পাহাড়ের রোজনামচা–সপ্তম পর্ব (www.amaderchhuti.com ও Tour & Tourists পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত)

 DSCN9767বাস থেকে নেমে যুবকটির সঙ্গে এতক্ষণ আমরা কিন্তু বাস রাস্তা ধরেই হেঁটে আসছি। এদিকে বাস কেন আসেনা, বুঝলাম না। আরও কিছুটা পথ হাঁটার পর কারণটা বোঝা গেল। শুধু বোঝা গেল তাই নয়, সঙ্গে গঙ্গোত্রী যাত্রার ভবিষ্যৎ নিয়েও আমাদের মনে সংশয় দেখা দিল। রাস্তা একেবারেই নেই। কোন কালে ছিল বলেও বোঝার উপায় নেই। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির কাজ চলছে। বড় বড় শাবলের মতো লোহার রড দিয়ে ড্রিল করে পাহাড়ের গায়ে গর্ত করা হচ্ছে। পরে ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ভেঙ্গে, রাস্তা তৈরি হবে। তখন লোক চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে। এবড়ো-খেবড়ো ভাঙ্গা পাথরের ওপর দিয়ে অনেকটা পথ পার হয়ে যেতে হ’ল। পাশেই গভীর খাদ। অনেক নীচ দিয়ে গঙ্গা আপন মনে বয়ে চলেছ। সেই গঙ্গা, যার উৎস দেখতেই আমাদের এত কষ্ট করে যাওয়া। খুব সাবধানে এই পথটুকু পার হয়ে এলাম। একটু পা হড়কালেই গঙ্গা মাইকী জয় হয়ে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এ জায়গাটায় রাস্তা বলে কিছু নেই। কখনও নীচুতে নেমে, কখনও বা বড় পাথর টপকে একটু ওপরে উঠে, এগিয়ে যেতে হয়। বেশ কিছুটা পথ এইভাবে পার হয়ে, আবার বাস রাস্তায় পড়লাম। গল্প করতে করতে জোর কদমে এগিয়ে চলেছি। বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি শুরু হ’ল। সঙ্গে ওয়াটার প্রুফ আছে বটে, কিন্তু যুবকটি ভিজে ভিজে আমাদের সাথে যাবে, আর আমরা বর্ষাতি গায়ে দিয়ে তার সাথে যাব? তাই আমরাও ভিজে ভিজেই তার সাথে পথ চলছি। কোথাও যে একটু দাঁড়াবো, তারও উপায় নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেজার থেকে, ভিজে ভিজে হাঁটাই বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের জন্য যতটা না চিন্তা, তার থেকে অনেক বেশি চিন্তা মাধবকে নিয়ে। যুবকটি জানালো, আমরা প্রায় গাংগানী এসে গেছি, আর সামান্যই পথ। একটু এগিয়েই একটা ঝোলা পোর্টেবল্ ব্রিজ পার হয়ে, গঙ্গার অপর পারে এলাম। পরপর দু’টো চায়ের দোকানের একটার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যুবকটি আমাদের একটা পাকা বড় ঘরে ছেড়ে দিয়ে বললো, এখানে রাতটা কাটাতে পারেন। আজ আর এগবেন না, কারণ এখান থেকে আগেকার পাকা বাস রাস্তা আর নেই। বাস রাস্তা ছিল গঙ্গার অপর পার দিয়ে, যেদিক দিয়ে আমরা এতক্ষণ হেঁটে আসলাম। এই ব্রিজের ঠিক পরেই আগেকার বাস রাস্তাটা গঙ্গার সাথে মিশে গেছে। যুবকটি জানালো, গত বছর বন্যার পর পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করে, এই ব্রিজটা তৈরি করা হয়েছে। গঙ্গার এপার থেকে ডাবরানী পর্যন্ত নতুন পায়ে হাঁটার পথ তৈরি করা হয়েছে। এটা একবারেই স্থানীয় লোকেদের প্রয়োজন মেটাতে, তাদের ঊপযুক্ত হাঁটাপথ তৈরি করা হয়েছে। এখন গঙ্গোত্রী যাবার যাত্রী নেই। তাছাড়া রাতে ঐ রাস্তায় ভাল্লুকের উৎপাত আছে। কাজেই আমাদের আজ আর এগিয়ে না গিয়ে, এখানেই থেকে যাওয়াই ঠিক হবে। সামনেই একটা পাকা বাড়ি দেখিয়ে যুবকটি জানালো যে, ওটাই তাদের অফিস, এবং ওখানেই মেস্ করে তারা কয়েকজন থাকে। যুবকটি তার নিজের আস্তানায় এগিয়ে গেল।

আমাদের সর্বাঙ্গ বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। যুবকটির দেখানো বড় ঘরটায় রাত্রিবাস করার সিদ্ধান্ত পাকা করে, ঘরে ঢুকে নিজেদের সব জামাপ্যান্ট খুলে, দরজা, জানালা ও মাটিতে মেলে শুকতে দিয়ে, জাঙ্গিয়া পরে বসে রইলাম। যদিও বুঝতে পারছি শুকনো হবার কোন সম্ভাবনাই নেই, তবু যদি কিছুটা শুকনো হয় এই আশায়, ওগুলো মেলে দিলাম। এতক্ষণে কলা, আপেলগুলো যথাস্থানে স্থান পেল। খিদেটা অনেকটাই কমে গেল। ঘরটার সামনেই একটা বড় চৌবাচ্চা মতো। তার জল কিন্তু গরম। চারপাশ দিয়ে অল্প অল্প ধোঁয়াও উঠছে। ডানপাশে, উপর থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে একটা ঝরনার ধারা নেমে এসেছে। পরে শুনলাম ঐ ঝরনার জল গরম এবং ঐ জলই এ অঞ্চলে সর্বত্র ব্যবহার করা হয়। আমাদের ঘরটার ভিতরে একপাশে মুখোমুখি দু’টো করে, মোট চারটে বাথরুম বা পায়খানা কিছু একটা হবে। চারটের দরজাই তালা দেওয়া। কার কাছে চাবি থাকে জানিনা, তবে ওগুলোর দেওয়াল ছাদ থেকে বেশ খানিকটা নীচে শেষ হয়েছে। বন্ধুদের বললাম, প্রয়োজনে দেওয়াল টপকে ভিতরে নেমে ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু সবার আগে রাতের খাবারের একটা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মাধবকে বসিয়ে রেখে, জাঙ্গিয়া পরা অবস্থায় গায়ে ওয়াটার প্রুফ চাপিয়ে দোকান দু’টোর কাছে গেলাম। নীচের দোকানটা জানালো, চা ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না। ওপরের দোকানটায় দেখলাম কয়েকজন বসে চা খাচ্ছে। একপাশে পাঁচটা খাটিয়া পাতা। কিছু পাওয়া যাবে কী না জিজ্ঞাসা করায়, দোকানদার জানালেন চা পাওয়া যাবে। এই দোকানের একমাত্র খাদ্যবস্তু চা আর বিড়ি। দেশলাই পর্যন্ত নেই। আমরা জানালাম, রাতে আমরা এখানে থাকবো, আমাদের খাবার কিছু ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বৃদ্ধ দোকানদারকে লালাজী বলে সম্বোধন করায়, তিনি খুব খুশি হলেন। দোকানের বাইরে ডানপাশে, একটা নল থেকে ঐ ঝরনার গরম জল একভাবে পড়ে যাচ্ছে। তার পাশে কিছু ছোট ছোট শুকনো আলু পড়ে আছে, হয়তো বা রাখা হয়েছে। দেখে মনে হ’ল পচে গেছে, তাই দোকানের বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা গেল প্রত্যেকটা আলুর গা থেকে শিকড়ের মতো কল্ বার হয়েছে। এতক্ষণে লালাজী জানালেন যে, আমরা যেখানে উঠেছি, সেটা আসলে মহিলাদের গরমকুন্ডে স্নান সেরে কাপড় ছাড়ার জায়গা। ওখানে রাত্রে থাকতে দেওয়া হয় না। বিশেষ করে পুরুষদের তো নয়ই। দিলীপ আর আমি পাশাপাশি বসে। হাতে এই দোকানের একমাত্র খাদ্য, চায়ের কাপ। শোচনীয় অবস্থা। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বৃষ্টি পড়ছে, দারুণ শীত, চারপাশে কালো হিমালয় ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না, অনেক নীচু থেকে গঙ্গার বীভৎস আওয়াজ এক নাগাড়ে কানে বাজছে, এই অবস্থায় এখনও আমরা জানি না, রাত্রে কোথায় থাকবো, কী খাবো। এখানে কাছেপিঠে কোন মানুষ বাস করেনা, থাকা বা খাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই, এখানে কোন্ মহিলা পাহাড় ভেঙ্গে রাতে কুন্ডে স্নান সেরে কাপড় ছাড়তে আসবে ভগবান জানেন। অপরদিকে একটা খাটিয়ায়, একজন পায়জামা সার্ট পরা লোক বসে আছেন। তাঁর দৃষ্টিটা কিরকম যেন সন্দেহজনক। দিলীপকে সাবধান করে দেবার জন্য বললাম, লোকটার চাউনি মোটেই সুবিধার নয়, রাতে সতর্ক থাকতে হবে। দিলীপও আমার কথায় সায় দিল। সঙ্গে এত টাকা, মাধবের ও আমার মানি ব্যাগে বেশ কিছু টাকা আছে। আর বেশিরভাগ টাকাই অবশ্য রাখা আছে খালি একটা বিস্কুটের প্যাকেটে। এমন জায়গায় এসে হাজির হয়েছি যে, চিৎকার করে আমাদের সতর্ক করে, ঢাক ঢোল পিটিয়ে আমাদের খুন করে ফেললেও, কারো জানার উপায় নেই। মাঝেমাঝে আড়চোখে তাকিয়ে দেখি লোকটা একভাবে আমাদের লক্ষ্য করছেন। আমরা যে ফাঁদে পড়েছি, তিনি বুঝে গেছেন। লালাজী বললেন, ভাত, ডাল ও সবজী পাওয়া যাবে। আমরা বললাম, ভাত না করে চাপাটি বানানো যায় না? লালাজী বললেন, বাঙালি আদমি রুটি খাবে? আমরা জানালাম যে রুটিই আমরা ভালবাসি। তিনি জানালেন যে তিনি রুটি তৈরি করে দেবেন। একটা সমস্যা মিটলো, অন্তত খালিপেটে লোকটার হাতে মরতে হবে না। আমরা বললাম রাতে তিনটে খাটিয়া চাই, সঙ্গে লেপ্ কম্বল। সামনের ঐ ঘরে আমাদের এক বন্ধু আছে, সে অসুস্থ। খাটিয়া লেপ ঐ ঘরে নিয়ে যাব। লালাজী জানালেন, সব কিছুই মিলবে, তবে ওখানে রাতে থাকতে দেওয়া হয় না, কাজেই দোকানেই থাকতে হবে। আসলে ঐ ঘরটায় থাকতে চাওয়ার একটাই উদ্দেশ্য, ঘরটায় দরজা আছে, এবং সেটা ভিতর থেকে বন্ধ করা যায়। আর এই দোকানটা একটা অতি সাধারণ চায়ের দোকান। সামনে তিনটে বাঁশের খুঁটি। সামনে ও ডানপাশটা পুরো খোলা। পিছন ও বাঁপাশটা খড়ের ও মাটির দেওয়াল মতো। খড়ের চাল। সঙ্গে এত টাকা পয়সা নিয়ে এখানে থাকা বেশ বিপজ্জনক বলেই মনে হয়। দিলীপ বললো মাধবের সাথে পরামর্শ করে, পরে এখানে আসা যাবে। আমি কিন্তু তাতে রাজি হলাম না। পাঁচটাই মাত্র খাটিয়া আছে। তার মধ্যে একটা নিশ্চই লালাজীর। বাকি রইলো চারটে। আমরা তিনজন আছি। এরমধ্যে কেউ এসে হাজির হ’লে, জায়গা পাওয়া যাবে না। তখন সারারাত বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকারে রাস্তায় বসে কাটাতে হবে।

11988207_504213833087704_656872141428237667_n   লালাজীর চায়ের দোকানটা অনেকটা রকমই ছিল

আগে এসে খাটিয়া দখল করে, পরে অন্য চিন্তা করা যাবে। ঘরে ফিরে এসে দলা করে সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে, দোকানে ফিরে চললাম। মাধবকে সন্দেহজনক লোকটার সম্বন্ধে সংক্ষেপে সব বললাম। দোকানে এসে তিনজনে তিনটে খাটিয়ায় সরাসরি উঠে বসে, লেপ-তোষক দিতে বললাম। পরপর তিনটে খাটিয়ায় আমরা তিনজন। আমার আর দিলীপের খাটিয়া দু’টোর মাথার দিকে, আর দু’টো খাটিয়া। স্থানাভাবে সবগুলো খাটিয়াই প্রায় গায়ে গায়ে লাগানো। লালাজী জানালেন, একটু পরেই লেপ তোষক বার করে দেবেন। বৃষ্টিটা বন্ধ হয়েছে। আমরা যে যার খাটিয়ায় চুপ করে বসে আছি। সন্দেহজনক লোকটা কিন্তু এখনও বসে আছেন, আর মাঝেমাঝেই আমাদের লক্ষ্য করছেন। ভুখি থেকে একসাথে যে যুবকটির সঙ্গে এতটা পথ হেঁটে আসলাম, তার থাকার ঘরটা যদিও এক মিনিটের পথ, তবু সে আর একবারও দেখা করতে এল না। ভেবে খুব আশ্চর্য লাগলো যে, যে লোকটা এতটা পথ একসঙ্গে এল, চায়ের দাম পর্যন্ত দিতে দিল না, সে আমাদের এই বিপদের সময়, একবারও দেখা করতেও এল না?

এতক্ষণে সন্দেহজনক লোকটা উঠে চলে গেলেন। আমরাও নিশ্চিন্ত হয়ে যে যার খাটিয়ায় শুয়ে, গল্পগুজব করতে লাগলাম। লালাজী জানালেন, খাটিয়া আর লেপ তোষকের ভাড়া, মাথাপিছু চার টাকা পঞ্চাশ পয়সা করে দিতে হবে। আজ রাতে আমরা যে জায়গায়, যে অবস্থায় এসে হাজির হয়েছি, তাতে চল্লিশ টাকা বললেও দিতে হবে। আকাশ একবারে পরিস্কার হয়ে, অসংখ্য তারা ফুটে গেছে। ঘরের খড়ের ছাদ দিয়েই নানা জায়গায় আকাশ দেখা যাচ্ছে। ভালো করে খুঁজলে হয়তো কালপুরুষ, সপ্তর্ষি মন্ডল-ও দেখা যেতে পারে। ভয় হ’ল, রাতে জোরে বৃষ্টি আসলে আমাদের কী অবস্থা হবে ভেবে। হাতে কোন কাজ নেই, সময় আর কাটে না। এক বান্ডিল বিড়ি নিয়ে, তিনজনে শেষ করতে বসলাম। কী করবো, কিছু একটা তো করা চাই। লালাজী একটা থালায়, লাল, সবুজ, হলদে, কালো, নানা রঙের মেশানো ডাল নিয়ে একবার করে ফুঁ দিচ্ছেন, আর দোকান ঘরে একরাশ ধুলো উড়ে যাচ্ছে। এর থেকেও অনেক খারাপ খাবার খাওয়ার অভ্যাস আমাদের হয়ে গেছে। তাছাড়া খিদেও পেয়েছে যথেষ্ট। তাই খাবার তৈরির আশায় বসে রইলাম। সব শান্তির অবসান ঘটিয়ে, সেই সন্দেহজনক মক্কেল, আবার এসে হাজির হলেন। দিলীপ বললো ওর সাথে কথা বলে দেখলে হয়। আমরা বললাম, যেচে ওর সাথে আলাপ করার দরকার নেই। কিন্তু লোকটাকে দেখে মনে হ’ল, সে আমাদের সাথে কথা বলতেই চায়। তাই আমরাই প্রথম জিজ্ঞাসা করলাম— তিনি কোথায় থাকেন, কী করেন ইত্যাদি। লোকটা এবার এগিয়ে এসে আমাদের সামনে একটা খাটিয়ায় বসলেন। তাঁর কাছে জানতে পারলাম যে, তিনি এখানে ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। বাড়ি মিরাটে। বছরে দু’একবার এর বেশি বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় না। এখানে ওয়্যারলেস কর্মীদের সাথে একই মেসে থাকেন। শীতকালে এখানকার অনেকেই বাড়ি চলে যায়। তখন এখানে তিনি প্রায় একাই থাকেন। একা একা তাঁর একদম ভালো লাগে না। কথাবার্তা শুনে বুঝলাম, লোকটি ভালো। একা একা থেকে, কথা বলার অভ্যাস কমে গেছে, সুযোগও নেই। আমাদের সাথে তিনি কথা বলতেই চাইছিলেন, তবে নিজে থেকে আগে কথা বলা ঠিক হবে কী না ভেবে, এতক্ষণ কোন কথা বলেন নি। ওঁর কাছ থেকে গত বছরের বন্যার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা শুনলাম।

গত বছর পাঁচই আগষ্ট রাত্রিবেলা, এই গাংগানীর কিছুটা আগে ডাবরানীর দিকে পাহাড়ের একটা চুড়া গঙ্গার ওপর ভেঙ্গে পড়ে। ওখানকার গঙ্গা খুব সরু, ফলে গঙ্গার জল চলাচল একবারে বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন সকালে ওরা দেখে গাংগানীতে গঙ্গা একবারে শুকিয়ে গেছে। দু একটা ঝরনার জল, ও গঙ্গার যেটুকু জল লিক্ করে আসতে পারে, সেই জলই সামান্য ধারায় বয়ে যাচ্ছে। ঐ দিন, অর্থাৎ ছয় তারিখে প্রায় বিকেল নাগাদ, গঙ্গার জমে থাকা বিপুল জলের চাপে, ঐ ভেঙ্গে পড়া পাথরের একটা অংশ ঠেলে ভেঙ্গে ফেলে, প্রবল বেগে জল নীচের দিকে, অর্থাৎ গাংগানী, ভুখি, বা উত্তরকাশীর দিকে ধেয়ে আসে। বর্ষাকালের প্রায় বার-চোদ্দো ঘন্টার জমে থাকা জলের স্রোত, হঠাৎ মুক্ত হয়ে ভীষণ আকার ধারণ করে সমস্ত শহর ভেঙ্গে, গুঁড়িয়ে দিয়ে বয়ে চলে যায়। এই গাংগানীতে, যেখানে আমরা এখন বসে আছি, তার অপর পারে দু’টো গেষ্ট হাউস, একটা আয়ুর্বেদিক কলেজ, একটা ইন্টার হাইস্কুল, কালীকম্বলীর ধর্মশালা ও বেশ কয়েকটা হোটেল ছিল। এক কথায় ওটা একটা বেশ বড় পাহাড়ি শহর ছিল। এখন এই মুহুর্তে আমরা যে জায়গাটায় আছি, তার নাম গরমকুন্ড। গঙ্গার অপর পারটার নাম গাংগানী। এ দিকটায় খাড়া পাহাড়, অপর দিকে প্রায় গঙ্গার লেভেলেই ছিল গাংগানী শহর, বাস রাস্তা। ফলে গঙ্গার জল ঐ বিশাল পাথর ঠেলে যেতে না পেরে, ডানদিকে বেঁকে গাংগানীর ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে, সমস্ত শহরটাকে ভেঙ্গে নিয়ে যায়। আসবার সময় এত ঘটনা আমরা জানতাম না। তবে আমাদের বাড়ির কাছে যে ভদ্রলোক গঙ্গোত্রী যেতে না পেরে ফিরে এসেছিলেন, তাঁর কাছে এর অনেকটাই শুনে, আমরা ইউ.পি.টুরিজিম্ অফিসে জিজ্ঞাসা করে হাসির খোরাক হয়েছিলাম। দোষটা তাদের নয়, তারা এ খবর জানতো না বা জানবার চেষ্টাও করে নি। আসবার সময় দেখেছিলাম, একটা ছোট মন্দির ও একটা ভাঙ্গা বাড়ির দেওয়াল ছাড়া আর কিছুই ওদিকে নেই। ভদ্রলোক জানালেন, পাঁচজন টুরিষ্ট মারা যায়, তারা সবাই বাঙালি। স্থানীয় লোকেরা বিপদের আশঙ্কা করে আগেই বাড়িঘর, জিনিসপত্র ফেলে, ওপর দিকে পালিয়ে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে রক্ষা পায়। যাহোক্, ভদ্রলোক এবার মেসে ফেরার জন্য উঠলেন। আমরা ডাবরানী আর কতটা রাস্তা, রাস্তায় দোকান পাব কী না, ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করায়, ভদ্রলোক জানালেন ভুখি থেকে এই গাংগানী পাঁচ কিলোমিটার পথ। আবার এখান থেকে ডাবরানী আট কিলোমিটার পথ। পথে কোন দোকান পাওয়া যাবে না। রাস্তাও খুবই কষ্টকর। এবার ভদ্রলোক বাসায় ফিরে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, কোন ভয় নেই। আপনারা ঠিক ভালোভাবে পৌঁছে যাবেন, আমার শুভেচ্ছা রইলো। ফিরবার পথে অবশ্যই দেখা হবে।

এদিকে লালাজীর রান্নাও শেষ। পাশের কাপড় ছাড়ার ঘরটা থেকে, চেঁচামিচির আওয়াজ আসছে। শুনলাম একদল পুরুষ ও মহিলা ওখানে এসে উঠেছে। আগেভাগে এখানে এসে জায়গা নিয়েছি বলে, নিজেদেরকে এখন ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছে। আমরা খাবার খেতে উঠতেই, লালাজী বললেন, ওখানে বসেই প্রেমসে খানা খাও। ডাল, ছোট ছোট আলুর তরকারী, যার অধিকাংশ আলুই শক্ত এবং পচা, আর শোনপ্রয়াগের দোকানের পদ্ধতিতে তৈরি একপিঠ পোড়া অপর পিঠ কাঁচা সেই উপাদেয় রুটি। আলুর তরকারীতে একটু করে মাখন দিয়ে নিয়ে, মৌজ করে খাওয়া শুরু করলাম। এরকম একটা জায়গায় এই পরিবেশে বিনা পরিশ্রমে খাটিয়ায় বসে এই খাবার পেয়ে, লালাজীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আর সত্যি কথা বলতে, কী ভালই যে লাগলো, মনে হ’ল অমৃত খাচ্ছি। জানিনা একেই “খিদে পেলে বাঘে ধান খায়” বলে কী না। অসুস্থ মাধব তিনটে রুটি মেরে দিল। এখানকার মতো বড় বড় রুটি না হলেও, আমি বোধহয় খান ছয়-সাত উদরস্থ করে ফেললাম। আমরা দোকানের বাইরে একটু দাঁড়িয়ে, আকাশে অসংখ্য তারার মেলা ও নীচে গঙ্গার গর্জন, উপভোগ করে, খাটিয়ায় ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম। এর কাছে দিল্লীর লালকেল্লার “লাইট অ্যান্ড্ সাউন্ড্” ও তুচ্ছ মনে হ’ল। আকাশে একসাথে এত তারা আগে কখনও কোথাও দেখেছি বলে মনে হয় না। চারপাশে যে কী অন্ধকার বলে বোঝানো যাবে না। মনে হচ্ছে দরজা জানালা হীন একটা ঘরে, অমাবস্যার রাতে, আলো না জ্বেলে, আমরা শুয়ে আছি। মাধবের মানিব্যাগ, আমার মানিব্যাগ ও বিস্কুটের প্যাকেটটা আমার পিঠের তলায়, তোষকের ওপর রেখে, লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। উচু হয়ে থাকায় শুতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। লেপ-তোষকের সাদা রঙ বোধহয় বাইরের অন্ধকারের কালো রঙকেও হার মানাবে। তেমনি তার সুগন্ধ। ঘুম আসছে না। একটু পরেই নতুন বিপদ এসে হাজির হ’ল। অসংখ্য ছাড়পোকার মতো এক রকম পোকা, সর্বাঙ্গ জ্বালিয়ে দিল। লালাজী আশ্বাস দিয়ে জানালেন, ও কিছু না, পিসু আছে। তাঁর বলার ধরণ দেখে মনে হ’ল বাস্তু সাপের মতো, এগুলো বাস্তু পিসু। এগুলোকে একপ্রকার রক্তচোষা উকুন বলা যায়। হাওড়া-কলকাতায় এ জাতীয় এক প্রকার ছোট্ট, অতি পাতলা পোকাকে, চামউকুন বলতে শুনেছি। এরা লোমকূপে আটকে থেকে রক্ত চুষে খায়। নখ দিয়ে খুঁটেও এদের লোমকূপ থেকে তুলে ফেলা যায় না। লালাজীর মুখে পিসুর কথা শুনে মনে হচ্ছে পাহাড়ি চামউকুনের খপ্পরে পড়েছি। রাতদুপুরে খাটিয়ায় উঠে বসে খস্ খস্ করে সারা শরীর চুলকাতে শুরু করলাম। এর আবার আর একটা অন্য যন্ত্রণাও আছে। গলা, কান, মুখ বা দেহের অন্য কোন অংশের চামড়ার ওপর দিয়ে এরা হেঁটে যাবার সময় একটা অস্বস্তি হয়। হাতের তেলো  দিয়ে ঘষে ফেলে দেবার চেষ্টা করলে, এরা হাঁটা বন্ধ করে দেয়। মনে হবে শরীর থেকে পড়ে গেছে বা মরে গেছে। কিন্তু একটু পরেই আবার সেই পুরানো জায়গা থেকেই শরীর ভ্রমন শুরু করে। আমরা যেমন মাংস কেনার সময়, নিজের নিজের পছন্দ মতো খাসির শরীরের অংশ দিতে বলি, মনে হয় এরাও বোধহয় নিজেদের পছন্দের লোমকূপ খুঁজতে মানুষের শরীরে হেঁটে বেড়ায়। মাধব ও দিলীপ ঘুমিয়ে পড়েছে। হতভাগ্য আমি একা জেগে বসে গা, হাত, পা চুলকে যাচ্ছি। বন্ধুদের দেখে মন হচ্ছে, ওরা মহানন্দে ঘুমচ্ছে। মনে হয় পিসুদের আমায় বেশি পছন্দ হয়েছে। এইভাবে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা, হঠাৎ মনে হ’ল আমার মাথাটা কে যেন কিছু দিয়ে খুব জোরে ঘষে দিল। ধরমর্ করে উঠে বসে দেখি, আমার মাথার কাছের খাটিয়াটায় কখন একজন এসে রাতের আশ্রয় নিয়েছে। তার মাথাটা আমার মাথার সাথে ঘুমের ঘোরে ঐ ভাবে ঘষে গেছে। ঘুম মাথায় উঠলো। নতুন করে আবার গা চুলকাবার পালা শুরু হ’ল। লোকটাকে মনে মনে অভিশাপ দিয়ে ঘুমবার চেষ্টা করলাম। ঘরের ছাদের ফাঁক দিয়ে একটা জ্বলজ্বলে তারাকে পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি। ওটা শুকতারা না মঙ্গল গ্রহ ভাবতে বসলাম। মাধব ও দিলীপ ঐ নোংরা লেপই মাথা পর্যন্ত ঢাকা দিয়ে দিব্যি ঘুমচ্ছে। আমার পেটটা আবার কেমন ব্যথা ব্যথা করতে শুরু করলো। একবার বাইরে যেতে পারলে হ’ত। আসবার সময় জায়গাটা ভালোভাবে দেখবার সুযোগ হয় নি। টর্চ সঙ্গে থাকলেও, অন্ধকারে একা একা কোথায় যাব ভেবে পেলাম না। একবার ভাবলাম মাধবকে ডাকি, তারপর ওকে আর বিরক্ত না করে চুপচাপ শুয়ে থাকলাম।

আজ আটাশে আগষ্ট। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, এক কাপ চা পর্যন্ত না খেয়ে, লালাজীকে থাকা খাওয়া বাবদ তেইশ টাকা পঞ্চান্ন পয়সা মিটিয়ে দিয়ে, ব্যাগ নিয়ে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বাঁ হাতে রাস্তা। একটু ওপরে উঠে রাস্তায় পড়লাম। তিনজনে লাইন দিয়ে এক কাঁধে ব্যাগ, এক কাঁধে ওয়াটার বটল্ নিয়ে, লাঠি হাতে আস্তে আস্তে হেঁটে চললাম। সামান্য কিছু রাস্তা হাঁটার পরই, রাস্তার ডানপাশে একটা ঝরনা পাওয়া গেল। মাধব ও দিলীপকে বললাম, রাস্তায় আর ঝরনা পাওয়া যাবে কী না জানি না। কাজেই এখানেই সকালের কাজটা সেরে ফেলার ব্যবস্থা করা যাক। রাস্তা একবারে ফাঁকা। তিনজনে সমস্ত জিনিসপত্র একপাশে রেখে, প্যান্ট, জুতো খুলে পছন্দ মতো তিন জায়গায় বসে পড়লাম। আহা কী সুবিধা, ভাবাই যায় না। আবার তৈরি হয়ে নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। কিন্তু মস্ত বড় একটা ভুল করলাম, ওয়াটার বটলগুলোয় জল না ভরে নিয়ে। অনেকটা রাস্তা পার হয়ে এসেও, সত্যিই কোন ঝরনার দেখা পেলাম না। অথচ আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল, ঝরনা নাও পাওয়া যেতে পারে। তার ওপর এরকম রাস্তার কথা স্বপ্নেও ভাবি নি। বোধহয় ৬৫-৭০ ডিগ্রী অ্যাংগেলে রাস্তা সোজা ওপর দিকে উঠেছে। মাঝে মাঝে স্থানীয় লোকেরা বেশ দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছে। আমাদের কিন্তু এর মধ্যেই দম বেরিয়ে যাবার উপক্রম। এখনও পর্যন্ত এত কষ্টকর রাস্তায় কখনও হাঁটতে হয় নি। স্থানীয় লোকেদের কাছে শুনেছিলাম, গাংগানী পর্যন্ত বাস রাস্তা হয়তো সামনের বছরেই তৈরি হয়ে যাবে, কিন্তু গাংগানী থেকে ডাবরানী বা ডাবরানী থেকে লঙ্কা পর্যন্ত রাস্তা কবে হবে, বলা খুব মুশকিল। ভুখি থেকে হেঁটে আসার সময় দেখলাম গাংগানী পর্যন্ত রাস্তা তৈরির কাজও হচ্ছে। নদীর ওপার দিয়েই রাস্তা ছিল। কিন্তু এখন আর ওপারের পুরাতন রাস্তা মেরামত করা সম্ভব নয়। নতুন করে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা সম্ভব কী না জানিনা। নদীর এপার দিয়ে নতুন রাস্তা তৈরি করলেও, যে রাস্তা দিয়ে আমরা এখন হাঁটছি, সেটা কোন কাজে আসবে বলে মনে হয় না। কারণ, একে এটা একবারে কাঁচা পাহাড়, তার ওপর এ যা রাস্তা, এ রাস্তায় জীপও উঠতে পারবে বলে মনে হয় না। যাহোক্, এক সময় আমাদের ওপরে ওঠার পালা শেষ হ’ল। এবার ঠিক আগের মতো ৬০-৬৫ ডিগ্রী অ্যাংগেলে, রাস্তা নীচে নামতে শুরু করলো। রাস্তার পাশ দিয়ে ওয়্যারলেস্ বা টেলিগ্রাফের তার গেছে। নীচে, অনেক নীচে ভয়ঙ্কর রূপিণী রূপালি গঙ্গা, আপন খেয়ালে নেচে নেচে বয়ে চলেছে। পায়ের আঙ্গুলের ওপর চাপ দিয়ে ব্রেক কষার মতো করে নীচে নামার গতি রোধ করে করে, আমরা এগিয়ে চললাম। নীচে নামার সময় আমার কোন কষ্ট হয় না, তাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। মাধবের আবার ঠিক উল্টো। ওপরে ওঠার সময় ওর বিশেষ কোন কষ্ট হয় না। কিন্তু এবার এই ভাবে নীচে নামতে, ওর বেশ কষ্ট হচ্ছে। এইভাবে একভাবে নীচে নামতে নামতে, আমরা একবারে নীচে, প্রায় গঙ্গার কাছাকাছি নেমে এসে দেখলাম, রাস্তা আবার ঐ আগের মতো একই ভাবে, ওপরে উঠতে শুরু করলো। কোথাও কোন গ্রাম, দোকান, এমন কী লোকজনও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে পাশ দিয়ে মালবোঝাই দু’একটা খচ্চর যাতয়াত করছে। হাঁটতে যে কী কষ্ট হচ্ছে বোঝাতে পারবো না। আমরা রাস্তার ধারে বিশ্রাম নিতে বসলাম।

মাধব জানালো, তার ভীষণ জল পিপাসা পেয়েছে। এগিয়ে গিয়ে ঝরনার অনেক খোঁজ করলাম, কিন্তু কোথাও কোন ঝরনা বা জলের সন্ধান করতে পারলাম না। গঙ্গার জল ঘোলাটে, তবু সে জলও যে একটু নিয়ে আসবো, তারও উপায় নেই। ওখানে নামা আমাদের কর্ম নয়। ওখানে নামার চেষ্টা করা সুইসাইডের নামান্তর। রাস্তার একপাশে পাথরে বসে তিনজনে আমসত্ব চুষে, লজেন্স্ খেয়ে, জল পিপাসা কমাতে ও বিশ্রাম নিতে লাগলাম। কিন্তু এর পরেও মাধব জানালো, একটু জল না পেলে, ওর পক্ষে আর এক পাও হাঁটা সম্ভব নয়। বললাম এখানে বসে থাকলেও তো জল পিপাসা কমবে না। কাজেই বাঁচতে গেলে কষ্ট হলেও এগিয়ে যেতে হবে। রাস্তায় জল পাওয়া গেলেও যেতে পারে, কিন্তু এখানে সে সম্ভাবনা মোটেই নেই। আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। মধ্যে মধ্যে জলের আওয়াজ কানে আসছে বলে মনে হচ্ছে। খুব আশা নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বুঝতে পারছি ভুল শুনেছিলাম। কী রাস্তারে বাবা, আট কিলোমিটার পথে একটাও ঝরনা বা জলের দেখা নেই। আমরা যেন এক হিমালয়ান ডেজার্টের ওপর দিয়ে হাঁটছি। মরীচিকা তো দেখার ভুল বলেই জানতাম, শোনার ভুলের মরীচিকাও হয় বলে তো কখনও শুনি নি। এক জায়গায় গঙ্গা দেখলাম বেশ চওড়া, এবং আমাদের হাওড়া-কলকাতার গঙ্গার থেকেও স্রোতোহীন। কী ব্যাপার বুঝলাম না। হয়তো এখানে গঙ্গায় বড় বড় পাথর পড়ে নেই বলে, স্রোতোহীন। রাস্তার পাশে কোথাও কোথাও, বড় বড় পাথরের গায়ে সাদা রঙ করে, আলকাতরা দিয়ে কত রাস্তা বাকি আছে লেখা আছে। এগুলোই এপথের মাইলস্টোন। এবার রাস্তার পাশে একটা ঝরনার দেখা মিললো। মনে হচ্ছে আমরা প্রায় এসে গেছি। আর ভালোও লাগছে না। এতবড় রাস্তার শুরুতে আর শেষে দু’টো ঝরনা, আর এই কষ্টকর রাস্তা। তবু ভুললে চলবে কেন-“সব ভালো যার শেষ ভালো”। মাধব তো ঝরনা দেখে প্রায় লাফিয়েই উঠলো। পারলে ছুটে গিয়ে সব জল খেয়ে নিতে চায়। ওকে ঝরনার জল খুব বেশি না খেয়ে, শুধু গলা ভেজাতে বললাম। যদিও বাড়ি থেকে আসার সময় ভেবে এসেছিলাম, কোথাও ঝরনার জল খাব না। প্রয়োজনে খেতে হলে জিওলিন মিশিয়ে খাব। কিন্তু বাস্তবে একটু পরিস্কার ভাবে জল তোলা যায়, এমন জল দেখলেই, আমরা দু’হাত ভরে জল নিয়ে পান করেছি। জিওলিনের কথা মনেও আসে নি। তবু মাধবের শরীরটা তো ভালো নয়, ওষুধ খেয়ে পথ চলছে। এখানে আমরাও অল্প অল্প জল খেলাম। জল ভর্তি কাঠি, খড়কুটো। এবার কষ্টের পরিমান অনেকটাই লাঘব হ’ল। একটু এগিয়ে একটা ব্রিজ দেখলাম গঙ্গার মাঝখানে কাত হয়ে পড়ে আছে। সম্ভবত বন্যার সময় ওটা জলের তোড়ে ভেঙ্গে পড়েছিল। গঙ্গা এখানে এখন এত চওড়া হয়ে গেছে যে, যে ব্রিজ আগে গঙ্গার ওপর এপার-ওপার করার জন্য ব্যবহৃত হ’ত, সেই ব্রিজ এখন নদীর মাঝখানে পড়ে আছে। ব্রিজের দু’দিকেই অনেকটা দুরে ডাঙ্গা। যাহোক্, রাস্তা এবার ভীষণ ভাবে নীচের দিকে নামতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে রাস্তা যেন রুপো দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। লাঠির ওপর ভর দিয়ে হাঁটলে কষ্ট অনেক কম হচ্ছে। পাথর ফেলা রাস্তা। এদিকে বোধহয় অভ্র থাকতে পারে। মনে হচ্ছে রাস্তা যেন অভ্রের পাত দিয়ে মোড়া। এতটা রাস্তার কোথাও একটু সূর্যের আলো পড়ে না। ফলে স্যাঁতস্যেঁতে, ভিজে ও বিপজ্জনক রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়। বড় বড় গাছের জন্যই কোথাও একটু সূর্যালোক পড়ে না। মাইলস্টোন অনুযায়ী, আর সামান্যই পথ বাকি আছে। অবশ্য যদি না এখানেও ত্রিযুগীনারায়ণের মতো রাস্তার মাপ হিসাব করা হয়ে থাকে। যতদুর দৃষ্টি যায়, কোথাও কিন্তু পাকা রাস্তা, বাস, দোকানপাট, বা লোকজন চোখে পড়ছে না। এতটা পথ আসলাম, একবারে লালাজীর দোকানের একটু ওপরে সামান্য রাস্তা হেঁটে একটা চায়ের দোকান ছাড়া, সত্যিই আর কোন দোকান নেই। এবার সামনে একটা ব্র্রিজ চোখে  পড়লো। গাংগানী থেকে গরমকুন্ড আসার জন্য যেমন পোর্টেবল্ ব্রিজ পার হতে হয়েছিল, সেরকমই একটা ব্রিজ। এই ব্রিজ পার হয়ে আমরা আবার গঙ্গার ওপারে, বাস রাস্তায় এসে উঠলাম। গাংগানী থেকে ডাবরানী, এই আট কিলোমিটার পথ, গঙ্গার ওপার দিয়ে হাঁটতে হয়। অর্থাৎ এই দু’টো জায়গার মধ্যে পুরাতন বাস রাস্তার অবস্থা গত বৎসরের ঘটনায় এমন হয় যে, বাস তো দুরের কথা, হেঁটেও যাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে এই নতুন রাস্তা দিয়েই হেঁটে আসতে হয়। আর সত্যিই এটা একেবারেই স্থানীয় লোকেদের হাঁটার পথই বটে। ব্রিজটা পার হয়ে, রাস্তা ধরে একটু এগিয়েই দেখলাম একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। লঙ্কা যাবে কী না জিজ্ঞাসা করায় উত্তর পেলাম, আরও এগিয়ে গেলে বাস পাওয়া যাবে। কথাটা শুনে মনে হ’ল আমরা লঙ্কা প্রায় পৌঁছেই গেছি।

        ON THE WAY TO DABRANI       ডাবরানী যাবার  পথে          ON THE WAY TO DABRANI (2)

ব্রিজটার কাছে একটা গাছের তলায় একটা চায়ের দোকান। ঐ দোকানে একজন সাধু গোছের লোককে দেখলাম। একে গতকাল গাংগানীতে দেখেছিলাম। গরমকুন্ডে রান্নাবান্না করতেও দেখেছিলাম। আর একটু এগিয়েই একটা আধা শহর দেখলাম। গোটা তিনেক বাস দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়িতে এখন সোয়া দশটা বাজে। কোন বাস যাবে জিজ্ঞাসা করে বাস নাম্বার জেনে নিয়ে, বাসে উঠে জায়গা দখল করলাম। এই প্রথম দেখলাম ড্রাইভারের একটু পিছনে, গ্রীলের পার্টিশন দিয়ে প্রথম শ্রেণী। পিছনে চারটে লম্বা রো। এগুলো দ্বিতীয় শ্রেণী। ভাড়া হয়তো কিছু কম। প্রথম শ্রেণীতে একটা লম্বা বড় সিট্, ও ড্রাইভারের পাশে দু’জনের বসার সিট্। নীচে এসে দেখলাম দু’পাশে কয়েকটা দোকান আছে। কিন্তু কোন খাবার দোকান দেখলাম না। সকাল থেকে এক কাপ চা পর্যন্ত পেটে পড়ে নি। কাল রাতে ছয়-সাত খানা কাঁচা রুটি খাওয়া বোধহয় ঠিক হয় নি। শরীরটায় খুব জুৎ নেই। এ রাস্তায় পেট খারাপ হওয়া খুব বিপজ্জনক। তার ওপর আবার এখন যাচ্ছি সব থেকে বিপদ সঙ্কুল স্থানে। লোকে বলে গোমুখী গেলে মানুষ নাকি আর ফিরে আসে না। ওখানে পৌঁছে ফিরে আসতে না পারলে দুঃখ নেই, কিন্তু ওখানে পৌঁছনোর আগেই কোন বিপদ ঘটলে, মৃত্যুটা বড়ই দুঃখজনক ও লজ্জাকর হবে। তাই ঠিক করলাম দুপুরে কিছু খাব না। একটু পকোড়া ও এক কাপ চা খেয়ে এসে, বাসে বসলাম। মনে মনে বেশ একটা আনন্দ অনুভব করছি। লঙ্কা যাবার বাস যখন পেয়ে গেছি, তখন গঙ্গোত্রী, গোমুখ পৌঁছেই গেছি বলা যায়। ক্রমে ক্রমে বেলা প্রায় বারটা বাজলো। পিছনের দ্বিতীয় শ্রেণীর সিটে সেই সাধু গোছের লোকটা এসে উঠেছে। আরও উঠেছে একজন গেরুয়া রঙের ধুতি পাঞ্জাবি পরা সাধু, তার একজন বাচ্চা শিষ্য ও বছর ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের একজন চেলা। মাধব ও দিলীপ ভাত রুটি যা পায়, খেতে গেল। আমি লম্বা সিটটায় চুপচাপ্ শুয়ে থাকলাম। পিছন থেকে গেরুয়াধারীর মাহাত্ম্য, তার নিজের মুখেই শুনছি। ভীষণ বিরক্ত লাগছে। নিজেকে সে মহাত্মা বলে সম্বোধন করছে। অপর সাধু গোছের লোকটা, যাকে আগে গাংগানীতেও দেখেছি, তার কথায় সায় দিচ্ছে বটে, তবে বেশ বোঝা যাচ্ছে, সে গেরুয়াধারীর একটা কথাও বিশ্বাস করছে না। শুয়ে শুয়েই শুনলাম, সাধু গোছের লোকটা গঙ্গোত্রী থেকে ফিরে যমুনোত্রী যাবে। আমি তার কাছে যমুনোত্রী সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়ে বুঝলাম, তার ঐ পথ সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। মাধব ও দিলীপ ফিরে এসেছে। ওরা ভাত, ডাল ও তরকারী খেয়ে এসেছে। ওরাও শুয়ে, বসে বিশ্রাম নিতে লাগলো। গেরুয়াধারীর কথার ফুলঝুড়ি যেন বেড়েছে। সে সাধু গোছের লোকটাকে বোঝাচ্ছে যে, সে জহরলাল নেহেরুকে বলেছিল যে, সে একটা অপদার্থ। তার দ্বারা দেশ চালানো সম্ভব নয়। শুনে শুনে আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। আমি ও দিলীপ তাকে একটু উস্কে দিতেই, সে জানালো যে, সে ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিল, “ইন্দিরা তোর দ্বারা দেশের কোন ভাল কাজ হবে না। তুই যা করছিস, তাতে তোর বিপদ হবে”। যা বুঝলাম, সে সুভাষ, গান্ধী, জহরলাল, সবাইকেই ভালোভাবে চিনতো, এবং সবার সাথেই “তুই তোকারি” সম্পর্ক ছিল। ভাবছিলাম, এবার কেনেডি, কার্টার বা ব্রেজনেভকে কী কী বলেছিল তার ফিরিস্তি দেবে। সে জানালো যে, সে একবার ধ্যানে বসে জানতে পারে যে, তার মা প্রায় মৃত্যু শয্যায়। তার মা’কে সাপে কেটেছে। ধ্যানে সে তার মা’কে বাঁচাবার জন্য দেবতাদের স্মরণ নেয়। মা বেঁচেছিল কী না জানবার আর আগ্রহ নেই। এই মুহুর্তে কখন বাস ছাড়বে, সেটা জানার আগ্রহ আমার অনেক বেশি। তবু মনে হ’ল ওর মা’কে সাপে না কেটে, যদি ওকে কাটতো, তাহলে ওর মা এবং আমরা, উভয়পক্ষই শান্তি পেতাম।

শুয়ে বসে কোমরে বাত ধরার উপক্রম। বাস থেকে নেমে খোঁজ নিতে গেলাম। এবার জানা গেল গতকাল কোন বাস লঙ্কা যায় নি। এখানে বাসের তেল ভুখি থেকে খচ্চরের পিঠে বয়ে আনতে হয়। একটা খচ্চর এক ব্যারেলও তেল আনে না। তার জন্য ভাড়া দিতে হয়, চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা। তাছাড়া উত্তরকাশী থেকে ভুখি পর্যন্ত তেল বয়ে আনতেও বাস খরচ অনেক লেগে যায়। কাজেই পঁচিশ-ত্রিশজন প্যাসেঞ্জার না হলে বাস ছাড়বে না। গতকালও এই একই কারণে কোন বাস ছাড়ে নি। একজন আবার বললো, গভর্নমেন্টের আদেশ অনুযায়ী, প্যাসেঞ্জার না হলেও, রোজ একটা অন্তত বাস ছাড়ার কথা। শুনে একটু আশার আলো দেখলাম। কোন কথাটা যে সত্যি আর কোন কথাটা যে মিথ্যে, বোঝার উপায় নেই। আরও শুনলাম লঙ্কা পর্যন্ত জীপ যায়। কিন্তু কোথাও কোন জীপের চিহ্ন দেখলাম না। আবার বাসে এসে বসলাম। একটু পরে লঙ্কা থেকে প্যাসেঞ্জার নিয়ে সত্যিই একটা জীপ এল। এবার জানা গেল অন্তত ছয়জন প্যাসেঞ্জার না হলে, জীপ যাবে না। ভাড়া মাথাপিছু কুড়ি টাকা। বাসে ভাড়া নেয় দশ টাকা মতো। ইতিমধ্যে বাসে একজন যুবক এসে উঠেছে, যাবে হরশীল। দেখে মনে হ’ল, সে এখানকার লোক নয়। প্যাসেঞ্জারের আশায় পথ চেয়ে বসে থাকা ছাড়া, আর কোন কাজও নেই। এবার আমার বেশ খিদে পাচ্ছে। মাধবকে নিয়ে গেলাম কিছু খাবারের সন্ধানে। ভাবলাম কিছু বিস্কুট আর চা খেয়ে নেব। কোন দোকানে বিস্কুট পেলাম না। কিন্তু সব দোকানেই অনেক রকম গায়ে মাখার সাবান আছে। এত সাবান এখানে কে মাখে জানিনা। অনেক নীচে সমতল এলাকায়, গোটাকতক মিলিটারি ক্যাম্প্। রাস্তার পাশে একটা কল থেকে অবিরাম জল পড়ে যাচ্ছে। শেষে একটা দোকানে বিস্কুটের প্যাকেট পাওয়া গেল। গ্লুকোজ বিস্কুট। প্যাকেটটা খুলতেই অর্ধেক বিস্কুট গুঁড়ো হয়ে পড়ে গেল। কত সালে এই প্যাকেটটা তৈরি হয়েছিল ভগবান জানেন। বাসের সেই মহাত্মা গেরুয়াধারী জানলেও জানতে পারে। উপায় নেই, তাই খেয়ে নিলাম।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s