স্মৃতি (দ্বিতীয় পর্ব)

 

Selfএইভাবে সুখে-দুঃখে বেশ দিন কাটছিল। কিন্তু এই সুখ বেশী দিন বিধাতার সহ্য হ’ল না। বাবা চেঙ্গাইল থেকে কলকাতায় বদলি হয়ে গেলেন। মন খুব খারাপ হয়ে গেল। বছরের মাঝখানে বদলি, আমাদের স্কুল নিয়ে কী হবে, তাই নিয়ে বাবা-মা চিন্তায় পড়লেন। আমার ওপরের দাদা, তপা উলুবেড়িয়া হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। দাদা সিটি কলেজে পড়ে। ঠিক হ’ল যে, তপা সেই বছরটা ফুলেশ্বরে দিদির বাড়ি থেকে স্কুল করবে। বাবা ঠিক করলেন এ বছরটা আমার নষ্ট হলে হোক, অল্প বয়স, কোন ক্ষতি হবে না। পরের বছর নতুন জায়গায় কোন স্কুলে, দুই ভাইকেই ভর্তি করে দিলেই হবে। রামরাজাতলায় বাড়ি ভাড়া নেওয়া হ’ল। তখন ই.এম.ইউ. কোচ চালু হয়নি। এখনকার মতো অত ট্রেন চলাচলও করতো না। মা তবু জেদ ধরলেন, ছেলের একটা বছর কিছুতেই নষ্ট করা ঠিক হবে না। তার জন্য এই বয়সে আমাকে রামরাজাতলা থেকে কাঠের গাড়িতে বাউড়িয়া যাতায়াত করতে দিতেও, তাঁর আপত্তি ছিল না। তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি।

যাহোক্, একদিন সকালে দু’টো লোক আমাদের গরুটাকে নিয়ে রামরাজাতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। পরদিন আমরা চেঙ্গাইলের পাততাড়ি গুটিয়ে, ভাড়া বাড়িতে উঠে এলাম। সন্ধ্যার মুখে নতুন বাড়িতে এসে কান্না পেয়ে গেল। চেঙ্গাইলের মতো এ জায়গাটা অত খোলা মেলা নয়। এখানে কাউকে চিনি না। তবে এত অসুবিধার মধ্যেও একটা আনন্দের বিষয়, এখানে ইলেকট্রিক আলো আছে।

কয়েকদিন পর থেকেই, শুরু হ’ল আমার স্কুল যাওয়া। তপার সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কোন দিনই ছিল না। তবু আমার একমাত্র প্রায় সমবয়সী সাথীও এখন নেই। বাড়ি থেকে সকালে বেড়িয়ে বেশ খানিকটা পথ হেঁটে স্টেশনে এসে, সেখান থেকে সাড়ে আটটা-ন’টা নাগাদ ট্রেন ধরে বাউড়িয়া স্টেশন যাওয়া। এর পরের ট্রেনে গেলে, স্কুলে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে যেত। বাউড়িয়া স্টেশনে নেমে, ঐ মাইল দু’-এক পথ হেঁটে স্কুলে যাওয়া। আবার স্কুল ছুটির পর, একইভাবে ঘরে ফেরা। মা স্কুল ব্যাগে টিফিন দিয়ে দিতেন, তবে অধিকাংশ দিনই সে টিফিন, স্কুল পর্যন্ত পৌঁছত না। তার অনেক আগেই সেগুলো আমার উদরস্থ হ’ত। স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে, সন্ধ্যা পার হয়ে যেত। প্রায় রোজই দেখতাম মা বা অন্য কেউ বাড়ির কাছাকাছি লেভেল-ক্রসিং এর কাছে, আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন।

স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ার একমাত্র কারণ ট্রেনের অভাব। স্কুল ছুটির পর স্টেশনে এসে যে ট্রেনটা পাওয়া যেত, সেটা রামরাজাতলায় দাঁড়াতো না। তার পরের ট্রেন ছিল অনেক পরে। ফলে বাড়ি ফিরতে অনেক দেরি হ’ত। স্কুল ছুটির মিনিট দশ-পনের আগে স্কুল থেকে বেরতে পারলে, আগের ট্রেনটা স্বচ্ছন্দে পাওয়া যেত। কিন্তু সেই ট্রেনটা কোনদিন আমার কপালে জোটেনি। হয়তো বারমাস বাতাসা আর জল একপাত্রে অন্যান্য দেবদেবীর সাথে ভাগ করে খেয়ে খেয়ে, সরস্বতীর কোপ আমার ওপর পড়েছিল। ঝিকে মেরে বৌকে শেখানোর মতো, ছেলেকে কষ্ট দিয়ে বাবা-মা’কে শেখানো।

স্কুলে প্রতিদিন শেষ পীরিয়ডটা ছিল ভূগোলের ক্লাশ। ধুতি, সাদা সার্ট, কেডস্ জুতো পরে সাধুবাবু ভূগোল পড়াতে আসতেন। পড়াতে না বলে, পড়া ধরতে বললেও খুব অন্যায় হবে না। তাঁর বাড়ি ছিল স্কুলে আসার পথে, স্কুলের কাছেই রাস্তার ঠিক পাশে। ছোট্ট বাড়ি, অনেক গাছপালা দিয়ে ঘেরা। তাঁর জমি ও রাস্তার মাঝে, নয়নজুলির মতো খাল জাতীয়। জল না থাকলেও গাছপালার পাতা আর আগাছায় ভরা। একটা পাতলা, ইঞ্চি আষ্টেক লম্বা, ইঞ্চি ছয়েক চওড়া, ভূগোল বই আমাদের শ্রেণীতে পড়ানো হ’ত। বেশ মনে আছে আমার ভূগোল বইটা “বেতার জগৎ” নামে একটা পত্রিকার কভার পেজ দিয়ে মলাট দেওয়া ছিল। চারপাশে হলুদ রঙের মধ্যে একটা সবুজ টিয়াপাখির ছবি। প্রতিদিন শেষ পিরিওডে সাধুবাবু ক্লাশে এসেই নিয়ম করে পড়া ধরতেন। ভূগোলের প্রতি একটা ভীতি আমার চিরকালই ছিল, আজও আছে। ফলে পড়া বলতে পারতাম না। পড়া না পারলেই তিনি কান ধরে দাঁড় করিয়ে দিতেন। কয়েকদিন এইভাবে কাটার পর, এই শাস্তি যথেষ্ট নয় বুঝে, কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করাতে শুরু করলেন। তিনি অবশ্য কথা দিয়েছিলেন যে, যেদিন আমি পড়া বলতে পারবো, সেদিনই আমাকে স্কুল ছুটির আগে ছেড়ে দেবেন। তিনি আমার ভাল চেয়েছিলেন, মঙ্গল চেয়েছিলেন ঠিক কথা, তবে শুধু পড়া ধরে আটকে রেখে আমার মঙ্গল না করে, পড়ালে এবং ভাল করে বোঝাবার জন্য একটু সময় ব্যয় করলে, অনেক ছেলের মঙ্গল হতে পারতো। সাধুবাবুর ক্লাশের পড়া কিন্তু তৈরী করবার আন্তরিক চেষ্টা করতাম। এরপর থেকে যেটুকু সময় পড়বার জন্য পেতাম, ভূগোল নিয়েই কাটাতাম। ফলে উপকার হ’ল এই, যে অন্যান্য বিষয়ের হাল ভূগোলের মতোই হ’ল। কিন্তু দুঃখের বিষয় ভূগোল পড়াটা কোনদিনই দিতে পারলাম না। এদিকে সাধুবাবুর আমাদের ক্লাশে এসে প্রথম ও একমাত্র কাজ ছিল, আমাকে পড়া ধরা, আর পড়া বলতে না পারলেই কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া। শেষের দিকে সাধুবাবু ক্লাশে ঢুকলে, পড়া ধরার আগেই আমি নিজে থেকেই কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে, তাঁর কাজটা অনেক কমিয়ে দিয়েছিলাম। অথচ ভূগোল পড়া তৈরী করার জন্য, আমার কিন্তু চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিল না।

স্কুলের আর এক বিভীষিকা ছিলেন রবিবাবু। তাঁর নাম রবি ঘোষ হলেও, বাস্তবে তিনি চিত্রাভিনেতা রবি ঘোষের মতো মজাদার, আমুদে মানুষ মোটেই ছিলেন না। বরং সব সময় অন্য মেরুতে বিচরণ করতেই তিনি বেশী পছন্দ করতেন। কলকাতার কোথায় যেন তিনি থাকতেন। তিনিও আমার সাথে একই ট্রেনে স্কুলে যেতেন। তিনি ছিলেন ইংরাজী শিক্ষক। সাধুবাবুর মতো তাঁরও ক্লাশে এসে পড়া ধরার একটা বদ রোগ ছিল। তবে পড়া না পারলে তাঁর আবার শুধু কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করানোর মতো নিরামিষ পদ্ধতির ওপর গভীর অনাস্থা ছিল। তাঁর পছন্দের আমিষ ও কন্টিনেন্টাল মেনুতে ছিল, রাক্ষুসে চিমটি, কানের লতি নিয়ে খেলা করা, জুলফি ধরে ওপর দিকে টানা, ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ পদ।

বাউড়িয়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমেই, তিনি আমাকে পাকড়াও করতেন। তরপর আমাকে সঙ্গে করে রিক্সা স্ট্যান্ডে এসে, রিক্সা করে স্কুলে নিয়ে যেতেন। বাধ্য হয়ে আমি এক এক দিন, এক এক কামরায় উঠতে শুরু করলাম। কিন্তু তিনি বোধহয় বাউড়িয়ার আগের স্টেশন থেকেই আমার খোঁজে ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন। বাউড়িয়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে সটকে পড়ার আগেই, তিনি চিৎকার করে অদ্ভুত সুরে ডাকতেন—“সু-উ-উ-বী-ঈ-ঈ-র”। তারপর রিক্সা স্ট্যান্ডে গিয়ে আবার প্রায় সেই একই সুরে—“রিক্সো-ও-ও-ও”। রিক্সাকে সাহেবরা কী বলে জানিনা, তবে তিনি রিক্সো বলতেন। আর তারপর? তারপর ঐ প্রায় দুই কিলোমিটার পথ তিনি আমায় পাশে বসিয়ে, ইংরাজী গ্রামার ধরতেন। তার সাথে স্যালাড হিসাবে—নখ কাটিস নি কেন? চুল আঁচড়াস নি কেন? ভাল করে দাঁত মাজিস নি কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। অধিকাংশ দিনই পড়া বলতে পারতাম না। পারবো কী করে? যার জীবনে সরস্বতী বিরূপ ও সাধুবাবুর মতো একজন শিক্ষক কপালে জুটেছে, সে আর যাই পারুক, পড়া বলতে পারবে না। কিন্তু এত কিছুর পরেও আমার একটা মহা সুবিধা ছিল এই যে, রবিবাবু রিক্সোয় বসে চিমটি কাটতে, জুলফি ধরে টানতে পারতেন না, বা অপছন্দ করতেন। কিন্তু স্কুলের ক্লাশে আর নতুন করে পড়া ধরতেন না। ফলে আর সকলে যখন স্কুলের ক্লাশে রবিবাবুর আমিষ খাবার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত, আমি তখন প্রতিদিন অনাহারে থেকে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতাম।

রাস্তায় হঠাৎ প্রয়োজন হতে পারে ভেবে, আমার ব্যাগে মাঝে মধ্যে সামান্য কিছু পয়সা দেওয়া হ’ত। যদিও অতি অল্পই পয়সা, তবু সে সময় আমাদের হাতে বাবা-মা’কে পয়সা দেবার কথা ভাবাই যেত না। মনে পড়ে, যখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তাম, তার কয়েক বছর আগে পুরানো পয়সা উঠে গিয়ে, নয়া পয়সা চালু হয়েছিল। টাকা, আনা বন্ধ হয়ে, টাকা, নয়া পয়সা চালু হয়েছিল। মা’র ঠাকুর দেবতার তাকে, একটা সিঁদুর মাখা কৌটোয়, অনেক পয়সা ছিল। কেন, কী কারণে, বলতে পারবো না, চেঙ্গাইল রেলওয়ে স্টেশনে ঐ পুরাতন পয়সা বদল করে, সম মূল্যের নয়া পয়সা দেওয়া হ’ত। হয়তো তখন এখনকার মতো, সর্বত্র ব্যাঙ্কের শাখা না থাকায়, রেলের ওপর এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। সে যাহোক্, এই তথ্য যেদিন জানতে পারলাম, সেদিন থেকে মাঝে মধ্যেই কৌটো থেকে পুরাতন পয়সা বার করে, স্টেশনে গিয়ে পুরাতন পয়সা দিয়ে, নয়া পয়সা নিয়ে আসতাম। লক্ষীর সেই অমূল্য সম্পদ, লক্ষীর জন্য ব্যয় না করে, মনের সুখে লাল তুলো, আম লজেন্স, ল্যাক্টো-বনবন্ লজেন্স, হজমীগুলি ইত্যাদি খাওয়ার একটা সুবন্দোবস্ত করে ফেলেছিলাম। নিজের সম্পদ অন্যকে অন্যায় ভাবে ব্যয় করতে দেখলে, কার না রাগ হয়? লক্ষীদেবীও তাই আমার প্রতি বিরূপই  হয়েছিলেন। তাঁকে দোষ দেওয়াও যায় না। কিন্তু তিনি নিজে টাকা পয়সার দেবী হয়েও, এ কাজটা নিজে করতে পারেন নি বলেই তো আমাকেই দায়িত্বটা নিতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর কোপে এ সুখ বেশীদিন স্থায়ী হ’ল না। স্টেশনে বাবার কোন সহকর্মী, বাবাকে ঘটনাটা জানান। ফলে বাবার হাতে উত্তম মধ্যম প্রহার জুটেছিল। অথচ অবশিষ্ট অচল পয়সাগুলো পাল্টে, নতুন নয়া পয়সা আনার ব্যাপারে বাবার বা লক্ষীদেবীর, কারো কোন আগ্রহ দেখি নি।

সে যাহোক্, যা বলছিলাম, এতটা পথ যাতায়াতে যদি কোন বিপদ আপদ হয় ভেবে, এই অল্প পয়সা দিয়ে একটা এমারজেন্সি ফান্ড তৈরী করা হ’ত। যদিও ঐ ফান্ড ভেঙ্গে কোন খাদ্যবস্তু কেনা ছাড়া, আর কী কাজে সেটা লাগতে পারে, ভেবে পেতাম না। মনে পড়ে আমার খুব ইচ্ছা ছিল, ঐ জমানো পয়সা দিয়ে বাড়ির সকলের জন্য একটা করে টিফিন কেক কিনে আনার। তখন লর্ডস কোম্পানীর টিফিন কেক ভারী সুন্দর খেতে ছিল। কিন্তু সে মনবান্ছা কিছুতেই পুরণ করতে পারি নি।

গাব, পেয়ারা, ফলসা ইত্যাদি গাছ থেকে ফল পাড়ার সুযোগটাও আমার একদম কমে গেছিল। বিশেষ করে রবিবাবুর সাথে রিক্সা করে স্কুলে যাওয়া ছিল, এই সব কজের প্রধান অন্তরায়। একদিন, তখন সবে রামরাজাতলা থেকে যাতায়াত শুরু করেছি। গরম কাল, রবিবাবুর সাথে রিক্সাভ্রমন তখনও শুরু হয় নি। বাউড়িয়া স্টেশন থেকে হেঁটে স্কুল যাওয়ার পথে, সাধুবাবুর বাড়ির কাছে এসে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, সাধুবাবুর বাড়ির একটা আম গাছ থেকে একটা লম্বা, বেশ বড়, সামান্য লাল রঙের আম, গাছ তলায় একটু দুরে পড়ে আছে। শুকনো পাতার মধ্যে চট্ করে আমটা চোখে পড়ছে না। কিন্তু আমার শকুনের দৃষ্টি সেটাকে ঠিক খুঁজে বার করলো। সামনে পিছনে অনেক ছাত্রছাত্রী স্কুলে যাচ্ছে। এখন আমটা নিলে অনেককে ভাগ দিতে হবে। তার ওপর সাধুবাবুর কানে খবরটা যাবেই। কাজেই স্থির করলাম টিফিনের সময় এক ফাঁকে এসে আমটা নিয়ে যাব। ওটা এমন জায়গায় পড়ে আছে যে, ওটার ওপর কারো নজর পড়বে না। টিফিনের সময় অকুস্থলে এসে অনেক খুঁজেও আমটা সেই জায়গায় আর খুঁজে পেলাম ন। সম্ভবত শ্রীমতী সাধু আমটা তুলে নিয়ে গেছেন। একেই বোধহয় রাজযোটক বলে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনের কেউ এতটুকু শান্তি আমাকে দেন নি।

ভোর বেলা স্নান করে ভাত খেয়ে স্কুলে গিয়ে, সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলে বাড়ি ফিরে, পড়াশোনা করার বিশেষ ইচ্ছা ও ক্ষমতা, কোনটাই থাকতো না। অবশ্য পড়াশোনার প্রতি কোন কালেই আমার তেমন আগ্রহ ও ভালোলাগা বা ভালোবাসা ছিল না। কিন্তু বাবা-মা’কে দেখে মনে হ’ত, তাঁরা যেন কোন মতে এই বছরটা কাটিয়ে দিতে পারলে বেঁচে যান।

এই ভাবে দিন কাটতে লাগলো। অবশেষে একদিন বছরও শেষ হ’ল। সাধুবাবুর অশেষ করুণায়, আমি ভূগোলে কোন রকমে পাশ করলাম। অন্যান্য বিষয়ের ফলও তথৈবচ। তপা উলুবেড়িয়া স্কুল থেকে নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে, আমাদের কাছে ফিরে আসলো। আমিও সাধুবাবু ও রবিবাবুর কবল থেকে চিরতরে মুক্তি পেলাম। তখন কী জানতাম, পশ্চিম বাংলার প্রতি স্কুলে সাধুবাবু, রবিবাবুর অভাব নেই।

ঠিক হ’ল জগাছা হাই স্কুলে আমরা দুই ভাই ভর্তি হব। তখনকার দিনে এখনকার মতো স্কুলে ভর্তি হওয়ার ঝামেলা ছিল না। জগাছা হাই স্কুল আমাদের বাড়ি থেকে অনেকটা দুর এবং বাড়ির কাছেই একই মানের একটা হাই স্কুল থাকা সত্ত্বেও, ওখানে ভর্তি করার পিছনে বাবার একটা উদ্দেশ্য ছিল। আমার ছোড়দির বিয়ে তখন ঠিক হয়ে গেছে, এবং ভাবী জামাইবাবু, ঐ স্কুলেই শিক্ষকতা করেন। বাইয়লজির শিক্ষক। ফলে তাঁর তত্বাবধানে তাঁর শ্যালক যুগল পড়াশোনায় প্রভুত উন্নতি করবে, বাবা বোধহয় মনে মনে এই আশা পোষণ করেছিলেন। মা’র ভাগ্যও ভালো বলতে হবে যে এখানে তুলসীর ঠাকুরমা নেই। তা নাহলে দ্বিতীয় মেয়ের বিয়েও ম্যাষ্টরের সঙ্গে দেওয়ার হাজার কৈফিয়ত তাঁকে আবার দিতে হ’ত। একদিন বাবার সাথে গিয়ে আমরা দুই ভাই স্কুলটা দেখেও আসলাম। বেশ বড় কো-এডুকেশন্ স্কুল।

যথা সময়ে আমরা দুই ভাই গিয়ে স্কুলে ভর্তি হয়ে গেলাম। আমি সপ্তম শ্রেণীতে, তপা নবম শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর দ্বিতীয় কী তৃতীয় দিনে, আমার ক্লাশে আমার ভাবী জামাইবাবু, শ্রী ক্ষৌণীশ বাগচী ক্লাশ নিতে এলেন। কোন একজন শিক্ষক না আসায়, তাঁকে আমাদের ক্লাশ নিতে পাঠানো হয়েছে। তিনি ক্লাশে এসে প্রথমেই বললেন, “তোমাদের মধ্যে কে কে এই স্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছ উঠে দাঁড়াও”। আমরা কয়েকজন উঠে দাঁড়ালাম। তিনি এক এক করে নাম জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। আমাদের ক্লাশে স্বপন রায় নামে একটা ছেলে ভর্তি হয়েছিল। স্বপন রায় তার নাম বলতেই, তিনি তার বাবার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। সে তার বাবার নাম বললে, তিনি তাকে বসতে বলে, পরের  ছেলেটার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। রায় পদবী না হলে, তিনি তাকে বসতে বলে পরের ছেলেটার নাম জিজ্ঞাসা করছেন। আমি কিন্তু ঐ বয়সেও বুঝতে পারছি, তাঁর নতুন ভর্তি হওয়া ছেলেদের নাম জানার এত আগ্রহের কারণ কী। এইভাবে  আমার টার্ন আসলে, আমি আমার নাম বললাম। তিনি যথারীতি বাবার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। বাবার নাম বলায়, তিনি কিছুক্ষণ আমায় লক্ষ্য করে বসতে বললেন। যাহোক্, শুরু হ’ল নতুন স্কুল জীবন। নতুন নতুন বন্ধু জুটলো। মাসখানেক পর আমার ছোড়দির বিয়ে হ’ল। বেশ মনে আছে, বর বেশে জামাইবাবু গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে,  আমি বিজ্ঞের মতো প্রশ্ন করেছিলাম, “স্যার চিনতে পারছেন”?

একটা বিয়ে বাড়িতে অনেক রকম ঘটনা ঘটে, এই বিয়েতেও ঘটেছিল। খুঁটিনাটি সব কিছু বলার প্রয়োজন দেখি না। তবে একজনের কথা খুব বলতে ইচ্ছা করছে। সব বিয়েতেই কোন প্রয়োজন না থাকলেও, একজন নাপিতের উপস্থিতি, প্রায় বরের উপস্থিতর মতোই জরুরি বলে মনে করা হয়। আমার এই দিদির বিয়েতেও, তাই মনে করা হয়েছিল। কোন সুত্রে তার এ বাড়িতে আবির্ভাব জানিনা, তবে তার নাম “বোকা” হলেও, অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তিনি বেশ আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আমার এক মামা তাকে রাগাবার জন্য, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে চিৎকার করে, “এই বোকা, আরে বোকাটা কোথায় গেল”, ইত্যাদি বলাতে, শ্রীমান বোকা খুব বিরক্তি প্রকাশ করছিল। কিন্তু বিরক্তি প্রকাশ করা ছাড়া, তার আর কিছুই করার ছিল না। কারণ সে তো আর বলতে পারে না, যে আমার নাম বোকা হলেও, আমাকে চালাক বা চতুর বলে ডাকুন। যাহোক্ কী কারণে মনে নেই, বিয়ের দিন সকালে একবার বাকসাড়ায় ছোট জামাইবাবুর বাড়ি যাবার প্রয়োজন দেখা দেয়। একটা রিক্সা করে বোকাকে সেখানে পাঠানো হয়। সঙ্গে আমি ও আমার মতো আর একজন কেউ। বোকা রিক্সার সিটে বসে আমাদের পায়ের কাছে বসতে বললো। আমরা তীব্র আপত্তি জানালে, বোকা বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, “এই জন্য তোমাদের নিয়ে যেতে চাই না”।

যাহোক্, এই স্যারটি বাইয়লজির শিক্ষক হিসাবে যত না পরিচিত ছিলেন, তার থেকে অনেক বেশী পরিচিত ছিলেন, ছাত্রদের শাস্তি দেবার শিক্ষক হিসাবে। এঁকে ভয় করতো না, এমন কোন ছাত্র স্কুলে ছিল না, অন্তত আমি তো মনে করতে পারি না। আমি স্কুলে ভর্তি হওয়ার বছর পাঁচেক পরে, ইনি স্কুল ছেড়ে আকাশবানী কলকাতার ঘোষক হিসাবে চাকরী নিয়ে চলে যান। চলে গিয়ে বেঁচে গেছিলেন, তা নাহলে নকশাল আন্দোলনের সময় তাঁর যথেষ্টই বিপদ ছিল। বর্তমানে ছাত্রছাত্রীদের শাস্তি না দেওয়ার কড়া হুকুমের যুগে, তাঁর পক্ষে চাকরী টিকিয়ে রাখাও মুশকিল ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, আজও আমার এমন কোন পুরানো ছাত্রছাত্রী চোখে পড়েনি, যে তাঁকে শ্রদ্ধা করতো না। এই শ্রদ্ধা ভয়ে না ভক্তিতে বুঝতাম না, কিন্তু এই সেদিন মারা যাবার আগে পর্যন্ত, রাস্তায় পুরানো ছাত্রদের সাথে দেখা হলে, তাদের এই বহু পুরাতন শিক্ষকের সাথে ব্যবহার দেখে অবাক হতাম। আসলে সেই সময় ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্কটা সত্যিই বোধহয় পিতাপুত্রের সম্পর্কের মতোই গভীর ও নিখাদ ছিল।

কিন্তু এই শিক্ষক আমার জীবনে যে কত বিপদের, কত অসুবিধার কারণ ছিলেন, তা আমি হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। তিনি নিজে আমাদের কোন ক্লাশ নিতেন না বটে, তবে অন্যান্য অনেক শিক্ষক ছিলেন, যাঁরা তাঁদের ক্লাশের ছাত্ররা পড়া না পারলে, বা গুরুতর কোন অপরাধ করলে, এই প্রহার করা শিক্ষকের হাতে অপরাধী ছাত্রদের সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতেন। আসলে সব ছাত্ররাই, যে কোন শিক্ষকের থেকে এই শিক্ষকটিকে অনেক বেশী ভয় পেত। আর তাই অনেক শিক্ষকই, জল্লাদের হাতে ফাঁসির আসামীকে সঁপে দেওয়ার মতো, এঁর হাতে ছাত্রদের সঁপে দিতেন। আমার আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো, আর এক অন্য বিপদ ছিল। কোন্ শিক্ষকের ক্লাশে পাশের ছেলের সাথে গল্প করেছিলাম, কোন্ শিক্ষকের ক্লাশে পড়া পারলাম না, ইত্যাদি সমস্ত খবরাখবর তাঁরা সযত্নে এঁর কাছে পরিবেশন করতেন। ফলে বাবার কাছেও এসব খবর পৌঁছে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল।

মাঝেমাঝেই স্কুলের পিওন, গোপালদা বা মানিকদা এসে ক্লাশ থেকে শিক্ষককে বলে, আমাকে ডেকে নিয়ে যেত। গিয়ে দেখতাম, জামাইবাবু কোনের ল্যাবরেটরি রুমে বসে আছেন। ওখানে গেলে মাইক্রোস্কোপে কখনও মশার মাথা কিরকম দেখায়, কখনও বা অন্য কিছু দেখাতেন। কিন্তু এই গোপালদা বা মানিকদা ডাকতে আসলে আমার ভয় করতো। কারণ গোপালদাকে “জয় জোয়ান, জয় কৃষাণ, জয় গোপাল” বললে, আর মানিকদাকে “মামদো” বললে, ভীষণ রেগে যেত। আর সেটা আমি রামনামের মতো, প্রায়শঃই ওদের সামনে জপ করতাম।

ধীরে ধীরে স্কুলে অনেকের সাথেই বন্ধুত্ব হয়ে গেল। অসীম, শেখ্ আলমগীর, যোগেশ, শ্যামা, প্রদীপ, দর্শক, সৌমেন, পরেশ, কমল, সুভাষ, রবীন, ইত্যাদি অনেক ছেলে। অনেক ছোট থেকেই পাখি পোষার সখ আমার ছিল। এখনও পাখি না থাকলেও, সখটা আছে। বনেজঙ্গলে এখনও পাখির সন্ধানে ঘুরে বেড়াই, তবে এখন আর গঙ্গাফড়িং এর সন্ধানে সময় নষ্ট করি না। পাখির ব্যাপারে আমার কোন বাছবিচার নেই, যেকোন পাখি পেলেই খুশি। একবার এক বুড়ির টিয়াপাখি দাঁড় সমেত চুরি করে নিয়ে এসে, পরে ফেরৎ দিতে বাধ্য হলাম। শ্যামার চেহারা ও গায়ের রং, অনেকটা আমার মতো হওয়ায়, তাকে আমার এই অপরাধের খেসারত দিতে হয়েছিল। ঐ বুড়ির পাড়ার সমস্ত ছোট ছোট ছেলেরা, শ্যামাকে আমার সাথে গুলিয়ে ফেলে, ওকে দেখলেই পাখি চোর, পাখি চোর বলে চিৎকার করে, হাততালি দিতে দিতে, ওর পিছন পিছন যেত। একবার কী পাখি চিনতে না পেরে, ঝোপের মধ্যে থেকে এক অসুস্থ শকুনকে রাস্তায় টেনে এনে, চুড়ান্ত অপদস্থ হতেও হয়েছে। সব ঘটনা বলতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। পরে অন্য সময়, অন্য ভাবে বলা যাবে।

পাড়াতেও ক্রমে ক্রমে অনেক ছেলের সাথেই আলাপ হয়ে গেল। সাতগুটি, হুস্ হুস্, শিরগীজ, ইত্যাদি নানা খেলা নিয়ে বিকেলবেলাটা মেতে থাকতাম। তপা কিন্তু এসব খেলাতেও কখনও অংশগ্রহণ করতো না। একদিন বাড়ি থেকে একটু দুরে, রেল লাইনের কাছে একটা ছোট্ট পুকুরে কয়েকজন বন্ধু ছিপ নিয়ে মাছ ধরতে গেল। আমিও একটা ছিপ বানিয়ে নিয়ে, তাদের সঙ্গে গেলাম। এই রোগটা আমার চেঙ্গাইলেও ছিল, সত্যি কথা বলতে কী আজও আছে। চেঙ্গাইলে বাড়ির পাশে রেলের ঝিলে, ছিপ দিয়ে মাছ ধরতাম। সন্ধ্যার মুখে কত যে পুঁটিমাছ ধরতাম, তার ইয়ত্বা নেই। আর একরকম মাছ খুব ধরা পড়তো, ওখানে সবাই সেটাকে ডানকুনি মাছ বলতো। কোয়ার্টার্সের উঠনে একটা বেশ বড় চৌবাচ্চার জলে, মাছ ধরে ছেড়ে দিতাম। মাছ ধরা, মাছ পোষা এবং ইচ্ছামতো মাছ খাওয়া, একবারে থ্রী-ইন-ওয়ান প্রজেক্ট্।

যাহোক্, এদের সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়ে দেখি, বঁড়শি জলে ফেলার সাথে সাথে মাছ খাচ্ছে, আর এরা পটাপট্ মাছ তুলে যাচ্ছে। আমার ছিপটায় বঁড়শি ঠিকমতো বাঁধা না হওয়ায়, ছিপ ফেলার সাথে সাথে মাছ খেলেও, ছিপে টান দিলেই বঁড়শি খুলে যাচ্ছে। ফলে দু-তিনবার প্রায় মিনিট দশ-পনেরর পথ দৌড়ে, সুফলের দোকান থেকে নতুন বঁড়শি কিনে, তাকে দিয়ে বঁড়শি বাঁধিয়ে, আবার পুকুরে ফিরে আসতে হ’ল। আসলে সুফলও বোধহয় আমার মতোই ছিপে বঁড়শি বাঁধায় পারদর্শী ছিল। তাই আর সকলে যখন দু’-তিনশ’ গ্রাম করে মাছ ধরে ফেললো, আমি তখন বেশ কিছু বঁড়শি কিনে পয়সা নষ্ট করে, আর কয়েক মাইল দৌড়দৌড়ি করে মরলাম। এরমধ্যে পুকুরের মালিক হৈহৈ করে তেড়ে এল। সবাই নিজ নিজ মাছ ও ছিপ নিয়ে দৌড়ে পালালো। একমাত্র আমি, শুধু ছিপ নিয়ে, তাও আবার বঁড়শিহীন ছিপ নিয়ে, মিলখা সিং এর মতো ছুটলাম। এখন ভাবলেও হাসি পায়, আর সকলে সেদিন মাছ নিয়ে বাড়ি গিয়ে, রান্নাকরা ঐ মাছের কী কী পদ খেয়েছিল জানিনা, কিন্তু আমিও সেদিন ওদের মতো মাছ ধরতে পারলে, সেই মাছ নিয়ে কী করতাম। ডিম ফোটা বাচ্চা বাচ্চা চারামাছ, ঐ পুকুর থেকে হাঁড়ি করে তুলে নিয়ে গিয়ে, অন্যান্য বড় পুকুরে ছাড়ার জন্য বিক্রি করা হ’ত। ঐ পুকুরের কোন একটা মাছও, এক-দেড় ইঞ্চির বেশী লম্বা ছিল না।

বিকেলবেলা বা ছুটির দিন সকালে, বাড়ির কাছেই একটা ছোট্ট মাঠে পিট্টু খেলা হ’ত। আমরা সকলেই প্রায় সমবয়সী ছেলেরা খেলতাম। একমাত্র বলরাম নামে একটা ছেলে, সিং ভেঙ্গে বাছুরের দলে নাম লিখিয়েছিল। এই পিট্টু খেলাতে আমি পাড়া চাম্পিয়ন্ ছিলাম। আর সকলে প্রায় ধরেই নিয়েছিল, এই খেলায় আমাকে হারানো দুঃসাধ্য। বলরাম কিন্তু কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারতো না। শীতকালের এক দুপুরে ছোট্ট মাঠটায় খেলতে গেছি। মাঠ ঠিক নয়, একটা চৌকো মতো জমি, তখনও বাড়ি হয়নি বলে ফাঁকা। সমস্ত ছেলেরা খেলতে এসে গেছে। আমি, পিট্টু খেলার গোষ্ট পাল, খুব স্টাইল করে হেঁটে মাঠে এলাম। এখন সচীন, সৌরভরা যেভাবে মাঠে নামে আর কী। কিন্তু খেলা শুরু করায় এক বাধা দেখা দিল। একটা বউ মাথায় ঘোমটা দিয়ে, মাঠে বসে সম্ভবত শীতকালের মিঠে রোদ পোহাচ্ছে। কেউ আর তাকে মাঠ থেকে উঠে যেতে বলতে সাহস করছে না। শেষে বলরাম আমাকে বললো, “তুই একটু বল্, যাতে সে মাঠের পাশে গিয়ে বসে রোদ পোহায়”। আর কেউ তাকে একথা বলতে সাহস না করায়, এবং খেলা শুরু হতে অযথা দেরি হওয়ায়, বাধ্য হয়ে আমি এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গেই বললাম— “কাকীমা, মাঠের পাশে গিয়ে একটু বসুন না, আমরা পিট্টু খেলবো”। বাক্য শেষ হওয়ার আগেই এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে উঠে, ঘোমটা খুলে তিনি চিৎকার শুরু করলেন— “ডাক তোর কাকাকে। কাকীমা? আমাকে কাকীমা বলা”? এতক্ষণে বোঝা গেল তাঁর রাগের কারণ কী। তিনি আধবুড়ি হলেও, অবিবাহিতা। মাঝ থেকে তাঁর চিৎকার চেঁচামিচিতে লজ্জায় আমি আর খেলতে পারলাম না। আর সকলে খেলায় মাতলো। বলরামকে দেখে মনে হ’ল, সে আমার নক-আউট পতনে খুব খুশী।

গুলি খেলারও খুব নেশা ছিল, কিন্তু গুলি কেনার সামর্থ ছিল না। তাছাড়া বাবা গুলি খেলা পছন্দও করতেন না। মা’কে পটিয়ে পাটিয়ে নানাভাবে গুলি কিনতাম। আজ আমি মানুষ হয়েছি কিনা জানিনা, তবে আমি জোর গলায় একথা বলতে পারি, মা না থাকলে আমি বড়ই হ’তাম, মানুষ হতে পারতাম না। আমি আমার সুন্দর, নানা অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ ছেলেবেলাটা হারাতাম। আমার সব ভাইবোন আজ স্বীকার করবে কিনা জানিনা, তবে এটা সত্য যে, আমরা যে আজ বড় হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি, তার পিছনে মা’র প্রত্যক্ষ মদত, সহযোগীতা ও আত্মত্যাগ, মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল।

ভাবলে খুব কষ্ট হয় যে, আজকালকার একটা ছেলেও সাতগুটি, পিট্টু, শিরগীজ খেলার নামই শোনে নি। আজ একটা মেয়েকেও আর এক্কা-দোক্কা খেলতে দেখিনা। অথচ এই খেলাটা, আমরাও ছোটবেলায় বোন ও তার বান্ধবীদের সাথে খেলতাম। মাঠের অভাবে নাহয় ছেলেদের খেলা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু মেয়েদের এই এক্কা-দোক্কা খেলতে বাধা কোথায়? এই খেলাটাতো একসময় মেয়েদের জাতীয় খেলা ছিল বলা যায়। খেলতে মাঠ বা স্টেডিয়ামও লাগে না, ঘরের মধ্যে, দালান বা উঠনেও ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বর্গফুট ফাঁকা জায়গা পেলেই খেলা যায়। এখন ক’টা ছেলে সাইকেলের রিম নিয়ে চাকা চালায়? চোখে তো পড়ে না। অথচ হাজার বাধা বিপত্তির মধ্যেও, এটা ছিল আমাদের একটা অতি প্রিয়, আনন্দের, ও আকর্ষণীয় খেলা। তবে কী আজকালকার ছেলেমেয়েরা সব সভ্য, আমরাই অসভ্য ছিলাম? কী জানি, রাস্তাঘাটে পোষাক, কথাবার্তা, আলাপ আলোচনা দেখলে ও শুনলে তো তা মনে হয় না। আসলে আমরা, সাহেব বাবা-মা’রা আমাদের একটা বা দু’টো সন্তানকেও সাহেব ব মেমসাহেব বানাতে ব্যস্ত। নীগারদের ঐ সব নোংরা খেলা আমাদের সহ্য হবে কেন? তাই আমরা খেলার জন্য ভিডিও গেম কিনে দিতে, নন্টে ফন্টে, হাঁদা ভোঁদা, বা বাঁটুল দি গ্রেট এর পরিবর্তে হ্যারি পটার, স্পাইডার ম্যান ইত্যাদি কিনে দিতে বেশী পছন্দ করি। যেখানে বাড়ির আশেপাশে খেলার মাঠই নেই, সেখানে তেপান্তরের মাঠের মতো অবাস্তব মাঠের প্রয়োজনীয়তা দেখি না।

যাহোক্, এতদিন পরে আর বিভিন্ন রকম গুলি খেলার নামগুলোর মনে করতে পারি না। তবে গাই-পাচার, চু-খাট, ইত্যাদি নানরকমের খেলা, গুলি দিয়ে খেলতাম। চু-খাট না পিল-খাট নামের খেলাটায়, গুলি জেতা বা হারার কোন ব্যাপার ছিল না। একটা ছোট্ট গর্ত, যাকে পিল বলা হ’ত, তাতে টিপ করে নিজের গুলিটা ফেলতে হবে। আবার যেকোন একজন সহ খেলোয়ারের গুলিকে নিজের গুলি দিয়ে টিপ করে মারতে হবে। দু’টো কাজের যেকোনটাকে আগে বা পরে করা যেতে পারে। গুলি খেলায় আমার বেশ টিপ ছিল, তাই একজনের কেন সকলের গুলিকেই আমার গুলি দিয়ে মারা হয়ে গেলেও, কিছুতেই টিপ করে নিজের গুলি পিলে ফেলতে পারতাম না। পিল থেকে এক বিঘতের মধ্যে নিজের গুলি থাকলে, তবেই পিলে গুলিটা ফেলতে পারতাম। ফলে আমার গুলি পিলে ফেলতে ফেলতেই, আর সকলের উভয় কাজই সম্পন্ন করা হয়ে যেত। ফলে অধিকাংশ সময়েই আমি হারতাম। আর এই খেলায় হেরে যাওয়া মানে চরম শাস্তি ভোগ করা। যে হারবে, সে তার গুলিটাকে ছুড়ে দুরে ফেলবে। অন্যান্য খেলোয়াররা তাদের নিজ নিজ গুলি, পরাজিত খেলোয়ারের গুলি লক্ষ্য আঙ্গুলে টিপ করে ছুড়বে। এবার যেকোন একজন যদি তার নিজের ছোড়া গুলির কাছ থেকে আঙ্গুলে টিপ করে পরাজিতর গুলিকে মারতে পারে, তাহলে পরাজিত ছেলেটি আবার আগের মতো গুলি সামনের দিকে ছুড়বে। এইভাবে যদি কোনবার কেউ পরাজিতর গুলিকে নিজের গুলি দিয়ে মারতে না পারে, তাহলে পরাজিতকে তার নিজের গুলির কাছ থেকে খেলার জায়গা, অর্থাৎ সেই পিল পর্যন্ত চু-উ-উ আওয়াজ করে একদমে ছুটে আসতে হবে। পিল পর্যন্ত একদমে আসার আগে দম ফুরিয়ে গেলে, সেই স্থান থেকে আবার আগের প্রক্রিয়ায় খাট দিতে হবে। এ ছাড়াও আরও অনেক নিয়ম আছে, বিস্তারিত বলতে গেলে অনেক বলতে হবে বলে বলছি না।

একদিন আমি বাড়ির কাছ থেকে প্রায় রামরাজাতলা বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত খাট দিতে দিতে চলে এসেছি। দৌড়ে গেলেও পিল থেকে সে প্রায় বিশ-পঁচিশ মিনিটের পথ। তখনও ওদের হাতে গোটা দশেক “ফুল্লোট” নামক পারমাণবিক বোমা আছে। ফুল্লোটের মাহাত্ম্য বোঝাতে গেলে অনেক সময় লাগবে, তাছাড়া যে কোনদিন গুলি খেলেনি, তাকে অত সহজে বোঝানোও আমার কর্ম নয়। তবে এক কথায় এটুকু বলতে পারি, এই খান দশেক ফুল্লোটের জোরে ওরা আমাকে আরও মাইল দু’এক পথ স্বচ্ছন্দে খাটিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু এখান থেকেই পিল পর্যন্ত একদমে চু-উ-উ আওয়াজ করে ছুটে যাওয়া, যে মায়ের পেট থেকে পড়েই প্রাণায়ম করছে, তার পক্ষেই সম্ভব নয়, আমি তো কোন ছাড়। তার ওপর এখনও অতগুলো ফুল্লোট ওদের হাতে মজুদ আছে। শেষ পর্যন্ত একবার গুলিটা ছুড়ে সামনের দিকে ছুটে যাওয়ার ভান করলাম। অন্যান্য সবাই যে যার গুলি আমার গুলির অবস্থান লক্ষ্য করে ছুড়ে, সামনের দিকে ছুটে যেতেই, আমি গুলি ফেলে পিছন ফিরে বাড়ির দিকে প্রাণপণে, প্রাণভয়ে ছুটতে শুরু করলাম। পিছন পিছন আট-দশজন আমাকে তাড়া করে ছুটছে। কুকুরের মতো হাঁপাতে হাঁপাতে, একসময় অর্ধমৃত অবস্থায় বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। তারাও প্রায় পিছন পিছন ছুটে এসে, বাড়ির বাইরে থেকে খুব চিৎকার করতে লাগলো। এটাই বোধহয় আমার জীবনে সব থেকে দ্রুত ছোটার সর্বকালীন রেকর্ড। কয়েকদিন লুকিয়ে লুকিয়ে স্কুল যাতায়াত করলাম। বিকেলে খেলতে যাওয়া বন্ধ। বেশ কয়েকদিন পর সকলের রাগ পড়ে গেলে, আবার গুলি খেলা শুরু হ’ল। এই পিল খাট খেলাটা আমি পিল করার ভয়ে, বিশেষ পছন্দ করতাম না। কিন্তু অন্যান্য ছেলেরা ছিল এক একজন পিল বিশেষজ্ঞ। পিল মাষ্টার জেনারেলও বলা যেতে পারে। অনেক দুর থেকে কী অদ্ভুত ভাবে আঙ্গুলে ধরে, গুলিটাকে ঠিক পিলে ফেলতো।

আর একরকম গুলি খেলা ছিল। পাঁচ-ছয় ফুট দুরত্বে দু’টো সমান্তরাল দাগ কাটা হ’ত। একটা দাগে দাঁড়িয়ে অপর দাগের ওপারে, দু’জনের সমপরিমান গুলি ছুড়ে ফেলতে হ’ত। এবার প্রতিপক্ষ যে গুলিটা বলবে, সেটা ছাড়া অন্য যেকোন একটা গুলিকে টিপ করে নিজের গুলি দিয়ে মারতে হবে। শর্ত একটাই, আর কোন গুলিতে যেন নিজের বা অন্য কোন গুলি স্পর্শ না করে। শর্ত মেনে মারতে পারলে, দাগের ওপারের সব গুলি তার হয়ে যাবে। অনেক সময় আবার প্রতিপক্ষের নির্দেশিত গুললিটাকেই মারতে হবে, এই শর্তেও খেলা হ’ত। এই খেলাটা দু’জনের বেশী ছেলেও খেলতে পারতো, এবং এই খেলাটা  ছিল আমার বিশেষ পছন্দের।

বীনা নামে একটা ছেলের কাছ থেকে একদিন অনেক গুলি জিতে নিলাম। পরপর কয়েকদিন সে তার হারানো সম্পদ উদ্ধারের আশায়, পিলখাট ছেড়ে আমার সাথে এই খেলা খেলতে লাগলো। আমিও পরম ভৃপ্তি সহকারে, তার বিভিন্ন রঙের গুলি হজম করতে লাগলাম। এইভাবে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে আমি অনেক, অনেক গুলির মালিক হয়ে গেলাম। ছেলেবেলায় কবি গুলি খেলেছিলেন কিনা জানিনা, তবে ব্যাপারটা তিনি ঠিক বুঝেছিলেন যে, “চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়”। একদিন বীনার ওপর অর্জুন ভর করলো। আমি বিপদ বুঝে খেলা ছেড়ে চলে আসতে চাইছিলাম। কিন্তু সে রাজী হবে কেন? ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি আমীর থেকে ফকির হয়ে বাড়ি ফিরলাম।

এই সময়কার অনেকের মধ্যে, দু’জনের কথা বেশ মনে পড়ে। একজন, ধনুকের মতো বেঁকে যাওয়া এক বৃদ্ধা। সকলে বলতো তার বয়স নাকি একশ’ পাঁচ বছর। সত্যি কিনা জানিনা, তবে চেহারা দেখে মনে হ’ত, হলেও হতে পারে। হাড়ের ওপর কোঁচকানো চামড়া ছাড়া, তার শরীরে কোন মেদ তো ছিলই না, মাংস ছিল বলেও মনে হ’ত না। কিন্তু খালি চোখেও সে পরিস্কার দেখতে পেত। মুখটাতে যে কত আঁকিবুকি ভাঁজের দাগ ছিল, না দেখলে বোঝানো যাবে না। সকলেই তাকে “সুখীবুড়ি” বলে ডাকতো। তার বোধহয় এক-আধটা গরু ছিল। দুধ বিক্রী করে সে অতি কষ্টে সংসার চালাতো। নাম ছাড়া তার জীবনে আর কোন সুখ ছিল কিনা জানিনা। আমরা এই সুখীবুড়ির পিছনে খুব লাগতাম। কেউ তার পিছন থেকে কাপড় ধরে টানলো, বুড়ি গালি দিতে দিতে তার দিকে তাড়া করে যেতেই, আর একজন কাপড় ধরে টানলো। বুড়ির কিন্তু গালাগালির ভান্ডারের স্টক্, খুবই সীমিত ছিল। তারমধ্যে “আঁটকুড়ির বেটা” বোধহয় প্রধান, ও সবথেকে প্রিয় ছিল। একদিন এইভাবে বুড়িকে রাগিয়ে ছুটে পালাতে গিয়ে, আমরা দু’জন ছেলে নিজেদের মধ্যে ধাক্কা লেগে পড়ে গেলাম। আর সেই সুযোগে বুড়ি আমার কব্জিটা চেপে ধরলো। মনে আছে, হাজার চেষ্টা করেও তার হাত থেকে নিজেকে কিছুতেই মুক্ত করতে পারি নি। পড়ে যখন ছাড়া পেলাম, তখন দেখি কব্জিতে গোল হয়ে কালো কালশিটে পড়ে, বুড়ির আঙ্গুলের দাগ হয়ে গেছে। পরদিন থেকে আবার সুখীবুড়ির পিছনে লাগা, যথারীতি চলতে লাগলো।

দ্বিতীয়জন একজন বৃদ্ধ। তখনও তাঁকে চিনতাম না। পরে জেনেছিলাম তাঁর ছেলে খুব ভাল নাট্য পরিচালক। সবাই তাঁকে চেনে। একদিন স্টেশনের কাছে ঐ বৃধ্ধকে দেখে হঠাৎ কী মন হ’ল, তাঁকে বললাম— “দাদু কেমন আছেন”? দাদু যে কেমন আছেন, তা জানার আমার যে খুব আগ্রহ ছিল তাও নয়, তবু হঠাৎ কী মনে হ’ল তাই বললাম। বৃদ্ধও হাসি মুখে বললেন, “ভাল আছি বাবা, তুমি ভাল আছ”? আমি কিছু বলার আগেই, বৃদ্ধ আমার হাতটা চেপে ধরে বললেন, “ফাজলামো হচ্ছে? দাদু? বলতো আমি কে, কোথায় থাকি”? বাপরে বাপ্, এ কী বুড়ো রে বাবা। বুড়ো কোথায় থাকে, সে যে কে, কী দিয়ে ভাত খেয়েছে, আমি কী করে জানবো? বাধ্য হয়ে বললাম, “এই তো একটু ওদিকে”। বৃদ্ধ চিৎকার করে লোক জড়ো করে ফেললেন। তিনি জনতার উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করলেন, “দেখ বাবারা, দেখ, আমি নাকি একটু ওদিকে থাকি। আমার সাথে ফাজলামো হচ্ছে? একে পুলিশে দিয়ে তবে ছাড়বো”? এত কিছুর পরেও, তিনি কিছুতেই আমার হাত ছাড়েন না। যাহোক্, শেষ পর্যন্ত তাঁর হাত থেকে মুক্তি পেলাম। পরে তাঁর পরিচয় পেয়েছিলাম, তবে সেটা আর নাই জানালাম। আরও অনেক পরে একটা ঘটনায় এই বুড়ো যে কী জিনিস, বুঝতে পেরেছিলাম।

অনেকদিন পরে রেল লাইন ধরে স্টেশন যাবার পথে, একটা এমটি রেক তাঁকে ধাক্কা মারে। দু’তিনটে বগি তাঁর ওপর দিয়ে চলে যাবার পরে, চিৎকার চেঁচামিচিতে গাড়িটা দাঁড়িয়ে যায়। কিছু লোক তাঁকে ট্রেনের তলা থেকে বার করে আনে। কোথাও কোন আঘাত লাগেনি। বোধহয় ধাক্কা খাওয়ার আগেই, ভয়ে বা অন্য কোনভাবে, দুই লাইনের মাঝখানে পড়ে গিয়েছিলেন। পাথরে পড়ে গিয়ে হাতে পায়ে সামান্য আঘাত পেলেও, দুই লাইনের মাঝখানে এমন ভাবে পড়েন যে, ট্রেন তাঁর শরীর স্পর্শ করে নি। একটু ধাতস্থ হয়েই তিনি লাঠি উচিয়ে ইঞ্জিন ড্রাইভারকে মারতে, প্রায় ছুটে এগিয়ে যেতে, সকলে তাঁকে অনেক বুঝিয়ে শান্ত করে।

এরমধ্যে ছোড়দি ও ছোট জামাইবাবু একদিন আমাদের বাড়িতে এসে, ম্যাটিনি শো তে কী একটা সিনেমা দেখতে গেলেন। বিকেলের দিকে এক বৃদ্ধ আমাদের বাড়িতে এসে উপস্থিত। পরিচয় দিতে জানা গেল, তিনি আমার জামাইবাবুর মামা, খড়গপুরে থাকেন। মা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাঁর কিন্তু একবারও মনে হ’ল না যে, নতুন জামাইয়ের মামা, যাঁকে আমরা কেউ চিনিই না, বলা নেই কওয়া নেই, একবারে সটান কেন ভাগ্নের শ্বশুর বাড়ি এসে হাজির হলেন। তিনি তাড়াতাড়ি দু’টো টাকা দিয়ে আমাকে মিষ্টি কিনতে পাঠালেন। বেয়াই বলে কথা, তাও আবার এক্কেবারে নতুন জামাই এর মামা। এখন যেমন রসগোল্লা, দু’টাকা আর তিন টাকা সাইজের পাওয়া যায়, অবশ্য পাঁচটাকা বা আরও বেশী দামের, বড় সাইজের রসগোল্লাও অনেক দোকানেই পাওয়া যায়, তবে স্ট্যান্ডার্ড সাইজ বলতে, এই দু’রকমেরই  পাওয়া যায়, কয়েক বছর আগে এই দুই সাইজেরই দাম ছিল যথাক্রমে এক টাকা ও দু’টাকা। এই ঘটনার সময়, অর্থাৎ চৌষট্টি সালে এই দুই সাজেরই দাম ছিল, পঁচিশ পয়সা ও পঞ্চাশ পয়সা। যাহোক্, আমাদের বাড়ির কাছাকাছি একটাই মিষ্টির দোকান ছিল। সেখান থেকে একছুটে পঁচিশ পয়সা দামের আটটা রসগোল্লা কিনে নিয়ে এলাম। ভদ্রলোককে একটা প্লেটে করে আটটা রসগোল্লাই আদর করে খেতে দেওয়া হ’ল। সাধারণত, সাইজ যাই হোক না কেন, সংখ্যায় অতগুলো মিষ্টি কাউকে খেতে দিলে, বিশেষ করে সদ্য পরিচিত কাউকে খেতে দিলে, সে তুলে নিতে বলবেই। চক্ষুলজ্জা বলেও তো  একটা কথা আছে। আমিও মনে মনে তাই আশা করে, ভদ্রলোকের বিনয় করে তুলে দেওয়া প্রসাদের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু তিনি সে রাস্তায় না হেঁটে, চামচ দিয়ে ঐ ছোট ছোট রসগোল্লা কেটে কেটে, অণু পরমাণু আলাদা করে, চোখ বুজে মুখে পুরতে শুরু করলেন। এমন সময় ছোড়দির শরীরে হঠাৎ অ্যালার্জি দেখা দেওয়ায়, জামাইবাবু ছোড়দিকে নিয়ে ফিরে এলেন। ওদের দু’জনকে দেখেই আমি ছুটে গিয়ে জামাইবাবুকে তাঁর মামার আগমন সংবাদ দিলাম। তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার মামা? সে আবার কে? কোথা থেকে এসেছেন”? কথা বলতে বলতেই তিনি ঘরে ঢুকে তাঁর মামাকে দেখে বললেন, “কী ব্যাপার, আপনি এখানে? চলুন চলুন”। এইভাবে প্রায় জোর করেই তাঁকে চলে যেতে বাধ্য করলেন। কংস মামার কথা শুনেছি, কিন্তু কংস ভাগ্নেকে সেদিন দেখলাম। এই জন্যই বোধহয় বলে—যম, জামাই, ভাগনা, কেউ নয় আপনা।

ভদ্রলোক চলে যাবার পর জানা গেল, তিনি জামাইবাবুর কোন আত্মীয় নন। খড়গপুরে জামাইবাবুরা একসময় থাকতেন, এই ভদ্রলোক তাঁদের বাড়ির কাছেই থাকতেন। তাঁর স্বভাব ছিল, কোনভাবে কারো আত্মীয় স্বজনের ঠিকানা পেলে, একবার ঢুঁ মেরে কিছু খেয়ে আসা। তিনি বোধহয় কোন কারণে হাওড়া এসেছিলেন, এবং সেই সুযোগে কোন ভাবে আমাদের বাড়ির খোঁছ পেয়ে, কিছু ভালমন্দ উদরস্থ করতে এসেছিলেন। বেচারার কপাল খারাপ। দিদিদের কাছে শুনি, পদ্মপুকুরে “সেন মশাই” বলে পরিচিত, বাবার এক সহকর্মীরও, এই এক রোগ ছিল। কে একজন স্পঞ্জের তৈরী হাতি নিয়ে নিমন্ত্রণ বাড়িতে খেতে যাচ্ছে দেখে, সেন মশাইও তার পিছন পিছন গিয়ে, অন্নপ্রাশন বাড়ির ভোজ খেয়ে এসেছিলেন। আমার দুর্ভাগ্য, হাজার চেষ্টা করেও তাঁকে মনে করতে পারছিনা। তাঁর চেহারাটাও মনে পড়ছে না।

আমার মা’র একমাত্র মামা, তাঁকে আমরা “নতুনদাদু” বলে ডাকতাম, এই সময় আমাদের একটা রেডিও উপহার দেন। তখনও আমাদের দেশে টি.ভি.’র প্রচলন হয় নি। রেডিওর দেখাও প্রায় হাতে গোনা বাড়িতে মিলতো বলা যায়। যন্ত্রটা আমাদের একটা গর্বের ও আনন্দের বস্তু হয়ে দাঁড়ালো। এটাই আমার দেখা, আমাদের বাড়িতে প্রথম বিলাসিতার বস্তু। তখন ছিল বাংলা গানের স্বর্ণযুগ। অনেকটা সময় গান শুনে কাটাতাম।

এইভাবে একসময় সেই বছরটাও পার হয়ে গেল। পরীক্ষার ফল ভাল না হলেও, অষ্টম শ্রেণীতে পা রাখলাম। আবার সেই সেকেন্ড হ্যান্ড নতুন নতুন বই হ’ল। কিছুদিন কাটতেই মালুম পেলাম, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্য পুস্তকের মধ্যে কত ফারাক। এই বছর থেকে আবার নতুন উৎপাত, বীজগণিত এসে ঘাড়ে চাপলো। বীজগণিত যখন প্রথম শেখানো শুরু হ’ল, তখন কী কারণে মনে নেই, কয়েকদিন স্কুল কামাই করতে হয়েছিল। ফলে স্কুলে উপস্থিত হওয়ার পর, ওটাকে বড়ই দুর্বোধ্য মনে হ’ল। কিন্তু আরও বেশী সময় বিষয়টার ওপর ব্যয় না করে, সযত্নে এড়িয়ে গিয়ে, বীজগণিত আর শেখা হ’ল না, যদিও পাটিগণিতের অঙ্ক আমি খুব ভালোই পারতাম। আমার দাদা বলতো, “বীজগণিত তো খুব সোজা, ফরমুলাগুলো মুখস্ত কর। যেকোন অঙ্ক ফরমুলায় ফেলে কর, দেখবি কত সহজে অঙ্কগুলোর সমাধান করতে পারছিস। পাটিগণিত যে পারে, তার কাছে বীজগণিত কোন সমস্যা হতে পারে না”। সেইমতো উপদেশ মেনে ফরমুলা মুখস্তও যথেষ্টই করলাম। সত্যি কথা বলতে কী, তার কথা মতো যত ফরমুলা আমি মুখস্ত করেছিলাম, স্বয়ং আইনস্টাইন সাহেবও হয়তো তত ফরমুলা জানতেন না। কিন্তু ঐ যে আগেই বলেছি, বিদ্যেবুদ্ধি আমার চিরকালই কম। ফরমুলাগুলো মুখস্তই করেছিলাম, কিন্তু সেগুলোকে প্রয়োজন মতো অ্যাপ্লাই করতে কোনদিনই পারলাম না। আজও নয়। ফলে বীজগণিত আর এ জীবনে শেখা হয়ে উঠলো না।

শিববাবু আমাদের অঙ্কের ক্লাশ নিতেন। তিনি ছিলেন এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ। ছাত্রদের অঙ্ক শেখাবার কী অদম্য প্রচেষ্টা তাঁর ছিল, বলে বোঝানো যাবে না। কোন অঙ্ক করতে না পারলে তিনি বোর্ডে অঙ্কটা করে বুঝিয়ে দিতেন, আর তারপর জিজ্ঞাসা করতেন বুঝতে পেরেছি কিনা। বুঝতে পারিনি বললে তিনি কখনও বিরক্ত হতেন না, আবার বোঝাতেন। আবার বললে আবার বোঝাতেন। যতবার বুঝতে পারিনি বলা হবে, ততবার আন্তরিকতার সঙ্গে বিভিন্ন ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করতেন। কিন্তু বুঝেছি বলে যদি কেউ করতে না পারে, তবে তাকে পিঠের চামড়া স্কুলে রেখেই বাড়ি ফিরতে হবে। ফলে আমাকে যদি কোনদিন বোর্ডে এসে বীজগণিত বা শক্ত পাটিগণিত করতে বলতেন, তাহলে প্রায়  গোটা পিরিয়ডটাই না বুঝে কাটাবার চেষ্টা করতাম। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্রদের তিনি কড়া হাতে শাসণ করতেন। কিন্তু নবম শ্রেণী থেকে, তিনি ছাত্রদের সাথে বন্ধুর মতো ব্যবহার করতেন। এই সেদিন, কয়েক বছর আগে, মেয়েকে তার স্কুল থেকে আনতে গিয়ে তাঁর সাথে দেখা। তাঁর বুড়িয়ে যাওয়া চেহারাটা দেখে, মনটা খারাপ হয়ে গেল। পরক্ষণেই মনে হ’ল, আমিও তো আর অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র নই, আমার মেয়েই তো এখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী। আমিও তো বুড়ো হতে  চললাম। উনি বললেন স্কুলটার উন্নতির জন্য আমরা কেন কিছু করছি না। আমি বললাম, “এভাবে একা একা স্কুলের কী কোন উন্নতির ব্যবস্থা করা যায়? তার থেকে পুরানো ছাত্র-ছাত্রীদের একটা সম্মেলন মতো করার ব্যবস্থা করে, সেখনে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের, স্কুলের উন্নতিকল্পে সাহায্য করার কথা বলুন। আমার মনে হয় সমস্ত ছাত্রছাত্রীই সাহায্যের হাত বাড়াবে। কত ছাত্র এখন কত সব ভাল ভাল জায়গায়, উচ্চপদে কাজ করছে, কত উপার্জন করছে। পুরাতন সব ছাত্র ছাত্রীদের ডাকুন, আমার বিশ্বাস, সাহায্যের পরিমান প্রয়োজনের তুলনায় বেশীই হবে”। কিন্তু আজও স্কুলের তরফে কোন রকম উদ্যোগ দেখলাম না।

স্কুলে ভূগোল পড়াতেন কালীপদ বাবু, কালীপদ গাঙ্গুলী। ওনার সাথে বাবার পদমপুকুর থাকা কালীন আলাপ ছিল। উনি বিভিন্ন ছাত্রের বিভিন্ন নাম রাখতেন, এবং সেইসব নাম উনি ঠিক মনেও রাখতেন। ছাত্রদের তিনি নিজের দেওয়া নাম ধরেই ডাকতেন। কত আন্তরিকতা, কত স্নেহ দিয়ে সেইসব নাম তিনি চয়ন করতেন, ভাবা যায় না। কারো নাম মোহন সিং, কারণ সে দস্যু মোহনের মতো বদমাস। কারো নাম অঙ্কন সিং, কারণ সে অঙ্কে খুব ভাল। এই রকম কেউ শান্ত সিং, কেউ অস্থির সিং, কেউ পালোয়ান সিং, ইত্যাদি ইত্যাদি। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি কিন্তু তাদের এইসব নামেই ডাকতেন। কখনও ভুল হ’ত না।

এই গাঙ্গুলীবাবু মাঝেমাঝেই পড়া ধরতেন। পড়া ধরার আগে তিনি ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলতেন, “আজ আমি পড়া ধরবো, যে যার ইষ্টদেবতা, পিতামাতার নাম গ্রহণ কর”। এরপর শুরু হ’ত পড়া ধরার পর্ব। পড়া না বলতে পারলে, তিনি সেই ছাত্রকে নিজের টেবিলের কাছে ডাকতেন। অপরাধীকে তাঁর টেবিলের ওপর কনুই এর কাছ থেকে হাত দু’টো রাখতে হ’ত। এরপর তিনি প্রশ্ন করতেন— “তুমি কার নাম গ্রহণ করসো”? ছাত্রটি কোন দেবদেবীর নাম বলার পর, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি বলতেন, “নীল ডাউন হও”। পড়া না পারা খুব কম ছাত্রই, এই নীল ডাউন হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে পারতো। এইভাবে বেশ কয়েকজন ছাত্র জড়ো হওয়ার পর, বেশীর ভাগ দিনই জয় গোপাল বা মামদোকে ডেকে, তাদের ক্ষৌণীশ বাগচীর গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হ’ত। গাঙ্গুলীবাবুর পড়া ধরার হাত থেকে আমিও মুক্তি পাই নি। আর বিষয়টা যখন ভূগোল, তখন আমি পড়া বলতে পারবো, আশা করাও অন্যায়। দু’দিনের কথা না বললে, গাঙ্গুলী বাবুকে ঠিক চেনা যাবে না।

একদিন তিনি আমাকে পড়া ধরে বসলেন, এবং পড়া ধরার আগে অন্যান্য দিনের মতোই যথারীতি—“যে যার ইষ্টদেবতা, পিতামাতার নাম গ্রহণ কর”, অনেকটা আদালতে যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বই মিথ্যা বলিব না গোছের কায়দায় আওড়ালেন। আমার প্রশ্ন শোনার কোন আগ্রহ ছিল না। কারণ আমি যদি ভূগোল পড়া বলতে পারি, তহলে জন্মান্ধ কোন বাঙালী ব্যক্তিও, স্বচ্ছন্দে উর্দু খবরের কাগজ পড়তে পারবে। যথারীতি প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায়, তাঁর টেবিলের কাছে গিয়ে, টেবিলের ওপর দু’হাত রেখে দাঁড়াতে হ’ল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—“তুমি কার নাম গ্রহণ করসো”? আমি ভাবলাম মারা তো পড়বোই, তাহলে আর তার আগে দুঃখ করে কী হবে? বললাম, “বাবা গণেশ, স্যার”। তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “বইসা পড়”। আমি আর এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে, নিজের জায়গায় গিয়ে বইসা পড়লাম।

আর একদিন, সেদিন ক্লাশে এসেই তিনি হঠাৎ ঘোষণা করলেন—“আজ আমি পুরানো পড়া ধরবো”। শুনে আমরা সবাই আঁতকে উঠলাম। পুরানো কেন অতি পুরানো পড়া ধরুন না, কে আপত্তি করেছে? কিন্তু একথা গতকাল বলতে কী অসুবিধা ছিল? আজ তাহলে স্কুলেই আসতাম না। আমি তো প্রমাদ গুনতে শুরু করলাম। টাটকা নতুন পড়াই বলতে পারিনা। পুরানো পড়া বলা কী আমার কর্ম? আমি এইসব ঝড়ঝাপটায় প্রথম শহীদ হওয়ার হাত থেকে বাঁচবার জন্য, তৃতীয় বেঞ্চে বসতাম। তাড়াতাড়ি ভূগোল বইটা দুই হাঁটুর কাছে লুকিয়ে খুলে বসলাম। আমার পাশের ছেলেরাও যে যার বই একই কায়দায় খুলে বসেছে। গাঙ্গুলীবাবু এক একজনকে এক এক চ্যাপ্টার থেকে প্রশ্ন করছেন, এবং পড়া বলতে না পারলেই, নীল ডাউন করিয়ে দিচ্ছেন। জানিনা আমার ইষ্ট দেবতা আজ আমায়, তাঁর হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন কিনা। একসময় তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন— “বল রায়, বল, আফ্রিকার উৎপন্ন সামগ্রী কী”?

আফ্রিকা দেশটা কোথায়, তাই ভাল করে জানলাম না, তো তার উৎপন্ন সামগ্রী। আমাকে উঠে দাঁড়াতে হওয়ায়, বইটা দেখার আর কোন সুযোগ নেই। পাশের ছেলেটাকে ফিসফিস্ করে বললাম, চটপট্ বই দেখে প্রম্পট্ করে যেতে। কিন্তু  তার আফ্রিকার পাতা খুঁজে বার করতে যা সময় লাগলো, ততক্ষণে আফ্রিকা গিয়ে উৎপন্ন সামগ্রী কী, জেনে আসা যেত। আর সময় নেওয়া যাবে না, এরপর নীল ডাউন হতে হবে। ফলে আমি খুব দ্রুত পড়া বলতে শুরু করলাম।

আফ্রিকায় ধান, গম, ভূট্টা ইত্যাদি প্রচুর উৎপন্ন হয়। এছাড়া আঙ্গুর, আপেল, পটল, বাদাম, পাট ও বাজরা কিছুকিছু হয়। আলু, বেগুন, লঙ্কা, ফলসা, খেজুর যে একদম উৎপন্ন হয় না, একথা বললে ভুল বলা হবে। এইভাবে যখন যে ফল বা সব্জীর নাম মনে আসছে, অতি দ্রুত তা কোথাও কোথাও বা কিছু কিছু উৎপন্ন হয় বলে যাচ্ছি। হঠাৎ মনে হ’ল, কোথায় যেন পড়েছিলাম, ভূমধ্য সাগরীয় জলবায়ুতে অলিভ ভাল হয়। এরকম একটা জ্ঞানগর্ভ কথা না বললেই নয়। তাই সঙ্ঙ্গে সঙ্গে বলে দিলাম, “যদিও ভূমধ্য সাগরীয় জলবায়ু ছাড়া অলিভ হয় না, তবু এখানে কিছু কিছু অলিভ উৎপন্ন হয়। হয়তো আফ্রিকাটা পুরো ভূমধ্য সাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থিত, হয়তো পৃথিবীর অর্ধেক অলিভ আফ্রিকাতে উৎপন্ন হয়, কিন্তু তা আমার জানাও নেই, জানবার বা ভাববার সময়ও নেই। কিন্তু আশ্চর্য হ’লাম তখন, যখন শুনলাম গাঙ্গলীবাবু বললেন— “বইসা পড়”।

গাঙ্গুলীবাবু সম্বন্ধে শেষ ঘটনাটা বলে, ওনার প্রসঙ্গ শেষ করবো। স্কুল ছাড়ার দশ-বার বছর পরের ঘটনা। উনি আমাদের অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়িয়েছিলেন, অর্থাৎ সেই হিসাবে প্রায় পনের বৎসর পরে, আমি একদিন শিবপুরে আমার অফিসের কাউন্টারে কাজ করছি। অনেক কাস্টোমারের মতো গাঙ্গুলীবাবু কাউন্টারের সামনে এসে, তাঁর পাস্-বই আপ- টু-ডেট্ করতে দিলেন। মাথার চুল আরও উঠে গেছে, প্রায় নেই বললেই চলে। চশমার কাচ আরও মোটা হয়ে, কাচের গ্লাশের তলার কাচের মতো হয়েছে। আমি জানি উনি আমাকে চিনতে পারবেন না। পরিচয় দিলে পুরাতন ছাত্র হিসাবে বুঝলেও, নির্দিষ্ট ভাবে কোন্ ছাত্র বোঝা তাঁর পক্ষে বোঝা কখনই সম্ভব নয়। কাউন্টারে যথেষ্ট ভিড় থাকায়, আমি আর পুরানো প্রসঙ্গ না তুলে, তাঁর পাস-বইটা আপ্-টু-ডেট্ করে দিলাম। উনি পাস্-বইটা চশমার কাছে নিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন, তারপর হঠাৎ বললেন, “তুমি মাষ্টারমশাই রায় বাবুর ছেলে না? বাবা ভালো আছেন”? আমি লজ্জায় মরে যাই আর কী। ক্ষৌণীশদার পরিচয়েও নয়, তিনি আমার বাবার পরিচয়ে আমাকে চিনতে পারার প্রমাণ দিয়ে, আমার সাথে কথা বললেন। কী ভাবে এতদিন পরে, আমার চেহারার এত পরিবর্তনের পরেও, উনি আমাকে চিনতে পারলেন ভেবে অবাক হয়ে গেলাম। আমি আর কী করি, বাধ্য হয়ে বললাম, “আপনি আমাকে এত বছর পরেও চিনতে পারলেন স্যার? আমার পরিচয় দিলে আপনি আমাকে চিনতে পারবেন কিনা ভেবে, আমি আর আমার পরিচয় দিইনি”। তিনি শুধু বললেন, “আমি কী তোদের ভুলতে পারি? আমি কাউকেই ভুলিনি রে”। এ যুগের রাজনীতি করা শিক্ষকদের দেখলে মনে হয়, সেইসব পিতৃতুল্য সোনার গাঙ্গুলীবাবুরা কোথায় হারিয়ে গেলেন?

বাড়িওয়ালা বেশ কিছুদিন থেকেই খুব খারাপ ব্যবহার করছিলেন। তাঁর একটা হাড় জিরজিরে গরু ছিল। শুকনো কিছু খড় ও ঘাস খেতে দিয়ে, তিনি গরুটার কাছে অনেক দুধের প্রত্যাশা করতেন। তাঁর দোষ নয়। তাঁদের ও আমাদের গরু একই গোয়ালে পাশাপাশি থাকতো। আমাদের গরুটা ছিল বাবার অত্যন্ত প্রিয়। শীতকালে আমাদের গরম জামা বার করার আগেই, বাবা তার জন্য বস্তা কেটে গরম জামা তৈরী করে দিতেন। পিঠের ওপর মোটা বস্তার অংশটা রেখে, দড়ি দিয়ে পেটের তলা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হ’ত। আমাদের সংসারে সাত-আটজনের জন্য মাসে যা খরচ হ’ত, তার থেকে বোধহয় কিছু বেশীই, বাবা শুধু এই একটা গরুর জন্য খরচ করতেন। খোলচুনি, সরষের তেল, আঁখের গুড় ইত্যাদি দিয়ে খড় মেখে, তাকে খেতে দেওয়া হ’ত। এছাড়া ভাতের ফ্যান, টাটকা কচি ঘাস ইত্যাদি তো ছিলই। কিন্তু আমাদের মেমসাহেব গরু, প্রতিদিনই বেশ কিছুটা করে খাবার নষ্ট করতেন। বাড়িওয়ালার রোগা পটকা গরুটা সেই খাবার চোখবুজে পরম তৃপ্তি সহকারে খেত। জানিনা দু’জনের মধ্যে কোন গট্-আপ কেস ছিল কিনা। কিন্তু তাঁর গরু দিনে এক-দেড় সের দুধ দেয়, অথচ আমাদের দেশী গরু কেন রোজ সাত সের দুধ দেয়, এটাই ছিল তাঁর প্রধান দুঃখের ও রাগের কারণ। শেষ পর্যন্ত এই গরু রাখা নিয়ে অশান্তি শুরু হ’ল। অন্যান্য অনেক কিছু উপদ্রবও সঙ্গে এসে হাজির হ’ল। গরুটা ছিল বাবার প্রাণাধিক প্রিয়। গরুটাও কী সুন্দর বাবার কথা বুঝতো ও শুনতো। অফিস থেকে ফিরে ঘরে ঢোকার আগে, একবার গোয়ালঘর ঘুরে আসা ছিল বাবার অভ্যাস। কতদিন দেখেছি গরুটা তার গলায় বাঁধা দড়ি, খুঁটিতে ও পায়ে জড়িয়ে ঘাড় কাত করে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা গোয়ালঘরে ঢুকে দড়িটা ঠিক করে দিতেন। গরুটার পায়ে দড়ি জড়িয়ে গেলে, বাবা শুধু বলতেন, পা তোল্। অদ্ভুত ব্যাপার, গরুটা সঙ্গে সঙ্গে পা উচু করতো। বাবা দড়িটা ঠিক করে দিতেন। জানিনা এত বুদ্ধিমতী গরু নিজেই কেন তার পা তুলে অসুবিধা দুর করতো না।

বাড়িওয়ালার ব্যবহারে আমি ও তপা তাকে চরম শাস্তি দেবার ব্যবস্থা করে ফেললাম। বাড়িওয়ালার ছোট্ট বাগান আর অনেক টব নিয়ে একটা ছোট নার্সারি ছিল। বাগানে অনেক গাছ ছিল, বেশীরভাগই ছোট ছোট ফুল গাছ। তিনি এইসব গাছ, কোন একটা নার্সারিতে পাঠাতেন। আমরা দুইভাই প্রায়ই রাতের অন্ধকারে টব থেকে গাছ উপড়ে ফেলে দিতে শুরু করলাম। শেষপর্যন্ত বাবা এই অশান্তি সহ্য করতে না পেরে, পাশের বাড়ির এক প্রফেসারকে প্রায় জলের দরে গরুটা বিক্রী করে দিয়ে, বাসা ছেড়ে শঙ্কর মঠের পিছনে একটা দোতলা বাড়ির, ওপর তলায় ভাড়া নিলেন। বাড়িটার ওপরে দু’টো আর নীচে দু’টো ফ্ল্যাট। আমরা ওপর তলার ডানদিকটা ভাড়া নিলাম।

পরবর্তী  অংশ  তৃতীয়  পর্বে……….

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s