রূপকুন্ডের হাতছানি–ষষ্ঠ পর্ব {লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary , Tour Picture এবং ভালো ছবি ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

Self (42)গত  বৎসর  হিমাচল  প্রদেশের  খাজিয়ারে,  অসামান্য  সুন্দর  একটা  বিশাল  মাঠের  মতো  বিস্তীর্ণ  অঞ্চল  দেখেছিলাম।  চারপাশে  গাছ  দিয়ে  ঘেরা  জায়গাটার  পাগল  করা  সৌন্দর্য,  আমাকে  ভীষণ  ভাবে  মুগ্ধ  করেছিল।  কিন্তু  এখানকার  সৌন্দর্যর  কাছে  খাজিয়ারকে  অতি  সাধারণ  বলে  মনে  হ’ল।  যেদিকে  যতদুর  চোখ  যায়,  শুধু  ঢেউ  খেলানো  মাঠ।  কোথাও  কোন  গাছ  নেই।  মাঠের  ওপর  ধনে  বা  মৌরী  গাছের  মতো  পাতা,  ঘাসের  মতো  জন্মে  আছে। পাতাগুলো  একবারে  মাঠের  সাথে  লেপ্টে আছে, আর তার থেকে ইঞ্চি দুই-তিন উঁচুতে,  সুতোর মতো সরু ডাঁটায়, ছোট্ট ছোট্ট ফুল মাথা তুলে হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। কতরকম যে তাদের রঙ বলতে পারবো না। বড় আকারের একটাও ফুল নেই। ছোট্ট ছোট্ট চার পাপড়ির  ফুল। লাল,  নীল,  হলুদ, বেগুনী, সাদা,  মেরুণ, আরও কত অদ্ভুত সব রঙ। যতদুর চোখ যায়, সবুজ জমির ওপর নানা রঙের  ফুল হাওয়ায় দুলছে। যেন সবুজ চাদরের ওপর নানা রঙের ফুলের কাজ করা হয়েছে। কত বর্গমাইল এলাকা নিয়ে এই এক সৌন্দর্য  বিরাজ করছে জানি না। এই সুন্দর সবুজ কার্পেটের মতো মাঠের ওপর দিয়ে ফুল মাড়িয়ে আমরা চলেছি। ফুলগুলো পায়ের চাপে  নষ্ট হচ্ছে। তবে এটাই যে পথ, এ ছাড়া উপায়ই বা কী ?  একসাথে কিন্তু বহুদুরের মাঠ  দেখা যায় না। কারণ এই মাঠের মতো জায়গাটা আস্তে আস্তে উপরে উঠে, আবার আস্তে আস্তে নীচে  নেমেছে। আবার  উঠেছে, আবার নেমেছে। এই মুহুর্তে আমি সঠিক বলতে পারবো না, ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্স বেশী সুন্দর,  না এই আলি বুগিয়াল। ঘন সাদা মেঘে চারিদিক আচ্ছন্ন হয়ে গেল। দু’হাত দুরের জিনিস, শত চেষ্টা করেও দেখা যাচ্ছে না। মধ্যে মধ্যে অবশ্য আকাশ কিছুটা পরিস্কার হচ্ছে, তবে তাকে ঠিক পরিস্কার হওয়া বলা যায় না। বরং একটু পাতলা হচ্ছে বলা বোধহয় ঠিক হবে। প্রথমে হরিশ, কারণ ওই একমাত্র পথ চেনে, তারপরে আমি, আমার পিছনে কুমার, তার সাথে শীতাংশু। শীতাংশুর গায়ে একটা ফুলহাতা জামা, আর আমার একটা হাফহাতা জামা সম্বল। এদিকে এখানে অসম্ভব রকমের ঠান্ডা। তার উপর এই সর্বনাশা মেঘ আমাদের আধভেজা করে ছাড়ছে। হাতের লোমকুপ-এ সাদা সাদা, বিন্দু বিন্দু, জলের মতো কী একটা জমেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম বরফ। মেঘের জন্যই হয়তো মেঘের রঙের সাদা জলকণা, বিন্দু বিন্দু হয়ে জমছে। ঠান্ডা লাগছে ঠিকই, তবে আমার কিন্তু চারিদিকের এই সৌন্দর্য আর অদ্ভুত পরিবেশে, তেমন কোন কষ্ট হচ্ছে না। কুমার অনেক পিছিয়ে পড়েছে। আবার, আমার থেকে হরিশ ও শীতাংশু অনেক এগিয়ে গিয়েছে। রাস্তা প্রায় সমতল, ফলে এক ঠান্ডা আর উৎপাতে মেঘ ছাড়া, হাঁটায় কোন কষ্ট নেই। আমি খুব আস্তে আস্তে আশপাশের প্রত্যেকটা নতুন ফুলকে লক্ষ্য করতে করতে চলেছি। সামনে বা পিছনে আমার সঙ্গীদের, মেঘের জন্য আর দেখা যাচ্ছে না। দুর থেকে আমার উদ্দেশ্যে শীতাংশুর চিৎকার শুনলাম। আমিও চিৎকার করে সাড়া দিলাম। ও আবার চিৎকার করে আমাকে কোন দিক দিয়ে এগতে হবে নির্দেশ দিল। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি ওরা একটা উচু মতো জায়গায়, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। শীতাংশু আমাকে আরও তাড়াতাড়ি হাঁটতে বললো। ওর এই এক দোষ। ওকে দেখে মনে হয়, ও যেন হাঁটা প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে এসেছে, এবং প্রথম পুরস্কারই ওর একমাত্র লক্ষ্য। ওদের কাছাকাছি এসে দেখি আমার চেনা নীল আর বেগুনী রঙের গোল গোল একরকম ফুল। অনেকটা এখানকার বনবেগুন ফলের মতো আকার। এই ফুল ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্সে, জোয়ান মার্গারেট লেগি-র কবরের পাশে অজস্র দেখেছি। আমি শীতাংশুকে বললাম ফুলটা ভাল করে দেখতে। ও খুব বিরক্তি প্রকাশ করে, ফুলের প্রতি কোনরকম আগ্রহ না দেখিয়ে, মুখ বেঁকিয়ে এগিয়ে চললো। আমি ভেবে পেলাম না যে, যে জায়গাটায় শুধু সবুজ মাঠ আর ফুলই একমাত্র দেখবার বস্তু, সেখানে সেটার প্রতি আগ্রহ না থাকলে, এত কষ্ট করে আসার প্রয়োজনটা কী। আর যখন আমরা আমাদের আজকের যাত্রার শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেই গেছি, তখন এত তাড়াতাড়ি করে, প্রায় ছুটে কোন দিকে না তাকিয়ে হাঁটার অর্থই বা কী? তবে কী শুধু হাঁটার জন্যই হাঁটা? আমার ভীষণ খারাপ লাগলো। আমি ঐ ফুলগুলো কিছু তুলে পকেটে রেখে দিলাম। ওর হাঁটার গতি আরও বাড়লো। আমি কিন্তু আমার গতি অপরিবর্তিত রেখে, আগের মতোই  চারিদিকের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রেখে এগিয়ে চললাম। আমি দেখতে এসেছি, দীর্ঘতম পথ দ্রুততম গতিতে হাঁটার কোন রেকর্ড গড়তে নয়। ওদের আর আমার মধ্যে ঘন সাদা মেঘ, সব সময়েই একটা প্রাচীর সৃষ্টি করে রেখেছে। পিছনে কুমার কত দুরে আছে জানি না। শীতাংশুর একটা বিরক্তিপূর্ণ চিৎকার শুনলাম। ও বোধহয় আমাকে ওর সাথে দৌড়ে পাল্লা দিতে আহ্বান জানাচ্ছে। আমি একই গতিতে এগিয়ে গিয়ে দেখি ওরা দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম কুমারকে অনেকক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, ওর জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো। ওরা দাঁড়িয়ে রইলো। আমি শীতাংশুকে তুলে আনা ফুলগুলো দেখালাম। ও জানালো ওর ফুল দেখার আগ্রহ ও ক্ষমতা, কোনটাই নেই। ঠান্ডায় ওর হাতদু’টো জমে গেছে। ও তাড়াতাড়ি গেষ্ট হাউসে যেতে চায়। হরিশের সঙ্গে আমরা দু’জনে গেষ্ট হাউসে চলে যেতেই পারি, কিন্তু আমাদের দু’জনের মতো কুমারও এপথ চেনে না। তাছাড়া ওর পিঠে অনেক মাল আছে। আমি বললাম ঠান্ডা আছে ঠিকই, তবে এত কষ্ট পাওয়ার মতো ঠান্ডা তো নয়। ও বেশ বিরক্ত হয়ে বললো ওর সারা শরীর ঠিক আছে, শুধু ওর হাত দু’টো অকেজো হয়ে গেছে। হাতের লাঠিটার ওপর হাত দু’টো ঘষে ঘষে, হাত দু’টোকে সতেজ রাখার চেষ্টা করছে। হঠাৎ অনেক দুরে কুমারকে দেখা গেল। ও একপাশে মালপত্র নামিয়ে বিশ্রাম নিতে বসলো। আমরা চিৎকার করে ওকে এগিয়ে আসতে বলে, নিজেরা হাঁটতে শুরু করলাম। এঁকেবেঁকে আরও অনেকক্ষণ হাঁটার পরে, আমরা মেঘের দেশের প্রাসাদপুরী, গেষ্ট হাউসে এসে পৌঁছলাম।

REST HOUSE OF ALI BUGIAL  আলি বুগিয়াল গেস্ট্ হাউস।

sketch   আলি বুগিয়াল গেস্ট্ হাউসের ভিতরের অংশ।

দুর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল ফাঁকা মাঠের ওপর একটা পাকা বাড়ি। লোহাজঙ্গ গেষ্ট হাউসের মতো না হলেও, প্রায় ঐ জাতীয়ই বাংলো। রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে তার আসল রূপ দেখলাম। দুটো সিঁড়ি ভেঙ্গে অল্প চওড়া একটা বারান্দা মতো জায়গায় উঠতে হবে। বারান্দার সামনে ও বাঁপাশে দুটো দরজা। সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে বড় ঘর। বারান্দার ডানপাশে বড় ঘরের একমাত্র জানালা। বড় ঘরে ঢুকেই বাঁপাশে পর পর দুটো দরজা। প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকলে, একটা পরিত্যক্ত ঘর। ঘরটার দুটো দরজা। একটা বড় ঘরের মধ্যে, আর একটা বারান্দার বাঁপাশে। বড় ঘরের পরের দরজাটা দিয়ে ঢুকলে, দরজার সোজাসুজি একটু ওপরে একটা জানালা। জানালাটা ভাঙ্গা। আর এই ঘরটায় ঢুকে ডানপাশে বাইরের মাঠে বেরিয়ে যাবার জন্য একটা দরজা। এই ঘরটার মধ্যেখানে খানিকটা জায়গার মাটি কালো হয়ে আছে। কিছু পাইন গাছের পাতার মতো শুকনো পাতা পড়ে আছে। আর আছে ছোট্ট ছোট্ট গোটা দু’তিন শুকনো কাঠের টুকরো, আর খানকয়েক পাথর। অর্থাৎ কোন সন্দেহ নেই যে এটা রান্নাঘর। জানালার ডানপাশের দেওয়ালে একটা তাক্। বড় ঘরেও, একবারে ছোট, ভাঙ্গা ও পরিত্যক্ত হলেও দু’দু’টো দেওয়াল তাক্ আছে। না, দেওয়াল তাক্ নয়, দেওয়াল আলমারি। তাক্ দু’টো ভাঙ্গা হলেও, পাল্লা দুটো আজও তাদের অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষ বহণ করছে। বড় ঘরটা বেডরুম। ঘরটায় তিনটে দরজা। বাঁপাশেরটা পরিত্যক্ত ঘরটায় যাবার জন্য। ডানপাশেরটা রান্নাঘরে যাবার। তৃতীয়টা বারান্দায় যাবার জন্য। একবারে বাঁদিকের দেওয়াল ঘেঁসে পর পর চারটে তক্তাপোশ। এত সুন্দর এদের গঠন, যে চারটে তক্তাপোশ পর পর রাখায়, দু’দিকের দেওয়ালের পাশে একচুল জায়গাও নেই। যেন ঘরের মাপ নিয়ে সমান মাপের চারটে তক্তাপোশ তৈরী করা হয়েছে। প্রথম তক্তাপোশটার বাঁদিকের দেওয়ালের ধারের দুটো পা-ই নেই। অর্থাৎ ডানদিকের দুটো পায়ের ওপর, ডানদিকের তিনটে তক্তাপোশের ধাক্কায় বা চাপে, বাঁদিকের দেওয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরেরটা অক্ষত, তবে ওটার ওপর শুয়ে নড়াচড়া করলে টলমল্ করে। যেন দু’দিকে দুটো তক্তাপোশ আছে বলে, ইচ্ছা থাকলেও জায়গার অভাবে ভেঙ্গে পড়তে পারছেনা। তার পাশেরটা বেশ শক্ত সমর্থ। কিন্তু ফ্রেমের অর্ধেকটায় কোন তক্তা নেই। আর একবারে ডান দিকেরটার যথারীতি বাঁ পা দুটোই বেঁচে আছে। ডান পা দুটো কোন কারণে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে অসুবিধা নেই। ডান পা দুটো না থাক্, ডানদিকে দেওয়াল ও বাঁদিকে তিন জাত ভাইতো এখনও বেঁচে আছে। তাদের জোরে এটা ভালভাবে বাঁ দিকেরটার মতোই দাঁড়িয়ে আছে। ব্যবস্থার কোন ত্রুটি নেই। এত সুন্দর একটা রাজপ্রাসাদ কিন্তু বিশাল মাঠের মাঝে একা দাঁড়িয়ে আছে। চারিদিকে যতদুর দৃষ্টি যায়, শুধু মাঠ আর মাঠ। অসম্ভব গতিতে হাওয়া বইছে। গোটা অঞ্চলটায় এই প্রাসাদটাই একমাত্র হাওয়ার গতিপথ রোধ করে, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে ঘরের ভিতর তীব্র ঝড়ের মতো হাওয়ার আওয়াজে মনে হচ্ছে, যেকোন সময় বাড়িটাকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে যাবে। কোন কেয়ার টেকারের ব্যবস্থা নেই। থাকলেও তার দেখা পেলাম না। ইলেকট্রিসিটি থাকার তো কোন প্রশ্নই ওঠে না। কয়েক বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে লোকজন থাকার সম্ভাবনাও নেই। শুধু আমরা পাঁচজন।

আমরা চারজন গেষ্ট হাউসের বেডরুমে এলাম। হাঁটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঠান্ডাটা যেন বেশী লাগছে। মালপত্র তক্তাপোশের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে, আমরা রান্নাঘরে এলাম। হরিশ ব্যাগ থেকে হাঁড়ি বার করে জল আনতে গেল। শীতাংশু জানালো ওর হাতে কোন জোর নেই, কোন সাড় নেই। ও ভয় পাচ্ছে, রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে হাতদু’টো না নষ্ট হয়ে যায়। আমরা রান্নাঘরের টুকরো কাঠগুলোয় আগুন জ্বালাবার চেষ্টা করতে শুরু করলাম। যতবার পাইন জাতীয় শুকনো পাতাগুলোয় দেশলাই জ্বেলে আগুন লাগাই, চোখের পলক পড়ার আগেই, খুব দ্রুত খানিকটা জ্বলেই নিভে যাচ্ছে।

অথচ প্রথমে এগুলোয় একটু আগুন ধরে না রাখতে পারলে, কাঠে আগুন লাগার কোন সম্ভাবনা নেই। সরু সরু পাতাগুলো চটপট্ আওয়াজ করে খুব দ্রুত খানিকটা পুড়েই নিভে যাচ্ছে। এদিকে বাইরে আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে আসছে। গঙ্গা এখনও ফেরে নি। হরিশ কত দুরে জল আনতে গেছে কে জানে। আমার সাথে শীতাংশুও আগুন জ্বালাতে আপ্রাণ চেষ্টা করলো। এ কাজটায় ওর উৎসাহে কোন খামতি নেই, প্রয়োজনটা ওরই। অথচ শুধু দেশলাই কাঠি নষ্ট করা ছাড়া, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। শীতাংশু বললো দেশলাই কাঠি নষ্ট না করে মোমবাতি বার করো। ব্যাগ থেকে মোমবাতি বার করে দেখি, তিনটে বড় মোমবাতির একটা একবারে গুঁড়ো হয়ে গেছে। আর দুটো ছোট ছোট টুকরো হয়ে, সুতোয় আটকে আছে। আমি একটা ছোট টুকরো জ্বাললাম। ঘরে একটু আলো হ’ল বটে, আগুন কিন্তু জ্বালানো গেল না। মোমবাতির টুকরোটা এতই ছোট যে, শেষ হয়ে দপদপ্ করে নিভে গেল। শীতাংশু বললো আর একটা টুকরো জ্বালাতে। আমি রাজী হ’লাম না। বললাম কাল কী হবে? ও বললো কালকের কথা কালকে ভাবা যাবে। আমি বললাম “না, এখন থেকে কালকের কথা আজই ভাবতে হবে। কাল আমরা আরও উচু, আরও কষ্টকর, আরও ভয়ঙ্কর জায়গায় রাত কাটাবো। প্রায় দশ পনের মিনিট সময় কেটে গেল, কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা বেশ কিছু দেশলাই কাঠি পোড়ানো ছাড়া, কাজের কাজ কিছুই করতে পারিনি। কুমার বুদ্ধি দিল স্টোভ জ্বালতে। বুদ্ধিটা মনে ধরলো, কেন এতক্ষণ মাথায় আসেনি জানিনা। স্টোভে তেল ভরা হ’ল। জনতা স্টোভ। স্টোভের একবারে ভিতরে, সলতের ঠিক আগে, সব থেকে ছোট যে টিনের কভারটা থাকে, সেটা মালপত্রের চাপে কিভাবে বেঁকে গেছে। শীতাংশু ও আমি অনেক চেষ্টার পরে, মোটামুটি একটা অবস্থায় ওটাকে নিয়ে আসতে সক্ষম হলাম। ছোট কভারটার খোলা দিকটা, বেঁকে মাথার ক্লীপের মতো হয়ে গেছে। শীতাংশুর নখে যথেষ্ট জোর আছে, তবে এখন ও শুধু চেষ্টাই করলো, উপকার কিছু করতে পারলো না। কুমার স্টোভে তেল ভরে স্টোভ জ্বাললো। কিন্তু স্টোভের ভিতরের কভারটা বেঁকে যাবার জন্য, না অক্সিজেন এর অভাব জানিনা, স্টোভ একবার দপ্ করে জ্বলে, তারপরেই নিভে যাবার মতো হয়। ঐ অবস্থায় কিছুক্ষণ থেকে, নিজে নিজেই আবার দপ্ করে জ্বলে ওঠে। অর্থাৎ স্টোভ কোন কাজে আসবে না। এ জায়গাটা বুগিয়াল, অর্থাৎ তৃণভুমি। সমুদ্রতল থেকে উচ্চতাও এগার হাজার ফুট। যতদুর দৃষ্টি যায়, একটা ছোট গাছও কোথাও নেই দেখে এসেছি। রান্নাঘরে দু’তিনটে সরু সরু কাঠের টুকরো, মানে কাঠও নেই। অর্থাৎ আজ রাতে হরিমটর চিবতে হবে। সঙ্গে যা শুকনো খাবার আছে, তা যদি আজ খাই, কাল কী হবে? আবার নতুন করে চেষ্টা শুরু হ’ল। এবার কুমার, পাইন পাতা ও কাঠের টুকরোগুলোর উপর খানিকটা কেরসিন তেল ঢেলে আগুন দিল। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো। একটু পরে আগুন নিভে গেলে দেখা গেল, শুধু তেলটুকু আর পাতাগুলোই পুড়েছে। কাঠগুলো অক্ষত শরীরে ড্যাবড্যাব্ করে আমাদের দিকে চেয়ে যেন ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করছে। বিরক্তি প্রকাশ করছে, তাদের চন্দন বর্ণের গায়ের রঙ শ্যামবর্ণে পরিণত করায়। আবার তেল ঢালা হ’ল। এবারও শুধু তেল ও পাতাই পুড়লো। লাভের মধ্যে শুধু ঐ সাময়িক সময়ের জন্য হাতগুলো আগুনের ওপর মেলে রাখা গেল।

এর মধ্যে হরিশ ফিরে এল। এল এক নতুন সুসংবাদ নিয়ে—“বাবুজী হাঁড়ি ফুটো। সব জল পড়ে যাচ্ছে”। ও জানালো, কাছাকাছি কোথাও জল নেই। প্রায় এক কিলোমিটার দুর থেকে ও জল বয়ে নিয়ে আসছে। হাঁড়ির তলায় ফুটোর ওপর আঙ্গুল চেপে ধরে, ও অনেক কষ্টে জল নিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন ঐ জল ধরে রাখবো কোথায়, কী ভাবে? আগুন জ্বালার প্রচেষ্টা ছেড়ে জল নিয়ে পড়লাম। জল ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে বড় ঘরে গেলাম। দেখি তিনটে বেশ বড় বড় ফুটো, হাঁড়ির তলায় প্রায় একই অক্ষরেখায় অবস্থান করছেন। ঠিক করলাম ফুটোগুলোর ওপর, হাঁড়ির তলায় লিউকোপ্লাষ্টার লাগিয়ে দেব। অন্ধকারে ওটাকে খুঁজেপেতে বারও করলাম। কিন্তু ওটাকে কাটবো কী দিয়ে? শীতাংশু রান্নাঘরে বসে আছে ওর “কুবেরের ধন”, হাত আগলে। ওকে ডাকতে ও জানালো, ও এখন কিছু করতে পারবে না। ও এখন সাময়িক হাত স্যাঁকা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। দাঁত দিয়ে খানিকটা প্লাষ্টার ছিঁড়ে, হাঁড়ির তলায় ও হাঁড়ির জলের ভিতর হাত ডুবিয়ে, ফুটোগুলোর ওপর ভাল করে সেঁটে দিলাম। হাত সরাতেই ফুটোর জলের চাপ, হাঁড়ির পিছনের প্লাষ্টারটাকে মাটিতে ফেলে দিল। ওঃ, কী বিপদ। আগুন যদিও বা জ্বালা যায়, রান্না হবে কী দিয়ে? জলও নেই, হাঁড়িও নেই। অথচ শীতাংশুর কোন চিন্তা নেই দেখে এত রাগ হচ্ছে বোঝাতে পারবো না। ওর ওপর আরও রাগ হচ্ছে কারণ হাঁড়িটা ওর বুদ্ধিতেই ও ওর দাদার কাছ থেকে নিয়ে এসেছে। আমি বার বার বারণ করেছিলাম। বলেছিলাম, এত কিছু মালপত্র যদি কলকাতা থেকে বয়ে নিয়ে যেতে পারি, একটা প্রেসার কুকার বা ডেকচিও বয়ে নিয়ে যেতে পারবো। কিন্তু লক্ষ্ণৌ-এ ও তার দাদার বাড়ি যাবেই, আর তখন ও পাত্রটা নিয়ে আসবে, এরকমই তার ইচ্ছা ছিল। আজ রাতে শুকনো খাবার খাওয়া মানে, আগামীকাল সারাদিন সারারাত এবং ফেরার পথে রাস্তায় অনাহারে কাটাতে হবে, এই সহজ কথাটা কী ও বুঝছে না। হাতে না হয় সাড় নেই, মাথায় কী হয়েছে? ও সেই একই ভাবে হাত সেঁকে যাচ্ছে। এবার আমি খুব বিরক্তির সঙ্গে ওকে ডাকলাম। ও খুব রেগে গিয়ে আমায় বললো, “তুমি কী আমায় বিশ্বাস করতে পারছো না যে, আমার হাতদুটো একদম কাজ করছে না”? সেই মুহুর্তে এই যুক্তি মেনে নিতে পারলাম না। কাজ করতে না পারুক, অবস্থার গুরুত্ব ও ভয়াবহতার ব্যাপারে ওর কোন চিন্তা নেই দেখে এত রাগ হ’ল যে ওকে বললাম “ওরকম হাত নিয়ে আস কেন”? শারীরিক কোন সাহায্য করতে না পারুক, জলটা ধরে রাখার একটা উপায়ও তো সে চিন্তা করতে পারে। কাছাকাছি কোথাও জলও নেই যে বলবো আবার জল নিয়ে এস। অথচ ওর কাছে এই বিপদেও হাত গরম করাটা বড় হ’ল? এই অবসরে ও গায়ে একটা ফুলহাতা সোয়েটারও চাপিয়ে নিয়েছে। একবার মনে হ’ল আমিও রান্নাঘরে গিয়ে বসে থাকি, যা হয় হোক। পরের মুহুর্তেই মনে হ’ল, তাতে শুধু টুরটাই বানচাল হবে। বাড়ি ফিরে বলতে হবে খাবারের অভাবে আমরা রূপকুন্ড যেতে পারি নি। কাজেই নতুন উদ্যোগে চেষ্টা শুরু করলাম। হরিশকে বললাম একটু মাটি নিয়ে আসতে। ও মাটি নিয়ে আসলো। এখানকার মাটিতে খুব কাঁকড়। হাঁড়ির তলায় মোটা করে মাটি লাগিয়েও, জল পড়া বন্ধ করতে পারলাম না। সঙ্গে সাবান আছে। মনে হ’ল সাবানে কাজ হতে পারে। কিন্তু সেটা কোথায় আছে কে জানে। ঘরে আলো নেই, সঙ্গীও সাহায্য করবে না, তার ওপর বার বার হাঁড়ির তলা থেকে আঙ্গুল সরানোর জন্য অর্ধেক জল ইতিমধ্যেই পড়ে গেছে। তাই চটপট্ দুটো পলিথিন ব্যাগে জল ভরে ফেললাম। কিন্তু তারপর? শক্ত কোন পাত্র হলে না হয়, দেওয়ালে ঠেস্ দিয়ে রেখে দিতাম। কিন্তু পলিথিন ব্যাগে তো আর ঐ ভাবে জল রাখা সম্ভব নয়। অনেকক্ষণ হরিশ একটা আর আমি একটা ব্যাগ হাতে করে দাঁড়িয়ে থেকে, শেষে বিরক্ত হয়ে আবার হাঁড়িতে রেখে, রান্নাঘরে চলে এলাম। মাঝ থেকে বেডরুমের মেঝে পুরো জলে ভিজে গেল। এখনও কিন্তু আগুন জ্বালা সম্ভব হয় নি, শুধু তেলই পুড়েছে। শীতাংশু তার শারীরিক অবস্থার কথা বোঝাবার চেষ্টা করলো। আমার তখন ওর কথা শুনবার, বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। শীতাংশু ফুলহাতা মোটা সোয়েটার অনেকক্ষণ পরে নিয়েছে। আমি এখনও সেই হাফহাতা পাতলা জামা পরেই আছি। এখানে ঠান্ডা বেশ ভাল রকম। কিন্তু অন্ধকারে ব্যাগ থেকে খুঁজে গরম জামা বের করে আনার মতো মানসিক অবস্থা তখন আমার আর নেই। ভীষণ একটা অশান্তি ভোগ করছি। তবে কী সামান্য একটা হাঁড়ির জন্য আমাদের পিছু হটে যেতে হবে? শুধু হাঁড়িই বা কেন? কাল সকালে কোন ভাবে হাঁড়ির ফুটো বন্ধ করতে পারলেও, রান্না হবে কী ভাবে? স্টোভও যে কাজ করছে না। এখানেই কাঠ পাওয়া যায় না, “বগুয়াবাসা”য় কাঠ পাওয়ার আশা? না, আর ভাবতে পারছি না। শীতাংশু বারবার আমাকে সোয়েটার পরে নিতে বলছে। কিন্তু ঠান্ডা লাগার ভয়ের চেয়েও ফিরে যাবার ভয়, তখন আমাকে চারিদিক থেকে গ্রাস করে ফেলেছে। শীতাংশু আবার তার কষ্টের কথা আমায় জানালো। ব্যাগ থেকে রামের বোতল বার করে বাড়ির বাইরে মাঠে এসে, ওকে খানিকটা গলায় ঢালতে বললাম। ও বললো কী দিয়ে খাব? মেজাজ হারিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কী মাল খাবার চাট চাইছো? বাইরে তখন ভীষণ ঠান্ডা। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, তার সাথে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। ও আর কথা না বাড়িয়ে ছিপি খুলে খানিকটা গলায় ঢেলে দিল। এবার শুরু হ’ল তার কাশি। ভয় হ’ল, হার্টফেল করবে না তো? একটু অপেক্ষা করে ঘরে ফিরে এলাম। এমন সময় গঙ্গা ফিরে এল। ঘি পাওয়া যায় নি। শীতাংশুর ওপর রাগটা গঙ্গার ওপর বর্ষণ করলাম। ও শান্তভাবে বললো “বাবুজী কী হয়েছে”? একে একে সমস্ত অবস্থাটা খুলে বলে, শেষে বললাম “গঙ্গা আমরা যে না খেয়ে, ঠান্ডায় মরে যাব। স্টোভ জ্বলছে না, হাঁড়ি ফুটো, মোমবাতি নেই, তবে কী আমাদের ফিরে যেতে হবে”?

এরপরে সপ্তম পর্বে……

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s