রূপকুন্ডের হাতছানি–একাদশ পর্ব {লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary ও Tour Picture এবং ভালো ছবি ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

SRINAGAR (3)খুব জল পিপাসা পাওয়ায় ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে বসে দেখি ডানপাশের আগুন কখন নিভে গেছে। পায়ের কাছের খোলা দরজা দিয়ে হুহু করে বরফ শীতল বাতাস ঢুকছে। শরীরটা কিরকম ম্যাজ্ ম্যাজ্ করছে। বোধহয় পাস্তুরাইজড্ হয়ে গেছি। ঢকঢক্ করে বেশ খানিকটা জল খেয়ে শুয়ে পড়লাম। শরীরের মধ্যে কিরকম একটা অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হয় জ্বর আসছে। এইভাবে শুয়ে থেকে থেকে, কখন আবার ঘুমিয়ে পড়েছি।

সকালবেলা শীতাংশুর ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো। উঠে দেখি আমার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। কাউকে কিছু জানালাম না। গঙ্গা  শুনলেই আজ  এখানে থেকে যেতে বলবে। মুখ ধুয়ে, কফি খেয়ে, মালপত্র নিয়ে রাস্তায় নামলাম। কিন্তু সামান্য পথ  হেঁটেই আমি বুঝে গেলাম, এই  জ্বর নিয়ে, আমার পক্ষে আর হাঁটা সম্ভবপর নয়। অথচ “দেবল” এখান থেকে অনেক কিলোমিটার পথ, এবং সেখানে না ফিরেও  আমার কোন উপায় নেই। সময় নেবার জন্য শীতাংশুকে বললাম, খুব খিদে পেয়েছে, কিছু না খেয়ে হাঁটতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।  ও, হরিশ কুমার ও গঙ্গাকে ডেকে ছাতু মাখতে বললো। ছাতু মাখা হলে, ওরা সকলে পরিমান মতো খেল। আমি এক দলা ছাতুও  খেতে পারলাম না। আমার তখন মনে হচ্ছে রাস্তার ওপরেই গায়ে কিছু চাপা দিয়ে শুয়ে পড়ি। ছাতু না খাওয়ায় শীতাংশু জিজ্ঞাসা  করলো,  আমি খেলাম না কেন ? ভাল লাগছে না উত্তর শুনে, ও ভীষণ রেগে গেল। আমরা একটু বসে আবার হাঁটতে শুরু  করলাম। আমি দেখতে পাচ্ছি প্রতি মিনিট হাঁটা পথে,  আমি ওদের থেকে অনেক পিছিয়ে পড়ছি। এইভাবে, এই গতিতে হাঁটলে, আমি  অসুস্থ শরীর নিয়ে একা পিছনে পড়ে যাব। বাধ্য হয়ে আবার ওদের থামতে বললাম। জল খেলাম। একটু সময় নষ্ট করে আবার হাঁটার চেষ্টা করলাম।

এইভাবে আস্তে আস্তে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। আমার এখন আর এক পা ও হাঁটার ক্ষমতা নেই। গায়ে প্রবল জ্বর,  নাক মুখ  দিয়ে গরম নিশ্বাস পড়ছে। বিশ্রাম পাবার আশায় শরীর এলিয়ে পড়ছে, অথচ দেবলের আগে বিশ্রামের কোন সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে  শীতাংশুকে ডেকে আমার অবস্থার কথা বললাম। ও আমার গায়ে হাত দিয়ে,  রীতিমতো ভয় পেয়ে গেল। ও গঙ্গাকে ডাকতে গেলে  আমি বাধা দিয়ে বললাম, গঙ্গা শুনে কী করবে?  শরীর খারাপ শুনলে,  গঙ্গা এখানে কোথাও কোন চালাঘরে থেকে যেতে বলবে।  এখানে কোন ডাক্তার নেই, আমার শরীরও বেশ খারাপ। কাল রাতে ঠান্ডা গরমে, আমার প্রচন্ড ঠান্ডা লেগে গেছে। এখন যত  তাড়াতাড়ি সম্ভব, কাঠগুদাম বা অন্য কোন বড় শহরে ফিরে যাওয়াই ভাল। ও ভয় পেয়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে, খুব আস্তে আস্তে হাঁটতে   লাগলো। কিছুটা হেঁটে ও একটা মুসম্বি লেবুর গাছ থেকে ছোট্ট একটা লেবু তুলে আমাকে দিয়ে, লেবুর গন্ধটা শুঁকতে শুঁকতে যেতে  পরামর্শ দিল। ও জানালো লেবুর গন্ধে শরীর ভাল লাগবে। ওকে বললাম আমার ঠান্ডা লেগেছে, জ্বর হয়েছে, কিন্তু গা বমি বমি করছে না, যে লেবুর গন্ধ শুঁকলে শরীর ভাল লাগবে। ও এবার আর আমার কথায় কান না দিয়ে, গঙ্গাকে ডাকলো। গঙ্গা সব শুনে আমাদের সাথে ওষুধ আছে কিনা জিজ্ঞাসা করলো। আমি বললাম হরিশের কাছে যে ব্যাগটা আছে, তাতে সবরকম ওষুধই আছে। গঙ্গা আমাদের শুয়ে বসে বিশ্রাম নিতে বলে বললো, ও হরিশের কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে আসছে। একটু পরেই তার চিৎকার শুনতে পেলাম। সে চিৎকার করে হরিশকে ডাকছে। আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে সে খালি হাতে ফিরে এসে জানালো, হরিশ অনেক এগিয়ে গেছে। ওষুধের ব্যাগ নিয়ে হরিশ এগিয়ে চলে গেছে বলে, সে হরিশের উদ্দেশ্যে গালিগালাজ শুরু করে দিল। দেবলে ফিরে আজ তার একটা ব্যবস্থা করবে, তাও জানাতে ভুললো না। আসলে হরিশের রাগ হয়েছে। গঙ্গা জিজ্ঞাসা করলো আমি হাঁটতে পারবো কিনা। না পারলে ও এখানে কোথাও থাকার ব্যবস্থা করবে। উত্তরে আমি জানালাম যে, আজ যে ভাবেই হোক, দেবলে ফিরে যাবই। গঙ্গা বললো হরিশ থাকলে ওর পিঠের মাল হরিশকে দিয়ে, ও আমায় পিঠে চাপিয়ে নিয়ে যেত। আমি জানালাম তার প্রয়োজন হবে না, তবে তোমরা একটু আস্তে হাঁটো, এগিয়ে যেও না। এর মধ্যে কুমারও গঙ্গার চিৎকার শুনে ফিরে এসে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। আমরা এবার খুব আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করলাম। গায়ে প্রবল জ্বর, পেট একদম খালি, গতি ক্রমশঃ কমতে শুরু করলো। গঙ্গা মাঝেমাঝেই উৎসাহ দিয়ে জানাচ্ছে, আমরা প্রায় দেবলের কাছাকাছি এসে গেছি। এইভাবে কখনও থেমে, কখনও বসে, কখনও বা একটু আধশোয়া হয়ে, সন্ধ্যার কিছু আগে দেবলে এসে হাজির হলাম।

গঙ্গা ঘর খুলে দিল। আমি শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়েই ঘরের বাইরে গঙ্গার সাথে হরিশের ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। গঙ্গা হরিশকে বলছে- “তুমি ওষুধের ব্যাগ নিয়ে আগে চলে এলে কেন? রাস্তায় যদি বাবুর কিছু হ’ত, তাহলে কী হ’ত? কে দায়িত্ব নিত”? ঝগড়া, কথা কাটাকাটি চলতেই লাগলো। এর মধ্যে কুমার দু’কাচের গ্লাশ গরম দুধ  আর দু’টো বড় বড় বালুসাই মিষ্টি নিয়ে এসে হাজির হ’ল। সে বললো এগুলো তার বাড়িতে জন্মাষ্টমীতে, পূজোর জন্য তৈরী হয়েছে। আমার এসব খেতে ইচ্ছা করছিল না, কিন্তু সে আমাকে ওগুলো খেয়ে নিতে অনুরোধ করলো। আমি উঠে বসে খেয়ে নিয়ে, ব্যাগ খুলে একটা ক্রসিন টেবলেট্ খেয়ে নিলাম। একটু পরেই প্রচুর ঘাম হয়ে জ্বর কমে গেল। মাথার ভিতর একটা প্রচন্ড যন্ত্রণা বোধ করছিলাম। ঐ অবস্থায় শুয়ে শুয়ে, আমরা আমাদের রূপকুন্ড যাওয়ার অভিজ্ঞতা, জায়গাগুলোর সৌন্দর্য, ইত্যাদি নিয়ে নিজেরা আলোচনা করতে শুরু করলাম। গঙ্গা, কুমার ও হরিশ এক ধারে বসে, ও শীতাংশু তার চৌকিতে শুয়ে। আমি অবশ্য একরকম শ্রোতার ভুমিকায় ছিলাম। একটু পরে ওরা চলে গেল। আমরা চুপ করে শুয়ে থেকে অনেকক্ষণ পরে, রাতের খাবার খেতে গেলাম। অনেক দিন পরে খিচুড়ির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে, মাংস রুটি খেলাম। ঘরে ফিরে এসে আর একটা ক্রসিন খেয়ে শুয়ে পড়লাম। আজ আর নিদ্রা দেবীর আরাধনা করতে হ’ল না। একটু পরেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়লাম।

ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরেই। গায়ে আবার গতকালের মতো জ্বর ও মাথা ব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙ্গলো। শীতাংশুকে বললাম দশটার সময় একটা ক্রসিন খেয়ে নেব। আধ ঘন্টার মধ্যে জ্বর কমে যাবে। সাড়ে দশটায় আমরা গোয়ালদামের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবো। আট কিলোমিটার পথ যেতে যদি তিন ঘন্টাও লাগে, তাহলেও দেড়টা-দু’টোর মধ্যে পৌঁছে যাব। তারপরে আবার জ্বর ফিরে এলে, তখন দেখা যাবে।

কথা মতো আমরা তৈরী হয়ে দোকানে খেয়ে দেয়ে, দশটার সময় একটা ক্রসিন চার্জ করে দিলাম। হিসাব মতো সাড়ে দশটা নাগাদ জ্বরও কমলো, আমরাও সময় নষ্ট না করে, গোয়ালদামের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে দিলাম। গঙ্গারা আমাদের সাথে গোয়ালদাম পর্যন্তই যাবে। আমাদের মালপত্র পৌঁছে দিয়ে, ওরা ওদের গ্রামে ফিরে আসবে। দু’-তিন ঘন্টায় পৌঁছনোর জন্য আমি একটু তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু মাঝপথেই আবার জ্বর বাড়তে শুরু করলো। রাস্তায় আবার একটা ক্রসিন খেয়ে বসে থাকলাম। কিছুক্ষণ পরে আবার হাঁটা শুরু করলাম। অবশেষে বিকেল বেলা গোয়ালদাম এসে পৌঁছলাম।

আমার অবস্থা এখন শোচনীয়। পিন্ডারী যাবার প্ল্যান, অনেক আগেই দেবলে বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু আমার গায়ে এত জ্বর, চোখ দুটো টকটকে লাল, ভালভাবে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই দেখে, গঙ্গারা আজ রাতটা এখানেই থেকে, কাল ভোরে আমাদের বাসে তুলে দিয়ে নিজেদের গ্রামে ফিরে যাবে ঠিক করলো। আমার ঠান্ডা লেগেছে জানতে পেরে গঙ্গা শীতাংশুকে বুদ্ধি দিল, আমায় যেন একটুও জল খেতে না দেওয়া হয়। শীতাংশু কারো সাথে পরামর্শ করার সুযোগ না পেয়ে, গঙ্গার কথার ওপর আস্থা রাখলো। আমার জল পিপাসায় ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম, কিন্তু ও আমাকে এক ফোঁটা জল খেতে দিতে রাজী হ’ল না। শেষে অনেক কাকুতি মিনতির পর, ও এক ঢোক জল দয়া করে দিল। গঙ্গা এবার ওকে নিয়ে ডাক্তার ডাকতে চললো। আমি শীতাংশুকে অনেক ভাবে, এখানকার ডাক্তার ডাকতে বারণ করলাম। এখানে ডাক্তার বলতে কেউ নেই। কিছু কোয়াক ডাক্তার অবশ্য আছে, কিন্তু তারা কিছু হলেই সুঁই দেয়, অর্থাৎ ইঞ্জেকশান দেয়। সব অসুখেই প্রায় একই চিকিৎসা। এতে হিতে বিপরীত হবে। কিন্তু শীতাংশু তখন অসহায় অবস্থায় বোধবুদ্ধি, বিচার বিবেচনা শক্তি হারিয়েছে। “কানু বিনা গীত নাই” এর মতো “গঙ্গা বিনা গতি নাই” ধারণায়, ও গঙ্গাকে নিয়ে ডাক্তার ডাকতে চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল ডাক্তারের দেখা না পেয়ে। যাক্ বাঁচা গেল, আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

হঠাৎ বাইরে একটা হৈচৈ শোনা গেল। কিছু বোঝার আগেই যারা আমাদের ঘরে ঢুকলো, তাদের দেখে তো আমরা ভুত দেখার মতো চমকে উঠলাম। বৈদিনী বুগিয়ালে যে দলটার সাথে আমাদের দেখা হয়েছিল, তারা ফিরে এসেছে। ওদের কাছে ফিরে আসার কারণ শুনে, মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। বলা যায় ফিরে আসতে তারা বাধ্য হয়েছে। এখন বুঝতে পারছি, আমরা কত ভাগ্যবান। কত সহজে রূপকুন্ড দেখে, নির্বিঘ্নে ফিরে আসতে পেরেছি।

সেদিন আমরা বৈদিনী থেকে চলে আসার পরে, ঐ প্রচন্ড বৃষ্টিতে ওরা বৈদিনীর বাংলো ও টেন্টে আশ্রয় নেয়। ওদের কুলিদের মধ্যে একজন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওরা তাকে তাদের বুদ্ধি মতো ওষুধ দেয়। সম্ভবত তার ঠান্ডা লেগেছিল। ওরা তার বুকে পিঠে রাম মালিশ করে, রাম খাওয়ায়। তাতেও সে সুস্থ না হয়ে, আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়তে থাকে। তখন ওরা তাকে কোরামিন দেয়, গরম সেঁক দেয়। কিন্তু এতকিছু করার পরেও, কুলিটা আস্তে আস্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ওখানে না আছে ডাক্তার, না আছে পুলিশ। ফলে গাইডের কথা মতো, কুলিটাকে বৈদিনীতে কবর দিয়ে ওরা ফিরে এসেছে। এখন এখানে ওদের কুলিরা আরও অনেক লোক জড়ো করে ক্ষতিপুরণ দাবী করছে। ওরা তাই এ ব্যাপারে কী করা উচিৎ জানার, এবং এই বিপদ থেকে বাঁচার জন্য‌, আমাদের কাছে সাহায্য চাইতে এসেছে।

একটা জলজ্যান্ত লোক, বিনা চিকিৎসায় অসহায় ভাবে মারা যাবার খবরটা শুনে আমরা খুব দুঃখ পেলেও, গঙ্গা আনন্দে নেচে নেচে ঘুরপাক খেতে শুরু করলো। একজন লোকের মৃত্যু যে আর একজন লোকের এত আনন্দের, নাচের কারণ হতে পারে, আগে জানা ছিল না। এইবার গঙ্গার কথায় তার এই নাচের কারণ জানা গেল। ওদের গাইড, রাম সিং গঙ্গার মামাতো ভাই হয়। এই ঘটনার পরে রাম সিং এর ওপর যাত্রীদের আস্থা কমে যাবে। পরোক্ষ ভাবে গঙ্গার ব্যবসা আরও ফুলে ফেঁপে উঠবে।

নদীর এক পার ভাঙ্গে, অপর পার গড়ে। রাম সিং এর ব্যাড উইল, গঙ্গা সিং এর গুড উইলের কারণ, তাই এত নাচাকোঁদা। এখন মনে হচ্ছে আমার অসুস্থতায় তার এই ব্যস্ততা, তার এত ভয় পাওয়ার কারণও হয়তো সেই ব্যাড উইল।

যাহোক্, ওদেরকে বলা হ’ল কিছু টাকা পয়সা দিয়ে একটা বোঝাপড়া করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। গঙ্গাও তাই বললো। ওরা আমাদের ওদের সঙ্গে গিয়ে কুলিদের সঙ্গে কথা বলতে অনুরোধ করলো। কিন্তু শীতাংশু আমার শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে, ওদেরকে নিজেদেরই কথা বলতে বললো। আমি বললাম, কাল প্রথম বাসেই ওদের এখান থেকে চলে যাওয়া উচিৎ। ওরা এখানে যত বেশী সময় নষ্ট করবে, ঝামেলা, চাহিদা, তত বাড়বে। ওরা এবার আমাদের সাথে এক বাসে কাঠগুদাম যাবার কথা বললো। ওরা ওদের দল ভারী করতে চাইছে। কিন্তু এতে আমাদেরও লাভ কম নয়। কাল সকাল থেকে গঙ্গারা আর আমাদের সাথে থাকবে না। বাড়ি ফিরতে এখনও অনেক, অনেক পথ বাকী। ওরা সঙ্গে গেলে অন্তত হাওড়া পর্যন্ত ওদের সঙ্গ পাওয়া যাবে। উপকার কতটা হবে জানিনা, তবু লোকবল তো প্রয়োজন হতেই পারে। ভোরের বাসে ফেরার কথা ঠিক করে, ওরা চলে গেল। আমরাও আর কিছুক্ষণের মধ্যেই খাওয়া দাওয়া সারতে গেলে, আগের পরিচিত সেই হোটেল মালিক আমার অসুস্থতার কথা শুনে বললেন, বাবু বাড়ি ফিরে গিয়ে মা’র হাতের ইলিশ মাছের ঝোল ভাত খেলেই, সব ঠিক হয়ে যাবে। কথায় আছে না—“চাকরী করি তো পুলিশ, মাছ খাই তো ইলিশ”। যাহোক্ খাওয়া সেরে ফিরে এসে, শুয়ে পড়লাম।

আজও ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরে। রাতেই শীতাংশু গিয়ে গোয়ালদাম থেকে কাঠগুদামের বাসের টিকিট কেটে একবারে সামনের সিট্ রিজার্ভ করে এসেছে। আমরা তৈরী হয়ে বাসে গিয়ে একবারে সামনের সিটে বসলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে ওরাও বাসে এসে বসলো। ওদের দেখে মনে হ’ল, ওদের টেনশন কমেছে। বোধহয় টাকা পয়সা নিয়ে একটা বোঝাপড়া হয়েছে। যাহোক্, সমঝোতা হলেই মঙ্গল। বাস ছাড়বার ঠিক আগে, আমার ডানদিকের সিটে জানালার ধারে সেই এভারেষ্ট বিজয়ী লামা সাহেব এসে বসলেন। বাস ছাড়তে গঙ্গারা হাত মেলালো। আস্তে আস্তে আমরা ওদের ছেড়ে চিরতরে দুরে চলে গেলাম। বাসের সিটে হেলান দিয়ে আধ শোয়া হয়ে চোখ বুজে রইলাম। শরীর একদম ভাল নয়। গায়ে বেশ জ্বর। অনেকটা পথ বাস জার্নি করে কাঠগুদাম। সেখান থেকে এক রাত্রি ট্রেন জার্নি করে লক্ষ্ণৌ। সেখান থেকে আবার এক রাত্র্রি ট্রেন জার্নি করে হাওড়া। আমার অবস্থার কথা শুনে নতুন সঙ্গীরা বললো, লক্ষ্ণৌতে নেমে ভাল ডাক্তার দেখাবার ব্যবস্থা করা যাবে। যাহোক্, কোনরকম নতুন ঝামেলা ছাড়াই আমরা একসময় কাঠগুদাম এসে পৌঁছলাম। ট্রেন আসতেই নতুন সঙ্গীরা কামরায় উঠে, আমার শোবার ব্যবস্থা করে দিল। আমাদের সিটের সামনে ওদের ও আমাদের সমস্ত মালপত্র এমন ভাবে রাখলো, যাতে সহজে কেউ আমাদের কাছে যেতে না পারে। রিজার্ভেশন পাওয়া না গেলেও, ওদের সহযোগীতায়, আমাদের বিশেষ কোন অসুবিধা হ’ল না। ওদের সেই বড় বড় তেনজিং নোরগে মার্কা কথাবার্তা বা হাবভাব আর নেই। রাতটা ভালোয় ভালোয় কেটে, একসময় আমরা লক্ষ্ণৌ এসে পৌঁছলাম। এখনও আমার জ্বর, চিকিৎসার অভাবেই বোধহয়, এতটুকু কমেনি।

ওরা ডাক্তার দেখাবার আগে, হাওড়ার রিজার্ভেশনের চেষ্টা শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত ওরা রিজার্ভেশনও ম্যানেজ করে ফেললো। তবে বিভিন্ন স্টেশন থেকে বিভিন্ন জনের, যখন যেরকম, যেখানে পাওয়া যাবে, শর্তে ম্যানেজ হ’ল। ডাক্তার আর দেখানো হ’ল না। বেশ কিছু সময় আমাকে বসে যেতে হ’ল। অবশেষে আমার শোবার ব্যবস্থাও হয়ে গেল। একে একে, আর সকলেরই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বার্থ ম্যানেজ হ’ল। গোটা ট্রেন জার্নিটাই আমি প্রায় অচৈতন্য অবস্থায়, ঘুমের ঘোরে পড়ে থাকলাম। অবশেষে একসময়, শেষপর্যন্ত আমরা হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছতে সক্ষম হলাম। ওরা বিদায় নিয়ে চলে গেল। শীতাংশু আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, আমি একা বাড়ি যেতে পারবো কী না। আমি ওকে আমায় ট্রেনে তুলে দিয়ে যেতে বললাম। ও আমার মালপত্র, মানে প্রায় সব মালপত্র সমেত আমাকে ট্রেনে তুলে দিল। নির্দিষ্ট স্টেশনে নেমে, কুলির মাথায় মাল চাপিয়ে, বাড়ি ফিরে এসে বিছানা নিলাম। ডাক্তার এলেন, পরীক্ষা করে চিকিৎসা শুরু হ’ল। কোন রকমে পরের দিন অফিস জয়েন করে, সিক্ লিভ্ নিলাম। ওজন নিয়ে দেখলাম, আমার ওজন প্রায় পাঁচ কিলোগ্রাম এর ওপর কমে গেছে। হিমালয় মানুষের রক্ত শুষে নেয় বলে নাকি প্রবাদ আছে। তা নিক্, আমার তাতে কিছুমাত্র দুঃখ নেই।

ভবিষ্যতের রূপকুন্ড যাত্রীদের জানাই, রূপকুন্ড যাবার কষ্ট হয়তো অনেক, বিপদও হয়তো পদে পদে আছে, আমাদেরও হয়তো ফিরেই আসতে হ’ত, যদি না গঙ্গা সিংকে সাথে পেতাম। ওর ঠিকানা দিলাম। ওকে সাথে পেলে, বিপদ ও দায়িত্ব অর্ধেক কমে যাবে, এবং রূপকুন্ডে পৌঁছনোর নিশ্চয়তা দ্বিগুন বেড়ে যাবে।

গঙ্গা সিং,  প্রযত্নে-বীর সিং নেগী,

গ্রাম-পূর্ণা,  পোষ্ট- দেবল,

জেলা-চামোলী,  উত্তর প্রদেশ।

—–O—–

সুবীর  কুমার  রায়।

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s