গাঙ্গুলীবাবু (স্মৃতির পাতা থেকে) {লেখাটি সুপ্ত প্রতিভা-Supto Protibha , প্রতিলিপি, অক্ষর-Akshar , বাংলায় লিখুন , উইপোকার কলম ও বই পোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত}।

DSCN9723 - Copyস্কুলে ভূগোল পড়াতেন কালীপদ বাবু, কালীপদ গাঙ্গুলী। আমার জন্মের আগে থেকেই ওনার সাথে বাবার পদমপুকুর থাকা কালীন আলাপ ছিল। উনি বিভিন্ন ছাত্রের বিভিন্ন নাম রাখতেন, এবং সেইসব নাম উনি ঠিক মনেও রাখতেন। ছাত্রদের তিনি নিজের দেওয়া নাম ধরেই ডাকতেন। কত আন্তরিকতা, কত স্নেহ দিয়ে সেইসব নাম তিনি চয়ন করতেন, ভাবা যায় না। কারো নাম মোহন সিং, কারণ সে দস্যু মোহনের মতো বদমাস। কারো নাম অঙ্কন সিং, কারণ সে অঙ্কে খুব ভাল। এই রকম কেউ শান্ত সিং, কেউ অস্থির সিং, কেউ পালোয়ান সিং, ইত্যাদি ইত্যাদি। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি কিন্তু তাদের এইসব নামেই ডাকতেন। কখনও ভুল হতো না।

এই গাঙ্গুলীবাবু মাঝেমাঝেই পড়া ধরতেন। পড়া ধরার আগে তিনি ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলতেন, “আজ আমি পড়া ধরবো, যে যার ইষ্টদেবতা, পিতামাতার নাম গ্রহণ কর”। এরপর শুরু হতো পড়া ধরার পর্ব। পড়া না বলতে পারলে, তিনি সেই ছাত্রকে নিজের টেবিলের কাছে ডাকতেন। অপরাধীকে তাঁর টেবিলের ওপর কনুই এর কাছ থেকে হাত দু’টো রাখতে হতো। এরপর তিনি প্রশ্ন করতেন— “তুমি কার নাম গ্রহণ করসো”? ছাত্রটি কোন দেবদেবীর নাম বলার পর, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি বলতেন, “নীল ডাউন হও”। পড়া না পারা খুব কম ছাত্রই, এই নীল ডাউন হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে পারতো। এইভাবে বেশ কয়েকজন ছাত্র জড়ো হওয়ার পর, বেশীর ভাগ দিনই জয় গোপাল বা মামদোকে ডেকে, তাদের ক্ষৌণীশ বাগচীর গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হতো। ক্ষৌণীশ বাগচী স্কুলের জীববিদ্যার শিক্ষক, তিনি আমার জামাইবাবু। স্কুলের সমস্ত ছাত্ররা তাঁকে যমের মতো ভয় করতো।

গাঙ্গুলীবাবুর পড়া ধরার হাত থেকে আমিও মুক্তি পাই নি। আর বিষয়টা যখন ভূগোল, তখন আমি পড়া বলতে পারবো, আশা করাও অন্যায়। দু’দিনের কথা না বললে, গাঙ্গুলী বাবুকে ঠিক চেনা যাবে না। একদিন তিনি আমাকে পড়া ধরে বসলেন, এবং পড়া ধরার আগে অন্যান্য দিনের মতোই যথারীতি—“যে যার ইষ্টদেবতা, পিতামাতার নাম গ্রহণ কর”, অনেকটা আদালতে যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বই মিথ্যা বলিব না গোছের কায়দায় আওড়ালেন। আমার প্রশ্ন শোনার কোন আগ্রহ ছিল না। কারণ আমি যদি ভূগোল পড়া বলতে পারি, তাহলে জন্মান্ধ কোন বাঙালি ব্যক্তিও, স্বচ্ছন্দে উর্দু খবরের কাগজ পড়তে পারবে। যথারীতি প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায়, তাঁর টেবিলের কাছে গিয়ে, টেবিলের ওপর দু’হাত রেখে দাঁড়াতে হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—“তুমি কার নাম গ্রহণ করসো”? আমি ভাবলাম মারা তো পড়বোই, তাহলে আর তার আগে দুঃখ করে কী হবে? বললাম, “বাবা গণেশ, স্যার”। তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “বইসা পড়”। আমি আর এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে, নিজের জায়গায় গিয়ে বইসা পড়লাম।

আর একদিন, সেদিন ক্লাশে এসেই তিনি হঠাৎ ঘোষণা করলেন—“আজ আমি পুরানো পড়া ধরবো”। শুনে আমরা সবাই আঁতকে উঠলাম। পুরানো কেন অতি পুরানো পড়া ধরুন না, কে আপত্তি করেছে? কিন্তু একথা গতকাল বলতে কী অসুবিধা ছিল? আজ তাহলে  স্কুলেই আসতাম না। আমি তো প্রমাদ গুনতে শুরু করলাম। টাটকা, নতুন পড়াই বলতে পারিনা। পুরানো পড়া বলা কী আমার কর্ম? আমি এইসব ঝড়ঝাপটায় প্রথম শহিদ হওয়ার হাত থেকে বাঁচবার জন্য, তৃতীয় বেঞ্চে বসতাম। তাড়াতাড়ি ভূগোল বইটা দুই হাঁটুর কাছে লুকিয়ে খুলে বসলাম। আমার পাশের ছেলেরাও যে যার বই একই কায়দায় খুলে বসেছে। গাঙ্গুলীবাবু এক একজনকে এক এক চ্যাপ্টার থেকে প্রশ্ন করছেন, এবং পড়া বলতে না পারলেই, নীল ডাউন করিয়ে দিচ্ছেন। জানিনা আমার ইষ্ট দেবতা আজ আমায়, তাঁর হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন কী না। একসময় তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন— “বল রায়, বল, আফ্রিকার উৎপন্ন সামগ্রী কী”?

আফ্রিকা দেশটা কোথায়, তাই ভালো করে জানলাম না, তো তার উৎপন্ন সামগ্রী। আমাকে উঠে দাঁড়াতে হওয়ায়, বইটা দেখার আর কোন সুযোগ নেই। পাশের ছেলেটাকে ফিসফিস্ করে বললাম, চটপট্ বই দেখে প্রম্পট্ করে যেতে। কিন্তু তার আফ্রিকার পাতা খুঁজে বার করতে যা সময় লাগলো, ততক্ষণে আফ্রিকা গিয়ে উৎপন্ন সামগ্রী কী, জেনে আসা যেত। আর সময় নেওয়া যাবে না, এরপর নীল ডাউন হতে হবে। ফলে আমি খুব দ্রুত পড়া বলতে শুরু করলাম।

আফ্রিকায় ধান, গম, ভূট্টা ইত্যাদি প্রচুর উৎপন্ন হয়। এছাড়া আঙ্গুর, আপেল, পটল, বাদাম, পাট ও বাজরা কিছুকিছু হয়। আলু, বেগুন, লঙ্কা, ফলসা, খেজুর যে একদম উৎপন্ন হয় না, একথা বললে ভুল বলা হবে। এইভাবে যখন যে ফল বা সবজির নাম মনে আসছে, অতি দ্রুত তা কোথাও কোথাও বা কিছু কিছু উৎপন্ন হয় বলে যাচ্ছি। হঠাৎ মনে হলো, কোথায় যেন পড়েছিলাম, ভূমধ্য সাগরীয় জলবায়ুতে অলিভ ভালো হয়। এরকম একটা জ্ঞানগর্ভ কথা না বললেই নয়। তাই সঙ্ঙ্গে সঙ্গে বলে দিলাম, “যদিও ভূমধ্য সাগরীয় জলবায়ু ছাড়া অলিভ হয় না, তবু এখানে কিছু কিছু অলিভ উৎপন্ন হয়। হয়তো আফ্রিকাটা পুরো ভূমধ্য সাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে অবস্থিত, হয়তো পৃথিবীর অর্ধেক অলিভ আফ্রিকাতেই উৎপন্ন হয়, কিন্তু তা আমার জানাও নেই, জানবার বা ভাববার সময়ও নেই। কিন্তু আশ্চর্য হলাম তখন, যখন শুনলাম গাঙ্গলীবাবু বললেন— “বইসা পড়”।

গাঙ্গুলীবাবু সম্বন্ধে শেষ ঘটনাটা বলে, ওনার প্রসঙ্গ শেষ করবো। স্কুল ছাড়ার দশ-বার বছর পরের ঘটনা। উনি আমাদের অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়িয়েছিলেন, অর্থাৎ সেই হিসাবে প্রায় পনের বৎসর পরে, আমি একদিন শিবপুরে আমার অফিসের কাউন্টারে কাজ করছি। অনেক কাস্টোমারের মতো গাঙ্গুলীবাবু কাউন্টারের সামনে এসে, তাঁর পাস্-বই আপ-টু-ডেট্ করতে দিলেন। মাথার চুল আরও উঠে গেছে, প্রায় নেই বললেই চলে। চশমার কাচ আরও মোটা হয়ে, কাচের গ্লাশের তলার কাচের মতো হয়েছে। আমি জানি উনি আমাকে চিনতে পারবেন না। পরিচয় দিলে পুরাতন ছাত্র হিসাবে বুঝলেও, নির্দিষ্ট ভাবে কোন্ ছাত্র বোঝা তাঁর পক্ষে বোঝা কখনই সম্ভব নয়। কাউন্টারে যথেষ্ট ভিড় থাকায়, আমি আর পুরানো প্রসঙ্গ না তুলে, তাঁর পাস-বইটা আপ্-টু-ডেট্ করে দিলাম। উনি পাস্-বইটা চশমার কাছে নিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন, তারপর হঠাৎ বললেন, “তুমি মাষ্টারমশাই রায় বাবুর ছেলে না? বাবা ভালো আছেন”? আমি লজ্জায় মরে যাই আর কী। ক্ষৌণীশদার পরিচয়েও নয়, তিনি আমার বাবার পরিচয়ে আমাকে চিনতে পারার প্রমাণ দিয়ে, আমার সাথে কথা বললেন। কী ভাবে এতদিন পরে, আমার চেহারার এত পরিবর্তনের পরেও, উনি আমাকে চিনতে পারলেন ভেবে অবাক হয়ে গেলাম। আমি আর কী করি, বাধ্য হয়ে বললাম, “আপনি আমাকে এত বছর পরেও চিনতে পারলেন স্যার? আমার পরিচয় দিলে আপনি আমাকে চিনতে পারবেন কী না ভেবে, আমি আর আমার পরিচয় দিইনি”। তিনি শুধু বললেন, “আমি কী তোদের ভুলতে পারি? আমি কাউকেই ভুলিনি রে”।

এ যুগের রাজনীতি করা শিক্ষকদের দেখলে মনে হয়, সেইসব পিতৃতুল্য সোনার গাঙ্গুলীবাবুরা কোথায় হারিয়ে গেলেন?

 

সুবীর কুমার রায়।

১৯-০৪-২০১৬

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s