রূপকুন্ডের হাতছানি–দশম পর্ব {লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary, Tour Picture এবং ভালো ছবি ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

SRINAGAR (3)ঘুম ভাঙ্গলো বেশ ভোরে। বৃষ্টি এখন আর পড়ছে না। পরিস্কার আকাশ। রাতে ভালভাবে শুতে পেরে এবং চিন্তামুক্ত হতে পেরে, শরীর ও মন বেশ তরতাজা ঝরঝরে। কফি ও জলখাবার খেয়ে আমরা মালপত্র নিয়ে রাস্তায় নামলাম। গঙ্গা কাল রাতে আমাদের লেখা চিঠিগুলো পোষ্ট করার ব্যবস্থা করতে গেল। ও ফিরে এলে আমরা তিন তালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। আমাদের কথায় শীতাংশু যাচ্ছে বটে, কিন্তু মুখ গোমড়া করে। আসলে ও যাচ্ছে না, যেতে বাধ্য হচ্ছে।

পাহাড়ী পথে এঁকেবেঁকে অনেকটা পথ পার হয়ে এলাম। বেশ জঙ্গলের পথ, চারিদিকে শুধু গাছ। চড়াই, উতরাইও বেশ ভালই। ফলে রাস্তাও বেশ কষ্টকর। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ও ভয়ের ব্যাপার হ’ল, গঙ্গা সম্ভবত এই পথ চেনে না। এখানে রাস্তা বলে কিছু নেই। এমন কী পায়ে চলা পথের যে দাগ থাকে, যা দেখে বোঝা যায় এটাই রাস্তা, তাও প্রায় নেই। গঙ্গা ভুল পথে যাচ্ছে কিনা চিন্তা হ’ল। মাঝেমাঝেই ও দাঁড়িয়ে পড়ে ভ্রুর কাছে হাত রেখে দুরে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করে, আমাদের ওর সাথে এগতে বলছে। ওকে জিজ্ঞাসা করলে বলছে, সামনের ঐ চুড়াটার পরেই তাল পাওয়া যাবে। চড়াই পথে অনেক ঘুরে দুরের চুড়া পার হওয়ার পর, আবার সেই ভ্রুর কাছে হাত নিয়ে এসে দুরে এদিক ওদিক কিছুক্ষণ দেখে, আবার জানাচ্ছে সামনের চুড়ার পরে তাল পাওয়া যাবে। এক সময় আমি গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে এই পথ চেনে কিনা, বা আগে এই পথে কখনও এসেছে কিনা? ও আমাদের ভয় পেতে বারণ করে জানালো, এই পথে কোন রাস্তা নেই। আগেও সে এসেছে, তবে অনুমান করে দিক নির্ণয় করে। এবারও ও আমাদের ঠিক ঐ তিন তালে পৌঁছে দেবে। এসব ব্যাপার দেখে, শীতাংশুর গোমড়া মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেছে। আমার সাথে একটাও কথা বলছে না। এদিকে আস্তে আস্তে বেলাও বেশ বেড়ে গেছে। এক জায়গায় বসে আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। কুমার জল নিয়ে এল। এতক্ষণে শীতাংশু গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলো রাস্তা আর কতটা বাকি? গঙ্গা জানালো বিকেলের মধ্যে আমরা পৌঁছে যাব। একটু বসে বিশ্রাম নিয়ে, আমরা আবার একই পদ্ধতিতে এগিয়ে চললাম। আবার সেই একই রকম ভাবে আন্দাজে পথ চলা। তবে এবার মাঝেমাঝেই গঙ্গা শান্তনা বাণী শোনাচ্ছ—“কোন ভয় নেই”। আমার ভয়টা অন্য কারণে। ইতিমধ্যে আমরা বেশ কয়েক কিলোমিটার পথ আন্দাজের ওপর ভর করে এগিয়ে এসেছি। এতক্ষণের পথে একটা গ্রাম তো দুরের কথা, একটা মানুষও চোখে পড়ে নি। এখন যদি পথ ভুল হয়ে থাকে, তবে রাতে না পারবো ওয়ান ফিরে যেতে, না পারবো কোন একটা তালের কাছে পৌঁছতে। কারণ সামনে বা পিছনে, যে দিকেই যাই না কেন, আবার যেতে হবে সেই আন্দাজের ওপর ভর করেই। মুখ্য রূপকুন্ড তালের যদি ঐ রূপ হয়ে থাকে, গৌণ এই তিন তালের সৌন্দর্য নিয়ে আমার মনেও যথেষ্ট সংশয় প্রথম থেকেই ছিল। একমাত্র আমার জেদেই, সকলে এ পথে আসতে বাধ্য হয়েছে। এখন শীতাংশুর হাতে খুন হয়ে যাবার সম্ভাবনাও আমার প্রবল।

ইলশেগুড়ি বৃষ্টি শুরু হ’ল। মাঝে মাঝে সামান্য জোরে হয়ে, আবার সেই একই ভাবে এক নাগাড়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। গঙ্কার কথায় একটার পর একটা চুড়া পার হয়ে, আমরা একটা চুড়ার ওপর এসে দাঁড়ালাম। আমি আর শীতাংশু পাশাপাশি, গঙ্গা আমাদের সামনে, অনেকটা নীচে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে হঠাৎ যেন ঢালু পাথর বিছানো মাঠ অনেক নীচে নেমে গেছে। গঙ্গা হঠাৎ অনেক ওপরে আমাদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে হি-স্-স্-স্ করে একটা শব্দ করে আমাদের চুপ করে থাকতে, কথা না বলতে ইশারা করলো। আমরা কিছু না বুঝেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। মিনিট কয়েক পরে গঙ্গা চিৎকার করে বললো—“শালা বকরী”। আমরা নীচে নেমে এলাম। এতক্ষণে ব্যাপারটা জানা গেল। ঘটনাটা আর কিছুই নয়, অনেক নীচ থেকে একটা কালো রঙের ছাগল আসছিল, ওটাকে দুর থেকে দেখে গঙ্গা ভাল্লু মনে করেছিল। তার মানে এখানে ভাল্লুর উৎপাতও আছে বোঝা গেল। আমরা এগিয়ে চললাম। বোধহয় বিশ-পঁচিশ পা এগিয়েছি, হঠাৎ পিছন থেকে গঙ্গার ডাকে পিছন ফিরতে গঙ্গা বললো, “বাবু, বকরী মর্ গিয়া”। এই তো ছাগলটাকে দেখলাম, এর মধ্যে এমন কী হ’ল, যে মরেই গেল। ছাগলের হার্ট অ্যাটাক হয় বলে তো শুনি নি। গঙ্গার কাছে ফিরে এসে দেখি ছাগলটা বোধহয় অসুস্থ, দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আর তারপরেই মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। গঙ্গা তাকে আবার দাঁড় করিয়ে দিল, কিন্তু ছাগলটা আবার মাটিতে পড়ে গেল। বোঝা যাচ্ছে যেকোন কারণেই হোক, ছাগলটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয়-ই বা কী থাকতে পারে, তাই এগিয়ে যাবার উদ্যোগ নিতেই, গঙ্গা বললো- “বাবু, টাং কাট লি”? ও ঠিক কী বলছে বুঝতে না পারায়, ও আবার বললো, টাং কাট লি? কলকাতা  থেকে যাবার সময় প্রয়োজন হতে পারে ভেবে, একটা চামড়ার খাপে ভরা বড় ভজালির মতো ছুড়ি নিয়ে গেছিলাম। সেটা গঙ্গার ব্যাগেই আছে। গঙ্গা সেটা দিয়ে অর্ধমৃত ছাগলটার পাগুলো কেটে নিতে চায়, রাতে মাংসের খিচুড়ি বানাবার জন্য। শুনে জিভে জল এসে গেল, কিন্তু পরমুহুর্তেই সাবধান হয়ে গেলাম। ওকে এই কাজ করতে বারণ করে বললাম— প্রথমত, ছাগলটা অসুস্থ, কিন্তু মরে নি। দ্বিতীয়ত, এখানে ছাগল যখন আছে, তখন ওর মালিকও কাছেপিঠে কোথাও আছেই। এই দীর্ঘ পথে এখন পর্যন্ত কোন মানুষ দেখিনি। কাজেই পা কাটা ছাগল দেখে তার মালিক সহজেই বুঝতে পারবে, আমরাই তার ছাগলের হত্যাকারী। সেক্ষেত্রে এই নির্জন, অচেনা, অজানা, জায়গায় বিপদ হতে পারে। গঙ্গা জানালো, ছাগলটা অসুস্থ, ওটা একটু পরেই মরে যাবে। কাজেই ওটাকে কেটে ফেললে ছাগলের মালিক কিছু মনে করবে না, বা কিছু বলবে না। এ যুক্তি মেনে নিতে পারলাম না। গঙ্গা আবার রাতের লোভনীয় খাবারের কথা মনে করিয়ে দিয়ে পাগুলো কেটে ফেলতে চাইলো। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি ওর মধ্যে আগের সহজ সরল গঙ্গাকে খুঁজে পেলাম না। এরমধ্যে ওপরের সেই জায়গাটায়, যেখানে কিছুক্ষণ আগে আমি ও শীতাংশু গঙ্গার ইঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, কুমার ও হরিশ এসে উপস্থিত হ’ল। গঙ্গা চিৎকার করে কুমারকে ডাকলো। কুমার ও হরিশ ছুটে নেমে এলে, গঙ্গা জানালো বকরী মর্ গিয়া। চোখের পলক পরার আগেই কুমার বললো, টাং কাট লো। মরেছে, সব শিয়ালের এক রা। এবার ছাগলের পা কাটা থেকে এদেরকে রোখা, আর বোধহয় আমার পক্ষে সম্ভব হ’ল না। আমি ওদের অনেক ভাবে বোঝালাম। শীতাংশুও ওদের এ কাজ থেকে বিরত থাকতে বললো। ওরা অনেক ভাবে আমাদের বুঝিয়েও যখন আমাদের রাজী করাতে পারলো না, তখন গঙ্গা আমাদের এগিয়ে যেতে বললো। আমরা এগিয়ে চললাম। বোধহয় মিনিট তিনেকের পথ হেঁটে এসে, গঙ্গা আবার আগের জায়গায় ফিরে গেল। আমরা বিপদের গন্ধ পেয়ে আবার পিছিয়ে এসে ছাগলটার কাছে এলাম। গঙ্গা কিন্তু ছুড়িও বার করলো না, ছাগলটার পা কাটারও কোন চেষ্টা করলো না। এমন কী টাং কেটে নেওয়ার জন্য আমাদের নতুন করে অনুরোধ পর্যন্ত করলো না। সে তার হাতের কঞ্চিটা দিয়ে ডাংগুলি খেলার মতো, ছাগলটাকে অনেক নীচে ফেলে দিল। আবার নীচে ছাগলটার কাছে ছুটে গিয়ে, ছাগলটার পেটের নীচে কঞ্চিটা দিয়ে একই কায়দায়, ওটাকে আবার বেশ কিছুটা নীচে তুলে ফেলে দিল। জায়গাটা ঢালু মাঠের মতো, ইতস্তত ছোট বড় পাথর পড়ে রয়েছে। ফলে অনেকটা দুরে ছিটকে পড়ে, ছাগলটা গড়াতে গড়াতে আরও খানিকটা নীচে চলে গেল। এইভাবে তিন-চারবার ছাগলটাকে ফেলে, একটা বড় পাথর দিয়ে তাকে আঘাত করে, সে আমাদের কাছে ফিরে এসে বললো, “চলিয়ে”। ছাগলটা কিন্তু তখনও মরে নি। টাং-ই যদি না কাটবে, তবে ছাগলটাকে এইভাবে আঘাত করার কী কারণ থাকতে পারে বুঝলাম না। তবে কী আমাদের ওপর রাগটা ছাগলের ওপর বর্তালো? আমরা আবার এগিয়ে চললাম এবং একটু আগে যে জায়গাটা থেকে ফিরে এসেছিলাম, সে জায়গাটায় এসে পৌঁছলাম। গঙ্গা, বহু নীচে বিন্দু বিন্দু কালো, সাদা রঙের কিছু দেখিয়ে বললো, বাবু ঐ দেখুন নীচে কত ছাগল, ভেড়া চরছে। ওখান থেকেই এই বকরীটা কী ভাবে এখানে চলে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওটাকে এমন ভাবে আঘাত করা হয়েছে যে, ওটা কিছুক্ষণের মধ্যেই মরে যাবে। যাবার পথে বকরীর মালিককে বকরীর সন্ধানটা দিয়ে যাব। ও তখন বাধ্য হবে আপনাদের কাছে ঐ বকরীর মাংস সামান্য কিছু দামে বিক্রী করে দিতে। কারণ এখানে একটা গোটা ছাগল খাবার মতো লোক কোথায়? আপনারা যদি কিনতে রাজী না হন, তবে বিনা পয়সায় আপনাদের ও মাংস দিয়ে যাবে। আজ রাতে মাংসের খিচুড়ির পাকা ব্যবস্থা করে দিয়ে এলাম। এতক্ষণে গঙ্গার ছাগলটাকে পৈশাচিক ভাবে আঘাত করে আধমরা করে রেখে যাবার কারণ বোঝা গেল। ও কেন ঐ ভাবে ছাগলটাকে আঘাত করলো, তাও বোঝা গেল। ছাগলের দেহে কোন আঘাতের চিহ্ন রেখে গেল না। ওর দুরদর্শিতা দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না। ভয়ও হ’ল, মাংসের লোভে যেভাবে ও ছাগলটাকে হাফমরা করে রাখলো, টাকার লোভে আমাদের না আবার ফুলমরা করে রেখে যায়। ছাগলের তবু মালিক আছে, আমাদের তো ত্রিসীমানায় কেউ নেই। আস্তে আস্তে একসময় আমরা ছাগলের মালিকের সাম্রাজ্যে এসে উপস্থিত হ’লাম। তিনি তাঁর একপাল ছাগল, ভেড়া নিয়ে অবস্থান করছেন। গঙ্গা তাকে খুব দুঃখের সঙ্গেই জানালো যে, তার একটা বকরী দলছুট হয়ে ওপরে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। উত্তরে নিরুত্তাপ কন্ঠে মালিক জানালো, উসকো তো বিমার থা। আর কোন কথাবার্তা উভয় পক্ষের মধ্যে না হওয়ায়, আমরা এগলাম।

একে একে আমরা তিনটে তালই দেখলাম। তাল বলতে কেউ যদি এগুলোকে নৈনিতাল জাতীয় তাল বলে ভাবে, তবে এদের দর্শন করলে সে মর্মাহত হবে। ব্রহ্মতাল, বিগুন তাল (বিখল তাল) ও খপলু তাল আসলে তিনটে ডোবা। বিগুন তালে দেখি কয়েকটা বাচ্ছা ছিপ দিয়ে মাছ ধরছে। মাছ বলতে ছোট ছোট পুঁটি মাছের মতো সাইজের কী একটা মাছ। ছেলেগুলো কোথায় থাকে, ছিপের বঁড়শি কোথায় পেল, বা এই পুকুরে মাছ কোথা থেকে এল, কিছুই জানিনা। তবে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম—এরা ছিপের ফাৎনা জিনিসটার সঙ্গে পরিচিত নয়। ফলে মাঝে মাঝে আন্দাজে ছিপটা টেনে, মাছ ধরার চেষ্টা করছে। ছোট ছোট কয়েকটা মাছ ধরেছে, তাই বিশ্বাস করতেই হ’ল যে এই পুকুর, বা তালে মাছ আছে। আমি একটা ছোট্ট চাড়া গাছের ডাল ভেঙ্গে, তার ভিতরের শোলার মতো নরম অংশটা দিয়ে ফাৎনা বানিয়ে দিলাম। এবার দিব্বি ফাৎনা নড়তে শুরু করলো। ওরাও খুব খুশী। এত বড় একটা আবিস্কারের জনক হিসাবে আমাকে পেয়ে, ওরা খুব আনন্দিত হ’ল বটে, কিন্তু আমাকে বেশীক্ষণ মাছ ধরার ডেমো দিতে রাজী হ’ল না।

আবার বৃষ্টি শুরু হ’ল। আমরা গঙ্গার কথা মতো দ্রুত এগিয়ে চললাম, এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই এই বিস্তীর্ণ এলাকার একমাত্র থাকবার জায়গাটা দেখতে পেলাম। একটু আগে গঙ্গার ছাগল মারা দেখে, গঙ্গা সম্বন্ধে যে ভয় পাচ্ছিলাম, বাসস্থানের নমুনা দেখে শীতাংশু সম্বন্ধে সেই ভয়টা আবার নতুন করে দেখা দিল। এত সুন্দর তিন-তিনটে তাল দেখে, এত সুন্দরতর বাসস্থানে রাত কাটাতে হলে, মনে একটা কবি কবি ভাব জাগবেই। আর তারপরে যদি—“এমন দিনে তারে মারা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়” ভেবে ও আমাকে খুন করতেও আসে, কিছু বলার নেই। কারণ এখানে আসার জন্য একমাত্র আমিই দায়ী। দু’টো মাত্র ঘর বা ঐ জাতীয় কিছু একটা। ঘাস, খড়, কঞ্চি, ও লতাপাতা দিয়ে তৈরী ইগলুর মতো দেখতে, বেশ লম্বা ঘর। ঘরদুটোর চারপাশে গোবরে থৈ থৈ করছে। বৃষ্টিতে তার অবস্থা আরও শোচনীয়। ঘরে নিশ্চিন্তে ঢুকবার জন্য গোবরের ওপর পর পর কয়েকটা পাথর ফেলা আছে। ব্যবস্থাপনার কোন ত্রুটি ধরা যাবে না। গঙ্গা আমাদের বড় ঘরটার ভিতরে যেতে বললো। আমাদের গায়ে ওয়াটারপ্রুফ থাকলেও, বেশ ভিজে গেছি। জুতো মোজাও বেশ ভিজে। এই অবস্থায় ঘাস, খড়, লতাপাতার তৈরী ঘরে রাত কাটানো কতটা সুখকর হবে ভাবতে ভাবতে, শীতাংশুর পিছন পিছন পাথরের ওপর পা রেখে রেখে চোরের মতো ঘরে ঢুকছি, এমন সময় শীতাংশুর পায়ের তলার পাথরটা নড়ে যাওয়ায়, তাল সামলাতে গিয়ে ওর একটা পা পাথরের বাইরে পড়তেই, সেটা বেশ খানিকটা গোবরে ডুবে গেল। আমারও ওর হাতে মৃত্যুর সম্ভাবনা আরও প্রশস্ত হ’ল।

যাহোক্, ঐ অবস্থায় মাথা নীচু করে ছোট দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকেই, প্রচন্ড ধোঁয়ায় আমার দম বেরিয়ে যাবার উপক্রম। চোখ জ্বালা করে উঠলো, নিশ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। ওয়াটারপ্রুফের বোতাম গলা পর্যন্ত লাগানো। তাড়াতাড়ি গলার কাছের বোতামটা খোলার চেষ্টা করেও, খুলতে পারলাম না। গঙ্গা এসে একটানে বোতামের জায়গাটা ছিঁড়ে দিল। ওয়াটাপ্রুফটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, প্রাণটা বাঁচলো। ঘরের ভিতর তিনজন লোক আগুন জ্বেলে বসে আছে। দরজার কাছেই ওরা বসে আছে। লম্বা ঘরটার পিছন দিকে পর পর অনেকগুলো গরু বাঁধা আছে। গুনে না দেখলেও, চল্লিশ-পঞ্চাশটা তো হবেই।

DSCN0981 (2)

ঘরের ভিতর ঐ লোকগুলোর দেওয়া সামান্য জলে শীতাংশু তার পা ধুয়ে পরিস্কার করে নিল। এই ঘরটার উল্টো দিকে পনের-বিশ হাত দুরে অপর ঘরটা। ঐ ঘরটায় যাবার সময় কুমারের পায়েও প্রচুর গোবর মাখামাখি হ’ল। আমাদের ঘরে, যেখানটায় আগুন জ্বালানো হয়েছে, তার ঠিক পাশে, এক ফুট বা দেড় ফুট উচ্চতার একটা পাথরের স্ল্যাব, দাঁড় করানো আছে। আড়াই ফুট মতো লম্বা এই স্ল্যাবটার খানিকটা অংশ মাটির তলায় পোঁতা আছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে বেশ পাকাপাকি ব্যবস্থা। স্ল্যাবটার অপর দিকে দু’টো শুকনো চট পেতে দেওয়া হ’ল। এই দু’টো চটই এই ঘরের একমাত্র শুকনো বস্তু। আমরা মহামান্য অতিথি বলে, ঐ দুটো শুকনো চটে আমাদের রাতে শোবার ব্যবস্থা করা হ’ল। ঘরের মেঝের মাটি পিটিয়ে শক্ত ও সমান করা হলেও, জলে ভিজে চটচটে, কাদা কাদা। চট্ দু’টো খুব বেশী লম্বা না হওয়ায়, আমাদের প্রায় কোমড়ের কাছ থেকে, চটের বাইরে ভিজে মাটিতে থাকবে। এখানে ঠান্ডাও বেশ ভালই, জায়গার অভাবে স্লীপিং ব্যাগ খোলার উপায় নেই, তার ওপর একনাগাড়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছে। আমরা আগুনের পাশে সবাই বসে আছি। আগুন আর আমাদের শোবার চটের মাঝখানে, শিলনোড়ার শিলের মতো পাথরের স্ল্যাবটা রয়েছে। শুনলাম কুমার, হরিশ ও এই ঘরের দু’একজন উল্টোদিকের ছোট ঘরটায় রাত্রে শোবে। বৃষ্টি, গোবর, আর শীতাংশুর হাতে খুন হওয়ার ভয়ে, ইচ্ছা থাকলেও পাশের ঘরটার সৌন্দর্য আর দেখতে যাওয়ার সাহস হ’ল না। তবে ওটার অবস্থা যে এর থেকেও শোচনীয়, তা না দেখেও বলে দেওয়া যায়। কারণ আমরা অতিথি, আমাদের খারাপ ঘরে ওরা থাকতে দেবে না।

এবার রান্না করার তোরজোর শুরু হ’ল। গঙ্গা ছাগলের মাংসের আশায় এতক্ষণ অপেক্ষা করেছে। আস্তে আস্তে বেশ অন্ধকার নেমে এল। গঙ্গা আর অপেক্ষা না করে নিজেই ছাগলের মালিক, প্রয়োজন হলে ছাগলের মৃত দেহের উদ্দেশ্যে, ছুড়ি নিয়ে রওনা হবার জন্য উঠে দাঁড়ালো। আমরাও মনে মনে বিনা ঝুঁকির ও প্রায় বিনা পয়সার মাংসের খিচুড়ি ভোগের আশায় মানসিক প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু বাধ সাধলো ঘরের লোকগুলো। তারা একসাথে প্রায় সকলেই গঙ্গাকে ওখানে এই অন্ধকারে যেতে বাধা দিল। ওরা জানালো যে, “যে সব কুত্তা ছাগল পাহারা দেয়, তারা ওকে কামড়ে ছিঁড়ে ফেলবে। ওই কুত্তার হাত থেকে বেঁচে গঙ্গা তো দুরের কথা, শেরও ছাগল নিয়ে যেতে পারবে না”। আমি নিজেও ঐ জাতীয় কুকুর অন্যান্য পাহাড়ী পথে দেখেছি। স্থানীয় পাহাড়ী কুকুর, কিন্তু বাঘের মতো চেহারা। এইসব কুকুর পাল পাল ছাগল, ভেড়া পাহারা দেয়। এই সব ছাগল, ভেড়ার পাশ দিয়ে যাবার সময়, ছাগল ভেড়ার মালিক আমাদের সাবধান করে দিয়ে বলেছে—ওদের গায়ে হাত না দিয়ে, পাশ দিয়ে চলে যেতে। তাদেরও বলতে শুনেছি, শেরও ওদের কাছ থেকে ছাগল, ভেড়া তুলে নিয়ে যেতে পারবে না।

শেষ পর্যন্ত গঙ্গা আগেই টাং কেটে নিয়ে না আসার জন্য আক্ষেপ করতে করতে, রণে ভঙ্গ দিয়ে বসে পড়লো। সেই পুরানো ফর্মুলায়, ঐ আগুনেই খিচুড়ি রান্না শুরু হ’ল। আমরা আগের মতোই আগুনের ধারে বসে গল্প করছি। এই ঘরের লোকেরা গঙ্গাকে সিগারেট দিল। একটা সিগারেট ওরা দু’-তিনজন মিলে টানছে। ওদের হাবভাব ও কথাবার্তায় মনে হ’ল, ওরা নির্দোষ সিগারেট খাচ্ছে না। আমি গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করা‌য়, ও বললো কুছ নেহি বাবু, ইয়ে সিগারেট হায়। আমার কিন্তু বিশ্বাস হ’ল না। ওদের কাছে একটা সিগারেট চাইতে, ওরা নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করে একটা সিগারেট বার করে, তার মধ্যে চেপ্টা চেপ্টা, কালো কালো, কী যেন ঢুকিয়ে, আমায় বলল, ছাই ঝাড়বেন না। আমি বেশ কয়েক টান দিয়েও, সাধারণ সিগারেটের থেকে কোন পার্থক্য খুঁজে পেলাম না। গঙ্গা আমাকে বললো, বেশী হয়ে যাবে, আর টানবেন না। আমি সিগারেটের অংশটা ওকে দিয়ে দিলাম।

একটু পরেই খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে পড়া গেল। শুয়ে পড়তে বাধ্য হলাম, কারণ ঘরের মালিকদের এর বেশী আলো বা আগুন জ্বালিয়ে বিলাসিতা করার মতো সামর্থ্য নেই। শিলের মতো পাথরের স্ল্যাবটার ঠিক পাশে আমি, আমার পাশে শীতাংশু শুয়েছে। আমরা অতিথি বলে ওরা ক্ষমতার বাইরে হলেও, আগুনে বেশ কিছু শুকনো ডালপালা দিয়ে দিল। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করলো। আগুনের তাপে তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে বলে, শীতাংশু ওর ভিজে উলিকটের গেঞ্জিটা আমার বুকের ওপর মেলে দিল। আগুনের তাপে পাথরের স্ল্যাবটাও বেশ গরম হয়ে গেছে। আমার রীতিমতো গরম লাগছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরের সবাই চুপ করে গেল। শীতাংশুও ঘুমিয়ে পড়েছে। পায়ের কাছের খোলা দরজা দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। এখন বাইরে আর বৃষ্টি পড়ছে না। আকাশ ভরা তারার মেলা। আমার আর ঘুম আসে না। যতবার তন্দ্রা মতো আসে, ঘুম ভেঙ্গে যায়। গরুদের উৎপাতে ঘুম আসা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। এটা পত্ পত্ করে পায়খানা করলো, তো ওটা ছড় ছড় করে পেচ্ছাপ করতে শুরু করলো। তার ওপর মাঝে মাঝই, হাম্বা-আ-আ-আ-আ রব্। সর্বপরি স্যাঁতস্যেঁতে মাটিতে পিসুর উৎপাত ও ঘরের সুগন্ধ আমার ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করলো। আসলে এটা একটা অস্থায়ী গোয়াল ঘর। বহু নীচে এইসব লোকের বাস। ঐসব এলাকা থেকে এরা গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়া নিয়ে আসে ঘাস খাওয়াবার জন্য। অনেকের গবাদি পশু একসাথে এখানে নিয়ে আসা হয়। আর এরা পালা করে কিছুদিনের জন্য এখানে এসে থাকে। প্রত্যেকেই কিছু না কিছু গরু মোষের মালিক। একদল আসে, তারা কিছুদিন থেকে ফিরে যায়, অন্য দল আসে। এইভাবে বর্ষার সময় থেকে কয়েক মাস তারা এখানেই গরু, মোষগুলোকে রাখে। ভাবতেও গর্ব হচ্ছে, অতগুলো গরুর সঙ্গে সমান আদরে, জামাই আদরেও বলা যায়, আজ আমরাও এখানে থাকার সুযোগ পেয়েছি। অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে নানা রকম আজগুবি চিন্তা, মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার ডানপাশে এখনও আগুন জ্বলছে, তবে তার তেজ অনেক কমে গেছে। এইভাবে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা।

খুব জল পিপাসা পাওয়ায় ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে বসে দেখি ডানপাশের আগুন কখন নিভে গেছে। পায়ের কাছের খোলা দরজা দিয়ে হুহু করে বরফ শীতল বাতাস ঢুকছে। শরীরটা কিরকম ম্যাজ্ ম্যাজ্ করছে। বোধহয় পাস্তুরাইজড্ হয়ে গেছি। ঢকঢক্ করে বেশ খানিকটা জল খেয়ে শুয়ে পড়লাম। শরীরের মধ্যে কিরকম একটা অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হয় জ্বর আসছে। এইভাবে শুয়ে থেকে থেকে, কখন আবার ঘুমিয়ে পড়েছি।

এরপরে একাদশ পর্বে……..

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s