স্মৃতি (ষষ্ঠ পর্ব)

TRIKUT PAHAR, DEOGHAR-DEC'76 (11)পাশের ফ্ল্যাটের নিতাইদার একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। অল্প দামী H.M.V. প্লেয়ার। তখন C.D., D.V.D. তো দুরের কথা ক্যাসেটের ব্যবহারও সেইভাবে চালু হয় নি। নিতাইদার কাছে অনেক আজেবাজে হিন্দী গানের রেকর্ড তো ছিলই, বাংলা গানের প্রায় সবটাই ছিল সাবস্ট্যান্ডার্ড ঝিনচ্যাক্ গান। কিশোর কুমারের মতো শিল্পীর সব গান ছেড়ে, নিতাইদার সংগ্রহে ছিল— “এই ঝুমরু ঝুমরু রে”, বা “বলহরি হরিবল” ইত্যাদি গান। আমার প্রিয় ছিল সে সময়ের সেই সব গান, যা আজও স্বর্ণ যুগের গান হিসাবে বিবেচিত হয়। রাগ রাগিণী বা রাগাশ্রয়ী গান বুঝতামও না, ভালও লাগতো না। তখন দুপুরবেলা রেডিওতে “গীতিকা” নামে একটা আধ ঘন্টার অনুষ্ঠান হ’ত। তাতে এক একদিন এক একজনের গান বাজানো হ’ত। শনিবার, গীতিকা শুনবার জন্য স্কুল থেকে প্রায় ছুটে বাড়ি ফিরতাম। অনেক সময় গলদঘর্ম হয়ে বাড়িতে এসে গীতিকায় পুরানো দিনের কোন শিল্পীর গান বাজানো হচ্ছে, অথবা অত্যন্ত অপছন্দের কোন শিল্পীর গান বাজানো হচ্ছে শুনে ভীষণ রাগ হ’ত। যদিও আজ মনে হয়, তখনকার অনেক অতি সাধরণ শিল্পীও, আজকের কোন অসাধারণ নামী শিল্পীর থেকে খুব খারাপ বোধহয় গাইতেন না। অন্তত তারা বাংলা গান, বাংলা ভাষায়, বাংলা উচ্চারণে গাইতেন, এবং সেইসব গানে চাঁদ, ফুল, তারা, জোছনার ভিড়েও, গানের কথার একটা মানে বোঝা যেত।

বাবা খেয়াল শুনতে খুব ভাল বাসতেন, আর পছন্দ করতেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামী, ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা, শচীন দেববর্মন, কানন দেবী, কে.এল.সায়গল, ইত্যাদি শিল্পীর গান। প্রায় প্রতিদিনই রাতে, ন’টা থেকে সাড়ে ন’টা, খেয়ালের অনুষ্ঠান হ’ত। বাবা প্রায় প্রতিদিনই ঐ অনুষ্ঠানটা খুলে দিতে বলতেন। পরবর্তীকালে দাদা চাকরী পাবার পর, একটা ভাল তিন ব্যান্ডের রেডিও তৈরী করিয়ে বাড়িতে দিয়ে গেছিল। বাবা নিজে রেডিওতে কোন সেন্টার ভালমতো ধরতে পারতেন না, তাই নিজে খুব একটা খোলা বা বন্ধ না করে, আমাদের ওপর নির্ভর করতেন। আজ এই বয়সে ভাবলে খুব দঃখ হয়, কষ্ট হয়, লজ্জাও করে, যে আমি নিজের স্বার্থ, নিজের ভাল লাগা অনুষ্ঠানের জন্য বাবাকেও কিভাবে ঠকাতাম। এসব ঘটনা না বললেই সব মিটে যেত, কেউ কোনদিন জানতেও পারতো না। কিন্তু স্মৃতি থেকে অপছন্দের কোন ঘটনা, বা ভাল না লাগা কোন ঘটনাকে, নিজের ইচ্ছায় মুছে দেওয়া যায় না। স্মৃতি নিজের ইচ্ছায় তার ভান্ডার থেকে পছন্দ মতো ঘটনাকে ডিলিট্ করে দেয়। হয়তো আমাকে এইসব পাপ বোধ বয়ে বেড়াবার জন্য, মানসিক কষ্ট দেবার জন্যই, স্মৃতি এইসব ঘটনা আজও সযত্নে রক্ষা করে যাচ্ছে। আর আজ জীবন সন্ধ্যায় স্মৃতি রোমন্থন করতে বসে, এসব প্রকাশ না করলে মিথ্যাচার হবে, পাপ হবে, স্মৃতি রোমন্থনের সার্থকতা থাকবে না।

বাবা যে সময়টায় খেয়াল শোনার জন্য রেডিওটা খুলে দিতে বলতেন, সেই সময় আমার পছন্দের কোন গান শোনার জন্য, বা পরবর্তীকালে বিবিধ ভারতী হওয়ার পরে, ঐ সব পছন্দের অনুষ্ঠান শোনার জন্য, মন আনচান করতো। কিন্তু এখনকার ছেলে মেয়েদের মতো নিজের ইচ্ছা, নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে জেদ ধরে কোন কিছু দেখা বা শোনার কথা, ভাবতেও পারতাম না, সাহসও ছিলনা। ফলে কিছু ছলচাতুরীর আশ্রয় নিতেই হ’ত।

রেডিওতে যখন খেয়াল বাজছে, অন্য কোনভাবে সেটাকে পরিবর্তন করা যাবেনা বুঝে, পাশের ঘরের সুইচবোর্ডের একটা নির্দিষ্ট সুইচ ধরে নাড়াতাম। বোধহয় ঐ সুইচটায় কোন লুজ কানেকশান বা অন্য কোন গোলমাল ছিল। ঐ নির্দিষ্ট সুইচটায় হাত দিলেই, রেডিওতে একটা গোঁ গোঁ করে বিশ্রী শব্দ হ’ত। অনেকক্ষণ এই প্রক্রিয়ায় রেডিওতে শব্দ করিয়ে, “বড্ড শব্দ হচ্ছে” বলে রেডিওটা বন্ধ করে দিতাম। একটু পরে নিজের পছন্দের কিছু হলে, বিনা ডিষ্টার্বেন্সে শুনতাম। রেডিওতে কোন বিশ্রী আওয়াজ হচ্ছেনা দেখে, বাবা অনেক সময় আবার খেয়ালটা চালিয়ে দিতে বললে, আবার আগের প্রক্রিয়া। আরও একটা পন্থা ছিল। রেডিওর পাশ দিয়ে যাবার সময় চট করে রেডিওর নবটা মিডিয়াম ওয়েভ থেকে সর্ট ওয়েভ করে দেওয়া। ফলে কোনভাবেই খেয়ালের অনুষ্ঠান খোলা না গেলে, সুবিধা মতো নিজের পছন্দের গান শোনায়, কোন বাধা থাকতো না।

কিন্তু কী আশ্চর্য, যে আমি হিন্দুস্থানী মার্গ সংগীত একদম বুঝতাম না বা পছন্দ করতাম না, সেই আমি ধীরে ধীরে এই সংগীতের ভক্ত হয়ে পড়লাম। পরবর্তীকালে বিবিধ ভারতীতে “সংগীত সারিকা” আর “স্বরসুধা’ নামে দুটো অনুষ্ঠানে এক একদিন এক একটা রাগের ওপর একটা হিন্দী ফিল্মী গান, একটা ইনস্ট্রুমেন্ট, ও একটা ভোকাল বাজানো হ’ত। এই অনুষ্ঠান দুটোয় যেন আমার নেশা হয়ে গেছিল। একসময় আমি বহু রাগ রাগিণী চিনতে শিখে গেছিলাম। গানবাজনা শোনার সময়ের অভাবে সেই ক্ষমতা আজ অনেকটাই কমে গেছে, তবু আজও আমি বহু রাগ রাগিণী চিনতে পারি। ছোট বোন গান শিখতো, মেয়ে সরোদ বাজাতো, পরে সরোদ ছেড়ে গান শেখা শুরু করে। কিন্তু তাদরও দেখেছি, তারা রাগ রাগিণী চিনতে পারে না। যে রাগের ওপর একাধিক গান তারা জানে, গায়, সেই রাগেই অন্য কোন গান বা বাজনা বাজলে, তারা কোন রাগ চিনতে পারে না। যাহোক্, অনেক পরে চাকরী পাবার পরে,“বালিকা বধু” নামে একটা সিনেমায়, এক বিপ্লবী শিক্ষকের গভীর রাতে বেহালা বাদন শুনে মহিত হয়ে, বেহালা কিনে শিখতে শুরু করি। বেশ কিছুদিন শেখার পর বুঝতে পারি, এই যন্ত্রটা আমার জন্য তৈরী হয় নি। নিতাইদাকে ধীরে ধীরে হিন্দুস্থানী মার্গ সংগীতে আকৃষ্ট করতে সফল হয়েছিলাম। যে নিতাইদা, ব্যোম ব্যোম মাকু বা বলহরি হরিবল ছাড়া গান শুনতো না, সে নিজেও একসময় সেতার শিখতে শুরু করে। ভালই বাজাতো। আমরা দু’জনে একসাথে, যাকে যুগলবন্দী বলে আর কী, বাজিয়েও অনেক সময় কাটিয়েছি। শেষে আমি বেহালা বাজানো ছেড়ে দিলেও, নিতাইদা কিন্তু সেতার বাজানো চালিয়ে যায়।

চাকরী পাওয়ার পরে একটা ফিলিপস্ রেকর্ড প্লেয়ার কিনেছিলাম। বেন্টিঙ্ক্ স্ট্রীটে জে.জে.মল্লিকের দোকান থেকে প্রায়ই রেকর্ড কিনতাম। রবীন্দ্র সংগীত বা ভালো বাংলা আধুনিক গান ছাড়া, অধিকাংশই ক্লাশিকাল ইনস্ট্রুমেন্ট বা ভোকাল রেকর্ড। দোকানের ভদ্রলোক আমার বয়সী একটা ছেলেকে হিন্দী গানের রেকর্ড না কিনে, আব্দুল করিম খাঁ, বিলায়েৎ খাঁ, বেগম আখতার, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় বা হরিপ্রসাদ, রবিশঙ্করের রেকর্ড কিনতে দেখে অবাক হতেন, এবং প্রথম প্রথম, রেকর্ড কেনার পর ফেরৎ নেওয়া হয়না জানাতে ভুলতেন না। এটা সাতের দশকের মাঝামাঝির ঘটনা। আজ দুঃখ হয় এই ভেবে, যে সেদিন আমি নিজেও সেইসব গান বাজনা শুনলাম না, বাবাকেও তাঁর একমাত্র্র আনন্দ থেকে বঞ্চিত করলাম। চাকরী পেয়ে বাবাকে তাঁর পছন্দ মতো অনেক রেকর্ড কিনে শুনিয়েছি, ভাল সিনেমাও দেখিয়েছি বটে, কিন্তু ফেলে আসা সেই দিনগুলো, সেই সময়টা তো আর ফিরিয়ে দিতে পারলাম না। তাই একটা পাপ বোধ মনের মধ্যে রয়েই গেছে। আর আফসোস? বাবার তখন একবারে শেষ অবস্থা, কলকাতা সি.এম.আর.আই. হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে এসে আবার ভর্তি করতে হবে, এরকম একটা অবস্থা। বাবা একটা ঘোরের মধ্যে আছেন, কথা জড়িয়ে গেছে। ঐ অবস্থায় তিনি পন্ডিত অজয় চক্রবর্তীর গান শুনতে চাইলেন। আমার কাছে বাবার পছন্দের অনেক রেকর্ড আছে, কিন্তু আমার সংগ্রহে একটাও অজয় চক্রবর্তীর রেকর্ড নেই। বাধ্য হয়ে আবার বাবাকে ঠকিয়ে, অন্য শিল্পীর রেকর্ড বাজিয়ে, অজয় চক্রবর্তী গাইছেন বলতে হ’ল। অজয় চক্রবর্তী আমার অত্যন্ত প্রিয় শিল্পী। পরবর্তীকালে তাঁর ক্যাসেট বা সি.ডি. কিনেছি, তাঁর বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছি, কিন্তু অন্তিম সময় বাবাকে তাঁর গাওয়া গান শোনাতে পারিনি। সে সুযোগও আর কোনদিন পাইনি, হাসপাতাল থেকে তাঁকে আর ফিরিয়ে আনতে পারিনি, শবদেহ নিয়ে ফিরেছিলাম।

আজ যখন পিছন দিকে ফিরে চাই, তখন নিজেই অবাক হই এই ভেবে, যে কী বিচিত্র জীবন যাপন করে একটা সময় কাটিয়েছি। তপন নামে একটা ছেলে একদিন আমাদের সাথে স্কুল পালিয়ে হাওড়া স্টেশনের কাছে গোলমোহর অঞ্চলে এসে হাজির হ’ল। শীতকালে গোলমোহরে সার্কাস হ’ত। আমরা যখন ওখানে এসে হাজির হলাম, তখন গরম কাল না শীত কাল, এতদিন পরে মনে করতে পারি না, তবে তখন সেখানে একটা সার্কাস চলছিল। পকেটে কোন পয়সা নেই, কাজেই সার্কাস দেখার কোন প্রশ্নই ওঠে ন। এদিকে জল তৃষ্নায় বুকের ছাতি ফাটার উপক্রম। পরপর অনেক শরবত বিক্রী হচ্ছে। একটা টেবিলের ওপর কয়েকটা রঙ্গিন সিরাপের বোতল, কয়েকটা কাচের গ্লাশ, আর বড় একটা ড্রামে জল নিয়ে জাঁকিয়ে ব্যবসা। অনেক শরবত ব্যবসায়ী, কিন্তু কেউ এক গ্লাশ খাবার জল দিতে রাজী নয়। শেষে একজন অতি দয়ালু, সহৃদয় শরবত ব্যবসায়ী জানালো, এক গ্লাশ শরবত কিনলে, খাবার জল পাওয়া যাবে। কী করা যায় ভাবছি, এমন সময় জানা গেল, আজ স্কুলে মাইনে দেবার জন্য, তপন টাকা নিয়ে এসেছিল, কিন্তু স্কুল পালানোর জন্য টাকা তার পকেটেই আছে। অনেক পটিয়ে পাটিয়ে তার থেকে পয়সা নিয়ে এক গ্লাশ শরবত কেনা হবে ঠিক হ’ল। শরবত বিক্রেতা জানালো, এক গ্লাশ শরবতের দাম বার পয়সা। দামটা একটু বেশী হলেও প্রয়োজনের তাগিদে, এক গ্লাশ শরবত নিয়ে খাবার পর দাম দিতে গেলে সে জানালো, শরবতের দাম এক টাকা বার পয়সা। আমরা তর্ক জুড়ে দিলাম। লোকটা হঠাৎ আমাদের দলের একজনের বুক পকেট থেকে একটা ভাল ফাউন্টেন পেন তুলে নিয়ে চিৎকার করে বলতে শুরু করলো যে, সে এক গ্লাশ শরবতের দাম এক টাকা বার পয়সাই বলেছিল। আমরা যাকে খুশী জিজ্ঞাসা করতে পারি। জিজ্ঞাসা করার জন্য কষ্ট করে লোকের খোঁজ করতেও হ’ল না। কিছু বোঝার আগেই দু’চারজন মস্তান গোছের লোক এসে, কাচের গ্লাশ স্বজোরে টেবিলে ঠুকে জোর গলায় জানালো যে শরবত বিক্রেতা এক টাকা বার পয়সাই দাম বলেছিল। আমরা অসহায়ের মতো কী করবো ভাবছি। আমাদের সাথে প্রদীপ এসেছিল, ওর কথা যথা সময়ে বলবো। ওর চেহারা অনেকটা “বাঁটুল দি গ্রেট” এর মতো। গায়ে অসম্ভব শক্তি। এর আগে একদিন empty rake এ হাওড়া যাবার সময় একটা বেশ জোয়ান ছেলের সাথে ওর কী নিয়ে যেন ঝগড়া লেগেছিল। ছেলেটা গালাগালি দিতে দিতে হঠাৎ আমাদের দলের একজনের জামার কলার চেপে ধরলে, প্রদীপ তাকে মারতে শুরু করে। ছেলেটা অনেক চেষ্টা করেও প্রদীপকে একবারও আঘাত করতে পারেনি। সে যেন ঈশ্বর পাটনী হয়ে আমাদের মধ্যে এসেছে। প্রদীপ তাকে মারতে মারতে ট্রেনের দরজার কাছে নিয়ে গিয়ে বললো, এবার শালাকে ট্রেন থেকে ফেলে দেব। শেষ পর্যন্ত ছেলেটাকে আমরাই প্রদীপের হাত থেকে মুক্ত করি।

কিন্তু আজ এমন বিপদের দিনে প্রদীপ সঙ্গে এসেও কোথায় গেল ভাবছি, এমন সময় তাকে খুঁজে পাওয়া গেল। ইতিমধ্যে ঐ শরবত বিক্রেতা এক মুসলিম ব্যক্তি ও তার বাচ্চা ছেলেকেও বার পয়সা আর এক টাকা বার পয়সার গাড্ডায় ফেলেছে। লোকটা অনেকক্ষণ তর্ক করেও কোন সুফল না পাওয়ায় খুব অসহায় অবস্থায় বললো, “আল্লার কসম তুমি বার পয়সাই বলেছ, এখন কেন এক টাকা বার পয়সা চাইছ”? কী কারণে জানিনা, শরবত বিক্রেতা আর তার সাথে বিতর্কে না গিয়ে তার কাছ থেকে বার পয়সাই নিল। আমরাও তার মতো আল্লার কসম খেলেও, আল্লা বা তার, কারোর দয়া হ’ল না।। প্রদীপ এসে সব শুনে লোকটাকে পেন ফেরৎ দিতে বললো। লোকটা জানালো এক টাকা বার পয়সা দিলে তবে পেন ফেরৎ দেবে। ইতিমধ্যে আমাদের চারপাশে অনেক দর্শক জুটে গেছে। যে টেবিলটার ওপর শরবতের জগ, বোতল, গ্লাশ ইত্যাদি রাখা ছিল, সেটার একটা কোনা ধরে প্রদীপ বললো, পেন ফেরৎ না দিলে সে টেবিল উল্টে দেবে। ততক্ষণে দু’চারটে গ্লাশ মাটিতে পড়ে গেছে। আমরা গন্ডগোল বাধার আশঙ্কায় শঙ্কিত, দর্শকদের মধ্যে থেকে এবার অনেকেই আমাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। লোকটা কোন ঝামেলায় না গিয়ে সুরসুর করে পেন ফেরৎ দিয়ে দিল। এক পয়সাও দাম না দিয়ে, প্রদীপ আমাদের সঙ্গে নিয়ে বাইরে চলে এল।

বাইরে এসে কিছুক্ষণ ঘুরপাক খেয়ে আমরা দক্ষিণেশ্বর গেলাম। তপনের স্কুলের মাইনের টাকা আমাদের ভোগে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে দেখে তপনও আতঙ্কিত। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আশেপাশে ঘুরেফিরে মন্দির চত্বরে আসতে, এক ধবধবে সাদা চুলের থুরথুরে বিধবা বৃদ্ধা আমাদের বললেন “তোমরা এই বয়সেই পুণ্য করতে এসেছ বাবা”? আমি তাকে বললাম “পুণ্য আর করতে পারলাম কোথায় ঠাকুমা”? তিনি বললেন, “কেন? এখানে আসলেই পুণ্য লাভ হয়”। বললাম, “এখানে এসে গঙ্গায় স্নান করতেই পারলাম না, পুণ্য আর হ’ল কোথায়”? তিনি শুনে বললেন “কেন সাঁতার জান না বোধহয়? সাঁতার জানলে স্নান করে নাও, না জানা থাকলে গায়ে, মাথায় গঙ্গাজল ছিটিয়ে নাও, পুণ্য অর্জন নিশ্চই হবে বাছা”। বললাম, “স্নান তো করবো ঠাকুমা, সাঁতারও ভালই জানা আছে, কিন্তু সঙ্গে গামছা আনা হয়নি যে, স্নান করবো কী ভাবে”? তিনি বললেন, “তাতে কী হয়েছে? তোমরা আমার নাতির মতো, আমার গামছাটা নাও”। তিনি আমায় একটা লাল রঙের ছোট্ট গামছা দিলেন। ব্যাস, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল।

মুশকিল হ’ল গামছা মাত্র একটা, স্নান করার জন্য সাত-আটজন ইচ্ছুক ছেলে মিহির সেনের মতো সাঁতার কাটার জন্য প্রস্তুত। আমি বুদ্ধি দিলাম, প্রথমে একজন গামছা পরে গঙ্গায় নেমে গামছাটা আমাদের দিকে ছুঁড়ে দেবে। সেই গামছা পরে দ্বিতীয়জন গঙ্গায় নামবে এবং আগের মতোই তৃতীয়জনকে ছুঁড়ে দেবে। এইভাবে স্নান শেষ হলে ঠিক উল্টো প্রক্রিয়ায় একে একে পাড়ে উঠে এসে, বৃদ্ধাকে তাঁর গামছা ফেরৎ দিয়ে দেওয়া হবে।

সেইমতো এক এক করে সকলে গঙ্গায় নামলাম। আমি নামলাম সবার শেষে। যাতে স্নান সেরে সবার আগে আমি পাড়ে উঠে আসতে পারি, এবং গামছাটা সারাক্ষণ আমার কোমরে বাঁধা থাকে। বেশ কিছুক্ষণ গঙ্গায় সাঁতার কেটে, স্নান সেরে পাড়ে উঠে এসে প্যান্টজামা পরে গামছাটা দ্বিতীয়জনের উদ্দেশ্যে গঙ্গায় ছুঁড়ে দিলাম। এইভাবে তপন ছাড়া আর সকলে একে একে পাড়ে উঠে এসে জামাপ্যান্ট পরে নিল। এবার গামছাটা তপনকে ছুঁড়ে না দিয়ে একটু ওপরের সিঁড়িতে রেখে দেওয়া হ’ল। তপন ঐ জায়গায় উঠে এসে গামছাটা নিতে পারছে না। ফলে সে গামছাটা জলে ছুঁড়ে দেবার জন্য কাকুতি-মিনতি শুরু করে দিল। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে অনেক পুণ্যার্থী মজা দেখছে। কিছুতেই তাকে গামছাটা ছুঁড়ে না দেওয়ায়, এবার সে চিৎকার করতে শুরু করলো— “আমার কিন্তু লজ্জা শরম নেই, এই অবস্থায় পাড়ে উঠে যাব”। আমি বললাম, তাহলে তো গামছার আর প্রয়োজনই নেই, ঠাকুমাকে এটা ফেরৎ দিয়ে দিচ্ছি”। সে প্রায় কেঁদে ফেলার উপক্রম। শেষে তাকে গামছাটা ছুঁড়ে দিতে, সে পাড়ে উঠে এসে জানালো যে, সে আর একটু দেখে সত্যিই পাড়ে উঠে আসতো। যাহোক্, গামছাটা ভাল করে ধুয়ে, চিপে, বৃদ্ধাকে ফেরৎ দেওয়া হলে তিনি খুব খুশী হলেন। তাঁকে দেখে মনে হ’ল, আমাদের গামছা দিয়ে গঙ্গাস্নানের ব্যবস্থা করে তিনি পুণ্য লাভের আনন্দ উপভোগ করলেন। তপনের স্কুলের মাইনের টাকায় টুকটাক হাবিজাবি খেয়ে বাড়ির পথ ধরলাম।

আমার স্কুল পালানোর সবথেকে সুবিধা হয়েছিল তপার টেষ্ট পরীক্ষা হয়ে যাবার পরে তাকে আর স্কুলে আসতে না হওয়ায়। কিন্তু নতুন করে আর এক অশান্তি এসে হাজির হ’ল। দশম শ্রেণী থেকে একাদশ শ্রেণীতে ওঠার সময় আমি কমার্স বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করলাম। গতবারের প্রথম হওয়া স্বপন রায় কিন্তু এবার অতি সাধারণ রেজাল্ট করলো। রজ্ঞিত বাবু, দ্বিজেন বাবু, এমন কী গৌরীশঙ্কর বাবু বা সমীর বাবু পর্যন্ত আশা করতেন, যে আমি হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় খুব ভাল ফল করবো। তাঁরা তাই আমার পড়াশোনার ওপর বিশেষ ভাবে নজর দিলেন। আমি যে একটু চেষ্টা করলেই ভালো ফল করতে পারি কিন্তু ভীষণ রকম অমনোযোগী, এ কথাটাও তাঁরা ঘটা করে ক্ষৌণীশদাকে জানাতে ভুল করলেন না। মা বোধহয় তাঁর কাছ থেকে খবরটা পেয়ে, আমাকে মন দিয়ে পড়াশোনা করার জন্য উপদেশ দিতে শুরু করে দিলেন। সকলে একজোট হয়ে আমাকে ভালো রেজাল্ট করিয়ে দেশের, দশের, স্কুলের একজন করার পরিকল্পনা করে বসলেন। কিন্তু চারিদিকের এত আনন্দের, এত আকর্ষণীয়, এত বিষ্ময়কর, এত দ্রষ্টব্য বিষয় ছেড়ে, শুধু পড়াশোনা করে ভাল ছেলে হতে আমি তো কখনও চাইনি।

একদিন স্কুলে যাই নি। পরের দিন স্কুলে গিয়ে প্রথম পীরিয়ডেই মানিকদা এসে ক্লাশ টিচারকে বলে গেল হেডমাষ্টার মশাই বলেছেন ক্লাশের সবাইকে দাঁড় করিয়ে রাখতে। কী কারণে আমরা এতগুলো ছেলে দাঁড়িয়ে থাকছি বুঝতে পারছি না। শুধু বেদবতী ও লক্ষীকে দাঁড়াতে হ’ল না। হায় ভগবান, জন্ম থেকে শুনে আসছি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, মেয়েরা বঞ্চিত, অবহেলিত, তাদের সম অধিকার দিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তাদের জন্যই তো দেখি যত সুযোগ সুবিধা। এখন তো কাউকে গলা ফুলিয়ে বলতে শুনলাম না যে, ক্লাশের মেয়েরা দাঁড়িয়ে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

প্রথম পীরিয়ডের শেষে শিক্ষক আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে নির্দেশ দিয়ে চলে গেলেন। এতক্ষণে খবর পেলাম গতকাল দু’টো ডেস্ক ভেঙ্গে কে যেন পাশের জলহীন কুয়োয় ফেলে দিয়েছে। এরপর অবশ্য ডেস্ক কী ভাবে ভেঙ্গেছে, কে কে ভেঙ্গেছে, সব খবরই পেলাম। অনিচ্ছাকৃত খুন করার পর মৃতদেহ লোপাট করার জন্য যেমন স্যানিটারী চেম্বারে ডেডবডি ফেলে দিয়ে খুনী বাঁচবার চেষ্টা করে, এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। নিতান্তই ইয়ার্কি ঠাট্টা করে ধাক্কাধাক্কিতে দু’টো ডেস্ক মাটিতে উল্টে পড়ে গিয়ে কিছু ক্ষতি হয়েছিল। সহজেই অল্প খরচে সেগুলো সারিয়ে নেওয়াও যেত, কিন্তু হেডমাষ্টার মশাইয়ের ভয়ে ডেস্ক দু’টোকে ছোট ছোট করে ভেঙ্গে, পাশের জলহীন শুকনো কুয়োয় ফেলে প্রমাণ লোপের চেষ্টা করা হয়েছিল।

পরপর চারটে পীরিয়ড আমরা দাঁড়িয়ে থাকলাম। পরিমল বাবু আশা করেছিলেন, শাস্তি পেয়ে ছাত্ররা দোষীদের নাম বলে দেবে বা দোষীরা নিজেরাই তাদের দোষ স্বীকার করবে। কিন্তু বাস্তবে দু’টোর কোনটাই না হওয়ায়, তাঁর সাথে ছাত্রদের স্নায়ু যুদ্ধের ফল গোল লেস ড্র হওয়ায়, এক্সট্রা টাইম তিন পীরিয়ড খেলা ঘোষণা করা হ’ল। এক্সট্রা টাইম খেলার আগে বিরতি থাকে, আমাদের ক্ষেত্রে তাও দেওয়া হ’ল না। টিফিনের সময়ও সব ছাত্রকে দাঁড়িয়ে থাকার ফরমান জারি হ’ল। তাতেও ফল না হওয়ায়, পঞ্চম পীরিয়ডে পাঁচজন করে ছাত্রকে পরিমল বাবুর ঘরে ডেকে পাঠানো হ’ল। প্রথম ব্যাচ্ ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরে আসলে দেখা গেল, তাদের হাতের তালু দুটো লাল রঙের হয়ে গেছে। হাতে, পায়ে, পিঠেও ইন্টারভিউয়ের চিহ্ন বিদ্যমান। এইভাবে পাঁচজন পাঁচজন করে সবাই গিয়ে ফিরে এল, আমিও এলাম। আমি যে গতকাল স্কুলেই আসিনি এই সুসংবাদটা তাঁকে আর জানালাম না। তাতে ঘরে বাইরে, উভয় দিকেই বিপদের সম্ভাবনা আছে। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেড়বার সম্ভাবনাও প্রবল। মেয়ে দু’জনকেও আলাদা ভাবে ডাকা হয়েছিল। উদ্দেশ্য, যদি ওদের কাছ থেকে আসামীদের নাম জানা যায়। কিন্তু বেদবতী ও আধপাগলী লক্ষী, কারো নাম বলে নি। তাদের কোন দৈহিক  শাস্তি দেওয়া হয় নি। এখানেও সেই সম অধিকার দেখা গেল না। শুধু জেরাতেই তাদের চোখে জল নিয়ে ফিরতে দেখলাম। পরের দুই পীরিয়ডও দাঁড়িয়ে থাকার কথা। ষষ্ঠ পীরিয়ডও দাঁড়িয়েই কাটালাম। শেষ পীরিয়ডে স্বয়ং পরিমল বাবু নিজে ক্লাশ নিত  আসলেন। প্রথমে কিছুক্ষণ পড়া ধরে, বকাবকি করে, শেষে তিনি অনেকটা নরম হলেন। আমাদের বসতে বলে অনেক উপদেশ টুপদেশ দিয়ে, ভাল করে পড়াশোনা করতে বলে ছুটি দিয়ে দিলেন।

কিন্তু যাদের ঠিকুজিতে ভালো হওয়ার কথা লেখা নেই, তারা ভালো হবে কী ভাবে? “তোমর কর্ম তুমি কর মা, লোকে বলে করি আমি”। যিনি আমাদের ভাগ্য, আমাদের কর্ম নিয়ন্ত্রন করতেন, তিনি তাঁর কর্ম আমাদের দিয়ে করাতেন, কিন্তু সেই কর্মের কর্মফল ভোগ করার সময় তাঁকে খুঁজে পাওয়া যেত না। Empty rake এ সাঁত্রাগাছি গিয়ে, সেখান থেকে হেঁটে স্কুলে যাব। রেল লাইনের পাশে প্ল্যাটফর্মের কাছেই দু’তিনটে তাঁবু খাটিয়ে রেল লাইন মেরামতের কী কাজ হচ্ছে। তাঁবুর প্রায় সকলেই সেই কাজে ব্যস্ত। শুধু দু’তিনজন তাঁবুর ভেতর বসে রান্না করছে। আমাদের গদা চন্দ্র সেই তাঁবুতে গিয়ে ঢুকলেন, আমরাও গেলাম। তাঁবুর ভেতরে বসে তাদের সাথে গ্যাঁজাতে বসে স্কুলে যাবার সময় পার হয়ে গেল। গদার ব্যবহারে খুশী হয়ে তারা আমাদের চা তৈরী করে খাওয়ালো। গদাও খুশী হয়ে সিগারেট কিনে এনে তাদের দিল, নিজেও নিল, আমাদেরও দিল। হঠাৎ তার মনে এত পুলক জাগলো কেন কে জানে। ওপর থেকে ভাগ্যবিধাতা বোধহয় মৃদু হাসলেন।

পরদিন ক্লাশ চলছে, গোপালদা ক্লাশে ঢুকে শিক্ষককে খুব আস্তে আস্তে কী বললেন। তারপর তাঁর নির্দেশে গোপালদা ক্লাশের বাইরে গিয়ে গদাকে নিয়ে ক্লাশরুমে ফিরে এল। গদাকে দেখে আমি তো অবাক। তার মাথায় খবরের কাগজের তৈরী একটা লম্বা টুপি। হাতে একটা সাদা কাগজ। গদা ক্লাশে ঢুকে হাতের কাগজটা পড়তে শুরু করলো— “আমি, গদাধর চৌধুরী, অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। গতকাল স্কুল পালিয়ে সাঁত্রাগাছি রেলওয়ে স্টেশনের পাশে তাঁবুতে বসে সিগারেট খেয়েছি। আমি এই কাজ ভবিষ্যতে আর কোনদিন করবো না। এরপরে যদি এই কাজ আর কোনদিন করি তাহলে……”।

আমার কানে তখন আর গদার কথাগুলো প্রবেশ করছে না। এটা জলের মতো পরিস্কার, যে আমাদের গতকালের স্কুল পালানোর কোন সাক্ষী রয়ে গেছে। তার মানে সে আমাকেও দেখেছে। সে নিজে বা স্বয়ং গদা যদি আমার নাম পরিমল বাবুকে বলে, তাহলে আমারও তো এই একই দশা হবে। দু’তিন ক্লাশ উচুতে পড়ি বলে আমি নিশ্চই গদার থেকে খুব একটা লায়েক হয়ে যাই নি যে আমাকে ক্ষমা হবে। যাহোক্, গদার পাঠ শেষ হলে সে পাশের ক্লাশে চলে গেল খবরের কাগজের লম্বা টুপি পরে হাতের কাগজ পাঠ করতে। গোটা ক্লাশে হৈচৈ শুরু হ’ল। না, আমার নাম সেই অদৃশ্য সাক্ষী বা স্বয়ং গদা, কেউ-ই পরিমল বাবুকে বলে দেয় নি। যদিও গদা কারো নাম বলে দেবে, এটা ভাবাই যায় না।

এত কিছুর পরেও, না আমার, না দলের আর কারোর স্বভাব বদলালো। তার জন্য অবশ্য আমাদের নিশ্চই দায়ী করা যায় না। শাস্ত্রেই তো বলছে—“স্বভাব যায় না মলে”। যথারীতি empty rake এ আবার হাওড়া স্টেশন যাওয়ার পথে বাঙালবাবুর ব্রীজের কাছে বাঁদিক থেকে পূর্ব রেলের একটা লোকাল ট্রেন হাওড়া স্টেশনে ঢুকছে। ঐ ট্রেনের একজন মহিলাকে দেখে দলের অনেকেই নিশ্চিত ভাবে জানালো, যে সে হিন্দী ফিল্ম নায়িকা জিনত আমন। লোকাল ট্রেনের একটা সাধারণ কামরায় অত ভিড়ে জিনত আমন কেন আসবে, আসছেই বা কোথা থেকে, এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামালো না। হাওড়া স্টেশনে নেমেই সকলে দৌড়ে জিনত আমনকে কাছ থেকে দেখবার আশায় পূর্ব রেলের প্ল্যাটফর্মের দিকে দৌড় লাগালো। আজ বাড়ি থেকে আসার সময় রাস্তায় অনিলের সাথে দেখা হয়েছিল। সে আজ স্কুলে যাবে না বলে খালি গায়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিল। আমাদের দেখে সে অন্যান্য দিনের মতো আমাদের সাথে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। বাড়ি গিয়ে জামা পরে আসতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে, তাই একজন তার জামার তলার স্যান্ডো গেঞ্জিটা খুলে অনিলকে দিয়ে, নিজে শুধু জামা পরে থাকলো। ব্যাস্, স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে অনিলও চললো আমাদের সাথে। সে তার বাড়িতেও কোন খবর দেবার প্রয়োজন বোধ করলো না। আজ তো সে স্কুলে যাবে বলে বাড়ি থেকে বার হয়নি।

শেষ পর্যন্ত কাল্পনিক জিনত আমনের দেখা না পেয়ে, আমরা অভ্যাস মতো ফাঁক খুঁজে গেট পেরিয়ে গঙ্গার ধারে ঘুরেফিরে, ফিরে আসার জন্য হাওড়া স্টেশনের গেট পেরিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকবার সময় গেটের চেকার হঠাৎ টিকিট দেখতে চাইলো। ব্যাটা আসবার সময় ঘুমচ্ছিল। তখনই টিকিট দেখার ঝামেলা থাকে। অথচ এ এক উল্টো ঝামেলা। দু’তিনজন ভিতরে ঢুকে গেছে। আমরা আর ভিতরে না গিয়ে আমাদের লোক টিকিট কাটতে গেছে বলে, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। চেকারটা অনিলকে হাতের কাছে পেয়ে, হয়তো বা ওরকম রাজকীয় পোষাক দেখেই, ধরে এনে তাকে নিজের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখলো। আমাদের কারো কাছে এমন পয়সা নেই, যে অন্তত দু’জনের টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকে অনিলকে উদ্ধার করে আনা যায়। শেষ পর্যন্ত অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও অনিলকে না ছাড়ায়, বাড়ি ফিরে এসে পয়সা জোগাড় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হ’ল। আসবার সময় অনিল ছাড়া আর যারা ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল, তারাও মিলিত হয়ে একসাথে ফিরে এলাম। বাড়ি ফিরে পয়সা জোগাড় করে আবার অনিল উদ্ধারে হাওড়া স্টেশন যাবার পরিকল্পনা থাকলেও, সবাই বললো ওকে ঠিক ছেড়ে দেবে। এখন গিয়েও যে ঐ জায়গায় ওর দেখা পাওয়া যাবে তারই বা কী গ্যারান্টী আছে? শেষে শোনা গেল অনিল রাত আটটার সময় বাড়ি ফিরেছে। ওকে অবশ্য দয়া দেখিয়ে একটা টুলে বসতে দেওয়া হয়েছিল।

বছর যত শেষ হয়ে আসছে, ততই সামনের পরীক্ষার জন্য শিক্ষকরা বিশেষ ভাবে যত্ন নিয়ে, এমন কী ছুটির পরেও ছাত্রদের বিনা পয়সায় পড়িয়ে তৈরী করতে সচেষ্ট হলেন। এরমধ্যে ক্ষৌণীশদা আবার মা-বাবাকে বুদ্ধি দিলেন যে আমাকে তাঁর বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। ক্ষৌণীশদা তখন অবশ্য স্কুল ছেড়ে আকাশবাণীতে জয়েন করেছেন। আমার কিন্তু একেবারেই ইচ্ছা ছিলনা সেখানে গিয়ে থাকার। কিন্তু তাঁর কথামতো ওখানে গিয়ে থাকার জন্য বাড়ি থেকেও চাপ আসতে লাগলো। শেষে, অন্তত কিছুদিন সেখানে থেকে ভালো না লাগলে বা কোন অসুবিধা হলে চলে আসার শর্তে বই, খাতা, জামাকাপড় নিয়ে বাকসাড়ায় যেতেই হ’ল। আসলে তাঁদের ইচ্ছা ছিল পরীক্ষার শেষ ক’টা মাস আমায় বন্ধুবান্ধব, আড্ডাস্থল থেকে দুরে রেখে পড়াশোনায় একটু মনোযোগ বৃদ্ধি করা। কিন্তু দু’এক দিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম আমাকে গৃহবন্দি করা হয়েছে। আমার মতো মুক্ত বিহঙ্গের এতটুকু খাঁচায় পোষাবে কেন? কয়েক দিনেই হাঁফিয়ে উঠলাম। শেষে একদিন টিউশন পড়তে যাবার নাম করে বাড়ি ফিরে এলাম। বাবা একটু রাগারাগি করলেও, আবার বাকসাড়া ফিরে যাবার জন্য সেরকম জোর জবরদস্তি করলেন না। বনের পাখি আবার বনে ফিরে আসতে সক্ষম হ’ল।

ছোড়দি ও জামাইবাবু একটু মনক্ষুন্ন হলেও আমি মুক্ত হলাম, আড্ডা ও পড়াশোনা একসাথে ভালোই চলতে লাগলো। আস্তে আস্তে বছর শেষ হ’ল, টেষ্ট পরীক্ষাও শেষ হ’ল। ইকনমিক্স-সিভিক্সের থেকেও এখন মাতৃভাষা বাংলা, আমার কাছে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। মনসা মঙ্গল, চন্ডী মঙ্গল, বাংলা ব্যাকরণ আমাকে গভীর চিন্তায় ফেললো। যে যখন পেরেছে একটা করে মঙ্গল কাব্য লিখে যে কার কী মঙ্গল করেছে, ভগবান জানেন। তাও ভাল সন্তোষী মঙ্গল, লক্ষী মঙ্গল, শীতলা মঙ্গল, ইত্যাদি লেখা হয় নি। আমাদের দেবদেবীর যা সংখ্যা, তার এক শতাংশকে নিয়ে মঙ্গল কাব্য লিখলেই হয়েছিল আর কী।

হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার সিট পড়েছিল স্থানীয় কেদার নাথ স্কুলে। প্রথম পরীক্ষার দিনও অন্যান্য দিনের মতোই পুকুরে স্নান ইত্যাদি সুসম্পন্ন করে স্কুলে গিয়ে দেখি স্কুলের মেন গেট বন্ধ হয়ে গেছে। যাহোক্, নির্বিঘ্নে পরীক্ষাগুলো দিলাম। মোটামুটি একপ্রকার পরীক্ষা হ’ল। যদিও কোন বিষয়টাই সেরকম সুবিধার হ’ল না, হওয়ার কথাও নয়। শুধুমাত্র সকলের আশা আর শুভেচ্ছায় আর যাই হোক, রেজাল্ট ভাল হতে পারেনা। আবার শুরু হ’ল আড্ডা, খেলা, গাছে ওঠা, সাঁতার কাটা। স্কুল পালানোর কোন ব্যাপার এখন আর নেই। সুযোগের অভাবে, আর সকলের স্কুল পালানোয় সঙ্গী না হওয়ায়, তারাও মনক্ষুন্ন। ছোট্ট মাঠটাতে আগের মতোই খেলা হ’ত বটে, তবে আগের মতো নির্মল আনন্দ যেন ক্রমশঃ হ্রাস পেতেই লাগলো। খেলাধুলার সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে রক্তের টান না থাকলেও, আত্মার টানের অভাব তো কোনদিনই ছিল না। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই টানও ক্রমে হ্রাস পেতে পেতে তলানিতে গিয়ে ঠেকলো।

পাড়ায় গগনবাবু নামে এক ব্যক্তি বিশাল প্ল্যানহীন এক অসুন্দর বাড়ি করেছিলেন। তিনি হাসপাতালের বেড ও অন্যান্য সামগ্রীর ব্যবসা করেন বলে শুনতাম। যদিও আড়ালে সকলেই বলতো, আগে নাকি তিনি ডাকাতি করতেন। কথাটা সত্য কী না বলতে পারবো না। তাঁর দুই পুত্র, প্রভাত ও পলাশ। প্রভাত আমাদের থেকে কিছু বড়। প্রভাত যতটা ভদ্র ও সভ্য ছিল, পলাশ ছিল ততটাই অসভ্য। এই পলাশ আমাদের স্কুলে পড়তো। তার পোষাকের বাহার ছিল যথেষ্ট। পলাশকে আমরা কেউই বিশেষ পছন্দ করতাম না। তার বাবা সত্যিই ডাকাত ছিলেন কী না জানি না, তবে তার মা যে চোর ছিলেন তা পরে জেনেছিলাম। একবার বাস স্ট্যান্ডে একটা বড় স্টেশনারি দোকান থেকে মালপত্র কিনে চলে আসার সময়, কিছু জিনিস লুকিয়ে ব্যাগে পোরার সময় হাতেনাতে ধরা পড়ে খুব অপমানিত হয়েছিলেন বলে জেনেছিলাম। আমাদের নিজেদের মধ্যে দুরত্ব বাড়ার প্রধান কারণ, এই পলাশ। কেউ একে পছন্দ না করলেও, ধীরে ধীর ছেলেরা দুটো দলে বিভক্ত হতে শুরু করলো। সন্তুর সাথে আমার দুরত্বও ক্রমে বাড়তে লাগলো।

এর মধ্যে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হ’ল। এখন যেমন রেজাল্ট বার হলে ফল জানার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির গুণে আর ছোটাছুটি করতে হয় না, বা স্কুলে কবে কখন লিষ্ট্ টাঙ্গাবে, তার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ঘরে বসে কম্পিউটারে অনলাইনে নিজের বা অন্যের ফলাফল জেনে নেওয়া যায়। আমাদের সময় সে সুযোগ ছিল না। হায়ার সেকেন্ডারি বোর্ড একটা গেজেট প্রকাশ করতো। হয় সেই গেজেট থেকে নিজের রোল নাম্বার মিলিয়ে ফল জানতে হ’ত, নাহয় স্কুলে লিষ্ট টাঙ্গানো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হ’ত। যাহোক্, সকালে হাওড়া সমবায়িকা থেকে গেজেট বিক্রী হবে শুনে সেখানে গিয়ে দেখলাম গেজেট নিয়ে মারামারি। আসলে গেজেট কিনে নিজের পাড়ায় বা আশেপাশে পরীক্ষার ফল জানিয়ে কিছু রোজগার করার জন্য কিছু লোক সেগুলো কিনে নিত। তাদের অধিকাংশই কিন্তু কেউ কোনদিন পরীক্ষাই দেয় নি। বাড়ির কেউ পরীক্ষার্থীও নয়, শুধু রোজগারের ধান্দায় গেজেট কিনতো। আসলে আমাদের রাজ্যে চাকুরীজীবি ও ব্যবসায়ীর থেকে দালালের সংখ্যা চিরকালই অনেক বেশী। দালালের অভাব কোনকালেই হয় নি। প্রাচীন কালেও নয়, আমাদের সময়ও নয়, এখন তো নয়-ই। জনসংখ্যার মতো দালালের সংখ্যাও হুহু করে বাড়ছে। পাশ করলে একরকম রেট্, ফেল করলে ফ্রী। ভাল রেজাল্ট হলে চার্জ অনেক বেশী। আমি অনেক কষ্টে একটা গেজেট কিনলাম। গেজেট হাতে রাস্তায় আসতেই, দু’তিনটে ঐ জাতীয় দালাল আমার হাত থেকে গেজেটটা একপ্রকার জোর করেই নিয়ে, তার থেকে দু’তিনটে পাতা ছিঁড়ে নিয়ে গেজেটটা আমায় ফেরৎ দিয়ে দিল। ঐ পাতাগুলোয় সম্ভবত তাদের এলাকার স্কুলের ফলাফল ছিল। এই দু’তিনটে পাতাই তাদের ব্যবসার পক্ষে যথেষ্ট মুলধন ছিল, কিন্তু সেটাও তারা বিনামূল্যে পেতে চায়।

আমি এতক্ষণে সুযোগ পেয়ে নিজের ফল জানলাম। অসাধারণ রেজাল্ট। শিক্ষকদের ও শুভাকাঙ্খীদের আশায় জল ঢেলে দিয়ে আমি তৃতীয় বিভাগে পাশ করেছি। সামান্য কিছু নম্বরের জন্য দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করতে পারিনি। আমার জন্য শিক্ষকদের খাটুনি, ক্ষৌণীশদার আন্তরিক চেষ্টা, ভষ্মে ঘি ঢালা হ’ল। ভষ্মে ঘি ঢালা কথাটা লিখতে গিয়ে, অতীতের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। সম্ভবত সপ্তম শ্রেণীতে “ভষ্মে ঘি ঢালা” দিয়ে বাক্য রচনা এসেছিল। ভষ্ম মানেও জানা ছিল, ঘি মানে তো জানি-ই, ঢালা মানে কে না জানে? অথচ ভষ্মে ঘি ঢালা মানে আমার জানা নেই, অথচ এত সোজা বাক্য রচনাটা ছেড়ে দিতেও মন চাইছিল না। আর শিক্ষকদের আক্কেলের কথা ভেবে ভীষণ রাগ হয়ে গেল। এখনকার যুগ হলে নির্ঘাত পুলিশে ডায়েরি করা হ’ত, হয়তো মানবাধিকার কমিশনও ঝাঁপিয়ে পড়তো। কিন্তু তখন তো সে সুযোগ ছিল না, তাই অনেক ভেবে লিখেছিলাম— মরে গেলে ভষ্মে ঘি ঢালা হয়। এত উন্নত মানের একটা বাক্য পড়েও, শিক্ষকের করুণা হয়নি, মন ভরেনি। আমাকে এর জন্য অন্তত আধ নম্বর দেওয়ার সৌজন্যবোধও তাঁর হয়নি।

যদিও তখন কমার্স বিভাগে সামান্য কয়েকজন মাত্র প্রথম বিভাগে পাশ করতো। কলকাতার খুব নামী কয়েকটা স্কুল ছাড়া, কোথাও প্রথম বিভাগে পাশ করা ছাত্রছাত্রী খুঁজে পাওয়া যেত না। তবু ভাল নম্বর নিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করা অবশ্যই উচিৎ ছিল যা আর সকলে কামনা করেছিলেন। বাড়ি ফিরে এলে বাবা-মা’র খবরটা শুনে খুব মন খারাপ হয়ে গেছিল। তখন অবশ্য আমারও একটু মন খারাপ হয়েছিল এটা সত্য, কিন্তু এখন মনে হয় ভাল রেজাল্ট করতে হলে, অন্যান্য সব আনন্দের সময় থেকে ভাগ বসিয়ে আরও অনেক বেশী সময় পড়াশোনার পিছনে খরচ করতে হ’ত। তাতে পরীক্ষার ফল হয়তো আরও অনেক ভাল হ’ত, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শুভাকাঙ্খীরা হয়তো খুশী হতেন, শান্তি পেতেন। আমি হয়তো আরও দশ-বিশ হাজারের বেশী মাইনের চাকরী পেতাম, অনেক আরামে, অনেক স্বাচ্ছন্দে, অনেক বিলাসিতায় জীবনটা কাটাতে পারতাম। কিন্তু তার জন্য সেদিনের সেই অনাবিল আনন্দ, আশ্চর্য সব অভিজ্ঞতা, বিচিত্র সব মানুষের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হতাম না কী? সেগুলোর মূল্য কী সত্যিই মাসিক দশ-বিশ হাজার টাকার থেকে কম? নাঃ, আমার কাছে কিছুতেই নয়। আমি এখনও সেই জীবনের পক্ষেই হাত তুলবো।

বাড়ি আসার পথে তপনের সাথে দেখা হয়েছিল। তপন ও স্বপন দুই ভাই আমার সাথে একই স্কুলে, একই শ্রেণীতে পড়তো। কাজেই তাদের পরীক্ষার ফলও আমার হাতেই আছে। তপনের রোল নাম্বার মনে ছিল না, তাই তাকে বললাম, “রেজাল্ট্ জেনেছো”? গেজেটের নির্দিষ্ট পাতাটা খুলে তার রেজাল্ট দেখার চেষ্টা করলাম। সে বললো “গেজেট এনেছো? একবার দেখি”। সে আমার হাত থেকে গেজেটটা নিয়ে মুহুর্তের মধ্যে আমায় ফিরিয়ে দিয়ে বললো,”পাতাটা ছেঁড়া”। দেখলাম গেজেটের পাতাটায় ঠিক তার রোল নাম্বারের জায়গাটা গোল করে কেউ যেন ছিঁড়ে নিয়েছে। পরে জেনেছিলাম সে আর.এ. হয়েছে। সেদিন তার রোল নাম্বারটা জানতাম না, কিন্তু তারপর থেকে আজ প্রায় চার দশক পরেও তার রোল নাম্বারটা বেশ মনে আছে— “HOW H G104”। ওদের একটা মিষ্টির দোকান ছিল, আজও আছে। স্বপনের সাথে আমার বেশী বন্ধুত্ত্ব ছিল। তার সাথে কিছু নিয়ে ঝগড়া হলেই বলতাম, “তোদের মিষ্টির দোকানের কথা আর বলিস না। এমনি সন্দেশ পঁচিশ পয়সা, কাগজ ফুলের পাতা লাগিয়ে ত্রিশ পয়সা”। সত্যিই তাদের দোকানের কিছু সন্দেশের ওপর বগনভেলিয়া ফুলের গোলাপী পাপড়ি ছিঁড়ে লাগানো থাকতো, এবং তার দামও কিছু বেশী ছিল। তপনের সাথে আজও মাঝেমাঝে দেখা হয়। স্বপনটাই আমাদের ছেড়ে ওপারে চলে গেল।

হ্যাঁ, যেকথা বলছিলাম, হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় পাশ করে যাবার পর ঐ পলাশ ও অন্য কেউ কেউ যেন কিরকম পর হয়ে গেল। শেষে একদিন কী একটা ব্যাপার নিয়ে পলাশ বলেই ফেললো যে আমি স্বার্থপর, স্কুল পালিয়েও ঠিক পাশ করে যাচ্ছি, নিজের আখের গোছাচ্ছি, ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর একদিন অকারণে ওরা কয়েকজন গায়ে পড়ে আমার সাথে ঝগড়া করে মারামারি জুড়ে দেয়। এত মতবিরোধ আর মন কষাকষি নিয়ে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা যায় ও না, উচিৎও নয়। ফলে ধীরে ধীরে ও পাড়ায় যাওয়া বন্ধ করে দিলাম। রাস্তায় দেখা হলে কথাবার্তা হ’ত, এই পর্যন্ত। আউট অফ্ সাইট, আউট অফ্ মাইন্ড যে কত বড় সত্য উক্তি, আমার থেকে বোধহয় আর কেউ ভালো জানে না।

শিবপুর দীনবন্ধু কলেজে ভর্তি হলাম। প্রথমে আমাকে অ্যাকাউন্টেন্সিতে অনার্স দিতে রাজী না হলেও, ইংরাজী ও বুক কিপিং এ প্রয়োজনীয় নম্বর থাকায়, প্রিন্সিপাল অনার্স দিতে রাজী হয়ে গেলেন, এবং আমিও অ্যাকাউন্টেন্সিতে অনার্স নিয়ে বি.কম. এ ভর্তি হয়ে গেলাম। তপা তখন এই একই বিষয় অনার্স নিয়ে, নরসিংহ দত্ত কলেজে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ওর স্কুলের ঘনিষ্ট বন্ধু বিপ্লব কুন্ডু, আমাদের পাড়াতেই থাকতো। সেও তপার সাথেই হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে। বিপ্লবদা  প্রায় রোজই আমাদের বাড়িতে আসতো। তপার বইপত্র বা অন্যান্য সাহায্য আমার কাজে লাগবে বলে সকলেই নিশ্চিন্ত হ’ল। প্রথম দিন কলেজে গিয়ে বুঝলাম, কলেজের জগৎটা সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কেউ মাইনর নয়, সবাই অ্যাডাল্ট্।

অল্প কয়েকদিনের মধ্যে কয়েকজনের সাথে পরিচয় হয়ে গেল। বিশেষ করে মাধব, দিলীপ, ছেদা ও অমিত। ছেদার নাম অমল চৌধুরী। চার ভাইয়ের মধ্যে ও সেজো। তাই সেজদা, আর সেজদা থেকে ছেদা। ওর বাড়ির সবাই ওকে ছেদা বলেই ডাকতো। চোখ বুজে বলে দিতে পারি এটা আমার বাদা নামের মতোই ব্যাপার। দিলীপ, মাধব, অমিত ও ছেদা, সকলেই কেদারনাথ স্কুলের ছাত্র ছিল। দিলীপ থাকে স্থানীয় ইছাপুরে। ছেদার বাড়িও কাছেই, চৌধুরী পাড়ায়। অমিত আর দু’পা এগিয়ে ভট্টাচার্য্যী পাড়ায়। মাধবের বাড়ি যদিও শিবপুর ক্ষেত্র ব্যানার্জী লেনে, কিন্তু জন্মের পর থেকেই ও ওর দিদিমার কাছে মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছে। ওর মামার বাড়ি অমিতের বাড়ি থেকে আর একটু এগিয়ে, ব্যাতড় মোড়ে ডাক্তার শীতল ঘোষের বাড়ির উল্টো দিকে।

রোজ বিকেলবেলা সাঁত্রাগাছি মোড় থেকে নির্দিষ্ট সময়ে আমি আর দিলীপ বাসে উঠতাম। চৌধুরী পাড়া মোড় থেকে ছেদা ও ভট্টাচার্য্যী পাড়া থেকে অমিত উঠতো। মাধব ঐ বাসেই ব্যাতড় মোড় থেকে উঠতো। আমাদের বাস ভাড়া লাগতো আট পয়সা করে, আর মাধবের ভাড়া লাগতো সাত পয়সা। সুকুমার নামে আমাদের বাড়ির কাছের একটা ছেলেও প্রায় প্রতিদিনই আমাদের সাথে একই বাসে কলেজে যেত। সুকুমারও কেদারনাথ স্কুলের ছাত্র ছিল। ও পড়াশোনায় খুব ভাল ছিল।

বাসে চ্যাটার্জীহাট মোড়ে গিয়ে, অনেকটা পথ হেঁটে কলেজে যেতে হ’ত। যাবার পথেই একটা গলি মতো রাস্তা দিয়ে ঢুকে মাধবদের বাড়ি। ওর বাবা, মা, ভাই, বোন ঐ বাড়িতেই থাকতো। একটা মাত্র বাঁধানো খাতা নিয়ে কলেজ যেতাম। বলাই বাবু আমাদের অনার্স সাবজেক্ট, ল এর ক্লাশ নিতেন। তাঁর মতো রাশভারী মানুষ খুব কম দেখা যায়। বলাই  বাবুর ছেলেও আমাদের সাথেই পড়তো। বামন আকারের ছেলেটার চোখ মুখও কিরকম অ্যাবনর্মাল ছিল। ওপরের পাটিতে দু’পাটি দাঁত ছিল বলে মনে হ’ত। বলাই বাবুকে সংক্ষেপে বি.সি.বি, বলা হ’ত। অনার্স সাবজেক্ট অ্যাকাউন্টেন্সি পড়াতেন, এ.সি.বি. নামে এক ভদ্রলোক। এস.কে.ডি. পড়াতেন বিজনেস ও সেক্রেটারিয়াল প্র্যাকটিস। আর.ডি. নামে আর একজনও বিজনেস পড়াতেন। এইচ.পি.জি, অ্যাকাউন্টেন্সি করাতেন। এছাড়া ইংরাজী পড়াতেন সুমন চৌধুরী নামে সুপুরুষ, নায়কচিত, অত্যন্ত ব্যক্তিত্বপূর্ণ চেহারার একজন ভদ্রলোক। পি.এম. এবং এম.এম. নামে আরও দু’জন ইংরাজীর ক্লাশ নিতেন। যদিও ভূগোল থার্ড ইয়ারের সাবজেক্ট ছিল, তবু প্রথম দিন থেকে কী জানি কোন অজ্ঞাত কারণে, ভূগোলের ক্লাশ নিতেন, পি,কে.ডি. নামে এক ভদ্রলোক।

দিন কয়েক পরেই পি.কে.ডি. একদিন বললেন, আমি বলছি তোমরা সবাই ভূগোলের সিল্যাবাসটা টুকে নাও। থার্ড ইয়ারের সাবজেক্ট নিয়ে ফার্স্ট্ ইয়ারের প্রথম দিন থেকেই এত হৈচৈ, এত মাতামাতি কেন বুঝতাম না। আগে দু’বছর কাটিয়ে পার্ট ওয়ান পাশ করি, তবে থার্ড ইয়ার এবং ভূগোল। হয়তো আমার ভূগোলের পান্ডিত্বের কথা ভেবেই এই ব্যবস্থা। যাহোক্, প্রথম প্রথম যা হয়ে থাকে, আমরাও সুবোধ বালকের মতো খাতা খুলে, থার্ড ইয়ারের ভূগোলের সিল্যাবাস যত্ন করে টুকতে শুরু করলাম। আমাদের সাথে একটা দক্ষিণ ভারতীয় ছেলে ভর্তি হয়েছিল। দীর্ঘদিন পশ্চিম বাংলায় থাকার সুবাদে, সে মোটামুটি বাংলা বলতে পারতো। তবে ইংরাজীতে সে ঝড়ের মতো কথা বলতে পারতো, কিন্তু সেই মাদ্রাজী সুর ও উচ্চারণ। এই ছেলেটা খাতা না খুলে চুপ করে বসে থাকলো। হঠাৎ ব্যাপারটা পি.কে.ডি. লক্ষ্য করে ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন সে সিল্যাবাসটা লিখে নিচ্ছে না। ছেলেটা বেশ ভদ্রভাবেই উত্তর দিল, ”ওটা থার্ড ইয়ারের সাবজেক্ট, এখন থেকে ওটার সিল্যাবাস লিখে রাখার কোন প্রয়োজন নেই। পি.কে.ডি. তাকে খুব কায়দা করে বললেন, প্রথম থেকে ফাঁকি দিলে পরে মেক আপ করতে পারবে না। তোমরা বড় বেশী বোঝ ইত্যাদি ইত্যাদি। তার উত্তরে ছেলেটা ইংরাজীতে উত্তর দিতে গিয়ে একবার আটকে গেল। পি.কে.ডি. তাকে বেশ অপমানকর ভাবেই বললেন, “বাংলায় বল, বাংলায় বল, অনেক হয়েছে, ইংরাজী বলার দরকার নেই”। পি.কে.ডি. বোধহয় জানতেন না, ছেলেটা দক্ষিণ ভারতীয়, এবং বাংলার থেকে ইংরাজী ভাষায় তার স্বাচ্ছন্দ অনেক বেশী। ঐ ভাবে কথা বলায় ছেলেটা কী রকম রেগে গিয়ে অনর্গল ইংরাজীতে তার বক্তব্য বলতে শুরু করলো। এবার পি.কে.ডি. কী রকম ভ্যাবাচকা খেয়ে গিয়ে তাকে বসতে বললেন। কিন্তু সে তখন বসবে কেন? ক্লাশরুমের চারিদিক থেকে মাঝেমাঝেই আওয়াজ উঠতে শুরু করলো, “কী রে পি.কে. কী বুঝছিস? পরে ধরবো কিন্তু”। সেই দিন থেকে তাঁর ভূগোল পড়ানো চললেও, সিল্যাবাস লেখানো বা ছাত্রদের কিছু বলা বন্ধ হ’ল। ফলে একদিন দেখা গেল, তিনি আর ছাত্রদের কিছু বলছেন না, ছাত্ররাই বরং তাঁকে বলছে। আমি শিক্ষকদের পিছনে অনেক লেগেছি বটে, কিন্তু এরকম পরিবেশ, শিক্ষকের সাথে ছাত্রদের এরকম ব্যবহার কল্পনাও করতে পারতাম না। সে কথায় পড়ে আসবো।

সুমন চৌধুরীর ব্যক্তিত্বের কাছে ছাত্ররা কেঁচো হয়ে থাকতো। একদিন তিনি ক্লাশ নিচ্ছেন, পাশের ঘরের ক্লাশের ছাত্ররা খুব চিৎকার চ্যাঁচামিচি করছে। সংক্রামক রোগের মতো অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের ক্লাশেও গুঞ্জন শুরু হ’ল। হঠাৎ সুমন বাবু পড়ানো থামিয়ে বললেন, তোমরা একটা কাজ করতে পারবে? ছাত্ররা বললো, বলুন স্যার। তিনি বললেন, তোমরা পাশের ক্লাশের ছেলেদের থেকে জোরে চিৎকার করতে পারবে? ছাত্ররা উৎসাহিত হয়ে বললো, হ্যাঁ স্যার, নিশ্চই পারবো। তিনি শুধু বললেন, তাহলে তোমরা চিৎকার করো, আমি যাই। সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররা ব্যাপারটা বুঝে বলে উঠলো, না স্যার। এরপরে ক্লাশরুমে আর কোন ছাত্রের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল না। তিনি সত্যিই খুব ভালো পড়াতেন। চৌধুরী পাড়ায় গোলবাড়ি নামে খ্যাত একটি বাড়িতে তিনি থাকতেন, আজও সেখানেই বসবাস করেন। সাদা রঙের একটা ল্যান্ডমাষ্টার গাড়ি নিয়ে তিনি কলেজে যেতেন। গাড়ির নাম্বার আজ এত বছর পরেও মনে আছে—WBE 1917, মনে আছে কারণ ঐ গাড়িতে আমরা বেশ কয়েকবার তাঁর সাথে কলেজ থেকে ফিরেছি। পরবর্তীকালে তিনি সম্পর্কে আমার দাদুশ্বশুর না দাদাশ্বশুর কী বলে, তাই হয়েছেন। সম্পর্কে তিনি আমার স্ত্রীর মা’র মামা হন। নাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কাজের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। বেশ কয়েক বছর আগে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পরে, তিনি কিছুটা একা হয়ে পড়েছিলেন। কিছুদিন আগে তাঁর এক পুত্রের অকাল মৃত্যু, তাঁকে আরও একা করে দিয়েছে।

বি.সি.বি. অর্থাৎ বলাই বাবু যখন ক্লাশ নিতেন, আমরা টুঁ শব্দটি করতে সাহস পেতাম না। তিনি ছিলেন নামকড়া ব্যারিষ্টার। খুব ভালো ল পড়াতেন। তিনি কেবল অনার্স ক্লাশের ছাত্রদের ল পড়াতেন। পাশ কোর্সের ল-এর ক্লাশ, মনিবাবু নিতেন। তাঁর ক্লাশও অনেকবার করেছি, সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

এস.কে.ডি. নামে এক ভদ্রলোক আমাদের সেক্রেটারিয়াল প্র্যাকটিস ক্লাশে প্রায়ই চিঠি লেখা শেখাতেন। পড়ানোর সময় কোন উদাহরণ দিতে গেলেই, তিনি বলতেন- “সাপোজ সান সাইন এন্ড কোম্পানী…”। জানিনা ঐ নামটা কেন তিনি সবসময়ে বলতেন। হয়তো তাঁর নিজের কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম, সান সাইন এন্ড কোম্পানী ছিল। একদিন কায়দা করে উচ্চারণ করতে গিয়ে, ক্যাপাসিটিকে কিরকম ফিসফিস্ করে খ্যাপাসিটি বলে বসলেন। ব্যাস শুরু হয়ে গেল চারিদিক থেকে ফিসফিসানি আওয়াজ— খ্যাপাসিটি, খ্যাপাসিটি।

আর একদিন তিনি ক্লাশে খুব মন দিয়ে পড়াচ্ছেন, আমি পিন্টু নামে সদ্য পরিচিত একটা ছেলের সাথে আলাপচারীতায় ব্যস্ত। হঠাৎ তিনি চুপ করে যাওয়ায় আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনি চশমার মোটা মোটা কাচের ভিতর দিয়ে আমার দিকে একভাবে তাকিয়ে আছেন। এবার তিনি আমাকে তিনি কী পড়াচ্ছিলেন জিজ্ঞাসা করায়, আমার পাশের ছেলেটা উঠে দাঁড়ালো। তিনি কী পড়াচ্ছিলেন আমার পক্ষে বলা আদৌ সম্ভব ছিলনা, কারণ এতক্ষণ আমি তাঁর একটা কথাও শুনি নি। পাশের ছেলেটা উঠে দাঁড়াতেই, তিনি তাকে বসতে বলে বললেন, আমি যাকে জিজ্ঞসা করেছি সে ভালোই বুঝতে পেরেছে। এরপর তিনি আমার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, “ইউ, ইউ দি বয়, আমি কী পড়াচ্ছিলাম”? কী পড়াচ্ছিলেন শুনলে তো বলবো। বাধ্য হয়ে বললাম, “আপনি কী পড়াচ্ছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না স্যার”। তিনি খুব গম্ভীর হয়ে বললেন, “তুমি যদি পড়া বলতে পারতে তাহলে আমার বুকটা গর্বে ফুলে উঠতো, কিন্তু এই যে তুমি গল্প করছো আর পড়া বলতে পারলে না, এতে আমার বুকটা বেদনায় ভরে গেল”। শুনে আমি হাসবো না কাঁদবো ভেবে পেলাম না। ক্লাশের সমস্ত ছাত্রদের সামনে এভাবে বলায়, কিরকম লজ্জা লজ্জা করতে লাগলো। তবে কিছুদিন কাটার পর বুঝেছিলাম, এটা কোন ব্যাপারই নয়। সকল ছাত্রের কপালেই এই জাতীয় মন্তব্য জোটে, এবং এসব নিয়ে কেউ মাথাও ঘামায় না।

মাঝেমাঝে অনার্স ক্লাশ না থাকলে আমরা পাশ কোর্সের ক্লাশে গিয়ে বসতাম, বা লাইব্রেরীতে গিয়েও বসতাম। লাইব্রেরীতে কানাইদা ও রঞ্জিতদা নামে দু’জন বইপত্র দিতেন। কানাইদাকে কলেজের প্রতিটা ছাত্র ভীষণ ভালোবাসতো, শ্রদ্ধাও করতো। রঞ্জিতদাও খুব ভালো লোক ছিলেন, তাঁকেও ছাত্ররা খুব পছন্দ করতো। কলেজ শেষ হলে একটু দুরে একটা হিন্দুস্থানীর চায়ের দোকানে চা খেয়ে, আমরা হেঁটে হেঁটে চ্যাটার্জীহাট বাসস্ট্যান্ডে এসে, বাস ধরে যে যার স্টপেজে নেমে বাড়ি ফিরে আসতাম। ঐ চায়ের দোকানটা একজন বৃদ্ধ দোকানদার চালাতেন। তার ভুঁড়িটা দেখার মতো আকারের ছিল। উননের অনেকটা দুরে বসলেও, তার ভুঁড়িটা প্রায় উননের ওপর এসে পড়তো। ভাবতাম এত তাপেও তার চর্বি গলে ভুঁড়িটা কেন এতটুকুও কমে না। চায়ের ভাঁড়ে চা দিয়ে, তার ওপরে হাতা করে খানিকটা বেশ মোটা দুধের সর দিয়ে দিত। ফলে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই জিভ পুড়ে যেত। তা হোক্, তবু তার চা-টা ভারী ভালো খেতে ছিল।

আমার রক্ত মজ্জায় পালাবার নেশা, সেসব ছেড়ে ভালো ছেলের মতো ক্লাশে আর কত বসে থাকা যায়? কিছুদিন পর থেকে পাশ কোর্সের ক্লাশ না করে শিবপুর শ্মশান ঘাটে, লঞ্চ ঘাটে, আড্ডা মারতে যাওয়া শুরু হ’ল। স্কুলের মতোই কলেজ পালানো। পার্থক্য একটাই, স্কুলে ভয়, ঝামেলা, নালিশ ইত্যাদি ছিল, এখানে স্বাধীন নাগরিক। কলেজ পালানো আমার গনতান্ত্রিক অধিকার। আমার মতো অভিজ্ঞ নেতার সঙ্গীর অভাব হওয়ার কথা নয়, হ’লও না। অনার্স ক্লাশগুলো করতাম। তারপর, পাশ কোর্সের ক্লাশে না গিয়ে শ্মশান ঘাটে গিয়ে আমরা অনেকক্ষণ বসতাম। তখনও ইলেক্ট্রিক চুল্লি হয় নি। ওখান থেকে আবার লঞ্চ ঘাটে গিয়ে গাধাবোটের ওপরেও বসে কিছুটা সময় কাটাতাম। পরপর গায়েগায়ে দাঁড় করানো অনেকগুলো গাধাবোট লঞ্চঘাটের পাশেই দাঁড় করানো থাকতো। ওগুলোর ওপরে কাউকে উঠতে দেওয়া হ’ত না। আমরা যেহেতু প্রায় রোজই যেতাম, তাই আমাদের তারা চিনে যাওয়ায় বিশেষ আপত্তি করতো না। আমরা একটা থেকে অপরটায় লাফিয়ে লাফিয়ে গিয়ে, শেষ বোটটায় শুয়ে বসে গঙ্গার ঠান্ডা হাওয়ায় গুলতানি করতাম। শ্মশান ঘাটে প্রায় রোজ গেলেও, কোন মৃতদেহ সৎকার করতে তখনও পর্যন্ত যাই নি।

কয়েক মাস পর থেকেই একে একে সবাই অনার্স ছেড়ে দিতে শুরু করলো। আমিও বেশ বুঝতে পারছিলাম যে অনার্স টিকিয়ে রাখা বেশ শক্ত। মাধব, সুকুমার ও আরও অনেকেই আমাকে বোঝালো— শেষে অনার্স ও থাকবে না, গ্র্যাজুয়েট হওয়াও যাবে না। তার থেকে পাশ কোর্সে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কী করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমি জানতাম অর্ডিন্যারি গ্র্যাজুয়েট হয়ে চাকরী পাওয়া মুশকিল হবে। আমার তো হবেই, কারণ আমার যা ব্রিলিয়্যান্ট রেজাল্ট আগে হয়েছে। শেষে আমার সমস্ত বন্ধুবান্ধব অনার্স ছেড়ে দিয়ে বেশ হাল্কা হয়ে গেল। আমি একা অনার্স আঁকড়ে পড়ে থাকলাম। অনার্স ক্লাশগুলো একা একাই করি। অবশ্য অনার্স ক্লাশের কিছু ছেলের সঙ্গেও ভালই বন্ধুত্ব হয়েছে, তবে ওরা কেউই আমার শ্মশান বা্ লঞ্চ ঘাটের সঙ্গী ছিল না। পাশ কোর্সের কিছু ক্লাশ একসাথে করি। বেছে বেছে পাশ কোর্সের ক্লাশ করতাম। অনার্স ক্লাশগুলো সাধারণত প্রথম দিকে থাকতো। ঐ সময়ে মাধব, দিলীপদেরও ঐ বিষয়গুলোর পাশ কোর্সের ক্লাশ থাকতো। ফলে অনার্স ক্লাশগুলো শেষ হলে, পাশ সাবজেক্টের কমোন ক্লাশ আর না করে অধিকাংশ দিনই মাধব, দিলীপ, ছেদা, অমিত আর আমি, হেঁটে হেঁটে শিবপুর শ্মশান ঘাট, লঞ্চ ঘাট, ভবঘুরে আশ্রম, বা অন্যান্য কোন না কোন স্থানে চলে যেতাম। শ্মশান ঘাটের বাঁধানো চাতাল মতো জায়গায় বসে থাকতাম, বা লঞ্চ ঘাটের লঞ্চে ওঠার জন্য বাঁধানো উচু ব্রীজের মতো জায়গাটায় বসে থাকতাম। সেখানে কিছুক্ষণ থেকে, সময় মতো নির্দিষ্ট চায়ের দোকানে গিয়ে জিভ পোড়া গরম চা খেয়ে বাড়ি ফেরা। বাসস্ট্যান্ডে হেঁটে আসার পথে কোন কোন দিন মাধব আমাদের নিয়ে ওর বাবা-মা’র কাছে যেত। ওখানে গেলে কিছু না কিছু খেয়ে বাড়ি ফিরতাম।

পরবর্তী অংশ সপ্তম পর্বে……….

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s