স্মৃতি (প্রথম পর্ব)

Self (37)  সেই কবে থেকে শুনে আসছি, “স্মৃতি তুমি বেদনা”। স্মৃতি শুধুই বেদনা কিনা জানিনা, তবে এই স্মৃতির মধ্যেই আমাদের ছোট বড় সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া, মান-অভিমান, বঞ্চনা, ভালবাসার ঘটনাগুলো ঘুমিয়ে থাকে। এদের কেউ কেউ মাঝে মধ্যে ঘুম থেকে জেগে ওঠে, আর তখনই আমরা আমাদের ফেলে আসা, প্রায় ভুলে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাকে ফিরে পাই। ফিরে পাই আমাদের হারিয়ে যাওয়া মধুর কৈশোর, সুখ-দুঃখের যৌবনকে, ফিরে পাই তাদের সকলকে, যাদের মধ্যে আমরা লালিত পালিত হয়েছি। এক প্রজন্ম ইহলোকের মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন, এসেছেন আর এক প্রজন্ম। কিন্তু সকলকে একসাথে মনের গভীরে ছোট ছোট ঘটনার মধ্যে ফিরে পাওয়া—সে তো স্মৃতিরই দান। তাই বয়সের ভারে শরীর দুর্বল হোক সেও ভালো, কিন্তু স্মৃতি দুর্বল হোক, আমি অন্তত চাই না। আমি চাই শেষ দিন পর্যন্ত স্মৃতির মধ্যে পুরানো সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকতে।

12096289_511717499004004_278476231998283575_n        Self               12141532_511716622337425_7109979035488382624_n                          বাবা                                    আমি                                        মা

আজ যেন মাঝে মাঝে মনে হয়, কত কিছু করার ছিল, কত জায়গা দেখার ইচ্ছা ছিল, কত মানুষকে চেনার ছিল, কিন্তু তা আর সম্ভব নয়। আর ঠিক তখনই মনে হয়, জীবনের শেষ প্রান্তে বোধহয় এসে পৌঁছেছি। আর তাই পঞ্চান্ন বছর বয়সে, জীবন কথা লেখা। মন বলে তাড়াতাড়ি কর, কে জানে কত সময় পাবে। মনে হয়, কারণ ইচ্ছাগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, মনে হয়, কারণ কত সহপাঠি, কত স্কুল কলেজ পালানো বন্ধু, ওপারে চলে গেছে, মনে হয়, কারণ আমার দেখা সেই নির্মল পৃথিবী দুষিত, কলুষিত হয়ে গেছে। মনে হয়। মনে হয়, কারণ স্মৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। মনে পড়ে তাদের, যাদের সেই কোন ছেলেবেলায় দেখেছি। তাদের সকলকে যে আমি চিনতাম, সবাই যে আমার প্রিয় ছিল, তাও নয়। তবু আজও তারা হামেশাই মনের কোণে উঁকিঝুকি মারেন। তাঁদের সকলের মধ্যে, সবার স্মৃতি নিয়েই, বাকী জীবনটা কাটাতে চাই।

আমার জন্ম ১৯৫২ সালের ২৩ শে জুলাই, হাওড়ার পদ্মপুকুর রেলওয়ে কোয়র্টার্সে। বাবা রেলওয়ে কর্মী ছিলেন। আমার জন্মের সময় বেশ কয়েকদিন প্রবল বর্ষণ হয়েছিল। তাই আমার ডাকনাম কিভাবে, কার ইচ্ছায় কে জানে, “বাদল” হয়ে যায়। আমরা চার ভাই, তিন বোন। আমার ঠিক ওপরের দাদা, যার ডাকনাম তপা, ভালো নাম সুপ্রিয়, আবার অত শক্ত শব্দ উচ্চারণ করতে না পারায়, নিজে নিজেই বাদলকে সংক্ষেপ করে নিয়ে, আমার একটা সুন্দর, অতি সুন্দর, লোকের কাছে গর্ব করে, বুক ফুলিয়ে বলার মতো ডাকনাম সৃষ্টি করে দিল—“বাদা”। শুনেছি আমার ভালো নাম প্রথমে সুনীল রাখা হলেও, পরে সেটা পরিবর্তন করে সুবীর রাখা হয়।

পদ্মপুকুরে আমার খুব অল্প কয়েক বছর থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। ঐ বয়সের বিশেষ কোন ঘটনাও আজ আর আমার স্মৃতির পর্দায় ধরা পড়ে না। হয়তো আমার স্মৃতি, আমার বিদ্যেবুদ্ধির মতোই দুর্বল। তবে একটা ঘটনা অত ছোট বয়সের হলেও, আজও মাঝে মাঝে স্মৃতির পর্দায় উকিঝুকি মারে। বোধহয় এটাই আমার জীবনের প্রথম ঘটনা, যা আজও মনে করতে পারি।

আমরা যে কোয়ার্টার্সে থাকতাম, তার ঠিক পিছনেই জামশেদ নামে এক ধোপা বাস করতো। পিছনের পুকুরে সে কাপড় কাচতো। বাবাকে সে খুব শ্রদ্ধা ভক্তিও করতো। জামশেদের অনেক মুরগি ছিল। একবার বাবা পুরী গেছিলেন। বাবার সেদিন পুরী থেকে ফিরে আসার কথা। সকালে আমাদের কোয়ার্টার্সের পিছনের উঠনের  ছোট্ট

Tapa   তপা             Bula  বুলা                   Maka মাকা

নালার গর্ত দিয়ে, জামশেদের একটা মুরগির বাচ্চা, সেটার বয়স বোধহয় দু’এক দিন হবে, কারণ একবারে গোল ছোট্ট বলের মতো দেখতে, আমাদের বাড়ির উঠনের ভিতর ঢুকে পড়ে। ঐ অতটুকু বয়সেও, স্বচ্ছন্দে সেটাকে আমি ধরে ফেলি। আর ঠিক সেই সময়, বাবা পুরী থেকে ফিরে হাঁকডাক করে বাড়িতে ঢোকেন। বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিলেই, সব ল্যাঠা চুকে যেত, কিন্তু ঐ যে বললাম, বিদ্যেবুদ্ধি আমার চিরকালই দুর্বল। অহেতুক ভয় পেয়ে, বাচ্চাটাকে নিয়ে কী করবো ভেবে না পেয়ে, তার মাথাটা মাটিতে ঠুকে দিলাম। মুরগির বাচ্চাটা সঙ্গে সঙ্গে মরে গেল। আমি আরও ভয় পেয়ে, পাঁচিল টপকে সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। বাচ্চাটা গিয়ে একবারে জামশেদের পায়ের কাছে পড়ে। কাল বিলম্ব না করে, জামশেদ মরা বাচ্চাটাকে নিয়ে এসে, বাবার কাছে নালিশ করে। কিন্তু বাড়ির কেউ বিশ্বাস করতে পারে নি, যে আমি বাচ্চাটাকে ধরতে বা মারতে পারি। বাবা তাকে বুঝিয়ে বললেন যে, ছোট বলতে বাডিতে এখন আমি একা, আর আমার বয়সী ছেলের পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়। আমতা আমতা করে, বাধ্য হয়ে জামশেদ মেনে নিল। ফলে সে যাত্রা আমি প্রাণে বেঁচে যাই। জামশেদ আজ বেঁচে আছে কিনা জানিনা, থাকলে তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

পদ্মপুকুর থেকে বাবা বদলি হয়ে, “চেঙ্গাইল” নামে একটা রেলওয়ে স্টেশনে চলে যান। প্রথমে ওখানে কোন কোয়ার্টার্স না পাওয়ায়, গঙ্গার ধারে “চক্কাশী” নামে একটা গ্রামে, বাড়ি ভাড়া নিয়ে আমাদের কিছুদিন থাকতে হয়েছিল। আজকের মতো সে সময়ে মায়ের পেট থেকে পড়েই, স্কুলে ভর্তি হওয়ার রেওয়াজ ছিল না। আর তাই, তখনও আমার স্কুলের পাঠ শুরুই হয় নি। এই চক্কাশী গ্রামের বিশেষ কিছু, আমার মনে পড়ে না। রেলওয়ে স্টেশন থেকে চক্কাশীর পথে, অনেকটা পথ একটা ইঁটের পাঁচিল মতো ছিল। মাটি থেকে তিন-চার ফুট উঁচু। হয়তো কোন চটকলের জমির সীমানা, ইঁটের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। দু’পাশে ছোট লতা পাতার জঙ্গল, হলুদ রঙের বুনো ফুলগাছে ভরা। সকলে সেই পাঁচিলের ওপর দিয়ে অনেকটা পথ গিয়ে, আবার মাটির রাস্তায় নামতো। আমাদের বাড়ির খুব কাছ দিয়ে গঙ্গা বয়ে গেলেও, আমার সেখানে একা যাওয়ার হুকুম ছিল না।

একটা রাতের কথা মনে পড়ে। সেদিন, সারাদিন খুব বৃষ্টি হয়েছে। গভীর রাতে আমাদের ঘুম থেকে ডেকে তোলা হ’ল। কারণটা এতদিন পরে আর মনে করতে পারি না, তবে আশপাশের সব বাড়ির লোকেরা, বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে এসে খুব চিৎকার চেঁচামিচি করছিল। সম্ভবত গঙ্গার বানের জল বাড়ির খুব কাছে চলে এসেছিল। আর একদিন গঙ্গার ধার থেকে খুব বড় একটা কাঁকড়া ধরে এনেছিলাম। কাঁকড়াটার কী হয়েছিল মনে নেই, তবে গঙ্গার ধারে একা যাওয়ার জন্য, বাবার কাছে খুব বকুনি খেতে হয়েছিল। এই কুঁড়েঘর সম বাড়িতে, এক বৃষ্টির রাতে, বাবা অনেক চেষ্টার পর, একটা বিশাল গোখরো সাপ মারেন। সন্ধ্যার পর সেটাকে বাড়ির দালানে দেখা গেছিল। রাতে বাবা স্টেশন থেকে ফিরে, মা’র কাছে সাপের কথা শুনে, ঘুঁটের বস্তার নীচ থেকে তাকে আবিস্কার করেন। মা’র কাছে শুনেছি, বাবা প্রচুর সাপ মেরেছেন। বাবার সাপ মারার একটা বিচিত্র ঘটনা পরবর্তীকালে দেখেছি, সে কথা যথা সময়ে বলা যাবে।

এরপর আমরা চেঙ্গাইল রেলওয়ে কোয়র্টার্সে চলে আসি। বর্তমান চেঙ্গাইল রেলওয়ে স্টেশন, আগের জায়গায় আর নেই। খানিকটা এগিয়ে গিয়ে নতুন স্টেশন, নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরী হয়েছে। এখানে আসার কয়েক মাস পরে, আমি প্রাথমিক স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হই। সে দিনটার কথা আজও বেশ মনে পড়ে। বাবা চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি করাবার জন্য, আমাকে নিয়ে স্কুলে গেলেন। প্রধান শিক্ষকের  নাম ছিল, শ্রী যোগেন্দ্র নাথ হোড়।

Didi দিদি Dadaদাদা  Chhordi o Maka  ছোড়দি ও মাকা

 

ভদ্রলোককে দেখতে অনেকটা মহাত্মা গান্ধীর মতো। তিনি আমাকে মুখে মুখে পঁচিশকে পাঁচ দিয়ে ভাগ করতে বললেন। মা’র দৌলতে এর থেকে অনেক বড় বড় গুণ-ভাগ, আমার কাছে কোন সমস্যা ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলাম, “ভাগফল পাঁচ”। উনি বেশ জোর গলায় বললেন— “ভাগফল পাঁচ”? এবার আমি একটু নরম গলায় উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ স্যার”। উনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ভাগফল পাঁচ”? এবার তাঁর কন্ঠস্বর আরও এক পর্দা চড়া। আমি মিনমিন্ করে জবাব দিলাম, ”ভাগফল চার, ভাগশেষ পাঁচ”। উনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, বাবাকে পরামর্শ দিলেন— “একে তৃতীয় শ্রেণীতেই ভর্তি করে দিন। অল্প বয়স, চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি না করাই ভাল”। বাবাও সুবোধ বালকের মতো সম্মতি জানিয়ে, আমাকে তৃতীয় শ্রেণীতেই ভর্তি করে দিলেন।

বাবার ছিল এই এক দোষ। কেউ কিছু পরামর্শ দিলে, সহজেই তা মেনে নিতেন। পরবর্তীকালেও দেখেছি, আমাদের নিয়ে জামা প্যান্ট কিনতে দোকানে গিয়েও, সেই একই ব্যাপার। দু’চারটে জামা বা প্যান্ট দেখিয়েই দোকানদার বললো, ”এটা নিন, এই জামাটা বেশ ভাল”। ব্যাস, সেটার রঙ লাল হোক, নীল হোক, আমাদের পছন্দ হোক বা না হোক, বাবা বলে বসলেন, “এটাই নিয়ে নে, দোকানদার তো বলছে এটা ভাল”। তাকে বেশী পরিশ্রম করতে না হওয়ায়, এবং এইরকম একটা বিদখুটে রঙের জামা বা প্যান্ট, এত সহজে বিক্রির ব্যবস্থা হওয়ায়, দোকানদাও বেজায় খুশী। আমাদের পছন্দ, অপছন্দ সেখানে গৌণ ছিল। মুখ্য ছিল দোকানদারের পছন্দ। ফলে আপ রুচিমে খানা, দোকানদারের রুচিমে পরনা, আপ্ত বাক্য শিরোধার্য করে, দোকানদারের গছানো জামা বা প্যান্ট, বেজার মুখে বগলদাবা করে, বাসায় ফিরতে হয়েছে।

11898813_496768840498870_2639965461624618621_n (1)  আমরা ভাই-বোনেরা।

যাহোক্, শুরু হ’ল স্কুল জীবন। কিন্তু বিধাতা বোধহয় আর সকলের মতো, আমার নিয়মিত স্কুল যাওয়ার ইচ্ছা, ভাল চোখে দেখলেন না। তাই স্কুলে যাবার প্রথম শুভ দিনটাই, কী কারণে যেন স্কুল কামাই হ’ল। ফলে সারা জীবন স্কুল, কলেজ পালানো, আমার পিছন ছাড়লো না। মনে পড়ে হাতে বই, স্লেট্, পেনশিল ও একটা চটের আসন নিয়ে স্কুলে যেতাম। মাটির ঘরে খড়ের ছাউনি, মাটির মেঝেতে আসন পেতে বসা। জানিনা ঐ স্কুল বড়ি দেখেই, “আমার মাটির ঘরে বাঁশের খুঁটি মা, তাও পারি না খড় জোটাতে” লেখা হয়েছিল কী না। তবে বৃষ্টিতে খড় ভেদ করে, ঘরে জল যথেষ্টই পড়তো।

আজ যেমন ছোট ছোট পরিবারে, ছোট বাচ্চাদের হাতেও মা’-বাবাকে টাকা পয়সা দিতে, বা সাধ্যের বাইরেও ভালো ভালো টিফিন দিতে দেখি, আমাদের সময় সে চল্ ছিল না। আমার বাড়িতে তো ছিলই না। কাছেই স্কুল হওয়ায়, টিফিনের সময় বাড়ি এসে টিফিন খাওয়ার নির্দেশ ছিল। স্কুলের পাশেই একটা ছোট্ট দোকানে ডালমুট, কোকো লজেন্স্, নারকেল লজেন্স্, লাল তুলো ইত্যাদি, পৃথিবীর সব শ্রেষ্ঠ খাবার বিক্রি হ’ত। কিছু কিছু ছেলেমেয়ে, সেসব অমৃত কিনে খেতও। আমার ভাগ্যে সে সুযোগ, কোন দিন জুটতো না। প্রতিদিন লোলুপ দৃষ্টিতে সে সব দৃশ্য দেখে, বাড়ির পথ ধরতাম। বাড়ি এসে রুটি তরকারী, বা ঐ জাতীয় কোন খাবার, অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেতে হ’ত। টিফিন খেয়ে আবার স্কুলের পথ ধরা। তবে ঐ অল্প সময়ের মধ্যেও, ভাল কিছু লোভনীয় খাবারের খোঁজে, এ কৌটো ও কৌটো খুলে খুলে দেখতাম। সবকিছু আজ আর মনে পড়ে না, তবে দু’একটা ঘটনার কথা বলতে খুব ইচ্ছা করছে।

একদিন টিফিনের সময় বাড়ি এসে দেখলাম, রান্নাঘরে ঝুড়িচাপা দেওয়া কী একটা রয়েছে। সুযোগ বুঝে ঝুড়িটা একটু ফাঁক করে হাত ঢুকিয়ে, নরম মতো কিছুর স্পর্শ পেলাম। কোনদিকে না তাকিয়ে, কোন কিছু না ভেবে, খানিকটা নিয়ে মুখে পুরেই, থু থু করে ফেলে দিলাম। আসলে ঝুড়ির নীচে খোলা ছাড়ানো কুচো চিংড়ির দল, হলুদ মেখে কড়ার গরম তেলে স্নান করার অপেক্ষায় ছিল।

আর একদিন স্কুল থেকে টিফিনের সময় এসে প্রথম কৌটোটা খুলেই, অমৃতের সন্ধান পেলাম। অন্যান্য দিন এ কৌট ও কৌট খুলে ডাল, সরষে, তেজপাতা ইত্যাদি দেখতে দেখতেই, মা টিফিন খেতে দিয়ে দিতেন, এবং তারপরেই স্কুলে যাবার পালা। আজ কার মুখ দেখে উঠেছি জানিনা, প্রথম কৌটোতেই অমৃত। আমার অতি প্রিয়, মিল্ক পাউডার। ঝপ্ করে মুঠো করে তুলেই মুখে পুরে দিলাম। গোটা মুখ জ্বালা করে গরম হয়ে গেল। ঘরের মধ্যেই থুথু ফেলে, কষ্টের হাত থেকে বাঁচবার চেষ্টা করলাম। মা এসে পিঠে দু’ঘা বসিয়ে মুখ ধুয়ে দিয়ে, জল খেতে বললেন। ওটা মিল্ক পাউডার ছিল না, ছিল কাপড় কাচার সোডা।

সেদিন স্কুলে যাবার সময় শুনে গেছি তালের বড়া হবে। তালের বড়ায় নন্দর আগ্রহ থাকলেও, আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, কারণ তাল আমি খাই না। টিফিনে বাড়ি এসে মিটসেফের ডালা খুলেই দেখি ছ’ছটা কলা। একটা কলা খেয়ে বেশ ভাল লাগলো। খোলাটা পকেটে রেখে, আর একটা চটপট্ খোলা ছাড়িয়ে মেরে দিলাম। খোলা পকেটে রেখে, ভাল ছেলের মতো টিফিন খেয়ে স্কুলে ফিরে যাবার আগে হঠাৎ মনে হ’ল, আমি স্কুল থেকে টিফিনে আসার পর কলা উধাও হলে, সকলের আমাকেই সন্দেহ হবে। তার থেকে সব ক’টা কলা খেয়ে নিলে, কলা ছিল কিনা কেউ বুঝতেই পারবে না। সেই মতো বাকি চারটে কলা সযত্নে পকেটস্থ করে, স্কুলে যাবার পথেই শেষ করে দিলাম। কিন্তু বাড়ির সবাই আমার মতো চতুর না হওয়ায়, সহজেই ধরা পড়ে গেলাম।

মিটসেফের বেশ খানিকটা ওপরে, একটা লম্বা কাঠের তাক ছিল। সেই তাকে বেশ বড় বড় তিন-চারটে কাচের বয়মে, মধু রাখা থাকতো। মধু খাওয়া ভাল, খেতেও ভাল, এবং মধু খেলে সর্দিকাশির ধাত হয় না, এই ধারণায় বাবা মধু  কিনে ওখানে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। একদিন স্কুল থেকে টিফিনের সময় এসে, মিটসেফের ওপরে উঠে মধুর বয়ম পারতে গিয়ে বুঝলাম, ওখানে আমার নাগাল পাওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। ওখানে হাত পাওয়ার জন্য আমাকে, আরও অন্তত পাঁচ-সাত বছর অপেক্ষা করতে হবে। মিটসেফের ওপরে তেলের বড় বড় টিনে, যেসব টিনে এখন ট্রেনে ঝালমুড়ি বিক্রি করে, চাল, মুড়ি, ইত্যাদি রাখা হ’ত। টিনের ওপরে উঠে, বুড়ো আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে উচু হয়ে দাঁড়িয়ে, কোন মতে বয়মের নাগাল পেলাম। টলমল পায়ে একটা বয়ম থেকে চুমুক দিয়ে মধু খেতে গিয়ে, গোটা জামা প্যান্ট বেয়ে মধু পড়তে শুরু করলো। গায়ে হাতেও কম মধু মাখামাখি হ’ল না। আজও আমার দেহের চামড়া বেশ ভাল, হয়তো সেদিনের সেই মধুস্নান করারই সুফল।

পরের বছর আমার ছোটবোন, একই স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে, ফুচকান ও গণেশ নামে দু’জন অত্যাশ্চর্য বন্ধুর সংস্পর্শে আসে। গণেশের ঠোঁটটা কাটা ছিল বলে, সে ঠোঁটকাটা গণেশ নামেই খ্যাত ছিল। আর সবসময় খাঁকি হাফ-প্যান্ট পরে থাকা, ফুচকান যে কী ধরণের নাম জানার খুব আগ্রহ থাকলেও, বাদা নামক চালনির ফুচকান নামক ছুঁচের নাম রহস্য নিয়ে মাথা ঘামানোর সাহস হয় নি। বাড়ির সকলে ফুচকানকে নিয়ে খুব হাসি-মস্করা করতো। আমার ছোটভাই আবার ফুচকানকে সংক্ষেপে ফুচু বলতে, এবং ছোটবোনকে ফুচু বলে ডাকতে শুরু করে। আজ এই বুড়ো বয়সেও সে ঐ ফুচু বলেই ডাকে। রোজ আমরা দু’জনে স্লেট, পেনশিল, বই, আসন, ও স্লেট মোছার জল ন্যাকড়া নিয়ে স্কুলে যেতাম। প্রধান শিক্ষক বাড়ি ফেরার পথে, মাঝেমাঝে আমাদের বাড়ি হয়ে যেতেন। আমাদের তিনি খুব স্নেহ করতেন। ভদ্রলোকের এক পাগলাটে ভাইপো ছিল। সে মাঝেমাঝেই স্কুলে এসে, স্কুলের ছাত্রছা্রীদের খুব বিরক্ত করতো। হেড মাষ্টারমশাই নিজেও তার প্রতি অত্যন্ত বিরূপ ছিলেন। একদিন স্কুলের মধ্যেই তাকে বেত দিয়ে খুব মারধর করার পর, তার স্কুল পরিদর্শন করা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অনেক পরে, বড় হয়ে তাকে ট্রেনের কামরায় লজেন্স্ বিক্রি করতে দেখেছি।

আমাদের কোয়ার্টার্সের সামনে একটা প্রাচীন অশ্বথ গাছ ছিল। বিরাট গাছটা তার বিশাল কান্ড ও মোটামোটা ডালপালা নিয়ে, পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকতো। গাছটার ঠিক সামনেই রেলের ঝিল। গাছের বাঁপাশে, স্টেশনে যাবার পথের ধারে, টিনের গোয়াল ঘরে, আমাদের গরু থাকতো। গাছটার খুব উচুতে একটা মোটা ডাল থেকে, খুব মোটামোটা দড়ি ঝুলিয়ে, একটা কাঠের তক্তা বেঁধে, বাবা একটা দোলনা তৈরী করে দিয়েছিলেন। তাতে আমরা তো দোল খেতামই, স্টেশনের অন্যান্য কর্মীরাও, অবসর সময় দোল খেতেন। রাস্তা দিয়ে যাতায়াতের পথে, অনেকেই তাতে দোল খেয়ে আনন্দ পেত।

আমার অভ্যাস ছিল, ফাঁকা দোলনাটাকে জোরে জোরে ঠেলে দোলানো। ফাঁকা দোলনাটা অনেক দুরে ঝিলের জলের ওপর দিয়ে গিয়ে, আবার আমাদের কোয়ার্টার্সের কাছে ফিরে আসতো। এইভাবে ওটাকে খুব জোরে জোরে দুলিয়ে, ছুটে গিয়ে কাঠের তক্তা ধরে পা মুড়ে ঝুলে পড়া। এইভাবে একা একা কারো সাহায্য ছাড়াই, খুব জোরে দোল খেয়ে অনেক উচুতে উঠে, ঝিলের মাঝখানে চলে যাওয়া যেত। মা প্রায়ই এই ব্যাপারটা নিয়ে বকাবকি করতেন। এই প্রক্রিয়ায় দোল খাওয়ার মধ্যে তিনি কোন বিপদের গন্ধ পেতেন। একদিন ফাঁকা দোলনাটাকে ঐ ভাবে ঠেলে ঠেলে বেশ জোরে দুলিয়ে, সবে ছুটে উঠতে যাব, এমন সময় মা এসে চেঁচামিচি শুরু করে দিলেন। সবজান্তা আমি পিছন ফিরে হাত নেড়ে, এইভাবে দোল খাওয়ার সুবিধা বোঝাতে শুরু করলাম। আর ঠিক তখনই দোলনাটা ঝিলের দিক থেকে ফিরে এসে, সজোরে আমার মাথায় আঘাত করলো। মাথা ফেটে রক্তারক্তি কান্ড। বাবা ফিরে এসে সব শুনে, দোলনাটা দড়িতে পাকিয়ে গোয়াল ঘরের টিনের চালে তুলে দিলেন। কিন্তু দোলনাটা এত লোকের প্রিয় ছিল, যে তাদের দোল খাওয়ার জন্য টিনের চাল থেকে নামানো হ’ত, এবং আমিও সে আনন্দ থেকে বঞ্চিত হ’তাম না।

আমার অবসর সময়ের সব থেকে বেশী সময় ব্যয় হ’ত, মাঠেঘাটে ঘুরে ঘুরে গঙ্গাফড়িং সংগ্রহে। জুতোর বাক্সে ঘাস রেখে, মাঠঘাট জলাজঙ্গল থেকে গঙ্গাফড়িং ধরে এনে, ঐ বাক্সে রেখে পুষতাম। যদিও এটা বেশ ভালোই বুঝতাম যে, গঙ্গাফড়িং পোষ মানার পাত্র নয়। কিন্তু সবুজ রঙ যে কত রকমের হতে পারে, বিভিন্ন গঙ্গাফড়িং-এর রঙ দেখে শিখতে হয়। এছাড়া সরু একরকম ফড়িং আছে, অনেকটা হেলিকপ্টারের মতো দেখতে। নানা রঙের এই ফড়িংও ধরে বেড়াতাম। একদিন সন্ধ্যার মুখে, হাতে একটা পাকা আম নিয়ে, বাড়ির সামনের ঝিলের ধারে আগাছার জঙ্গলে, গঙ্গাফড়িং-এর সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমটা খেয়ে আঁটিটা ছুড়ে গোয়াল ঘরের টিনের দেওয়ালে মারতেই, গোয়াল ঘরের অপর দিকের রাস্তা থেকে একটা মুরগি আওয়াজ শুনে ভয় পেয়ে, উড়তে উড়তে গিয়ে, পানাভরা রেলের ঝিলের মাঝখানে গিয়ে ল্যান্ড করলো। কাদের মুরগি জানিনা, সে যে গোয়াল ঘরের অপর প্রান্তে ছিল, তাও জানতাম না। কিন্তু মুরগিটা বড় বড় পানার মধ্যে থেকে আর উঠলো না। খানিক পরেই মুরগির মালিক কোথা থেকে খবর পেয়ে এসে, খুব চেঁচামিচি শুরু করে দিল। যারা ঘটনাটা দেখেছিল, তারা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করলো যে, আমার আমের আঁটি ছোড়ার কারণেই, মুরগির এই আত্মহত্যা। অকুস্থলে আমি একা, কাজেই টি.আই. প্যারেডেরও কোন সুযোগ নেই, প্রয়োজনও হ’ল না। আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অপরাধে, আমি দোষী সাব্যস্ত হ’লাম, এবং বিনা দোষে, বিনা কারণে, সেই সন্ধ্যায় বাবার হাতে সান্ধ্যভোজের ব্যবস্থা হ’ল। রাতে পড়া না পারার জন্য, নৈশভোজের ব্যবস্থাও বেশ ভালই হ’ল। জানিনা এটা জামশেদ বা তার মৃত মুরগির আত্মার অভিশাপে কিনা, তবে এই মুরগির কারণে বারবার আমাকে বিপদে পড়তে হয়েছে।

আমাদের নিজেদেরও বেশ কয়েকটা মুরগি ছিল। একদিন এক তীরধনুক তৈরী করে, তীরের মুখে একটা ছোট পেরেক বেঁধে, আমাদের একটা মুরগিকে টিপ করে, তীর ছুড়লাম। সেদিন আমার মধ্যে, মধ্যম পান্ডব অর্জুনের আত্মা বোধহয় ভড় করেছিল। পাটকাঠির তীর গিয়ে মুরগির গায়ে বিঁধে, ঝুলতে শুরু করলো। মুরগিটা ভয়ে, না যন্ত্রণায় জানিনা, সারা পাড়া তীর নিয়ে ছুটে বেড়াতে লাগলো। মুরগির পিছন পিছন আমিও, সব কাজ ফেলে ছুটে মরছি। উদ্দেশ্য একটাই, মুরগি মরে মরুক, তীরটা কোনমতে খুলে নিয়ে প্রমাণ লোপ করা। তা নাহলে আমার হাতে মুরগির মৃত্যু না হলেও, বাবার হাতে আমার মৃত্যু অনিবার্য। শেষ পর্যন্ত মুরগিটার লাফঝাঁপে, তীর আপনা আপনি খুলে পড়ে গেল, এবং সে যাত্রায় মুরগি বা আমার, কারোরি মৃত্যু হ’ল না।

স্টেশন চত্বরে কিছু কাবুলিওয়ালার আনাগোনা ছিল। সেই বয়সে তাদের আনাগোনার কারণ বুঝতাম না। স্টেশন থেকে কিছুটা দুরে পরপর দু’টো চায়ের দোকানে, তারা দলবেঁধে চা খেত, গল্প করতো। রাতে তারা সেখানেই থাকতো কিনা, বলতে পারবো না। এদের মধ্যে একজন, আমাকে ও আমার ছোট বোনকে খুব ভালবাসতো। অনেকবার টিফিনের সময় স্কুলে তার কাছ থেকে লজেন্স, বিস্কুট, ইত্যাদি উপহারও পেয়েছি। কয়েকদিন দেখা না হলে, সে আমাদের কোয়ার্টার্সে এসে খোঁজ খবর নিয়ে যেত। আমাদের গরুর প্রচুর দুধ হ’ত। আমরা সকলে খেয়েও অনেক দুধ থেকে যেত। এরপর থেকে সে প্রতিদিন তার জন্য দুধ নেওয়া শুরু করলো। পরিমানে কতটা নিত জানিনা, তবে বিরাট একটা কাচের গ্লাশে, সে গরুর দুধ দোয়ার সময় এসে, এক গ্লাশ কাঁচা দুধ খেত।

একদিন বিকেলবেলা তাদের সেই চায়ের দোকানের কাছ দিয়ে যাবার সময়, আরও কিছু কাবুলিওয়ালার সাথে তাকেও দেখতে পেলাম। হঠাৎ আমার মাথায় কী ভুত চাপলো কে জানে, এক লাফে তার মাথার পাগড়ীটা খুলে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সে আমার হাতটা সজোরে চেপে ধরলো। তার চোখ মুখ দেখে আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। আরও ভয় পেলাম, কারণ এটা আমার পরিচিত বন্ধু কাবুলিওয়ালাটা নয়। সে অদ্ভুত সুরে অতি দ্রুত অচেনা ভাষায় চিৎকার শুরু করলো। বজ্রমুষ্টিতে সে আমার কব্জি ধরে আছে। মুহুর্তের মধ্যে আরও অনেক কাবুলিওয়ালা, আমাদের ঘিরে জড়ো হ’ল। তারা সকলেই তাদের ভাষায় নিজেদের মধ্যে চিৎকার করে কথা বলতে শুরু করলো। তারা কী বলছে বুঝতে না পারলেও, এটা বেশ বুঝতে পারছি যে, চিৎকার চেঁচামিচিটা আমাকে নিয়ে। এমন সময় হঠাৎ কোথা থেকে আমার পরিচিত বন্ধু কাবুলিওয়ালাটা এসে উপস্থিত হ’ল। সে আমাকে দেখে তার দেশওয়ালি ভাইদের সাথে কথা বলে, আমাকে মুক্ত করলো। এবার সে গম্ভীর ভাবে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, কেন আমি এই কাজ করেছি। আমি জানালাম যে আমি তাকে ভেবে, ভুল করে অন্য কাবুলিওয়ালার পাগড়ী খুলে দিয়েছি। সে আমাকে বেশ শান্ত ভাবেই বললো, এটা খুব অপমানকর ব্যাপার। আমি যেন ভবিষ্যতে কোনদিন কোন কাবুলিওয়ালার পাগড়ীতে হাত না দেই, তার পাগড়ীতেও নয়।

এইভাবে বেশ কাটছিল। সকালবেলা একটু পড়া, তারপর একটু খেলে স্কুলে যাওয়া। স্কুল থেকে ফিরে আবার দোল খাওয়া, ঝিলের জলে মাছ ধরা, গঙ্গাফড়িং খুঁজে বেড়ানো, বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করা। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, আমার দেড় বছরের বড় দাদা, তপা কিন্তু আমার কোন ব্যাপারে সঙ্গী ছিল না। সন্ধ্যায় মাদুর পেতে তারায় ভরা খোলা আকাশের নীচে, হ্যারিকেন জ্বেলে বাবাকে ঘিরে গোল হয়ে বসে পড়তে বসা। যত রাজ্যের ঘুম তখন আমার দু’চোখে বাসা বাঁধতো। মাঝেমাঝেই জল খেয়ে আসছি, বাথরুম থেকে আসছি, ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে ঘরে যেতাম। এই ব্যাপারে বাবাকে কিন্তু কোনদিন, শরৎ চন্দ্রের “মেজদার” ভুমিকায় দেখা যায় নি। ঘরে একটা বেঞ্চের ওপর বড় বড় তিন-চারটে ট্রাঙ্ক, পরপর রাখা ছিল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তার ওপর মাথা রেখে একটু ঘুমিয়ে নিতাম। কিন্তু বাবার ডাকে আবার ফিরে আসতে হ’ত। একটু বকাঝকা খেয়ে, পরদিন থেকে ভাল করে পড়াশোনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, দুধ, কলা ও রুটি খেয়ে শুয়ে পড়া। দুঃখের বিষয়, সেই পরদিন আমার জীবনে আর কোনদিন আসেনি।

আমাদের কোয়ার্টার্সের ঠিক পাশেই একটা খেজুর গাছ ছিল। শীতকালে একটা লোক, গাছ চেঁচে একটা কলসী বেঁধে দিয়ে যেত। মাঝেমাঝে গাছে নতুন কলসী বেঁধে, পরদিন খুব ভোরে আমাদের খেজুর রস দিয়ে যেত। ঐ অমৃত খেয়ে যত না আনন্দ পেতাম, তার থেকে অনেক বেশী কষ্ট হ’ত, ঐ অমৃত পান করার জন্য, শীতের মধ্যে অত ভোরে ঘুম থেকে উঠতে। একদিন খুব ভোরে চিৎকার চেঁচামিচিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। শুয়ে শুয়েই শুনলাম আমাদের পায়খানার বদনাটা পাওয়া যাচ্ছে না। অ্যালুমিনিয়ামের তৈরী বদনাটার বয়স, আমার থেকেও বেশী। সেটার ওপরেও যে কারো লোভ থাকতে পারে, বাড়ির কেউ ধারণাও করতে পারে নি। একটা মুসলমান লোক আমাদের গরুর ঘাস দিয়ে যেত। তার ওপর কেন জানিনা, বাবার সন্দেহ হ’ল। পরদিন তাকে ধমক দিয়ে জেরা করতে, সে স্বীকার করলো যে সে কাঁচা রস নিয়ে যাবার জন্য, বদনাটা নিয়েছে। ঐ বদনা করে খেজুর রস নিয়ে গিয়ে যে কেউ খেতে পারে, সেদিন প্রথম জানলাম। এই খেজুর রস প্রসঙ্গে আরও একটা কথা মনে পড়ছে। পরবর্তীকালে আমরা রামরাজাতলায় চলে আসার পর, চেঙ্গাইল প্রসঙ্গে আমার ছোট ভাই সকলকে বলে বেড়াতো— “চেঙ্গাইলে আমরা হাঁড়ি হাঁড়ি তাড়ি খেতাম”।

তখন চতুর্থ শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষা হ’ত। “ছাত্রবন্ধু” নামে এখনকার টেষ্টপেপারের মতো একটা বই ছিল, তাতে সমস্ত জেলার প্রশ্নপত্র থাকতো। আমি রান্নাঘরের দরজার কাছে বসে, ছাত্রবন্ধু থেকে মার কাছে অঙ্ক কষতাম। অঙ্কগুলো মা আমাকে এতবার করিয়েছিলেন যে, যেকোন জেলার যেকোন অঙ্কের উত্তর পর্যন্ত আমার মুখস্ত হয়ে গেছিল। বৃত্তি পরীক্ষার রেজাল্ট স্কুলে গিয়ে জেনে, আমি একটা আঙ্গুল তুলে ফার্ষ্ট ডিভিশন বলে চিৎকার করতে করতে বাড়ি এসেছিলাম।

বছরের প্রথমে বাবা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বাউড়িয়া বুড়িখালি স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। আমার ওপরের দুই দাদা-ই কিন্তু উলুবেড়িয়া হাই স্কুলে পড়তো। আমায় কেন বাউড়িয়া বুড়িখালি স্কুলে ভর্তি করা হ’ল, বলতে পারবো না। বাউড়িয়া স্টেশনে এসে, প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যেতে হ’ত। এখানকার স্কুল জীবন কিন্তু একবারে অন্য ঘরাণার। আমাদের সেকশনে অনেক ছেলেমেয়ে পড়তো। আজও তাদের কয়েকজনের কথা বেশ মনে পড়ে। স্বরূপ ঘোষ, মোহন পাল, বিরেন্দ্র নাথ আদক, স্মৃতিকণা আদক ইত্যাদি। বিরেন্দ্র নাথ ও স্মৃতিকণা ছিল দুই ভাইবোন। আমাদের সময় এখনকার মতো সেইসব শব্দ ব্যবহার হ’ত না, যার অর্থ বোঝা গেলেও, বাংলা শব্দকোষে খুঁজে পাওয়া যায় না। একমাত্র এই বিরেন্দ্রই যেসব শব্দ ব্যবহার করতো, তার অধিকাংশের অর্থ, সেই সময় বুঝতাম না। আর একটি মেয়ে আমার সাথে পড়তো, তার নাম পূর্ণিমা চ্যাটার্জী। কথায় কথায় সে আমাদের গুন্ডা বলতো। আমার মেজদি, যাকে আমরা ছোড়দি বলে ডাকি, হাওড়া বাকসাড়ায় থাকে। তার সাথে নাকি বেশ কয়েক বছর আগে পূর্ণিমার আলাপ হয়। পূর্ণিমাও তখন বাকসাড়ায় থাকতো। পূর্ণিমাকে আমার কথা বলায়, সে নাকি অবাক হয়ে বলে, তার মতো কালো কুৎসিত মেয়ের নাম আমি কী ভাবে পূর্ণিমা রাখলাম। আমার কিন্তু আজও মনে পড়ে, তার গায়ের রঙ কালো হলেও, কুৎসিত সে মোটেই ছিল না। আর যতদুর মনে পড়ে, তার নাম পূর্ণিমাই ছিল, অন্তত আমরা তাকে সেই নামেই চিনতাম বা ডাকতাম। সে পূর্ণিমা হয়েই আমার স্মৃতিতে থাক।

স্কুলে আমার সব থেকে কাছের বন্ধু ছিল স্বরূপ। তার সাথে গঙ্গাফড়িং বিনিময় হ’ত। কিছুদিন পর থেকে তার জেঠতুতো না খুড়তুতো ভাই, অরূপ এসে ক্লাশে জুটলো। সে সম্ভবত খুব বড়লোকের সন্তান ছিল। তার জামা প্যান্টের কায়দাই ছিল আলাদা। তাদের বাড়ি ছিল বাউড়িয়া স্টেশনের কাছেই। স্বরূপও সেই একই বাড়িতে থাকতো। একই বাড়ির দুই ভাইয়ের মধ্যে, চালচলনে কোন মিল খুঁজে পেতাম না।

স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে, রবি ঘোষ ও সাধু বাবুর কথা আজও বিশেষ করে মনে পড়ে। এ ছাড়া এক মৌলবী সাহেব পড়াতেন। তাঁকে নিয়ে আমাদের বেশ সময় কাটতো। অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প বলে, ছেলেদের হাতে রাখতে তিনি খুব পারদর্শী ছিলেন। রবি ঘোষ ও সাধু বাবুর কথা, আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জল হয়ে আছে। আছে তার যথেষ্ট কারণও আছে।

একদিন স্কুল চলা কালীন, আমার বই এর মধ্যে একটা সাদা কাগজ পেলাম। তাতে হাতে লেখা কোন দেবদেবীর মহিমার বিবরণ লেখা ছিল। আর ছিল ঐ লেখা কপি করে দশজনকে বিলি করার নির্দেশ। আগে এই লেখা বিলি করে, কে কী পেয়েছে, এবং বিলি না করায় কে কিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তার বিবরণও ফলাও করে লেখা ছিল। ঠাকুর দেবতার প্রতি আমার কোন দিনই আস্থা নেই, তবু সেই বয়সে ঐ কাগজ বিলি না করার মতো মনের জোর, আমার ছিল না। ঐ দেব বা দেবী কিন্তু খুব দয়ালু ছিলেন। তখনও আমাদের দেশে জেরক্স প্রচলিত হয় নি বলে, মাত্র দশ কপি বিলি করার নির্দেশ দিয়েছেন। বাড়ি ফিরে চার-পাঁচটা কপি করে, পরদিন স্কুলে একজন নিরীহ গোছের সহপাঠীর (নামটা আজ আর মনে পড়ে না) ব্যাগে একটা কপি রেখে দিলাম। কিন্তু দু’চারজন ব্যাপারটা দেখে ফেলে। পরে সাধু বাবু ক্লাশে আসলে আমরা ব্যাগ থেকে বই খাতা বার করলাম। সেই ছেলেটা বই বার করতে গিয়ে কাগজটা হাতে পেয়ে, ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করলো। সাধু বাবু কান্নার কারণ জানতে চাওয়ায়, সে তাঁকে হাতের কাগজটা দেখালো। এই গর্হিত কাজ কে করেছে এই নিয়ে শ্রেণীকক্ষ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে, সাক্ষীরা আমার নাম বলে দেয়। হাতের লেখাও আমার। ফলে সাধু বাবু আমাকে এই অমার্জনীয় অপরাধের জন্য, বেশ কয়েক ঘা প্রহার করে, শ্রেণীকক্ষে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করলেন। আমি কিন্তু তাঁকে বোঝাতে পারলাম না যে, যে কারণে এই ছেলেটা কাঁদছে, যে কাগজ হাতে পেয়ে বিলি করার ভয় ও ঝামেলায়, ছেলেটা ভীত, সন্ত্রস্ত, গতকাল এই ঘরেই সেই একই কাগজ হাতে পেয়ে, সমবয়সী আমারও একই দশা হয়েছিল। নিজেকে বিপদ মুক্ত করতেই আমাকে অতগুলো কপি করতে হয়েছে, এবং দশজনের মধ্যে কেবল মাত্র একজনকে বিলি করেই, আজকের এই ঘটনা। কাগজের সেই দেব না দেবীকে কিন্তু আমার চরম বিপদের সময় পাশে পাওয়া গেল না।

এই বছরেই আমার বড়দিদির বিয়ে ঠিক হয়। ভাবী জামাইবাবু উলুবেড়িয়া হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। আমাদের কোয়ার্টার্সের কাছেই তুলসী নামে একটা ছেলে ছিল। তার ঠাকুরমা ছিলেন এলাকার গেজেট। সারাদিন এক অদ্ভুত সুরে ‘এই তু-উ-উ-উল-সী-ই-ই-ই-‘, বলে তিনি তুলসীকে ডাকতেন। অত ঘন ঘন কেন তাঁর তুলসীকে প্রয়োজন হ’ত ভগবান জানেন। যাহোক্, তিনি কিভাবে খবরটা পেয়ে সোজা আমাদের বাড়ি চলে এসে মা’কে জিজ্ঞাসা করলেন— “মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনলাম, জামাই কী করে”? মা বললেন, স্কুল মাষ্টার। শুনে তিনি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওমা ম্যাষ্টর? চাকরী করে না”? মা বললেন, প্রফেসারী করে। এবার তিনি আস্বস্থ হয়ে বললেন, “প্রেফেসার, তাই বল”। যাহোক, তুলসীর ঠাকুরমার আশীর্বাদে আমার বড়দিদির বিয়ে হয়ে গেল। জামাইবাবু ঈশপের গল্প, সীন্ধবাদ নাবিকের গল্প, ইত্যাদি খুব সুন্দর ভাবে বলতেন, আর আমি মুগ্ধ হয়ে ভাবতাম লোকটা কত পন্ডিত, কত গল্প জানে।

স্কুলে আমার থেকে তিন ক্লাশ উচুতে, দীপক কুমার দাস নামে একটা ছেলে পড়তো। আজও তার বাবার নামটা পর্যন্ত মনে আছে, যতীন্দ্র নাথ দাস। দীপক ফুলেশ্বরে থাকতো এবং আমাকে খুব ভালবাসতো। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে, বাউড়িয়া স্টেশনে সে দু’টো কাঠি আইসক্রীম কিনে, নিজে একটা নিয়ে অপরটা আমাকে দিল। ঐ বয়সে কাঠি আইসক্রীম খুবই লোভনীয় হলেও, বাড়িতে ঐ জাতীয় আইসক্রীম খাওয়ায় অনেক বাধা ছিল। কিন্তু সেদিন হঠাৎ কিরকম জেদ চেপে গেল, বাড়ির গুরুজনদের পথ অনুসরণ করে গম্ভীর গলায় জানালাম, “এই আইসক্রীম খেলে অসুখ করে, এই আইসক্রীম খাওয়াও ভাল নয়, এই আইসক্রীমটা খাব না”। দীপক আমাকে অনেক বোঝালো, অনেক অনুরোধ করলো, শেষে রেগে গিয়ে পাশের প্ল্যটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মালগাড়ির ওপর, দু’টো আইসক্রীমই ছুড়ে ফেলে দিল। মনটা হু হু করে উঠলো, কিন্তু তাকে বলতে পারলাম না, যে ওটা খাবার জন্য আমার ভীষণ লোভ হচ্ছিল।

দীপক তার বাগানের নানা ফল আমার জন্য নিয়ে আসতো। তার বাগানের কত আম যে সে আমার জন্য এনেছে, তার ইয়ত্তা নেই। মনে পড়ে গরমের সময় স্কুল বন্ধের দিনটার কথা। ঐ সময়টা আমার দিন বেশ কেটেছিল। গরমের ছুটি পড়ার আগের দিন সকালে, অর্থাৎ ভোরবেলা স্কুল বসতো। ফেরার পথে স্কুল থেকে হেঁটে হেঁটে বাড়ি এসেছিলাম। আসার পথে গুড়িগুড়ি আম পেরে নিয়ে এসে, থেঁতো করে নুন দিয়ে খেয়েছিলাম। মনে পড়ে, আমগুলোর অধিকাংশই এত ছোট ছিল, যে তাতে টক ভাব পর্যন্ত আসে নি।

আমার বড়দিদি পড়াশোনায় চিরকালই আমাদের সব ভাইবোনদের মধ্যে ভাল। একদিন সন্ধ্যাবেলা ছোড়দি অন্যান্য দিনের মতোই কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে এল। দিদির বোধহয় সামনে কোন পরীক্ষা ছিল। সে তার পড়া নিয়ে ব্যস্ত। ছোড়দির পিছন পিছন একটা অচেনা লোক দরজা দিয়ে ভিতরে উঠনে চলে এল। উঠনে মাদুরে বসে দিদি তার বইপত্রে ডুবে আছে। বাবা অনেক সময় স্টেশনের পিওন বা অন্য কারো হাতে চিরকুট দিয়ে, চা পাঠাতে বলতেন, পেনে কালি ভরে দিতে বলতেন, বা অন্য প্রয়োজনীয় কিছু চেয়ে পাঠাতেন। লোকটাকে দেখে দিদি তাকে বাবার পাঠানো কোন লোক ভেবে, কী প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করতে, ছোড়দি পিছন ফিরে লোকটাকে দেখে গটগট্ করে এগিয়ে গিয়ে, সপাটে তার গালে একটা বিরাশি সিক্কার চড় কষিয়ে দিল। আমার এই ছোড়দির চিরকালই খুব সাহস। লোকটা মক্ষম একটা চড় খেয়ে এবং আর সকলের চিৎকার চেঁচামিচিতে কিরকম ঘাবড়ে গিয়ে জানালো যে, সে পৌঁছে দিয়ে গেল, এবার চলে যাচ্ছে। তৎক্ষণাত সে হন্ হন্ করে স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। আমি ছুটে গিয়ে ঘটনাটা বাবাকে জানালাম। স্টেশন রুম থেকে বেড়িয়ে দেখি, লোকটা পাশের প্ল্যাটফর্মে যাবার জন্য এই প্ল্যাটফর্ম থেকে নামার চেষ্টা করছে। বাবাকে লোকটাকে দেখাতেই বাবা তার চুলের মুঠি ধরে টেনে, রেল লাইন থেকে প্ল্যাটফর্মে তুলে আনলেন। তারপর তাকে বেশ কয়েক ঘা দিয়ে, খুব ধমক ধামক দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হ’ল। পরে ছোড়দির কাছে জানা গেল, হাওড়া স্টেশন থেকেই সে ছোড়দির কামরায় উঠেছিল। মাঝেমাঝে বিভিন্ন স্টেশনে নেমে আবার ঐ কামরায় ওঠে। এইভাবে চেঙ্গাইলে এসে ছোড়দি ট্রেন থেকে নেমে ওভারব্রীজ পার হয়ে বাড়িতে আসে। অর্থাৎ লোকটাও চেঙ্গাইলে নেমে, পিছন পিছন উপস্থিত হয়েছিল।

বাবা ছিলেন ভীষণ রাগী। বাড়ির সকলে তাঁকে ভয় করতো। অথচ তাঁর মতো এত স্নেহপ্রবণ পিতা ক’জনের ভাগ্যে জোটে সন্দেহ আছে। একদিন সকলে ব্যাগ হাতে বাবার সাথে বাজারে যাচ্ছি। আমরা প্ল্যাটফর্মে উঠতেই, একটা ট্রেন এসে থামলো। বাবার এক সহকর্মী যাত্রীদের টিকিট সংগ্রহ করছিলেন। একটা লোক ট্রেন থেকে নেমে তাঁকে দেখেই, জোর পায়ে এগিয়ে যেতে শুরু করলো। টিকিট পরীক্ষক ভদ্রলোক লোকটাকে কয়েকবার ডেকে তার দিকে এগিয়ে যেতেই, সে আরও জোরে হাঁটতে শুরু করলো। ভদ্রলোক এবার বাবাকে ডেকে লোকটাকে ধরতে বললেন। বাবা তার কাছে টিকিট চাইতেই, সে ছুটতে শুরু করলো। আমি বাবাকে যতদুর চিনতাম, তাতে এটা বলতে পারি যে, সে যদি টিকিট কাটেনি স্বীকার করে তাকে ছেড়ে দিতে বলতো, তাহলে বাবা অবশ্যই তাকে কিছু বলতেন না। কিন্তু ঐ ভাবে ছুটে পালাতে দেখে বাবা কিরকম রেগে গেলেন এবং দু’চারবার তাকে দাঁড়াতে বলেও কথা না শোনায়, লোকটাকে তাড়া করলেন। প্ল্যাটফর্ম শেষ হয়ে ঢালু অংশে নামার সময় বাবার পায়ের চাপে তার এক পাটি জুতো খুলে গেল। সেই অবস্থায় এক পায়ে জুতো নিয়ে লোকটা কিছুটা পথ ছুটে গিয়ে পিছন ফিরে দেখে, বাবা তার জুতোর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বাবা তাকে কয়েকবার ডাকা সত্ত্বেও সে কাছে না আসায়, বাবা তার জুতোটা ছুঁড়ে পাশের রেলের ঝিলে ফেলে দিলেন। আমরা অনেকটা পথ এগিয়ে যাবার পর, পিছন ফিরে দেখি, লোকটা এক কোমর জলে দাঁড়িয়ে তার এক পাটি জুতো উদ্ধারে ব্যস্ত।

বাবার সাথে বাজার করতে যেতে বেশ ভালো লাগতো। তবে ব্যাপারটা ছিল খুবই কষ্টকর। বাবার বাজার করার একটা নেশা ছিল। কোন্ জিনিসটা ভালো কোনটা ভালো নয়, কোন সবজি ভালো কিনা কিভাবে বুঝতে হয়, তিনি খুব ভালো বুঝতেন। আমাদের শেখাবার চেষ্টাও যথেষ্টই করেছিলেন। কিন্তু আজও আমরা কোন ভাইবোনই সেটা শিখে উঠতে পারি নি। হয়তো সেভাবে শেখার চেষ্টাও করি নি, বা শেখার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করি নি। প্রচন্ড অর্থকষ্টে আমাদের দিন কাটতো। তবে ঐ অর্থাভাবের জন্য আমাদের আহারটা প্রায়শঃই বেশ রাজকীয় হ’ত। শুনতে অধ্ভুত লাগলেও, ঘটনাটা সত্যি। মাসের প্রথম সপ্তাহের পর থেকেই টাকা পয়সার অভাব দেখা দিত। তার অনেক কারণও ছিল, যথা সময় বলা যাবে। আর এ অর্থাভাবের সময়েই আমাদের অতিপ্রিয় খাসির মাংস ভাত খাবার দিন আসতো। বাজারে একটা মাংসের দোকান ছিল। দোকানের মালিক বাবাকে মাষ্টারবাবু বলতো। সে বাবাকে জোর করে মাংস চাপাতো। এক কিলোগ্রাম মাংস চাইলে, সে দেড়-দুই কিলোগ্রামের কম কিছুতেই দিত ন। এইভাবে মাস শেষ হলে, তার প্রাপ্য মেটাতেই আবার অর্থাভাব, ফলে আবার খাসির মাংস ভাত।

একটা দিনের কথা বেশ মনে পড়ে। বাবার সাথে বাজারে গিয়ে মাংস কিনে মহানন্দে ফেরার পথে একটা মিষ্টির দোকান থেকে এক ভাঁড় টক দই কিনে ফিরছি। আমার হাতে দই এর ভাঁড়। বাবার হাতে বাজারের ব্যাগ। রেল লাইনের পাশ দিয়ে আমরা বাসায় ফিরছি। হঠাৎ কিছু বোঝার আগেই আমার হাতের দই এর ভাঁড়, ছিটকে গিয়ে পাশের জঙ্গলে পড়লো। হতভম্ব ভাব কাটলে বুঝতে পারলাম, একটা চিল ছোঁ মেরে আমার হাতের দই এর ভাঁড় নেবার চেষ্টা করেছিল।

বাবা ছিলেন খুব খাদ্য রসিক। মা সারাদিন রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। মোচা, ডুমুর জাতীয় ঝামেলার পদ প্রায়ই করতে হ’ত। বাবা নিজে অবশ্য মা’কে অনেক সাহায্য করতেন। অদ্ভুত অদ্ভুত সব রান্নার প্রক্রিয়া তাঁর মাথায় আসতো। নিজেও মাঝে মধ্যে এক আধটা পদ রান্না করতেন। তবে অধিকাংশ সময়েই তাঁর সাহায্য, মা’র খাটুনি বৃদ্ধি ও ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়াতো। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিস্কার হবে। নারকেল কোড়া দিয়ে নারকেল নাড়ু করলে ছিবড়ে থেকে যায়, ফলে খেতে তত ভাল লাগে না। তাই নারকেল কুড়িয়ে, শিলে বেটে তবে নারকেল নাড়ু হবে। আর এই গোটা অধ্যায়টা তিনি নিজেই সামলাতেন। মা’র কষ্ট লাঘব করতে, সমস্ত কাজ নিজেই করতেন। কিন্তু তারপর শিল পরিস্কার, রান্নাঘর পরিস্কার, হাজারো বাসন পরিস্কার, মায় কড়াইয়ের পিছনের কালি পরিস্কার পর্যন্ত মা’কে অন্যান্য কাজের শেষে করতে হ’ত।

বুড়িখালি স্কুলের জীবনটাও কম আনন্দের ছিল না। রবিবাবু আর সাধুবাবুর পড়া ধরার অধ্যায়টা ছাড়া, আর সব ছিল সুখের। সে সময় গাছপালাও ছিল অনেক। ফাঁকা মাঠঘাটের অভাবও ছিল না। স্কুল যাবার পথে রাস্তার পাশে বিস্তীর্ণ জমিতে কড়াইশুটি চাষ হ’ত। কড়াইয়ে দানা আসার আগেই, আমাদের কড়াইশুটি খাবার ধুম লেগে যেত। চাষের খেতে নেমে কড়াইশুটি তুলতে গেলে চাষীরা হৈ চৈ করে তাড়া করে আসতো। ফলে হাতে খুব অল্প সময় পাওয়ায়, একটা একটা করে বেছে বেছে কড়াইশুটি তোলার সময় পাওয়া যেত না। ফলে চাষীদের ক্ষতিই বেশী হ’ত। একসাথে জড়ো করে মুঠোয় ধরে অনেক গাছ একসাথে উপড়ে নিয়ে ছুটে পালাতে হ’ত। কিন্তু পরে দেখা যেত অত গাছে কড়াইশুটির সংখ্যা নিতান্তই কম, এবং তার মধ্যে আবার অধিকাংশই দানাহীন কড়াই। কথায় বলে নিজের ভাল পাগলেও বোঝে। চাষীরা নিজেদের ভাল না বুঝলে, না চাইলে, আমরা আর কী-ই বা করতে পারতাম?

স্কুলের আশপাশে কোথায় আঁশফল, কোথায় জামরুল, কোথায় গাব বা ফলসা গাছ আছে, তা আমাদের হাতের তালুর মতো পরিচিত ছিল। ঐ বয়সে মনে হ’ত, পাকা গাবের মতো সুস্বাদু ফল, দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়টি নেই। বাউরিয়া স্টেশনের কাছে একটা খালের মতো ছিল। জল খুব অল্প হলেও, পাঁক ছিল প্রচুর। খালের ঠিক পাশেই একটা বেশ বড় গাব গাছ ছিল। গাছটার ডালপালা খালের দিকে বেঁকে থাকায়, গাছে উঠলে আমাদের ঠিক নীচেই খালটা থাকতো। ঐ গাছে আমরা একসাথে অনেক ছেলে উঠে পাকা গাবের সন্ধান করতাম। কিন্তু ছেলেদের সংখ্যার তুলনায়, পাকা গাবের সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। ছোট ছোট অনেক গাব হ’ত বটে, কিন্তু সেগুলো বড় হয়ে পাকার সুযোগ পেত না। একদিন একটা ছেলে, ঐ গাছ থেকে খালে পড়ে মারা যায়। যদিও সে আমাদের স্কুলের ছাত্র ছিল না, বা আমাদের পরিচিতও ছিল না, কিন্তু তারপর থেকে গাছটার চারপাশে কাঁটা গাছপালা ফেলে, আমাদের গাছে ওঠার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে, গাব খেতে কত উপাদেয়, এ কথা আমার মুখে বহুবার শুনে, বাবা একদিন বাজার থেকে একটা পাকা গাব কিনে এনেছিলেন। আমি তখন চাকরী করি। সেটা মুখে দিয়ে নিজেই অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে, যে এই ফলটা মানুষ খায় কী করে? অথচ তখন এটাকেই অমৃত জ্ঞান করতাম। আর একটা ফল আমরা খুব খেতাম, কয়েতবেল। স্কুল যাবার রাস্তার দু’পাশেই, অনেক কয়েতবেল গাছ ছিল। ফলনও হ’ত যথেষ্ট। কিন্তু পাছে অন্য কেউ তুলে নিয়ে যায়, এই ভয়ে প্রায় ভ্রুণ অবস্থায় কয়েতবেলগুলো গাছ থেকে পেড়ে নিতাম। ফলে সুস্বাদু কয়েতবেল পাওয়ার সুযোগ প্রায় ছিলই না। যদিও আমরা ছাড়া আর কাউকে কয়েতবেল পাড়তে কখনও দেখি নি।

এইভাবে একদিন বার্ষিক পরীক্ষা শেষে আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠলাম। নতুন নতুন বই হ’ল। নতুন বই কিনে দেবার ক্ষমতা বাবার ছিল না। আমরা অনেক ভাইবোন, সকলের পড়াশোনার খরচ চালাতে, বাবা হিমশিম খেতেন। তাছাড়া তখন একটা রেওয়াজ ছিল, সেকেন্ড হ্যান্ড বই কেনা। বেশীর ভাগ ছেলেমেয়েই নতুন শ্রেণীতে উঠে, ওপরের শ্রেণীর কোন ছেলে বা মেয়ের কাছ থেকে তার বইগুলো অর্ধেক দামে কিনে নিত। আর তারা নিজেরাও পুরাতন বই অর্ধেক দামে বেচে দিয়ে, তাদের নিজেদের নতুন শ্রেণীর বই একই প্রথায়, ওপরের শ্রেণীর কোন ছেলে বা মেয়ের কাছ থেকে, অর্ধেক দামেই কিনে নিত। এইভাবে প্রতিটি বই-ই বেশ কয়েকবার হাত ফেরি হ’ত। কিন্তু সেকেন্ড হ্যান্ড বই কখনও থার্ড, ফোর্থ, বা ফিফথ্ হ্যান্ড হিসাবে গণ্য হ’ত না, এবং বইয়ের দাম সব সময়েই বই এর আসল দামের অর্ধেকই থাকতো। এখনকার মতো তখন বই নিয়ে প্রকাশক, স্কুল, বা প্রশাসনের মধ্যে পার্টনারশীপ ব্যবসা চালু না থাকায়, বছর বছর বই পরিবর্তন করার রেওয়াজ একেবারেই ছিল না।

মনে পড়ে বইগুলোর পাতায় কত কী যে লেখা থাকতো। বই এর পাতায় কবিতার ছন্দে লেখা— “এই বই যেইজন করিবে হরণ, ভগবানের হাতে হবে নিশ্চিত মরণ”। খাসা কবিতা, তবে কবির পরিচয় আজও জানা হ’ল না। আবার কোন বই এর পাতায় লেখা— বই এর মালিককে চিনতে হলে ১২ পৃষ্ঠা খুলুন। ১২ পৃষ্ঠা খুলে দেখা গেল লেখা আছে— আমাকে চিনতে হলে ৫৫ পৃষ্ঠা খুলুন। ৫৫ পৃষ্ঠায় লেখা আছে— আমাকে চিনতে হলে ২১ পৃষ্ঠা খুলুন। এইভাবে বহুবার বিপুল আগ্রহে বই এর মালিকের নির্দেশ মতো সামনে পিছনে পাতা উল্টিয়ে দেখা গেল তার নাম লেখা আছে। বইটা এত পুরানো, যে খোঁজ নিলে দেখা যাবে সে হয়তো আমার বাবা বা কাকার ক্লাশমেট ছিল।

আমাদের বাড়িতে পূজাআর্চার চল, কোন কালেই ছিল না, আজও নেই। মা’কে দেখেছি এক জায়গায় কতগুলো ঠাকুর-দেবতার বাঁধানো ছবি রাখতে। ঠাকুর দেবতাদের অবস্থাও আমাদের মতোই অসচ্ছল ছিল। সামান্য ফুল বাতাসা ছাড়া, তাঁদের তেমন কিছুই জোটেনি। লক্ষীপূজার দিন আমাদের বাড়ির একটা সিঁদুর মাখা, রঙচটা লক্ষীনারায়ণের বাঁধানো ফটো কাকার বাড়ি নিয়ে যাওয়া হ’ত। কাকার অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভাল ছিল। ঠাকুরমা সেখানেই থাকতেন। কাকার বাড়িতে খুব ধুমধাম করে লক্ষীপূজা হ’ত। আমাদের হতশ্রী, হতদরিদ্র লক্ষীনারায়ণ, সেই পূজার জায়গায় বি ক্লাশ সিটিজেনের মর্যাদায়, একপাশে বসবার অধিকার পেতেন। বড়লোক মেয়ে জামাই আর দরিদ্র ঘরজামাই ও মেয়ে, জামাই ষষ্ঠিতে একই শ্বশুর বাড়িতে, যে ধরণের বৈষম্যমুলক খাতির যত্ন পায়, এই দুই লক্ষীনারায়ণ যুগলও সেই ধরণের খাতির যত্ন পেতেন। ফলে তাঁদের কৃপাদৃষ্টি, তাঁদের আনুকুল্য, আমাদের ভাগ্যে তেমন জোটেনি। লক্ষী সারা জীবন মুখ ঘুরিয়েই থেকেছেন, নারায়ণ কী উপকারে লাগেন জানিনা, তবে আমাদের জন্য তিনি কিছুই করেন নি। তাঁকে দোষ দেওয়াও যায় না। তাঁর প্রতি আমার ব্যবহার, তাঁকে হয়তো আমাদের সুনজরে দেখা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেছিল। সেকথা সময়, সুযোগ থাকলে পরে বলা যাবে। সরস্বতী বোধহয় কিছুদিন আশায় আশায় থেকেছিলেন। তাই বাবা ও বড়দিদিকে তাঁর ভান্ডার থেকে যথেষ্ট ত্রাণ সামগ্রী উজাড় করে দিতে, কার্পণ্য করেন নি। তবে সেটা যে সরস্বতীরই দান, সে কথা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারবো ন। কারণ এই দু’জনেই ছিলেন ইংরাজী ভাষায় পারদর্শী।

প্রতি বছর মা শিবরাত্রির দিন নির্জলা উপোষ করে, সন্ধ্যাবেলা পূজা শেষে একজন ব্রাহ্মণকে কিছু না খাইয়ে, নিজে জল পর্যন্ত খেতেন না। আমাদের কোয়ার্টার্সের কাছেই ল্যাডলো ও আরও দু’-একটা জুট মিল ছিল। তখনও জুট মিলগুলোর অবস্থা বেশ ভালই ছিল। জুট মিলগুলোকে কানোরিয়া জুট মিলের মতো যুদ্ধ করে অস্তিত্ব বজায় রাখতে হ’ত না। ল্যাডলো জুট মিলের ভেতর একটা ফাঁকা মাঠের মধ্যে একটা শিব মন্দির ছিল। শিবরাত্রির সন্ধ্যায় মা সেখানে শিবের মাথায় ফুল, দুধ, জল, বেলপাতা দিতে যেতেন। সারাদিন ঘেঁটু, আকন্দ ইত্যাদি মূল্যবান ফুল, মাঠঘাট থেকে তুলে এনে, আমি নিজেকে বেশ সাবালক সাবালক ভেবে আনন্দ পেতাম। মা’র সাথে আমিও মন্দিরে যেতাম। যে দুধ শিশুর খাদ্য, রোগীর পথ্য, সেই দুধ মাথায় ঢালা হলে শিবের যে কী আনন্দ হ’ত জানিনা, তবে মা’র সাথে সেখানে যাবার আমার আনন্দের কারণ ছিল অন্য। মিলের ভেতর ছোট ছোট লাইন পাতা ছিল। তার ওপর দিয়ে ছোট ছোট ট্রলিতে ঠেলে ঠেলে মাল বয়ে নিয়ে যাওয়া হ’ত। ওগুলো জোরে ঠেলে নিয়ে গিয়ে তার ওপর চাপাটাই ছিল, ওখানে যাওয়ার মূল আকর্ষণ। অন্যান্য দিনেও এই আনন্দ উপভোগ করতে ওখানে যেতাম, এবং ট্রাম লাইনের মতো লোহার রড দিয়ে লাইন পরিবর্তন করতে গিয়ে, ট্রলিকে বেলাইন করে বাড়ি ফিরতাম। তাছাড়া মাঠের ধারে কলকে ও বাসক্ ফুলের গাছ থেকে ফুল তুলে মধু খাওয়াও ছিল, জায়গাটার প্রতি আকর্ষণের আর একটা কারণ। সুযোগ পেলেই সেখানে যাওয়া ছিল আমাদের একটা আনন্দের ব্যাপার। বাসক্ ফুলের মধুর গুনেই হয়তো এই বয়সেও সর্দিকাশির ধাত শরীরে প্রবেশ করতে পারে নি। আজও শীতকালে গরম জামা না পরে দিব্যি ভালই থাকি। বর্ষায় বৃষ্টির জলে ভিজেও কোন অসুবিধা হয় না।

দোলের দিনটা আমাদের সুখ-দুঃখে ভালই কাটতো। বাবা বালতিতে রং গুলে দিতেন। পিচকিরি কোনদিন কপালে জোটেনি। আজকালকার মতো তখন প্লাষ্টিক, পলিথিনের প্রচলন ছিল না। পিচকিরি বলতে পিতলের, কিছু টিনের বা লোহারও পাওয়া যেত। কিন্তু সেগুলো আমরা কোনদিন ব্যবহার করার সুযোগ পাই নি। ছোট ছোট কাঁসার গ্লাশ দিয়ে রং খেলতাম। কিন্তু এই রং খেলায় প্রধান অন্তরায় ছিল ধর্মীয় বাধা। চেঙ্গাইলে মুসলমান সম্প্রদায়ের অনেক লোক বাস করতো। রং দেওয়ার সময় কে হিন্দু, কে মুসলমান চেনা সম্ভব হ’ত না। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে হিন্দু বেছে বেছে রং খেলাও বাস্তবে সম্ভব হ’ত না। ফলে মুসলমানের গায়ে রং দেওয়া নিয়ে প্রতিবার অশান্তি হ’ত। এই কারণে বাবার কাছে বকুনি এমন কী মার খেতেও হয়েছে। বাবার এক সহকর্মী ছিলেন, নাম মনে নেই, তবে তাঁর পদবী ছিল দেব। আমরা তাঁকে দেব কাকাবাবু বলে ডাকতাম। অবিবাহিত ভদ্রলোক, আমাদের খুব স্নেহ করতেন। তিনি তাঁর কোয়ার্টার্সের উঠনের নালা বন্ধ করে দিয়ে, প্রচুর রং ঢেলে আমাদের ভেজাতেন। তাঁকে অবশ্য খুব বেশী পরিশ্রম করতে হ’ত না। আমরাই সেচ্ছায় জমা রঙে গড়াগড়ি খেতাম। একটু বেলায় বাবা আমাদের নিয়ে পাশের পুকুরে গিয়ে সাবান দিয়ে শরীরের রং তুলে দিতেন। সন্ধ্যায় বাবার আর এক সহকর্মী, সিং কাকাবাবু স্টেশনের সকলকে সপরিবারে নিমন্ত্রন করতেন। তাঁর কোয়ার্টার্সে খেতে যাওয়া ছিল, সবার কাছেই এক বিভীষিকা। অখাদ্য পুরি, লিট্টি, টক আচার ইত্যাদি খেতে দিতেন। আমরা কায়দা করে নিয়ে এসে ফেলে দিতাম।

আগেই বলেছি, আমাদের কোয়ার্টার্সের পাশেই একটা বেশ বড় পুকুর ছিল। শুনতাম ওটা রেলের পুকুর। রেলের জমিতে পুকুর, না রেল পুকুরটা লিজ্ নিয়েছিল, বলতে পারবো না। বোধহয় চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার সময়, ঐ পুকুরে সাঁতার শিখেছিলাম। মাঝেমাঝে ঐ পুকুরে জাল দিয়ে মাছ ধরা হ’ত। একদিন পুকুর পাড়ে একটা বড় মাছকে ঘোরাফেরা করতে দেখলাম। সেদিন সকালে পুকুরে জাল ফেলা হয়েছিল। মাছটা হয় অসুস্থ, না হয় কোনভাবে আঘাত পেয়েছিল। মাছটা একবারে পাড়ের কাছে মুখ উচু করে খাবি খাচ্ছিল। আমি আস্তে আস্তে জলের কাছে গিয়ে, মাছটাকে ধরে ফেললাম। মাছটা গভীর জলে পালাবার চেষ্টা শুরু করলো। পুকুরের জলে বড় মাছের শক্তি যে কত হতে পারে, সেদিন ঐ আধমরা মাছ ধরেই বুঝেছিলাম। মাছটাকে কিছুতেই ডাঙ্গায় তুলে আনতে পারছিলাম না। ক্রমে তার টানে আমিই জলে নামতে শুরু করলাম। মাছটা অসুস্থ বা আঘাতপ্রাপ্ত বলেই বোধহয়, আমার হাত ছাড়িয়ে পালাতেও পারছিল না। শেষে মাছ সমেত জলে হাবুডুবু খেয়ে, প্রচুর জল খেয়ে ফেললাম। অবশেষে কাশতে কাশতে মাছটাকে নিয়ে ডাঙ্গায় উঠে আসতে সক্ষম হলাম। বাবা এইভাবে অত বড় মাছ ধরার কথা শুনে খুব ভয় পেয়ে গেলেন। যদিও মাছটাকে দেখে বেশ খুশীও হলেন। যাহোক্, তিনি আমাকে মাছটা স্টেশনে দিয়ে আসতে বললেন। আমিও বীরের মতো হাবভাব নিয়ে মাছটা স্টেশনে দিয়ে আসলাম। আমার বীরত্বের কাহিনী শুনে, স্টেশনের সকলে আমার সাহসের খুব প্রশংসাও করলেন। শুনলাম ঐ মাছ দিয়ে চপ্ তৈরী হবে। মাছের চপ্ তৈরীর মশলাও মা’কেই শিলে পিষে তৈরী করে পাঠাতে হ’ল। কার বাড়িতে চপ্ তৈরী হয়েছিল মনে নেই, তবে সে চপের একটাও আমার কপালে জোটে নি।

পরবর্তী  অংশ  দ্বিতীয় পর্বে………….

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s