রূপকুন্ডের হাতছানি –প্রথম পর্ব {লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary , Tour Picture এবং ভালো ছবি ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

Self (42)হিমালয়ের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। তা না হ’লে ১৯৭৯ সালের আগষ্ট মাসে ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্স, হেমকুন্ড সাহেব, বদ্রীনারায়ণ, মানা হয়ে বসুধারা, ত্রিযুগীনারায়ণ, কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী, গোমুখ, যমুনোত্রী দর্শণ করে ঘরে ফেরার সাথে সাথে, আবার কেন হিমালয়ে যাবার নতুন করে টান অনুভব করবো? কথায় বলে সব ভাল যার শেষ ভাল। হয়তো গতবার সব শেষে যমুনোত্রী যাওয়াটাই ভুল হয়েছে। সবক’টা জায়গার মধ্যে, ঐ যমুনোত্রীর সৌন্দর্যই বোধহয় সবচেয়ে কম। তাই দেখা হয়েছে, কিন্তু মন ভরেনি।

তাই বছর না ঘুরতেই, হিমালয়ে যাবার টানটা এত প্রবল হ’ল, যে পরের বছর আগষ্ট-সেপ্টেম্বরে ফের ঘর ছাড়া হতে হ’ল।  ডালহৌসী, ধরমশালা, জ্বালামুখী, পালামপুর, খাজিয়ার, কুলু, মানালী, মণিকরণ ইত্যাদি, হিমাচল প্রদেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরলাম, দেখলাম, কিন্তু পায়ে চলার যে একটা বিশেষ আনন্দ আছে, কষ্ট আছে, বাসে বাসে ঘোরায় সে আনন্দ কোথায়? তাই চাম্বা, ভারমোর, খাড়ামুখ, হাডসার, ধানচো হয়ে দর্শণ করলাম অধুনা হর-পার্বতীর বাসস্থান, ভারতীয় কৈলাশ “মণিমহেশ”। বেশ কষ্টকর রাস্তা, অথচ এই কষ্টের শেষে মন ভরলো না।  খারাপ আবহাওয়া আর মেঘ, মণিমহেশ শৃঙ্গকে, আমাদের সাথে পুরোপুরি পরিচিত হবার সুযোগ দিল না। ফিরে এসে বেশ কয়েক মাস আনন্দেই দিন কাটলো। তারপরই দেখি সেই পুরানো রোগটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কোথাও চলো, বেড়িয়ে পড়ো। কিন্তু যাই কোথায়? মনের মধ্যে তো অনেক জায়গাই ভিড় করে আসছে। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে একটা জায়গাই যেন প্রবল ভাবে হাতছানি দিচ্ছে। ফিস্ ফিস্ করে বলছে– আমায় দেখবে না? আমার কাছে আসবে না? ওখানকার শত শত কঙ্কাল যেন অভিমান করে বলছে, যে জায়গা দেখতে গিয়ে আজ আমাদের এই পরিণতি, সেই জায়গার প্রতি কী তোমাদের কোন টানই থাকবে না? হলামই বা আমরা মৃত, তবু একবার আমাদের না হয় দেখেই গেলে। এ ডাককে এড়িয়ে যাবার, উপেক্ষা করার, ক্ষমতা আমার নেই। অতএব ঠিক করলাম, এবার রূপকুন্ড যাবই।

অসাধারণ লোকেরা বলবেন রূপকুন্ডে যাবে? তা এর মধ্যে চিন্তার আছেটা কী? বেড়িয়ে পড়ো। কিন্তু আমরা যে অতি সাধারণ, না আছে অভিজ্ঞতা, না আছে সহায় সম্বল। তাই চিন্তা হয় বৈকি। ঠিক করলাম মে মাসেই যাব। সঙ্গী হিসাবে এগিয়ে এল সহকর্মী সুভাষ দে। “ইনটূর” নামে দক্ষিণ কলকাতার একটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। এদের কাছে স্লীপিং ব্যাগ পাওয়া যাবে। ভাড়াও খুব একটা বেশী নয়। তবে সিকিউরিটি মানি হিসাবে প্রতিটি স্লীপিং ব্যাগের জন্য চার শত টাকা করে জমা রাখতে হবে। চিন্তার কথা, চার’শ টাকা যদি জমাই রাখবো, তবে যাব কী নিয়ে? তবু উপায় না থাকায়, ঐ শর্তেই রাজী হতে হ’ল। কিন্তু সতেরই মে থেকে অন্য একটা দল, ঐ সব স্লীপিং ব্যাগ, তাঁবু, ইত্যাদি ভাড়া নেবার জন্য টাকা অ্যাডভান্স্ করে গেছে। আমার ইচ্ছা ছিল, মে মাসের পনের-ষোল তারিখ নাগাদ যাত্রা শুরু করার। কিন্তু বাধ্য হয়ে যাত্রার তারিখ পাঁচই মে তে এগিয়ে আনতে হ’ল। এর মধ্যেও ওদের একটা শর্ত আছে, যেটা অতি ন্যায্য এবং যুক্তিসঙ্গত। রাস্তায় যত বাধা বিপত্তিই আসুক, পনেরই মের মধ্যে জিনিসগুলো ওদের ফেরৎ দিতেই হবে। দরকার হলে মাঝ রাস্তা থেকে ফিরে এসেও ফেরৎ দিতে হবে। সুভাষ দে’র যাবার আগ্রহ যথেষ্ট। কিন্তু ও সমস্ত কিছু দায়িত্ব, সমস্ত কিছু চিন্তার ভার, আমার ওপর ছেড়ে দিয়েছে। আমাদের মনে হ’ল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমরা ফিরে আসতে পারবো। তাই ঐ শর্তেই রাজী হয়ে গেলাম। প্রতিষ্ঠানটির একজন অভিজ্ঞ ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, মে মাসের প্রথম দিকে ওখানে যাওয়া যাবে তো? ভদ্রলোক জানালেন একটু বেশী বরফ হয়তো হতে পারে, কিন্তু না যেতে পারার কোন কারণ নেই।

যাওয়া যাবে কী যাবে না, এই নিয়ে যখন দোটানায় রয়েছি, তখনই আলাপ হ’ল আমার এক সহকর্মী, শ্রী নন্দ দুলাল দাস এর সঙ্গে। ভদ্রলোকের পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা অনেক। নন্দদা বললেন, মে মাসে ওখানে যাবেন না। মে মাসে ওখানে আমাদের মতো একবারে সাধারণ, অনভিজ্ঞ লোকের পক্ষে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া গাইডের সাথে আগে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা করতে হবে। সব দিক চিন্তা করে ওখানে দাঁড়িয়েই ঠিক করলাম, মে মাসের পরিবর্তে আগষ্ট মাসের মাঝামাঝি যাব।  নন্দদা সহকর্মী হিসাবে আমাদের স্লীপিং ব্যাগ দিতে রাজী হয়ে গেলেন। ভাড়া প্রায় একই রকম। তবে চেনা জানার মধ্যে বলে, কোন সিকিউরিটি ডিপোজিট্ লাগবে না। আমার সঙ্গে সেদিন আবার এক সহকর্মী, শীতাংশু রায় ছিল। ও আমার সাথে একই শাখায় কাজ করে। ঐখানে দাঁড়িয়েই সে আমার রূপকুন্ড যাত্রার সঙ্গী হয়ে গেল। কথাবার্তা পাকা করে আমরা ফিরে এলাম। আমাদের সঙ্গে যাবার জন্য এগিয়ে এল, আরও তিনজন। অমল চৌধুরী, শ্যামল মুখার্জ্জী, ও সরল ভট্টাচার্য্য। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যে সুভাষদে’র মা হঠাৎ মারা গেলেন। আমরা যদি মে মাসে যেতাম, তাহলে সুভাষ দে’র সাথে ওর মা’র আর কোনদিন দেখা হ’ত না। এই ঘটনার পর স্বাভাবিক ভাবে সুভাষ দে’র আর আগষ্ট মাসে যাওয়া সম্ভব নয়। আমরা চারজন পয়লা আগষ্টের কাঠগুদামের টিকিট কাটলাম। ইতিমধ্যে সরল ভট্টাচার্য্য, শরীর খারাপের জন্য দল থেকে বেরিয়ে গেছে। গাইড বীর সিং এর সাথে চিঠিতে যোগাযোগ করলাম। সমস্ত রকম যোগাযোগ, ব্যবস্থা ও কেনাকাটার ভার যথারীতি আমার ওপর এসে চাপলো। আমার অফিসের এক বয়স্ক কর্মী, রাম ওউধ পাঠক, উত্তর প্রদেশের সুলতানপুর এর বাসিন্দা, তাকে দিয়ে বীর সিংকে হিন্দীতে চিঠি লিখলাম। বীর সিং নেগী আমার চিঠির উত্তরে জানালেন, তিনি আমাদের নিয়ে রূপকুন্ড যেতে রাজী আছেন। এখান থেকে যাবার সময় তাঁর জন্য একটা ছয় নম্বর হান্টার সু নিয়ে যাবার কথাও চিঠিতে জানাতে ভুললেন না। সে ব্যবস্থাও করা হ’ল। কেনাকাটাও প্রায় শেষ, এমন সময় যাবার ঠিক দিন সাতেক আগে, হঠাৎ আমার প্রচন্ড জ্বর হ’ল। নানা রকম কড়া ওষুধ খেয়েও পাঁচ দিনের আগে জ্বর কমানো গেল না। শরীর খারাপ হলেও যাবার ইচ্ছা ও মনের জো্‌র, তখনও কিন্তু আমার এতটুকু কমে নি। আমি যাবার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু আমার এই অবস্থায় আর সকলে যেতে সাহস করলো না। ফলে প্রচন্ড অনিচ্ছা ও মানসিক যন্ত্রনা নিয়ে, যাবার দু’দিন আগে, ঊনত্রিশ-এ জুলাই আমাদের ট্রেনের টিকিট বাতিল করা হ’ল। ওঃ! সে যে কী কষ্ট, বোঝাতে পারবো না। পরপর দু’রাত আমার ভাল ঘুম হ’ল না। পয়লা আগষ্ট হাওড়া স্টেশন না গিয়ে, অফিস জয়েন করলাম। আমার জন্য সকলের যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, নিজেকে যেন কিরকম অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু তার থেকেও খারাপ লাগলো আমার জন্য যাওয়া বন্ধ হওয়ায়, সকলের ব্যঙ্গোক্তি। এদের অধিকাংশই কিন্তু জীবনে পুরী, দিঘার বাইরে জগৎ দেখে নি।

ঐ দিনই মনস্থির করলাম এ মাসেই রূপকুন্ডু যাব। কেউ না যায়, আমি একা যাব। শ্যামল মুখার্জ্জীর সাথে দেখা করে অনুরোধ করলাম যাবার জন্য। সে জানালো কাঠগুদামের টিকিট বাতিল করতে হওয়ায়, সে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী যাবার জন্য টিকিট কেটেছে। বললাম ও সব জায়গায় ভবিষ্যতে যাবার অনেক সুযোগ আসবে, কিন্তু রূপকুন্ড যাবার সুযোগ হয়তো আর পাবে না। সঙ্গী পাওয়া তো ভাগ্যের কথা। কাজেই গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী যাবার টিকিট বাতিল করে চলো আমার সাথে। ও জানালো সামনের বছর যদি যাই, তাহলে ও আমার সাথে যেতে পারে। সামনের বছর কেন সামনের মাসেও নয়, এই আগষ্ট মাসেই আমি যাব।

যোগাযোগ করলাম অমল চৌধুরীর সাথে। ও আমার সহপাঠী, সহকর্মী শুধু নয়। আমার মণিমহেশ যাবার সঙ্গীও ছিল। কিন্তু অমলও শরীর ও পড়াশোনার অজুহাতে, সযত্নে নিজেকে দল থেকে আলাদা করে নিল।

আমার তখন পাগলের মতো অবস্থা। একা যাব বললেই তো আর যাওয়া যায় না। শেষ চেষ্টা করলাম শীতাৎশুকে অনুরোধ করে। প্রথমে ও যেতে রাজী হ’ল না। কারণ নাকি আমাদের যাওয়া বাতিল হওয়ায় ওর মন ভেঙ্গে গেছে। পরে শুনলাম আমার অসুস্থতার জন্য ওদের যাওয়া বাতিল হওয়ায়, অফিসের অনেকেই ওর উদ্দেশ্যে অনেক ব্যাঙ্গোক্তি করেছে। ওর শাঁখা সিঁদুর পরে থাকা উচিৎ, একা যেতে ভয় পায় ইত্যাদি। সত্যি, এই এক শ্রেণীর মানুষ, মন্তব্য করার সময় সকলের আগে এরা আছে। অথচ দুঃখের বিষয়, এদের অনেকেই জীবনে কোথাও কখনও যায় নি, অথবা গেলেও সুসজ্জিত শহর অঞ্চলেই গেছে। তাই পুরী আর রূপকুন্ড, এদের কাছে এক, বা হেঁটে তারকেশ্বর যাওয়া আর রূপকুন্ড যাওয়া একই ব্যাপার। যাহোক্, বহু অনুরোধর পর ও যেতে রাজী হ’ল বটে, তবে এক শর্তে। যাবার আগে পর্যন্ত অফিসে কাউকে কিছু জানানো চলবে না। ওর শর্তে রাজী হয়ে পরের দিনই টিকিট কাটলাম। যাবার দিন স্থির হ’ল চোদ্দই আগষ্ট, ঊনিশ’শ একাশি সাল। কেউ জানলো না ভিতরে ভিতরে আমরা দু’জন আবার প্রস্তুত হচ্ছি। বীর সিংকে আবার চিঠি দেওয়া হ’ল। বাধ্য হয়ে এবার হিন্দীতে আমিই লিখলাম। এত অল্প সময়ে সে এই চিঠি হাতে পাবে কিনা, বা পেলেও আমার মতো হিন্দীতে পন্ডিত লোকের লেখা চিঠি, সে পাঠোদ্ধার করতে পারবে কিনা, যথেষ্ট সন্দেহ থেকেই গেল। যাবার দু’চারদিন আগে আমি অফিসে জানালাম আমি যাচ্ছি। শীতাংশু যাচ্ছে এটা অনেকে জানলো, অনেকে জানলো না।

অফিসের সলিল দে আমাদের জন্য চিড়ে, বাদাম ভাজা, মুড়কি দিল। অফিসেরই সমীরণ ঘোষাল দিল কফির প্যাকেট। পাড়ার এক বৌদি দিল চানাচুর। যাবার আগের দিন লোড শেডিং এর মধ্যেও সমস্ত জিনিস লিষ্ট্ মিলিয়ে ব্যাগে পুরলাম। যাবার দিন অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়িই বেড়িয়ে পরলাম। কেনাকাটা, গোছগাছ এখনও অনেক বাকী আছে। ওটা সবটাই আমাকে একাই করতে হবে। আশ্চর্য হয়ে গেলাম, যখন দেখলাম অফিসের অনেকেরই ধারণা, আমাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। সেই মুহুর্তে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছিল। সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি চলে এলাম। বাকী টুকিটাকি জিনিসপত্র কেনাকাটা করে, সব গুছিয়ে ফেললাম। রাত আটটার পাঞ্জাব মেল আমাদের নিয়ে যাবে। বিকেলবেলা শীতাংশু আসলো। যথা সময়ে সমস্ত মালপত্র নিয়ে আমরা হাওড়া স্টেশনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম।

হাওড়া স্টেশনে আমার নিজস্ব কিছু বন্ধুবান্ধব ছাড়া অফিসের সলিল দে এবং তপন গাঙ্গুলী এসে হাজির। কথাবার্তার মধ্যে কখন রাত আটটা বেজে গেল। আস্তে আস্তে ওদের আমাদের মধ্যে দুরত্ব বাড়তে লাগলো। সুন্দর দুটো বার্থ পাওয়া গেছে। আমাদের সামনেই কয়েকজন চেনা মুখ। এরা আমাদের হেড অফিস ও অন্যান্য শাখার কর্মী। আমরা জানালার ধারে মুখোমুখি সিট্, বা ওপর নীচের বার্থ পেয়েছি। আমার ঠিক পিছনের সিঙ্গল আমাদের মতো সিটটায়, সার্টপ্যান্ট পরা এক যুবতী। খুব স্মার্ট। নিজের থেকেই আমাদের সাথে আলাপ করলো। নাম অনিতা। রেলে চাকুরী করে। মেয়েটির চেনাশোনা ছয়জন ছেলে রূপকুন্ড গেছে, গাইড নাথু সিং। তবে খবর পাওয়া গেছে নাথু সিং অসুস্থ। মেয়েটি আমাকে বললো ঐ ছেলেগুলোর সাথে দেখা হলে যেন, আমরা আলাপ করি এবং তার কথা বলি। অনিতা জানালো সে নিজেও ট্রেকিং করে। দার্জিলিং থেকে জুনিয়র মাউন্টেনিয়ারিং ট্রেনিং নিয়েছে। সামনের মাসে মণিমহেশ যাবে। এখন অফিসের কাজে অমৃতসর যাচ্ছে। সঙ্গে দু’জন অফিসকর্মী। অন্য একজন যাত্রীকে সঙ্গী করে, ওরা চারজন তাস খেলতে শুরু করলো। বেশ বুঝতে পারছি জুয়া খেলছে। জানালার মুখোমুখি আমি ও শীতাংশু। গল্পগুজবে বেশ সময় কেটে যাচ্ছে। মনে কিন্তু একটা চিন্তা সবসময় ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে- বীর সিং আমার চিঠি পেয়েছে তো? সে গোয়ালদামে আমাদের সাথে দেখা করবে তো? পয়লা তারিখে যাওয়া বাতিল করে চোদ্দ তারিখে যাবার কথা জানিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পোষ্টঅফিস থেকে পোষ্ট করা তিনটে চিঠি দিয়েছি। একটা টেলিগ্রাম করার কথা চিন্তা করেছিলাম, কিন্তু হয়ে ওঠেনি। যদি বীর সিং চিঠি পায়ও, সে আমাদের কথা বিশ্বাস করবে তো? আমাদের রূপকুন্ড যাবার ইচ্ছা বা সাহস নেই, শুধু শুধু চিঠি দিচ্ছি ভাববে না তো? ভাবা অবশ্য উচিৎ নয়, কারণ আমি মোট খান দশেক খাম বা পোষ্টকার্ড পাঠিয়েছি। তার ওপর আবার আর এক চিন্তা। যাবার আগে শুনে গেছি বীর সিং হাঁপানির জন্য এখন নিজে না গিয়ে, ওনার ছেলে, গঙ্গা সিংকে পাঠান। গঙ্গা সিং নাকি লোক ভাল নয়। জুলুম করে টাকা আদায় করে। শঙ্কু মহারাজের রূপকুন্ডের উপর লেখা একটা বই-এ রামচাঁদ নামে একজন গাইড এর, ঐ প্রকৃতির চরিত্রের কথা পড়েছি। ঐ অঞ্চলে আমরা তো পুরোপুরি গাইড-কুলির হাতের পুতুল হয়ে থাকবো। সব থেকে বড় চিন্তা, অনিতা নামে ঐ মেয়েটার পরিচিত ঐ ছয়জনের দলটা নাথু সিংকে না পেয়ে বীর সিংকে গাইড হিসাবে নিয়ে যায় নি তো? সব রকম প্রস্তুতি লিষ্ট্ করে নিয়ে গেলেও, নানা চিন্তা মনের কোনে উঁকি দিচ্ছে। কারণ এইসব পথে যেতে গেলে অনেক কিছুই সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, যেগুলো আমাদের পক্ষে নিয়ে যাওয়া বা ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। তার প্রধান কারণ পরিচিতি এবং পয়সার অভাব। আমাদের সামান্য স্লীপিং ব্যাগের সিকিউরিটি ডিপোজিট নিয়েই সমস্যায় পড়তে হয়। সঙ্গে টেন্ট্ নিয়ে যাই নি। রাস্তায় বৃষ্টির জন্য আটকে পরলে থাকবো কোথায়? সব জিনিস গুছিয়ে নিলেও কোন হাঁড়ি, ডেকচি বা প্রেসার কুকার সঙ্গে নেওয়া হয় নি। নেওয়া হয় নি, কারণ লক্ষ্ণৌতে শীতাংশুর এক দাদা থাকে, তার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হবে বলে শীতাংশু আমাকে এখান থেকে অযথা বয়ে নিয়ে যেতে বারণ করেছে। ওখানে না পাওয়া গেলে কিনে নেওয়া হবে। অথচ লক্ষ্ণৌ পর্যন্ত আমরা তো ট্রেনেই যাব, তাহলে আর বয়ে নিয়ে যাবার হ্যাপা কোথায় ওই জানে। সঙ্গে বড় বড় তিনটে পাশ বালিশের কভারের মতো ব্যাগ এবং একটা কিট্ ব্যাগ। চারটে ব্যাগই প্রচন্ড ভারী, দু’টো কুলিতে হবে তো? নাকি তিনটে কুলি লাগবে? তার মানে আরও ১৬৫-১৭০ টাকার ধাক্কা। আস্তে আস্তে রাত্রি নেমে এল। আমরা খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম। রাতে ভাল ঘুম হ’ল না। এক সময় ভোর হয়ে এল।

আজ আগষ্ট মাসের পনের তারিখ। ট্রেনে আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তে শুরু করলো। আসবার আগে কাগজে পড়েছি বিহার ও উত্তর প্র্রদেশে প্রচন্ড বণ্যার কথা। ট্রেনে বসে কিন্তু কিছুই বুঝলাম না। দুপুর নাগাদ আমরা লক্ষ্ণৌ এসে পৌঁছলাম। ট্রেনে খুব ভিড়। আমরা ধরাধরি করে মালপত্র্র স্টেশনে নামালাম। একটা বড় ব্যাগ অনিতা নামের মেয়েটিকে লক্ষ্য রাখতে বলে গেছিলাম। আমরা মাল নিয়ে নামার সাথে সাথে দেখি মেয়েটি ঐ ভারী ব্যাগটা প্ল্যাটফর্মে নিজেই নামিয়ে এনেছে। ওর পক্ষেই বোধহয় এটা সম্ভব। গতকাল থেকে ট্রেনে লক্ষ্য করেছি, বিভিন্ন স্টেশনে ও নিজের এবং অন্যান্য অনেক বয়স্ক যাত্রীর খাবার জল, প্ল্যাটফর্মে নেমে ভরে আনছে। সে আমাদের যাত্রার শুভ কামনা জানালো। আমাদের মুখ চেনা, অল্প পরিচিত, সেই হেড অফিস বা অন্যান্য শাখার সহকর্মীরা কিন্তু কোন সাহায্যের হাত বাড়ায় নি।

LUCKNOW RLY. STN.  লক্ষ্ণৌ রেলওয়ে স্টেশন।

আমরা  মালপত্র  নিয়ে কাঠগুদামের  গাড়ির  উদ্দেশ্যে  নির্দ্দিষ্ট  প্ল্যাটফর্মে  রওনা  দিলাম।  গাড়ি রাত  ন’টায়।  কাঠগুদাম  যাবার  রিজার্ভেশনও  পাওয়া  গেল।  আমরা  মালপত্র   নিয়ে  দোতলায়  ওয়েটিং  রুমে  গেলাম।  ভালভাবে  স্নান  সেরে,  শীতাংশু  একটা  রিক্সা  নিয়ে  ওর  সেই দাদার  বাড়ি  গেল।  আমার  কিন্তু  মোটেই  ইচ্ছা  ছিল  না   যে, ও  এখন  কোথাও  যায়।  কোন  রকম  বিপদ  ঘটলে  যাবার  বারটা   বেজে  যাবে।  কিন্তু  ঐ  এক  হাঁড়ির  জন্য  আমাকে   মুখ  বুজে  ওর  যাওয়াকে  মেনে  নিতে  হ’ল।  আমি  মালপত্র  আগলে  বসে  থাকলাম।  ওয়েটিং  রুমের  বারান্দা  থেকে  লক্ষ্ণৌ  স্টেশনের  গম্বুজের  ওপর  চাঁদ  ওঠার  সুন্দর  দৃশ্য  দেখা  যাচ্ছে।   প্রায়  পৌনে  আটটা  বাজলো,  শ্রীমান  শীতাংশুর  পাত্তা  নেই।  এত  খারাপ  লাগছে,  ভিতরে  ভিতরে  কিরকম  একটা  টেনশন  হচ্ছে  বোঝাতে  পারবো  না। এখানকার রিক্সাগুলো এত বাজে, এত বেপরোয়া ভাবে রাস্তায় চলে যে, যেকোন মুহুর্তে একটা কিছু ঘটে যেতে পারে। একটা করে রিক্সা স্টেশনের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে, আমি খুব আগ্রহ ভরে লক্ষ্য করছি সঙ্গী ফিরে এল কী না, আর প্রতিবারই আমাকে আরও চিন্তায় ফেলে, রিক্সা থেকে অপরিচিত লোক নামছে। এবার রীতিমতো বিরক্ত লাগছে। প্রথম থেকে আমি হাঁড়ি বা ডেকচি, বাড়ি থেকেই নিয়ে আসার কথা বলে আসছি। এমন সময় একটা সাইকেলে একটা হাঁড়ি হাতে বাবু তার দাদার সাথে স্টেশনে এলেন। সেই মুহুর্তে যে কী আনন্দ ও শান্তি হ’ল বলতে পারবো না। ট্রেনের বগি ও বার্থ নাম্বার দেখে, সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে, আমরা ট্রেনে চাপলাম। শীতাংশু জানালো ওর বৌদি বলেছে, হাঁড়িটা যেন বেশী মাজা না হয়, তাহলে ফুটো হয়ে যেতে পারে।

এরপর দ্বিতীয় পর্বে………

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s