স্মৃতি (তৃতীয় পর্ব)

Selfজন্মের পর থেকেই আমাদের বড়িতে গরু দেখে এসেছি। এই প্রথম আমাদের বাড়ি থেকে গরু বিদায় নিল। অনেকেরই এই গরুটার প্রতি লোভ ছিল। অনেক দাম দিতেও চেয়েছিল। কিন্তু বাবা টাকার লোভ সম্বরণ করে ঐ প্রফেসারকে গরুটা দিলেন, শুধু মাত্র গরুটার যত্ন হবে বলে। এই গরু নিয়ে কত স্মৃতি। মনে পড়ে, বাবা কোনদিন জ্বাল দেওয়া পাতলা দুধ খেতেন না। দুধও প্রচুর হ’ত। প্রতিদিন বাবার জন্য খানিকটা দুধ, মা খুব ঘন করে জ্বাল দিয়ে ক্ষীর করে দিতেন। আমি, তপা, ছোটবোন বুলা, ছোটভাই মাকার, ঐ দুধ জ্বাল দেওয়া পাত্রটার প্রতি খুব লোভ ছিল। চামচ দিয়ে চেঁচে তুলে ঐ ক্ষীরের অংশ, মা আমাদের চারজনকে ভাগ করে দিতেন। পাত্র থেকে চামচ দিয় চেঁচে তোলা ঘন দুধের অংশকে আমরা চাঁচি বলতাম। কিন্তু ঐ উপাদেয় পদার্থটি চারজনের তুলনায়, খুবই অপ্রতুল ছিল। তর ওপর কে একটু বেশী পেল, কে ভাল অংশটা পেল, এইসব নিয়ে রোজ সন্ধ্যায় সমস্যা দেখা দিত। ফলে মা নতুন রুল জারি করলেন— এক এক দিন, এক একজন পাত্রটা চামচ দিয়ে চেঁচে খাবে। সোমবার হয়তো মাকা খেল, মঙ্গলবার বুলা, বুধবার আমি, বৃহস্পতিবার তপা। একদিন খেয়ে আবার তিন-চার দিন অপেক্ষা করা, খুব কষ্টকর ছিল। কিন্তু আরও কষ্টকর ছিল, অন্য কেউ একা একা খাওয়ার সময়, সেটার প্রতি লোভ না করা।

টুলু নামে একজন, সন্ধ্যার সময় আমাদের পড়াতে আসতো। টুলুদার কাছে পড়া চলাকালীন, দুধ ঘন করে একটা বাটিতে ঢেলে, পাত্রটা চেঁচে খাবার জন্য, মা এক একদিন এক একজনকে রুটিন মাফিক ডাকতেন। এই অতি আকাঙ্খিত ডাক শুনে, পড়া ছেড়ে এক একদিন এক একজন উঠে চলে যেতাম। টুলুদা এই ডাক শুনে উঠে যাওয়ার রহস্যটা জানতোনা বটে, কিন্তু সেও নিশ্চয় অবাক হয়ে, আমাদের এই এক একদিন এক একজনের পালা করে উঠে যাওয়া, এবং কিছুক্ষণ পরে ফিরে আসার কারণ খুঁজতো।

যাহোক্, নতুন ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে ঢুকে একটা বেশ লম্বা চওড়া বারান্দা। বারান্দার পিছনে পাশাপাশি দু’টো বেডরুম। এই ঘরদু’টোর পিছনে, সামনের বারান্দার মতো এবং সামনের বারান্দার সমান্তরাল একটা জায়গা। তার পিছনে, রান্নাঘর, বাথরুম-পায়খানা ও আর একটা ছোট্ট সরু ঘর। বাড়ির সামনে একটু বাঁধানো জায়গা, পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তার একবারে ডানদিকে ছাদহীন একটা ঘর মতো। তার ভিতরে একটা পাতকুয়ো, ওপরের দু’টো ফ্ল্যাটের ব্যবহারের জন্য। নীচের দুই ফ্ল্যাটের মাঝখান দিয়ে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাঁক নেবার জায়গায়, একট ছোট জানালা। ঐ জানালা দিয়ে আধো অন্ধকার নীচে তাকালে, আর একটা পাতকুয়ো দেখা যায়, যেটা নীচের দু’টো ফ্ল্যাট দু’দিক থেকে ব্যবহার করে। অ্যাটাচ বাথ অনেক দেখেছি, কিন্তু অ্যাটাচ পাতকুয়ো আজ পর্যন্ত আর কোথাও দেখার সৌভাগ্য হয় নি। নীচে পাঁচিলের বাইরেই সিমেন্টের স্ল্যাব ঢালা রাস্তা, রাস্তার পরেই, বড় বড় কচুরিপানা আর কচু গাছে ভরা ছোট্ট একটা জলহীন ডোবা মতো। ডোবার অপর পারে, আগাছায় ভরা বেশ খানিকটা ফাঁকা জমি। আমাদের এই ফ্ল্যাটটা আগের বাড়ির তুলনায় অনেক বড়, অনেক আলো হাওয়া যুক্ত, ও খোলামেলা ছিল।

এখানে উঠে আসার ফলে বীনা, বলাই, স্বপন, রাজা, ইত্যাদি অনেককেই হারালাম বটে, কিন্তু এই বাড়ির কাছাকাছি অনেকেই ছিল, যারা আমার সঙ্গে বা আমার প্রায় সমবয়সী হয়েও, নীচু শ্রেণীতে পড়তো। ফলে প্রাথমিক অবস্থায় খুব একটা পরিচিতের অভাব হ’ল না। এই রাজার ব্যাপারে একটা ঘটনার কথা মন পড়ে। রাজার দাদা স্বপন, আমার সাথে একই স্কুলে একই শ্রেণীতে পড়তো। একবার কী একটা কারণে মনে নেই, সম্ভবত গুলি খেলা নিয়ে আমাদের মধ্যে বিবাদ বেধেছিল। রাজার গায়ে খুব জোর ছিল বলে জানতাম। তার জোরে বলীয়ান্ হয়ে, স্বপন আমার সাথে খুব দুর্যবহার করতে শুরু করলো। পাড়াতে তো বটেই, স্কুলেও তার অত্যাচারে আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম। একদিন শ্যামা সব শুনে বললো, “আজ স্কুল থেকে ফেরার পথে ওকে ধরবি। ভয় নেই, আমি পাশেই থাকবো”। শ্যামার গায়ে কত জোর, সে স্বপনের হাত থেকে আমায় রক্ষা করতে পারবে কিনা জানিনা, তবে তার আশ্বাসে মনে বেশ জোর পেলাম। স্কুল থেকে ফেরার পথে, কালীশঙ্করের মঠের পাশ দিয়ে আসার সময় স্বপনকে ধরলাম। মাটির সরু রাস্তা্‌, একপাশে কাঁটাতারের বেড়া, অন্য পাশে আগাছায় ভরা জলা জমি। স্বপনকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুই আমার সাথে এরকম ব্যবহার করিস কেন? তোকে সাবধান করে দিচ্ছি, ভবিষ্যতে এরকম করলে ফল ভাল হবে না”।

কথাগুলো বললাম বটে, কিন্তু মিন মিন করে কাঁপা গলায় স্বগতোক্তির মতো, কথাগুলো নিজের কানেই পৌঁছল না। স্বপন বেশ দাপটের সাথে বললো, “বেশ করি, কী করবি”? একটু দুরেই শ্যামা দাঁড়িয়ে, তবু যেন ভরসা পেলাম না। স্বপন এবার আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে আবার বললো, “কী করবি”? হঠাৎ কী মনে হ’ল, ওকে জড়িয়ে ধরে এক ধাক্কায় জলা জমিতে ফেলে দিলাম। পাশের কাঁটা তারে হাত লেগে, আমার কব্জির কাছে খানিকটা কেটে গিয়ে রক্ত বেরোতে লাগলো। আমি তার বুকের ওপর চেপে বসে, তার গলা টিপে ধরলাম। অল্প জল হলেও, সে কাদাজলের মধ্যে শুয়ে আছে। আমার জামা প্যান্টও কাদা মাখামাখি হয়ে গেছে। স্বপন কিন্তু খুব ভয় পেয়ে আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে জানালো, যে সে আর কোনদিন করবে না। তাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। মনে মনে একটা গর্ব বোধ করতে করতে বাড়ি ফিরে এলাম। সন্ধ্যার মুখে আমি ও তপা দোকান থেকে ফিরছি, রাজা এসে পথ আগলে দাঁড়ালো। তার দাদাকে মারার প্রতিশোধ নিতে, সে আমাকে আক্রমন করতে উদ্দত হতেই, তপা বেশ জোরে তার জামার কলারের কাছটা চেপে ধরতেই, রাজা কিরকম ভ্যাবাচাকা খেয়ে, ভয়ে কেঁদে ফেললো। তারপর থেকে রাজা বা স্বপন আমাদের আর ঘাঁটাতো না। আজও আমার ডান হাতের কব্জিতে কাটা দাগটা আছে।

আগের পাড়ায় আরও একটা আকর্ষণের বিষয় ছিল। সেই সময় অনেক যুবক, বাচ্ছাদের বিভিন্ন খেলধুলা, শরীরচর্চা, ইত্যাদি করাতেন। আমার ছোটবোনের এক বন্ধুর দাদা, সনতদা রোজ বিকেলে একটা ছোট্ট মাঠে রুমাল চোর, টেনিস বলে ফুটবল, ইত্যাদি আরও বিভিন্ন রকম অদ্ভুত অদ্ভুত খেলা আমাদের খেলাতেন। তিনি নিজে সব খেলা পরিচালনা করতেন। নতুন জায়গায় চলে এসে সে আনন্দ থেকে বঞ্চিত হলাম। যদিও মজার ব্যাপার হ’ল, সনতদা কিন্তু আমার নতুন পাড়ার বাসিন্দা। আমাদের ফ্ল্যাট থেকে কয়েকটা বাড়ি পরেই তিনি থাকতেন, এখনও থাকেন।

নতুন বাড়ি থেকে স্কুল যাতায়াত শুরু হ’ল। এরমধ্যে হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা এসে গেল। সংস্কৃত নিয়ে আমার খুব দুশ্চিন্তা ছিল। সংস্কৃত শিক্ষক ছিলেন, আমার দাদার বন্ধুর বাবা। তাঁর অনেক জমি, অনেক নারকেল গাছ, বিশাল পুকুর নিয়ে বেশ বড় বাড়ি, আমাদের ফ্ল্যাটের পিছনেই ছিল। আর ছিল অনেক পুত্র ও কন্যা। তাঁর এক ছেলে, গোপাল আমার সাথে পড়তো। আর এক দুর সম্পর্কের ভাইপোও আমার সাথে পড়তো। তার নাম সুশীল, ডাক নাম মেনো।

সংস্কৃত পরীক্ষার দিন পন্ডিত স্যার নিজে গার্ড দিচ্ছেন। গার্ড মানে টেবিল চেয়ারে বসে বই লেখা। টেবলে অনেক বই, খাতা। আমরা যে যার মতো পরের সাহায্যে পরীক্ষার নম্বর বাড়াবার চেষ্টায় ব্যস্ত। মাঝেমাঝেই পন্ডিত মশাই টেবিলে বেত আছড়ে, পরীক্ষার খাতা কেড়ে নেবার ভয় দেখাচ্ছেন। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও, তিনি গোপালকে বলছেন— “গোপাল, মন দিয়ে পরীক্ষা দাও, কোন কিছু বুঝতে না পারলে জিজ্ঞাসা করবে, গোলমাল করবে না”। গোপাল আমাদের গোলমাল করতে বারণ করে, মাঝেমাঝেই উঠে গিয়ে বাবার কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে আসছে, আমরাও সেই সাহায্য থেকেই উত্তর লিখে পরীক্ষা দিয়ে এলাম। ফল প্রকাশের পর দেখা গেল কোনরকমে উতরে গেছি।

এই পন্ডিত মশাইকে নিয়ে কত স্মৃতি, যদিও সেসব অনেক পরের, আরও উঁচু শ্রেণীতে পড়ার সময়কার কথা। কোন শ্রেণী মনে নেই, সম্ভবত একাদশ শ্রেণীর এক শেষ পীরিয়ডে বাংলার শিক্ষক না আসায়, তাঁকে আমাদের ক্লাশে পাঠানো হয়েছে। আমাদের শ্রেণীকক্ষে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা ডেস্ক্ ও চেয়ারের ব্যবস্থা ছিল, এবং ডেস্কের সংখ্যা ছাত্রের সংখ্যার তুলনায় বেশ কিছু বেশীই ছিল। পন্ডিত স্যার ক্লাশে এসে জিজ্ঞাসা করলেন— “কী পড়ানো হচ্ছে”? আমরা জানালাম, লুই পাস্তুর, স্যার। তিনি একজনের থেকে বই নিয়ে, তাঁর মতো করে “লুই পাস্তুর” পড়াতে শুরু করলেন। অনেকক্ষণ পরে জিজ্ঞাসা করলেন, “সবাই বুঝতে পেরেছো? কেউ কিছু বুঝতে না পারলে জিজ্ঞাসা কর”। আমি একবারে সামনের ডেস্কে, তাঁর  প্র্রায় টেবিলের কাছে বসে আছি। তাঁকে উৎসাহ দেবার জন্য উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাম— “স্যার, লুই পাস্তুর মানে কী”? প্রশ্ন শেষ হবার আগেই একটা বিরাশি সিক্কার থাপ্পর আমার গাল লক্ষ্য করে বিদ্যুৎ বেগে এগিয়ে এল। কিন্তু আমিও তো এক কালের পিট্টু চাম্পিয়ন। এর থেকেও দ্রুত গতির বলের আঘাত, আমি অবলীলাক্রমে কাটিয়েছি। পন্ডিত স্যারের হাতের তালু আমার গাল স্পর্শ করবার অনেক আগেই, আমি নীচু হয়ে বসে পড়েছি। শুধু লক্ষ্য করলাম তাঁর হাতটা পূব থেকে পশ্চিমে কী দ্রুত চলে গেল। আর ঠিক তখনই চোখে পড়লো, তাঁর জামার পিঠের দিকে গুন চিহ্নের মতো করে, পেনের কালি ছেটানোর দাগ। ডেস্কের ওপর হাতের ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে, একদম পিছনে চলে গেলাম। ডেস্কগুলো এমন ভাবে সাজানো, যে তাঁর পক্ষে আমার মতো করে হাতে ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে যাওয়া ছাড়া, ক্লাশরুমের পিছন দিকে যাওয়া অসম্ভব। ফলে তিনি টেবিলের ওপর বেত আছড়ে, তর্জন গর্জন করতে লাগলেন। আর ঠিক তখনই আমি তাঁকে জানালাম— “স্যার, আপনার জামার পিছনে পেনের কালি”।

কোথায় কালি, কিসের কালি, আদপে সত্যিই কালি আছে কী না, না দেখেই তিনি বললেন, “অ্যাই, এটা তোরই কাজ। বল্ কেন করেছিস? ফাজলামো হচ্ছে”? এতো মহা বিপদ, স্বয়ং লুই পাস্তুর যে আমার জীবনে এত বিপদ ডেকে আনবেন কে জানতো। আমি শান্ত ভাবে বললাম, “স্যার, আমি যদি কালি দিতাম, তাহলে আমি নিজে কখনও আপনাকে কালির কথা বলতাম”? কিন্তু পন্ডিত স্যার সংস্কৃত ব্যকরণ, বিয়ের মন্ত্র, শ্রাদ্ধের মন্ত্র, সাবিত্রী-সত্যবান পূজোর যুক্তি ছাড়া, পৃথিবীর আর কোন যুক্তি-তর্কের ধার ধারেন না। তিনি বললেন, “তুই ছাড়া আর কে কালি দেবে? তবে কে কালি দিয়েছে বল্”? বাধ্য হয়ে বললাম, “আমি কী করে জানবো, আমি কী ডিটেকটিভ্ নাকি”?

তিনি আমাদের সবাইকে ছুটির পরেও ক্লাশে দাঁড়িয়ে থাকার হুকুম দিয়ে, ক্লাশ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। ছুটির পর বাড়ি ফিরে টিউশন পড়তে যাওয়া আছে। শুধু আমার একার নয়, বেশ কয়েকজন ছুটির পর পড়তে যাবে। কী করবো ভেবে না পেয়ে উমাশঙ্কর বাবুকে সব কথা খুলে বললাম। তিনি ছিলেন স্কুলের সুপারিনটেনডেন্ট্ মতো। ছাত্ররা তো বটেই, শিক্ষকরাও তাঁকে খুব সম্মান করতেন। যাহোক্, তিনি আমাদের ক্লাশে এসে সব শুনে, এবং সব ছাত্রদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, “তোরা পন্ডিত মশাইয়ের সাথে ইয়ার্কি ঠাট্টা করিস-ই বা কেন? তিনি কী তোদের সমবয়সী না ইয়ার্কির পাত্র? প্রাইভেট টিউশন আছে বলে তোদের ছেড়ে দিলাম, ভবিষ্যতে এরকম ঘটনা যেন আর না হয়”।

আমরা তো মহানন্দে যে যার বাড়ি চলে গেলাম। পরদিন স্কুলে ঢোকার সময়েই যেন কেমন থমথমে পরিবেশ বলে মনে হ’ল। পরে শুনলাম পন্ডিত স্যার কালকের ঘটনায় ভীষণ চটেছেন। তাঁর অনুমতি না নিয়ে আমাদের বাড়ি চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ায়, তাঁর সাথে উমাশঙ্কর বাবুর নাকি প্রচন্ড কথা কাটাকাটিও হয়েছে। ঠিক যে কী হয়েছে বুঝতেও পারছি না। যেহেতু ব্যাপারটা আমাদের, বিশেষ করে আমাকে নিয়ে, তাই প্রত্যক্ষ ভাবে খোঁজ নিতেও সাহস হচ্ছে না। এর ওর মুখের কথায় যতটুকু জানা যাচ্ছে।

টিফিনের সময় দেখলাম টিচার্সরুমে পন্ডিত স্যার খুব গম্ভীর মুখে বসে আছেন। আসলে আমাদের মতো পন্ডিত স্যারকে তো শিক্ষকরাও চিনতেন। আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে বলে, ব্যাপারটা ভুলে গিয়ে তিনি হয়তো বাড়িও চলে যেতেন। তাছাড়া তিনি কোনদিন এই রকম লংটার্ম শাস্তিও দিতেন না। তাই উমাশঙ্কর বাবু একটু বকাঝকা করে, আমাদের ছেড়ে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা নিয়ে যে এত জল ঘোলা হবে, তিনিও আন্দাজ করতে পরেন নি। টিফিনের শেষে সবে নতুন ক্লাশ শুরু হয়েছে, নীচে খুব গোলমালের আওয়াজে বারান্দায় এসে দেখি, একতলায় টিচার্সরুম এর কাছে কিছু শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মচারীদের ভীড়। ইংরাজী বর্ণমালার ইউ এর ওল্টানো শেপের স্কুল বিল্ডিং এর দোতলার বারান্দায় ছাত্র-ছাত্রীদের ভীড়। সকলেরই দৃষ্টি নীচে টিচার্সরুমের দিকে। পরে শুনলাম পন্ডিত স্যার লক্ষীদিকে, লক্ষীদি আমাদের স্কুলে বেয়ারার কাজ করতো, চা আনতে দিয়েছিলেন। লক্ষীদি চা নিয়ে এসে, “স্যার আপনার চা” বলে পন্ডিত স্যারকে চা দিতে গেলে, তিনি হঠাৎ লক্ষীদিকে বেত দিয়ে মেরেছেন। সম্ভবত তিনি অন্য কোন চিন্তায়, অন্য কোন জগতে ছিলেন। হয়তো লক্ষীদিকে কোন ছাত্রী মনে করেছিলেন, ছাত্র মনে করলেও, অবাক হবার কিছু নেই। আর কালকের ঘটনার জের হলে, অবশ্যই তিনি লক্ষীদিকে আমি মনে করেছিলেন। মুহুর্তের মধ্যে চিৎকার চেঁচামিচিতে স্কুল ভরে গেল, তার সাথে ঘন ঘন শিষ দেওয়ার আওয়াজ। অবস্থার সামাল দিতে, হেড মাষ্টারমশাই বাধ্য হয়ে স্কুল ছুটি দিয়ে দিলেন। আমরাও বাঁচলাম, তিনিও বাঁচলেন। যাহোক্, হেড মাষ্টারমশাই ও অন্যান্য শিক্ষকদের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির তৎপরতায় এই উত্তেজনা প্রশমিত করার চেষ্টায়, ব্যাপারটা মিটে গিয়ে আবার শান্তি ফিরে এল। এই পন্ডিত স্যারকে নিয়ে এত স্মৃতি, সব বলতে গেলে একটা নতুন মহাকাব্য লেখা হয়ে যাবে। তবু দু’একটা ঘটনা তো না বললেও নয়।

দাদারা তখন নাটক করার নেশায় মেতেছে। পন্ডিত স্যারের মেজছেলে, দাদার প্রাণের বন্ধু বিভাসদাও, দাদার সাথে নাটকের দলে আছে। আর আছে পন্ডিত স্যারের সেই ভাইপো, আমার সহপাঠী, সুশীল বা মেনো। এখনকার মতো তখন নাটকের এত চল্ ছিল না, দলতো ছিলই না। যতদুর মনে পড়ে “দ্বান্দ্বিক” নামে একটা নাটক সেদিন বড় রাস্তার ওপর “বানী নিকেতন” নামে একটা পাবলিক লাইব্রেরীতে সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হবে। দুপুর থেকেই দাদা, বিভাসদা ও আরও সকলে নাটক নিয়ে খুব ব্যস্ত। হলে চেয়ার পাতা, মাইক বাঁধা, আলোর ব্যবস্থা করা, জোর কদমে চলছে। আজকের এই অনুষ্ঠানে পন্ডিত স্যার প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কিত করবেন।

সন্ধ্যাবেলা দাদা, বিভাসদারা গ্রীনরুমে মেক-আপ নিয়ে ব্যস্ত। দর্শকরা কার্ড হাতে হলে ঢুকতে শুরু করেছে। মাইক্রোফোন হাতে পেয়ে পর্দার ওপাশ থেকে কে যেন একই কথা বারবার ঘোষণা করে চলেছে। ঘোষণার মাঝেমাঝে, কাম-সেপ্টেম্বর এর মিউজিকের রেকর্ড বাজানো হচ্ছে। হলের বাঁধানো মঞ্চে উঠবার জন্য দু’পাশে সিঁড়ি রয়েছে। পর্দার পিছন দিয়ে মঞ্চে যাবার ব্যবস্থা যেমন থাকে তাতো আছেই। হল থেকে বাঁধানো মঞ্চ বেশ উচু। যাহোক্, একসময় মঞ্চের পর্দা ধীরে ধীরে দু’পাশে সরে গেল। নিয়ম মতো উদ্বোধন সঙ্গীত ও দু’-একজনের বক্তৃতার পর, ঘোষণা করা হ’ল— এবার আমাদের প্রধান অতিথি, শ্রী মুরারী মোহন চক্রবর্তী, কাব্য ব্যকরণ তীর্থ, ইত্যাদি ইত্যাদি, তাঁর মূল্যবান বক্তব্য রাখবেন।

পন্ডিত মশাই মঞ্চে এলেন। তাঁর সামনে মাইক্রোফোনটা সেট করে দিয়ে যাওয়া হ’ল। স্কুলের পড়ানোর কায়দায় তিনি মাঝেমাঝেই দুই পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে উচু হচ্ছেন, এবং বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘক্ষণ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও, তাঁর বক্তৃতা শেষ হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। বানীনিকেতন হলও রাতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভাড়া দেওয়া হয়। বেশী দেরি হলে সম্পূর্ণ নাটক মঞ্চস্থ করায়, অসুবিধা দেখা দিতে পারে। কী ভাবে তাঁকে ক্ষান্ত করা যায়, এই নিয়ে দাদারা চিন্তায় পড়ে গেছে। এমন সময় তিনি বললেন, “এই তো গেল গোড়ার কথা, এখন দেখতে হবে, রস কয় প্রকার। রস প্রধানত তিন প্রকার, আদি, মধ্য ও অন্ত। এবার তিনি আদি রস ব্যাখ্যা করতে শরু করলেন। অবস্থা যা দাঁড়ালো, তাতে এইভাবে রসের ব্যাখ্যা করতে গেলে নাটক তো দুরের কথা, তিনি অন্ত রসে পৌঁছনোর আগেই, বানীনিকেতন হল ব্যবহার করার অনুমোদিত সময় অন্ত হয়ে যাবে। শেষে তাঁর কাছে গিয়ে ফিসফিস্ করে, বক্তব্য ছোট করার কথা বলার চেষ্টা করা হ’ল। কিন্তু তিনি সেসব কথা শুনলে, তবে তো তাঁকে বলা হবে। শেষে এইভাবে অনেক চেষ্টার পরে তিনি তাঁর মূল্যবান বক্তব্য শেষ করে, ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে প্রথম রোতে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট আসনে বসলেন। বহু আকাঙ্খিত নাটক শুরু হ’ল।

পন্ডিত স্যারের ভাইপো, মেনো, যে আমার সাথে পড়তো, কৌতুক অভিনয় ভালই করতো। এই নাটকেও সে একটা হাসির রোলে চুরান্ত অভিনয় করছে। দু’একবার হাততালিও পেয়েছে। পুরোদমে নাটক চলছে, এমন সময় পন্ডিত স্যার মঞ্চে ওঠার পাশের সিঁড়ি ব্যবহার না করে, পা উচু করে হাতে ভর দিয়ে একবারে দর্শকদের সামনে দিয়ে মঞ্চে উঠে, মঞ্চের মাঝখানে গিয়ে, মেনোর হাত ধরে বললেন— “এই মেনো, এদিকে আয়”। মঞ্চের সমস্ত অভিনেতারা দাঁড়িয়ে পড়েছে, অভিনয় বন্ধ। এবার তিনি দর্শকদের উদ্দেশ্যে বললেন— এই যে মেনো, আমার ভাইপো, ভাল নাম সুশীল চক্রবর্তী, এর অভিনয় আমার খুব ভাল লেগেছে। এর অভিনয়ে খুশী হয়ে একে একটা মেডেল দেবার কথা ঘোষণা করছি। আজকের এই নাটকে সকলেই খুব ভাল অভিনয় করছে, ইত্যাদি কিছু কথা বলে, তিনি প্রায় একই কায়দায় মঞ্চ থেকে নীচে নেমে এসে নিজের আসনে বসলেন। নাটক আবার শুরু হ’ল।

এখনও আগের মতো আছে কিনা জানিনা, সেই সময় চিঠি লিখলে বিভিন্ন চার্চ বা খ্রীষ্টান ধর্মীয় সংস্থা থেকে বাইবেল সংক্রান্ত বই পাঠানো হ’ত। কলকাতার কোন খ্রীষ্টান প্রতিষ্ঠানে চিঠি লেখার ফলে আমার কাছে বিভিন্ন পত্রিকা, বই পাঠানো শুরু হ’ল। প্রথম প্রথম পোষ্টে ঐ সব বই বা পত্রিকা আসার আশায়, পিওনের পথ চেয়ে থাকতাম। তারপর এক সময় দেখলাম কলকাতা তো বটেই, বোম্বে বা মাদ্রাজ থেকেও বিভিন্ন বই আসা শুরু হ’ল। এরা আবার বই এর সাথে বাইবেল বা যীশু সংক্র্রান্ত প্র্রশ্নপত্রও পাঠাতো। ডাকযোগে পরীক্ষার মতো সেই সব প্রশ্নের উত্তরও ডাকযোগে তাদের পাঠাতে হ’ত। প্রশ্নগুলোও অদ্ভুত, আগাগোড়া বইটা তারা না পড়িয়ে ছাড়বে না। যেমন, এই বইতে যীশু শব্দটি কতবার আছে? যীশু শব্দটি কতবার আছে গুনে দেখতে গেলে, মোটামুটি যত্ন নিয়েই গোটা বইটার ওপর চোখ বোলাতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পরে সার্টিফিকেট আসতো। আমি অনেকগুলো সার্টিফিকেট পেয়েছিলাম। স্কুলের পরীক্ষায় যত খারাপ রেজাল্টই করি না কেন, বাইবেলে ৯৮ থেকে ১০০ শতাংশ নম্বর পেয়ে, পরিবারের মুখ যথেষ্টই উজ্জল করেছিলাম।

সে যাহোক্, এই সব প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝেই কিছু কার্ড পাঠিয়ে আমার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজন, যারা এই সব বই পড়তে চায়, পরীক্ষা দিয়ে নিজেদের ধন্য করতে চায়, তাদের দিতে বলতো। আগ্রহী ব্যক্তিরা এই কার্ডে তাদের নাম, ঠিকানা লিখে ঐ প্রতিষ্ঠানে পাঠালে, তারাও আমার মতো বইপত্র, প্রশ্নপত্র পেতে শুরু করবে। এই কার্ড পোষ্টে পাঠাবার জন্য কিন্তু কোন ডাকটিকিট লাগাতে হ’ত না। আমি এইসব কার্ডে আমার পরিচিত বন্ধু বান্ধবের নাম ঠিকানা লিখে পোষ্ট করে দিতাম। তার মধ্যে একাধিকবার পন্ডিত স্যারের নাম ঠিকানা লিখেও পোষ্ট করে দিয়েছিলাম। গোঁড়া ব্রাহ্মণ পন্ডিত স্যার নিশ্চই বাইবেল, অন্যান্য বই বা প্রশ্নপত্র পেতে শুরু করেছিলেন। গীতা, উপনিষদের পরিবর্তে বাইবেল বা ঐ জাতীয় বই পেয়ে তাঁর মনের অবস্থা কী হয়েছিল, কেষ্টর বাণীর পরিবর্তে খ্রীষ্টর বাণী পড়ে তাঁর কেমন লেগেছিল, জানার খুব ইচ্ছা থাকলেও, জানার সুযোগ বা সাহস কোনটাই হয়নি।

যাহোক, আবার সেই পুরানো কথায়, পুরানো সময়ে ফিরে যাই। আমাদের বাড়িটা ছিল নন্দীপাড়া নামে একটা জায়গায়। আমাদের বাড়ির কাছেই মুখার্জীপাড়া নামে একটা পাড়া ছিল। সেখানে যেতে হলে পন্ডিত স্যারের বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে হয়। তাঁর জমিদারির বেশীরভাগ জায়গাই ছিল, জঙ্গল আর বিছুটি গাছে ভরা। আর তার মধ্যেই ছিল প্রচুর বড় বড় নারকেল গাছ, মাদার গাছ, আঁশ ফলের গাছ, খুব লম্বা লম্বা দেবদারু ও অন্যান্য নানা রকম গাছ। মাসকয়েক পর থেকেই সেখানে যাওয়া শুরু হ’ল। এই পাড়াতেই ছিল আমার সহপাঠী সৌমেন দত্ত’র বাড়ি। তাকে আমরা সত্তু বলেই ডাকতাম। ক্রমে ক্রমে বন্ধুত্ব হ’ল অঞ্জন, ক্ষুদি, দেবু, গদা, কচি, ইত্যাদি অনেক ছেলের সঙ্গে। সন্তু ছাড়া আর সকলেই প্রায় আমার সমবয়সী হলেও, নীচু শ্রেণীতে পড়তো। ক্ষুদি অবশ্য অনেক নীচু শ্রেণীতে পড়তো। কোন একটা স্কুলে তার নাম লেখানো ছিল, তাই স্কুলে পড়তো বললাম। বাস্তবে পড়াশোনার সাথে তার কোন সম্পর্ক ছিল না। এই ক্ষুদি ও দেবু ছাড়া, আর সকলেই আমার স্কুলের ছাত্র ছিল।

এই পাড়ায় সন্তোষ দাস নামে একজন বাস করতেন। বয়সে আমার থেকে বছর ছয়-সাতের বড় ছিলেন। তাঁর দুই ভাই ছিল অসীম ও শীলু। অসীমের সম্ভবত হার্টের কোন অসুখ ছিল। কিছুদিন পরে সে মারা যায়। সন্তোষদার মা আমার সাথে অসীমের কোন মিল খুঁজে পেতেন। তিনি বলতেন আমাকে নাকি ঠিক অসীমের মতো দেখতে। সম্ভবত এই কারণেই তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। সন্তোষদার বাবা ছিলেন বদ্ধ পাগল। তাঁর পাগলামির একমাত্র লক্ষণ ছিল, সারাদিন বিড়বিড় করে বকবক্ করা। আর এই বকবকের অধিকাংশই কথাই ছিল অশ্লীল খিস্তি। অথচ সন্তোষদা, তার কাকা, বা বাড়ির অন্য সকলেই ছিলেন বেশ ভদ্র। পাগল হলেও একটা ভদ্রবাড়ির অত বয়স্ক একজন, সারাদিন এত খিস্তি কেন করতেন জানিনা। রাস্তাঘাটে তাঁকে একা পেলেই উস্কে দিতাম। ব্যাস গালাগালির বন্যা বয়ে যেত।

সন্তোষদার বাড়ির ঠিক পিছনেই ছিল রেলের ঝিল। তাঁর বাড়ির সামনে, একটু দুরেই ছিল একটা ছোট্ট মাঠ। একদিকে মাঠ লাগোয়া একটা আরও ছোট পুকুর। পুকুর না বলে তাকে ডোবা বলাই ঠিক হবে। মাঠটার একপাশে ছিল দেবদারু, মাদার ফল, আঁশ ফল, ইত্যাদি বড় বড় গাছ। অনেকটা জমির ওপর পরপর অনেকগুলো বড় বড় গাছ, মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতো। জমিটা ছিল মাঠ থেকে প্রায় দেড়-দু’ফুট উচু। যেন কেউ নিজ হাতে জমি তৈরী করে, যত্ন করে এইসব গাছপালাগুলো লাগিয়েছে। মাঠের অপর পারে ছিল গোপাল ধাড়ার বাগান। বেশ বড় লম্বা দোতলা বাড়ির মালিক ছিল এই গোপাল ধাড়া। অনেক ঘর ভাড়াটিয়া। এই বাড়িতেই অঞ্জন ও তার ভাই চন্দনরা ভাড়া থাকতো। বাড়ির পিছনের অংশে, ছোট্ট মাঠটার একপাশে ছিল বেড়া দিয়ে ঘেরা, এই বড় বাগানটা। গোপাল ধাড়ার বাড়িটা নন্দীপাড়ায় হলেও, মাঠটা ছিল মুখার্জী পাড়ায়। জমি বাড়ি নিয়ে বেশ অনেকটা জায়গা।

আমি তখন মুখার্জী পাড়ায় নতুন যাওয়া শুরু করেছি। ভাল করে লোকজন, পথ ঘাট তখনও চেনা হয়ে ওঠেনি। একদিন সন্তু বললো, “চল্ বাগান থেকে জামরুল পেরে আনি”। জামরুল যে আমি খুব ভালবাসি তাও নয়, তবু ওর সাথে বাগানের বেড়া টপকে বাগানে ঢুকলাম। জামরুল গাছে ওঠারও দরকার হ’ল না। গাছের নীচে প্রচুর জামরুল পড়ে আছে। আমরা সেগুলো কুড়িয়ে, গাছে উঠবো ঠিক করলাম। সবে মাত্র জামরুল কোড়ানো শুরু হয়েছে, হঠাৎ বেড়ার বাইরে হইচই, চিৎকর শুনে দেখি, দু’টো লোক বেড়ার বাইরে দিয়ে এসেছে, এবং একটা লোক বাগানের ভিতর দিয়ে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। সন্তু বাগানের ভিতর দিয়ে গোপাল ধাড়ার বাড়ির দিকে দৌড় দিয়ে আমায় শুধু বললো, “পালিয়ে আয়”। আমার ব্যাপারটা বুঝে উঠতে একটু সময় চলে গেল, তাছাড়া ওদিক দিয়ে রাস্তাও আমার চেনা নেই। এইটুকু সময়ের মধ্যে সন্তু চোখের বাইরে চলে গেল। আমি একছুটে বাগানের ভিতরের লোকটাকে কাটিয়ে, বেড়ার কাছে এসে বেড়া টপকাতে যাবার আগেই, বেড়ার বাইরে দিয়ে ঐ দু’জন লোক আমার সামনে চলে এসেছে। এইভাবে কয়েকবার বাগানের বিভিন্ন প্রান্ত দিয়ে বেড়া টপকে পালাতে ব্যর্থ হয়ে, আমি আবার বাগানের অন্য প্রান্তে ছুটতে শুরু করে, মাঝপথে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে মাঠের দিকে ছুটে এসে বেড়া টপকাতে গেলাম। বাইরের দু’জন ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারেনি, ফলে তাদের এদিকে ফিরে আসতে সময় লাগলো। কিন্তু বেড়া টপকে যখন মাঠে লাফাতে যাব, ঠিক তখনই একটা ছেলে ধূমকেতুর মতো আবির্ভুত হয়ে, আমাকে জড়িয়ে ধরে টেনে বাগানের ভিতর নামিয়ে নিল। ও কখন বাগানে এসেছে লক্ষ্যও করিনি। আমার বোনের গানের সঙ্গে মন্টুদা নামে একজন তবলা বাজাতো। এই ছেলেটা তার ভাগ্নে না ভাইপো, কী যেন হয়। ততক্ষণে বাগানের ভিতরের লোকটা এবং বাইরের দু’জন এসে আমাকে ধরে ফেলেছে। এদের মধ্যে একজনকে চিনি, তাকে লক্ষণদা বলে ডাকতাম। তাকে জানালাম, আমরা একটাও জামরুল গছ থেকে পারিনি। গাছ তলা থেকে কুড়িয়ে নিয়েছি, কাজেই আমাকে ছেড়ে দেওয়া হোক। লক্ষণদা বললো আমাকে ছেড়ে দিলে, গোপাল ধাড়া তাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবে। সে জানালো, তার সাথে গোপাল ধাড়ার কাছে যেতে, সে লোক খারাপ নয়, কাজেই ছেড়ে দেবে। বাধ্য হয়ে আমাকে ওদের সাথে সন্তু যে পথে পালিয়েছে, সেই পথে গোপাল ধাড়ার বাড়ির দোতলায় গিয়ে উপস্থিত হতে হ’ল।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও শ্রীমান গোপালের দেখা পেলাম না। শেষে দেখি গোপাল ধাড়া বেশ সাজগোজ করে, মানে সার্ট ও ধুতি পড়ে এসে উপস্থিত হ’ল। গোপল ধাড়া বিশেষ কোথাও যায়ও না, কারণ বেঁটেখাটো বুড়ো লোকটার দু’টো পা-ই, ধনুকের মতো বাঁকা। ফলে লাঠি নিয়ে কোন মতে পেঙ্গুইনের মতো করে হাঁটাচলা করে। কাজেই সে যখন সাজগোজ করে এসে বললো, “একে নিয়ে থানায় যাব”, আমি একটু ভয়ই পেলাম। লক্ষণদা ব্যাপারটাকে হাল্কা করে দেবার চেষ্টা করলো। শেষে গোপাল ধাড়া জানতে চাইলো, আমার সাথে আর কে কে ছিল। এ প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে, আর করবো না, ভুল হয়ে গেছে, ইত্যাদি বলতে শুরু করলাম। কিন্তু শ্রীমান গোপাল আমাকে আর লক্ষণদাকে নিয়ে অনেক কসরৎ করে রাস্তায় নামলো। সে কিন্তু থানার দিকে না গিয়ে্‌ বাড়ির পিছনে মুখার্জী পাড়ার রাস্তা ধরলো। মন্টুদার ভাগ্নেও বীর বিক্রমে আমাদের সাথে হাঁটতে শুরু করলো। যেতে যেতে গোপাল ধাড়া সেই একই প্রশ্ন করে যাচ্ছে— সঙ্গে কে কে ছিল? আমি ও লক্ষণদা চুপ করে থাকলেও, মন্টুদার ভাগ্নে বলে দিল, “সঙ্গে সন্তু ছিল, আমি নিজের চোখে দেখেছি”। ব্যাস, গোপাল ধাড়া চ্যাঁচাতে শুরু করলো, “কে সন্তু? সে কত বড় বাপের ব্যাটা আজ দেখবো। সবকটাকে হাজত বাস করিয়ে তবে ছাড়বো”। কিন্তু আমার এমন কপাল, যে সে যখন সন্তুর নাম ধরে চ্যাঁচাচ্ছে, ঠিক তখনই আমরা সন্তুর বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছি। একবার ভাবলাম এক ছুটে পালিয়ে যাই, কিন্তু লক্ষণদা অভয় দিল, “ভয় নেই আমি তো আছি। পালিয়ে গেলে ঝামেলা আরও বাড়বে”। এদিকে সন্তুর মা, সন্তুর নাম ধরে চিৎকার শুনে, দোতলা থেকে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞসা করলেন, “কী হয়েছে? সন্তু কী করেছে”? ব্যাস, এবার গোপাল ধাড়া আমায় ছেড়ে সন্তুকে নিয়ে পড়লো। শেষে লক্ষণদার চেষ্টায় ব্যাপারটা সেখানেই মিটে গেল।

পরদিন বিকেলে মাঠে আমরা ফুটবল খেলছি, এমন সময় দেখি মন্টুদার ভাগ্নে দাঁত মাজতে মাজতে, গামছা পরে মাঠের পাশ দিয়ে পুকুরের দিকে যাচ্ছে। খেলার সাথীদের গতকালের ঘটনা বলতেই, সকলে বললো, “আজ শালাকে ধর”। কিন্তু তাকে ধরবো কী? তার যা অহি রাবণের ব্যাটা মহী রাবণের মতো চেহারা, একা গিয়ে তাকে ধরবার সাহস কোথায়? সকলে অভয় দিল তারা আমার সঙ্গে আছে। তার দিকে এগিয়ে গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কাল তুই আমাকে ধরিয়ে দিলি কেন”? সে এক হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে বললো, “বেশ করেছি, বাগানে ঢুকেছিলি কেন? তোর বাপের বাগান”?

গোপাল ধাড়া কিন্তু তার বাপ নয়, বাড়িওয়ালা মাত্র। মাথায় আগুন জ্বলে গেল। “ওটা তোরও বাপের বাগান নয়” বলে, তার গালে একটা সপাটে চড় কষিয়ে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ও কাটা কলাগাছর মতো পুকুরে পড়ে গেল। বিপদ বুঝে আমরা সকলে বল খেলা বন্ধ করে মাঠ ছেড়ে পালালাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে মনে হ’ল, আমাদের চলে আসাটা ঠিক হয়নি। ও যদি অজ্ঞান হয়ে জলে ডুবে মরে যায়? সঙ্গীদের নিয়ে তৎক্ষণাত আবার পুকুর পাড়ে ফিরে এসে, তাকে আর দেখতে পেলাম না। বাধ্য হয়ে সকলে মিলে পুকুরে নেমে, অনেক খুঁজেও তাকে জীবিত বা মৃত, কোন অবস্থায় পাওয়া গেল না। সারা রাত খুনের আসামীর মতো ভয়ে ভয়ে কাটালাম। দিন দু’এক পরে তাকে আবার দেখলাম। সে কিন্তু আমাদের এড়িয়ে চলে গেল। আর কোনদিন সে আমাদের সাথে ঝামেলা করার সাহস দেখায় নি।

কিন্তু গোপাল ধাড়ার কী হবে? তাকে তো সহজে ছেড়ে দেওয়া যায় না। একদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে আমরা দু’তিনজন তার সাধের বাগানে ঢুকে, ছোট্ট একটা কাটারি দিয়ে অনেকগুলো কলাগাছ কেটে, মাটিতে শুইয়ে দিয়ে এলাম। পরদিন পাড়ায় খুব হইচই। গোপাল ধাড়া গোটা মুখার্জী পাড়া বাঁকা পায়ে পেঙ্গুইনের মতো হেঁটে পুলিশি কায়দায় টহল দিয়ে গেল। দিন কয়েক আমরা চুপচাপ থাকায়, কলাগাছ নিধন পর্ব যখন প্রায় থিতিয়ে এসেছে, তখনই একদিন পাড়ায় গিয়ে শুনলাম, ভীষণ ব্যাপার। গতকাল লক্ষণদা একটা বড় মিষ্টির বাক্সে, অনেক টাকার মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছিল। গোপাল ধাড়াই তাকে আনতে দিয়েছিল। কেউ একজন অন্ধকারে তার হাত থেকে সেই মিষ্টির বাক্স ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে গেছে। চোর পালাবার আগে, লক্ষণদা তার হাতের তিন ব্যাটারির বড় টর্চ দিয়ে চোরকে আঘাত করেও, মিষ্টির বাক্স বাঁচাতে পারেনি। পরে অবশ্য গোপন সুত্রে খবর পেয়েছিলাম, বান্ছা নামে এ পাড়ারই একজন, এই কাজটা দক্ষতার সঙ্গে সুসম্পন্ন করেছে। গোপাল ধাড়া থানায় গিয়ে ডায়েরি করেছে। জানিনা ডায়েরিতে হয়তো আমাদের নামও ছিল। আমরা মিষ্টির ভাগ পাইনি, কে নিয়েছে তাও নিশ্চিত ভাবে জানিনা, তবু আমাদের বিপক্ষের বিপদে, ক্ষতিতে, আমরা খুশীই হয়েছিলাম। যাহোক্, এ নিয়ে আর বিশেষ কোন ঝামেলা হয় নি।

পনেরই আগষ্ট, মাঠে ইঁট দিয়ে একটা বেদী তৈরী করে, তার ওপর একটা নেতাজীর ছবি রেখে, এবং তার পাশে একটা বাঁশ পুঁতে, জাতীয় পতাকা উত্তলন করা হবে। ঠিক হ’ল গোপাল ধাড়াকে দিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তলন করে, স্বাধীনতা দিবস পালন করা হবে। আসলে আমাদের সম্পর্কটাকে মাখনের মতো মসৃন করার এটা একটা প্রয়াস মাত্র। সেই মতো গোপাল ধাড়ার বাড়ির দোতলায়, আমরা কয়েকজন গিয়ে তাকে সব বলে, তাকে পতাকা তোলার কথা বললাম। কিন্তু সে আমাদের দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললো, “পতাকা তুলবো? এই দ্যাখ”, বলে পরনের কাপড়টা তার মাথার ওপর তুলে ধরলো। আমরাও তাকে বেশী তেল না দিয়ে ফিরেই আসছিলাম। হঠাৎ দেখি সিঁড়ির পাশে তার লাঠিটা দাঁড় করানো আছে। আমি সেটা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলাম। লাঠি ছাড়া সে একপাও হাঁটতে পারে না, ফলে ”হাই শালা, হাই শালা” বলতে বলতে লাঠি ছাড়াই দেওয়াল ধরে ধরে, অতি কষ্টে কোন মতে আমার কাছে এগিয়ে এল। খান তিনেক সিঁড়ি নেমে, লাঠিটাকে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখলাম। অনেক সময় নিয়ে, অতি কষ্টে দেওয়াল ধরে ধরে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে, সিঁড়ি ভেঙ্গে লাঠির কাছে আসতেই, লাঠিটাকে আরও তিন-চার ধাপ নীচে রেখে দিলাম। আগের মতোই অনেক কসরৎ করে লাঠির কাছে আসতেই, আবার লাঠি নিয়ে খানিক নীচে নেমে এসে লাঠিটাকে রেখে দিলাম। এইভাবে তাকে লাঠি ছাড়াই একতলায় নামিয়ে এনে বললাম, “ভবিষ্যতে আমাদের পেছনে লাগলে মজা দেখিয়ে দেব। আজ শুধু একটু নমুনা দেখিয়ে গেলাম”। আমরা চলে আসার পর বাড়িটাতে অনেকক্ষণ চিৎকার চ্যাঁচামিচিতে, কাক চিল বসতে পারে নি।

মুখার্জী পাড়ায় যাওয়া বন্ধ করা পর্যন্ত প্রায় চার বছর, গোপাল ধাড়ার সাথে সম্পর্কটা একদিনের জন্যও ভাল হয় নি। হবার কথাও নয়। বাগানে ছোট ছোট তরতাজা অনেক গাছ গজালো। সঙ্গীরা সকলেই বোটানির মাষ্টার, শুনলাম ওগুলো শাঁখালু গাছ। শাঁখালু গাছ কোনদিন দেখিনি, শাঁখালু খেতেও যে খুব ভালবাসি তাও নয়। তবু গোপাল ধাড়ার বাগানের শাঁখালু বলে কথা, আমরা খাব না, এ হতেই পারে না। ফলে শাঁখালু খাবার জন্য যত গাছ উপড়ে তুলে আনা হয়, সবই দেখি কাঁচা হলুদ। আসলে ওগুলো সবই হলুদ গাছ। পরপর লাইন দিয়ে লাগানো সব ক’টা গাছ একই রকম দেখতে। একটা গাছ তুলেই বোঝা উচিৎ, ওগুলো হলুদ গাছ, শাঁখালু নয়। তবু একটার পর একটা গাছ তুলে, পরীক্ষা করতে করতেই, অর্ধেক গাছ তোলা হয়ে গেল। এত কষ্ট করে তোলা, তার ওপর আবার গোপাল ধাড়ার বাগানের কাঁচা হলুদ, কাজেই ফেলে না দিয়ে, খেয়ে নিতাম। এভাবে প্রায় রোজই গাছ তোলা ও হলুদ খাওয়া চলতে লাগলো। এই বয়সেও আমার গায়ের রং ও ত্বক বেশ ভাল। জানিনা হয়তো এটা ঐ কাঁচা হলুদেরই গুন। একদিন রাতে তার বাগানের নারকেল গাছে উঠে, ডাবে হাত দেবার সঙ্গে সঙ্গে, হাতে কী যেন একটা কামড়ালো। অসম্ভব জ্বালা শুরু হওয়ায়, গাছ থেকে নেমে এসে বন্ধুদের পরামর্শে হোমিওপ্যাথি আর্নিকা খেয়ে, নিশ্চিন্তে রাত কাটালাম। কেউটে, গোখরো, বিচ্ছু, এমন কী মহাস্থবীর জাতকের বিষখোবরাও হতে পারতো, কিন্তু কিছুই হয় নি। হয়তো আমাদের ওপর তার রাগ থাকলেও অভিশাপ ছিল না। গোপাল ধাড়া তোমায় লাল সেলাম।

গোপাল ধাড়া হয়তো মরে গিয়েও বান্ছারামের মতো বাগানের সেই ন’কড়ি না তিনকড়ির মতো বাগান পাহাড়া দিচ্ছে। তা দিক, তবু তাকে আজ এত বছর পরেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি, ক্ষমা প্রার্থনা করছি। অল্প বয়সের রক্তের তেজে তাকে কত জ্বালাতনই না করেছি, আর সে রক্তের তেজও হয়তো তার বাগানেরই কাঁচা হলুদ, পেয়ারা, জামরুল, ডাব-নারকেল খেয়েই হয়েছিল।

আমাদের মধ্যে দেবু ছিল সব থেকে চৌকস। সুন্দর গাছে উঠতে পারতো, গাছের বেশ উচু ডাল থেকে অদ্ভুত কায়দায় দুটো-আড়াইটে ভল্ট খেয়ে পুকুরে ঝাঁপ দিতে পারতো। আমি আর দেবু ছাড়া আর কেউ, ঐ উচু মোটা মাদার গাছে উঠতে পারতো না। ফলে আমাদের দু’জনের একটু আলাদা কদর ছিল। আমরা মাদার ফলের গাছে উঠে পাকা ফল পেরে আনলে, অন্যদের কপালে প্রসাদ জুটতো। মাদার গাছটার কান্ডটা এত মোটা ছিল যে, ওতে ওঠা ভীষণ কষ্টকর ছিল। দেবু আবার পাশের দেবদারু গাছটায় উঠে, একটা নির্দিষ্ট ডালে দাঁড়িয়ে, অদ্ভুত কায়দায় দোল খাওয়ার ভঙ্গিতে লাফ দিয়ে, মাদার গাছটার একটা নির্দিষ্ট ডাল ধরে, মাদার গাছটায় চলে যেত। কতবার ওর মতো দেবদারু গাছটায় উঠেও, সাহস করে মাদার গাছটার উদ্দেশ্যে লাফ দিতে পারিনি। ঠিক মতো ভাবে ওপরের ডাল ধরে দোল খেয়ে মাদার গাছে যেতে না পারলে, হাত, পা ইত্যাদি ভাঙ্গা তো আছেই, মৃত্যুও হতে পারে।

পুকুর পাড়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে শুন্যে একটা পাক খেয়ে পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া, দেবুই আমাকে সযত্নে শিখিয়েছিল। ওর মতো গাছ থেকে শুন্যে পাক খেয়ে পুকুরে ঝাঁপ দেওয়ার ইচ্ছা আমার খুব ছিল। কতবার গাছে উঠেও শেষ পর্যন্ত ভয়ে গাছ থেকে নেমে এসেছি। আসলে গাছটা থেকে পুকুরে ঝাঁপ দেওয়ার সব থেকে কাছের ডালটাই ছিল বেশ উচুতে। শেষ পর্যন্ত ওর কথা মতো একদিন সাহস করে লাফও দিলাম। কিন্তু শুন্যে সুন্দর পাক খেয়ে, তীর বেগে বুক চিতিয়ে পুকুরে পরে, আমার অবস্থা শোচনীয় হয়ে গেছিল। আর কোনদিন সে চেষ্টা করে দেখিনি। তবে একদিন অদ্ভুত ভাবে সেই দেবদারু গাছটার উচু ডালটা থেকে দেবুর মতো কায়দায়, মাদার গাছটায় দিব্বি চলে গেলাম। তারপর থেকে কোনদিন অসুবিধা হয় নি, ভয়ও করতো না। ফলে মাদার গাছের মোটা কান্ড বেয়ে নামা ওঠার পর্ব শেষ হওয়ায়, কষ্ট অনেক লাঘব হয়েছিল। গাছের নীচে যখন অনেকেই আমার দয়ায় মাদার ফল খাওয়ার আশায়, তীর্থের কাকের মতো ঘাড় উচু করে দাঁড়িয়ে থাকতো, তখন বেশ গর্ব বোধ হ’ত। তবে এই সুবিধা খুব বেশী দিন ভাগ্যে সইলো না।। একদিন দেবদারু গাছটার মোটা ডালটায় দাঁড়িয়ে, মাথার ওপর অপেক্ষাকৃত অনেক সরু ডালটা ধরে, অন্যান্য দিনের মতো দোল খেয়ে লাফ দেব, এমন সময় পায়ের নীচের মোটা ডালটা কী ভাবে ভেঙ্গে পড়ে গেল। আমি কিন্তু হাতের সরু ডালটা ধরে দিব্যি ঝুলতে থাকলাম। শেষে বাধ্য হয়ে দেবদারু গাছ থেকে নেমে এলাম। এরপর থেকে আবার সেই মোটা কান্ড বেয়ে আগের মতো মাদার গাছে উঠতে হ’ত।

আজ খুব অঞ্জনের কথা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, কারণ আজ যখন স্মৃতি রোমন্থন করে পুরানো সঙ্গী সাথীদের কথা ভাবতে বসেছি, তখন অঞ্জন ইহলোকের মায়া কাটিয়ে ওপারে চলে গেছে। ওকে নিয়ে কত স্মৃতি, ওকে ভুলি কী ভাবে? অঞ্জনরা তিন ভাই। কাবুল, অঞ্জন ও চন্দন। কাবুল বড়, ওর সাথে আমাদের খুব একটা আলাপ ছিলনা, চিনতাম এই পর্যন্ত। অঞ্জন ও চন্দন পিঠাপিঠি ভাই। অঞ্জন বড়, চন্দন ছোট। দু’জনেই আমাদের আড্ডার, খেলাধুলার সাথী। কাবুল বয়সে সামান্য বড় হলেও, একটু দাদা দাদা ভাব নিয়ে থাকতো, তাছাড়া ওর আড্ডা ছিল শঙ্কর মঠে। অঞ্জন আমার থেকে বয়সে কিছু ছোট ছিল। রাধামোহন নামে একটা আইসক্রীম বিক্রেতা, ছোট বাক্সে কাঠি আইসক্রীম নিয়ে, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বিক্রি করতো। কেন বলতে পারবো না, সে অঞ্জনকে ধারে আইসক্রীম বিক্রি করতো, যদিও দেখলেই বোঝা যায়, তার এখনও উপার্জন করার বয়সই হয় নি। ফলে আমরাও এই কাঠি আইসক্রীম খাওয়ার সুযোগ পেতাম। ধার যত না শোধ হয়, বেড়ে যায় অনেক বেশী। এই অঞ্জনকে নিয়ে কত স্মৃতি, কত ঘটনা, যথা সময়ে বলা যাবে।

মাঠ ও পুকুরের অপর পাড়ে, একটা জায়গায় অনেক দেবদারু গাছ ও অন্যান্য অনেক বড় বড় গাছ ছিল। কিন্তু গোটা অঞ্চলটা লতাপাতা ও বিছুটি গাছের মতো দেখতে, একরকম এক মানুষ উচু গাছে, ঘন জঙ্গলে পরিণত হয়েছিল। আমরা প্রথম প্রথম জঙ্গলের ডালপালা সরিয়ে, জঙ্গলের মাঝখানে গিয়ে আড্ডা মরতাম। আড্ডার জায়গাটায় জঙ্গল কেটে বেশ পরিস্কার করে নিয়েছিলাম। একটা মাদুর জোগাড় করে পাতাও হয়েছিল। বাইরে থেকে জঙ্গলের ভিতরটা দেখা যেত না।

এরমধ্যে পঞ্চায়েত বা ঐ জাতীয় কী একটা নির্বাচন এসে গেল। গদা ও কচির বাবা, পঞ্চানন চৌধুরী ভোটের প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ধারণা, তিনি জিতবেনই। তাঁর হয়ে খাটাখাটনি করার জন্য, আমাদের অনুরোধ করা হ’ল। একটা ভাঙ্গাচুরা সাইকেল গদা ও কচিকে দেওয়া হ’ল, আমাদের প্রয়োজনে। ভোটে জেতার জন্য যিনি অষ্টম শ্রেণী বা তার থেকেও নীচু শ্রেণীর ছাত্রদের ওপর নির্ভর করেন, তাঁর বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। অবশ্য এখন তো লোকসভা ভোটের মিছিলেও, প্রাপ্ত বয়স্ক ভদ্র শিক্ষিত লোকের থেকে, শিশু ও ন’চ্যাংড়া ছেলের ভীড় বেশী দেখতে পাই। যাহোক্, গদা ও কচি বিকালে মাঠে ভাঙ্গা ঝরঝরে সাইকেলটা নিয়ে আসতো। আমরা অধিকাংশ ছেলেই সাইকেল চালাতে জানতাম না। এই সুযোগে পালা করে সাইকেল চালানো শেখা শুরু হ’ল। শিখতে ও শেখাতে তো হবেই, আমরা সাইকেল চালানো শিখে, সাইকেল নিয়ে তাঁর হয়ে প্রচার ও অন্যান্য কাজ করে তাঁকে ভোটে জেতাবো। বেচারার আর যে কেউ কোথাও ত্রিভূবনে নেই। এই সাইকেল নিয়ে আমাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে গেল। সবাই আগে শিখতে চায়। সাইকেল একটা, শিক্ষক দু’জন, শিক্ষার্থী অনেক। আমি কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই, সাইকেল চালানো শিখে ফেললাম। প্রথম থেকেই সবাই বলছে, আমার ব্যালান্স্ খুব ভাল। সাইকেল চালিয়ে মাঠ ঘুরছি, পিছনে দু’জন ধরে আছে। হঠাৎ পিছন থেকে আমার নাম ধরে ডাকতে, মুখ ঘুরিয়ে দেখি, আমার সাইকেল কেউ ধরে নেই, আমি একাই সাইকেল চালিয়ে মাঠে পাক খাচ্ছি। কতক্ষণ এভাবে একা চালাচ্ছিলাম কে জানে, কিন্তু আমি একা নিজে নিজে সাইকেল চালাচ্ছি জানতে পেরেই, সাইকেল নিয়ে মাঠের পাশের পুকুরে নেমে গেলাম। আর এই অপরাধে আমাকে সাইকেল দেওয়া বন্ধ হ’ল।

সেই দিনই বিকালে শঙ্কর মঠের বিশাল মাঠে অপর একজনের সাইকেল ম্যানেজ করে চালাতে শুরু করলাম। দু’এক পাক ঘুরে সাইকেলের মালিককে সামনে বসিয়ে কিছুক্ষণ ডবল্ ক্যারী করেও দিব্বি চালালাম। একটু পরে দেখি একটা ছেলে এসে মাঠের একপাশে দাঁড়ালো। ছেলেটার পিছনেই শঙ্কর মঠের একটা পুকুর। এখন অবশ্য সেই পুকুর বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। যাহোক্, ছেলেটার পাশ দিয়ে যাবার সময়েই তাকে সরে যেতে বললাম। অত বড় মাঠটা চক্কর দিয়ে ছেলেটার কাছাকাছি এসে, ডান দিক দিয়ে যাব, না বাঁদিক দিয়ে যাব ঠিক করতে করতেই, তার কাছে এসে গেলাম। কিন্তু তাকে ধাক্কা মারার আগেই, সাইকেল নিয়ে পড়ে গেলাম। সাইকেলটা এবেলা আমার সাহায্য ছাড়া একাই গড়াতে গড়াতে পুকুরে নেমে গেল। সাইকেলটা পড়ে যাবার জন্য ছেলেটা যে কত দায়ী, তার আগেই সরে যাওয়া কেন উচিত ছিল, ইত্যাদি বোঝাবার চেষ্টা করলাম বটে, কিন্তু সাইেকলটা আর চাপার সুযোগ পাওয়া গেল না।

প্রথম প্রথম যেমন সব ছেলেরই সাইকেল চালানোটা নেশার মতো হয়ে যায়, আমার ক্ষেত্রেও তাই হ’ল। অথচ এমন কোন সাইকেল নেই, যেটা চালাবার সুযোগ পাওয়া যায়। ষষ্ঠীতলায় অনুপ নামে একটা ছেলে ছিল। সে আমার প্রায় সমবয়সী হলেও, কাছেই একটা ঘড়ির দোকানে কাজ করতো। সে একটা সাইকেলে চেপে দোকানে যেত। খুব ছেলেবেলা থেকে সে সাইকেল চালাচ্ছে, তাই সাইকেলের প্রতি তার তেমন কোন আকর্ষণ নেই। অনুপ আমাদের পরিচিত ছিল। শেষে অনেক ভেবে তাকে সাইকেলের কথা বললাম। সে আমাকে বললো, দুপুরে সে সাইকেলটা নিয়ে আসতে পারে এবং বিকেল পর্যন্ত আমি তাকে নিয়ে সেই সাইকেল চালাতেও পারি, তবে এর মধ্যে তার দুটো শর্ত আছে। এক, সে নিজে সাইকেল চালাবে না। শুনে তো আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। আর দ্বিতীয় শর্ত, তাকে রোজ আইসক্রীম ইত্যাদি খাওয়াতে হবে। মরেছে, এখানেই তো ঝামেলা দেখা দেবে। রোজ রোজ তাকে আইসক্রীম খাওয়াবার মতো পয়সা কোথায় পাব? অন্য সময় হলে নাহয় অঞ্জনের দৌলতে রাধামোহনের কাছ থেকে বাকীতে নিয়ে, তাকে যত খুশী আইসক্রীম খাওয়াতে পারি, কিন্তু সাইকেল চালানোর সময়, ঐ ভরদুপুরে রাধামোহনকে কোথায় পাব? কিন্তু এত কিছু ভাবতে গেলে সাইকেল পাওয়া যাবে না। তাই রাজী হয়ে গেলাম। আশ্চর্য, আইসক্রীমের পয়সা নিয়ে এত ভাবনা হ’ল, অথচ দুপুর বেলা সাইকেল চালালে স্কুলের কী হবে, তা কিন্তু একবারও ভাবলাম না, মনেও হ’ল না।

শুরু হ’ল স্কুল পালানো। দুপুর বেলার চড়া রোদে অনুপকে সামনে বসিয়ে, সাইকেল চড়া শুরু হ’ল। আইসক্রীমওয়ালা দেখলে, কাঠি আইসক্রীম খাওয়ানোও শুরু হ’ল। এর জন্য সুযোগ মতো পয়সা হাতানোও শুরু হ’ল। একদিন সাইকেল নিয়ে দু’জনে জগাছা দিয়ে গিয়ে, বম্বে রোড পর্যন্ত গেলাম। অসম্ভব গরম ও চড়া রোদে ঘেমে নেয়ে অনুপকে সামনের রডে বসিয়ে, অকারণে সাইকেল চালাচ্ছি। অনুপের সব থেকে বড় গুণ, সে কখনও নিজে সাইকেল চালাতে চায় না। বম্বে রোড থেকে আবার একই পথে ফিরে কদমতলা হয়ে যোগমায়া সিনেমা হলের কাছাকাছি এসে দেখি, একটা পাগলী রাস্তার মাঝখানে বসে আছে। তার পাশেই, সম্ভবত সে নিজেই, অনেকটা বড় বাইরে করে রেখেছে। অভিজ্ঞ অনুপ আমাকে আগেই সতর্ক করে দিল। আমিও যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে পাগলীর কোন পাশ দিয়ে যাব, ঠিক করতে শুরু করে দিলাম। শেষপর্যন্ত পাগলীকে দক্ষ হাতে কাটিয়ে চলে গেলাম বটে, তবে ঐ এক সের বড় বাইরেকে কাটাতে পারলাম না। ফলে সাইকেলের সামনের চাকায়, বস্তুটা মাখামাখি হয়ে গেল। রিম, স্পোক্, টায়ার, সর্বত্র নারীবরে মাখামাখি। ঐ অবস্থাতেই কোন মতে আমাদের মাঠে এসে, পুকুরে সাইকেল নামিয়ে, অনেক চেষ্টায় সাইকেল পরিস্কার করা হ’ল। ঐ রোদে প্রায় চদ্দ-পনের কিলোমিটার পথ ডবলক্যারী করে, ঘেমে নেয়ে হাঁপিয়ে গিয়ে, শেষপর্যন্ত যাত্রার পরিসমাপ্তি হ’ল।

একদিন এক ভীষণ বিপদের সময় জানতে পারলাম, সাইকেলটা আদৌ অনুপের নয়, অনুপ যে দোকানে কাজ করে, সেই ঘড়ির দোকানের মালিকের সাইকেল। সেদিন সাইকেলটা আমি একাই চালাচ্ছি। কথা ছিল বিকেলবেলা অনুপকে ফেরৎ দিয়ে দেব। দুপুরবেলা বাড়ির পাশের স্ল্যাব ঢালা রাস্তা দিয়ে বেশ জোরে বড় রাস্তায় এসেই দেখি, ডান দিক থেকে একটা পুলিশের জীপ তীর বেগে এগিয়ে আসছে। ব্রেক কষলাম, সাইকেল দাঁড়ালো না। সাইকেলের কোন ব্রেকই কাজ করছে না। আমাকে দেখে বিপদ বুঝে পুলিশের জীপ খুব জোরে ব্রেক কষে, তীব্র শব্দ করে, আমার সামনে জীপটা দাঁড় করিয়ে দিল বটে, কিন্তু আমি তীর বেগে সাইকেল নিয়ে গিয়ে জীপে ধাক্কা মারলাম। সামনের চাকা ভয়ঙ্কর ভাবে বেঁকে গিয়ে, টায়ার ফেটে গেল। জীপ থেকে দু’তিনজন পুলিশ নেমে, আমাকে খুব ধমকাতে শুরু করলো। দুপুরবেলা হলেও, অনেকেই ঘটনাটা দেখলো। জীপ চলে গেল বটে, কিন্তু আমি বোকার মতো সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সাইকেল চেপে যাওয়া তো দুরের কথা, টেনে নিয়ে যাওয়াও যাচ্ছে না। শেষে অনেক কষ্টে সাইকেলের দোকানে টেনে নিয়ে গিয়ে, সাইকেলটা সারাতে দিলাম। এত দিন পরে ঠিক কত মনে নেই, তবে অনেক টাকা চার্জ লাগবে ও অনেকক্ষণ সময় লাগবে শুনে প্রমাদ গুনলাম। অনুপকে সাইকেল ফেরৎ দেবার সময়, সাইক্লোনিক গতিতে এগিয়ে আসছে। টাকাই বা কোথায় পাব? স্কুল পালিয়ে পরের ব্রেকহীন সাইকেল নিয়ে পুলিশ জীপকে ধাক্কা মেরেছি শুনলে, বাড়িতে আহ্লাদিত হয়ে, সাইকেল সারানোর টাকা দেবার সম্ভাবনা বড়ই ক্ষীণ। শেষে সন্তুকে দিয়ে ওর মা’কে বলে, টাকা নিয়ে গিয়ে সন্ধ্যাবেলা সাইকেল ফেরৎ নিলাম। সাইকেল সারানোর দোকানের কাছেই, একটা চায়ের দোকান ছিল। ঐ দোকান থেকে অনেকবার চা পাতা কিনে নিয়েও গেছি। দোকানের মালিক যে আবার অনুপের কাকা হয়, জানা ছিল ন।। তিনি কেন যে লালবাজারে পুলিশের চাকরী না করে, চা পাতা বেচতে বসেছেন, কে জানে। তিনি অনুপকে চিনতেন কিনা জানিনা, তবে তিনি অনুপের সাইকেলটা ঠিক চিনতে পেরেছেন। অপরকে সাইকেল দেওয়ার জন্য ও সাইকেলটা বেঁকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য, অনুপকে দোকানের মালিক ও তার কাকা, উভয়েই খুব বকাবকি করেন। সেদিনই প্রথম জানতে পারলাম, সাইকেলটা ঘড়ির দোকানের মালিকের এবং সেদিন থেকেই আমার অনুপের সাইকেল চালানো বন্ধ হয়ে গেল। আজ এত বছর পরে, এ কাহিনী লিখতে বসে, অনুপকে খুব মনে পড়ছে। তার ঘড়ির দোকান আজও আছে, কাকার চায়ের দোকানও আছে, হয়তো সাইকেলটাও আছে, শুধু অনুপ-ই আজ আর নেই। নকশাল আন্দোলনের সময় পাইপ গানের গুলিতে তার মৃত্যু হয়। সে নিজে নকশাল আন্দোলনে জড়িয়েছিল, না নকশালরাই তাকে মেরেছিল বলতে পারবো না।

পরবর্তী অংশ চতুর্থ পর্বে………..

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s