স্মৃতি (পঞ্চম পর্ব)

Self এই সন্তুর সাথে আমার বন্ধুত্ব বিচ্ছেদ হয়, ক্ষুদি নামে একটা ছেলের জন্য। একজনের কথা বলতে গেলে, আর একজনের কথা এসেই পড়ে। কিন্তু কতজনের কথা আর লেখা যায়? এ জীবনে তো কম লোকের সংস্পর্শে আসলাম না। আগেই বলেছি, এই সন্তুর সাথে একদিন কথা না বলে, দেখা না করে, থাকতে পারতাম না। কিন্তু ধীরে ধীরে কিভাবে যেন ওর সাথে ক্ষুদির বন্ধুত্ব গাঢ় হতে লাগলো। অনেকটা ত্রিকোণ প্রেমের মতো।

এখানে ক্ষুদির একটু পরিচয় দেওয়া দরকার। ওর বাবা রাজ্য সরকারের কর্মী ছিলেন। অল্প আয়। ওরা বোধহয় তিন ভাই ছিল। ক্ষুদির কিন্তু পোশাক পরিচ্ছদের খুব বাহার ছিল। খুব স্টাইল করে চুল কাটতো, যেটা সেই সময় বিশেষ চল্ ছিলনা। পড়াশোনার সাথে প্রায় কোন সম্পর্কই ছিলনা। যদিও সে আমাদেরই সমবয়সী, তবু অনেক নীচু শ্রেণীতে নামকা ওয়াস্তে পড়াশোনা করতো। খুব ভালো ক্রিকেট খেলতো। ওর মতো স্পিন বল করতে, ঐ বয়সে কাউকে দেখি নি। ওর হবি ছিল স্বামী কাপুরের সিনেমা দেখা, আর সারাদিন স্বামী কাপুর অভিনীত সিনেমার গান গাওয়া। এখনকার মতো সি.ডি. বা ক্যাসেটের যুগ তখন ছিল না। কোন পিকনিক্ হলে, কী রান্না হবে, কতজন অংশ গ্রহন করবে, কে বাজার করবে, কে রান্না করবে, এসব নিয়ে ওর বিন্দুমাত্র চিন্তাও ছিলনা, আগ্রহও ছিলনা। ওর একমাত্র আগ্রহ ছিল, পিকনিকে মাইক বাজানোতে। ও নিজেই সকাল সকাল মাইক ভাড়া করে নিয়ে এসে, উচ্চৈঃস্বরে গান বাজাতে শুরু করে দিত। কয়েকটা রেকর্ড বাজানোর পরপরই, পিন বদল করতে হ’ত। তখন অনেকে আবার ওটাকে কলের গান বলতো। যদিও যতদুর জানি, কলের গান যাকে বলে, ওটা ঠিক তা নয়। যাহোক্, যন্ত্রের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দম দিয়ে রেকর্ড বজানো হ’ত। বড় বড় রেকর্ড যতগুলো নিয়ে আসতো, তা প্রায় সমস্তই হিন্দী গান, আর তার অধিকাংশই স্বামী কাপুরের ছবির গান। অসম্ভব জোরে মাইক বাজিয়ে, ও প্লেয়ারের সামনে বসে থাকতো। কাউকে একটু হাত দিতে পর্যন্ত দিতে দিত না। পিকনিকে কী কী রান্না হয়েছে, তা নিয়ে ওর বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা ছিল না।। খেতে যাওয়ার ইচ্ছাটুকু পর্যন্ত লক্ষ্য করতাম না। আধঘন্টা সময় খাওয়ার জন্য নষ্ট না করে, ঐ সময়ে আট-দশটা গান বাজানোতে, ও অনেক বেশী আনন্দ পেত। কিন্তু এই মাইক বাজানো আর ক্রিকেট খেলা ছাড়া, আর কোন গুণ ওর মধ্যে ছিলনা। ভালো সাঁতার কাটতে পারতো না, গাছে চড়তে পারতো না, সাইকেল চালাতে পারতো না। একটা মস্তান মস্তান ভাব তার মধ্যে ছিল। পয়সা কড়ি নিয়ে মাঝে মাঝেই তার বাবার ওপরেও মস্তানী করতো। তবে আবার স্বীকার করছি, তার একটা গুণ সত্যিই ছিল। ক্র্রিকেট খেলায় সে অসম্ভব ভাল স্পিন বল করতে পারতো। ঠিকমতো প্রশিক্ষণ পেলে, হয়তো তার  জীবনটা অন্যরকম হলেও হতে পারতো। কিন্তু সে সুযোগ সে পায়ও নি, আর সে ইচ্ছাও তার মধ্যে ছিল না। তবু সে আমার খেলার সঙ্গী ছিল, জীবনের কয়েকটা বছর তো সে আমাদের সঙ্গেই সময় কাটিয়েছে, তাকেই বা ভুলি কেমন করে?

একবার সলিল নামে একটা ছেলেকে, প্রায়ই শিবু নামে দাদার এক বন্ধুর বাড়িতে, যাওয়া আসা করতে দেখা গেল। শিবুর ভাইপো রঘু আমার থেকে এক শ্রেণী ওপরে, একই স্কুলে পড়তো। পড়াশোনায় সে খুবই ভালো ছিল। রঘুর বাবা, অর্থাৎ শিবুর দাদা মেদিনীপুর জেলার কোন একটি স্কুলের হেডমাষ্টার ছিলেন। ডবল্ এম.এ., বি.টি. পাশ করা এই ভদ্রলোক ছিলেন হাফ্ পাগল। যাহোক্ সলিলকে হঠাৎ এই ঘন ঘন আসা যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে, সে এড়িয়ে যেত। কিন্তু তার যাতায়াত ক্রমশঃ বাড়তে লাগলো, এবং শিবু বা তার বাড়ির লোকেদের সাথে কথাবার্তাও ক্রমশঃ উত্তেজক হতে লাগলো। শেষে একদিন সলিল আমাদের জানালো যে, তাকে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেবার ব্যবস্থা করার জন্য, শিবু তার কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা (পাঁচ’শ না এক হাজার কত যেন বলেছিল, এতদিন পরে ঠিক মনে পড়ছে না) নিয়েছিল। শিবু তাকে বলেছিল যে বোর্ডে তাদের যথেষ্ট হাত আছে, কাজেই সে তাকে পাশ করিয়ে দেবার ব্যবস্থা করে দেবে। আসলে সলিল এর আগে একবার না দু’বার ফেল করেছে, এবং সে নিজেও জানে যে নিজের বুদ্ধিতে পাশ করার আশা অতি ক্ষীণ। শিবু ভেবেছিল, সলিল নিজের বুদ্ধিতেই এবার পাশ করে যাবে এবং তাহলে টাকাটা তার হয়ে যাবে। কিন্তু সলিল যথারীতি এবারও ফেল করেছে।

ঠিক এই সময়, শিবু একটা নতুন রিষ্টওয়াচ হাতে পরে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছিল। ঘটনাটা শোনার পর আমাদের বদ্ধ ধারণা হ’ল, শিবু সলিলের টাকায় ঘড়িটা কিনেছে। এরপর থেকে শিবুকে দেখলেই, আমরা ক’টা বেজেছে জানতে চাইতাম। প্রথম প্রথম সময় জানতে চাইলে, সে ক’টা বেজেছে জানাতো। কিন্তু পরে যখন সে দেখলো, একজন সময় জিজ্ঞাসা করার পর, এক হাত দুরে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয়জন আবার সময় জানতে চাইছে, বা আমাদের দলের যার সাথে ওর যখন যেখানেই দেখা হয়, সেই সময় জানতে চায়, তখন সে আমাদের বাড়িতে নালিশ করবে, দেখে নেবে, ইত্যাদি বলে ভয় দেখাবার চেষ্টা করলো। আমরাও অন্য পন্থা ধরলাম। খবরের কাগজ থেকে অক্ষর কেটে কেটে, আঠা দিয়ে একটা সাদা কাগজে লাগিয়ে, শিবুকে সাবধান বাণী পাঠাতে লাগলাম। বেশ মনে আছে, তখন “শিকার” নামে একটা সিনেমার বিজ্ঞাপন রোজ খবরের কাগজে ছাপা হ’ত। শিকারের শি-টা কেটে, অন্য জায়গা থেকে বু কেটে, আঠা দিয়ে সাদা কাগজে পরপর লাগিয়ে, “শিবু সাবধান” বা “শিবু টাকা ফেরৎ দে”, ইত্যাদি লিখে, তার বাড়ির জানালা  দিয়ে ফেলে দেওয়া হ’ত। একদিন এক বৃষ্টির দিনে, শিবুর সাথে আমাদের বেশ তর্কাতর্কি এবং শেষে ক্ষুদির সাথে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে গেল। কিন্তু সেদিন আমরা সবাই এক বলিষ্ঠ চরিত্রের মানুষকে প্রত্যক্ষ করলাম। সে আর কেউ নয়, স্বয়ং সলিল। তার টাকা ফেরৎ দেবার জন্য শিবুর সাথে এত গন্ডগোল, এমনকি হাতাহাতি হয়ে যাবার পরে, সলিল ওখানে দাঁড়িয়ে শিবুকে টাকা দেবার ব্যাপারটা বেমালুম অস্বীকার করলো। পরে সে আর টাকা ফেরৎ পেয়েছিল কিনা জানিনা, জানিনা সলিল আদৌ কোনদিন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় পাশ করতে পেরেছিল কিনা। শধু জানি, সে কংগ্র্রেসী করতো এবং সেই সুবাদে একটা প্র্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা ম্যানেজ করেও নিয়েছিল। এখন শুনতে পাই যে, সে প্রাইমারী স্কুলের হেড মাষ্টার হয়েছে এবং দেশের সবথেকে বড় রাজনৈতিক দল, কংগ্রেসের একজন বড় নেতাও নাকি হয়েছে। হায় রে! শ’য়ে শ’য়ে, হাজারে হাজারে, দেশের ভবিষ্যৎ শিশুরা, সলিলের কাছে প্র্রারম্ভিক শিক্ষা নিয়ে বড় হচ্ছে। এ পোড়া দেশে এর থেকে ভাল আর কী আশা করা যায়? ভারত মাতার কপাল নিতান্তই খারাপ, পরাধীন অবস্থায় সলিলের মতো নেতারা এ দেশে জন্মায় নি, তা নাহলে দেশ কবে শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে, কবিতায় নয়, বাস্তবে “ভারত আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে” হ’ত। বেচারা ক্ষুদি খুবই অল্প বয়সে, এ পৃথিবী ছেড়ে অনেক দুরে চলে গেছে। যোগাযোগের অভাবে খবরটা পেয়েছিলাম অনেক পরে, তাকে শেষ দেখা দেখতে যাওয়ার সুযোগ পর্যন্ত পাই নি।

আমরা কয়েকজন স্কুল ছুটির পর, সন্ধ্যাবেলা হীরেণ বাবুর বাসায় গিয়ে ইংরাজী পড়তাম। হীরেণ বাবু আমাদের স্কুলেরই শিক্ষক। তিনি ছিলেন অবিবাহিত। স্কুলের পাশেই বাড়ি ভাড়া নিয়ে একাই থাকতেন। তিনি অত্যন্ত সরল ও সাধারণ জীবন যাপন করতেন। হাওয়াই চটি বা ছেঁড়া চটি, নোংরা ধুতি ও অপরিস্কার জামা পরে স্কুলে আসতেন। তিনি একটু খিটখিটে স্বভাবের লোক ছিলেন, রেগে গেলে দাঁত কিড়মিড় করতেন। ছাত্রদের কান মলে দেওয়া, চিমটি কাটা, প্রয়োজনে বেত্রাঘাতও করতেন। একবার রাগের মাথায় এক ছাত্রকে শুয়োরের বাচ্ছা বলে ফেলে খুব ঝামেলায় পড়েছিলেন। পরে ঝামেলা বাড়লে তিনি ছাত্রটিকে খুব মিষ্টি সুরে বলেছিলেন, আমি তোকে শুয়োরের বাচ্ছা বলেছি নাকি? আমি তো তোকে বাচ্ছা শুয়োর বলেছি।

তাঁর বাসায় পড়তে যাবার এক অদ্ভুত ঝামেলা ছিল। তাঁর ঘরে একটা কাচের দেওয়াল আলমারি ভর্তি পাতলা পাতলা অসংখ্য বই ছিল। বেশীরভাগই মহান ব্য্যক্তিদের জীবনি। কোনটা রাজা রামমোহন রায়, কোনটা বিদ্যাসাগর, কোনটা বিবেকানন্দ বা রবীন্দ্র্র নাথ ঠাকুরের জীবনি। এরকম শ’য়ে শ’য়ে বই তাঁর দেওয়াল আলমারিতে সাজানো থাকতো। নিয়মিত বই কিনে, তিনি তাঁর বইয়ের স্টক্ বাড়াতেন। তাঁর কাছে পড়তে গেলে তাঁর প্রথম কাজ ছিল, প্রত্যেক ছাত্রকে একটা করে বই পড়তে দেওয়া। পরের দিন পড়তে গেলে, তিনি প্রথমে প্রত্যেক ছাত্রকে, তাকে দেওয়া বই থেকে প্রশ্ন করতেন। ঠিকমতো উত্তর দিতে পারলে, তাকে নতুন কোন বই পড়তে দিতেন, আর না পারলে সেই বইটাই আবার ভাল করে পড়ে আসতে বলতেন। আজ সারা পশ্চিম বাংলায় চিরুণী তল্লাশী করলেও, একটা হীরেণ বাবুকে খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। চারিদিকে সলিলদের ভিড়ে, হীরেণ বাবুরা হারিয়ে গেছেন। বেশ কয়েক বছর আগে শিব বাবুর কাছে শুনেছিলাম, হীরেণ বাবু ডক্টরেট্ করে আমেরিকা যাচ্ছেন। আমি রসিকতা করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম— “হাওয়াই চটি পরে যাচ্ছেন”? শিব বাবুও হাসতে হাসতে জবাব দিয়েছিলেন, “হ্যাঁ, হাওয়াই চটি পরেই যাচ্ছেন”। কিছুদিন আগে একজনের কাছে খবর পেলাম, তিনি নাকি এখন বেলুর রামকৃষ্ণ মিশনে থাকেন।

হীরেণ বাবুকে নিয়ে অনেক ঘটনা শোনা যায়। শুনেছি তিনি নাকি একটা নেড়ি কুত্তা পুষেছিলেন। কুকুরটাকে তিনি নিজ সন্তানের মতো করে লালন পালন করেছিলেন। তিনি নিজে যেহেতু ব্রাহ্মণ সন্তান ছিলেন, তাই একবার নাকি পন্ডিত স্যারকে বলেছিলেন যে, তিনি তাঁর সন্তানসম কুকুরটার পৈতে দিতে চান। তাঁর কথা শুনে পন্ডিত স্যার নাকি ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন।

এরমধ্যে সমীর বাবু বি.টি. পড়া শেষ করে, স্কুলে ফিরে এলেন। হায় ভগবান, বি.টি. টা যে কেন তিন বছরের কোর্স হ’ল না। তিনি আবার স্বমহিমায় ফিরে এলেন। সুমিতাদির ক্লাশে পড়া না করলেও চলতো, ফলে ইকনমিক্স্-সিভিক্স্ এ কাঁচাতর হয়েই ছিলাম। সমীর বাবু এসেই নতুন, পুরাতন, অতি পুরাতন পড়া ধরা শুরু করে দিলেন। যথারীতি একদিনও পড়া বলতে পারতাম না। আমি একা নই, দু’একজন ছাড়া, প্রায় সকলেরই একই অবস্থা।

শেষে তাঁর সাথে আমাদের একটা MOU বা চুক্তি হ’ল। পড়া তৈরী না হলে, শেষ বেঞ্চে বসতে হবে। তাহলে তিনি আর পড়া ধরবেন না। তাঁর হাত থেকে বাঁচবার জন্য শেষ বেঞ্চ কেন, পৃথিবীর শেষ প্রান্তে বসতেও রাজী। কিন্তু শেষ বেঞ্চতো দু’টো রো এ মাত্র দু’টোই আছে। শেষ বেঞ্চের আগের বেঞ্চও তো শেষ বেঞ্চের মর্যাদা পায় না। শেষ বেঞ্চে বসতে আগ্রহী ছাত্রের সংখ্যা এত, যে সেখানে স্থান পাওয়াই দুস্কর হয়ে দাঁড়ালো। তিনি পঞ্চম পীরিয়ডে, অর্থাৎ টিফিনের পর প্রথম পীরিয়ডে ক্লাশ নিতেন। ঐ পীরিয়ডে আমরা ঘেঁষাঘেঁষি করে শেষ বেঞ্চে বসতাম। শেষে তিনি একদিন বুঝতে পারলেন, বুদ্ধিযুদ্ধে তিনি পরাজিত হয়েছেন। তিনি তো বিশ্ব আইনজ্ঞ, আইন তাঁর হাতে, ফলে আবার আগের নিয়ম প্রবর্তন হ’ল, আবার পড়া ধরা শুরু হ’ল। কিন্তু ততদিনে অতিচালাক আমি অনেক পিছিয়ে পড়েছি।

আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্রী পরিমল সেন ছিলেন, অত্যন্ত রাশভারী ব্যক্তি। তাঁর সৃষ্ট নতুন নতুন নিয়মের গন্ডি, আমাদের স্বাধীনতাকে ক্রমশঃ সঙ্কুচিত করে দিচ্ছিল। টিফিন হ’ত চতুর্থ পীরিয়ড শেষ হলে। টিফিনের ঠিক আগে, স্কুলের গেট বন্ধ করে দেওয়া শুরু হ’ল। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে স্কুলে আসতো। স্কুল গেটের বাইরে একজন হিন্দুস্থানী, হজমি, সেকুল, মিষ্টি আমড়া, ইত্যাদি বিক্রী করতো। গেটের সামনে ছাত্রছাত্রীরা জটলা করে, সেইসব অমৃত কিনতো।

পরিমল বাবু নতুন নিয়ম চালু করলেন, কোন ছাত্র বা ছাত্রী পীরিয়ড শেষ হলে, ক্লাশরুমের বাইরে যেতে পারবে না। পীরিয়ড শেষ হলে শিক্ষককে বলে ক্লাশরুমের বাইরে জল খেতে বা বাথরুমে গেলেও শাস্তি পাবে। তিনি নিজেও যদি ভুল করেও কাউকে ক্লাশ শেষে ক্লাশের বাইরে জল খেতে বা বাথরুম যেতে ছাড়েন, তাহলেও সে শাস্তি পাবে। নতুন পীরিয়ডে শিক্ষক আসলে, তাঁকে বলে ক্লাশরুমের বাইরে যেতে হবে। এর পিছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণও ছিল। কোন পীরিয়ড শেষ হলেই, ছাত্ররা দল বেঁধে ক্লাশরুমের বাইরে চলে যেত। পরের পীরিয়ডের শিক্ষক ক্লাশে আসার বহু পরে ছাত্ররা হাওয়া খেয়ে দল বেঁধে ক্লাশে ফিরলে, বাইরে যাওয়া নিয়ে নতুন শিক্ষক কোন প্রশ্ন তুললে স্বচ্ছন্দে জানানো হ’ত, আগের পীরিয়ডের স্যারকে বলে বাথরুম বা জল খেতে গেছি। আগের পীরিয়ডের স্যারটি তখন অন্য ক্লাশরুমে, একই প্রবলেম ফেস করছেন।

স্কুলের বাউন্ডারি ওয়ালের একদিকে খানিকটা অংশ ভাঙ্গা ছিল। টিফিনে সেই পথে দিব্বি স্কুলের বাইরে যাওয়া যেত। একদিন হঠাৎ দেখা গেল, পাঁচিল সারিয়ে সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হ’ল। টিফিনের সময় বাড়িতে টিফিন খেতে যাবার অজুহাত দেখিয়ে পরিমল বাবুর সাথে কথা বলা হ’ল। তিনি আমাদের আবেদনে কান না দিয়ে সরাসরি বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসতে বললেন। আমি উঠতি নেতার মতো তর্ক শুরু করে দিলাম— “অত সকালে মা টিফিন তৈরী করে দিতে পারেন না”। স্কুল কম্পাউন্ডের মধ্যে পাঁচিলের ধারে একটা ছোট্ট ক্যান্টিন, না ক্যান্টিন না বলে তাকে চায়ের দোকান বলা-ই বোধহয় ঠিক হবে, তৈরী করা হয়েছিল। শিক্ষকরা ওখান থেকে টিফিন বা চা আনিয়ে খেতেন। পরিমল বাবু আমাকে ঐ দোকান থেকে টিফিন কিনে খেতে বললেন। আমি বিপ্লবী জঙ্গী নেতার মতো ভঙ্গিতে তাঁকে জানালাম যে, আমার বাবার অত পয়সা নেই যে রোজ রোজ দোকান থেকে খাবার কিনে খাব। তাছাড়া, বাবা বাইরের খাবার খাওয়া পছন্দও করেন না। অগত্যা তিন-চারদিন বাধ্য হয়ে তিনি আমাদের কয়েকজনকে ঐ দোকান থেকে পাউরুটি, আলুর দম বা ঐ জাতীয় কিছু কিনে খাওয়ালেন। শেষে আবার আগের মতো মিলিটারি নিয়ম চালু হ’ল। আজ ভাবি, একটি লোকের মুখের কথায়, স্কুলের অত ছেলে বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসতে, বা ঐ দোকান থেকে টিফিন কিনে খেতে বাধ্য হলেও, কোন অভিভাবক কিন্তু থানায় ডায়েরী করেন নি, বা মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হন নি, কোন রাজনৈতিক দলের দাদা দিদিও কিন্তু স্কুলের পরিচালন নীতিতে মাথা গলান নি।

স্কুলে ভবনাথ মজুমদার নামে এক অতিবৃদ্ধ প্রাক্তন সহ প্রধান শিক্ষক রোজ সকালে স্কুল খুললে স্কুলে আসতেন। তিনি বিনা বেতনে উচু শ্রেণীর ছাত্রদের ইংরাজী ক্লাশ নিতেন। ইংরাজী ভাষায় তাঁর অগাধ পান্ডিত্য ছিল। অন্যান্য শিক্ষকদের মতো, তিনিও ছাত্রদের নিয়মিত ক্লাশ নিতেন, এবং ছুটির পরে সকলের সাথে বাড়ি ফিরতেন। একথা সত্য, যে তাঁর বাড়ি স্কুলের কাছেই ছিল, কিন্তু রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতেও তাঁকে কখনও দেরি করে স্কুলে আসতে দেখি নি। বয়সের ভারে, ও চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসায়, অনেক সময়েই তিনি চট্ করে ছাত্রদের চিনতে পারতেন না। তিনি যেদিন আমাদের ক্লাশে আসতেন, আমি খুব খুশী হতাম। সুযোগ পেলেই উঠে দাঁড়িয়ে বলতাম— “স্যার মাথা বানিয়ে দেব”?

ওনার পায় কেশহীণ মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিলে, কপালটা একটু টিপে দিলে, উনি খুব খুশী হতেন। দু’চার মিনিট মাথা বানিয়ে দিয়ে, মিনমিন্ করে বলতাম, “স্যার, আজ সকালে ভাত খেয়ে আসিনি, টিফিনে বাড়িতে ভাত খেতে যাব, একটু লিখে দেবেন? তিনি ছোট সাদা কাগজে বাড়ি যাবার অনুমতি দিয়ে সাক্ষর করে দিতেন, কিন্তু কোন তারিখ দিতেন না। কাগজ নিয়ে মহানন্দে ফিরে এসে নিজের সিটে বসতাম। ক্লাশ শেষ হবার কিছু আগে অন্য সিটে বসে, সেখান থেকে আবার একবার মাথা বানাবার কথা বলে, তাঁর কাছে উঠে যেতাম। তিনি চিনতে পারলে বিনা পারিশ্রমিকে মাথা বানিয়ে দিতাম, আর চিনতে না পারলে, আরও একটা তারিখহীন বাইরে যেতে দেবার হুকুমনামা সংগ্রহ হ’ত। মজার ব্যাপার, অধিকাংশ সময়েই তিনি চিনতে পারতেন না। অনেক সময় মাথা বানিয়ে দিয়ে বাড়ি যাবার অনুমতিপত্র চাইলে তিনি বলতেন, “এইজন্য মাথা বানাতে এসেছিস”? এর উত্তরও আমার জানা ছিল। সঙ্গে সঙ্গে বলতাম, “না স্যার, তাহলে লিখে দিতে হবেনা”। তিনি কিন্তু খুব দয়ালু ছিলেন, আমাদের মিথ্যাচার, শয়তানি, তাঁর শিশুসুলভ নিস্পাপ মস্তিষ্কে ঢুকতো না। অভুক্ত, অসুস্থ, সন্তানসম, ছাত্রদের কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারতেন না। ফলে ধীরে ধীরে তারিখহীন অনুমতিপত্রের স্টক্ আমার বেশ ভালই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। গেটের বাইরে যেতে বাধা প্রাপ্ত হলে, স্টক্ থেকে একটা কাগজ মামদোর হাতে দিয়ে, গটগট্ করে গেট পেরিয়ে নিজের পথ ধরতাম। অনেক সময় ঘুরতে যাবার সঙ্গী সাথীদেরও, স্টক্ থেকে এক-আধটা গেটপাশ দান করতে হ’ত। পরিমল বাবু ব্যাপারটা বুঝতে পেরেও, কিছু করতে পারতেন না। কারণ তিনি নিজেও আর সকলের মতোই ভবনাথ বাবুকে সম্মান করতেন। যে শিক্ষক বহু বছর আগে অবসর নিয়েও শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বিনা বেতনে নিয়মিত স্কুলে আসতেন শুধুমাত্র ছাত্রদের পড়াবেন বলে, তাঁর ওপর কথা বলার কথা, বোধহয় তিনিও ভাবতে পারতেন না। ভবনাথ বাবু আমাদের দাদুর বয়সী ছিলেন। তাঁর সাথে আমাদের দাদু-নাতির মতোই একটা মিষ্টি সম্পর্ক ছিল। আজ অনুশোচনা হয়, স্কুল পালাতাম বলে নয়, তাঁর মতো একজন প্রকৃত ভদ্র, শিক্ষিত, দয়ালু, মানুষকে তাঁর সরলতার সুযোগ নিয়ে ঠকাতাম বলে। আজ তিনি না থাকলেও, কান ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করতে এতটুকু লজ্জা, এতটুকু দ্বিধা বোধ হচ্ছেনা, বরং একটু হাল্কা বোধ হচ্ছে।

সমীর বাবুর অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে আমি আর কমল, চতুর্থ পীরিয়ডের পর ভবনাথ বাবুর গেটপাশ দিয়ে স্কুলের বাইরে চলে যেতাম। চতুর্থ পীরিয়ড শেষ হবার ঠিক আগে, নানা ছুতোনাতায় ক্লাশ থেকে বেড়িয়েও, স্কুলের বাইরে বিনা খরচায় চলে যেতাম। ফিরতাম পঞ্চম পীরিয়ড শেষ হলে, কিন্তু ষষ্ঠ পীরিয়ড শুরু হবার আগে। পঞ্চম পীরিয়ডটা সমীর বাবুর ক্লাশ ছিল। সব দিকের আইন বাঁচিয়ে বেশ চলছিল। কিন্তু একদিন দু’জনে মনের আনন্দে পঞ্চম পীরিয়ডটা বাইরে কাটিয়ে, অন্যান্য দিনের মতো ষষ্ঠ পীরিয়ডে, ক্লাশরুমে ঢুকেই চমকে উঠলাম। সমীর বাবু তখনও ক্লাশ ছেড়ে যান নি। তিনি খুব কড়া দৃষ্টিতে আমাদের দু’জনকে দেখে, ক্লাশ ছেড়ে চলে গেলেন। আমরা আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় বাকী দুটো  পীরিয়ড কাটালাম। আমাদের স্কুল বিল্ডিংটা ছিল ইংরাজী বর্ণ “U” এর উল্টো গঠনের। শেষ পীরিয়ড যখন চলছে, তখন লক্ষ্য করলাম আমাদের ক্লাশরুমের উল্টোদিকের অংশের একটা ঘরে, সমীর বাবু ক্লাশ নিচ্ছেন। ছুটির ঘন্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে, একমুহুর্ত সময় নষ্ট না করে, আমরা দু’জন প্রায় ছুটে স্কুল থেকে বেরোবার চেষ্টা করলাম। অনেক ছেলেমেয়ে দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছে, ফলে সিঁড়ি ভেঙ্গে দ্রুত নীচে নামা সম্ভব হচ্ছিল না। অথচ পিছন থেকে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, “এই সুবীর, এই কমল” ডাক। সমীর বাবু খুব দ্রুত আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। আমরা ভিড় কাটিয়ে ছুটে নীচে নামার সময় লক্ষ্য করলাম, সমীর বাবুও আমাদের পিছন পিছন প্রায় ছুটে নীচে নামছেন।

সিঁড়ি দিয়ে নেমে একতলার ডানপাশের প্রথম ঘরটার কাছে এসে দেখলাম, ঘরটা একবারে ফাঁকা। এই ঘরে পঞ্চম শ্রেণীর ক্লাশ হয়, তাই আগেই ছুটি হয়ে গেছে। ঘরটা বেশ বড় এবং দু’দিকে দুটো দরজা আছে। দরজার মতোই বড় বড় দুটো জানালায় কোন সিক বা গ্রীল নেই। ঘরটার একটা দরজা বন্ধ, অপরটা খোলা। আমরা খোলা দরজা দিয়ে ক্লাশরুমে ঢুকে, বন্ধ দরজাটার কাছে লুকিয়ে থাকলাম। আমি বুদ্ধি দিয়েছিলাম, জানালা খুলে স্কুলের বাইরে চলে যেতে। কিন্তু কমল বললো, সমীর বাবু ধারণাই করতে পারবেন না, যে এই খালি ঘরে কেউ থাকতে পারে। কিন্তু সমীর বাবু ধারণা করে, না সন্দেহ করে জানিনা, খোলা দরজা দিয়ে ক্লাশরুমে এসে ঢুকলেন। খোলা দরজার সামনে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, আমরা দু’জনে ইঁদুর কলে পড়েছি। তিনি খুব গম্ভীর গলায় আমাদের দু’জনকে তাঁর সাথে হেড স্যারের ঘরে যেতে বললেন। এতগুলো অন্যায় একসাথে করা হয়েছে যে বিপদ বুঝে বললাম, স্যার অন্যায় হয়ে গেছে, আর কোনদিন হবেনা। আজকের মতো ক্ষমা করে দিন।

আজই বা এ অন্যায় হ’ল কেন? প্রায় রোজই বা এ অন্যায় হচ্ছে কেন?

ভবিষ্যতে আর কোনদিন হবেনা স্যার।

আজই বা হ’ল কেন?

পড়া তৈরী হয়নি বলে স্যার।

পড়া তৈরী হয়নিই বা কেন?

ঠিকমতো বুঝতে পারিনি স্যার, অনেক চেষ্টা করেছিলাম।

বুঝতে না পারলে আমাকে জিজ্ঞাসা করে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করিস নি কেন?

এইভাবে মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো, একটার পর একটা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে, দু’জনকে সঙ্গে করে হেড স্যারের ঘরে ঢুকে, তাঁকে সবিস্তারে নালিশ করে, নিজের গাত্রদাহ মেটালেন। সব শুনে পরিমল বাবু আমাদের এক ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। তাঁর অসীম দয়া, তাই কান ধরতে বললেন না। আমাদের দাঁড়ানো ঠিক আইন সঙ্গত হচ্ছে কী না পর্যবেক্ষণ করার জন্যই বোধহয়, সমীর বাবু বাড়ি না গিয়ে বসে থাকলেন।

এর মধ্যে আবার এক কেলেঙ্কারি করে বসলাম। তখন গৌরীশঙ্কর বাবুর সাথে সুমিতাদির একটা গভীর প্রেমের সম্পর্ক চলছে। ওনারা ভাবতেন ব্যাপারটা কেউ জানে না। কিন্তু অত বড় স্কুলে, জানার ও জানাবার ছেলের অভাব থাকতে পারেনা। তাঁদের দু’জনকে একসাথে অনেক জায়গায় দেখাও গেছে। গৌরীশঙ্কর বাবু মেদিনীপুরের লোক, কিন্তু সুমিতাদি যে কোথায় থাকতেন, কাউকে বলতেন না। কিভাবে তাঁর ঠিকানা জোগাড় করেছিলাম, এতদিন পরে আর মনে করতে পারছি না, তবে তাঁর ঠিকানা জোগাড় করে একদিন তাঁর বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। তাঁর বাবা ছিলেন একজন নামকড়া ব্যারিষ্টার। আমরা জানতাম এই সময়ে সুমিতাদি বাড়িতে থাকবেন না। তাই সরাসরি তাঁর বাড়ি গিয়ে, সুমিতাদি বাড়ি আছেন কিনা, আমরা তাঁর ছাত্র, এদিকে একটা প্রয়োজনে এসেছিলাম, ইত্যাদি দু’চার কথা বলে, নিজেদের নাম না জানিয়ে চলে এলাম।

পরের দিন গৌরীশঙ্কর বাবুর গম্ভীর মুখ দেখেই বুঝলাম, ব্যাপারটা তাঁর কানে গেছে। তিনিও কোনরকম ভূমিকা না করেই বলতে শুরু করলেন, “আজকালকার ছেলেরা তাদের শিক্ষক শিক্ষিকাদের সম্মান করতে ভুলে গেছে। তারা তাঁদের বাড়ি পর্যন্ত ধাওয়া করতেও লজ্জাবোধ করেনা। বক্তব্যটা To whom it may concern হলেও, সেটা যে আমার উদ্দেশ্যেই নিবেদিত, বেশ বুঝতে পারছি। পরে সুমিতাদিকেও দেখলাম চশমার মোটা কাচের ভিতর দিয়ে, কঠিন চোখে আমাকে লক্ষ্য করছেন। যাহোক্, স্কুল ছেড়ে আসার পরবর্তীকালে শুনেছিলাম, ওনারা দু’জনে পরিণয় সুত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁদের বিবাহিত জীবন সুখের হয়েছিল কিনা জানিনা, তবে অনেক বছর পরে এ খবর পেয়ে খুব খারাপ লেগেছিল যে, সুমিতাদি ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে, পরপারে চলে গেছেন। ছেলে বয়সের ঔদ্ধত্যের জন্য তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

নবম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীতে ওঠার সময় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করলাম। আমার জীবনে এই প্রথম স্ট্যান্ড করে উত্তীর্ণ হওয়া। স্বপন রায় প্রথম স্থান অধিকার করে। ইকনমিক্স ও ভূগোল নিয়ে একটু ঝামেলা থাকলেও, অন্যান্য সব বিষয় আমার বেশ পছন্দের ছিল, তৈরীও ভালই হয়েছিল। রঞ্জিত বাবু আমার সম্বন্ধে খুব ভাল ধারণা পোষণ করতেন, এবং ভবিষ্যতে আমার রেজাল্ট খুব ভাল হবে বলে আশা করতেন। তাঁর এই আশা যে আমার পক্ষে কত বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সে কথা পরে বলা যাবে।

এই রকম একটা সময়ে সাধারণ নির্বাচন এসে পড়লো। এখনকার মতো স্কুলে তখন রাজনীতি হ’ত না। আমি আমার স্কুল জীবনে আমার কোন স্কুলে ছাত্র ইউনিয়ন বা ভোট দেখিনি। এ বিষয়ে বর্তমানের দাদা-দিদিরা কী বলবেন জানি না, তবে তাতে স্কুলের বা ছাত্রদের কোন ক্ষতি হয়েছিল বলে তো আজও মনে হয় না। আমরাও কংগ্রেস, সি.পি.আই., ফরওয়ার্ড ব্লক, ইত্যাদি কয়েকটা রাজনৈতিক দলের নাম ছাড়া, আর কোন খোঁজ রাখতাম না। সেই সময় এখানে পুরাতন পোষ্ট অফিসের দোতলায়, কংগ্রেস তাদের  একটা পার্টি অফিস করেছিল। বিজুদা নামে একজন দাড়িওয়ালা, রোগা, লম্বা লোক, লোকাল কংগ্রেস পার্টির বোধহয় নেতা ছিল। তার হাতে উল্কি করে দু’টো ছোট ছোট নীলচে ছোড়া আঁকা ছিল। নিজের হাতে হঠাৎ খরচা করে, কষ্ট করে, কেন ছোড়ার ছবি উল্কি করে আঁকিয়েছিল জানিনা। হয়তো সেই সময় সে উঠতি মস্তান ছিল। কয়েক বছর আগে বিজুদাকে দেখলাম, বুড়ো হয়ে গেছে, মরা হাড়গিলের মতো চেহারা হয়েছে। এখন আর রাজনীতি করে কিনা জানিনা, তবে দীর্ঘদিন তাকে কংগ্রেসের কোন মিটিং-মিছিলে দেখিনি। সে যাহোক্, এই বিজুদা একদিন হঠাৎ মুখার্জী পাড়ায় এসে আমাদের প্রস্তাব দিল, যে আমরা যদি তাদের প্রার্থী, শ্রী মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়-এর হয়ে ভোটের কাজে খাটা-খাটনি করি, তাহলে আমাদের সরস্বতী প্রতিমার দাম সে দিয়ে দেবে। সামনেই সরস্বতী পূজা, সব ছেলেরা সরস্বতী পূজা করবে বলে মেতে উঠেছে।

নির্বাচনে খাটা-খাটনি করার অভিজ্ঞতা পঞ্চানন চৌধুরীর দৌলতে যথেষ্ট হয়েছে। তাই জিজ্ঞাসা করা হ’ল যে আমাদের ঠিক কী কী করতে হবে। বিজুদা জানালো যে রং, তুলি সেই দিয়ে যাবে, আমাদের শুধু তাদের প্রার্থীর নামে দেওয়াল লিখন করতে হবে। আজও সাদা কাগজে ধরে ধরে কিছু লিখলেও, আমার হাতের লেখা অন্য কেউ পড়তে পারে না, কাজেই সেই সময় দেওয়ালে বড় তুলি দিয়ে আমার লেখা কেউ পড়তে পারবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কিন্তু ঐ যে, সরস্বতী প্রতিমার দাম, সেটাও তো ছেড়ে দেওয়া যায় না। ফলে কংগ্রেসের অফিস থেকে রং, তুলি, দরমা, পোষ্টার সংগ্রহ করে আনা হ’ল। প্রতিদিনই প্রায় আমরা সেখানে যেতাম এবং কেক্, চা, ঘুঘনি ইত্যাদি খেয়ে আসতাম। চারিদিকে পোষ্টার মারা ও দেওয়াল লিখন শুরু হ’ল। এমন কী স্নান করার সময় পুকুরে নেমে, পুকুরের পাশের বাড়ি ও পাঁচিলে পর্যন্ত লিখলাম। বিজুদাও বোধহয় তার রাজনৈতিক জীবনে এরকম কর্মনিষ্ট কর্মীদের আগে খুঁজে পায় নি। ফলে খাতির যত্ন আরও বেড়ে গেল। একটু ঘোরাঘুরি করতে হলেও, সরস্বতী প্রতিমার দামও পাওয়া গেল। গোপাল ধাড়ার কর্মী সেই লক্ষণদা, বাঁশ আর খড় দিয়ে পাড়ার রাস্তার মাঝে মন্ডপও তৈরী করে দিল। পূজার আগের দিন রাতে বিমল দাস নামে একজনের বাড়ির বাগান থেকে ফুলকপি চুরি করতে যাওয়া হ’ল। সুন্দর দামী বাড়ির সামনে কিছুটা জমিতে, ফুল গাছ ও বেশ কিছু কপি গাছ। গেটের কাছে আবার “কুকুর হইতে সাবধান” বোর্ড লাগানো। রাতে বস্তা ও কাটারি নিয়ে বাগানে ঢুকে কপি কেটে আনা হ’ল। পঁচিশটা কপি কেটে আনা হলে, দেখা গেল তার পনেরটাই ওলকপি। বাকী কিছু বাঁধাকপি, ফুলকপির সংখ্যা নিতান্তই কম। কেউ যে সাধ করে বাড়িতে ওলকপি চাষ করে জানা ছিল না।

বেশ চলছিল, হঠাৎ কী মতিভ্রম হ’ল, যেখানে যত মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নামে দেওয়াল লিখেছিলাম, সব মুছে দিয়ে যতদুর মনে পরে ফরওয়ার্ড ব্লকের, ডাঃ কানাই লাল ভট্টাচার্যের নাম লিখে দেওয়া হ’ল। আমাদের আঁকা সিংহের ছবি দেখলে, সেটা যে কোন জন্তু বোঝা কষ্টকর ছিল। জনে জনে ভোটারের বাড়ি গিয়ে, ওটা কিন্তু সিংহ, বলে আসার প্রয়োজন হতে পারতো। কিন্তু তার কোন প্রয়োজন হ’ল না। কারণ বিজুদা খবরটা পেয়ে, ডবল্ ছোড়া আঁকা হাত নিয়ে, আমাদের খুঁজে বেড়াতে লাগলো। আর আমরাও তার ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে লাগলাম। আজ ভাবলেও বেশ অবাক লাগে, আমরা অত কষ্ট করে আঁকা ও লেখা মুছে, কেন নতুন করে লিখতে ও আঁকতে গেলাম। আমাদের কাছে তখন মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায় জিতলেও যা, কানাই ভট্টাচার্য জিতলেও তাই, এমন কী নির্দল নুরু মিঞা বা পাড়ার ভজা পাগলা জিতলেও একই ব্যাপার। যাহোক্, ভোটপর্ব মিটে যাবার পর, নতুন করে আর কোন ঝামেলা না হয়ে, সব আগের মতোই চলতে লাগলো।

স্কুল চলছে, স্কুল পালানোও চলছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে, আমার পাখি পোষা ও পাখি সংগ্রহের প্রচেষ্টা। কত রকম পাখিই যে পোষার চেষ্টা করলাম, চড়াই থেকে শুরু করে চাতক পর্যন্ত। কিন্তু পাখি পোষা বোধহয় আমার ভাগ্যে লেখা নেই। একবার, তখন আমি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র, রেল লাইনের ধারের ঝোপঝাড়ের মধ্যে একটা বেশ বড় পাখিকে দেখে, অনেক কষ্টে তার আক্রমনের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে, এক ঝটকায় লাইনের পাশের রাস্তায় তাকে তুলে এনে জানতে পারলাম যে, সেটা আসলে একটা শকুন। শকুনটা সম্ভবত অসুস্থ হয়ে ঝোপের মধ্যে পড়েছিল। জনগনের আদেশে আবার তাকে ঐ ঝোপে ফেরৎ পাঠানোর দায়িত্বও ঐ বয়সে আমাকেই নিতে হয়েছিল। স্কুল থেকে ফেরার পথে, বা সুযোগ সুবিধা পেলেই পাখির খোঁজ চালাতাম। টিয়ার বাচ্ছা ধরবার জন্য নারকেল গাছের মাথায় চড়া, কোকিল ছানার খোঁজে আম, দেবদারু, মাদার, কোন গাছে না চড়েছি? একদিন ভরদুপুরে চড়া রোদে শঙ্কর মঠের একটা বেল গাছে উঠে কোকিল ছানার খোঁজ করতে গিয়ে, দু’টো কাকের আক্রমনে মাথা ফেটে রক্তও ঝড়েছে। নারকেল গাছের মাথায় উঠে, গর্ত থেকে টিয়া পাখির ছানা ধরতে গিয়ে জনগনের তীব্র আপত্তিতে পাখির ছানা ধরা থেকে বিরত থেকে, গাছ থেকে নেমে আসতেও হয়েছে। আপত্তির কারণ অবশ্য গাছের গর্তে সাপের উপদ্রব থাকতে পারে। একবার আবার একজনের কাছ থেকে একটা পাখি, প্রায় ভিক্ষা করে চেয়ে নিয়ে এসে শুনলাম, তখন অবশ্য আমার বয়স অনেক কম ছিল, সেটা নাকি চাতক পাখি। চাতক পাখি আমি তখনও চিনতাম না, এখনও তাই। কিন্তু চিন্তা হ’ল এই ভেবে, যে চাতক পাখি নাকি বৃষ্টির জল ছাড়া অন্য কোন জল খায় না বলে শুনেছিলাম। কিন্তু চাতক পাখি যে কী খায় জানা না থাকায়, কী খায় পরীক্ষা করতে করতেই, সেটা সম্ভবত খাদ্যাভাবেই দেহ রাখলো। এক শীতের সন্ধ্যায়, কাছে পিঠে কেউ কোথাও নেই দেখে, সুযোগ বুঝে এক বুড়ির টিয়া পাখি দাঁড় সমেত খুলে নিয়ে বাড়ি এসে দিব্বি গল্প বানালাম যে এক বন্ধুর টিয়া, তারা নতুন টিয়া কিনেছে বলে আমাকে এটা দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একজন বৃদ্ধ সেটা কিভাবে দেখেছিলেন বা জেনেছিলেন জানিনা, পরের দিনই তিনি আমার বাড়ি এসে আমার কাছ থেকে পাখিটা ফেরৎ নিয়ে যান। এরপরেই যেখান থেকে পাখিটাকে নিয়ে এসেছিলাম, সেই ষষ্ঠীতলা দিয়ে আমার সহপাঠী শ্যামা গেলেই, তার পিছন পিছন একদল বাচ্ছা ছেলে “পাখি চোর, পাখি চোর” বলে হাততালি দিতে দিতে যেতে শুরু করে। শ্যামার অপরাধ, তার চেহারা ও গায়ের রঙের সাথে আমার খুব মিল ছিল। বাচ্ছরা শ্যামাকে আমার সাথে গুলিয়ে ফেলেছিল।

সেদিন বিকালে মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছে, হঠাৎ সকলের প্রায় একই সাথে জল পিপাসা পেয়ে যাওয়ায়, পন্ডিত স্যারের গাছের ডাব পেরে খাবার সখ জাগলো। পন্ডিত স্যারের জমিজমাও প্রচুর, নারকেল গাছেরও অভাব ছিলনা। কিন্তু কোন গাছটাই পরিস্কার জমির ওপর নয়। একরকম বিছুটি গাছের মতো দেখতে গাছ আছে, রেল লাইনের পাশে প্রচুর দেখা যায়, ছোট ছোট, অনেকটা নাইন-ও-ক্লক্ ফুলের মতো আকারের, সাদা ও বেগুনী, অথবা হলুদ ও কমলা রঙের মিশ্রণের ফুল হয়। গোল গোল ছোট ছোট ফল দিয়ে আঙুরের মতো থোকা হয়। পেকে গেলে ফলগুলো কালো রঙের দেখতে হয়ে যায়। ছোট বয়সে আমরা এই পাকা, কালো ফল খুব খেতাম। সমস্ত নারকেল গাছের গোড়ায়, এই গাছের জঙ্গলে ভরা। যাহোক্, মাঠের পাশেই পাশাপাশি কয়েকটা নারকেল গাছ ছিল। গাছগুলোর পাশেই কয়েকটা কুঁড়েঘর নিয়ে, একটা বস্তি মতো ছিল। একটা গাছ থেকে অপর গাছে তার বাঁধা ছিল, বস্তির মেয়েরা কাপড় কেচে, এই তারে কাপড় মেলে শুকতে দিত। বিফল খুব ভালো গাছে উঠতে পারতো। আগে অনেকবার সে নারকেল গাছ থেকে ডাব বা নারকেল পেরেও এনেছে। সে একটা গাছে উঠে গেল। গাছের ওপর থেকে দু’তিনটে ডাব সবে জঙ্গলে ফেলেছে, ভয় হচ্ছে ডাব পড়ার আওয়াজে, পন্ডিত স্যারের বাড়ি থেকে কেউ না, এসে হাজির হয়। হঠাৎ কী কারণে কে জানে, লম্বা নারকেল গাছটার ওপর থেকে বিফল পড়ে গেল। কিন্তু সরাসরি জঙ্গলে না পড়ে, পড়লো ঠিক ঐ তারের ওপর। গাছের ওপর থেকে কাপড় মেলার তারে পড়ে, খানিকটা শুন্যে উঠে জঙ্গলের মধ্যে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। কাছে গিয়ে দেখি, তার পিঠের একদিক থেকে অপর দিক, কালো রক্ত জমা কাটা দাগের মতো হয়ে গেছে। ও যেভাবে তারের ওপর পড়েছে, তাতে দু’টুকরো হয়ে গেলেও অবাক হতাম না। আমরা ভয় পেয়ে পাশের কুঁড়ে ঘর থেকে জল এনে ওর চোখে মুখে ছিটিয়েও, কোন ফল হ’ল না। বিফল মরে গেছে মনে করে, বস্তির মেয়েরা চিৎকার শুরু করে দিল। একটু পরেই  সুকুমার নামে আমাদেরই বয়সী একজন এসে হাজির হ’ল। সুকুমার, পন্ডিত স্যারের দেশের কোন আত্মীয়, পূজো-অর্চার কাজে সহায়তা করার জন্য, তখন এখানেই থাকতো। অবস্থার গুরুত্ত্ব বুঝে সেও খুব ঘাবড়ে গেল। ডাবের জল খাওয়া মাথায় উঠলো, সকলে মিলে বিফলকে নিয়ে ডাক্তারখানায় যাওয়া হ’ল। অবস্থা এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো, যে স্বয়ং পন্ডিত স্যার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে খুব চেঁচামিচি শুরু করেন, বাড়িতেও নালিশ করা হ’ত, কিন্তু পন্ডিত স্যারের বড় মেয়ে, সন্ধ্যাদি আমাদের সে যাত্রা বাঁচিয়ে দেন। এসব ব্যাপার নিয়ে প্রায়ই আমার বাসায় নালিশ আসতো, কিন্তু মা সে সব সামলে নিতেন। যাহোক্, দীর্ঘদিন বাড়িতে শুয়ে থেকে, ওষুধপত্র খেয়ে, তবে বিফল আবার সুস্থ হ’ল।

এই ঘটনার পর, পন্ডিত স্যারের পক্ষ থেকে আমাদের একটা নারকেল গাছ, ডাব-নারকেল পেরে খাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হ’ল। কথা হ’ল অন্যান্য গাছে আমরা কখনও নারকেল পারবো না। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, যে গাছটার অধিকার আমাদের নির্দিষ্ট করে দেওয়া হ’ল, তাতে কখনও ডাব-নারকেল হ’ত না। পরবর্তীকালে, অনেক বছর পরে, দাদা ঐ গাছটা সমেত খানিকটা জমি কিনে বাড়ি তৈরী করে। তখন কিন্তু ঐ গাছটায় প্রচুর ফলন হ’ত। তবে আবার আমাদের সেই দুর্ভাগ্য, গাছটার ওপর বাজ পড়ে গাছটা মরে যায়।

আমাদের বাড়ির ঠিক সামনেই একটা কাঁচা রাস্তা ছিল। রাস্তার ওপাশে একটা ছোট ডোবা মতো ছিল। জল নেই, শুধুই পাঁক। আর তার ওপর বড় বড় কচুরিপানা আর কচু গাছ মাথা তুলে থাকতো। ডোবার ওপারে আগাছায় ভরা বেশ খানিকটা ফাঁকা জমি। পরবর্তীকালে রাস্তাটার ওপর সিমেন্টের স্ল্যাব দিয়ে বাঁধানো হয়। বাড়ির পাঁচিলের পাশ দিয়ে সরু বাঁধানো নালাটা আমাদের বাড়ির গেটের সামনে এসে, স্ল্যাবের তলা দিয়ে গিয়ে পাশের ডোবায় মিশেছে।

একটা সাপকে প্রায়ই দেখা যেত স্ল্যাবের নীচে দেহটাকে রেখে, গেটের কাছটায় মুখ বার করে প্রাকৃতিক শোভা দেখতে। সকলেই, বিশেষ করে আমদের বাড়ির চারটে ফ্ল্যাটের সকলে তো বটেই, খুব ভয় পেত, কারণ এই বাড়িতে অনেক বাচ্ছা ছেলেমেয়ে বাস করে। কিন্তু গেটের কাছে যাওয়ার আগেই, বা পায়ের আওয়াজ হলেই, সাপটা স্ল্যাবের নীচে মুখটা ঢুকিয়ে নিত। আবার লোক চলে গেলে, ঠিক বাড়ি থেকে বেরবার দরজাটার সামনে মুখ বার করে, আবার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতো। ব্যাপারটা সত্যিই খুব অস্বস্তিকর ছিল। আমরা অনেকবার অনেক ভাবে মারার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। বাবা অবশ্য প্রায়ই অভয়বাণী শোনাতেন, যে ওটা জলঢোড়া সাপ, বিষ নেই। কিন্তু বাড়িতে অনেক বাচ্ছা থাকায়, সবাই ভয় পেতই। শেষে বাবা একদিন অদ্ভুত কায়দায় সাপটাকে মারলেন।

আমাদের বাড়িতে কয়েকটা প্রাচীন আমলের অস্ত্র ছিল। কে তৈরী করিয়েছিলেন, কেনই বা তৈরী করিয়েছিলেন, ঐ সব অস্ত্র দিয়ে তিনি কী-ই বা করতেন, বলতে পারবো না। তবে পৈত্রিক সুত্রে বাবা বোধহয় ঐটুকু সম্পত্তির মালিকানার অধিকারি হয়েছিলেন বলেই, ফেলে না দিয়ে, বাড়ির আর সব আবর্জনার সঙ্গে রেখে দিয়েছিলেন। বন্দুক, পিস্তল হলেও তবু বুঝতাম, কিন্তু অস্ত্রগুলো হচ্ছে, একটা মরচে ধরা তরোয়াল, একটা বেশ বড় শক্তপোক্ত ভারী ছোড়া, আর একটা শিবের ত্রিশুলের মতো ত্রিশুল। না ভুল বললাম, এটার যতদুর মনে পড়ে পাঁচটা না ছ’টা ফলা ছিল। এটাকে ত্রিশুল না বলে পঞ্চশুল বলাই বোধহয় ঠিক হবে। বাবা অবশ্য এটাকে খোচনা বলতেন। কিন্তু সবকটাই মরচে ধরা। ঠাকুরদার কথা মনে করতে পারিনা, কিন্তু মা’র কাছে শুনেছি, তিনি নাকি অতি বৃদ্ধ বয়সে মাঝে মাঝে তেল দিয়ে ঐ তরোয়ালটা ঘষে, মেজে, মুছে, পরিস্কার করতেন আর আক্ষেপ করে বলতেন— “তরোয়ালটা কেউ ব্যবহার করে না”।

যাহোক্, বাবা ঐ ত্রিশুল বা খোচনা দিয়ে একটা ব্যাঙকে গেঁথে নিলেন। ব্যাঙটা কিন্তু তখনও বেঁচে আছে। এবার স্ল্যাবের ওপর উবু হয়ে বসে, ব্যাঙ সমেত খোচনার মুখটা ঠিক গেটের সামনে, স্ল্যাবের নীচের নালার মুখে বামহাতে ধরে, ডান হাতে একটা ছোট, কিন্তু বেশ মজবুত লাঠি নিয়ে, সাপটার আগমনের অপেক্ষায় রইলেন। খোচনার মুখে ব্যাঙটা তখনও নড়াচড়া করছে। এইভাবে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও, সাপের দেখা মিললো না। রাস্তা দিয়ে যাবার সময়, অনেকেই নানা মন্তব্য করে যেতে লাগলো। স্বাভাবিক, এইভাবে সাপ মারতে তারা তো দুরের কথা, তাদের বাপ-ঠাকুরদারাও কোন দিন দেখেছিল বা শুনেছিল কিনা সন্দেহ। আমরা বাবাকে চলে আসতে বললে, তিনি শুধু কথা বলতে ও গেটের কাছাকাছি আসতে বারণ করছেন। সত্যি কী অসীম ধৈর্য। শেষে আরও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরে, সাপটা আস্তে আস্তে মুখ বার করে ব্যাঙটাকে ধরার আগেই, বাবার ডান হাতের লাঠির আঘাতে তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল। সবাই অবাক, সম্ভবত সাপটা মরবার আগে আমাদের থেকেও বেশী অবাক হয়েছিল। আমি শুধু বললাম, “সাপটা স্বর্গে গিয়ে ভাববে, মার খেয়ে মরলাম ঠিক আছে, কিন্তু মারলোটা কোন শালা? আর কিভাবে কোথা থেকেই বা মারলো”? তাঁর আদরের অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে দেখে, ঠাকুরদার অতৃপ্ত আত্মাও হয়তো এতদিনে শান্তি লাভ করলো।

ডোবার ওপারে যে আগাছায় ভরা জমিটা ছিল, সেখানে একপাশে একটা কুঁড়েঘর ছিল। টালির ছাদ দেওয়া একটা মাত্র ছোট্ট ঘর। ঐ একটা ছোট্ট ঘরে মেনকাদি, তার বুড়ো স্বামী বেচু, জয়ন্ত, তিনকড়ি, শম্ভু ও মানুকে নিয়ে বাস করতো। জয়ন্ত বড়ছেলে, রিক্সা চালায়, সম্ভবত টি.বি. রোগে, চির রুগ্ন। মেজছেলে তিনকড়ি টেম্পো চালায়। মোষের মতো চেহারা। যদিও বাড়িতে কিছুই দেয় না, তবু একটু বেশী রোজগার করে বলে, একটু বেশীই খাতির যত্ন পায়। শম্ভু ছোটছেলে, অল্প বয়স, তাই এখনও কিছু করেনা। এরপরে মেয়ে মানু। বোধহয় পরে আরও একটা ছেলে হয়েছিল। মেনকাদি লোকের বাড়ি কাজ করে কোনমতে সংসার চালাতো। স্বামী বেচু, বয়স ও রোগের ভারে ক্লান্ত, তাই সন্তান উৎপাদন ছাড়া আর কোন কাজ তাকে কোনদিন করতে দেখিনি। তিনকড়ি একটু বেশী রোজগার করায়, স্টেটাস্ রক্ষা করতে, একটু পরিস্কার জামাকাপড় পরতো। তার নিজের জামাকাপড় কাচার জন্য গুঁড়ো সাবান কিনতো। অন্যরা কোনমতে লজ্জা নিবারণ করতো, এবং ঐ ডোবার জলেই কমদামী কোন সাবান ও সোডা দিয়ে, নিজেদের ছেঁড়া ফাটা নোংরা কাপড় জামা পরিস্কার করতো। দিনের বেলা অধিকাংশ দিন তাকে মালিকের টেম্পো নিয়ে বাইরে কাটাতে হ’ত। প্রায়দিনই সে এই বলে রাতে ঝামেলা শুরু করতো, যে সে খাক না খাক, তার ভাগের ভাগ খাবার কেন রাখা হয় নি।

একদিন জয়ন্ত, তিনকড়ির অনুপস্থিতিতে তার কাপড় কাচার গুঁড়ো সাবান দিয়ে, তার নিজের জামা প্যান্ট কেচেছিল। তিনকড়ি ফিরে এসেই এই চরম অপরাধের শাস্তি হিসাবে, জয়ন্তর কাচা জামা প্যান্ট, মাটিতে কাদায় ফেলে দিয়ে, পা দিয়ে ঘষে ঘষে নোংরা করে দেয়। শঙ্কর মঠের মাঠের একপ্রান্তে একটা কুঁড়েঘর করে, এক সাধু বাস করতো। মানু একটু বড় হলে এই সাধুকে মানুর ওপর অত্যাচার করার অপরাধে, তার ঘর ভেঙ্গে দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। মেনকাদির ছেলে মেয়েদের আর এতদিন পরে দেখতে পাই না। তবে মেনকাদিকে শঙ্কর মঠের গেটের পাশে আজও দেখি। ছোট্ট একটা কাচের বাক্সে সিগারেট নিয়ে বিক্রি করে। আর তাদের বাড়ির সেই জমিটার ওপর নিতাইদা, মেজদারা প্রাসাদসম বাড়ি করে এখনও বাস করে।

এই নিতাইদা, মেজদার বড় বোনের ছেলে গোবিন্দ, নিতাইদাদের বাড়িতেই থাকতো। ওর বাবা-মা অসামে থাকতেন। ওর বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল, তাই মেজদা ভাগ্নেকে নিজের কাছে রেখে স্কুলে ভর্তি করে, পড়াশোনা করাতেন। ও প্রায় আমার সমবয়সী হলেও অনেক নীচু ক্লাশে আমাদের স্কুলেই পড়তো। গাঁট্টাগোঁট্টা চেহারার গোবিন্দ খুব পরিশ্রমী ছিল। বাইরের কোন লোক বাড়িতে এলে, গোবিন্দকে বাড়ির কাজের লোক বলে ভুল করতো। গোবিন্দকে সত্যিই কাজের লোকের মতোই সারাদিন কাজ করতে হ’ত।

একদিন স্কুলে যাব বলে স্টেশনে এসে চলন্ত empty rake এ উঠতে যাচ্ছি, হঠাৎ পিছন থেকে গোবিন্দর ডাক। বাধ্য হয়ে ট্রেনটা ছেড়ে দিলাম। গোবিন্দ জানালো যে, সে স্কুলে যাবার জন্য বাড়ি থেকে বেড়িয়েছে বটে, তবে সে স্কুলে যাবে না। সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। আমি তো শুনে অবাক। আমার দৌড় স্কুল পালানো পর্যন্ত, বাড়ি থেকে পালানোর ইচ্ছা, ক্ষমতা, মনোবল, কোনটাই আমার নেই। কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে জিজ্ঞাসা করায়, সে শুধু জানালো, কিছু একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে। কী ব্যবস্থা হবে ভাবতে ভাবতে, ওর সাথে পরের ট্রেনে মৌড়িগ্রাম স্টেশনে এসে উপস্থিত হলাম। আমার আর স্কুলে যাওয়া হ’ল না। এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে, শেষে ওর সাথে আন্দুল বাজারে “স্বপ্না” সিনেমা হলে “হঠাৎ দেখা” নামে একটা সিনেমা দেখতে ঢুকলাম। সেদিন আবার ঐ হলের সাউন্ড বক্সে কী একটা গোলমাল দেখা দেওয়ায়, কোন আওয়াজ হচ্ছিল না। ফলে পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে, নির্বাক ছবি দেখলাম। অবশ্য আমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছিল না, কারণ আমরা সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় নির্বিঘ্নে কাটাতে, সিনেমা হলে ঢুকেছিলাম। হল থেকে বেড়িয়ে গোবিন্দ জানালো যে, সে সুনীল মালীর বাড়িতে থাকবে। সুনীল আমাদের স্কুলেরই ছাত্র, আমাদের সাথে স্কুল পালিয়ে সে দু’-একবার ঘুরতেও গেছে। সাঁত্রাগাছি রেমন কোম্পানীর পিছন দিকে তার বাড়ি। সন্ধ্যার পর সুনীলের বাড়ি গিয়ে, গোবিন্দকে রেখে বাড়ি ফিরে এলাম। ফিরে আসার সময় গোবিন্দ বারবার অনুরোধ করলো যে, আমি যেন ও কোথায় আছে, ওর মামাদের কোনদিন না বলি।

সেদিন গোবিন্দ বাড়িতে না ফেরায়, ওর মামারা আমায় নানা ভাবে প্রশ্ন করে জানবার চেষ্টা করলেও, আমি কিছু জানিনা বলে এড়িয়ে গেলাম। যদিও তাঁদের একটা সন্দেহ থেকেই গেছিল যে, আমি আসলে সব জানি। সব জানি, কারণ গোবিন্দ আমার সমবয়সী, আমার বন্ধু। রাতে, গোবিন্দ কী করছে, ওখানে সে কতদিন থাকবে, এরপরেই বা কী করবে, এই সব ভাবনায় ঘুম আসছিল না।

সুনীলরা ছিল বেশ গরীব। ছোট্ট বাড়ি, ওখানে গোবিন্দর পক্ষে দু’-একদিনের বেশী থাকা সম্ভব নয়। সুনীল একটু মস্তান প্রকৃতির ছেলে ছিল। একবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখতে যাব বলে আমরা আট-দশজন ছেলে, empty rake এ হাওড়া স্টেশনে এসে হাজির হয়েছি। গেট পেরবার সময় একটু ভয় ভয়ও করছিল। কিন্তু গেট পেরবার সময়, সুনীল এক অদ্ভুত কান্ড করলো। ঠিক গেটের সামনে চেকারের পাশে দাঁড়িয়ে, একে একে আমাদের গেট পার করিয়ে দেবার সময়, এক, দুই, তিন করে হেঁকে হেঁকে গুণে আমাদের গেটের ওপারে বার করে দিল। আমাদের মধ্যে তখন কে আগে নির্বিঘ্নে গেটের ওপারে গিয়ে নিজেকে বিপদমুক্ত করবে, তার প্রতিযোগীতা লেগে গেল। দুর থেকে দাঁড়িয়ে দেখলাম, সবাইকে গেট পার করিয়ে দিয়ে সে নিজেও গেটের বাইরে চলে এল। চেকারকে কী গুলগল্প শোনালো, কিভাবে অতগুলো ছেলেকে গেট পার করে দিল, আজও অজানা রয়ে গেল। এ ঘটনার অনেকদিন পরে, এই হাওড়া স্টেশনেই চেকারকে মারধর করে সে চরম বিপদে পড়েছিল।

যাহোক্, সেদিন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে আমরা আর এক কান্ড করেছিলাম। এখন কী নিয়ম হয়েছে জানিনা, কিন্তু সেই সময় কোন জিনিস নিয়ে ভিতরে ঢোকা যেত না। আমরা যত অপ্রয়োজনীয় বই খাতা গেটে জমা দিলে, প্রত্যেককে তার পরিবর্তে একটা করে পিতলের টোকেন দেওয়া হ’ল। বেরবার সময় খাতা বই ফেরৎ না নিয়ে, টোকেন নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।

পরদিন শুনলাম গোবিন্দ সুনীলের বাড়ি থেকে চলে গেছে, সুনীল জানেনা যে সে কোথায় গেছে। তারপর থেকে গোবিন্দর খোঁজ আর কেউ পায় নি। ওর মামারাও যেন ঘটনাটা ক্রমে ভুলে গেল। বেশ কয়েকমাস পরে মুখার্জী পাড়ার দুর্জয়দা পুরী বেড়াতে গিয়ে, গোবিন্দকে দেখতে পায়। গোবিন্দ একটা হোটেলে কাজ নিয়েছিল। দুর্জয়দার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে তাকে কয়েকটা চিঠি লিখেও কোন উত্তর পাইনি। এরও অনেক পরে, গোবিন্দ স্বমহিমায় ফিরে এসে, আবার আগের মতো মামার বাড়ির কাজে লেগে যায়।

পাড়ায় একটা আধক্ষ্যাপা বিধবা বুড়ি ছিল। তার ভাইপো আমাদের সাথে খেলাধুলা করতো। এই বুড়িকে সবাই গেজেট বলতো। সে যে কী কী বিষয়ে খবরাখবর রাখতো জানিনা, তবে ছেলেরা তাকে গেজেট বলতো। গেজেট কথার অর্থ সে বুঝতো কিনা সন্দেহ আছে, তবে ভীষণ রেগে যেত। একদিন গোবিন্দ তাকে গেজেট বলায়, সে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে যায়। সত্যিই যে সে পাড়ার গেজেট, সেদিন বুঝলাম। গোবিন্দ কোন বাড়িতে থাকে, তার জানার কথা না হলেও, সে ঠিক জানতো এবং আমাদের বাড়ির নীচে দাঁড়িয়ে চিৎকার চ্যাঁচামিচি, সঙ্গে অকথ্য গালিগালাজ শুরু করে দিল। গোবিন্দকে হাতের কাছে না পেয়ে, সে আমাকে সনাক্ত করে, অতীতের গেজেট বলার ঝাল মেটালো। বাবাও কোন কথা না শুনে আমার ওপর এক হাত নিলেন। পরে অবশ্য সব শুনে, যদিও আমি নিজেও যে তাকে অহরহ গেজেট বলে থাকি, সেকথা বাদ দিয়ে বলার পর, উনি বললেন, “এইসব ছেলেদের সাথে না মিশলেই পার, মেশ কেন”?

বাবার হাতে অকারণে কতবার যে মার খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। আজ এই বয়সেও হাতে ঘড়ি পরি না, তো সেই সময় ঘড়ির কথা ভাবাই যায়না। এক রবিবার পন্ডিত স্যারের পুকুরে স্নান করতে গেছি। পুকুরটা বিশাল বড় হলে কী হবে, কোথাও এক বুকের বেশী জল ছিলনা। ডুব দিয়ে দিয়ে মাটির নীচে বড় বড় গর্ত মতো করে, দলবেঁধে চোরচোর ইত্যাদি খেলতাম। অনেকক্ষণ জলে থাকলেও কোনদিন জ্বরজ্বালা হয়নি, বরং ওসব ছেড়ে দেওয়ার পরই ভুগতে হ’ত। যাহোক্, সেদিন পুকুরে থাকাটা একটু বেশীই হয়ে গেছিল। স্নান সেরে বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে, বাবা হাতের কাছের একটা নারকেল কাঠির ঝাঁটা নিয়ে, আমার পায়ে, পিঠে সপাসপ্ কয়েক ঘা বসিয়ে দিলেন। সেদিন আবার আমার এক মামা ও মাইমা এসেছিলেন। মুহুর্তের মধ্যে সারা পিঠে লাল লাল ঝাঁটার কাঠির দাগ হয়ে গেল। তখন সব কাজ ফেলে, নিজে স্নান করতে না গিয়ে, আমার ক্ষতস্থানে ন্যাকড়া ভিজিয়ে জলপটি দিতে শুরু করলেন। বাবাকে আমরা ছোটবেলা থেকেই খুব ভয় পেতাম। আমার সব ভাইবোনেরাই বাবাকে খুব ভয় পেত। একটা উদাহরণ দিলে বোধহয় ব্যাপারটা একটু পরিস্কার হবে। একবার আমাদের নিয়ে বাবা আলিপুর চিড়িয়াখানায় গেছিলেন। যতদুর মনে পড়ে, আমার মেজদিও সঙ্গে গেছিল। দ্বিতীয় হুগলী সেতু বা বিদ্যাসাগর সেতু হওয়ার পরে যেমন খুব অল্প সময়ে, প্রায় বিনা কষ্টে চিড়িয়াখানায় যাওয়া যায়, তখন তা যেতনা। সারাদিন সেখানে ঘুরেফরে নানা জীবজন্তু দেখে মেন গেট দিয়ে বেড়িয়ে বেশ খানিকটা পথ বাবার পিছন পিছন হেঁটে চলেছি বাস ধরবার জন্য। গেট থেকে বেড়িয়েই আমরা সবাই লক্ষ্য করেছি, ছোটবোন বুলা সঙ্গে নেই। কিন্তু এই কথাটা বাবাকে কেউ সাহস করে বলতে পারছি না। বাবাকে কথাটা বলার জন্য, একে অপরকে ইশারা করতে করতে অনেকটা পথ এগিয়ে গিয়ে যখন বাসে উঠতে যাব, তখন বাধ্য হয়ে আমাদের মধ্যে কে যেন বাবাকে জানালো, বুলা আমাদের সঙ্গে নেই। এতক্ষণ তাঁকে না জানানোর জন্য রাগারাগি করে, আমাদের দাঁড় করিয়ে তিনি গেলেন বুলার খোঁজে। কিছুক্ষণ পরে তিনি বুলাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসলেন। জানা গেল বুলা নাকি আমাদের সঙ্গে এসে গেটের কাছে কাউকে দেখতে না পেয়ে কাঁদতে শুরু করে এবং সবাইকে জিজ্ঞাসা করতে থাকে— “আমার বাবাকে দেখেছো”? তখন গেট কীপার তাকে বলে, এখানে দাঁড়াও তোমার বাবা এক্ষুণি আসবে।

খুব ছোটবেলা, তখন বোধহয় তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছি। ছুটির দিনে দুপুরবেলা আমাদের ঘুমতে হুকুম করা হ’ত। অতবড় দুপুরটা দোলনা না চেপে, গঙ্গাফড়িং এর সন্ধানে বনেবাদাড়ে না ঘুরে, ঘুমিয়ে কাটাতে কার ভাল লাগে? বাধ্য হয়ে একদিন ঘুমের ভান করে ঘাপটি মেরে শুয়ে আছি, আর নিজেদের মধ্যে ফিসফিস্ করে কথা বলছি। বাবা বেশ কয়েকবার ধমক দিলেন। শেষে আর সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, বাইরের উঠনে যাবার জন্য পা টিপেটিপে এগিয়ে যেতে গিয়ে শব্দ করতেই, বাবার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি বিরক্ত হয়ে আমাকে ধরতে গেলে, ছুটে পালাতে গিয়ে পড়ে গেলাম। বাবা পা দিয়ে আমার হাতের কব্জির কাছটা চেপে ধরে, ভাল করে লুঙ্গিতে গিঁট দিয়ে নিয়ে, আমাকে এটা চড় কষিয়ে, কান ধরে নিয়ে গিয়ে আবার স্বস্থানে শুইয়ে দিলেন।

আমাদের বাড়ির নীচে, স্ল্যাবঢালা রাস্তা দিয়ে একটা লোক, টিনের বাক্সে ঘুগনি নিয়ে, “অ্যাই ঘুগনি” বলে চিৎকার করতে করতে যেত। শালপাতায় করে দেওয়া তার ঘুগনি বড় উপাদেয় ছিল। মা’র কাছ থেকে ম্যানেজ করে, বা এদিক-সেদিক থেকে যা পাওয়া যেত তাই দিয়ে, রাতে তার কাছ থেকে প্রায়ই ঘুগনি কিনে খাওয়া হ’ত। প্রথম প্রথম নীচে নেমে গিয়ে কিনে আনা হ’ত। পরের দিকে আমরা বড় ও রেগুলার খদ্দের হিসাবে পরিগণিত হওয়ায়, সে নিজে সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতলায় এসে, ঘুগনি দিয়ে যেত। কিন্তু মুশকিল হ’ল এই যে, ঐ ঘুগনিওয়ালা আশা করতো, আমরা ভাত রুটি না খেয়ে তার ঘুগনি খেয়েই থাকি। ফলে যেদিন আমরা ঘুগনি নিতাম না, সেদিন সে বাড়ির ঠিক নীচে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, আমাদের দোতালার ফ্ল্যাটের দিকে ঘাড় উচু করে, এক নাগাড়ে চিৎকার করে “অ্যাই ঘুগনি, অ্যাই ঘুগনি” করেই যেত। এতে বাবার সন্দেহ হতে পারে, তাই তাকে একদিন বলা হ’ল, বাড়ির নীচে দাঁড়িয়ে চিৎকার না করতে। আমরা যেদিন ঘুগনি কিনবো, তাকে ইশারা করে ডাকলে, সে যেন চুপচাপ ওপরে উঠে এসে ঘুগনি দিয়ে যায়। এরপর থেকে সে বাড়ির নীচে একবারই চিৎকার করে জানান দিত, যে সে উপস্থিত। খাওয়ার মতো পয়সা হাতে থাকলে, তাকে হাতের ইশারায় ওপরে ডেকে এনে খাওয়াপর্ব সুসম্পন্ন করতাম। ধীরে ধীরে ঘুগনির প্রতি আগ্রহ কমে গেল। আরও অনেক পরেও তাকে একই ভাবে, একই সুরে ঘুগনি বেচতে দেখেছি, তবে তখন তার সারা শরীরে শ্বেতি হয়েছিল।

পরবর্তী অংশ ষষ্ঠ পর্বে………

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s