রূপকুন্ডের হাতছানি–নবম পর্ব {লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary, Tour Picture এবং ভালো ছবি ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

SRINAGAR (3) (লেখাটি ইচ্ছামতী , Right There Waiting for you…,Bhraman Diary ও Tour Picture এবং ভালো ছবি পত্রিকায়)ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত)এরপরেই শুরু হ’ল তীব্র চড়াই। আস্তে আস্তে পাথুরে রাস্তা ভেঙ্গে ওপরে উঠছি। আরও অনেকক্ষণ হাঁটলাম। এখন পর্যন্ত রাস্তাও কম হাঁটা হ’ল না। কিন্তু গঙ্গার হিসাব মতো সাত কিলোমিটার পথ এখনও শেষ করতে পারলাম না। হঠাৎ আমার কীরকম শ্বাস কষ্ট হতে শুরু করলো। হাঁটতে গেলে বুকের বাঁ দিকটায় একটা যন্ত্রণা অনুভব করছি। বুকের ভিতর হৃতপিন্ড যেন অসম্ভব দ্রুত গতিতে চলছে। মনে হচ্ছে বুকের ভিতর হৃতপিন্ড যেখানে থাকে, সেই জায়গাটায় যেন কী একটা লাফাচ্ছে। এসব রাস্তায় একটু বসে বা দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিলে, আবার আগের শক্তি ফিরে পাওয়া যায়, সুস্থ বোধ হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাও হচ্ছে না। অনেকক্ষণ বসে থেকে বিশ্রাম নিয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে, আবার সেই কষ্টটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। গঙ্গা আমাকে উৎসাহ দিতে জানালো, সামনের চুড়াটা পার হলেই রূপকুন্ডের দেখা মিলবে। অথচ আমি আর এগিয়ে যেতে পারছি না। হঠাৎ মনে হ’ল হার্টে কোন গোলমাল হয় নি তো? হার্ট অ্যাটাক হবে না তো? গঙ্গা বোধহয় আমার মনের কথা, আমার অসহায় অবস্থার কথা, আমার কষ্টটা বুঝতে পেরেছে। সে বললো বিশ্রাম নিয়ে খুব আস্তে আস্তে এগতে। বিশ্রাম নিলাম, কিন্তু এগবার ক্ষমতা ফিরে পেলাম না। প্রায় ষোল হাজার ফুট উচ্চতায় আমার এখন যদি কিছু হয়, এরা কী করবে? শীতাংশু দাঁড়িয়ে পড়লো। আমাকে বললো একটু বসে নিতে। ওর কথাটা যেন কীরকম শোনালো। ওর কথায় ভয়, না বিরক্তি মেশানো, ঠিক বুঝলাম না। আমি বেশ বুঝতে পারছি, আমার আর রূপকুন্ড দেখা হ’ল না। ভাবলাম ওদের বলি, তোমরা চলে যাও, আমি এখানে বসে অপেক্ষা করছি। কিন্তু রূপকুন্ডের দোরগোড়ায় এসে, সে কথা মুখ ফুটে বলতে পারলাম না। গঙ্গা বললো, “হাতে অনেক সময় আছে, তাড়াতাড়ি করার প্রয়োজন নেই। প্রেমসে হাঁটো”। আমার তখন   প্রেম  বার  হচ্ছে। আমি  শীতাংশুকে  বললাম,  তোমরা  এগিয়ে  যাও। আমি একটু  বিশ্রাম  নিয়ে, আস্তে আস্তে  যদি যেতে পারি  তো  যাব।  তোমরা  দেখে এস। ওরা  কিছুক্ষণ  দাঁড়িয়ে  থেকে, সামনের পথ  ধরলো। আমাকে  কী  কষ্টে  যে হাঁটতে  হচ্ছে, বোঝাতে পারবো না। কোনক্রমে লাঠিতে  ভর  দিয়ে  আস্তে  আস্তে, এক  পা  এক  পা  করে ওপরে  উঠছি। ওরা  তখন  অনেকটা  ওপরে  উঠে  গেছে।  আমি  আবার  বসে  পড়লাম। ওরা  আর  একটু  পথ  ওপরে  উঠেই,  দাঁড়িয়ে পড়লো। শীতাংশু  চিৎকার  করে  জানালো,  রূপকুন্ড  দেখা  যাচ্ছে। নতুন উদ্যমে আস্তে আস্তে, অনেকটা সময় নিয়ে ওপরে উঠে এলাম। এখান থেকে ছোট্ট কুন্ডটা দেখা যাচ্ছে বটে, তবে তার সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যাচ্ছে না। আজ এত কষ্ট কেন ভোগ করলাম জানি না। অতীতে কখনও এই অবস্থায় পড়তে হয় নি। কিন্তু কষ্টের শেষ প্রান্তে এসেই যেন সমস্ত কষ্ট লাঘব হ’ল। তরতর করে অনেকটা নীচে নেমে এসে, কুন্ডের পাড়ে দাঁড়ালাম। কুন্ডটাকে একটা গোলাকার নীল জলের ডোবা বললেই ঠিক ব্যাখ্যা করা হবে। ডানদিকটা সম্পূর্ণ বরফে ঢাকা, অপর পাড়টা, অর্থাৎ আমাদের ঠিক সামনের দিকটা পূর্ব দিক। ওদিকের পাহাড়ের চুড়াটা অনেকটা উচু। ফলে হাল্কা রোদ উঠলেও, কুন্ডে তার ছিটেফোঁটাও পড়ছে না। এখন পৌনে আটটা বাজে। শীতাংশু এত কষ্টের পরে রূপকুন্ডের এই রূপ দেখে, একবারে ভেঙ্গে পড়েছে।

কুন্ডের পাড়ে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, কিছু পাথর সাজিয়ে একটা বেদী মতো তৈরী করা, তার উপর অ্যালুমিনিয়ামের তৈরী একটা বড় প্লেট্, একটা  লোহার  শিকে বাঁধা অবস্থায়  দাঁড় করানো আছে। আরও অনেক এই  জাতীয়  প্লেট, হেলান  দিয়ে দাঁড় করানো ও  ইতস্তত  ছড়ানো  পড়ে  আছে। এগুলোতে আগে  যারা এখানে  এসেছে, তাদের নাম, ঠিকানা খোদাই  করা। এখানে আসবার সময় তৈরী করে নিয়ে আসা হয়েছে। বেদীর ওপরে একটা পলিথিন পেপারে মোড়া একটা ছোট্ট ডায়েরী,  তাতে কয়েকজন বাঙালীর নাম, ও তাদের গাইডের  নাম  লেখা আছে। এদের মধ্যেই  একজন,  লক্ষ্ণৌ আসার  সময়  ট্রেনে  অনিতা  নামে  মেয়েটার  মুখে  শোনা তার পরিচিত ছেলেটা। নাথু  সিং অসুস্থ হওয়ায়, অপর  একজন গাইড এদের দলকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। সঙ্গে  অপর একটা দলও এসেছে। আমরাও ঐ ডায়েরীতেই  আমাদের  নাম,  ঠিকানা ও  গাইড-কুলিদের  নাম লিখে, আবার পলিথিন পেপারে মুড়ে, বেদীর ওপর চাপা  দিয়ে  রেখে দিলাম। অ্যালুমিনিয়ামের  প্লেটগুলোয়,  বেশীরভাগই  পশ্চিম বঙ্গ  বাসীর  নাম।

শীতাংশু জানালো, এত কষ্ট করে এতদুর এসে, রূপকুন্ডের এই রূপ  দেখে, তার আর অন্য কোথাও যাবার ইচ্ছা নেই। সে এখান থেকে সোজা বাড়ি ফিরে যাবে। অনেক আশা নিয়ে এসে রূপকুন্ডের এই রূপ দেখে, আমার মনও খুব খারাপ হয়ে গেছে। তবে আমি নিশ্চিত, এখান থেকে কথামতো তিন তাল দেখে আমরা পিন্ডারী গ্লেসিয়ার যাবই। শীতাংশুর এই বিমর্ষভাব ততক্ষণ আর থাকবে  না। ছোট একটা ব্রান্ডির বোতলে, গঙ্গাকে কুন্ড থেকে জল ভরে আনতে বললাম। গঙ্গা কুন্ড থেকে জল ভরে এনে দিল। শীতাংশু  গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলো,  তার ভীষণ জল পিপাসা  পেয়েছে, এই জল খাওয়া যাবে কী না। গঙ্গা জানালো, এই জল খেলে নির্ঘাত অসুখ  করবে। তাই জল খাওয়ার পরিকল্পনা ত্যাগ করে ও নীচে কুন্ডের কাছে, একবারে জলের কাছে নেমে গেল।

আমি ডানদিক দিয়ে কিছুটা নেমেই, একটা সাদা মতো কী যেন আবিস্কার করলাম। তুলে দেখি,  একটা নরকঙ্কালের মুন্ডু। সাদা  ধবধবে, দাঁতগুলো পর্যন্ত অবিকৃত আছে। এতক্ষণ নানা সমস্যায় রূপকুন্ডের ধারে হাজার কঙ্কালের কথা ভুলেই গেছিলাম। রূপকুন্ডের বুকে শয়ে শয়ে কঙ্কাল, বা কঙ্কালের হাড়গোড় দেখতে পাওয়ার কারণ হিসাবে দু’রকম মত শোনা যায়। ১)প্রাকৃতিক ২)ধর্মীয়।

১) সম্ভবত বহু বছর আগে কোন ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিতে যাওয়ার সময় কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ মৃত্যুমুখে  পতিত হয়। এর বহু বছর পরে, এক ইংরেজ সাহেব জায়গাটায় গিয়ে অনেক মৃতদেহ ও কঙ্কাল দেখতে পান। ঘটনার কারণ ও সময়কাল বিশ্লেষণের জন্য একটি মহিলার অবিকৃত মৃতদেহ তিনি সঙ্গের কুলিদের নিয়ে আসতে বলেন। কুলিরা রাজী না হয়ে ভয়ে পালিয়ে আসতে চাইলে, তিনি বন্দুক তুলে ভয় দেখিয়ে মৃতদেহটি নিয়ে আসেন। বলতে লজ্জা করছে, মৃত্যুর কারণ ও সময় আমার জানার সুযোগ হয় নি।

২) হিমালয়ের দেবী, নন্দাদেবী রুষ্ট হওয়ায়, ঐ অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হাজার হাজার মানুষের একসাথে মৃত্যু হয়।

কারণ যাই হোক না কেন, বহু মানুষ রূপকুন্ডে একসাথে মারা গেছিলেন। জায়গাটা অসম্ভব ঠান্ডা হওয়ায়, এখনও মৃতদেহ দেখতে পাওয়া না গেলেও, মাংসযুক্ত হাড়গোড় দেখতে পাওয়া যায়। এবং মহিলাদের ওখানে যাওয়ায়, অলিখিত নিষেধ আছে বলে শোনা যায়।

DSCN0981    DSCN0985

যাহোক্, ওটাকে নিয়ে গঙ্গা ও শীতাংশুর কাছে ফিরে এলাম। গঙ্গা জানালো, এত পরিস্কার কঙ্কাল, বা তার অংশ এখন আর বিশেষ  দেখতে পাওয়া যায় না। কঙ্কালের মুন্ডুতো দেখাই যায় না। এখানে যারা আসে, স্মৃতি হিসাবে অনেকেই কিছু কিছু অংশ নিয়ে যায়। অবশ্য বরফ খুঁড়লে পূর্ণ কঙ্কাল এখনও অনেক পাওয়া যাবে। তবে বরফের ওপরে পূর্ণ কঙ্কাল আর একটাও পাওয়া যাবে  না। গঙ্গা  চারিদিকে ছড়ানো ছেটানো অনেক হাড়ের টুকরো দেখালো। কোনটা হাতের অংশ,  কোনটা পায়ের অংশ। তবে নরমুন্ড আর একটাও  দেখতে পেলাম না। কোন কোন হাড়ের ওপর কালো মতো জমা অংশ দেখিয়ে, গঙ্গা জানালো, এগুলো মাংস। ঠান্ডায় নষ্ট হয়নি।  হয়তো তাই হবে, কিন্তু পরীক্ষা করার প্রবৃত্তি হ’ল না। গঙ্গা আমাকে নরমুন্ডুটা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে বললো। কিন্তু একমাত্র  অবিকৃত নরমুন্ড সঙ্গে করে নিয়ে যেতে ইচ্ছা করলো না। তাছাড়া এতটা রাস্তা হেলমেটের মতো নরমুন্ড হাতে করে নিয়ে গেলে,  ফেরার পথে পুলিশের ঝামেলা, এবং সর্বপরি এই বয়সে নরমুন্ড হাতে বাড়ি ফিরে বাড়ির লোকেদের, ছেলে সন্ন্যাসী হয়ে নরমুন্ড হাতে  হিমালয় থেকে ফিরেছে ভেবে কষ্ট পাবার হাত থেকে মুক্তি দিতে,  নরমুন্ড আর নিয়ে আসা হ’ল না। তাই পরের যাত্রীদের সহজে দর্শণ লাভের জন্য, ওটাকে বেদীর ওপর রেখে এলাম। ডানদিকের বরফের ওপরেই বেশী কঙ্কালের হাড়গোড় পড়ে আছে। গঙ্গা জানালো, ঐ  বরফের তলায় এখনও অবিকৃত গোটা মৃতদেহ আছে। দেহের মাংস পর্যন্ত নষ্ট হয় নি। কারণ, ঐ বরফ কখনও গলে না।

রূপকুন্ডের পাড়ে পাড়ে আমরা অনেকক্ষণ ঘুরলাম, জলে হাত  দিলাম। গঙ্গা বললো ওপরে উঠে আসতে। এবার মেঘ  করতে শুরু করবে। আর একটু পরেই ফিরতে হবে। আমরা ওপরে উঠে এসে বেদীর ধারে বসলাম। এ জায়গাটার ঊচ্চতা ১৬৪৭০ ফুট। গঙ্গা  জানালো, সাড়ে ন’টা-দশটার মধ্যে, জায়গাটা সাদা মেঘে ঢেকে যাবে। সূর্য পূর্বদিকের চুড়ার কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। সূর্য ঠিক মাথার ওপর না উঠলে, রূপকুন্ডের জলে রোদ পড়ার আশা কম। অর্থাৎ সাড়ে এগারটা-বারটার আগে কুন্ডের জলে সূর্যালোক পড়ার কোন  সম্ভাবনা নেই। অথচ ওর কথা মতো প্রতিদিনই তার অনেক আগেই জায়গাটা গভীর মেঘে ঢেকে যায়। বোঝাই যাচ্ছে রূপকুন্ডে প্রায় কোনদিনই সরাসরি সূর্যালোক পড়ে না। খুব  ভাল আবহাওয়া থাকলে, ন’মাসে ছ’মাসে রূপকুন্ড রৌদ্রস্নান করার সুযোগ পায়। এখন ন’টা বাজে। গঙ্গা বললো এর আগে কলকাতার এক ভদ্রলোক রূপকুন্ডে পৌঁছেই, সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে কূন্ডের ধারে পূজোয় বসেন। কিন্তু তিনি আর তাঁর পূজো শেষ করার সুযোগ পাননি। তার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। এবার আমাদের ফিরতে হবে। আমাদের ছবি  তোলাও শেষ। নরমুন্ড নিয়ে শীতাংশু, গঙ্গা ও কুমারের ছবি তুলতেও ভুললাম না। সকাল থেকে একবারে খালি পেটে আছি। খানিক  বাদাম চিবিয়ে প্রাতরাশ সারলাম। রূপকুন্ডের রূপ, মহিত হয়ে বসে থাকার মতো নয়, তাই আমরা রূপকুন্ডকে শেষ বারের মতো  দর্শন করে, বিদায় জানিয়ে সদলবলে বগুয়াবাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম।

রূপকুন্ডে আসবার সময় লক্ষ্য করেছি বগুয়াবাসা থেকে প্রায় রূপকুন্ড পর্যন্ত পথের ধারে ধারে, ব্রহ্মকমল ফুটে আছে। কিন্তু প্রায় সব  ফুলই মাকড়সার গুটির মতো সাদা একটা আবরণে ঢাকা। কী কারণ,  জিনিসটাই বা কী, জানি না। এতদিনের স্বপ্ন, রূপকুন্ড দেখে  মন ভরে নি। শীতাংশুর হাঁটার গতি অনেক কমে গেছে। মনে মনে ভাবছি ও মণিমহেশ গেলে কী করবে? এ পথে তবু অফুরন্ত  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে, মণিমহেশে তো তাও নেই। মনে মনে একটা দুর্ভাবনা, সত্যি যদি ও আর কোথাও যেতে না চায়? অনেকটা  পথ নেমে এসেছি। এখন শুধু উতরাই এর পথ, কাজেই হাঁটতে কোন কষ্ট নেই। এবার একটা ঢালু বড় পাথরের ওপর দিয়ে নামতে  হবে। আসার সময় ওটার ওপর দিয়েই হেঁটে গেছিলাম। পাথরটার ওপর পা দিয়েই পা পিছলে আছাড় খেলাম। কোন রকমে সামলে নিয়ে শীতাংশুকে সাবধান করে দিলাম। পাথরটার ওপর একটা হাল্কা শ্যাওলার আস্তরণ, ওপর থেকে দেখাও যায় না, বোঝাও যায় না। তবে ভীষণ পিচ্ছিল, একটু নেমেই আবার আছাড় খেলাম। এবার কিন্তু অনেকটা গড়িয়ে পড়লাম। ভয়ের কোন কারণ নেই, কারণ জায়গাটায় খাদ নামক বিপজ্জনক বস্তুটি নেই। তবে এবার দাঁড়িয়ে উঠে বুঝলাম, হাঁটুর নীচে বেশ খানিকটা জায়গা কেটে গেছে। অথচ প্যান্টের কোথাও ছেঁড়েনি। শীতাংশু আমাকে সাবধানে নামতে বললো। ওদের কাউকে আর জানালাম না যে, আমার পা কেটে গেছে। কাটা জায়গাটা বেশ জ্বালা করছে। আস্তে আস্তে একসময় সেই গ্লেসিয়ার দু’টো পার হয়ে গেলাম। এবার কিন্তু আগের মতো অতটা অসুবিধা হ’ল না। এঁকেবেঁকে একসময় বগুয়াবাসা গুহার সামনে এসে হাজির হ’লাম।

অসম্ভব খিদে পেয়েছে। সকাল থেকে এক কাপ চা পর্যন্ত খাওয়া হয় নি। এসে দেখলাম সকালের খাবার তো দুরের কথা, কফির ব্যবস্থাও হরিশ করে রাখে নি। আমি আর শীতাংশু গুহার বেডরুমে ঢুকে, টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। যাবার সময় আমার এত কষ্ট হ’ল, অথচ এখন দেখছি শীতাংশু আমার থেকে অনেক বেশী কাহিল হয়ে পড়েছে। ব্যাগ থেকে বাদাম বার করে চিবতে শুরু করলাম। হাত বাড়িয়ে শীতাংশুকেও দিলাম। ও অতি কষ্টে হাত পেতে নিল। একটু পরে কুমার কফি দিয়ে গেল। শীতাংশুকে দেখে মনে হ’ল ও ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি কাত হয়ে শুয়ে শুয়ে কোনমতে কফি খেলাম। শীতাংশু কিন্তু কাতও হ’ল না, কফিও খেল না। একবার ডাকলাম, কিন্তু কোন উত্তর পেলাম না। আমিও চোখ বুজে শুয়ে রইলাম। কতক্ষণ শুয়ে ছিলাম জানিনা। আমরা দু’জনেই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গঙ্গার ডাকে উঠে পড়লাম বটে, কিন্তু আর হাঁটতে ইচ্ছা করছে না। হাঁটবার শক্তিও যেন নেই। শীতাংশুর ওঠার ভঙ্গি দেখে বুঝলাম, ওর অবস্থাও খুবই খারাপ। বিস্কুট বার করে ওকে দিলাম। মালপত্র বাঁধাছাদা গঙ্গারাই করলো। আস্তে আস্তে গুহা থেকে বার হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। শুরু হ’ল পথ চলা। যদিও জানি এবার শুধু উতরাই এর পথ, কাজেই কষ্টও কম এবং খানিকটা হাঁটলেই, আবার হাঁটার ক্ষমতা ও ইচ্ছা ফিরে পাওয়া যাবে। রাস্তা এখন সমতল, তাই হাঁটতে বিশেষ কষ্ট হচ্ছে না। পথে হরিশ ও কুমারের কথাবার্তায় মনে হ’ল, ওদের মধ্যে কোন অশান্তি হয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা কী জানতে পারলাম না। গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলাম “আজ রাতে আমরা কোথায় থাকবো”? ও বললো, আজ রাতে বৈদিনীতে থাকাই ভাল হবে। শীতাংশু তার অবসন্ন দেহে একবার মাথা নাড়লো। মনে হ’ল ও বোধহয় রাজী হয়ে গেল। আমার কিন্তু তিন তাল ও পিন্ডারীর কথা মাথায় রেখে, আজ আরও এগিয়ে যাবার ইচ্ছা। তাছাড়া বৈদিনী বুগিয়াল তো খুব বেশী দুরের পথও নয়। যাইহোক, সেই পুরানো, আধা চেনা পথ ভেঙ্গে, আস্তে আস্তে একসময় আমরা বৈদিনী বুগিয়াল এসে পৌঁছলাম। সারা রাস্তা হরিশ, কুমারের থেকে একটা ব্যবধান রেখে হেঁটে আসলো। বৈদিনীতে থাকার বাংলোটা, আলি বুগিয়ালের থেকে ভাল নয়। অন্তত বাইরে থেকে আমার তো তাই মনে হ’ল। এখানে মাঠে বসে আমরা ছাতু মেখে খেলাম। আজ কেন রুটি তৈরী করেনি বুঝলাম না। গঙ্গাকে আড়ালে ডেকে কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করলাম। সে জানালো, হরিশ আমাদের ব্যাগ থেকে সিগারেট, বিস্কুট ইত্যাদি নিয়েছে। গঙ্গা সেটা জানতে পেরে হরিশকে বলেছে, “বাবুরা তো সবকিছু আমাদের না চাইতেই দিয়েছে, তবে তুমি কেন চুরি করবে”? এই নিয়ে ওদের মধ্যে অশান্তি হয়েছে। আমি গঙ্গাকে বললাম ওসব ছেড়ে দাও, ও যে নিয়েছে আমরা বুঝতেও পারিনি। ওর কিছু প্রয়োজন হলে আমায় বলতে বলবে। গঙ্গা বললো, হরিশের এই স্বভাবের জন্য তার বদনাম হবে। এ লাইনে একবার কারো নামে বদনাম হলে, কোন খদ্দের তাকে বিশ্বাস করতে চায় না। আমি তাকে এই ব্যাপারটা ভুলে যেতে বললাম।

BAIDINI BUGIALবৈদিনী বুগিয়াল।

এখানে একদল নতুন যাত্রীর সাথে আলাপ হ’ল। চার-পাঁচ জনের একটা দল। শ্র্রীরামপুর, চন্দননগর ইত্যাদি জায়গা থেকে এসেছে। সঙ্গে চারজন কুলি। এদের গাইড রাম সিং। ওরা সঙ্গে আইস অ্যাক্স্, ছোট ছোট টেন্ট্, ইত্যাদি অনেক কিছু পাহাড়ী উপকরণ ও বিস্তর শুকনো খাবার নিয়ে এসেছে। কোন বিস্কুট কোম্পানী তাদের বিস্কুটের টিন দিয়েছে। আরও অনেকের কাছ থেকে তারা অনেক সাহায্য পেয়েছে। এইসব কথা, তাদের দলের একজনের কাছেই শুনলাম। আমরা সারা পথে বাদাম, অল্প বিস্কুট চিবিয়ে কাটিয়েছি। এরা দু’টো বিস্কুটের মধ্যে কোনটায় মাখন, কোনটায় ক্রীম, কোনটায় জ্যাম ইত্যাদি দিয়ে নিজেরাও খেল, আমাদেরও দিল। ওদের মধ্যে দু’জনের খুব বড় বড় কথা, আমাদের তারা বিভিন্ন জায়গার নাম উল্লেখ করে জানতে চাইলো, আমরা এই টুরে সেইসব জায়গা গেছি কিনা, বা যাবার প্ল্যান আছে কিনা। অনেক জায়গার নামই আমরা শুনি নি। তারা বিজ্ঞের হাসি হেসে, প্র্রায় বিদ্রুপ করেই বললো, তাহলে এ পথে আসলেন কেন? তাদের কথাবার্তার ধরণ ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনে হবে, যেন তারা এভারেষ্ট সমেত সমস্ত হিমালয় জয় করে, এখানে এসেছে, উল্লিখিত জায়গাগুলো জয় করে কোর্স কমপ্লিট করতে। আমাদের সাথে আইস অ্যাক্স্ নেই, তাঁবু নেই, এমন কী যথেষ্ট খাবার দাবার নেই শুনে, তারা আর এক দফা বিদ্রুপের হাসি হাসলো। ওরা আজ রাতটা এখানেই থাকবে, তাই কোথায় তাঁবু ফেলা হবে, তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। হাবভাব দেখে মনে হ’ল, এভারেষ্ট জয়ের পথে বেস্ ক্যাম্পে রাত্রিবাসের আয়োজন। আমার এদের সঙ্গ আর ভাল লাগলো না। এখনও আমাদের হাতে অনেক সময় আছে। কাজেই “ওয়ান” গ্রামে চলে যাওয়াই স্থির করে ফেললাম।

একটু পরে ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, আমরা আবার নিজেদের রাস্তা ধরলাম। বৈদিনী খুবই সুন্দরী সন্দেহ নেই, তবে আলি বুগিয়ালের মতো সুন্দরী সে মোটেই নয়, এ কথা হলফ্ করে বলতে পারি। বেশ কিছুটা পথ এসে, একটা সরু খালের মতো জায়গা দিয়ে আসতে হ’ল। অল্প একটু পথ। খালটার ওপরে বাঁপাশের গাছের শুকনো পাতা পড়ে পড়ে, ভরাট হয়ে গেছে। অবশ্য খালের মতো দেখতে হলেও, ওটা আসলে খাল নয়, জলও নেই। যেন খানিকটা জায়গার মাটি কেটে, কেউ নালার মতো তৈরী করেছে। আর তার ভিতর শুকনো পাতা পড়ে পড়ে, সেটা ভরাট হয়ে গেছে। খাল বা নালাটার বাঁপাশে অনেক গাছ আছে, আর সেইসব গাছের ঝরে পড়া শুকনো পাতায়, সেটা ভর্তি হয়ে গেছে। জায়গাটা একটু স্যাঁতসেঁতে। ওটার ওপর দিয়ে হাঁটার সময়, মনে হচ্ছে যেন কোন স্পঞ্জ দিয়ে রাস্তা তৈরী করা হয়েছে। লাফাতে লাফাতে, নাচতে নাচতে, পার হতে হয়। এর ওপরেই গঙ্গা একটা জোঁক হাতে তুলে আমায় দেখিয়ে বললো, জোঁক দেখতে চেয়েছিলেন, এই দেখুন আপনার জোঁক। আশ্চর্য, ওর জোঁকের ব্যাপারটা মনেও আছে? নন্দদার সাবধান বাণী মনে হতেই সচেতন হয়ে গেলাম। কিন্তু একটা জোঁককেও পায়ে বা কোথাও রক্ত খাওয়ার জন্য কামড়াতে দেখলাম না। গঙ্গা বললো এ জায়গায় এখন যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে এখনি শ’য়ে শ’য়ে জোঁক এসে হাজির হবে। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্যই হোক বা দুর্ভাগ্যই হোক, বৃষ্টিও হ’ল না, জোঁকও দেখা হ’ল না। কিন্তু আর কিছুটা পথ যাবার পরই মুষলধারে বৃষ্টি আসলো। অতর্কিতে এত জোরে বৃষ্টি আসলো যে, ওয়াটার প্রুফ বার করে গায়ে দেবার সময় পর্যন্ত পেলাম না। হাতের কাছে বগুয়াবাসার গুহায় পাতা, ভাঁজকরা পলিথিন সিটটা ব্যাগে ছিল। আমি সামনে, শীতাংশু পিছনে দু’হাত বাড়িয়ে পলিথিনটাকে ধরে ছাদের মতো তৈরী করে, সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। সরু রাস্তাটার ডান পাশটায় গোলাপ গাছের মতো কী একটা কাঁটা যুক্ত গাছের জঙ্গল। অনেকটা রাস্তার পাশে লাইন দিয়ে ঐ গাছের ঘন জঙ্গল। ঐ গাছের কাঁটায় পলিথিন সিটটা বার বার আটকে গিয়ে, অনেক জায়গায় ছিঁড়ে গেল। আমাদের হাতেও অনেক জায়গায় ছড়ে গেল। এইভাবে কিছুটা পথ গিয়ে বুঝলাম, মাথার ওপর কষ্ট করে ওটা ধরে রাখার কোন মানে হয় না। আমরা একদম ভিজে গেছি, বৃষ্টিও অসম্ভব জোরে পড়ছে। ভীষণ ঠান্ডা, তার ওপর এভাবে হাঁটতেও খুব অসুবিধা হচ্ছে, হাঁটার গতিও কমে যাচ্ছে। গাইড-কুলিরা আমাদের থেকে বিশ-পঁচিশ হাত পিছনে মালপত্র নিয়ে ভিজে ভিজে আসছে। আমরা বাধ্য হয়ে পলিথিন সিট্ মুড়ে ফেলে, হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। তাতে কী লাভ হ’ল অবশ্য নিজেরাও জানিনা। চোখে মুখে বৃষ্টির জলে ছুঁচ ফোটার মতো বোধ হচ্ছে। হান্টার সু-এর ভিতরে জল ঢুকে, নতুনদার পাম্প সু-এর আকার নিয়েছে। এইভাবে অনেকটা পথ প্রায় দৌড়ে আমরা প্রায় আট হাজার ফুট উচ্চতায়, ওয়ান ডাকবাংলোয় এসে উপস্থিত হ’লাম।

বাংলোয় কাউকে দেখা গেল না। গঙ্গারাও এসে হাজির হ’ল। কেয়ার টেকারের দেখা পাওয়া গেল না। দরজায় ছোট্ট একটা তালা লাগিয়ে, সে কোথায় গেছে কে জানে। গঙ্গা সময় নষ্ট না করে, তার বা পেরেক জাতীয় কিছু দিয়ে দিব্বি বাংলোর তালা খুলে ফেললো। আমরা ভিতরে ঢুকে সমস্ত জামা কাপড় খুলে, ভিজে জাঙ্গিয়া পরে ব্যাগ থেকে একে একে সমস্ত জিনিস বার করে, মেঝেতে রাখলাম। খাবার জিনিস সবই পলিথিন প্যাকে আছে, তাই ওগুলো খুব একটা ভিজতে পারেনি। তবে একটা জামা কাপড়ও শুকনো নেই। এমনকি মোটা মিলিটারি কাপড়ের পাশ বালিশের মতো ব্যাগগুলো পর্যন্ত, ভিজে চপচপ্ করছে। সব কিছু ভাল করে চিপে, দড়ি টাঙ্গিয়ে, তাতে শুকতে দেওয়া হ’ল। ওদের ও আমাদের এত কিছু টাঙ্গাবার মতো দড়ির অভাব দেখা দিল। বৃষ্টি এখনও অবিরাম পড়ে যাচ্ছে। আমরা খালি গায়ে, ভিজে জাঙ্গিয়া পরে বসে রইলাম। গঙ্গা সম্ভবত বাংলোর কাঠ এনে, আগুন জ্বালালো। এর মধ্যে বাংলোর কেয়ার টেকার এসে উপস্থিত হ’ল। বাংলোর তালা খোলা নিয়ে সে একটা প্রশ্নও করলো না, বরং গঙ্গা কফি তৈরী করছে দেখে, পরম উৎসাহে গঙ্গার সাহায্যে, কাজে হাত লাগালো। আমরা বাড়ির উদ্দেশ্যে চিঠি লিখলাম। এখানে ডাকবাক্সে চিঠি ফেলার ব্যবস্থা আছে, তবে সে চিঠি যাবে কী না, বা গেলেও ক’বছরে যাবে, বলতে পারবো না। ওয়ান বেশ বড় গ্রাম। গঙ্গা কফি দিয়ে গেল। শুয়ে শুয়ে গরম কফিতে চুমুক দিয়ে ভাবতে লাগলাম, গতকাল রাতে যদি এই বৃষ্টি হ’ত, তাহলে আমরা বোধহয় কোনমতেই বেঁচে ফিরতাম না। সাড়ে চোদ্দ হাজার ফুট উচ্চতায় বৃষ্টি মানেই তুষারবৃষ্টি। বগুয়াবাসার গুহায় পলিথিন সিট্ আমাদের বৃষ্টি বা তুষারপাতের হাত থেকে রক্ষা করতে পারতো না। বৈদিনীতে একটু আগের দেখা দলটার কী অবস্থা কে জানে। গঙ্গা কাঠের আগুনে আমাদের সমস্ত ভিজে জিনিস শুকতে বসে গেল। হরিশ, কুমার ও এই বাংলোর কেয়ার টেকারও, এই কাজে হাত লাগালো। আমরা শুয়ে বসে বিশ্রাম নিতে লাগলাম।

শীতাংশু জানালো, তিন তাল যাবার তার আদৌ কোন ইচ্ছা নেই। রূপকুন্ডের যদি এই রূপ হয়, তবে খপলু তাল, বিগুন তাল (বিখল তাল), বা ব্রহ্মতালের কী রূপ হতে পারে, ও এখান থেকেই বুঝতে পারছে। আমি ওকে বোঝালাম, জীবনে আর কখনও এদিকে আসা হবে না, কাজেই কষ্ট হলেও দেখে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কিন্ত ও, ওর গোঁ ধরে বসে রইলো। কিছুতেই রাজী করাতে না পেরে বললাম, একজন কুলি সঙ্গে নিয়ে ও যেন গোয়ালদাম চলে যায়। আমি তিন তাল দেখে ওখানে চলে যাব। ও জানালো, ও বাড়ি ফিরে যেতে চায়। আমি কোন কথা না বলে, আগুনের কাছে চলে গেলাম। গঙ্গাকে তিন তালের কথা বলতে, ও খুব উৎসাহ দেখিয়ে বললো ওগুলো খুব সুন্দর তাল, আমরা না দেখে ফিরে গেলে, আমরাই ঠকবো। কী করা উচিৎ ভেবে পাচ্ছি না। বেশ কিছু প্রায় শুকনো জামা কাপড়, গঙ্গা ঘরে নিয়ে গিয়ে, দড়িতে মেলে দিয়ে আসলো। একটু পরে আমি ঘরে গেলে শীতাংশু জানালো, পরশু জন্মাষ্টমী। গঙ্গা তাকে বলেছে ঐ সব জায়গাগুলোয় কিছুই দেখার নেই, তাছাড়া জন্মাষ্টমীতে বৃষ্টি হবেই। ওপথে বৃষ্টি হলে খুব কষ্ট হবে। কাজেই ওখানে যাবার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

গঙ্গা আমাকে একরকম কথা, শীতাংশুকে আর একরকম কথা কেন বলছে কে জানে। তবে কী শীতাংশুর মতো ওরাও ঐ তিন তাল যেতে চায় না? উঠে গিয়ে গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করাতে, সে বললো তার ওখানে যেতে কোন আপত্তি নেই, আমরা চাইলেই ওরা আমাদের ওখানে নিয়ে যাবে। ওকে বললাম শীতাংশুকে একটু বুঝিয়ে বলে রাজী করাতে। আমার কথায় গঙ্গা শীতাংশুকে কী বললো ওই জানে, শীতাংশু কিছুতেই রাজী হ’ল না। শেষে গঙ্গাকে সঙ্গে নিয়ে শীতাংশুর সাথে কথা বলে অনেক বুঝিয়ে, ওকে রাজী করালাম। গঙ্গা হঠাৎ এরকম ব্যবহার শুরু করলো কেন কে জানে। শীতাংশুর কথাবার্তায় মনে হ’ল গঙ্গাই ওকে না যাবার জন্য বুদ্ধি দিয়েছে। যদিও সে সারাক্ষণ আমাকে ওখানে যাবার জন্য উৎসাহ দিয়ে গেছে। যাহোক্, আবার নতুন করে মোটামুটি শুকিয়ে যাওয়া পোষাক এবং অন্যান্য সব কিছু গুছিয়ে নেওয়া শুরু হ’ল। অধিকাংশ জামা কাপড়ই দড়িতে ঝোলানো রইলো। রান্না হয়ে গেলে আমরা সবাই বসে গল্পগুজব শুরু করলাম। গঙ্গা জানালো, বৈদিনীতে আলাপ হওয়া ঐ দলটার গাইড রাম সিং, তার মামাতো ভাই হয়। আরও বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা মারার পর, আমরা রাতের খাবার খেয়ে, শুয়ে পড়লাম। এখানকার বাংলোটা বেশ ভাল। বোধহয় এই গ্রামটা বেশ বড়, এবং এই পথের প্রায় সব যাত্রীই রাতে এখানে থাকে বলেই, এটাকে একটু যত্ন করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয়।

এরপর দশম পর্বে……

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s