শৈশব-১ (স্মৃতির পাতা থেকে) {লেখাটি সুপ্ত প্রতিভা- Supto Protibha , Pratilipi Bengali ও বাংলায় লিখুন পত্রিকায় প্রকাশিত}

SRINAGAR (3)শুরু হ’ল প্রথম স্কুল জীবন । কিন্তু বিধাতা বোধহয় আর সকলের মতো, আমার নিয়মিত স্কুল যাওয়ার ইচ্ছা, ভাল চোখে দেখলেন না। তাই স্কুলে যাবার প্রথম শুভ দিনটাই, কী কারণে যেন স্কুল কামাই হ’ল। ফলে সারা জীবন স্কুল, কলেজ পালানো, আমার পিছন ছাড়লো না। মনে পড়ে হাতে বই, স্লেট্, পেনশিল ও একটা চটের আসন নিয়ে স্কুলে যেতাম। মাটির ঘরে খড়ের ছাউনি, মাটির মেঝেতে আসন পেতে বসা। জানিনা ঐ স্কুল বাড়ি দেখেই, “আমার মাটির ঘরে বাঁশের খুঁটি মা, তাও পারি না খড় জোটাতে” লেখা হয়েছিল কী না। তবে বৃষ্টিতে খড় ভেদ করে, ঘরে জল যথেষ্টই পড়তো।

আজ যেমন ছোট ছোট পরিবারে, ছোট বাচ্চাদের হাতেও মা’-বাবাকে টাকা পয়সা দিতে, বা সাধ্যের বাইরেও ভালো ভালো টিফিন দিতে দেখি, আমাদের সময় সে চল্ ছিল না। আমার বাড়িতে তো ছিলই না। কাছেই স্কুল হওয়ায়, টিফিনের সময় বাড়ি এসে টিফিন খাওয়ার নির্দেশ ছিল। স্কুলের পাশেই একটা ছোট্ট দোকানে ডালমুট, কোকো লজেন্স্, নারকেল লজেন্স্, লাল তুলো ইত্যাদি, পৃথিবীর সব শ্রেষ্ঠ খাবার বিক্রি হ’ত। কিছু কিছু ছেলেমেয়ে, সেসব অমৃত কিনে খেতও। আমার ভাগ্যে সে সুযোগ, কোন দিন জুটতো না। প্রতিদিন লোলুপ দৃষ্টিতে সে সব দৃশ্য দেখে, বাড়ির পথ ধরতাম। বাড়ি এসে রুটি তরকারী, বা ঐ জাতীয় কোন খাবার, অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেতে হ’ত। টিফিন খেয়ে আবার স্কুলের পথ ধরা। তবে ঐ অল্প সময়ের মধ্যেও, ভালো কিছু লোভনীয় খাবারের খোঁজে, এ কৌটো ও কৌটো খুলে খুলে দেখতাম। সবকিছু আজ আর মনে পড়ে না, তবে দু’একটা ঘটনার কথা বলতে খুব ইচ্ছা করছে।

একদিন টিফিনের সময় বাড়ি এসে দেখলাম, রান্নাঘরে ঝুড়িচাপা দেওয়া কী একটা রয়েছে। সুযোগ বুঝে ঝুড়িটা একটু ফাঁক করে হাত ঢুকিয়ে, নরম মতো কিছুর স্পর্শ পেলাম। কোনদিকে না তাকিয়ে, কোন কিছু না ভেবে, খানিকটা নিয়ে মুখে পুরেই, থু থু করে ফেলে দিলাম। আসলে ঝুড়ির নীচে খোলা ছাড়ানো কুচো চিংড়ির দল, হলুদ মেখে কড়ার গরম তেলে স্নান করার অপেক্ষায় ছিল।

আর একদিন স্কুল থেকে টিফিনের সময় এসে প্রথম কৌটোটা খুলেই, অমৃতের সন্ধান পেলাম। অন্যান্য দিন এ কৌট ও কৌট খুলে ডাল, সরষে, তেজপাতা ইত্যাদি দেখতে দেখতেই, মা টিফিন খেতে দিয়ে দিতেন, এবং তারপরেই স্কুলে যাবার পালা। আজ কার মুখ দেখে উঠেছি জানিনা, প্রথম কৌটোতেই অমৃত। আমার অতি প্রিয়, মিল্ক পাউডার। ঝপ্ করে মুঠো করে তুলেই মুখে পুরে দিলাম। গোটা মুখ জ্বালা করে গরম হয়ে গেল। ঘরের মধ্যেই থুথু ফেলে, কষ্টের হাত থেকে বাঁচবার চেষ্টা করলাম। মা এসে পিঠে দু’ঘা বসিয়ে মুখ ধুয়ে দিয়ে, জল খেতে বললেন। ওটা মিল্ক পাউডার ছিল না, ছিল কাপড় কাচার সোডা।

সেদিন স্কুলে যাবার সময় শুনে গেছি তালের বড়া হবে। তালের বড়ায় নন্দর আগ্রহ থাকলেও, আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, কারণ তাল আমি খাই না। টিফিনে বাড়ি এসে মিটসেফের ডালা খুলেই দেখি ছ’ছটা কলা। একটা কলা খেয়ে বেশ ভালো লাগলো। খোলাটা পকেটে রেখে, আর একটা চটপট্ খোলা ছাড়িয়ে মেরে দিলাম। খোলা পকেটে রেখে, ভালো ছেলের মতো টিফিন খেয়ে স্কুলে ফিরে যাবার আগে হঠাৎ মনে হ’ল, আমি স্কুল থেকে টিফিনে আসার পর কলা উধাও হলে, সকলের আমাকেই সন্দেহ হবে। তার থেকে সব ক’টা কলা খেয়ে নিলে, কলা ছিল কী না কেউ বুঝতেই পারবে না। সেই মতো বাকি চারটে কলা সযত্নে পকেটস্থ করে, স্কুলে যাবার পথেই শেষ করে দিলাম। কিন্তু বাড়ির সবাই আমার মতো চতুর না হওয়ায়, সহজেই ধরা পড়ে গেলাম।

মিটসেফের বেশ খানিকটা ওপরে, একটা লম্বা কাঠের তাক ছিল। সেই তাকে বেশ বড় বড় তিন-চারটে কাচের বয়মে, মধু রাখা থাকতো। মধু খাওয়া ভালো, খেতেও ভালো, এবং মধু খেলে সর্দিকাশির ধাত হয় না, এই ধারণায় বাবা মধু কিনে ওখানে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। একদিন স্কুল থেকে টিফিনের সময় এসে, মিটসেফের ওপরে উঠে মধুর বয়ম পাড়তে গিয়ে বুঝলাম, ওখানে আমার নাগাল পাওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। ওখানে হাত পাওয়ার জন্য আমাকে, আরও অন্তত পাঁচ-সাত বছর অপেক্ষা করতে হবে। মিটসেফের ওপরে তেলের বড় বড় টিনে, যেসব টিনে এখন ট্রেনে ঝালমুড়ি বিক্রি করে, চাল, মুড়ি, ইত্যাদি রাখা হ’ত। টিনের ওপরে উঠে, বুড়ো আঙ্গুলের ওপর ভর দিয়ে উচু হয়ে দাঁড়িয়ে, কোন মতে বয়মের নাগাল পেলাম। টলমল পায়ে একটা বয়ম থেকে চুমুক দিয়ে মধু খেতে গিয়ে, গোটা জামা প্যান্ট বেয়ে মধু পড়তে শুরু করলো। গায়ে হাতেও কম মধু মাখামাখি হ’ল না। আজও আমার দেহের চামড়া বেশ ভাল, হয়তো সেদিনের সেই মধুস্নান করারই সুফল।

সুবীর কুমার রায়।

০৫-০৪-২০১৬

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s