সংস্কৃত (স্মৃতির পাতা থেকে) {লেখাটি সুপ্ত প্রতিভা- Supto Protibha ও প্রতিলিপি পত্রিকায় প্রকাশিত।}

DSCN9767এক সময় বৎসরিক পরীক্ষা এসে গেল। সংস্কৃত পরীক্ষায় পাশ করাবার একটা ব্যবস্থা করার জন্য মেনোকে ধরলাম, মেনো পন্ডিত স্যারের ভাইপো, আমার সাথেই পড়ে। আমি খুব ভাল করে জানি, সংস্কৃতে পাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। পড়লেও নয়, না পড়লেও নয়। কাজেই সংস্কৃতর পিছনে অযথা সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না। কিন্তু এটাতো মানতেই হবে যে, দেশে এখনও কিছু ভাল লোক আছে বলেই, দেশটা এখনও সুষ্ঠ ভাবে চলছে। আমার দুরাবস্থার কথা শুনে, এরকমই একজন সহৃদয় উচু শ্রেণীর ছাত্র জিজ্ঞাসা করলো— “শব্দরূপ, ধাতুরূপ পড়া আছে? লিখতে পারবি”? লতা, মুনি, মতি, ইত্যাদি কয়েকটা মুখস্থ করাই ছিল, বললাম এগুলো জানা আছে। বলেই মুখস্থ বলতে শুরু করলাম— মতি-মতী-মতয়ঃ, মতিম্-মতী-মতিন, মত্যা—। সে আমাকে আর এগোতে না দিয়ে বললো, “বাঃ, চমৎকার তৈরি হয়েছে, এতেই চলবে। এক কাজ করবি, তুই খাতার প্রথমেই শব্দরূপ, ধাতুরূপ লিখবি, তারপরে যা পারবি লিখে যাবি”। বললাম, “আর তো কিছুই পারবো বলে মনে হয় না”। সে বললো, “ঠিক আছে, পারলে লিখবি, না পারলে আন্দাজে যা পারবি, লিখে যাবি, তাতে কিছু আসবে যাবে না। তবে হ্যাঁ, অনেক পাতা ধরে লিখবি। পারলে কাগজ নিবি, যাতে তোর খাতা বেশ মোটা হয়। শেষে আবার সেই শব্দরূপ, ধাতুরূপ লিখবি। মোটকথা দু’টো শব্দরূপ, ধাতুরূপের মধ্যে যেন, বেশ কিছু লেখা পাতা থাকে। ক্লিয়ার? দেখবি পাশ করে গেছিস”।

আন্দাজে সংস্কৃত খাতায় পাতার পর পাতা কী লিখবো ভেবে দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “আন্দাজে এত কী লিখবো, ধরা পড়ে যাব না তো”? সে খুব তাচ্ছিল্য সহকারে বললো—“ফুঃ, নারে বাবা না। সাপ, ব্যাঙ যা মনে আসে লিখে যাবি। পন্ডিত স্যার পঞ্চাশটা খাতায় পঞ্চাশবার শব্দরূপ, ধাতুরূপ দেখবেন, কাজেই পঞ্চাশের জায়গায় একান্নবার দেখলেও ধরতে পারবেন না। চুয়ান্ন, পঞ্চান্নবার দেখলেও নয়”। যাহা ঊনিশ, তাহাই বিশ জানতাম, এখন জানলাম যাহা পঞ্চাশ, তাহাই একান্ন। সত্যি জানার কোন শেষ নাই।

পরীক্ষার খাতায় ছোট ছোট বাক্য সংস্কৃতে অনুবাদ, ছেড়ে দিতে ভীষণ গায়ে লাগছিল, কষ্টও কম হচ্ছিল না। এক একটায় পাঁচ নম্বর করে আছে। কথা মতো আন্দাজে আন্দাজে অনুবাদ করে দু’-তিনটে লিখে হঠাৎ দেখি, শেখ আলমগীর বাইরে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টার পরে আমিও বাথরুমে যাবার সুযোগ পেলাম। ওকে জিজ্ঞাসা করার সুযোগ পেয়ে ভাবলাম, এই অনুবাদ থেকে আমার পঁচিশ নম্বর পাওয়া আর কে আটকায়? প্রয়োজনীয় বাকি নম্বর শব্দরূপ, ধাতুরূপ থেকে উঠে আসবে, কাজেই দু’বার করে একই প্রশ্নের উত্তর লেখার ঝুঁকি আর নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

আলমগীর প্রথমেই সাবধান করে দিয়ে বললো, “দু’টো বলছি, মনে করে নিয়ে গিয়ে লিখে দে। সবক’টা মনে রাখতে পারবিনা। সত্যি এই এক ছেলে। সমস্ত বিষয়েই ও সমান পারদর্শী। বরাবর প্রথম হয়। শুধু প্রথমই হয় না, সমস্ত বিষয়েই প্রথম হয়। কিন্তু লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু কথাটাতো আর এমনি আসেনি। জেদ করে সবক’টা শুনে, মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে পরীক্ষার হলে ফিরে গিয়ে বুঝলাম, “দাদখানি ডাল, মুসুরের চাল” হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে আবার সেই পুরানো পরামর্শ মতো পাতার পর পাতা হাবিজাবি লিখে, পরামর্শ দাতার কথা মতো, আবার শব্দরূপ ও ধাতুরূপ লিখে এলাম। যতদুর মনে পড়ে সংস্কৃত পরীক্ষায় সেবার আটচল্লিশ পেয়েছিলাম। অর্থাৎ টোটকায় কাজ হয়েছিল।

সুবীর কুমার রায়।

১৯-০৪-২০১৬

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s