অমল, বিমল ও কমল {লেখাটি অন্যনিষাদ/ গল্পগুচ্ছ ও সুপ্ত প্রতিভা- Supto Protibha পত্রিকায় প্রকাশিত।}

11933477_499335700242184_8226523325230916592_n

অমল

অফিসে অমল বাবু নামে নতুন এক অফিসার জয়েন করলেন। ইনি অতি কৃপণ, তবে চেহারা ও ব্যবহার একবারেই শিশুসুলভ। তিনি স্থানীয় এলাকার দীর্ঘদিনের বাসা ছেড়ে অচেনা অজানা কোন্নগরে একটা বাড়ি কিনে বসলেন। অতদুরে হঠাৎ এক অচেনা জায়গায় চলে যাবার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি শুধু বললেন, “আপনার কোন ধারণা নেই, জায়গাটা খুব ভালো ও সস্তা। আমার বাড়ির কাছেই একটা দোকান আছে, রুটি কিনলে তরকারী ফ্রী”। শুধু বিনা পয়সার তরকারীর লোভে যে কেউ বাড়ি কেনার জায়গা পছন্দ করে, জানা ছিল না।

এই অমল বাবু কথায় কথায় বাজি ধরে বসতেন। তবে খাওয়া ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে তাঁকে বাজি ধরতে কখনও দেখি নি। একদিন হঠাৎ কে কত তাড়াতাড়ি রাজভোগ খেতে পারে তাই নিয়ে গুলতানির মাঝে ঢুকে পড়ে অমল বাবু ঝাঁ করে বাজি ধরে বসলেন যে, তিনি ত্রিশটা রাজভোগ রস না চিপে, পনের মিনিটে খেয়ে নেবেন। সকলেই একটা করে ঘটনার কথা বলতে শুরু করায়, ত্রিশটা রাজভোগ খাওয়ার ঘটনা যে পৃথিবীতে আগে অনেক ঘটেছে, এবং অনেক কম সময়ে খেয়ে সেইসব ব্যক্তিরা যে আজও অমর হয়ে আছেন— এটা তাঁর কাছে জলের মতো পরিস্কার হয়ে গেল। ফলে বাধ্য হয়ে সময়টা সাত মিনিটে নামিয়ে আনতেই হল। শেষে দুই পক্ষের মধ্যে একটা অলিখিত চুক্তি (MOU) হ’ল, যে তিনি সাত মিনিটে ত্রিশটি রাজভোগ রস না চিপে খেয়ে নিতে পারলে তাঁকে আর একদিন পেট ভরে মাংস ভাত খাওয়ানো হবে। না পারলে তিনি রাজভোগের দাম ফেরৎ দিতে বাধ্য থাকবেন। মিষ্টির হাঁড়িতে পড়ে থাকা অবশিষ্ট রসটাও খেয়ে নেবার ও সময়ের মধ্যে খেতে না পারলে মিষ্টির দাম ফেরৎ ছাড়াও সবাইকে মাংস ভাত খাওয়ানোর প্রস্তাব পেশ হলেও, শেষে সেই প্রস্তাব বাতিল করা হয়।

পরের দিন অফিস ছুটির পরে বড় হাঁড়ি করে ত্রিশটা রাজভোগ নিয়ে আসা হল। বিকেল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটায় ত্রিশটা রাজভোগ খেতে হবে জেনেও, তিনি দুপুরে অন্যান্য দিনের মতোই টিফিন করেছিলেন। তবে খাওয়া শুরু করার আগে তিনি পেশাদার  খেলোয়ারের মতো রাজভোগের সংখ্যা একবার গুণে দেখে নিলেন।

খাওয়া শুরু হল। অতি দ্রুত গতিতে এক একবারে দু-তিনটে করে রাজভোগ তুলে মুখে পুরে তিনি খেতে, থুরি প্রায়  গিলতে শুরু করলেন। এরমধ্যেও অপর পক্ষ আপত্তি জানালো — হাঁড়ি থেকে  রাজভোগ তোলার সময় তিনি এত জোরে ধরছেন, যে অনেক রস হাঁড়িতে পড়ে যাচ্ছে। কাজেই অত জোরে মিষ্টি ধরে তোলা চলবে না।

অমল বাবু যখন খাওয়া শেষ করলেন, তখনও সাত মিনিট সময় অতিক্রান্ত হয় নি। কনুই পর্যন্ত হাত, জামার বুকের কাছটা, এমন কী প্যান্টেরও কোথাও কোথাও মিষ্টির রস মেখে তিনি বাজিমাৎ করার ঘোষণা শুনবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন। অপরদিকে এপক্ষের দু-একজন ঘড়ির দিকে ও মাঝেমাঝে মিষ্টির হাঁড়ির দিক লক্ষ্য রেখে অপেক্ষা করে অবশেষে ঘোষণা করলো— “সময় শেষ। অমল বাবু নির্দিষ্ট সময়ে বাজিমাৎ করতে পারেন নি, কারণ মিষ্টির হাঁড়িতে এখনও মিষ্টি পড়ে আছে”। দেখা গেল তাড়াহুড়ো করে এক একবারে দু’-তিনটে করে রাজভোগ তুলে মুখে পুরতে গিয়ে, অণু পরিমান একটা টুকরো হাঁড়িতে পড়ে আছে। অমল বাবু এটা দেখতে পান নি, তা নাহলে তাঁর হাতে সেটা খেয়ে নেবার মতো অনেক সময় ছিল। এই নিয়ে তুমুল অশান্তি শুরু হলে, অমল বাবুর প্রতি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে ম্যানেজার অমল বাবুর পক্ষে রায় দিয়ে তাঁকে জয়ী ঘোষণা করলেন। ততক্ষণে তাঁর জামা প্যান্টের রস শুকিয়ে চিনি হয়ে গেছে। পরে একদিন অবশ্য তাঁকে কথামতো মাংস ভাতও  খাওয়ানো হয়।

পরবর্তীকালে অফিসের অন্য এক শাখায় শুনেছিলাম যে, অমল বাবু অফিসের আর সকলের সঙ্গে একজনের বিয়ের নিমন্ত্রণ খেতে যাওয়ার আগে ঐ শাখার এক চতুর্থ শ্রেণী কর্মীর পরামর্শে খিদে বাড়াবার জন্য জামা প্যান্ট খুলে আন্ডারওয়ার পরে দীর্ঘক্ষণ অফিসের ভিতর পায়চারি করেছিলেন। অমল বাবু তখন ঐ শাখার ম্যানেজার ছিলেন।

এই অমল বাবু একদিন অফিস থেকে বেশ দুরে এক বড় বাজার এলাকায় গেলেন একটা বালতি কিনতে। বালতি কেটে তিনি একটি তোলা উনন তৈরী করবেন। অফিসের নীচেই বেশ কিছু দোকান থাকা সত্ত্বেও অত দুরে যাওয়ার কারণ হিসাবে জানা গেল, ওখানে অনেক দোকান থাকায় পছন্দমতো মজবুত বালতি অনেক সস্তায় পাওয়া যাবে। যাহোক্, তিনি অনেক দোকান ঘুরে, অনেক দরদাম করে “লক্ষ্মী” মার্কা এক বালতি কিনে, কোথা থেকে একবারে উননের উপযোগী বালতির নীচের দিকে বেশ খানিকটা কেটে ও ফুটো করে করে প্রয়োজনীয় শিক লাগিয়ে অফিসে ফিরলেন। বাড়ি ফিরে শুধু মাটি লাগাতে হবে।

দিন দু’-এক পরে কী কারণে ঐ এলাকায় আবার গিয়ে তিনি হঠাৎ এক দোকানের সন্ধান পেয়ে, মনোকষ্টে একবারে ভেঙ্গে পড়লেন। কারণ ঐ দোকানে “লক্ষ্মী” মার্কা বালতি দু’টাকা কম দামে বিক্রী হচ্ছে। এই ক্ষতি ও অসততা মেনে নিতে না পেরে, তিনি তৎক্ষণাত পূর্বের দোকানে গিয়ে ক্ষোভ ও অভিযোগ জানিয়ে টাকা ফেরৎ চাইলেন। দোকানদার জানালেন “কোন দোকান কী দামে বিক্রী করছে জানি না, তবে আমার দোকানে বালতি এই দামেই বিক্রী হয়”। এই নিয়ে বিস্তর কথা কাটাকাটির পর, দোকানদার বিরক্ত হয়ে, বালতি ফেরৎ দিয়ে টাকা ফেরৎ নিয়ে যেতে বললেন। বালতি ফেরৎ দেবার কোন সুযোগ না থাকায়, আর কেউ হলে হয়তো হৃদরোগে আক্রান্ত হতেন, কিন্ত অমল বাবু ভেঙ্গে পড়ার লোক নন। ঠান্ডা মাথায় অনেক চিন্তা করে, শেষে অপর দোকান থেকে দু’টাকা কম দামে লক্ষ্মী মার্কা আর একটা বালতি কিনে, এই দোকানে এসে বালতি ফেরৎ দিয়ে লোকসানের হাত থেকে বাঁচলেন।

বিমল

অফিসে বিমল জানা নামে এক চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী ছিল। সে খুব ভালো রান্না করতে পারতো এবং মাঝেমধ্যে অফিসের ক্যান্টিনে ভালোমন্দ রান্না করে আমাদের খাওয়াতোও। ছেলেটা খুব ভাল ছিল, কিন্তু তার পিছনে লেগে আমরা খুব মজা পেতাম। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, সে রোজ দুটো করে ডিমসিদ্ধ খাওয়া শুরু করেছে। তখন আমার অল্প বয়েস, কথায় কথায় কবিতা লিখে ফেলতাম। একটা কাগজে বড় বড় করে “জানার মাথায় গোবর পোরা, উঠবে এবার সিং। বুদ্ধি কী আর বাড়ে জানা, খেলে ডবল্ ডিম”? লিখে ক্যান্টিনের দেওয়ালে সেঁটে দিলাম। কিছুক্ষণ পরে ক্যান্টিনে চিৎকার চ্যাঁচামিচি শুনে গিয়ে দেখি, বিমল কবিতার কাগজটা দেওয়াল থেকে খুলে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার শ্রীমুখ দিয়ে অনর্গল খিস্তি ছুটছে।

এই বিমল তার বিয়েতে ছবি তোলার জন্য বিশেষ ভাবে ধরলো। আমি একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ক্যামেরা কিনে মাঝে মাঝে ফটো তুলি বটে, কিন্তু ফ্ল্যাশগান না থাকায় রাতে ছবি তোলার সুযোগ ছিল না। নাছোড়-বান্দা বিমলকে এটা কিছুতেই বোঝাতে না পেরে শেষে সহকর্মী সুজয়কে অনুরোধ করতে বুদ্ধি দিলাম। জায়গাটা ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরে হওয়ায় সুজয় রাজী হলেও, একা যেতে কিছুতেই রাজী হ’ল না। শেষে সুজয়কে সঙ্গ দেবার জন্য আমাকেও সঙ্গী হতে রাজী হতে হ’ল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল সেই ফ্ল্যাশগান নিয়েই। সুজয়ের ক্যামেরাটার ফ্ল্যাশগান নাকি মাঝেমধ্যেই কাজ করছে না। শেষে সুজয় ও বিমলের বিশেষ অনুরোধে খুঁতখুঁতে ও সন্দেহবাতিক জয়দেব তার ফ্ল্যাশগানটা দিতে রাজী হলে, সুজয় তার ক্যামেরা নিতে বাড়ি চলে গেল।

বিকাল বেলা জয়দেবের বাড়ি থেকে ফ্ল্যাশগানের সুদৃশ্য প্যাকেটটা নিয়ে সুজয়ের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। সুজয় তৈরী হয়েই ছিল। যাবার আগে তার ক্যামেরায় ফ্লাশগানটা একবার লাগিয়ে দেখে নিতে গিয়ে জানা গেল, ফ্ল্যাশগানের প্যাকেটে তারটা নেই। সব ফ্ল্যাশগানেই দেখি একটা সরু তার ফ্ল্যাশের সাথেই লাগানো থাকে, যেটা ক্যামেরায় গুঁজতে হয়। এর আবার তারটা দুদিকেই খোলা যায়। খুঁতখুঁতে জয়দেবের ফ্ল্যাশের তারটা সম্ভবত তার ক্যামেরার সাথেই অবস্থান করছে। অন্য উপায় না থাকায় বাধ্য হয়ে সুজয়ের ফ্ল্যাশ নিয়েই যাওয়া স্থির হ’ল।

বিমল বিয়ে করতে যাবার আগে তার বাবা আশীর্বাদ করছেন, সুজয় দু’দুটো ফটো নিল, কিন্তু  একবারও ফ্ল্যাশ কাজ করলো না। এরপর খুব কায়দা করে পালকিতে ওঠার আগে বিমল একবার মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ালো, সুজয়ও তিন-তিনবার সার্টার টিপলো। কারণ তৃতীয়বারেই শুধু আলো জ্বলেছিল। একটা বাচ্চাছেলে সুজয়কে জিজ্ঞাসা করলো যে সে রঙ্গীণ ছবি তুলছে কী না। তাকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, তার বাবা রঙ্গীন ছবি তোলে। সুজয়কে বললাম যে এখানে অন্তত একজন লোক আছে, যে ক্যামেরার ব্যবহার জানে। কাজেই সাবধান হতে হবে। যাহোক, বর পালকি চড়ে এগিয়ে চললো, হ্যাজাকের আলোয় আমরা সবাই তার পিছন পিছন হেঁটে।

সরু মেঠো রাস্তা দিয়ে বিয়ে বাড়ি পৌঁছলে, আমাদের সবাইকে একটা খুব বড় বারান্দায় আপ্যায়ণ করে বসতে দেওয়া হ’ল। সবাইকে চা ও গরম সিঙ্গারা দিয়ে যাওয়া হলেও, সুজয়কে পাত্রীর ভাইবোনের আব্দার মেটাতে চা ফেলে ক্যামেরা কাঁধে যেতেই হ’ল। যাওয়ার আগে ও আমাকে সঙ্গী হিসাবে পেতে চেয়েছিল, কিন্তু ফিরে গিয়ে অফিসে হাসির খোরাক হবার ভয়ে তাকে একাই যেতে বললাম।

বেশ কিছুক্ষণ পরে গম্ভীর মুখে ফিরে এসে সে জানালো, পাঁচটা ছবির মধ্যে দুবার মাত্র আলো জ্বলেছে। এভাবে চললে তো এখনই ফিল্ম শেষ হয়ে যাবে, তাই সে ফিল্মটা রিওয়াইন্ড করে নিয়েছে। এখানে এসে বিমলের ছবি তুলতে গিয়ে আবার দুটো ফটো নষ্ট হ’ল। আবার রিওয়াইন্ড করতে গিয়ে ফ্লিমটা কিভাবে জড়িয়ে গেল। ক্যামেরা খুলে দেখা গেল ফিল্মটা মুড়ে ভাঁজ হয়ে গেছে। ছবির অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহ থাকলেও, বাধ্য হয়ে দাঁত দিয়ে বেশ খানিকটা ফিল্ম ছিঁড়ে, নতুন করে লাগানো হ’ল।

বিশাল ছাদে বিয়ের জায়গাটায় আলোর অভাব হলেও, ফটো তোলার পক্ষে আদর্শ। সুজয় বেশ কয়েকটা ছবিও তুললো, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফ্ল্যাশ কাজ করে নি। সে আমাকে দু’একটা ছবি তুলতে বলে বললো, “তুলে দেখ না, যদি তোর হাতে ভাগ্য ফিরে যায়”। আমি অফিসে মুরগি হবার ভয়ে ক্যামেরা বা সুজয়ের ভাগ্য ফেরাবার ঝুঁকি নিলাম না, কারণ এই ছবি তোলা নিয়ে আমরা আগে দুজনকে খোরাক করেছি।

এবার খই পোড়ানোর ছবি। বিমল তার নববধুর পিছনে দাঁড়িয়ে, সামনে হাত বাড়িয়ে, দু’জনে মিলে আগুনে কুলো করে খই ফেললো। অনেকগুলো ছবির পরে ফ্ল্যাশ জ্বললো বটে, কিন্তু তার আগেই সব খই আগুনে পড়ে গিয়ে দুজনে ফাঁকা কুলো হাতে দাঁড়িয়ে আছে।

বাসরে আরও অনেকের মাঝে বিখ্যাত ফটোগ্রাফার হিসাবে সুজয় ঘর আলো করে বসে আছে, পাশে তার সাঁকরেদ হিসাবে আমি। ঘন ঘন ছবি তোলার অনুরোধ আসছে। আলো সমেত, আলো ছাড়া, কয়েকটা ছবিও তোলা হয়েছে। সুজয় আবার আমাকে দু’- একটা ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করলো। আমি ঐ প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে, তাকে হাত দিয়ে ফ্ল্যাশগানের লাইট জ্বেলে আপাতত মান বাঁচিয়ে অবস্থার সামাল দিতে পরামর্শ দিলাম।

কোনমতে রাতটা কাটিয়ে ভোর হতেই আমরা বিদায় নিলাম। সেদিনের সেই ফাঁকা কুলো হাতে বরকনের বিখ্যাত ছবিটা নিয়ে মোট আটটা ছবি উঠেছিল। অফিসে সুজয়ের অবস্থার কথা আর নাই বললাম।

কমল

নতুন চাকরিতে ঢুকেই কমলকে সহকর্মী হিসাবে পাওয়া ভাগ্যের কথা। ওর সব ভালো, শুধু কানে বেশ কম শোনা, সব কথায় মাইরি বলা ও চুড়ান্ত কৃপণতাই ওকে আদর্শ মুরগিতে রূপান্তরিত করে ছেড়েছে। আমার থেকে তার নিজের ও চাকরির, উভয়েরই বয়স অনেকটাই বেশি।

এ হেন কমলের বিয়েতে অফিসের সবার নিমন্ত্রণ। অফিসের ঠিক নীচের ফুলের দোকানের তপনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে ইঞ্চি দু’-এক আকন্দ তারপরে ইঞ্চি খানেক জবা দিয়ে মোটা দুটো গোড়ের মালা তৈরী করে দিতে পারবে কী না। মালা দুটোয় ইঞ্চি তিনেক লম্বা অপরাজিতার লকেট মতো থাকবে। আমার কথা শুনে তপন তো অবাক। বললো, “তা পারবো, কিন্তু ঐ মালা নিয়ে আপনি কী করবেন”? বললাম “সেটা তোর জানার দরকার নেই, তুই দুটো মালা তৈরী করে দিতে পারবি কী না সেটা বল, আর জবা ফুলগুলো কালী পূজার জবা দিবি, যেগুলো অনেক রাতে ফুটে বড় আকার ধারণ করে”। সে সম্মতি জানিয়ে চলে গেল।

খবর পেয়ে ম্যানেজার জানালেন ঐ সব সঙ্গে নিয়ে গেলে, তিনি আমার সাথে যাবেন না। বললাম “অফিস থেকে সকলে মিলে একটা উপহার তো দেওয়াই হচ্ছে। এটা আমরা কয়েকজন, বন্ধু হিসাবে অতিরিক্ত দেব”। যাহোক্, সন্ধ্যার পর মালা নিয়ে  বিয়েবাড়ি যাবার পথে দোকান থেকে একটা মাত্র নিরোধ কনডোম প্রায় বিনা পয়সায় কিনে, ফুলের মালার সাথে নিয়ে যাওয়া হ’ল।

বিয়ে বাড়িতে নতুন বরকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করা হয়েই থকে। এটাই রীতি, কিন্তু সেটা বিয়ের দিন। বৌভাতের দিন এই জাতীয় ব্যাপার, বিশেষ হতে দেখি না। কিন্তু এখানে দেখছি পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে, এক ঝাঁক নিমন্ত্রিত কমলের ওপর হামলে পড়েছে। যেন তার পিছনে লাগার জন্যই তারা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে এসেছে। হঠাৎ আলো চলে যাওয়ায় দেখা গেল জেনারেটার তো দুরের কথা, একটা মোমবাতি পর্যন্ত বাড়িতে নেই। অন্ধকারে বেশ কিছুক্ষণ বসার পর আলো আসলে পরেশ বললো, “কমল তুমিও একটা ফুলের মালা গলায় দাও। বিয়ের দিন তো দু’জনের তেমন ভালো ফটো তোলা যায় নি, আজ তোমাদের দু’জনের একটা ভালো ফটো তুলে দিচ্ছি, বড় করে বাঁধিয়ে নিও”। কমল একটা চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে বাবার ফটোতে ঝোলানো মালাটা খুলে নিজের গলায় পরতে পরতে বললো, “ফটোর দাম কী  আমায় দিতে হবে মাইরি”?

খেতে যাবার পথে একটা খুব সুন্দর দেখতে মেয়েকে দেখিয়ে ঠাট্টা করে কমলকে বললাম, “তোমার তো একটা হিল্লে হয়ে গেল, ঐ মেয়েটার সাথে আমার একটা ব্যবস্থা করে দাও না”। উত্তরে সে শুধু বললো “কী যে বল মাইরি”। দোতলায় খাবার জায়গায় যাওয়ার পথে নতুন বউকে মালার প্যাকেটটা দিয়ে বললাম, “বৌদি প্যাকেটটা এখন খুলবেন না”। কমল চিৎকার করে “সুবীর, চ্যাংড়ামো কোরনা মাইরি” বলতে বলতে খাবার জায়গায় নিয়ে গিয়ে বসালো। মুখোমুখি দুটো সারিতে আমরা অফিস কর্মীরা বসেছি, শুধু আমার ঠিক সামনে একজন অপরিচিত ব্যক্তিত্বপূর্ণ চেহারার ভদ্রলোক মোটা কাচের চশমা পরে খেতে বসেছেন। কিছুক্ষণ পরে কমল খাবার জায়গায় হঠাৎ এসে হাজির হয়ে ভদ্রলোকের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বেশ জোরে জোরে বললো, “সুবীর তুমি যে মেয়েটাকে বিয়ে করার কথা তখন বলছিলে, সে এনার মেয়ে। ইনি একটা কলেজের হেড অফ্ দি ডিপার্টমেন্ট”। আমার তো খাওয়া মাথায় উঠলো। ভদ্রলোক একবার শুধু তাঁর মোটা কাচের চশমার ভিতর দিয়ে আমাকে জরিপ করে নিলেন।

খাওয়া দাওয়া শেষে নীচে এসে নতুন বউ-এর কাছ থেকে প্যাকেটটা নিয়ে খুলে দেখি, জবা ফুলগুলো বেশ বড় বড় হয়ে গেছে। আহা! মালার কী রূপ। একটা মালা কমলকে পরিয়ে দিয়ে নতুন বউকে বললাম, “বৌদি রাতে এই মালাটা কমলকে বলবেন আপনাকে পরিয়ে দিতে।”। কমল চিৎকার শুরু করে দিল—“সুবীর চ্যাংড়ামো কোর না মাইরি”। যাহোক্ আমরা ফিরে এলাম।  পরে কাজে যোগ দিয়ে সে জানালো, “তোমাদের নামে খুব নিন্দা হয়েছে মাইরি”।

দিন যায়, কমলকে নিয়ে ভালই সময় কাটে। বছর খানেক পরে একদিন, সেদিন সে অফিস আসে নি, বিকালের দিকে অফিসে এসে জানালো যে তার মার অবস্থা খুব খারাপ। সে কিছু টাকা তুলতে চায়। তার ব্যাঙ্ক এাকাউন্টে সবসময় অনেক টাকা থাকলেও, সাধারণত সে খুব একটা টাকা তোলে না। তার মা অনেকদিন ক্যানসারে ভুগছেন জানতাম, তাই জিজ্ঞাসা করলাম “মা এখন কেমন আছেন”? সে করুণ স্বরে উত্তর দিল “ভালো না গো”। সেফে টাকা উঠে যাওয়ায় তাকে টাকা তুলতে দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেল না। অগত্যা যার পকেটে যা ছিল তাই দিয়ে কিছু টাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল।

পরদিন কাছা নিয়ে কমল অফিস জয়েন করলো। গতকাল তার মা মারা গেছেন জেনে, আমরা সবাই তাকে সহানুভুতি জানালাম। ম্যানেজার বললেন “গতকাল তোমার মা মারা গেছেন, আজ অফিস জয়েন না করলেই ভাল করতে। এই সময়টা খুব সাবধানে থাকতে হয়, তার ওপর গতকাল তোমার ঝামেলাও গেছে। দু’চারদিন ছুটি নিয়ে অফিসে আসা উচিৎ ছিল।

উত্তরে কমল বললো “আমিতো মাকে কনট্রাক্টে পুড়িয়েছি, তাই আমার তেমন কষ্ট বা ঝামেলা পোহাতে হয় নি। আমি শ্মশানে গিয়ে মুখাগ্নি করে চলে এসেছি, আবার ঘন্টা দেড়েক পরে একবার গিয়ে গঙ্গায় অস্থি ফেলে কাছা নিয়ে ফিরে এসেছি। বাকী সব ঝামেলা ওরাই সামলেছে। কিছু ফালতু খরচা হয়ে গেল। তা আর কী করা যাবে মাইরি। তাছাড়া বাড়িতে থাকলে অনেক ঝামেলা। অনবরত লোক আসবে। তাদের চা খাওয়াও, মিষ্টি খাওয়াও। তার থেকে অফিসে থাকা অনেক ভাল”।

আসল খবরটা আরও পরে জানা গেল। সেদিন কমল যখন অফিসে টাকার জন্য এসেছিল, তার অনেক আগেই তার মার মৃত্যু হয়। পাছে সহকর্মীর মার মৃত্যুর খবর পেয়ে অফিসের কেউ তার বাড়ি বা শ্মশানে যায়, সেই ভয়ে সে তার মার অবস্থা খারাপ বলেছিল। কারণ তাহলে তাদের আবার শ্মশানবন্ধু হিসাবে শ্রাদ্ধে বা নিয়মভঙ্গে নিমন্ত্রণ করার প্রশ্ন আসবে।

নিয়মভঙ্গ তো দুরের কথা, কমলের মার শ্রাদ্ধেও যে অফিসের কেউ তার বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পায় নি, একথাটা বোধহয় আর না বললেও চলবে।

সুবীর কুমার রায়।

১০-০৭-২০১৫

 

Advertisements

2 thoughts on “অমল, বিমল ও কমল {লেখাটি অন্যনিষাদ/ গল্পগুচ্ছ ও সুপ্ত প্রতিভা- Supto Protibha পত্রিকায় প্রকাশিত।}

  1. বেশ লাগলো আপনার অমল, বিমল, কমল; কিন্তু ইন্দ্রজিৎকে দেখতে পেলাম না তো!….
    বাদলদাকে অল্প অল্প চিনতাম। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটকের একটা দুর্বল প্রযোজনা মুক্তাঙ্গনে অগণিত বার দেখেছি, যেমন দেখেছি ‘বড়োপিসিমা’ ও ‘বল্লভপুরের রূপকথা’।আপনার অমল-বিমল-কমল যথার্থ নাট্যরূপে প্রভূত প্রশংসা পাবার যোগ্যতা রাখে।

    • দাদা, রেডিওতে’এবং ইন্দ্রজিৎ’-এর একটা চরিত্রে আমার জামাইবাবু (ক্ষৌণীশ বাগচী) অভিনয় করেছিলেন, যদিও কোন চরিত্রে, এত বছর পরে আর মনে করতে পারি না। ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ আমার অতি প্রিয় নাটক। আমার অমল, বিমল, কমল, চোখে দেখা চরিত্র। ইন্দ্রজিৎ কেন সত্যজিৎ, বিশ্বজিৎ, ইত্যাদি অনেক জীবন্ত চরিত্র প্রচুর মালমশলা নিয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের নিয়ে লিখলেই লেখা যায়। আপনি পড়েছেন, এবং আপনার ভালো লেগেছে, এটা আমার একটা বড় পাওয়া।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s