“অহি নিধন যজ্ঞ” {লেখাটি সুপ্ত প্রতিভা-Supto Protibha পত্রিকায় প্রকাশিত}

 DSCN9767আমাদের বাড়ির ঠিক সামনেই একটা কাঁচা রাস্তা, ও রাস্তার ওপাশে একটা ছোট ডোবা মতো ছিল। জল নেই, শুধুই পাঁক। আর তার ওপর বড় বড় কচুরিপানা আর কচু গাছ মাথা তুলে থাকতো। ডোবার ওপারে আগাছায় ভরা বেশ খানিকটা ফাঁকা জমি। পরবর্তীকালে রাস্তাটার ওপর সিমেন্টের স্ল্যাব দিয়ে বাঁধানো হয়। বাড়ির পাঁচিলের পাশ দিয়ে সরু বাঁধানো নালাটা আমাদের বাড়ির গেটের সামনে এসে, স্ল্যাবের তলা দিয়ে গিয়ে পাশের ডোবায় মিশেছে।

একটা সাপকে প্রায়ই দেখা যেত স্ল্যাবের নীচে দেহটাকে রেখে, গেটের কাছটায় মুখ বার করে প্রাকৃতিক শোভা দেখতে। সকলেই, বিশেষ করে আমাদের বাড়ির চারটে ফ্ল্যাটের সকলে তো বটেই, খুব ভয় পেত, কারণ এই বাড়িতে অনেক বাচ্চা ছেলেমেয়ে বাস করে। কিন্তু গেটের কাছে যাওয়ার আগেই, বা পায়ের আওয়াজ হলেই, সাপটা স্ল্যাবের নীচে মুখটা ঢুকিয়ে নিত। আবার লোক চলে গেলে, ঠিক বাড়ি থেকে বেরবার দরজাটার সামনে মুখ বার করে, আবার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতো। ব্যাপারটা সত্যিই খুব অস্বস্তিকর ছিল। আমরা অনেকবার অনেক ভাবে মারার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। বাবা অবশ্য প্রায়ই অভয়বাণী শোনাতেন, যে ওটা জলঢোঁড়া সাপ, বিষ নেই। কিন্তু বাড়িতে অনেক বাচ্চা থাকায়, সবাই ভয় পেতই। শেষে বাবা একদিন অদ্ভুত কায়দায় সাপটাকে মারলেন।

আমাদের বাড়িতে কয়েকটা প্রাচীন আমলের অস্ত্র ছিল। কে তৈরি করিয়েছিলেন, কেনই বা তৈরি করিয়েছিলেন, ঐ সব অস্ত্র দিয়ে তিনি কী-ই বা করতেন, বলতে পারবো না। তবে পৈত্রিক সুত্রে বাবা বোধহয় ঐটুকু সম্পত্তির মালিকানার অধিকারী হয়েছিলেন বলেই, ফেলে না দিয়ে, বাড়ির আর সব আবর্জনার সঙ্গে রেখে দিয়েছিলেন। বন্দুক, পিস্তল হলেও তবু বুঝতাম, কিন্তু অস্ত্রগুলো হচ্ছে, একটা মরচে ধরা তরোয়াল, একটা বেশ বড় শক্তপোক্ত ভারী ছোরা, আর একটা শিবের ত্রিশুলের মতো ত্রিশুল। না ভুল বললাম, এটার যতদুর মনে পড়ে পাঁচটা না ছ’টা ফলা ছিল। এটাকে ত্রিশুল না বলে পঞ্চশুল বলাই বোধহয় ঠিক হবে। বাবা অবশ্য এটাকে খোচনা বলতেন। কিন্তু সবকটাই মরচে ধরা। ঠাকুরদার কথা মনে করতে পারি না, কিন্তু মা’র কাছে শুনেছি, তিনি নাকি অতি বৃদ্ধ বয়সে মাঝে মাঝে তেল দিয়ে ঐ তরোয়ালটা ঘষে, মেজে, মুছে, পরিস্কার করতেন আর আক্ষেপ করে বলতেন— “তরোয়ালটা কেউ ব্যবহার করে না”।

যাহোক্, বাবা ঐ ত্রিশুল বা খোচনা দিয়ে একটা ব্যাঙকে গেঁথে নিলেন। ব্যাঙটা কিন্তু তখনও বেঁচে আছে। এবার স্ল্যাবের ওপর উবু হয়ে বসে, ব্যাঙ সমেত খোচনার মুখটা ঠিক গেটের সামনে, স্ল্যাবের নীচের নালার মুখে বামহাতে ধরে, ডান হাতে একটা ছোট, কিন্তু বেশ মজবুত লাঠি নিয়ে, সাপটার আগমনের অপেক্ষায় রইলেন। খোচনার মুখে ব্যাঙটা তখনও নড়াচড়া করছে। এইভাবে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও, সাপের দেখা মিললো না। রাস্তা দিয়ে যাবার সময়, অনেকেই নানা মন্তব্য করে যেতে লাগলো। স্বাভাবিক, এইভাবে সাপ মারতে তারা তো দুরের কথা, তাদের বাপ-ঠাকুরদারাও কোন দিন দেখেছিল বা শুনেছিল কিনা সন্দেহ। আমরা বাবাকে চলে আসতে বললে, তিনি শুধু কথা বলতে ও গেটের কাছাকাছি আসতে বারণ করছেন। সত্যি কী অসীম ধৈর্য। শেষে আরও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরে, সাপটা আস্তে আস্তে মুখ বার করে ব্যাঙটাকে ধরার আগেই, বাবার ডান হাতের লাঠির আঘাতে তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল। সবাই অবাক, সম্ভবত সাপটা মরবার আগে আমাদের থেকেও বেশি অবাক হয়েছিল। আমি শুধু বললাম, “সাপটা স্বর্গে গিয়ে ভাববে, মার খেয়ে মরলাম ঠিক আছে, কিন্তু মারলোটা কোন শালা? আর কিভাবে, কোথা থেকেই বা মারলো”?

তাঁর আদরের অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে দেখে, ঠাকুরদার অতৃপ্ত আত্মাও হয়তো এতদিনে শান্তি লাভ করলো।

সুবীর কুমার রায়।

২২-০৬-২০১৬

Advertisements

2 thoughts on ““অহি নিধন যজ্ঞ” {লেখাটি সুপ্ত প্রতিভা-Supto Protibha পত্রিকায় প্রকাশিত}

  1. বাঃ তোমার ছোট্টছোট্ট স্মৃতি চারনগুলো আমাদের জন্য বেশ আনন্দদায়ক গল্প ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s