লে-লাদাখ {লেখাটি Right There Waiting for you…. ও Tour & Tourists পত্রিকায় প্রকাশিত।}

11933477_499335700242184_8226523325230916592_nআজ আটই জুন, দু’হাজার পনের সাল। কথামতো কোন অসুবিধা হবার কথা নয়। হাসান তার টেম্পো ট্রাভেলার গাড়ি নিয়ে জম্মু স্টেশনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। কিন্তু হিমগিরী এক্সপ্রেস প্রায় পাঁচ ঘন্টা বিলম্বে জম্মু এসে পৌঁছলো। আজই আমাদের পহেলগাম চলে যাবার কথা। বিলম্ব দেখে ফোনেই ওকে জানিয়ে দিয়েছি, আজ পহেলগাম যাওয়া না গেলেও আমরা পাটনি টপ্ চলে যেতে চাই। স্টেশনের বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করছে। গাড়ির ভিতরেই সব মালপত্র তুলে এগিয়ে চললাম। বারজন বসার গাড়ি, আমরা এখন নয়জন। আমাদের গাড়ি রাজু নামে একজন চালিয়ে নিয়ে চললো। হাসান তার স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে পিছনে অন্য গাড়িতে লে’র পথে, ওর নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে। রাতে কোথায় থাকবে জানি না, তবে আমাদের পাটনি টপের ওর চেনা হোটেলের নাম ও ফোন নম্বর দিতে ভুললো না। পছন্দ হলে আমরা আজ রাতটা ওখানেই কাটাবো।

JAMMU RAILWAY STATION (3)    ON THE WAY TO PATNI TOP (19)

জম্মু স্টেশন      টেম্পো ট্রাভেলার

 

সুন্দর রাস্তা দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চললো। নন্দিনি ট্যানেলের ভিতর দিয়ে গাড়িটা যখন এগিয়ে যাচ্ছে, খুব ভালো লাগছে। রাস্তার সৌন্দর্যও খুব ভালো, আরও ভালো লাগছে কারণ এবার আজই প্রথম পাহাড়ী পথে ভ্রমণ। মাঝে একবার চা পানের বিরতি। দু’দিনের ট্রেন জার্নিতে সবাই যথেষ্ট ক্লান্ত, তাই আর কোথাও না দাঁড়িয়ে সোজা পাটনি টপে হাসানের পছন্দের “KASSAL” হোটেলে এসে খুব ভালো করে স্নান সেরে নেওয়া গেল। হোটেলটা মন্দ নয়। রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে পূর্ণ বিশ্রাম।

ON THE WAY TO PATNI TOP (7) PATNI TOP (3)

পাটনি টপ যাবার রাস্তা                                                                                    পাটনি টপ

আজ জুনের নয় তারিখ। গাড়ি হোটেলর নীচেই দাঁড়িয়ে আছে। সকাল সকাল তৈরী হয়ে পহেলগামের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। এ রাস্তায় আগেও গেছি। রাস্তার সৌন্দর্য খুবই সুন্দর, অনেকদিন পরে নতুন করে আবার প্রেমে পড়লাম। অনেক বছর পরে “বানিহাল”-এ জহর ট্যানেল আবার দেখার সুযোগ হ’ল। শেষে বিকালের দিকে অল্প ভিজে মেঘ ও কুয়াশার মধ্যে সুন্দরী পহেলগাম এসে পৌঁছলাম। ড্রাইভার রাজুর সাহায্য “HOTEL SHIKARGAH RESORT” রাতের আস্তানা পাকা করে শহর ঘুরতে বেরলাম। হোটেলটা বেশ ভালো, কর্মচরীদের ব্যবহারও ভালো। এখানে আবার আমাদের গাড়িকে চন্দন বাড়ি, বা আরু ও বেতাব ভ্যালিতে যেতে দেওয়া হবে না। ইউনিয়নের খেলা ও মস্তানি বোধহয় ভারতবর্ষের সর্বত্রই বিরাজমান। স্থানীয় মোটর ইউনিয়নের অফিসে গিয়ে পরের দিনের জন্য সতেরশ’ টাকায় একটা টাটা সুমো ঠিক করা হ’ল। আটজনের বেশী লোক নেওয়া হবে না। আমরা নয়জন, অনেক বুঝিয়ে রাজী করানোও গেল। এখানকার ব্যবস্থা পাকা করে স্থানীয় বাজার, মামল মন্দির, মসজিদ, লীডার নদীর পাড়ে পার্কে বসে, ছবি তুলে সন্ধ্যা (এখানকার রাত্রি) পর্যন্ত বেশ কাটলো। স্থানীয় পুনম রেস্টুরেন্টে চা জলখাবার খেয়ে আর এক প্রস্থ ঘুরেফিরে, হোটেলে ফিরে এলাম। আজও স্বাভাবিক ভাবে সবাই বেশ ক্লান্ত, বিশ্রামের প্রয়োজন। রাতের খাবার খেয়ে যে যার ঘরে চলে গেলাম।

 

PAHELGAM (36)

PAHELGAM        PAHELGAM (18)

পহেলগাম হোটেল                                                                                             পহেলগাম

আজ জুন মাসের দশ তারিখ, আজ আমাদের শ্রীনগর চলে যাওয়ার কথা। কথামতো সকাল আটটায় টাটা সুমো গাড়িটা আমাদের হোটেলে চলে এল। আমরা প্রথমে আরু ভ্যালি গেলাম। আগে এই জায়গাটা দেখা হয় নি। তখন এর নামও শুনি নি। হয়তো পরবর্তী কালে জায়গাটা টুরিষ্ট স্পট হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। তবে স্বীকার করতেই হবে, অতুলনীয় এক জায়গার সাথে পরিচিত হবার সুযোগ হ’ল। অনেক, অনেক দিন পরে এরকম সবুজের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হ’ল। বেশ কিছুক্ষণ পায়ে হেঁটে আরু ভ্যালি ঘুরে গাড়িতে ফিরে এলাম, উদ্দেশ্য, চন্দন বাড়ি। সেই চন্দন বাড়ি, তেত্রিশ বছর আগে পহেলগাম থেকে পায়ে হেঁটে গিয়েছিলাম অমরনাথ যাবার পথে। জায়গাটাকে একবারে অপরিচিত মনে হ’ল। তবে গতবার এখানে এত বরফ দেখি নি, আর দেখি নি ঘনঘন এত হেলিকপ্টারের আনাগোনা। স্ত্রী ও অন্যান্য মহিলাদের লাঠি ভাড়া করে দিয়ে গ্লেসিয়ারের ওপর দিয়ে হাঁটার আনন্দ উপভোগ করতে সাহায্য করলাম। বেশ কিছুক্ষণ সময় চন্দন বাড়িতে কাটালাম। এবার বেতাব ভ্যালি। ১৯৮২ সালে অমরনাথ থেকে হেঁটে ফেরার পথে অনেক উচু থেকে ওখানে সুটিং হতে দেখেছিলাম। শুনেছিলাম বেতাব ছবির সুটিং হচ্ছে। আজ আবার সেই জায়গা, পার্থক্য একটাই, এখন জায়গাটা বেতাব ভ্যালি নামে খ্যাত। তাই হয়, অরুণাচলের মাধুরী লেকের কথা মনে হ’ল। তা হোক, তবু সুটিং এর দৌলতে যে জায়গাটা খুব সুন্দরভাবে সাজানো গোছানো হয়েছে, এটাই আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বড় পাওয়া।

ARU VALLEY (7)  BETAB VALLEY (2)  CHANDANBARI (15)

আরু ভ্যালি                         বেতাব ভ্যালি                               চন্দনবাড়ি

এবার হোটেলে ফেরার পালা, আজ আমাদের শ্রীনগর চলে যেতে হবে। যেতে হবেই, কারণ দলের দশম সদস্যা, কন্যাসম ঝুম, আকাশপথে আজ বিকালে শ্রীনগর এসে আমাদের সাথে যোগ দেবে। হোটেলে ফিরে রাজুর গাড়িতে মালপত্র তুলে শ্রীনগরের পথে যাত্রা শুরু করা গেল। রাস্তার ধাবায় দুপুরের খাবার, আলুর পরোটা। মাঝে এক দোকানে কফি খেতে নামা হ’ল। অখাদ্য কফি খেয়ে বৃষ্টিতে ভিজে আবার গাড়িতে। বিকেলের দিকে শ্রীনগর এসে হাজির হলাম। রাস্তায় সঙ্গী বন্ধুটি তার মেয়ে ঝুমকে নিয়ে আসার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় নেমে পড়লো। এখানেও “কোহিনুর” হোটেলটা মন্দ ছিল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাবা ও মেয়ে হোটেলে চলে এল। দশজনের দলটা এতক্ষণে পরিপূর্ণ হ’ল। মেয়েদের পছন্দমতো ভাত, ডাল, পোস্ত খাবার বাসনা মেটাতে, সন্ধ্যার পর ছেলেরা গিয়ে বাঙালী খাবারের হোটেলের সন্ধান করে “অপূর্ব-তৃষা” হোটেলের সন্ধান পেলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে বাজার ঘুরে ভালো চালের গরম ভাত, ডাল, আলু পোস্ত, আর মুরগীর ঝোল দিয়ে রাতের আহার সেরে হোটেলে ফিরে এলাম।

আজ এগারই জুন। সকাল সকাল তৈরী হয়ে রাজুর গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি তার চোখ মুখ ফুলে ঢোল। ড্রাইভারের সিটে কাত হয়ে আধশোয়া হয়ে, সে সিগারেট ফুঁকছে। জানা গেল তার গায়ে প্রবল জ্বর। সে তার গাড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অপর একটা টেম্পো ট্রাভেলার দেখিয়ে জানালো ওটা তার বন্ধুর গাড়ি। তার বন্ধু নিজে তার গাড়িতেই আমাদের গুলমার্গ, খিলেনমার্গ নিয়ে যাবে। সেইমতো আমরা রাজুর বন্ধুর গাড়িতে চেপে বসলাম। আমাদের সাথে কোন মালপত্র নেই, কাজেই অসুবিধা হবার কথা নয়। কিন্তু গাড়িটা যেমন অপরিস্কার তেমনি নড়বড়ে। একটু লাফালেই পিছনের সিটটা মেঝেতে পড়ে যায়। যাহোক শেষপর্যন্ত গুলমার্গ গিয়ে হাজির হলাম। এখানে এসে এবার এক নতুন অভিজ্ঞতা হ’ল। খিলেন মার্গ যাওয়ার রোপওয়ে পর্যন্ত যেতে ইচ্ছুক একশত লোককে নিয়ে যাওয়ার জন্য এক সহস্র ঘোড়ার মালিক তাদের ঘোড়া নিয়ে প্রস্তুত। তাদের ইচ্ছামতো টাকায় ঘোড়া নিতে না চাইলে, তারা তাদের ঘোড়াগুলিকে এমন ভাবে দাঁড় করিয়ে রাখবে, যে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়াও সম্ভব নয়। এই জাতীয় অত্যাচার রাজস্থানের শাম-এ মরুভূমির ওপর উটে চড়ার সময়ও সহ্য করতে হয় নি। শেষ পর্যন্ত টুরিজিমের অফিসে গিয়ে সমস্যার সমাধান হলেও, সময়ের অভাবে রোপওয়ে করে দুটো পর্বে চোদ্দশ’ টাকা খরচ করে, খিলেনমার্গ যাওয়ার পরিকল্পনা এবার ত্যাগ করতে বাধ্য হলাম। আগামীকালই আমাদের সোনমার্গ, দ্রাস হয়ে কারগিল চলে যাবার কথা। তাই রোপওয়ে চাপার জন্য বিশাল লাইনের পিছনে না দাঁড়িয়ে, শ্রীনগর ফিরে আসাই যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করে, শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম এবং ফিরে এসে রাজুর গাড়িতে এই ড্রাইভারের সাথেই শালিমার, নিশাত, ও চেশমাশাহি উদ্দান ঘুরে দেখে সিকারা চেপে ডাললেক পরিদর্শন করাও সম্পন্ন করলাম। এবার কাশ্মীর ভ্রমণ আমাদের উদ্দেশ্য নয়, শ্রীনগর দিয়ে লে গিয়ে মনালি হয়ে ফেরাই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই অল্পেতে, বুড়ি ছুঁয়ে আমাদের খুশী হওয়া ছাড়া উপায়ও নেই। এবার শুরু হ’ল সবথেকে বিরক্তিকর পর্বের সুচনা, কেনাকাটা করা। মাঝপথে আগামীকাল যে আমাদের গাড়ি চলিয়ে লে নিয়ে যাবে, তার ফোন পেয়ে একবার হোটেলের কাছে এসে আলাপ পর্ব শেষ করলাম। মাত্র তেইশ বছরের তরতাজা একটি ছেলে, নাম জিগমে। বাড়ি লে তে। ঠিক হ’ল আগামীকাল সকাল আটটায় সে তার গাড়ি নিয়ে আসবে। তার সাথে কথা বলে আবার বাজারে ফিরে গেলাম। শেষে কেনাকাটা পর্ব শেষ হলে আবার বাঙালী খানা খেয়ে হোটেলে ফেরা।

OUR DRIVER JIGME   জিগমে  SRINAGAR (89) SRINAGAR (36)

আজ বারই জুন। সাড়ে আটটার মধ্যে তৈরী হয়ে বেড়িয়ে পড়া গেল। আগে বেড়িয়েও খুব একটা লাভ নেই, কারণ সোনমার্গ থেকে কার্গিলের পথে প্রায় বারটার আগে কোন গাড়িকে যেতে দেওয়া হয় না। জিগমের গাড়ি চালানোর হাত খুবই ভালো, দেখতেও তার গাড়িটার মতোই ঝাঁ-চকচকে। তবে দোষ একটাই, নিজে থেকে কোন কথা বলে না। পুরানো দিনের অনেক বাংলা ও হিন্দী গান পেন-ড্রাইভ এ ভরে নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই সব গান শুনতে শুনতে খোশমেজাজে আমরা এগিয়ে চলেছি। একসময় সোনমার্গ এসে পৌঁছলাম। জায়গাটা আমার অনেক বছর আগে দেখা। এর সৌন্দর্যের বিবরণ আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। হাতে অনেক সময়, PEAKS HOTEL & RESTAURANT এ গরম গরম আলুর পরোটা ও কড়া কফি দিয়ে প্রাতরাশ সেরে বেশ কিছুটা সময় সোনমার্গে কাটালাম। এবার এগিয়ে যাবার পালা। মাঝপথে রাস্তা অতিরিক্ত বরফে ঢেকে থাকায় আমাদের গাড়ি প্রায় শ’খানেক গাড়ির পিছনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো।

ON THE WAY TO KARGIL (8)

ON THE WAY TO KARGIL (20)            ON THE WAY TO KARGIL (17)

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে পায়ে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে দেখি, সামনে বরফ কেটে রাস্তা পরিস্কারের কাজ চলছে। আরও কিছু পরে ছোট গাড়িদের এগিয়ে যাবার অনুমতি মিললো। আমাদের পিছনের ছোট গাড়িগুলোও আমাদের টাটা সী-ইউ করে পাশ কাটিয়ে চোখের আড়ালে চলে গেল। একসময় আমাদেরও এগিয়ে যাবার সুযোগ এল। আমাদের গাড়ি ধীরে ধীরে জোজিলা পাশের গুমরি, দ্রাস, ভীমবাট, থাসগাম, সিমসা, কাকসার হয়ে কারগিলের পথে এগিয়ে চললো। “ভীমবাট”-এ দ্রাস ও সুরু নদীর সঙ্গমস্থলটা বেশ সুন্দর। মাঝপথে বরফের ওপর কিছুক্ষণ সময় কাটাতে আমরা গাড়ি থেকে রাস্তায় নেমেছিলাম। জিগমে এগিয়ে এসে জানালো যে সামনে কারগিল যুদ্ধের একটা মিউজিয়াম আছে, বেশী দেরি করলে সেটা দেখার সুযোগ হবে না। কারণ মিউজিয়ামটায় বিকাল চারটের পর ঢুকতে দেওয়া হয় না। সময় নষ্ট না করে গাড়িতে ফিরে এলাম। অনেক পথ পেরিয়ে প্রায় পাঁচটার পরে কারগিল ওয়ার মেমোরিয়ালের সামনে এসে দেখলাম, ভিতরে ঢোকায় কোন বাধা বা অসুবিধা নেই। দীর্ঘক্ষণ সময় ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে চোখে জল এসে গেল। অরুণাচলের তাওয়াং-এই একই অনুভুতি হয়েছিল। তবে বারবার ভারতরত্নের কন্ঠে “আয় মেরে ওয়াতান কী লোগো” চালাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শেষে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিশ্রী সুরে বিখাত শিল্পীর নিজের কন্ঠে “বন্দে মাতরম্”, যা শুনে সদ্য প্রয়াত এক ভারত বিখ্যাত শিল্পীর উক্তি “এই গান শুনলে দেশ মাতৃকা পালাবে”, শুনতে খারাপ লাগছিল। এই জায়গায় বোধহয় লতার ঐ গান ছাড়া অন্য কোন গান সত্যিই বেমানান। অসংখ্য শহীদের ছবির কাছে দাঁড়িয়ে ভাবতেও লজ্জা করছিল— এঁদের মৃতদেহ নিয়ে যাবার কফিন নিয়েও আমরা দালালি করি, ঘুষ খাই, ব্যবসা করি।

KARGIL WAR MEMORIAL (1)          KARGIL WAR MEMORIAL (48)    KARGIL WAR MEMORIAL (71)

যাহোক অনেকক্ষণ সময় কাটিয়ে কারগিলের উদ্দেশ্য যাত্রা করলাম। এটা প্রায় দ্রাস-এ অবস্থিত। এখান থেকে করগিল অনেকটা রাস্তা। অবশেষে বিকেলের শেষে কারগিল এসে হাজির হলাম। এখান থেকে কোন জায়গার হোটেল বুক করে যাই নি। হাসানকেও সেই দায়িত্ব দেওয়া হয় নি, তবে কথা ছিল প্রয়োজনে সে আমাদের হোটেল খুঁজে নিতে সাহায্য করবে। সেইমতো এখানেও হোটেলটার সাথে ফোনে সে কথা বলে রেখেছিল। জিগমে তার কথামতো “হলিডে ইন” হোটেলটার সামনে গাড়ি দাঁড় করায়। দোতলার ওপর আমাদের চারটে ঘর, একরাত থাকার পক্ষে মন্দ নয়। রাতে বাইরের এক হোটেল থেকে খাবার কিনে নিয়ে এসে সবাই মিলে মেঝেতে বসে পিকনিক মুডে খাওয়া হ’ল।

আজ তেরই জুন। আজ আমাদের এবারের ভ্রমণের মূল আকর্ষণ, লে তে পৌঁছনোর কথা। গতকাল রাতেই জিগমে জানিয়ে গেছে সকাল সকাল না বেরলে অসুবিধা হতে পারে, পৌঁছতে দেরী হয়ে যেতে পারে। সকাল সাড়ে আটটায় গাড়ি ছেড়ে দিল। রাস্তার সৌন্দর্য খুব ভালো। সত্যি কথা বলতে কী আমি তো হিমালয়ের কোন অংশে সৌন্দর্যের অভাব দেখি না। তবে এই রাস্তায় রঙের বৈচিত্র ও প্রাচুর্য অনেক বেশী। একসময় আমরা “মুলবেখ” এসে হাজির হলাম। এখানে বিশাল বুদ্ধমূর্তি সহ গুম্ফা আছে। জায়গাটা বেশ ফাঁকা হলেও সুন্দর। এখানে PARADISE HOTEL & RESTAURANT এ জলখাবার ও কফি খেয়ে বেশ চাঙ্গা হওয়া গেল। ধীরে ধীরে একসময় ১২১৯৮ ফুট উচ্চতার “নামিকা লা” তে এসে পৌঁছলাম। কিছুক্ষণ ইতস্তত ঘোরাফেরা ও ছবি তোলা শেষে, আবার এগিয়ে যাওয়া। যাবার পথেই লামায়ুর গুম্ফা, লিকির গুম্ফা, শ্রীনগর-লে হাইওয়ের উচ্চতম স্থল- ফাতুলা টপ (১৩৪৭৯ ফুট), ম্যাগনেটিক ফিল্ড, খালসে, নুরলা, সাসপল, আলচি গুম্ফা হয়ে নিম্মু তে এসে হাজির হলাম। এখানে জাঁসকার ও সিন্ধু নদের সঙ্গম স্থলটা খুব সুন্দর। এখানেও অনেকটা সময় ব্যয় করতেই হ’ল। গুরু নানকের পাথর সাহিব দেখেও খুব ভালো লাগলো।

 

FATULA TOP (4)              MULBEKH (2)             NAMIKA LA (5)

ফাতুলা টপ্                                মুলবেখ গুম্ফা                                 নামিকা লা

PATHAR SAHIB (10)            LAMAYURU GUMPHA (19)            ALCHI (16)

পাথর সাহিব                                   লামায়ুর গুম্ফা                                        আলচি

LIKIR GUMPHA (1)         NIMMU (1)        LEH (12)

লিকির                                        নিম্মু                                    হোটেল (লে)

শেষে আরও বেশ কিছু পথ পাড়ি দিয়ে আমরা লে শহরে এসে পৌছলাম। হাসান ও জিগমে, উভয়েরই বাড়ি লে শহরে। হাসানের সাথে জম্মু ত্যাগ করার পর শ্রীনগরে একবার সাক্ষাত হয়েছিল। ও আমাদের হোটেলে এসে দেখা করে গিয়েছিল। তখনই ও জানায় যে, লে তে হোটেলের সমস্যা নেই। কারগিলেও হোটেলের সমস্যা খুব একটা নেই, তবে কারগিল সেই অর্থে টুরিষ্ট স্পট নয়। যাত্রী সংখ্যা বেশী হলে, হোটেল ভাড়া বেশী হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। সেইমতো ওকে কারগিলে থাকার হোটেলের ব্যবস্থা করে রাখতে বলেছিলাম। লে শহরে ঢোকার মুখে ফোনে হাসানের সাথে যোগাযোগ করে হোটেলের কথা জিজ্ঞাসা করা হ’ল। জম্মু-কাশ্মীরের সবথেকে বড় সমস্যা, মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া। কোন প্রি-পেড মোবাইল কাজ করে না। বি.এস.এন.এল. পোষ্ট-পেড একমাত্র কাজ করে, তবে সেটা মোবাইলের মালিকের ইচ্ছামতো সময়ে নয়, বি.এস.এন.এল., হয়তো বা মোবাইলের ইচ্ছামতো সময়েই কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়। কাজেই আমাদের সঙ্গে বার-চোদ্দটা মোবাইল থাকলেও, দু’টো মাত্র মাঝেমাঝে আংশিক কাজ করছে। শুনেছিলাম লে তে হাসানের নিজের হোটেল আছে। মালিক হোটেল না কী যেন একটা হোটেলের কথা জিগমেকে ফোনে বলেও দিল। কিন্তু এই হোটেলটা খুঁজে পেতে জিগমে অনেক সময় নিয়ে নিল। মূল রাস্তা থেকে বেশ চওড়া গলির ভিতর অনেকটা জায়গা নিয়ে এই তিনতলা হোটেলটা। মোট দশ-বারটা ঘর আছে। আমাদের গাড়ি কম্পাউন্ডের দরজার কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে বড় দরজা খুলে দেওয়া হ’ল।

মনে হ’ল ওরা যেন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। দোতলায় পরপর চারটে ঘর। মাঝখান দিয়ে সিঁড়ি। ঘরগুলোর সামনে লম্বা বারান্দা। তিনতলা ও একতলাতেও একই রকম ঘর, তবে একতলায় একটা বা দু’টো ঘর হোটেলের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য রাখা আছে। হোটেলটার সব ভালো, সোলারের সাহায্যে গরম জল হয়। এই সন্ধ্যায়ও কল থেকে ফুটন্ত গরম জল পড়ছে। যে যার ঘরে গিয়ে সাবান শ্যাম্পু সহযোগে আপাদমস্তক প্রাণ খুলে, মন ভরে স্নান সেরে নিলাম।

LEH (5)        HEMIS GUMPHA (17)     KHARDUNGLA TOP (6)

লে হোটেলের ছাদ থেকে                     হেমিস গুম্ফা                                খারদুংলা টপ্

লে তে আমাদের হোটেলটার সব ভালো হলেও অসুবিধা একটাই, প্রাতরাশ আর চা কফি ছাড়া এখানে কোন খাবার পাওয়া যায় না। মেয়েরা এখন পুরুষদের সমান, সম অধিকার দাবীও করে, কিন্তু বাজারে গিয়ে খাবার খেয়ে আসা, বা কিনে নিয়ে আসার ব্যাপারে দেখা গেল তারা সে অধিকার স্বচ্ছন্দে বর্জন করে ঘরে গরম কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে বসে থাকাটাই সমীচিন মনে করলো। সুতরাং আমরা তিন ভাঙ্গা কুলো, ছাই ফেলতে, অর্থাৎ খাবার কিনতে অচেনা বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বাইরে বেশ ঠান্ডা, রাস্তাও অচেনা। খানিকটা পথ যাওয়ার পরেই উল্টোদিক থেকে আসা একটা ঝাঁ চকচকে ইনোভা গাড়ি আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে গেল। চালকের আসনে হাসান বসে। আমরা খাবারের সন্ধানে বাজারে যাচ্ছি শুনে সে গাড়ি ঘুরিয়ে আমাদের নিয়ে একটা হোটেলের সামনে নামিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। খাবার কেনার পর সে আমাদের সাথে হোটেলে এল। আবার এক প্রস্থ আলোচনার পর স্থির হ’ল আগামীকাল আমরা লে শহর ঘুরে দেখে তার পরের দিন শীতল মরুভূমি নুবরা ভ্যালির উদ্দেশ্যে রওনা হ’ব। কিছুক্ষণ পর হাসান চলে গেলে আমরা একটা ঘরে খাটে, চেয়ারে, সোফায় এমনকি মাটিতে বসেও বনভোজনের মতো রাতের খাবার খেলাম।

আজ চোদ্দই জুন। আজ আমাদের একটু বেলা করেই বেরনোর কথা। আমাদের দলের একজনের একটু শরীর খারাপ হওয়ায়, ওরা কর্তা-গিন্নী হোটেলে থেকে বিশ্রাম নেওয়া মনস্থ করলো। হোটেলের নীচে গাড়ি এসে হাজির, তবে গাড়িটা আমাদের পরিচিত জিগমের JK 10A 2813 হলেও, চালকের আসনে অপরিচিত একজন। সে জানালো তার নাম দোরজে, জিগমে সামান্য অসুস্থ, তাই আজ তাকে পাঠিয়েছে। আগামীকাল জিগমেই আমাদের নুবরা ভ্যালি নিয়ে যাবে। জিগমে একটা ইনোভা ও এই গাড়িটার মালিক। দোরজে তার ইনোভা গাড়িটা চালায়। বুঝতে পারছি তার একদিন বিশ্রামের প্রয়োজন, আমাদের মতো সেও ক্লান্ত। যাহোক আমরা দোরজের সাথে লে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমেই সে আমাদের হেমিস গুম্ফা দেখাতে নিয়ে গেল। রাজস্থানে যেমন প্রধান আকর্ষণ দুর্গ, কারগিল থেকে লে আসার পথে, ও লে তেও তেমনি গুম্ফার অভাব নেই। সত্যি কী না জানি না, যাওয়ার পথে অনেকটা জায়গা নিয়ে প্রায় গুম্ফাকৃতি একটা বাড়ি দেখিয়ে দোরজে জানালো, দলাই লামা লে তে আসলে এখানেই থাকেন। এরপর “সে প্যালেস”। সে প্যালেস থেকে থিকসে গুম্ফা যাওয়ার পথে “DRUK WHITE LOTUS SCHOOL” দেখতে গেলাম। এই স্কুল আগেও ছিল, এখনও আছে। তবে অনেকেই এর নাম জানতেন না, এখনও কতজন জানেন বলতে পারবো না। স্কুল দেখতে গিয়ে রেজিস্টারে নাম লিখতে হ’ল। তারপর ঐ অফিস ঘরে সাজানো চেয়ারে বসিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের একজন অল্প কথায় স্কুলের একটি পরিচিতি দিলেন। তারপর স্কুলেরই একজন সকল দর্শনার্থীকে একসাথে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে স্কুলটি ঘুরিয়ে দেখালেন। অনেকটা জায়গা নিয়ে এই স্কুল। যাবার পথে বাম দিকে পরপর ছেলেদের ছোটছোট হোস্টেল, ডানদিকে মেয়েদের। ৭৩৫ জন বাচ্চা স্কুলটাতে পড়ে, ৩৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রায় দুশ’ জন বাচ্চা বিনা পয়সায় পড়ার সুযোগ পেলেও অন্যান্যদের ঐ স্কুলে পড়ার খরচ বছরে অনেক টাকা। যদিও দেখেতো সবাইকেই স্থানীয় বলে মনে হ’ল। হ্যাঁ, স্কুলটা আমীর খানের THREE IDIOTS খ্যাত সেই ছবির মতো স্কুল। যিনি সঙ্গে করে নিয়ে স্কুল ঘুরে দেখাচ্ছিলেন, তিনি অনেকবারই জানালেন স্কুলটা সিনেমায় দেখাবার অনেক আগেই বেশ কয়েকটা আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। তবে তিনি কিন্তু আগ্রহী সব দর্শনার্থীদের, সিনেমায় দেখানো দোতলা থেকে ‘সুসু’ করার জায়গাটা অধিক আগ্রহ নিয়ে দেখাতে ভোলেন নি। অনেকটা জায়গা এখনও ফাঁকা পড়ে আছে, ছবির মতো সুন্দর স্কুলটা আরও বড় হোক আশা নিয়ে গাড়িতে ফিরে এলাম।

 

ON THE WAY TO DRUK WHITE LOTUS SCHOOL (67)            DRUK WHITE LOTUS SCHOOL (53)              DRUK WHITE LOTUS SCHOOL (47)

থিকসে গুম্ফা দেখে স্তোক প্যালেস দেখলাম। স্তোক প্যালেসে টিকিটের বোঝা অনেক বেশী হলেও, মিউজিয়ামটি বন্ধ। শেষে ডাকাডাকির পর এক বৃদ্ধ এসে দরজা খুলে দিয়ে গেলেন। প্রাচীন কালের ব্যবহৃত বাসনপত্র, অস্ত্রশস্ত্র, ও অন্যান্য ব্যবহৃত সামগ্রী থাকলেও, অত টাকার টিকিট হওয়ার কোন যুক্তি খুঁজে পেলাম না। সুরক্ষিত অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও একটি যুবক সর্বক্ষণ আমাদের সাথে ঘুরে ঘুরে সংরক্ষিত জিনিসের ব্যবহার বর্ণনা করে গেল। মিউজিয়ামের ভিতরে ছবি তুলতে দেওয়া হয় না। বাইরে চেয়ারে বসা টিকিট বিক্রেতা ও গাইড-কাম পাহারাদারের খরচ মেটাতেই বোধহয় টিকিটের হার এত বেশী। তবে রাজ পরিবার বলে কথা। যা বোঝা গেল এই প্যালেসেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে তারা এখনও বসবাস করেন। বেশ বড় বড় তিনটে কেকের বাক্স নিয়ে দু’জনকে ভিতরে যেতে দেখলাম। শুনলাম আজ নাকি কার জন্মদিন। মাথার ভিতর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করলো— এত বড়বড় কেক বা তার সুদৃশ্য বাক্স কোথা থেকে নিয়ে আসা হ’ল। তবে রাজ পরিবারের সদস্যদের রাজপ্রাসাদে স্থান হলেও, বুদ্ধদেবকে কিন্তু একা একা অনেকটা দুরে খোলা আকাশের নীচে বসে থাকতে হচ্ছে।

বেশ বুঝতে পারছি দলের অধিকাংশেরই আর আগের মতো গুম্ফা দেখা, বিশেষ করে সিঁড়ি ভাঙ্গায় উৎসাহ নেই। এটা অবশ্য ঘটনা, যে গত কয়েকদিন যাবৎ আমাদের পরিশ্রমের তুলনায় বিশ্রাম অত্যন্ত কম হচ্ছে। সময় ও সুযোগের অভাবে খাওয়া দাওয়াও ঠিক মতো হচ্ছে না। ফলে শরীরে ক্লান্তি আসা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।

STOKE PALACE (3)           STOKE PALACE (6)         STOKE PALACE (4)

দোরজে আমাদের এবার লে প্যালেস নিয়ে চললো। তবে দলের প্রায় অধিকাংশই দু’হাত অন্তর গুম্ফা ও প্যালেসের সিঁড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে বিপর্যস্ত। ফলে শান্তির একমাত্র জায়গা শান্তি স্তুপ দেখে হোটেলে ফেরাই মনস্থ হ’ল। দোরজেকে

SHANTI STUP (16)       THIKSAY GUMPHA (62)       DISKIT (3)                             শান্তি স্তুপ                                 থিকসে গুম্ফা                        দিস্কিত গুম্ফা

বলা হ’ল ফেরার পথে বাজারে একটু হোটেলের কাছে দাঁড়াতে। স্থির হ’ল আমরা একবারে খাবার কিনে নিয়ে হোটেলে ফিরে যাব। কিন্তু দোরজে গাড়ি নিয়ে এমন একটা জায়গায় এসে হাজির হ’ল, যে গতকালের পরিচিত হোটেলতো দুরের কথা আশে পাশে কোন হোটেল-রেস্টুরেন্ট নেই। অগত্যা আমরা তিনজন নেমে গিয়ে দোরজেকে বললাম মেয়েদের হোটেলে পৌঁছে দিয়ে সে যেন চলে যায়। অনেক ঘোরাঘুরির পর তরুনের একক প্রচেষ্টায় গতকালের হোটেলটা খুঁজে বার করা হ’ল। খাবারের অর্ডার দিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম রাস্তা চিনে সে হোটেলে ফিরে যাতে পারবে কী না। উত্তরে সে জানালো যে এটা কোন ব্যাপারই নয়। আমরা খাবার নিয়ে হোটেলের উদ্দেশ্যে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরপাক খেয়ে বিফল হলাম। হোটেলে এক সঙ্গীকে ফোন করেও হোটেলের নাম বা রাস্তার নাম সঠিক জানা গেল না। রাতও ভালই হয়েছে। মালিক হোটেলের সন্ধান দেওয়া তো দুরের কথা, নামই কেউ শোনে নি। হোটেলটায় কোন সাইনবোর্ড নেই, সেটার নাম যে মালিক হোটেল, সে ব্যাপারেও আমরা নিশ্চিত নই। অবশেষে একটা দোকানে এক বয়স্ক ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করায় তিনি কোন রাস্তায় জিজ্ঞাসা করলেন। হঠাৎ মনে হ’ল আজ সকালে একা হোটেলের কাছেই একটা দোকানে সাবান কিনতে গিয়ে দু তিনটে বড় বড় সুদৃশ্য হোটেলের ছবি আমার ছোট ক্যামেরাটায় তুলেছিলাম, আর ক্যামেরাটা এখন আমার সঙ্গেই আছে। কাঁধের ছোট ব্যাগ থেকে কাগজের বাক্সটা বার করে তার ভিতরে পলিথিনের সরু প্যাকেট থেকে সাদা নরম টিসু পেপারে মোড়া ক্যামেরাটা বার করতে দেখে ভদ্রলোক বললেন, “ওটা কী বার করছেন”? কিন্তু আমায় তখন কে থামাবে? এত বড় একটা সুত্রের আবিস্কার করে আমি তখন উত্তেজিত, নিজের আবিস্কারে নিজেই মুগ্ধ। ক্যামেরা অন করে “HOTEL ANTELOPE” এর নাম সহ ছবি দেখাতেই ভদ্রলোক আমাদের হোটেলের রাস্তা বাতলে দিলেন। আমরা প্রায় আমাদের হোটেলের কাছাকাছি ঘুরপাক খাচ্ছিলাম। শেষে ঘরের ছেলেরা ভালোয় ভালোয় ঘরে ফিরে এলাম।

আজ পনেরই জুন। আজ আমরা শীতল মরুভূমি নুবরা ভ্যালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করবো। এখান থেকে পুল্লো (১৫৩০০ ফুট),খারদুংলা, খালসার হয়ে দিস্কিত। পুল্লোকে আবার দেখলাম দুভাগে ভাগে ভাগ করা হয়েছে, দক্ষিণ ও উত্তর পুল্লো। যাবার পথে দিস্কিতের ঠিক আগে ডানদিকে বেঁকে সুমুর গুম্ফা ও প্যানামিক উষ্ণপ্রস্রবণ দেখে যাবার কথা। সম্ভব হলে দিস্কিত-এ গুম্ফা ও বুদ্ধ মূর্তি দেখে, রাতে “হুন্ডার” এ রাত কাটিয়ে পরদিন তুরতুক গ্রাম দেখে হুন্ডারে ফিরে আসা। সকাল আটটার আগেই কথামতো জিগমে তার গাড়ি নিয়ে হোটেলের নীচে এসে উপস্থিত হ’ল।

স্নান সেরে তৈরী হয়ে সকাল সোয়া আটটায় বেড়িয়ে পড়া গেল। এই রাস্তার সৌন্দর্য অতুলনীয়। গতকাল শান্তি স্তুপে দাঁড়িয়ে উল্টোদিকের দুরের তুষারাবৃত সাদা বরফে ঢাকা পাহাড়ের দিকে দেখিয়ে দোরজে জানিয়েছিল, আজ আমাদের গাড়ি ঐ বরফের ওপর দিয়ে নুবরা যাবে। সাদা বরফের ওপর সরু কালচে দাগ দেখিয়ে সে জানিয়েছিল, ওটাই গাড়ি চলাচলের রাস্তা। আজ আমরা পৃথিবীর উচ্চতম মোটর যাবার রাস্তা, খারদুংলার ওপর দিয়ে যাব, কাজেই রাস্তায় যে বরফের আধিক্য থাকবে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বাস্তবে যে এরকম বরফ রাস্তার ওপর আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে ভাবতেও পারি নি। দুরের, বহুদুরের সাদা বরফেরা ধীরে ধীরে স্বাগত জানাতে যেন আমাদের রাস্তার দু’পাশে প্রাচীরের মতো নেমে এল। ক্রমে ক্রমে তারা রাস্তার ওপর নেমে এসে আমাদের বেষ্টন করে ফেললো। গাড়ি ধীরে ধীরে এক বরফের সাম্রাজ্যে প্রবেশ করে পথ না পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। সামনে ছোট, সেজ, মেজ, বড়, হাজার গাড়ির লাইন। এত গাড়ি কোথায় যাচ্ছে কে জানে। সামনে এক দৈত্যাকৃতির বুলডোজার তার ইস্পাতের লম্বা শুঁড় দিয়ে রাস্তা থেকে বরফ চেঁচে তুলে রাস্তা পরিস্কার করছে। রাস্তার বরফ ঐভাবে চেঁচে তোলার ফলে রাস্তার ওপর দিয়ে বরফগলা জল গড়িয়ে আসছে। এরমধ্যে শুরু হ’ল তুষার বৃষ্টি। গাড়ি থেকে নামতে গেলে সঙ্গীদের অনেকেই ঠান্ডা লেগে যাবার ভয়ে নামতে বারণ করলো। ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া হলে তখন দেখা যাবে, ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাওয়া যাবে, কিন্তু এই দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ বারবার পাওয়া যাবে না। গাড়ি থেকে রাস্তায় নামলাম। মূহুর্তের মধ্যে গাড়ির ছাদ, উইন্ডস্ক্রীন, বনেট সাদা বরফে ঢেকে গেল। এবার কিন্তু ঠান্ডা লাগার ভয় উপেক্ষা করেই সবাই গাড়ি থেকে রাস্তায় নেমে দাঁড়ালো। শুধু দাঁড়ালোই না, তুষার বৃষ্টি মাথায় করেই বরফের ওপর হাঁটতে, বরফ ছোড়াছুড়ি করতেও পিছপা হ’ল না। এবার বরফে ঢাকা সাদা রাস্তার ওপর গাড়ির চাকার কালো দাগের ওপর দিয়ে গাড়িগুলো এগতে গিয়ে অধিকাংশ গাড়িই সোজা না গিয়ে পিছলে বাঁদিক বা ডানদিকে চলে যাচ্ছে। শেষে অনেক গাড়িতেই চাকায় লোহার শিকল বাঁধা হ’ল। উপযুক্ত মাপের শিকল অনেক গাড়িতেই, বিশেষ করে ছোট ছোট গাড়িগুলো ও মিলিটারি গাড়িতে রাখাই থাকে বলে মনে হ’ল। আমাদের গাড়িতে লোহার শিকল নেই, প্রয়োজনও হ’ল না। সামনের কাচের জমা বরফ পরিস্কার করে, জিগমে গাড়ি সাবধানে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করলো।

 

 

ON THE WAY TO KHARDUNGLA (11)      ON THE WAY TO KHARDUNGLA (7)      ON THE WAY TO KHARDUNGLA (75)

ON THE WAY TO KHARDUNGLA (53)      ON THE WAY TO LEH VIA KHARDUNGLA (11)       ON THE WAY TO KHARDUNGLA (10)

শেষে সমস্ত বাধা অতিক্রম করে একসময় আমরা খারদুংলা টপ্-এ এসে পৌঁছলাম। খারদুংলা পাস পৃথিবীর উচ্চতম মোটরেবল্ রোড। এই খারদুংলা টপের উচ্চতা ১৮৩৮০ ফুট। এখানে দেখলাম এই উচ্চতাকে সাক্ষী রেখে ছবি তোলার হিরিক। তবে উত্তেজনা ও আনন্দের আতিশয্যে বোর্ডটাকেই সবাই গার্ড করে ছবি তুলতে ব্যস্ত। আমরাও বেশ কিছুটা সময় এখানে কটিয়ে “খালসার”(১০০৬০ ফুট) এর উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলাম। খালসার ও চেনমার্গ অতিক্রম করে সায়ক নদীর পাশ দিয়ে দিস্কিত আসার আগে ডানদিকের রাস্তা ধরে সুমুর গুম্ফা দেখে নিলাম। সেখান থেকে প্যানামিক। প্যানামিকের উষ্ণ প্রস্রবণ দেখে কিন্তু সত্যিই হতাশ হতে হ’ল। প্যানামিক তার হট স্প্রিং এর জন্য, না তার হট স্প্রিং কিচেনের জন্য বিখ্যা্‌ত, ঠিক বোধগম্য হ’ল না। তা আবার এর জন্যও টিকিট। যাহোক, সেখান থেকে একসময় দিস্কিত এসে পৌঁছলাম। প্রথমে আমাদের হুন্ডার থেকে তুরতুক্ যাবার পরিকল্পনা ছিল না। তাই হুন্ডার যাবার পথেই দিস্কিত-এর গুম্ফা ও বুদ্ধমূর্তি দেখে যাবার কথা ছিল। পরে হুন্ডার থেকে প্রায় ৮৭ কিলোমিটার দুরে তুরতুক্ গ্রাম দেখতে যাওয়া স্থির হওয়ায়, হুন্ডারে অতিরিক্ত একদিন রাত্রিবাস করা ঠিক হয়। জিগমে আমাদের হুন্ডার থেকে ফেরার পথে দিস্কিত গুম্ফা দেখার পরামর্শ দেয়। সেইমতো আমরা দিস্কিতে সময় নষ্ট না করে, সোজা হুন্ডারের দিকে এগিয়ে গেলাম। অবশেষে হাসানের কথামতো জিগমে আমাদের হুন্ডারের একটি হোটেলে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীও চারটি ঘর না ফাঁকা থাকায়, হোটেলের একটি ছেলে, কাছেই “HORCHO GUEST HOUSE” এ নিয়ে এল। ঐ হোটেলের মতো এখানেও হাজার টাকা করে ঘর ভাড়া। ঠিক হ’ল আগামীকাল আমরা হোটেলটায় চলে যাব। ওখানে একটু ভালো খাবার দাবার মিলবে। স্বামী-স্ত্রী মিলে গেষ্ট হাউসটি চালান। ভদ্রমহিলা ওখান থেকে বিশ কিলোমিটার দুরের একটা স্কুলের শিক্ষীকা। খুব ভালো ব্যবহার, আন্তরিকতার অভাব নেই। আমরা চারটে ঘর নিলাম। একটু দরাদরি করে আটশ’ টাকা করে ভাড়া ঠিক হ’ল। খুব ভালো ঘরগুলো। প্রাকৃতিক পরিবেশও খুবই সুন্দর। অনেকটা জায়গা নিয়ে বাগান। রাতে খাবার খেতে একতলায় গিয়ে দেখি, সে এক অদ্ভুত ব্যবস্থা। গোটা ঘরটায় কার্পেট পাতা। ঘরের তিনপাশে দেওয়াল ঘেঁষে মোটা গদি পাতা, পিছনে হেলান দেওয়ার জন্য তকিয়া। সামনে অল্প উচু টেবিল বা জলচৌকির মতো পাতা। এই গদিতে বসে জলচৌকির ওপর খাবার নিয়ে খেতে হবে। গদিগুলো এত মোটা ও নরম যে খাওয়ার পর ঘরে না গিয়ে ওখানেই শুয়ে পড়ার ইচ্ছা মনে জাগবেই।

HUNDAR (53)       HUNDAR (1)       HUNDAR (50)

হরচো গেষ্ট হাউস                              ডাইনিং হল                            মালিক ও মালকিন

আজ ষোলই জুন। আজ এখান থেকে প্রায় সাতাশি কিলোমিটার দুরে তুরতুক্ গ্রাম দেখতে যাবার কথা। ভারত-পাকিস্তান বর্ডারর (এল.ও.সি. থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দুর) এই মুসলিম গ্রামটি ১৯৭১ সালের আগে ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং গত বছর পর্যন্ত ঐ গ্রামে প্রবেশ করার জন্য ভারতীয়দের পারমিটের প্রয়োজন হ’ত।
গতকাল গেষ্ট হাউসের মালিক ভদ্রলোক এখানে ছিলেন না। কোন একটা কাজে তাঁর গাড়ি নিয়ে লে তে গিয়েছিলেন। আজ তাঁর ফেরার কথা। আমরা আজ আর সেই হোটেলে না গিয়ে এখানেই রাত কাটাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। সকলে এখান থেকে তুরতুক্ গিয়ে ফিরতে ফিরতে বিকাল গড়িয়ে যাবে, তাই গতকালই ভদ্রমহিলাকে খাবার প্যাক্ করে দেবার কথা বলে রেখেছিলাম। তিনি সকালে আমাদের বেড-টি দিয়ে, আমাদের খাবার তৈরী করে, নিজে স্কুলে যাবার জন্য সকাল আটটার মধ্যে প্রস্তুত হয়ে নিলেন। একজন মহিলা যে কত পরিশ্রম করতে পারেন ও কতদিক একা সামলাতে পারেন, তাঁকে দেখলে বোঝা যায়। বন্ রুটির মতো দেখতে মাথাপিছু দু’টো করে রুটি একটা হটপটে দিয়ে, সঙ্গে একটা শিশিতে জ্যাম ও অপর একটা শিশিতে মাখন দিয়ে, তিনি একটা ঝোলায় দিয়ে দিলেন। মাখন খাওয়ায় আমার নিষেধ আছে। তবে মাখন খাওয়া না রুটির মূল্য দেওয়া, কোনটায় আমার হৃতপিন্ড বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হ’ল বলা মুশকিল। মাথাপিছু দু’টো রুটি ও খানিকটা জ্যাম ও মাখনের দাম পড়লো একশ’ ত্রিশ টাকা মাত্র। কাল রাত থেকে ঝুমের শরীরটা ভালো না থাকায়, ও আজ আমাদের সাথে যাবে না। ফলে ওর মাকেও ওর সাথে গেষ্ট হাউসেই থাকতে হ’ল। যাইহোক গাড়িতে ওঠার সময় ভদ্রমহিলা তাঁকে তাঁর স্কুলের সামনে নামিয়ে দিতে আমাদের অনুরোধ করলেন। আজ আমরা মাত্র আটজন। তাঁকে আমাদের গাড়িতে তুলে নেওয়া হ’ল। অন্যান্য দিন তিনি কিভাবে স্কুলে যাতায়াত করেন জিজ্ঞাসা করায় জানা গেল, যে অন্যান্য দিন তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে স্কুল যাতায়াত করেন। এবার কিন্তু সত্যিই মনে হ’ল— এ তো মেয়ে মেয়ে নয়, দেবতা নিশ্চয়।

আমাদের গাড়ি এগিয়ে চললো। নৈসর্গিক সৌন্দর্য অসাধারণ। পাশের পাহাড়ের যেমন অদ্ভুত রঙ, তেমনি অদ্ভুত তার গঠন। দেখলে মনে হবে যে, কেউ যেন ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে সারা পাহাড়ের গায়ে খোদাই করেছে। বেশ কিছুক্ষণ পরে ভদ্রমহিলা তাঁর স্কুলের কাছে নেমে গেলেন। কথাবার্তায় জানা গেল তাঁর ডাকনাম হরচো, যদিও তার অর্থ ওনার নিজেরও জানা নেই বলে জানালেন। সুন্দর সৌন্দর্যের সাথে মানানসই সুন্দর রাস্তা দিয়ে এঁকেবেঁকে আমরা একসময় সেই ছবির মতো ছোট্ট সুন্দর গ্রাম, “তুরতুক্” এসে পৌঁছলাম। ছোট্ট নদীর ওপর দিয়ে সাঁকো পেরিয়ে আমরা গ্রামে ঢুকলাম। লে তে সবুজের বড় অভাব। যতটুকু দেখা যায়, ওখানকার মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সেটা সম্ভব হয়েছে। তুরতুক্ গ্রামটি কিন্তু বেশ সবুজ। ছোট ছোট চাষের জমি ও বাগানের মাঝখান দিয়ে সরু রাস্তা। অনেক বাচ্চাকে একা বা তাদের মা বা অন্যান্য আত্মীয়ার সাথে দেখলেও, যেখানে আমরা গাড়ি থেকে নেমেছিলাম, সেখানে দু’-চারজন ছাড়া গোটা গ্রামে কোন বয়স্ক পুরুষের দেখা মিললো না। গ্রামের পায়েচলা সরু পথ দিয়ে অনেকটা ভিতরে চলে গেলাম। ছোট ছোট বাড়িগুলোয় পর্যটকদের জন্য “হোম-স্টে” এর ব্যবস্থা আছে। ছোট হলেও একটা স্কুল দেখলাম। শুনলাম আরও বেশ কিছুটা পথ পাড়ি দিলে বর্ডার দেখা যায়। সঙ্গের মেয়েরা আর এগতে রাজী হ’ল না। সারা পথে কোথাও বসার মতো জায়গাও নেই, তাই ইচ্ছা না থাকলেও ফিরতেই হ’ল।

 

 

TURTUK (6)             TURTUK (3)                 TURTUK (25)

TURTUK (15)         TURTUK (5)         TURTUK (14)

এবার ফেরার পালা। গাড়িতে উঠে একশ’ ত্রিশ টাকা দামের দুটো বাদশাহী রুটি জ্যাম দিয়ে খেয়ে, আবার আগের সেই পথ ধরেই একসময় হুন্ডারে হরচোর আস্তানায় ফিরে এলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে ভদ্রমহিলা ফিরে এসেই আমাদের চা দিয়ে গেলেন। শুনলাম তিনি আমাদের গাড়ি চলে আসার ঠিক পরেই ঐ রাস্তায় আসেন এবং কোন মিলিটারি গাড়িতে ফিরে আসেন। রাতে ভদ্রলোক লে থেকে ফিরে এসে আমাদের সাথে আলাপ করলেন। বেশ শান্ত স্বভাবের ভদ্রলোক। রাজস্থানের শামে থর মরুভূমিতে আমার একবার উটের পিঠে চেপে ঘোরার সুযোগ হয়েছিল। আজ কিছুক্ষণ পরে গাড়ি আমাদের উট চাপাতে নুবরা শীতল মরুভূমিতে নিয়ে যাবে। তা আবার যে সে উট নয়, দুই কুঁজ বিশিষ্ট উট। হরচো জানালো যে, ওখানে একটা স্থানীয় সংস্কৃতির ওপর খুব ভালো অনুষ্ঠান হয়, আমরা যেন অতি অবশ্যই সেটা দেখি। এই জাতীয় একটা অনুষ্ঠান উদয়পুরে দেখে খুব ভালো লেগেছিল। ঠিক হ’ল উটের পিঠে চেপে, অনুষ্ঠানটা দেখে আমরা ফিরবো। যথা সময়ে গাড়ি আমাদের নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গেল। আমরা এক একজন এক একটা উটের পিঠে বসে পড়লাম। একে তো উটের বসা ও দাঁড়ানোর অদ্ভুত কায়দার জন্য উটে চাপা একটু ঝামেলা সাপেক্ষ। এখানে আবার উটের পিঠে চেপে ধরার জায়গার বড় অভাব। তাই মাথাপিছু দুই শত টাকা দিয়ে প্রাণ হাতে করে, ক্যামেরা বাঁচিয়ে, অনেকটা জায়গা ঘুরে দেখলাম। তবে আমাদের কপাল খারাপ, মানালির রাস্তা আজ ধ্বসে অনেকক্ষণ বন্ধ থাকার জন্য অনেকেই উপস্থিত হতে না পারায়, আজ ঐ অনুষ্ঠানটি বন্ধ রাখা হয়েছে। দীর্ঘ এলাকা জুড়ে বিস্তীর্ণ বালির ওপর ঘুরেফিরে, শুয়ে বসে অনেকটা সময় উপভোগ করে, আস্তানায় ফিরে এলাম। আগামীকাল সকালে আমরা লে ফিরে যাব। আবার সেই খারদুংলা পাস, তাই সকাল সকাল বেরোবার পরিকল্পনা করে রাতের খাওয়া সেরে মালপত্র গুছিয়ে শুয়ে পড়লাম।

HUNDAR (12)      HUNDAR      HUNDAR (42)

HUNDAR (40)       HUNDAR (31)      HUNDAR (17)

শীতল মরুভূমি নুবরা

আজ সতেরই জুন। সকাল সোয়া আটটায় হুন্ডারকে বিদায় জানিয়ে আমরা লের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। পথে দিস্কিতে গুম্ফা ও বুদ্ধমূর্তি দেখতে কিছুক্ষণ সময় ব্যয় করতে হবে। সেই পুরনো রাস্তা ধরে দিস্কিত এসে পৌঁছলাম। এখানকার বুদ্ধমূর্তিটির উচ্চতা নাকি একশ’ ছয় ফুট। আগে অনেকটাই নাকি হেঁটে উঠতে হ’ত। তবে এখন সে কষ্ট আর নেই। সুবিশাল বুদ্ধমূর্তিটি অনেকটা সময় নিয়ে ঘুরেফিরে দেখলাম। দেখলাম গুম্ফাটিও। এবার এগিয়ে যাওয়ার পালা। জানিনা এবারও উত্তর পুল্লো, দক্ষিণ পুল্লো ও খারদুংলা পেরতে, আসার সময়ের মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হবে কী না। তবে আমি কিন্তু মনে মনে ঐ অবস্থাকে আবার কামনা করছি। সময় লাগে লাগুক, কিন্তু এ সৌন্দর্য দর্শনের সুযোগ জীবনে বারবার আসে না। এবার কিন্তু দু’পাশে বরফের মধ্যে দিয়ে গাড়ি গেলেও, তুষারবৃষ্টি দেখার বিশেষ সুযোগ হ’ল না। ধীরে ধীরে একসময় আমরা আবার লের সেই পুরনো হোটেলের পুরনো ঘরে নির্বিঘ্নে ফিরে এলাম।

আজ আঠারই জুন। কথামতো আজ আমাদের বেশ সকাল সকাল প্যাংগং এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ার কথা। সামান্য বিলম্ব হলেও জিগমে তার গাড়ি নিয়ে মোটামুটি ঠিক সময়ে এসে হাজিরও হলো। আমরা গাড়িতে যখন মালপত্র গুছিয়ে তুলতে শুরু করেছি, তখন জিগমে জানালো আজ প্যাংগং গিয়ে রাতে থেকে আগামীকাল ওখান থেকে সরাসরি সুমরিরি চলে গেলে এবং তারপর দিন সুমরিরি থেকে কেলং যেতে গেলে গাড়িতে তেলের অভাব হবে। কাজেই ও একটা ফাঁকা বড় জ্যারিকেন নিয়ে আসছে, রাস্তায় তেল ভরে নেবে। আমাদের টুর চার্ট ও ভালোভাবেই জানে, কাজেই এই কাজটা সে এখানে আসার আগেই কেন করে এল না বুঝলাম না। ও গাড়ি নিয়ে চলে গেল। ইতিমধ্যে হাসান এসে উপস্থিত হ’ল। ও এখনও আমাদের কাছ থেকে অনেক টাকা পাবে। ও আমাদের দশ হাজার টাকা রেখে বাকীটা এখন দিয়ে দিতে বললো। বাকী দশ হাজার মানালি পৌঁছে জিগমেকে দিয়ে দিতে হবে। ওকে ওর প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হ’ল। বেশ কিছুক্ষণ ওর সাথে গল্গগুজব করার পর জিগমে এক বিরাট জ্যারিকেন নিয়ে এসে হাজির হ’ল। এমনিতে ওর গাড়িতে স্টেপনি রাখার মতো বড় একটা জ্যারিকেন গাড়ির পিছনে রাখার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করাই আছে। গাড়ির ট্যাঙ্ক ও ঐ জ্যারিকেন তেলে ভর্তি। তবু তেল কম পড়বে বলে নতুন জ্যারিকেন নিয়ে আসা হ’ল। আসলে লে থেকে প্যাংগং এর দুরত্ব অনেক। আবার প্যাংগং থেকে সুমরিরির দুরত্ব প্রায় ২৩৫ কিলোমিটার, এবং এই পথে কোন পেট্রল পাম্প নেই। ইতিমধ্যে দেরি হচ্ছে দেখে রাস্তায় যাতে আর সময় নষ্ট করতে না হয় তাই এই হোটেলেই প্রাতরাশ সেরে নেওয়া হয়েছে। আমরা প্যাংগং এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম।

আমাদের গাড়ি কারু, সেরথি, জিঙ্গরাল (১৫৫০০ ফুট), ডাগসে, দুরবুক, টাঙ্গসে, লুকুং, স্প্যাংমিক হয়ে প্যাংগং এর উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললো। কারুতে আমরা টুকটাক কিছু খেয়ে নিয়ে আবার এগিয়ে চললাম। দু’পাশের পাহাড়ের রঙ ও গঠন বৈচিত্র্য অতুলনীয়। যেন কোন দক্ষ শিল্পীর আপন খেয়ালে বিভিন্ন রঙ নিয়ে পাহাড়ের ক্যানভাসে আঁচড় কাটা, অথবা ছেনি হাতুড়ি দিয়ে নিজের পছন্দে পাহাড়ের গায়ে ধ্রুপদী শৈলীর খোদাই করা। এবারের টুরের সমস্ত পথের সৌন্দর্যটাই একটু অন্য প্রকৃতির, ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সারা পথের দু’ধারের পাহাড়, হয় সদ্য বিধবার মতো সাদা আবরণে আবৃতা, নাহয় নববিবাহিতা তরুণীর মতো বিভিন্ন রঙের আবরণে সুসজ্জিতা, এবং কী তার শারীরিক গঠন।

 

 

DSCN6781        DSCN6564         ON THE WAY TO LEH VIA KHARDUNGLA (8)

একসময় আমরা বহুদুর থেকে নীল জলের লেকের সামান্য অংশ দেখতেপেয়ে বুঝতে পারলাম যে, আজকের মতো আমাদের পথ চলা শেষ। আমাদের গাড়ি স্প্যাংমিক-এ এসে দাঁড়ালো। বাঁপাশে গভীর নীল রঙের বিশাল লেক, ও লেকের জলে, পাড়ে ও আকাশে ঘুরপাক খেয়ে নীচে নেমে আসা ব্রাহ্মণী হাঁসেদের দেখে আমরা সব ভুলে, লেকের ধারে গিয়ে তাদের ও নিজেদের ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আমাদের গাড়ির ঠিক পাশে বেশ কয়েকটা গাড়ি ও মোটর সাইকেল। তার পাশেই দু’চারটে হোটেল। এবার লে থেকে নুবরা যাওয়ার সময় থেকে এখন পর্যন্ত সমস্ত পথে মোটর সাইকেল নিয়ে ভ্রমণার্থীর সংখ্যা প্রচুর দেখতে পেলাম। বেশীরভাগই রয়েল এনফিল্ড বুলেট গাড়ি, এবং তার পিছনে প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু বাঁধা। যাহোক, আমরা এখানে অনেকটা সময় ব্যয় করে হোটেলর সন্ধানে এগিয়ে চললাম। হাসানকে একটা হোটেলের সাথে কথা বলে রাখতে বলেছিলাম, সে কথা বলে রাখবে বলেওছিল। কিন্তু বাস্তবে টাওয়ারের অভাবে সে যোগাযোগ করতে পারে নি। এখানে দেখলাম হোটেলের তুলনায় তাঁবুর সংখ্যা অনেক বেশী। আমরা হোটেল অঞ্চলের কাছে গিয়ে দেখি কোন হোটেলে জায়গা নেই। অনেক গাড়ি ও মোটর সাইকেলের ভিড় দেখেই বুঝেছিলাম, আজ এখানে যাত্রী সংখ্যা বেশ ভালোই। আবার হোটেলের খোঁজ করতে করতে স্প্যাংমিকে ফিরে আসা হ’ল, হয় ঘর খালি নেই, নাহয় অসম্ভব ভাড়া। শেষে স্প্যাংমিকে একটা অতি সাধারণ হোটেলের পরপর তিনটে ঘরের মাঝেরটা ছাড়া দু’পাশের দুটো ঘর অনেক বুঝিয়ে, অনেক অনুরোধ করে রাজী করানো গেল। তাতে মেয়েদের ছ’জনের কষ্ট করে রাতটা থাকার ব্যবস্থা করে, আমাদের চারজনের থাকার ঘরের সন্ধানে লেগে পড়লাম। লেক দেখা মাথায় উঠলো। পাশেই আর একটা ঘরের সন্ধান পাওয়া যেতে আমরা হাতে চাঁদ পেলাম। কাঁটাতারের বেড়ার ভিতর দিয়ে কোনমতে সেখানে গিয়ে ঘর দেখার পর হোটেলের লোকটি জানালো যে, ঘরটি অন্ লাইনে বুক করা আছে কিন্তু এখনও কেউ আসে নি। ঘরের ভীষণ প্রয়োজন, আশার একটা ফিকে আলোর রেখাও দেখা যাচ্ছে, তাই তাকে বললাম “অন্ধকার হয়ে আসছে আর কী তারা আসবে বলে মনে হয়”? উত্তরে সে জানালো, “টাকা অ্যাডভান্স করা আছে। আপনি একটু অপেক্ষা করুণ, আমি বরং ফোন করে জেনে নিচ্ছি”। আশার আলো আরও একটু উজ্জল হ’ল। কিন্তু এবার সে জানালো, “এখান থেকে ফোনের টাওয়ার পাওয়া যায় না। তিন-সাড়ে তিন কিলোমিটার দুরে গেলে ফোন করা যাবে, আপনি একটু অপেক্ষা করুণ আমি জেনে আসছি”। হ্যারিকেনের আলো নেভার আগে দপদপ্ করে, এক্ষেত্রে তাও করলো না। আশার আলো দপ্ করে নিভে গেল। অতক্ষণ অপেক্ষা করার পর এই ঘর না পাওয়া গেলে, বিপদে পড়তে হবে। তাই আবার সেই হোটেল অঞ্চলের দিকে পায়ে হেঁটেই এগলাম। হ্যাঁ, প্রমাণ হ’ল ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়। অনেক বুঝিয়ে দু’হাজার টাকায় একটা চলনসই ঘর ঠিক করা গেল। এক অল্পবয়সী ভদ্রমহিলা এটি চালান। ঘরে তালা দিয়ে ঘর দখল করে, আমরা আবার সঙ্গের মেয়েদের হোটেলে ফিরে এসে, তাদের এখানেই রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে, নিজেদের প্রয়োজনীয় টুকটাক্ জিনিসপত্র নিয়ে, প্রায় তিনশ’ মিটার দুরে গিয়ে নিজেদের ঘরে ঢুকলাম। চারজনের থাকার পক্ষে কষ্টকর হলেও চালিয়ে নিতে হবে। ঘরের বিছানা চারজনের উপযোগী করে লেপ কম্বল নিয়ে বেশ গুছিয়ে বসা গেল। বিশ ফুট দুরেই ডাইনিং হল। আমি আমার ভালো ক্যামেরাটা বিকল হয়ে গেছে দেখে তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এমন সময়, রাত সাড়ে নটার সময় সেই মহিলা এসে হাত জোড় করে আমাদের ঘর ছেড়ে দিতে অনুরোধ করলেন। কারণ হিসাবে তিনি জানালেন যে ঘরটা অন লাইনে যাদের বুকিং ছিল, তারা এখন এসে হাজির হয়েছে। তাদের ঘর না দিলে তাঁর লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। একেই বোধহয় টকের ভয়ে পালিয়ে এসে তেঁতুল তলায় বাস বলে। আমরা এখন কোথায় যাব জিজ্ঞাসা করায় ভদ্রমহিলা বললেন আপনাদের আমি টেন্টের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, ফ্রি অফ্ কষ্ট্। ততক্ষণে ঘরের বাইরে গোলমাল শুরু হয়ে গেছে। ভদ্রমহিলার অসহায় আবস্থার কথা ভেবে আমরা ঘর ছেড়ে দিলাম। আমাদের চারজনকে ডাইনিং হলের কাছে একটা বেশ বড় টেন্ট দেওয়া হ’ল। মাটিতে কী পাতা আছে জানি না। তবে তার ওপরে একটা কার্পেট জাতীয় কিছু পাতা আছে। ভদ্রমহিলা বেশ মোটা মোটা ও নরম চারটে সিঙ্গল বেডের ভালো গদি পেতে দিয়ে, তার ওপর আবার একটা কার্পেট জাতীয় নরম কিছু পেতে দিলেন। সঙ্গে আটটা পরিস্কার লেপ। আগের থেকে ব্যবস্থা ভালোই হ’ল। ডাইনিং হলে গিয়ে খেয়ে এসে তাঁবুর চেন টেনে একটু গল্পগুজব করে শুয়ে পড়লাম।

PANGONG (29)         PANGONG (36)          TSUMORIRI (2)

DSCN6356         DSCN6432           DSCN6450

আজ ঊনিশে জুন। আজ আমাদের এখান থেকে সোজা ২৩৫ কলোমিটার দুরে সুমরিরি চলে যাবার কথা। আমরা ভদ্রমহিলার খোঁজ করলাম। হোটেল ঘর ও তাঁবুর আশেপাশে এমনকি ডাইনিং হলেও তাঁর দেখা পেলাম না। কেউ বলতেও পারলো না তিনি কোথায়। শেষে আরও কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে শেষপর্যন্ত ফিরে এলাম। ভদ্রমহিলা তার ফ্রি অফ কষ্ট্-এর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে আমাদের বিষ্মিত করলেন।

শেষপর্যন্ত আমাদের গাড়ি ছেড়ে দিল। আমাদের গাড়ি সোলটাক্, খাড়গু, হয়ে আবার সেই কারু এসে উপস্থিত হ’ল। এখানে, খাওয়া দাওয়া সেরে, আমরা উপসি, লিকচে, গায়ক্, নুরনিস, কেশার, কিয়লমাঙ্গ, চুমাথাং, মাহি, সোকার হয়ে সুমরিরির উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম। চুমাথাং এর উষ্ণ প্রস্রবণটি দেখার মতো। মণিকরণকে বাদ দিলে যমুনোত্রী ছাড়া এরকম ফুটন্ত উষ্ণ প্রস্রবণ আর কোথায় দেখেছি, মনে করতে পারছি না। একেবারে নদীর পাশে অনেকগুলো জায়গা দিয়ে ফুটন্ত জল বার হচ্ছে। ঘুরে ঘুরে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে দেখে ও ফটো তুলে গাড়িতে ফিরে এলাম। এবারের ভ্রমণ পথে বন্যপ্রাণীর প্রাচুর্যের কথা শুনে আসলেও, তাদের সাথে তেমন সাক্ষাৎ হয় নি। শুধুমাত্র কয়েকটা মারমট্, অদ্ভুত রঙের গাধা, চমর-চমরী, স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে আমাদের সাথে দেখা করে ও ছবি তোলার সুযোগ দিয়ে গেছে। আর একটা প্রাণী, কেন্নো আকৃতির বেশ বড় সাপের মতো দেখতে, প্রচন্ড গতিতে রাস্তা পার হতে একবারই মাত্র দেখার সুযোগ পেয়েছি। ধীরে ধীরে এখানকার সন্ধ্যার পরে, ওখানকার বিকাল বেলায় আমরা সুমরিরি এসে হাজির হলাম। খুব ছোট জায়গা, কিন্তু অপর্যাপ্ত গাড়ি ও মোটর সাইকেলের ভিড় দেখে গত রাতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ভেবে ভয় পেয়ে গেলাম। দু’চার জায়গায় স্থান না পেয়ে, বিফল মনোরথে শেষপর্যন্ত আরও কয়েকজন মোটর সাইকেল আরোহীর সাথে এক বৃদ্ধের সঙ্গে, যদিও তিনি জানালেন যে তাঁর নাম দোরজে, বয়স ঊনপঞ্চাশ বছর, তাঁর দোতলা বাড়ির ওপর তলায় গিয়ে হাজির হলাম। সেখানে ততক্ষণে এক বিদেশী দম্পতি একটি ঘর দখল করে নিয়েছেন। আরও সম্ভবত পাঁচটি ঘর আছে, কিন্তু মোটর সাইকেল আরোহীরা আগে আসায় তাদের সাথে ঘর নিয়ে বৃদ্ধের কথাবার্তা শুরু হ’ল। প্রভু বুদ্ধের অশেষ কৃপা, তাদের ঘর পছন্দ হ’ল না। গতকালের অভিজ্ঞতার পর আর একমূহুর্ত সময় নষ্ট না করে, আমরা চারটে ঘর নিয়ে নিলাম। একটি অ্যাটাচ বার্থ, যদিও ঐ ঘরটি ভীষণ স্যাঁতসেঁতে। তবে আরও দু’টি বাথরুম আছে। আমরা ঐ ঘরটি ঠিক পছন্দ নয় বলায়, ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঐ ঘরটা বাদ দিয়ে বাকী তিনটি ঘর নিতে বললেন। তিনি আরও জানালেন যে ঐ বিদেশী দম্পতি খুব ভোরে চলে যাবেন, কাজেই আমাদের কোন অসুবিধা হবে না। প্রতি ঘরের ভাড়া ছয়শত হিসাবে তিনটি ঘর নিয়ে নেওয়া হ’ল। দোতলায় তিনটি বাথরুম, অসুবিধা হবার কথা নয়। আমরা এবার নিশ্চিন্তে লেক দেখতে গেলাম। লেকের ধারে দাঁড়িয়ে মোহিত হয়ে গেলাম। কী যে তার রূপ, বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই। অনেকক্ষণ লেকের ধারে দাঁড়িয়ে, বসে, ছবি তুলে সময় কাটালাম। জিগমেকে তার গাড়ি সমেত সঙ্গে নিয়ে এসেছি। এবার তার গাড়িতে করে লেকটা যতটা পারা যায় ঘুরে দেখে হোটেলের পথ ধরলাম। মনের মধ্যে হঠাৎ একটা প্রশ্নের উদয় হ’ল – ঐ অ্যাটাচ বার্থ সমেত ঘরটা কেউ ভাড়া নিয়ে নেয়নি তো? তাহলে তো সাড়ে সর্বনাশ, দুঃখ, কষ্ট, অসুবিধার শেষ থাকবে না। সবকিছুর মধ্যে অসুবিধা খুঁজে বার করার লোক তো আমাদের দলেও আছে।

হোটেলে ফিরে এসে দোরজে সাহেবকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, ঘরটা এখনও কেউ নেয় নি, তবে নেবার সম্ভাবনা আছে। সত্যি কিনা জানিনা, তবে কোন ঝুঁকি না নিয়ে ঐ ঘরটার জন্য আরও তিনশ’ টাকা দিয়ে নিজেদের দখলে নিয়ে নেওয়া গেল। একটা ঘরে কিভাবে খাট বা চৌকি রাখলে অনেক বেশী লোকের জায়গা করা যায়, দোরজে সাহেবের কাছে শিখতে হয়। তার অর্থ কিন্তু এই নয় যে ঘেঁষাঘেঁষি করে চৌকি সাজিয়ে ঘর ভর্তি করা। বাথরূমে কল থাকলেও জল নেই, কোনসময় থাকে কী না, পরিস্কার করে জানা গেল না। তবে কিছু বলার আগেই দোরজে সাহেব একতলা থেকে বেশকিছু বড় বড় পাত্রে জল ভরে নিয়ে এসে রেখে দিলেন। কী পাওয়া যায় খোঁজ করিনি, তবে ঠিক নীচেই রাস্তার ওপর একটা রেস্টুরেন্ট জাতীয় দোকান আছে। কিন্তু আমরা এঁর এখানেই খাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাত, ডাল, অমলেট ও গোটা গোটা আলুসিদ্ধ। পেঁয়াজ ও লঙ্কা কুচিয়ে দিতে বলা হ’ল, মেয়েরা নিজেদের মতো করে সিদ্ধ আলু মেখে নেবে। একতলাটা বেশ অন্ধকার। সেখানে দোরজে দম্পতি আমাদের জন্য রান্নায় ব্যস্ত। একতলাতেই ডাইনিং রূম। এই থ্রী-স্টার হোটেলের সেভেন-স্টার ডাইনিং রূমে খেতে গিয়ে দেখি কত্তা-গিন্নী দু’জনেই, আমরা গোটা গোটা আলুসিদ্ধ কিভাবে খাবো তাই নিয়ে বেশ চিন্তিত। যাহোক, মেয়েরা আলুর খোসা ছাড়িয়ে কোচানো পেঁয়াজ লঙ্কা দিয়ে মেখে তাদের এই দুশ্চিন্তার হাত থেকে মুক্ত করলো।

 

 

 

 

ON THE WAY TO TSUMORIRI (2)        ON THE WAY TO TSUMORIRI (7)         TSUMORIRI (2)

আজ বিশে জুন। ঘুম থেকে উঠে একটা বাথরুমে ঢুকে দেখি কায়দা করা শাওয়ার, কল, কমোড, কী নেই? না ভূল বললাম, এখানেও জল নেই। এই বাথরুম ও পাশের একটি ঘর দোরজে সাহেবদের নিজেদের ব্যবহারের জন্য। সম্রাট শাজাহান ভালোবাসার প্রতীক হিসাবে মুমতাজকে তাজমহল তৈরী করে দিলেও অনেক দেরি করে ফেলেছিলেন। দোরজে সাহেব সেই ঝুঁকি নেন নি। যদিও প্রয়োজনে খদ্দেরকে বাথরুমটা ব্যবহার করতে দেন। ঘরভাড়া ও খাবারের দাম নিতে গিয়ে তিনি খুব লজ্জায় পড়েছেন বলে মনে হ’ল। অথচ ঐ জায়গা অনুযায়ী তিনি মোটেই বেশী চাননি এটা স্বীকার করতেই হবে। এত সরল সাধাসিধে মানুষ কী ভাবে হোটেল চালান, তিনিই জানেন। ইচ্ছা করলে তিনি এর তিনগুণ টাকা স্বচ্ছন্দে নিতে পারতেন।

কাল রাতে আমাদের সমস্ত মাল রাস্তায় গাড়ির ভিতরে ছিল। এর আগে প্যাংগং-এও রাতে গাড়িতেই মালপত্র রেখে আমরা হোটেলে ছিলাম। আমরা তৈরী হয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। এবারের মতো ঘোরা শেষ, এবার ঘরে ফেরার পালা। আজ আমরা মানালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করবো। রাতে কেলং-এ রাত্রিবাস। আজ আমাদের সোকার, পাং (১৫২৮০ ফুট), লাচুংলা পাস,(১৬৬১৬ ফুট), নাকিলা পাস (১৫৫৪৭ ফুট), সারচু (১৩৮৫০ ফুট), কিলিং সরাই, বারুলাচা পাস, সুরজ ভিশাল তাল, জিংজিংবার পাস, দারচা, স্টিংরি, জিসপা হয়ে কেলং যেতে হবে। এদিকটা শ্রীনগর-কারগিল হয়ে লে যাওয়ার মতো রাস্তা ভালো নয়, পথও যথেষ্ট। সকাল সকাল সুমরিরিকে বিদায় জানিয়ে, হয়তো এ জীবনের মতো বিদায় জানিয়ে, কেলং-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। পথে সৌন্দর্য ও অনেকগুলো পাস-এর সৌজন্যে বরফের অভাব না থাকলেও, বরফহীন জায়গায় রুক্ষতার অভাব নেই। রাস্তাও মোটেই ভালো নয়। তবু ঘরে ফেরার টানের পাশাপাশি বিষাদগ্রস্ত মন নিয়ে এগিয়ে চলা। এ চলায় আনন্দ ছাড়া আর সব উপাদানই আছে। আমাদের মতো জিগমেও বোধহয় তার ঘরের প্রতি টান অনুভব করছে। এটাই স্বাভাবিক, আর তাই বোধহয় শীঘ্র ঘরে ফেরার টানেই সুযোগ পেলেই রাস্তা ছেড়ে পাথুরে জমির বাইপাস ধরে ওর গাড়ি ছোটাচ্ছে। মাঝে একটা ছোট্ট ব্রীজের ওপর দিয়ে জল বয়ে যাওয়ায় ও মেরামতের জন্য বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হ’ল। এপথে লে যাওয়ার যাত্রী সংখ্যা মনে হয় শ্রীনগর হয়ে লে যাওয়ার তুলনায় কিছু বেশীই হবে। বারবার বরফের মাঝখান দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে সন্ধ্যার মুখে জিগমে আমাদের ছোট্ট শহর “কেলং” এ পৌঁছে দিল। হোটেলটাও বেশ ভালোই পাওয়া গেল। চা খেয়ে ভালো করে স্নান সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে এই হোটেলেই রাতের খাওয়া সেরে নিলাম। আজ কোন তাড়া নেই, নতুন করে কিছু দেখার নেই, এবার ঘরে ফেরা। পথে রোথাং পাস পড়বে বটে, তবে সেখানে আগেও এসেছি আর দু’চোখ ভরে যা দেখে এলাম, এরপরে তার সৌন্দর্য কতটা ভালো লাগবে বা মনে ধরবে, নিজেরই সন্দেহ আছে।

আজ একুশে জুন। সকালে ঘুম থেকে উঠেই কাচের জানালা দিয়ে কেলং-এর যে রূপ দেখলাম, তাতে কেলং-এর প্রেমে না পড়ে উপায় নেই। ছোট্ট শহর, কিন্তু কী তার রূপ, যেন তুলি দিয়ে নিপুন ভাবে আঁকা একটা পাহাড়ী ছবি। তৈরী হয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। আজ আমাদের দল থেকে একজন সদস্য, এই ক’টা দিন যে আমাদের নিকট আত্মীয়ের মতো ভালো রাখবার, সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করবার দায়িত্ব পালন করেছে, বিদায় নেবে। জানিনা এ জীবনে তার সাথে আর কোনদিন দেখা হবে কী না। আজ মানালিতে গিয়ে জিগমে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। কেলং ছেড়ে গাড়ি টান্ডি, সিসু, কোকসার (১০৩০০ ফুট), হয়ে একসময় সেই রোথাং পাস এসে পৌঁছালো। আগে দু’দুবার দেখা সেই রোথাংপাস, অনেক বছর আগে যাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সেই রোথাং পাস, মানালি থেকে যাকে দেখতে আসার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করাও একটু অসুবিধাজনক ছিলো। কিন্তু এবার তার অন্য রূপ দেখছি। এতো গঙ্গাসাগর বা পূর্ণ কুম্ভ মেলায় স্নান করতে এসেছি বলে মনে হচ্ছ। এত লোকের, এত গাড়ির ভিড়, আগে দেখিনি। আগে এখানে এত বরফ দেখার সুযোগও হয় নি। এখানকার গাড়ির চালকরা অনেক ডিসিপ্লিন্ড্, আমাদের মতো অপর দিক দিয়ে গাড়ি আসার রাস্তা দখল করে গাড়ি পার্কিং করে না। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে এখানকার সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। এবার এগতে হবে। মানালিতে গিয়ে স্নান সেরে দুপুরের খাবার খেতে হবে। সবাই আবার ওখানে আজ ভাত, ডাল, পোস্ত খাবার বায়না ধরেছে। অবেলায় সেখানে গিয়ে হাজির হলে, সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবার সম্ভাবনাও যথেষ্ট। আমরা মানালির দিকে এগিয়ে চললাম। মারহি, গুলাবা, কোঠি, পলচান, কিন্তু এ কী? মানালি প্রায় পৌঁছে গেলাম, এখনও যে রোথাং যাবার দীর্ঘ গাড়ির লাইন। এ যেন অফিস টাইমে মহাত্মা গান্ধী রোডে গাড়ির মেলা, এ যেন রবীন্দ্র সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে শ্যামবাজারের নেতাজী মূর্তি দর্শন। রোথাং দর্শনের সুবিধার্থে, মানালির হাজার ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির কৃপায়, এত গাড়ি রোথাং এর পথে এসেছে, যে অনেক গাড়ির যাত্রীরাই প্রায় মানালির কাছে দাঁড়িয়েই রোথাং দর্শনের স্বাদ গন্ধে তৃপ্ত হচ্ছেন। ঐসব গাড়ির প্রকৃত রোথাং আসতে সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হয়ে যাবে, কারণ পুরো ব্যাপারটাই আগের যাত্রীদের ফেরার মানসিকতা ও ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। যাহোক, একটু বেশী সময় লাগলেও আমরা বেশ বেলায় মানালি এসে পৌঁছলাম। হোটলটাও বেশ ভালোই পাওয়া গেল। হোটেল যেমনই হোক, বাঙালী দ্বারা পরিচালিত, জোরে শ্বাস নিলে যেন পোস্ত ভাতের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে, কাজেই সেটা ভালো না হয়ে পারে না। জিগমেকে জিজ্ঞাসা করা হ’ল তাকে আর কত টাকা দিতে হবে। ওর সাথে আমাদের কোন চুক্তি হয় নি। হাসান ওর গাড়ি নিয়েছে, হাসানের সাথে ওর কত টাকার চুক্তি হয়েছে জানি না, জানার কথাও নয়। লে ছেড়ে আসার সময় হাসান ওর প্রাপ্য বাকী দশ হাজার টাকা জিগমেকে মানালি পৌঁছে দিয়ে দিতে বলেছিল। জিগমে জানালো দশ হাজার টাকা। আমরা টাকাটা দিতেই সে সেলাম করে চলে যাচ্ছিল। তাকে ডেকে এক হাজার টাকা বকশিশ দেওয়া হলে সে খুশী হ’ল, হয়তো অবাকও হ’ল।

স্নান সেরে ভাত, ডাল, পোস্ত, ডিমের অমলেট দিয়ে মনের সুখে ভাত খেয়ে, একটু বিশ্রাম নিয়ে মেয়েরা গেল তাদের সাধের মার্কেটিং করতে। আমরা গেলাম পরশু চন্ডীগড় যাবার গাড়ির খোঁজে। চন্ডীগড় যাবার টেম্পো ট্রাভেলার গাড়ির ভাড়া ১৪০০০-১৫০০০ টাকা শুনে তো মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম। কোন এ.সি. বাসের টিকিটও পাওয়া গেল না। ঘুরে ফিরে খাবার কিনে হোটেলে ফিরে এসে সবাই একটা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে রাতের খাবার খাওয়া হ’ল।

আজ বাইশে জুন। আমরা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির অফিসগুলো ও বাসস্ট্যান্ডে অনেক ঘুরেও, একটা গাড়ির বা এ.সি. বাসের টিকিটের ব্যবস্থা করতে পারলাম না। অগত্যা সরকারী বাসের টিকিট কেটে, হোটেলে ফিরে এসে স্নান সেরে ভাত খেয়ে আবার বেরনো। মানালি আমদের সকলের ঘোরা, তাই এখানে আমাদের একটা রাত থাকার কথা। কিন্তু সারা পথের আপদ-বিপদের কথা ভেবে যে একটা অতিরিক্ত দিন হাতে রাখা হয়েছিল, সেটার প্রয়োজন না হওয়ায় আজ রাতটাও আমরা মানালিতে থেকে আগামীকাল চন্ডীগড় চলে যাব। আমরা কয়েকজন বাজারে ও মেলায় কিছুক্ষণ ঘুরে হিড়িম্বা দেবীর মন্দির ও পাশেই ঘটোৎকচ মন্দির (গাছ তলায়) ঘুরতে গেলাম। ফিরে এসে বেশ কিছুক্ষণ বাজার ও আশপাশে ঘুরে রাতের খাবার নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।

 

 

 

KELONG       ON THE WAY TO KELONG (16)        ON THE WAY TO KELONG (3)

ROTHANG PASS (22)          ROTHANG PASS (20)            HIDIMBA TEMPLE, MANALI (3)

আজ তেইশে জুন। কাল রাত থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমরা ভোরবেলা উঠে স্নান সেরে তৈরী হয়ে নিলাম। গতকালই শুনে এসেছি যে সকাল ন’টায় বাস দেওয়া হবে। অনেক চেষ্টার পর বৃষ্টিতে ভিজে এক অটো ডেকে নিয়ে এসে মালপত্র বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হল। বাসস্ট্যান্ডে বাস আসলে বাসের ডিকিতে আমাদের সব মাল ঢুকিয়ে দিলাম। শুধু তাই নয় কন্ডাক্টারের কথামতো ডিকির দরজায় আমাদের নিজস্ব তালা লাগিয়ে দেওয়া হ’ল। বাস ছেড়ে দিল। কুলুতে এসে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো বটে, কিন্তু বাসটা বেশ ফাঁকাই ছিল এবং ভালোভাবেই আমাদের সন্ধ্যার সময় চন্ডীগড়ের ৪৩ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে দিল।

বিশাল বাসস্ট্যান্ডেই থাকার ব্যবস্থা, খাওয়ার জায়গা আছে। সবথেকে বড় কথা কালকা যাওয়ার বাস এখান থেকেই ছাড়ে। আমাদের সাথে মালপত্রও প্রচুর, সারাদিনের বাস জার্নির পর হোটেল খোঁজাও সমস্যা ও সময় সাপেক্ষ, তাই একটা রাত এখানেই কাটিয়ে দেবার পরিকল্পনা করা হ’ল। দোতলার ওপর ঘরগুলো একটু নড়বড়ে, অতি সাধারণ ও আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত নিরাপত্তাহীন হলেও, সরকার পরিচালিত এই লজের ঢিল ছোঁড়া দুরত্বেই পুলিশ স্টেশন অবস্থিত। আমাদের মধ্যে অনেকেরই এই ঘরগুলো পছন্দ না হলেও, এখানেই চারটে ঘর নিয়ে রাতে থাকার ব্যবস্থা হ’ল। চন্ডীগড়ের মতো জায়গায় ভাড়াও নামমাত্র। চন্ডীগড় এর আগেও একবার এসেছি, তাই এখানকার খরচ সম্বন্ধে একটা ধারণা আছে। স্নান সেরে নীচের ক্যান্টিন থেকে খাবার কিনে নিয়ে এসে একটা ফাঁকা ঘরে সবাই মিলে বসে রাতের খাওয়া সারলাম। অত ঠান্ডার জায়গা থেকে হঠাৎ এখানে এই গরমে আসায়, আমাদের সাইবেরিয়ান ভালুককে আলিপুর চিড়িয়াখানায় আনার মতো অবস্থা হ’ল। লম্বা একটা প্যাসেজের দু’পাশে পরপর ঘর। প্রতিটা ঘরের প্লাই উডের দেওয়াল ছাদের বেশ কিছুটা নীচেই শেষ হয়ে গেছে। প্যাসেজের একবারে শেষে গোটা প্যাসেজ ও ঘরগুলো ঠান্ডা রাখার জন্য একটা বিরাট কুলার লাগানো আছে। সেটা সবসময় চললেও ব্যাপারটা কিছুটা হাতিকে প্রচন্ড খিদের মুখে আমাদের ছেলেবেলায় দেখা মৌড়ি লজেন্স খাইয়ে পেট ভরানোর মতো ঠেকলো। তবে শরীরের নাম মহাশয়……, রাতটা কেটে ভোর হয়ে গেল।

আজ চব্বিশে জুন, আজ রাত এগারটা পঞ্চান্ন মিনিটে আমাদের কালকা স্টেশন থেকে কালকা মেলে হাওড়া ফেরার কথা। সকালবেলা তৈরী হয়ে ঝুম এয়ারপোর্টে চলে গেল। ওর ছুটি কম, বেশী ছুটি পাওয়াও মুশকিল, তাই যাওয়া আসায় সাতটা দিন ছুটি বাঁচাতে তাকে দু’দুবার খেসারত দিতে হ’ল। ও চলে যাবার পর আমরা তৈরী হয়ে লজের পরামর্শ মতো তিনটে ঘর ছেড়ে দিয়ে, একটায় সমস্ত মালপত্র রেখে চন্ডীগড় ঘুরতে বেরলাম। রক গার্ডেন যাবার জন্য একটা এ.সি. বাসে উঠবার আগে কন্ডাক্টার ভদ্রলোক জানালেন কুড়ি টাকা করে ভাড়া, তবে ষাট টাকার টিকিট কাটলে, যেকোন এ.সি. বা নন্ এ.সি. বাসে সারাদিন চন্ডীগড় শহর ঘুরে দেখা যাবে। আমরা তাঁর পরামর্শ মতো ষাট টাকার টিকিট কেটে ফাঁকা বাসে রক গার্ডেন গিয়ে উপস্থিত হলাম। সারাদিন হাতে আছে, কিন্তু থাকার আস্তানা নেই, তাই দীর্ঘ সময় রক গার্ডেনে ঘুরে, যাযাবরের মতো এদিক সেদিক এ.সি. বাসে ঘুরেফিরে রোজ্ গার্ডেনে গিয়ে হাজির হলাম।

 

 

ROCK GARDEN, CHANDIGARH (12)     ROCK GARDEN, CHANDIGARH (10)    ROCK GARDEN, CHANDIGARH (2)    ROCK GARDEN, CHANDIGARH (6)

এখন বোধহয় গোলাপের সময় নয়, সুবিশাল জায়গা জুড়ে গোলাপ বাগানে ফুলের বড়ই অভাব। শেষে এক গাছতলায় সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়া জমিতে শুয়ে বসে গান করে দীর্ঘ সময় কাটানো হ’ল। এবার লেক দেখতে যাওয়া হ’ল। সেখানেও অনেকটা সময় কাটাতে বেশ ভালোই লাগলো। এবার সত্যিই ঘরে ফেরার পালা। ফেরার এ.সি. বাসটা আমাদের লজের নীচের স্ট্যান্ডেই যাত্রা শেষ করবে। বাস থেকে নেমে কালকা যাবার টিকিট কোথা থেকে দেবে ও বাস কোথা থকে ছাড়বে দেখে এসে, চা জলখাবার খেয়ে লজের ঘরে গিয়ে তৈরী হয়ে নিলাম। পালা করে নিজেরাই মালপত্র নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করলাম। বাসে সবার বসার জায়গা পাওয়া গেল। বাসের ছাদে মাল গুছিয়ে রেখে নিশ্চিন্তে বসা গেল। নির্দিষ্ট সময়ে বাস নির্বিঘ্নে কালকা পৌঁছে দিল। এখান থেকে দু’টো অটোয় স্টেশন। স্টেশন ক্যান্টিনেই রাতের খাওয়া সেরে নিজেদের নির্দিষ্ট আসনে জাযগা দখল করে মালপত্র গুছিয়ে রাখলাম। রাত অনেক হয়েছে তাই ট্রেন ছেড়ে দিলে শুয়ে পড়লাম।

আজ পঁচিশে জুন। ট্রেনের ভিতর সময় আর কাটেনা। সারাদিন শুয়ে বসে গল্প করে সকাল থেকে বিকাল, বিকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত সময় কাটিয়ে শুয়ে পড়া গেল।

আজ ছাব্বিশে জুন। ট্রেন ঘন্টা তিনেক বিলম্বে হাওড়া এসে পৌঁছালো। আমরা যে যার বাড়ির পথে রওনা হলাম।

 

সুবীর কুমার রায়।

০২-০৭-২০১৫

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s