ভারতীয় কৈলাস মণিমহেশ {লেখাটি পর্যটকের ডায়েরি (দ্বিতীয় সংখ্যা) তে প্রকাশিত }

DSCN9767 কৈলাস দেখার সাধ আমার বহুদিনের, কিন্তু কৈলাসের অধিকার আমরা অনেক বছর আগে, সম্ভবত বাষট্টির চীন-ভারত যুদ্ধের পর হারিয়েছি। আজ কৈলাস দর্শন সহজলভ্য না হলেও সম্ভব, কিন্তু বছর দু-তিন আগেও কৈলাস-মানস সরোবর দেখার ইচ্ছাকে স্বপ্নের পর্যায়েই ফেলা হ’ত। গত প্রায় কুড়ি বৎসর চীন অধিকৃত কৈলাস যাবার পথ পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

তাই আমরা তিনজন, আমি, দিলীপ ও অমল, কৈলাসের বিকল্প হিসাবে, হিন্দুতীর্থ মণিমহেশকেই বেছে নিয়েছিলাম।  আসল কৈলাস দেখার সৌভাগ্য যখন হ’ল না, তখন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে, ভারতীয় কৈলাস মণিমহেশকেই বেছে নিতে হয়েছিল। কিন্তু আসল বা খাঁটিরও তো একটা বিকল্প আছে। পাথরের গুণাগুণে যাঁরা বিশ্বাসী, তাঁরা মূল্যবান হীরা, গোমেদ, পান্না বা নীলার আকাশছোঁয়া দামে ভেঙ্গে না পড়ে, বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজেন কমদামী পাথর বা বিভিন্ন গাছগাছড়ায়। তাঁরা মনে করেন এতে কাজ হয়তো কিছু কম পাওয়া যায়, কিন্তু নেই মামার থেকে কানা মামা ভালো। তাই সব হারানোর থেকে এর ব্যবহারে অল্প কিছু পাওয়াও লাভজনক বইকি।

সালটা ১৯৮০, মাসটা  সেপ্টেম্বরের প্রথম, আমরা হিমাচল প্রদেশের চাম্বায় এসে হাজির হলাম। উদ্দেশ্য, মণিমহেশ দর্শন। অন্যান্য বারের মতোই  সঙ্গে  তাঁবু  বা  অন্য কোন সরঞ্জাম বিহীন যাত্রা। শুনেছি এপথে সাধারণ কোন টুরিষ্ট যায় না। জন্মাষ্টমী থেকে রাধাষ্টমী, এই সময়টার মধ্যে সারা দেশ থেকে অসংখ্য পূণ্যার্থী এই পথে যায়, মণিমহেশে মানত করে ত্রিশুল পুঁতে দিয়ে আসার জন্য। তারা রাতে রাস্তাতেই থাকে, ভেড়ার মাংস পুড়িয়ে খায়। আমরাও নির্দিষ্ট সময়েই এসেছি, তাই আমাদের এই পথে যাবার জন্য একটু সাহায্য করার অনুরোধে, চাম্বায় অবস্থিত হিমাচল টুরিজম ও পি.ডাব্লু.ডি. আমাদের পরিস্কার জানিয়ে দিল, মণিমহেশের পথে কোন থাকার জায়গা বা টেন্ট্ পাওয়া যাবে না, এমনকী তাঁবুর পরিবর্ত হিসাবে পলিথিন শীট পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব নয়। মণিমহেশ যাত্রীরা পথে রাতে কোথায় আশ্রয় নেয় জানতে চাওয়ায়,  পি.ডাব্লু.ডি.-এর এক অফিসার সরাসরি জানিয়ে দিলেন, “রাস্তায় কিছু পাওয়া যাবে না। থাকার ব্যবস্থাও নেই। তাঁবু ও খাবার সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে”। আমরা তাঁকে এই ব্যবস্থাটা করে দিতে অনুরোধ করায় তিনি জানালেন যে  “তাঁদের কোন তাঁবু নেই, ঐ রাস্তায় তাঁদের কোন কাজও হচ্ছে না, কাজেই রাস্তায় তাঁদের ডিপার্টমেন্টের কোন তাঁবু পাওয়ার আশাও নেই”। চাম্বায় কোথায় তাঁবু ভাড়া পাওয়া যাবে প্রশ্ন করায় তিনি জানালেন— “চাম্বায় তাঁবু ভাড়া পাওয়া যায় না”। আমরা হতাশ হয়ে প্রশ্ন করলাম “তাহলে ওখানে লোকে যায় কিভাবে”? উনি জানালেন, “সাধারণ মানুষ ওখানে খুব একটা যায় না। ওখানে যে মেলা হয়, তাতে শুধু পাহাড়ি মানুষেরই ভিড় হয় এবং তারা খোলা আকাশের নীচেই রাত কাটায়।

আমার দুই সঙ্গী এই উপাদেও সংবাদটি পেয়ে একটু মুষড়ে পড়লেও আমি কাউন্টারের ভদ্রলোকটিকে জানালাম, “আমরা মণিমহেশ যাব বলে যখন এতটা পথ এসেছি, তখন আমরা যাবই। আপনি সাহায্য করলে তো যাবই, না করলেও যাব”। ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ঐ পথে হিমালয়ান বিয়ারের ভীষণ উৎপাত। রাস্তায় ভাল্লুক দেখলে আড়ালে চলে যাবেন। পাথর ছুঁড়ে বা অন্য কোনভাবে তাড়াতে যাবেন না। এইপথে অনেকেই ভাল্লুকের আক্রমনে চোখ নাক হারিয়েছে, রাস্তায় হয়তো দেখা হলেও হতে পারে”। খুব ভালো খবর, আমরা আর কথা না বাড়িয়ে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে এগিয়ে গেলাম। পিছন থেকে ভদ্রলোকের সাবধান বাণী শুনলাম—“সাবধানে যাবেন, তবে এইভাবে না গেলেই বোধহয় ভালো করতেন”।

অগত্যা নিজেদের সঙ্গে আনা পলিথিন শীট সম্বল করেই মণিমহেশ যাওয়া মনস্থির করে, পরদিন সকালে চাম্বা থেকে প্রায় আটচল্লিশ কিলোমিটার দুরে ‘খাড়ামুখ’ এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। যাবার আগে ভ্রমণ সংক্রান্ত বইতে মণিমহেশের মাহাত্ম্য, ও ভারমোরে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের কর্মী, শান্তি রঞ্জন রায় সম্বন্ধে অনেক তথ্য, অনেক গল্প, পড়ে যাবার সুযোগ হয়েছিল। জেনেছিলাম শান্তিবাবু মণিমহেশ যাত্রীদের নানাভাবে সাহায্য করে থাকেন। যাবার পথে চাম্বাতেই কয়েকজন মণিমহেশ ফেরত অভিযাত্রীর কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মণিমহেশের পথে এই মুহুর্তে আর কোন যাত্রী নেই। শান্তিবাবুর ডেরার সন্ধানও এদের কাছেই পাওয়া গেল, তাঁকে ভারমোরের স্টুডিও কৈলাসে পাওয়া যাবে। সম্ভবত তিনি কাজের ফাঁকে স্টুডিওটিও চালান।

বাসে শুধু স্থানীয় মানুষের ভিড়, কোন পর্যটক দেখলাম না বাসের টিকিট আগের দিন কেটে রাখায়, জানালার ধারে বসার সুযোগ পেয়েছি বাসের ছাদে সঙ্গে নিয়ে আসা ছোট একটা হোল্ডঅল তিনটি কম্বল ইরাবতী নদীর পাড় ধরে সরু রাস্তা এঁকেবেঁকে বাস একসময়খাড়ামুখএসে  পৌঁছলো ছোট্ট জায়গা, লোকবসতিও খুব একটা বেশি নয় পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ভুডর নালা এই ভুডর নালার ওপর একটা ছোট্ট ব্রিজ ব্রিজের ওপার থেকে আবার বাস জীপ চলাচলের রাস্তা রাস্তা গিয়েছে ভারতের সুইৎজারল্যান্ড নামে খ্যাতভারমোরপর্যন্ত  চা খেয়ে  ব্রিজের ওপারে গিয়ে দাঁড়ালাম জানা গেল আগে এই রাস্তায় শুধু জীপ যাতায়াত করতো, তাও আবার পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম এখন বাস যাতায়াত করে, সংখ্যায় যদিও গোটা দুয়েক রাস্তার ওপর থেকে বহু নীচের ভুডর নালার রূপ বড় ভয়ঙ্কর একসময় অপেক্ষার সমাপ্তি ঘোষণা করে কাঙ্খিত বাস এসে উপস্থিত শুনলাম এখান থেকে ভারমোরের দুরত্ব মাত্র চোদ্দ কিলোমিটার মতো, ভিড়ও খুব একটা হয় বলে মনে না আরও কিছু পরে  সামান্য কিছু যাত্রী নিয়ে বাস ছেড়ে দিল রাস্তা আরও খারাপ, পাকা রাস্তার থেকে কাঁচা ভাঙ্গা রাস্তাই বেশি পথের শোভায় নতুনত্বের কোন ছোঁয়া নেই বললেই চলে প্রায় সন্ধ্যা নাগাদ বাস এসে ভারমোরে পৌঁছল মণিমহেশে কোন মন্দির নেই, মণিমহেশ মন্দিরটি আসলে এই ভারমোরে অবস্থিত এখান থেকে মেলার সময় ছড়ি নিয়ে যাওয়া হয় মণিমহেশে এর সত্যাসত্য আমার জানা নেই, জানার আগ্রহও বিশেষ নেই এই মন্দিরটি পাশে নরসিংহ দেবের মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আর্কিয়লজি ডিপার্টমেন্টের কর্মী, শান্তিবাবুর উপর ন্যস্ত দুটি মন্দিরেই পূর্ব ভারতের গঠনশৈলী লক্ষ করা যায়

ছোট্ট জায়গা, বাস থেকে নেমে স্টুডিও কৈলাস খুঁজে নিতে অসুবিধা হবার কথা নয়। ডান হাতে ছোট্ট দোকান, কিন্তু দোকানের মালিক দোকানে নেই। বাম দিকে একটা ছোট মন্দির বা আশ্রম জাতীয় কিছু, সেখানে কয়েকজন দাঁড়িয়ে ও বসে। তাদের একজনকে দেখে মনে হ’ল বাঙালি, কাজেই শান্তিবাবু হলেও হতে পারেন। তাঁদের দিকে হাত তুলে শান্তিদা বলে দু’বার চিৎকার করতেই একজন ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, যদি এই ভদ্রলোক শান্তিদা হন, তাহলে তো মিটেই গেল, আর না হলে ওঁর কাছেই শান্তিদার খোঁজ নেওয়া যাবে। যদিও জানিনা শান্তিদা এরকম এক পান্ডব বর্জিত জায়গায় এখনও কর্মরত আছেন কী না।

ভদ্রলোক আমাদের কাছে এসে প্রথমেই বললেন— “আপনাদের তো ঠিক চিনলাম না”? অর্থাৎ ইনিই ‘দি গ্রেট শান্তিদা’। আমি একমুহুর্ত সময়  নষ্ট না করে বললাম, “আমরা গত বছরের আগের বছর এসেছিলাম, মনে নেই”? উত্তরে তিনি শুধু বললেন— “প্রতি বছর এত লোকের সাথে আলাপ হয়  যে, সবাইকে মনে রাখা যায় না”। আমাদের সাথে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের সুবাদেই বোধহয়, তিনি আমাদের তিনজনকে তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন।  অনেক কথা হ’ল। চা তৈরি করে খাওয়ালেন, নিজের জীবনের অনেক কথা বললেন। ছোটবেলায় তিনি তাঁর বাবার সাথে ঝগড়া করে, বাঁকুড়া না পুরুলিয়ার বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে উড়িষ্যার এক ভদ্রলোকের কৃপায় লেখাপড়া শিখে, বড় হয়ে প্রত্নতাত্বিক বিভাগে চাকরি পান। তাঁর একটি ছোট্ট মেয়ে আছে, তার নাম তিনি সন্তোষি রেখেছেন। এখন কোন কোন বৎসর শীতের সময় বাড়ি গেলে, রাতে খোলা ছাদে শোয়ায় তাঁর বাবা ছেলের ঠান্ডা লাগবে, এই ভয়ে সারা রাত জেগে থাকেন। তিনি কিছুতেই তাঁর বাবাকে বোঝাতে পারেন না, যে ঘরে শুলে তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসে, সারা রাত না ঘুমিয়ে জেগে কাটাতে হয়। এইসব অনেক গল্প করে তিনি আমাদের তিনজনকে একটি কাঠের তৈরি ঘরে রাতে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। ঘরের জন্য কোন ভাড়া লাগে না, পাশে একটি আশ্রম আছে সেখানে কিছু দিয়ে দিলেই হবে। অনেক তীর্থযাত্রী এরমধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছে। চারিদিকে ছোটখাটো একটা মেলা বসে গেছে। রাতেই শান্তিবাবু কিষাণ নামে একটি ছেলেকে কুলি কাম গাইড হিসাবে ঠিক করে দিলেন। আমরা আমাদের নির্দিষ্ট আস্তানায় গিয়ে উঠলাম।

রাতে একটি ছোট দোকানে রুটি, রাজমার তরকারী চা খেলাম। দোকানে একটি বছর বারচোদ্দোর বাচ্চা মেয়েকে দেখলাম সারা শরীরে গয়না পরে বসে চা খাচ্ছে। মুখে যেন তার অনর্গল খই ফুটছে। সে থুতনি পর্যন্ত ঝোলা এত বড় একটা নাকছাবি পরেছে, যে প্রতিবার চায়ের কাপে চুমুক দেবার আগে এক হাতে নাকছাবিটা ওপর দিকে তুলে, তবে চায়ের কাপে চুমুক দিতে হচ্ছে। দোকানদার ভদ্রলোকটি জানালেন যে মেয়েটি তার ভাইঝি। নতুন  বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পরে তাঁর কাছে বেড়াতে এসেছে। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন, এখানে সোনার গয়না পরার চল খুব বেশি। তাঁর ভাইঝি গলায়, কানে, নাকে, হাতে বা কোমরে যা পরে আছে, সবই সোনার তৈরি, তবে কাঁচা সোনা, তাই নরম। জিজ্ঞাসা করলাম এই আধো অন্ধকার রাতে এত গয়না পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোন ভয়ের বা বিপদের সম্ভাবনা আছে কী না। ভদ্রলোক জানালেন, এখানে চুরিচামারির কোন ভয় নেই। কেউ সেটা করলে আর বেঁচে ফিরবে না

পরদিন ভোরের আলোয় ভারতীয় সুইৎজারল্যান্ড, ভারমোরকে দেখার সুযোগ পেলাম। একদিকে মণিমহেশে যাবার হাঁটাপথের শুরু, অন্যপ্রান্তে রাস্তার পাশে লাল ও সোনালি আপেলের গাছগুলি শোভাবর্ধন করছে। শান্তিবাবু আমাদের সঙ্গে করে একটি বাগানে নিয়ে গেলেন। বাগানটিতে শত শত আপেল ও ন্যাসপাতি গাছ। গাছগুলি ফলের ভারে মাটিতে প্রায় নুইয়ে পড়েছে। মাটিতে বসেও বেশ কিছু আপেল পাড়া সম্ভব। তিনি আমাদের রাস্তার খাবার হিসাবে অনেক আপেল ও ন্যাসপাতি দিলেন। আমরা নিজেরা কিছু ফল পাড়তে চাইলে, তিনি আমাদের কিছু আপেল ও ন্যাসপাতি পেড়ে নিতে বললেন। খুব খারাপ লাগলো, এত সুন্দর একটা বাগানকে মানুষের সকালের প্রাকৃতিক কাজের জন্য ব্যবহৃত হতে দেখে।

BHARMOUR             BHARMOUR (4)            BHARMOUR (2)

                                                                    ভারমোর

অল্পবয়সি কুলি কিষাণকে সঙ্গী করে, কাঁধের ঝোলা ব্যাগ ভর্তি আপেল ও ন্যাসপাতি নিয়ে, শুরু হ’ল আমাদের মণিমহেশ যাত্রা। আমরা এগিয়ে চললাম, কিষাণ পথের পাশে তার কোন এক আত্মীয়ের বাসায় দেখা করতে গেল। রাস্তা খুব একটা বৈচিত্রময় বলে মনে হ’ল না। প্রায় সমতল রাস্তা, তবে সূর্যালোক ভালো না পাওয়ায়, রাস্তা ভীষণ স্যাঁতসেঁতে। তার ওপর আবার রাস্তায় বড় বড় গাছ কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। কখনও মাথা নীচু করে ফেলে রাখা কাটা গাছের তলা দিয়ে, কখনও কাটা গাছ টপকে, কোনমতে হেঁটে একসময় আমরা ‘সান্ডি’ এসে পৌঁছলাম। এখান থেকে বোধহয়  আরও তিন কিলোমিটার মতো পথ পার হয়ে ‘হাডসার’-এ এসে উপস্থিত হওয়া গেল। এখান থেকে মণিমহেশ লেকের দুরত্ব প্রায় চোদ্দ কিলো মিটার। ভারমোর থেকে হাডসারের দুরত্ব প্রায় এগারো কিলো মিটার মতো। কিষানের কিন্তু দেখা নেই, ওকে অবশ্য তিনটে কম্বল বইতে হচ্ছে, কিন্তু তা হলেও ও ভীষণ আস্তে হাঁটে।

ON THE WAY TO HADSAR  হাডসারের পথে কিষাণ।

হাডসার একটা মাঝরি গ্রাম, কথামতো এখানেই আমাদের রাত কাটাবার কথা। শান্তিবাবুও সেইমতো এখানকার এক ভদ্রলোকের নাম ঠিকানাও দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এখনও যেহেতু যথেষ্ট দিনের আলো আছে, আর কাল সকালে এখান থেকে মণিমহেশ দেখে আবার এখানে ফিরে আসা কষ্টকর হবে, তাই এখান থেকে সাত কিলো মিটার দুরে ধানচোর বা ধানচৌতে গিয়ে আজ রাতটা কাটাবার পরিকল্পনা করা হ’ল। চায়ের দোকানে কিষাণের অপেক্ষায় অনেক্ষণ বসে থাকলাম। ওর দেখা মিললো আরও অনেক পরে। ও কিন্তু আমাদের এগিয়ে যাওয়ার মতলবকে সমর্থন করলো না। ওর বক্তব্য ধনচৌ পৌঁছতে অন্ধকার হয়ে যাবে। এ পথে চারিদিকে ভুট্টার চাষ হয়, কাজেই ভীষণ ভাল্লুকের উৎপাত, তাছাড়া ধানচৌতে থাকার জায়গা পাওয়া যাবে না। শান্তিবাবুও সন্ধ্যার পর বাইরে বেরোতে বার বার বারণ করে দিয়েছিলেন। তবু আমরা কিন্তু এগিয়ে যাওয়াই স্থির করলাম। এখান থেকে অল্প অল্প চড়াই শুরু হ’ল। সূর্যালোকহীন এবড়ো খেবড়ো পাথুরে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় অনেক দুরে একটা কালো রঙের হৃষ্টপুষ্ট প্রাণীকে গদাই-লস্করী চালে এগিয়ে আসতে দেখে, সাবধানতা অবলম্বনের জন্য দাঁড়িয়ে পড়লাম। অনেকটা কাছে আসতে বুঝতে পারলাম, সেটা আসলে একটা কুকুর। কুকুরটা আমাদের প্যান্ট, জুতো একটু শুঁকে দাঁড়িয়ে রইলো। আমরা এগিয়ে চললাম। কুকুরটাও কখনও আমাদের সামনে সামনে, কখনও আমাদের পিছন পিছন, আমাদের সাথে এগিয়ে চললো। একটু এগিয়ে “প্রিহঙ্গলা” নামে একটা জায়গায় এসে হাজির হলাম। রাস্তার সৌন্দর্য সত্যিই কিছু নেই। আরও এগিয়ে একসময় অনেকটা দুরে দু’টো তাঁবু চোখে পড়লো। কিষাণ জানালো আমরা ধানচৌ এসে গেছি। আরও কাছে আসতে লক্ষ্য করলাম একটা খুব ছোট তাঁবু, তার পাশেই অপেক্ষাকৃত একটু বড় আর একটা তাঁবু খাটানো আছে। বড় তাঁবুটার সামনে এক বৃদ্ধ বসে হুঁকো টানছেন। কিষাণ জিজ্ঞাসা করলো একটা তাঁবুতে আমাদের থাকতে দেবার জন্য বৃদ্ধকে অনুরোধ করবে কী না। আমি বারণ করলাম। কারণ একবার না বললে তাঁকে রাজি করানো মুশকিল হতে পারে। সেই একঘেয়ে সৌন্দর্য বিহীন রাস্তা ধরে সন্ধ্যার কিছু আগে আমরা আমাদের কুলি কিষাণ, ও গাইড কুকুরটার সাথে ধানচৌ এসে পৌঁছলাম। এখনও চারিদিকে বেশ আলো, এটাকে স্বছন্দে বিকেল বেলা বলা যেতেই পারে। বিরাট একটা উপত্যকা, ছোট-বড় অসংখ্য পাথর পড়ে, পাশ দিয়ে একটা নদী বয়ে চলেছে। সম্ভবত এটা সেই ভুডর নালা। পরপর দু’টি তাঁবু খাটানো আছে, হয়তো অন্য কোন পর্যটকের তাঁবু। তাঁবুর পাশে, একটু উপরে একটি চায়ের দোকান। এছাড়া আর কোন থাকার জায়গা দেখলাম না। তাঁবু দু’টির একটি মাঝারি এবং একটি একেবারে ছোট। মাঝারি তাঁবুটির ঠিক বাইরে একজন বয়স্ক ব্যক্তি হুঁকো হাতে বসে আছেন। কিষাণ আবার বললো ভদ্রলোককে অনুরোধ করতে, যাতে তিনি আমাদের ছোট তাঁবুটিতে রাত্রে থাকার অনুমতি দেন। এবারও আমি রাজি হলাম না। যদিও এখনও  বিকেলের মতোই আলো, আমরা কিন্তু এখনও জানিনা  বিস্তীর্ণ  এই  উপত্তকায় রাতে কোথায়  থাকবো।

                ON THE WAY TO PRIHANGALA (2)             প্রিহঙ্গলা         ON THE WAY TO PRIHANGALA

কিষাণকে বললাম, “কিছু বলার দরকার নেই। আমরা আগে তাঁবুতে ঢুকে জায়গা করে নিই, আগে দেখা যাক উনি আপত্তি করেন কী না। অনুমতি নিতে গেলে উনি না বললে, হ্যাঁ করানো শক্ত হবে। আমরা চারজন তাঁবুতে প্রবেশ করলাম। ছোট্ট তাঁবু, তার উপরে ভিতরে চাল, গম বা ঐ জাতীয় কিছুর বস্তা ভর্তি, ফলে জায়গা আরও কমে গেছে। পাশের তাঁবুর বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি সব দেখলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। আমরাও আগ বাড়িয়ে তাঁর সাথে পরিচয় করতে গেলাম না। এরমধ্যে বৃষ্টি শুরু হ’ল। সময় নষ্ট না করে কিষাণকে পাঠালাম পাইন জাতীয় গাছের পাতা কেটে আনতে।  মালপত্র একপাশে রেখে তাঁবুর বাইরে এসে, “নমস্তে লালাজী” বলে হাতজোড় করে তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে তাঁর সাথে গল্প জুড়ে দিতে, তিনি খুব খুশি হলেন। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে গেলাম তখন, যখন জানলাম যে চাম্বার পি.ডাব্লু.ডি–এর অফিসারটি না জানলেও, দু’টি তাঁবুই তাঁদের ডিপার্টমেন্টের।  ভদ্রলোক জানালেন এবার সারা দেশ থেকে পূণ্যার্থীর আগমন হবে, তাই রাস্তা মেরামত, মাইলস্টোনে রঙ করা ইত্যাদি কাজ হচ্ছে। তিনি সম্ভবত সুপারভাইজার, যদিও কাছেপিঠে আর কাউকে দেখলাম না। ছোট তাঁবুটার একটু ওপরে ছোট্ট একটা অস্থায়ী দোকান।

          DHANCHOU (2)                 ধানচৌ                      DHANCHOU

আরও কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে, কোনরকম অনুরোধ ছাড়াই আগের মতো আবার ছোট তাঁবুতে এসে ঢুকলাম। আমরা তাঁবুর ভিতরটা চাল বা গমের বস্তার পাশ থেকে ভালভাবে পরিস্কার করলাম, এবার তাঁবুর বাইরে চারপাশে নালার মতো করে কেটে, ঢালুর দিকে অনেকটা দুর পর্যন্ত নিয়ে গেলাম। ব্যাস, অনেকটা শিবলিঙ্গ আকৃতির এই নালায়, বৃষ্টির জল আর তাঁবুতে ঢোকার কোন সম্ভাবনাই রইলো না। কিষাণ পাইন গাছের ডাল সমেত অনেক পাতা এনে হাজির করলো। তাকে ডাল থেকে ছিঁড়ে শুধু পাতা এক জায়গায় জড়ো করতে বললাম। এবার আমরা পাইন পাতা তাঁবুর মেঝেতে বেশ মোটা করে পেতে, তার ওপরে পলিথিন শীট পেতে, তার ওপর কম্বল পেতে, খাসা রাজকীয় বিছানা করে নিলাম। ভদ্রলোক চুপ করে বসে আমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করলেও মুখে কিছু বললেন না। কুকুরটাও তাঁবুর বাইরে বসে রইলো।

আমরা সব কাজ সেরে তাঁবুর বাইরে আসলে ভদ্রলোক শুধু বললেন যে, এখানে বিচ্ছু অর্থাৎ পাহাড়ি কাঁকড়া বিছার খুব উপদ্রব, আমরা যেন তাঁবুর ভিতরটা ভালোভাবে দেখে তবে বিছানায় শুই। তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে, আমরা জায়গাটা এক চক্করে ঘুরে দেখতে গেলাম। আমাদের পিছন দিকটায় উঁচু পর্বতশৃঙ্গ, লম্বা পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ঐ দিকে উঁচুনীচু মাঠের মতো অনেকটা জায়গায় ইতস্তত ছোট বড় পাথর পড়ে আছে। তারই এক ধারে, ছোট্ট দোকানটা। আমরা ঐ দিকে বেশ খানিকটা দুর পর্যন্ত ঘুরে বেড়ালাম, বড় পাথরের ওপর চড়ে বসলাম, ফটো তুললাম। কিছুক্ষণ সময় ঐভাবে কাটিয়ে দোকানটায় ঢুকলাম। রাতে রুটি তরকারী পাওয়া যাবে শুনে আশ্বস্ত হলাম। দোকানটায় আর কিছু পাওয়া যাক বা না যাক, ডিম সাজানো আছে দেখলাম, আর দেখলাম লাল, নীল, সবুজ রঙের নানা আকৃতির সুদৃশ্য পেয়ালায় তরল পানীয়। হয়তো স্থানীয় কোথাও তৈরি, কিন্তু পানপাত্রে কেন ঢেলে রাখা হয়েছে, তা বোঝা গেল না। এখানে ঐ এক বৃদ্ধ লালাজী  ছাড়া এতটা পথে দ্বিতীয় কোন মানুষের দেখা পাই নি। লালাজী এই রসে আসক্ত কী না জানিনা, তবে তিনি খেলেও আর কত খাবেন? তার জন্য অতগুলো পাত্রে তরল পানীয় ঢেলেই বা রাখার প্রয়োজনটা কী বোঝা গেল না।

আমাদের সামনে অনেকটা নীচে সম্ভবত কোন পাহাড়ী নদী ছোট বড় পাথড়ের ওপর দিয়ে কুল কুল করে নিজের আনন্দে বয়ে যাচ্ছে। জল প্রায় নেই বললেই চলে। নদীর অপর পাড়ে পর্বতশ্রেণী রক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। ডানপাশে মণিমহেশ যাবার পথ, বাঁপাশটা দিয়ে কিছুক্ষণ আগে আমরা এসেছি। চারিদিকে পাইন বা ঐ জাতীয় আকাশচুম্বি গাছের সারি। ক্রমে অন্ধকার নেমে আসলো। আমরা দোকানটায় গিয়ে ডিমের অমলেটের অর্ডার দিলাম। সুদৃশ্য পান পেয়ালায় কী আছে প্রশ্নের উত্তরে জানা গেল “দারু”। সঙ্গে ব্র্যান্ডির বোতল আছে, তবু মনে হ’ল জিনিসটা চেখে দেখলে কেমন হয়? অমল বললো বিষ হতে পারে, না খাওয়াই ভালো। আমি বললাম, “পাত্রে যখন সাজিয়ে রেখেছে, তখন খদ্দেরও নিশ্চই আছে। তারা যদি খেয়ে বেঁচে থাকে, আমরাই বা মরবো কেন”? শেষে ঠিক হ’ল কিষাণ এইসব এলাকার লোক, ওকেই প্রথমে খাওয়ানো যাক। ওর কিছু না হলে, আমরা একপাত্র করে চেখে দেখবো। দারু খাবে কী না জিজ্ঞাসা করায়, কিষাণ খুব খুশি হয়ে মাথাটা কাত করে প্রায় পেটের কাছে এনে সম্মতি জানালো। পর পর দু’পাত্র গলায় ঢেলে সে ডিমের অমলেটে কামড় দিল। নতুন কোন রোগের ওষুধ আবিষ্কারের পর গিনিপিগের ওপর প্রয়োগ করে চিকিৎসক যেমন অধীর আগ্রহে গিনিপিগটিকে পর্যবেক্ষণ করেন, আমরাও সেইরকম কিষাণের ওপর লক্ষ্য রাখতে শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে সে যখন আরও একপাত্র খাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলো, তখন নিশ্চিত হওয়া গেল, যে জিনিসটা ক্ষতিকারক কী না তার পরীক্ষার খরচ একটু বেশি হলেও, বিপদের কোন সম্ভাবনা নেই। তখন আমরাও ডিমের অমলেট সহযোগে দু’এক পাত্র করে পান করে তাঁবুতে ফিরে এলাম। আরও কিছু পরে দোকানে রাতের খাবার, রুটি তরকারী খেতে গেলাম। রুটির চারপাশটা গোল করে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে আমরা দু’তিনটে করে রুটি খেলাম। কিষাণ অনেকগুলো রুটি খেয়ে নিল। এখন আবার আমাদের সঙ্গে আমাদের অতিথি, গাইডটিও ল্যাজ নাড়তে নাড়তে রাতের খাবার খেতে এসেছেন।

তাঁবুর পাশে বসে অনেকক্ষণ গুলতানি করলাম। লালাজী বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছেন। চারিদিক হালকা জ্যোৎস্নালোকে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। পয়সা খরচ করে দোকানে দু’এক পাত্র খেয়ে কোন নেশা না হলেও, এই পরিবেশ আমাদের নেশাগ্রস্থ করে ফেললো। নির্জন এই উপত্যকায় বেওয়ারিস্ তাঁবুর পাশে বসে হালকা চাঁদের আলোয় চতুর্দিক গাছপালা ঢাকা এক উপত্যকায় আমরা তিন বন্ধু। সঙ্গে কিষাণ ও ভাল্লুক সাদৃশ্য এক সারমেয়। বহু নীচে জল বয়ে যাওয়ার হালকা দরবারীর সুর, তীব্র ঝিঁঝির ডাকের সঙ্গতে, ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। গলা ছেড়ে কিছুক্ষণ “আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে….” গাইলাম।

আমরা তাঁবুতে ঢুকে তাঁবুর দড়ি ভাল করে বেঁধে শুয়ে পড়লাম। অনেক রাত, ক’টা বাজে বলতে পারবো না, কিসের একটা খস্ খস্ আওয়াজে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। চুপ করে শুয়ে শুয়ে ভাবছি বিচ্ছু নয় তো? হিমালয়ান বিয়ারের পরিবর্তে অতি ভদ্র ও মিশুকে এক কুকুরের দেখা মিললেও, বিচ্ছুর পরিবর্তে যে তিন বাউন্ডুলে ব্যাচেলারের কাছে শুভবার্তা নিয়ে প্রজাপতি আসবে, তার গ্যারান্টি কোথায়? আরও কিছু পরে উঠে বসলাম। অমল ওপাশ থেকে জিজ্ঞাসা করলো “কিসের আওয়াজ বলতো”? বুঝলাম তার ঘুমও ভেঙ্গে গেছে। দু’জনে টর্চ জ্বেলে কোন বিচ্ছুর সন্ধান না পেলেও, একটা বেশ বড় মাকড়সা দেখতে পেলাম। ঐ রাতে তাঁবুর ভিতরে মোমবাতি জ্বেলে হিন্দুমতে তার সৎকার করা হ’ল। ইতিমধ্যে দিলীপেরও ঘুম ভেঙ্গে গেছে। কিষাণের নাসিকা গর্জনকে উপেক্ষা করে তিনজনে তাঁবুর দড়ি খুলে বাইরে রাস্তার পাশে খাদের ধারে টর্চ জ্বেলে এলাম জলবিয়োগ করতে। চাঁদের আলো বোধহয় একটু জোর হয়েছে। নদীর ওপারে বহুদুর পর্যন্ত পরিস্কার দেখা যাচ্ছে।

হঠাৎ মনে হ’ল মুখ ঘোরালেই যদি ভাল্লুকের দেখা পাই, তাই পাশের দুই বন্ধুকে বললাম, টর্চ নিভিয়ে ওয়ান টু থ্রী বললেই, ছুটে গিয়ে তাঁবুতে ঢুকবো। যেন টর্চ নিভিয়ে দিলে ভাল্লুক আর আমাদের দেখতে পারবে না। কথামতো আলো নিভিয়ে ছুটে তাঁবুতে ঢুকতে গিয়ে দেখি, দোকানের বহু উপরে সেই পাহাড়ের চুড়ায় আগুন জ্বলছে। ভালুকের ভয় ভুলে, কিসের আগুন ভাবতে বসলাম। শেষে আবার তাঁবুতে ঢুকে দড়ি বেঁধে শুয়ে পড়লাম। ফেরার সময় শুনেছিলাম কোন মেষপালকের ভেড়া হারিয়ে যাওয়ায়, সে তার ভেড়ার খোঁজে ওখানে গিয়ে রাতে ফিরতে না পারায় আগুন জ্বেলেছিল।

যাইহোক, পরদিন খুব ভোরে আমাদের পাশের তাঁবুর ভদ্রলোকটিকে আমাদের মালপত্র দেখবার জন্য অনুরোধ করে, খালি হাতে মণিমহেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আবহাওয়া খুব খারাপ, ভীষণ কুয়াশা, মধ্যে মধ্যে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তাও প্রাণান্তকর চড়াই। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয় নি, গতকালের আপেল ন্যাসপাতি, নেওয়ার মতো জায়গার অভাব ও বোঝা সদৃশ হয়ে দাঁড়ানোয়, ফেলে দিয়েছি। চড়াই ভাঙ্গতে খুব কষ্ট হচ্ছে, বিশেষ করে মাঝেমাঝে বৃষ্টিতে বর্ষাতি পরে হাঁটা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে এরকম অনেক হাঁটা পথে গিয়েছি, কিন্তু এরকম ন্যাড়া, সৌন্দর্যহীন রাস্তা বিশেষ কোথাও পাই নি। সারা পথে শিলনোড়া আকৃতির মাইলস্টোনগুলি রঙ করা হলেও দুরত্বের পরিমাপ এখনও লেখা হয়ে ওঠেনি, তাই এক স্থান থেকে অপর স্থানের দুরত্ব জানতে লালাজী ও কিষাণ ছাড়া গতি নেই। তাদের দেওয়া খবরে মাঝেমাঝেই অঙ্ক শাস্ত্রের মিল খুঁজে পাওয়া ভার হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় সাত-আট কিলো মিটার পথ হেঁটে এসে উপস্থিত হলাম গৌরীকুন্ডে। এখান থেকে আর সামান্য রাস্তা পার হয়ে মাত্র পাঁচশ’ ফুট উঁচুতে উঠে,  আমরা উপস্থিত হলাম তের হাজার তিনশ’ নব্বই ফুট উচ্চতায় ভারতীয় কৈলাস— মণিমহেশ লেকের পাশে। বিরাট লেক, তবে কোন কোন মন্দির নেই।  কিছু কঞ্চি জাতীয় কাঠি ও ত্রিশুলের সাথে ঘন্টা বাঁধা। বিক্ষিপ্ত ভাবে পোঁতা রয়েছে অসংখ্য ত্রিশুল, সেখানেই কিছু কঞ্চি জাতীয় কাঠি ও ত্রিশুলের সাথে ঘন্টা বাঁধা জায়গায় দেবতার স্থান। আর আছে পাহাড়ি তীর্থ যাত্রীদের কাটা ভেড়ার রক্তাক্ত শিং, চামড়া ইত্যাদি। লেকের একপাশে অনেকগলো ত্রিশুল একসাথে পোঁতা আছে। তারই পাশে বাঁধানো জায়গায় রয়েছে একটি শিবমুর্তি। সেখানে সম্ভবত একজন পুরোহিতকে ঘিরে পাঁচ-সাতজন দেহাতি মানুষ বসে। পুরোহিত ভদ্রলোক তাদের মণিমহেশের মাহাত্ম্য ও গল্প শোনাচ্ছেন। সামনেই হিমালয়ের পীর পাঞ্জল রেঞ্জের মণিমহেশ-কৈলাস শৃঙ্গ, উচ্চতা ১৮৫৪৭ ফুট। বর্তমানে এই শৃঙ্গ কৈলাস নামেই সমাদৃত।

                   GOURIKUND, WAY TO MANIMAHESH     গৌরীকুন্ড

আমি হিন্দী বড়ই কম বুঝি, তবু যেটুকু বোধগম্য , মণিমহেশ সম্বন্ধে ভদ্রলোকের বক্তব্যের সাথে আমার পড়া গল্পের কোন মিল খুঁজে পেলাম না শেষে আমি আমার বিশুদ্ধ হিন্দীতে বললাম, “ইয়ে বাত সাহি নেহি পুরোহিত ভদ্রলোক একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে চুপ করে গিয়ে, হয়তো একটু বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন বিশ্বস্ত অনুচরেরাও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো এবার আমার বিপদে পড়ার পালা ভদ্রলোককে আমার বক্তব্য বুঝিয়ে বলতে গেলে দোভাষী লাগবে তবু বাধ্য হয়ে আবার বলতেই , “আপ যো কাহানী বাতাতে হ্যায় সাহি নেহি

ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে গুম হয়ে থেকে বেশ অবজ্ঞার সাথেই জানতে চাইলেন, আসল ঘটনা তাহলে কী এবার আমার ঘামার পালা গল্পটা বেশ বড়, শুধু বড়ই নয়, কাক, সাপ, ভেড়া, মেষপালক, ইত্যাদি অনেক চরিত্র আছে কিন্ত ওখানে খাল কাটার সম্ভাবনা না থাকলেও, বিপদরূপী কুমির  আমি নিজেই ডেকে এনেছি কাজেই হিন্দীতে গল্প বলা আমার কম্ম না হলেও, পিছিয়ে আসারও আর কোন সুযোগ নেই

অগত্যা আমার নিজস্ব হিন্দীতেই গল্পটা বলতে শুরু করলাম। আমার সবথেকে বড় অসুবিধা, আমি হিন্দীতে কোন বাক্যই শেষ করতে পারি না। প্রতিটা বাক্যই মাঝপথে এসে হোঁচট খেয়ে থেমে যায়, তখন আবার ফিন রামসে শুরু করতে হয়। যাইহোক, কৈলাস ছেড়ে মহাদেব যে একপ্রকার পালিয়ে এসে মণিমহেশে বসবাস শুরু করেন, এটা কেউ জানতেও পারে নি। একদিন এক মেষপালকের একটি মেষ হারিয়ে গেলে, হারানো মেষের সন্ধান করতে করতে সে মণিমহেশ গিয়ে হাজির হয় এবং মহাদেবের সাক্ষাৎ পায়। মণিমহেশে আসার কারণ শুনে মহাদেব তাকে বর দিয়ে বলেন যে, সে তার বাসস্থানে ফিরে গিয়ে যতগুলি মেষের কামনা করবে ততগুলি মেষ সে পাবে, তবে একটি শর্তে। মহাদেব যে মণিমহেশে আছেন, একথা সে কাউকে জানাতে পারবে না। মহাদেবের কথায় মেষপালক বাড়ি ফিরে এসে অনেক মেষ কামনা করে এবং মহাদেবের কথামতো পেয়েও যায়। রাতারাতি সে অনেক মেষের মালিক হয়ে যায়। কিন্তু সে মহাদেবের কথা রাখে নি। সে একটা সাপ, একটা কাককে নিয়ে আবার মণিমহেশে যায়। মহাদেব তাকে দেখে রুষ্ট হয়ে শাপ দেন। মহাদেবের অভিশাপে উপস্থিত সকলেই পাথর হয়ে যায়

                     MONIMAHESH (2)      মণিমহেশ      MANIMAHESH

অনেক বছর আগে ঘটনাটা পড়েছিলাম, মেষপালকের সাথে বোধহয় আরও কেউ ছিল, আমি ঠিক স্মরণ করতে পারছি না। তবে আমার সাথে ঐ ভদ্রলোকের গল্পের বিন্দুমাত্র মিল না থাকলেও, গল্পের চরিত্রগুলো, অর্থাৎ সাপ, কাক, ভেড়া ইত্যদি ও তাদের পরিণতি প্রায় একই ছিলো। তবে গল্প বলার গুণে না হিন্দী বলার গুণে বলতে পারব না, বাবারও যেমন বাবা থাকেন, আমাকেও বোধহয় সেরকম আধ্যাত্মিক জগতের একজন মহাপন্ডিত ভেবে, স্বয়ং মহাদেবের খাসতালুক থেকে আসছিও ভেবে থাকতে পারেন, আমাকে অতি বিনয়ের সাথে বললেন “আপ বৈঠিয়ে সাহাব”। অতএব বসতেই হ’ল।

                  MANIMAHESH (3)          মণিমহেশ          MONIMAHESH

ভদ্রলোক আমাদের আম লজেন্স্ ও বরফ প্রসাদ দিলেন। এবার আঙ্গুল তুলে দুরের পাহাড়ের দিকে দেখিয়ে আমাদের সকলকে পাহাড়ের গায়ে কাক, সাপ ইত্যাদির পাথর হয়ে যাওয়া মুর্তি দেখাবার চেষ্টা করলেন।      এতদুর থেকে জ্যান্ত সাপ বা কাক দেখাই অসম্ভব, তো দুরের পাহাড়ের গায়ে একই রঙের পাথরের সাপ বা কাক দেখা, তবু আমার মতো সম্মানীয় ও শিববিশারদ ব্যক্তিকে বাধ্য হয়েই আলাদা আলাদা ভাবে কাক, সাপ, ভেড়া, মেষপালক, প্রত্যেককে দেখতে পেয়ে উল্লাসিত হতেই হ’ল। প্রত্যেক জায়গা থেকে কিছু না কিছু স্মৃতি চিহ্ন হিসাবে নিয়ে আসার অভ্যাস, তাই ভদ্রলোককে খুব নরম গলায় বিশুদ্ধ হিন্দীত বললাম, “ইয়ে যো ত্রিশুল হায় না, উসমে শিউজীকা স্পর্শ্ হ্যায়। মেরা পিতাজী মাতাজী ইধার আ নাহি পায়েগা। হাম এক ত্রিশুল লে যায়, তো উনলোগ ভী শিউজীকা স্পর্শ্ পায়গা। এক ত্রিশুল লে যাঁউ?  শুনে ভদ্রলোক যেন একটু লজ্জাই পেলেন।খুব মিষ্টি সুরে বললেন—“লে যাইয়ে সাহাব”। আমি একটা বেশ শক্তসমর্থ ত্রিশুল তুলে নিয়ে গুছিয়ে বসলাম। এবার দিলীপের জন্য একটা ম্যানেজ করতে হবে। একটু সময় নিয়ে দিলীপকে দেখিয়ে আবার শুরু করলাম, “ইয়ে যো হামারা বন্ধু হায় না, উনকো পিতামাতা হররোজ শিউজীকে লিয়ে জীবন উৎসর্গ্ কিয়া। উনকো পিতামাতাকে লিয়ে আউর এক ত্রিশুল লে যাঁউ”? আমার ঠাকুর দেবতায় বিন্দুমাত্র আস্থা না থাকলেও, দিলীপের বাড়ির লোকজনের ভগবানের ওপর ভীষণ আস্থা। তবে আমার ঐ বক্তব্যের যে প্রকৃত অর্থ কী দাঁড়িয়েছিল, আজও ভাবলে হাসি পায়। ভদ্রলোক এতটুকু সময় নষ্ট করে আমায় বিব্রত না করে বললেন, লে যাইয়ে জনাব। দিলীপকে একটা ত্রিশুল তুলে নিতে বললাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, এই ঘটনার বহু আগেই দিলীপের বাবা ইহলোকর মায়া ত্যাগ করে সম্ভবত শিবলোকেই চলে গেছিলেন। এবার আমার কদর বুঝে অমুমতির তোয়াক্কা না করে অমলকেও একটা ত্রিশুল আমিই তুলে নিতে বললাম। অমল ত্রিশুল নিয়ে কাকে খুঁচিয়ে মারবে জানিনা, তবে উৎসাহের আতিশয্যে একটা করে ত্রিশুল উপড়ে তুলছে, আর নাঃ এটা ভালো নয়, নাঃ এটা কিরকম বাঁকা মতো, ইত্যাদি বলে সেগুলোকে মাটিতে শুইয়ে রাখছে। শেষে পছন্দমতো একটা জুতসই ত্রিশুল তুলে নিয়ে এসে আমাদের পাশে বসে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেটা পরখ করে দেখতে শুরু করলো। আমি তাকে আর নতুন করে ত্রিশুল উৎপাটন থেকে বিরত করে, একটু এদিক ওদিক ঘুরে, ধানচৌ ফিরে আসার জন্য তাদের কাছ থেকে বিদায় চাইলাম। গেলাম, দেখলাম সবই ঠিক, কিন্তু মন ভরলো না। তীর্থ করতে আমরা যাই নি, আমরা পথের সৌন্দর্য খুঁজতে গিয়েছিলাম। মনে পড়ে গেল সেই উক্তি—“পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয়, পথের দুধারে আছে মোর দেবালয়”।

এবার আমাদের সাথে আর এক ভদ্রলোক সস্ত্রীক বেড়াতে এসেছেন। তাঁরা চাম্বায় আমাদের অপর সঙ্গীদের সাথে রয়েছেন। ফেরার পথে একটু নীচ থেকে তাঁর জন্যও একটা ত্রিশুল সংগ্রহ করা ল। ত্রিশুল হাতে অনেক পথ পার হয়ে, ধানচৌ এর তাঁবু থেকে মালপত্র নিয়ে সেই পুরাতন পথ ধরে এঁকেবেঁকে একসময় ভারমোর এসে পৌঁছলাম। শান্তিদার সাথে দেখা হতেই তিনি আঁতকে উঠে বেশ বিরক্তের সঙ্গেই বললেন, “এটা আপনারা কী করেছেন? এখানকার লোকেরা তো আপনাদের পিটিয়ে মেরে ফেলবে এখানকার মতো নিরীহ সাদামাটা মানুষ যে পিটিয়ে মানুষ খুন করতেও পারে, জানা ছিল না। আমাদের অপরাধটা যে ঠিক কী তাও বুঝতে পারলাম না

ভদ্রলোক এবার বললেন সারা দেশ থেকে মানুষ এসে এখানে দেবস্থানে ত্রিশুল পুঁতে মনস্কামনা পুরণের জন্য মানত করে যায়। মনস্কামনা পুরণের আগেই ত্রিশুল তুলে নিলে, ইচ্ছা পুরণের কোন সম্ভাবনাই থাকে না। কোনটা কার ত্রিশুল বোঝার উপায় না থাকায়, কোন ত্রিশুলই তোলা বা নিয়ে যাওয়া উচিৎ নয়। যাইহোক তুলে যখন এনেইছেন, কেউ দেখে ফেলার আগে ওগুলোকে ফেলে দিন বা ব্যাগে পুরে নিন। এতকষ্টে বয়ে নিয়ে এসে ফেলে দিয়ে যেতে মন চাইলো না, তাই কাঁধে ঝোলানো কাপড়ের শান্তিনিকেতনি ব্যাগে ওগুলো পুরে ফেলে, হোটেলে খেতে গেলাম। সেখান থেকে ফিরে শান্তিদার সাথে পাশের আশ্রমে গেলাম, তাঁর সাথেই আশপাশটা বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে দেখলাম। ত্রিশুলগুলোর সামনে তিনটি ও পিছনে একটি ছুঁচালো অংশ ব্যাগ ফুঁড়ে, প্যান্ট্ ফুঁড়ে আমার ঊরু ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। তবু পিটুনি খেয়ে মরার চেয়ে ক্ষতবিক্ষত ঊরু নিয়ে আধমরা হয়ে থাকা, অনেক আরামপ্রদ ও নিশ্চিন্তের বলে মনে হ’ল।

 

12108832_515916805250740_1541352606638663789_n

ঠাকুর দেবতায় আমার কোনকালে বিশ্বাস বা আস্থা ছিল না, আজও নেই। শুনেছি মহাদেব ভদ্রলোক অতি অল্পেই তুষ্ট হ’ন। সামান্য ফুল বেলপাতা, তাও গোলাপ, চাঁপা বা জুঁই-রজনীগন্ধা নয়, আকন্দ, ভাট বা ধুতরোর মতো বুনো ফুলেই তিনি সন্তুষ্ট। কিন্তু আমার কাছ থেকে কোনদিন তাঁর সেটুকুও প্রাপ্তি না হলেও, তিনি আমাকে খুব পছন্দ করেন, বিপদে আপদে পরোক্ষভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, এটা আবার দেখলাম।

ফেরার পথে বাসে বসার জায়গা না পেয়ে বিড়ির ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ হয়েও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আসার সময়, মণিমহেশ নিয়ে ঠাট্টা তামাশা ও আলোচনা চলছে। আমাদের কথা বা ভাষা কারো বোঝার কথাও নয়। সম্ভবত স্থানীয়, দরিদ্র একজন মানুষ হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে বসলেন আমরা কোথা থেকে এসেছি, কোথায় গিয়েছিলাম। তাকে ওয়েষ্ট বেঙ্গল বললে তিনি বুঝতে না পারায়, আবার বললাম বঙ্গাল সে। তিনি এবার জিজ্ঞাসা করলেন, বঙ্গাল  হিন্দুস্থানের মধ্যে কী না। তাঁকে এবার ব্যাখ্যা করে বোঝালাম যে, কাশ্মীর যেমন একটা রাজ্য, হিমাচল প্রদেশ যেমন একটা রাজ্য, মাদ্রাজ বা গুজরাট যেমন একটা রাজ্য এবং হিন্দুস্থানের মধ্যে অবস্থিত, বঙ্গালও সেরকম হিন্দুস্থানেরই একটা রাজ্য। তিনি আমার কথা কতটা বুঝলেন জানি না, তবে আমরাও হিন্দুস্থানে বাস করি শুনে খুব খুশি হয়ে, এবং আমরা মণিমহেশ থেকে ফিরছি শুনে, নিজে উঠে দাঁড়িয়ে আমায় বসার জায়গা করে দিলেন। বাস কিছুটা যাবার পর কন্ডাক্টারের কাছ থেকে খবর পাওয়া গেল, যে সামনে কিছুটা দুরে একটা ছোট্ট ধ্বসের জন্য বাস আর যেতে পারছে না। তিন কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে চাম্বা যাবার বাস পাওয়া যাবে। চাম্বা থেকে খাড়ামুখগামী বাসগুলো আর এগলে বাস ঘোরানো যাবে না বলে, ওখান থেকেই বাসের মুখ ঘুরিয়ে চাম্বা ফিরে যাচ্ছে। তিন কিলোমিটার পথ হাঁটাটা আমাদের কাছে কোন সমস্যা নয়, কিন্তু সঙ্গের মালপত্র কাঁধে করে তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে যাওয়া নিয়ে আমরা একটু চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়তে ভদ্রলোক আমাদের ভয় পেতে নিষেধ করে জানালেন, আমরা শিউজীর জায়গা থেকে ঘুরে আসছি, কাজেই তিনি নিজে আমাদের মালপত্র বয়ে নিয়ে গিয়ে আমাদের ঐ তিন কিলোমিটার দুরের বাসে তুলে দেবেন। ধ্বসের জায়গায় এসে জানা গেল রাস্তা মেরামত হয়ে গেছে কাজেই আমরা নিশ্চিন্তে চাম্বা এসে পৌঁছলাম। ভদ্রলোক নিজে বাসের ছাদ থেকে আমাদের মালপত্র নীচে নামিয়ে এনে দিলেন। জানিনা ভদ্রলোকের এই অযাচিত সাহায্যের পিছনে মহাদেবের ইচ্ছা বা হাত ছিল কী না, তবে সম্ভবত এই মহাদেববাবুই, এর পরেও আমাকে একবার বিপদের সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

বছর দুয়েক পরে কাশ্মীরঅমরনাথ ঘুরে বৈষ্ণুদেবী দেখে জম্মু স্টেশনে এসে ফেরার টিকিটের জন্য রেলের টিকিট কাউন্টারে অনেক লোকের পিছনে লাইন দিলাম এখন অনলাইন কম্পিউটারের যুগ, কিন্তু সেদিন জম্মু স্টেশনে যতগুলো কাউন্টার ছিল, তার প্রায় সবকটাই মিলিটারিদের জন্য সংরক্ষিত, বাকি দুএকটিতেও মিলিটারিরা সাধারণ মানুষের সাথে লাইনে দাঁড়িয়েছে আমি আমার সামনে লাইনে দাঁড়ানো ভদ্রলোকটির সাথে কথা প্রসঙ্গে সদ্য শুনে আসা অমরনাথের মাহাত্ম্য নিয়ে লেকচার দিচ্ছি অনেকেই পিছন ফিরে আমার শ্রীমুখনিঃসৃত বাণী শুনছেন হঠাৎ মনে সামনের ভদ্রলোক হিন্দু না মুসলমান, জানা হয়ে ওঠেনি, তাই হজরতবালের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে শুনে আসা কিছু গল্পও বর্ণনা করলাম লাইনের সামনের দিক থেকে এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে, আপ ইধার আইয়ে জনাব, বলে আমায় লাইনের প্রায় একেবারে সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন এতবড় লাইনের একজনও আপত্তি করলো না দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম দিলীপ আমায় জিজ্ঞাসা করলো, তুই এত শিব ভক্ত কবে থেকে হলি আমি তাকে ইশারায় চুপ করে যেতে বললাম মহাদেব না মহম্মদ, কার ইচ্ছায় জানি না, তবে খুব সহজেই সেবার ফেরার টিকিট হস্তগত হয়েছিল

 সুবীর কুমার রায়।

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s