পাহাড়ের রোজনামচা–ষষ্ঠ পর্ব { লেখাটি www.amaderchhuti.com ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

DSCN9767রাস্তায় একপ্রকার ছোট ছোট ঝোপ হয়ে আছে। তাতে অজস্র ছোট ছোট, লাল লাল, করমচার মতো ফল হয়ে আছে। স্থানীয় লোকেরা দেখি টপাটপ্ ঐ গাছ থেকে ফল ছিঁড়ে মুখে পুরছে। আমরাও কয়েকটা ফল তুলে খেলাম। বোধহয় ওগুলো পাহাড়ি করমচা। যত বাইপাস চোখে পড়ছে, ব্যবহার করে বেশ দ্রুত নেমে আসছি। গতকাল যাওয়ার সময় একটা গুহা মতো পাথরের খাঁজে, একটা উলঙ্গ সন্যাসীকে বসে থাকতে দেখেছিলাম। সামনে কয়েকটা ঠাকুর দেবতার ছবি টাঙ্গিয়ে, গায়ে ছাই মেখে বসে ছিল। আমরা পাশ দিয়ে যাবার সময় চোখ পিটপিট্ করে দেখছিল। এখন ফেরার পথে তার কাছাকাছি আসতে, সে দিলীপ ও মাধবের কাছে পয়সা চাইলো। ওরা কোন কথা না বলে এগিয়ে গেল। একটু পিছনেই আমি। আমার কাছেও পয়সা চাইলো। আমিও কিছু না দেওয়াতে, সে বেশ কড়া সুরে অভিশাপ দেবার ভঙ্গিতে আমায় বললো— “তুই যেমন আছিস, তেমন থাকবি”।

ভীষণ রাগ হয়ে গেল। যাবার সময় কিছু বলে নি। ভেবেছিল এপথে ফিরতে তো হবেই, ট্যাক্সটা তখনই আদায় করা যাবে। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। ভাবলাম বেশ দু’ঘা দিয়ে ব্যাটাকে ওপর থেকে নীচে ফেলে দেই। মাধব এগিয়ে এসে আমায় কিছু বলতে বারণ করলো। আবার হাঁটতে শুরু করলাম। বাইপাস ব্যবহার করে বেশ দ্রুত ফিরছিলাম। কিন্তু আরও শর্টকাট্ করতে গিয়ে মহা বিপদে পড়লাম। বাইপাস নয়, এমন একটা পায়ে চলা রাস্তার মতো দাগকে বাইপাস ভেবে, হাত দিয়ে লতাপাতা সরিয়ে হাঁটতে গিয়ে, ডান হাতের কব্জির কাছ থেকে কনুই পর্যন্ত মক্ষম বনবিছুটি লাগলো। মনে হ’ল ভীষণ জোরে ইলেকট্রিক শক্ খেলাম। অল্প সময়ের মধ্যে সমস্ত জায়গাটা শক্ত হয়ে ফুলে উঠলো। মনে হচ্ছে হাতের দু’দিক থেকে দু’জন যেন মক্ষম ভাবে চামড়াটা দু’দিকে টানছে। গোটা জায়গাটা গরম হয়ে ভীষণ কষ্টকর যন্ত্রণা শুরু হ’ল। একজন স্থানীয় বৃদ্ধ কাছেই একটা পাথরের ওপর বসেছিল। কী ভাবে জানিনা, সে কিন্তু বুঝে গেছে যে আমার বিচ্ছু লেগেছে। তাকেই জিজ্ঞাসা করলাম কী করবো। সে বললো হাতের ক্ষত জায়গায় পিসাব্ কর দেও। এখন এই মুহুর্তে সেটা করা সম্ভব নয়। তাই আস্তে আস্তে সাবধানে রাস্তায় ফিরে এসে, হাতে ভালোভাবে বোরোলিন লাগালাম। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রামওয়ারা চটিতে এসে উপস্থিত হলাম। স্থানীয় কী একটা উৎসবের জন্য, পুরুষ ও মহিলারা নেচে নেচে টাকা পয়সা, চাল, ডা্‌ল, আটা ইত্যাদি আদায় করছে। এখানে চা বিস্কুট খেয়ে, বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলাম, হাতে বিছুটি লেগেছে কী করবো? সে বললো কিছু হবে না। যাই লাগান না কেন, আজ যখন লেগেছে কাল সেই সময় কমে যাবে। অর্থাৎ পুরো চব্বিশ ঘন্টা যন্ত্রণা থাকবে। আঁতকে উঠে ভাবলাম পুরো চব্বিশ ঘন্টা এই যন্ত্রণা আমার সঙ্গী হলেই হয়েছে আর কী। উঠে পড়ে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। দিলীপ অনেক এগিয়ে গেছে, মাধবের হাঁটুর ব্যথাটা বেশ বেড়েছে। ওর সঙ্গে তাল রেখে ধীরে ধীরে নামছি। ক্রমে ওর হাঁটার গতি এত কমে গেল যে, ইচ্ছা না থাকলেও এগিয়ে গেলাম। একটু এগিয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করে, আবার ওর সঙ্গে একটু হাঁটলাম। আবার এগিয়ে গেলাম। এইভাবে একসময় গৌরীকুন্ডে এসে, পরিচিত সেই দোকানে গিয়ে বসলাম। দিলীপ আগেই এসে গেছে। মাধব একটু পরেই এসে হাজির হ’ল।

চায়ের অর্ডার দিয়ে দোকানদারকে বললাম, আমরা আজই উত্তরকাশী যাবার বাস ধরতে চাই, কখন বাস পাব? দোকানদার জানালেন বিকাল পাঁচটায় শেষ বাস পাওয়া যাবে। দাম মিটিয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে এলাম। এখানে এখন কোন প্যাসেঞ্জার না থাকায়, আমাদের তিনজনকে নিয়ে কোন ট্যাক্সি যেতে রাজি হ’ল না। আরও অন্তত দু’তিনজন প্যাসেঞ্জারের প্রয়োজন। কিন্তু কেউ আর আসে না। ট্যাক্সি ড্রাইভারকে উত্তরকাশীর বাসের কথা জিজ্ঞাসা করতে সে জানালো, উত্তরকাশীগামী শেষ বাস শোনপ্রয়াগ থেকে বিকাল পাঁচটায় ছাড়ে। হাতে অনেক সময় আছে, তাই দু’তিনজন প্যাসেঞ্জারের আশায় তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে রইলাম। একজন টাকমাথা, বেঁটে, মোটা মতো মাঝবয়সি ভদ্রলোক, শোনপ্রয়াগ যাবার জন্য ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে এসে হাজির হলেন। কেদারনাথ থেকে আরও যদি কেউ আসে, সেই আশায় ট্যাক্সি ড্রাইভার তবু দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পরে নতুন কোন যাত্রী না পাওয়ায়, আমাদের চারজনকে নিয়েই ট্যাক্সি ছেড়ে দিল। মাধব আমার পাশে, তার পাশে ঐ নতুন ভদ্রলোক। মাধব জানালো যে তার পায়ের ব্যথাটা বেশ বেড়েছে, সঙ্গে জ্বরও এসেছে বলে মনে হচ্ছে। আমি বললাম শোনপ্রয়াগ গিয়ে সঙ্গে আনা ওষুধ দেওয়া যাবে। ভদ্রলোক পাশ থেকে বললেন আমায় বলুন না, আমি ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি। অনেকক্ষণ ব্যাগ হাতড়ে খুঁজেপেতে একটা ট্যাবলেট বার করে বললেন, চট্ করে গিলে ফেলুন। মাধব আমার দিকে আড়চোখে তাকাতে, আমি চোখের ইশারায় তাকে ট্যাবলেটটা খেতে বারণ করলাম। কারণ ভদ্রলোকের আচরণ কেমন যেন অদ্ভুত রকমের, তার ওপর ঐ ওষুধটার নামও আগে কখনও শুনি নি। মাধব তাঁকে জানালো যে সে ওটা খেয়ে নিয়েছে। ভদ্রলোক বললেন তিনি বদ্রীনারায়ণ যাবেন। আমরা তাঁকে কী ভাবে বদ্রীনারায়ণ যেতে হবে, সেখানে কী কী দেখার আছে, সব জানালাম। ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন, যদিও এই তাঁর প্রথম বাইরে বেড়াতে আসা, তবু তিনি কল্পনার চোখে সব দেখতে পাচ্ছেন, কারণ তিনি শিল্পী, ছবি আঁকেন। একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ তিনি প্রস্তাব দিলেন, শোনপ্রয়াগে আমাদের সঙ্গে তিনি একই জায়গায় থেকে যেতে চান। তাঁর সঙ্গে এক জায়গায় থাকার ইচ্ছা আমাদের মোটেই নেই। তার ওপর আজই আমরা উত্তরকাশীর উদ্দেশ্যে রওনা দেব। তাঁকে বললাম, আজই আমরা সন্ধ্যার বাসে চলে যাব, কাজেই আমাদের একসাথে থাকার কোন সুযোগ নেই। অবশেষে শোনপ্রয়াগে পূর্বপরিচিত জায়গায়, ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো।

আমরা বাসের টিকিট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম। মাধব গেল আমাদের মালপত্রগুলো পোষ্ট অফিস থেকে ছাড়াতে। হায়! টিকিট কাউন্টারে এসে জানতে পারলাম, আজ কোন বাস নেই। কাল সকাল পাঁচটায় প্রথম বাস ছাড়বে। সেই টেহেরী গাড়োয়ালের রাজধানী শ্রীনগর পর্যন্ত ঐ বাসে গিয়ে, ওখান থেকে উত্তরকাশীর বাস পাওয়া যাবে। গত বৎসর বন্যার আগে এই সমস্ত রাস্তায় “যাত্রা বাস” বা ডিরেক্ট বাস সার্ভিস ছিল। এখন প্যাসেঞ্জারের অভাবে যাত্রা বাস পাওয়া যায় না। ফলে সময় ও খরচ দু’টোই অনেক বেড়ে গেছে। কষ্ট তো বেড়েইছে। কাউন্টারে জানালাম, গৌরীকুন্ডে এবং ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে আমরা শুনেছি যে বিকাল পাঁচটায় লাষ্ট্ বাস পাওয়া যাবে। ভদ্রলোক বললেন, ওরা ভুল বলেছে, সকাল পাঁচটায় ফার্ষ্ট বাস পাওয়া যাবে। অহেতুক আজ শোনপ্রয়াগে এলাম। এখানে না পাওয়া যায় ভালো খাবার, না পাওয়া যায় ভালো থাকার জায়গা। গৌরীকুন্ডে রাতে থাকলে, অনেক আরামে থাকা যেত।

টিকিট কাউন্টারের বাঁপাশে একটু ওপরে, একটা ভালো থাকার জায়গা পাওয়া গেল। কিন্তু এখানে আবার খাটিয়া পাওয়া গেলেও, আলাদা ঘর পাওয়া যাবে না। অগত্যা আবার সেই পোস্ট্ অফিসের পুরাতন ঘরটায় রাতের আশ্রয় নিতে হ’ল। আগেরবার যে ঘরটায় মোটাবাবু ও তার বৃদ্ধ সঙ্গীটি আশ্রয় নিয়েছিল, সেই ঘরটায় একটা দক্ষিণ ভারতীয় পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এদের লোক সংখ্যা অনেক। সঙ্গে আবার একগাদা বাচ্চা। কান্নার আওয়াজ সব সময় লেগেই আছে। আমাদের পিছনে, মাঝখানে খানিকটা পার্টিশন দিয়ে আলাদা করা যে ঘরটি আছে, সেখানে কয়েকজন যুবক এসে জায়গা নিয়েছে। এদের সঙ্গে ট্যাক্সির সেই আর্টিষ্ট ভদ্রলোক কিভাবে ম্যানেজ করে জায়গা করে নিয়েছে। সবকটা যুবকই খুব আধুনিক ধরণের, এসেছে কলকাতা থেকে। আর্টিষ্ট ভদ্রলোক দেখলাম তাদের খুব বড় বড় কথা বলে চলেছে। তারাও খুব চতুরতার সঙ্গে তাঁকে ব্যাঙ্গ করছে, মুরগি করছেও বলা যেতে পারে।

মাধবের গায়ে মোটামুটি ভালোই জ্বর আছে। ওকে বাইরে যেতে বারণ করে, আমি আর দিলীপ ঘরে মালপত্র ভালোভাবে গুছিয়ে রেখে, বাইরে এলাম। এখানে ঠান্ডা খুব একটা বেশি নয়। আগের দোকানে রাতের সেই একই খাবার খেয়ে, অপর একটা দোকানে মগ নিয়ে গেলাম মাধবের জন্য দুধ কিনতে। দোকানদার জানালো দুধ নেই, দুধ পাওয়া যাবে না। আমরা বললাম, আমাদের এক বন্ধুর বেশ জ্বর, একটু দুধ না পেলে সারারাত তাকে না খেয়ে থাকতে হবে। আমাদের কথা শুনে দোকানদার কিন্তু একবারে অন্যরকম ব্যবহার করলো। সে বললো, গায়ে জ্বর? তাহলে অসুবিধা হলেও একটু দুধ তো দিতেই হয়। দুধ গরম করতে করতে, কী কী ওষুধ খাওয়ানো প্রয়োজন, বা কী কী করা উচিৎ, নিজে থেকেই বলতে শুরু করে দিল। চায়ের জন্য রাখা সামান্য দুধ থেকেও, কিছুটা দুধ গরম করে আমাদের মগে ঢেলে দিল, শুধু একজন অসুস্থ লোক না খেয়ে থাকবে বলে। এদের সরলতা, আন্তরিকতা বা মনুষ্যত্ব দেখলে, নিজেদেরকে খুব ছোট মনে হয়। আমাদের এখানে শুধু লোক ঠকানো ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করা ছাড়া, আমরা আর কিছুই শিখলাম না। যাহোক্, ঘরে ফিরে এসে গরম দুধে কিছুটা বোর্ণভিটা দিয়ে মাধবকে দিলাম। সঙ্গে নিয়ে আসা ওষুধ থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধও দিলাম। মাধব জানালো দুধটা খুব ভালো। আমরা আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম।

পাশের ঘরে তখনও আলো জ্বলছে। পার্টিশনের ফাঁক দিয়ে পাশের ঘরটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। আমাদের ঘরটা অন্ধকার, তাই পাশের ঘর থেকে আমাদের দেখার কোন সুযোগ নেই। দেখলাম একটা মদের বোতল খুলে সবাই গোল হয়ে বসেছে। তারা আর্টিষ্ট ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলো, এটা তার চলে কী না। আর্টিষ্ট বললেন তাঁর অভ্যাস নেই। তিনি আরও বললেন, যে তাদের এত খাওয়া উচিৎ হচ্ছে না। কিন্তু বোতলটা নিয়ে কথা বলতে বলতে, বেশ কয়েকবার অনেকটা করে নিজের গ্লাশে ঢেলে, গ্লাশ খালি করলেন। মাধব বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার ঘুম আসছে না। উপুড় হয়ে শুয়ে ওদের কাজকর্ম লক্ষ্য করতে লাগলাম। আর্টিষ্ট ভদ্রলোককে একজন জিজ্ঞাসা করলো, এপথে তিনি আগে কখনও এসেছেন কী না। উত্তরে আর্টিষ্ট বললেন, এপথে তিনি এই প্রথম, তবে কল্পনার চোখে তিনি এসব জায়গার ছবি অনেক স্কেচ্ করেছেন। এখন বাস্তবে দেখে বুঝছেন, তিনি যেরকম ছবি এঁকেছেন, জায়গাটা আসলে তত সুন্দর মোটেই নয়। তাঁর আঁকা কেদারের ছবি, যদিও কল্পনায় আঁকা, তবু হুবহু এক এবং অনেক প্রাণবন্ত। যুবকরা বললো, “আপনার মধ্যে এরকম প্রতিভা লুকিয়ে আছে, আর আপনি সেটা নষ্ট করছেন? আপনাকে দেখলে বোঝাই যায় না, আপনি এত গুণের অধিকারী”। তাদের ব্যাঙ্গ গায়ে না মেখে, ভদ্রলোক আর একবার কারণসুধা গলায় ঢেলে শুয়ে পড়লেন। যুবকরাও আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো। রাতের খাবার খেতে যাবার সময় কাল সকালে কোন বাস যাবে খোঁজ নিয়ে এসেছি। গাড়ির নম্বরও নোট করে এনেছি। ড্রাইভারের সাথে আলাপ হয়েছে। সে বলেছে কাল সকালে বাসের সামনের দিকে তিনটে ভাল সিট, সে আমাদের জন্য রেখে দেবে এবং ভোরে আমাদের সে ঘুম থেকে ডেকে তুলেও দিয়ে যাবে। ফলে অত ভোরে ঘুম না ভাঙ্গার কোন ভয় আর নেই। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হবে, ফলে ঘুমবার চেষ্টা করলাম।

আজ ছাব্বিশে আগষ্ট। ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ, দিলীপের ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো। আমাদের কথাবার্তায় পাশের ঘরের ওরাও উঠে পড়েছে। দক্ষিণ ভারতীয় পরিবার বোধহয় অনেক আগেই উঠেছে। বাইরে এলাম চায়ের খোঁজে। কোন দোকান খোলে নি। বাসটাও দেখতে পেলাম না। ড্রাইভারের সাথে দেখা হ’ল। সে বললো, “আপনারা উঠে পড়েছেন? আমি ঠিক ডেকে দিতাম। বাসে গিয়ে জায়গাটা বরং একটু রেখে আসুন”। খোঁজ নিয়ে বাসে গিয়ে দেখলাম বাস একবারে ভর্তি। ব্যাটা ড্রাইভার জায়গা রাখে নি। পিছন দিকে একটা তিনজন বসার সিটে জায়গা রেখে এসে দেখি, একটা চায়ের দোকান খুলেছে। অনেক লোকের ভিড়। তিনজনে চা খেয়ে, মুখ হাত ধুয়ে, বাথরুম সেরে, পোস্ট্ অফিসের মালিককে ভাড়া মিটিয়ে, বাসে ফিরে এসে জায়গায় বসলাম। আমাদের ঠিক সামনের তিনজন বসার সিটে, একজন বৃদ্ধ ও একজন বৃদ্ধা পরম সুখে বসে আছেন। বাসে বেশ ভিড়, ফলে অনেকেই ওখানে বসতে চায়। কেউ ওখানে বসতে চাইলেই, বৃদ্ধ দম্পতি জানাচ্ছেন, এখানে একজনের জায়গা আছে। কার জায়গা আছে বোঝা যাচ্ছে না। বোঝা গেল বাস ছাড়ার পরে, কন্ডাক্টার যখন একজনকে ওখানে বসাতে গেল। জানা গেল যে ওদের পায়ের কাছে, দুই সিটের মাঝে, একজন মহিলা শুয়ে ঘুমচ্ছে। ঘুম ভাঙ্গলে তাকে ওখানে বসানো হবে। বাসের সব লোক হেসে উঠতে, বৃদ্ধ বৃদ্ধা কিরকম বোকা বোকা মুখে বসে রইলেন। সত্যিই এরা অদ্ভুত মানুষ। আমরা একত্রিশ টাকা পঁচানব্বই পয়সা দিয়ে তিনটে শ্রীনগরের টিকিট কাটলাম। এসব জায়গায় যে কী হিসাবে ভাড়া নেওয়া হয়, স্বয়ং আইনস্টাইনও হিসাব করে বলতে পারবেন না। আজ আমরা কতদুর যেতে পারবো জানি না। বাস গুপ্তকাশী, অগোস্তমুনি হয়ে এক সময় আবার সেই রুদ্রপ্রয়াগ এসে পৌঁছলো। আজ যেন মনে হ’ল, রুদ্রপ্রয়াগ নতুন রূপে সেজেছে। সত্যি জায়গাটা কী অপূর্ব সুন্দর। বাসের ভিড় ক্রমশঃ বাড়ছে। তিনজনের বসার সিটে, চারজন করে বসছে। কোনরকমে কষ্ট করে শ্রীনগরে এসে পৌঁছলাম। বাস থেকে চটপট্ নেমে, ছাদে উঠে দিলীপকে সঙ্গে নিয়ে মালপত্র রাস্তায় নামালাম। হৃষিকেশ থেকে যে জামাপ্যান্ট পরে বেরিয়েছি, সেই পোষাক পরেই আজও আছি। ওই পোষাক পরেই প্রয়োজনে রাস্তায় শুয়ে বসে বিশ্রাম নিতেও হয়েছে। বাসের ধুলোয়, পথের ধুলোয়, তার আগের রঙ ঠিক কিরকম ছিল, মনে করতে পারছি না। গায়ের ধুলো ঝেড়ে দৌড়ে গেলাম টিকিট কাউন্টারে। মাধব একপাশে দাঁড়িয়ে মালপত্র পাহারা দিচ্ছে। ওর শরীর বেশ খারাপ, বিশ্রামের প্রয়োজন।

কাউন্টারে এসে গঙ্গোত্রী যাবার বাসের খোঁজ করলাম। পথে শুনেছিলাম গঙ্গোত্রী যাওয়া যাচ্ছে না। এক বৃদ্ধা জানিয়েছিলেন, বন্ডে সই করে, তবে ওখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে। তাঁকে গঙ্গোত্রী যেতে দেওয়া হয় নি। মিলিটারিরা ওখানে যেতে বারণ করেছিল। সব শুনে আমরা ঠিক করেছিলাম, সেরকম অসুবিধা বুঝলে, প্রথমে যমুনোত্রী চলে যাব। তারপর সম্ভব হলে, গঙ্গো্ত্রী, গোমুখ যাওয়ার চেষ্টা করা যাবে। কাউন্টারের ভদ্রলোক জানালেন, গঙ্গোত্রী যাবার যাত্রাবাস পাওয়া যাবে না। ভদ্রলোক একটা বাসের নম্বর দিয়ে বললেন, “এখনই এই বাসটা ছেড়ে দেবে। চটপট্ এই বাসে করে টেহেরি চলে যান। ওখান থেকে বাস পাবেন”। কোথা দিয়ে কিভাবে যেতে হবে, সত্যিই এভাবে যাওয়া যাবে কী না, আমাদের কোন ধারণাই নেই। খোঁজ নেওয়ার সময়ও নেই। একজনের মুখের কথার ওপর ভরসা করে, দৌড়ে গিয়ে, নির্দিষ্ট নাম্বারের বাসের ছাদে উঠে, মালপত্র গুছিয়ে রাখলাম। বাসে ড্রাইভার ইঞ্জিন চালু করে বসেই ছিল। ছাদ থেকে নেমে দেখলাম, মাধব একটা বসার জায়গা ম্যানেজ করে নিয়েছে। দিলীপও ওর পাশে একটা জায়গা পেয়ে গেল। বাসে খুব ভিড়, ফলে সবার পরে আমি বাসে ওঠায়, আমার বসার জায়গা মিললো না। বাসের অধিকাংশ যাত্রীই, স্থানীয় অধিবাসী বলে মনে হ’ল। এদের দু’একজনকে অনুরোধ করলাম, একটু সরে বসে আমায় একটু বসার জায়গা করে দিতে। কিন্তু কেউ কোন আগ্রহ প্রকাশ করলো না। সারাদিন খালিপেটে বাস জার্নির পর, দাঁড়িয়ে যেতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। খুব গরম লাগছে। বুক, পিঠ, মু্‌খ, ঘামে ভিজে গেছে। হাফহাতা সোয়েটারটা খুলে ফেললাম। গায়ের এক ইঞ্চি পুরু ময়লার ওপর ঘাম গড়িয়ে লেগে হাত, মুখ, গলা, কালো হয়ে গেছে। নিজেকে এই মুহুর্তে নিজেরই ঘেন্না করছে। ভিড় ক্রমশঃ বাড়ছে। বাসের সামনের দিকে মাধব আর দিলীপের পাশেই আমি দাঁড়িয়ে আছি। এদিকে কোন সিট খালি হচ্ছে না। খালি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছে, পিছনের দিকের সিটগুলো। কিন্তু ভিড় ঠেলে পেছনে যাবারও কোন উপায় নেই। এইভাবে পঁচিশ কিলোমিটার পথ যাওয়ার পর, পিছনের দিকে এগিয়ে গিয়ে একবারে পিছনের সিটে, একটা বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। এই ভিড়ে এখানে একসাথে প্রায় সবাই বিড়ি খাচ্ছে। গরমে, ধোঁয়ায়, নিশ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হচ্ছে। তবু মনে একটাই আশা, গঙ্গোত্রীও তাহলে যাওয়া হচ্ছে। বন্ডে সই করে যেতে হবে শুনে রাস্তার বিপদ ও বন্ধুরতার কথা ভেবে, দিলীপ একটু মুষড়ে পড়েছিল, এখন ও কী চিন্তা করছে জানতে ইচ্ছা করছে। তিনটে টিকিট আঠারো টাকা পঁচাত্তর পয়সা দিয়ে কাটা হ’ল। জলের মতো পয়সা খরচ হচ্ছে। তবু কপাল ভালো গোবিন্দঘাট, যোশীমঠ, ঘাংরিয়া, বা নন্দনকানন ও হেমকুন্ডের পথে পাঞ্জাবিদের দয়ায়, থাকা খাওয়ার কোন খরচ লাগে নি। অন্যান্য জায়গাতেও দু’তিন টাকার মধ্যে তিনজনের এক বেলার খাওয়া হয়ে গেছে। প্রচন্ড খিদেয় পেট জ্বালা করছে। এর নামই বোধহয় তীর্থ। এই কষ্ট স্বীকার করলেই বোধহয়, ষোল আনা পূণ্য অর্জন করা যায়। সুন্দর রাস্তার ওপর দিয়ে এখন বাস ছুটছে। যতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম ধুলোয় ভরা মেঠো রাস্তা দেখছিলাম। এবার দেখছি প্রকৃতির সাজানো বাগানকে ভেদ করে, কী সুন্দর রাস্তাই না তৈরি করা হয়েছে। রাস্তা আরও চওড়া করার কাজও চলছে। বেশ দুপুর নাগাদ বাস এসে,  “টেহেরি” পৌঁছলো।

আশ্চর্য, খিদেয় সেই পেট জ্বালা করা ভাবটা আর অনুভব করছি না। বাস থেকে মালপত্র নামিয়ে, দৌড়ে নতুন বাসের খোঁজে গেলাম। শুনলাম সন্ধ্যার আগে উত্তরকাশী যাবার কোন বাস নেই। এদিকে মাধব যেন ক্র্রমশঃ কেমন ঝিমিয়ে পড়ছে। এত চিন্তার ওপর মাথার ওপর আর এক চিন্তা, বাড়িতে ওর বাবাকে অসুস্থ দেখে এসেছি, এখন আবার ওকে নিয়ে না এখানে কোন বিপদে পড়তে হয়। একটা জায়গায় মালপত্র জড়ো করে রেখে, কোথায় খাওয়া যায় ভাবছি, এমন সময় খোঁজ পাওয়া গেল, কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বাস যাবে। একবারে খালি একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। ভালভাবে খোঁজখবর নিয়ে বাসের ছাদে গিয়ে চড়লাম। মালপত্র সাজিয়ে রেখে, একটা হোটেলে গেলাম। জায়গাটা বেশ বড়। একসময় এটা একটা স্বাধীন এস্টেট্ ছিল। বড় বড় অনেক হোটেল, দোকানপাট আছে। অনেক দিন পরে মনপ্রাণ ভরে মাংস রুটি খেলাম। জানিনা আবার কবে এ সুযোগ আসবে। দাম মিটিয়ে বাসে এসে বসলাম। একবারে সামনের সিটে আমি ও মাধব। ঠিক তার পেছনের সিটটাতে দিলীপ। নির্দিষ্ট সময়েই বাস ছাড়লো। মাধবের গা বেশ গরম, চোখও বেশ লাল। কথা বলার শক্তিও যেন অনেক কমে গেছে। এখনও পর্যন্ত নিজেরাই ডাক্তারি করেছি। জানালার কাচ টেনে দিয়ে, ওয়াটার বটল্ থেকে একটু জল দিলাম, সঙ্গে সেই নিজেদের বুদ্ধিমতো ওষুধ। তিনজনের বাস ভাড়া চব্বিশ টাকা পঁয়তাল্লিশ পয়সা মিটিয়ে দিলাম। রাস্তাও অনেকটাই। বাস বেশ জোরে ছুটছে। টেহেরি আসার পথে দেখলাম, একটা বাস গভীর খাদে পড়ে আছে। একটা মোটা শক্ত দড়ি দিয়ে বাসটাকে ওপরে একটা মোটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে, যাতে বাসটা আর নীচে গড়িয়ে পড়তে না পারে। শুনলাম কেউ মারা যায় নি। ড্রাইভারও লাফিয়ে প্রাণে বেঁচেছে। আমরাও আমাদের বাসের ড্রাইভারের হাতে নিজেদের প্রাণ সঁপে দিয়ে বসে থাকলাম। একসময় বাস “ধরাসু” এসে পৌঁছলো। এখান থেকে যমুনোত্রী যাবার রাস্তা বেঁকে গেছে। বাস থেকে নেমে, তিনজনে চা খেয়ে বাসে ফিরে এলাম। একটু পরেই বাস ছেড়ে দিয়ে আবার আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চললো। মনে মনে ভাবছি কখন বাস উত্তরকাশী পৌঁছবে। ওখানে পৌঁছে প্রথম কাজ, মাধবকে ডাক্তার দেখানো। আরও বেশ কিছু পথ পার হয়ে, সব চিন্তার অবসান ঘটিয়ে, বাস নিরাপদে উত্তরকাশী এসে পৌঁছলো।

বাসের ছাদ থেকে মাল নামিয়ে, একটা বাচ্ছা ছেলের হাতে মালপত্র দিয়ে, সামনের ট্রাভেলার্স লজে এসে হাজির হলাম। এখানেই একটা ঘর নেওয়া হ’ল। অশ্চর্য, এতবড় বাড়িটাতে আমরাই একমাত্র বোর্ডার। এখানেও সেই আঠারো টাকা ভাড়া। যে ভদ্রলোক ভাড়া নিয়ে রসিদ দিলেন, তাঁকে গঙ্গোত্রী, গোমুখী সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, গত বছরের বন্যায় গঙ্গোত্রীর রাস্তা খুবই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মাঝখানে তের কিলোমিটার রাস্তা, একবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। আগে বাস “লঙ্কা” পর্যন্ত সরাসরি যেত। এখন এখান থেকে বাসে “ভুখি” নামে একটা জায়গা পর্যন্ত যাওয়া যাবে। ভুখি থেকে তের কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হবে “ডাবরানী” নামে একটা স্থানে। ডাবরানী থেকে আবার লঙ্কা পর্যন্ত বাস পাওয়া যাবে। তবে প্যাসেঞ্জার হলে তবেই বাস পাওয়া যাবে, অবশ্য জীপ পাওয়া যায়। এ খবর অনেক আগেই আমাদের বাড়ির কাছে  এক ভদ্রলোকের কাছে শুনে এসেছিলাম। উনি শুধু এই কারণেই গঙ্গোত্রী যেতে পারেন নি। কলকাতার ইউ.পি.টুরিজিম্ কিন্তু এ খবর জানেই না। আসবার আগে তাদের কাছে এই খবরের সত্যতা জিজ্ঞাসা করলে, তারা একটু ব্যাঙ্গ করেই বলেছিল, “কী জানি মশাই, এত বড় একটা খবর আপনারা জানেন, আর আমরাই জানিনা”? যাহোক্, মালপত্র রেখে, একটু মুখ হাত ধুয়ে পরিস্কার হয়ে, ট্রাভেলার্স লজের ভদ্রলোকের কাছে ভাল ডাক্তারের খোঁজ করলাম। ভদ্রলোক জানালেন, একটু এগিয়ে স্টেট্ ব্যাঙ্কের একতলায়, একজন ভাল ডাক্তার বসেন। মাধবকে সঙ্গে করে গেলাম সেই ডাক্তারের খোঁজে। আজ রবিবার, রবিবারে ঐ ডাক্তার বসেন না। স্থানীয় লোকেদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ট্রাভেলার্স লজের পিছন দিকে একটু এগিয়ে ডান দিকের রাস্তায়, ডাঃ শিব কুমার বসেন। তিনি খুব ভাল ডাক্তার। আমরা তাঁর কাছেই গেলাম। বাড়ির বাইরে নেমপ্লেটে দেখলাম, ওনার অনেক ফরেন ডিগ্রী আছে। তাছাড়া উনি কনসালট্যান্ট্। অপর কোন ডাক্তারের মাধ্যমে ওনাকে দেখাতে হয়। দরজায় নক্ করলাম, কেউ সাড়া দিল না। দরজায় আবার নক্ করে, ওনার বাচ্চা ছেলেটার কাছে জানা গেল, উনি এখন বাড়িতে নেই। শেষে ওনার স্ত্রীকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, কখন এলে ওনাকে পাওয়া যাবে। ওনার স্ত্রীর কথা মতো রাত্রে আবার গেলাম। ডাক্তার সাহেব তখন রাতের খাবার খেতে বসেছেন। আমাদের একটু বসতে বললেন।

বিকেলবেলা মাধবকে ঘরে রেখে, আমি আর দিলীপ শহরটা একটু ঘুরে দেখে এসেছিলাম। খুব সুন্দর শহর। পাহাড়ের কোলে সবরকম সুযোগ সুবিধা নিয়ে শহরটা গড়ে উঠেছে। স্থানীয় এক ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হ’ল। ভদ্রলোক শিবপুর বি.গার্ডেনের কাছে দু’এক বৎসর ছিলেন। অদ্ভুত বাংলা বলেন। এখন পর্যন্ত সব জায়গায় দেখলাম, এখানকার মানুষ মোটামুটি বাংলা বোঝে, অল্পবিস্তর বাংলা বলতেও অনেকেই পারে। শুধু তাই নয়, বাঙালিদের এরা বেশ খাতির ও সম্মান করে। যাহোক্‌ ডাক্তার সাহেব খাওয়া সেরে এসে, ডিসপেন্সারীর দরজা খুলে, আমাদের ঘরের ভিতর নিয়ে গেলেন। সাজানো গোছানো খুব সুন্দর দু’টো ঘর। সামনের ঘরে সোফাসেট্ আছে, ওখানে রোগী বা সঙ্গে আসা বাড়ির লোকেরা বসে। ভিতরের ঘরে রোগী দেখা হয়। মাধবকে একটা বেডে শুতে বলে, উনি অনেক রকম ভাবে পরীক্ষা করলেন, প্রেসারও মাপলেন। মাঝবয়সী এই ডাক্তারটিকে রাজপুত্রের মতো দেখতে। কথা বলার কায়দাও খুব। মাধবকে পরীক্ষা করে তিনি বললেন, প্যারাটাইফয়েড্। দিলীপ অনেকক্ষণ থেকেই বলছে রিস্ক্ না নিয়ে ফিরে যেতে। আমি ভাবছিলাম ওকে একটু সুস্থ করে যদি গঙ্গোত্রীটা অন্তত ঘুরে আসা যায়। এত কাছে এসে ফিরে যাব? আমরা পাশেই বসে আছি। প্যারাটাইফয়েড শুনে আমি ও দিলীপ নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়াচায়ি করলাম। আমি খুব আস্তে আস্তে দিলীপকে বললাম, আমাদের ওখানকার ডাক্তারদেরও চট্ করে প্যারাটাইফয়েড বলার একটা স্বভাব আছে। ঘাবড়াবার কিছু নেই। ডাক্তার সাহেব এবার অনেকক্ষণ ধরে মাধবের চোখ ও জিভ পরীক্ষা করে বললেন, যদিও ন্যাচারাল আলো, অর্থাৎ সূর্যালোক ছাড়া সঠিক বলা সম্ভব নয়, তবু মনে হচ্ছে এর জন্ডিস্ হয়েছে। মরেছে, একেই বোধহয় জন্ডিস কেস্ বলে। ভয় হ’ল এরপর ম্যালেরিয়া, নিউমোনিয়া, কলেরা, ইত্যাদি আর পাঁচটা রোগের নাম না একে একে বলে বসেন। শেষে তিনি বললেন, “কাল সকাল পর্যন্ত ওষুধ আমি আমার কাছ থেকেই দিয়ে দিচ্ছি। এখন আর কোথায় ওষুধ কিনতে যাবেন? এগুলো খেলে খিদে হবে, জ্বরও কমে যাবে। কাল সকালে আবার একবার এসে দেখিয়ে নিয়ে যাবেন”। কাল সকালেই আমাদের ভুখি যাবার কথা। সকাল সাতটায় বাস। ওনাকে সব খুলে বললাম। সব শুনে উনি বললেন, আগামী কাল না যাওয়াই ভাল। কাল সকালে উনি যদি দেখে বোঝেন, তবে পরশু যাওয়া যেতে পারে। কত ফীজ্ দেব জিজ্ঞাসা করায়, উনি বললেন, আমি এইভাবে ডিরেক্টলি রোগী দেখি না। আপনারা টুরিষ্ট, যাতে কোন অসুবিধায় না পড়েন, তাই দেখে দিলাম। যদিও রাতে আমার ফীজ্ কিছু বেশি, তবু আপনারা ঐ সকালের চার্জ, অর্থাৎ পনের টাকাই দিন। আমরা তাঁকে কুড়ি টাকা দিতে, উনি দশ টাকা রেখে বললেন, খুচরো নেই, কাল সকালে দিয়ে দেবেন।

বাইরে এসে আমরা একটা হোটেলে খেয়ে নিয়ে, মাধবকে একটা দোকানে দুধ, পাউরুটি খাইয়ে, লজে ফিরে এলাম। মাধব শুয়ে পড়লো, আমি ও দিলীপ অনেক রাত পর্যন্ত জেগে, চিঠি লিখলাম। আগামীকাল সকাল সকাল ওঠার কোন তাড়া নেই। মনে শুধু একটাই চিন্তা, তাহলে কী শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়েও হ’ল না? আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। মাধবের গায়ে হাত দিয়ে মনে হ’ল জ্বর নেই। মনে মনে ঠিক করলাম, ওকে উৎসাহ দিয়ে, সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েও, গঙ্গোত্রী গোমুখ যাবই। দরকার হলে ওকে কান্ডি বা ডান্ডিতে নিয়ে যাওয়া যাবে। ভুখি থেকে ডাবরানী, এই তের কিলোমিটার পথ খচ্চরে করে নিয়ে যাব। রাতে ট্রাভেলার্স লজের ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এখানে মালপত্র রেখে যাবার খরচ কী রকম? ভদ্রলোক বলেছিলেন পার লাগেজ পার ডে, এক টাকা ভাড়া। কত টাকা লাগেজের জন্য খরচ হতে পারে, ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম।

আজ সাতাশে আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো যথারীতি বেশ সকালেই। মাধবের গায়ে জ্বর নেই, শরীরও অনেক সুস্থ। বাইরের ঘেরা জায়গায় এসে চা খেলাম। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সকাল ন’টায় একটা বাস আছে বটে, তবে সেটা “ভাটোয়ারী” নামক একটা জায়গা পর্যন্ত যাবে। ওখান থেকে ভুখি অল্প কয়েক কিলোমিটার পথ। এখান থেকে সকাল সাতটার বাসটাই একমাত্র সোজা ভুখি পর্যন্ত যায়। সাতটার বাসটা ধরার কোন সুযোগ নেই। ন’টার বাসটা ধরতে গেলেও, তৈরি হওয়া দরকার। দিলীপকে পাঠালাম মাধবকে সঙ্গে করে ডাক্তারের কাছে। ওকে বললাম আজ সকাল ন’টার বাসটায় আমরা যেতে চাই জানিয়ে, প্রয়োজন মতো ওষুধপত্র নিয়ে আসতে। আমি একটা হোল্ড্ অল্-এ সব জিনিসপত্র সমেত অন্য হোল্ড্-অল্ দু’টো ঢুকিয়ে বাঁধতে বসলাম। তাহলে তিনটের জায়গায় একটা লাগেজ হয়ে যাবে। সুটকেস তিনটেকে তো আর কিছু করার উপায় নেই। সব খুলে আস্তে আস্তে ভাঁজ করে একটা হোল্ড্ অল্-এ মালপত্র গুছিয়ে দেখলাম, তিনটে হোল্ড্-অলকে দু’টো করা যেতে পারে। একটার মধ্যে সব কিছু ঢোকানো সম্ভব নয়। সেইভাবেই বেঁধে নিয়ে, কাঁধের ঝোলা ব্যাগগুলো গোছালাম। মাধবের ব্যাগটা যতটা সম্ভব হাল্কা করলাম। সঙ্গে নেওয়ার মধ্যে, তিনটে ওয়াটার প্রুফ, কিলোখানেক চিড়ে, এক প্যাকেট আমসত্ব, এক প্যাকেট খেজুর, কিছু লজেন্স্ ও চিকলেটস্, তিনটে গামছা, ও সেই রামের বোতলটা। আসবার সময় তিনটে প্যাকেটে এক কিলোগ্রাম করে, তিন কিলোগ্রাম শুকনো চিড়ে নিয়ে এসেছিলাম। এখনও একটুও খরচ হয় নি। সুটকেসে বাকি দু’টো প্যাকেট রেখে দিলাম। সব কাজ শেষ হলে, ভালভাবে সাবান মেখে স্নান সারলাম। এই লজটায় অনেকগুলো বাথরুম পায়খানা থাকলেও, জলের বেশ অভাব। বিকেলবেলা বড় বড় ড্রামে জল ধরে রাখা হয়। দু’টো ড্রাম আছে, বোর্ডারের সংখ্যা বেশি হলে অসুবিধা হবেই। সকালে অবশ্য জল যথেষ্টই পাওয়া যায়। স্নান সেরে সেই পুরাতন জামা প্যান্ট পরেই ট্রাভেলার্স লজের অফিস ঘরে গেলাম। এখানে ভালোভাবে যাত্রাপথের খোঁজ খবর নিলাম। এখানেই জানতে পারলাম, গত বৎসরের ভয়াবহ বন্যার পর, এদিকের যাত্রাবাস ব্যবস্থা প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। আরও জানা গেল যে, ডাবরানীতে বুদ্ধি সিং নামক এক ব্যক্তির কাছে ভালো থাকবার জায়গা পাওয়া যাবে।

দিলীপ ও মাধব ডাক্তার দেখিয়ে ফিরে এল। ডাক্তার শিব কুমার ওদের জানিয়েছেন, অন্য কেউ হলে আজ এই বিপজ্জনক, ভাঙ্গা, অনিশ্চিত রাস্তায় যেতে তিনি বারণ করতেন। কিন্তু যেহেতু আমরা টুরিষ্ট, এবং ঝুঁকি নিয়েও গঙ্গোত্রী ও গোমুখ দেখবার জন্য এতটা পথ এসেছি, তাই তিনি ওখানে যাবার অনুমতি দিচ্ছেন। তবে সময় মতো ওষুধগুলো যেন অবশ্যই খাওয়ানো হয়। বেশ কিছু ট্যাবলেট, ক্যাপশুল ইত্যাদি তাঁর প্রেসক্রিপশন মতো ওরা কিনেও এনেছে। তবে সুখের কথা, ডাক্তার জানিয়েছেন যে, মাধবের জন্ডিস্ হয় নি। দিলীপ জানালো আজ তিনি কোন ফীজ্ নেন নি। গতকালের বাকি পাঁচ টাকা কেবল তাঁকে দেওয়া হয়েছে। দিলীপ স্নান সেরে নিল। মাধবকে খুব বেশি স্নান করতে বারণ করলাম। সাবধান হওয়া ভালো।

ক্লোকরুমে তিনটে সুটকেস ও দু’টো হোল্ড্-অল্ রেখে, তিনজনে তিনটে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ ও তিনটে ওয়াটার বটল্ নিয়ে, লাঠি হাতে রাস্তায় এলাম। হোটেলে খাওয়া দাওয়া সেরে, টিকিট কাউন্টারে গেলাম টিকিট কাটতে। ভাটোয়ারী পর্যন্ত তিনটে টিকিটের দাম নিল ন’টাকা ত্রিশ পয়সা। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার মতো রাস্তা। একটু পরে বাস ছেড়ে দিল। আমাদের পাশে এক বাঙালি ভদ্রলোক বসেছিলেন। তাঁর কাছে শুনলাম, একটু এগিয়ে এক বিরাট বাঁধের কাজ চলছে। গত বৎসর বাঁধের কাজ চলাকালীন বন্যায় গঙ্গার জল ঢুকে, সমস্ত নষ্ট হয়ে যায়। তিনি ওখানে কনট্র্যাকটারী করেন। যাহোক্, এক সময় বাস এসে ভাটোয়ারী পৌঁছলো। বাসের দু’একজন মাত্র যাত্রী ভুখি যেতে চায়। আমরা তিনজন নিজেদের গরজে বাস থেকে নেমে, বাসের অফিসে গিয়ে, ভুখি পর্যন্ত বাস নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করলাম। প্রথমে ওরা এই প্রস্তাবে কানই দিল না। পরে আরও কিছু প্যাসেঞ্জারের অনুরোধে, ওরা জানালো কুড়ি-পঁচিশজন যাত্রী হলে, বাস ভুখি নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। ব্যাস, আর সময় নষ্ট না করে, লেগে পড়লাম প্যাসেঞ্জারের সন্ধানে। ভুখিগামী যে কোন লোককে দেখলেই আমরা তাকে ডেকে এনে, বাস এক্ষুণি ছাড়বে জানিয়ে বাসে বসতে বলছি। এইভাবে অনেক কষ্টে গোটা পনের লোক যোগাড় করা গেল। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর, ভুখি যাবার জনা কুড়ি-পঁচিশজন যাত্রী যোগাড় হ’ল। কিন্তু বাস ছাড়ার কোন লক্ষণ কিন্তু দেখা গেল না। ফলে দু’চারজন আগ্রহী যাত্রী আবার বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলো। যাহোক্, কর্তৃপক্ষের অশেষ কৃপা, শেষ পর্যন্ত এই রাস্তাটার জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে এক টাকা করে ভাড়া নিয়ে, বাস ছাড়লো। অল্পই রাস্তা, কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস এসে ভুখি পৌঁছলো।

আকাশটা আজ আবার বেশ মেঘে ঢেকে আছে, তবে এক্ষুণি বৃষ্টি নামার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। এক যুবক আমাদের সাথে এই বাসেই এসেছে। সে নিজেই আমাদের সাথে আলাপ করলো। লক্ষ্ণৌতে বাড়ি, যাবে গরমকুন্ডে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম গরমকুন্ডটা কোথায়? সে জানালো, “গাংগানী” নামক জায়গাটার গঙ্গার অপর পারটার নাম গরমকুন্ড। যুবকটি খুব সুন্দর কথাবার্তা বলে, দেখতেও বেশ সুন্দর। হাতে একটা ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে, আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে, একসাথে হেঁটে চলেছে। আমরা কিছু কলা ও আপেল নিয়ে এসেছিলাম রাস্তায় প্রয়োজন হতে পারে ভেবে। খিদেও বেশ ভালই পেয়েছে। ভাবলাম কোথাও বসে সেগুলো খাওয়া যাবে। যুবকটি জানালো যে সে গরমকুন্ডে ওয়্যারলেসে কাজ করে। হাওড়া শিবপুরে রেমিংটন ব্যান্ডে, তার বাবা কাজ করতেন। ফলে সে নিজেও হাওড়া কলকাতা ঘুরে এসেছে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, সে মিলিটারিতে কাজ করে কী না। সে জানালো, যে ওটা মিলিটারির আন্ডারে পড়ে না। ওদের কাজ গঙ্গার জল হ্রাসবৃদ্ধির খবর, ওয়্যারলেসে উত্তরকাশীকে জানানো, ও ঐ এলাকার ওপর লক্ষ্য রাখা। তাছাড়া রাস্তা মেরামতির জন্য পাহাড় ব্লাষ্টিং করলেও উত্তরকাশীকে খবর পাঠানো, যাতে ঐ সময়ে কোন যাত্রীকে আসতে দেওয়া না হয়। আরও হয়তো কিছু কাজকর্ম আছে, বিশদভাবে জানতে চাইলাম না। যুবকটি সামনে একটা দোকানে আমাদের নিয়ে চা খেতে ঢুকলো। খুব হাল্কা এক পশলা বৃষ্টি শুরু হ’ল, সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া। চা খাওয়া হলে দাম দিতে গেলে, যুবকটি বাধা দিয়ে বললো “তাই কখনও হয়? আমাদের জায়গায় এসে আপনারা দাম দেবেন কী? আপনাদের ওখানে গেলে, তখন আপনারা দাম দেবেন”। বললাম, এটাও তো আপনার এলাকা নয়, লক্ষ্ণৌ গেলে আপনি দাম দেবেন। যুবকটি বললো, ওখানে গেলে আমার খরচায় সমস্ত লক্ষ্ণৌ শহর ঘুরে দেখাবো। বললাম, “আপনাদের লক্ষ্ণৌ শহর আমার দেখা, খুব ভালো জায়গা”। বৃষ্টি আর পড়ছে না, আমরা উঠে পড়ে দোকান থেকে রাস্তায় নামলাম।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s