রূপকুন্ডের হাতছানি–সপ্তম পর্ব {লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary , Tour Picture এবং ভালো ছবি ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

Self (42) এখন পর্যন্ত গঙ্গা সম্বন্ধে নিয়ে আসা খারাপ ধারণাটা, ওর আর আমাদের মধ্যে একটা্ ব্যবধান সৃষ্টি করে রেখেছিল। গঙ্গা মাতাল, গঙ্গা সুযোগ বুঝে যাত্রীদের কাছ থেকে চাপ দিয়ে টাকা আদায় করে, গঙ্গা চরিত্রহীন, গঙ্গার ব্যবহার খুব খারাপ, এইসব ধারণার বশে, রাস্তায় প্রথম থেকে শীতাংশু ও আমার ধারণা হয়েছিল, গঙ্গা সত্যিই একটা ঘুঘু লোক। ওর কাছ থেকে সব সময়েই খারাপ ব্যবহার পাওয়ার জন্য, ওর চাপে বাধ্য হয়ে বেশী টাকা দেবার জন্য, আমরা যেন প্রস্তুত হয়েই ছিলাম। রাস্তায় ঐ দোকানদার আবার এই সব বিশেষণগুলো নতুন করে শুনিয়ে, দুরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাছাড়া এতটা পথে তাকে এমন কিছু করতেও দেখিনি, যার জন্য ধারণাটা পাল্টাতে পারে। তবু কথাগুলো গঙ্গাকে বলে খারাপ লাগছিল, কারণ হাঁড়ি ফুটো হওয়া, স্টোভ খারাপ হওয়া, মোমবাতি গুঁড়ো হয়ে যাওয়া, কোনটার জন্যই কিন্তু গঙ্গা দায়ী নয়।

কিন্তু এ কী? মাতাল, লম্পট, চরিত্রহীন গঙ্গা যে মুক্তিদূতের মতো ঘোষণা করলো —“বাবুজী, আমি যদি জিন্দা থাকি, তোমরাও জিন্দা থাকবে, ডরো মাৎ”। ও আবার অন্ধকারে ঐ ঠান্ডায় সম্ভবত ত্রাণসামগ্রী যোগাড়ে, আমাদের প্রাণ রক্ষার চেষ্টায় বেড়িয়ে গেল।  আরও অনেকক্ষণ কাটলো আশায় আশায়। আরও তেল পুড়লো, আরও দেশলাই কাঠি ধ্বংস হ’ল, পুড়ে শেষ হ’ল রান্নাঘরের অবশিষ্ট পাইন পাতা। অপেক্ষা করে করে যখন ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছি, ঠিক তখনই চোখের সামনে এক দেবদূতকে দেখলাম। তিনি যেন স্বর্গ থেকে নেমে এসেছেন আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে, রূপকুন্ড পেরিয়ে দেবস্থান হোমকুন্ডে আমাদের পৌঁছে দিতে। পরশুরামের মতো এক হাতে তাঁর কুঠার, অপর হাতে ভুসোকালি মাখা একটা ডেকচি। সত্যিই সেই মুহুর্তে গঙ্গাকে দেবদুত বলে মনে হয়েছে।

কয়েক মাসের জন্য যারা এত উচ্চতায় গরু মোষ চড়াতে আসে, তাদের কাছ থেকে দু’দিনের জন্য পাঁচ টাকা ভাড়ায়, গঙ্গা ডেকচিটা নিয়ে এসেছে। কথা হয়েছে পরশু রূপকুন্ড দেখে ফেরার পথে, ডেকচিটা ফেরৎ দেওয়া হবে। ডেকচিটার যা আকার, তাতে আমাদের পাঁচ জনের খিচুড়ি হওয়া মুশকিল। তা হোক্, তবু চলে যাবে। আর ভাড়া? পাঁচ টাকা কেন পঞ্চাশ টাকা বললেও, আমি অন্তত আপত্তি করবো না, একথা শপথ করে বলতে পারি। গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম কুড়ুল কী কাজে লাগবে? গঙ্গা বললো কাঠ কাটতে হবে। কোথায় কাঠ? এই বিস্তীর্ণ বুগিয়ালে ও কাঠের সন্ধান কোথায় পেল? গঙ্গা জানলো রেষ্ট হাউসের পাশে এই ঘর মেরামতের জন্য গভর্ণমেন্ট কিছু স্লীপার এনে রেখেছে। তারই একটা সে কেটে ফেলবে। ওগুলো ঘরে ঢুকবার সময়েই দেখেছি। ওগুলো কেটে ব্যবহার করার কথা ভাবিও নি। আবার এক নতুন বিপদের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। আমি বললাম গভর্ণমেন্টের রেখে যাওয়া স্লীপার কাটলে কোন রকম ঝামেলা হবে না তো? ও জানালো এখানে দেখবার কেউ নেই। তাছাড়া আগে মানুষের প্রাণ, পরে গভর্ণমেন্ট। গঙ্গা এবার কুমারকে নিয়ে বাড়িটার ডানপাশে রাখা হাল্কা কাঠের কয়েকটা স্লীপারের একটাকে, কুড়ুল দিয়ে কাটতে শুরু করলো। গঙ্গার হাতের কাজও খুব সুন্দর। ওকে একজন দক্ষ শিল্পী বলা উচিৎ। অতি অল্প সময়ের মধ্যে ও কাঠ কাটা শেষ করে ফেললো। কাঠ কাটারও কিছু রীতি আছে দেখলাম। কিছু কাঠ মোটা মোটা করে কাটা হয়েছে, কিছু খুব সরু সরু, আবার কিছু কাঠ দারুচিনির মতো পাতলা করে কেটে, কুড়ুলের ভোঁতা দিক দিয়ে পিটিয়ে থেঁতো মতো করা হ’ল। এ সবই শুধু তাড়াতাড়ি ও সহজে আগুন জ্বালাবার জন্য। আর সত্যি হ’লও তাই। বোধহয় দুই কী তিন মিনিটের মধ্যে, গঙ্গা কাটা কাঠে আগুন জ্বেলে ফেললো। সামান্য কেরসিন তেল ঢেলে আগুন লাগিয়ে, মুখ দিয়ে যতটা সম্ভব হাওয়া টেনে খুব জোরে ফুঁ দিয়ে, অনায়াসে সে আগুন জ্বেলে ফেললো। আমি একটা শান্তির নিশ্বাস ফেলে বেডরুম থেকে সোয়েটার বার করে আনলাম। এবার আগুন ঘিরে আমরা পাঁচজন গোল হয়ে বসলাম। মনে হচ্ছে গঙ্গাকে একটা প্রণাম করি। গঙ্গা হাঁড়ির ভিতর পলিথিন ব্যাগে যতটা জল ছিল, ডেকচিতে ঢেলে কফি তৈরীর আয়োজন করলো। হরিশ বা কুমার এতক্ষণ সময়ে যা করতে পারেনি, গঙ্গা কত অল্প সময়ে তা করে দিল।

গঙ্গার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা, আস্থা, অনেক বেশী বেড়ে গেল। বই-এ পড়া বীর সিং এর কথা মনে হ’ল। মনে হ’ল বীর সিং এর রক্ত যার শরীরে বইছে, সে কখনও খারাপ হতে পারে না। ওকে আমরা চিনতে পারিনি, অকারণে ভুল বুঝেছিলাম। গঙ্গাকে বললাম কলকাতায় তার সম্বন্ধে কতো খারাপ কথা শুনেছিলাম। গঙ্গা মাতাল, গঙ্গা জুয়া খেলে, গঙ্গা লোককে ঠকিয়ে চাপ দিয়ে টাকা আদায় করে। এখন বুঝতে পারছি কতো ভূল ধারণা, তার সম্বন্ধে নিয়ে এখানে এসেছিলাম। এখন, এই মুহুর্তে তাকে নতুন করে চিনছি। আজকের রাতটা যদি বেঁচে থাকি, তবে সে শুধু গঙ্গার জন্যই।

গঙ্গা সব শুনে বললো “ওসব কথা ছেড়ে দাও বাবুজী, আমি কারো সাথে কখনও খারাপ ব্যবহার করিনি। জানিনা কেন আমার নামে এত বদনাম রটেছে। সবই আমার ভাগ্য”। ওর কথাগুলো শুনে সত্যি এখন তার কথা ভেবে খুব খারাপ লাগছিল।

যাহোক্, কফি তৈরী হয়ে গেল। গঙ্গা আমাদের দু’জনকে দু’টো মগে কফি দিল। এই এক সমস্যা। পাঁচজন লোক, আর দু’টো মাত্র মগ্। অবশ্য একটা বাটিও আছে। মোট তিনটে কফি খাবার পাত্র। আমি গঙ্গাকে বললাম তোমরা তিনজন আগে খাও, তারপর আমাদের দু’জনকে দেবে। শুধু যে ওদের খুশী করবার জন্যই ওকে বা কুলিদের আগে কফি খেতে বললাম, তা কিন্তু নয়। সেই মুহুর্তে এটার খুব প্রয়োজনও ছিল। এবার শীতাংশুও আমার মতোই ওদের, আগে খাবার জন্য বললো। গঙ্গা কিন্তু রাজী হ’ল না। ও বললো “তা হয়না। তোমাদের জন্যই কফি তৈরী করা, তোমরা না খেলে আমরা খেতে পারিনা”। হরিশ ও কুমার ওর সাথে সুর ধরলো। আমি বললাম, গঙ্গা দু’বার ঠান্ডার মধ্যে বাইরে গেছে। হরিশকেও আবার জল আনতে যেতে হবে, কাজেই তোমাদের আগে শরীর গরম করার প্রয়োজন। আমরা একটু পরে খেলেও, কোন ক্ষতি হবে না। ওরা আরও কিছুক্ষণ না না বলে, শেষে আমাদের কথায় কফি খেতে শুরু করলো। ওরাও আমাদের ব্যবহারে খুব খুশী, আমরাও তাই। গঙ্গাকে বললাম আজ না হয় একটা ব্যবস্থা হ’ল, কাল কী হবে? আগামী কাল তো আমরা ১৪৬৫৫ ফুট উচ্চতার বগুয়াবাসার গুহায় থাকবো। ওখানে তো কিছুই পাওয়া যাবে না। গঙ্গা জানালো স্টোভ কোন কাজে আসবে না, কাজেই এখান থেকে কাঠ বয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাই একটা লোকের ব্যবস্থা করতে হবে। আমি রাজী হলাম, রাজী না হয়ে উপায়ও নেই। গঙ্গা বললো কাল সকালে সে একটা লোক যোগাড় করে নেবে। ইতিমধ্যে আমাদেরও কফি খাওয়া শেষ। হরিশ ও কুমার গেল অন্ধকারে, ঠান্ডার মধ্যে আবার জল আনতে। গঙ্গা আগামীকালের জন্য কাঠ কাটতে বসলো। আমরা আগুনের ধারে বসে নিজেদের শরীর খানিকটা গরম করে নিলাম। গঙ্গা জানালো এই বাংলো মেরামতের জন্য গভর্ণমেন্ট টেন্ডার ডাকে। যে সব থেকে কম দর দিয়েছে, তাকে অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, আশ্চর্য হলাম পরের কথাটা শুনে। সে জানালো, যে অর্ডার পেয়েছে, সে এক’শ টাকা দর দিয়েছে। কাঠ এসে গেছে, এবার কাজ শুরু হবে। এক’শ টাকার গল্পটা সত্যি কিনা জানিনা। তবে তাই যদি হয়, তবে এই টাকায় কী মেরামতির কাজ হবে, তা বোধহয় ভগবানও জানেন না। ঐ টেন্ডার প্রাপক ও গভর্ণমেন্ট হয়তো বলতে পারবে। এই এক’শ টাকার মধ্যে কাঠের দামও আছে কিনা জানিনা। ক’টা স্লীপার এসেছিল কে জানে। আমরা তো একটা কেটে ফেললাম। হয়তো আগেও আমাদের মতো কোন দল প্রাণ বাঁচাতে স্লীপার কেটেছে। শীতাংশু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, আজকের রাতের কথা সে জীবনে ভুলবে না। ভুলবো না আমিও। এই অভিজ্ঞতা কী ভোলা যায়? গঙ্গাও বললো ইয়ে রাত ইয়াদ রহেগা। গঙ্গাকে বললাম তোমার কথাও ভুলবো না। গঙ্গা বললো সকলেই এই কথা বলে, কিন্তু বাড়ি ফিরে সব ভুলে যায়। সে এক ডাক্তারের কথা বললো। সকলকে ওষুধ দিয়ে সুস্থ রেখে, শেষে ডাক্তার নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। গঙ্গার সেবা যত্নে সে সুস্থ হয়ে ওঠে। সেও গঙ্গাকে বলেছিল যে সে গঙ্গাকে সারা জীবন মনে রাখবে, গঙ্গাকে চিঠি দেবে। গঙ্গার জন্যই সে এ যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেল। অথচ আজও গঙ্গা তার কোন চিঠি পায় নি। আমি বললাম আমি চিঠি দেব, ছবি পাঠাবো। হরিশ ও কুমার জল নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললো তাদের ছবিও পাঠাতে। বললাম গঙ্গার ঠিকানায় তাদের ছবিও অবশ্যই পাঠাবো।

আগুন জ্বালা হয়েছে, জল আনা হয়েছে, প্রয়োজনীয় কাঠ কাটাও হয়েছে। অতএব রাতের খাবার তৈরী করা যেতেই পারে। গঙ্গা ভাড়া করে আনা ডেকচিতে খিচুড়ি চাপালো। আমরা সবাই গোল হয়ে বসে গল্পগুজব করছি। ঘরটাতে অসম্ভব ধোঁয়া হয়ে যাওয়ায় চোখ খুলতে পারছি না। নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। মাঝে মাঝে ডানদিকের দরজাটা খুলে দেওয়া হচ্ছে। দমকা ঠান্ডা হাওয়ায় কিছুটা ধোঁয়া বার হয়ে যাচ্ছে। মোমবাতির খুব অভাব, তাই আলো জ্বালানো হয় নি। ওপরের জানালাটা খোলার প্রয়োজন হবে আগে জানলে, কলকাতা থেকে যাবার আগে ভাল ভাল পুষ্টিকর খাবার খেয়ে, ডন বৈঠক দিয়ে, শরীরটাকে তৈরী করে নিয়ে যেতাম। বেডরুমের  মেঝে, ফুটো হাঁড়ির কৃপায় জলকাদায় থৈথৈ করছে। নানারকম অভিজ্ঞতার কথা আলোচনা হচ্ছে। গঙ্গা একাই এক’শ। ঐটুকু  ডেকচিতে যতটা  সম্ভব বেশী  খিচুড়ি তৈরী করতে গিয়ে সে হিমশিম খাচ্ছে। বিড়ি, সিগারেট খুব দ্রুত শেষ হচ্ছে। এর মধ্যেও  শীতাংশুর হাত স্যাঁকা অব্যাহত আছে। যাহোক্‌ অবশেষে খাবার তৈরী শেষ হ’ল। ব্যাগ থেকে মাখন বার করে দিলাম। গঙ্গা  আমাদের  দু’জনকে খেতে দিয়ে দিল। হরিশের শরীর খারাপ লাগছে বলে অনেকক্ষণ  আগেই বেডরুমের একবারে ডানদিকের “পালঙ্কে” গা এলিয়ে  দিয়েছে। শুধু খাওয়ার  জন্য এতক্ষণ  যুদ্ধ করে, তার আর খাওয়ার ইচ্ছা বা ক্ষমতা,  কোনটাই নেই। গঙ্গাকে খিচুড়ি কমিয়ে দিতে  বললাম। ও ভাবলো  কম  পড়বে  ভেবে  আমরা খাচ্ছি  না। ওকে বললাম  আমার  খিদে পায়  নি। ও একটু কমিয়ে দিল। পরে  আবার আমায় ও  শীতাংশুকে বড় চামচের এক চামচ করে খিচুড়ি দিয়ে হেসে বললো,  এটা আমার অনারে নিন। নিতে হ’ল,  খাওয়াও শেষ হ’ল। উঠে গিয়ে এবার হরিশকে ডাকলাম। ও জানালো ওর শরীর খারাপ লাগছে, আজ রাতে  সে  কিছু  খাবে  না।  ওদের কারো শরীর খারাপ হলে, আমাদের যাওয়া বন্ধ হতে পারে ভেবে, ওকে জোর করে তুলে ওষুধ দিলাম। গঙ্গাকে বললাম ওকে  খাবার দিতে। গঙ্গা ও কুমার খাবার খেয়ে নিল। গঙ্গা জানালো, সে ও কুমার রান্নাঘরে শোবে। আমি  বললাম ওখানে ভীষণ ধোঁয়া,  তাছাড়া ঐটুকু ঘর, তার আবার অর্ধেকটায় ছাই, কাঠ আর আগুনে ভর্তি। গঙ্গা জানালো ওদের কোন অসুবিধা হবে না। বুঝলাম  আমাদের শুতে অসুবিধা হবে ভেবে, ওরা রান্নাঘরে শুতে চাইছে। গঙ্গাকে বললাম, আমাদের কোন অসুবিধা হবে না। তাছাড়া মাটিতে ধোঁয়ার মধ্যে শুয়ে তাদের শরীর খারাপ হলে, আমাদেরই ভুগতে হবে। গঙ্গা আমাদের চিন্তা করতে বারণ করে, রান্নাঘরে কুমারকে নিয়ে, মাটিতে পলিথিন সিট্ পেতে শুয়ে পড়লো। ধোঁয়ায় আমাদের কষ্ট হবে বলে, দুই ঘরের মাঝখানের দরজাটা ভেজিয়েও দিল। আমরা পরদিন ভোরবেলা হাঁটা পথ ধরবো বলে, ব্যাগগুলো গুছিয়ে রাখলাম। পরদিন রাস্তায় খাবার জন্য গঙ্গা খিচুড়ি রান্নার শেষে, রুটি তৈরী করে রেখেছে। কিছু আলুসিদ্ধও রাখা হয়েছে। সবকিছু ঠিক করে রেখে আমরা স্লীপিংব্যাগে ঢুকে পড়লাম।

ঘরের একদম বাঁদিকের তক্তাপোশে শীতাংশু শুয়েছে। ওটার দেওয়ালের দিকের দুটো পা-ই নেই। ওকে সাবধান করে দিয়ে বললাম, “তক্তাপোশটা দেওয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো আছে, বেশী নড়াচড়া কোর না। সবসুদ্ধু ভেঙ্গে পড়বার সম্ভাবনা আছে”। তার পাশেরটায় আমি শুয়েছি। এটার চারটে পা যদিও আছে, তবু একটু নড়লেই, বিকট আওয়াজে সবার পাকা ঘুম ভেঙ্গে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। আমার পাশেরটার তক্তাপোশ নাম হলেও, অর্ধেক তক্তা নেই। কাজেই ওটায় শুলে মাঝখান দিয়ে গলে নীচে মেঝেতে পরে যাবার সম্ভাবনা কম নয়। একবারে ডানদিকে, বারান্দার দিকটায়, হরিশ শুয়েছে। একটু পরেই দেখলাম শীতাংশু ঘুমিয়ে পড়েছে। গঙ্গা ও কুমারের কথাবার্তাও অনেকক্ষণ বন্ধ হয়ে গেছে। হরিশ তো অনেক আগেই ঘুমিয়েছে। আমার পোড়া চোখে ঘুম নেই। নেই কারণ, সারাদিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, স্লীপিংব্যাগে ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর আওতার বাইরের পিসুর দল, সর্বপরি অবিরাম একটা টপ্ টপ্ করে শব্দ। টর্চ জ্বেলে কিসের শব্দ বুঝবার চেষ্টা করলাম। কোথাও কিছু দেখতে পেলাম না। পিসুগুলো বড়ই বিরক্ত করছে। হঠাৎ আমার বাঁ হাতটা ডান কাঁধের কাছে ঠেকতে চমকে উঠলাম। এত ভিজে কেন? উঠে বসে দেখি, বাইরে হাল্কা বৃষ্টি ও কুয়াশার জন্য ছাদ থেকে টপ্ টপ্ করে জল পড়ছে। তাহলে এতক্ষণ এরই শব্দ শুনছিলাম? সর্বনাশ, বাঁদিকের তক্তাপোশে যাবার উপায় নেই। দু’জনে শুলে ওটা ভাঙ্গতে বাধ্য। ডান দিকেরটার অর্ধেক তক্তা নেই। ওটাতে একটা শিশু শুতে পারে। কিন্তু আমি স্লীপিংব্যাগে ঢুকে, নীল আর্মস্ট্রং সেজে ওখানে শুলে? সকাল বেলা আমার মৃতদেহ নির্ঘাৎ নীচের মেঝে থেকে আবিস্কার করা হবে। তখন রূপকুন্ড না গিয়ে আমাকে কাঁটাপুকুর মর্গে যেতে হবে। অতএব কোন উপায় না থাকায়, একটু ডানদিকে সরে চোখ বুজে গায়ের ওপর জল পড়াকে মাথা পেতে মেনে নিয়ে, নিদ্রা দেবীর আরাধনা করতে শুরু করলাম।

আজ বিশে আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরে। ঘরের বাইরে এসে কালকের দুর্যোগের কথা ভুলে গেলাম। ঝকঝকে রোদ উঠেছে।  বাঁহাতে সম্ভবত ত্রিশুল,  নন্দাদেবীর শিরদেশ, শুভ্র পাগড়ীতে ঢাকা। চারদিকে সবুজ ঘাসে, স্নিগ্ধ হাওয়ায়, ছোট ছোট ফুলগুলো দোল  খাচ্ছে। সমস্ত বাঁধাছাদা করে,  আমরা তৈরী হয়ে নিলাম। গঙ্গা কফি তৈরী করলো। কালকের ডেকচিওয়ালা এসে হাজির হ’ল। এসেই এপথের রীতি অনুযায়ী, এর অসুখ, তার মাথার ব্যথা, তার গলার ব্যথা, ইত্যাদি বলে ওষুধ চাইতে শুরু করে দিল। আমাদের সবকিছু প্যাক্ করা হয়ে গেছে। গঙ্গা অবস্থা বুঝে ওকে বললো, বাবুরা নওজোয়ান আদমী, তাই ওষুধের প্রয়োজন নেই বলে কোন ওষুধ সঙ্গে নিয়ে আসে নি। ডেকচিওয়ালা কফি, রুটি খেয়ে, বিড়ি টেনে চলে গেল। আমরা চারিধারের ছবি তুলে, মালপত্র নিয়ে, আলি বুগিয়ালকে নমস্কার করে বিদায় জানিয়ে, পথে নামলাম। জায়গাটা যে এত সুন্দর, গতকাল কুয়াশায় ও মেঘের উৎপাতে, বুঝতে পারি নি। চারিদিকে যত দুর চোখ যায়, শুধু মাঠ আর মাঠ। আস্তে আস্তে উপরে উঠে, আবার আস্তে আস্তে নীচে নামায়, কোন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, জায়গাটার বিশালত্ব বোঝা যায় না, দেখাও যায় না। পায়ে হাঁটার সরু পথ ধরে এঁকেবেঁকে প্রথমে আমি, আমার পিছনে শীতাংশু, কিছুটা দুরে হরিশ ও গঙ্গা। কুমারকে দেখা যাচ্ছে না। ও অনেক পিছিয়ে পড়েছে। গঙ্গা ঠিকই বলেছিল, ওর  মাল বওয়ার অভ্যাস নেই। আজ এখন পর্যন্ত চড়াই ভাঙ্গতে হয়নি। গঙ্গা অবশ্য আগেই বলেছিল  আলি বুগিয়াল থেকে প্রথমে চড়াই ভাঙ্গতে হবে না। অনেকক্ষণ হাঁটলাম, চারিদিকের দৃশ্যপট কিন্তু এতটুকু বদলায় নি। সেই এক মাঠ, এক ফুল, একই পায়ে হাঁটার পথ। শুধু এক ধরণের চিল জাতীয় পাখি, এখানে প্রচুর দেখতে পাচ্ছি। অসম্ভব ভীতু প্রকৃতির পাখিগুলোর কাছে যাওয়া যায় না। কিছুটা দুর থেকে মানুষ দেখেই উড়ে চলে যায়। একসাথে বেশীক্ষণ উড়তেও পারে না, বা বেশী উচুতেও উড়ে যেতে পারে না। উড়বার সময় ডানায় একটা বেশ জোরে আওয়াজ তুলে যায়, সঙ্গে একটা অদ্ভুত ডাক। এগুলো বেশীরভাগই পাথরের আড়ালে বসে আছে। ফলে আমরাও আগে থেকে এদের দেখতে পাচ্ছি না। পাখিগুলোও বোধহয় আমাদের আগে থেকে দেখতে পাচ্ছে না। হঠাৎ কাছে গিয়ে উপস্থিত হলে, আমাদের ভীষণ ভাবে চমকে দিয়ে, ডানায় বিশ্রী আওয়াজ তুলে, ডাকতে ডাকতে উড়ে গিয়ে একটু দুরেই বসে পড়ছে। গঙ্গা জানালো তার পিতাজীর সঙ্গে আসলে এসব পাখী শিকার করে খাওয়ার সুবিধা হয়, কারণ তার পিতাজীর সঙ্গে বন্দুক থাকে। হরিশ জানাল, সে একবার গঙ্গার পিতাজী, বীর সিং এর সাথে কিছু টুরিষ্ট নিয়ে এসেছিল। বীর সিং একটা কস্তুরী হরিণ মেরেছিল। সবাই মিলে কিছু মাংস খেয়ে, বাকী মাংস বিরাট দামে বিক্রী করা হয়েছিল। কাদের বিক্রী করা হয়েছিল, সেইসব খদ্দেররা সেখানে কী করতে এসেছিল, হরিশই বলতে পারবে। যদিও আজ রাতে কস্তুরী মৃগ কেন, পাতি নেড়ি কুত্তা রান্না করলেও, আমার কিছুমাত্র আপত্তি নেই। তবু আমি বললাম, বীর সিং বাবার বয়সী, আর গঙ্গা বন্ধুর মতো। কাজেই বীর সিং এর সাথে গিয়ে শিকার করা পাখি বা হরিণ খাওয়ার থেকে, গঙ্গার সাথে গিয়ে, গঙ্গার হাতের খিচুড়ি খাওয়াতেই বেশী আনন্দ। গঙ্গা আমার কথা শুনে খুব খুশী হ’ল। আমরা এগিয়ে যেতে যেতে গঙ্গাকে বললাম, পাথর ছুড়ে একটা পাখিকে মারা যায় না? আমি নিজেও অনেকবার চেষ্টা করলাম। হরিশ ও গঙ্গাও চেষ্টা করে দেখলো। কিন্তু পাখিগুলোর পাখার জোর না থাকলেও, সৃষ্টিকর্তা বুদ্ধির জোর ভালই দিয়েছেন।

ALI BUGIALALI BUGIAL (2)WAY TO ALI BUGIALআলি বুগিয়াল

এখানে চিরাচরিত একদিকে খাদ, একদিকে পাহাড়ের সারি দেখা যাচ্ছে না। ঠিক যেন একটা বিরাট মাঠের ঠিক মাঝখান দিয়ে  আমরা  হাঁটছি।  গতকাল  রাতের তিক্ত  অভিজ্ঞতার  কথা  গঙ্গা   বোধহয়  এখনও  ভুলতে  পারে নি।  তাই  মধ্যে  মধ্যেই  আমাদের  সতর্ক  করে  দিচ্ছে— “আজ  আমাদের  ১৪৫০০  ফুট  উচ্চতায় পাথুরে  গুহায়  রাত কাটাতে  হবে।  খুব  ঠান্ডা,  তাই  যত  দেরীতে  সম্ভব  পৌঁছনোই  ভাল।  ওখানে  গিয়ে  খাওয়া  দাওয়া  করেই  গুহায়  ঢুকে পড়বো”। গঙ্গা  শেষ  পর্যন্ত  আজকের  রাতের  প্রয়োজনীয়  কাঠ  নিজের  পিঠেই  বেঁধে  নিয়েছে।  হাতে  অঢেল  সময়।  “ যত দেরীতে পৌঁছনো যায়, ততই  মঙ্গল ”,  এই  বেদবাক্য  মাথায়  রেখে  গঙ্গার  কথা  মতো,  মাঝে  মাঝেই  রাস্তায়  বসছি, বাদাম, লজেন্স  চিবচ্ছি, আবার  নতুন  করে  হাঁটা  শুরু করছি। কমলা লেবু স্বাদের গোল গোল লজেন্স আর বাদাম, একসাথে চিবলে যে কী অমৃতের স্বাদ পাওয়া যায়, কী বলবো।

এক সময় গঙ্গা জানালো, এই জায়গাটার নাম “বৈদিনী বুগিয়াল”। জিজ্ঞাসা করলাম থাকার জায়গাটা কোথায়? গঙ্গা জানালো, নীচে নেমে খানিকটা যেতে হবে। ভয় হ’ল গঙ্গা গতকাল রাতে বৈদিনী বুগিয়ালে না থেকে আলি বুগিয়ালে থাকতে বলেছিল, কারণ বৈদিনী থেকে চড়াই এর রাস্তা শুরু। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠেই চড়াই ভাঙ্গতে কষ্ট হবে। আমরা এখন সেই বৈদিনীতে হাজির। অর্থাৎ এবার শুরু হবে উতরাই হীন চড়াই এর রাস্তা। আরও খানিকটা পথ গিয়ে গঙ্গাকে একটু খাবার জল যোগাড় করতে বললাম। হরিশ জানালো একটু এগিয়েই জল পাওয়া যাবে। রাস্তার রূপ আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করেছে। বাঁদিকে সামান্য উচু পাহাড়, ডান দিকে মাঠ যেন অনেকটা নীচে ঢালু হয়ে নেমে গেছে। ফুল এখনও আছে, তবে রঙের সংখ্যা সীমিত হয়ে গেছে।

আমরা এবার বসলাম। হরিশ গেল ওয়াটার বটল্ নিয়ে জল আনতে। সে ফিরে এল প্রায় মিনিট পনের বাদে। প্রাণ ভরে ঠান্ডাজল খেয়ে উঠে পড়লাম। রাস্তা আস্তে আস্তে ওপরে উঠছে। আরও অনেকটা পথ নীরবে হাঁটলাম। মনে শুধু একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে- আগামীকাল সকাল কখন আসবে। বহু আকাঙ্খিত সুন্দরী রূপকুন্ডকে কাল সকালে দেখতে পাবো তো? দুরে বড় বড় পাথরের টুকরো চোখে পড়লো। গঙ্গা জানালো জায়গাটার নাম “পাথরনাচুনি”। নির্জন পাথরনাচুনিতে এসে, গঙ্গা, কুমার ও হরিশ, পিঠের মালপত্র নামিয়ে ফেললো। খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। পাথরের আড়ালে কাঠ জ্বালানো হ’ল। গঙ্গাকে বললাম কম করে কাঠ খরচ করতে। রাতে যেন  কাঠের অভাব না হয়। গঙ্গা জানালো, সঙ্গে যা কাঠ আছে, তাতে আজ রাতের খাবার ও কাল সকালের কফি তৈরী করতে কোন অসুবিধা হবে না। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, বগুয়াবাসায় জল পাওয়া যাবে তো? সে জানালো জল পাওয়া যাবে, তাছাড়া বরফও প্রচুর আছে। গঙ্গা কফি তৈরীর আয়োজন করতে বসলো। আমি এদিক ওদিক একটু ঘুরে নিলাম। কিছু ছবিও তুললাম। কী রকম একটা আনন্দ ও উত্তেজনা বোধ করছি। মনে হচ্ছে এই বিশাল পৃথিবীতে আমরাই মাত্র পাঁচজন প্রাণী। রুটি, আলুসিদ্ধ ও কফি দিয়ে লাঞ্চ শেষ করে, গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম, নাচুনিদের যেখানে কবর দেওয়া হয়েছিল, সেই গর্তগুলো দেখা যায় শুনেছি, সেগুলো কোথায়? গঙ্গা জানালো যাবার পথে পড়বে। জায়গাটার নাম “হুনিয়াথর” অর্থাৎ ভূতেদের স্থান।

PATHAR NACHUNIপাথর নাচুনি

খাওয়া দাওয়া সেরে, মালপত্র বেঁধে, নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করলাম। একটু এগিয়েই ডানদিকে একটা ছোট গর্ত দেখিয়ে গঙ্গা বললো, ওপর দিকে আরও আছে। এই গর্তগুলোই সেই নর্তকীদের কবর। সে আরও বললো “বাবুজী গর্তে কান পেতে শুনুন, আজও নর্তকীদের নুপুরের আওয়াজ শোনা যায়”। নর্তকী হওয়ার অপরাধে জীবন্ত মানুষ কবরে স্থান পাবার পরেও, কবরের ভিতর শুয়ে শুয়ে নাচার সখ হয় কিভাবে কে জানে। যাহোক্, তখন হয়তো নর্তকীদের ঘুমবার বা বিশ্রাম নেবার সময়, আমি কোন নুপুরের শব্দ শুনতে না পেয়েও, এমন একটা ভাব দেখালাম, যেন আমি নুপুরের আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। কোথায় যেন পড়েছিলাম, অনেকদিন আগে কোন এক রাজার রূপকুন্ডের পথে যাবার সময় এই জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সঙ্গে মন্ত্রী-সান্ত্রী, লোক-লশকর ও কিছু নর্তকী নিয়ে সেখানে যাওয়ায়, হিমালয়ের দেবী, নন্দাদেবী রুষ্ট হন। রাজা স্বপ্নে আদেশ পান যে, এই পথে নর্তকীদের নিয়ে গেলে তার বংশ লোপ পাবে, কাজেই তিনি যেন অবিলম্বে ফিরে যান। রাজা স্বপ্নাদেশ পেয়ে সমস্ত নর্তকীদের ওখানে পাথর খুঁড়ে গর্ত করে জীবন্ত কবর দেন। তাই জায়গাটর নাম পাথরনাচুনি। কথিত আছে আজও ঐ গর্তে কান পাতলে নর্তকীদের পায়ের নুপুরের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। এই জায়গাটা হুনিয়াথর নামেও পরিচিত। হুনিয়া মানে ভুত আর থর মানে স্থান, অর্থাৎ ভুতেদের স্থান। পরে অবশ্য প্রায় এর মতোই অন্য গল্পও শুনেছিলাম। যাহোক্, গল্পের সেই নর্তকীদের জীবন্ত কবরস্থান দেখার সখ মিটিয়ে, উপরে ওঠার পর্ব শুরু হ’ল। গঙ্গা জানালো, এরপর “কৈলুবিনায়ক”। আমরা খুব আস্তে আস্তে হাঁটছি। এখনও ভরা বিকেল, কাজেই গঙ্গার কথামতো সন্ধ্যাবেলায় বগুয়াবাসা বোধহয় আর যাওয়া হ’ল না। ভালই হ’ল বগুয়াবাসার শোভা দেখার জন্য হাতে অনেক সময় ও সূর্যালোক পাওয়া যাবে।

 

এরপরে অষ্টম পর্বে……।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s