“পাহাড়ের রোজনামচা”–তৃতীয় পর্ব {লেখাটি www.amaderchhuti.com ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

 

 

DSCN9767একটা  ব্রিজ  পার  হয়ে  তীরথের  কাছে  এসে  হাজির  হলাম।  বিরাট  এলাকা  নিয়ে  এই  ফুলরাজ্য।  এখান থেকে  ঘাংরিয়ার  দুরত্ব,  প্রায় সাড়ে  তিন  কিলোমিটার।  তবে  ভালোভাবে  নন্দন  কাননকে  দেখতে  হলে, আরও  দেড়-দুই  কিলোমিটার  পথ  এগতে  হবে।  এক  হাত থেকে  এক  বুক  পর্যন্ত  ফার্ণ  জাতীয়  গাছের মধ্যে  দিয়ে  পায়ে  হেঁটে  ঘুরতে  হবে।  দুর  থেকে  সবুজ  বন বলে  মনে  হবে।  দু’হাত  দিয়ে জঙ্গল  সরিয়ে  বনের মধ্যে  না  ঢুকলে,  ফুল  পাওয়া  যাবে  না।  বেশিরভাগ  ফুলের  আকারও  খুব   ছোট   ছোট।  বই এ পড়েছিলাম, এখানে  জোঁকের  উপদ্রব  খুব   বেশি।  একটা  সরু  ঝরণার  মতো  জলের  ধারার  জল  খেয়ে, আমরা  বনে  প্রবেশ  করলাম।  বুঝতেই পারছি  সমস্ত  জামা  প্যান্ট   ভিজে  যাবে।  বর্ষাতি  গায়ে  থাকায়, শুধু  প্যান্ট   ভিজতে  শুরু  করলো।  এক  এক  রঙের  ফুল,  এক  এক  জায়গায়  ফুটে  আছে।  কী  তাদের রঙ।  মনে  হয়  যেন  ফুলের  রঙ  অনুযায়ী  ফুলের  গাছ  বিভিন্ন  জায়গায়  লাগানো  হয়েছে।  মাইকের  চোং এর  মতো   দেখতে  একরকম  ফুল   দেখলাম।  যত  রঙ,  যত  কারুকার্য,  সব  ফুলের  ভিতরের  অংশে, ফুলের  বাইরেটা   কিরকম  বিশ্রী  ফ্যাকাশে   সবুজ  রঙের।  চারিদিকে  একরকম   হলুদ  ও  সাদা  রঙের ফুলের  ঝাড়  চোখে  পড়ছে।  রজনীগন্ধার  মতো  বড়  বড়  ডাঁটার  ওপর  থোকা  থোকা  ফুল,  অনেকটা এলাকাকে  হলুদ  বা  সাদা  করে,  সব  গাছের  ওপরে  মাথা  তুলে  দাঁড়িয়ে  আছে।  উপত্যকার  চারিদিকের পাহাড়ের  ওপরেও  সবুজ  বনের  রাজত্ব।  ওখানেও  হয়তো  এইসব  ফুল  পাওয়া  যাবে,  হয়তো  এর  থেকেও সুন্দর  ফুলেরা  লোকচক্ষুর  আড়ালে  ওখানেই  বসবাস  করে।  তীরথ  তার  মা,  ও  বোনকে  দেখাবার  জন্য যেসব ফুল  হেমকুন্ড  সাহেবে  দেখে  নি,  সেইসব  ফুল  তুলে  সংগ্রহ  করতে  শুরু  করলো।  এখানে  কিন্তু ব্রহ্মকমল  পাওয়া  যায়  না।  বিস্তীর্ণ  এলাকা  ঘুরেও,  আমাদের  অন্তত  একটাও   চোখে  পড়ে  নি।  সম্ভবত এখানকার  উচ্চতা  হেমকুন্ডের  তুলনায়  অনেক  কম   বলে,  এই  অঞ্চলে  এই  ফুল   ফোটে  না।   হেমকুন্ডে আরও  কিছু  ব্রহ্মকমল  তুলবার  ইচ্ছা  ছিল,  কিন্তু  দিলীপ  ও  মাধব  বলেছিল,  আজ  না  তুলে  আগামীকাল বরং  নন্দন  কানন  থেকে  তুলে  নেওয়া  যাবে।  শুধু  শুধু  আগে  থেকে  তুলে  শুকনো  করার  দরকার  কী? এখন  আফসোস  হচ্ছে।  এখন  হাজার  চেষ্টা  করলেও  আর  পাওয়া  যাবে  না।

হেমকুন্ডে  একরকম  বেগুনি  রঙের  দোপাটির  মতো  ফুল   দেখেছিলাম,  এখানে  সেই  ফুল  অজস্র  ফুটে  আছে,  তবে  সব  হলুদ  রঙের। এবার  বর্ষা   অনেক  দেরিতে  এসেছে,  এখনও  আসেনি  বললেই  ঠিক  বলা  হবে।  তাই  সব  ফুল  এখনও  ফোটে  নি।  অদ্ভুত  অদ্ভুত  সব ফুলের  কুঁড়ি  হয়ে  আছে।  ফুলের  বন  দিয়েই যাত্রীরা  ঘুরে  বেড়ায়,  ফলে  অনেক  গাছ  কাত  হয়ে  মাটিতে  শুয়ে  আছে।  আমরা  ঠিক করলাম  এবার ফেরা  উচিৎ।  বৃষ্টিত  ভিজে,  জামা  প্যান্ট  ভিজিয়ে,  এত  কষ্ট  করে  এতটা  পথ  হেঁটেও,  খুব  একটা  নতুন কিছু  উল্লেখযোগ্য  ফুল  পেলাম  না।  ঠিক  করলাম  কাল  আর  আসবো  না।  দিলীপ  হয়তো  আমাদের কথা  বিশ্বাস  করবে  না।  তাই  তীরথকে  বললাম,  ওকে  একটু  বুঝিয়ে  বলতে।  ও  বললো,  ওর  হাতের  ফুল  দেখিয়ে  দিলীপকে  বলবে,  এর  থেকে  বেশি  নতুন  ধরণের  ফুল,  নন্দন  কাননে  নেই।  জীবনে  আর হয়তো  দ্বিতীয়বার  এখানে  আসার  সুযোগ  হবে  না,  তাই  বৃষ্টির  মধ্যেও  তীরথকে  নিয়ে  নন্দন  কাননের  দু’টো  ছবি  তুলে  নিলাম।  হঠাৎ  জোরে  বৃষ্টি  নামতে  আমরা  দ্রুত  পা  চালালাম।  বৃষ্টির  তোড়ে  নিশ্বাস  নিতে  কষ্ট  হচ্ছে।  একে  বৃষ্টি,  তার  ওপর  ভীষণ  জোরে  হাওয়া  বইছে।  বৃষ্টির  ছাটে  ভাল  করে  তাকানো  পর্যন্ত  যাচ্ছে  না।  তিনজনে  লাইন  দিয়ে  হেঁটে  বন  পেরিয়ে  রাস্তায়  উঠলাম।  এই  অবস্থাতেও  তীরথ  ওর  মা   ও   বোনের  জন্য   নতুন  ফুলের  অনুসন্ধান  চালিয়ে  যাচ্ছে।  আমরাও  ওর  কাজে  সাহায্য  করতে  করতে  পথ  চলছি।  রাস্তার  সেই  ছেলেটা  ছাড়া  আর  কাউকে  এতক্ষণ  পর্যন্ত  চোখে  পড়ে  নি।  আমরা  তিনজনেই  এত  বড়  ফুলের  সাম্রাজ্যে  বিচরণ  করছি।  রাস্তা  আরও  পিচ্ছিল  হয়ে  গেছে।  টুকরো  টুকরো  পাথরগুলো  ফেলে  যেন  আরও   বিপদ  সৃষ্টি  করেছে।  যতটা  সম্ভব  মুখ  ঢেকে,  প্রায়  ছুটে  আমরা   নীচে নেমে  আসছি।  গ্লেসিয়ারগুলো  একে  একে  লাঠি  ঠুকে  ঠুকে  অতিক্রম  করে  এলাম।  বর্ষাতি   আমাদের  বৃষ্টির  হাত  থেকে  রক্ষা  করতে  পারছে  না।  আমরা  প্রায়  সম্পূর্ণ  স্নান  করে  গেছি।  অবশেষে  একসময়  সমস্ত  কষ্টের  সমাপ্তি  ঘটিয়ে  ছুটে  গুরুদ্বোয়ারার  হলঘরে  ঢুকলাম।

তীরথের মা, বোন ও দিলীপ ঘুমিয়ে পড়েছে বলে মনে হ’ল। বাইরে প্রবল বৃষ্টি, হলঘরের ভিতরে অসম্ভব ঠান্ডায়, মোটা মোটা কম্বল গায়ে দিয়ে ওরা আরামে শুয়ে আছে। আমরা বৃষ্টিতে সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে ঠান্ডায় কাঁপছি। আমাদের দু’জনের আবার ঐ অবস্থায় থাকা ছাড়া উপায়ও নেই। কারণ সঙ্গে কোন দ্বিতীয় পোষাক নেই। দিলীপকে ডেকে সব বললাম। আগামীকাল আর ওখানে যাবার কোন যুক্তি নেই, তাও জানালাম। আজ ও আমাদের সাথে বেগার যায়নি বলে, নিজেকে নিজে ধন্যবাদ জানালো, নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করলো। আমি আর মাধব বাইরের চায়ের দোকানে এসে, আলুর পরোটা আর কফি খেলাম। দোকানের একটা ছেলেকে দিয়ে তীরথদের জন্যও পাঠালাম। একটু পরেই দিলীপ দোকানে এল। দোকানদার আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, আমরা আজ নন্দন কানন গিয়েছিলাম কী না। বললাম গিয়েছিলাম, তবে ফুল সেরকম পেলাম না। আমাদের জায়গাটা খুব একটা ভালো লাগেনি। দোকানের বাইরের দিকে এক ভদ্রলোক বসে চা খাচ্ছিলেন। তিনি বললেন নন্দন কানন যেতে, একটা নদী পার হতে হয়। ঐ নদীর কাছে একটা গ্লেসিয়ার ভেঙ্গে গেছে। ভাঙ্গা গ্লেসিয়ারের ওপারে অনেক ফুল আছে। উনি ভাঙ্গা গ্লেসিয়ার পার হয়ে ওপারে যেতে সাহস করেন নি। তবে একজন ভদ্রলোক ওপারে গিয়েছিলেন, তার কাছ থেকে তিনি এ কথা শুনেছেন। দোকানদার আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, আমরা কবরখানা পর্যন্ত গিয়েছিলাম কী না। তার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। অনেক দিন আগেই একটা বইতে নন্দন কাননের কবর সম্বন্ধে পড়েছিলাম। যাঁর কবর, সেই জোয়ান মার্গারেট লেগি সম্বন্ধেও অনেক কিছু পড়েছিলাম। উনি নাকি ইংল্যান্ড থেকে ফুলের বীজ সংগ্রহে এখানে এসে মারা যান। ঠিক করে এসেছিলাম, কবরটা দেখতে যাব, ফুল দেব, ছবি তুলবো। আর কার্যক্ষেত্রে একবারে ভুলেই গেলাম? আসলে বৃষ্টি আর রাস্তার কষ্ট, আমাদের সব গোলমাল করে দিয়েছে। দোকানদার এবার বললো, ঐ কবরখানার কাছেই আসল ফুল পাবেন, আপনারা নন্দন কাননের আসল জায়গাটাই যান নি। দ্বিতীয় গ্লেসিয়ার থেকে নন্দন কাননের এলাকা শুরু হলেও, যত ভিতরে যাবেন, তত নতুন নতুন ও সুন্দর ফুলের সন্ধান পাবেন। এরপরেও সেখানে না গিয়ে ফিরে যাই কী করে? বন্ধুদের বললাম, কাল ভোরে এই দোকান থেকে পরোটা, ডিমসিদ্ধ কিনে নিয়ে, আমরা আবার নন্দন কানন যাব। তীরথকে বলবো ও যেন গোবিন্দঘাট চলে যায়, সম্ভব হলে বদ্রীনারায়ণ। আমরা নন্দন কানন থেকে সোজা গোবিন্দ ঘাট, সম্ভব হলে বদ্রীনারায়ণ চলে যাব।

গুরুদ্বোয়ারার হলঘরে ফিরে এসে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। তীরথকে আমাদের প্ল্যান জানালাম। ও রাজি হ’ল। ঠিক হ’ল আগামীকাল বিকেলে গোবিন্দঘাটে আবার আমাদের দেখা হবে। শুয়ে শুয়ে ভাঙ্গা গ্লেসিয়ারটা কিরকম জিনিস, তার থেকে বিপদের সম্ভাবনাই ব কতটা, চিন্তা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরেই তীরথ আমাদের খেতে যাবার জন্য ডাকাডাকি শুরু করলো। আমার আর মাধবের কিন্তু কম্বল থেকে বার হবার যথেষ্ট অসুবিধা আছে। জামা প্যান্ট একবারে ভিজে যাওয়ায়, আমি আর মাধব, খালি গায়ে জাঙ্গিয়া পরে কম্বলের তলায় শুয়ে আছি। এই হলঘরে সমস্ত পাঞ্জাবি পুরুষ ও মহিলারা আছেন। এই অবস্থায় কম্বল থেকে বার হওয়া মুশকিল। বললাম, আমাদের একদম খিদে নেই। ও কিন্তু কিছুতেই ছাড়বে না। এতবড় রাত না খেয়ে থাকা অন্যায় হবে, শরীর খারাপ হবে, এবং ওদের পক্ষেও অকল্যানকর হবে, ইত্যাদি বলতে শুরু করলো। সব বুঝছি, কিন্তু কী করে ওকে আমাদের আসল সমস্যার কথাটা বলি? আমরা জানালাম, সত্যিই আজ আমাদের খিদে নেই, তোমরা খেয়ে এস। কিছু মনে কোর না। তীরথের মা বললেন, “খিদে পেলে তোমরাই কষ্ট পাবে, আমাদের আর কী”? তাদের চিন্তা করতে বারণ করে, ভালো করে কম্বল চাপা দিলাম। শুয়ে শুয়ে বুঝতে পারছি, বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। কাল কী হবে কে জানে। ভীষণ জল পিপাসা পেয়েছে। কম্বলের তলায় শুয়ে শুয়ে আবার প্যান্ট জামা পরে, বর্ষাতি চাপিয়ে, ঘর থেকে ঠান্ডায় বার হয়ে জল খেয়ে, আবার সবার অগোচরে প্যান্ট জামা খুলে শুতে হবে ভেবে, জল খাবার ইচ্ছা ত্যাগ করলাম। শুয়ে শুয়ে কখন ঘুম এসে গেল।

অবশেষে আবার সেই তীরথের ডাক। ভোর হয়ে গেছে। আজ বিশ-এ আগষ্ট। আজ আমরা তিনজন নন্দন কানন যাব। রাস্তা আমাদের চেনা, অসুবিধা হবার কথা নয়। দোকান থেকে চা খেয়ে, তীরথদের জন্য চার কাপ চা পাঠিয়ে দিয়ে, আমরা গতকালের মতো রাস্তার ধারে ঝরণার নালার পাশে, সকালের কাজ সারতে গেলাম। ও বাবা! হেমকুন্ডে ব্রহ্মকমল যেমন চারিদিকে ফুটে ছিল, এখানেও বনের চারিদিকে লাল, সবুজ, নীল, সাদা পাগড়ীর ফুল ফুটে আছে। ওরাও বনের এদিক ওদিক একই উদ্দেশ্যে বসে পড়েছে। আমরাও পছন্দ মতো জায়গা দেখে, কাজ সেরে নিলাম।

তীরথরা তৈরি, তৈরি আমরাও। তবে ওদের পথ গুরুদ্বোয়ারা থেকে বেড়িয়ে ডানদিকে, আর আমরা যাব বাঁদিকে। ওরা যাবে গোবিন্দঘাট, আমরা নন্দন কানন। তীরথকে বললাম, “তুমি যদি আজ বদ্রীনারায়ণ যাও, তাহলে গোবিন্দঘাটে আমাদের মালপত্র একজায়গায় সাজিয়ে রেখে ওদের বলে যেও, যাতে আমাদের মালপত্র নিতে কোন অসুবিধা না হয়। গোবিন্দঘাটে আমাদের সমস্ত মালপত্র, একই জায়গায়, একই খোপে সাজিয়ে রাখা আছে”। তীরথ আমাদের চিন্তা করতে বারণ করলো। আমরা তিনজনে কাঁধে যে যার ব্যাগ নিয়ে, হাতে লাঠি ও একটা মাত্র ওয়াটার বটল্ নিয়ে, শুভযাত্রা শুরু করলাম। গুরুদ্বোয়ারায় ফুলের পলিথিন ব্যাগ দু’টোর মুখে গিঁট দিয়ে একপাশে রেখে গেলাম। আর রেখে গেলাম, বাকী দু’টো ওয়াটার বটল্।

হাঁটতে হাঁটতে একসময় আমরা দ্বিতীয় গ্লেসিয়ারটার কাছে পৌঁছলাম। আকাশ একবারে পরিস্কার, সুন্দর রোদ উঠেছে। এখনও সেই ভদ্রলোকের কাছে শোনা, নদী ও ভাঙ্গা গ্লেসিয়ারের কথা মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। আস্তে আস্তে একসময়, গতকাল যেখান থেকে প্রথম ফার্ণ জাতীয় গাছের বনে ঢুকেছিলাম, ব্রিজ পার হয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হলাম। আজ আর বর্ষাতি গায়ে নেই, ফলে প্যান্টের সাথে জামা ও সোয়েটারও ভিজেছে। শুনেছিলাম জোঁকের উপদ্রব আছে, কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত জোঁকের দেখা না পেলেও, আর একটা জিনিসের উপদ্রব দেখছি অনেক বেশি। সামনে বিরাট অঞ্চল জুড়ে বেগুনি ও হলুদ রঙের দোপাটির মতো একপ্রকার ফুলের জঙ্গল। দেখলে মনে হবে কেউ চাষ করেছে, কারণ এখানে এ ছাড়া অন্য কোন ফুল নেই। অনেকটা অঞ্চল জুড়ে, যেন একটা বড় মাঠে, এই ফুলের চাষ করা হয়েছে। দিলীপকে বললাম ফুলের জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়াতে, উদ্দেশ্য একটা ছবি তোলা। একটা বড় পাথর পড়ে আছে। তার ওপরে উঠে ছবি নেব বলে প্যান্টটা যেই একটু তুলেছি, ব্যাস হাঁটু পর্যন্ত বিছুটি লেগে গেল। চুলকাতে চুলকাতে প্রাণ যায় আর কী। ছবি তুলে আবার এগিয়ে চললাম। গতকালের জায়গাটা পেরিয়ে প্রায় মাইল খানেক যাওয়ার পর চোখে পড়লো, ভাঙ্গা গ্লেসিয়ারটা। ভাঙ্গা বললে ভুল হবে। আসলে একটাই গ্লেসিয়ার ওপর থেকে নীচে নেমে এসেছে। কিন্তু মাঝখান থেকে দু’ভাগে বিভক্ত। মাঝখানটা দিয়ে একটা দশ-বার ফুট চওড়া নদী বা ঝরনার জল, প্রবল বেগে গড়িয়ে নেমে আসছে। কিছুটা এগিয়েই নদীটা আবার গ্লেসিয়ারের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। ঐ জায়গাটা কিরকম গর্ত মতো। যেন গ্লেসিয়ারটা নদীটাকে গ্রাস করবার জন্য বিশাল হাঁ করে আছে। ওখানে পড়লে গ্লেসিয়ারের ভিতর দিয়ে কোন্ রাজ্যে নিয়ে যাবে জানি না। কবরটার কাছে যেতে হলে, নদীটার অপর পারে যেতে হবে। একটু আগে দেখলাম দু’জন কুলি দু’টো তাঁবু খাটাচ্ছে। দুই যুবক এবং এক যুবতী তাঁবুর ধারে বসে আছে। বুঝলাম আজ রাতে ওরা এখানেই থাকবে। আলাপ করে জানলাম, এক যুবক এসেছে নৈনিতাল থেকে, আর এক যুবক বোম্বাই থেকে। কী ভাবে যোগাযোগ হ’ল ওরাই জানে। যুবতীটি মাদ্রাজ বা আসামের কী না জানবার ইচ্ছা হলেও, মনের ইচ্ছা মনেই চেপে রেখে, কুলিদের কাছে কবরখানার খোঁজ নিলাম।

নদীটার ওপর ছোট বড় অনেক পাথর পড়ে আছে। কোনটা জলের তলায়, কোনটা বা মাথা বার করে আছে। জলের গভীরতা না থাকলেও, গতি খুব বেশি। পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে, জলের রঙ দুধের মতো সাদা দেখাচ্ছে। দিলীপ ও মাধবকে বললাম, জুতো খুলে ফেলতে। আমি আগে নদী পার হয়ে গিয়ে, ওদের হাত থেকে মালপত্র নিয়ে নেব। তারপরে ওরা একে একে, আমার বাড়ানো লাঠি ধরে পাথরের ওপর দিয়ে পা ফেলে নদী পার হয়ে যাবে। এই ব্যবস্থা পাকা করে, পাথরের ওপর লাফ দিয়ে দিয়ে নদী পার হয়ে, অপর পারে গিয়ে দাঁড়ালাম। অদ্ভুত ব্যাপার, নদীর এপারটা আবার পুরো বরফে আচ্ছাদিত, খালি পায়ে দাঁড়াতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। মাধবকে বললাম একটা একটা করে জুতোগুলো ছুড়ে দিতে। মাত্র দশ-বার ফুট দুর থেকে ওগুলো আমি সহজেই লুফে নিতে পারবো। মাধবের কিন্তু অন্য মত। সে বললো, লোফালুফিতে যথেষ্ট ঝুঁকি আছে। ঠিকমতো লুফতে না পারলে, নদীতে পড়ে যেতে পারে। আর একবার নদীতে পড়লে, গ্লেসিয়ারের সেই হাঁ করা গর্ত দিয়ে গ্লেসিয়ারের ভিতর চলে যাবে। তাই ও ঠিক করলো একটা একটা করে জুতো, ও আমার দিকের পারে, বরফের ওপর ছুড়ে ছুড়ে ফেলে দেবে। সেইমতো ও ওপার থেকে প্রথম পাটি জুতোটা দক্ষ ক্রিকেটারের স্টাইলে এপারে ছুড়লো, এবং আমরা চরম বিপদের মধ্যে পড়লাম। হান্টার সু-এর পিছন দিকটা সামনের দিকের তুলনায় অনেক বেশি ভারী। ও জুতোর ফিতে ধরে জুতোটা এপারে বেশ জোরে ছোঁড়ায়, ওটা এপারে না এসে, সোজা ওপরদিকে অনেকটা উঠে গেল। আমি এক পা নদীতে বাড়িয়ে কোনমতে ওটাকে লুফে নেবার চেষ্টা করলাম। ক্রিকেট খেলায় ওভার বাউন্ডারি মারতে গিয়ে যেমন মাঝেমাঝে, বল মাঠের বাইরে না গিয়ে অনেক ওপরে উঠে মাঝমাঠে পড়ে, ঠিক সেই রকম ভাবে আমার প্রায় হাত খানেক দুর দিয়ে অনেকটা ওপর থেকে ওটা নদীতে গিয়ে পড়লো, এবং সঙ্গে সঙ্গে নদীর প্রবল স্রোতে, নীচের দিকে বরফের গহ্বরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। পা দিয়ে ওটাকে কোনমতে অপর পারে কিক্ করে পাঠাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু চোখের নিমেষে সেটা আমার পায়ের পাতার ওপর দিয়ে চলে গেল। নদীর ওপারে, যেখানে দিলীপ দাঁড়িয়ে, সেখানে ওটাকে এক মুহুর্তের জন্য দেখা গেল। চিৎকার করে ওকে লাঠি দিয়ে ওটাকে আটকাতে বললাম। কিন্তু ও দেখতে পাবার আগেই, সেটা আবার জলের তলায় চলে গেল। বুকের মধ্যে যেন কেমন করে উঠলো। টাকা পড়ে গেলে তবু টাকার যোগাড় করা যাবে, অন্তত ফিরে আসা যাবে। কিন্তু জুতো? জুতো কোথায় পাব? তিন তিনটে গ্লেসিয়ার পেরিয়ে, জোঁক ও বিছুটি বনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গিয়ে, অভ্রযুক্ত ধারালো পাথরের ওপর দিয়ে পাঁচ কিলোমিটার পথ খালিপায়ে বা একপায়ে জুতো পরে হাঁটলে, তবে ঘাংরিয়া। সেখানে কোন দোকান নেই। ওখান থেকে তের-চোদ্দ কিলোমিটার পথ হাঁটলে, গোবিন্দঘাট। এ পথটাও উচুনীচু অসমান পাথুরে পথ। ওখানে চায়ের দোকান কয়েকটা আছে বটে, কিন্তু জুতোর দোকান কোথায়? ওখান থেকে বাসে পঁচিশ কিলোমিটার রাস্তা গিয়ে বদ্রীনারায়ণ। ওখানে বদ্রীবিশালের কৃপায়, জুতো হয়তো কিনতে পাওয়া যাবে, তবে ভাল নরম জুতো পাওয়া যাবে কী না, বা পায়ের মাপে পাওয়া যাবে কী না, যথেষ্ট সন্দেহ আছে। নন্দন কাননের রাস্তা ঘোড়ার মলে ভর্তি। এপথে খালিপায়ে হাঁটতে গেলে ধারালো পাথরে পা কাটবেই, আর তার ওপরে ঘোডার মলের প্রলেপ? স্বর্গের রাস্তা পরিস্কার।

    WAY TO VALLEY OF FLOWERS (6)WAY TO VALLEY OF FLOWERS (7)           WAY TO VALLEY OF FLOWERS

                                                              নন্দন কানন যাবার পথে

হাঁ করে দাঁড়িয়ে চিন্তা করার সময় নেই। আমার দিকের পারে, একটু দুরে বরফের গহ্বরের কাছে, একটা পাঁচ-ছয় ফুট উচু প্রায় গোলাকার পাথর রয়েছে। পাথরটার পিছনে সাত-আট ফুট দুরে সেই মৃত্যু গহ্বরে নদীটা ঢুকে যাচ্ছে। দৌড়ে পাথরটার কাছে গিয়ে হাতের চাপ দিয়ে ওটার ওপরে উঠেই, দেখতে পেলাম আমাদের পরম আরাধ্য দেবতাটিকে। ফিতেটা একটা পাথরের তলায় কী ভাবে আটকে গিয়ে জলের স্রোতে বনবন্ করে ঘুরছে। যেকোন মুহুর্তে ফিতে ছিঁড়ে বা পাথর থেকে আলগা হয়ে, সঙ্গে সঙ্গে বরফের ভিতর চলে যাবে। চিৎকার করে মাধবকে ডাকলাম, উদ্দেশ্য ও এসে আমায় ধরবে। আমি নীচে নেমে ওটাকে তুলে আনবো। মাধব কী করবে ভেবে পেল না। সময়ও আর নষ্ট করা চলে না, যা করার এখনই করতে হবে। বিপদ মাথায় করে নীচে গহ্বরের কাছে বরফের ওপর লাফ দিলাম। যে গ্লেসিয়ারের ওপর একটু আগে হাঁটতে ভয় পাচ্ছিলাম, সমতল হওয়া সত্ত্বেও লাঠি দিয়ে ঠুকে ঠুকে হাঁটছিলাম, সেই গ্লেসিয়ার, তা আবার নীচের দিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে, এবং একটু দুরেই ওরকম মৃত্যু গুহা থাকা সত্ত্বেও, অত উচু পাথরের ওপর থেকে কোন কিছু না ভেবে স্বচ্ছন্দে লাফ দিয়ে দিলাম। এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে, জুতোটাকে দু’হাতে চেপে ধরলাম। ওঃ, সেই মুহুর্তে কী যে আনন্দ পেলাম কী বলবো। আমার সামনে বড় পাথরটা, তাই মাধবরা কী করছে দেখতে পাচ্ছি না। জুতো হাতে উঠে দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ একভাবে খালিপায়ে বরফের ওপর লাফঝাঁপ করে, পা দু’টো ঠান্ডায় প্রায় অবশ হয়ে গেছে। উত্তেজনায় এতক্ষণ বুঝতে পারি নি। এখন দেখছি সোজা হয়ে দাঁড়াতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। মাধবরা এখন আমায় দেখতে পাচ্ছে। ওরা দুর থেকেও আমার অবস্থার কথা বুঝে ফেলেছে। মাধব দু’হাত নেড়ে চিৎকার করে আমায় বসে পড়তে বলছে। কিন্তু বসবো কোথায়? যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেটাও তো বরফ। শেষে হাতের চাপে পাথরটার ওপর উঠবার চেষ্টা করলাম। এদিক থেকে পাথরটার উচ্চতা অনেক বেশি হওয়ায়, পাথরের ওপর ওঠাও বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত হাতের চাপে বরফ থেকে পাথরটার ওপর উঠতে সমর্থ হলাম। জুতোর ওপর হাতের চাপ পরায়, জুতোর ভেতরের সমস্ত জল ছিটকে আমার মুখ, চোখ, সোয়েটার ভিজিয়ে দিল। এবার জুতোর ভেতর থেকে মোজাটা টেনে বার করলাম। আমার নয়, তবে সেটা কার সেই মুহুর্তে চিনতে পারলাম না। মনে হ’ল মাধবের। একটু সময় নিয়ে আবার আগের জায়গায়, মানে নদীর পারে ফিরে এলাম। এতকিছু ঘটনা ঘটতে বোধহয় পাঁচ মিনিটও সময় নিল না। মাধবকে বললাম আস্তে আস্তে বাকি জুতোগুলো ছুড়ে আমার হাতে দিতে। একটা একটা করে সবগুলো জুতো আমার পায়ের কাছে জড়ো করলাম। লাঠিতে ঝুলিয়ে ক্যামেরাটাও এপারে নিয়ে আসলাম। এবার এপার থেকে একটু জলে নেমে লাঠিটা বাড়িয়ে ধরলাম। ওরা লাঠি ধরে সহজেই এপারে চলে এল। জুতোটা জলে ভিজে নতুনদার পাম্প সুতে পরিণত হয়েছে। মাধব ভিজে জুতোর ভেতর থেকে মোজা বার করে ঘোষণা করলো— “এটা দিলীপের জুতো”। দিলীপের মুখের তখন কী শোচনীয় অবস্থা। ওর পায়ের মাপ অস্বাভাবিক বড়। জুতো হারালে, কষ্ট করে বদ্রীনারায়ণ গেলেও ওর পায়ের মাপের জুতো মিলতো না। কারণ কলকাতাতেই আমাদের পায়ের মাপের হান্টার সু পাওয়া গেলেও, অনেক দোকানেই ওর মাপের জুতো পাওয়া যায়নি। ও আমাকে বারবার কৃতজ্ঞতা জানাতে লাগলো, আর আমি মনে মনে মাধবকে গালাগাল করতে লাগলাম। জায়গাটাকে স্মরণীয় করে রাখতে গোটাকতক ছবি নিয়ে নিলাম। এতক্ষণে বুঝছি উত্তেজনায় কী সাংঘাতিক ঝুঁকি নেওয়া হয়েছিল। জুতো পরে আবার হাঁটা শুরু হ’ল।

       WAY TO VALLEY OF FLOWERS (3)       WAY TO VALLEY OF FLOWERS (4)       WAY TO VALLEY OF FLOWERS

                                                      নন্দন কানন যাবার পথে

এবার কিন্তু সত্যিই নতুন নতুন ফুলের সন্ধান পেলাম। সব রকম ফুল কিছু কিছু করে তুলে, দিলীপের হাতে দিলাম। উদ্দেশ্য কবরখানায় ফুল দেব। টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হ’ল। ওয়াটারপ্রুফ গায়ে চাপিয়ে, এক বুক ফার্ণ জাতীয় গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি। সাপখোপ বা জোঁকের চিন্তা একবারও মাথায় আসলো না। মধ্যে মধ্যে গাছে ঢাকা পাথরের টুকরোতে হোঁচট খাচ্ছি। এগুলো খুব বিপজ্জনকও বটে। অসাবধানে দুই পাথরের মধ্যে পা পড়লে, পা ভেঙ্গে যেতে পর্যন্ত পারে। দুরে একটা সাদা রঙের পতাকা উড়ছে। ওটাই সম্ভবত কবরখানা। আমি ওদের থেকে অনেকটা এগিয়ে আছি। সুন্দর একটা পাখির বাচ্চা দেখে ধরবার চেষ্টা করে বুঝলাম, সেটা মোটেই বাচ্চা নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা কবরখানার কাছে চলে এলাম। তুলে আনা সমস্ত ফুল কবরের বেদির ওপর দিয়ে, রোদের অপেক্ষায় রইলাম। অবশেষে সে আশা ছেড়ে একটা বড় পাথরের ওপর বসে, আলুর পরোটা ও ডিম সিদ্ধর গতি করতে লাগলাম। হঠাৎ একটু শরৎকালের মতো রোদ দেখা গেল। পরপর দু’টো ছবি নিলাম। একটা করে পরোটা খেয়ে, একটা করে ব্যাগে রেখে দিলাম।

 

VALLEY OF FLOWERS (2)     VALLEY OF FLOWERS (3)         VALLEY OF FLOWERS (10)

জোয়ান মার্গারেট লীগ-এর সমাধি।

একটা বেদির ওপর একটা ছোট মারবেল্ পাথরের ফলক। মাঝখান থেকে ফেটে গেছে। হাত দিয়ে ধুলো, গাছের শুকনো পাতা সরিয়ে, খুব কাছ থেকে আবার ছবি নিলাম। কবরটার পাশে, আমাদের এখানকার বনবেগুনের মতো দেখতে, অদ্ভুত নীল রঙের একরকম ফুল দেখলাম। শুধু ঐ একই ফুল। চারিদিকে আরও কিছুটা ঘুরে, আমরা ফিরবার পথ ধরলাম। সময় নষ্ট করে লাভ নেই। যদি সম্ভব হয়, আজই বদ্রীনারায়ণ চলে যাব। দু’টো জায়গা দেখা হ’ল। এবার তৃতীয় জায়গার জন্য তৈরি হতে হবে। একসময় আমরা আবার সেই নদীটার কাছে ফিরে এলাম। কোন রাস্তা না থাকায়, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আন্দাজে হেঁটে এসে দেখি, গতবার যেখান দিয়ে নদী পার হয়েছিলাম, সেখানে না এসে অন্য জায়গায় এসে হাজির হয়েছি। লাঠি ঠুকে বরফের ওপর দিয়ে নদীতে নামলাম। ওদের দাঁড়াতে বলে কোনদিক দিয়ে পার হওয়া সুবিধাজনক ভাবছি, মাধবই আবিস্কার করলো সেই সহজতম পথটা। সুন্দরভাবে পাথর পড়ে আছে। তিনজনই এবার জুতো পায়ে সহজেই নদী পার হয়ে এলাম। এপারে এক বৃদ্ধ ইংরেজ ভদ্রলোক, সঙ্গী ইংরেজ বৃদ্ধাকে নিয়ে খুব বিপদে পড়েছেন। কোনখান দিয়ে পার হলে তাঁদের সুবিধা হবে, ঠিক করতে পারছেন না। একটু দুরে এক হিন্দুস্থানী স্বামী-স্ত্রীরও সেই একই সমস্যা। ইংরেজ ভদ্রলোককে হাত ধরতে বললাম। ভাবলাম ওদের দেশের লোকের জনই তো আজ আমরা নন্দন কাননকে খুঁজে পেয়েছি, ওদের সাহায্য করা উচিৎ। ভদ্রলোক জানালেন তাঁকে ধরবার দরকার নেই। তিনি সঙ্গের বৃদ্ধাটিকে নদী পার করে দিতে অনুরোধ করলেন। বৃদ্ধার দিকে হাত বাড়াতে, তিনি এত জোরে আমার হাত চেপে ধরলেন, যে ভয় হ’ল তিনি পড়লে আমায় নিয়ে পড়বেন। একটা একটা করে পাথর টপকে এগচ্ছি, আর তাঁকে টেনে এগিয়ে নিয়ে আসছি। শেষ বড় পাথরটার ওপর থেকে ওপারে উঠলাম। বৃদ্ধাটি বড় পাথরটায় দাঁড়ালেন। তাঁকে একটানে এপারে নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে, সম্ভবত তাঁর পায়ের চাপে, পাথরটা গড়িয়ে জলে চলে গেল। খুব সামলানো গেছে যাহোক্। ওপথে আর ওপারে ফেরা গেল না। একটু ঘুরে আবার ওপারে গেলাম। আমরা এগিয়ে গেলাম। বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে যতক্ষণ দেখতে পেলাম, দেখলাম হাত নেড়ে আমাদের বিদায় জানালেন। আবার সেই ফুল, আবার সেই বনজঙ্গল, ক্রমে ভাঙ্গা রাস্তা, গ্লেসিয়ার, ঝরনা ফেলে, আমরা সেই পুরাতন চায়ের দোকানে ফিরে এলাম।

পরোটাগুলো গরম করে নিয়ে কফির সাথে খেতে ভালোই লাগলো। মাধব গিয়ে কম্বলগুলো গুরুদ্বোয়ারা কর্তৃপক্ষকে ফেরৎ দিয়ে, আমাদের জিনিসগুলো নিয়ে আসলো। দোকানে বসেই ঘাংরিয়া গুরুদ্বোয়ারার একটা ছবি নিলাম। কয়েকজন মিলিটারি, দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। অনেকদিন হ’ল বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছি। গোটা পৃথিবীর কোন খবর আমরা এতদিন পাইনি। ওদের হাতে রেডিও দেখে খবর জিজ্ঞাসা করলাম, ওরা জানালো প্রধান মন্ত্রী চরণ সিং পদত্যাগ করেছেন। ওসব খবর তখন মোটেই মুখরোচক মনে হ’ল না। দাম মিটিয়ে গোবিন্দঘাটের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। নন্দন কানন থেকে ফিরবার পথে চারজন যুবকের সাথে দেখা হয়েছিল। তারা বোধহয় হেমকুন্ড সাহেব পরে যাবে। তাদের একজনের হাতে দেখলাম, সাদা বেশ কয়েকটা কাগজ যত্ন করে পলিথিন পেপারে মোড়া। আলাপ হলে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এই কাগজগুলো কী জন্য নিয়ে যাচ্ছে। উত্তরে একজন বলেছিল, এগুলো ব্লটিং পেপার, এটা দিয়ে মুড়ে ব্রহ্মকমল নিয়ে যাবে। তাতে নাকি ফুল অনেকদিন টাটকা থাকে। আমি হেসে বললাম “মৌয়া গাছের মিষ্টি ছায়া ব্লটিং দিয়ে শুষে, ধুয়ে মুছে সাবধানেতে রাখছি ঘরে পুষে”, গোছের ব্যাপার বলছেন। সত্যিই কী ব্লটিং পেপারে মুড়ে রাখলে, ফুল অনেকদিন ভালো ও টাটকা থাকে? ওরা বললো ওরা তো তাই শুনেছে। বললাম নন্দন কাননে কিন্তু ব্রহ্মকমল পাবেন না, ব্রহ্মকমল নিতে গেলে হেমকুন্ড সাহেব যেতে হবে। ওরা তবু বললো না না, নন্দন কাননেই তো আসল ব্রহ্মকমল পাওয়া যায়। বললাম দু’-দু’বার ঘুরে আসলাম, আসল নকল একটাও তো চোখে পড়ে নি। দেখুন চেষ্টা করে, বেষ্ট অফ্ লাক্। এখন হঠাৎ ওদের কথা এসে পড়ায়, দিলীপ বললো আগে জানলে ব্লটিং পেপার নিয়ে আসতাম। একে ব্রহ্মকমল খুব একটা বেশি নেওয়া হয় নি, তাও আবার যদি ভালো না থাকে, তবে দুঃখের শেষ থাকবে না।

সকালবেলা তীরথ চলে যাবার আগে, আমাদের একটা পলিথিন ব্যাগে করে, ওদের বাড়িতে তৈরি ঘিয়ে ভাজা আটার মতো এক প্রকার খাবার দিয়ে গেছে। রাস্তায় খবর পেলাম বিকেল চারটের সময় শেষ বাস পাওয়া যাবে। হাতে সময় খুব অল্প। কোন দোকানে চা পর্যন্ত না খেয়ে, তীরথের দেওয়া নতুন খাবার মুখে পুরে, আমরা প্রায় ছুটে নেমে চলেছি। হেমকুন্ড, নন্দন কানন থেকে ফিরছি বলে, পথে হেমকুন্ডগামী পাঞ্জাবিরা আমাদের সাথে কথা বলছে, খোঁজখবর নিচ্ছে। অল্প কথায় আলাপ সেরে, আবার সামনে এগিয়ে চলেছি। জঙ্গলচটিতে এসে আমরা চা খেলাম, সঙ্গে তীরথের দেওয়া আটাভাজা। জিনিসটা নতুন হলেও, খেতে বেশ ভালোই। এখানে আবার শুনলাম বদ্রীনারায়ণ যাবার বাস, পৌনে পাঁচটার সময় পাওয়া যাবে। বুকে নতুন আশা নিয়ে দাম মিটিয়ে ছুটলাম। একনাগাড়ে নীচের দিকে নামতে নামতে, পাগুলো বেশ ব্যথা করছে। যতদুর দৃষ্টি যায় দেখবার চেষ্টা করছি নীচের গুরুদ্বোয়ারা দেখতে পাওয়া যায় কী না। এখনও কিছু নজরে পড়ে নি। আরও কিছু পথ চলার পর, হঠাৎ দুরে, বহুদুরে, আমাদের কাঙ্খিত গুরুদ্বোয়ারার দেখা মিললো। এবার আমাদের হাঁটার গতি আরও বেড়ে গেল। সবকিছু ঠিক থাকলে, আজই আমরা বদ্রীনারায়ণ পৌঁছচ্ছি। শেষ পর্যন্ত আমরা গুরুদ্বোয়ারার সামনে এসে হাজির হলাম। সামনে কয়েকজন পাঞ্জাবি বসে আছে। তীরথকে দেখলাম না। সময় নষ্ট না করে, দোতলায় মাল রাখার ঘরে গেলাম। বাইরে থেকে দরজায় তালা ঝুলছে। এদিকে প্রায় সাড়ে চারটে বাজে। দৌড়ে গেলাম কুলি ডাকতে। একজন কুলির কাছেই জানতে পারলাম, একজন পাঞ্জাবির কাছে মাল রাখার ঘরের চাবি থাকে, এবং সে বাস রাস্তায় গেছে। মাধবকে ডুপ্লিকেট চাবি কার কাছে থাকে জেনে মাল নেবার ব্যবস্থা করতে বলে, ছুটলাম বাস রাস্তার দিকে। কুলিটা জানালো ঐ পাঞ্জাবিটা মিলিটারি রঙের জামা ও পায়জামা পরে আছে। মাধবকে বললাম “আমি ভদ্রলোককে খুঁজে পাঠিয়ে দিচ্ছি এবং বাস রাস্তায় বাস থামাবার জন্য অপেক্ষা করছি। দেখি যদি অনুরোধ করে বাসটাকে পাঁচসাত মিনিট বেশি সময় দাঁড় করানো যায়”। বাস রাস্তায় যাবার পথেই পাঞ্জাবিটার সাথে দেখা হয়ে গেল। হাতজোড় করে তাকে শীঘ্র ঘর খুলে মালপত্র বার করে দেবার জন্য অনুরোধ করলাম। এও জানালাম যে আমার দু’জন সঙ্গী গুরুদ্বোয়ারায় কুলি নিয়ে অপেক্ষা করছে। সে সম্মতি জানিয়ে জোর কদমে গুরুদ্বোয়ারার দিকে পা চালালো। আমি বাস রাস্তার দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, আমরা তীরথের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। ও আমাদের জন্য যতই করুক, তবু গুরুদ্বোয়ারায় থাকার দৌলতে, আমাদের ওপর ওদের একটা নিয়ন্ত্রণ ছিলই। এখন আমরা স্বাধীন। বদ্রীনারায়ণ গিয়ে আমাদের পছন্দ মতো যেকোন হোটেলে ওঠা যাবে। আর আমাদের গুরুদ্বোয়রায় মালপত্র নিয়ে লাইন দিয়ে উদ্বাস্তুদের মতো রাত কাটাতে হবে না। এইসব ভাবতে ভাবতে বাস রাস্তায় এসে, সামনে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। সামনে তীরথ দাঁড়িয়ে। ওর মা, বোন ও ভগ্নীপতি একটা চায়ের দোকানে বেঞ্চে বসে আছেন। তীরথ আমায় দেখেই প্রায় ছুটে এসে, নন্দন কানন সম্বন্ধে নানারকম প্রশ্ন করতে শুরু করে দিল। ওকে জুতো হারানোর গল্প বললাম। ও তার মাকে নিজের ভাষায় ঘটনাটা বললো। নতুন নতুন ফুল কী কী দেখেছি, এবং কবরখানার কথা বলতে, ও এগুলো দেখতে না পাওয়ার জন্য আফসোস করে বললো, গতকাল আর একটু কষ্ট করে এগিয়ে গেলেই ভালো হ’ত। ফুল কেন তুলে নিয়ে আসিনি জিজ্ঞাসা করায়, বললাম ওর সাথে আবার এভাবে দেখা হবে ভাবি নি। ও জানালো ও আজ এখানেই থাকবে বলে স্থির করেছিল। কিন্তু ভগ্নীপতি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায়, আজই বদ্রীনারায়ণ যাচ্ছে। কাল ভোরে গরমকুন্ডে স্নান সেরে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। ও চলে যাচ্ছে, এবং কেন চলে যাচ্ছে জানিয়ে, গুরুদ্বোয়ারায় একটা চিঠি লিখে রেখে এসেছে, আমাদের দেবার জন্য।

অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল, মাধবদের পাত্তা নেই। তীরথকে বললাম একটু এগিয়ে দেখি। ও বললো চিন্তা করো না, ওরা ঠিক সময়ে চলে আসবে। একটু পরেই অনেক দুরে মাধব, দিলীপ ও কুলিকে লাইন দিয়ে আসতে দেখা গেল। সবার জন্য চায়ের অর্ডার দিয়ে, এগিয়ে গিয়ে মাল নিলাম। হাল্কা বৃষ্টি শুরু হওয়ায়, দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির তলায় মালপত্রগুলো ঢুকিয়ে রাখলাম। চা দিয়ে গেল। একটাও চুমুক দেবার আগেই বাস এসে গেল। চা ফেলে রেখে বাসের ছাদে উঠে মালপত্র সাজিয়ে রাখলাম। কুলির পয়সা দিতে গিয়ে দেখা গেল খুচরো পয়সা বা টাকা নেই। তীরথের বোনের কাছ থেকে দু’টো টাকা নিয়ে, কুলিকে বিদায় করলাম। আমি ও মাধব বাসের ছাদে মাল তোলায় ব্যস্ত ছিলাম। মালপত্র তুলে রেখে এসে দেখি, তীরথের মা আমাদের জন্য কাপড় পেতে বসার জায়গা সংরক্ষণ করে রেখেছেন। আমরা সবাই বাসে বসার জায়গা পেলাম। বদ্রীনারায়ণ পর্যন্ত বাস ভাড়া মাত্র দু’টাকা পঁচাত্তর পয়সা। তীরথ আমাদের বাস ভাড়াও দিতে গেল। আমরা কিছুতেই রাজি না হওয়ায় ও বললো, “ঠিক আছে, তাহলে তোমরা তোমাদের ভাড়া দাও, আমি আমাদের চারজনের ভাড়া দিচ্ছি”।

বাস ছেড়ে দিল। আগামীকাল সকালের পর আর আমাদের কোন দিন দেখা হবেনা বলে, তীরথের মা খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললাম মন খারাপ করবেন না। পৃথিবীটা গোল, একদিন না একদিন আবার দেখা হবেই। তাছাড়া কোনদিন পাঞ্জাবে যাওয়ার সুযোগ আসলে আপনাদের ওখানে তো যাবই। তিনি খুব খুশি হয়ে বললেন, তোমাদের যতদিন ই্ছা, আমার ওখানে প্রেমসে থাকতে পার। তীরথ এবার বললো, ”রায় তুমি তো গান জান। সামনেই আমার বিয়ে। তুমি তোমার বন্ধুদের নিয়ে আসবে, হারমোনিয়াম বাজাবে”। “নতুনদার” সাথে কোথায় যেন নিজের মিল খুঁজে পেলাম। একটু থেমে, তীরথ হঠাৎ বললো, “যদি কিছু মনে না করো তো একটা কথা বলতাম। তোমরা তিনজনেই চাকরি করো, যাবেও অনেক জায়গা। হেলং এর মতো, পথে আরও বিপদ আসতে পারে। আমার কাছে যথেষ্ট টাকা আছে, প্রয়োজন হলে কিছু রেখে দাও। পরে কোন কারণে প্রয়োজন হলে আর আমার সাথে দেখা হবে না, বিপদে পড়বে”। ওর মা’ও বললেন “তীরথের থেকে কিছু টাকা নিয়ে রেখে দাও বেটা”। বললাম “কথাটা শুনে খুব ভালো লাগলো। আমাদের টাকার আর প্রয়োজন হবে না, ধন্যবাদ”। তবু তীরথ আবার বললো, “নাহয় ধার হিসাবেই রাখ, বাড়ি ফিরে গিয়ে ফেরৎ দিয়ে দিও”। আমরা তাকে জানালাম, আমরা প্রয়োজনের বেশিই টাকা নিয়ে এসেছি, দরকার হবে না। এবার তীরথের বোনকে কুলিকে দেওয়া টাকা দু’টো ফেরৎ দিতে গেলে, ও কিছুতেই নেবে না। সে বললো, মাত্র দু’টো টাকা, তাও ফেরৎ দেবে? ভাইয়ার কাছ থেকে ও টাকা আমি ফেরৎ নিতে পারবো না। কী বিপদ, এরা আমাদের ভেবেছেটা কী? বললাম টাকা ভাঙ্গানো ছিলনা বলে নিয়েছিলাম, ফেরৎ না নিলে খুব দঃখ পাব। ও আর কথা না বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে নিল।

তীরথ জানালো, আজ রাতটা বদ্রীনারায়ণে কোন একটা ভালো হোটেলে উঠবে, আমরা যেন তার সাথে একই হোটেলে উঠি। কিছু না বলে চুপ করে বসে, সামনের দিকে উদাসভাবে তাকিয়ে রইলাম। সন্ধ্যাবেলা বাস এসে বদ্রীনারায়ণ পৌঁছলো। কুলিরা ছুটে এল। একজন পান্ডা পরিস্কার বাঙলায় আমাদের বললো তার ওখানে উঠতে। মন্দিরের পাশেই সে থাকে। ঘন কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। জিজ্ঞাসা করলাম, মন্দিরটা কোথায়? ও দুরে হাত তুলে দেখালো। কুয়াশায় কিছুই দেখা গেল না। পান্ডাটা বললো, আপনারা বাঙালি বলেই বলছি। ওর কথা শুনে বুঝতে পারছি, বাঙলা বললেও ও বাঙালি নয়। ব্যবসার খাতিরে বাঙলাটা শিখেছে। কত টাকা দিতে হবে জিজ্ঞাসা করায় সে জানালো, আমাদের যা ইচ্ছা দিলেই হবে। তার নাম জিজ্ঞাসা করায় সে জানালো, “পঞ্চভাই” বললে এখানে যে কেউ তাকে দেখিয়ে দেবে। জানিনা পাঁচ ভাই মিলে পার্টনারশিপ্ ব্যবসা ফেঁদেছে কী না। এবার তীরথকে বললাম যে তারা কাল সকালেই চলে যাবে, কিন্তু আমরা তো এখানে তিন-চার দিন থাকবো। দামী হোটেলে তিন-চার দিন থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। কাজেই আজ আমরা এই ভদ্রলোকের বাড়িতেই উঠি। পছন্দ না হলে কাল অন্য কোথাও ঠিক করে নেওয়া যাবে। তারা যেন কিছু মনে না করে। কাল প্রথম বাসে তাদের হৃষিকেশ যাবার সময় আমরা এসে, তাদের বিদায় জানিয়ে যাব। তীরথ কুলির হাতে তাদের মালপত্র্র দিয়ে, মা, বোন ও ভগ্নীপতিকে নিয়ে এগিয়ে গেল।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s