রূপকুন্ডের হাতছানি–চতুর্থ পর্ব {লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary , Tour Picture এবং ভালো ছবি ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

Self (42) বাড়িটার বারান্দায় একটা দোকান মতো। গঙ্গা একটা পলিথিন সিট্ পেতে দিল। আমরা শুয়ে বসে বিশ্রাম করতে লাগলাম। এই জায়গাটাই মান্দোলী। এখানেই আমরা দুপুরের খাবার খাব। গঙ্গা দোকানদারকে খাবারের ব্যবস্থা করতে বললো। দোকানদার আমাদের চা করে খাওয়ালো। গঙ্গার দেখলাম এখানে বিরাট পরিচিতি। রাস্তাতেও দেখেছি ওকে সবাই চেনে। আসলে বীর সিং এর পরিচয়েই ওর পরিচিতি। দোকানের উল্টোদিকে পরপর দুটো ছোট ঘর। ঐ ঘর থেকে একজন বৃদ্ধা বেরিয়ে এসে গঙ্গাকে বললো একজনের মতো খাবার তৈরী আছে। আমরা গঙ্গাকে খেয়ে নিতে বললাম। ও প্রথমে যেতে চাইলো না। কিন্তু আমরা আাবার ওকে প্রথমে খেয়ে নিতে বলাতে, সে একটা ঘরের ভিতর চলে গেল। আসলে গঙ্গা এদের পরিচিত, তাই গঙ্গাকে এরা একটু ভালমন্দ, অর্থাৎ ভাত-ডালের সাথে একটা সবজি খাওয়াতে চায়। কুলিরা এখনও এসে পৌঁছয় নি। গঙ্গা একটু পরে ঘর থেকে খেয়েদেয়ে এল। দোকানদার বোধহয় পূর্ণা গ্রামে, অর্থাৎ বীর সিং এর গ্রামে থাকে। কারণ গঙ্গাকে সে পাড়াতুত ভাই বলে পরিচয় দিল। শীতাংশু কাছেপিঠে একটু ঘুরতে গেছে। দোকানদার আমায় জানালো যে গঙ্গা, বীর সিং এর সাথে থাকে না। সে তার বাবা, মা, কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলে না। গঙ্গা বীর সিং এর একমাত্র ছেলে। দোকানদার আরও জানালো যে গঙ্গা, বীর সিং এর অনেক টাকা আজেবাজে ভাবে উড়িয়েছে। সে দারু খায়, জুয়া খেলে। বীর সিং ওর বিয়ের ব্যবস্থা করেছিল, কিন্তু কেউ ভাংচি দেওয়াতে তার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে। দোকানদার এসব কথা হঠাৎ এত লোক থাকতে আমায় কেন বলতে বসলো জানিনা। কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি এসব কথা আমাকে বলাতে, গঙ্গা বেশ অসন্তুষ্ট হচ্ছে। আমি কী করা উচিৎ ভেবে না পেয়ে গঙ্গাকে বললাম, এটা ভাল কথা নয়। সে বীর সিং এর একমাত্র সন্তান, কাজেই তার বাবা মা’র সাথেই থাকা উচিৎ। দোকানদার আবার শুরু করলো–বীর সিংকে গোটা হিন্দুস্থান চেনে। আর তার ছেলে এরকম বাঁদর তৈরী হয়েছে। এবার আমার অস্বস্তি বোধ করার পালা। আমার সামনে সে গঙ্গাকে বাঁদর বলছে, গঙ্গা বিরক্ত হয়ে আমাদের ভোগাবে না তো? দোকানদার কিন্তু থামবার পাত্র নয়। সে গঙ্গাকে বললো গঙ্গা যেন বাড়ি যায়, বাবা-মাকে রোজ পূজো করে। গঙ্গার বিয়ের ব্যবস্থা তিনিই করে দেবেন।

MANDALI  মান্দোলী।

কুলিরা এসে গেল। আমাদের খাবারও প্রস্তুত। আমি ও শীতাংশু খেতে বসলাম। গ্র্যান্ড খানাপিনার ব্যবস্থা। ভাত আর ডাল। আমাদের খাওয়া হয়ে গেলে কুলিরা খেয়ে নিল। আর কিছুক্ষণ বসে, দাম মিটিয়ে, আমরা রওনা হলাম। কুলি দু’টোর জন্য অনেক বেলা হয়ে গেল। ভাবছি আজ ওয়ান যাওয়া যাবে তো? আগেই শুনেছিলাম “লোহাজঙ্গ” এর চড়াই এ প্রানান্তকর কষ্ট। আমরা এখন সেই লোহাজঙ্গ এই যাচ্ছি। ছোট ছোট গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, চড়াই ভাঙ্গতে শুরু করলাম। হঠাৎ গঙ্গা বললো “বাবুজী এক কাজ কর, আজ লোহাজঙ্গে থেকে যাও। কাল ওখান থেকে বৈদিনী চলে যাব”। আগামীকালই আমাদের “বৈদিনী বুগিয়াল” যাবার কথা। লোহাজঙ্গ এ থাকার কথা গঙ্গা “পিলখোরাতে”ও বলেছিল। আমরা তখন আপত্তি জানিয়েছিলাম। আমরা বললাম আজকে ওয়ান যাওয়াই ঠিক হবে। তাছাড়া আমাদের হাতে ছুটিও খুব কম। শীতাংশু আমাকে বললো ওরা ইচ্ছা করে দেরী করছে। ওরা হয়তো কায়দা করে দশ দিনের বেশী সময় লাগিয়ে দেবে। যাহোক্, আমরা গঙ্গার পিছন পিছন জঙ্গলের রাস্তা ভেঙ্গে, ওপরে উঠতে শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে জঙ্গল পার হয়ে আমরা চওড়া রাস্তায় এসে উপস্থিত হলাম। এবার আমরা ওদের পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলাম। উদ্দেশ্য সেই এক। একসাথে গেলেই গঙ্গা আমাদের বারবার বিশ্রাম নিতে বলবে। রাস্তা একভাবে ওপর দিকে এঁকেবেঁকে উঠেছে। কোথাও একটু উতরাই নেই। ফলে মধ্যে মধ্যে আমাদের বিশ্রাম নিতেও হচ্ছে। গঙ্গা কখনও কখনও আমাদের ধরে ফেলছে, আবার পিছিয়ে পড়ছে। মধ্যে মধ্যে আমি ওর জন্য অপেক্ষা করে কিট্ ব্যাগের ফিতের রিংটা পরীক্ষা করে নিচ্ছি। শীতাংশু আমার থেকে অনেকটা এগিয়ে গেছে। আরও বেশ খানিকটা চড়াই ভেঙ্গে দেখি, ও বসে আছে। কাঁধের ঝোলা ব্যাগ নামিয়ে একটা পাথরের ওপর শুয়ে পড়লাম। লোহাজঙ্গ নামটা সার্থক। শরীরজঙ্গ বা দেহজঙ্গ হলে বোধহয় আরও সার্থক হ’ত। ওখানে পৌঁছতে সারা শরীরে জঙ্গ ধরিয়ে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠে পড়লাম। সিঁড়ির মতো এঁকেবেঁকে রাস্তা সোজা ওপরে উঠছে। রাস্তা যেন আর শেষ হয় না। শেষে বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ আমরা লোহাজঙ্গে এসে পৌঁছলাম।

DIDNA (2)           REST A WHILE AT DIDNAKANDE

দিদনা                                            দিদনা                                             কান্ডে

LOHAJANG                                               REST HOUSE OF LOHAJANG

লোহাজঙ্গ                                                                 লোহাজঙ্গ গেষ্ট হাউস

গঙ্গারই জয় হ’ল। আমরা ভেবে দেখলাম আগামীকাল যদি আলি বুগিয়াল হয়ে যাওয়া হয়, তাহলেও আমরা সময় মতো যাচ্ছি। কারণ আমাদের রুটচার্ট অনুযায়ী আজ আমাদের বগরীগড় থাকার কথা। গঙ্গাকে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, ফিরবার সময় ওয়ান হয়ে ফিরবে তো? গঙ্গা সম্মতি জানালো। ভাবলাম ভালই হ’ল। এখন ওয়ান যেতে গেলে সন্ধ্যার মুখে জোঁকের আক্রমনে পড়তে হতে পারে। তাছাড়া এই ফাঁকে আলি বুগিয়ালটাও দেখা হয়ে যাবে। কাজেই আজ লোহাজঙ্গেই রাত কাটাবো স্থির করে ফেললাম। আমরা পাঁচজন, টুরিষ্ট বাংলোয় গেলাম। কেয়ারটেকার একটা দরজা খুলে দিল। ভিতরটা ঘর বলে মনে হলেও, আসলে চারিদিক ঘেরা বারান্দা। তারের জাল লাগানো জানালা। গঙ্গা বললো “আমরা আজ রাতে এখানে থাকবো, বাবুদের ঠান্ডা লাগবে, ঘর খুলে দাও”। কেয়ারটেকার অনিচ্ছা সত্ত্বেও, বারান্দার বাঁপাশে প্রকান্ড ঘরটার দরজা খুলে দিল। লাইট নেই। মালপত্র নামিয়ে রেখে বাইরে এলাম। ওপরের মন্দিরটা দেখে, আমরা তারঘেরা মাঠটায় গেলাম। বেশ সুন্দর জায়গা। দুরে ঠিক যেন লাল মোরাম ঢাকা খানিকটা অঞ্চল। ওটাই ওয়ান গ্রাম। হরিশ ও কুমার এসে উপস্থিত হ’ল। গঙ্গা বাংলোতেই আছে। হরিশ এপথে আগেও অনেকবার এসেছে, তবে কুমারের এই প্রথমবার এপথে আসা। সে নেপালের লোক। এখন থাকে দার্জিলিংএ। ওখানে গাইডের কাজ করতো, কাজেই মাল বওয়ার অভ্যাস না থাকায়, ওর হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে। ওর কিন্তু নতুন জায়গা দেখবার আগ্রহ খুব। সে হরিশকে আলি বুগিয়াল যাবার রাস্তা কোন দিক দিয়ে, ওয়ান যেতে গেলে কোন দিক দিয়ে যেতে হবে, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন শুরু করলো। আরও কিছুক্ষণ মাঠটায় বসে, আমরা বাংলোয় ফিরে এলাম। হরিশ ও কুমার গেল গঙ্গার নির্দেশ মতো কাঠের সন্ধানে। আমাদের ঘরটার বারান্দাটার একদিকে রান্নাঘর। এখানে জলের খুব অভাব। বাংলোর সামনেই একটা বিরাট ট্যাঙ্ক করা আছে। কিন্তু তাতে জল নেই। কোন কালে ছিল কিনা কে জানে? কোন কারণে জল আনা হয়তো সম্ভব হচ্ছে না। বড় গাছটাকে বাঁ হাতে ফেলে, ওয়ান যাবার রাস্তা দিয়ে বেশ খানিকটা পথ গেলে, জল পাওয়া যাবে। পাথরের ওপর দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। একটা গাছের পাতার সাহায্যে, পাইপ দিয়ে জল পড়ার মতো ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওখানেই বনে জঙ্গলে সবাই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যায়। আবার সমস্ত গ্রামটার রান্নার, খাবার, বা ঘরের কাজের জন্যও ঐ জায়গা থেকেই জল বয়ে আনা হয়।

কাঠ এল। হরিশ ও কুমার তাদের খাবার জন্য চাল, ডাল, আটা কিনে নিয়ে এল। কথা ছিল বিকেল বেলা খিচুড়ি রান্না হবে। আর পরের দিনের রাস্তায় খাবার জন্য, রুটি ও তরকারী তৈরী করে রাখা হবে। সবকিছু উপকরণই আমাদের সঙ্গে আছে বা গোয়ালদাম থেকে কিনে আনা হয়েছে। কিন্তু ঐ তরকারীটা করতে যে তেল বা ঘি কিছু একটা লাগবে, এটা চিন্তাও করি নি, কিনে নিয়ে আসাও হয় নি। আর বীর সিং আমাদের রেশন কেনার সময় মনে করিয়েও দেন নি। ফলে গঙ্গা গেল তেলের খোঁজে। কিছুক্ষণ পরে গঙ্গা খালি হাতে ফিরে এল। এখানকার লোকেরা বোধহয় তেল, ঘি খায় না, কিছু পাওয়া যায় নি। অগত্যা পরের দিনের জন্য আলু সিদ্ধ করে রাখা হ’ল। এটা পরিস্কার হয়ে গেল, সারা পথে আর তেল পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ রোজই আলু সিদ্ধ আর রুটি কপালে নাচছে। সত্যি রাজকীয় খাবার আয়োজন।

আমরা দু’জন কখনও ঘরে শুয়ে বসে গল্প করে, কখনও বাইরে এসে অন্ধকারের শোভা দেখে, সময় কাটাচ্ছি। বাংলোর সামনের দিকে একটু বাঁপাশে, বহুদুরে আলোক মালায় সজ্জিত, গোয়ালদামকে দেখা যাচ্ছে। অন্ধকারে এখানে আকাশে তারার সংখ্যা যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। মধ্যে মধ্যে গোয়ালদামের আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঘরে ফিরে এলে কুমার থালায় করে আমাদের দু’জনের রাজভোগ নিয়ে এল। রুটি, আর তেল ঘি হীন এক সুস্বাদু তরকারী। আমাদের কাছে চার প্যাকেট মাখন আছে। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভেবে বার করা হ’ল না। আমাদের খাওয়া হয়ে গেলে, ওরাও খেয়ে নিল। এরপর গঙ্গা আমাদের আধ মগ করে ভারী সুন্দর কফি খাওয়ালো। বাংলোর কেয়ারটেকারও দেখি আমাদের কফি ক্লাবের সদস্য হয়ে গেছে। আর খালি পেটে যেহেতু কফি খাওয়া ক্ষতিকর, তাই কফির আগে রুটি তরকারী দিয়ে শরীরটাকে কফি সেবনের উপযোগীও করে নিল। অথচ ওই আমাদের ফাঁকা ঘরটা দিতে চাইছিল না। পরের দিনের জন্য মালপত্র গুছিয়ে ভাল করে বেঁধে নিলাম। সঙ্গে আনা মোমবাতি, জিনিসপত্রের চাপে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে গেছে। এখানে বা এরপরে আর কোথাও মোমবাতি পাওয়ার আশা নেই, তাই আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। ওরা তিনজন বারান্দায় শুয়ে গলা ছেড়ে গান ধরলো। গান শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা।

আজ ঊনিশে আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরে। কথা মতো আজ আমাদের বৈদিনী বুগিয়াল যাবার কথা। গঙ্গা অবশ্য আলি বুগিয়াল দিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। আসবার আগে অনেকেই বলেছিল, আমরা যেন একদিন অন্তত বৈদিনীতে থাকি। ওটাই নাকি এ পথের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। গঙ্গা কফি তৈরী করে নিয়ে আসলো। কফি খেয়ে মালপত্র তুলে নেওয়া হ’ল। কেয়ারটেকারকে দশ টাকা দিতে হ’ল। আমরা আস্তে আস্তে পথ চলতে শুরু করলাম। উতরাই এর পথে চলেছি। গতকালের সেই জল নেবার জায়গাটা ফেলে, আমরা নীচে নেমে চললাম। এখানেই ভোরবেলার প্রয়োজনে দু’জনে একবার এসেছিলাম। আর এখানে এসে আমি এই যাত্রার সব থেকে বিপজ্জনক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম।

জলের জায়গাটার পবিত্রতা রক্ষা করতে, জামা প্যান্ট খুলে, একটু দুরে পাথরের আড়ালে, অনন্ত আকাশের নীচে গালে হাত দিয়ে, উদাস মনে বসেছিলাম। শীতাংশু অন্য দিকে তার পছন্দ মতো জায়গা বেছে নিয়েছে। অত সকালে কোন লোকজন না থাকায়, জামা, প্যান্ট, জুতো, জলের জায়গার কাছাকাছি একটা পাথরের ওপর রেখে এসেছিলাম। কাজ সেরে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দেখি, এক পাল বাচ্ছা ছেলে, বোধহয় কোন মর্নিং স্কুলের ছাত্র, জলের জায়গায় এসে হৈচৈ করে জল খাচ্ছে, জল ছিটিয়ে খেলা করছে। আমি অশুচি অবস্থায় একটা পাথরের আড়ালে বার্থ ড্রেসে দাঁড়িয়ে আছি। অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল, তাদের বাড়ি বা স্কুলে যাবার কোন লক্ষণ নেই। নির্জন জায়গায় জামা, প্যান্ট, জুতো দেখে তারা অবাক। আমার হাতে তখন দুটো অপশন। হয় নাঙ্গা সন্ন্যাসী হয়ে, লজ্জার মাথা খেয়ে, তাদের কাছে গিয়ে, তাদের আরও অবাক করা। নয়তো আজকের যাত্রা বাতিল করে, ওদের বাড়ি যাওয়া পর্যন্ত চোরের মতো লুকিয়ে অপেক্ষা করা। শেষে কী ভেবে ওরা চলে যেতে, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসতে পেরেছিলাম, এবং স্বপোষাকেই ফিরেছিলাম।

যাহোক্, এবার শুরু হ’ল চড়াই, উতরাইয়ের পথ। এখন পর্যন্ত কিন্তু খুব কষ্টকর কোন চড়াই পাই নি। অন্তত লোহাজঙ্গের সেই প্রাণান্তকর চড়াই পার হওয়ার পর, এ পথকে কোন কষ্টকর বলে মনেই হচ্ছে না। আমরা দু’জনে অনেক এগিয়ে গিয়েছি। কুলি ও গাইডের দেখা নেই। কুলিরা তবু না হয় মাল বইছে, গঙ্গা থেকে থেকে কোথায় হাওয়া হয়ে যাচ্ছে কে জানে। আরও অনেকটা পথ পার হয়ে একটা জায়গায় আমরা বসলাম। আসার পথে একটা জায়গা দেখলাম, যেখানে তাঁবু থাকলে রাত কাটানোর পক্ষে আদর্শ জায়গা হিসাবে মনে হ’ল। আমরা নিয়ম মাফিক পাথরের ওপর বসে বাদাম ও মুড়কির ঠোঙা বার করলাম। মাটি এখনও শিশিরে ভিজে আছে। সকালের সূর্যালোক খুব আরামদায়ক। এতক্ষণে গঙ্গা ও হরিশের আগমন হ’ল। ওদের বাদাম ও মুড়কি খেতে দিলাম। গঙ্গার সাথে মুড়কি নামক বস্তুটির আগে পরিচয় হয় নি। সে অনেকক্ষণ দেখে জিজ্ঞাসা করলো “এটা কী খাবার”? নাও ঠ্যালা, মুড়কির হিন্দী কী? বললাম এটা এক প্রকার মিঠাই, এর নাম মুড়কি। সে খানিকটা মুখে পুরে জানালো, খাদ্যটা তার খুব পছন্দ হয়েছে। আগে কখনও কোন যাত্রীকে সে এই খাবার আনতে দেখেনি। এতক্ষণে কুমার এসে হাজির হ’ল। ওকেও খাবার দিলাম। আরও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠে পড়লাম। এখন পর্যন্ত যতটা পথ এলাম, তার বেশীর ভাগটাই উতরাই। গঙ্গা দুরে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বললো, বাঁদিকটা ওয়ান গ্রাম। সেই লাল রঙের জায়গাটা এখন বেশ পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। ও জানালো আরও কিছুটা পথ পার হয়ে, আমরা ডানহাতি রাস্তা ধরবো। বহুদুরে আলি বুগিয়াল যাবার রাস্তাটা ও আঙ্গুল দিয়ে দেখালো বটে, কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না, রাস্তাটা ঠিক কোন জায়গা দিয়ে গেছে। সরু আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে আমরা আলি বুগিয়ালের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম। এখন পর্যন্ত বিশেষভাবে আকর্ষণ করার মতো কোন দৃ্শ্য চোখে পড়েনি। সেই পাহাড়, সেই খাদ, দুরে জঙ্গলে ঢাকা উচু চুড়া, সেই একই দৃ্শ্য। গঙ্গা জানালো এবার চড়াই এর পথ শুরু হবে। আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, এবং নিজেকে সামনের চড়াই এর উদ্দেশ্যে তৈরী করে নিলাম।

বাঁহাতে ওয়ান যাবার রাস্তা ছেড়ে, আমরা ডানদিকে বেঁকলাম। আস্তে আস্তে রাস্তা ওপরে উঠছে, তবে ভয় পাওয়ার মতো খাড়াই নয়। দু’পাশে হাল্কা জঙ্গলের মাঝ দিয়ে রাস্তা। একঘেয়ে হাঁটা, মাঝে মাঝে ছবি তোলা, রাস্তার পাশে বসে বা শুয়ে বাদাম অথবা লজেন্স চেবানো, আবার নতুন করে পথ হাঁটা। এইভাবে কতক্ষণ হেঁটেছি জানিনা, বেলা এখন বেশ বেড়েছে। গঙ্গা বললো সামনের গ্রামে সঙ্গে নিয়ে আসা রুটি ও আলুসিদ্ধ খাওয়া হবে। ডান পাশে ছোট ছোট ছাউনির কুড়ে ঘর ইতস্তত ভাবে তৈরী করা হয়েছে। একটা ঘরের সামনে, একবারে ছোট তিনটে বাচ্ছা খেলা করছে। আর একটা বাচ্ছা বোধহয় কেবল দাঁড়াতে শিখেছে। আমি রাস্তার ওপর থেকে একটা লজেন্স দেখাতেই, একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে লজেন্সটা নিয়ে আসবার জন্য ইশারা করতে লাগলো। কিন্তু কেউ সাহস করে এগিয়ে আসলো না। আমরা লজেন্সটা নিয়ে এগিয়ে যাবার ভান করতেই, ওরা বুঝলো আর লজ্জা করাটা ঠিক হবে না। একটা বাচ্ছা আস্তে আস্তে এগিয়ে এল। তার নাম জিজ্ঞাসা করাতে, সে কী একটা নাম বললো বুঝতে পারলাম না। তার হাতে একটা লজেন্স দিলাম। এই লোভনীয় দৃশ্য দেখার পর, বাকী দুটো বাচ্ছাও এগিয়ে এসে তাদের নাম বলে লজেন্স নিল। আমরা এগতে যাব, এমন সময় ওদের মধ্যে একজন, সেই ছোট্ট, কেবল হাঁটতে শেখা বাচ্ছাটার নাম বললো। অর্থাৎ ওর ভাগেরটা দাও। আর একটা লজেন্স ওর হাতে দিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম। সামান্য একটা লজেন্স পেয়ে, ওরা যে কী খুশী হয় ভাবা যায় না। আর একটু পথ ওপরে এসে, রাস্তার বাঁপাশে একটা ছোট ঘর। সামনে পাথর পেতে খানিকটা জায়গা বারান্দার মতো করা। সেখানে খুঁটির ওপর কাঠের তক্তা পেতে কয়েকটা বেঞ্চের মতো তৈরী করা হয়েছে। বারান্দা বা উঠোনের মতো জায়গাটায়, অনেক কাঁচা পাতা ছোট ছোট করে ছিঁড়ে, শুকতে দেওয়া হয়েছে। গঙ্গা বারান্দায় উঠে এল। দু’জন বৃদ্ধ বসেছিলেন, তাঁরা আমাদের বেঞ্চে বসতে বললেন। এটা কোন দোকান, না এই দুই বৃদ্ধের বাসস্থান বুঝলাম না। গঙ্গা রুটি ও আলুসিদ্ধ বার করলো। এখানেও দেখলাম গঙ্গাকে এরা চেনে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম শুকতে দেওয়া এগুলো কী পাতা? একজন বৃদ্ধ জানালেন এগুলো তামাক পাতা। হাতে নিয়ে দেখলাম, কোন গন্ধ নেই। বাঁপাশে ছোট্ট একটা জায়গায় বাগান মতো করা। ওখানে কয়েকটা গাছকে বৃদ্ধ ভদ্রলোক আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ঐগুলো তামাক গাছ, বিড়ি তৈরী হয়। যদিও খুব উন্নত মানের নয়, তবু ওঁদের কাজ মিটে যায়।

এরপর পঞ্চম পর্বে……..

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s