স্মৃতি (সপ্তম পর্ব)

TRIKUT PAHAR, DEOGHAR-DEC'76 (11)আমার হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ার জন্য আমার ফাঁকি দেওয়া, অমনোযোগ ও স্কুল পালানো ছাড়া আর এক ভদ্রলোককে অবশ্যই দায়ী করা যেতে পারে। তিনি বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তখন তাঁর গানে আমি এতটাই পাগল ছিলাম, যে মনে হ’ত তাঁর বাড়িতে চাকরের কাজ পেলেও করতে রাজী। তবু তো তাঁকে রোজ সামনে থেকে দেখতে পাব, তবু তো তাঁর গাওয়া গান রোজ সামনে থেকে শুনতে পাব। পড়ার সময় রেডিও খুলে রাখতাম। বিভিন্ন শিল্পীর গান বাজানো হ’ত, রেডিও খুলতাম আর অন্য কারো গান বাজানো হলে বন্ধ করে দিতাম। একটু পরেই আবার খুলতাম, আবার বন্ধ করতাম। এইভাবে পড়া আর হ’ত না, শুধু রেডিও নিয়েই কেটে যেত। অথচ তাঁকে চাক্ষুস দেখার সুযোগ তখনও হয়নি। এই রকম একটা সময় নরসিংহ দত্ত কলেজের ফাংশানে শুনলাম হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আসছেন। আমাদের সেই বিখ্যাত “মেনো” তখন ঐ কলেজে ভর্তি হয়েছে। তাকে একটা কার্ড ম্যানেজ করে দেবার জন্য ধরলাম। কিন্তু যখন বুঝলাম ওর দ্বারা সেটা সম্ভব নয়, তখন ওর নিজের কার্ডটা আমাকে দেবার জন্য অনুরোধ করলাম। ও তো কিছুতেই দেবে না। হেমন্ত মুখার্জী আসছেন তাই আমি নিজে দেখতে যাব, তোকে অন্য কার্ড ম্যানেজ করে দেব, ইত্যাদি বলে এড়িয়ে যেতে লাগলো। অনেক কষ্টে, অনেক চেষ্টায়, ওকে বুঝিয়েই ছাড়লাম যে, হেমন্ত মুখার্জী আসছেন না, যত আজেবাজে শিল্পীরা আসছে। ওর কলেজের ফাংশান, অথচ শেষ পর্যন্ত ও আমার কথায় বিশ্বাস করে ওর কার্ডটা আমাকে দিয়ে দিল। একবারও প্রশ্ন করলো না যে হেমন্ত যদি নাই আসে, তাহলে আমারই বা ঐ ফাংশানে যাবার এত আগ্রহ কেন? যদিও ওর কাছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর পাড়ার সুকদেব, একই দরের শিল্পী। আজ এত বছর পরে আর মনে করতে পারিনা যে, ঐ কার্ডের জন্য আমি তপাকে কেন বলিনি, ও তো তখন ঐ কলেজেরই ছাত্র ছিল। ফাংশানে ও গেছিল কী না তাও আর মনে পড়ে না।

যাহোক্, অনেক আশা নিয়ে নরসিংহ দত্ত কলেজে গিয়ে দেখি, বেশ সরু কিন্তু অনেকটা লম্বা জায়গা জুরে ম্যারাপ বেঁধে ফাংশান হচ্ছে। অসম্ভব ভিড়, তাই অনেক পিছনে দাঁড়াতে হ’ল। এই জায়গায় সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফাংশান দেখছে, কাজেই বসার কোন সুযোগ নেই, সামনে এগবারও কোন উপায় নেই। বহু দুর থেকে দেখলাম, সুমিত্রা সেন রবীন্দ্র সংগীত গাইছেন। তাঁকে আগে দেখেছি বলে চিনতে পারলাম। তা নাহলে ভাল করে দেখাও যাচ্ছে না। কী করা যায় ভাবছি, এমন সময় এমন একটা ঘটনা ঘটলো, যা আমার ভাগ্য ফিরিয়ে দিল।

বড় বড় গাছগুলোর মাথা ম্যারাপের বাইরে বার করিয়ে দিয়ে ম্যারাপ বাঁধা হয়েছে। ফলে লম্বা মতো সরু জায়গাটায়, অনেক গাছ ভালভাবে দেখতে বাধা সৃষ্টি করছে। আমার ঠিক পাশের একটা গাছের ওপর থেকে কয়েকটা ছেলে সিগারেট ধরিয়ে জ্বলন্ত দেশলাই কাঠি নীচে ফেলতেই হৈচৈ শুরু হয়ে গেল। আমাদের ঠিক সামনে যারা বসেছিল তারা সবাই ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ধর শালাকে, মার শালাকে বলে চিৎকার শুরু করে দিল। কিন্তু বাস্তবে তাদের ধরা বা মারার জন্য গাছে না উঠে, ধাক্কাধাক্কি করে সামনে এগতে শুরু করলো। সেই সুযোগে আমি পিছনের প্রচন্ড চাপে এবং নিজের চেষ্টায় যখন ঠেলাঠেলি করে সামনে গিয়ে বসার সুযোগ পেলাম, তখন দেখি নারকেল দড়ি দিয়ে জায়গাটা ঘিরে, কাগজে “প্রেস অ্যান্ড গেষ্ট” লিখে আলাদা করা হয়েছে। মেনোর সৌজন্যে ও ইউনিভার্সাল শালাদের সিগারেট ধরিয়ে জ্বলন্ত কাঠি ফেলে সহযোগীতায়, আজ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে একবারে কাছ থেকে দেখার সুযোগ মিলবে। অবশ্য নিয়ম মাফিক আমার তো এখানেই বসা উচিৎ। অন্য কলেজের ছাত্র হিসাবে আমাকে তো গেষ্ট বলা-ই উচিৎ। সুমিত্রা সেন তখনও গান গাইছেন। তাঁর গান শেষ হলে ঘোষণা করা হ’ল যে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এসে গেছেন এবং আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি গান শুরু করবেন। এর কিছুক্ষণ পরেই তিনি স্টেজে এসে একের পর এক, অনেক গান গাইলেন। পরবর্তীকালে তাঁকে অনেক বার দেখার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু তাঁকে প্রথমবার অত কাছ থেকে দেখার আনন্দটাই ভিন্ন স্বাদের ছিল।

এখন যেমন সব ছেলেমেয়েরাই কম্পিউটার শেখে, আমাদের সময় কম্পিউটারের চল শুরু না হওয়ায়, অধিকাংশ ছেলেরা টাইপ  শিখতো। কেউ কেউ আবার সঙ্গে শর্টহ্যান্ড রাইটিংও শিখতো। অমিতের বাবা তাঁর বাড়ির দোতলায় টাইপ-শর্টহ্যান্ড স্কুল চালাতেন। তিনি নিজে খুব ভাল শর্টহ্যান্ড জানতেন। অনেকগুলো টাইপরাইটার থাকলেও, তিনি নিজে টাইপরাইটারের ছোট খাটো মেরামতিও করতে পারতেন না। আমি তাঁর কাছে টাইপ-শর্টহ্যান্ড শিখতাম। তপাও অন্য এক জায়গায় টাইপ ও শর্টহ্যান্ড শিখতো। অমিতের বাবা নিজের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য একটা ভাল টাইপরাইটার রেখেছিলেন। সেই মেশিনটাতে তিনি কোন ছাত্রকে হাত দিতে দিতেন না। অথচ ঐ ভাল মেশিনটাতে টাইপ করার আমার খুব শখ ছিল। শেষে বুদ্ধি করে তারও একটা ব্যবস্থা করে ফেললাম। কথায় বলে ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। ছাত্রদের জন্য নির্দিষ্ট টাইপরাইটার গুলোর কোনদিন এটার কোনদিন ওটার স্প্রিং, স্ক্রু বা ঐ জাতীয় কিছু একটা খুলে দিতাম। ঐ মেশিনের ছাত্র এসে মেশিনের অভাবে ফিরে যাবার উপক্রম হলে, আমাকেই চিফ্ মেকানিকের ভূমিকা নিতে হ’ত। ঐ মেশিনের আমারই সৃষ্ট গন্ডগোলটা কোথায় আমার জানা থাকায়, অমিতের বাবার সামনে মেশিনটা নিয়ে খানিক নাড়াচাড়া করে, গন্ডগোলটা সারিয়ে ফেলতাম। নিজের খোলা স্প্রিং বা স্ক্রু আবার নির্দিষ্ট জায়গায় লাগাতে বেশ কিছুক্ষণ সময় নিতাম। তাড়াতাড়ি ঠিক করে দিলে সন্দেহ হতে পারে, তাছাড়া মেকানিকের শ্রম ও দক্ষতার কদর থাকে না। মেশিন ঠিক হয়ে যাবার পরে উনি সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে বলতেন। আমি তাঁর বিপদের ত্রাতা এবং আমার জন্য তাঁর ছাত্রদের ফিরে যেতে হয়নি, বা মেকানিককে অযথা টাকা দিতে হয়নি বলে, তিনি খুব খুশী হতেন। এরপর আমার মতো দক্ষ মেশিন বিশেষজ্ঞকে তাঁর নিজের ভাল টাইপরাইারটা ব্যবহার করতে দিয়ে তিনি ধন্য হতেন।

কলেজে ওঠার পরে স্বাভাবিক ভাবেই আমার কিছু হাত খরচের প্রয়োজন হ’ত। বাবার কাছ থেকে বিশেষ কিছু পাওয়া যেত না। দিদি তখন হাসনাবাদে থাকতো। জামাইবাবু উলুবেড়িয়া স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে, হাসনাবাদে একটা স্কুলে প্রধান শিক্ষকের চাকুরী নিয়ে ওখানে চলে যান। আরও অনেক পরে ওখান থেকে হিঙ্গলগঞ্জের একটা স্কুলে একই পদে যোগ দেন। দাদা বছর খানেক হ’ল স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় চাকরী পেয়ে, পুরুলিয়ায় চলে গিয়ে একটা মেসে থাকে। আমি সুযোগ ও প্রয়োজন মতো হাসনাবাদ বা পুরুলিয়ায় যেতাম। ঘোরাও হ’ত, আবার কিছু অর্থের আমদানীও হ’ত। পুরুলিয়া যেতে কোন খরচ হ’ত না। বাবা রেলের ফার্ষ্ট ক্লাশ পাশ পেলেও কোথাও যেতেন না, বরং বলা ভাল যাবার মতো বিলাসিতা করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। ফলে এইভাবেই রেলের পাশের যেটুকু ব্যবহার হ’ত।

একবার পুরুলিয়া যাবার ঘটনা বেশ মনে পড়ে। আমি আর তপা পুরুলিয়া যাচ্ছি। ফার্ষ্ট ক্লাশের একটা কুপ বাবা রিজার্ভ করে দিয়েছেন। বাড়ি থেকে বিশেষ কিছু খেয়ে গেলাম না। রাস্তায় পছন্দের খাবার কিনে খাব, মনে এই বাসনা ছিল। সামান্য কিছু টাকা সঙ্গে নিয়ে আমরা দুইভাই হাওড়া স্টেশনে গেলাম। বাবা আমাদের ট্রেনে তুলে দেবার জন্য আমাদের সঙ্গে গেলেন। সেদিন আবার একটা বড় রাজনৈতিক দলের কলকাতায় বড় মিটিং ছিল। ট্রেনেরও কিছু গোলমাল ছিল। আমাদের ট্রেনটাতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। প্ল্যাটফর্মেও লোকে লোকারণ্য। ফার্ষ্ট ক্লাশ বগির করিডোরে দেহাতি মানুষ দল বেঁধে বসে আছে। করিডোর দিয়ে হাঁটার উপায় নেই। আমাদের জন্য নির্দিষ্ট কুপেতেও ঐ জাতীয় লোকে ভর্তি। নীচে পা ফেলার উপায় নেই। সিটের একপাশে, জানলার ধারে এক ভদ্রলোক একটা শিশুকে নিয়ে বসে আছেন। বাবা আমাদের দু’জনকে নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে বেশ গম্ভীর ভাবে সবাইকে নেমে যেতে বললেন। কয়েকজন ঠেলাঠেলি করে বেড়িয়ে গেলেও, বেশীর ভাগই নির্বিকার ভাবে মেঝেতে বসে রইলো। বাবা তখন পুলিশ ডাকার ভয় দেখালেন। এবার কিছুটা কাজ হ’ল। ঐ ভদ্রলোক শিশুটিকে নিয়ে বসে থাকলেন, বাকী সবাই বেড়িয়ে গেল। বাবা তখন ভদ্রভাবে ঐ ভদ্রলোককে আমাদের কুপ থেকে নেমে, অন্য কোন জায়গায় চলে যেতে বললেন। ভদ্রলোকও খুব শান্ত ও ভদ্র ভাবেই জানালেন, যে তিনি সামনেই একটা স্টেশনে নেমে যাবেন। এই ভীড়ে এতটুকু বাচ্ছা নিয়ে যাওয়া খুব বিপজ্জনক। তিনি বললেন, সামনেই তিনি নেমে যাবেন। নামার সময় আর কেউ যাতে কুপের ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে, এবং আমাদের যাতে কোন অসুবিধা না হয়, সে বিষয় তিনি অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন। ঠিক মনে নেই, তবে সেই সময় ট্রেনটা আন্দুল না উলুবেড়িয়া, কোথায় যেন দাঁড়াতো। অনেক অনুরোধের পরেও ভদ্রলোক না নেমে বসেই থাকলেন। বাবা ট্রেন থেকে নেমে যাবার সময় সকলকে শুনিয়ে বেশ জোরে জোরে বললেন, কোন অসুবিধা হলেই পুলিশ ডাকতে।

গাড়ি ছাড়ার পরে শুরু হ’ল আরও লোকের আমাদের বগিতে ওঠা ও আমাদের কুপের বন্ধ দরজায় ধাক্কা দেওয়া। এই বগির অন্যান্য দরজায় ধাক্কা দেওয়াও সমান তালেই চলছিল। যাহোক্, নির্দিষ্ট স্টেশনে আমাদের কুপের ভদ্রলোক সঙ্গের বাচ্ছাটাকে নিয়ে কোন মতে নেমে গেলেন। আমরাও কুপের দরজা লাগিয়ে লক্ করে দিলাম। এই কুপের মধ্যে একটা  হাত মুখ ধোয়ার বেসিন ছিল, জলের ব্যবস্থাও ছিল। আগে কখনও কোন ফার্ষ্ট ক্লাশে, এই ব্যবস্থা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। এছাড়া করিডোরের দিকে একটা জানালাও ছিল। আমরা এই জানালাটা খুলতেই দেখি, করিডোরের ওপাশের জানালায় একজন পাঞ্জাবী ভদ্রলোক হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বেশী বয়স নয়। সাদা জামা, ডিপ কালারের প্যান্ট, চওড়া টাই ও পালিশ করা শু। আমরা জানালাটা খুলতেই, ভদ্রলোক ওদিকের জানালায় কোন মতে বসে, আমাদের কুপের জানালায় পা দুটো তুলে দিলেন। এতে তাঁর একটু সুবিধা হ’ল। আমরা জানালাটা বন্ধ করার চেষ্টা করতেই, তিনি বারণ করলেন এবং তাঁর পা দুটো এমন ভাবে রাখলেন, যাতে আমরা জানালাটা কিছুতেই বন্ধ করতে না পারি।

এক সময় ট্রেন খড়গপুরে এসে পৌঁছালো। এখানে যাহোক কিছু খাবার কিনতে হবে। তা নাহলে সারা রাত অভুক্ত থাকতে হবে। খড়গপুরে গাড়ি দাঁড়াতে কুপের দরজা একটু ফাঁক করে আমি করিডোরে বেরিয়ে এলাম। দরজাটা খুলবার সময় বুঝতে পারলাম, দরজাটা ঠিক মতো খোলা বন্ধ করা যাচ্ছে না। অনবরত ধাক্কাধাক্কিতে দরজাটা রেল থেকে একটু সরে গিয়ে কিরকম বাঁকা হয়ে গেছে। আমি কুপে থেকে বার হতেই, পাঞ্জাবী ভদ্রলোক আমাকে কী যেন বলতে গেলেন। আমি তাঁকে একটু অপেক্ষা করতে বলে প্ল্যাটফর্মে নেমে গেলাম। কিছু কেনার আগেই তপা জানালা দিয়ে হাত নেড়ে আমাকে ডাকতে শুরু করলো। জানালার কছে ফিরে এসে শুনলাম, পাঞ্জাবী ভদ্রলোক ঠিক কুপের দরজাটা গার্ড করে দাঁড়িয়ে আছেন এবং কুপের ভিতরে ঢুকতে চাইছেন। খাবার কেনা মাথায় উঠলো, ট্রেনে ফিরে এলাম। পাঞ্জাবী ভদ্রলোক আমাকে জানালেন, যে তিনি নিজেও রেলে কাজ করেন, তাঁর ফার্ষ্ট ক্লাশ পাশ আছে। আমরাও যেহেতু রেলের পাশ নিয়ে যাচ্ছি, তাই আমরা একটা ফ্যামিলির মতো। তিনি আদ্রা যাবেন। অতটা পথ এইভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই তাঁকে যদি আমরা ভিতরে জায়গা দেই, তাহলে আমরা দু’জনে একটা বার্থে এবং তিনি একটা বার্থে শুয়ে যেতে পারেন। অথবা ইচ্ছা করলে তিনি আর আমাদের একজন একটা বার্থে শুয়ে, অপরজন অন্য বার্থটায় শুয়ে যেতেও পারি।

পাঞ্জাবী ভদ্রলোকটি ঠিক কুপের দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছেন। বুঝতেই পারছি একবার দরজা খুললে তিনি জোর করে ভিতরে ঢুকলে, তাঁকে বার করা শক্ত হবে, কারণ ট্রেনে কোন টি.টি.ই. নেই। আমি তাঁকে খুব শান্ত ভাবে বললাম যে, আমাদের ফার্ষ্ট ক্লাশ পাশ আছে এবং দুটো বার্থ রিজার্ভ করাও আছে। কাজেই তিনি অন্য কোথাও চেষ্টা করে দেখুন। উত্তরে তিনি বললেন, তাঁরও ফার্ষ্ট ক্লাশ পাশ আছে, তবে কোন বার্থ রিজার্ভেশন করা সম্ভব হয় নি। একটা রাত একটু কষ্ট করে গিয়ে তাঁকে একটু জায়গা দিলে, তাঁর খুব উপকার হয়। বুঝলাম এঁর মতলব ভালো নয়। তিনি কিছুতেই দরজার কাছ থেকে সরছেন না। অর্থাৎ হয় তাঁকে ভিতরে ঢুকতে দিতে হবে, না হয় আমাকে বাইরে করিডোরে দরজার সামনে তাঁর সাথে দাঁড়িয়ে যেতে হবে।

তাঁকে আবার খুব শান্ত ও ভদ্র ভাবেই বললাম, অন্য কোন বার্থে চেষ্টা করে দেখতে, না পেলে আমরা যেহেতু একই প্রতিষ্ঠানের লোক, তাই তাঁকে আমাদের সাথে নিয়ে নেব। তিনি জানালেন, তিনি খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, কোথাও কোন বার্থ খালি নেই। আমি বললাম আমাদের পরের পরেরটায় একটা বার্থ হাওড়া থেকে খালি এসেছে। ট্রেনে কোন টি.টি.ই. নেই বলে কাউকে রিজার্ভেশন দেওয়াও হয় নি। ওটাতে একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন, না পেলে না হয় আমাদের সাথেই যাবেন। তিনি বোধহয় আমার চালাকি ধরতে পেরেই বললেন, এই করিডোর দিয়ে হাঁটা যাবেনা কারণ বহুলোক এখানে শুয়ে বসে আছে। তাঁর দু’হাতে কাচের জিনিস আছে, কাজেই আমি যেন ঐ বার্থটার ব্যাপারে একটু খোঁজ নিয়ে আসি। বুঝলাম ভদ্রলোক একটা ঝানু শয়তান। ঊত্তেজিত না হয়ে খুব ভদ্রভাবে বললাম, “ঠিক আছে আমি আপনার ব্যাগদুটো ধরছি, আপনি প্ল্যাটফর্ম দিয়ে ওদিকে গিয়ে দয়া করে একটু খোঁজ নিয়ে আসুন। আমি অপেক্ষা করছি”। এবার ভদ্রলোক একটু নিমরাজী হয়েই, আমার হাতে ব্যাগদুটো দিয়ে প্ল্যাটফর্মে নামলেন। সঙ্গে সঙ্গে তপাকে দরজাটা খুলতে বললাম। ও একটু চেষ্টা করে দরজাটা একটু খুললো বটে, তবে দরজাটা কিরকম বাঁকা ভাবে খুললো। আমি এতটুকু সময় নষ্ট না করে করিডোরের জানালার কাছে তাঁর ব্যাগদুটো রেখে, কুপেতে ঢুকে দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করলাম। ততক্ষণে পাঞ্জাবী ভদ্রলোক বুঝে গেছেন যে, তাঁকে বোকা বানানো হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি কামরায় উঠে এলেন। কিন্তু ততক্ষণে আমি অনেক চেষ্টায় দরজা বন্ধ করে ভিতর থেকে লক করে দিতে সমর্থ হয়েছি। তিনি বেশ জোরে জোরে ধাক্কা মেরে দরজাটা খোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। আমি করিডোরের জানালাটা বন্ধ করে দিলাম।

সারারাত খালিপেটে, শুধু জল খেয়ে, কুপের ভিতরের বেসিনে ছোট বাইরে করে, আমরা ভোরবেলা আদ্রা স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। আমরা যাব পুরুলিয়া। পাঞ্জাবী ভদ্রলোক এখানে নেমে গেলেন। প্ল্যাটফর্মে নেমে তিনি যেভাবে আমাদের দিকে তাকালেন, যেন ধরতে পারলে আস্ত গিলে খাবেন। আমরা তাঁকে বাই, সী ইউ গোছের হাত নাড়লাম।

পুরুলিয়া যাবার এই ট্রেনটা বড় গোলমেলে, বড় অশান্তিকর ছিল। আর একবার, সেবার আমি একা থ্রী টায়ার স্লীপার কোচে পুরুলিয়া যাচ্ছি। বর্ষাকাল, ইলিশ মাছের সময়। পুরুলিয়ায় মেসে দাদা ইলিশের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে বাবা বেশ কিছু বড় বড় ইলিশের টুকরো নুন হলুদ মাখিয়ে, মা’কে খুব অল্প করে ভেজে দিতে বললেন। এতে মাছগুলো নষ্ট হবে না। পরের দিন সকালে পুরুলিয়া পৌঁছলে ভরত রান্না করে নেবে। ভরত দাদার মেসে রান্না করতো। দাদার মতোই বয়স হবে, আর সকলের সঙ্গে তাকে আলাদা করা যেত না। সবার সাথে সে মেসের-ই একজন বোর্ডার এর মতো থাকতো। যাহোক্, একটা বড় টিফিন কেরিয়ারে না কাঁচা না ভাজা একগাদা ইলিশ মাছের টুকরো নিয়ে আমি যথাসময়ে ট্রেনে চাপলাম। একদম ওপরের বার্থে আমার জায়গা। পুরুলিয়া যাবার জন্য যেটুকু টাকা পয়সা পেয়েছিলাম, হাওড়া স্টেশনেই এটা ওটা খেয়ে খরচ করে ফেলেছি। ওখানে যাবার কোন খরচ লাগবে না, আর একবার সেখানে গিয়ে পৌঁছলে, হাতখরচ বাবদ কিছু তো ম্যানেজ করে আনবোই। আর সেই জন্যই তো পুরুলিয়া যাওয়া।

ট্ট্রেন ছাড়তেই আমি আপার বার্থে উঠে শুয়ে পড়লাম। আমার দিকে একবারে নীচের বর্থে এক ভদ্রমহিলা ও অপর দিকের নীচের বার্থের এক ভদ্রলোকের কথাবার্তায়, ও চোখে আলো লাগায় ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভদ্রলোককে ঠিক অভিনেতা বসন্ত চৌধুরীর মতো দেখতে। চোখ মেলে দেখি সকাল হয়ে গেছে। আমি ঘাবড়ে গিয়ে নীচে নামতে যাওয়ায় ভদ্রলোক বললেন, ঘুম ভাঙ্গলো? একটু হেসে নীচে নেমে দেখি, ট্রেন খড়গপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, রেল লাইনে এত জল জমেছে যে ট্রেন যেতে পারে নি।

সকলে কিভাবে ট্রেন যাবে, কখন ছাড়বে, আদৌ আজ পৌঁছতে পারবে কী না, ইত্যাদি চিন্তা করছে। আমার ঐ সব চিন্তার থেকেও অনেক বড় চিন্তা, অতগুলো আধভাজা ইলিশের টুকরো নিয়ে কী করবো। এদিকে পকেটে একটাও পয়সা নেই, সারাদিন খাবই বা কী? মাছগুলো ভালভাবে ভাজাও নয় যে খাওয়া যাবে, তা নাহলে আমার অতিপ্রিয় ইলিশ ভাজা খেয়ে দুপুরটা ভালই কাটতো। মুখ ধুয়ে আবার নিজের বার্থে উঠে শুয়ে পড়লাম।

অনেক বেলায় ট্রেন ছাড়লো। ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা ভাত, ডাল, সবজী ও মাছ, দুপুরে খাবার জন্য নিয়েছেন। ট্রেন সারারাত স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকায় সম্ভবত স্টেশন থেকে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমার শুধু চিন্তা হচ্ছে ওরা না আবার আমাকে দুপুরে কী খাব জিজ্ঞাসা করে বসেন। ভদ্রলোক খাওয়া শুরু করার আগে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে বসলেন— “ও ভাই, দুপুরে তো কিছু খেতে হবে না কী? কী খাবে”?

আমি বললাম “আমার সাথে খাবার আছে, একটু পরে খেয়ে নেব”। তিনি বললেন, “আরে দুপুরে ভাত না খেয়ে কী থাকা যায়? নেমে এস, আমাদের সাথে বসে পড়”।

ভয় হচ্ছে, খাবার পর যদি দাম চান, তাহলেই তো গেছি। ভদ্রলোক আবার আমাকে নীচে নেমে আসতে বললেন। বাধ্য হয়ে নীচে নেমে এসে তাঁর পাশে বসলাম। ভদ্রমহিলা একটা পাত্রে তাঁদের খাবার থেকে আমাকে খাবার তুলে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় যাবে”? বললাম পুরুলিয়া। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “পুরুলিয়ায় কে থাকেন”? বললাম, দাদা থাকেন। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন “কোথায় থাকেন”? বললাম, পাঞ্চজন্য নামে একটা মেসে। শুনে তিনি আবার বললেন, “পাঞ্চজন্য মেসে? কী নাম বলতো”? বললাম, সুব্রত রায়।

সুব্রত তোমার দাদা? তারপর দেখলাম ঐ মেসের সবাইকে ভদ্রমহিলা খুব ভালো ভাবে চেনেন। এখন শুনলাম ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা দু’জনেই পুরুলিয়া যাচ্ছেন, ট্রেনেই তাঁদের আলাপ। যাহোক্ শেষ পর্যন্ত মেসে পৌঁছে ভরতের হাতে ইলিশের পাত্র তুলে দিলাম। কপাল ভাল মাছ নষ্ট হয় নি। মেসের সকলে ইলিশের খবরে ভীষণ খুশী। পরদিন দাদা অফিস যাওয়ার সময় টাকা দিয়ে বললো, ‘সারাদিন বাড়িতে বসে বোর না হয়ে সিনেমা দেখে আসিস”। একটা হলে “জয়জয়ন্তী” হচ্ছিল। আমাদের এখানে যেমন সিনেমা আরম্ভের আগে নানা বিষয়ের ওপর, নানা খবরের ওপর ছবি দেখানো হয়, ওখানে দেখলাম শুধু কুষ্ঠ রোগের ওপর অনেকক্ষণ ছবি দেখানো হ’ল। কুষ্ঠ রোগ কী, কিভাবে বোঝা যায়, রোগ হলে কী করতে হবে, রাজ্য সরকার কুষ্ঠ রোগ নিরাময়ের জন্য বিনা পয়সায় চিকিৎসার কী কী ব্যবস্থা করেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। ছবিগুলো দেখতে দেখতে কিরকম অস্বস্তি ও ভয় করতে লাগলো। যদিও বার বার দেখানো হচ্ছে, বা নানাভাবে জানানো হচ্ছে যে কুষ্ঠ রোগ ছোঁয়াচে নয়, এবং এই রোগ চিকিৎসায় একবারে সেরে যায়, তবু আমার যেন মনে হতে লাগলো এই হলে বেশীক্ষণ থাকা নিরাপদ নয়। কোন মতে সিনেমাটা দেখে মেসে ফিরে এসে ভালোভাবে স্নান করে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। সন্ধ্যার পর একে একে মেসের সকলে ফিরে এল।

এই মেসে অসীম নামে একজন অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সী ছেলে থাকতো। সে বোধহয় অল্প বয়সে তার মা’কে হারিয়েছিল। একটা খাতায়, সে শুধু মা, মা, লিখতো। দাদা তাকে বললো আমাকে নিয়ে একটু ঘুরে আসতে। একটু পরে সে আমাকে সঙ্গে নিয়ে মেস থেকে বার হয়ে বেশ খানিকটা পথ গিয়ে জানালো যে, সে আমাকে পুরুলিয়া কুষ্ঠাশ্রম দেখাতে নিয়ে যাচ্ছে। সে আরও জানলো যে সেখানে প্রতি বছর খুব বড় বিচিত্রানুষ্ঠান হয়, অনেক বড় বড় শিল্পীরা সেখানে আসেন। আমি তো ভয়ে মরি আর কী।

একদিন কলেজে গিয়ে হঠাৎ ভীষণ পেটে যন্ত্রণা শুরু হ’ল। কিছুক্ষণ পরে বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হলাম। দাদা তখন পুরুলিয়ায়।  বাবা হাসনাবাদে দিদির বাড়ি গেছেন। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে এসে চুপ করে শুয়ে থাকলাম। বাবা বাড়িতে না থাকায় মা খুব ভয় পেয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আসতে বললেন। ডাক্তারের কাছে আর যেতে ইচ্ছা করলো না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই ব্যথাটা চাগাড় দিয়ে উঠলো। তীব্র যন্ত্রণায় এবার নিজেই ঘাবড়ে গেলাম। বাড়ির কাছে এক ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে শুনলাম, উনি কলে গেছেন। ভিতরে বসার জায়গা খালি না থাকায়, বড় রাস্তার সামনে চেম্বারের সিঁড়িতে বসে বসে শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরে এলাম। রাতে শুরু হ’ল মৃত্যু যন্ত্রণা। তপা গিয়ে অন্য এক ডাক্তারকে ডেকে আনলো। সেই ডাক্তার আজও রামরাজাতলায় এক নার্সিং হোম খুলে চুটিয়ে ব্যবসা করছেন। কাজেই তাঁর নাম আর নাই উল্লেখ করলাম। তিনি এসে বললেন, কলেজে চপটপ্ কিছু খেয়েছে, তার থেকেই গ্যাস ফর্ম করেছে। আমি জানালাম আমি কিছু খাই নি। কিন্তু তিনি আমার কথায় গুরুত্ত্ব না দিয়ে, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন এবং একটা মরফিয়া জাতীয় ইঞ্জেকশান দিয়ে বললেন, এক্ষুণি ঘুমিয়ে পড়বে, কাল সকালেই ঠিক হয়ে যাবে। নাড়ী টিপে যে রোগী চপ্  খেয়েছে বোঝা যায়, এই প্রথম জানলাম। হয়তো কোন দোকানের চপ্, বা কোন ময়রার মিষ্টি, তাও তিনি বুঝতে পারেন। কিন্তু আমি ঘুমিয়েও পড়ি নি, ঠিক হয়েও যাই নি। কিছুক্ষণ ঝিমিয়ে থেকে আবার সেই যন্ত্রণায় ছটফট করা, বাড়ির বারান্দায় একদিক থেকে অপর দিক গড়গড়ি খাওয়া। কিন্তু তিনি দয়া করে ঐ রাতে চারবার এসেছিলেন। প্রতিবারই ইঞ্জেকশান দিয়ে, ফিজ নিয়ে,  সান্তনা দিয়ে ফিরে গেছিলেন। বাড়ির একতলার প্রনবদার বাবা সামনের পুকুর থেকে পাঁক তুলে এনে পেটে লেপে দিতে বলেছিলেন, তাতে ডাক্তারর বিরক্তির উদ্রেগ হলেও আমার কষ্ট সাময়িক লাঘব হয়েছিল। শেষে সকাল বেলা সুশীল স্যান্যাল নামে এক বৃদ্ধ এম.বি. ডাক্তারকে নিয়ে আসা হলে, তিনি অতি কষ্টে দোতলায় উঠে আমাকে দেখে, পেটে একটু চাপ দিয়েই বললেন, অ্যাপেন্ডিসাইটিস এর জন্য এর এত যন্ত্রণা হচ্ছে। একে কোন কোল্ড ড্রিংক্স খেতে দাও এবং হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা কর।

এই বৃদ্ধ ডাক্তার, সম্পর্কে আমাদের দুর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। ওনার নিজের ভীষণ হাঁপানি ছিল।ওনার বাড়িতে প্রয়োজনে এর আগে বা পরেও গিয়েছি। ওনার বেডরুমের শিলিং ফ্যানটা মশারীর মধ্যে ঢুকিয়ে, মশারীর ওপরের অংশটা ফ্যানের রডে বাঁধা থাকতো। নিজে হাঁপানি রোগে ভুগতেন বলেই বোধহয়, মাঝে মাঝে মুখের ভিতর একটা স্প্রে করতেন। কিন্তু উনি মারা যাবার পরে, সত্যি কথা বলতে এলাকায় ভাল জেনারেল ফিজিশিয়ানের অভাব দেখা গিয়েছে।

তখন টেলিফোন ব্যবস্থা আজকের মতো এত সহজলভ্য ছিল না। মোবাইল ফোন তখনও দেশে হয়তো কল্পনায় ছিল। ফলে বাবাকে হাসনাবাদে ও দাদাকে পুরুলিয়ায় টেলিগ্রাম করা হ’ল। আমাকে মেডিক্যল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হ’ল এবং সেই দিনই ডাক্তার মমিন আমার অপারেশন করেন।

হাসপাতলের বেডে শুয়ে সেই বয়সে একটা পরম সত্য উপলব্ধি করেছিলাম। সমস্ত মানুষের সঙ্গে, সে যত ছোট কাজই করুক না কেন, যেখানেই থাকুক না কেন, যত গরীবই হোক না কেন, সম্পর্ক রাখা উচিৎ। কার যে কোথায় পরিচিতি আছে, কে যে কখন কোন ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে, আগে থেকে বোঝা যায় না। কাশী নাথ দে নামে আমার থেকে বয়সে কিছু বড় একজন মুখার্জী পাড়ায় থাকতো। বউবাজারে তাদের একটা ছোট্ট সোনার গয়নার দোকান ছিল। তাদের আর্থিক অবস্থাও মোটেই ভাল ছিল না। ওদের দোকানটা কোনদিন না দেখলেও বুঝতাম খুব একটা ভাল চলে না। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দ্বিতীয় দিন থেকে সারাদিন বিছানায় শুয়ে, আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। সারাদিন বিছানায় শুয়ে বিকেলবেলা বাড়ির লোক আসার অপেক্ষায় কাটলো।

তৃতীয় দিন সকাল সাড়ে বারটা-একটা নাগাদ হঠাৎ কাশীদা আমার সাথে দেখা করতে এল। কিছুক্ষণ থেকে যাবার সময় সে জিজ্ঞাসা করলো আমার কোন অসুবিধা হচ্ছে কী না। বললাম, একা একা সারাদিন বিছানায় শুয়ে হাঁপিয়ে উঠেছি। সে আমাকে গল্পের বই পড়ার কথা বলায়, বললাম বই কোথায় পাব? সে জানালো, সে ব্যবস্থা করে দিয়ে যাচ্ছে। সেইদিনই আমাকে একজন নার্স একটা বই দিয়ে গেল। কাশীদার দয়ায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে “ভূবন সোম” পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কাশীদা এর পরেও বেশ কয়েকবার এসেছিল। কিন্তু একবারও ভিজিটিং আওয়ার্সে নয়। সে আমাকে জানিয়েছিল, মেডিক্যাল কলেজে তার অবাধ গতি। কী সুত্রে অবাধ গতি বলতে পারবো না, তবে সে আমাকে অনেকটা সময় সঙ্গ দিয়েছিল।

আমাদের পরিবারে এই প্রথম কারো অপারেশন হওয়ায়, বাড়ি ফেরার পরে আমাকে খুব যত্নে, খুব সাবধানে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বলতে একটু লজ্জাই করছে, ডাক্তার তেল, ঝাল, মশলা খেতে বারণ করলেও বাড়ি ফেরার দিন দশেকের মধ্যে এক বিয়ে বাড়িতে ভোজ খেতে গিয়েছিলাম।

আমাদের বাড়ির কাছেই আমার ছোড়দাদু, ছোড়দিদা ও মামারা থাকতেন। ছোড়দাদু, ছোড়দিদা মানে আমার মা’র নিজের কাকা-কাকীমা। এই ছোড়দিদার লিভারে ক্যানসার হয়েছিল। সত্তর সালের দূর্গা পূজার পঞ্চমীর দিন চোখের সামনে ধীরে ধীরে তাঁকে মারা যেতে দেখলাম। এই আমার প্রথম মৃত্যু দর্শন। সারাদিন তাঁর পাশে বসে দেখেছিলাম কী ভয়ানক কষ্ট তিনি পেয়েছিলেন।

পঞ্চমীর দিন সন্ধ্যার মুখে শঙ্করমঠের দূর্গা প্রতিমা যে ট্রাকে করে পূজামন্ডপে নিয়ে আসা হয়েছিল, সেই ট্রাকে করেই দূর্গা প্রতিমার মতোই সুন্দরী, উমা নামের আমার ছোড়দিদাকে নিমতলা শ্মশান ঘাটে নিয়ে যাওয়া হ’ল। আমিও সঙ্গে গেলাম। প্রায় প্রতিদিনই শ্মশানে আড্ডা দিতে যাওয়া এই আমার, এই প্রথম মৃতদেহ সৎকারে শ্মশান যাওয়া।

শ্মশানে একটা অল্পবয়সী মহিলার মৃতদেহ দেখেছিলাম। যার স্বামী, বাড়ির অন্যান্য লোকজনের সাথে তার বছর পাঁচেকের ছেলেকে শ্মশানে নিয়ে এসেছিল। বাচ্ছাটাকে দিয়ে মুখাগ্নী করানো, মাটির পাত্র করে অস্থি গঙ্গায় ফেলানো হ’ল। বাচ্ছাটার বাবাকে দেখে মনে হ’ল, দাহ করে বাড়ি ফেরার পথেই না দ্বিতীয়বার বিয়ে করে বাড়ি ফেরে। অথচ কী মহানন্দে, উৎসাহের সঙ্গে বাচ্ছাটা ঐ কাজগুলো করলো। সে বুঝতেও পারলো না, তার কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল। বাচ্ছাটার জন্য, বিশেষ করে তার বাবার হাবভাব দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিল। বাড়ি ফিরে সে যখন তার মাকে খুঁজবে, সেই সময়টার কথা ভেবে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল।

এই পূজোর মধ্যেই বা পূজোর ঠিক পরে দিদি-জামাইবাবু ছেলেমেয়ে নিয়ে হাসনাবাদ থেকে এসেছিলেন। কালী পূজোর দিন তাঁরা ফিরে যাবেন। ঐ দিন সকালে, বাবা তপাকে বললেন ওদের শিয়ালদা স্টেশনে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসতে। তপার শিয়ালদা স্টেশন যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছা না থাকলেও, শেষ পর্যন্ত রাজী হয়ে, স্নান করে নিল। ওর অদ্ভুত কিছু স্বভাব ছিল। স্নান করে উঠেই ও না খেয়ে থাকতে পারতো না। স্নান করে এসেই ও ভাত খেয়ে নিত। কোন কারণে রান্না দেরীতে হলে, ও স্নানও দেরীতে করতো, যাতে স্নানের পরেই ভাত খেয়ে নিতে পারে। রাতে শুতে যাবার আগে বাথরুম থেকে প্রায় দৌড়ে গিয়ে শুয়ে পড়তো। কোন কারণে বাধাপ্রাপ্ত হলে, বা সঙ্গে সঙ্গে শুতে না পারলে, আবার বাথরুম গিয়ে তবে শুতে যেত। আজ আমার মনে হয়, ওর মানসিক দুর্বলতা কিছু ছিল। মনের জোরের কিছু অভাব হয়তো ছিল।

যাহোক্ স্নান সেরে খেতে বসার আগে হঠাৎ ঠিক হ’ল, তপার কষ্ট করে আর যাবার দরকার নেই। বাবা সেইমতো তাকে এত সকাল সকাল খাওয়ার দরকার নেই জানাতেই, সে অসম্ভব রেগে গিয়ে বাবার সাথে তর্ক জুরে দিল। “আমাকে যেতে হবে না তো আগে বললে না কেন? আমি সাত তাড়াতাড়ি স্নান করে তৈরী হয়ে নিলাম”। বাবা বললেন, “তাতে কী হয়েছে? স্নান করে নিয়েছিস, খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম কর”। কিন্তু কথার পিঠে কথা বলে সে সমানে তর্ক করে যেতে লাগলো। কথায় কথা বাড়ে, উত্তেজনাও বাড়ে। এইভাবে তর্কাতর্কির মধ্যে সে হঠাৎ বললো, “আমি এখানে থাকতে চাই না, আমি চলে যাব”। বাবাও বলে বসলেন, “বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে যদি ভাল থাকিস, তবে তাই যা”। সে তার উত্তরে বললো, “বাড়ি ছেড়ে যাব কেন, আমি আত্মহত্যা করবো”। বাবাও বেশ উত্তেজিত হয়ে বললেন, এই সামান্য ঘটনার জন্য যদি বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়, আত্মহত্যা করতে হয়, তবে যা ভাল বুঝিস তাই কর। আমি আর কী বলবো”। যাহোক মা’র চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত দু’জনকেই শান্ত করানো হ’ল। দুপুরে মাগুর মাছ রান্না হয়েছিল। তপা মাগুর মাছ খুব পছন্দ করতো, আমরাও করতাম। ও একটু গুম হয়ে থেকে, চুপচাপ ভাত খেয়ে উঠে গেল।

ওর বন্ধু বিপ্লবদা প্রায় রোজই আমাদের বাড়ি আসতো। সেদিন কিন্তু একবারও এল না। তপা একবার বিপ্লবদার বাড়ি গিয়েছিল, কিন্তু তার সাথে দেখা হয় নি। আগেই বলেছি, ওর সাথে বিভিন্ন কারণে প্রায়ই আমার কথা বলা বন্ধ থাকতো। স্বাভাবিক অবস্থাতেও ওর সাথে আমার খুব কম কথা হ’ত। ওর জগৎ ছিল সম্পুর্ণ আলাদা। নির্মলেন্দু চৌধুরীর গান ও খুব ভালবাসতো। টেবিল বাজিয়ে ও নির্মলেন্দুর গান গাইতো। মোহনবাগানের ও একজন বড় সমর্থক ছিল। কলেজে পড়ার সময় বাসভাড়া ইত্যাদি বাবদ যা পয়সা পেত, তা থেকে পয়সা বাঁচিয়ে, প্রায়ই মোহনবাগানের খেলা দেখতে যেত। আমার বোনের বন্ধু ঊষার সঙ্গে একটা লাভ অ্যাফেয়ার তৈরী হয়েছিল বলেও শুনেছিলাম। ওর প্রকৃতিও ছিল অন্য সুরে বাঁধা। একটা উদাহরণ দিলে বোধহয় ব্যাপারটা পরিস্কার হবে।

এই বছরেরই সম্ভবত জুলাই মাসে, আমার ছোড়দির একটি কন্যা সন্তান হয়। সেইসময় ঐ দিদি আমাদের বাড়িতে বেশ কিছুদিন ছিল। আমাদের ভাইবোনেদের মধ্যে সম্পর্কটা তখনও শুধু ভাইবোনের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাছাড়া আমার দুই দিদিই আমাদের থেকে বয়সে অনেক বড়। ফলে তারা যেমন আমাদের সাথে ইয়ার্কি ঠাট্টা করতো, তেমনি শাসনও করতো। কিন্তু তপা চিরকালই একটু অন্যরকম ছিল। ছোড়দি বাচ্ছা নিয়ে থাকাকালীন তপাকে কী একটা ওষুধ কিনে আনতে দেয়। তপা ওষুধ কিনে এনে দেবার পর, ছোড়দি রসিকতা করে তপাকে বলে— “কী রে কত গ্যাঁড়ালী”? এই জাতীয় ইয়ার্কি, ঠাট্টা তামাশা হামেশাই আমাদের সাথে করা হ’ত। আমিও করতাম, আজও করি। তপা কিন্তু কোন উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পরে ওষুধের দোকান থেকে ক্যাশমেমো এনে ছোড়দিকে দিয়ে চলে গেল।

এরমধ্যে ওর বি.কম্. অনার্স পার্ট টু পরীক্ষা হয়ে গেছে। ও টাইপ শর্টহ্যান্ড শিখছে ও কাগজ দেখে চাকরীর দরখাস্ত করছে। বিপ্লবদা প্রায় রোজই আমাদের বাড়িতে আসতো। বিপ্লবদা ছাড়া ওর আর দু’একজন বন্ধুর কথা আমার মনে আছে। একজন আশু, ওর সাথে কলেজে পড়তো। সম্ভবত বাউড়িয়ায় বাড়ি ছিল। দ্বিতীয়জন চিন্ময় রায় নামে একজন। এই চিন্ময় পরবর্তীকালে আমাদের ব্যাঙ্কে চাকরী পায়। গৃহ অশান্তির ফলে সে আত্মহত্যা করে। তার স্ত্রী ও পুত্রকেও আমি চিনি। কারণ তার স্ত্রী তার স্বামীর মৃত্যুর পরে আমাদের ব্যাঙ্কে চাকরী পায়। তার সাথে আমি একই শাখায় কাজও করেছি। পুনরায় বিয়ে করে ও পক্ষ এ পক্ষ, দুই পক্ষের সন্তান নিয়ে ভালোই আছে। ছেলের সাথেও পরিচয় আছে। এইতো কয়েক বছর আগে তার বিয়েতে কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে এলাম।

যাহোক্, যে কথা বলতে গিয়ে এত কথা টেনে আনলাম। দিনটা ছিল কালীপূজো, ২৯শে অক্টোবর, ১৯৭০ সাল। সন্ধ্যর শোতে “পার্ব্বতী” সিনেমা হলে একটা সিনেমা দেখতে গেলাম। যতদুর মনে পড়ে বইটা বোধহয় “প্রতিদ্বন্দী” ছিল। তখন আবার আমার সাধ্য না থাকলেও বাজী পোড়াবার সাধ খুব ছিল। ওর মধ্যেই সামান্য যা পয়সা ম্যানেজ করতে পারতাম, তাই দিয়ে বাজী কিনতাম। রাতের দিকে কিছু বাজীও পোড়ালাম। যতদুর জানি সন্ধ্যার সময়ও তপা বিপ্লবদার বাড়িতে গিয়ে দেখা না হওয়ায় ফিরে এসে নিজের ঘরেই ছিল। একবার ছোট্ট ঘরটায় ও একাই শুতো। অন্যান্য দিনের মতোই রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে, যে যার বিছানা নিল। আমাদের বাডিতে তখন কাশী নামে একটা বাচ্ছা ছেলে কাজ করতো। সে বাবার ঘরের মেঝেতে শুয়ে পড়লো। বাইরের লম্বা বারান্দাটায় গরমকালে আমরা মাটিতে পরপর সবাই শুতাম। ঐ দিন বাবা-মা বাইরের বারান্দায় শুয়েছিলেন। আমি ঘরে শুয়ে অনেক রাত পর্যন্ত জেগেই ছিলাম। ভেতরের বারান্দায় রাতে আলো জ্বালার উপায় ছিল না। আলো জ্বাললেই মিঠু বিকট গলায় চিৎকার শুরু করতো।

মিঠু আমাদের পোষা টিয়া পাখিটার নাম। একটা দাঁড়ে পাখিটা সরু চেন দিয়ে বাঁধা থাকতো। সারাদিন বিশ্রী গলায় পাখিটা চিৎকার করতো। বিরক্ত হয়ে প্রায় সকলেই তাকে অনবরত ধমক দিত। রাতে কোন কারণে লাইট জ্বাললেই সে চিৎকার শুরু করে দিত। তবে তার মাথার কাছে হাত নিয়ে গিয়ে সুর করে মি-ই-ই-ঠু-উ-উ-উ বলে ডকলে, সে তার চোখ দুটো কী রকম ছোট করে খুব সুন্দর শিষ দিয়ে পরিস্কার মিঠু বলতো। তবে এই সুযোগ আমরা খুব একটা পেতাম না। কারণ আমাদের ধমক খেয়ে খেয়ে, পাখিটা আমাদের খুব ভয় পেত। তার কাছে গেলেই, সে চেন সমেত দাঁড়ের চারপাশে চিৎকার করে ঘুরপাক খেত।

খুব ভোরে মা’র তীব্র আর্তনাদের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমার একটু বেলা পর্যন্ত ঘুমনোর বদ অভ্যাস ছিল। এখনও আছে। অত ভোরে মা’র কান্না ও আর্তনাদ করে বাবাকে ডাকার আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেলে বুঝে উঠতে পারলাম না, কী ঘটেছে। বাবা বাইরের বারান্দা থেকে অদ্ভুত একটা আওয়াজ করতে করতে, প্রায় ছুটে তপার ঘরের দিকে গেলেন। আমি এক লাফে বিছানা ছেড়ে তপার ঘরের কাছে গিয়ে চমকে উঠলাম। আমাদের বাড়িতে তখনও কোন ঘরে ফ্যান ছিল না। তপা তার ঘরের ছাদে, ফ্যান  লাগাবার হুক থেকে ঝুলছে। ঘাড়টা এক পাশে কাত হয়ে আছে, জিভটা সামান্য বেরিয়ে আছে।

আমাদের একটা নড়বড়ে বেতের টেবিল ও দু’তিনটে বেতের চেয়ার ছিল। বাঁকে করে একজন ফেরিওয়ালা নিয়ে যাচ্ছিল, তার কাছ থেকে কেনা। অত্যন্ত পল্কা ও সস্তার জিনিস। টেবিলটা ও একটা চেয়ার চৌকির ওপর কাত হয়ে পড়ে আছে। বাবা পাগলের মতো অবস্থায় একটা কাটারি দিয়ে দড়ি কেটে তাকে বিছানায় শোয়ালেন, কিন্তু তার অনেক আগে সব শেষ হয়ে গেছে। বাবা কাটারির পিছন দিয়ে না কী দিয়ে যেন পিটিয়ে পিটিয়ে হুকটাকে বেঁকিয়ে ছাদের সাথে মিশিয়ে দিলেন। আমি বাবাকে দু’হাতে চেপে ধরে রেখেও সামলাতে পারছিনা। একবার বাবাকে একবার মা’কে সামলানো ও শান্ত করার চেষ্টা করা ছাড়া, আমি কী করবো ভেবে পেলাম না। মাকা গিয়ে পাশের ফ্ল্যাটের নিতাইদা, মেজদাকে ডেকে নিয়ে আসলো। একটু পরেই আমাদের ফ্ল্যাটে বাড়ির এবং বাইরের লোকে ভরে গেল।

ভাবলে অবাক লাগে যে, টিয়াপাখিটা সেদিন রাতে একবারও ডাকলো না কেন। তপার ঘরের দরজা হাট করে খোলা ছিল, লাইটও জ্বলছিল। ভোরে কাশী প্রথম দেখতে পেয়ে বারান্দায় গিয়ে মাকে খবর দেয়, “মেজদা ঝুলছে”। সে সময় মোবাইল তো দুরর কথা, আশেপাশে কোথাও টেলিফোন পর্যন্ত ছিল না। আমি একটা সাইকেল নিয়ে বাকসাড়ায় ছোড়দির বাড়ি গিয়ে খবরটা দিয়ে, এতটুকু সময় নষ্ট না করে ওখান থেকে চ্যাটার্জীহাট গিয়ে কাকার বাড়িতে খবরটা দিলাম। ঠাকুরমা তখন কাকার বাড়িতে থাকতেন। খবরটা দিয়েই বাড়ি ফিরে এলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোড়দি চলে এল। পুলিশে খবর দেওয়া হ’ল। আমি তপার জামার বুকপকেট থেকে দুটো চিরকুট পেলাম। একটায় লেখা—“মা, হঠাৎ মরতে ইচ্ছা হওয়ায় মরলাম। আমার পয়সার বাক্স থেকে ২\ ছোটদিকে দিও। ও আমার কাছে পায়”। ছোড়দির কাছ থেকে ও বোধহয় কোন কারণে টাকাটা নিয়েছিল। অপর চিরকুটটায় লেখা ছিল—“পুলিশ, আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়”। আআজও চিঠিদুটো আমার কাছে যত্ন করে রাখা আছে।

আজওআআমার তখন আঠারো বছর বয়স। কয়েকজন আত্মীয় ও পাড়ার পরিচিত কয়েকজনকে নিয়ে মর্গে গেলাম। এই আমার প্রথম মর্গ দর্শন। মর্গে মৃতদেহ নামিয়ে সকলে এদিক সেদিক চলে গেল। স্বাভাবিক, জায়গাটা যেমন নোংরা, তমনি দুর্গন্ধে ভরপুর। তার ওপর কখন পোষ্টমর্টেম হবে, তারও কোন স্থিরতা নেই। ফলে কেউ পোষ্টমর্টেম যাতে তাড়াতাড়ি হয় তার চেষ্টায়, কেউ উৎকট গন্ধের হাত থেকে বাঁচতে, ডেডবডির কাছে অপেক্ষা না করে যে যার মতো এদিক সেদিক চলে গেল। চারিদিক কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে, ফলে আমি সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঐ দুর্গন্ধময়, অসাস্থকর জায়গায় মরা আগলে একা বসে থাকলাম। বসে বসে শুধু বাড়ির কথা চিন্তা হচ্ছিল। বিকালের পরে পোষ্টমর্টেম হয়ে গেল। মা বলেছিলেন একটা ছবি তোলার ব্যবস্থা করতে। এত ঝামেলার মধ্যেও ছবি তোলার ব্যবস্থাও করেছিলাম। তবে সে ছবি কাউকে দেখাবার মতো নয়, নিজেরাও দেখার মতো নয়। এখনও সেই ছবি আমার কাছেই আছে। ধীরে ধীরে সেই ছবি প্রায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যাহোক্, মর্গের সমস্ত ঝামেলা মিটলে, ওখান থেকে মৃতদেহ বাঁশতলা শ্মশান ঘাটে নিয়ে যাওয়া হ’ল। জীবনে দ্বিতীয়বার কলেজ না পালিয়ে মৃতদেহ সৎকারে শ্মশানে যাওয়া, এবং প্রথমবার মুখাগ্নি করা। এও এক যন্ত্রণাদায়ক নতুন অভিজ্ঞতা।

বাড়ি ফিরে এসে সম্পূর্ণ এক অপরিচিত পরিবেশে প্রবেশ করলাম মনে হ’ল। অপরিচিত পরিবেশে চেনা মানুষগুলোও যেন কিরকম অপরিচিত হয়ে গেছে। ছোড়দি শ্মশান ফেরৎ সবাইকে লোহা স্পর্শ, নিমপাতা দাঁতে কাটা ইত্যাদি কাজগুলো সম্পন্ন করালো। একটু পরে বাড়ি ফাঁকা হতে শুরু করলো। সবাই চলে গেলে দেখলাম তপার ঘরের চৌকির ওপর একটা প্রদীপ জ্বালানো হয়েছে ও কয়েকটা ধুপকাঠি জ্বলছে। ধুপের ধোঁয়ায়, নিস্তব্ধ থমথমে আবহাওয়ায়, আমার অতি পরিচিত সেই হৈ হল্লার বাডিটার দম বন্ধ হওয়া শ্মশানের পরিবেশ বিরাজ করছে । বাবা-মা সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। বাবার গলায় আফশোষের সুর— “টিয়া পাখিটা পর্যন্ত একবার ডাকলোনা”?

পরের দিনই সকালে দাদা পুরুলিয়া থেকে চলে এল। ছোড়দি আরও কয়েকদিন থাকলো। মা’র শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বুঝে নন্দ নামে এক মহিলাকে রান্না করার জন্য রাখা হ’ল। একে একে আত্মীয়স্বজনরা এসে সান্তনা দিয়ে গেল। বাবা যেন নিজেকে কিরকম অপরাধী ভাবতে শুরু করে সম্পূর্ণ বদলে গেলেন।

এই নন্দ নামে মহিলাটি আর এক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। মা’কে যাতে কিছুদিন রান্নাবান্না বা অন্যান্য কাজে যেতে না হয়, তাই তাকে রাখা। অথচ সে দু’মিনিট অন্তর অন্তর “মা, দেখে যাও তো আর নুন দেব কী না, অথবা মা, একবার দেখে যাও তো আর আলু কাটবো কী না” ইত্যাদি বলে মা’কে ডাকতো। শেষে এমন অবস্থা দাঁড়ালো, যে মা সব করে দেন আর নন্দ শুধু খুন্তি নাড়ে। শেষে কিছুদিন পরে তাকে বিদায় করা হ’ল।

সময় সমস্ত শোক ভুলিয়ে দেয়, কথাটা যে কত সত্য, তা ক্রমে বুঝতে পারলাম। ধীরে ধীরে শোক কমতে শুরু করলো। বাবা কিন্তু কিরকম বদলে গেলেন। মা’ও কিরকম চুপচাপ হয়ে গেলেন। ইতিমধ্যে দাদা তার কর্মস্থলে ফিরে গেছে। আমিও কলেজ যাওয়া শুরু করলাম। মা একটা কথা বারবার আফশোস করে বলতেন, “ঐ দিন তপা দু’তিনবার বিপ্লবের বাড়ি গিয়েও দেখা না পেয়ে ফিরে এসেছে, ও হয়তো বিপ্লবকে কিছু বলতে চেয়েছিল। বিপ্লবকে মনের কথা বলে হাল্কা হলে, এ ঘটনা হয়তো ঘটতো না”।

তপার কোন ভালো ফটো ছিলনা বলে মা’র খুব দুঃখ ছিল। ও কিছুদিন আগেই আনন্দবাজার পত্রিকার পোষ্ট বক্সে একটা চাকরীর জন্য আবেদন করেছিল। সেই আবেদন পত্রের সাথে এক কপি পাশপোর্ট সাইজ ফটো পাঠাতে হয়েছিল। আনন্দবাজার পত্রিকার অফিসে গিয়ে সমস্ত ঘটনা বলে ফটোটা ফেরৎ চাইলাম। ওরা জানালো, ওদের কাছে আবেদনকরীর পত্রগুলো নেই। বিজ্ঞাপন দাতাকে সব আবেদন পত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞাপন দাতার নাম, ঠিকানা জানতে চাইলে তারা জানালো, সেটা বলায় তাদের কিছু অসুবিধা আছে। তারা আমাকে আমার নাম, ঠিকানা রেখে যেতে বললো এবং তারা ফটোটা ফেরৎ পাঠাবার চেষ্টা করবে, সে প্রতিশ্রুতিও দিল। বেশ কিছুদিন পরে তপার সেই ফটোটা তারা পোষ্টে ফেরৎ পাঠায়। এইজন্যই বোধহয় আনন্দবাজার পত্রিকার আজও লোকের ঘরে ঘরে এত কদর। তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। যাহোক্, ফটোটা বড় করে বাঁধানো হ’ল। আজও মা’র ঘরে তার একমাত্র ফটোটা টাঙ্গানো আছে। মৃত্যুদিনে তার ছবিতে ফুলের মালা দেওয়া হলেও, মা ছাড়া আমরা আর সবাই কিন্তু তাকে ভুলে গেছি। ভুলে গেছি কারণ একদিনও কী তার কথা আমাদের কারো মনে পড়ে? বোধহয় না। এরপর ওর পার্ট টু পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে দেখা গেল ও সেকেন্ড ক্লাশ অনার্স নিয়ে বি.কম. পাশ করেছে।

11889633_493074554201632_4683533167728821188_n তপা

প্রথম প্রথম বেশ কিছুদিন তপার ঘরটায় কেউ শুত না। সারা রাত ঘরে একটা প্রদীপ জ্বালানো থাকতো। তারপরে ঐ ঘরটায় আমার স্থান হ’ল। সত্যি কথা বলতে আমার ঐ ঘরে রাতে একা শুতে ভয় করতো না বটে, কিন্তু মাঝে মাঝেই ওকে নিয়ে অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখতাম। মনে হ’ত শেষ সময়টাতে ওর সাথে কথা বন্ধ না হলে, আমি হয়তো এই সমস্যাটা সামলাতে পারতাম।

শুরু হ’ল আবার কলেজ যাওয়া, কলেজের ক্লাশ না করে শ্মশান ঘাটে, গঙ্গায় গাধা বোটের ওপর শুয়ে বসে আড্ডা মারা, ভুঁড়িওয়ালা দাদুর দোকানে জিভ পোড়া চা খেয়ে বাড়ি ফেরা। কিন্তু ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এক নতুন বিপদ, বিশেষ করে যুবকদের বিপদ। নকশাল আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললে শুধু খুন জখমের খবরে পাতা ভরা থাকতো। সর্বত্র বোমার আওয়াজ, গোলাগুলি আর পুলিশের ঝামেলা লেগেই থাকতো। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা সহনীয় ছিল। অত্যন্ত মেধাবী ছেলেরা এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়লো। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্ররা, যাদের আমরা চিরকাল অন্য চোখে দেখে আসতে অভ্যস্ত, তাদের অনেকেই এই আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ভাবে যোগ দিল। তারা অবশ্য একটা আদর্শ, একটা নীতি নিয়ে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। সাধারণ জনগন তাদের এই আদর্শকে সমর্থনও করেছিল। কিন্তু এখন যেমন ঠাকুর দেবতা, রাজনীতি বা হাত দেখা, কিছু মানুষের  জীবিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে সময়ও বেশ কিছু বাজে, সমাজের অপাংক্তেও ছেলে এই আন্দোলনকে তাদের জীবিকা হিসাবে গ্রহন করে,  নিজেদের নকশাল হিসাবে পরিচিত করেছিল। পাড়ায় পাড়ায় মস্তানী, লুঠতরাজ ও অত্যাচার ছিল তাদের এই রাজনীতি নামক জীবিকার অঙ্গ। এরা পাড়ার লাইট পোষ্টের বাল্ব ভেঙ্গে, পাড়ার রাস্তাঘাট অন্ধকার করে রাখতো। এর গাছের ডাব, তার বাগানের সবজী জোর করে নিয়ে যেত। ভয়ে তাদের কেউ কিছু বলতে সাহস করতো না। আর এটাই তাদের মুলধন ছিল। আমাদের পাড়ায় একটা ছেলে ছিল, যার কাজ ছিল রাস্তার লাইট পোষ্টের বাল্ব ভেঙ্গে দেওয়া। এই কাজের জন্য সে পয়সাও পেত। সেও নিজেকে নকশালপন্থী বলে পরিচয় দিত, এবং ভয়ে, ভক্তিতে, অনেকেই তাকে একজন বিশিষ্ট নকশাল নেতা বলে সমীহও করতো। হায় রে চারু মজুমদার, কানু স্যান্যাল, তোমরা শিব গড়তে গিয়ে এ কী তৈরী করলে?

এ বাড়িতে ও বাড়িতে পাঁচজনের খাবার লাগবে, দশজনের খাবার দিতে হবে, ইত্যাদি বলে জোর করে খাবার নিয়ে যাওয়া শুরু হ’ল। আমাদের সন্তু এই নকশাল পন্থী ছেলেদের দলে ভিড়ে গেল। সিনেমা জগতে যেমন অভিনেতারা নিজের নাম পরিবর্তন করে পছন্দ মতো অমুক কুমার, তমুক কুমার ইত্যাদি হয়, এই নকশালী করা অনেক ছেলেরই তখন নতুন নতুন নামকরণ হ’ল। আমাদের সন্তু সম্রাট নামে পরিচিত হ’ল। কিভাবে যে সে সম্রাট হ’ল বলতে পারবো না, কারণ তখন তার সাথে আমার আর কোন যোগাযোগ ছিল না।

আমাদের বাড়ির ঠিক দুটো বাড়ি আগে বংশীদাদের বাড়ি। ঐ বাড়ির একতলায় প্রদীপরা ভাড়া থাকতো। ওদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। যতদুর মনে পড়ে, ওর বাবা সামান্য বিস্কুট বা ঐ জাতীয় জিনিস দোকানে দোকানে সরবরাহ করতেন ও নিজেও বিক্রী করতেন। আজ এত বছর পরে ঠিক মনে করতে না পারলেও, এরকমই কী একটা করতেন। প্রদীপ আমার বন্ধু ছিল, শুধু বন্ধুই ছিল না, স্কুল পালানো দলের সদস্যও ছিল। ওর কোন নতুন নামকরণ হ’ল না বটে, কিন্তু দিলীপ, সেন্টু, প্রদীপ, এই    ত্রিমুর্তির নাম শোনেনি, তখন আশেপাশের পাড়ায় এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার ছিল। সমস্ত পাড়ায় নকশাল পন্থীদের অত্যাচার ও পুলিশের অত্যাচার পাল্লা দিয়ে চলতে লাগলো। দু’পক্ষই সাধারণ জনগনের ওপর অত্যাচার ও বীরত্ব প্রদর্শন সুবিধা জনক বলে মনে করতো। আমাদের পাড়ায় নকশালদের অত্যাচারটা অপেক্ষাকৃত অনেক কম ছিল, কারণ পুলিশ তাড়া করলে পালাবার পথের অভাব।

প্রদীপের নামে অনেকেই ভয় পেত। ওকে দেখাও যেত খুবই কম। আমার সাথে মাঝেমধ্যে দেখা হলে, আমি একটু এড়িয়ে যেতাম। ও নিজেও সেটা বুঝতো, তাই আমার সাথে রাস্তায় খুব একটা কথা বলতো না। বড়জোর “কী রে কেমন আছিস” জাতীয় সামান্য দু’-চার কথা। কিন্তু অধিকাংশ ছেলেকেই যেমন নিজেকে নকশাল বলে পরিচয় দিয়ে সাধারণের ওপর অত্যাচার করতে, জুলুম করতে, বা মস্তানি করতে দেখা যেত, প্রদীপকে কিন্তু কোনদিন তা করতে দেখিনি। বরং ও আমাদের পাড়ার বাসিন্দা হওয়ায়, আমাদের পাড়ায় নকশালদের জুলুম ছিল না বললেই চলে।

পুলিশের ওপর নকশালদের ভীষণ রাগ ছিল। একবার এক ট্রাফিক পুলিশকে প্রকাশ্য দিবালোকে বড় রাস্তার ওপর মাছ কাটার বঁটি দিয়ে কেটে খুন করা হ’ল। লোকটার একমাত্র অপরাধ, সে পুলিশে চাকরী করে। অচেনা পাড়ায় যাওয়াও বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ালো। অচেনা পাড়ায় গেলে সেই এলাকার নকশালপন্থীরা পুলিশের লোক বলে সন্দেহ করতে পারে, এরকম একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হ’ল।

হঠাৎ শুনলাম ঘোষপাড়ায় এক ভদ্রলোক বড় রাস্তা থেকে একটা গলির মধ্যে কিছুটা যাবার পর, হঠাৎ তাঁর মনে হয় পিছন পিছন কারা যেন চুপিসারে তাঁকে অনুসরণ করছে। ভদ্রলোক তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাচ্ছিলেন। ভদ্রলোক পিছন ফিরে দেখতেই দেখেন, দু’-তিনটে ছেলে ভজলি বা ঐ জাতীয় অস্ত্র দিয়ে তাঁকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল। ভদ্রলোক পিছন ফিরে তাকাতে, তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে। তারা যাকে মনে করে আঘাত করতে উদ্দত হয়েছিল, এ সেই লোক নয়। কিন্তু সেই মুহুর্তে পিছন দিকে না তাকালে, সেদিন তাঁর মৃত্যু অনিবার্য ছিল।

এইসব ঝামেলার ওপর ছিল পুলিশের অত্যাচার। লোকাল পুলিশ তো ছিলই, তার ওপর সি.আর.পি. নামক আর এক শ্রেণীর অত্যাচারী অবাঙ্গালী পুলিশ। পোষাক ও হাবভাব দেখে মনে হবে, এরা সীয়াচীন এলাকায় যুদ্ধ করতে এসেছে। এই দু’পক্ষই যত না নকশালপন্থী ধরেছে, তার বহুগুণ সাধারণ নীরিহ ছেলেদের ধরে নিয়ে গিয়ে অকথ্য অত্যাচার করেছে, হত্যা করেছে। এদের অকারণে অত্যাচারের ভয়ে, প্রত্যেক বাড়ির নীরিহ ছেলেরা ভয়ে ভয়ে থাকতো। শুধু যে অল্প বয়সী ছেলেরাই এদের অত্যাচারের শিকার হ’ত তা নয়। মুখার্জী পাড়ায় সত্যবান চক্রবর্তী নামে এক বয়স্ক নীরিহ ভদ্রলোক বাড়ি করে বসবাস করতেন। ভদ্রলোককে আমি খুব ভালভাবে চিনতাম, কারণ ঐ পাড়া আমার একসময় প্রাণ ছিল। তাছাড়া এর আগে আমরা যখন পঞ্চানন সরকারের বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, যে বাড়িতে প্রচুর গাছ আমি নষ্ট করে দিয়েছিলাম, ভদ্রলোক সেই বাড়িতেই আমাদের পাশে ভাড়া থাকতেন। নিঃসন্তান এই মানুষটি অত্যন্ত নীরিহ গোবেচারা প্রকৃতির ছিলেন। কোনরকম সাতে পাঁচে থাকতেন না। অফিস থেকে ফিরেই হারমোনিয়াম নিয়ে গান গাইতে বসে যেতেন। যদিও তাঁর সাথে কবিতার ভীষ্মলোচন শর্মার কোথায় একটা মিল খুঁজে পাওয়া যেত। প্রতিদিন তাঁর কন্ঠে বেসুরো “চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙ্গেছে” শুনতে হলেও, তিনি যে নিপাট ভদ্রলোক ছিলেন, একথা স্বীকার করতেই হবে। যাহোক্, একদিন গভীর রাতে তাঁর বাড়িতে সি.আর.পি. এসে কাউকে খুঁজে না পেয়ে, তাঁকে ভীষণ রকম মারধোর করে যায়।

একদিন রাতে আমরা অন্যান্য দিনের মতোই কলেজ থেকে হেঁটে চ্য্যাটার্জীহাট আসছি বাস ধরবো বলে। একটা পুলিশ জীপ আমাদের পাশ দিয়ে উল্টোদিকে চলে গেল। আমাদের অতিক্রম করে একটু এগিয়েই, জীপটা মুখ ঘুরিয়ে আবার আমাদের দিকে এগিয়ে এল। আমরা রাস্তার একপাশে সরে গিয়ে জীপটাকে পথ করে দিলাম। জীপটা কিন্তু এগিয়ে না গিয়ে, খুব আস্তে আস্তে আমাদের পিছন পিছন আসতে লাগলো। এইভাবে প্রায় দশ-পনের মিনিটের পথ হেঁটে এসে আমরা বাসস্ট্যন্ডে এলাম। এতটা পথ জীপটা আমাদের পিছন পিছন ধীর গতিতে এসে, আমরা বাসে উঠতেই আবার জীপের মুখ ঘুরিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল, সেই দিকে ফিরে গেল। কী উদ্দেশ্যে যে এতটা পথ তেল পুড়িয়ে আমাদের পিছন পিছন এল, তা ওরাই জানে।

এর ওপর, যতদর মনে পড়ে সেই সময়েই প্রথম লোডশেডিং নামক গর্ভযন্ত্রণার জন্ম হয়। দিনে রাতে যখন তখন বিদ্যুৎ চলে যায়। কলেজ যাওয়া ও কলেজ থেকে বাড়ি ফেরা এক সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। খুন জখমও দিন দিন বাড়তে লাগলো। পাইপগান্ নামক বস্তুটির নাম সেই সময় প্রথম শুনলাম। যতদুর মনে পড়ে, গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মতো এই সময়েই বাংলাদেশ যুদ্ধ শুরু হয়। যে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ভাবে আমাদের দেশের একটা বড় ভুমিকা ছিল।

পরবর্তী অংশ অষ্টম পর্বে………

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s