স্মৃতি (চতুর্থ পর্ব)

Self যাহোক্, জঙ্গলের ভিতর ফাঁকা ঘরের মতো জায়গাটায় বেশ ভালই আড্ডা চলতে লাগলো। বাইরে থেকে কিছু দেখা বা বোঝার অবকাশ নেই। একই পথে যাতায়াত করে করে, সরু একটা পায়ে চলার পথ তৈরী হয়েছিল। মাথা নীচু করে, প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে জঙ্গলের ভিতরে গিয়ে, এক মানুষ উচু, সত্তর-আশি বর্গফুট মতো ফাঁকা জায়গা। ঐ জায়গার জঙ্গল কেটে পরিস্কার করা হয়েছে। চারপাশে লতাপাতা, আগাছার জঙ্গল। দেবদারু গাছে পেরেক পুঁতে, জামা প্যান্ট রাখার হ্যাঙ্গার তৈরী করা হয়েছিল। দুই গাছের মধ্যে পাতলা কাঠের তক্তা আটকে, মাদুর বা টুকটাক জিনিস রাখার তাকও তৈরী করা হয়েছিল। আমরা যে ঐ জঙ্গলের ভিতর নিজেদের সৃষ্ট ফাঁকা অংশে আড্ডা মারি, পাড়ার প্রায় সবাই জানতো, কিন্তু এতগুলো ছেলেকে কেউ ঘাঁটাতো না, বা অকারণে ঘাঁটাতে সাহসও করতো না।

একদিন রাতে কালীশঙ্করের মঠে বিচিত্রানুষ্ঠান হবে। প্রতি বছরেই একটা নির্দিষ্ট দিনে, ঐ মঠে বিচিত্রানুষ্ঠান হ’ত। পরবর্তীকালে ঐ মঠের অনুষ্ঠান থেকে, তখনকার দিনের কত বড় বড় শিল্পীকে যে দেখার সযোগ হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। যাহোক, ঐ সন্ধ্যায় অনেক কাকুতি-মিনতি করে, তাড়াতাড়ি ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, বিচিত্রানুষ্ঠান দেখতে যাবার অনুমতি পাওয়া গেল। কালীশঙ্করের মঠে যাবার পথে, মুখার্জী পাড়ায় দেবু ও বিফলের সাথে দেখা। বিফলের মা লোকের বাড়ি কাজ করতো। আমরা তার সাথে মিশতাম, এটা অনেকেই ভাল চোখে দেখতো না, মেনে নিতে পারতো না। কিন্তু নিরক্ষর বিফল, আমাদের বেশ ভালই সঙ্গী ছিল। আজও আমি প্রায় আগের মতোই, যে কোন শ্রেণীর মানুষের সাথে মিশতে, কোন বাধা বা অসুবিধা বোধ করি না। বিফলের কথায় যথা সময়ে আসবো।

হঠাৎ দেবু ও বিফল পন্ডিত স্যারের গাছে নারকেল পারার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। পন্ডিত স্যরের বাড়ির পাশেই পুকুর পাড়ে, এক মানুষ উচু জঙ্গলের মধ্যে, পর পর বেশ কয়েকটা নারকেল গাছে অনেক নারকেল হয়েছে। নারকেল গাছে উঠতে আমরা তিনজনই ওস্তাদ। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল দড়ি নিয়ে। দড়ি না পেলে অত উচু গাছ থেকে নারকেল কাঁদি নামাবো কী করে? কথায় বলে ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। দড়ির ব্যবস্থাও হয়ে গেল। রঘুবীর নামে একটা ছেলে আমার স্কুলেই, আমার থেকে এক ক্লাশ উচুতে পড়তো। সে পড়াশোনায় খুব ভাল ছিল। রঘুবীরের কাকা, শিবু আবার আমার দাদার ঘনিষ্ট বন্ধু। ওদের বাড়ির কুয়োতে, দু’দিক থেকে দু’জনে জল তোলার জন্য, একটা লোহার রডে দু’টো কপিকল লাগানো ছিল। ঐ দু’টো দড়িই বালতি থেকে চুপিসারে খুলে এনে, গিঁট দিয়ে বড় করা হ’ল। আমি বারবার বললাম, দড়িটা গাছ থেকে মাটি পর্যন্ত লম্বা হয় নি, আরও একটু দড়ির প্রয়োজন। কিন্তু দেবু ও বিফল তর্ক শুরু করলো, অবশ্যই গাছের মাথা থেকে মাটি পর্যন্ত দড়ি পৌঁছে যাবে। শেষে আমি গাছে ওঠার জন্য জঙ্গলে ঢুকলাম। চারিদিক অন্ধকার, আবছা একটা আলো আঁধারি রাত। রাতও তখন অনেক। কিন্তু বিফল একটা কাটারি নিয়ে, কোমরে ঐ লম্বা দড়ি বেঁধে, গাছে ওঠার জন্য তৈরী হয়ে গেল। কাটারিটা বোধহয় লোহা আবিস্কারের পরেই তৈরী হয়েছিল। কাটারির পিছন দিকটা বোধহয় সামনের দিকের তুলনায় বেশী ধারালো।

বিফল জঙ্গলে ঢুকে গাছে উঠতে শুরু করলো। হাল্কা, ফ্যাকাসে চাঁদের আলোয়, তাকে পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। একটু পরেই বিফল গাছের মাথায় উঠে, নারকেল কাঁদি কাটতে শুরু করলো। নিস্তব্ধ রাতে বিফল একটা করে ভোঁতা কাটারির কোপ দেয়, আর বেশ জোরে একটা আওয়াজ হয়। আমি বিফলকে কাঁদির ওপরের নৌকার মতো অংশটা ছাড়িয়ে, ফেলে দিতে বললাম। কাঁদির ওপরে যতবার কাটারির কোপ পড়ছে, নৌকার মতো অংশটা কাঁদির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে, ততবার ঐ বিকট আওয়াজ সৃষ্টি করছে। এইভাবে বেশ কয়েকবার আওয়াজ হওয়ার পর, কাঁদিটা তীব্র গতিতে নীচে নামতে শুরু করলো। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই, আমি লাফ দিয়ে সরে গেলাম। নারকেল কাঁদিটা মাটি থেকে আট-দশ ফুট ওপর পর্যন্ত নেমে এসে, দড়ির অভাবে প্রবল ঝাঁকুনি খেয়ে, দড়ি ছিঁড়ে জঙ্গলের মধ্যে পড়ে গেল। খুব জোরে একটা ভাড়ী কিছু পড়ার আওয়াজ হয়েই, আবার সব নিস্তব্ধ। হঠাৎ বেশ জোরে কথা বলার আওয়াজ শুনে দেখি, পুকুরের আর এক পাশে, একটু দুরে রাস্তার ধারে, শ্যাম ভূঁইঞা, তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে— চোর চোর, নারকেল পারছে, ইত্যাদি বলে চিৎকার করতে শুরু করেছে।

এই এক লোক। কিছুদিন আগে এই পুকুরেই রাতে মাছ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে বেইজ্জত হয়েছিল। সেই লোকই আজ সাধু হয়ে, নারকেল চোর বলে চিৎকার করছে। আমি জানি বিফল গাছ থেকে নামতে নামতেই, ওর চিৎকারে লোক জড়ো হয়ে যাবে। তাই এতটুকু সময় নষ্ট না করে, এক ছুটে ওর পাশ দিয়ে চলে গেলাম। ওর এত সাহস নেই যে আমাদের কাউকে ধরে। ফলে আমাকে দেখে ও মনে করবে যে, আমি নারকেল পারতে গাছে উঠেছিলাম, এবং গাছ থেকে নেমে পালিয়ে যাচ্ছি। বাস্তবে হ’লও তাই। ও আমাকে ছুটে যেতে দেখে, চিৎকার বন্ধ করে দিল। বেশ কিছুক্ষণ পরে অকুস্থলে ফিরে এসে বিফলকে ডাকাডাকি করেও, কোন সাড়া পেলাম না। জঙ্গলে ঢুকেও নারকেল কাঁদি, দড়ি, কাটারি, কিছুই নজরে পড়লো না।

পরদিন শুনলাম বিফল গাছ থেকে নেমে, নারকেল কাঁদি নিয়ে জঙ্গলের ভিতর আমাদের গুপ্ত আস্তানায় যাচ্ছিল। যদিও কাঁদির অধিকাংশ নারকেলই মাটিতে আছাড় খেয়ে, কাঁদি থেকে খুলে গিয়ে, জঙ্গলে ছিটকে পড়েছিল। কাঁদি ও কিছু খোলা নারকেল নিয়ে বিফল জঙ্গলের আস্তানায় যাবার সময়, গুপিদা তাকে ঐ অবস্থায় দেখে চিৎকার চেঁচামিচি করতে, বিফল নারকেল ফেলে পালায়। আমরা নারকেল গাছতলায় এসেও, কোন নারকেল খুঁজে পেলাম না। বোধহয় সমস্ত নারকেলই গুপির পেটে গেছে।

আমাদের আর এক সঙ্গী, অরুন সাধুখাঁ সমস্ত ঘটনা শুনে, এক ঢিলে দুই পাখি মারার পরিকল্পনা করলো। অরুনকে দেখতে যেমন মোষের মতো ছিল, গায়ে শক্তিও তেমন মোষের মতোই ছিল। অরুন, শ্যাম ভূঁইঞার বাড়ির সামনের নারকেল গাছে, দিনের আলোয় নারকেল পারার পরিকল্পনা করলো। ওর ধারণা, এতে শ্যাম ভূঁইঞা ও গুপিদা, উভয়কেই বোঝানো যাবে যে, আমরা তাদের পরোয়া করি না। এখন ভাবলেও অবাক লাগে যে, শ্যাম ভূঁইঞা ও গুপিদাকে বোঝাবার জন্য, আবার সেই পন্ডিত স্যারের নারকেল গাছই ব্যবহার কর হ’ল। আমি গাছে উঠে একটা একটা করে ডাব নীচে ফেলছি, আর অরুন হাতের তেলো দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় তার গতি রোধ করছে, যাতে মাটিতে পড়ে একটা ডাবও ফেটে না যায়। এইভাবে অনেক ডাব পেরে, শ্যম ভূঁইঞার সামনেই ডাব কেটে, ডাবের জলে হাত মুখ ধুয়ে, ডাবের জল খাওয়া হ’ল। আজ ভাবলে অবাক লাগে, ঐ সময়ে আমি দাঁত দিয়ে কী সুন্দর নারকেল ছাড়াতে পারতাম।

কিছুদিন এইভাবে কাটার পর, আমরা বুঝতে পারলাম, আমাদের জঙ্গলের আস্তানা আর নিরাপদ নয়। কারণ অনেকবার আমরা জঙ্গলের আস্তানায় গিয়ে বুঝতে পেরেছি যে, আমাদের অনুপস্থিতিতে এই জায়গায় অন্য কারো পায়ের ধুলো পড়েছে। আগন্তুক কিন্তু কোন কিছু চুরির মতলবে এখানে আসে নি, কারণ কোন কিছু খোয়া যায় নি। ফলে খেলার মাঠের পাশে পুকুর পাড়ে, একই রকম খানিকটা জঙ্গল ঘেরা ফাঁকা জায়গা পরিস্কার করে, ছয় ফুট বাই ছয় ফুট মতো জায়গা কোদাল দিয়ে কেটে কেটে, প্রায় চার ফুট গভীর করে, চৌবাচ্চার মতো করা হ’ল। এবার নীচের মাটি ভাল করে দুরমুশ দিয়ে পিটিয়ে সমান করে, ভিজে মাটি ও গোবর দিয়ে লেপে, বেশ শক্ত ও পরিস্কার মেঝে তৈরী করা হ’ল। পাকা মেঝে তৈরী করার ইচ্ছা থাকলেও, সিমেন্ট বালির অভাবে তা আর সম্ভবপর হ’ল না। মাটির ঠিক ওপরে, দু’-আড়াই ফুট উচু মাটির দেওয়াল তৈরী করে, তার ওপর টিন দিয়ে ছাদ তৈরী করা হ’ল। ভিজে মাটি দিয়ে চারপশের দেওয়াল বার বার ভাল করে লেপে দিয়ে, একটা জলের রিজার্ভারের মতো, আন্ডার গ্রাউন্ড ঘর তৈরী হ’ল। মাটির ওপরের অংশে একটা টিনের দরজা লাগিয়ে, তালা লাগাবার ব্যবস্থাও করা হ’ল। এই ঘরটা আমাদের ক্লাব ঘর হিসাবে ঠিক করা হ’ল। ঘরের মাটিতে অনেক বস্তা পেতে, তার ওপর মাদুর পেতে, বেশ সুন্দর বসার ব্যবস্থাও করা হ’ল। দেওয়ালের তিন দিকে কাঠের তক্তা দিয়ে তাক তৈরী হ’ল। ফুটবল, ক্রিকেটের সাজ সরঞ্জাম এখানেই রাখার ব্যবস্থা করা হ’ল। আমাদের এই বিশ্বাস ছিল যে, তালা ভেঙ্গে এ ঘরে ঢোকার সাহস কারো হবে না। জমিটা যে কার কেউই জানিনা, তবে এখনকার মতো তখন অন্যের জমিতে ক্লাব ঘর বা শনি মন্দির তৈরী করে, জমি দখলের বিশেষ উপদ্রব ছিল না বলেই বোধহয়, কেউ কোন আপত্তি করে নি।

এইভাবে এক সময় বৎসরিক পরীক্ষা এসে গেল। সংস্কৃত পরীক্ষায় পাশ করাবার একটা ব্যবস্থা করার জন্য মেনোকে ধরলাম। আমি খুব ভাল করে জানি, সংস্কৃতে পাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। পড়লেও নয়, না পড়লেও নয়। কাজেই সংস্কৃতর পিছনে অযথা সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না। কিন্তু এটাতো মানতেই হবে যে, দেশে এখনও কিছু ভাল লোক আছে বলেই, দেশটা এখনও সুষ্ঠ ভাবে চলছে। আমার দুরাবস্থার কথা শুনে, এরকমই একজন সহৃদয় উচু শ্রেণীর ছাত্র জিজ্ঞাসা করলো— “শব্দরূপ, ধাতুরূপ পড়া আছে? লিখতে পারবি”? লতা, মুনি, মতি, ইত্যাদি কয়েকটা মুখস্থ করাই ছিল, বললাম এগুলো জানা আছে। বলেই মুখস্থ বলতে শুরু করলাম— মতি-মতী-মতয়ঃ, মতিম্-মতী-মতিন, মত্যা—। সে আমাকে আর এগোতে না দিয়ে বললো, “বাঃ, চমৎকার তৈরী হয়েছে, এতেই চলবে। এক কাজ করবি, তুই খাতার প্রথমেই শব্দরূপ, ধাতুরূপ লিখবি, তারপরে যা পারবি লিখে যাবি”। বললাম, “আর তো কিছুই পারবো বলে মনে হয় না”। সে বললো, “ঠিক আছে, পারলে লিখবি, না পারলে আন্দাজে যা পারবি, লিখে যাবি, তাতে কিছু আসবে যাবে না। তবে হ্যাঁ, অনেক পাতা ধরে লিখবি। পারলে কাগজ নিবি, যাতে তোর খাতা বেশ মোটা হয়। শেষে আবার সেই শব্দরূপ, ধাতুরূপ লিখবি। মোটকথা দু’টো শব্দরূপ, ধাতুরূপের মধ্যে যেন, বেশ কিছু লেখা পাতা থাকে। ক্লিয়ার? দেখবি পাশ করে গেছিস”।

আন্দাজে সংস্কৃত খাতায় পাতার পর পাতা কী লিখবো ভেবে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “আন্দাজে এত কী লিখবো, ধরা পড়ে যাব না তো”? সে খুব তাচ্ছিল্য সহকারে বললো—“ফুঃ, নারে বাবা না। সাপ, ব্যাঙ যা মনে আসে লিখে যাবি। পন্ডিত স্যার পঞ্চাশটা খাতায় পঞ্চশবার শব্দরূপ, ধাতুরূপ দেখবেন, কাজেই পঞ্চাশের জায়গায় একান্নবার দেখলেও ধরতে পারবেন না। চুয়ান্ন, পঞ্চান্নবার দেখলেও নয়”। যাহা ঊনিশ, তাহাই বিশ জানতাম, এখন জানলাম যাহা পঞ্চাশ, তাহাই একান্ন। সত্যি জানার কোন শেষ নাই।

পরীক্ষার খাতায় ছোট ছোট বাক্য সংস্কৃতে অনুবাদ, ছেড়ে দিতে ভীষণ গায়ে লাগছিল, কষ্টও কম হচ্ছিল না। এক একটায় পাঁচ নম্বর করে আছে। কথা মতো আন্দাজে আন্দাজে অনুবাদ করে দু’-তিনটে লিখে হঠাৎ দেখি, শেখ আলমগীর বাইরে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টার পরে আমিও বাথরুমে যাবার সুযোগ পেলাম। ওকে জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পেয়ে ভাবলাম, এই অনুবাদ থেকে আমার পঁচিশ নম্বর পাওয়া আর কে আটকায়? প্রয়োজনীয় বাকী নম্বর শব্দরূপ, ধাতুরূপ থেকে উঠে আসবে, কাজেই দু’বার করে একই প্রশ্নের উত্তর লেখার ঝুঁকি আর নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

আলমগীর প্রথমেই সাবধান করে দিয়ে বললো, “দু’টো বলছি, মনে করে নিয়ে গিয়ে লিখে দে। সবক’টা মনে রাখতে পারবিনা। সত্যি এই এক ছেলে। সমস্ত বিষয়েই ও সমান পারদর্শী। বরাবর প্রথম হয়। শুধু প্রথমই হয় না, সমস্ত বিষয়েই প্রথম হয়। কিন্তু লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু কথাটাতো আর এমনি আসেনি। জেদ করে সবক’টা শুনে, মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে পরীক্ষার হলে ফিরে গিয়ে বুঝলাম, “দাদখানি ডাল, মুসুরের চাল” হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে আবার সেই পুরানো পরামর্শ মতো পাতার পর পাতা হাবিজাবি লিখে, পরামর্শ দাতার কথা মতো, আবার শব্দরূপ ও ধাতুরূপ লিখে এলাম। যতদুর মনে পড়ে সংস্কৃত পরীক্ষায় সেবার আটচল্লিশ পেয়েছিলাম। অর্থাৎ টোটকায় কাজ হয়েছিল।

অষ্টম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীতে উঠলাম। এবার কী নিয়ে পড়বো? বিজ্ঞান বিভাগে অঙ্ক আছে। পাটিগণিত পারি, কিন্তু বীজগণিত জানিনা। কলা বিভগে সংস্কৃত আছে, ভূগোল তো আছেই, তাই ঠিক করলাম কমার্স পড়বো। আমাদের সময় কমার্স প্রায় নতুন এসেছে, সেই মতো কমার্সে ভর্তি হলাম। যদিও জানিনা কমার্সে কী কী বিষয় পড়তে হয়।

নতুন শ্রেণী, নতুন বই, নতুন নতুন বিষয়, নতুন শিক্ষক। রঞ্জিত রায় চৌধরী ও গৌরী শঙ্কর মান্না, কমার্সের সাবজেক্ট পড়াতেন। এছাড়া সিভিক্স্ ও ইকনমিক্স্ পড়াতেন সমীর বোস নামে একজন শিক্ষক। নতুন ধরনের এই সব সাবজেক্ট্ আমার কিন্তু বেশ ভালই লাগলো। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আমি, রঞ্জিত বাবুর বেশ প্রিয় ছাত্রে পরিণত হ’লাম। গৌরী শঙ্কর বাবুও বেশ ভাল পড়াতেন। তাঁর নাম গৌরী শঙ্কর মান্না, সংক্ষেপে জি.এম। আমরা কিন্তু আড়ালে তাঁকে গুল মাষ্টার বলতাম। এমন অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলতেন, যেগুলো একটা বাচ্চা ছেলেও বিশ্বাস করবে না।

সমীর বাবু যে কী পড়াতেন, তা বোধহয় তিনি নিজেও জানতেন না। তবে এটা বুঝতাম যে তাঁর ইকনমিক্স্ না পড়িয়ে, আইন পড়ানো উচিৎ ছিল। তাঁকে আড়ালে বি.আই বা বিশ্ব আইনজ্ঞ বলে ডাকতাম। যে কোন ব্যাপারে তাঁর প্রশ্নের শেষ ছিল না। খুব গরম লাগছে বলে ফ্যানের সুইচ অন্ করলাম, ব্যাস, শুরু হ’ল তাঁর প্রশ্নবাণ।

সুইচ বোর্ডে হাত দিলি কেন?

ভীষণ গরম লাগছিল স্যার।

হঠাৎ এত গরম লাগছে কেন?

আজ বোধহয় একটু বেশী গরম পড়েছে।

তোর একার-ই বা এত গরম লাগছে কেন?

এইভাবে তাঁর প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়ে যেতে হ’ত। ফলে তাঁকে প্রথম থেকেই আমরা পছন্দ করতাম না। তাই তাঁর সাথে একটা দুরত্ব তৈরী হতে শুরু করলো। তাঁর পড়ানো সিভিক্স-ইকনমিক্স্, আমার কাছে দুর্বোধ্য মনে হ’ত, ভালও লাগতো না। প্রায়ই তাঁর পড়া তৈরী হ’ত না। আর পড়া বলতে না পারলেই, শুরু হ’ত হাজার একটা প্রশ্ন।

আমার সাথে কমল গুপ্ত নামে একটা ছেলে পড়তো। কমল ছিল আমার খুব বন্ধু। তাকে আপাত দৃষ্টিতে খুব নিরীহ শান্তশিষ্ট মনে হলেও, সে ছিল অসম্ভব বিচ্ছু। সমীর বাবু তাকেও পছন্দ করতেন না। এইভাবে কয়েক মাস কাটার পর, সমীর বাবু বি.টি. পড়তে চলে গেলেন। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। সমীর বাবুর জায়গায়, সুমিতা মন্ডল নামে এক অবিবাহিতা ভদ্রমহিলা জয়েন করলেন। তাঁর চেহারার সাথে হিন্দী সিনেমার টুনটুন-এর বেশ মিল ছিল। প্রথম দিন তিনি ক্লাশে এসে চেয়ারে বসেই জিজ্ঞাসা করলেন—“তোমাদের এটা কোন বিষয়ের ক্লাশ”? আমরা সবাই মিলে একসাথে জানালাম, “ইকনমিক্স্ দিদিমণি”।

ইক্-নমিক্স্? গুড, বলেই তিনি হাতের রুমাল দিয়ে মুখ মুছলেন। তারপর শুরু করলেন, “আমার আগে ইক্-নমিক্স কে পড়াতেন? আগের রুমাল টেবিলে রেখে, নতুন রুমাল বার করে, খুব সাবধানে যত্ন সহকারে আবার মুখ মুছলেন। আমরা বললাম, সমীর স্যার দিদিমণি।

গুড। তোমরা ইক্-নমিক্স্ কতদুর পড়েছ? আমাদের ইকনমিক্স্ কতদুর পড়া হয়েছে জানাতে, তিনি তারপর থেকে মিনিট পাঁচেক পড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা আমার পড়ানো বুঝতে পেরেছো”? কোন ঝামেলায় না গিয়ে আমরা জানালাম, “হ্যাঁ দিদিমণি”। গুড, তাহলে আমি যাই? বলে, আমাদের উত্তরের অপেক্ষা না করে, আবার একটা নতুন রুমাল বার করে মুখ মুছে, সবক’টা ব্যবহার করা রুমাল টেবিল থেকে নিয়ে, গটগট্ করে ক্লাশ ছেড়ে চলে গেলেন।

শুরু হ’ল হৈচৈ। তখনও পীরিয়ড শেষ হতে অনেক দেরি। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, শ্রী পরিমল সেন। সত্যি কিনা জানিনা, তবে শুনতাম তিনি নাকি প্রফুল্ল সেনের ভাইপো। অত্যন্ত কড়া প্রকৃতির মানুষ। ক্লাশ রুমে হৈহল্লার আওয়াজ শুনে, তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ক্লাশ রুমে চলে এলেন। ক্লাশে কোন শিক্ষক নেই দেখে, তিনি আমাদের হৈচৈ করতে বারণ করে ফিরে গেলেন। একটু পরেই সুমিতাদি ক্লাশে ফিরে এলেন। এবার তিনি বেশ গম্ভীর। নতুন শিক্ষিকার সাথে ছাত্রদের সম্পর্ক গড়ার আগেই সম্পর্কে চিড় ধরে গেল।

এরপর থেকে ছাত্রদের সাথে তাঁর সম্পর্ক মোটেই মধুর ছিল না। তাঁকে কোন ছাত্রই খুব একটা ভয় পেত না, মানতোও না। আমাদের স্কুল, নবম শ্রেণী থেকে কো-এডুকেশন ছিল। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের সকালে স্কুল ছিল। আমাদের ক্লাশে দু’জন মেয়ে পড়তো, বেদবতী মৈত্র ও লক্ষী। লক্ষীর পদবী আজ আর মনে করতে পারিনা। এরা দু’জনেই কিন্তু সুমিতাদিকে খুব মানতো। তাঁর কথাও শুনতো। আমরাও পরিমল বাবুর ভয়ে, তাঁর ক্লাশে বাধ্য ছেলে হয়েই থাকতাম।

ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের স্কুলে মিনু ভট্টাচার্য নামে আর একজন অবিবাহিতা ভদ্রমহিলা পড়াতেন। তাঁকে স্কুলের সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা সম্মান করতো, ভয় পেত, আবার ভালোও বাসতো। সমস্ত শিক্ষকরা মিনুদিকে, বোধহয় তাঁর ব্যক্তিত্বের জন্যই, খুব সম্মান করতেন। অথচ সুমিতাদিকে কেউ মানতোও না, ভয়ও পেত না। আর সুমিতাদিকে ভয় পাওয়ার কোন কারণ না থাকায়, সিভিক্স্-ইকনমিক্স্ পড়া না করলেও চলতো। অনেকটা তোমরা আমায় শান্তি দাও, আমি তোমাদের পড়া ধরবো না গোছের একটা অলিখিত চুক্তি। ফলে ক্রমশঃ আমরা এই দু’টো বিষয়ে বেশ পিছিয়ে পড়তে লাগলাম।

স্কুলে দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য নামে একজন ইংরাজী শিক্ষক ছিলেন। অজাতশত্রু কথাটা বই-এ পড়া যায় বা অভিধানে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে কেউ অজাতশত্রু হতে পারে না। কারণ একজন ব্যক্তি কখনই সকলের প্রিয় হতে পারে না। শত্রু মাত্রই তো আর খুনোখুনি, রক্তারক্তি কান্ড করে না। একজন যদি অপর একজনকে পছন্দ না করে, তবে দু’জনে দু’জনের মিত্র, একথা নিশ্চই বলা যায় না। কিন্তু দ্বিজেন বাবু ছিলেন স্কুলের সবার প্রিয়, সবার মিত্র, সবার ভালবাসা ও শ্রদ্ধার পাত্র। তিনি ছিলেন সত্যিকারের শিশুসুলভ নিষ্পাপ, নিষ্কাম এক আদর্শ পুরুষ।

দ্বিজেন বাবুরা বার ভাইবোন। বেনারসে বাড়ি। তাঁর কাছ থেকে তাঁর বাড়ির কথা শুনতাম। তাঁর বড় ভাইবোনেরা ছিলেন কেউ ঈশান স্কলার, কেউ ডক্টরেট্, প্রথম বিভাগে প্রথম বা দ্বিতীয় স্থানাধিকারী। দ্বিজেন বাবু ছিলেন, এদের মধ্যে অতি সাধারণ, ইংরাজীতে এম.এ.। ছাত্রদের তিনি আদর করে ছাওয়াল বলতেন। ইংরাজী ভাষায় এত পান্ডিত্য দেখা যায় না। কিন্তু তাঁর দোষ ছিল তিনি থামতে জানতেন না। আমাদের সময় যতদুর মনে পড়ে, সম্ভবত দু’শ নম্বরই আনসিন্ ছিল। কোন টেক্সট্ বই ছিল বলে মনে করতে পারছি না।

একটা স্টোরি লিখতে হ’ত একশত কুড়ি শব্দের মধ্যে। একটা কুকুর মুখে করে মাংস খন্ড নিয়ে নদীর ওপর ব্রীজ দিয়ে পার হবার সময়, নদীর জলে তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখে কী করলো, এই গল্পটা তিনি আমাদের লিখে দিলেন। তাঁকে কোন কিছু লিখে দিতে বললেই, তিনি ডিক্টেট্ করতেন, আমরা লিখতাম। পরে অন্য কোনদিন, সেই লেখাটাই নিজে লিখেছি বলে তাঁকে দেখালে, তিনি অনেক শব্দই পরিবর্তন করে দিয়ে বলতেন, এই জায়গায় এই শব্দটা ঠিক ভাল লাগছে না, বরং এই শব্দটা লিখলে অনেক বেশী ভাল শোনাচ্ছে।

যাহোক্‌ কুকুরের মাংস নিয়ে নদী পর্যন্ত আসতেই, বোধহয় দু’শ শব্দ লেখা হয়ে গেল। এর মধ্যে পঁচিশ শতাংশ শব্দ, জীবনে কোনদিন শুনি নি। ফলে পরবর্তীকালে আমরা নিজে লিখে তাঁকে দিয়ে শুদ্ধ করাতাম। তাঁর একটা বড় গুণ ছিল, তিনি কখনও ছাত্রদের গায়ে হাত তোলা তো দুরের কথা, বকাবকি পর্যন্ত করতেন না। দরকারও হ’ত না। লেখায় কোন রকম ভুলভ্রান্তি হলে, খুব জোর গাধা বলতেন। অন্য যে কোন শিক্ষক, এমন কী আমার বাবাকেও দেখেছি, ইংরাজী লেখায় কোন ভুল পেলে রাগারাগি করতেন এবং ক্রমে ক্রমে নাউন, প্রোনাউন কয় প্রকার, ভার্ব, অ্যাডভার্ব, টেন্স্, জেন্ডার, সব একে একে টেনে এনে তালগোল পাকিয়ে, জানা জিনিসকে অজানা করে ছাড়তেন। দ্বিজেন বাবু ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। আমি ভাল ছেলে, এটা যদি ইংরাজীতে কেউ আই ইজ এ গুড বয় লেখে, তাহলেও তিনি বিরক্ত না হয়ে বাক্যটা ঠিক করে দিয়ে বলতেন, আই এর পরে ইজ হয় গাধা? ফলে তাঁর কাছে নিজে লেখার সাহস জন্মাতো। তিনি সব সময় একটা উপদেশ দিতেন— simple sentence এ বাক্য লেখ, বেশী জটিলতায় যেও না। কিন্তু মুশকিল হ’ল, তাঁকে খাতা দেখাতে গেলে, তিনি প্রায় অধিকাংশ শব্দই পরিবর্তন করে দিয়ে বলতেন, এটা লিখলে শুনতে ভাল লাগবে। তাঁর স্টক্ অফ্ ওয়ার্ডসের ভান্ডারও ছিল সমুদ্রের মতো বিশাল। কিন্তু পরীক্ষার খাতায় কেউ কোনদিন তাঁর হাতে ভাল নম্বর পায় নি। তার প্রধান কারণ ছিল, সমস্ত শিক্ষকরা যখন পরীক্ষার খাতা দেখে স্কুলে জমা দিয়ে দিতেন, তখনও তাঁর খাতা দেখা শুরুই হ’ত না। শেষে স্কুল থেকে তাড়া খেয়ে, লাল পেন্সিল নিয়ে খাতা দেখতে বসতেন। তাঁর স্বভাব ছিল প্রতিটি খাতার প্রতিটি লাইন লাল দাগ দিয়ে খুঁটিয়ে পড়া, এবং বেশীর ভাগ শব্দে লাল গোল পাকিয়ে তার মাথায় অন্য কোন সমার্থক ভাল শব্দ লাল পেন্সিলে লেখা। এরপর গোটা খাতা লাল দাগে ও লাল রঙের শব্দে ভরে গেলে, নোংরা করসে, ভাল লেখে নাই, ভাল শব্দ প্রয়োগ করে নাই, ইত্যাদি মন্তব্য করে, কম করে নম্বর দিতেন। তাঁর দেখা ইংরাজী খাতায় প্রত্যেক ছাত্রকে গ্রেসমার্ক দিতে হয়েছে, এমন ঘটনাও ঘটেছে।

এখনকার মতো প্রথম বিভাগে বেশীর ভাগ ছাত্রের পাশ করা, বা অধিকাংশ বিষয়ে লেটার পাওয়া বা স্টার পাওয়ার কথা, সেই সময় ভাবাই যেত না। কোন স্কুলে আট-দশটা ছাত্রছাত্রী প্রথম বিভাগে পাশ করলে, স্কুলে হৈচৈ পরে যেত। এখনকার ছেলে-মেয়েদের এতটুকু ছোট না করে বলতে পারি, সেই সময়ের ছেলে-মেয়েরাও কিন্তু কম ভাল ছিল না। বেশ মনে পড়ে, সাতের দশকের শেষে মলবিকা চক্রবর্তী নামে একটি মেয়ে, হায়ার সেকেন্ডারী পরীক্ষায়, কলা বিভাগে প্রথম হয়। তার প্রাপ্ত মোট নম্বর, বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম ছেলেটির প্রাপ্ত মোট নম্বরের থেকেও বেশী ছিল। মেয়েটি বাংলা ও ইংরাজী, উভয় বিষয়েই লেটার মার্কস্ পেয়েছিল। এটাও একটা অসাধারণ ও বিরল ঘটনা হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল। তার মেধা নিয়ে খবরের কাগজে খুব লেখালিখিও হয়েছিল।

যাহোক্, দ্বিজেন বাবু বলতেন, “আমার হাতে কেউ ত্রিশ পেলে, ফাইনাল পরীক্ষায় সে পঞ্চাশ পাবে”। কিন্তু তাঁর দেওয়া নম্বর দেখে বাবার হাত থেকে বাঁচলে, তবে তো ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। তিনি ছিলেন ভবঘুরে প্রকৃতির মানুষ। যদিও তিনি একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন, কিন্তু সে বাসায় তিনি প্রায় থাকতেনই না। তিনি অবিবাহিত ছিলেন, ফলে একাই থাকতেন। তাই বোধহয় তাঁর নিজের বাসার প্রতি কোন টান বা আকর্ষণও ছিল না। তার বাসায় ঢুকতে গেলে মাকড়সার জাল সরিয়ে, ধুলো মেখে ঢুকতে হ’ত। তাঁকে তাঁর বাবার লেখা কোন কোন চিঠি তিনি পড়ে শোনাতেন। তাঁর বাবা ঠিক কী করতেন, এতদিন পরে মনে করতে পারিনা। সম্ভবত বেনারস হিন্দু ইউনিভর্সিটির প্রফেসার ছিলেন। তাঁর বাবা অদ্ভুত কবিতার ছন্দে, ছেলেকে চিঠি লিখতেন। একটা চিঠি একদিন তিনি পড়ে শুনিয়েছিলেন। তাতে অদ্ভুত কবিতার ছন্দে তাঁকে তাঁর বাবা যা লিখেছিলেন, তার সারমর্ম— তিনি একটা পাকা আমের মতো বৃন্তে ঝুলছেন। যে কোন মুহুর্তে বৃন্ত থেকে খসে পড়তে পারেন। কাজেই তিনি তাঁর ছেলেকে হাত পুড়িয়ে খাবার হাত থেকে মুক্তি দেবার জন্য, বিবাহ করার উপদেশ দিয়েছিলেন, এবং সেটা তিনি দেখে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবা বোধহয় জানতেন না যে, তাঁর পুত্রের হাত পুড়বার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। কারণ তাঁর পুত্র রান্নাঘরের ধারেকাছেও যেতেন না। আর যাবেনই বা কেন? সেখানে তো রান্নার কোন ব্যবস্থাও ছিলনা। তাঁর ঐ বাসায় কখনও-সখনও পড়তে গিয়ে দেখেছি, ধুলোয় ভরা ঘরটা তিনি কিভাবে নিজে না থেকে, শত শত মাকড়সাদের অবাধে থাকার সুবন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। তাঁর বাবার কবিতার ছন্দে লেখা চিঠির প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, তাঁর খুব অল্প বয়সে একবার কঠিন অসুখ করেছিল। তাঁর বাবা তাঁকে নিজ হাতে ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ খাওয়াতেন। কোন একটা ওষুধে বোধহয় অ্যালকোহলের মিশ্রণ ছিল। সেই ওষুধটা তাঁকে খাওয়াবার সময়, তাঁর বাবা তাঁকে বলেছিলেন— “নিজ হাতে খাওয়ায় দারু, এমন পিতা দেখেছ কারু”? ইংরাজীতে অনুবাদ করতে।

তাঁকে কতবার দেখেছি স্কুলে এসে ধুতি পরেই টিউবওয়েলের জলে স্নান করে নিতে, অথবা দুপুরের খাবার হিসাবে মুড়ি, আর ঠান্ডা আলুর চপ্ খেয়ে নিতে। তাঁর ভবঘুরে জীবনের আর একটা নমুনা দিয়ে এবং তাঁর নীচের দুই ভাইয়ের কথা বলে, তাঁর প্রসঙ্গ শেষ করবো। তিনি কখন যে কোথায় থাকতেন, কী খেতেন, কেউ জানতো না। একদিন বেশ রাতে কোথা থেকে ঘুরে ফিরে এসে, পন্ডিত স্যারের বাড়িতে এসে উপস্থিত। এরকম আমার বড়িতেও অনেক রাতে পড়াতে চলে আসতেন। ইচ্ছা না থাকলেও অত রাতে তাঁর কাছে ইংরাজী নিয়ে বসতে হ’ত। অত রাতে আমাকে পড়িয়ে, তিনি যে কোথায় থাকতেন কে জানে। আমার ও তাঁর বাড়ির মধ্যে দুরত্ব, প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার তো বটেই। যাহোক্, তাঁর ডাকে পন্ডিত স্যারের ছেলে দরজা খুলে দিতে, তিনি শোবার ঘরে গিয়ে বললেন, “অনেক রাত হয়ে গেছে, একটু সরে সরে শোও দেখি, এখানেই শুয়ে পড়ি”।

দ্বিজেন বাবুর ছোট এক ভাই একবার আমাদের স্কুলে তার দাদার সাথে দেখা করতে এসেছিল। সে শিবপুর বি.ই. কলেজে পড়তো। ঐ সময়ে অত আধুনিক পোষাকে তাকে দেখে আমরা অবাক হয়ে গেছিলাম। হাতে বালা, বিরাট জুলপি, পকেটে চিরুনি বা ছুড়ি জাতীয় কিছু একটা হবে। অবাক হয়েছিলাম, কারণ সে দ্বিজেন বাবুর ভাই। তার নাম সম্ভবত বুধেন্দ্র নারায়ণ। পরবর্তীকালে সে খুব ব্রিলিয়্যান্ট্ রেজাল্ট করে ইঞ্জিনিয়ার হয়।

দ্বিজেন বাবুর একবারে ছোট ভাইয়ের নাম ছিল ধ্রুব, সম্ভবত ধ্রুবেন্দ্র নারায়ণ। সে ছিল বংশের কুলাঙ্গার। কী কারণে বলতে পারবো না, ধ্রুবকে আমাদের স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছিল। একবার, সম্ভবত সপ্তম শ্রেণীতে সে সমস্ত বিষয় মিলে মোট সতের নম্বর পেয়ে রেকর্ড করেছিল। বিশ্ব রেকর্ডও হতে পারে। হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা, গ্রীষ্মকাল সম্বন্ধে রচনা লিখতে দেওয়া হয়েছিল। ধ্রুব লিখেছিল—গ্রীষ্মকালে ভীষণ গরম পড়ে, মাঠ ঘাট গরমে ফেটে যায়, পুকুরের জল শুকিয়ে যায়। এরপরই আসে বর্ষাকাল। বৃষ্টির জলে মাঠ, ঘাট, পুকুর জলে ভর্তি হয়ে যয়। চারিদিক জল কাদায় ভরে যায়। যে দিন সারাদিন ধরে খুব বৃষ্টি হয়, ছাতা নিয়েও স্কুলে যাওয়া যায় না, সেদিন আমাদের স্কুলের হেড মাষ্টার মশাই রেনি ডে দিয়ে দেন। তিনি খুব ভাল ও দয়ালু লোক। এরপর এক পাতা হেড মাষ্টার মশাই এর গুণগান।

এ হেন ধ্রুব হঠাৎ একদিন কোথা থেকে একটি মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে, তার দাদাকে শুধু ছ’টি শব্দ ব্যয় করে, জীবনের একটা বড় অধ্যায়কে কত সহজে ব্যাখ্যা করে দিল— “বিস্কুট কিনতে গিয়ে বিয়ে হয়ে গেল”। কথায় বলে লাখ কথার কমে বিয়ে হয় না। কিন্তু কোন কথা না বলে, শুধু দোকান থেকে বিস্কুট কিনতে গিয়ে বিয়ে হয়ে যাওয়ার নমুনা বোধহয়, ভূভারতে আর কোথাও পাওয়া যাবে না। এর কয়েক মাস পরে ধ্রুবকে লাল কাপড় ও লাল চাদর গায়ে, সাধু হয়ে যেতে দেখেছিলাম। তার জীবনে হঠাৎ আসা স্ত্রী, তাকে হঠাৎই ছেড়ে চলে যায়। পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ, দ্বিজেন বাবুদের আত্মীয় ছিলেন বলে শুনেছিলাম। এক পরিবারে দু’-দু’জন সন্ন্যাসী, ভাবা যায়? স্কুল ছেড়ে আসার বেশ কয়েক বছর পরে শুনেছিলাম নিতান্ত অসহায়, নিঃসঙ্গ জীবন শেষ করে, দ্বিজেন বাবু ইহলোক ত্যাগ করেছেন। পোষ্ট অফিস ও ব্যাঙ্কে প্রচুর টাকা সঞ্চিত থাকলেও, তাঁর চিকিৎসা সেভাবে করা হয় নি।

এদিকে আরও কয়েকজন বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে, মাঝে মাঝেই স্কুল পালানো শুরু হ’ল। এরা কিন্তু কেউই আমার সাথে এক    শ্রেণীতে পড়ে না। এদের সকলের বয়স আমার কাছাকাছি হলেও, সকলেই আমার থেকে নীচু শ্রেণীতে পড়তো। গদা, কচি, অঞ্জন, চন্দন, অনিল, প্রদীপ, ইত্যাদি কয়েকজন ছিল স্কুল পালানো দলের নিয়মিত সদস্য।

কোনদিন রঙ্গীন মাছ কিনতে যাওয়া, কোনদিন বা বল্ কিনতে যাওয়া, এসব তো ছিলই, তার সাথে ছিল ভিক্টোরিয়া, যাদুঘর, ব্যান্ডেল চার্চ বা ইমাম-বাড়া ইত্যাদি দর্শণ করতে যাওয়া। কতবার যে ব্যান্ডেল বা কোলাঘাটে স্কুল পালিয়ে গেছি তার ইয়ত্তা নেই। কতবার বিপদের মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু আমাকে কোনদিন প্রত্যক্ষ ভাবে বিপদে পড়তে হয় নি। হাওড়া থেকে মেল, এক্সপ্রেসের যে সব empty rake সাঁত্রাগাছি কার শেডে যেত, তাতে করে সাঁত্রাগাছি, অথবা ঠিক একই ভাবে, সাঁত্রাগাছি থেকে হাওড়া গিয়ে, প্রয়োজন বা ইচ্ছা মতো এদিক সেদিক গিয়ে, সময় মতো বাড়ি ফিরে আসা।  হাতে সামান্য খাতা ও পাতলা বই। বিচিত্র অভিজ্ঞতা, আরও বিচিত্র সব ঘোরাফরা, সব লিখতে গেলে রাময়ণ হয়ে যাবে। আজকালকার ছেলেমেয়েরা এই সব আনন্দের কথা ভাবতেও পারে না। ভয়ঙ্কর প্রতিযোগীতার মধ্যে তাদের বড় হতে হয়। কিন্তু তারা এই অনাবিল আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ভেবে খুব খরাপও লাগে। কারণ এই আনন্দ বেশী বয়সে আর ভাল লাগবে না, ইচ্ছাও করবে না।

একদিন স্কুল পালিয়ে আমি আর অঞ্জন, না অঞ্জন নয়, বলতে হবে আমি আর ঈশ্বর অঞ্জন, পানার ভেলায়, রেল লাইনের পাশের ঝিলে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছি। পানার ভেলা জিনিসটা হয়তো এখনকার অনেকেই জানেনা বা, শোনেও নি। কঞ্চি বা ঐ জাতীয় কিছু দিয়ে একটা আয়তকার ফ্রেম তৈরী করে, ফ্রেমের ভিতর বড় বড় কচুরিপানা দিয়ে বেশ মোটা করে ভরতে হবে। চারপাশে কঞ্চির ফ্রেম থাকায়, পানাগুলো ছড়িয়ে যেতে পারবে না। এরপর সেই কচুরিপানার ভেলায় চেপে জলপথে স্বচ্ছন্দে যেথা খুশী যাওয়া যায়। সত্যি কথা বলতে কী, ভাল ভাবে যথেষ্ট পরিমান কচুরিপানা দিয়ে মোটা করে ভেলা তৈরী করলে, তার ওপর একটা হাতিকে চাপিয়ে নিয়ে গেলেও বোধহয় কোন ক্ষতি হবেনা। হাতিটা একটা উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করলেও, ব্যাপারটা কিন্তু সত্যিই সেরকমই।

অনেকের কাছেই হয়তো এটা নিছক গল্প বা পাগলের প্রলাপ বলে মনে হতে পারে, আমিও তাই মনে করতাম, যদি না ঐ ভেলায় আমরা একসাথে অনেক ছেলে, এমন কী বয়স্ক লোকেদেরও চাপিয়ে রেল লাইনের পাশের লম্বা ঝিলে, একদিক থেকে অপর দিকে নৌকার মতো করে ঘুড়ে বেড়াতাম। অত ছেলে একসাথে চাপলেও কোনদিন কিছু হয় নি। না ভুল বললাম, একদিন হয়েছিল, সে কথা পরে বলবো। এরকম কিছু অদ্ভুত ব্যাপার সত্যিই আছে, যা না দেখলে শুনে অবাক হতে হয়, বিশ্বাস করতে মন সায় দেয় না। উদহরণ স্বরূপ বলতে পারি ছাগলকে কচু পাতা চাপা দেওয়ার কথা।

একটা ছাগলকে জোর করে পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে, তার মাথার চারপাশে ভাল করে কচু পাতা দিয়ে ঢেকে দিলে, ছাগলটা মরার মতো পড়ে থাকে। বেশ কিছু কচু পাতা দিয়ে, ছাগলটার মাথা এমন ভাবে ঢেকে দিতে হবে, যাতে একটুও আলো না ঢোকে। এরপর পাতা না সরিয়ে তার ওপর দিয়ে হেঁটে গেলেও, সে ঐ ভাবে শুয়েই থাকবে। যদি পাতা দিয়ে মাথা ঢেকে হাত সরিয়ে নিলে, ছাগলটা শুয়ে না থেকে উঠে পড়ে, তাহলে বুঝতে হবে কোন ভাবে আলো ঢুকছে। কচু পাতা ছাড়া অন্য কোন পাতা ঐ ভাবে চাপা দিলে, একই ঘটনা ঘটে কী না, আমার জানা নেই বা পরীক্ষা করে দেখা হয় নি। অনেকে বলে ছাগলরা মনে করে, সে মরে গেছে। ছাগল কী মনে করে ছাগল-ই জানে। মানুষ তার মনের গভীরে প্রবেশ করলো কিভাবে, বা বংশপরম্পরাক্রমে সব ছাগল একই কথা মনে করেই বা কেন জানিনা। তবে ছাগল যে মরার মতো পরে থাকে, এটা পরীক্ষিত, প্রমাণিত সত্য। অনেকের মুখেই শুনেছি, লাল রঙের ভিজে গামছা চাপা দিয়ে দিলে, মুরগিরও নাকি একই দশা হয়। সব মুরগিই দক্ষিনপন্থী এবং লাল রঙে অ্যালার্জিগ্রস্ত কী না, আমার জানা নেই।

সেদিন অঞ্জন ও আমি, পানার ভেলায় চেপে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছি। পানাগুলো অনেক দিনের পুরানো ও জল না পেয়ে শুকনো হয়ে গেছে। নতুন করে পানা দেওয়া হয়ে ওঠেনি। দু’জনে স্কুল পালিয়ে মনের আনন্দে ভাসছি। হঠাৎ অঞ্জন “উরি বাবা, উরি বাবা” বলে চিৎকার করে, জামা ধরে লাফাতে শুরু করলো। কী হয়েছে বুঝতেও পারছি না, সেও কী হয়েছে না বলে, পানার ভেলার ওপর লাফিয়ে যাচ্ছে। পুরানো পানার অনেকটাই শুকিয়ে বা পচে গেছে। ওর লাফ ঝাঁপে, ভেলায় জল উঠতে শুরু করেছে। অবশেষে জানা গেল, ওর পিঠে, জামার তলায় কী একটা ঢুকেছে। জামা তুলে কিছুই দেখতে পেলাম না। গেঞ্জিটা গুটিয়ে ওপর দিকে তুলতেই, কালো লিকলিকে একটা সাপ পিঠ থেকে পানায় পড়ে, জলে নেমে গেল। কিন্তু ততক্ষণে ভেলার যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে। ভেলার যে অংশেই দাঁড়াচ্ছি, সেখানেই আস্তে আস্তে পা ঢুকে যাচ্ছে এবং ভেলায় জল ঢুকছে। বাধ্য হয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, পাড়ে ভিরবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। জায়গা পরিবর্তন করতে করতে, পাড়ের দিকে ভেলা নিয়ে যাওয়ার সময় দু’জনেই পানা ভেদ করে জলে নেমে গেলাম। সারা শরীর ও জামা প্যান্টে পাঁক মেখে, পাড়ে উঠে ভিজে বই খাতা নিয়ে, সন্তোষদার বাড়ি এলাম। আগেই বলেছি, সন্তোষদার মা আমার মধ্যে তাঁর মৃত ছেলে অসীমকে খুঁজে পেতেন। তাই সাত খুন মাফ। গামছা পরে, জামা প্যান্ট ধুয়ে, উননে বই খাতা, প্যান্ট জামা শুকিয়ে, স্কুল ফেরৎ ভাল ছেলের মতো বাড়ি ফিরে এলাম।

আর একদিন স্কুল পালিয়ে, আমরা আমাদের আন্ডারগ্রাউন্ড মাটির ঘরে, মাদুরে বসে মনের সুখে আড্ডা মারছি। হঠাৎ দরজা আর ছাদের মাঝে কাটা অংশে, এক জোড়া চোখ দেখতে পেলাম। তারপরেই শুরু হ’ল টিনের দরজায় প্রবল  ধাক্কা। এখানে ধাক্কা দেবার সাহস সাধারণের হবে না। বাধ্য হয়ে দরজা খুলে দেখা গেল, অঞ্জনের মা দাঁড়িয়ে আছেন। কোথা থেকে স্কুল পালানোর সংবাদ পেয়ে, সরজমিনে তদন্ত করতে এসে হাতেনাতে ছেলেকে ধরে ফেললেন। ফলে সেদিন থেকে স্কুল পালিয়ে ওখানে আসা আর নিরাপদ নয় বুঝে, বাধ্য হয়ে আমরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। স্কুল কামাই করলে, পরের দিন গার্জেনের চিঠি দিতে হ’ত। দ্বিজেন বাবুর আশীর্বাদে বিভিন্ন রকম ভাবে ওদের সবার, ও আমার নিজের চিঠি লিখে নেওয়া, তখন আমার কাছে কোন সমস্যাই ছিল না। অবশ্য বিভিন্ন রকম হাতের লেখায়। বাবা লিখলে ইংরাজীতে, মা লিখলে গোটা গোটা বাংলায়। চিঠি নিয়ে কোনদিন কোন সমস্যা হয় নি।

একদিন স্কুল পালিয়ে রঙ্গীন মাছ কিনতে গিয়ে, নির্জন দুপুরে গদা এক মুরগি ধরে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে বহু লোকের চিৎকার, এবং আমাদের, বিশেষ করে মুরগি বগলে গদাকে, তাড়া করা শুরু হ’ল। মাঠের ওপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে, গদা মাঠের শেষে ছোট্ট ছোট্ট পানায় ভরা পুকুরকে মাঠ মনে করে জলে নেমে গেল। অনেক চেষ্টায় তাকে উদ্ধার করে, তাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে ফিরে আসার সময়, গদাকে জিজ্ঞাসা করা হ’ল, হঠাৎ সে পুকুরে নামতে গেল কেন, মুরগিটা বগলদাবা করে না ছুটে, ছেড়েই বা দিলনা কেন। উত্তরে গদা জানালো, ওটা যে পানায় ঢাকা পুকুর, ছুটে যাওয়ার সময় সে বুঝতে পারে নি। পুকুরটাকে সে মাঠেরই অংশ মনে করেছিল, আর মুরগি ছেড়ে দিলেও সে ধরা পড়তো, কিন্তু মুরগি সমেত পালাতে পারলে, সন্ধ্যায় ফিষ্টিটা খুব জমতো।

এই গদাকে নিয়ে কত ঘটনাই না মনের কোনে ভিড় করে। নলপুর স্টেশনে আমি আর গদা, বিনা টিকিটে ট্রেনে করে গিয়ে বেঞ্চে বসে আছি। ফেরার গাড়ি আসলে ফিরে এসে টিউশন পড়তে যাব। এমন সময় সাদা পোষাকে একজন এসে, টিকিট দেখতে চাইলে, গদা বলে বসলো— “আমলা তো ত্রেনে কলে আছিনি”। গদার বয়স হলেও, একটু তত করে বাচ্ছাদের মতো কথা বলতো। আমি সঙ্গে সঙ্গে ছুটে পালাবার পরামর্শ দিলাম। আমি জানতাম ঐ লোকটার পক্ষে, “ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব (ধরব?) না”, বলে আমাদের পিছন পিছন ছোটা ছাড়া, ধরবার ক্ষমতা হবে না। কিন্তু গদা বোধহয় সেদিন সাহসিকতায় পরমবীর চক্র পাওয়ার আশায়, লোকটার সাথে সে যে ট্রেনে চেপে আসেনি, বোঝাতে বোঝাতে স্টেশন মাষ্টারের ঘরে ঢুকে পড়লো। শেষ পর্যন্ত তাকে কান ধরে উঠবোস করতে হয়।

আর সে দিন? যেদিন আমরা কয়েকজন স্কুল পালিয়ে, পদ্মপুকুরের বিরাট ঝিলের ধারে গিয়ে হাজির হলাম? গদাও আমাদের সঙ্গে আছে। দু’টো বাচ্ছা ছেলে অনেকগুলো মোষ নিয়ে, ঝিলের জলে মোষগুলোকে স্নান করাতে এল। তারা মোষের পিঠে চেপে এসে, মোষের পিঠে চেপেই ঝিলের জলে নেমে গেল। আমরা তাদের অনেক বুঝিয়ে, এক একটা মোষের পিঠে চেপে বসলাম। মোষগুলো ঝিলের ধার ঘেঁষে, হাঁটতে হাঁটতে না সাঁতার কেটে ভগবান জানেন, এগিয়ে যেতে যেতে, ঝপ করে বসে পড়ার মতো করছে। ফলে বই, খাতা, জুতো, ঝিলের পাড়ে রেখে আসলেও, জামা প্যান্ট একবারে ভিজে যাচ্ছে। বেশ চলছিল, হঠাৎ গদা যে মোষটার পিঠে চেপেছিল, তার বোধহয় গদাকে ঠিক পছন্দ না হওয়ায়, বা গদার অত্যাধিক দেহ ভার সহ্য না হওয়ায়, কিরকম কাত হয়ে গদাকে জলে ফেলে দিল। শেষে সকলে জল থেকে উঠে এসে, নির্জন ঝিলের ধারে বার্থ ড্রেসে দাঁড়িয়ে থেকে, রোদে জামা প্যান্ট শুকিয়ে, ভাল ছেলের মতো বাড়ি ফিরে এলাম।

সৌমেন দত্ত ছিল আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড। ওকে আমরা সন্তু বলে ডাকতাম। ও আমার সাথে একই শ্রেণীতে পড়তো, তবে নবম শ্রেণী থেকে ও বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে। ওকে একদিন না দেখলে বা একদিন কথা না বললে, আমার ভাত হজম হ’ত না। ওর লেখার হাত বেশ ভাল ছিল। কিন্তু সব থেকে মজার ব্যাপার ছিল, এ হেন সৌমেনের সাথে আমার অনবরত বিভিন্ন কারণে কথা বন্ধ হ’ত। দু’জনেই চেষ্টা করতাম কিভাবে আবার ভাব করা যায়। ও কিন্তু আমাদের স্কুল পালানো দলের নিয়মিত সভ্য ছিল না। এক-আধদিন ওর সাথে স্কুল পালিয়ে, সিনেমা দেখতে গিয়েছি। দলের সবার সঙ্গে ও আর কোথাও গিয়েছিল কী না, আজ এতদিন পরে আর মনে করতে পারছি না। তবে empty rake এ চলন্ত অবস্থায় উঠে সাঁত্রাগাছি গিয়ে, ওখান থেকে হেঁটে আমরা প্রায় রোজই স্কুলে যেতাম। বেশ দ্রুত গতিতে ছোটা চলন্ত ট্রেন থেকে নামতে ও ট্রেনে উঠতে, আমরা সকলেই প্রায় সমান দক্ষ ছিলাম। তবে আর সকলে প্ল্যাটফর্মে আর আমি রেল লাইনের পাশের পাথরে, চলন্ত ট্রেন থেকে নামতে স্বচ্ছন্দ বোধ করতাম।

একদিন স্কুলে যাবার পথে একে একে সকলেই চলন্ত ট্রেনে উঠে পড়লো। আমিও উঠে পড়লাম। আমার ঠিক আগের বগিতে সৌমেন উঠতে গিয়ে কিভাবে পড়ে গেল। প্ল্যাটফর্মের ওপর ট্রেনের সাথে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে, সে এগিয়ে  যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মের সমস্ত লোক চিৎকার করে ট্রেন থামাতে বলছে। আমি আমার বগি থেকে নেমে ছুটে গিয়ে ওর পাশ দিয়ে উঠে ওকে টেনে ট্রেনের ভিতর তুলে নিলাম। সেদিন ওর একটা বড় ফাঁড়া গেল। আজ সে একটা নামী বাংলা সংবাদ পত্রের অ্যাসিস্টেন্ট এডিটার হয়েছে, জানিনা সে সেই সব দিনের কথা মনে করতে পারে কী না, মনে হলে ফেলে আসা দিনগুলোর জন্য তার মন খারাপ হয় কী না, কিন্তু আমার স্মৃতিতে সেই সব দিনগুলো আজও উজ্জল হয়ে আছে।

সন্তু আর আমি দুপুরে স্কুল পালিয়ে, সন্ধ্যায় টিউশন পড়তে যাবার নাম করে, অনেক সিনেমা দেখতাম। পয়সার বড় অভাব ছিল। যাও বা কিছু পয়সা জোগাড় হ’ত, সিনেমা দেখে খরচ হয়ে যেত। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা মতো, ওতে আমাতে একটা ব্যাঙ্ক তৈরী করলাম। নিজেরা আলাপ আলোচনা করে, সুবিধা অসুবিধা বিবেচনা করে, নিয়ম কানুন তৈরী করা হ’ল। ঠিক হ’ল জমানো টাকা পয়সা তুলতে হলে, সাত দিন আগে জানাতে হবে। এই সাত দিনের নোটিশের পিছনে অবশ্য একটা কারণ ছিল। আমাদের উভয়ের বাড়ির কাছেই “শ্যামলী” সিনেমা হল ও আশেপাশের সমস্ত সিনেমা হলে, প্রতি শুক্রবার ছবি বদল হ’ত। আশপাশের কোন সিনেমা হলে ভাল কোন ছবি আসলে যাতে সিনেমা দেখে পয়সার অপব্যবহার করা না যায়, তাই এক সপ্তাহের নোটিশ। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা পয়সা তোলার সুযোগ আসার আগেই, সিনেমা হলের ছবি বদল হয়ে যাবে। সিনেমা দেখতে অবশ্য ঊনিশ পয়সা, আর একটু ভাল সিটে বসলে, বোধহয় চল্লিশ পয়সা হলেই চলতো। কিন্তু এটাই আমাদের পক্ষে জোগাড় করা দুষ্কর ছিল। একমাত্র আমরা দু’জনেই ব্যাঙ্কের কাষ্টোমার কাম চেয়ারম্যান কাম জেনারেল ম্যানেজার হলেও, এবং ব্যাঙ্কের সঞ্চিত টাকা পয়সা আমাদের নিজেদের কাছে থাকলেও, ব্যাঙ্কের সংবিধানের প্রতি আস্থা ও সম্মান রক্ষার্থে, যত ভাল সিনেমাই আসুক বা যত লোভনীয় প্রয়োজনই হোক, সাত দিনের আগে এক পয়সাও তোলা হ’ত না।

ব্যাঙ্কে টাকা পয়সা জমা দেবার জন্য হাতে লেখা পেয়িং স্লীপ তৈরী হ’ল। স্লিপের মাঝখান দিয়ে সুচ দিয়ে ফুটো ফুটো করে, দু’টো ভাগ করা হ’ল। একটা নিজের, অপরটা ব্য্যঙ্কের। তখন টাকা তো দুরের কথা, পয়সাও হাতে পাওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। ঠিক হ’ল নানা ভাবে, নানা কায়দায়, নানা অছিলা অজুহাতে, যা জোগাড় হবে, তাই জমানো হবে। সন্তু কিছু পয়সা জমাও রাখলো। ব্যবস্থায় কোন খামতি ছিল না, খামতি ছিল মনবলের। সপ্তাহ কয়েক ব্যাঙ্কের আয়ু ছিল। তারপর নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে, পবিত্র সংবিধানকে অসম্মান করে, সব পয়সা সিনেমা দেখে বাজে খরচ হয়ে গেল। যুক্তি ছিল একটাই— আমাদের দু’জনেরই তো টাকা, আমরা যদি দু’জনেই ঠিক করি টাকা তুলে নেব, তাহলে অন্যায় বা অসুবিধা কোথায়?

এই পয়সা খরচ করার ব্যাপারে অসংযম ও লুকিয়ে সিনেমা দেখার হ্যাপা নিয়ে কয়েকটা ঘটনা বেশ মনে পড়ে। সাম রেস্, অর্থাৎ দৌড়ের মাঝে একটা অঙ্ক কষে, কে আগে দৌড়ে নিশানায় পৌঁছতে পারে, প্রতিযোগীতায় আমি বেশ কয়েক বার সফল হয়েছিলাম। একবার আদর্শ সঙ্ঘ নামে একটা বড় ক্লাবের স্পোর্টস্-এ আমি সাম রেসে দ্বিতীয় হয়ে, একটা বেশ ভালো ও মজবুত কিট্-ব্যাগ পেয়েছিলাম। মৌমাছি যেমন তিল তিল করে মধু সংগ্রহ করে সঞ্চয় করে, আমিও সেইভাবে পয়সা ম্যানেজ করে করে, দশ টাকা জমিয়েছিলাম। একদিন, এক প্রবল বর্ষণ মুখর সন্ধ্যায়, খুব ইচ্ছে হ’ল “করকাফে” নামে বাড়ির কাছেই এক রেস্তরাঁ থেকে কিছু চপ, কাটলেট কিনে খাই। কিন্তু বার বার মন বাধা দিল— “পয়সাগুলো নষ্ট কোরনা”। একবার খেতে যাব, একবার যাবনা, এই ভাবে ঘন্টাখানেক যুদ্ধ করে, খরচা করার প্রবণতাকে আরও প্রশমিত করতে, খুচরো পয়সাগুলো কিট্-ব্যাগ থেকে নিয়ে বাইরে গিয়ে, একটা চকচকে দশ টাকার নোট বদল করে নিয়ে এলাম। নোটটা হাতে নিয়ে নিজেকে বেশ বড়লোক বড়লোক মনে হ’ল। টাকাটা খরচ করার ইচ্ছাও যেন বেশ কমে গেল। নোটটা কিট্-ব্যাগে তুলে রেখে বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করলাম। আরও প্রায় ঘন্টাখানেক পরে সব বাধা উপেক্ষা করে, ব্যাগ থেকে চকচকে নোটটা নিয়ে, ছাতা হাতে এক হাঁটু জল ভেঙ্গে করকাফেতে গিয়ে, মন ভরে, পেট পুরে, টাকার সদব্যবহার করে, মনকষ্টে বাড়ি ফিরলাম। আবার আমি আমির থেকে ফকির বনে গেলাম।

একদিন সন্ধ্যার সময় টিউশন পড়তে যাবার নাম করে বাড়ির কাছের “শ্যামলী” সিনেমা হলে “রাম ধাক্কা” নামে একটা হাল্কা হাসির সিনেমা দেখতে গেলাম। একাই গেছি। সেই বয়সে ছবিটা খারাপও লাগছিল না। মনের আনন্দে আধো অন্ধকারে ছবি দেখছি, হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, আমার ঠিক বাঁ পাশের চেয়ারটায় সাধনদা বসে সিনেমা দেখছে। সাধনদা আমাদের বাড়ির দোতলারই বাঁপাশের ফ্ল্যাটটায় থাকে। ঐ ফ্ল্যাটের নিতাইদা, সেজদা, মেজদার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ঠিক আত্মীয়র মতোই। সাধনদা এই মেজদার শালা, মেজদার কারখানায় কাজ করার সুত্রে, তখন মেজদার কাছেই থাকতো। সাধনদা আমার থেকে বয়সেও অনেক বড়।

যাহোক্ আধো-অন্ধকারে সাধনদাকে এতক্ষণে দেখে যখন পরিস্কার চিনতে পারছি, তখন এটা নিশ্চিত যে, সেও তার ডানপাশে বসা আমাকে এতক্ষণে দেখে ও চিনে ফেলেছে। অর্থাৎ রাম ধাক্কা দেখে বাড়ি ফিরে, ঘাড় ধাক্কার ব্যবস্থা পাকা। ইন্টারভ্যালের ঠিক আগে একটা বেল বাজতো। বেল বাজতেই আমি অন্ধকারে হলের বাইরে চলে এলাম। কিছুক্ষণ পরে হল আবার অন্ধকার হ’ল। শুরু হ’ল নানারকম বিজ্ঞাপন দেখানো। আমি হলের বাইরে, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দুরু দুরু বক্ষে, অপেক্ষা করছি। ছবি আরম্ভ হলে অন্ধকার হলের ভিতরে ঢুকে, হাতড়ে হাতড়ে নিজের সিটে এসে বসলাম। এই রো এর একবারে ডানদিকে, ধারের সিটটা আমার। যতটা পারি ডানদিকে ফিরে বসে, ঘাড়টাকে বাঁপাশে করে, চোখ বেঁকিয়ে, কোন মতে ছবি দেখতে শুরু করলাম। ছবি দেখবো কী, মনের ভিতর তোলপাড় হচ্ছে— বাড়ি ফিরে কী হবে। হঠাৎ সাধনদা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস্ করে বললো, “এই বাদা, দেখ্ দেখ্, কাউকে বলবো না”। সাধনদা তার কথা রেখেছিল।

সেদিন স্কুল পালিয়ে “নবরূপম” নামে একটা হলে “নায়িকা সংবাদ” নামে একটা সিনেমা দেখতে গেছি। নতুন মুক্তি পাওয়া ছবি, ফলে অসম্ভব ভিড়। লাইনে দাঁড়িয়ে ভাবছি টিকিট পেলে হয়। কী কারণে এতদিন পরে মনে নেই, তবে সেদিনও আমি একাই সিনেমা দেখতে গেছি। অনেকক্ষণ পর যখন টিকিট কাউন্টারের প্রায় কাছে এসে পৌঁছেছি, আমার সামনে আর মাত্র তিন-চারজন লাইনে আছে, পিছনে বিরাট লাইন, হঠাৎ নজরে পড়লো, লাইনের একবারে প্রথমে যিনি টিকিট কাটছেন, টিকিট কেটে ঘুরলেই যাঁর নজর সোজা আমার ওপর পড়বে, তিনি আর কেউ নন, স্কুলের শিব বাবু। তিনি স্কুল ছুটি নিয়ে সিনেমা দেখতে এসেছেন, না আমার মতোই স্কুল যাবার নাম করে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে, সিনেমা দেখতে এসেছেন জানিনা, তবে এটা জানি যে, এইসময় বই খাতা হাতে আমাকে সিনেমা হলে দেখলে, কপালে অনেক দুঃখ আছে। তাই এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে লাইন ছেড়ে বেড়িয়ে এসে, বাঘ জল খেতে এলে হরিণ যেমন আত্মগোপন করে, সেইভাবে দুরে আড়ালে দাঁড়িয়ে নজর রাখলাম। তিনি ওখান থেকে চলে গেলে, টিকিট কাটার জন্য আবার বিরাট লাইনের পিছনে দাঁড়ালাম। শিব স্যার নিশ্চই দামী টিকিট কাটবেন, তাই কোন ঝুঁকি না নিয়ে, সব থেকে কম দামী টিকিট কেটে, হল অন্ধকার হলে, গুটি গুটি পায়ে ভিতরে ঢুকে ছবি দেখলাম।

লুকিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে কেউ দেখে ফেলবে, শুধু কী এই একটাই বিপদ? কেউ যাতে দেখতে না পায় সেই ব্যাপারে সাবধানতা নিতে গিয়েও যে কত রকম বিপদ আসে, তা আর আমার থেকে ভালো কে জানে? “যোগমায়া” সিনেমা হলে কী একটা সিনেমা দেখতে গেছি। হল অন্ধকার না হলে ভিতরে ঢোকায় যথেষ্ট ঝুঁকি আছে, তাই বাইরে একপাশে দাঁড়িয়ে, চারিদিকে তীক্ষ্ণ নজর রেখে অপেক্ষা করছি। সবাই যখন হলের ভিতর, তখন আমি নগদ পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে, চোরের মতো হলের বাইরে দন্ডায়মান। বই আরম্ভ হবার ঠিক আগে, একটা বেল বাজতো। এসব সিগনাল আমার নখদর্পনে, অভিজ্ঞতার ফসল। বেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে টিউবওয়েল থেকে লুকিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে কেউ দেখে ফেলবে, শুধু কী এই একটাই বিপদ? কেউ যাতে দেখতে না পায় সেই ব্যাপারে সাবধানতা জল খেয়ে, হলের ভিতরে যাব। একছুটে টিউবওয়েলের কাছে গিয়ে দেখি, একজন লোক একহাতে কলের মুখ চেপে ধরে, অপর হাতে পাম্প্ করে যাচ্ছে। একা একা জল খেতে হলে, এটাই করতে হয়। এভাবে আমরাও খেতাম, সম্ভবত এ দেশের সবাই এই ভাবেই খায়। কিছুক্ষণ পাম্প্ করার পর, কলের মুখের হাতটা সামান্য ফাঁক করে, কলে মুখ ঠেকিয়ে জল খেতে হয়। লোকটা পাম্প্ করা শেষ করে কলের মুখে সবে মুখ ঠেকাতে যাচ্ছে, এমন সময় আমি দৌড়ে কলের সিমেন্ট বাঁধানো জায়গায় এসে, শেওলায় পা পিছলে পড়ার উপক্রম। নিজেকে বাঁচাতে একহাতে টিউবওয়েলটা ধরতে গেলাম। কিন্তু বেসামাল অবস্থার জন্য, হাতটা গিয়ে সজোরে লোকটার মাথায় লাগলো। কলের সাথে সজোরে মাথা ঠুকে, “ওরে বাবারে” বলে লোকটা কল থেকে হাত সরিয়ে, মাথায় হাত দিয়ে বাঁধানো জায়গায় বসে পড়ে যন্ত্রনায় কাতরাতে লাগলো। এদিকে আবার কল থেকে সজোরে জল পড়তে শুরু করায়, লোকটা পুরো ভিজে গেল। আমি সরি বলে বোকার মতো লোকটার সুস্থ হবার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি, আর মনে মনে রামকৃষ্ণপুর না শিবপুর, কোন শ্মশানঘাটে আমায় নিয়ে যাওয়া হবে ভাবছি। লোকটা নিশ্চই সুস্থ হয়ে আমায় এক হাত নেবে। ছুটে যে পালাবো, তারও তো উপায় নেই। পকেটে বহু কষ্টে জোগাড় করা পয়সায় কাটা সিনেমার টিকিট। কিন্তু লোকটার ভীমের মতো চেহারা হলেও, যুধিষ্ঠিরের মতো ভদ্র, তাই সে যাত্রা কোন মতে বেঁচে গিয়ে, মাঝখান থেকে সিনেমাটা দেখলাম।

সন্তু আর আমার এই গোপনে সিনেমা দেখার প্রকল্প যাতে প্রকাশ না পায়, অন্য বন্ধুরাও যাতে বুঝতে না পারে, তার জন্য নতুন এক পন্থা বার করা হ’ল। এটাও আমারই প্ল্যান। দেখা না হলে চিঠিতে প্রোগ্রাম ঠিক করতাম। চিঠিটা কোন না কোন বাচ্ছা ছেলের হাত দিয়ে আদান প্রদান হ’ত। যদিও চিঠি লেখা হ’ত ইংরাজীতে, তবে সেটা অবশ্যই সাংকেতিক ধঙে। আমাদের দু’জনের কাছেই একটা করে চার্ট থাকতো, তাতে প্রতিটি ইংরাজী অক্ষরের পাশে, একটি করে বাংলা অক্ষর লেখা ছিল। ধরা যাক, H=ব, 0=প, W=এ, A=ল, R=হ, E=ত, Y=চ, U=ক। তাহলে How are you?= বপএ লহত চপক? চিঠিতে নাম লেখা হ’ত না, ওর নামের জায়গায় “স্বস্তিক” চিহ্ন, আর আমার নামের জায়গায় “তারকা” চিহ্ন থাকতো।

পরবর্তী  অংশ  পঞ্চম  পর্বে……….

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s