পাহাড়ের রোজনামচা–চতুর্থ পর্ব {লেখাটি www.amaderchhuti.com ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

DSCN9767পঞ্চভাই এর সাথে একটা বাচ্চা ছেলে এসেছিল। সম্ভবত ওর অ্যাসিস্টেন্ট। কুলির হাতে মালপত্র দিয়ে, তার সাথে কথা বলতে বলতে আমরাও এগলাম। মাধবের লাঠির নালটা আলগা হয়ে গেছিল। কুলিটা লাঠিগুলোর ওপর ভর দিয়ে হাঁটছিল। মাধবকে বললাম লাঠিগুলো ওর হাত থেকে নিয়ে নিতে। ও বললো, থাক্ কিছু হবে না। মন্দিরে এসে পৌঁছলাম। ও বাবা, এ তো রীতিমতো শহর। মন্দিরের সঙ্গেই ডানপাশে বিরাট একটা হোটেল। দু’টোর মাঝখান দিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে আমাদের যেতে হবে। পাশের একটা দরজা দিয়েও মন্দিরে ঢোকা যায়। একটু ওপরেই পঞ্চভাই-এর আস্তানা। একটা ঘেরা বারান্দা, শতরঞ্চি পাতা আছে। একজন মোটাসোটা যুবক ও একজন বৃদ্ধ তাতে বসে গল্প করছেন। তাদের পাশ দিয়ে পরপর দু’টো ঘরের দ্বিতীয়টায় গিয়ে ঢুকলাম। ছোট ঘর, দু’টো দরজা একটা জানালা। একটা দরজা দিয়ে বারান্দায় বেরতে হয়। অপরটা পাশের ঘরে যাবার। এই দরজাটা বন্ধ। বুঝলাম বাইরে বসে থাকা দু’জন ঘরটা নিয়েছে। পাশের ঘর থেকে ঘন ঘন কাশির আওয়াজ আসছে। তারমানে ওরা সংখ্যায় তিনজন। আমাদের ঘরটা ভালোই। যারা বাইরে যাওয়া বলতে শুধুই বিলাসবহুল হোটেলের ঘর বোঝেন, তাদের কথা বলতে পারবো না। কিন্তু আমাদের মতো যারা এপথে শুধু দেখতেই এসেছে, এবং ঘর বলতে রাতের নিশ্চিন্ত আশ্রয় বোঝে, তাদের পক্ষে ঠিক আছে, অন্তত আমাদের চলে যাবে। যাহোক, পঞ্চভাই লেপ এনে দিল। আমাদের মালপত্র তাকে গুছিয়ে রাখলাম। বারান্দায় আসতেই ওরা জিজ্ঞাসা করলো আমরা কোথা থেকে আসছি। আমরা আজকের সমস্ত ঘটনা বলে বললাম, আজ বদ্রীনারায়ণের বাস ধরবার জন্য প্রায় ছুটে ছুটে আসার জন্যই বোধহয়, পায়ে বেশ ব্যথা হয়েছে। পায়ে ব্যথার কথা শুনেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক বললেন, তাহলে আর এখানে বসা যাবে না। কেন বসা যাবে না জিজ্ঞাসা করায়, তিনি বললেন ইয়ং ছেলে, এইটুকু পথ হেঁটেই পায়ে ব্যথা হয়ে গেল? মোটা যুবকটি জানালো বৃদ্ধ ভদ্র্রলোকটি তার কেউ হয় না। একতলায় একটা ঘর নিয়ে থাকেন। নয় বৎসর বাড়ি ছাড়া হয়ে, হিমালয় দর্শন করে বেড়াচ্ছেন। বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে বললাম, এপথে আসার জন্য শারীরিক শক্তি কোন কাজে লাগে না। মনোবলই সব। ভদ্রলোকের বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করাতে, তিনি বলতে চাইলেন না। পরে জানলাম তাঁর বাড়ি নদীয়া জেলায়। ভদ্রোলোকের পায়ের পাতায় বিরাট বিরাট ঘা, লাল রঙের ওষুধ লাগানো আছে। তাঁর কাছেই শুনলাম জোঁক তাঁর এই অবস্থা করেছে। তাঁকে দু’মাস হাসপাতালেও থাকতে হয়েছিল। একটু পরেই ভদ্রলোক একতলায় চলে গেলেন। মোটা যুবকটি জানালো যে, তার বাড়ি বর্দ্ধমানের মেমারীতে। তার সোনার দোকান আছে। তারা কেদারনাথ যাবার জন্য গিয়েও, রাস্তার ধ্বসের জন্য বাস যেতে না পারায়, বদ্রীনারায়ণ চলে এসেছে। আমরা এখান থেকে কেদারনাথ যাব শুনে, মোটা যুবকটি জানালো যে, সেও আমাদের সঙ্গে কেদারনাথ যেতে চায়। তার সঙ্গে তার এক কর্মচারী এসেছে, তাকে খচ্চর ভাড়া করে দেবে।

আমরা একবার বাইরে যাবার জন্য নীচে নেমে দেখি, একতলার বৃদ্ধটি ঐ ঠান্ডায় বাসন ধুচ্ছেন। তিনি আমাদের এখানে কী কী দেখবার আছে জানালেন। আমরা মন্দিরে এলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই চন্দন চর্চিত বদ্রীবিশালকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে, নতুন বস্ত্র পরানো হ’ল। তাঁর গলার পুরাতন মালার চাহিদা দেখলাম খুব। সমস্ত ভক্তরা হাত বাড়িয়ে মালা বা ফুলের টুকরো নিতে চাইছে। মুর্তির মাথার মুকুটটা দুর থেকে দেখলেও চোখ ঝলসে যাবে। শুনলাম ওটার মূল্য নাকি এক কোটি টাকা। হতেই পারে, মন্ত্রীদের যেখানে কোটি টাকার সম্পত্তি থাকে, নারায়ণের থাকতে আপত্তি কোথায়?

একজন কালো পোষাক পরিহিত পুরোহিত দ্বারা সমস্ত কাজ সম্পাদিত হচ্ছে। এরপর সামান্য আরতি মতো হ’ল। শুনলাম এবার মন্দিরের দরজা বন্ধ করা হবে। আমাদের সাথে পঞ্চভাই পান্ডাও মন্দিরে গেছিল। তার প্রচেষ্টায় আমরা সবার আগে দাঁড়াবার সুযোগও পেয়েছিলাম। কয়েকজন লোক মুর্তির একটু দুরেই, আমাদের আর মুর্তির মাঝখানে বসে আছে। শুনলাম তারা নাকি ভি.আই.পি. মানুষ। একজন লম্বা চওড়া লোক মন্দিরে প্রবেশ করলো। সঙ্গে তার আবার বডিগার্ড। শুনলাম তিনিও একজন ভি.ভি.আই.পি। মন্দিরের ভেতর এই আলাদা ব্যবস্থা দেখবো আশা করি নি। পাঞ্জাবিদের কোন গুরুদ্বোয়ারায় কিন্তু এ ব্যবস্থা দেখি নি। অথচ দেশে শিখ ধর্মাবলম্বি পাঞ্জাবি ভি.ভি.আই.পি-র অভাব আছে বলে তো মনে হয় না। জয় বদ্রীবিশাল কী জয়। মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলাম।

       BADRINARAYAN    BADRINARAYAN (2)       BADRINARAYAN (3)

                                                             বদ্রীনারায়ণ  মন্দির

ঘরে ফিরে গিয়ে ঠিক করলাম আগামীকাল সকালে ভারতীয় শেষ গ্রাম, “মানা”র ওপর দিয়ে “বসুধারা” যাব। মোটা যুবকটি এ কথা শুনে জানালো, সেও কাল একা আমাদের সাথে ওপথে যেতে চায়। একতলার সেই নদীয়ার বৃদ্ধ ভদ্রলোক জানালেন, এখানে বেশ কয়েক কিলোমিটার দুরে “শতপন্থ” লেক্। খুব সুন্দর জায়গা, তবে ওখানে যেতে গেলে “চামোলী’ থেকে অগ্রিম অনুমতি পত্র নিয়ে আসতে হয়। জানা ছিলনা, তাই ওখানে যাবার চেষ্টা করেও লাভ নেই।

একটু পরে মন্দিরের পাশের দোকানে রুটি, তরকারী খেতে গেলাম। দেখা হ’ল ঘাংরিয়ার সেই বাঙালি ভদ্রলোকের সাথে, যিনি আমাদের ভাঙ্গা গ্লেসিয়ার ও নদীর কথা বলেছিলেন। তাঁর সাথে আবার হেমকুন্ডে সাঁতার কাটতে দেখা, সেই জাপানি ছেলেটাও জুটেছে। শুনলাম ওরা দু’জনে একই হোটেলের একই ঘরে রয়েছেন। জাপানির কোন সঙ্গী নেই, সঙ্গী নেই সেই ভদ্রলোকেরও। ভদ্রলোক মধ্যপ্রদেশে, ভারত হেভী ইলেকট্রিকালস্ লিমিটেড-এ কাজ করেন। এরা দু’জনেই একা একা ঘুরতে এসেছেন, তাই দু’জনে দু’জনকে সঙ্গী হিসাবে জুটিয়ে নিয়েছেন। ভদ্রলোক, আমরা নন্দন কাননের ভাঙ্গা গ্লেসিয়ারটা পার হয়ে গেছিলাম কী না জিজ্ঞাসা করায়, তাঁকে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বললাম। ভদ্রলোকের উল্টো দিকের চেয়ারে আর এক ভদ্রলোক বসেছিলেন। তাঁকে দেখতে অনেকটা বাঙালিদের মতোই। ভদ্রলোক জাপানির সঙ্গী ঘাংরিয়ার সেই ভদ্রলোকটিকে ইংরাজীতে জিজ্ঞাসা করলেন যে, আমরা কী বলছি। বুঝলাম ইনি বাঙালি নন্। আমাদের পরিচিত ভদ্রলোক তাঁকে সমস্ত ঘটনা বলাতে, তিনি বললেন খুব রিস্ক্ নিয়েছিলেন। দেশের জন্য, দশের জন্য লোকে প্রাণ দেয়, আপনি তো একটা জুতোর জন্য প্রাণ দিতেন। যাহোক্, শুনলাম জাপানি ও বাঙালি দু’জনও কাল বসুধারা যাবেন।

আজ একুশে আগষ্ট। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা গেলাম তপ্তকুন্ডে স্নান করতে। মাঝখানের চৌবাচ্চাটায়, আমরা তিনজনে জলে নামলাম। চৌবাচ্চাটার ডানপাশে মন্দিরের দিকে মুখ করে বসলে, এক কোনে একটা সিমেন্ট বা পাথরের স্ল্যাব জলের মধ্যে আছে। ওটায় সুন্দর বসে থাকা যায়। আমি হঠাৎ ওটা আবিস্কার করে, ওর ওপর বসে গরম জলে শরীর ডুবিয়ে, সমস্ত দেহ ম্যাসাজ করতে শুরু করলাম। মাধব ও দিলীপ একটু পরেই গেল মন্দিরে পূজো দিতে। আমি গরম জলে বসে গায়ের ব্যথা কমাতে লাগলাম। কয়েক মিনিট বাদেই পঞ্চভাই এসে আমায় ডেকে পূজো দেবার জন্য মন্দিরে যেতে বললো। মাধবের কথা বলে বললাম, ও আমার আত্মীয়, ও আমার হয়ে পূজো দিয়ে দেবে। পঞ্চভাই চলে গেল। বাঙালি ও জাপানি এসে হাজির হলেন। বাঙালি ভদ্রলোক গরম জলে নামলেন। আর কিছুক্ষণ কাটিয়ে, জল থেকে উঠে জাপানিকে প্রশ্ন করলাম, সে কেন জলে নামছে না। জাপানি ইংরাজীতে কথা বললেও, থাওল থাওল বলে কী বলতে চাইছে, বুঝতে পারছি না। হঠাৎ বুঝলাম ওর সঙ্গে টাওয়েল নেই। বললাম ওর সঙ্গীর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে স্নান করতে, শরীর একবারে সুস্থ হয়ে যাবে। কাঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে তাকে একটু আমসত্ত্ব দিলাম। তার চোখ বুজে খাওয়া দেখে বুঝলাম, এ পদার্থটির সঙ্গে তার আগে পরিচয় না থাকলেও, আমসত্ত্ব তাকে যথেষ্ট তৃপ্ত করেছে। বেশ কিছুক্ষণ পরে ঘরে ফিরে এসে দেখি, আমার সঙ্গী দু’জন তখনও ফেরে নি। অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে তারা প্যাকেটে করে প্রসাদ নিয়ে ফিরে এল। আমরা মন্দিরের পাশে হোটেলে গেলাম। ওরই বাঁপাশ দিয়ে বসুধারা যাবার রাস্তা। এখানে দেখি ধোসাও পাওয়া যায়। গরম গরম ধোসা আর চা খেয়ে আমরা রওনা দিলাম। মোটা যুবকটিও আমাদের সঙ্গী হ’ল। পরিস্কার আকাশ। মন্দিরের একবারে কাছে, সামনের রেলিং এর ওপর থেকে মন্দিরের একটা ছবি নিয়ে নিলাম।

এখান থেকে তিন কিলোমিটার দুরে ভারতীয় শেষ গ্রাম “মানা”। মন্দিরের বাঁপাশে, অর্থাৎ হোটেলটার কাছে একটা নোটিশ বোর্ডে লেখা আছে—“বিদেশীদের ঐ নোটিশ বোর্ডের ওপারে যাওয়া নিষেধ”। শুনলাম চামোলী থেকে অনুমতি পত্র আনলে বিদেশীদের বসুধারা যেতে দেওয়া হয়। বুঝলাম জাপানিটার আর বসুধারা দেখা হ’ল না। যাওয়ার পথে অনেকে বললো, ক্যামেরা নিয়ে যেতে দেওয়া হয়, আবার অনেকেই বললো, ক্যামেরা নিয়ে বসুধারা যেতে দেওয়া হয় না। আমাদের সাথে অতি সাধারণ একটা ভারতীয় ক্যামেরা। সেটা গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে চললাম। ডানপাশে মিলিটারি আড্ডা, প্রচুর ঘোড়া ও ট্রাক দাঁড়িয়ে। একটা ব্রিজ পার হয়ে ওখানে যেতে হয়। একসময় আমরা মানা গ্রামে এসে হাজির হলাম। কেউ কিন্তু ক্যামেরা চাইলো না। অনেকগুলো বাচ্চা পিছন পিছন পয়সার জন্য আসছে। শুনলাম এখান থেকে ঊনচল্লিশ কিলোমিটার দুরে তীব্বত বর্ডার।

                 WAY TO BASUDHARA & MANA                   MANA

                    মানা-বসুধারা যাবার পথে                                      মানা

একটু এগতেই ছোট একটা মিলিটারি ক্যাম্প। আমাদের থেকে মোটা যুবকটি একটু এগিয়ে গেছিল, ও দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে। কাছে যেতে আমার গলায় ঝোলানো ক্যামেরাটা মিলিটারিগুলো চেয়ে নিল। মোটা যুবকেরটা আগেই নিয়েছে। আরও বেশ খানিকটা পথ হেঁটে আমরা “ভীমপুল” এসে পৌঁছলাম। সরু নদী, কিন্তু ভীষণ তার গতি। অসম্ভব রকম গর্জন করে বয়ে যাচ্ছে। নদীর দু’পারের দু’টো বড় পাথরের উপর একটা বিশাল পাথর যেন শুইয়ে রাখা হয়েছে। এটাই একটা দশ-বার ফুটের ব্রিজ বা পুল। ব্রিজের বেশ খানিকটা নীচ দিয়ে সেই ভয়ঙ্কর নদী বয়ে যাচ্ছে। নীচে নদীর দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যায়। আসবার পথে শুনেছি এটা নাকি সরস্বতী নদী। মহাপ্রস্থানের পথে যাবার সময় ভীম এই বিশাল পাথরটা ফেলে, এই পুল তৈরী করেন। যাহোক্, ওখানে বসে ভাবছি সরস্বতী নদী কী সারা দেশের ওপর দিয়েই বয়ে গেছে? তাহলে সর্বত্র তার স্বাস্থ্য এত খারাপ কেন? এই ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে কী ভাবেই বা সে এতটা পথ পাড়ি দেয়? এখানে এই ভয়ঙ্কর নদীর ওপর কী অদ্ভুত একটা ব্রিজ। কত কম খরচে নদীর ওপর ব্রিজ তৈরি করা যায়, এখনকার বড় বড় ইঞ্জিনীয়ারদের ভীমের কাছ থেকে শেখা উচিৎ। কোনরকম রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ছাড়াই, যুগের পর যুগ দিব্বি ব্যবহারযোগ্য হয়ে টিকে আছে।

এমন সময় সেই বাঙালি ভদ্রলোক গলায় এক দামী বিদেশী ক্যামেরা ঝুলিয়ে এসে হাজির হলেন। আমরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি কী ভাবে ক্যামেরা নিয়ে এখানে এসেছেন। তিনি তো আমাদের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তিনি জানালেন যে, তিনি এই ভাবেই গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে এখানে এসেছেন। পথে এক মিলিটারি তাঁর সাথে আলাপও করেছে। কিন্তু কেউ তাঁকে ক্যামেরা রেখে যেতে বলে নি। দিলীপকে বললাম তার মানে ক্যামেরা নিয়ে এখানে আসতে না দেওয়ার কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। আমরা দু’জনে আমাদের ক্যামেরা ফেরৎ আনতে আগের ক্যাম্পটার উদ্দেশ্যে ফিরে গেলাম। মাধব, মোটা যুবক ও বাঙালি ভদ্রলোক ভীমপুলে বসে থাকলেন। ক্যাম্পে এসে আমি ওখানকার মিলিটারি প্রধানটিকে বললাম, “আমরা সাধারণ ভারতীয়, আমাদের সঙ্গের ক্যামেরাটাও অতি সাধারণ ভারতীয় ক্যামেরা। বহুদুর থেকে এখানে এসেছি। যদি অনুমতি দেন তাহলে ভীমপুল বা বসুধারার ছবি নিয়ে গিয়ে, বাড়ির লোকদের দেখাতে পারি”। ভদ্রলোক খুব শান্ত ও ভদ্রভাবে জানালেন, বসুধারার ছবি তোলা গভর্ণমেন্টের কড়া বারণ। তাঁর কিছু করার নেই। আমরা জানালাম এক ভদ্রলোক ক্যামেরা নিয়ে ভীমপুলে অপেক্ষা করছেন, তাকে কেন নিয়ে যেতে দেওয়া হ’ল? মিলিটারি ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে তাঁর সঙ্গীদের ডাকলেন। ক্যাম্পের ভিতর থেকে দু’জন সঙ্গী বেরিয়ে এসে সব শুনেই, ঘোড়া নিয়ে ঐ বাঙালি ভদ্রলোককে ধরতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হ’ল। ভাবলাম কেন বলতে গেলাম। কিন্তু কথাটা বলে ভদ্রলোকের বোধহয় মঙ্গলই করেছি। নাহলে ফিরবার সময় তাঁর বিপদ হ’তই। আমি খুব শান্ত ভাবে নরম গলায় মিলিটারিদের বললাম, আমি গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে বসুধারা যাচ্ছিলাম। আপনারা ক্যামেরাটা এখানে জমা রেখে যেতে বলেছেন, আমি জমা দিয়ে দিয়েছি। আমার মতো ঐ ভদ্রলোকও তাঁর ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে নিয়েই এখান দিয়ে গেছেন। ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া নিষেধ বলে কোন নোটিশ বোর্ড কোথাও নেই, আপনারাও তাঁর কাছ থেকে ক্যামেরা চেয়ে নেন নি। ফলে তিনি না জেনে ক্যমেরা নিয়ে গেছেন। আমার কাছে না চাইলে, আমিও তো ক্যামেরা নিয়েই চলে যেতাম। প্রথম যে মিলিটারি অফিসারের সাথে আমরা কথা বলছিলাম, তিনি এবার বেশ কড়া সুরে বললেন “অসম্ভব, এদিক দিয়ে গেলে আমরা ক্যামেরা চেয়ে নিয়ে জমা রাখবোই। ওপাশ দিয়ে আর একটা রাস্তা আছে, সে দিকেও একটা ক্যাম্প আছে। ওদিক দিয়ে গেলে, ঐ ক্যাম্পের কর্মীরা ক্যামেরা জমা নিয়ে নেবে। ক্যামেরা ইচ্ছা করলে আপনারা নিয়ে যেতে পারেন, তবে রীলে কত নম্বর পর্যন্ত ছবি তোলা হয়েছে নোট করে রাখা হবে। ফিরবার পথে দেখে নেওয়া হবে নতুন করে আর কোন ছবি তোলা হয়েছে কিনা। যদি কেউ ভুল করে ক্যামেরা নিয়ে চলেও যায়, তবু তার ক্যামেরা থেকে রীলটা খুলে নেওয়া হবে”। বললাম ঠিক আছে তাঁদের যাওয়ার দরকার নেই। কোন সভ্য ভারতীয়, ভারত সরকারের নিষেধ অমান্য করে না। ভদ্রলোককে আমি আপনাদের কথা বলে ছবি তুলতে বারণ করে দেব। আমার কথা শুনে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ঐ ভদ্রলোক আমাদের লোক কিনা, বা আমাদের সঙ্গে এসেছেন কী না। বললাম তিনি আমাদের লোক নন, আমাদের সাথেও আসেন নি। তবে তিনি বাঙালি, আমাদের ভাষা বোঝেন। আমি বারণ করলে তিনি কখনই ওখানকার ছবি তুলবেন না। অফিসারটি এবার অনেকটা নরম হয়ে বললেন, ঠিক আছে, আমি যেন তাঁকে ওখানকার কোন ছবি তুলতে বারণ করি। চলে আসছিলাম, হঠাৎ মনে হ’ল ব্যাপারটা আরও একটু পরিস্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। ফিরে এসে জিজ্ঞাসা করলাম, ভদ্রলোক আমার কথায় কোন ছবি তুলবেন না কথা দিতে পারি। কিন্তু ফেরার পথে তাঁরা বিশ্বাস করবেন তো? পরে কোন ঝামেলা হবে না তো? অবিশ্বাসের প্রশ্ন থাকলে তাঁরা গিয়ে ভদ্রলোকের ক্যামেরা নিয়ে আসতে পারেন। অফিসারটি বললেন ঠিক আছে তাকে যেন ছবি তুলতে বারণ করে দেওয়া হয়। পরে কোনরকম ঝামেলা করা হবে না।

ফিরে এসে দেখি মাধব ও মোটা যুবকটি আমাদের জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে। ক্যামেরার মালিক অনেকক্ষণ ক্যামেরা নিয়ে বসুধারার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন। মহা চিন্তায় পড়লাম। মাধবকে সব বললাম। মাধব জানালো, একটু আগে তিনি তাকে সামনে দাঁড় করিয়ে ভীমপুলের একটা ছবি তুলেছেন। কী করা উচিৎ ভেবে না পেয়ে, এগিয়ে চললাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে, বহুদুরে নীল জ্যাকেট পরা ভদ্রলোককে দেখতে পেলাম। একবারে ফাঁকা রাস্তা। মাঝে মাঝে মানা গ্রামের লোকেরা যাতায়াত করছে। দুরে বরফাচ্ছাদিত একটা শৃঙ্গ চোখে পড়ছে। হাত নেড়ে চিৎকার করে ভদ্রলোককে দাঁড়াতে বললেও, তিনি কিন্তু শুনতে পেলেন না। ভাবলাম রাস্তায় ছবি তুললে স্থানীয় লোকেরা যদি লক্ষ্য করে, তবে তারা হয়তো মিলিটারি ক্যাম্পে খবর দেবে। তখন আমিও না এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ি। যাহোক্ ভদ্রলোক বোধহয় হাঁপিয়ে গিয়ে একটা জায়গায় বসে পড়লেন। আমরা জোর পায়ে আরও এগিয়ে গিয়ে, চিৎকার করে তাঁকে অপেক্ষা করতে বললাম। শেষে তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। ভদ্রলোক সব শুনে খুব ভয় পেয়ে গিয়ে বললেন, ইতিমধ্যে তাঁর দু’টো ছবি তোলা হয়ে গেছে। একটা ভীমপুলে, আর একটা মাঝপথে। আর মাত্র একটা ছবি তুললেই, এই ফিল্মটা শেষ হয়ে যাবে। তাঁকে আর কোন ছবি তুলতে বারণ করে বললাম, ফিরবার পথে ওরা জিজ্ঞাসা করলে সত্যি কথা বলতে। কারণ কোন কারণে অবিশ্বাস করে ফিল্ম্ খুলে নিয়ে ওয়াশ করলে তিনি খুব বিপদে পড়বেন। ভদ্রলোক বললেন তার ওয়াশিং চার্জ দেওয়াই আছে। সেরকম হলে তিনি অনুরোধ করবেন যে, ফিল্ম্ খুলে নিয়ে ওয়াশ করে আপত্তিকর ছবি রেখে দিয়ে, বাকি ফটো নষ্ট না করে তাঁকে পাঠিয়ে দিতে। শেষ পর্যন্ত তাই ঠিক হ’ল।

আমরা আবার এগিয়ে চললাম। বহুদুরে বসুধারা ফলস্ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু যতই হাঁটছি, দুরত্ব একই থাকছে বলে মনে হচ্ছে। রাস্তা খুব একটা কষ্টকর না হলেও, হাঁটতে আর ভালো লাগছে না। মানা গ্রামে একটা বোর্ডে লেখা ছিল— বসুধারা পাঁচ কিলোমিটার। অর্থাৎ বদ্রীনারায়ণ থেকে বসুধারা আট কিলোমিটার পথ। কিন্তু রাস্তা যেন আর শেষ হতেই চায় না। অবশেষে আমরা বসুধারা ফলস্ এর তলায় এসে হাজির হলাম। পাহাড়ের চুড়ায় ভেন্টিলেটারের মতো একটা গর্ত থেকে সাদা মিল্ক পাউডারের মতো সাদা জল পড়ছে। কোনকালে হয়তো পাহাড় বেয়েই জলের ধারা নামতো। মনে হয় পাহাড়ের ক্ষয়ের ফলেই এখন পাহাড়ের গা বেয়ে না পড়ে, ওপর থেকে সোজা তলায় জল পড়ছে। ওপর থেকে সরাসরি জল যেখানে পড়ছে, সেখান থেকে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান পর্যন্ত সাদা গ্লেসিয়ার। পাশ দিয়ে গ্লেসিয়ারের ওপর গেলে, ফলস্ এর ঠিক তলায় যাওয়া যায়। শুনেছি বসুধারার তলায় দাঁড়ালে গায়ে যদি জল না লাগে, তাহলে বুঝতে হবে সে পাপী। ফলস্ এর ঠিক নীচে দাঁড়ালে একটুও জল গায়ে না লেগে কী ভাবে তলায় পড়তে পারে, বা কী ভাবে তলায় পড়া সম্ভব, ভেবে পেলাম না। মনে হ’ল তবে কী সারা দুনিয়ার মানুষই কোন পাপ কাজ করে নি? পাপের জন্য আদালতে বিচার, সাক্ষীর হাস্যকর প্রহসন না করে, অযথা সময় ও অর্থ নষ্ট না করে, এখানে জলের তলায় দাঁড় করিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। সে যাহোক্, গ্লেসিয়ার বেয়ে লাঠি নিয়ে খানিকটা উঠলাম। মাধবের লাঠি আগের দিন কুলির ধকল সইতে না পেরে, নালছাড়া হয়েছে। বুঝলাম লাঠি নিয়ে চেষ্টা করলে ওঠা যাবে, কিন্তু নেমে আসা খুব কঠিন হবে। পা হড়কে রাস্তার ওপর, যেখানে সবাই দাঁড়িয়ে আছে, ওর ওপর দিয়ে গড়িয়ে নীচের চাষের জমিতে চলে যেতে হবে। আস্তে আস্তে সাবধানে নীচে নেমে এলাম। সঙ্গে আমসত্ত্ব আছে, সকলে মিলে খানিকটা খেলাম। ভাবলাম জাপানি ছেলেটাকে আর একটু খাওয়ালে হয়। একটু পরে আমরা ফিরবার পথ ধরলাম।

রাস্তায় কোন জলের ব্যবস্থা নেই। কাজেই ঐ ঝরনার জলই একটু খেয়ে, এগিয়ে চললাম। মাধব, দিলীপ ও মোটাবাবু আস্তে আস্তে অনেক পিছিয়ে পড়লো। আমি ও ক্যামেরা কেলেঙ্কারির নায়ক, গল্প করতে করতে এগিয়ে চলেছি। একসময় মোটাবাবুও এগিয়ে এসে আমাদের দলে যোগ দিল। মাধব ও দিলীপ এত পিছনে পড়ে গেল, যে ওদের আর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। মাধবের হাঁটুতে একটা ব্যথা হয়েছে। চিন্তা হ’ল কোন অসুবিধায় পড়লো কী না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর, ওদের আবার বহুদুরে দেখতে পেলাম। একসময় আমরা সেই মিলিটারি ক্যাম্পের কাছাকাছি চলে এলাম। কোনরকম ঝামেলা হলে আমিও ঝামেলায় পড়তে পারি ভেবে, কায়দা করে ওদের থেকে পিছিয়ে গেলাম। আমরা তিনজন যখন ক্যাম্পে এসে পৌঁছলাম, দেখলাম মোটাবাবু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বাঙালি ভদ্রলোক তাঁর ক্যামেরা সমেত ভালোভাবে ফিরে গেছেন। বুঝলাম কোন ঝামেলা হয় নি, মিলিটারিরা তাদের কথা রেখেছে। আমরা আমাদের ক্যামেরা ফেরৎ নিলাম। পাশেই কয়েকজন বৃদ্ধা ভেড়ার লোম দিয়ে কম্বল বা ঐ জাতীয় কিছু তৈরি করছে। কয়েকটা বাচ্চা তাদের ঘিরে খেলা করছে। একজন বৃদ্ধা একটা বালতি নিয়ে এসে আমায় কী বললো, বুঝতে পারলাম না। আবার জিজ্ঞাসা করাতে সে বললো, আমার ওয়াটার বটলটার কত দাম? আমাদের দেশে এগুলো সস্তা কী না? বললাম এটার দাম সাত টাকা। সে বললো যে সে আমাকে সাতটা টাকা দিচ্ছে, আমি যেন তাকে এটা দিয়ে দেই। আমি ইচ্ছা করলে তার বালতিটা নিয়েও এটা তাকে দিতে পারি। এরকম যে কোন প্রস্তাব আসতে পারে, স্বপ্নেও ভাবি নি। বললাম আমরা আরও অনেক জায়গায় যাব। রাস্তায় খাবার জলের প্রয়োজন হবে। বালতি করেও জল নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কাজেই আমি এটা তাকে দিতে পারছিনা বলে দুঃখিত। ওদের সরলতা দেখে অবাক হতে হয়।

আমরা আবার হাঁটতে শুরু করে কিছুক্ষণের মধ্যেই মানা গ্রামে এসে উপস্থিত হলাম। আই.টি.বি. পুলিশ ক্যাম্পের উল্টো দিকের একটা চায়ের দোকানে বসে কয়েক বৎসরের পুরানো চানাচুর কিনে, চা করতে বললাম। চানাচুরই এই দোকানের একমাত্র খাদ্যবস্তু। আমরা চায়ের অপেক্ষায় বসে আছি। বসে আছে আই.টি.বি. পুলিশে পোষ্টেড দু’জন ভদ্রলোক। একজনের বাড়ি বেনারস, অপরজন বিহারের লোক। তারা আমাদের সব কথা শুনে বললো, আমাদের ক্যামেরাটা জামার তলায় ঢুকিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল। ওপর থেকে দেখা না গেলে, কেউ সার্চ করতো না। ভাবলাম একই কাজে নিযুক্ত দু’জন কী সুন্দর দু’রকম কথা বলছে। ধন্য আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সাহস একটু বেড়ে গেল। পুলিশ ক্যাম্পকে সাক্ষী রেখে, দুরের গ্রামের ছবি নিলাম। দোকানদার এখনও চা তৈরি করছে। হঠাৎ দেখি পাথরে থেঁতো করে, সে কী যেন চায়ের কেটলিতে দিয়ে দিল। পরিমানেও অনেকটা। জিজ্ঞাসা করতে দোকানদার জানালো, মশলা। ভাবলাম এখানকার অনেক চায়ের দোকানের মতো, এলাচ বা গরম মশলা জাতীয় কিছু দিয়েছে। ও বাবা! চায়ে একটা চুমুক দিয়েই অবস্থা শোচনীয়। খাবে কার সাধ্য। একগাদা গোলমরিচ চায়ে থেঁতো করে দেওয়া হয়েছে। জীবনে এই প্রথম ঝাল চা খেয়ে ধন্য হলাম। যাহোক, চা শেষ করে যথাসময়ে মন্দিরের পাশের হোটেলে ফিরে এলাম। অনেক বেলা হয়ে গেছে। পরোটা আর চা খেয়ে, গেলাম “শোণপ্রয়াগ” যাবার বাসের খবর নিতে। তীরথের কথা খুব মনে পড়ছে। আজ সকালে আমাদের ঘুম থেকে উঠতে অনেক দেরি হয়ে গেছিল। ওর বাস খুব ভোরে বদ্রীনারায়ণ ছেড়ে চলে গেছে।

কেদারনাথ যেতে হলে, শোণপ্রয়াগ পর্যন্ত বাসে যাওয়া যাবে। খবর পেলাম বাস ছাড়ার ঘন্টাখানেক আগে টিকিট দেওয়া হয়। কেদারের রাস্তা খুব খারাপ হয়ে আছে। ওদিক থেকে কোন বাস আসছে না। ওদিক থেকে বাস আসলে, তবে এদিকের বাসের টিকিট দেওয়া হবে। ঘরে ফিরে এসে দেখি একতলায় সিঁড়ির পাশে, বৃদ্ধ ভদ্রলোকের পাশের ঘরে, চার- পাঁচজন যুবক বসে আছে। পঞ্চভাই ও ঐ বৃদ্ধ ভদ্রলোকও আছেন। বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমাদের কথা বোধহয় এদের আগেই বলেছেন, কারণ আমরা আসতেই তারা আমাদের ডেকে কথা বলতে শুরু করলো। সবাই বাঙালি। দু’জনের বাড়ি আসানসোলে। ওদের মধ্যে দু’জন নাকি অমরনাথ ও কেদারনাথ হয়ে এখানে এসেছে। বাকিরা কেদারনাথেই প্রথম গেছিল। সেখান থেকে একটু আগে এখানে এসে পৌঁছেছে। একসাথে অমরনাথ, ও কেদার-বদ্রী যেতে, আগে কারো কথা শুনেছি বলে মনে করতে পারছি না। তবু মনটা বেশ পুলকিত হয়ে গেল। বাস তাহলে কেদারনাথ থেকে এসেছে। ওরা জানালো, মাঝ রাস্তায় ধ্বসের জন্য তাদের অনেকক্ষণ আটকে থাকতে হয়েছিল। গত দু’দিন কোন বাস আসে নি। কেদারনাথ থেকে আজই প্রথম বাস আসে তাদের নিয়ে। ওরা এখান থেকে নন্দন কানন, হেমকুন্ড সাহেব যাবে। ওদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, আমরা কেদারের রাস্তার একটা মোটামুটি অবস্থা জেনে নিলাম।

বিকালে, প্রায় সন্ধ্যার সময় আমরা আবার বাস স্ট্যান্ডে গেলাম। মোটাবাবু তার কেদার যাবার জন্য শোনপ্রয়াগের দু’টো টিকিট কাটার টাকা দিয়ে দিল। বাস স্ট্যান্ডের টিকিট কাউন্টারের ভদ্রলোক আমাদের জানালেন যে, এই পথে প্রথমে যমুনোত্রী, তারপর গঙ্গোত্রী, তারপর কেদারনাথ হয়ে সব শেষে বদ্রীনারায়ণ যাওয়া সুবিধাজনক। তাই সকলে ঐ ভাবেই এই চার জায়গায় যায়। যারা শুধুমাত্র কেদার-বদ্রী যায়, তারাও প্রথমে কেদারনাথ গিয়ে, সেখান থেকে বদ্রীনারায়ণ আসে। কেদার থেকে বদ্রী আসার বাস অনেক আছে। আজ রাস্তা পরিস্কার হয়ে যাওয়ায়, ওদিক থেকে কিছু বাস এসেছে। আগামীকালও বেশ কিছু বাস আসবে। তবে এদিক থেকে সোজা শোনপ্রয়াগ যাওয়ার বাস নেই। কাল সকাল ন’টায় সোজা শোনপ্রয়াগ যাওয়ার একটাই বাস ছাড়বে, এবং সেটা সন্ধ্যাবেলা শোনপ্রয়াগ পৌঁছবে। কাল সারাদিনে ঐ একটাই ডিরেক্ট্ বাস, বা এখানকার ভাষায় “যাত্রাবাস” আছে। আর একভাবে আমরা যেতে পারি। সকাল ছ’টার বাসে রুদ্রপ্রয়াগ গিয়ে, ওখান থেকে শোনপ্রয়াগের বাস ধরতে পারি। পৌঁছতে পৌঁছতে সেই সন্ধ্যাই হয়ে যাবে। ভাবলাম দু’ভাবেই পৌঁছতে যদি সন্ধ্যা হয়ে যায়, তবে যাত্রাবাসেই যাওয়া ভাল ও সুবিধাজনক। বাস বদল করবার ঝামেলা নেই, বসবার জায়গা না পাওয়ার ঝুঁকি নেই। এতক্ষণে জানা গেল, যাত্রাবাসের টিকিট কাল সকাল আটটায় পাওয়া যাবে।

ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলাম। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রী নামলো। মাধব ও দিলীপ গেল মন্দিরে আরতি দেখতে। আমি ঘরে বসে সুটকেস গোছাতে বসলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে সঙ্গীরা ঘরে ফিরে এল। তারাও আমার কাজে সাহায্য করতে শুরু করে দিল। সুটকেস ও কাঁধের একটা ব্যাগ গুছিয়ে রাখলাম। কাল সকালে হোল্ড-অল্ বেঁধে ফেললেই হবে। পঞ্চভাই একটা বদ্রীনারায়ণের মালা নিয়ে ঘরে এল। আমাদের তিনজনের নামধাম ওর খাতায় টুকে নিল। নাম, বাবার নাম, গোত্র ইত্যাদি অতি প্রয়োজনীয় বিষয় জেনে নিয়ে, মন্ত্র পড়ে তিনজনকেই কপালে চন্দনের ফোঁটা পড়িয়ে দিল। হাতে খানিকটা করে পূজোর চরণামৃতও দিল। মাধব ও দিলীপ তাকে ভক্তিভরে প্রণাম করলো। পঞ্চভাই একটু পরে ঘর ছেড়ে নিজের কাজে চলে গেল। আমরা আরও কিছু পরে সেই হোটেলে গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে এলাম। কিছুক্ষণ নিজেরা গল্পগুজব করে সময় কাটালাম। আজ একুশে আগষ্ট, বাড়ি থেকে দিন আষ্টেক হ’ল এসেছি। বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে। যে যার বাড়িতে চিঠি লিখে, শুয়ে পড়লাম।

আজ বাইশে আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো বেশ সকালে। দাঁত মেজে, একতলায় সকালের কাজ সেরে, একবারে সব মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে এলাম। পাশের ঘরের মোটাবাবু ও তার বৃদ্ধ সঙ্গীও আমাদের সাথে পথে নামলো। পঞ্চভাই-এর দক্ষিণা ও ঘরভাড়া বাবদ কুড়ি টাকা, গতকাল রাতেই দিয়ে দিয়েছি। সন্ধ্যাবেলা শোনপ্রয়াগ পৌঁছবার কথা। আগামীকাল কেদারনাথ দর্শন। আগে কেদার গেলে, মোটাবাবুর মতো ধ্বসে আটকে হয়তো ফিরে আসতে হ’ত। আমাদের ভাগ্য ভালো বলেই মনে হ’ল। বাস স্ট্যান্ডে এলাম। কোন বাস যাবে এখনও ঠিক হয় নি। প্যাসেঞ্জার হলে বাসের টিকিট দেওয়া হবে। কথায় কথায় মোটাবাবু গতকালের বসুধারা যাবার কথা তুলে বললো, “কালকের চায়ের দোকানের চা টা  কী সুন্দর করেছিল বলুন, এখনও মুখে লেগে আছে। ব্যাটাকে গড়তে বললাম ভগবান, গড়ে আনলো হনুমান। বলুন তাই নয়? আচ্ছা, ঐ পথটা কী সত্যিই মহাভারতের মহাপ্রস্থানের পথ? সত্যিই কী ভীম ঐ পুলটা তৈরি করেছিল”? আমি আর কী বলবো, বললাম “লোকে তো তাই বলে”। মোটাবাবু বললো, “গতকাল আমরা তাহলে একপ্রকার পঞ্চপান্ডবের ভূমিকায় ছিলাম বলুন”। আমি বললাম “অবশ্যই, আপনি দ্বিতীয় পান্ডব ছিলেন”। মোটাবাবু একটু চুপ করে থেকে গম্ভীর হয়ে গেল।

এতক্ষণে কোন বাসটা যাবে জানা গেল। একবারে ড্রাইভারের বাঁ পাশে সিঙ্গল সিট ও তার ঠিক পিছনের দু’জনের বসার চেয়ার সিটটা দখল করে, রাস্তায় নেমে বাসের ছাদে মালপত্র গুছিয়ে রাখলাম। দু’জনে বসার আমাদের চেয়ার সিটটার পিছনের সিটটা, মোটাবাবু ও তার বৃদ্ধ সঙ্গীটি দখল করলো। এতক্ষণ চারিদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছিল। এখন ধীরে ধীরে আকাশ পরিস্কার হচ্ছে। বাস স্ট্যান্ডের পিছনে, অর্থাৎ মন্দিরের বাঁপাশে বরফমন্ডিত শৃঙ্গ সূর্যালোকে নিজেকে প্রকাশ করলো। একজন দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ, কয়েকজন মাঝ বয়সি ভদ্রলোক ও একজন যুবতীকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। বাসের ছাদ থেকে নেমে আসতে, ঐ বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমাদের বাড়ি কোথায়, কোথা থেকে এখানে এসেছি, এখান থেকে আর কোথায় কোথায় যাব, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন করলে, আমরা সব উত্তর দিলাম। বৃদ্ধের কথায় জানতে পারলাম, তাঁরা সোজা বদ্রীনারায়ণ এসেছিলেন। এখান থেকে এই বাসেই কেদারনাথ যাচ্ছেন। সেখান থেকে দেরাদুন ও মুসৌরী যাবেন। তিনি আরও জানালেন যে, এই নিয়ে তাঁর দু’-তিনবার কেদারনাথ যাওয়া হবে। যদিও দু’বার না তিনবার, স্পষ্ট করে বলতে পারলেন না। তাঁর মধ্যে একটু সবজান্তা সবজান্তা ভাব। যাহোক একটু পরে টিকিট কাউন্টার খুললো। আটষট্টি টাকা নব্বই পয়সা দিয়ে আমরা তিনটে শোনপ্রয়াগের টিকিট কাটলাম। রাস্তার ধারে একটা দোকান থেকে চা-জলখাবার খেয়ে নিয়ে বাসের কাছে অপেক্ষা করছি। বাসও ইতিমধ্যে বাস স্ট্যান্ডের মাঠ মতো ফাঁকা জায়গা থেকে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। একটু পরেই বাস ছাড়বে বললেও, বাস ছাড়ার কোন লক্ষণ চোখে পড়ছে না। টাটার বেশ বড় ও নতুন বাস। কাল সময় করে বদ্রীনারায়ণ মন্দিরের পূর্ণাঙ্গ ছবি নেওয়া হয়ে ওঠেনি। এখন বেশ ভাল রোদ ওঠায়, ভাবলাম মন্দিরের একটা ছবি তুলে আনি। এখান থেকে মন্দির অনেকটা পথ। দিলীপকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ছুটেই মন্দিরের সামনে, ব্রিজের ওপর গেলাম। খুশিমতো ছবি তুলে খুব দ্রুত বাসের কাছে ফিরে এসে দেখলাম, সেই একই ভাবে ড্রাইভারহীন বাস দাঁড়িয়ে আছে। শুনলাম ওয়ান ওয়ে, অর্থাৎ যোশীমঠে যেরকম দেখেছিলাম, সেইরকম ওদিক থেকে আজ বাস প্রথমে আসবে। যাহোক্ কপাল ভাল, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই লাইন দিয়ে বেশ কয়েকটা বাস, ট্রাক ইত্যাদি এসে হাজির হ’ল। আমাদের বাসও আর সময় নষ্ট না করে ছেড়ে দিল।

খুব ভাল লাগছে, মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে আমরা চলেছি। হনুমান চটি যমুনোত্রীর পথে পড়ে জানতাম, এপথেও দেখি আছে। একজন পুরোহিত গোছের লোক, বাসের সবার কপালে লাল রঙের ফোঁটা পরিয়ে দিয়ে গেল। গোবিন্দঘাটের ঠিক আগের স্টপেজে বাস এসে থামলো। আমরা বাস থেকে নেমে এলাম। তীরথের সঙ্গে গোবিন্দঘাট থেকে বদ্রীনারায়ণ যাবার দিনও বাস এখানে অনেকটা সময় দাঁড়িয়েছিল। এখানে একটা আপেল গাছে, সামান্য লাল রঙের একটা আপেল দেখে গেছিলাম। আজও একটু খুঁজতেই সেটা চোখো পড়লো। রাস্তার পাশে একটু সমতল জমি, ধান চাষ হয়েছে। আমরা দাঁড়িয়েই আছি, বাস আর ছাড়ে না। খবর নিয়ে জানা গেল, এখান থেকে এই বাসে মেল যাবে। চিঠিপত্র সম্ভবত সর্টিং করা হচ্ছে। আমরা, এই বাসের সমস্ত যাত্রীরা চেঁচামিচি শুরু করে দিলাম। সমস্ত বাস ছেড়ে দিয়ে এই বাসটাকে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য, ড্রাইভারও বিরক্ত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ডাক না নিয়েই বাস ছেড়ে দিল। আমাদের বাসটা নতুন, কিন্তু গতি সব সময় সীমিত। আমাদের পিছনের সিটের মোটাবাবু জানালো, ধ্বস নামার জন্য কেদারনাথ যেতে না পারায়, তারা যখন বদ্রীনারায়ণ চলে আসছিল, তখন “গৌচর” নামে একটা জায়গায় তাদের বাস ধ্বসে বেশ কয়েক ঘন্টা আটকে ছিল। একসময় আমরা সেই অভিশপ্ত “হেলং” শহরের কাছে এসে পৌঁছলাম। আশ্চর্য, এখানে কিছু হয়েছিল বলে মনে হ’ল না। এখানকার পাথরে বোধহয় চুনের ভাগ খুব বেশি। ঐ ধ্বসের জায়গায় রাস্তাটা দেখলাম সাদা হয়ে আছে। তবে এখন রাস্তাটা বেশ চওড়া ও পরিস্কার হয়ে গেছে। গৌচরে বাস আসলে মোটাবাবুও, কোনখানে ধ্বস নেমেছিল দেখালো। শুনলাম গৌচরে নাকি দেখার মতো মেলা বসে। এখানে এসে শুনলাম, বদ্রীনারায়ণে আর কিছুদিন পরেই বিষ্ণুযজ্ঞ হবে। প্রচুর সাধুসন্ত, ভক্ত ও সাধারণ মানুষের আগমন হবে সেই সময়। আমরা ফাঁকায় ফাঁকায় ভালই ঘুরেছি।

একসময় বাস এসে “পিপলকোঠি”তে থামলো। সেই পিপলকোঠি, যেখানে শ্রীনগর থেকে যাবার সময়, দুপুরের আহার সেরেছিলাম। এবারেও এখানে বাস থামার সেই একই উদ্দেশ্য, দুপুরের আহার এখানেই সেরে নিতে হবে। আশ্চর্য, জায়গাটা আগে চিনতেই পারি নি। গতবারের বাস ড্রাইভারের সাথে বোধহয় ঐ ছোট হোটেলগুলোর কোন কমিশনের ব্যাপার ছিল। তা নাহলে এত বড় বড় দোকানপাট থাকতে, ঐ ছোট ছোট দুটো দোকানের কাছেই বা বাস দাঁড় করাবে কেন? এখন দেখছি বেশ বড় শহর, বেশ বড় বড় দোকান আছে। একটা হোটেলে দিব্বি মনের সুখে গরম গরম মাংস আর রুটি খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নিলাম। কী ভাল যে লাগলো কী বলবো। মনে হ’ল যেন অমৃত খেলাম। বাস ড্রাইভার জানালো, একটু তাড়াতাড়ি বাসে ফিরে আসতে, তা নাহলে আজ শোনপ্রয়াগ পৌঁছনো যাবে না। গুপ্তকাশীর পর থেকে ওদিকের রাস্তা একবারে কাঁচা। তার ওপর অনবরত ধ্বসে, রাস্তার অবস্থাও খুবই খারাপ। নিজেদের স্বার্থে আমাদের বাসের যতগুলো যাত্রীকে কাছাকাছি দেখতে পেলাম, ড্রাইভারের কথা বলে বাসে উঠতে বললাম। সেই দাড়িওয়ালা বূদ্ধের দু’একজন সঙ্গীর জন্য, বাস আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। ড্রাইভার আবার বললো, বিকেল চারটে-সাড়ে চারটের মধ্যে গুপ্তকাশী পৌঁছতে না পারলে, এখানকার ট্রাফিক-রুল অনুযায়ী, আজ আর শোনপ্রয়াগ যেতে দেওয়া হবে না। যাহোক কিছুক্ষণ পর সবাই বাসে ফিরে আসায়, বাস আবার এগিয়ে চললো।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s