রূপকুন্ডের হাতছানি–পঞ্চম পর্ব {লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary , Tour Picture এবং ভালো ছবি ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

Self (42)এখান থেকে ওয়ানের দিকে বহুদুরে একটা ঢেউ খেলানো মাঠের মতো জায়গা দেখা যাচ্ছে। খুব সুন্দর সেই দৃশ্য। একজন ভদ্রলোক, সম্ভবত মিলিটারিতে চাকুরী করেন, ওপর থেকে এসে, আমাদের পাশে বসলেন। আমরা রুটি, আলুসিদ্ধ ও কফি খেলাম। আর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, চললাম বুগিয়াল। বেশ কিছুটা সময় ঝোপঝাড় জঙ্গলের পথ ধরে ওপরে উঠতে শুরু করলাম। এটা আসলে বাইপাশ, হরিশ ও কুমার অন্য দিক দিয়ে মালপত্র নিয়ে আসছে। গতকাল লোহাজঙ্গ আসার পথে হরিশ তার পিঠের ব্যাগের সঙ্গে কেরসিন  তেলের টিনটাও বেঁধে নিয়েছিল। ঐ ব্যাগে চাল, ডাল, আটা ও অন্যান্য সমস্ত খাদ্যদ্রব্য ছিল। রাস্তায় হঠাৎ আমাদের চোখে পড়েছিল  যে ব্যাগটা টিনের তেলে অনেকটা জায়গা ভিজে গেছে। খুব ভয় পেয়েছিলাম। একে তো সমস্ত রাস্তাটা এই এক খিচুড়ি, আর রুটি আলুসিদ্ধ ছাড়া কিছুই জুটবে না, তার ওপর কেরসিনের সুগন্ধ হ’লে, ভয়াবহ ব্যাপার হবে। পরে অবশ্য সেই আশঙ্কা থেকে মুক্ত হয়েছিলাম। পলিথিন সিটে সমস্ত কিছু মোড়া থাকায়, সম্ভবত কেরসিনের গন্ধ তাদের আক্রমন করতে পারে নি। আজ তাই গঙ্গা নিজে কেরসিনের টিন হাতে করে নিয়ে পথ চলছে। তার পিঠে তার নিজের একটা ব্যাগ আর আমাদের কিট্ ব্যাগটা রয়েছে। হরিশ রোগা হলেও কিন্তু কুমারের থেকে অনেক বেশী ও ভারী মাল বইছে। এখন আমরা যে জায়গাটা দিয়ে যাচ্ছি, সেটা একটা ঘন জঙ্গল। চারপাশে বিরাট বিরাট গাছ, জায়গাটাকে আলো ছায়ায় সাজিয়ে রেখেছে। এখানে কোন রাস্তা নেই, তাই অগত্যা গঙ্গার সাথে গতি মিলিয়ে আস্তে আস্তে ওপরে উঠছি। নিজেদের এ পথ চিনে যাবার ক্ষমতা নেই। গঙ্গা কিছুটা করে পথ যায়, আর যেখানে সেখানে বসে পড়ে, আমার কাছে বিড়ি চায়। আমার এই ঘন ঘন বসে অনবরত বিশ্রাম নেওয়াটা পছন্দ না হলেও, চুপ করে আছি। শীতাংশুকে দেখছি গোমড়া মুখে বসে থাকতে। ওর বিরক্তির কারণ বুঝছি, কিন্তু এপথে কুলি গাইডকে মেনে না নিয়েই বা উপায় কী? এবার গঙ্গা এক জায়গায় বসে আমাদের বললো কুলিরা অনেক পিছিয়ে পড়েছে। ও মাঝে মাঝে সুর করে “আ—–উ—–“ করে একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ করে, যেটা অনেক দুর থেকেও শোনা যায়। এখন আবার সেরকম অদ্ভুত রকমের তীক্ষ্ণ আওয়াজ করলো। ওদিক থেকে কোন সাড়া এল না। তার মানে কুলিরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। আমরা চুপচাপ বসে আছি। সামনে বিরাট খাদ। বহুদুরে উচু পাহাড়ের শ্রেণী। তারই একটার মাথায় লোহাজঙ্গের সেই সাদা মন্দিরটা চোখে পড়লো। গঙ্গাই অবশ্য সেটা আমাদের দেখালো। খাদের বাঁদিকে পাহাড়ের শ্রেণী অবশ্য খুব কাছে। অর্থাৎ আমরা এখন যেখানে রয়েছি, তার সাথে যোগ রয়েছে। গঙ্গা হাত দিয়ে দেখিয়ে বললো ওটার ওপর উঠতে হবে। এবার হরিশ এসে উপস্থিত হ’ল। কিন্তু কুমার না আসায় চিন্তা শুরু হ’ল, কারণ ও, এপথে এই প্রথমবার আসছে। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে গঙ্গা উঠে পড়লো। বোধহয় কুমারের-ই খোঁজে। একটু এদিক ওদিক দেখে, আবার সেই তীক্ষ্ণ আওয়াজ করলো। এবার কিন্তু ওদিক থেকে কুমারেরও সাড়া মিললো। যাক্ বাঁচা গেল। কুমার এসে বসলো। একে একে ওরা এসে উপস্থিত হচ্ছে বলে, প্রত্যেককে বিশ্রামের জন্য সময় দিতে হচ্ছে। ফলে আমরা বসে বসে হাঁপিয়ে যাচ্ছি। ওরা তিনজনে একবারে খাদের ধারে এগিয়ে গিয়ে বসলো। এবার দেখি ওরা আঙ্গুল দিয়ে খাদের দিকে কী দেখাচ্ছে। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, ওরা হরিণ দেখতে পাওয়া যায় কিনা খুঁজছে। শীতাংশু যেখানে বসেছিল, সেখানেই বসে রইলো। ওর অবস্থা দেখে হাসিও পাচ্ছে, করুণাও হচ্ছে। আমারও যে খুব ভাল লাগছে তা নয়, তবু ভাল লাগাবার চেষ্টা করছি। অনেকটা “পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে” গোছের ব্যাপার। গঙ্গা জানালো সন্ধ্যাবেলা এখানে এলে অনেক হরিণ দেখতে পাওয়া যায়। আমি বললাম জায়গাটা সত্যিই খুব সুন্দর। গঙ্গা বললো “বাবুজী, এখানে থেকে যাও। তোমায় একটা কোঠি বানিয়ে দেব। এখানকার একটা ভাল লেড়কিকে সাদি করে, এখানকার বাসিন্দা হয়ে যাও”। আমি বললাম তুমিই তাই করো না কেন? সে উত্তরে বললো যে সে ব্রহ্মচারী।

যাহোক্, হাতের লেড়কি পায়ে ঠেলে, আমি উঠে পড়লাম। বাধ্য হয়ে ওরাও আমাদের সঙ্গে এগিয়ে চললো। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ওদের সাথে পথ চলছি। আরও বেশ কিছু পথ চলার পর, ডানপাশে ছোট একটা কুঁড়েঘর দেখতে পেলাম। ঘরের বাসিন্দা এক বৃদ্ধ, বাইরে বসে মনের সুখে ভেড়ার লোম পাকাচ্ছেন। এ পথের সমস্ত পুরুষেরই দিনের অধিকাংশ সময় কাটে এই লোম পাকিয়ে, মোটা উল তৈরী করায়। এর থেকে ওরা নিজেদের গরম পোষাক তৈরী করে। এ ভদ্রলোকও দেখলাম গঙ্গাকে চেনেন। সাধারণত এ পথের সমস্ত যাত্রীই ওয়ান হয়ে বৈদিনী যায়। অর্থাৎ গঙ্গাও এ পথে খুব কম গিয়েছে। হরিশ এ পথে আগে গিয়েছে। কুমারের এই প্রথম। অথচ এই বৃদ্ধ গঙ্গাকে চেনেন। এ পথে দেখছি বৃদ্ধাশ্রমের অভাব নেই। তবে শুধু বৃদ্ধের জন্যই আশ্রম, বৃদ্ধাদের স্থান নেই, এবং শর্ত একটাই, বৃদ্ধ একা থাকবে।

যাহোক্, তিনি গঙ্গাকে ডেকে তাঁর ওখানে একটু বিশ্রাম নিতে বললেন। এই কয়েক মিনিট হ’ল আমরা এক পর্ব বিশ্রামের পালা শেষ করে আসলাম। আমি বিপদ বুঝে তাড়াতাড়ি বললাম, “এইতো এখনই বিশ্রাম নিয়ে এলাম। এখন আর বসার প্রয়োজন নেই”। গঙ্গা জানালো ওঁর ওখানে একটু বসে না গেলে, তিনি মনে খুব দুঃখ পাবেন। সুতরাং বৃদ্ধকে আসন্ন দুঃখের হাত থেকে মুক্তি দিতে, গঙ্গার ইচ্ছায়, গুটি গুটি পায়ে তাঁর ঘরটার দিকে এগতেই হ’ল। কুমার ও হরিশ সমস্ত মালপত্র আমাদের যাবার পথের ওপরেই রেখে এল। বৃদ্ধটি তাঁর ভাঙ্গাচোরা ঘর থেকে দুটো চট্ এনে ঘরের সামনে বিছিয়ে দিলেন। আয়োজনের ত্রুটি নেই। ভয় হ’ল গঙ্গা না আবার আজ এখানে থেকে যাবার প্রস্তাব দিয়ে বসে। আমি আরাম করে চটের ওপর শুয়ে পড়লাম। এবার তিনি একটা হুঁকো সেজে নিয়ে এলেন। ঠিক থেলো হুঁকোর মতো সাধারণ হুঁকো নয়। বৃদ্ধটি ঐ বিস্তীর্ণ এলাকায় একাই থাকেন। জমিদারও বলা যেতে পারে। তাই তিনি জমিদারের মতোই গড়গড়া খান। একটা প্রায় তিন ফুট মতো লম্বা, সরু, বাঁশের ফাঁপা কঞ্চির মতো লাঠি দিয়ে, তিনি পরম আরামে হুঁকো টানতে শুরু করলেন। না ভূল বললাম, হুঁকো টানার নলটাকে কঞ্চি বললে অসম্মান করা হবে। এখানে ঐ জাতীয় গাছ প্রচুর হয়। দেখতে এখানকার বাঁশের কঞ্চির মতো হলেও, এগুলোকে বাঁশ বলাই উচিৎ। হরিশ আমাদের রাস্তা হাঁটার কষ্ট লাঘব করতে দু’টো কঞ্চির ন্যায় বাঁশ কেটে দিল। অসম্ভব শক্ত। গঙ্গা আর বৃদ্ধটি পালা করে হুঁকো টেনে যাচ্ছে। আমি শুয়ে আছি। শীতাংশু জায়গাটা সরজমিনে তদন্ত করে দেখছে। হঠাৎ গঙ্গা আমায় বললো, বাবুজী সখ করবে? সখ করা মানে হুঁকো টানা। এর আগে আমাদের বাড়ির পাশে, এক দাদুর হুঁকো টেনে দেখেছি। তবে সেটা ছিল অতি সাধারণ থেলো হুঁকো। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। হুঁকোটাকে যতটা সম্ভব দুরে রেখে, প্রায় তিন ফুট লম্বা বাঁশ দিয়ে টানতে হবে। মুখ দিয়ে না টেনে কঞ্চি দিয়ে খাচ্ছেন খান, কিন্তু কঞ্চিটা অত বড় রেখে কী সুবিধা, তিনিই বলতে পারবেন। গঙ্গার কথায় বৃদ্ধটি আহ্লাদ প্রকাশ করে আমায় সখ করতে অনুরোধ করলেন। আমি উঠে বসে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর, সখ করতে সমর্থ হ’লাম। আতুর ঘরে নাতির প্রথম জন্মক্রন্দন শুনে যেমন দাদুর মুখে হাসি ফোটে, আহ্লাদে আটখানা হন, এই বৃদ্ধটিও আমার সখ করার সাফল্যে, সেই রকম আহ্লাদিত হলেন। গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম জায়গাটার নাম কী? সে জানালো জায়গাটার নাম “টোল”। পরে অবশ্য সে জায়গাটাকে “টোর্ন” নামে পরিচয় দিল। জানিনা কোনটা ঠিক নাম। এইরকম নির্জন জঙ্গলে, ভাঙ্গাচোরা একটা ঘরে, বৃদ্ধটি কিসের আকাঙ্খায় বাস করেন, ভগবান জানেন।

যাহোক্, আমরা বৃদ্ধটিকে নমস্কার করে উঠে পড়লাম। শুরু হ’ল নতুন করে পথ চলা। এবার একটু চড়াই এর পথ। একটু আগে গঙ্গার দেখানো সেই পাহাড়ের চুড়ায় উঠছি। রাস্তা একটু পাথুরে। দু’পাশে ঘন জঙ্গল। এর কিছু পরেই আমরা একটা ফাঁকা মাঠে এসে দাঁড়ালাম। সত্যি এক অদ্ভুত জায়গা। কখনও ভীষণ ঢালু মাটির রাস্তা, কখনও পাথুরে চড়াই এর পথ, কখনও সুন্দর ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, কখনও লাল মাটির রাস্তা, আবার কখনও বা ঘন জঙ্গলে অথবা বড় বড় ঘাসে ঢাকা বা ঝোপঝাড় পেরিয়ে এগতে হয়। এই মাঠটার পরেই আবার বড় বড় গাছের জঙ্গল। গাছগুলো থেকে খুব হাল্কা মাকড়সার জালের মতো এক প্রকার লতা ঝুলছে। পাহাড়ী এলাকায় গাছের ডালপালা বা কান্ডের ওপর বরফ জমে, গরম কালে গলে যাবার পর যেরকম শ্যাওলা জাতীয় জন্মায়, অনেকটা সেই জাতীয় এক প্রকার লতার মতো। অথচ অনেকটা স্বর্নলতিকার মতো রঙ। গঙ্গা জানালো এগুলো খুব দামী জিনিস। এখন এর দাম, প্রতি কিলোগ্রাম ১৬৮টাকা। আমি বললাম এখানে তো অনেক রয়েছে, নিয়ে গিয়ে বিক্রী করলে তো পার। গঙ্গা বললো এগুলো গদি তৈরীর কাজে লাগে। এগুলো এত হাল্কা যে, এক কিলোগ্রাম তুলতে ঘাম ছুটে যাবে। যাহোক্, আমরা সামনের জঙ্গলের পথে এগতে যাব, এমন সময় শীতাংশু বললো, তার একটা প্রস্তাব আছে। আমরা জানতে চাইলে সে গম্ভীর হয়ে বললো, এক রাউন্ড কফি হলে হ’ত না? সত্যি, এতক্ষণের রাস্তায় এই প্রথম শীতাংশু একটা দামী কথা বলেছে। জায়গাটা বেশ ঠান্ডা, তাছাড়া মুখের ওপর দিয়ে এত সাদা ঘন মেঘ উড়ে যাচ্ছে, যে একটু দাঁড়ালে, বেশ কষ্ট হচ্ছে। আমি প্রস্তাবে রাজী হ’লে, ধ্বনি ভোটে সেই প্রস্তাব পাশ হ’ল। গঙ্গা হরিশকে জল আনতে বললো। হরিশ বললো সে একা যাবে, ভাল্লুর ভয় নেই তো? গঙ্গা বললো ভাল্লু তোমায় খাবে না। হরিশ জঙ্গলের দিকে না গিয়ে, ডানপাশে মাঠ পেরিয়ে জল আনতে চলে গেল। গঙ্গা একটা গাছের তলায় পাথর সাজিয়ে উনন তৈরী করে, শুকনো কাঠ খুঁজতে গোটা মাঠ ঘুরে বেড়াতে লাগলো। কুমার ও শীতাংশু কিছু শুকনো ডালপালা যোগাড় করলো। একটা পলিথিন সিট পেতে আমরা বনের মধ্যে বনভোজনের প্রস্তুতি শুরু করলাম।

অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল, হরিশ ফিরে এল না। গঙ্গা, কুমারকে হরিশের খোঁজে পাঠিয়ে, উননে কাঠ জ্বালাবার চেষ্টা শুরু করলো। আরও বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে গেল, ওদের দু’জনের কেউই ফিরে এল না। এবার শীতাংশু চললো ওদের খোঁজে। আমি শীতাংশুকে বললাম ওদের খুঁজে না পেলেও, তুমি অন্তত ফিরে এস। একটু পরেই তিন মুর্তিমান জল নিয়ে ফিরে এল। হরিশ জানালো অনেক দুরে জল আনতে যেতে হয়েছিল। গঙ্গা জানালো আরও শুকনো কাঠের প্রয়োজন। আমি ওরা যে দিকে জল আনতে গিয়েছিল, সেই দিকে খানিকটা পথ গিয়ে, বাঁদিকে একটা জঙ্গল মতো জায়গায় ঢুকলাম। জায়গাটা এত নির্জন, যে গা ছমছম্ করে। এখানে কোন বসতি নেই। গোটা এলাকাটাই নির্জন, কিন্তু এই জায়গাটার একদিকে মাটির ওপর কাঁটা তার পড়ে আছে। হয়তো কোন সময় কাঁটা তারের বেড়া দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সোজা কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, জায়গাটায় কিরকম একটা ভৌতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। শুকনো কাঠ পাওয়া গেল না।

এদিক ওদিক থেকে কিছু শুকনো ডালপালা নিয়ে ফিরে এলাম। জল ফুটলো, কফিও তৈরী হ’ল। জায়গাটা সত্যি অতুলনীয়। সামনে পিছনে ঘন জঙ্গল। ডানপাশে, যে দিকে ওরা জল আনতে গিয়েছিল, বেশ বড় মাঠ। বাঁপাশে, যে দিক থেকে আমরা এখানে এলাম, দুরে বহুনীচে খাদ আর উচু পাহাড়ের মেলা। বাড়ি থেকে একটা ছোট অ্যালুমিনিয়ামের বাটি নিয়ে এসেছিলাম কফি তৈরীর জন্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, এরা ঐ বাটি ভর্তি কফি এক একজন খায়। সঙ্গে দুটো প্লাষ্টিক মগ আর ঐ একটা বাটি। হাঁড়িতেই কফি তৈরী হ’ল। তাই আগে তিনজন কফি খেয়ে, পরে দু’জনকে কফি খেতে হচ্ছে। বাদাম আর কফি খেয়ে, মালপত্র বেঁধে উঠে পড়লাম। হঠাৎ গঙ্গা বললো এক কাম করো, আজ “আলি বুগিয়াল” থেকে যাও। কাল ওখান থেকে “বগুয়াবাসা” চলে যাব। আগামীকালই হিসাব মতো আমাদের বগুয়াবাসা যাবার কথা। আমি বললাম গতকাল আমাদের ওয়ান যাবার কথা ছিল, তুমি লোহাজঙ্গে থেকে গেলে। আজ বৈদিনী বুগিয়াল যাবার কথা, তুমি আলি বুগিয়ালে থেকে যাবার কথা বলছো। কাল আবার মাঝ রাস্তায় কোথাও থাকতে বলবে। দরকার নেই, আজই আমরা বৈদিনী চলে যাব। গঙ্গা বললো, আলি থেকে বৈদিনী মাত্র দুই-আড়াই কিলোমিটার পথ। বৈদিনী বুগিয়াল থেকে চড়াই ভাঙ্গতে হবে। আজ বৈদিনী বুগিয়াল গেলে, কাল ঘুম থেকে উঠেই চড়াই ভাঙ্গতে খুব কষ্ট হবে। আজ আলি বুগিয়ালে রাত্রে থেকে, কাল বৈদিনী পর্যন্ত সমান রাস্তায় হেঁটে, তারপর  চড়াই ভাঙ্গলে, কষ্ট অনেক কম হবে। কথাটার যুক্তি আছে বলে মনে হ’ল। শীতাংশু আমায় বললো, আমাদের টুর প্রোগ্রাম অনুযায়ী আমরাতো একদিন আগেই ওখানে পৌছাব, কাজেই আজ আলি বুগিয়াল থেকে যাওয়া যেতে পারে। তাই ঠিক হ’ল। হরিশ জানালো আলি, বৈদিনীর থেকে অনেক সুন্দর ও অনেক বড় বুগিয়াল। এতক্ষণে জানা গেল বুগিয়াল কথার অর্থ, তৃণভূমি, এবং আলি বুগিয়ালের বিস্তীর্ণ এলাকায় শুধু তৃণভূমি।

যাহোক্, একভাবে অনেকটা পথ গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে, আমরা এবার একটা ফাঁকা জায়গায় হাজির হ’লাম। এও এক অদ্ভুত জায়গা। শীতাংশু ও গঙ্গা আগে আগে যাচ্ছে, ওদের ঠিক পিছনেই আমি। আমার পিছনে কিছুটা দুরে হরিশ ও কুমার। আকাশ পরিস্কার নয়, তবে যথেষ্ট আলো আছে। হঠাৎ হঠাৎ সাদা ভারী মেঘ আমাদের ওপর নেমে আসছে। ভীষণ ঠান্ডা, আর মনে হচ্ছে যেন জামা প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহুর্তে দু’হাত দুরের শীতাংশু ও গঙ্গাকে একদম দেখা যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে না পিছনে হরিশ ও কুমারকে। এখানে রাস্তা বলে কিছু নেই। এমন কী আমাদের পথ চলা ও চেনার সুবিধার্থে, কোন দয়ালু মানুষ পায়ে চলার দাগ পর্যন্ত রেখে যান নি। সমতল জায়গা, তাই সম্পূর্ণ আন্দাজে, অন্ধের মতো সোজা সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি। আমাদের সুবিধার্থে গঙ্গা হাততালি দিতে দিতে যাচ্ছে। মাত্র কয়েক মিনিট, তার পরেই আবার চারিদিক পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। এমনকি সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে, বিকালের সেই হাল্কা সুন্দর শেষ সূর্যালোক, তার সীমিত ক্ষমতা দিয়ে আমাদের উত্তাপ দেবার চেষ্টা করছে। উত্তাপ না দিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাচ্ছি, এটাই বড় পাওয়া। আবার সামনে শীতাংশু ও গঙ্গাকে পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি, আর ঐ তো হরিশ ও কুমার পিছন পিছন মালপত্র পিঠে নিয়ে আসছে। সব কিছু আবার আগের মতো। শুধু পার্থক্য এই যে, আগে আমরা প্রায় লাইন দিয়ে যাচ্ছিলাম। যাচ্ছিলাম সামনের লোককে লক্ষ্য করে, ঠিক তার পিছন পিছন হেঁটে। আর এখন আমরা একে অপরের থেকে কেউ বেশ খানিকটা ডাইনে, কেউ বা অনেকটা বাঁয়ে চলে গেছি। আবার সেই মেঘ, আবার সেই সূর্যের মিষ্টি আলো। এইভাবে কতটা পথ হেঁটেছি জানিনা, এক সময় মেঘ কেটে যেতে দেখলাম, সামনে কিছুটা দুরে একটা মাঠ যেন আস্তে আস্তে উপরে উঠে একটা পাথুরে ঢিবির কাছে শেষ হয়ে গেছে। গঙ্গা আর শীতাংশু এগিয়ে গিয়ে ওটার ওপর বসে পড়লো। আমি হাতের লাঠি ফেলে ক্যামেরা বার করে, সুন্দর জায়গাটার একটা স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু প্রকৃতি দেবী বোধহয় চান না, যে তাঁর এলাকায় তাঁর ব্যাপারে আমি নাক গলাই, তাঁর অনুমতি না নিয়ে তাঁর ছবি তুলি। তাই মুহুর্তের মধ্যে ঘন মেঘে নিজের নিরাবরণ অঙ্গ ঢেকে ফেললেন। আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, অগত্যা ক্যামেরা গুটিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালাম। ঢিবিটার কাছে পৌঁছানোর আগেই আবার সামান্য সূর্যের আলো দেখা গেল। আমি সময় নষ্ট না করে একটা ছবি তুলে নিলাম। এরপর আমরা পাঁচজন বেশ কিছুক্ষণ সময় ঢিবিটার ওপর বসে বিশ্রাম নিলাম। বেশ ঠান্ডা লাগছে। তার ওপর এই মেঘ এসে সমস্ত পোষাক স্যাঁতসেঁতে করে দিয়েছে। মনে মনে ভীষণ কফি খেতে ইচ্ছা করছিল। অথচ এখানকার আবহাওয়ার এই বিচিত্র রূপ দেখে, গঙ্গাকে আর মনের কথা বলতে পারলাম না। তাছাড়া এখানে শুকনো কাঠও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। গঙ্গা জানালো আর বেশী পথ নেই। আমরা উঠে পড়লাম।

এবার রাস্তা কিন্তু এই মাঠের মধ্যে দিয়েই গেছে। মাঠটা যেন আস্তে আস্তে ওপর দিকে উঠেছে। চারিদিকে গাছপালা বেশ কমে এসেছে। বুঝলাম আমরা বুগিয়ালের জমিদারিতে ঢুকে পড়েছি। আরও খানিকটা পথ এগিয়ে একটা জায়গায়, মাঠটা যেন গোল আকার ধারণ করেছে। তার এক দিকটা একটু উচু। তারপাশে খানিকটা জায়গায় জল জমে আছে। আমরা বসে পড়লাম। একটু পরেই হরিশ ও কুমার এল। দুর থেকে মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। আমি খুব আশ্চর্য হয়ে গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম “এখানে মানুষ থাকে”? ও জানালো এই সময় গরু মোষকে ঘাস খাওয়াতে, নীচের থেকে কিছু লোক এসে ছোট ছোট ঝুপড়ি করে এইসব জায়গায় দু’এক মাস থাকে। একটু পরেই দেখলাম তিনজন মহিলা, তিন-চারটে বাচ্ছা ও খানচারেক মোষ নিয়ে আসছে। অনেক আগে থেকেই লক্ষ্য করেছি, এখানকার সমস্ত মেয়েরা কালো রঙের পোষাক পরে। পোষাক বলতে গলা থেকে পা পর্যন্ত কালো রঙের ফ্রক বলা-ই বোধহয় ঠিক হবে। তার থেকেও লক্ষ্য করার বিষয়, এই সব এলাকার কোন পুরুষ, বলতে গেলে কোন কাজ করে না। অন্তত আমি তো দেখলাম না। যাদের ঘরের সাথে দোকান মতো আছে, তারা দোকানে বসে ভেড়ার লোম পাকায়। আর যাদের তা নেই, তারা রাস্তাঘাটে, বা বাড়ির সামনে বসে লোম পাকায়। আর মেয়েরা পিঠে বিরাট বেতের ঝোড়া নিয়ে, গাছের পাতা নিয়ে আসে নিজেদের গরু মোষের জন্য। বনজঙ্গলে চড়াই উতরাই ভেঙ্গে, গাছের শুকনো ডালপালা যোগাড় করে বয়ে আনে। কাঠের বোঝার ভারে তাদের শরীর বেঁকে যায়। তাদের অনেকেরই মুখের দিকে তাকালে সহজেই অনুমান করা যায় যে, অন্তত ষাটটা বসন্ত তারা হিমালয়ের কোলে কাটিয়ে দিয়েছে। বনের কাঠ, পাতা সংগ্রহ করে আনা ছাড়াও, তাদের খেতের কাজও করতে হয়। মনটা হুহু করে উঠলো গঙ্গার দেওয়া প্রস্তাবে সাড়া দেবার জন্য। একবার এ অঞ্চলের একটা মেয়েকে সাদি করতে পারলে, আর আমাকে পায় কে? সারা জীবন বসে বসে খাওয়া। নেই কোন চিন্তা, টাকা রোজগারের ধান্দা, শারীরিক পরিশ্রম। আহা কী সুখের জীবন। শুধু একটু ভেড়ার লোম পাকানো শিখে নিতে পারলে, আর কোন ঝামেলা নেই। বছরে দু’তিনটে কালো ফ্রক? তা আর কিনে দিতে পারবো না? তাহলে মরদ কিসের? যাহোক্ এই তিনজন মহিলা ও তাদের বাচ্ছাদের দলটা এসে আমাদের সামনে একটা উচু জায়গায় বসলো। বাচ্ছাগুলো ছোটাছুটি করে খেলা করতে শুরু করে দিল। মহিলারা অবাক হয়ে আমাদের লক্ষ্য করছে। কিছুক্ষণ পরে ওরা মোষগুলোকে নিয়ে, যেদিক থেকে এসেছিল, সেই দিকেই ফিরে গেল। গঙ্গার নিজের কথায়, সে একজন ব্রহ্মচারী। তাই বোধহয় ব্রহ্মচর্য পালন করতে, গঙ্গাও ওদের পিছন পিছন, একটু তফাৎ রেখে, ওদের সঙ্গে এগিয়ে গেল। এতো মহা মুশকিল্। হরিশ ও কুমার গঙ্গাকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা শুরু করে দিল। খানিকটা এগিয়ে গঙ্গা একটা ঢিবির কাছে দাঁড়িয়ে শাম্মী কাপুরের স্টাইলে একটা পাহাড়ী সুরে গান ধরলো। শিষ দিয়ে গানের সুর ভাঁজলো। তারপরে একসময় ফিরে এসে আমাদের পাশে বসলো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় গিয়েছিলে? ও একটু হেসে জানালো, সে একজন ব্রহ্মচারী। আমি বললাম “তাই তো দেখছি। আরে তুমি হোচ্ছ গাড়োয়ালের ব্রহ্মচারী, কিন্তু আমি যে কলকাতার ব্রহ্মচারী। কাজেই তোমাকে দেখেই বুঝতে পারছি যে তুমি একজন সাচ্চা ব্রহ্মচারী”। ও হেসে উঠে বললো, একবার হাত মেলান। আমি হাত মিলিয়ে উঠে পড়লাম। বাকী সকলেও তৈরী হয়ে নিল। গঙ্গা বললো তাকে পঁচিশটা টাকা দিতে। সামনের কোন ঝুপড়ি থেকে ঘি পাওয়া গেলে, কিনে নিয়ে আসবে। আলি বুগিয়ালের গেষ্ট হাউস সামনেই, কুমার ও হরিশ আমাদের সঙ্গে যাবে। গঙ্গা ঘি নিয়ে সোজা গেষ্ট হাউসে চলে যাবে। শেষ মুহুর্তে ওকে কাছ ছাড়া করতে ইচ্ছা না থাকলেও ঘিয়ের লোভে তাকে টাকা দিয়ে, হরিশ ও কুমারকে নিয়ে এগলাম। হরিশ জানালো আজ আর কোন চড়াই এর রাস্তা নেই। গাছপালা কমতে কমতে, এখন একবারে ফাঁকা হয়ে গেছে। এত সুন্দর জায়গা এর আগে কোনদিন কোথাও দেখি নি।

এরপরে ষষ্ঠ পর্বে……

 

 

 

এরপর ষষ্ঠ পর্বে………

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s