রূপকুন্ডের হাতছানি–অষ্টম পর্ব {লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary , Tour Picture এবং ভালো ছবি ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

SRINAGAR (3)গঙ্গা, হরিশ ও  কুমার অনেক পিছিয়ে  পড়েছে। এখন  অবশ্য পথ না চেনার কোন ভয় নেই। রাস্তা খাড়া  ওপর দিকে উঠেছে।  তবে  পাথরের মধ্যে  দিয়ে এঁকেবেঁকে ওঠা  পথটাকে চিনে নিতে  কোন কষ্ট  হয়না। প্রথমে শীতাংশু, ওর ঠিক পিছনে আমি। এক  সময়, একটু  বসে আমরা  ঠিক করলাম, এবার একবারে কৈলুবিনায়কের  সেই গণেশ মুর্তির কাছে  গিয়ে, তবে বিশ্রাম নেব। বইতে  পড়া গণেশের  কথা নিয়ে আলোচনা,  ঠাট্টা, তামাশা করলাম। এই কৈলুবিনায়ক  থেকেই  কোয়েলগঙ্গা নদীর জন্ম। এখানে একটা পাথরের গণেশ মুর্তি আছে। এই মুর্তিটিকে  নিয়ে বেদীর চারপাশে  ঘুরতে  না পারলে, রূপকুন্ড  যাওয়া নাকি  সার্থক হয়  না। বাংলার একজন  বিখ্যাত, সর্বজন বিদিত, সর্বজন প্রিয় পর্বতারোহী, ও সুলেখকের রূপকুন্ড ভ্রমণ কাহিনীতে পড়েছিলাম, ওনার সঙ্গীসাথীরা ঐখানে আনন্দে গণেশ মুর্তি  নিয়ে  লোফালুফি খেলেছিলেন। গণেশে আমার বিশ্বাস বা আস্থা, কোনটাই নেই। শীতাংশুর  আছে  কিনা  জানি  না।  তবে কৌতুহল, গণেশমুর্তি তুলে  ঘোরাতে না  পারলে যখন রূপকুন্ড যাওয়াই সার্থক হয় না,  পৌঁছনো  যায়না,  তখন  মুর্তি না তুলতে পারার  সম্ভাবনাও, একবারে  উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ঐ সব  শ্রদ্ধেয় অভিযাত্রীরা পাহাড়ী পথে  যথেষ্ট অভিজ্ঞ সন্দেহ  নেই,  কিন্তু তাঁরা সকলেই  নিশ্চয় ব্যায়ামবীর  নন।  কাজেই তাঁরা যাকে নিয়ে  “ খেলার  ছলে  ষষ্ঠীচরণ  হাতী  লোফেন যখন তখন ”  এর মতো লোফালুফি খেলতে  পারেন,  আমরা,  ঊনত্রিশ- ত্রিশ  বছরের যুবকেরা,  তাকে  তুলতে পারবো না?  ক্ষমতা পরীক্ষার লোভেই বোধহয়  হাঁটার গতি  বেড়ে গেল।

WAY TO KAILU BINAYAK  কৈলুবিনায়ক যাবার পথে।

ঝিড় ঝিড়  করে  বৃষ্টি শুরু হ’ল। আরও অনেকটা পথ এঁকেবেঁকে উপরে উঠে, শেষে শ্রীমান গণেশের সাক্ষাৎ মিললো। একটা বেদীর ওপরে প্রায় ফুট দু’এক উচু একটা কালো পাথরের তৈরী গণেশ মুর্তি হেলান দিয়ে দাঁড় করানো আছে। মুর্তিটির ফিনিশিং সত্যিই প্রশংসা করার মতো। মসৃন এবং নিখুঁত মুর্তিটার মাথার উপর অর্ধ বৃত্তাকার একটা পাথর রাখা আছে। দেখে মনে হ’ল কোন কালে ওটা চাকার মতো বৃত্তাকার  ছিল,  এবং মুর্তির মাথার পিছনে  শোভা পেত। মুর্তিটা ভালই চওড়া, কিন্তু পাথরটা খুব বেশী মোটা নয়। শীতাংশু প্রথমে গতকালের হাতের অবস্থার কথা ভুলে, মুর্তিটাকে তুলবার চেষ্টা করলো। কিন্তু ও হয় মুর্তিটার ডানদিকটা একটু উচু করতে পারে, বাঁদিকটা বেদীর ওপরেই থেকে যায়, না হয় বাঁদিকটা একটু উচু করতে পারলেও, ডানদিকটা বেদীর ওপর থেকে তুলতে পারে না। মোটকথা শত চেষ্টাতেও মুর্তিটাকে নিয়ে পাক খাওয়া দুরে থাক, বেদী থেকে তুলতেই পারলো না। আমি ওকে আর চেষ্টা করতে বারণ করলাম। কারণ গণেশ অসন্তুষ্ট হলে, যায় আসে না, কিন্তু ওর ফিকব্যথা লাগলে, আমাদের উভয়েরই যথেষ্ট যায় আসবে। ও সরে এলে আমি নিজে একবার শক্তি পরীক্ষায় নামলাম। আমাকেও সেই একই অবস্থা থেকে রণে ভঙ্গ দিতে হ’ল। সুতরাং দু’জনেই বিফল মনরথে চুপ করে বসে রইলাম। গণেশ মুর্তির সামনে একটা ব্রহ্মকমল, বোধহয় আগের যাত্রীরা পূজো দিয়ে গেছে। শীতাংশু আগে এই ফুল দেখে নি। ওকে তাই ফুলটা দেখিয়ে, ফুলটার পরিচয় দিলাম। ফুলটার গন্ধ কিন্তু খুব একটা তীব্র নয়। হেমকুন্ড সাহেবে দেখেছি এই ফুলের গন্ধ অতি তীব্র। ফুল দুরে থাক, এর ছোট্ট মুলো গাছের মতো গাছে বা পাতায় হাত দিলেও, হাতে অনেকক্ষণ একটা তীব্র শেয়াল কাঁটা ফুলের মতো গন্ধ থেকে যায়। কাছাকাছি কোথাও ব্রহ্মকমল ফুলের গাছ কিন্তু দেখা গেল না। অথচ বই-এ পড়েছি, এখানে প্রচুর ব্রহ্মকমল, হেমকমল, ও ফেনকমল ফুল হয়। ব্রহ্মকমল আগে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু হেমকমল ও ফেনকমল এর সাথে পরিচয় পর্বটা এবারেই সারবার কথা।

DSCN5507  “গনেশ মুর্তিটা অনেকটা এরকমই দেখতে ছিল”।

একে একে গঙ্গা, কুমার ও হরিশ এসে হাজির হ’ল। গঙ্গাকে আমাদের গণেশ মুর্তিটা তোলার ঘটনাটা বললাম। গঙ্গার এসব কুসংস্কারে, খুব একটা বিশ্বাস বা আস্থা আছে বলে মনে হ’ল না। তবু আমাদের খুশী করতে সে হরিশকে, গণেশ মুর্তিটা তুলে একবার পাক খেতে বললো। হরিশ মাল বওয়ার ব্যাপারে কুমারের থেকে অনেক পোক্ত। আমাদের ঐ বিশাল মালপত্রের বেশীর ভাগটাই সে, দেবল থেকে পাহাড়ী রাস্তায়, ভয়ঙ্কর চড়াই উতরাই ভেঙ্গে বয়ে এনেছে। হরিশ বার কতক আমাদের মতো চেষ্টা করেও, গণেশ মুর্তি তুলতে সক্ষম হ’ল না। শেষে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে কোনমতে ওটাকে তুলে, নিজেকে নিজে একপাক ঘুরে, দড়াম করে মুর্তিটাকে বেদীর ওপর নামিয়ে রাখলো। এখন বুঝতে পারছি, এই কুসংস্কারের জন্যই গণেশ মুর্তিটার নীচের দিকের অনেক জায়গায় চটা উঠে গেছে, একটু আধটু ভেঙ্গেও গেছে। মাথার পিছনের পূর্ণ বৃত্তাকার পাথরটাও, এই ভাবেই দু’টুকরো হয়ে থাকতে পারে। সকলে জোর করে কোনমতে এটাকে তুলে আর রাখতে না পেরে, তাড়াতাড়ি কোনমতে বেদীতে নামিয়ে রাখতে গিয়ে, আঘাত লাগিয়ে নীচের অংশটায় চটা উঠিয়ে, ভেঙ্গে ফেলে, নষ্ট করে। অবশ্য মেসার্স পুস্তক লেখক অ্যান্ড পার্টির কথা আলাদা। হরিশের অবস্থা দেখে, আর ঐ বিখ্যাত পর্বতারোহীর চ্যালাদের বীরত্বের কাহিনী পড়ে, সুকুমার রায়ের “পালোয়ান” কবিতার প্রথম লাইনটা আবার একবার মনে হ’ল।

বৃষ্টি এখনও পড়ছে, সঙ্গে আবার রোদও উঠেছে। গঙ্গা এবার আমাদের এগিয়ে যেতে বললো। মালপত্র তুলে বগুয়াবাসার গুহার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। গঙ্গা জানালো, আর খুব বেশীক্ষণের পথ নয়, রাস্তাও সোজা, বিশেষ চড়াই উতরাই নেই। রাস্তার বাঁপাশে একটু ঢালু নীচু জমি। সেখানে অনেক পাথর পড়ে আছে। রাস্তার দু’পাশে, বিশেষ করে বাঁপাশে অজস্র ব্রহ্মকমল ফুটে আছে। অর্থাৎ এখান থেকেই ফুল তুলে গণেশকে দেওয়া হয়েছিল। এখানকার ব্রহ্মকমল গাছের একটা বৈশিষ্ট্য আছে। পাতাগুলো দেবদারু পাতার মতো পাশগুলো একটু কোঁচকানো, আর একটা গাছে একসাথে অনেকগুলো ফুল ফুটে আছে। অবশ্য গাছগুলো অনেকটা জায়গা নিয়ে ঝোপের মতো হয়ে আছে। কাজেই একটা গাছে একটার বেশী ফুল, নাও হতে পারে। কোন কোন ফুলের রঙ আবার একটু লালচে। গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কোনটা ব্রহ্মকমল, কোনটা ফেনকমল, আর কোনটাই বা হেমকমল? ওর বলার ভঙ্গি দেখে বুঝলাম, ও নিজেও জানে না, বা এইসব ফুল নিয়ে ও কোনদিন মাথাও ঘামায় নি। আর সামান্য পথ হেঁটে এসে, আমরা সেই বগুয়াবাসার গুহার সামনে উপস্থিত হলাম। আগেই জেনেছি এটা শ্রী প্রনবানন্দ স্বামীজীর তৈরী। এটা আছে বলেই রূপকুন্ড দেখা সম্ভব। অন্তত আমাদের মতো অতি সাধারণ হতভাগ্য টেন্টহীনদের পক্ষে। এটাকে কিন্তু গুহা বললে ভুল হবে। একটা বড় পাথর একটু ঝুঁকে আছে। তার পাশগুলো পাথর সাজিয়ে একটা গুহা, বা ঘর মতো তৈরী করা হয়েছে। ওপরেও ফাঁক ফাঁক পাথর সাজানো। বৃষ্টি দুরে থাক্, বড় মাপের কুকুরও অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে। গুহার ভিতরে একরাশ পাতা ফেলা। আগের যাত্রীদের কাজ। এখানে যারা যখন আসে, তারা তাদের নিজেদের সুবিধা ও পছন্দ মতো ব্যবস্থা করে নেয়। আমাদের কপাল ভাল যে, পাতা ফেলে সম্ভবত বিছানা করার পর, সেরকম বৃষ্টি হয় নি। তা নাহলে পাতা পচে গোবর হয়ে থাকতো। হামাগুড়ি দিয়ে ঘরটায় ঢুকতে হবে। ঘরের ভিতরেও দাঁড়ানো যাবে না। বসে বা শুয়ে থাকতে হবে। ঘরটা একে একবারে ছোট, তা আবার একদিকে পাথরের একটা ঢাল থাকায়, আরও ছোট হয়ে গেছে। আমাদের পাঁচ জনের, তার মধ্যে আবার দু’জনের স্লীপিংব্যাগ থাকায়, রাতে থাকতে বেশ কষ্ট হবে।

 

বোধহয় রাতে না শুয়ে, বসেই কাটাতে হবে। তবে এটা যে পেয়েছি, তাতে আমরা ধন্য। এখানে ১৪৫০০ ফুট উচ্চতায় এই গুহা তো কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলকে হার মানায়। প্রণাম স্বামী প্রনবানন্দজী, আপনাকে শতকোটি প্রণাম। গুহাটার একটু নীচে বাঁদিকে পাথর সাজিয়ে, আর একটা ছোট ঘর তৈরী করা হয়েছে। এটা বোধহয় রান্নাঘর হিসাবেই ব্যবহৃত হয়। দু’দিকে দুটো দরজা। আমি আর শীতাংশু সময় নষ্ট না করে, বড় পলিথিন সিট্ পেতে বেডরুমের ছাদ মেরামত করতে শুরু করলাম। মোটামুটি যাহোক্ একটা থাকার মতো ব্যবস্থা হ’ল।

আসবার আগে কিটব্যাগে রাম ও ব্র্যান্ডির বোতল ছিল। হাঁটার তালে তালে ওগুলোর ছলাৎ ছলাৎ তরল আওয়াজ, গঙ্গা অবশ্যই শুনেছে। কিন্তু ব্যাগে তালা লাগানো থাকায়, ও ব্যাগ খুলে দেখার সুযোগ পায় নি। ওরা কিন্তু বুঝতে পেরেছে ব্যাগের মধ্যে কী থাকতে পারে। আমার খুব সামান্য পাহাড়ী অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এদের টাকা পয়সা বা ভাল খাবার দাবারের থেকে, দারু ও দাওয়াই এর প্রতি লোভ বা আকর্ষণ অনেক বেশী হয়। হরিশ বারকতক আমাকে জিজ্ঞাসাও করেছে, ব্যাগের ভিতর থেকে জলের আওয়াজ হচ্ছে কেন? আমি চটজলদি জবাব দিয়েছি— খাশীর ওষুধ আছে। কিন্তু এ প্রসঙ্গ আর এগতে না দেওয়ায়, ও বারবার চুপ করে  গেছে। আমার ভয় হচ্ছিল, ওরা না আবার খাশী হয়েছে বলে কাশির ওষুধ চেয়ে বসে। কিন্তু এতটা পথে, সেসব ঝামেলা হয় নি।

এখানে বেশ ঠান্ডা। ঠান্ডা হওয়াই স্বাভাবিক। হরিশ ও কুমার গেল জল আনতে। আমরা চারিদিক ঘুরে দেখলাম, ছবি তুললাম, বাদাম খেলাম। গঙ্গা রান্নাঘরে কাঠ সাজিয়ে, রাতের রান্নার ব্যবস্থা করতে শুরু করলো। এখনও যথেষ্ট আলো আছে। এখন সবে বিকেল, কিন্তু ওর ব্যস্ততা দেখে রাতে ঠান্ডার প্রকোপ সম্বন্ধে একটা ধারণা করতে পারছি। ভয় হ’ল বৃষ্টি না আসে, ভালোয় ভালোয় রাতটা কাটলে হয়। আমাদের মালপত্র সব রান্নাঘরেই রাখা হয়েছে। বেডরুমের মাটিতে একটা বড় পলিথিন সিট পেতে, কাঁধের ঝোলা ব্যাগ ও মালপত্র ওখানে গুছিয়ে রেখে এলাম।

DSCN0991

সঙ্গে নিয়ে আসা  সব মোমবাতি নষ্ট হয়ে গেছে। গঙ্গা বললো কাঠ জ্বালালে মোমবাতির প্রয়োজন হবে না। রান্নাঘরে একটা সামান্য  ব্যবহৃত সরু মোমবাতি আবিস্কার করা হ’ল। বোধহয় আগের কোন যাত্রী ভুল করে ফেলে গেছে,  বা পরের যাত্রীদের প্রয়োজনে  রেখে গেছে। আমরা সোনার খোঁজ পেয়ে হৈচৈ করে উঠলাম। গঙ্গা বললো ভগবানের দান। তথাস্তু, ভগবান হোক, আর মানুষই  হোক, ইচ্ছা করে হোক বা অনিচ্ছায়,  ভুলে হোক, আমাদের কাছে এটা যে দান, এটা যে ত্রাণ, এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।  আমরা এই দান, মাথাপেতে গ্রহণ করে ধন্য হলাম। অনেকক্ষণ পরে কুমার ও হরিশ এক ডেকচি জল নিয়ে আসলো। গঙ্গা বলেছিল এখানে জলের কোন অভাব নেই, অথচ হরিশ ও কুমার জানালো, এখানে কাছে পিঠে কোথাও জল নেই। গঙ্গা বললো কাছে পিঠে  কোথাও জল না থাকলেও,  বরফের অভাব হয় না। এবার এখানে সেরকম বরফ জমেনি বা জমে থাকলেও, এখন নেই। এরা এক  একবার এক একরকম কথা বলে। আমরা এ বিষয়ে কোন কথা বললাম না। ঐ এক ডেকচি জলে হাত ধোয়া,  খিচুড়ি রান্না ও জল  খাওয়ার কাজ সারতে হবে। কাল সকালের কফি তৈরীর জলও রাখতে হবে। আমার আবার রাতে শোবার আগে অনেকটা জল খেতে হয়। বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত গঙ্গাকে বলতে বাধ্য হলাম “একে আমি জল একটু বেশী খাই, তার ওপর খিচুড়ি খেলে, জলের আরও বেশী প্রয়োজন হবে। তাই আমার জন্য একটু জল রেখ”। গঙ্গা কোন কথা না বলে আলু কেটে, ডেকচিতে ধরবে, এরকম মাপের চাল বসিয়ে দিল। ডেকচিটা আমাদের পাঁচজনের পক্ষে সত্যিই খুব ছোট। তবে আমি প্রায় না খেয়েই থাকি। শীতাংশুর খাওয়ার পরিমানও প্রায় একই রকম। ফলে, যাহোক্ করে কুলিয়ে যায়। গঙ্গাকে বললাম পাঁচজন অতটুকু গুহাতে শোয়া যাবে না, তার চেয়ে আজকের রাতটা গান গেয়ে, গল্প করে কাটানো যাক। গঙ্গা, হরিশ ও কুমার এক কথায় রাজী হয়ে গেল। অন্ধকার নেমে এসেছে। মনে হচ্ছে এই বিরাট পৃথিবীতে আমরাই বোধহয় পাঁচজন প্রাণী। ডেকচিতে খিচুড়ি ফুটছে। আমরা গঙ্গাকে ঘিরে বসে আছি।

গান শুরু করলাম। গান গেয়ে এত বড় রাত কাটানোর মধ্যে একটা বিরাট অসুবিধা দেখা দিল। রবীন্দ্র নাথ, হাজার কবিতা ও গান লিখে, মন মাতানো সুর দিয়ে, পৃথিবীর সেরা সম্মান “নোবেল” আনতে পারেন, নজরুল, তাঁর গানের কথায় ও সুরে শহুরে বাবুদের পাগল করতে পারেন, স্বাধীনতা সংগ্রামী যুবকের রক্তে বিদ্রোহের ঝড় তুলতে পারেন, কিন্তু এঁরা এই নিস্তব্ধ পাহাড়পুরীতে মাত্র তিনজন লোককে খুশী করতে, আনন্দ দিতে, তাঁদের গান শুনে রাত জাগাতে অপারগ। অপরদিকে এই পাহাড়ী তিন যুবকের গান, আমাদের কিছুটা সময় হয়তো চুরি করতে পারে, কিন্তু সারা রাত জাগিয়ে রাখতে অক্ষম। ফলে এই মুহুর্তে প্রয়োজন এমন কিছু গানের, যা ওরা এবং আমরা, উভয়পক্ষই জানি বা শুনি। ফলে শুরু হ’ল “জয় জগদীশ হরে”, “গোবিন্দ বল হরি” গোছের কিছু ভক্তিমুলক গান, আর অতি প্রচারিত, সারা দেশে প্রচলিত, কিছু হিন্দী ফিলমি গান। কিন্তু তার স্টক্ আর আমাদের কতো? ফলে একই গান একাধিকবার গোটা, অর্ধেক, সিকি, যতটা জানি, গেয়েও একসময় থেমে গেল। রাত এখনও অনেক বাকী। শীতাংশু জানালো এখন রাত আটটাও বাজে নি। খিচুড়ি রান্না শেষ। খাওয়া দাওয়া সেরে, ভাগের অতি সামান্য পাওনা জলটুকু খেয়ে, আরাম করে বসলাম। গঙ্গা বাঁচিয়ে রাখা জলটা দিয়ে কফি তৈরী করতে বসলো। ওকে কিছু বলতে হয় না, ও আমাদের প্রয়োজন, আমাদের থেকেও বেশী বোঝে, তাই আর একবার হাত মিলিয়ে নিলাম। এক সময় সে পর্বও শেষ হ’ল। আর যে সময় কাটে না।

গতকাল রাতে আমার ভাল ঘুম হয় নি, তার ওপর আজকের সারা দিনের পরিশ্রম, ফলে শরীরটাকে একটু কাত করতে ইচ্ছা করছে। ঘুমও পাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে গান গেয়ে রাত জাগার পরিকল্পনা ত্যাগ করে, আমরা মালপত্র নিয়ে বেডরুমে ঢুকে, পলিথিন সিট দিয়ে দরজার মুখটা ঢেকে দিলাম। সবাই গুছিয়ে বসার পর সঙ্গে আনা অফিসের আর্মড গার্ড, কল্যানদার দেওয়া মিলিটারি “খাশীর ওষুধ” এর বড় বোতলটা বার করে গঙ্গার হাতে দিয়ে দিলাম। আমাদের সঙ্গে স্লিপীংব্যাগ আছে, ওদের সেরকম গরম জামাও নেই, ঠান্ডাও ক্রমশঃ জাঁকিয়ে পড়ছে। ওরা খুব খুশী হ’ল। ওরা ভাবতেই পারছে না যে বাবুরা না চাইতেই, নিজেরা এক ফোঁটা না খেয়ে, গোটা একটা বড় রামের বোতল দিয়ে দিতে পারে। গঙ্গাই বেশী পরিমান খেয়ে ফেললো, হরিশও কিছু খেল। কুমার খায় না, তাই সামান্যই গলায় ঢাললো। গঙ্গা এবার আমাদের শুয়ে পড়তে বললো। সে তার কম্বলটা পেতে আমাদের শুতে বললো। আমরা জানালাম যে আমাদের স্লীপিংব্যাগ আছে, কাজেই ওর একমাত্র কম্বলটা নেওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। সে আবার আমাদের শুয়ে পড়তে বললো। শুতে পারলে তো ভালই হ’ত, কিন্তু শোব কী করে? শুতে গেলে ওদের গায়ের ওপর পা দিয়ে শুতে হবে। গঙ্গা বোধহয় সেটা বুঝতে পেরেই বললো, আমাদের গায়ের ওপর পা তুলে দিন, আমাদের কোন অসুবিধা হবে না। আমরা কিন্তু এ প্রস্তাবে রাজী হ’লাম না। ফলে আবার সংগীত চর্চা শুরু হ’ল। আমি চুপ করে কাত হয়ে হাঁটু থেকে পা মুড়ে, আধ শোয়া হয়ে ছিলাম। গঙ্গা বললো, বাবু আপনার ঘুম পেয়েছে, শুয়ে পড়ুন। তা নাহলে শরীর খারাপ হবে। আমি আর কথা না বাড়িয়ে, স্লীপিংব্যাগটা গায়ে চাপা দিলাম। শীতাংশু একটা শাল গায়ে দিয়ে পাথরে হেলান দিয়ে বসে আছে। তরল পদার্থ বোধহয় এতক্ষণে গঙ্গার শরীরে কাজ করতে শুরু করেছে। হঠাৎ গঙ্গা বললো, “হরিশ, ওরা বাবু, আমরা নোকর। আমাদের কাজ মনিবের সেবা করা”। বলেই আমার হান্টার সু সমেত পা দু’টো ওর পেটের ওপর তুলে দিল। আমি তাড়াতাড়ি উঠে বসে, জুতো খুলে, স্লীপিংব্যাগে ভাল করে ঢুকে, স্লীপিংব্যাগের চেন টেনে শুয়ে পড়লাম। একসময় আমাদের কথা বলাও বন্ধ হ’ল। শীতাংশু বললো তার খুব ঠান্ডা লাগছে। আমি তাকে স্লীপিংব্যাগে ঢুকতে বললে, সে এতক্ষণে জানালো যে, সে ওটা রান্নাঘরে ফেলে এসেছে। সে ওটা নিয়ে আসার কথা বললে, আমি তাকে বারণ করলাম। কারণ এখন বদ্ধ গুহার থেকে বাইরে বেরলে, অবধারিত ঠান্ডা লাগবে। গঙ্গা, হরিশ ও কুমার ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই ওদের আর ডাকা হ’ল না। ঐটুকু জায়গাতে ওদের ডিঙ্গিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে, বাইরে যাওয়াও খুব অসুবিধাজনক। ফলে শীতাংশু ভালভাবে শাল গায়ে দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় রইলো। আমারও যে ঘুম হ’ল তা নয়। তবে কখনও কিছুটা তন্দ্রা, কখনও জেগে উসখুস করে রাত কাটতে লাগলো। আমার  অনেকক্ষণ খাওয়া হয়ে গেছে, এবার পিসুরা খাওয়া শুরু করলো।

আজ একুশে আগষ্ট, বহু আকাঙ্খিত সেই দিন। খুব ভোরে গঙ্গা আমাদের ডেকে দিল। কথা ছিল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটার মধ্যে আমি, শীতাংশু, গঙ্গা ও কুমার বেরিয়ে পড়বো। হরিশ বগুয়াবাসায় থাকবে, এবং কফি ও খাবারের ব্যবস্থা করবে। পাঁচটা বেজে গেছে। ঘুম ভাঙ্গতে দেখি পায়ের কাছে ওদের গায়ের ওপর পা তুলে নিশ্চিন্তে শুয়েছিলাম। উঠে পড়ে তৈরী হয়ে নিলাম। বাইরে কেমন ঠান্ডা বুঝতে পারছি না। সমস্ত মালপত্র জড় করে রেখে, কাঁধের ব্যাগ নিয়ে গুহার বাইরে এলাম।

আজ আমরা সেই কুন্ডের দর্শণ পাব, যার রূপের তুলনা নেই। যার রূপ দর্শণ করতে গিয়ে একদিন শ’য়ে শ’য়ে মানুষ একই জায়গায়, একসাথে প্রাণ দিয়েছিল। আজ আমাদের সেই রূপকুন্ড দেখার শুভদিন। গুহাটাকে ডানহাতে রেখে, সরু রাস্তা ধরে আমরা চারজন এগিয়ে গেলাম। গঙ্গা আগে আগে চলেছে। ওই একমাত্র পথ চেনে। রাস্তা খাড়া ওপরে উঠেছে। দুরে কোন একটা শৃঙ্গ, বরফের টুপি পরে ধ্যানে বসেছেন। পাথুরে রাস্তা ভেঙ্গে আমরা সেই দিকেই চললাম। সকাল থেকে এক কাপ চা পর্যন্ত পেটে পড়ে নি,  ফলে  মানসিক আনন্দ যতই থাকুক, শারীরিক কষ্ট যথেষ্টই  অনুভব করছি। গঙ্গা একটা স্যান্ডাকের জুতো পরে এসেছিল। জুতোটা পায়ে  ঠিক মাপের না হওয়ার জন্যই হোক, বা ঐ জুতো পরে এত বেশী হাঁটার জন্যই হোক, ওর পায়ে বিশাল এক ফোস্কা পড়েছিল। কাল  সারা রাস্তা ও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটেছে। কাল সন্ধায় ওকে ওষুধ দিয়ে ব্যান্ড-এড্ লাগাতে বললে, ও খুব বাহাদুরী দেখিয়ে বললো  “বাবু, ওসব জিনিস আপনাদের মতো শহুরে সাহেবদের জন্য,  আমাদের ওষুধ হচ্ছে এই”।  কথাটা বলেই,  স্যান্ডাকের জুতো সমেত পা  দিয়ে ফোস্কাটা গেলে দিল। আজ আর পুরানো জুতো পরার অবস্থায় না থাকায়, শক্ত জুতো রেখে শীতাংশুর হাওয়াই চটি পরে  রূপকুন্ডে চলেছে।

আর কিছুটা পথ হাঁটার পর এল প্রথম গ্লেসিয়ারটা। ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্স যাওয়ার সময়, এর থেকে অনেক চওড়া গ্লেসিয়ার পার  হতে হয়েছিল, কিন্তু সেটা ছিল প্রায় সমতল মাঠের মতো। তার ওপর দিয়ে হাঁটতে কোন অসুবিধা হয় নি। কিন্তু বসুধারাতে বরফ  ভেঙ্গে খানিকটা ওপরে উঠে বুঝেছিলাম, বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া,  বিশেষ করে ওপরে ওঠা কী রকম শক্ত কাজ। আজকের  এই গ্লেসিয়ারটা খুব কম চওড়া, হয়তো কুড়ি-পঁচিশ ফুট হবে। কিন্তু এই  গ্লেসিয়ারটা পার হওয়ার মধ্যে বিপদের ঝুঁকি প্রচন্ড। ওপর  থেকে সোজা রাস্তা ক্রস্ করে ওটা নীচের দিকে নেমে গেছে। একবারে শক্ত বরফকে  আড়াআড়ি ভাবে  পার হয়ে,  আমাদের আবার  রাস্তায় পড়তে হবে। গ্লেসিয়ারটা কিন্তু খুব ওপর থেকে আরম্ভ হয়নি। তবে একবারে সোজা কত নীচু পর্যন্ত নেমে গেছে, বলতে  পারবো না। ওটা পার হওয়ার সময় যদি কোনভাবে পা পিছলে যায়,  তাহলে ধরবার মতো একটা ঘাসও নেই। একবারে গড়িয়ে  কত নীচে চলে যেতে হবে জানি না। সঙ্গে স্পাইক্ লাগানো লাঠিও নেই। হাতে অতি সাধারণ একটা বাঁশের লাঠি, তা দিয়ে হুঁকো  খাওয়া যায় জানি,  কিন্তু গ্লেসিয়ারে পিছলে পড়লে কোন কাজে আসবে না,  এটা নিশ্চিত। গঙ্গা হাওয়াই চটি পরে আছে। তাই কুমার গ্লেসিয়ারটা পার হওয়ার দায়িত্বটা নিয়েছে। কুমার প্রথমে তার হান্টার সু এর পিছন দিয়ে, অর্থাৎ গোড়ালির কাছ দিয়ে লাথি মেরে ঠুকে ঠুকে, বরফের ওপর একটা ছোট গর্ত মতো তৈরী করছে। সেই গর্তে পা দিয়ে গঙ্গা, তার পিছনে আমি, আমার পিছনে শীতাংশু যাচ্ছে।

 

DSCN0989

কুমারের তৈরী গর্তে কুমার দাঁড়িয়ে, ওর সামনে আর একটা নতুন গর্ত তৈরী করে এগিয়ে যাচ্ছে। তখন গঙ্গা প্রথম গর্তে পা রেখে দ্বিতীয় গর্তের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। গঙ্গা যখন সামনের গর্তে পা রেখে এগিয়ে যাচ্ছে, ততক্ষণে পিছনের গর্ত প্রায় ভরাট হয়ে, আগের চেহারায় রুপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমার পক্ষে পার হওয়া বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমার পরে শীতাংশুর জন্য আর অপেক্ষা না করে, পুরোপুরি আগের রূপ নিয়ে নিচ্ছে। ছোট গর্তে পায়ের গোড়ালি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, আগের গর্ত থেকে গঙ্গা পা ওঠালে, আমি সেই গর্তে পা দিয়ে এগিয়ে যাব। শীতাংশু আর এইভাবে ঝুঁকি নিয়ে না এগিয়ে, ফিরে গিয়ে পাথর বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠে, বরফ যেখান থেকে আরম্ভ হয়েছে, তার ওপর দিয়ে পার হয়ে, আবার শক্ত পাথর ধরে ধরে, কোনমতে নীচে রাস্তায় নেমে এল। ওকে দেখে আমারও তাই ইচ্ছা হচ্ছে। কিন্তু আমি গ্লেসিয়ারের প্রায় মাঝামাঝি চলে এসেছি। পিছনের সব গর্ত বুঁজে গেছে। আমি এক পায়ের গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছি, তাই পিছন ফেরাই মুশকিল। তার ওপর বরফ ভেঙ্গে গর্ত করে পিছনে যাওয়ার থেকে, সামনে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। গঙ্গা আমার অবস্থা দেখে তার হাত ধরতে বললো। সে সামনের দিকে মুখ করে পিছন দিকে হাত বাড়ালো। ওর হাত ধরলাম। ও খুব শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরলো। কিন্তু ঐভাবে হাঁটতে আরও অসুবিধা বোধ করলাম। তাছাড়া ও যতই অভিজ্ঞ ও দক্ষ হোক, ও হাওয়াই চটি পরে আছে। ওর পা কোন ভাবে পিছলোলে, ও আমাকে সঙ্গে নিয়ে নীচে চলে যাবে। তাই ওকে হাত ছেড়ে দিতে বলে, কোনক্রমে বরফ পার হয়ে, আবার রাস্তায় এসে হাঁফ ছাড়লাম। একটু এগিয়েই আবার ঐ একই রকমের গ্লেসিয়ার। পার্থক্য শুধু এবারেরটা কত উচু থেকে নেমে এসেছে বোঝা যাচ্ছে না। ফলে এবারে আর শীতাংশু আগের বুদ্ধিটা কাজে লাগাতে পারলো না। তবে এবার আমরা কিছুটা অভিজ্ঞ। আস্তে আস্তে গতবারের কায়দায় গ্লেসিয়ারটা পার হয়ে গেলাম। গঙ্গা হাওয়াই চটি পরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দিব্বি পার হয়ে গেল।

এরপরে নবম পর্বে……

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s