাতে নিজেদের ঘরে গুলতানি করছি। পাশের ঘর থেকে বাচ্চাগুলোর হৈচৈ এর আওয়াজ আসছে।  শিক্ষকটি তাদের আস্তে কথা বলতে বলছেন। আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে মিঠুকাকা এসে খবর দিল— রান্না হয়ে গেছে। আমরা জানালাম আমরা কিছুক্ষণ পরে খাব। মিঠুকাকা কিন্তু চলে না গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম সে কিছু বলতে চায় কী না। সে তাকে একটা টাকা দিতে অনুরোধ করলো। এক টাকা নিয়ে সে কী করবে জিজ্ঞাসা করায়, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে জানালো যে, সে ঐ টাকা দিয়ে  তুম্বা খাবে। তার হাতে দু’টো টাকা দিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে বললাম। সে জানালো যে সে একটু পরেই ফিরে এসে আমাদের খেতে দেবে। সে চলে গেল, আমরাও আবার জমিয়ে গল্পগুজবে মত্ত হয়ে গেলাম।

শিক্ষক ভদ্রলোকটি আমাদের ঘরে এসে বললেন, “আপনাদের রান্না হয়ে গেছে? এবার তাহলে আমরা খিচুড়ি বসাই? আর একটা কথা, আপনাদের জ্বালানো কাঠে এখনও যা আগুন আছে তাতে আমাদের খিচুড়ি রান্না হয়ে যাবে। কাঠের আগুনটা নষ্ট করে কী হবে, আমরা কী ঐ আগুনে আমাদের খিচুড়িটা বসাতে পারি”? আমাদের কাঠের আগুন যে এখনও জ্বলছে তা আমরা জানতামও না। ভদ্রলোককে বললাম, “এতে জিজ্ঞাসা করার কী আছে, ঐ আগুনেই খিচুড়ি চাপিয়ে দিন। প্রয়োজন হলে আরও কিছু কাঠ নিতেও পারেন”। ভদ্রলোক রান্নাঘরে চলে গেলেন। কিছু পরেই শুরু হ’ল বাচ্চাদের চিৎকার। হয়তো জীবনে প্রথম নিজেরা রান্না করার আনন্দের বহিপ্রকাশ। একটু পরে শিক্ষক ভদ্রলোক আমাদের ঘরে এসে ধন্যবাদ জানালেন। এত অল্প সময়ে কী ভাবে রান্না শেষ হ’ল জিজ্ঞাসা করায় ভদ্রলোক বললেন, “বাচ্চাগুলোর সাথে কথা বলাই আছে যে সমস্ত কিছু নিজেদের করতে হবে। এটাই প্রথা। মোটামুটি দেখিয়ে দিয়ে বলে আসলাম যে, তোমাদের রান্না  করা খিচুড়ি তোমাদেরই খেতে হবে, কাজেই ভাল করে রান্না কর। অসুবিধা হলে আমায় ডাকবে”। বললাম,   “অতটুকু বাচ্চারা নিজেরা কাঠের আগুনে রান্না করবে, কোন বিপদ না হয়”। ভদ্রলোক বললেন, “কিচ্ছু হবে না। আমি মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসবো, ওদের শেখার সুযোগ তো দিতে হবে”। ভদ্রলোক নিজের ঘরে চলে গেলেন।

অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল, মিঠুকাকা কোথায় গেছে কে জানে, ফেরার নাম নেই। আমরা কয়েকবার বাইরের দরজার কাছ থেকে মিঠুকাকার নাম ধরে চিৎকার করেও কোন জবাব পেলাম না। পাশের রান্নাঘর থেকে চিৎকার চেঁচামিচি, হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। আমরা মিঠুকাকাকে খুঁজতে যাব কিনা ভাবছি, এমন সময় মিঠুকাকা ঘরে ফিরে এল। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। দু’-এক টাকার   তুম্বায়, তার এই দশা কী করে হ’ল বোঝ গেল না। সে আমাদের খাবার দেবার জন্য রান্নঘরের দিকে পা  বাড়ালো। পরমুহুর্তেই সে চিৎকার করতে করতে প্রায় ছুটে ঘরে ফিরে এল, এবং এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে, তার নিজের ব্যাগ হাতড়ে বেশ বড় একটা ভোজালি, ওটাকে বোধহয় কুকরী বলে, বার করে “হামলোগোকা লকড়ি চুরি কিয়া, সবকো আভি মার দুঙ্গা শালা” বলতে বলতে আবার রান্নাঘরের দিকে ছুটলো। আমি তাকে দু’বার বারণ করা সত্ত্বেও সে আমার কথায় কর্ণপাত না করে এগিয়ে গেল। আমাদের ঘর থেকে রান্নাঘরের দুরত্ত্ব হয়তো পনের ফুট মতো হবে। ডান হাতে ভোজালি বাগিয়ে ধরে তার ছোটা দেখে এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু সে রান্নাঘরের এত কাছে চলে গেছে, যে দৌড়ে গিয়ে তাকে বাধা দেবার আগেই সে রান্নাঘরে পৌঁছে যাবে। খুব জোরে চিৎকার করে তার নাম ধরে ডেকে, তাকে থামাবার শেষ চেষ্টা করলাম। সে একটু থতমত খেয়ে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে পড়লো। তার হাতে সাপের ফণার মতো উদ্বত ভোজালি। তাকে অনেক বুঝিয়ে আমাদের ঘরে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও, সে তখনও রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সব শালাকো খুন পী লুঙ্গা ইত্যাদি বলে যাচ্ছে।

এতক্ষণে গোটা ব্যাপারটা পরিস্কার হ’ল। বাচ্চাগুলো আমাদের কাঠের আগুনে রান্না করছে দেখে ওর মাথা গরম হয়ে গেছে। যাহোক অনেক কষ্টে, অনেক চেষ্টায়, তাকে শান্ত করে ঘরে বসালাম। কিন্তু সে তার ভোজালিটা তার ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে, ঘরে বসে বসেই মাঝে মাঝে উত্তেজিত হয়ে রান্নাঘরে যাবার চেষ্টা করছে দেখে, আমি উঠে গিয়ে পাশের ঘরটায় গিয়ে দেখি অল্প কয়েকটা ছেলেকে নিয়ে শিক্ষক ভদ্রলোক ঘরে বসে আছেন। তাকে সব কথা বলে রান্নাঘরে যেতে অনুরোধ করলাম। ভদ্রলোক বললেন, “অধিকাংশ নেপালি কুলিই এই জাতীয় হয়। রোজগারের অধিকাংশ টাকায় নেশা করে, আর নেশা করে মাথা ঠিক রাখতে পারে না। আপনি চিন্তা করবেন না, আমার ছেলেরাই ওকে সোজা করে দেবার পক্ষে কাফী। তাছাড়া আমি তো আছি। আপনারা টেনশন করে টুর নষ্ট করবেন না। নিশ্চিন্তে টুরটা এনজয় করুন। একটু পরে বাচ্চাগুলো খাবার দাবার নিয়ে তাদের ঘরে চলে গেল। আমরা মিঠুকাকাকে আমাদের খাবার দিতে বললাম। মিঠুকাকা ঘরে খিচুড়ি নিয়ে এসে আমাদের খেতে দিল। আরও বেশ কিছু পরে যে যার বিছানায় আশ্রয় নিলাম।

রাত তখন কত বলতে পারবো না, হঠাৎ কিরকম একটা গোঙানি মেশানো কান্নার আওয়াজে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে তীব্র অ্যালকহলের গন্ধ। কান্নার আওয়াজটা আমার ডানপাশে পায়ের দিকে,  দিলীপের বিছানার কাছ থেকে আসছে। ঐ বিছানার একতলায়, অর্থাৎ লোয়ার বার্থে মিঠুকাকা শুয়েছে, মিডল্ বার্থে দিলীপ। ঘুম চোখে অন্ধকারে মনে হ’ল মিঠুকাকা নিশ্চই ড্রিঙ্ক করেছে। কিন্তু ড্রিঙ্ক করলোটা কখন, আর পেল-ই বা কোথায়? সে তো বাইরে থেকে খালি হাতে ফিরলো, তাহলে কী তার ব্যাগে মদের বোতল ছিল? পীযুষদার ব্যাগে অবশ্য একটা শিল্ড বোতল আছে। তাহলে কী সে ঐ বোতল ভেঙ্গে সাবাড় করেছে? নাঃ, আর চুপ করে শুয়ে থাকা যায় না। খুব নীচু গলায় পাশে পীযুষদাকে ডাকলাম। তার কাছে টর্চটা আছে। এক ডাকেই পীযুষদাও খুব নীচু গলায় উত্তর দিল। আমি টর্চটা চাইলাম। অন্ধকারেই টর্চটা হাত বদল হ’ল। আমি অন্ধকারে আন্দাজে মিঠুকাকার বিছানা তাক করে তীব্র আলো ফেললাম।

ভেবেছিলাম মিঠুকাকাকে বোতল হাতে মাতাল অবস্থায় দেখবো। কিন্তু মাতাল হলেই বা সে কাঁদবে কেন? হাতে ভোজালিটা নেই তো? কিন্তু তীব্র টর্চের আলোয় দেখলাম, মিঠুকাকা তার বিছানায় বসে একপায়ে উল্টো জুতো পরে অপর পায়ে আর একপাটি জুতো পরার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই সফল হচ্ছে না। এরকম একটা নিরামিষ দৃশ্য দেখার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিলাম না। হঠাৎ চোখে তীব্র আলো পড়ায় ও হাত দিয়ে চোখ গার্ড করে, ঐ অবস্থায় উল্টো দিকের আলমারির পাশে বন্ধ দরজার কাছে গিয়ে দরজাটা খোলার চেষ্টা শুরু করলো। আমি ওর চোখ থেকে টর্চের আলো না সরিয়ে লাফ দিয়ে মাটিতে নামলাম।

মিঠুকাকার কাছে গিয়ে তাকে ধরে কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করায়, সে জানালো সে বাইরে পেচ্ছাপ করতে যাচ্ছে।  সে নিজে একা একা যাবে কী, তার তো ভাল করে হাঁটার মুরদ নেই, তার ওপর বাইরে যাবার দরজা পর্যন্ত সে চিনতে পারছে না। তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে ঘরের দরজা খুলে প্যাসেজে এসে, বাইরে যাওয়ার দরজা খুললাম। বাইরে নিয়ে গিয়ে একপাশে দাঁড় করিয়ে দিয়ে এক ছুটে ঘরে ঢুকে ওর ব্যাগ থেকে ভোজালিটা বার করে নিলাম। আমার ব্যাগেও চামড়ার খাপে বেশ বড় ও মজবুত একটা ছুরি আছে। এটা আমি সব জায়গায় সঙ্গে নিয়ে যাই। এটা দিয়ে সবজী কাটা, বা আত্মরক্ষার্থে ব্যবহার করার পক্ষে আদর্শ। দরকারে বন্য পশু, এমনকী মানুষ পর্যন্ত কাটা যাবে। আমার ব্যাগ থেকে সেটাও বার করে নিয়ে, দুটোই আমার বালিশের নীচে রেখে আবার বাইরে এলাম। তাকে ধরে ধরে বাইরের দরজা দিয়ে প্যাসেজে ঢুকে বাইরের দরজা বন্ধ করার আগেই, সে ডানপাশে বাচ্চাদের ঘরটার বন্ধ দরজায় খুব জোরে লাথি মারতে শুরু করলো। কোনরকমে তাকে ঘরে এনে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। অনেকক্ষণ জেগে জেগে শুয়ে থেকে কখন ঘুম এসে গেল জানি না।

ভোরে সম্পূর্ণ সুস্থ মিঠুকাকাকে নিয়ে আবার পথ চলা। ফালুটে এসে পীযুষদা, নিউ জলপাইগুড়ি থেকে কেনা একটা সুন্দর দেখতে হুইস্কির বোতলে নানারকম ফুল সাজিয়ে টেবিলে রাখলে, আমি বারণ করলাম। মিঠুকাকা এটা দেখুক আমার ইচ্ছা নয়। কিন্তু জায়গার গুণেই বোধহয়, পীযুষদার মধ্যে একটা কবি কবি ভাব জেগে  উঠেছে। সে টেবিলে সেটা সাজিয়ে রাখবেই। যথারীতি মুখে কিছু না বললেও, মিঠুকাকা সেটা দেখলো।

ফেরার পথে বিকালের দিকে আমরা রিম্বিক এ এসে হাজির হলাম। এখানেই আমরা রাত কাটাব। এক এক্স-মিলিটারির একটা লজে একটা ঘর ভাড়া নেওয়া হ’ল। মালপত্র গুছিয়ে রেখে আমরা বাইরে এলাম। আজ আর কোন রান্নার পাট নেই। বাইরে ছোটখাটো যথেষ্ট খাবার দোকান আছে। আমাদের কারো ইচ্ছা নয় যে মিঠুকাকা আমাদের সাথে রাতে একঘরে থাকে। লজের মালিককে আলাদা করে ডেকে সব বলে মিঠুকাকার জন্য রাতে আলাদা শোয়ার একটা ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করলাম। তাঁকে আরও অনুরোধ করলাম যে, তিনি যেন আমাদের ইচ্ছার কথাটা মিঠুকাকাকে না জানান। তিনি রাজী হতে আমরাও নিশ্চিন্ত হলাম।

সন্ধ্যার বেশ পরে হঠাৎ মিঠুকাকা সন্তানহারা পিতার মতো অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে আমাদের ঘরে ঢুকে যা বললো, শুনে তো আমরা থ। মিঠুকাকার বক্তব্য, সে আমাদের জন্য কী করে নি? পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে, রান্না করে খাইয়েছে, সমস্ত বোঝা নিজের পিঠে করে বয়ে নিয়ে গেছে, শুধু আমাদের নির্বিঘ্নে, বিনা কষ্টে, নিরাপদে ঘুরিয়ে আনার জন্য। আর আমরা তার প্রতিদানে তাকে একটা রাত আমাদের সাথে একঘরে থাকতে দিলাম না। শুনে খুব খারাপ লাগলো। আরও খারাপ লাগলো লজ মালিকের ব্যবহার দেখে। কে তাকে এ কথা বলেছে জিজ্ঞাসা করায় মিঠুকাকা জানালো লজ মালিক তাকে বলেছে যে আমরা লজ মালিককে বলেছি তার জন্য রাতে থাকার একটা আলাদা ব্যবস্থা করতে, কারণ আমরা তার সাথে এক ঘরে থাকতে চাই না। মিঠুকাকাকে বললাম, “আমরা ঠিক তা বলি নি। আমরা বলেছি ঘরটা ছোট, চারজনের রাতে শুতে কষ্ট হবে তাই অন্যত্র একটা বেডের ব্যবস্থা করতে। ঠিক আছে তুমি এ ঘরে থেকে যাও, আমি তোমার জায়গায় শুতে চলে যাচ্ছি”। সে এবার একটু শান্ত হয়ে আলাদা থাকতে রাজী হ’ল।

পরদিন তাকে টাকা মেটাবার আগে জিজ্ঞাসা করলাম, সান্দাকফুতে কেন সে ঐ রকম করলো। সে খুব লজ্জা পেয়ে গেল বলে মনে হ’ল। সে জানালো মিঠু নামে তার এক ছোট্ট ভাইঝি ছিল। সে তাকে খুব ভালবাসতো। তাই সবাই তাকে মিঠুকাকা বলে ডাকে। সেই ভাইঝি হঠাৎ কঠিন অসুখে মারা যায়। তারপর থেকে সে কোন রাতে ঘুমতে পারে না। ভাইঝির কথা ভেবে তার ভীষণ কষ্ট হয়, তাই কষ্ট ভুলে থাকতে, রাতে একটু ঘুমবার জন্য সে তুম্বা খায়, দারু খায়। কিন্তু তবু তার রাতে ঘুম আসে না। প্রতিটা রাতই সে প্রায় না ঘুমিয়ে জেগে কাটায়।

তাকে কিছু বেশী টাকা দিয়ে, দারু বা তুম্বা খেতে বারণ করে, দেশ থেকে একবার ঘুরে আসার উপদেশ দিয়ে হাত মিলিয়ে বিদায় নিলাম। সেই শেষ দেখা, তবু তার স্মৃতি আজও বয়ে বেড়াচ্ছি।

                             —–O—–

সুবীর কুমার রায়।

১২-১০-২০১৪

Advertisements

6 thoughts on ““মিঠুকাকা” {লেখাটি বেড়ানোর গল্পছবি, ‎Right There Waiting for you…., Tour Picture & Tour Information… , Tour & Tourists , সুপ্ত প্রতিভা-Supto Protibha, ও প্রতিলিপি পত্রিকায় প্রকাশিত।}

  1. মিঠুকাকা আসলে ছেলেটা ভালো। মানসিক কষ্টে গোলমাল করে ফেলেছিল। ভলোই লাগলো।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s