স্বপ্নরাজ্য মিজোরাম {লেখাটি Right There Waiting for you…., Tour Picture &Tour Information… , Beyond weekend, beyond bound… , Tour & Tourists ও চলুন বেড়িয় আসি (Let’s Go & Enjoy Nature)পত্রিকায় প্রকাশিত।}

Selfমিজোরাম হাউস থেকে মিজোরাম রাজ্যে প্রবেশের অনুমতি পত্র হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই চাল্টলাঙ্গ(CHANTLANG), চামফাই(CHAMPHAI) ও থেনজল (THENZAWL), গেস্টহাউস বুক করার জন্য ফোন করলাম। ফোন নাম্বার ভ্রমণ পত্রিকায় এক ভ্রমণার্থীর মিজোরাম ভ্রমণের ওপর লেখা থেকে সংগ্রহ করা। চাল্টলাঙ্গ গেস্টহাউস কর্তৃপক্ষ আমাদের শুধুমাত্র আইজল পৌঁছনোর দিন, অর্থাৎ একত্রিশে ডিসেম্বরের জন্য ঘর বুক করে দিয়ে জানালেন, পরের দিনে কোন ঘর খালি না থাকায় হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে নিতে হবে। অবশ্য তাঁরা আমাদের সুবিধার্থে একটি হোটেলের ফোন নাম্বার জানান। আমরা সেইমতো পয়লা জানুয়ারির জন্য ঘর বুকিং এর বিষয় খোঁজখবর নিয়ে রাখলাম।

চামফাই গেস্ট হাউসের ভদ্রলোকটি আমায় জানলেন যে তিনি এখন বাইরে আছেন, আমি যেন তাঁকে পরে ফোন করি। অবশ্য তিনি জানালেন যে আমাদের প্রয়োজনীয় দু’টি দিনের জন্য ঘর পাওয়া যাবে। আমি তাঁর কথায় সম্মতি জানিয়ে ফোন ছেড়ে দিয়ে থেনজল গেস্টহাউসে ফোন করলাম।

এখানে আবার এক ভদ্রমহিলা ফোন ধরলেন। ইনি কোন ভাষায় কথা বলেন বোঝার সুযোগ পেলাম না। হিন্দি এবং ইংরেজি, দু’ভাষাতেই আমার কথা শুনে তিনি শুধু ‘হ’ বললেন। সন্দেহ হওয়াতে আমি কেটে  কেটে, সময় নিয়ে, তাঁকে নির্দিষ্ট দিনে প্রয়োজনীয় তিনটি ঘর পাওয়া যাবে কী না জিজ্ঞাসা করায়, তিনি শুধু ‘হ’ বললেন। আমি তাঁকে ঘর বুকিং এর জন্য কিভাবে টাকা পাঠাবো জিজ্ঞাসা করায়, তিনি একই সুরে তাঁর অভিধানের একমাত্র শব্দ ‘হ’ বললেন।

বিকালের দিকে চামফাই গেস্টহাউসে আবার ফোন করতে আগের সেই ভদ্রলোক আবার সেই একই কথা বললেন, তিনি বাইরে আছেন আমি যেন তাঁকে পরে ফোন করি। তবে তাঁর কথায় জানা গেল যে তিনি গেস্টহাউসেই থাকেন, ঘর পাওয়া যাবে, কোন অসুবিধা হবে না।

থেনজলের ভদ্রমহিলার ‘হ’-এ আশ্বস্ত হতে না পেরে সন্ধ্যার সময় তাঁকে তাঁর মোবাইলে এস.এম.এস. করে সকালের কথোপকথন উল্লেখ করে, থেনজলের গেস্টহাউসে থাকার দিনক্ষণ পুনরায় জানিয়ে, তিনটি ঘর  আমাদের জন্য রাখার অনুরোধ করলাম। কিছুক্ষণ পরে তাঁর পাঠানো এস.এম.এস. উত্তরে জানা গেল, নির্দিষ্ট দিনে আমাদের জন্য তিনটি ঘর রাখা থাকবে। আমাদের তাঁর গেস্টহাউসে নির্দিষ্ট দিনে চলে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে আশ্বস্ত করা হ’ল, আমাদের কোনরকম অসুবিধা হবে না। যাক, একটা সমস্যা মিটলো।

চামফাই গেস্টহাউসের ভদ্রলোককে ফোন করলাম। এবার আমার বক্তব্য শুনে তিনি প্রথমে চারটি ঘরের কথা বললেও, আমার অনুরোধে তিনি তিনটি ঘর নির্দিষ্ট দু’টি দিনে আমাদের জন্য রেখে দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তবু নিশ্চিন্ত হতে আমাদের ওখানে যাওয়ার বিস্তারিত, অর্থাৎ কোন গেস্টহাউস, ক’টা ঘর, কোন কোন দিনের জন্য, কতজন যাব, ইত্যাদি তথ্য বিস্তারিত ভাবে দিয়ে, কনফার্ম করার অনুরোধ করে তাঁকে এস.এম.এস. পাঠালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই “নো প্রবলেম, ওয়েলকাম” লেখা এস.এম.এস. পেলাম। এবার নিশ্চিন্ত, মেঘালয়ে থাকার ব্যবস্থা ওখানে গিয়ে করবো। মিজোরামে থাকার ব্যবস্থাও পাকা হয়ে গেল।

প্রথমে আমাদের ট্রেনে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, সেইমতো যাওয়া আসার টিকিট কাটাও ছিল, কিন্ত অযথা অনেক সময় নষ্ট ও শারীরিক কষ্টের কথা ভেবে মিজোরাম হাউস থেকে অনুমতি পাওয়ার পরে যাত্রার দিন দু’দিন পিছিয়ে বিমানের টিকিট কাটা হ’ল। যাবার ট্রেনের টিকিটও বাতিল করা হ’ল। নির্দিষ্ট দিনে, অর্থাৎ বছরের শেষ দিনটায় ছোট্ট বিমানে করে আইজলের ছবির মতো সুন্দর সাজানো গোছানো, ঝাঁ চকচকে, হিমালয়ের মিষ্টি গন্ধ মাখা, ছোট্ট বিমানবন্দর ‘লেংপুই’ গিয়ে নামা গেল। কিন্তু  বিমানবন্দর থেকে বেরতে গিয়ে টের পেলাম, বিপদ ও ঝামেলা আমাদের এখনও পিছু ছেড়ে যায় নি।

3 LENGPUI AIRPORT4 LENGPUI AIRPORT5 LENGPUI AIRPORT

ট্রেনে যাওয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের মিজোরামে ঢোকার কথা ছিল পরের বছরের প্রথম দিনটিতে। অনুমতিপত্রেও আমাদের পূর্ব ইচ্ছামতো তাই লেখা আছে। কিন্তু আমরা একদিন পূর্বেই মিজোরামে এসে হাজির হয়েছি। কাউন্টারে কর্তব্যরত সিকিউরিটি অফিসার আমাকে ব্যাপারটা দেখাতে আমার তো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ার মতো অবস্থা। যাওয়ার আনন্দে, উত্তেজনায়, এই ব্যাপারটা মনেও পড়ে নি, ভেবেও দেখি নি। আমার তখন আশা ভরসা একটাই, রাজ্যটা পশ্চিমবঙ্গ নয়। গোটা ব্যাপারটা ঐ অফিসারকে বুঝিয়ে বললাম। উনি হাতে একটা কলম নিয়ে বারবার তারিখটার কাছে নিয়ে যাচ্ছেন আর বলছেন—“বুঝতে পারছি, কিন্তু  যিনি এই অনুমতি পত্রে সাক্ষর করেছেন, তিনি অনেক উচ্চ পদস্থ অফিসার। ওখানে কলম চালানো আমার উচিৎ হবে না”। ব্যাপারটা হয়তো সত্যিই তাই, কারণ মিজোরাম হাউসে অনুমতি পত্র তৈরি হওয়ার পরে আমাদের অনেক্ষণ সাক্ষরকারী অফিসারের জন্য বসে থাকতে হয়েছিল। শেষে লাল বাতি জ্বালানো গাড়ি নিয়ে এক ভদ্রলোক এসে সমস্ত অনুমতি পত্রে সাক্ষর করেন। যাইহোক শেষ পর্যন্ত আগের মতোই কলমটি তারিখের কাছে নিয়ে এসে ভদ্রলোক কথা বলতে বলতেই হঠৎ মিজোরামে ঢোকার তারিখটি কেটে আগের দিন করে দিয়ে শুধু বললেন, আপনারা অসুবিধায় পড়েছেন তাই করে দিলাম। আমাদের রাজ্যে হলে এই কাজটির জন্য খরচ হয়তো একটু বেশিই হ’ত, কারণ এই কাজটির জন্য কোন অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে, তাঁর মুখ থেকে একবার ওয়েলকাম শব্দটি শুনতে হয়েছিল এবং করমর্দন করতে হয়েছিল। আমরা বিমানবন্দরের বাইরে পা রাখলাম।

বিমানবন্দর থেকে সুন্দর পাহাড়ী রাস্তা ভেঙ্গে একসময় আমরা চাল্টলাঙ্গ গেস্টহাউসে এসে পৌছলাম। বাইরে থেকে তত সুন্দর মনে না হলেও অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি চারতলা বিশাল বাড়িটায় তখন শ্মশানের নীরবতা। ভিতরটা বেশ সুন্দর, রিসেপশনটা তো খুবই সুন্দর, বাড়ির চারপাশটাও ফুলের ও অন্যান্য সৌখিন গাছ দিয়ে সাজানো। কিন্তু তবু বোঝা যায় পরিচর্যা ও দেখভালের যথেষ্ট অভাব, কতদিন সুন্দর থাকবে বলা শক্ত। এল প্যাটার্নের বাড়ির চারতলায় আমাদের পরপর তিনটি ঘর দিয়ে আমাদের একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে অনুরোধ করা হ’ল। আমরা ছাড়া এতবড় বাড়িতে আর কোন বোর্ডার নেই। স্নান সেরে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে আমরা ডাইনিং হলে খেতে গেলাম। আমরা সাতজন বেশ বড় হলঘরের একপ্রান্তে বসলাম। আর কোন লোক নেই। খাবারও অতি সাধারণ, ভাত, ডাল, একটা সবজী ও ডিমের ঝোল। পরিবেশক জানালেন,  আমরা আজ আসবো বলে আমাদের জন্য তাদের খাবার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। গেস্টহাউসে কোন কর্মী নেই, তাই আমরা যেন রাতের খাবার ব্যবস্থা অন্যত্র কোথাও করে নি।

8 ON THE WAY TO CHALTLANG9 ON THE WAY TO CHALTLANG12 CHALTLANG GUEST HOUSE11 CHALTLANG GUEST HOUSE18 CHALTLANG GUEST HOUSE13 CHALTLANG GUEST HOUSE

খাওয়া শেষ করে নীচে রিসাপশনে গিয়ে অন্য কোথাও খাওয়ার অসুবিধার কথা জানাতে গেলাম। কাউন্টারের ভদ্রলোক জানালেন যে, বছরের শেষ দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন এখানে সবাই উৎসবে মেতে থাকে। তাই গেস্টহাউসে খাবার তৈরি করা তো দুরের কথা, ঘরে খাবার জল দেওয়ার লোক পর্যন্ত নেই। গোটা গেস্টহাউস ফাঁকা, লোকের অভাবে কাউকে বুকিং দেওয়া হয় নি। এতক্ষণে আমাদের আগামী কাল অন্য হোটেলে থাকতে বলার রহস্য উদঘাটন হ’ল। আমরা জানালাম যে আমাদের ঘরে খাবার জল দেওয়ার প্রয়োজন নেই, ঐ কাজটা আমরা নিজেরাই করে নেব। তবে আগামী কাল আর আমরা অন্য কোন হোটেলে যাচ্ছি না, এখানেই থেকে যাব। আর এই ঠান্ডার মধ্যে মেয়েদের নিয়ে কোথায় খেতে যাব, আজ রাতের খাবারটা যেভাবে হোক একটু করে দেবার ব্যবস্থা করা হোক। ভদ্রলোক হ্যাঁ বা না কিছুই না বলে চুপ করে রইলেন।

এখানে আমাদের তিনটে ঘরেই তিনটে ইলেকট্রিক কেটলি রাখা আছে দেখলাম। আমাদের সঙ্গেও একটা এসেছে। সঙ্গে প্রচুর টি ব্যাগ নিয়ে আসা হয়েছে, কাজেই চা খাওয়ায় কোন অসুবিধা নেই। তরুন জানালো যে সে বিকালে পাঁউরুটি, জ্যাম বা জেলি, ডিম, আলু, ইত্যাদি কিনে আনবে। সে বললো আলু ও ডিম ভাগ করে করে চারটে কেটলিতে সিদ্ধ করে নিতে পারলে, জলখাবার, প্রয়োজনে রাতের খাবারের সমস্যাও মিটবে। আমরা তার এই প্রস্তাব নিয়ে ঠাট্টা তামাশা শুরু করে দিলাম।

বিকাল বেলা পায়ে হেঁটে ঘুরবার পথে সামান্য রাস্তা হেঁটেই দেখলাম রাস্তার দুপাশে পরপর দোকানগুলো সব বন্ধ। রাস্তা একবারে শুনশান, এক-আধজন যুবক যুবতী ছাড়া একটা লোকও চোখে পড়লো না। বুঝতে পারছি আমাদের মিশন-কেটলি ‘ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে’ হয়েই থেকে গেল, ভুমিষ্ঠ হবার সুযোগ আর পেল না। হাঁটতে হাঁটতে বেশ খানিকটা রাস্তা যাবার পর, একটা দোকান খোলা দেখে ঢুকে পড়লাম। সবকিছুই পাওয়া গেল, যদিও জ্যামের শিশিটা স্থানীও কোন প্রস্তুতকারকের তৈরি ও প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত ছোট, আর তিন বছর আগেও কালচে রঙের এবড়ো-খেবড়ো আলু চল্লিশ টাকা কিলো। খনার বচনের কথা মনে পড়লো- যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন। আমরা তো মাত্র সাতজন, ঐ জ্যামের শিশিতে অসুবিধা হওয়ার কথা ধোপে টিকবে না। তাই ‘নেই মামার চেয়ে কানা মামাও ভালো’ ভেবে, সববিছু কেনাকাটা করে জনশূন্য রাস্তা দিয়ে এক চক্কর শহর পরিক্রমা করে গেস্টহাউসে ফিরলাম।

22 NEW YEAR'S NIGHT, CHALTLANG23CHANTLANG20 CHALTLANG GUEST HOUSE

রিসেপশনের আরামদায়ক বেতের সোফায় দেখলাম দু’চারজন বসে আলাপচারীতায় ব্যস্ত। নিজেদের ঘরে ঢুকবার আগে দেখলাম আমাদের পাশের দু’টো ঘরে লোক এসেছে। খাবার জল আনতে গিয়ে জানা গেল আজ হঠাৎ দু’চারজন সরকারি আমলা দরকারি কাজে এসে উপস্থিত হওয়ায়, রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতেই হচ্ছে, তাই আমরাও সেই খাবারের থেকে কিছু প্রসাদ পাবো। তবে লোকের অভাব, তাই খাবার পেতে একটু রাত হতে পারে। মনে হ’ল সেই সরকারি আমলাদের খুঁজে বার করে একটা চুমু খেয়ে আসি। রাতের খাবারের ব্যবস্থা যখন হয়েই গেল, তখন সদ্য কিনে আনা খাবারের সদব্যবহার করে ফেলা উচিৎ। অন্তত পাঁউরুটি আর ডিমগুলোর কথা ভেবে সান্ধ্যভোজের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। কাল এগুলোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। প্রয়োজন হলে কালকের কথা কাল ভাবা যাবে। শাস্ত্রেই তো বলা আছে, মিজোরাম এনেছেন যিনি, খাবার জোগাবেন তিনি।

তিন ঘরে চারটে কেটলিতে আলু ধুয়ে, খোসা ছাড়িয়ে, ছোটছোট করে কেটে, সিদ্ধ করতে দেওয়া হ’ল। একই ভাবে ডিমও সিদ্ধ হ’ল। নু্‌ন, মরিচ গুঁড়ো ও মিষ্টি আমাদের সঙ্গেই আছে। ফলে জ্যাম মাখানো রুটি, নুন ও মরিচ গুঁড়ো দেওয়া আলু ও ডিম সিদ্ধ এবং শেষে মিষ্টি দিয়ে সান্ধ্যভোজ সেরে এক রাউন্ড কফি সেবন করে, মহাভোজ সাঙ্গ হ’ল। তরুনটা বোকা হলেও মাথায় বুদ্ধি যথেষ্টই রাখে, আর তাই ও বা ওর পরিবার আমার সবথেকে প্রিয় ভ্রমণসঙ্গী ও আত্মীয়সম।

রিসেপশন থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে গাড়ির জন্য সকালেই ফোন করে রেখেছিলাম। অনেক চেষ্টা অনেক সাধ্য-সাধনার পর, ও প্রান্ত থেকে ফোন ধরে আমার বক্তব্য শুনে জানিয়েছিল সন্ধ্যার সময় গেষ্টহাউসে এসে দেখা করবে। সন্ধ্যা অনেক্ষণ অতিক্রম করে গিয়ে রাত হয়ে যাওয়ায় আবার ফোন করলাম। অনেক চেষ্টার  পরে ও প্রান্ত দয়া করে ফোন ধরলেও, তার বক্তব্য পরিস্কার নয়। পরের দিন সকালে সে এসে কথা বলবে বলে জানিয়ে ফোন কেটে দিল। মহা মুশকিল, কাল সকালেই আমাদের গাড়ি নিয়ে বেরবার কথা, শেষে ওর  অপেক্ষায় থেকে একটা গোটা দিন নষ্ট হবে। আবার রিসেপশন কাউন্টারের সেই ভদ্রলোকের শরণাপন্ন হলাম। ভদ্রলোক জানালেন বছরের প্রথম ও শেষ দিনটি এখানে সবাই উৎসবে মেতে থাকে, সমস্ত দোকানপাট বন্ধ রেখে আনন্দে মেতে থাকে। এই দু’দিন গাড়ি পাওয়ায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। আরও খান দু’এক ফোন নাম্বার নিয়ে চেষ্টা করে বিফল হয়ে, শেষে আবার পূর্বের সেই ফোন নাম্বারে ফোন করে একটু মেজাজ দেখিয়েই বললাম যে, সে যদি আমাদের সাথে যেতে চায়, তাহলে এখনই এসে দেখা করে যাক, তা নাহলে আমরা অন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে নেব। উত্তরে বিড়বিড় করে সে কী যে বললো বোঝা না গেল না।

কী করা যায় বুঝতে পারছি না। এই রাজ্যে প্রায় সাতাশি শতাংশ অধিবাসী খ্রিস্টধর্মাবলম্বী। বছরের শেষ ও প্রথম দিনটি উপভোগ করার জন্য এই খ্রিস্টান প্রধান রাজ্যে বেছে বেছে এই দিনটাতে আসা। তার ফল যে এমন উল্টো হবে কে জানতো। আমাদের এই রাজ্যে বড়দিন, বর্ষশেষ, বা নববর্ষের দিনে রাস্তাঘাট বা দোকানপাট আলোক মালায় সজ্জিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পার্ক স্ট্রীট্ বা ঐ জাতীয় রাস্তায় তো সারা রাত লোকের ভিড় উপচে পড়ে। আমরা বাঙালী অখ্রিস্টানরাও সাহেব-মেম সেজে, বাড়িতে তালা লাগিয়ে, খ্রিস্টান প্রধান এলাকায় বড়দিন বা নববর্ষ পালন করতে যাই। কিন্তু এরা এই দিনগুলিতে সমস্ত কিছু বন্ধ রেখে,  পরিবারের সাথে নিজের নিজের বাড়িতে আনন্দে মেতে ওঠে। আমাদের এই রাজ্যে বড় কোন রাজনৈতিক দলের ডাকা বাংলা বন্ধেও রাস্তাঘাট এত ফাঁকা থাকে না, সমস্ত দোকানপাট এইভাবে বন্ধ থাকে না।

যাইহোক প্রভু যীশুর অসীম দয়া ও করুণায়, আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে কিমা নামে বছর ত্রিশ-এর একজন এসে হাজির হ’ল। সে জানালো আজ ও আগামী কাল তাদের উৎসব, তাই আমরা পরশু গেলে তার পক্ষে সুবিধা হয়। আজ ও আগামী কাল গাড়ি বা ড্রাইভার পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আমরা তাকে জানালাম যে আমাদের হাতে সময় খুব কম, কাজেই দু’দিন আইজলে বসে থাকা কোন মতেই সম্ভব নয়। কাজেই সে যদি আমাদের ইচ্ছা মতো আমাদের সাথে মিজোরামের জায়গাগুলো গাড়ি নিয়ে যেতে চায়, তাহলে কাল সকালে গাড়ি নিয়ে আসুক, তা না হলে আমরা অন্য গাড়ির সাথে চলে যাবার ব্যবস্থা করে নেব। এই এক বেলাতেই বুঝতে পেরেছি, আমাদের মতো পাগল ছাড়া মিজোরামে টুরিস্ট বিশেষ একটা আসে না। এখন পর্যন্ত আমাদের তো একজনও চোখে পড়ে নি। আমাদের প্রতি দয়া বা সাহায্যের হাত বাড়ানো, না খদ্দের হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে জানি না, সে আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী মিজোরামের জায়গাগুলো ঘুরিয়ে দেখাবার জন্য দরদস্তুর করে ভাড়া ঠিক করে, কাল সকালে টাটা সুমো গাড়ি নিয়ে আসবে বলে কথা দিয়ে চলে গেল।

রাতে মহামান্য সরকারি আমলাদের সাথে রুটি তরকারী খেয়ে, রাস্তায় একটু পায়চারি করে ঘরে ফিরলাম। আমাদের ঘরগুলোর পাশেই এক ভদ্রলোক এসে উঠেছেন। উনি বাঙালী, তাই নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আলাপ করলেন। তাঁর কথায় জানা গেল তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের অতি উচ্চ পদস্থ কর্মচারী। সরকারি কাজে এখানে প্রায়ই আসতে হয়। এবার এখান থেকে মিজোরামের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেরাতে হবে। আমরা মায়ানমার-এ হার্ট লেক দেখতে যাব শুনে তিনি জানালেন যে, একবার কলকাতা থেকে তাঁর আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবদের তিনি হার্ট লেক দেখাতে নিয়ে গেছিলেন। তিনি সঙ্গে থাকায় তাদের সীমান্তের ওপারে নিয়ে যেতে কোন অসুবিধা হয় নি। আগে জানলে তিনি আমাদের হার্ট লেকে যাবার ব্যবস্থা করে দিতেন, কিন্তু তাঁর হাতে এখন আর সেই সময় নেই। আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, বই-এ পড়েছি যে হার্ট লেক দেখার জন্য মায়ানমারে ঢুকতে কোন ভিসা পাসপোর্টের প্রয়োজন হয় না। তিনি বললেন এটা সবার জন্য নয়। আমাদের সাহায্য করতে না পারার জন্য তিনি আর একবার দুঃখ প্রকাশ করে বললেন— দেখুন চেষ্টা করে। আমরা যে যার ঘরে চলে গেলাম। মিজোরামে সুরা পান ও সুরা বিক্রয় নিষিদ্ধ হলেও, এই ব্যাপারে যে কড়াকড়ি গুজরাটে দেখেছি, তার ছিটে ফোঁটাও এখানে লক্ষ্য করি নি। রাস্তার পাশে, এমন কী আমাদের গেস্টহাউসের আনাচে কানাচে সুরার খালি বোতলের সংখ্যাই তার সাক্ষ্য বহন করে। আজ বর্ষপুর্তির উৎসবের যা নমুনা দেখলাম, আগামী কাল সুস্থ অবস্থায় কিমা সাহেব আসলে হয়। আস্তে আস্তে রাত বাড়ছে। নিঃশব্দ  গেস্টহাউসের ব্যালকনিতে চেয়ার নিয়ে বসে দুরের অন্ধকারে নানা রঙের আলোর মালা দেখছি। রাত বারটা বাজতেই শরু হ’ল আতশ-বাজি জ্বালানো। জ্বালানো বললাম ফাটানো নয়, কারণ এরা আমাদের মতো শব্দ বাজি ফাটিয়ে সকলকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ উপভোগ করার মতো সভ্য এখনও হয়ে উঠতে পারে নি।

সকাল সকাল চা খেয়ে তৈরি হয়ে কিমা চন্দ্রের আসার অপেক্ষায় বসে রইলাম। আজ ওর সাথে রেইক যাব। ফেরার পথে আইজল শহরের দ্রষ্টব্য যা যা আছে দেখে এখানেই ফিরে আসা। খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হ’ল না, কিমা তার টাটা সুমো নিয়ে উপস্থিত হ’ল। আমরা আর এতটুকু সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পড়লাম। আইজল থেকে রেইক-এর দুরত্ব উনত্রিশ কিলোমিটার মতো। কিমা জানালো রেইক পৌঁছতে ঘন্টাখানেক মতো সময় লাগবে।

সুন্দর সবুজ জঙ্গল ও ঝোপে ঘেরা রাস্তা দিয়ে আমাদের গাড়ি একসময় মামিট জেলার রেইক এসে পৌঁছলো। রেইক-এর উচ্চতা পাঁচ হাজার ফুটের মতো। মিজোরামের কোন অঞ্চলের উচ্চতাই খুব একটা বেশি নয়, সর্বোচ্চ শৃঙ্গের উচ্চতা মাত্র সাত হাজার দুশ’ পঞ্চাশ ফুট। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল কথাটা ভূগোল বইতে পড়তাম, এখানে এসে মালুম হ’ল নাতিশীতোষ্ণ কাকে বলে। কী আরামদায়ক জায়গা বোঝাতে পারবো না। শুনেছিলাম রেইক একটি হেরিটেজ ভিলেজ। ছোট ছোট কুঁড়েঘর দিয়ে ঘেরা গ্রামটি সত্যিই ভারী সুন্দর। বড় বা আধুনিক স্থাপত্য বিশেষ চোখে পড়লো না। মিজোরামে প্রধানত বিভিন্ন উপজাতির বাস। এখানে বিভিন্ন উপজাতির বাসস্থান ও তাদের ব্যবহৃত জিনিস মিজোরাম পর্যটন বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা আছে। গোটা রাজ্যটার এখনও প্রায় সমস্তটাই সবুজ জঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে পরিপুর্ণ। স্বাভাবিক ভাবে রেইক গ্রামটিতেও ঘন সবুজের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। একটা স্টেডিয়ামও লক্ষ্য করলাম। আর এখান থেকে পরিস্কার আকাশ থাকলে বাংলাদেশের কিছুটা দেখা যায়। তবে এই কুঁড়েঘরের সাম্রাজ্যে চোখ ধাঁধানো কাফেটারিয়াটা দেখলে সত্যিই অবাক হতে হয়। অনেকক্ষণ সময় রেইক-এ কাটালাম। পায়ে হেঁটে বনজঙ্গল পেরিয়ে অনেকটা পাহাড়ি রাস্তা ভেঙ্গে বেশ উঁচু একটা জায়গায় গেলাম। এখান থেকে চারিদিকের বহুদুর পর্যন্ত দেখা যায়। ফিরে এসে কাফেটারিয়ায় ঢুকলাম। ঝাঁ চকচকে কাফেটারিয়ায় অর্ডার দিলে খাবার তৈরি করে দেবে। সামান্য চাউ করতে চাউয়ের দামের মতোই অনেক বেশি সময় নিল। একজন পর্যটকও চোখে পড়লো না। এখানে সারা বছরে ক’জন পর্যটক বেড়াতে আসেন সন্দেহ। স্থানীয় মানুষদের এই কাফেটারিয়ায় খাওয়ার ক্ষমতা বা স্বভাব, কোনটাই আছে বলে তো মনে হ’ল না, অথচ কী পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে ওরা এটাকে রেখেছে দেখে শেখা উচিৎ। এবার ফেরার পালা। আজই আমাদের আইজল শহরটা ঘুরে দেখার কথা। রেইককে সারা জীবনের মতো বিদায় জানিয়ে, আইজল শহরের উদ্দেশ্যে আমরা গাড়িতে এসে বসলাম।

48 REIEK47 REIEK42 REIEK43 REIEK38 REIEK37 REIEK34 REIEK55 REIEK54 REIEK50 REIEK CAFETERIA51 REIEK CAFETERIA52 REIEK

আইজল শহরে দেখার মতো বিশেষ কিছু আছে বলে তো মনে হ’ল না। আর পাঁচটা পাহাড়ি শহরের মতোই। তবে আমরা যেহেতু না জেনে এক অদ্ভুত সময়ে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছি, তার খেসারত তো আমাদের দিতেই হবে। এ যেন এক জনপ্রিয় মেগা সিরিয়াল দেখার সময় অযাচিত ভাবে গৃহস্থ বাড়িতে উপস্থিত হওয়ার মতো অবস্থা। আমাদের নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ, অথবা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। আমরা অনাহূতের মতো গাড়ি নিয়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে কিমার সাথে ঘুরলাম। কিমাই আমাদের বড় বাজার বা অন্যান্য দেখবার জায়গা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আইজল শহর দেখালো। সন্ধ্যার পর নির্বিঘ্নে গেস্টহাউসে ফিরে এলাম। আগামী কাল আমরা চামফাই চলে যাব। যাবার পথে টামডিল লেক দেখে যাওয়ার কথা। কিমার কথা অনুযায়ী রাস্তা অনেকটাই এবং রাস্তার অবস্থাও খুব একটা সুবিধার নয়, তাই ওকে আগামী কাল খুব ভোরে আসার কথা বলে বিদায় দিলাম। রাতে আমাদের রুটি তরকারী ও ডিমভাজা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম।

বেশ সকাল সকাল শেষবারের মতো কেটলি ব্যবহার করে চা ও সঙ্গে আনা টুকটাক খাবার খেয়ে গেস্টহাউসের বিল মিটিয়ে তৈরি হয়ে, কিমার আগমনের অপেক্ষায় বসে রইলাম। দেখতে দেখতে একটু বেলা হয়ে গেল, কিন্তু কিমা সাহেবের দেখা মিললো না। রাস্তা ধরে বেশ খানিকটা ঘুরে এলাম, স্থানে স্থানে বনভোজনে যাওয়ার প্রস্তুতি চোখে পড়লো। আজ যদিও উৎসবের সমাপ্তি ঘটা উচিৎ, কিন্তু উৎসবের রেশ  এখনও কাটেনি দেখলাম। গেস্টহাউসের ডানপাশ দিয়ে গেস্টহাউসের পিছন দিকে যাওয়া যায়। সম্ভবত সেখানে গেস্টহাউসের কর্মচারীরা থাকে। গেস্টহাউসের চারতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম একটা ম্যাটাডোর জাতীয় গাড়ি এসে আমাদের ঘরের ঠিক সামনের খোলা চত্বরটায় দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে দু-চারজন নেমে গাড়ির পিছনের ডালা খুলে রেখে, ঐ রাস্তা দিয়ে গেস্টহাউসের পিছনদিকে চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পরে দেখলাম জনা আট-দশ লোক একটা সাদাও নয় গোলাপিও নয় রঙের তাগড়া শুয়োরকে, দড়ি দিয়ে বেঁধে তার ইচ্ছার  বিরুদ্ধে টানতে টানতে গাড়ির কাছে নিয়ে আসছে। শুয়োরটা তার সর্বশক্তি দিয়ে, ও ভীষণ রকম চিৎকার করে এই অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আর পাঁচটা ন্যায্য প্রতিবাদের মতো এটাও ধোপে টিকলো না। যেমন ভাবে কোন পোস্ট্ বা ঐ জাতীয় কিছুকে, যাতে পড়ে না যায় বলে চারিদিক দিয়ে টেনে বাঁধা হয়, তাকেও গাড়িটার কাছে টানতে টানতে নিয়ে এসে ঐ ভাবে চারিদিক দিয়ে শক্ত দড়ি দিয়ে টেনে বাঁধা  হ’ল। এবার একজন একটা বন্দুক নিয়ে এসে কিছুটা দুর থেকে এক গুলিতে তার প্রতিবাদ চিরদিনের মতো স্তব্ধ করে দিল। এতোটা রাস্তা মরা শুয়োর বয়ে আনার কষ্ট লাঘব করতেই বোধহয়, এই ব্যবস্থা। এবার দড়ির বাঁধন খুলে অনেক লোকে বেশ পরিশ্রম করেই তাকে ফাঁকা ম্যাটাডোরে শুইয়ে দিয়ে, নিজেরা গাড়িতে উঠে চলে গেল। পরে শুনলাম ওরা দুরে কোথাও পিকনিক্ করতে যাচ্ছে। বাকি লোকেরা সেখানে আগেই চলে গেছে। সবাই মনের আনন্দে চলে গেল, শুধু কিমা চন্দ্রের আগমনের অপেক্ষায় নির্জন পুরীতে আমরা সাতজন বসে আছি।

শেষেরও তো একটা শেষ থাকে, অবশেষে প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে আমাদের কিমা সাহেব গাড়ি নিয়ে এসে হাজির হলেন। আমাদের কোন কথা বলার আগেই সে আমাদের আশ্বস্ত করে বললো,  কোন অসুবিধা নেই, আমরা টামডিল লেক দেখে ফেরার পথে লাঞ্চ করে সোজা চামফাই চলে যাব। ও যে দয়া করে উৎসবের আনন্দ ছেড়ে এসেছে, এটাইতো সবথেকে বড় পাওয়া, সুবিধাও বলা যেতে পারে। কাজেই এরপর অসুবিধার কোন বদ গন্ধের প্রশ্ন আসতেই পারে না। রাস্তায় কোথায় খাব জানি না, রাজধানী শহর আইজলেরই এই অবস্থা, মাঝপথে ছোট জায়গায় কী পাওয়া যাবে, আদৌ পাওয়া যাবে কী না, প্রভু যীশুই জানেন। সঙ্গে অবশ্য শুকনো খাবার যথেষ্টই আছে। ভেবে লাভ নেই, “পড়েছি কিমার (মোগলের) হাতে, খানা খেতে হবে সাথে”। মালপত্র গাড়িতে বাঁধাছাঁদা করে যীশু যীশু করে, এখান থেকে পঁচাশি কিলোমিটার (কোথাও আবার দেখলাম ৬৪ কি.মি.)দুরের টামডিল লেক হয়ে, আমাদের চামফাই যাত্রা শুরু হ’ল।

নির্মল আকাশ, আবহাওয়াও খুবই আরামপ্রদ, সবথেকে বড় কথা ওদের উৎসব ও আমাদের দুশ্চিন্তার দিন শেষ। আমরা যেমন এক রাতের কালীপূজো পাঁচ-সাত দিন ধরে মহানন্দে পালন করি, ওরা বোধহয় এখনও আমাদের মতো অত চালাক হয়ে উঠতে পারে নি। দুপাশে সবুজ পাহাড়ি রাস্তা ধরে আমাদের গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে। আইজল থেকে চামফাই-এর দুরত্ব এক শ’ চুরানব্বই কিলোমিটার, কিন্তু আমরা চামফাই যাওয়ার পথে প্রথমে প্রায় পঁচাশি কিলোমিটার দুরের টামডিল লেক দেখে তবে চামফাই যাব। দুটো জায়গা একই পথে পড়ে কী না, বা এর জন্য অতিরিক্ত কত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে কিমার কথায় পরিস্কার হ’ল না।

অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসে একটা দোকান থেকে কিছু ফল কিনে নিয়ে, পাশের চা-কাম স্টেশনারি দোকান থেকে চা খেয়ে, কিছু কেক, বিস্কুট, জলের বোতল ইত্যাদি কেনা হ’ল। দুটো দোকানেই মহিলা বিক্রেতা। আমরা দোকান ছেড়ে চলে আসার সময় মহিলাটি একটু হেসে বললেন,  ‘কেলবা’। এখানে বেশ ভাষা সমস্যা আছে, ওদের উচ্চারণও অদ্ভুত, তাই ‘কেলবা’ শুনে আমরা নিজেদের মধ্যে একটু হাসাহাসি করলাম। আমরা বাঙালিরা আজকাল মারবো বা প্রহার করবো কথাটা বলা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি, হয়তো ভুলেই গেছি। তার পরিবর্তে এখন যে বিখ্যাত শব্দটি ব্যবহার করি, তার সাথে মহিলার ‘কেলবা’র এত মিল, যে আমরা মহিলাটি কী বলতে চাইছেন বুঝতে না পেরে, নির্ঘাত সেই বিখ্যাত শব্দটি বলছেন বলে নিজেদের মধ্যে নিজেদের ভাষায় ঠাট্টা তামাশা করলাম। মহিলাটি বোধহয় বুঝতে পারলেন যে আমরা তাঁর কথার অর্থ বুঝতে পারিনি, তাই তিনি নিজেই বুঝিয়ে দিলেন যে কেলবার অর্থ ধন্যবাদ।

একটা জায়গায় এসে রাস্তা থেকে একটু উপরে একটা হোটেল দেখিয়ে কিমা আমাদের জানালো, যে ফিরে আসার পথে এখানেই দুপুরের খাবার খেয়ে নেবার কথা বলে আসতে। গাড়ি থেকে নেমে উপরে গিয়ে শুনশান হোটেলে কারো দেখা পাওয়া গেল না। বেশ কয়েকবার ডাকাডাকির পর একজন এসে জানালো যে লোকের অভাব, তাই খাবারের ব্যবস্থা করা যাবে না। তাকে একবার অনুরোধ করলাম শুধু চাপাটি আর একটা সবজী বানিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু ভীষ্ম তার পূর্বপুরুষ ছিলেন কী না জানি না, তবে সে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা করে বসে রইল, চাপাটি সে বানাবে না, বানাবে না, বানাবে না। অগত্যা হাল ছেড়ে গাড়িতে ফিরে এলাম।

একসময় মূল রাস্তা থেকে বাঁ দিকে বেঁকে আমরা টামডিল লেক দর্শনে এগিয়ে চললাম, এবং টামডিল লেকের প্রবেশ দ্বারের সামনে এসে উপস্থিত হলাম। আরও বেশ কিছুটা পথ এসে লেকের পাড়ে হাজির হওয়া গেল। বাঁপাশে লেকের পাড়ে একটা গাছে একটা বোর্ড লাগানো। বোর্ডটি আদ্যপ্রান্ত ইংরেজি হরফে লেখা হলেও, বক্তব্য বোঝার উপায় নেই। এখন পর্যন্ত যতটুকু ঘুরলাম, প্রায় কোন লেখারই মর্মোদ্ধার করতে পারিনি, যদিও সর্বত্রই ইংরেজি হরফে লেখা। প্রথম প্রথম ইংরেজি শব্দে নিজের পান্ডিত্য দেখে নিজেরই লজ্জা করবে, মা কালীর দিব্যি বলছি আমারও করেছিল। দশটা শব্দের কোন লেখার অন্তত সাড়ে ন’টার অর্থ জানি না। কোন কালে শুনেছি বলেও মনে করতে পারি না। এখানে তবু আমরা আসবো বলেই বোধহয়, বোর্ডের একবারে নীচে অপেক্ষাকৃত ছোট হরফে হলেও “INCHARGE, TAMDIL FISH SEED FARM” কথাটা লেখা হয়েছে। ওঃ! কী যে আনন্দ পেলাম, বোঝাতে পারবো না। নিজেকে কেমন সাহেব সাহেব মনে হচ্ছে। পাঁচটা শব্দের পাঁচটার অর্থই আমি জানি, একি কম কথা। কৃতজ্ঞতায় ফার্মের ইনচার্জকে মনে মনে একটা ছোট্ট করে প্রণাম ঠুকে দিলাম।

লেকটি খুবই সুন্দর ও বড়, যদিও জলের রঙ মোটেই নীল নয়, বরং একটু সবজেটে, পুকুরের জলের মতো। লেকটি “লেক অফ মাস্টার্ড” নামেও পরিচিত। এক স্বামী-স্ত্রীর চাষাবাদের উপাখ্যান, কিন্তু এতো বলতে গেলে পাঠক-পাঠিকার ধৈর্যচ্যুতি হতে পারে, তাই ইচ্ছা থাকলেও সেই পসঙ্গে আর গেলাম না। তবে এখানে এসে কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানলাম, এই লেকটি থেকে আইজলের দুরত্ব মাত্র একশ’ দশ কিলোমিটার। সবথেকে কাছের শহর, মাত্র ছয় কিলোমিটার দুরের সাইতুয়াল।

72 TAMDIL LAKE66 TAMDIL LAKE63 TAMDIL LAKE65 TAMDIL LAKE60 TAMDIL LAKE70 TAMDIL LAKE

এখানে দেখলাম দলে দলে লোক লেকের পাড়ে বনভোজন করতে এসেছে। রীতিমতো জমজমাট ভিড়। সব দলের সামনেই কাঠের আগুনে রান্না হচ্ছে। আমার একটু বেশি চা খাওয়ার বদভ্যাস আছে। চারিদিক ঘুরেও একটা দোকান চোখে পড়লো না। শেষে পাশ দিয়ে যাবার সময় প্রত্যেক দলের হাঁড়ি-ডেকচির দিকে শকুনের দৃষ্টি বুলিয়েও, একটা চা বা কফির পাত্র নজরে পড়লো না। বড় বড় পাত্রে শুধু শুয়োরের মাংস রান্না হয়েছে বা হচ্ছে। দেখলে খাবার প্রবৃত্তি হবে না। আমাদের কিমা সাহেবকে দেখলাম এর, ওর, তার পাত্র থেকে দিব্যি মাংস তুলে মুখে ফেলছে।

লেকের একপ্রান্তে একটা ছোট্ট পার্ক আছে। মাঝে একটা ছোট্ট স্নান করার জায়গা। সেখানে বাচ্চাদেরসাথে বড়দেরও জলকেলি করতে দেখলাম। হয়তো বাচ্চার বাবা-কাকা হবে। তবে পার্কটি বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। লেকের জলে ও পাড়ে অদ্ভুত দেখতে হাঁসের দেখাও পাওয়া গেল। লেকটি যথেষ্ট বড় হলেও তার আয়তন জানার কোন সুযোগ পেলাম না। হয়তো কোন বোর্ডে ইংরেজি হরফে লেখা আছে, শুধু শব্দের অর্থ না বোঝার জন্য অজানাই রয়ে গেল। আরও বেশ কিছুক্ষণ এখানে কাটিয়ে ফেরার জন্য প্রস্তুত হলাম। এখান থেকে চামফাই সত্যিই কতটা পথ, চিমা বা প্রভু যীশু, অথবা দু’জনেই জানেন। তবে জোর দিয়ে সে কথাও বোধহয় বলা যায় না।

লেকের বাইরে এসে চামফাই-এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। সঙ্গে আনা কেক, বিস্কুট, কলা, টক আপেল, ডাল ভাজা, বাদাম ভাজা, ইত্যাদি দিয়ে লাঞ্চ সেরে এগিয়ে গেলাম। কিমার হয়তো বেশ অসুবিধাই হ’ল, আমরা এখানে বোধহয় এটাই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে বাধ্য হলাম।

গেট পেরিয়ে আমরা বড় রাস্তায় পড়লাম। একসময় যাবার পথের সেই খাবারের দোকানের পাশ দিয়ে গেলেও আর নতুন করে অনুরোধ করলাম না। যাবার পথেই দোকানদারের “যে চাপাটি করে করুক, আমি চাপাটি করব না মা” গোছের গোঁ দেখে আর সময় নষ্ট করতে ইচ্ছা হ’ল না। পরিস্কার রাস্তা, প্রকৃতি সর্বত্রই তার নিজের খেয়ালে, প্রাণীকুলের স্বার্থে, পৃথিবীটাকে সাজিয়ে দিয়েছেন, আমরাই খোদার উপর খোদকারি করে সেই সব নষ্ট করে নিজেদের বিপদ ডেকে এনেছি। মিজোরামে দেখলাম খুব প্রয়োজন ছাড়া প্রকৃতির উপর হাত দেওয়া হয় নি। এ পথটার অনেকটা রাস্তাও বোধহয় এই একই কারণে হাত দেওয়া হয় নি। বেশ খানিকটা পথ পেরিয়ে কিমা একটা দোকানের সামনে দাঁড় করালো। কিমা ও আমরা এখানে কিছু খেয়ে নিলাম। দোকানদারের কথায় জানতে পারলাম, খাদ্যবস্তুটি আলুর পরোটা। যাইহোক্ পেটে তো কিছু পড়লো। কেক-বিস্কুট আর কত খাওয়া যায়। আমরা খেলেও, কিমা পারবে না।

আঁকাবাঁকা পথ ধরে, মাঝে মাঝে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাস্তায় নেমে একটু হাত-পা খেলিয়ে, একসময় বড় রাস্তা থেকে বেঁকে চামফাই টুরিস্টলজে এসে উপস্থিত হলাম। গাছপালা দিয়ে ঘেরা টুরিস্টলজটি মুখোমুখি দুটি ভাগে বিভক্ত। ডানদিকে লতাপাতা দিয়ে সাজানো সুন্দর দোতলা পাকা বাড়ি, আর বাঁদিকে শক্তপোক্ত প্লাই ও কাঠের তৈরি কয়েকটা কটেজ। কর্তৃপক্ষ আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা কোথায় থাকতে চাই, টুরিস্টলজের মুল বাড়িতে না কটেজে। কটেজগুলোর ভাড়া সামান্য বেশি, কিন্তু দেখে আমাদের এত ভালো লাগলো যে, মুল বাড়ির ঘরগুলো আর দেখতে যাওয়ার প্রয়োজন বোধও করলাম না। গাছপালা দিয়ে সাজানো তিনটে কটেজ নিয়ে নিলাম। মুল বাড়িতে রিসেপশন ও ডাইনিং। আমরা রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে যে যার কটেজে গিয়ে পরিস্কার হয়ে নিলাম। মেয়েরা স্বাভাবিক ভাবেই ক্লান্ত, কিন্তু তবু তরুনের কটেজটায় গিয়ে সোফা, চেয়ার ও খাটে গুছিয়ে বসে বেশ কিছুক্ষণ গুলতানি করা হ’ল, ছবি তোলা হ’ল। আগামী কালের প্রোগ্রাম নিয়ে আলোচনা করা হ’ল। আগামী কাল সকালে সেই মায়ানমার বা বার্মার বর্ডার পেরিয়ে আমাদের হার্ট লেক দেখতে যাওয়ার কথা। যদিও আইজলের চাল্টলাঙ্গে আলাপ হওয়া সেই অফিসারের কথা মতো তাঁর সাহায্য ছাড়া ঐ দেশে ঢোকা সাধারণ মানুষদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আমাদের দেশে এটাই সবথেকে বড় অসুবিধা। দেড়শ’ কোটি ছুঁতে যাওয়া জনসংখ্যার, কয়েক হাজার, বেশ সংখ্যাটা নাহয় কয়েক লাখই হ’ল, ভি.আই.পি. বা ভি.ভি.আই.পি.। এরাই একমাত্র দেশকে ভালোবাসে, আর সব অবিশ্বাসী চোর, ছ্যাঁচড়, জোচ্চোরের দল। আর যাই হোক এদের বিশ্বাস করা যায় না, উচিৎও নয়। ফলে যতকিছু সুযোগ সুবিধা তাদের জন্য। বৃদ্ধ হোক, অসুস্থ হোক, বা পঙ্গু হোক, সাধারণ মানুষকে যেখানে কষ্ট করে হেঁটে যেতে হয়, ওনারা হেলিকপ্টার বা কোন বিশেষ ব্যবস্থায় যাতায়াত করেন। শুধু তাই নয় ওনাদের যাতায়াতের সময় সাধারণ মানুষ হেঁটে যাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়।

74 TOURIST LODGE, CHAMPHAI76 TOURIST LODGE, CHAMPHAI80 TOURIST LODGE, CHAMPHAI

উল্টো দিকের দোতলা বাড়িতে খেতে গেলাম। আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলেও, কিমা সাহেবকে কোথাও দেখলাম না। খাবার টেবিলে বসে খবর পেলাম কিমাবাবু খেয়ে নিয়েছেন। ওকে দোষ দেওয়াও যায় না, কারণ এখানে আমাদের মতো এত রাত করে কেউ খায়ও না, জেগে বসেও থাকে না। অতি সাধারণ খাবার, কিন্তু সারাদিনের কেক-বিস্কুটের অত্যাচারে ও জায়গার গুণে, খেতে মন্দ লাগলো না। খেয়ে উঠে দেখলাম ক্যান্টিনের পাশেই রান্নাঘরের একপাশে আগুন জ্বেলে কর্মচারীরা কাঠের আগুন ঘিরে বসে জল গরম করছে। ঠান্ডা আছে, তবে আগুন ঘিরে বসে থাকার মতো বলেতো আমার মনে হ’ল না। ওরা আমাদের জিজ্ঞাসা করলো ঘরে নিয়ে যাবার খাবার জলের সাথে গরম জল মিশিয়ে দেবে কী না। মেয়েদের ইচ্ছামতো গরম জল মিশিয়ে খাবার জল নিয়ে যে যার ডেরায় ঢুকে যাবার সময় লক্ষ্য করলাম, অবস্থার কিছু পরিবর্তন হয়েছে। এখন শুধু কিমাবাবু নয়, গাড়িটাও নেই।

সকালবেলাও কিমা এবং তার গাড়ির দেখা মিললো না। উনি আসলেন অনেক পরে। জানা গেল ও অন্য কোথায় রাতে ছিল। সর্বত্র দেখেছি গাড়ির ড্রাইভারদের থাকার ব্যবস্থা হোটেল বা লজেই থাকে। এখানে এত বড় বাড়ি, এত জায়গা থাকতে ও গাড়ি নিয়ে অত রাতে কোথায় গিয়েছিল, কেনই বা গিয়েছিল বোঝা গেল না। আমরা হার্ট লেকের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। লেকটির গঠন  নাকি হার্ট বা হৃদয়াকৃতির, তাই হার্ট লেক নামে পরিচিত হলেও, আসলে লেকটির নাম কিন্তু “RIH DIL LAKE”, লেকটি এক কিলোমিটার লম্বা ও সত্তর মিটার চওড়া। এখান থেকে প্রায় সাতাশ কিলোমিটার দুরে ZOKHAWTHAR ভারত-বার্মা বর্ডার। বর্ডার থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দুরে  লেকটি অবস্থিত। বেশ কিছুটা পথ গিয়ে, কিমা তার গত রাতের রাত্রিবাসের আলয়টি দেখালো।

দুরত্ব বেশি নয়, আমাদের গাড়ি একসময় ভারত-মায়ানমার(বার্মা) বর্ডার গেটের কাছে এসে দাঁড়ালো। এখানে উল্লেখ করার মতো দুটি ঘটনা হ’ল, বর্ডার পারের অধিকারটি একমাত্র আইজলের চাল্টলাঙ্গ গেস্টহাউসের সেই নামী বাঙালী অফিসারটি বা তাঁর বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনদের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়, এবং এই প্রত্যন্ত মিজো এলাকাতেও পোলিও বুথ আছে। গেটের বাঁপাশে ইমিগ্রেশন অফিস, আমাদের গাড়ি ইমিগ্রেশন অফিসের পাশে দাঁড়ালে, গাড়ি থেকে নেমে তরুন সেখানে পরিচিতি পত্র দেখানোর সাথেসাথেই ওপারে যাওয়ার অনুমতি মিললো। মিজোরামবাসীদের জন্য বোধহয় এই ব্যাপারে তেমন কড়াকড়িও নেই। জানা গেল এই পথ দিয়ে দুইদেশের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানিও প্রচুর হয়। ইমিগ্রেশন অফিসের একটি বোর্ডে ইংরেজিতে “Except illegal goods, all goods can be imported freely” (যদিও দ্বিতীয় goods টিতে good লেখা আছে) এবং মিজো ভাষায় “Sorkar khap tel to bungrua reng reng chu zalen takin luhphalan” লেখা আছে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে আমাদের দেশের সীমানায় কিছুক্ষণ ঘুরে পায়ে হেঁটে একটা ব্রীজ পার হয়ে বিদেশের মাটিতে পা রাখলাম। আমাদের পিছন পিছন আমাদের গাড়িও এসে হাজির হ’ল। এখানে একটা খুব বড় না হলেও, ভালোই বাজার আছে। সেখানে কী না পাওয়া যায়। বাজারটা একটু ঘুরে দেখে আমরা গড়িতে উঠে বসলাম। আগের মতোই গাড়ি এগিয়ে চললো, শুধু পার্থক্য একটাই, এ দেশের নিয়ম অনুযায়ী গাড়ি রাস্তার ডানদিক দিয়ে চলছে।

88 ZOKHAWTHAR86 BORDER OF MYANMAR87 BORDER OF MYANMAR89 BORDER OF MYANMAR89 MYANMAR90 MYANMAR

রাস্তা যদিও খুবই খারাপ, তবে অল্পই রাস্তা। আমরা হার্ট লেক বা RIH DIL লেকের ধারে এসে পৌঁছলাম। মিজোরাম রাজ্যের সবথেকে বড় ও পবিত্র লেকটি এই হার্ট লেক বলে বলা হয়ে থাকলেও, এটি এই মায়ানমারে অবস্থিত।  মিজোরামের মানুষদের টামডিলে ছুটির দিনে ভিড় করে বনভোজন করতে যেতে দেখলেও, যেমন আমরা দীঘা, টাকি, ফুলেশ্বর, গাদিয়ারা, ইত্যাদি জায়গায় গিয়ে থাকি, আকৃতি বা সৌন্দর্যে প্রায় সমতুল্য হলেও পবিত্রতার ধারে কাছেও টামডিল স্থান পায় না।

হার্ট লেকে কিন্তু দর্শনার্থীর সংখ্যাও অতি নগন্য। সুরাপান নিয়ে কেলেঙ্কারি হলেও, এই রাজ্যে সুরাপান নিষিদ্ধ। কিন্তু নির্জন হার্ট লেকের পাশে গুটি দুই-তিন দোকান থাকলেও, সেখানে লজেন্স, বিস্কুট, সাবান, বাচ্ছাদের খেলনার পাশাপাশি পরোটা, চাউ ও ছোট-বড় বিভিন্ন আকৃতির দেশী ও বিদেশী (মায়ানমার-এ প্রস্তুত) সুরা বিক্রয় হয়। এখানে সুরা, পান বা বিক্রয় কোনটাই নিষিদ্ধ নয়, তবে ভারতীয় সুরার মূল্য অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি। মোটর সাইকেল নিয়ে এখানে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা শুধুমাত্র সুরাপান করতেই আসে বলে মনে হ’ল। জনবসতিহীন এই জায়গায় খাবারের দামও অত্যন্ত বেশি। যতদুর জানা যায়, মিজো উপজাতিদের পূর্বপুরুষরা কোন সময় এই বার্মা দেশ থেকে এসেই এখানে, অর্থাৎ বর্তমানের মিজোরামে বসবাস শুরু করে। তাই হয়তো মিজোরামের মানুষদের বিশ্বাস, মৃত্যুর পর তাদের আত্মা এই লেক-এ এসে আশ্রয় নেয়। মনে হয় শুধুমাত্র এই বিশ্বাসকে সম্মান দিতেই এই অঞ্চলে যাতায়াতের ওপর কোন বাধানিষেধ নেই। কেবলমাত্র গেট পার হয়ে ওদের দেশে প্রবেশ করে, রাস্তার ডানদিক দিয়ে গাড়ি চাললেই ওরা খুশি। অনেকভাবে চেষ্টা করেও, লেকটির সাথে হৃদয়ের সাদৃশ্য খুঁজে বার করতে পারলাম না। বেলা হয়ে যাচ্ছে, এবার ফেরার পালা। সূর্যদেব ‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে’ বলে এদেশের পাট চুকিয়ে অন্যত্র চলেছেন।

98 HEART LAKE, MYNAMAR100A HEART LAKE, MYNAMAR97 HEART LAKE, MYNAMAR101HEART LAKE, MYNAMAR96 HEART LAKE, MYNAMAR94 HEART LAKE, MYNAMAR

ফেরার পথে আগের মতোই বর্ডার গেটের কাছে গাড়ি থেকে নামা হ’ল দোকনগুলো থেকে মেয়েরা তাদের প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ব্রীজ পার হয়ে ফিরে আসার সময় মাঝ পথে একটি শববাহী দলকে হার্ট লেক উদ্দেশ্যে যেতে দেখলাম। ওদের সাথে গিয়ে সৎকার অনুষ্ঠানটি দেখার ইচ্ছা থাকলেও, সময়াভাবে বাস্তবে সম্ভব হ’ল না। জায়গাটা খুব নির্জন, শান্ত, সুন্দর ও দূষণমুক্ত। মৃত্যুর পরে ওখানে থাকার জন্য কোন অনুমতি লাগে কী না, অথবা অগ্রিম বুকিং এর ব্যবস্থা আছে কী না জানি না, তবে  আমি ওখানেই চলে যাব স্থির করে ফেললাম। খাওয়ার খরচ একটু বেশি হলেও, থাকার খরচ নেই। আর কারো ইচ্ছা হলে জায়গাটা দেখে এসে আমার সাথে যোগাযোগ করতেই পারেন। অন্তত বাংলা ভাষায় সুখ-দুঃখের কথা বলে সময় কাটবে।

একসময় চামফাই গেস্টহাউসে এসে চায়ের খোঁজ করে, টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা হ’ল। টেবিলে চা দিতে এসে ছেলেটি আমাদের একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে বললো। তার বলার ধরণ দেখে মনে হ’ল, এখনই রাতের খাবার খেয়ে নিলে সে আরও খুশি হবে। চা খেয়ে ঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে, জমিয়ে বসে গুলতানি শুরু হ’ল।

ওদের অনুরোধ মতো আজ বেশ তাড়তাড়িই ডাইনিং হলে হাজির হলাম। তাছাড়া আজ সারাদিন সেই শুকনো খাবার ও লেকের ধারে দুর্মূল্য চাউ খানিকটা করে ভাগ করে খেয়ে কেটেছে। যদিও সেই চাউয়ের সিংহ ভাগই, কিমাচন্দ্রের উদরে স্থান পেয়েছে। তা যাক্, ছেলেটা ভালো এবং একটু খেতে, বলা ভালো বেশি খেতে বেশি ভালোবাসে। তবু সেইতো আমাদের সবকিছু দু’চোখ ভরে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। আর আমাদের মতো পর্যটক বা কেউ ওর গাড়িতে ভ্রমণ করলে তবেই  ওর ভাগ্যে এই জাতীয় খাবার জোটে, সে আর মাসে ক’টাই বা দিন।

ডাইনিং হলে টাঙ্গানো বিরাট ম্যাপটা দেখে আগামীকালের থেনজল যাবার রাস্তা সম্বন্ধে একটা ধারণা করার চেষ্টা করছি, গাড়ি নিয়ে তিনজন এসে উপস্থিত হলেন। তাঁদের হাবভাব চেহারাই বলে দিচ্ছে, তাঁরা খুব সাধারণ লোক নন। আলাপ করলাম, আমরা মিজোরামে বেড়াতে এসেছি শুনে, তাঁরা প্রথমেই বিষ্মিত হলেন। তাঁদের কথায় বোঝা গেল তাঁরা দেশের সিকিউরিটি সংক্রান্ত কোন বিভাগে কাজ করেন। অনেক রকম কথা হ’ল। তাঁরা জানালেন, মিজোরামে, বিশেষ করে এই জাতীয় জায়গায় কোন চুরির ঘটনা ঘটে না। আমরা ঘরের দরজা খুলে রাতে ঘুমলেও, চুরি হবার কোন সম্ভবনা নেই। তিনি জানালেন, একবার কোন ম্যজিস্ট্রেটের মানিব্যাগ এই অঞ্চলের কোথায় পড়ে গিয়েছিল। তিনি এই গেস্টহাউসে আদৌ আসেননি, কিন্তু দরকারি কাগজপত্র, ক্রেডিট কার্ড সমেত ব্যাগ এই গেস্টহাউসের দরজার কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছিল। অবশ্য কিছু টাকা বার করে নেওয়া হয়েছিল। আসলে খুবই গরীব অঞ্চল, অভাবের তাড়নায় হয়তো কিছু নিয়েছিল, তাই চুপিসারে এখানে রেখে গেছে, যাতে মালিককে সহজে ব্যাগটি ফেরৎ দেওয়া যায়। আমরা এখান থেকে থেনজল যাব শুনে তাঁরা আমাদের কোন দিক দিয়ে গেলে সুবিধা হবে ও পথে কী কী দেখার জিনিস পড়বে কিমাকে ডেকে বুঝিয়ে দিলেন। আমি রাজনীতি করি না, পছন্দও করি না, হয়তো ঘৃণা করি বললেই ঠিক বলা হবে। যে মিজোরামের শাসন ব্যবস্থা, নিয়মিত গোলমাল, ইত্যাদি শুনে আমরা আতঙ্কগ্রস্ত হই, সেই মিজোরামের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে দাঁড়িয়ে আমাদের রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের বক্তব্য ও আমাদের রাজ্যের মানুষ কী করে সহ্য করে শুনে, এবং সর্বপরি এ রাজ্যের মানুষের কী করা উচিৎ শুনে মনে হ’ল, আমরা কী আমাদের নিজ রাজ্যে সত্যিই ভালো আছি, নির্ভয়ে আছি, ন্যায় বিচার ও সুশাসনে আছি। এঁদের কাছে আবার নতুন করে শুনলাম যে, চামফাই হচ্ছে মিজোরামের বৃহত্তম সমতলভূমির এলাকা।

খাবার দিয়ে গেল। নিজেরাই পাত্র থেকে খাবার নিয়ে খেয়ে, রাতের জন্য খাবার জল নিতে রান্নার জায়গায় গিয়ে দেখি একটা লোকও নেই। বাধ্য হয়ে নিজেরাই ভিতরে ঢুকে জল ভরে নিয়ে যে যার ঘরে গেলাম।

পরদিন সকালে উঠে জায়গাটা এক চক্কর ঘুরে দেখে, চা জলখাবার খেয়ে, গেস্টহাউসের বিল মিটিয়ে, গাড়ি নিয়ে থেনজল চললাম। বিদায় চামফাই, চিরকালের মতো বিদায়।

থেনজল নিয়ে মনের মধ্যে একটা চিন্তার জট্ প্রথম দিন থেকে রয়েই গেছে, কারণ আমাদের মধ্যে কথোপকথনটা কখনই দ্বিপাক্ষিক হওয়ার সুযোগ পায় নি। যাত্রা শুরুর আগে থেকে এখন পর্যন্ত কতবার যে ফোন করে কবে থেকে কবে, কোথায়, কত দিন, ক’টা ঘর, লোক সংখ্যা কত, বলতে গেলে ঠিকুজি কোষ্ঠী পর্যন্ত জানিয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্ত প্রতিবার ঐ একই মহিলা কন্ঠে একই উত্তর ‘হ’। শেষে অবস্থাটা এমন দাঁড়ালো যে আমি ফোন করলেই সঙ্গীরা ঠাট্টা করে বলতো, “সুবীরদা ভদ্রমহিলার প্রেমে পড়েছে, তাই বারবার ফোনে প্রেমালাপ করছে। ব্যাপারটা সত্যিই প্রায় সেরকমই দাঁড়িয়েছে। কলকাতা থেকে, বাড়ি থেকে, আইজল থেকে, রেইক থেকে, এমন কী গত পরশু চামফাই থেকেও ফোনে কাটা রেকর্ড শুনিয়েছি, উত্তরও সেই এক ‘হ’, শুধু রেইক থেকে ফোন করলে, একটা কিনলে একটা ফ্রী-এর মতো সঙ্গে একটা ওয়েলকাম শব্দ যোগ হয়েছে মাত্র।

চামফাই থেকে থেনজলের দুরত্ব কত মনে করতে পারছি না, তাছাড়া কিমার কথায়, বা স্থানীয়  কোন মাইলস্টোন থেকে সে তথ্য উদ্ধার করাও ভীষণ শক্ত। চাল্টলাঙ্গ বা চামফাই গেস্টহাউস থেকে সংগৃহীত তথ্যের মধ্যে কোন মিল নেই। স্থানীয় লোক বা দোকানদারদের মত আবার এদের থেকে আলাদা। ত্রিশ কিলোমিটারও হতে পারে, দু’শ ত্রিশ কিলোমিটারও হতে পারে, এরকম একটা অবস্থা। তার ওপর চামফাই গেস্টহাউসে ঐ ভদ্রলোক অন্যপথে থেনজল যাবার কথা কিমাকে বলে দিয়েছেন, যাতে আমরা পথে দু’-একটা নতুন স্পট্ দেখার সুযোগ পাই। কিমা ভদ্রলোকের কথা অনুযায়ী রাস্তা সম্ভবত কিছু পরিবর্তন করে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। কানু বিনা গীত নাই এর মতো আমাদের কাছে এখন কিমা বিনা গতি নাই অবস্থা। যাহোক সে একটা জায়গায় এসে গাড়ি দাঁড় করিয়ে জানলো যে, এটা একটা ভীষণ পবিত্র জায়গা। এই জায়গাটা আগে কেউ জানতোও না, কিন্তু দুর্গম এই জায়গায় সমস্ত কষ্ট উপেক্ষা করে কোন এক গরু একটি শাবক প্রসব করে। তারপরেও এই গল্পের অনেক পর্ব আছে। কিন্তু যে জায়গায় কেউ আগে কখনও আসেনি বা বসবাস করেনি, সেখানে গরু কোথা থেকে এসে হাজির হ’ল, এবং মোটামুটি সমতল জায়গা ছেড়ে, যেখানে আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি, অত কষ্ট করে দুর্গম চড়াই ভেঙ্গে সন্তান প্রসবের জন্য অত উপরে উঠলোই বা কেন কে জবাব দেবে? এক যদি মেজদাকে খুঁচিয়ে জানা যায়।

বেচারা কিমা আমাদের এ হেন তীর্থক্ষেত্র দেখাবে বলে রাস্তা পরিবর্তন করে এতদুর নিয়ে এসেছে, কাজেই কথা না বাড়িয়ে সপারিষদে গোশাবকের জন্মস্থান সন্দর্শনে চললাম। এবড়ো-খেবড়ো জঙ্গলের চড়াই ভেঙ্গে বেশ কিছুটা পথ গিয়ে এক কাঁটা তারের বেড়া পড়লো। একটা নয়, ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত তিন-তিনটে কাঁটা তার দিয়ে ঘেরা। অনেক চেষ্টা করেও মেয়েরা সেই তারের বেড়া গলে যাওয়ার চেষ্টায় বিফল হয়ে, আমাদের অযোগ্য স্বামী বিবেচিত করে, মার্চপাস্ট করতে করতে ফিরে গেল। আমরা তিনজন কাঁটাতার গলে, জামা ছিঁড়ে, আরও বেশ খানিকটা পথ চড়াই ভেঙ্গে,  দ্রষ্টব্যস্থলে পৌঁছলাম। পাহাড়ি পথে একটু সমতল চাতাল মতো এলাকা, ওখান থেকে অনেক দুর পর্যন্ত দেখা যায়। SERCHHIP জেলার অন্তর্গত থেনজল শহরটি গভীর জঙ্গল ও বণ্য পশু অধ্যুষিত এলাকা ছিল। ১৯৬১ সালের পর থেনজলকে মনুষ্য বাসযোগ্য করা হয়। গোটা থেনজলের লোক সংখ্যা মাত্র পাঁচ হাজার পাঁচশ’ মতো। এই গোশাবকটির জন্মের সময় সেটা অনেক কম ছিল, এবং আজও এই জায়গাটি মনুষ্যবিহীন, তাহলে ঐ অসুস্থ গরুটির আব্রু রক্ষার্থে কেন অত কষ্ট করে ওপরে যেতে হয়েছিল, জানা গেল না। কাঁটা তারের বেড়াও সেই গরুই দিয়েছিল কী না, কিমাকে জিজ্ঞাসা করার ইচ্ছা থাকলেও করা গেল না।

109 ON THE WAY TO THENZAWL108 ON THE WAY TO THENZAWL107 ON THE WAY TO THENZAWL

নীচে নেমে এসে আর একপ্রস্থ মুখঝামটা ও হাসির খোরাক হলাম। তোমার কর্ম তুমি কর কিমা,লোকে বলে করি আমি। একটু সময় কাটিয়ে, টুকটাক কিছু মুখে পুরে এগিয়ে গেলাম। একটু দুরেই নতুন স্পট্। চামফাইয়ের ভদ্রলোকের কথামতো কিমা গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমাদের দেখে আসতে বললো। এইসব জায়গাগুলোর নাম হয়তো ভূগোলে নেই, কিমা জানবে কোথা থেকে। একটা মানুষ চোখে পড়লো না যে জিজ্ঞাসা করবো। কোথাও কিছু লেখাও নেই, থাকলেও সেটা পালিভাষাসম দুর্বোদ্ধ। এখানে একই জায়গায় পরপর প্রচুর বিখ্যাত মিজো মানুষের সমাধিস্থল। এতো নির্জন জায়গায় সমাধিস্থ করার কারণ বোধগম্য হ’ল না। হয়তো হার্ট লেকের মতো এখানেও কিছু উপাখ্যান আছে, কিন্তু জানার সুযোগ হ’ল না। কিন্তু এটা খুব একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার নয়। যেটা উল্লেখ করার বিষয় সেটা হ’ল, অধিকাংশ ফলকেই জন্ম সাল উল্লেখ করা থাকলেও, মৃত্যুর বছরটির জায়গা ফাঁকা রাখা আছে। মৃত্যুর পূর্বেই ফলক তৈরি করে রাখা হয় কী না বলতে পারবো না। কোন একজন মানুষের জন্ম সাল নাও জানা থাকতে পারে, কিন্তু মৃত্যুর সাল না জানার কোন কারণ থাকতে পারে না। তবে কী তাঁরা এখনও জীবিত? আমাদের এখানে জমি কিনে পাঁচিল দিয়ে রাখার মতো মৃত্যুর আগেই সমাধি তৈরি করে জমি দখল করে রাখা হয়েছে? মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট সমাধিস্থল খুঁড়ে সমাধিস্থ করা হবে? উত্তর জানা নেই। সত্যি এদেশে কত কিছুই না  জানার আছে, আমরা সে সব ছেড়ে বারমুডা ট্রাঙ্গেল নিয়ে পড়ে আছি।

111 ON THE WAY TO THENZAWL110 ON THE WAY TO THENZAWL112 ON THE WAY TO THENZAWL

গাড়ি আবার এগিয়ে চললো, আবার নতুন দ্রস্টব্যস্থল। এটার নামও সঠিক জানা গেল না। জানা গেল না, কারণ অনেকটাই প্রায় আগের সেই একই অসুবিধা। তবে কিমা জানালো, এটা লাভার্স পয়েন্ট। সুইসাইডাল পয়েন্ট্ নাম বললেও আশ্চর্য হ’তাম না। এখানে পাহাড়ের চুড়ায় একটি ঝুলন্ত বারান্দার মতো জায়গা আছে। তার একবারে কিনারায় বসে এক ব্যর্থ প্রেমিক তার অন্য পাহাড়ের চুড়ার প্রেমিকার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। এখানে কিছু দোকানপাট আছে। তারা ঐ প্রেমিকের বসার ভঙ্গিতে ওখানে গিয়ে বসে। প্রতিবার ঐ একই ভঙ্গিতে প্রেমিকটি কেন বসতো, বা ঐ নির্দিষ্ট ভঙ্গি তারা জানলোই বা কিভাবে, জিজ্ঞাসা করে আমাকে বিব্রত না করলেই খুশি হ’ব। ভাবা যায়? এর কাছে স্বয়ং শাজাহানের মুমতাজের প্রতি প্রেমও ম্লান হয়ে যায়। আমাদের প্রত্যেকের সাথেই স্ত্রীরা আছে, তাই নিষ্ফল জেনেও, ঐ জায়গায় গিয়ে একটু বসলাম। কিমা জানালো থেনজল গেস্টহাউসের আগে আর কিছু দেখার নেই। আসার পথে যে তিনটি জায়গা দেখা হ’ল, তা দেখে হয়তো কারও পছন্দ হ’ল না বা হবে না, আমার কিন্তু মন্দ লাগলো না। যে কোন নতুন জায়গা আমার সমান আগ্রহ নিয়ে দেখার অভ্যাস।

113 ON THE WAY TO THENZAWL114 ON THE WAY TO THENZAWL115 ON THE WAY TO THENZAWL

আমাদের গাড়ি থেনজয়াল গেস্টহাউসের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল। অনেক্ষণ থেকেই মনটা চা-চা করছিল। অবশেষে বিখ্যাত ‘সাংসাং হোটেল কাম টি স্টল’ এ চা খেতে যাওয়া হ’ল। এখানে CHAW, CHAU, CHHANG, THINGPUI, CHANA, ARTUI, BAWNGHNUTE, কী না পাওয়া যায়। দোহাই আপনাদের, দয়া করে জানতে চাইবেন না খাদ্যবস্তুগুলি কী। জানলে আমরাই তো খেতে পারতাম। ফোন নাম্বার দেওয়া আছে, খাবার সাধ হলে ফোন করে জেনে নিয়ে খাবারের অর্ডার দিতেই পারেন। আমরা চা খেয়ে গাড়িতে উঠলাম। আরও বেশ কিছুক্ষণের পথ পাড়ি দিয়ে এসে, গাড়ি দাঁড় করানো হ’ল। জায়গাটা মোটামুটি বেশ বড়ই। একটা দোকানের, পেট্রল পাম্প বললেও বলা যেতে পারে, বোর্ডে দেখলাম ‘KHAWBUNG’ লেখা। সম্ভবত জায়গাটার নাম। এখানে আমরা কিছু খেয়ে নিয়ে একটু ঘুরে ফিরে জায়গাটা দেখলাম।

120 ON THE WAY TO THENZAWL121 ON THE WAY TO THENZAWL122 ON THE WAY TO THENZAWL

এখানকার ভাষা সমস্যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। এদের নিজেদের ভাষাটা সম্ভবত মিজো, কিন্তু এদের কোন বর্ণমালা ছিল না। বৃটিশ মিশোনারীদের কল্যানে মিজোবাসী লিখবার সুযোগ পায়। যদিও স্ক্রিপটটি সম্ভবত রোমান, ইংরেজি নয়, কারণ লিখিত ইংরেজি বর্ণের মধ্যে অনেকগুলোই আবার ইংরেজি বর্ণমালায় নেই। তাই এইসব লেখা পড়ে তার পাঠোদ্ধার করা আমাদের কর্ম নয়। যাইহোক জায়গাটা বড়, এরপর অনেক্ষণের পথ, তাই মেয়েরা টয়লেটের খোঁজ শুরু করলো। পাওয়াও গেল। আমাদের এখানকার মতো খানিকটা ঘেরা জায়গা মাঝখান দিয়ে পাঁচিল তুলে দু’ভাগ করা। একদিকে পুরুষদের, আর অপরদিকে মহিলাদের জন্য। কিন্তু এত সুব্যবস্থার মধ্যেও বাধা সেই ভাষা। টয়লেটের বাঁদিকে MIPA আর ডানদিকে HMEICHHIA লেখা, অর্থাৎ একটা পুরুষ ও অপরটা মহিলা বুঝেও টস্ করে কোনটা মহিলা কোনটা পুরুষ ঠিক করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। শেষে স্থানীয় লোকের সাহায্যে আলোকিত হয়ে, মেয়েরা একে একে টয়লেট ঘুরে এল। এবার এগতে হয়। বেলাও ক্রমশঃ বাড়ছে। আমরা এগতে যাবার আগে ওখানকার এক অফিসকর্মী সোজা রাস্তায় না গিয়ে, ডানপাশের বাইপাস ধরে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন, তাতে নাকি রাস্তা অনেকটাই কম হবে। ভদ্রলোক অন্য রাজ্যের বাসিন্দা, কর্মসুত্রে এখানে এসে মেসে থাকেন। ভদ্রলোকের অবস্থা দেখে কষ্ট হ’ল। এর নাম চাকরি। ভদ্রলোক কিমাকে রাস্তাটা বুঝিয়ে দিলেন। আরও দু’একজন স্থানীয় মানুষও কিমাকে বুঝিয়ে দিল। আমরা সোজা না গিয়ে ডান দিকের সরু, অসমান, অপেক্ষাকৃত ভাঙ্গা রাস্তা ধরলাম।

123 ON THE WAY TO THENZAWL125 ON THE WAY TO THENZAWL126 ON THE WAY TO THENZAWL

বেশ কিছুটা পথ যাওয়ার পর একটা সবুজ চাষের জমির কাছে রাস্তাটা দু’ভাগ হয়ে গেছে। বাঁদিকেরটা অপেক্ষাকৃত চওড়া। কিমা গাড়ি থেকে নেমে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হ’ল, কারণ একটা লোকেরও দেখা পাওয়া গেল না। শেষে বাঁদিকের রাস্তাটা হওয়ার সম্ভবনা বেশি মনে করে গাড়ি নিয়ে এগিয়ে চললো। মেঠো রাস্তাটা ঘুরপাক খেয়ে ক্রমশঃ নীচের দিকে নেমে চাষের জমিতে গিয়ে শেষ হয়েছে। সেখানে দু’তিনটে ভাঙ্গা, পরিত্যক্ত মোটর গাড়ি একপাশে পড়ে আছে। কোথাও কারও দেখা মিললো না। এখানে কে ভাঙ্গা গাড়ি রাখতে আসবে ভেবে পেলাম না। তবে কী আমাদের মতোই পথ হারিয়ে এখানে এসে আজ এই অবস্থা? আমাদের গাড়িও ভবিষ্যতে এর পাশেই স্থান পাবে কিনা ভাবছি, বহু কসরত করে কিমা গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলো।

আবার আমরা সেই তিন মাথার মোড়ে এসে যেদিক থেকে এসেছিলাম, সেই ডানদিকের চওড়া পথে না গিয়ে সোজা সরু রাস্তা ধরলাম। এ রাস্তাটা অনেকটা এরাজ্যের গ্রাম্য মাটির রাস্তা, তবে সুবিধা একটাই, এঁটেল মাটির পথ নয়। আমরা যত সামনের দিকে এগচ্ছি, রাস্তা তত সরু হতে হতে প্রায় কোনমতে একটা গাড়ি যাবার মতো চওড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। রাস্তার বাঁদিকটা ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ পাঁচিলের মতো খানিকটা উঁচু পাথর, আর ডানদিকে সরু কঞ্চির মতো আকৃতির বাঁশ গাছের জঙ্গল, ধীরে ধীরে অনেকটা নীচে সমতল ভূমিতে নেমে গেছে। রাস্তার অনেক জায়গাতেই জল জমে কাদা কাদা হয়ে আছে। কতটা রাস্তা এরকম কে জানে, চিন্তা হচ্ছে উল্টো দিক থেকে কোন গাড়ি এসে হাজির হলে কী হবে। আলোর তেজ বেশ কমে এসেছে। আলো আঁধারি এই জঙ্গলে ঘেরা নির্জন রাস্তা যেন আর শেষই হতে চায়না। কিমার পাশে বসে নানারকম উদ্ভট সব চিন্তা শুরু হ’ল। এতক্ষণেও উল্টো দিক থেকে কোন গাড়ি আসতে দেখলাম না। ভিজে রাস্তায় গাড়ির চাকার দাগও আছে, তবু আমরা ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি তো? কিমা আবার এ রাস্তায় কোনদিন আসেও নি। রাস্তায় কেউ গাড়ি দাঁড় করালে কী করবো? এরকম নির্জন জায়গায় জঙ্গীদের কবলে পড়বো না তো? কোন কারণে গাড়ি খারাপ হলেই বা কী করবো? মেয়েদের দেখছি হাসি-ঠাট্টা বন্ধ হয়ে গেছে। গাড়ির সামনে বসে রাস্তার কিছু ছবি তুলছিলাম, থমথমে পরিবেশ সেটা বন্ধ করতে বাধ্য করলো। এইভাবে আরও বেশ কিছুক্ষণ রূদ্ধশ্বাসে কাটার পর, আমরা বড় রাস্তায় উঠে এলাম। তখন বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। কিমা জানালো সত্যিই অনেকটা রাস্তা সর্টকাট হয়েছে। গাড়ির ভিতর বর্ষা কেটে গিয়ে শরৎ, হেমন্ত, শীত টপকে একবারে বসন্তের আগমন লক্ষ্য করলাম।

127 ON THE WAY TO THENZAWL130 ON THE WAY TO THENZAWL126A ON THE WAY TO THENZAWL

এবার গাড়ি তির বেগে ছুটলো। কিমা জানালো আর ঘন্টা দেড়েক সময় লাগবে। গাড়ির ভিতর আবার হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে। শরীরে কিছু ক্লান্তি অবশ্যই এসেছে, তবে আজকের মতো নিরাপদ আরামদায়ক আশ্রয়ে প্রায় পৌঁছে গেছি জেনে সবাই খুশি। এমন সময় আমার মোবাইলে এই প্রথম থেনজয়ালের গেস্টহাউস থেকে ফোন— ‘আপনাদের আজ আসার কথা, আপনারা কী আজ  আসছেন’? সঙ্গীরা ঠাট্টা শুরু করে দিল, সবাই চুপ করো সুবীরদার প্রেমিকা ফোন করেছে। আমি জানালাম আমরা রাস্তায় আছি, আর ঘন্টা খানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাব। অনেকক্ষণ সময় পার হয়ে যাবার পর আমরা একটা ছোট গঞ্জ মতো জায়গায় নেমে চায়ের দোকানে ঢুকলাম। মেয়েরা কেউ গাড়ি থেকে নামলো না। চা খাচ্ছি, এমন সময় আবার ফোন, আসতে আর কতক্ষণ লাগবে? জানালাম আধঘন্টা মতো। গাড়ি ছেড়ে দিল। রাত প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা থেনজয়াল গেস্টহাউসের গেটে প্রবেশ করলাম। মেয়েরা গাড়িতেই বসে রইলো, আমরা তিনজন এগিয়ে গিয়ে একটা ঘরে ঢুকে দেখি দু’জন যুবক বসে ল্যাপটপ্ নিয়ে কাজে ব্যস্ত। আমরা আমাদের আগমনের কারণ বলতে তাঁরা বললেন, বাইরে রিসেপশনে গিয়ে কথা বলতে। আমরা বাইরে আসতেই দু’জন আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের কী প্রয়োজন। একজন যুবক ও আর একজন তার থেকে বয়সে কিছু বড়। আমাদের আজ এখানে তিনটি ঘর বুকিং আছে শুনে যুবকটি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি জানালেন আজতো এখানে কারও নামে ঘর বুকিং নেই, তাছাড়া কোন ঘর খালিও নেই। বাইরে রীতিমতো ঠান্ডা। তবু এই ঠান্ডাতেও ঘামতে শুরু করার মতো অবস্থা। তিনি আমাদের বুকিং-এর কাগজ দেখতে চাইলেন। আমরা জানালাম যে কলকাতা থেকে ফোনে আমাদের ঘর বুক করা আছে। এরমধ্যে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন জায়গা থেকে এই ব্যাপারে ফোনে কথাও হয়েছে। এক ভদ্রমহিলা প্রতিবার আমায় ঘর বুকিং আছে বলে জানিয়েছেন। আজও আসার পথে উনি দু’বার ফোন করেছেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন আপনার মোবাইলটা একবার দিন তো দেখি কোন নাম্বার থেকে আপনাকে ফোন করা হয়েছে। এই গেস্টহাউসে তো কোন ভদ্রমহিলা কাজ করেন না, আমিই তো এখানকার ম্যানেজার। আপনি বাংলায় কথা বলতে পারেন, আমি বাংলা বুঝি, বাঙালিও বলতে পারেন।

131 TOURIST LODGE, THENZAWL133 TOURIST LODGE, THENZAWL134 TOURIST LODGE,THENZAWL136 TOURIST LODGE,THENZAWL137 TOURIST LODGE,THENZAWL138 THENZAWL

আমার মোবাইল থেকে ফোন নাম্বর দেখে তিনি যা বললেন, তা শুনে তো আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। এই ফোন নাম্বারটা রেইক গেস্টহাউসের। যা বোঝা গেল, আমরা যে ভ্রমণ পত্রিকার মিজোরামের ওপর একটা লেখা থেকে ফোন নাম্বার জোগাড় করেছিলাম, লেখক সেখানে ভুল করে থেনজয়ালের ফোন নাম্বারটা রেইক-এর ফোন নাম্বার লিখেছিলেন। কিন্তু আমি ঐ নাম্বারে ফোন করার সময় কোনবারই থেনজয়াল গেস্টহাউসের কথা উল্লেখ করতে ভুলিনি। ওখানে যে এস.এম.এস. করেছিলাম, তাতেও থেনজয়ালের কথা উল্লেখ করে দিয়েছিলাম।

যুবকটি আমাদের বললেন, আপনারা আইজলে চলে যান, এখানে কোন ঘর খালি নেই যে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেব। আর একটা কোথাকার গেস্টহাউসের নাম করে বললেন, আপনারা এই গেস্টহাউসেও চলে যেতে পারেন, তবে এটা এখান থেকে অনেকটাই দুর।

জানুয়ারির প্রথম, খুব ঠান্ডার রাত, রাতও এই এলাকা অনুযায়ী অনেক হয়ে গেছে। বিপদের গুরুত্ব বুঝে এবার একটু রুঢ় হলাম। যুবকটিকে বললাম আইজল ফিরে যাওয়ার জন্য আমরা এতটা পথ এত কষ্ট করে, পকেটের পয়সা খরচ করে আসিনি। ফোনটা নিয়ে ঐ ভদ্রমহিলাকে সরাসরি গোটা

ঘটনা জানিয়ে বললাম, এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিতে। কিভাবে করবেন সেটা তাঁর ব্যাপার, তবে মেয়েদের নিয়ে এই শীতের রাত্রে আইজল ফিরে যেতে হলে, আমি তাঁর নামে রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী, প্রয়োজনে মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও লিখিত অভিযোগ করবো। আমার মোবাইলে এখনও প্রতিটা কলের ও এস.এম.এস. এর রেকর্ড আছে। ভদ্রমহিলা এবার তাঁর ‘হ’ ছেড়ে কী যেন বোঝাবার চেষ্টা করতেই, আমি ফোন কেটে দিলাম।

যুবকটিকে এবার বললাম যেভাবে পারেন কিছু একটা ব্যবস্থা করুন। যুবকটি উত্তরে বললেন এখানে কোন ঘর খালি নেই, একটা ভি.আই.পি. রুম খালি আছে বটে, তবে এখানে অনবরত ভি.আই.পি. দের আগমন হয়। বলা যায় না, যে কোন সময় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও এসে হাজির হতে পারেন। এরকম একটা সময় যুবকটির ফোন বেজে উঠলো। ও পক্ষের কথা শুনতে না পেলেও, যুবকটির কথা শুনে মনে হ’ল আমাদের নিয়েই কথা হচ্ছে। ফোন ছেড়ে পুরনো প্রসঙ্গ তুলতেই তাঁকে বললাম, ঐ ভি.আই.পি. রুমটাই আজ রাতের মতো দেবার ব্যবস্থা করুন। উনি এবার বললেন আর কিছু নয়, কাল সকালেই হয়তো কোন ভি.আই.পি. এসে হাজির হবেন, তখন আপনারা এবং আমি উভয়ই বিপদে পড়বো। আমি এবার একটু রাগ দেখিয়েই বললাম কাল রবিবার, ছুটির দিন, কাল কেউ আসবেন না। তাছাড়া কাল সকালে আপনার মন্ত্রী আসার আগেই আমরা ঘর ছেড়ে দেব। যুবকটি আর কথা না বাড়িয়ে, সামনের একটি বাড়ির দোতলায় একটি ঘর দেখিয়ে বললেন এই ঘরটার   জন্য হাজার টাকা লাগবে। ঘরটা বড়, একটা জানালার কাচ ফাটা, সেলোটেপ লাগানো। এ.সি.  আছে, তবে চলে কী না বলা শক্ত, কারণ রিমোট নেই। কথা না বাড়িয়ে চরজন মেয়েকে এই ঘরে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলাম আমরা কোথায় থাকবো? যুবকটি খানিকটা দুরে অন্য একটা ঘর দেখিয়ে বললেন, এটায় আপনারা থাকুন, ছশ’ টাকা ভাড়া লাগবে। রাজী হয়ে গেলাম, না হয়েও উপায় নেই। মালপত্র ঘরে তুলে, গেস্টহাউসের কাছাকাছি একটা চায়ের দোকান কাম হোটেলে খাবারের অর্ডার দিয়ে ঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে পরিস্কার হয়ে খেতে গেলাম। গেস্টহাউসের বাইরে এটাই একমাত্র খাওয়ার জায়গা, এটা না থাকলে কী হ’ত কে জানে। এখানেও শুয়োরের মাংসের অভাব নেই। কিমাকে দেখলাম ডেকচি থেকে একটা টুকরো তুলে মুখে ফেললো। আমরা চাপাটি, ডাল, একটা সবজি ও ডিম ভাজা, সঙ্গে গরম চা দিয়ে আহার সেরে, আমাদের ভি.আই.পি. মেয়েদের ভি.আই.পি. ঘরে পৌঁছে দিয়ে এলাম। সবার সাথেই মোবাইল আছে, প্রয়োজনে যোগাযোগ করে নেওয়া যাবে। আমরা আমাদের ঘরে চলে এলাম। এখানেও দেখলাম কিমার গাড়ি, গাড়ি রাখার জায়গায় নেই। দুর্যোগ কাটিয়ে দু’জনের শোয়ার বিছানায় তিনজন শুতে গিয়ে দেখি আর এক বিপদ। থেনজলের উচ্চতা মোটামুটি পঁচিশ থেকে ছাব্বিশশ’ ফুটের মধ্যে হলেও, মাসটা জানুয়ারি, খুব ঠান্ডা। দু’টো সরু সরু লেপ্ নিয়ে তিনজন শুলে, মাঝেরজনের নিউমোনিয়া কে আটকায়? সমস্যা, সমস্যা, আর সমস্যা, কোথাও এতটুকু শান্তি নেই। এতো দেখছি “যদি দেখি কোন পাজি বসে (পড়ুন শোয়) ঠিক মাঝামাঝি, কি যে করি ভেবে নাহি পাই রে— ভেবে দেখ একি দায়, কোন্ ল্যাজে মারি তায় (পড়ুন কোন লেপে ঢাকি তায়) দুটি বই ল্যাজ (পড়ুন দুটি বই লেপ) মোর নাইরে!” গোছের সমস্যা। কিছু দুর অন্তর অন্তর সেফ্টিপিন লাগিয়ে, দু’টো লেপকে একটায় পরিণত করে শুয়ে পড়লাম।

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে, আবার উল্টো প্রক্রিয়ায় একটা লেপকে দুটোয় পরিণত করে বাইরে বেরলাম। ভি.আই.পি. রুমে গিয়ে দেখলাম মেয়েরা তৈরি হয়ে বসে আছে। একসাথে কালকের  সেই দোকানে গিয়ে গরম গরম লুচি, আলু-মটরের তরকারি, ডিম সিদ্ধ আর চা খেয়ে গতকাল রাতের সব দুঃখ ভুলে গেলাম। অল্প কিছু পরে কিমা গাড়ি নিয়ে হাজির হ’ল। জানা গেল তার ছেলে অসুস্থ। তার কথায় মনে হ’ল সে বাড়ি গিয়েছিল, কিন্তু সেটা বাস্তবে সম্ভবপর বলে মনে হ’ল না। কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম।

আজ রবিবার, মিজোরাম দেখলাম রবিবারটা সত্যিই ছুটির মেজাজে কাটায়। আজ সকালে উঠেই আমরা চলে যাব জেনেও, গেস্টহাউসের কেউ টাকা নিতে হাজির হ’ল না। কাউকে কোথাও দেখাও  গেল না। কিমার খাওয়া শেষ হলে সমস্ত মালপত্র নিয়ে VANTAWNG জলপ্রপাত দেখতে চললাম।  এই জলপ্রপাতটি থেনজল থেকে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এবং এটি মিজোরাম রাজ্যের  উচ্চতম জলপ্রপাত। প্রায় সাতশ’ পঞ্চাশ ফুট ওপর থেকে নেমে এসেছে।

139 HIGHEST WATERFALL OF MIZORAM140 HIGHEST WATERFALL OF MIZORAM144 HIGHEST WATERFALL OF MIZORAM147 HIGHEST WATERFALL OF MIZORAM149 HIGHEST WATERFALL OF MIZORAM148 HIGHEST WATERFALL OF MIZORAM

VANTAWNG জলপ্রপাতটি খুব একটা চওড়া নয়, বা ভীষণ বেগে ওপর থেকে জল নেমে আসছে, তাও নয়, তবু জলপ্রপাতটির একটি আলাদা সৌন্দর্য অবশ্যই আছে। সরু সরু কঞ্চির মতো বাঁশ গাছের গভীর জঙ্গলে ঢাকা। বেশ খানিকটা দুরে, কিন্তু সরাসরি নীচে নেমে কাছে যাওয়া যায় না। ঠিক যেন অনেক ওপর থেকে কুয়োর মধ্যে জল পড়ছে। অন্য পথে যাওয়া যায়, সেখানে তৃতীয় বা চতুর্থ দফায় জল আছাড় খেয়ে পড়ে, একটা পুকুরের মতো সৃষ্টি হয়েছে। এখানে আসা খুব কষ্টকর,  ঝামেলা সাপেক্ষ ও বিপজ্জনকও বটে। সঙ্গের মেয়েরা অনেকটা এসেও শেষপর্যন্ত জঙ্গল ও ভিজে এবড়ো খেবড়ো পাথর ভেঙ্গে নামতে সাহস করলো না। অথচ এখানে দেখলাম লোকে পিকনিক করতে আসে। কলাপাতা ও কাগজের তৈরি থালা বাটি ইতস্তত ছড়ানো। তবে জায়গাটা সত্যিই খুব সুন্দর। গা ছমছমে নির্জন পরিবেশে জলের আছাড় খাওয়ার শব্দে একটা আলাদা মাধুর্য আছে।

এবার ফেরার পালা। সাবধানে জঙ্গল পেরিয়ে মাঝপথ থেকে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে ওপরে উঠে এলাম। আরও কিছু সময় কাটিয়ে গেস্টহাউস ফিরে চললাম। গেস্টহাউসে কাউকে দেখা গেল না। ভিজে গামছাগুলো শুকনোর জন্য মেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল, সেগুলো ব্যাগে পুরে, পুরানো চায়ের দোকানটায় চা খেতে ঢুকলাম। দোকানদার জানালো, আজ রবিবার ছুটির দিন, কেউ আসবে বলে  মনে হয় না। আমার মনে হয়, কারো না আসার পিছনে দু’টো কারণ থাকতে পারে। হয় রেইকের  সেই ভদ্রমহিলা ভয় পেয়ে এখানকার যুবকটিকে আমাদের একটা রাত থাকার ব্যবস্থা করে দিতে বলেছিলেন, যেটায় অফিসিয়ালি কোন অসুবিধা ছিল। যুবকটি ষোলশ’ টাকা দাবি করলেও রসিদ দিতে পারবে না বলে পিছিয়ে গেছে। না হয় যুবক বা তার সহচর ছুটির দিনে কষ্ট করে গেস্টহাউসে আসে নি, বা আসতে ভুলে গেছে। এদের চাহিদা খুব কম, ফলে একটু কুঁড়ে প্রকৃতির হয়।

151 WAY TO AIZWAL152 WAY TO AIZWAL153 WAY TO AIZWAL156 WAY TO AIZWAL157 WAY TO AIZWAL159 AIZWAL BUS STAND

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমরা আইজলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। আইজল বাসস্ট্যান্ডে এসে  জানা গেল, আজ কোন বাস শিলং-এর উদ্দেশ্যে যাবে না। রবিবার, ছুটির দিন, তাই বাসস্ট্যান্ড ফাঁকা। দুরপাল্লার বাস চলাচল প্রায় বন্ধ। আগামীকাল দুপুরে বাস পাওয়া যাবে। একটা বড় নীল রঙের বাস দেখলাম শিলং যাচ্ছে। ছুটি কাটিয়ে আইজলের বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী শিলং ও গৌহাটি ফিরবার জন্য বাসটা ঠিক করেছে। আজ না ফিরতে পারলে, আজ এবং আগামীকাল, দু’-দু’টো দিন নষ্ট, তাই ড্রাইভার ও হেল্পারকে অনেক বুঝিয়ে এই বাসে যাওয়া পাকা করে নিলাম। ওভারনাইট জার্নি, বিক্ষিপ্তভাবে কিছু আজেবাজে বসার জায়গা, দু’জনের বসার জায়গায় তিনজন বসে, সারারাত জেগে, প্রায় অভুক্ত অবস্থায় পরদিন খুব ভোরে মেঘালয় রাজ্যের শিলং এসে উপস্থিত হ’লাম।

সুবীর কুমার রায়।                                                                                                              ৩০-১১-২০১৫

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s