পাহাড়ের রোজনামচা–পঞ্চম পর্ব {লেখাটি www.amaderchhuti.com ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

 

DSCN9767অনেক রাস্তা পার হয়ে একসময় আবার আমরা রুদ্রপ্রয়াগ এসে পৌঁছলাম। এই জায়গাটাকে জংশন বলা যেতে পারে। এখান থেকে কেদারনাথ ও বদ্রীনারায়ণ যাবার রাস্তা ভাগ হয়ে দু’দিকে বেঁকে গেছে। এখন প্রায় পৌনে পাঁচটা বাজে। আকাশে অবশ্য যথেষ্ট রোদ আছে। কেবল বিকেল হয়েছেও বলা যায়। কিন্তু এখানকার ট্রাফিক আইন অনুযায়ী, আজ আর শোনপ্রয়াগ যাবার কোন সম্ভাবনা নেই। বাস কিছুক্ষণের জন্য এখানে দাঁড়াবে। বাস থেকে নেমে চা খেয়ে নিয়ে, জায়গাটা একটু ঘুরে দেখলাম। দেখা হয়ে গেল সেই অমরনাথ, কেদারনাথ ফেরৎ দু’জন যুবকের সঙ্গে। তারা জানালো যে তারা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। তাদের পক্ষে এবার আর নন্দন কানন, হেমকুন্ড যাওয়া সম্ভব হ’ল না। এদের বাকি সঙ্গীদের দেখলাম না। তারা বোধহয় হেমকুন্ডের দিকে গিয়ে থাকবে। যাওয়ার সময়ও এই জায়গাটা এক চক্কর ঘুরে দেখেছিলাম। সত্যিই খুব সুন্দর জায়গা। এখানে দাঁড়িয়ে আবার সেই একই কথা মনে হচ্ছে। এখন এত বছর পরেই জায়গাটার এই অবস্থা, তাহলে জিম করবেট যখন এখানে চিতা মেরেছিলেন, তখন এখানকার অবস্থা কী ছিল? চিতাটাকে উনি মারলেন কী ভাবে? চিতাটা নিশ্চই প্রাণ দেবার জন্য খাদ থেকে রাস্তার ওপর আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে এসে দাঁড়িয়ে ছিল না। যাহোক্, বাস ছেড়ে দিল। গন্তব্য স্থান, এখান থেকে সম্ভবত আটষট্টি কিলোমিটার দুরের শোনপ্রয়াগ। একবার মনে হচ্ছে আজ হয়তো শোনপ্রয়াগ পৌঁছে যাব। আবার মনে হচ্ছে এতটা পথ যাওয়ার মতো হাতে সময় কোথায়? এদিকের রাস্তা কিন্তু বেশ ভাল। ড্রাইভার জানালো, গুপ্তকাশীর পর থেকে রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। আজ বাস নিয়ে শোনপ্রয়াগ যাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। নীচে রাস্তার বাঁপাশে বিরাট একটা সমতল মাঠ। অনেক ছেলে সেখানে সাইকেল চালাচ্ছে। একধারে ভলিবল খেলা হচ্ছে। অনেকদিন পরে সমতল জমি দেখলাম।

গুপ্তকাশী যখন পৌঁছলাম, তখন বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। রাস্তার এদিক থেকে ওদিক, লেভেল্ ক্রসিং এর গেটের মতো, একটা কাঠের গেট ফেলা। আজ আর এদিক ওদিক, কোন দিকেরই বাস যাতায়াত করবে না। ড্রাইভার জানালো, এখানে হোটেল, ধর্মশালা, পাওয়া যাবে। কাল সকালে আবার বাস ছাড়বে। বাসের কিছু লোক আজই বাস নিয়ে শোনপ্রয়াগ যাবার জন্য, বাসের ড্রাইভারকে জোর করতে লাগলো। দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ এদের নেতৃত্ব দিতে শুরু করলেন। তিনি জানালেন যে তিনি এপথে অনেকবার এসেছেন। এদিকের রাস্তা এমন কিছু খারাপ নয়, যে আজ যাওয়া যাবে না। এতক্ষণ বাসের সামনের সিঙ্গল সিটে বসে ঘুম আসছিল। মাধব আমাকে পেছন থেকে ডেকে দিল। ড্রাইভারের পাশের ও ঠিক পেছনের দু’দিকের সিটে বসে ঘুমানো নিষেধ। ঠিক হয়ে বসলাম। ড্রাইভার যাত্রীদের জানালো যে সামনের রাস্তা একবারে কাঁচা। একটু এদিক ওদিক হলে, বাস গভীর খাদে গড়িয়ে যেতে পারে। সবজান্তা বৃদ্ধও নাছোড়-বান্দা। আমরা বললাম ড্রাইভার যখন বাস নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছে, তখন নাহয় আজ রাতটা এখানেই কাটিয়ে যাই। সবজান্তা বৃদ্ধ জানালেন, যে তিনি এপথে অনেকবার এসেছেন। ধ্বস নামলেও কোন ক্ষতি হবে না, বাস ঠিক চলে যাবে। আমরা বললাম প্রত্যেকবার তো রাস্তা একই রকম থাকে না। ড্রাইভার যখন চাইছে না, কী দরকার অযথা ঝুঁকি নেবার। বৃদ্ধ সেই একই কথা আবার বললেন যে, তিনি আগে এপথে অনেকবার এসেছেন। ভয় পেলে এপথে যাওয়া যায় না। বিরক্ত হয়ে বললাম, বাস খাদে পড়লে, তাদের ও আমাদের একই দশা হবে। কিন্তু মাঝ রাস্তায় বাস কোন কারণে যেতে না পারলে, বিপদ বা ঝুঁকি তাদেরই বেশি, কারণ তাদের সাথে অনেক বয়স্ক লোক ও একজন যুবতী আছে। আমরা একটা রাত অন্ধকারে বাসে বসে কাটিয়ে দিতে পারবো। এখনও প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পথ যেতে বাকি। অচেনা অজানা রাস্তায়, অন্ধকার বাসে বসে রাত কাটানো, তাদের পক্ষে ঠিক বা নিরাপদ হবে তো? শেষে ড্রাইভার বেচারা অনেকের চাপে পড়ে জানালো, সবাই যদি এই অন্ধকারে যেতে চা্‌য়, তবে সে স্পেশাল পারমিশান নিয়ে বাস এগিয়ে নিয়ে যেতে রাজি আছে। তবে আজ না গেলেই বোধহয় সবাই ভাল করতো। সবজান্তা বৃদ্ধ জয়ের হাসি হাসলেন। যাহোক, ড্রাইভার নিজে বাস থেকে নেমে গিয়ে কী ভাবে ব্যবস্থা করে, বাসে ফিরে এসে বসলো। বাসের স্টিয়ারিং এর ওপর হাত দিয়ে বিড়বিড় করে কী সব বলে, বারকতক নমস্কার করে, আবার একবার রাস্তা খুব খারাপ, আজ না গেলেই ভাল করতেন বলে, বাস ছেড়ে দিল।

চারিদিক ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। সামনের জোরালো হেডলাইটের আলোয় বাস এগিয়ে চলেছে। ড্রাইভার বাসের গতিও অসম্ভব বাড়িয়ে দিয়েছে। বাস খানিকটা পথ এগোতেই, একটা বেড়াল রাস্তার একদিক থেকে অপরদিকে চলে গেল। ব্যাস, বিল্লি রাস্তা কাট্ দিয়া বলে ড্রাইভার বাস থামিয়ে, ইঞ্জিন বন্ধ করে, সব আলো নিভিয়ে দিল। উঃ, বাসের একবারে সামনে ড্রাইভারের বাঁপাশে বসে দেখতে পাচ্ছি চারিদিকে কী ঘন অন্ধকার। কিছুক্ষণ সময় এইভাবে থেকে, বারবার বিল্লি রাস্তা কাট্ দিয়া, বিল্লি রাস্তা কাট্ দিয়া বলতে বলতে, বাসের ইঞ্জিন চালু করে, ড্রাইভার আবার বাস এগিয়ে নিয়ে চললো। মনে পড়ে গেল, গত বছরের কথা। আমরা দিল্লী থেকে বাসে হরিদ্বার যাচ্ছি। অসম্ভব গতিতে বাস ছুটছে, হঠাৎ ড্রাইভার প্রচন্ড জোরে ব্রেক কষে, বাস থামিয়ে দিল। আমরা একে অপরের গায়ে গিয়ে পড়লাম। অনেকে বেশ গুরুতর আঘাতও পেল। কী ব্যাপার, না বিল্লি রাস্তা কাট্ দিয়া। এটা সমস্ত রাজ্যে, সমস্ত গাড়ির ড্রাইভারের কাছে একটা অশুভ ইঙ্গিত। বাসের চল্লিশ পঞ্চাশজন যাত্রী আহত হোক ক্ষতি নেই, তবু বাস না দাঁড় করিয়ে, একটু না থেমে, এক ইঞ্চিও বাস এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিৎ নয়। অনেকে আবার বলে বিল্লিকে চাপা দিয়ে চলে যেতে পারলে নাকি আর কোন বিপদের সম্ভাবনাই থাকে না। যাহোক্, সেই বিল্লি আবার এবারেও রাস্তা কেটে দিল। তা আবার অন্ধকার রাতে এরকম দুর্গম পথে।

ড্রাইভার একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেছে বলে মনে হ’ল। ওকে একটা সিগারেট দিলাম। ভাবলাম, ওর ঐ দুশ্চিন্তা থেকে মনটাকে যদি ফিরিয়ে আনা যায়। প্রথমে নেবে না বলে, পরমুহুর্তেই হাত বাড়িয়ে সিগারেটটা নিল। এবার একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে, আমাদের সাথে বকবক্ করতে করতে, ঐ গতিতে বাস নিয়ে এগিয়ে চললো। চোখ যদিও সামনের দিকে, তবু এটা বিপজ্জনক তো বটে। তাই আমরা কথা বন্ধ করলাম। রাস্তার অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ। রাস্তার ওপর দিয়ে দু’এক জায়গায় জোরালো ঝরনা বয়ে যেতেও দেখলাম। ঐ কেদারের পথ বিশেষজ্ঞ বৃদ্ধও বোধহয় এবার একটু ভয় পেয়ে চুপ করে সামনের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। আগের মতো এক নাগাড়ে কথা বলাও বন্ধ হয়ে গেছে। বেশ কিছুটা দুরে দেখলাম, রাস্তার ওপর কী যেন রাখা আছে। বাস আরও কাছে আসতে বুঝলাম রাস্তার ওপর গাছের বেশ বড় বড় গুঁড়ি ফেলে রাখা হয়েছে। ড্রাইভার ব্রেক কষে বাস দাঁড় করিয়ে, আমাদের বাস থেকে নামতে বারণ করলো। সম্ভবত এই পথে এত রাতে বাস বা অন্যান্য গাড়ি চলাচল করে না বলেই বোধহয়, সকালে সরিয়ে নিয়ে যাবে ভেবে কেউ গাছ কেটে রাস্তায় রেখেছে। ড্রাইভার তো সেই অদৃশ্য ব্যক্তির উদ্দেশ্যে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে শুরু করে দিল। কন্ডাক্টার বাস থেকে নেমে একপাশে গুঁড়িগুলো ঠেলে সরিয়ে দিতে শুরু করে দিল। ড্রাইভার চিৎকার করে তাকে গাছের গুঁড়িগুলো খাদে ফেলে দিতে বললো। কন্ডাক্টার তার কথা না শোনায়, সে তাকেও গালিগালাজ করতে লাগলো। যহোক্, শেষ পর্যন্ত বাস আবার ছেড়ে দিল। মধ্যে মধ্যে রাস্তার পাশে গ্রাম পড়লে, সেখানে বাচ্ছা-বুড়ো সবাই দেখি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে, অবাক হয়ে বাসের দিকে তাকিয়ে দেখছে। বোধহয় এত রাতে এ রাস্তায় বাস দেখে, তারাও অবাক না হয়ে পারছে না। শেষ পর্যন্ত রাত প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা অক্ষত অবস্থায়, শোনপ্রয়াগ এসে পৌঁছলাম। একটা উদ্বেগ ও বিপদ কেটে গেল।

এখানে নেমে শুনলাম, এখানে ইলেকট্রিক্ আলোর ব্যবস্থা থাকলেও, যেকোন কারণে গত দু’দিন ধরে আলো জ্বলছে না। চরিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। দুরে দুরে কেরোসিন তেলের আলো জ্বলছে। কোনদিকে হোটেল বা ধর্মশালা পাওয়া যাবে ভেবে পেলাম না। ঐ অন্ধকারেও দেখলাম প্রচুর বাস দাঁড়িয়ে আছে। মনে হ’ল জায়গাটা বেশ বড়, অনেক হোটেল পাওয়া যাবে। অন্ধকারে বাসের ছাদে উঠে হাতড়ে হাতড়ে মালপত্র নামালাম। দিলীপ একজনের সঙ্গে রাতে থাকবার জায়গা নিয়ে কথা বলছে। এত রাতে এপথে বাস আসে না। তাই বোধহয় অনেক কৌতুহলী লোকের ভিড় বাসটার কাছে। খোঁজ পাওয়া গেল বাসগুলো যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে পোস্ট অফিসে থাকার জায়গা পাওয়া যাবে। একে অন্ধকার, তার ওপর রাত প্রায় ন’টা বাজে। তাই কথা না বাড়িয়ে, নিজেরাই মালপত্র হাতে নিয়ে পোস্ট অফিসের খোঁজে পা বাড়ালাম। বাড়িটা খুব কাছেই। একটা পোস্ট অফিসের সঙ্গে লাগোয়া তিনটে ঘর। দশ টাকা ভাড়া। এখানে আবার মালপত্র রেখে যাবার, অর্থাৎ ক্লোক্ রুমের ব্যবস্থাও আছে। তার ভাড়া মাত্র ছ’টাকা। মোটাবাবুও আমাদের সাথে এসেছে। তার ইচ্ছা যে, তারা দু’জনেও আমাদের সাথে এক ঘরে থাকে। আমাদের এটা মোটেই ইচ্ছা নয়। দিলীপের ওপর ওদের আলাদা ঘরে থাকার ব্যবস্থা করার ভারটা দেওয়া হ’ল। ও বেশ সহজেই দু’দলের দু’ঘরে আলাদা থাকার ব্যবস্থা পাকা করে ফেললো। যাহোক্ এখানেই আমরা দু’টো দল দু’টো ঘরে, রাত্রে ঠাঁই নিলাম।

এ বাড়ির মালিকই বোধহয় পোস্ট অফিসের পোস্টমাষ্টার বা কোন কর্মচারী। তিনি আবার পান্ডার কাজও করেন। কথায় কথায় তিনি জানালেন, দশ টাকা দিলে তিনি নিজে বা অন্য কোন পান্ডাকে আমাদের সাথে ত্রিযুগীনারায়ণ পাঠিয়ে আমাদের পূজো দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। মাধব কী করা উচিৎ জিজ্ঞাসা করলে বললাম, পান্ডার কোন প্রয়োজন নেই। নিজেরাই ওখানে যাব এবং ওখানে যদি তারা পূজো দিতে চায়, তখন ওখান থেকেই কোন পান্ডা ঠিক করে নেওয়া যাবে। তাই ঠিক হ’ল। মোটাবাবু জানালো তারা ত্রিযুগীনারায়ণ যাবে না, কাল সকালে এখান থেকে সোজা কেদারনাথ চলে যাবে। আমরা ঠিক করলাম কাল খুব ভোরে ত্রিযুগীনারায়ণ চলে যাব। ওখান থেকে ফিরে ট্যাক্সিতে গৌরীকুন্ড, এবং সম্ভব হলে হেঁটে কেদারনাথ। শুনলাম এখান থেকে ত্রিযুগীনারায়ণ মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ। এই ব্যবস্থা পাকা করে, আমরা রাতের খাবার খেতে রাস্তায় এলাম। একটা ঘর মোটাবাবু ও তার বৃদ্ধ সঙ্গী নিয়েছে। আর দু’টো ঘরের একটা আমরা নিয়েছি। তৃতীয় ঘরটা ও আমাদের ঘরটার মাঝখানে, সাত-আট ফুট উচু কাঠের পার্টিশন। যে কেউ ইচ্ছা করলেই, অপর ঘর থেকে আমাদের ঘরে সহজেই চলে আসতে পারে। তাই টাকার ব্যাগ হাতে নিয়ে বাইরে এসেছি। কোন হোটেল দেখলাম না। দু’দুটো দোকানে বললো, অর্ডার দিলে রুটি তরকারী বানিয়ে দেবে। বাধ্য হয়ে তাই অর্ডার দিয়ে বসে রইলাম। অনেকটা আটামাখা হাতে নিয়ে, হাতে দু’চার বার চাপড় মেরে এক ইঞ্চি মোটা রুটির আকারে পরিণত করে, কাঠের আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হ’ল। রুটির যে অংশটা আগুনের দিকে রয়েছে, সেদিকটা পুড়ে কালো হয়ে গেল, কিন্তু অপর দিকটা যেমনকার কাঁচা, প্রায় সেরকমই রয়ে গেল। আমরা সঙ্গে করে মাখন নিয়ে এসেছি। ছোট ছোট আলুর তরকারীতে একটু করে মাখন ফেলে, তাই দিয়ে দু’টো করে রুটি খেয়ে, দাম মিটিয়ে নিজেদের ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম। কাল ভোরে আবার উঠতে হবে।

আজ তেইশে আগষ্ট। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে আমরা তৈরি। পোস্ট্ অফিসের মালিক এসে উপস্থিত হলেন। দশ টাকা ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। কাঁধের তিনটে ব্যাগে টুকিটাকি জিনিসপত্র নিয়ে, ওয়াটার বটল্, হোল্ড্-অল্, ও সুটকেসগুলো ভদ্রলোকের হাতে ছেড়ে দিয়ে, মাল রাখা বাবদ ছ’টাকা ভাড়া দিয়ে, আমরা বেরিয়ে পড়লাম। শোনপ্রয়াগে মন্দাকিনী ও শোনগঙ্গা মিলিত হয়েছে। এখান থেকে বাঁদিকে ত্রিযুগীনারায়ণ যাবার পথ বেঁকে গেছে। ব্রিজ পার হয়ে ডানদিকে কেদারনাথ যাবার পথ। এখান থেকে গৌরীকুন্ড পর্যন্ত ট্যাক্সি পাওয়া যায়। গৌরীকুন্ড থেকে পায়ে হেঁটে কেদারধাম যেতে হবে। ব্রিজের ঠিক আগেই আমরা বাঁদিকে ত্রিযুগীনারায়ণ যাবার পথ ধরলাম। বোর্ডে লেখা—ত্রিযুগীনারায়ণ ৩.৬ কিলোমিটার। গোবিন্দঘাট যাবার পথে যখন ধ্বসে আটকে গেছিলাম, তখন দেখেছিলাম বহু লোক পাহাড়ের গা থেকে এক প্রকার গাছের সরু সরু পাতা ছিঁড়ে নিচ্ছে। জিজ্ঞাসা করে জেনেছিলাম ওগুলো সিদ্ধি গাছ। সিদ্ধি গাছের কাঁচা পাতা খেলে নেশা হয় কী না তারা-ই বলতে পারবে। এখানেও দেখলাম ঐ সিদ্ধি গাছের জঙ্গল। অনেকে আবার এগুলোকে গাঁজা গাছ বললো। তা গাঁজাই হোক্ আর সিদ্ধিই হোক্, এপথে এই গাছ না থাকাটাই অস্বাভাবিক, কারণ এখানে বামে ত্রিযুগীনারায়ণ ডানে কেদারনাথ। গোটা এলাকাটাই ভোলে বাবার রাজত্ব। অনেক ওপরে দেখলাম বেশ কয়েকজন লাইন দিয়ে ওপর দিকে উঠছে। মধ্যে মধ্যে ইলেকট্রিকের তার নিয়ে যাবার জন্য মোটা মোটা ইস্পাতের পোস্ট্। পোস্ট্ লক্ষ্য করে সোজা রাস্তা ও বাইপাশ দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। এখানকার রাস্তা পায়ে হাঁটার রাস্তা হিসাবে খারাপ নয়। মধ্যে মধ্যে ওপর থেকে রাস্তার ওপর দিয়ে ঝরনা নেমে এসেছে। মূল ঝরনা বা এই ঝরনাগুলোর উৎস কিন্তু কোথাও চোখে পড়লো না। রাস্তা বেশ খাড়াই। ঝরনার জলে জুতো মোজা ভিজে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটে আছে, তবে সংখ্যায় বড় অল্প। সমস্ত রাস্তার পাশে পাশে ঐ সিদ্ধি গাছের জঙ্গল। রাস্তার ওপর বেশ কয়েক জায়গায় কয়েকটা সজারুর কাঁটা কুড়িয়ে পেলাম। এখানে সজারু আছে, না এপথে যাওয়ার সময় কেউ এগুলো ফেলে গেছে, বুঝতে পারলাম না। প্রাকৃতিক দৃশ্য খুবই সাধারণ। ফলে হাঁটতে ভালোও লাগছে না, কষ্টও হচ্ছে। আরও আধঘন্টা কী পঁয়তাল্লিশ মিনিট হাঁটার পর, উল্টো দিক থেকে আগত একজন স্থানীয় মানুষকে জিজ্ঞাসা করলাম— আর কত দুর? উত্তর পেলাম, তিন মিল্। অর্থাৎ এখনও তিন মাইল রাস্তা। কী করে এতটা পথ হাঁটার পরও তিন মাইল রাস্তা বাকি থাকে, স্বয়ং ত্রিযুগীনারায়ণই বলতে পারবেন। বেশ কিছু পুরুষ ও মহিলার একটা দল দেখলাম রাস্তার ওপর বসে আছে। এখনও অনেকটা পথ বাকি আছে শুনে তারা কেমন মুষড়ে পড়লো। আমরা এগিয়ে চললাম।

হাঁটতে আর ভালো লাগছে না। বেশ কষ্টকর রাস্তা। এবার আমরা একটা ছোট মন্দির, ও মন্দির সংলগ্ন খানিকটা ঘেরা জায়গা দেখতে পেলাম। খুব খুশি হলাম শিবদূর্গার বিবাহ স্থানে এসে গেছি ভেবে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ঐ জায়গায় এসে হাজির হলাম। অবাক হয়ে গেলাম যখন শুনলাম, এটা মোটেই ত্রিযুগীনারায়ণ মন্দির নয়। আরও অবাক হলাম যখন শুনলাম, এখান থেকেও মন্দির মাত্র তিন মিল্ রাস্তা। এটা “শাকম্ভরী” মন্দির। ইনি স্বর্গের কোন বিভাগের ভারপ্রাপ্তা জানি না। জানার ইচ্ছাও এখন আর নেই। খোলা ঘেরা জায়গাটায় দেখলাম একজন বৃদ্ধ সাধু গোছের লোক একটা বই পাঠ করছেন, এবং রাস্তায় দেখা সেই দলটার মতো অনেক ভক্ত, মন দিয়ে তাঁর পাঠ শুনছেন। যতদুর মনে হ’ল, রামায়ণ পাঠ হচ্ছে। সামনে একটা বোর্ড লাগানো। তাতে দেখলাম লেখা আছে— ত্রিযুগীনারায়ণ ৩.৬ কিলোমিটার পথ। একবারে নীচে ব্রিজের কাছে যত দুরত্ব দেখেছিলাম, সকাল থেকে এতটা পথ হেঁটে এসে, এখানেও দেখি সেই একই দুরত্ব লেখা আছে। সত্যি সত্যি আরও ৩.৬ কিলোমিটার পথ যেতে বাকি আছে কী না কে জানে। এখানে সবই সম্ভব। আমরা আবার এগিয়ে চললাম।

রাস্তার পাশে একটা ঝরনার জলে জাঁতা ঘুরিয়ে সম্ভবত গম ভাঙ্গা হচ্ছে। কোন লোকজনকে অবশ্য দেখলাম না। হঠাৎ কানে তালা লাগানো আওয়াজ। প্রথমে একটু ভয় পেলেও, একটু পরেই হেলং এর কথা মনে পড়লো। বুঝলাম কোথাও ব্লাষ্টিং হচ্ছে। সকালে সামান্য চা বিস্কুট খেয়ে বেড়িয়েছি। খিদেও পেয়েছে খুব। সঙ্গে গতকালের কেনা কিছুটা ঝুড়িভাজা ছিল। নরম হয়ে গেলেও, তাই সামান্য করে খেয়ে, আবার এগিয়ে চললাম। উল্টোদিক থেকে একজন স্থানীয় যুবককে কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে আসতে দেখলাম। তাকে আর কত দুর জিজ্ঞাসা করায় উত্তর পেলাম, “দু’ই-ঢাই মিল্ হোগা”। যাক্, তবু আধ কিলোমিটার পথ অন্তত কমানো গেছে। আবার এগিয়ে চলা। বেশ কিছুক্ষণ পরে দুরে, বহু দুরে, একটা মন্দিরের সাদা পতাকা নজরে এল। দেখে বেশ আনন্দ হলেও ভয় হ’ল, কাছে গিয়ে হয়তো দেখবো কোন কাদম্বরী বা ধন্বন্তরি দেবীর মন্দির। আজই আমাদের কেদারনাথ যাবার ইচ্ছা, তাই সময় নষ্ট না করে গতি বৃদ্ধি করলাম। অবশেষে ওদের কথামতো ৩.৬ কিলোমিটার পথ পার হয়ে, মন্দিরে এসে পৌঁছলাম।

উড়িষ্যার পুরী বা আশেপাশের অন্যান্য মন্দিরগুলোর মতো অনেকটা দেখতে হলেও, মনে হয় যেন কী রকম সিমেন্টের তৈরি। যদিও মন্দিরটা পাথরেরই তৈরি। মন্দিরের বাইরে উঁচু চাতালে গোটা দু’-তিন চায়ের দোকান। বাদবাকি, দোকানের মতো অনেক গুলো ঘর। তবে সবকটা ঘরেই পান্ডার ভিড়। একটা কল থেকে একভাবে জল পড়ে যাচ্ছে। যদিও তার চারপাশে ভীষণ নোংরা, তবু খানিকটা করে জল খেয়ে, মন্দিরে যাবার জন্য তৈরি হলাম। মোটা মোটা লাল কাপড়ে বাঁধানো চিত্রগুপ্তের খাতা হাতে পান্ডারা এসে হাজির হ’ল। তাদের প্রয়োজন আমাদের নাম, ধাম, বাবার নাম ইত্যাদি। আমরা পূজো দিতে আসিনি, কাজেই ঐ সবের আমাদের কোন প্রয়োজন নেই, ইত্যাদি বলতে বলতে, আমরা সিঁড়ি দিয়ে নীচে মন্দিরের চাতালে এলাম। মন্দিরে ঢুকবার আগে জুতো, মোজা খুলে, ব্যাগ তিনটে ও লাঠিগুলো এক জায়গায় রেখে গেলাম। মন্দিরের ভিতর সব সময় একটা প্রদীপ জ্বলে। শিবদূর্গার বিবাহের সাক্ষী হিসাবে, নারায়ণ তিন যুগ ধরে এখানে অবস্থান করছেন বলে শুনলাম। নারায়ণের কী অন্য কোন কাজ নেই, না শিবের বিয়ের সময় ভালো বিয়ে বাড়ি পাওয়া যেত না জানি না। ডানপাশে বাঁধানো চৌবাচ্চা মতো। সেখানে স্নান সেরে বহু হিন্দুস্থানী পূর্ণার্থী,

       SONPROYAG      TRIYUGINARAYAN (4)      TRIYUGINARAYAN

শোনপ্রয়াগ                         ত্রিযুগী নারায়ণ মন্দির।                ত্রিযুগী নারায়ণ মন্দির।

গোল হয়ে বসে আছেন। পান্ডারা তাদের লাল খাতা খুলে, নাম ধাম ইত্যাদি খুঁজে বার করে, মন্ত্র পাঠ করাচ্ছে। আ  কাশে বেশ মেঘ করেছে। রোদের জন্য ক্যামেরা হাতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে শেষে রোদের আশা ছেড়ে দিয়ে মেঘের মধ্যেই বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। এবার ফেরার পালা। জুতো মোজা পরে, ব্যাগ ও লাঠি নিয়ে বাইরে এলাম। আবার সেই কান ফাটানো ব্লাষ্টিং এর আওয়াজ। জানা গেল শোনপ্রয়াগ থেকে ত্রিযুগীনারায়ণ, বাস রাস্তা তৈরির কাজ চলছে। সামনের চায়ের দোকানে বসে তিনজনে চা খাচ্ছি, দু’জন পান্ডা এসে বললো পূজো না দেবেন তো কী হয়েছে, প্রসাদ নিন। তারা সামান্য প্রসাদ দিয়ে গেল। কথা না বাড়িয়ে প্রসাদগুলো ব্যাগে রেখে দিলাম। এবার সত্যিই ওঠার পালা। আমরা পুরানো রাস্তা ধরে নামতে শুরু করলাম। আমাদের কাছে ইউ.পি.হিলস্ এর যে গাইড ম্যাপ ছিল, তাতে দেখলাম শোনপ্রয়াগ থেকে ত্রিযুগীনারায়ণের দুরত্ব, মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পথ। মনে হয় এ ম্যাপটাই ঠিক। এর আগেও অনেক হেঁটেছি। ৩.৬ কিলোমিটার পথ এটা যে নয়, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আসবার সময় যে বাইপাসগুলো ব্যবহার করিনি, এবার সেগুলো দিয়ে নেমে আসায়, খুব দ্রুত নীচে নেমে আসতে শুরু করলাম। সেই ঝরনা, গাঁজা বা সিদ্ধির জঙ্গল পেরিয়ে, একসময় আমরা নীচের ব্রিজের কাছে এসে পৌঁছলাম।

গতকাল রাতে যেখানে খাবার খেয়েছিলাম, সেই দোকানেই খাবার খেতে গেলাম। মাখনের প্যাকেটটা নিয়ে আসা হয় নি। তাছাড়া মাধবের পায়ে ব্যথার জন্য নী-ক্যাপটাও আনা প্রয়োজন। মাধব ও দিলীপ আমাদের আস্তানায় গিয়ে ওগুলো নিয়ে ফিরে আসলো। রুটি আর আলুর তরকারী খেয়ে, আমরা গৌরীকুন্ড যাবার জন্য একটা ট্যাক্সি ঠিক করলাম। এখানে প্রচুর ট্যাক্সি শোনপ্রয়াগ-গৌরীকুন্ড যাতায়াত করে। দুরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। তিনজনের ভাড়া লাগলো বার টাকা। গৌরীকুন্ড জায়গাটা দেখে মনে হ’ল, শোনপ্রয়াগের থেকে ছোট হলেও অনেক উন্নত। এখানেও ইলেকট্রিক আলো আছে, তবে কোথাও কিছু খারাপ হওয়ায় শোনপ্রয়াগের মতোই জ্বলছে না। শোনপ্রয়াগে শুনেছিলাম, গৌরীকুন্ডে মন্দির কমিটির বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা নাকি ভালো। ডানপাশে গৌরী দেবীর মন্দির ছেড়ে একটু এগিয়ে রাস্তার ডানপাশে মন্দির কমিটির ঘর। আজই কেদারনাথ চলে যাবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু স্থানীয় লোকেদের উপদেশ, আজ অনেক বেলা হয়ে গেছে, আজ আর কেদারনাথ যাওয়া ঠিক হবে না। এখান থেকে চোদ্দ কিলোমিটার হাঁটা পথ। ঠিক করলাম আজ গৌরীকুন্ডে থেকে, কাল সকালে কেদারনাথ যাব। মন্দির কমিটির একটা ঘর ষোল টাকা দিয়ে ভাড়া নিলাম। কাঠের মেঝে। কম্বল ও লেপ পাওয়া গেল। এখানে আমরা সঙ্গে কিছু নিয়ে আসি নি। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে একটু বিশ্রাম নেব ভাবলাম।

মাধব শুয়ে পড়লো। আমি আর দিলীপ কিন্তু শুয়ে না থেকে, ক্যামেরা হাতে জায়গাটা এক চক্কর ঘুরে দেখতে বেরলাম। গৌরীদেবীর মন্দিরের সামনে একটা চৌবাচ্চা মতো আছে। তাতে অবশ্য ঠান্ডা জল। সামনেই গৌরীকুন্ড, গরম জলের কুন্ড। এখানেই পূজা, তর্পন, পিন্ডদান ইত্যাদি দেবার ব্যবস্থা আছে। এখানেই একটা দোকানে রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে ঘরে ফিরে এসে, আমরাও লেপ চাপা দিয়ে পরম আরামে শুয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙ্গলো বেশ বিকালে। দুপুরে ঘুমিয়ে শরীরটা খারাপ লাগছে। মাধবের ইচ্ছা কেদারনাথে একদিন থাকার। আমরা ভেবেছিলাম যেদিন যাব, সেইদিনই সন্ধ্যায় ফিরে আসবো। শেষ পর্যন্ত কেদারনাথে রাতে থাকার ব্যবস্থাই পাকা হ’ল। দুপুরের দিকে খুব হাল্কা এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তা এখনও অল্প অল্প ভিজে আছে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে এল। রাত আটটা নাগাদ আমরা রাতের খাবার খেতে নির্দিষ্ট দোকানে গেলাম। দোকানদার ভদ্রলোক খুব ভাল মানুষ, নাম প্রতাপ সিং। তিনি জানালেন তাঁর দোকানের ওপরে দোতলায় থাকার ব্যবস্থা আছে। সীজনের সময় ভাড়া বাবদ সামান্য কিছু টাকা নেন। এখন অফ্-সীজন এর সময়, থাকার জন্য কোন চার্জ লাগে না। এরকম প্রস্তাব যে কেউ, কোথাও, কোনদিন দিতে পারে, স্বপ্নেও ভাবিনি। এখানে থাকলে আমাদের সুবিধাও হ’ত। টপ্ করে দোতলা থেকে এক তলায় নেমে রাতের খাবার খাওয়াও যেত, ঠান্ডায় এতটা আসার প্রয়োজনও হ’ত না। আর ষোল টাকা ভাড়া তো বেঁচে যেতই। যাহোক্, পুরী, তরকারী খেয়ে, পরের দিন সকালের জন্য জলখাবারের অর্ডার দিয়ে, আমরা ঘরে ফিরে এলাম। রাতে খুব আরামে লেপের তলায় ঘুমলাম।

            GOURIKUND                             WAY TO KEDARNATH

                      গৌরীকুন্ড                                                  কেদার নাথ যাবার পথে

আজ চব্বিশে আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো খুব সকালে। আমাদের ঘরের একটু পাশেই পরপর তিনটে বাথরুম পায়খানা আছে। হাত মুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে ঘরের ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে, কাঁধের ঝোলাব্যাগ সঙ্গে নিয়ে, আমরা সেই দোকানে খাবার খেতে গেলাম। গরম গরম পুরি, তরকারী আর লাড্ডু দিয়ে প্রাতরাশ সেরে, হাঁটার জন্য প্রস্তুত হলাম। দোকানদার বললেন, ফেরার সময় গৌরীকুন্ডে রাত কাটালে, আমরা তার ওখানে থাকলে তিনি খুশি হবেন। আমরা সম্মতি জানিয়ে কেদারনাথের রাস্তা ধরলাম। আকাশ পরিস্কার। একদিন অনেকটা সময় বিশ্রাম পাওয়ায়, শরীরও বেশ চাঙ্গা। হাঁটতে কোন কষ্ট হচ্ছে না। পাশ দিয়ে ঘোড়া ও কান্ডিতে বুড়োবুড়ি এমন কী যুবক যুবতীদেরও, কেদারনাথের দিকে যেতে দেখলাম। বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে, বদ্রীনারায়ণের মোটা বাবু ও তার বৃদ্ধ সঙ্গীটিকে ফিরতে দেখলাম। তারা জানালো যে তারা কেদারনাথে বিড়লা গেষ্ট হাউসে গতকাল রাতে ছিল। আমরা সামনের দিকে পা বাড়ালাম। এবার একটা বিরাট ঝরনা দেখতে পেলাম। প্রাণভরে ঠান্ডা জল খেয়ে আবার এগলাম। সামনেই “রামওয়ারা” চটি। এখানে রাত কাটাবার ভালো ব্যবস্থা আছে। এখানে এসে দেখলাম, বেশ কিছু লোক শোনপ্রয়াগ যাবার উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছে। গতকাল রাতে তারা এখানেই ছিল। দুরে বরফ ঢাকা শৃঙ্গ দেখা যাচ্ছে। এখানে ঝুড়িভাজা ও চা খেয়ে, সামনের রাস্তা ধরলাম। প্রাকূতিক দৃশ্য বেশ সুন্দর। রাস্তাও বেশ চওড়া ও ভালো। ফলে মনের আনন্দে চলেছি। আর কিছুটা পথ এসে, “গড়ুর” চটিতে হাজির হলাম। এখানে আলাপ হ’ল হাওড়া কদমতলার চারজনের সঙ্গে। একজন একটা স্কুলের শিক্ষক, বাকি সবাই ব্যবসা করে। চেনাশোনা অনেকের কথাই তারা জিজ্ঞাসা করলো। তারা জানালো, হাওডা থেকে মোটরে গৌরীকুন্ডে এসে, ওখানে গাড়ি রেখে, হেঁটে কেদারনাথ এসেছে। এখন ফিরে যাবে গৌরীকুন্ডে। হাতে কেদারনাথের পূজার ব্রহ্মকমল। আমরা জানালাম, আমরা ব্রহ্মকমলের রাজত্ব পার হয়ে এসেছি। সব শুনে তারা হেমকুন্ড-নন্দন কানন যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। বললাম অনেক হাঁটতে হবে। ওরা জানালো, ওদের সঙ্গে গাড়ি আছে। মনে মনে ভাবলাম সঙ্গে গাড়িই থাক্ আর টাকাই থাক্, সৌন্দর্য কুড়তে গেলে, হাঁটতে তোমাদের হবেই। অবশ্য ঘোড়া বা কান্ডি নিতে পার।

কেদারনাথের উচ্চতা ৩৫৮৪ মিটার। গৌরীকুন্ড মাত্র ১৯৮১ মিটার। কিন্তু কেদারনাথের রাস্তা খুব ধীরে ধীরে ওপর দিকে ওঠায়, হাঁটার কষ্ট বেশ কম। বহুদুরে বরফ ঢাকা শৃঙ্গ দেখা যাচ্ছে। শুনলাম ঐ শৃঙ্গের পাদদেশেই কেদারনাথ মন্দির। অনেকক্ষণ হাঁটছি, পথের যেন আর শেষ নেই। ডান্ডি বা কান্ডিগুলোকে পিছনে ফেলে, জোর কদমে আমরা এগিয়ে চলেছি। অবশেষে বহুদুরে ছোট্ট মন্দির চোখে পড়লো। মনে হ’ল যেন ছাই এর গাদার উপর একটা ছোট্ট মন্দির, নির্জন পরিত্যক্ত একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। পরে শুনলাম এই জায়গা থেকে মন্দিরটা প্রথম দেখা যায়, তাই এই জায়গাটাকে “দেবদেখনি” বলা হয়। একসময় আমরা উত্তর প্রদেশ সরকারের ট্রাভেলার্স লজের কাছে এসে পৌঁছলাম। পাশেই হোটেল “হিমলোক”। এখানে খাওয়ার ব্যবস্থাও বেশ ভালো। সম্ভবত এটাও উত্তর প্রদেশ সরকার দ্বারাই পরিচালিত। সামনে সামান্য দুরেই, কেদারনাথ মন্দির। দুর থেকে যেটাকে ছাইয়ের গাদা ভেবেছিলাম, সেটা আসলে হাল্কা কুয়াশা। মন্দিরের পেছনে কিন্তু কোন বরফ ঢাকা পাহাড় দেখলাম না। চারিদিক মেঘ ও কুয়াশায় ঢেকে গেছে। এই মুহুর্তে বরফ দুরে থাক, মন্দিরের পেছনে যে পাহাড় আছে, বুঝবার উপায় নেই। ট্রাভেলার্স্ লজে একটা ঘর, আঠারো টাকা ভাড়ায় বুক করলাম। ভালো বিছানা, প্রত্যেকের জন্য তিনটে করে মোটা ভালো কম্বল। ঘরে ব্যাগ রেখে, দরজা বন্ধ করে, মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মন্দিরের একটু আগে একটা ব্রিজ পার হতে হয়। এখানে দুধগঙ্গা, মধুগঙ্গা, স্বর্গদুয়ারী, সরস্বতী, ও মন্দাকিনী, বোধহয় এই পাঁচটা নদী এসে মিশেছে। মন্দিরের সামনে রাস্তার দু’পাশে পরপর দোকান। মন্দির এখন বন্ধ, সন্ধ্যা নাগাদ খুলবে। কয়েকটা ছবি তুলে, কিছু খাওয়ার ধান্দায় একটা দোকানে গেলাম। রাস্তার দু’পাশে দু’টো মিষ্টির দোকান মতো আছে। একমাত্র এখানেই কিছু খাবার মিলতে পারে। একটা দোকানে একটা ছেলে বসে আছে। সে জানালো, লুচি, তরকারী ও মিষ্টি পাওয়া যাবে, তবে লালাজী না আসলে হবে না। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও লালাজীর দর্শন পেলাম না। বাধ্য হয়ে অপর দিকের দোকানটায় গেলাম। এটা অপেক্ষাকৃত অপরিস্কার। এই দোকানের মালিকের আবার বেশ গরম মেজাজ। সে জানালো লুচি হবে না, পুরিও হবে না। আগের থেকে অর্ডার না দিলে পাওয়া যায় না। বললাম আমরা এইমাত্র এখানে এসে পৌঁছলাম, আগের থেকে অর্ডার দেব কী ভাবে? আমাদের কথায় তার মন গললো না। সে জানালো, নিমকি আছে খেতে পারেন, লুচি এখন পাওয়া যাবে না। অপরদিকে তখনও লালাজীহীন দোকানে, তুলনামুলক ভাবে একটু ভাল মিষ্টি ও অন্যান্য খাবার শোভা পাচ্ছে। শেষে বাধ্য হয়ে কবেকার ভাজা কে জানে, ঠান্ডা নিমকি, গরম মেজাজের দোকনদারের থেকে পয়সা দিয়ে কিনে ধন্য হলাম। সঙ্গে লাড্ডু আর চা। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে ঘরে ফিরে এলাম।

ট্রাভেলার্স লজের সামনে অনেকটা ফাঁকা মাঠের মতো জায়গা, রেলিং দিয়ে ঘেরা। সামনের খোলা জায়গাটায়, কয়েকটা চেয়ার ও একটা বেতের টেবিল পাতা আছে। লজে আমাদের অপর দিকের ঘরে একটা মাদ্রাজি পরিবার আছে। তারা সমস্ত চেয়ারগুলো দখল করে বসে, আরামে চা খাচ্ছে। বাইরে বেশ ঠান্ডা। আমরাও চায়ের অর্ডার দিলাম। রেলিং এর কাছে, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, গলা ছেড়ে গান জুরে দিলাম। মনটা বেশ খুশি খুশি। হেমকুন্ড, নন্দন কানন, বদ্রীনারায়ণ, ত্রিযুগীনারায়ণ দেখা হয়েছে। কেদারনাথও দেখা হ’ল। আগামীকাল বাসুকীতাল দেখতে যাবার ইচ্ছা আছে। হিমলোক হোটেলের ছেলেগুলো জানালো, বাসুকীতাল মাত্র পাঁচ-ছয় কিলোমিটার পথ। এই সামান্য রাস্তা হাঁটার ভয় এখন আর নেই। মনে শুধু একটাই চিন্তা, গঙ্গোত্রী, গোমুখ, যমুনোত্রী যাওয়া হবে তো? আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নেমে এল। ঘরে এসে দেখলাম, পাশের ঘরে মিটমিট্ করে ইলেকট্রিক লাইটগুলো জ্বলছে। আমাদের ঘরের বাল্বটা বোধহয় কেটে গেছে। কেয়ারটেকারকে বাল্বটা বদলে দেবার কথা বলে, আমরা মন্দিরে গেলাম। চা জলখাবার খেয়ে কিছুক্ষণ মন্দিরের চাতালে ঘুরে, ঘরে ফিরবার কথা বললাম। দিলীপের খুব ইচ্ছা সন্ধ্যা আরতি দেখে যাবার। আমার কিন্তু ঘরে ফিরে যাবার ইচ্ছা ছিল, কারণ আমরা হাওয়াই চটি পরে ঘর থেকে মন্দিরে এসেছি। অনেকটাই পথ, তার ওপর অসম্ভব ঠান্ডা পড়েছে। আমার সঙ্গী দু’জনেরই আবার একটু ঠান্ডার বাতিক আছে। ফলে ওদের শরীর খারাপ হবার সম্ভাবনাও যথেষ্ট। কিন্তু মাধবও দিলীপের সাথে যোগ দিয়ে, আরতি দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। এরপর আর আমার না বলার কোন জায়গা নেই। তাই তিনজনে একটা দোকানে আরতি আরম্ভ হবার অপেক্ষায় বসে থাকলাম।

       KEDARNATH (13)     KEDARNATH (7)    KEDARNATH (10)

              কেদার নাথ                        শঙ্করাচার্যের দণ্ড                           ট্রাভেলার্স লজ্

এখানে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে বাসুকীতাল সম্বন্ধে খোঁজখবর নিলাম। বাসুকীতালের দুরত্ব সম্বন্ধে এক একজনের এক একরকম বক্তব্য। কেউ বলে বার মাইল, কেউ বলে ছয় মাইল, কেউবা আবার অনেক বেশি বলে জানালো। তবে সকলেই কিন্তু একটা কথা বললো যে, ওখানে পর্বতারোহনের অ্যাডভান্স ট্রেনিং হয়। কাজেই ওখানে যাওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজসাধ্য নয়। তার ওপর ওখানে যাওয়ার কোন নির্দিষ্ট রাস্তাও নেই। একটু মেঘলা করে আসলে, রাস্তা চিনে ফিরে আসা খুব সহজ কাজ নয়। ভাল গাইড সঙ্গে নিলে অবশ্য আলাদা কথা। শুনলাম ওখানকার লেকের আয়তন নাকি এখনও হিসাব করা যায় নি। বাসুকীতাল সম্বন্ধে বিশেষ জানাও ছিল না, আসার আগে খোঁজখবরও নিয়ে আসা হয় নি। ফলে একটা কথা বেশ বুঝতে পারছি যে, আগামীকাল শোনপ্রয়াগ ফিরতে হলে, এবার আর বাসুকীতাল দেখা সম্ভব নয়, উচিৎও নয়। সন্ধ্যা আরতি শুরু হ’ল প্রায় রাত সাড়ে সাতটা নাগাদ। ঠান্ডাও বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। এই ঠান্ডাতেও অনেক লোকই মন্দিরে এসে হাজির হয়েছে। লাইন দিয়ে সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে, ডান পাশের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে হয়। আস্তে আস্তে হাঁটার ফলে যেটুকু দেখা যায়। দর্শনার্থীর সংখ্যা যত কম হবে, তত বেশি সময় নিয়ে ভালোভাবে দেখা যাবে। অবশ্য পূজা দেবার সময় মূর্তি স্পর্শ করতে দেওয়া হয়, যেটা বদ্রীনারায়ণে দেওয়া হয়না। তবে এখানে আবার বদ্রীনারায়ণের মতো ঘটা করে আরতি হয় না, অন্তত এখন তো হতে দেখলাম না। খালিপায়ে এইটুকু পথ হাঁটতে হয়। আমরা মন্দিরের বাইরে এসে চটি পরে ঘরের পথে পা বাড়ালাম। এখানকার স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী সম্বন্ধে কোন ধারণা পাওয়া গেল না, পাওয়া যাবে বলেও মনে হ’ল না। ওদের হাবভাব দেখে মনে হ’ল, এখানকার কেউ কোনদিন এদিক থেকে ওপথে যায়ও নি। এদের কাছ থেকে একটা ধারণা পেলে সুবিধা হ’ত। যাহোক্, আমরা ঘরে ফিরে দেখলাম আমাদের ঘরে নতুন বাল্ব লাগিয়ে দেওয়া হয় নি। পাশের হিমলোক হোটেলে রাতের খাবার খেতে গেলাম। আধা ভাত, আধা রুটি, দু’রকম তরকারী, বেশ ভাল ডাল ও পাঁপড় ভাজা দিয়ে গেল। কায়দা কানুনও আধুনিক হোটেলের মতো। দাম লাগলো মাথাপিছু চার টাকা পঞ্চাশ পয়সা। বাল্বের কথা জিজ্ঞাসা করতে জানা গেল বাল্ব আনতে গেছে, আপাতত মোমবাতি দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বাস হ’ল না। ঘরে ফিরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। বাল্ব বা মোমবাতি কোন কিছুই দিয়ে না যাওয়ায়, বাইরে মেন সুইচের কাছ থেকে একটা বাল্ব খুলে এনে নিজেদের ঘরে লাগিয়ে নিয়ে, দরজা বন্ধ করে, আলো জ্বেলেই শুয়ে পড়লাম। মনে হ’ল বিছানা যেন ভিজে গেছে। তিনটে কম্বলও যথেষ্ট বলে মনে হ’ল না।

     KEDARNATH (4)        KEDARNATH (5)       KEDARNATH (3)

           হোটেল হিমলোক                              কেদার নাথ                               কেদার নাথ

আজ পঁচিশে আগষ্ট। বেশ ভোরেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। বাড়ির পিছন দিকে হাত, মুখ ধুতে গিয়ে প্রথম নজরে পড়লো একবারে হাতের কাছে সূর্যালোকে লাল-হলুদ রঙের বরফের চুড়া। তাড়াতাড়ি চা খেয়ে তৈরি হয়ে   মন্দিরে গেলাম। ভোরের মন্দিরের রূপ একবারে অন্যরকম। মন্দিরের ঠিক পিছন থেকে বরফের চাদর ঢাকা পাহাড় উঠেছে। প্রাণভরে ছবি তুললাম। মাধব ও দিলীপ পি.সুক্লা নামে এক পান্ডার খোঁজ করে পূজো দিতে গেল। আমি মন্দিরের পিছনে শঙ্করাচার্যের সমাধি দেখতে গেলাম। একপাশে শ্বেত পাথরের শঙ্করাচার্যের দণ্ড। একটা সাদা পাথরের হাত, দণ্ডটা ধরে আছে। সমাধিটা বাঁপাশে। একটা ছোট মন্দিরের মতো ঘরে, শঙ্করাচার্যের মুর্তিটা রাখা আছে। চারপাশের দেওয়ালে শ্বেত পাথরের ফলকে, সম্ভবত তাঁরই বাণী লেখা। ঘুরে ফিরে ছবি নিয়ে ফিরে এলাম। বন্ধুরাও তৈরি। এবার ফেরার পালা। হোটেলে এসে, বিল মিটিয়ে, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে, ফেরার রাস্তা ধরলাম। আমাদের সাথে বদ্রীনারায়ণ থেকে এক বাসে আসা সেই সবজান্তা দাড়িওয়ালা বৃদ্ধের দলের সাথে দেখা হ’ল। তারাও আমাদের মতোই ফেরার পথে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s