রূপকুন্ডের হাতছানি–দ্বিতীয় পর্ব {লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary , Tour Picture এবং ভালো ছবি ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

Self (42)রাত ন’টার একটু পরে ট্রেন ছেড়ে দিল। লোয়ার বার্থে আমি, আর আপার বার্থে শীতাংশুর শোবার ব্যবস্থা হ’ল। ট্রেনটা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেডিস কুপ থেকে একটা আর্তনাদ ভেসে এল। গিয়ে দেখি জানালার ধারে বসা এক ভদ্রমহিলার কানের রিং কেউ টেনে নিয়ে গেছে। তার কান থেকে রক্ত ঝরছে। নিজের জায়গায় ফিরে এসে দেখি, একটা যুবক বার্থ রিজার্ভেশনের আশায় রেলওয়ে কর্মচারীর সাথে কথাবার্তা বলছে। যুবকটি জানালো, সে পুলিশে কাজ করে। আমার প্যান্টের বাঁ পকেটে এক টাকার একটা প্যাকেট, অর্থাৎ এক’শ টাকা। ডান পকেটে বেশ কিছু টাকার ট্রাভেলার্স চেক্। একটু তন্দ্রা মতো এসেছে, হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। দেখি যুবকটা আমার বার্থে আমার পায়ের দিকে ম্যানেজ করে আধ শোয়া হয়ে রয়েছে। আর তার একটা হাত ঠিক আমার বাঁ পকেটের ওপর। আমার মনে হ’ল ওর কোন বদ মতলব আছে। হয়তো বা পকেটমার। চুপ করে ঘুমের ভান করে শুয়ে শুয়েই ওর ওপর নজর রাখলাম। যুবকটিও এমন ভাব দেখাচ্ছে, যেন ও ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ আমি নিশ্চিত, ও জেগে আছে। ওর ওপর সন্দেহটা আরও বেড়ে গেল। হঠাৎ মনে হ’ল এভাবে তো চলতে পারে না। রাত জেগে ওকে আমি পাহারা দেব নাকি? কখন আমি ঘুমিয়ে পড়বো, আর সেই সুযোগে ও আমার পকেটের সমস্ত টাকা নিয়ে কেটে পড়বে। আমি উপুড় হয়ে শুলাম। একটু পরে লোকটা উঠে গেল। আমি এবার এমন ভাবে শুলাম, যাতে আর কেউ না আমার পাশে বসবার বা শোবার সুযোগ পায়। ঘুম এসে গেছিল। হঠাৎ একটা ধাক্কায় ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি সেই যুবকটি আবার আমার পাশে, পায়ের কাছে বসেছে। একটু পরেই ও আমাকে একটু ঠেলে আমার পাশে শোবার চেষ্টা করলো। এবার আমি আপত্তি জানালাম। ও বেশ কড়া সুরে আমায় সরে শুতে বললো। আমার এত রাগ হ’ল যে সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে ওর টিকিট দেখতে চাইলাম। চিৎকার করে ওকে তখনই আমার সিট থেকে উঠে যেতে বললাম। চিৎকার করার উদ্দে্শ্য, শীতাংশুর ঘুম ভাঙ্গানো। শীতাংশুর ঘুম কিন্তু ভাঙ্গলো না। লোকটা একটু ঘাবড়ে গিয়ে আমার সিট ছেড়ে উল্টো দিকের সিটটায় বসলো। আমার চিৎকার শুনে কন্ডাক্টার গার্ড এসে ওর টিকিট দেখতে চাইলো এবং ওকে নেমে যেতে বললো। ও অভিযোগ করলো যে, আমি তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, সিট থেকে খেদিয়ে দিয়েছি। যাহোক্, শেষ পর্যন্ত ও আমাদের রিজার্ভড্ কামরা ছেড়ে নেমে গেল। আমিও নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমবার চেষ্টা করলাম।

ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরে। জানালা দিয়ে খুব সুন্দর সূর্যের আলো এসে পড়েছে। একটু পরে “লালকুয়া” নামে একটা স্টেশনে গাড়ি এসে থামলো। আগেরবার যখন নৈনিতাল, আলমোড়া ইত্যাদি গেছিলাম, তখন দেখেছিলাম এই লালকুয়া স্টেশনে অতি উপাদেয় জিলিপি পাওয়া যায়। তাই তাড়াতাড়ি প্ল্যাটফর্মে নেমে টাটকা জিলিপি ও সিঙ্গাড়া কিনে আনলাম। শীতাংশু তার ভাগের সিঙ্গাড়া, জিলিপি নিয়ে নিজের সিটে চলে গেল। আমি দরজার সামনে পাদানিতে পা রেখে মেঝেতে বসে, বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে, সিঙ্গাড়া জিলিপি ও চা দিয়ে উপবাস ভঙ্গে মন দিলাম। খুব আস্তে গাড়ি ছুটছে। লাইনের ধারে ধারে বোর্ডে ঘন্টায় চার কিলোমিটার বেগে গাড়ি চলার নির্দেশ দেখলাম। এত আস্তে গাড়ি চলার কারণ কী বুঝলাম না। সোয়া আটটা নাগাদ ট্রেন হলদুয়ানি স্টেশনে এসে পৌঁছালো। এখানেই আমরা নেমে যাব। এখান থেকেই গোয়ালামের বাস ধরার সুবিধা। একটা রিক্সা নিয়ে সামনেই বাসস্ট্যান্ডে এলাম। ন’টার সময় বাস ছাড়বে। শীতাংশু টিকিট কাউন্টারে টিকিট কাটতে গেল। আমি মাল পাহারা দিচ্ছি। তিনটে বাঙালী ছেলেও দেখলাম এই বাসে যাচ্ছে। শীতাংশু ফিরে আসলে, মালপত্র বাসের ছাদে তুললাম। কিট্ ব্যাগটা আর কেরোসিন তেলের টিনটা, বাসের ভিতরেই রাখা হ’ল। আগেই আমি দুটো সিট্ দখল করে রেখেছি। হাওড়া থেকে কাঠগুদামের দুরত্ব ১৫৩১ কিলোমিটার। রিজার্ভেশন চার্জ নিয়ে এক একজনের ভাড়া লেগেছে সাতাত্তর টাকা নব্বই পয়সা। হলদুয়ানি থেকে গোয়ালদাম প্রায় এক’শ আশি কিলোমিটার পথ। দু’জনের বাস ভাড়া লাগলো সাতচল্লিশ টাকা দশ পয়সা। বাসে বসে ঐ তিনজন ছেলের সাথে আলাপ হ’ল। ওরা কলকাতায় থাকে, যাবে গোয়ালদাম। ওখান থেকে পরের দিন যোশীমঠ হয়ে কেদারনাথ, বদ্রীনারায়ণ, ভ্যালী অফ্ ফ্লাওয়ার্স, হেমকুন্ড যাবে। একেবারেই অনভিজ্ঞ, এই প্রথম এই জাতীয় রাস্তায় আসছে। ওদের মধ্যে একজনকে দেখলাম এর মধ্যেই ভয়ে অস্থির। ওরা গোয়ালদাম দেখতে চায়। তাই এত ঘুরে, পরের জায়গাগুলো যাবে। ঐ সব জায়গা আমার দেখা, কোথায় কোথায় থাকার জায়গা ভাল পাওয়া যাবে, কোথায় কী অসুবিধা, সব কিছু ডিটেলস্-এ ওদের জানালাম।

বাস আলমোড়া হয়ে বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ গোয়ালদাম এসে পৌঁছালো। গোয়ালদাম আমি আগেও এসেছি। পথের সৌন্দর্য বিশেষ উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। তবে এখান থেকে নন্দাদেবী, নন্দাঘন্টি, ত্রিশুল, ইত্যাদি শৃঙ্গ খুব পরিস্কার দেখা যায়। এবার আমরা ওদের আরও কাছে যাব। মালপত্র নামিয়ে, আমি গেলাম টুরিষ্ট বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা করতে। একটা ঘরে পাঁচটা বেড, এক একটা বেডের ভাড়া আট টাকা। একটা ডবলবেড রুম আছে, ভাড়া পঁচিশ টাকা। কোনটাই আমার পছন্দ হ’ল না। আমি চাইছি সস্তায় একটা সেপারেট্ ঘর। কারণ রাতে মালপত্র ঠিক করে গোছাতে হবে। তৃতীয় কোন লোক আমাদের ঘরে থাকে, এটা আমার পছন্দ নয়। টুরিষ্ট বাংলোর উল্টোদিকে, রাস্তার ধারেই “মানস সরোবর” হোটেল। মালিক, দীর্ঘদিন পশ্চিম বাংলার হাসানাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জ অঞ্চলে ছিলেন। ভদ্রলোক মিলিটারিতে কাজ করতেন। বেশ ভাল বাংলা বলেন। তার সাথে ঘর দেখতে গেলাম। এক একটা ঘরে চারটে করে বিছানা। প্রতি বেডের ভাড়া চার টাকা। আমরা ষোল টাকা ভাড়া দিয়ে একটা ঘর নিলাম। মালপত্র ঘরে রেখে, তালা দিয়ে রাস্তায় এলাম। বাস থেকে নামার সময় লক্ষ্য করেছিলাম, একজন নেপালীদের মতো দেখতে স্থানীয় লোক, আমাদের দু’জনকে লক্ষ্য করছেন। এখনও দেখছি তিনি রাস্তায় পায়চারি করে বেড়াচ্ছেন। এখনও তিনি আমাদের লক্ষ্য করে যাচ্ছেন। আমার বধ্য ধারণা হ’ল, ইনি অবশ্যই বীর সিং। কিন্তু কী করে বোঝা যায়? শীতাংশুকে বললাম আমরা ওঁর পাশ দিয়ে যাবার সময় বীর সিং সম্বন্ধে আলোচনা করতে করতে যাব। তাহলে উনি বীর সিং হলে, নিজেই আমাদের সাথে কথা বলবেন। বীর সিং সমস্যা মিটলো ভেবে করলামও তাই। অথচ তাঁর দিক থেকে কোন সাড়া মিললো না। বুঝে গেলাম, এ আর যে সিংই হোক, বীর সিং নয়। চা জলখাবার খেয়ে, যে পথটা দেবল হয়ে রূপকুন্ড যাবার জন্য বড় রাস্তা থেকে নেমে গেছে, সেই পথে একটু নীচে একটা দোকানে গেলাম। বয়স্ক দোকানদারকে আমাদের অসুবিধার কথা জানালাম। সব কথা শুনে ভদ্রলোক জানালেন, বীর সিং নিশ্চই চিঠি পেয়েছেন। আর চিঠি পেলে যত রাতই হোক, তিনি গোয়ালদাম এসে আমাদের সাথে দেখা করবেনই। ভদ্রলোক বীর সিংকে ভাল ভাবে চেনেন। মনে একটু আশার সঞ্চার হ’ল।  ভদ্রলোক বললেন বীর সিং এই পথেই আসবেন এবং তার সাথে দেখা করবেন। বীর সিং আসলে তিনি তাঁকে আমাদের কথা বলে আমাদের হোটেলে পাঠিয়ে দেবেন। আর বীর সিং যদি আজ না আসেন, তাহলে কাল সকালে দেবলে যে ডাক নিয়ে যায়, তার হাতে আমাদের কথা জানিয়ে চিঠি দিয়ে দেবেন।

আরও কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে, আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। বাড়ি ও অফিসে চিঠি লিখে, সমস্ত মালপত্র ব্যাগ থেকে বার করলাম। ঠিক করলাম খাওয়া দাওয়া সেরে, নতুন করে মালপত্র গোছগাছ করে নেব। একটু বিশ্রাম করে, হিসাবপত্র মিলিয়ে, আমরা রাতের খাওয়া সারতে গেলাম। প্রথমে গেলাম টুরিষ্ট বাংলোতে সেই তিনজন বাঙালী ছেলের সাথে দেখা করতে। গিয়ে দেখি ওরা কেয়ার টেকারের সাথে, যারা বাংলো বুক করেছে, তাদের চিঠি দেখছে। আমরা হাজির হতে তারা নতুন করে তাদের গন্তব্যস্থলের পথঘাট, হোটেল সম্বন্ধে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলো। কথাবার্তায় বুঝলাম, এই সমস্ত জায়গার পথঘাট সম্বন্ধে তাদের বিন্দুমা্ত্র ধারণা নেই। সেই ভীতু ছেলেটা জানালো, তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কী রকম একটা হাঁপানির ভাব দেখা দিচ্ছে। আমি তাকে বললাম ওটা তার মনের ভুল। সে যেন কম করে স্মোক্ করে। আমরা উঠে পড়লাম। ওরাও রাতের খাওয়া সারতে উঠে পড়লো। রাস্তায় ওরা জানালো টুরিষ্ট বাংলোয় জলের ভীষণ অভাব। কেয়ারটেকার এক বালতি জল এনে দিয়েছে। আমরা ভাগ্যবান, আমাদের হোটেলে জলের কোন সমস্যা নেই। আমরা সন্ধ্যার সময় একটা হোটেলে খাবার কথা বলে এসেছিলাম। ওরা জানালো ওরাও একটা হোটেলে খাবারের অর্ডার দিয়ে এসেছে। কাজেই ওদের যাত্রার শুভ কামনা জানিয়ে, আমরা নির্দ্দিষ্ট হোটেলে চলে গেলাম। দোকানদার জানালো এটা তার জামাইবাবুর হোটেল। তারা এখন এখানে নেই বলে সে হোটেলটা চালাচ্ছে। সে স্থানীয় হাসপাতালে কাজ করে। ডাল, রুটি, তরকারী যখন প্রায় খাওয়া হয়ে গেছে, তখন সে জানালো মাংস আছে। সে নিজে মাংস খায় না। আমরা মাংসের অর্ডার দিলাম। জানিনা এরপর কবে আবার ভাল খাবার জুটবে। যাহোক্, খাওয়ার শেষে সে জানালো সতের টাকা বিল হয়েছে। কী এমন খেলাম জানিনা। বিল মিটিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।

রাত অনেক হ’ল, বীর সিং এলেন  না। আমাদের  প্ল্যান অনুযায়ী আঠারো তারিখে হাঁটা শুরু করার কথা। আজ ষোল তারিখ। খেতে যাবার সময় ঠিক করেছিলাম কাল সকালেও বীর সিং না আসলে, আমরা “দেবল” গিয়ে বীর সিং এর সাথে দেখা করে, সন্ধ্যায় গোয়ালদাম ফিরে আসবো। কিন্তু এখানে কথা বলে বুঝেছি, সেটা সম্ভব হবে না। আমরা হোটেলে ফিরে সমস্ত মালপত্র গোছগাছ শেষ করে শুয়ে পড়লাম।

আজ সতেরই আগষ্ট। বেশ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে, হাতমুখ ধুয়ে চা খেতে গেলাম। ঘুম থেকে উঠেই বীর সিং এর চিন্তা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। দোকানে গিয়ে দেখি বেঁটে মতো, নেপালীদের মতো পাহাড়ি চেহারার একজন ভদ্রলোক, চেয়ারে বসে আছেন। সামনে শেষ করা ছোট একটা মদের বোতল। দোকানের একজন, নতুন একটা বোতল বাইরের কোন দোকান থেকে এনে, তাঁর টেবিলে রাখলো। ভদ্রলোকের বোধহয় ঠান্ডা লেগেছে। তিনি চায়ের গ্লাশ বারবার চোখের কাছে এনে গরম ভাব নিচ্ছেন। গতকাল সন্ধ্যার পর এই ভদ্রলোক আমাদের হোটেলে উঠেছিলেন। ইনি ঐ হোটেলে ওঠায়, হোটেল মালিক কিন্তু মোটেই খুশী হন নি। পরে হোটেল মালিকের কাছে শুনেছিলাম যে ভদ্রলোকের নাম পি.ডি.লামা। উনি একটা আমেরিকান দলকে নিয়ে এভারেষ্ট জয় করেন। ওনার অনেক ছেলেমেয়ে। ভদ্রলোক কুমায়ন মাউন্টেনিয়ারিং ইনষ্টিটিউটের চেয়ারম্যান। অনেক টাকা মাইনে পান। আবার আমেরিকা থেকেও নাকি প্রতিমাসে একটা বড় অঙ্কের টাকা পেনশন পান। গতকালও এঁকে অনেকগুলো বোতল শেষ করতে দেখেছি। হোটেল মালিককে ওগুলো আনার ব্যবস্থা করতে হয়, হোটেল ভাড়াও নাকি ঠিকমতো পাওয়া যায় না। অথচ উনি যখনই গোয়ালদামের বাইরে যান, এই হোটেলে রাত কাটান। ঐ রকম নামী, ধনী একজন, কেন এইরকম একটা অনামী, নোংরা হোটেলে থাকেন বলতে পারবো না। যাহোক্, চা জলখাবার খেয়ে, আমরা স্টেট্ ব্যাঙ্কটা কোথায় দেখে আসলাম। সাড়ে দশটায় ব্যাঙ্ক খোলে, ব্যাঙ্ক খুললে ট্রাভেলার্স চেক ভাঙ্গাতে যেতে হবে।

আজকের আবহাওয়া খুব সুন্দর। নীল আকাশ, ঝলমলে রোদে গোয়ালদাম রৌদ্রস্নান সারছে। এখানে এসে শুনলাম দিন তিনচার হ’ল বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে। তার আগে প্রতিদিন ভাল বৃষ্টি হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে এক তারিখে আসা হয়নি, ভালই হয়েছে। কিন্তু এ ভাল কতক্ষণ থাকবে তার তো কোন স্থিরতা নেই। বেলা বেশ বেড়ে গেল, বীর সিং এর পাত্তা নেই। গতকালের সেই দোকানদারের কাছে গেলাম। ভদ্রলোক জানালেন বীর সিং না আসলে তিনি দেবলে যে ডাক নিয়ে যায়, তার হাতে বীর সিংকে চিঠি দিয়ে সব জানিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবেন। আমাদের হোটেল মালিক অবশ্য বলেছিলেন এর আগে ছয়জনের যে দলটা রূপকুন্ডের উদ্দেশ্যে গেছে, তাদের গাইড না আসায়, তাঁর ছেলে তাদের কুলির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কুলিরা তাদের মালপত্র দেবলে পৌঁছে দেবে। ওখান থেকে গাইড পেতে অসুবিধা হবে না। কাজেই আমাদের গাইড না আসলে, ভদ্রলোক ছেলেকে বলে কুলির ব্যবস্থা করে দেবেন। একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেলেও চিন্তা শতগুনে বাড়লো। বীর সিং বা তার ছেলে গঙ্গা সিং, ঐ দলটার গাইড হিসাবে চলে যায় নি তো? সম্ভাব্য খরিদ্দার কখনই নিশ্চিত খরিদ্দারের থেকে ভাল হতে পারে না।

বেলা আরও বাড়লে, আমরা নিজেরাই পোষ্ট অফিসে গেলাম। সেখানে একজন যুবক কর্মীকে সমস্ত ব্যাপারটা জানালাম। যুবকটি বেশ ভদ্র্র। আমাদের সব কথা সে মন দিয়ে শুনে জানালো- বীর সিংকে সে চেনে। আমাদের সে বীর সিং এর উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখে দিতে বললো। একটু পরেই দেবল থেকে ডাক আসবে, তার হাতে সে আমাদের চিঠিটা দিয়ে দেবে। পোষ্ট অফিসে কাগজ পাওয়া গেল না। আমাদের সঙ্গেও এই মুহুর্তে চিঠি লেখার মতো কাগজ নেই। আশেপাশে অনেকগুলো দোকান ঘুরেও কাগজ পেলাম না। শুধু কাগজ নয়, এখানে একটা দোকানেও সিগারেট পাওয়া গেল না। রাস্তায় গাইড, কুলির জন্য কিছু সস্তার সিগারেট নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। বাধ্য হয়ে বিড়ি কিনে নেওয়া হ’ল।

হঠাৎ দেখি একদল বাচ্ছা ছেলে বইখাতা হাতে স্কুলে যাচ্ছে। তাদের একজনের কাছ থেকে একটা খাতার পাতা ছিঁড়ে নিয়ে, গতকাল রাতে যে হোটেলে খেয়েছিলাম, সেই হোটেলের ছেলেটাকে দিয়ে বীর সিংকে একটা চিঠি লিখিয়ে নেওয়া হ’ল। ছেলেটা চিঠিটা একটা সাদা খামে পুরে মুখ বন্ধ করে দিল। আমরা চিঠিটা পোষ্ট অফিসে দিয়ে আসলাম। ওখান থেকে ফিরে, ঘুরতে ঘুরতে দেবল যাবার রাস্তা দিয়ে একটু নেমেছি, দু’-তিনজন লোক আমাদের পাশ দিয়ে ওপরে উঠে গেল। এমন সময় সেই বৃদ্ধ দোকানদার আমাদের ডেকে জানালেন, বীর সিং এসে গেছেন। আমরা ফিরে এসে দেখলাম আমরা এইমাত্র বীর সিং এর পাশ দিয়েই নীচে নামলাম। বীর সিং হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক্ করলেন। আমি আনন্দে তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম। ভদ্রলোকের বয়স হয়েছে। শুনলাম তাঁর বয়স পঞ্চান্ন-ছাপান্ন। কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় এখনও যথেষ্ট ক্ষমতা ধরেন। তিনি আমাদের সাথে হোটেলে এলেন। সঙ্গে দু’জন লোক। বোধহয় কুলি হবে। তিনি ভীষণ তাড়াতাড়ি কথা বলেন, বললেন গতকাল সন্ধ্যায় তিনি গঙ্গা সিংকে আমাদের খোঁজে পাঠিয়েছিলেন। গঙ্গা সিং টুরিষ্ট বাংলোয় আমাদের আসার খোঁজ করে, আমাদের না পেয়ে ফিরে গেছে। তিনি আরও জানালেন যে তিনি টুরিষ্ট বাংলোয় আমাদের আসার কথা বলে রেখেছিলেন, কারণ তাঁর ধারণা ছিল আমরা নিশ্চই ওখানেই উঠবো। আশ্চর্য ব্যাপার। গতকাল ওখানকার কেয়ারটেকার শুনলো আমরা রূপকুন্ড যাব, অথচ সে গঙ্গাকে কিছু বললো না?

বীর সিং ও তাঁর সঙ্গীদের বিড়ি দিলাম। তিনি অনেক কথা অনর্গল বলে গেলেন।  তিনি  কথা  বললেই  বোঝা যায়, তাঁর  হাঁপের  টান  আছে।  আমরা  শঙ্কু মহারাজ, প্রাণেশ চক্রবর্তীর  কথা  জিজ্ঞাসা  করাতে,  তিনি  হাত  জোড়  করে  নমস্কার  করলেন। এতক্ষণে আসলো প্রধান সমস্যা, তিনি আমাদের মালপত্র দেখতে চাইলেন। মনে মনে ভাবছি আমাদের যা লাগেজ, তাতে তিনটে কুলি নিশ্চই লাগবে। তিনি চটপট্ ব্যাগগুলো তুলে নিয়ে জানালেন, মাল যা আছে, তাতে দু’টো কুলি লাগবেই। তিনি খুব চিন্তার সঙ্গে কথাগুলো বললেও, আমরা দু’জনেই  মনে  মনে  খুব  খুশী  হ’লাম।  শেষে  তিনি  বললেন  কাল  সকালে  আমাদের  নিয়ে  রওনা  হবেন।  আমরা  যেন  ভোরবেলা  তৈরী  হয়ে  থাকি।

তিনি  চলে  গেলেন,  আমরা  ব্যাঙ্ক  থেকে  চেক  ভাঙ্গিয়ে,  আর  একবার  জিলিপি  আর  চা  খেয়ে  নিলাম। আজ ভাল করে স্নান করতে হবে। এরপর আবার কবে স্নান করার সুযোগ পাবো জানিনা। হোটেলের ড্রামে জল ধরা আছে। কিন্তু ঐ জলে স্নান করার ইচ্ছা নেই, তাই ঝরণার খোঁজে গামছা গায়ে রাস্তায় এলাম। একটা দোকানে খোঁজ করে জানতে পারলাম, মাইল খানেক দুরে স্নান করার জন্য ভাল জল পাওয়া যাবে। জলের সন্ধানে আমরা রওনা হ’ব, এমন সময় বীর সিং এর সাথে আবার দেখা হ’ল। তিনি বললেন- “এক কাজ করা যাক, আজই আমরা দেবলে চলে যাই। আমার সাথে খচ্চর আছে। কাল ভোরে ওখান থেকে কুলি-গাইড নিয়ে যাত্রা শুরু করে বিকালে ‘ওয়ান’ চলে যাওয়া যাবে”। তাঁর কাছেই এবার জানলাম, গাইড হিসাবে আমাদের সাথে তাঁর ছেলে গঙ্কা সিং যাবে। আবার সেই গঙ্গা? সে কেমন ব্যবহার করবে কে জানে। বীর সিং জানালেন তাঁর ছেলে বেশ জোয়ান আছে। সঙ্গে দু’জন জোয়ান ভাল কুলি দিয়ে দেবেন। কিছু বলার নেই।

আমরা বললাম আমরা স্নান সেরে এসে খাওয়া দাওয়া করে, তৈরী হয়ে নিচ্ছি। তিনি আমাদের একটু তাড়াতাড়ি করতে বলে চলে গেলেন। আমরাও আমাদের গন্তব্য স্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বেশ কিছুটা পথ হেঁটে জায়গাটা পাওয়া গেল। রাস্তা থেকে অনেকটা নেমে পরপর দুটো বাড়ির পাশ দিয়ে গিয়ে একটা জায়গায় দেখলাম, মাটি থেকে সামান্য উচুতে একটা পাইপ থেকে জল পড়ছে। পাইপটা দ্বিতীয় বাড়িটার পাশের দিকে। পাইপটা এত কম উচ্চতায় অবস্থিত, যে একটা মগ্ না পেলে, স্নান করা যাবে না। আমি ঐ দুটো বাড়ি থেকে একটা মগ্ চাইতে গেলাম। বাড়ি না বলে পরপর দুটো ঘর বলা-ই বোধহয় ঠিক হবে। প্রথম ঘরটা, মানে কলের পাইপের কাছেই যে ঘরটা, সেখানে মগ্ পাওয়া গেল না। দ্বিতীয়টা অন্য লোকের। সেটার সামনে গিয়ে দেখি, ঘরের গৃহিণী রান্নায় ব্যস্ত। সামনে খুব ছোট দুটো বাচ্ছা খেলা করছে। মহিলাটি আমায় দেখে একটু অবাক হ’ল। আমি স্নানের জন্য একটা মগ্ চাইলাম। বাচ্ছাদুটো তাদের বাবাকে ডাকলো। সঙ্গে সঙ্গে এক ভদ্রলোক বেড়িয়ে এসে, আমি কোথা থেকে আসছি, কোথায় উঠেছি, কোথায় যাব, এখানে কী প্রয়োজন, ইত্যাদি প্রশ্ন করে, শেষে একটা টিনের কৌট দিলেন। আমি আবার প্রথম ঘরটার পাশ দিয়ে, ধান বা গমের জমির মধ্যে দিয়ে, জলের পাইপের কাছে নেমে এলাম। দু’জনে পরপর স্নান সেরে, জামা প্যান্ট পরে, উপরে উঠে এলাম। প্রথম ঘরটার কাছে বাচ্ছা দুটো ও একটা বিরাট আকারের কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম ঘরের বাসিন্দারাও পাশেই আছে। শীতাংশু আমার আগে আগে যাচ্ছে। আমি একটা বাচ্ছার গালে হাত দিয়ে আদর করতেই, কুকুরটা তেড়ে এসে প্রায় আমার গায়ে উঠে পড়লো। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। ওটার যা গতর, কামড়ালে পাঁচ চোদ্দং সত্তরটা ইঞ্জেকশনের কমে কিছু হবে বলে মনে হয় না। কুকুরটা  কিন্তু  কিছু  করলো  না।  শীতাংশু  এগিয়ে  গেল।  আমি  যেই  এগোতে  গেলাম,  অমনি  সেটা  আবার  আগের মতো তেড়ে এল। এরপর দেখি আমি দাঁড়িয়ে থাকলে ওটা কিছু করে না, কিন্তু একটু নড়লেই, বা একটু এগবার চেষ্টা করলেই, তেড়ে আসে। প্রথম ঘরের বাসিন্দারা কিন্তু এ ব্যাপারে নিশ্চুপ। বাধ্য হয়ে আমি ওদের কুকুরটাকে ধরতে বললাম। ওরা একটা কাঠি দিয়ে কুকুরটাকে তাড়িয়ে দিয়ে বললো, বাচ্ছার গালে হাত দেওয়ার জন্য ওটা ওরকম করছে। আমরা দ্বিতীয় ঘরে মগটা ফেরৎ দিয়ে, রাস্তায় উঠে এলাম এবং একবারে খাওয়া দাওয়া সেরে নিজেদের ঘরে এলাম। শীতাংশু গেল বীর সিং এর সাথে দেখা করে চাল, ডাল, আটা, ইত্যাদি কিনতে। আমরা হোটেলের চার বেডের একটা ঘর নিয়ে আছি। কথা ছিল ষোল টাকা ভাড়া দিতে হবে। কিন্তু চারটে বেডের দুটো বেডে, ছাদ থেকে জল পড়ায়, আমি হোটেল মালিককে ডেকে পাঠালাম। কিছুক্ষণ পরে তার ছেলে আসলে তাকে বেডের অবস্থা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, চারজন লোকের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, আর দু’জন লোক থাকলে তারা কোথায় শুতো? ছেলেটা বিছানার অবস্থা দেখে, আমাকে বার টাকা ভাড়া দিতে বললো। যাহোক্ ভাড়া মিটিয়ে, সমস্ত মাল একজায়গায় গুছিয়ে রেখে, রাস্তায় এলাম। ওদের অনেক খোঁজার পরে, দেখলাম শীতাংশু ও বীর সিং একটা দোকানে চাল, ডাল, আটা, ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনছেন। বীর সিং নিজেও একটা বড় বস্তায় ময়দা, একটা বড় দেশলাই এর প্যাকেট ইত্যাদি কিনছেন। বোধহয় দেবলে তাঁর দোকান আছে। বীর সিং এর এ অঞ্চলে দেখলাম খুব সম্মান। প্রায় সকলেই তাঁকে হাত তুলে নমস্কার করছে। তাঁর কথামতো একটু ওপরে একটা দোকান থেকে হলুদ ও লঙ্কা গুঁড়ো কিনে নিলাম। নীচে এসে দেখি দুটো খচ্চর দাঁড়িয়ে আছে। বীর সিং ও অপর দু’জন তাতে আমাদের ও ওদের মালপত্র বেঁধে ঠিক করে রাখছেন। একটা দোকান থেকে একটা মোমবাতি কিনে নিলাম। সঙ্গে অবশ্য আরও দুটো আছে। খচ্চর নিয়ে গিয়ে হোটেল থেকে সব মালপত্র গুছিয়ে বাঁধা হ’ল।

এরপর তৃতীয় পর্বে……।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s