বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী {লেখাটি অন্যনিষাদ-গল্পগুচ্ছ , সুপ্ত প্রতিভা-Supto Protibha, ও Pratilipi Bengali পত্রিকায় প্রকাশিত}

DSCN9723 - Copyস্নাতক হওয়ার পর উঠেপড়ে চাকরির চেষ্টায় লেগে গেলাম। চাকরির বাজার তখন এখনকার মতো খারাপ না হলেও, সহজলভ্য  মোটেই ছিল না। বাঙালি মনীষী ব্যবসা বাণিজ্যে উদ্বুদ্ধ করলেও, সাহসের অভাবে সে রাস্তায় হাঁটার চেষ্টা করি নি। প্রাণের বন্ধু দিলীপ স্নাতক হওয়ার আগেই সংসারের অর্থনৈতিক চাপে সম্বলপুরে একটা রাইস মিলে সামান্য বেতনের চাকরি নিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। পরীক্ষার ঠিক আগে ও ওখান থেকে ছুটি নিয়ে এসে পরীক্ষা দিয়ে স্নাতক হয়। তারপর একদিন সেই লোভনীয় চাকরির মায়া কাটিয়ে ঘরে ফিরে এসে, আমার মতোই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে শুরু করে। মাঝে চরম দুর্দিনে কিছুদিন ধুপকাঠির ব্যবসা শুরু করে ক’পয়সা লাভ করেছে সেই জানে, তবে সেখান থেকেও রণে ভঙ্গ দিয়ে স্থিত হয়ে বাড়িতে বসে চাকরির চেষ্টা শুরু করলেও, ব্যবসায়ী হওয়ার মোহ সে আর ত্যাগ করতে পারেনি।

এ হেন দিলীপ একদিন জানালো যে সে প্লাস্টিকের ছিপির ব্যবসা করবে বলে মনস্থির করেছে এবং আমাকে সে তার সঙ্গে নিতে চায়। আমি সরাসরি জানালাম যে ছিপির ব্যবসা সম্বন্ধে আমার কোন ধারণাই নেই। সে বিজ্ঞের মতো জানালো যে মায়ের পেট থেকে পড়েই কেউ ব্যবসাদার হয় না। চেষ্টা, অনুশীলন, ইচ্ছা, লেগে থাকা ইত্যাদি, মানুষকে সামান্য ব্যবসা থেকে শিল্পপতি তৈরি করে। উদাহরণ স্বরূপ কে ফুটপাথে গামছা বিক্রি দিয়ে জীবন শুরু করে আজ দেশের এক নম্বর শুটিং শার্টিং ফ্যাক্টরীর মালিক হয়েছে, কে সামান্য চায়ের দোকানে কাজ করে আজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড় বড় শহরে পাঁচতারা হোটেলের মালিক হয়েছে, ইত্যাদিও জানাতে  ভুললো না। সে আরও জানালো, যে সে অনেক খোঁজখবর নিয়ে এটা বুঝেছে যে এই ব্যবসায় লাভের পরিমাণ অনেক। আমি জিজ্ঞাসা করলাম বিভিন্ন মাপের প্লাস্টিকের ছিপি কোথায় কিনতে পাওয়া যায় তা ওর জানা আছে কী না। সে শুধু বললো এখন অন্য কারো মেশিন থেকে তৈরি করাতে হবে, ঠিকমতো ব্যবসা চললে পরে নিজেরাই তৈরি করবো। বুঝলাম সে অনেক খোঁজখবর নিয়ে মনস্থির করে, তবে এই ব্যবসায় নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঐ রোগাপটকা, কলেজ কেটে গামছা পরে গঙ্গার ঘাটে ব্যায়াম করা দিলীপের মধ্যে যে একজন সুপ্ত রতন টাটা বিরাজ করছিল আগে কে জানতো? ভাবলাম ও যখন সবই জানে, সবই করবে, তখন ওর সাথে থাকলে যদি দু’পয়সা আয় হয়, তো হোক না।

ও নিজেই একদিন জি.ডি.ফার্মাসিউটিক্যালে বোরোলিনের ছিপির অর্ডার সংগ্রহে গেল। বুঝলাম ‘মারি তো গন্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার’ একেই বলে। ভাবলাম ওর হবে, ও অনেক উঁচু থেকে শুরু করতে জানে। আর সব ব্যবসায়ী বহু সাধনা করে যেখানে গিয়ে পৌঁছয়, ও সেখান থেকে শুরু করতে চলেছে। পশুপাখির মা’রা খাবারের সন্ধানে গেলে, বাচ্চারা যেমন ভালো খাদ্যের আশায় মা’র ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকে, আমিও সেরকম ভালো আয়ের আশায় ওর ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকলাম।

ও ফিরে আসার পর জানা গেল যে ঐ কোম্পানির লোক তার কাছে এই জাতীয় কাজে তার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে কী না, নিজস্ব মেশিন আছে কী না, পুঁজির পরিমাণ কত, ইত্যাদি অনেক কিছু তথ্যের খোঁজখবর নিয়ে জানিয়েছে, যে তাদের অর্ডার অনেক টাকার ও অনেক মালের জন্য হয়। খুব ভালো মেশিন ছাড়া তাদের ঐ কোয়ালিটির ছিপি তৈরি করাও সম্ভব নয়। যাহোক্ সান্তনা পুরস্কার হিসাবে তারা দিলীপকে বলেছে, যে তারা বোরোলিনের একটা বড় ব্যানার দিতে পারে, সেটা পুজো প্যান্ডেলে টাঙ্গালে একটা টাকা তারা বিজ্ঞাপন বাবদ দিতে পারে। সেই সময় দূর্গা বা ঐ জাতীয় বড় কোন একটা পূজো ছিল। বেচারার এমন ফাটা কপাল, যে কোন পূজোর সঙ্গে সে প্রত্যক্ষভাবে যুক্তও নয়।

ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো, হয়তো বা শেষ হয়ে যাওয়াই উচিৎ ছিল, কিন্তু দিলীপ সে ধাতুতে গড়া ছেলেই নয়। সে তখন ব্যবসা করে বাড়ি, পাড়া, দেশ ও দশের মুখ উজ্জল করার ব্রত নিয়ে ফেলেছে। ভেঙ্গে না পড়ে সে আমায় বললো, “চল রুপালী প্লাস্টিকের ওখানে গিয়ে ওদের এ ব্যাপারে একটু সাহায্য করতে অনুরোধ করে দেখি কি বলে”। রুপালী প্লাস্টিক, প্লাস্টিক শিল্পে একটা স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান, প্রচুর নামী দামি যন্ত্রপাতি নিয়ে তাদের ব্যবসা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকী বিদেশেও তারা প্রচুর মাল রপ্তানি করে। সেইসময় অবশ্য তাদের ব্যবসা এত বড় ছিল না, তবু বেশ বড় ও নামী প্রতিষ্ঠান হিসাবে অবশ্যই পরিচিতি ছিল, কাজেই আমাদের অনুরোধের ফল কি হতে পারে বুঝতেই পারছি। তাই তাকে মিনমিন্ করে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে অন্য একদিন যাওয়া যাবে। কিন্তু সে তখন রণমুখী ঘোড়া, আমার ছেঁদো কথায় কান দেবে কেন? সে বেশ জোর গলায় বললো “ব্যবসায় কাল বলে কোন কথা হয় না, সব কাজ সাথে সাথে করে ফেলতে হয়, নে চল্ এখনি যাওয়া যাক”।

ইচ্ছা না থাকলেও যা ঝড়ঝাপটা ওই সামলাক্ গোছের একটা মনোভাব নিয়ে ওর পিছু পিছু যেতেই হ’ল। ওখানে গিয়ে দিলীপ এক ভদ্রলোককে সব কথা খুলে বলতে ভদ্রলোক বললেন, “আপনারা কিরকম সাহায্য আশা করেন? আপনারা যদি অর্ডার ধরে আনতে পারেন, আমরা রিজোনেবল্ রেটে মাল তৈরি করে দিতে পারি”। ভেবেছিলাম আমাদের পাল সাহেব রাজা পুরুর মতো স্টাইলে বলবে, “একজন শিল্পপতি অপর একজন শিল্পপতির কাছ থেকে যেরকম সাহায্য আশা করে”, কিন্তু সেই সব উক্তির ধারে কাছে না গিয়ে বললো, “এই মুহুর্তে আমাদের হাতে কোন অর্ডার নেই”। ভদ্রলোক বললেন, “ঠিক আছে, আপনারা বরং এক কাজ করুন। লেভেল ক্রসিং-এর কাছে যে বাড়িতে মনসা মন্দির আছে, ঐ বাড়ির ভদ্রলোককে গিয়ে আমার কথা বলে সব কথা খুলে বলুন। উনি আপনাদের অবশ্যই সাহায্য করবেন”। সেইমতো আমরা মনসা মন্দির সংলগ্ন সেই বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলাম। মনসার কৃপায় না অভিশাপে বলতে পারবো না, ভদ্রলোকের একটা চোখ আবার নষ্ট। ভদ্রলোককে সব কথা খুলে বলায় তিনি বললেন, “আপনারা যদি দু-চারদিন পরে আসেন তাহলে আমি ছিপির কিছু স্যাম্পেল ও একটা ঠিকানা দিয়ে দেব। সেখানে গিয়ে আমার কথা বলে স্যাম্পেল দেখিয়ে কথা বলে দেখুন, যদি কিছু উপকার হয়”। কথামতো দিন দুয়েক পরে আবার তাঁর কাছে যাওয়া হ’ল। তিনি আট-দশটা বিভিন্ন মাপের ছিপি দিয়ে প্রত্যেকটার গ্রোস হিসাবে দাম বলে দিলেন, সঙ্গে ক্যানিং স্ট্রীটের একটা দোকানের কথাও বলে দিলেন। অর্ডার সংগ্রহ হলে, তিনি ছিপি সংগ্রহ ও সরবরাহের ব্যাপারেও সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তিনি নিজে এই কাজটা করে মুনাফা না করে, আমাদের কেন সাহায্য করছেন বোঝা না গেলেও, দূরে, বহুদূরে কিছুটা আশার আলো যেন দেখতে পেলাম।

বাড়ি ফিরে দিলীপকে বললাম, ছিপিগুলোর কোনটার কত দাম মনে থাকবে না, আমি বরং ছোট ছোট সাদা কাগজে দাম লিখে কাগজটা মুড়ে নির্দিষ্ট ছিপির ভিতর ঢুকিয়ে রাখি। দাম বলার সময় কাগজটা খুলে নিলেই হবে, তাহলে আর কোন সমস্যা থাকবে না। সেইমতো শ্রীকান্তের মেজদার মতো কোন কাগজে আট টাকা, কোন কাগজে ছ’টাকা, কোন কাগজে দশ টাকা ইত্যাদি লিখে, নির্দিষ্ট ছিপির ভিতর গুঁজে দিলাম। এবার কিন্তু আশার আলোটা বেশ উজ্জল বলেই মনে হ’ল।

একদিন কাগজ লাগানো ছিপি নিয়ে আমরা দু’জন স্বশরীরে নির্দিষ্ট দোকানে গিয়ে হাজির হ’লাম। দোকানে একজন ভদ্রলোক বসে আছেন, তাঁকেই আমাদের প্রেরকের পরিচয় দিয়ে আসার উদ্দেশ্য বললাম। উনি জানালেন যে দোকানের মালিক এখন নেই, আমরা যেন মালিক থাকাকালীন এসে সরাসরি মালিকের সাথে কথা বলি। মালিক কখন আসবেন, কতক্ষণ থাকবেন ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করছি, এমন সময় মালিক এসে উপস্থিত হলেন। দোকানের ভদ্রলোক দোকানের মালিককে আমাদের আগমনের কারণটি খুলে বললেন।

দিলীপ মনসার আশীর্বাদ ধন্য ব্যক্তিটির পরিচয় দিয়ে বললো “আমরা প্লাস্টিকের ছিপি সাপ্লাই করে থাকি”। মালিক ভদ্রলোক বললেন, “স্যাম্পেল এনেছেন”? বুঝতে পারছি ভদ্রলোকের সাথে আমাদের MOU সাক্ষরের দোর গোড়ায় এসে পৌঁছে গেছি। অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে আমাদের প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান দিলীপ চন্দ্র পকেট থেকে ছিপিগুলো বার করলো, পাশেই দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠানের সি.ই.ও. এই শর্মা। কিন্তু দিলীপকে আর কষ্ট করে ছিপি থেকে কাগজ খোলার কাজটা করতে হ’ল না, ততক্ষণে অধিকাংশ কাগজ ছিপি থেকে বার হয়ে নিজেদের মুক্ত করে ফেলেছে।

দিলীপের হাত থেকে একটা ছিপি তুলে নিয়ে ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, “এটা কত করে গ্রোস দিচ্ছেন”? দিলীপ গম্ভীর হয়ে বললো, “এটা আট টাকা গ্রোস”। ভদ্রলোক বললেন, “এটা আমি ছ’টাকা করে কিনে থাকি”। এবার আর একটা ছিপি তুলে নিয়ে অনেক নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “এটা কত করে দিচ্ছেন”? দিলীপ জানালো, “এটা ছ’টাকা গ্রোস পড়বে”। ভদ্রলোক একটু অবাক হয়ে বিষ্ময় প্রকাশ করে বললেন, “সেকি, কিভাবে দিচ্ছেন? এটাতো আমি ন’টাকা করে কিনি মশাই”। বুঝলাম থলির ভিতর থেকে বেড়াল বেরিয়ে পড়ার মতো, ছিপির পেট থেকে কাগজ বেরিয়ে পড়ায় দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল এখন দাদখানি বেল, মুসুরির তেল, হয়ে গেছে। ভদ্রলোকের অসীম ধৈর্য বলতে হবে, এর পরেও কয়েকটার দাম করে কোনটার অনেক বেশি, কোনটার অনেক কম দামের গল্প শুনে হঠাৎই আমাদের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে কর্মচারীটিকে একজনের কথা বলে বললেন, “ও এলে বলবে বিকালে আমার আসতে একটু দেরি হবে”। এরপর আমাদের সাথে একটাও কথা না বলে, তিনি চলে গেলেন। পাল গ্রুপ অফ্ ঈন্ডাস্ট্রীজের সেখানেই জীবনাবসান হ’ল।

আবার গতানুগতিক ভাবেই দিন কাটতে লাগলো। সকালের কাগজ দেখে চাকরির জন্য দরখাস্ত, মাঝেমাঝে পরীক্ষায় বসা বা সেজেগুজে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়া, যদিও শেষপর্যন্ত ফলাফল সেই ‘বাপের হোটেল’। এরকম একটা সময় দাদার মাথায় হঠাৎ ব্যবসা করার ভুত চাপলো। সে নিজে ভারতীয় স্টেট্ ব্যাঙ্কে অফিসার হিসাবে কর্মরত, ভালো চাকরি, ভালো মাইনে। কিন্তু হলে কি হবে, সুপুরুষ স্বামী, সুখের সংসার, ফুলের মতো শিশু সন্তান ছেড়ে সামান্য প্রেমিক ভূতের পাল্লায় পড়ে কত নারী সংসার ত্যাগ করে চলে যায়, আর এতো ব্যবসার ভূত, লোভের ও লাভের হাতছানি। তবু রক্ষে, সে চাকরি ও সংসার ত্যাগ না করেই ব্যবসাটি করতে চায়। ও হঠাৎ একটা দোকান করার জন্য ক্ষেপে গেল। বাধ্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম যে সে কিসের দোকান করতে চায়। উত্তরে সে শুধু জানালো, যে সে অনেক খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে হোসিয়ারি দ্রব্যের ওপর লাভের পরিমাণ নাকি খুব বেশি। চাকরি বাকরির  বাজার খুব খারাপ, কাজেই একটা দোকান খুলতে পারলে ভবিষ্যতে আর আমাদের চাকরি নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। মহৎ চিন্তা, আমাদের দুই ভাইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সে ভীষণ চিন্তিত। তাই জিজ্ঞাসা করলাম, দোকানটা সে কোথায় করতে চায়। উত্তরে সে জানালো বাড়ির কাছে বাস রাস্তার ওপর করতে পারলেই ভালো হ’ত, কিন্তু ওখানে দোকান ঘর পাওয়া খুব শক্ত, আর পেলেও অনেক টাকার প্রয়োজন।

“তাহলে দোকানটা কোথায় করতে চাস্”?

ও খুব ক্যাজুয়ালি বললো, “ব্যাতড় মোড়ে দোকান ঘরের চেষ্টা করে দেখলে হয়”। এমন ভাবে কথাটা বললো, যেন গড়িয়াহাট মোড়ে দোকান ঘর না পেয়ে শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে দোকান করতে চায়। ১৯৭৪-’৭৫ সালের ব্যাতড় মোড় কিন্তু আজকের মতো মোটেই ছিল না। এখন বিদ্যাসাগর সেতু ও কোনা এক্সপ্রেস ওয়ের দৌলতে ব্যাতড়ের গ্ল্যামার বেড়েছে বটে, সেই সময় কিন্তু ব্যাতড়ে দোকানপাটের সেরকম রমরমা ছিল না। একটা কাপড় কিনতে হলে হয় দু’-আড়াই কিলোমিটার রাস্তা ভেঙ্গে আমাদের বাড়ির কাছে আসতে হবে, নয়তো বাকসাড়া বাজার বা চ্যাটার্জী হাট যেতে হবে। অথচ ব্যাতড়ে কোন দোকানই সেরকম ভালো চলে না। ভালো চলার হলে এতদিনে কেউ না কেউ কাপড়ের দোকান খুলে চুটিয়ে ব্যবসা শুরু করে দিত।

বললাম “ভুলেও ব্যাতড়ে দোকান খুলতে যাস না, ওখানে দোকান চলবে না, চলতে পারে না”।

“কেন, ওখানে কি লোক বাস করে না? তাদের কি হোসিয়ারি জিনিসের প্রয়োজন হয় না”?

“হয়, নিশ্চই হয়। কিন্তু তারা অন্য জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনে। বাকিতে বিক্রি করলে অনেক টাকার বিক্রি হবে বটে, তবে সে টাকা কোনদিন ফেরৎ পাবি না। সুট পরা লোককে মাছওয়ালা তার পাওনা টাকা ফেরৎ পাওয়ার জন্য গালাগালি করে প্রায় গায়ে হাত তুলতে যাচ্ছে, এ দৃশ্যও দেখেছি। আরে ওখানেই তো আমার আড্ডা, কাজেই আমার কথা শোন, দোকান করতে হলে অন্য কোথাও দোকান ঘর নেবার কথা চিন্তা কর। এত লাভজনক ব্যবসা জেনেও আজও কেন কেউ ওখানে দোকান করে নি, একবার ভেবে দেখ”।

“তোদের বড় নেগেটিভ অ্যাটিচুড, প্রথমেই হবে না ভেবে নিলি। লেগে থাকলে হবে না, এ হতে পারে না। আরে আর কোন হোসিয়ারি জিনিসের দোকান নেই, এটা তো মঙ্গলের কথা। কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, এই সুযোগ ক’জনের ভাগ্যে জোটে? আমরা একা রাজত্ব করবো রে, একা রাজত্ব করবো। চাকরির যা বাজার, তোরা যে চাকরি পাবিই তার স্থিরতা কোথায়? দোকানটাকে আস্তে আস্তে দাঁড় করাতে পারলে, ভবিষ্যতে চাকরির চিন্তা করতে হবে না। আমরাই অন্য ছেলেদের চাকরি দেব রে”।

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মতো বাঙালিকে ব্যবসায়ে উৎসাহিত করতে চাইলেও, আমি জানি ওখানে দোকান করা, আর হাওড়া ব্রিজ থেকে টাকাগুলো গঙ্গায় ফেলে দেওয়ার নিট ফল একই। বরং দ্বিতীয়টায় পরিশ্রম অনেক কম। কিন্তু পতঙ্গ যেমন মরণ অবশ্যম্ভাবী  জেনেও মোমবাতির দিকে ধেয়ে যায়, দাদাও সেরকম ব্যাতড়সম মোমবাতির দিকে ধেয়ে গিয়ে ওখানেই আমাদের দুই ভাইয়ের ভবিষ্যৎ ও নিজের কষ্টার্জিত অর্থকে পোড়াবার পরিকল্পনা পাকা করে ফেললো। তাকে তখন আটকাবে কে? কোন বাধাই তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে পারলো না।

ঠিক ব্যাতড় মোড়ে বাস রাস্তার ওপরে একটা বেশ বড় চায়ের দোকানের অর্ধেকটা মতো অংশ নেওয়া হ’ল। টাকা কত লেগেছিল ঠিক মনে নেই, তবে আমাদের বাড়ির কাছের তুলনায় অনেকটাই কম। বাকসাড়ার একটা কাঠের দোকান থেকে মজবুত দরজা, দোকানে আলো বাতাস খেলার ব্যবস্থা করার জন্য দরজার ওপরে মোটা লোহার শিক ও মজবুত জাল লাগানো কাঠের জানালা মতোও লাগানো হ’ল। দোকানের মোটা কাঠের দরজায় প্রকান্ড ইন্টার-লক্ লাগানো হ’ল। তিন-তিনবার চাবি ঘুরিয়ে সেটাকে বন্ধ করতে হ’ত। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের স্ট্রংরুমের চাবি দেখার সৌভাগ্য আমার হয় নি, তবে আমি নিশ্চিত, সেই চাবি আমাদের দোকানের চাবির থেকে কিছু ছোটই হবে। এখন ইন্টার-লক্ প্রায় প্রতিটি দোকানেই দেখা গেলেও, তখন কিন্তু এটার বিশেষ ব্যবহার হ’ত না।  কারণ আশেপাশের অনেক দোকান থেকেই লোক এসে, এই দোকানে কী বিক্রি হবে খোঁজ না নিয়ে লকটা দেখে যেত। লকটার কত দাম, আমরা জোগাড় করে দিতে পারবো কী না, ইত্যাদি খোঁজ নিয়েও যেত। শুধু কি তাই? দোকান চালুই হ’ল না, দোকান ছেড়ে  দিলে লকটা যেন তাকে ছাড়া অন্য কাউকে না দেওয়া হয়, এ অনুরোধও অনেক দোকানদারই স্বচ্ছন্দে করে যেত। দোকান শুরু হওয়ার আগেই দোকান বন্ধের ইঙ্গিত তারা দিয়ে গেলেও, দাদার শিক্ষা হ’ল না।

দোকানের শিলিং ও চারপাশের দেওয়াল ভালো দরমার মাদুর দিয়ে ঢেকে, উজ্জল রঙ করে, বেশ সুন্দর ভাবে সাজিয়ে নেওয়া হ’ল।  ভাইয়ের এক বন্ধু, উত্তমের কাকার সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশ ভালো। দিনেশ নামে এই ছেলেটি প্রায় আমারই বয়সি। তার হাওড়া স্টেশনে দত্ত কেবিনের পাশেই একটা দোকান ছিল, এবং সেখান থেকে তার আয়ও যথেষ্টই ছিল। কেন জানি না, সে আমায় খুব পছন্দ করতো। তার কাজে সে কলকাতা গেলে প্রায়ই আমাকে তার সাথে নিয়ে যেত, এবং ভালো মন্দ খাওয়াতো। যাহোক্ সে আমায় বললো দোকানটা ভালো ভাবে সাজাতে এবং এর জন্য সে বেশ কিছু টাকাও ধার হিসাবে দিল। দাদা হাওড়া মঙ্গলা হাট ও অন্যত্র থেকে গেঞ্জি, ব্লাউজ, রুমাল, মোজা, ইত্যাদি বেশ কিছু মাল কিনে এনে দোকান সাজাবার ব্যবস্থাও করে ফেললো। ওর অনেক পরিকল্পনা, একদিকে ক্যাশ কাউন্টার, একদিকে রিসেপশন ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেকটা শ্রী নিকেতন, আদি ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয় বা ইন্ডিয়ান সিল্ক্ হাউসের স্টাইলের করতে হবে। যাহোক্ শেষ পর্যন্ত সামনেটা কাচ দেওয়া একটা কাঠের বেশ বড় শোকেস বা আলমারি ও ওপরে কাঠের তাক লাগানো হ’ল। নীচে একটা বড় চৌকিতে সতরঞ্চি ও চাদর পেতে বসার ব্যবস্থাও করা হ’ল। অনেকগুলো ক্যাশ মেমোর প্যাড ছাপিয়ে, বাঁধিয়ে, সিরিয়াল নাম্বার দিয়ে তৈরি করে নেওয়া হ’ল।

কিন্তু দাদার তাতে মন ভরবে কেন? আগের পরিকল্পনা মতো শুধু হোসিয়ারি দ্রব্য বিক্রিতে সে তার ব্যবসাকে বেঁধে রাখতে রাজি নয়, হোসিয়ারি দ্রব্য বিক্রি ছাড়া কাপড়ও মেশিন বা হ্যান্ড প্রিন্টিং করা হবে বলে ঠিক করা হ’ল। সেইমতো হোসিয়ার্সের নাকের ডগায় একটা প্রিন্টার্স জুড়ে দিয়ে “শুভ্র প্রিন্টার্স এন্ড হোসিয়ার্স” নামে একটা বড় সাইন বোর্ডও তৈরি করা হ’ল। দাদার ছেলের নাম তখন শুভ্র রাখা হবে বলে ঠিক হয়েছিল। এই পর্যন্ত তবু ঠিক ছিল, কিন্তু কে প্রিন্ট করবে, কিভাবে করবে, কত খরচ হবে, প্রিন্টিং চার্জই ব কত হবে, কিছুই ঠিক হ’ল না, কোন ধারণাও নেই, উৎসাহের আতিশয্যে একটা সেগুন কাঠের বেশ উঁচু শক্তপোক্ত বিরাট টেবিল তৈরি করা হয়ে গেল। তৈরির পর দেখা গেল সেটাকে সাত বাই দশ মাপের বিশাল দোকানে রাখার মতো জায়গাই নেই, তাই বিনা প্রয়োজনে তাকে বাড়িতে নিয়ে এসে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় রইলো না।

  একটা শুভদিন দেখে দোকান উদ্বোধন করার সব ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেল। দাদা পারলে তার নিজের চাকরিটাই ছেড়ে দেয় এরকম একটা অবস্থা, কিন্তু বাস্তবে সেটা যেহেতু সম্ভব নয়, তাই আমাদের দুই বেকার ভাইয়ের ওপর সুষ্ঠভাবে দোকান চালাবার কাজের ভারও ভাগ করে দেওয়া হ’ল। তাই ভাই কোথায় থেকে দোকানের কী কী সামলাবে, আমাকে কী কী করতে হবে, সব নির্দেশ দিয়ে দেওয়া হ’ল। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যেমন নিজের দপ্তর ছাড়াও পুলিশ বা অন্য কোন বিশেষ দপ্তর নিজের হাতেই রাখেন, দাদাও সেরকম প্রথম দিনে রিসেপশানের দায়িত্বটা নিজের হাতেই রাখলো। গণেশ-লক্ষ্মীর মুর্তি ও পূজার ফল, ফুল ও আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় দশকর্মা সামগ্রী কেনার ভার পড়লো ভাইয়ের ওপর। অযথা খরচের বহর বেশ ভালোই হবে বুঝতে পারছি, তাই ভাইকে সবকিছু অল্প অল্প করে, দাম করে কেনার পরামর্শ দিয়ে বললাম, “যত সংক্ষেপে পারিস বাজার করবি, খুব বেশি খরচ করিস না”। দাদা কিন্তু সে পথে হাঁটতে মোটেই রাজি নয়। দোকান উদ্বোধনের দিন বয়স্কদের দেওয়ার জন্য বেশ কয়েক প্যাকেট ফিলটার উইলস্ সিগারেট কিনে আনলো।

নির্ধারিত শুভ দিনে দোকান খোলা ও লোক দেখানো পূজাও শুরু হ’ল। ভাই কিন্তু আমার নির্দেশ শুনলো। শুধু শুনলো বললে কম বলা হবে, একটু বেশি মাত্রায় শুনলো ও অক্ষরে অক্ষরে পালন করলো। গণেশ-লক্ষ্মীর যে মুর্তি সে কিনে আনলো, সেটা এতই ছোট,  যে কোন দেবতার মুর্তি বোঝার জন্য ম্যাগনিফাইং গ্লাস নিয়ে আসতে হবে। শুধু কি তাই? বেদানার দানার সাইজের শষা, আপেল  ইত্যাদি কেটেও, আশপাশের দোকানে দেওয়ার মতো পরিমাণ হ’ল না। তার ওপর আবার আপেল কত করে, কলা কত করে, ইত্যাদি দর করতে ও দর কমাতে কমাতে, গণেশ-লক্ষ্মী কত করে দাম জিজ্ঞাসা করে, ও তার দাম কমাতে বলে দোকানদারের বিরাগভাজন হ’ল। দোকানদার জিভ কেটে তাকে জানায়, গণেশ-লক্ষ্মীর দাম করতে নেই। আমাদের কম পয়সায় পুষ্টিকর পুরুত, শ্রীমান মেনো চিৎকার করে গোটা এলাকার লোকের কানের পোকা বার করে মন্ত্র পড়ে পূজো শুরু করলো। পূজা শেষে সবাইকে অণু পরিমানে, হয়তো বা পরমাণু পরিমানেও হতে পারে, প্রসাদ বিতরণ করা হ’ল।

স্থানীয় বাসিন্দারা, যারা আমাদের ভবিষ্যৎ, দোকানে এসে খোঁজ খবর নিয়ে, কী কী করা উচিৎ ছিল উপদেশ দিয়ে, ভবিষ্যতে কিছু কেনাকাটা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, দাদার হাত থেকে ফিলটার উইলস্ নিয়ে, আমাদের মুখের ওপর ধোঁয়ার রিং ছেড়ে, বিদায় নিল।  ব্যাতড়ে যে এত ধুমপায়ী আছে, আগে জানা ছিল না। প্রথম দিনটা বেশ ভালোই কাটলো, অনেক লোকসমাগম হ’ল, হৈচৈ হ’ল। সবই হ’ল, হ’ল না শুধু এক পয়সারও বিক্রি। দাদা শুকনো মুখে আশ্বাস দিল, ধৈর্য ধর, একদিনে সব কিছু বোঝার শেষ হয়ে যায় না। অপেক্ষা কর সুদিন আসবেই। ভাগ্য দেবতা ফিক্ করে হেসে বোধহয় বললেন, “বৎস, আমায় চিনলেও চিনতে পার, এখানকার বাসিন্দাদের আমিই চিনলাম না, তোমরা তো অবোধ শিশু। এখনও সময় আছে, ভালোয় ভালোয় কেটে পড়”।

কাপড় প্রিন্টিং আমাদের কর্ম নয়। বাড়ির কাছাকাছি শিবানী প্রিন্টার্স নামে একটা দোকানের সাথে কথা বলে ঠিক হ’ল, আমরা কাপড় হ্যান্ড্ বা মেশিন প্রিন্টিং-এর অর্ডার পেলে, উভয় পক্ষরই একটা লাভ রেখে ওরা প্রিন্ট করে দেবে। সেইমতো ওরা কোন কাপড়ের জন্য কত চার্জ নিতে হবে, তারও একটা চার্ট দিয়ে দিল। অল্প হলেও মাঝেমাঝে এক-আধটা অর্ডার পাওয়া যেত। কিন্ত অসুবিধা দেখা দিল অন্য জায়গায়, কাপড় চেনায়। যে কাপড়টা প্রিন্ট করতে দেওয়া হ’ল, সেটা কী কাপড়- সুতি, সিল্ক, গরদ, না অন্য কিছু? প্রিন্টের চার্জ যে আবার কাপড়ের ওপর নির্ভর করে। আমরা একরকম চার্জ বলতাম, দেখা যেত হয় বেশি চার্জ শুনে কাস্টোমার মুখ বেঁকিয়ে কেটে পড়তো, নাহয় মনের আনন্দে অর্ডার নিয়ে প্রিন্ট করতে দিতে গিয়ে দেখা যেত, কাপড় চিনতে না পারায় চার্জ অনেক কম চাওয়া হয়েছে।

এইভাবে দিন কাটতে লাগলো। লোকে শুনেছি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে যায়, আমাদের কাজটা ছিল আরও বিরক্তিকর,   কষ্টকরও বটে— ঘরের খেয়ে ব্যাতড়ের দোকান খুলতে যাওয়া। দিনের পর দিন এক পয়সাও বিক্রি না হওয়ায় ক্রমশই মনের জোর ও ইচ্ছা কমে যেতে লাগলো। আমি বা ভাই, দু’জনে সকাল বিকেল পালা করে সব কাজ ফেলে বুনো মোষ তাড়াতে যেতাম। ছুটির দিন সকালে বা অন্যান্য দিনে মাঝেমাঝে দোকানের মালিক দোকান তদারকিতে যেতেন। আমাদের দোকান খুলতে যাওয়ার অনিচ্ছা দেখে ও কষ্ষ্টের ভার কমাতে, বাবাও সকালের দিকটায় মাঝেমধ্যেই দোকানে বসতে শুরু করলেন। কর্মচারীর সংখ্যা বাড়লেও বিক্রি  কিন্তু এক পয়সাও বাড়লো না। বিভিন্ন রকমের বই পড়া ও লেখার একটা অভ্যাস বাবার চিরকালই ছিল। তিনি ছিলেন চরম নাস্তিক, বিভিন্ন ধর্মের সংস্কার ও কুসংস্কার, ভণ্ডামি, গোঁড়ামি, ইত্যাদি নিয়ে তিনি লিখতেন। আমরা বলতাম দপ্তর। বাবা তাঁর কাগজপত্র বা অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে সকালের দিকে দোকানে গিয়ে বসতেন। একটাও খদ্দেরের ঝামেলা নেই, তাই বিরক্ত করারও কেউ নেই। রথ দেখার অঢেল সুযোগ থাকলেও কলা বেচার সুযোগ বা ঝামেলা না থাকায়, নিজের মনে নিশ্চিন্তে লেখাপড়া করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। মাঝে মধ্যে পথ ভুলে এক আধটা খদ্দের যে আসতো না, তা তো নয়। এদের নিয়ে কত অভিজ্ঞতা কত স্মৃতি।

শুধু মাত্র ব্লাউজের দোকান করতে গেলে যে পরিমাণ মূলধন লাগে, সেই পয়সায় একটা বড়সড় ইস্পাত ফ্যাক্টরী তৈরি করা সম্ভব। বিশ্বাস হ’ল না তো? জানতাম বিশ্বাস হবে না। সবাই শুধু খনির বাইরেটাই দেখে, ভিতরের ছবিটা আর ক’জন জানে বা খবর রাখে! আচ্ছা ঠিক আছে, বোঝাবার সুবিধার্থে বরং একদিনের ঘটনা বলি, তাতেই চিত্রটা বেশ পরিস্কার হয়ে যাবে বলে মনে হয়। এক ভদ্রমহিলা এলেন—“দাদা, একটা চৌত্রিশ সাইজের লাল রঙের ব্লাউজ দেখি”। অনেকদিন পরে স্বয়ং লক্ষ্মীর আগমন, তাই মহানন্দে ব্লাউজের বাক্স হাতড়াতে শুরু করলাম। কিন্তু কপাল মন্দ, চৌত্রিশ সাইজের বিভিন্ন রঙের অজস্র ব্লাউজের মাঝে লাল রঙের দেখা মিললো না।

“নেই? আচ্ছা ঠিক আছে, সবুজ রঙের হবে? তাই একটা দিয়ে দিন”। ঈশ্বর অশেষ করুণাময়, খদ্দেরের পছন্দমতো সবুজ রঙের ব্লাউজটি তিনি বাক্সে পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখার ব্যবস্থা করার সুপরামর্শ আগেই দিয়েছিলেন। ব্লাউজটা বার করে তাঁর হাতে দিলাম। তিনি ব্লাউজটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখে, ঠিক আছে….. বলে চৌকির উপর রাখলেন। মনে মনে খুশি হয়ে ব্লাউজটা প্যাক  করতে যাব, ঠিক এই সময় ভদ্রমহিলা তাঁর অসমাপ্ত কথাটি শেষ করলেন—“আপনি বরং এক কাজ করুন, এয়ার হোস্টেস্ গলা দিন”। মরেছে, গলার আবার রকমভেদ আছে জানা ছিল না। ভদ্রমহিলা এবার নিজেই ব্লাউজগুলো নাড়াচাড়া করে বললেন, “নাঃ! নেই দেখছি, তাহলে বরং গোল গলা নীল রঙের একটা ব্লাউজই দিয়ে দিন”। যদিও বা গোল গলা, নীল রং, চৌত্রিশ সাইজ, সব কিছুই মিললো, কিন্তু দেখলাম বিয়েতে ঠিকুজি মেলার থেকেও, পছন্দমতো ব্লাউজ মেলা অনেক শক্ত। ভদ্রমহিলা বললেন, “এটাতো সামনে বোতাম, এটা নিয়ে আমি কী করবো? পিছনে বোতাম দেখে বার করুন, আর হ্যাঁ পাইপিন গলা দেবেন”। ব্যাস হয়ে গেল, বাড়া ভাতে ছাই। শেষে ভদ্রমহিলা অনেক ঘেঁটে তাঁর পছন্দমতো সব কিছু মিলিয়ে একটা ব্লাউজ বার করলেন। কিন্তু আমাদের ফাটা কপালে এত সুখ সইবে কেন? সবকিছু মিললেও সাইজটা ছত্রিশ। বললাম, “ছত্রিশ সাইজ হচ্ছে, এটা যখন পছন্দ হয়েছে তখন নিয়ে নিন্, একটু টিঁকে নেবেন”। অন্য কেউ হলে হয়তো বলতেন “মামার বাড়ি আর কি”, রাগের বশে হাত চালিয়েও দিতে পারতেন। কিন্তু ভদ্রমহিলা সত্যিই ভদ্র, তাই কোন কথা না বলে ব্লাউজ রেখে দোকান ছেড়ে বেড়িয়ে গেলেন।

 দোকানের কিছুটা দুরেই বাস রাস্তার ওপরেই একটা একতলা বাড়ির ছাদে একটা পোল্ট্রি ছিল। ঐ পোল্ট্রির মালিক আমার বন্ধু হওয়ার সুবাদে ওখানেও আমাদের আড্ডা ছিল, মঝেমাঝেই অবিক্রিত মাংস দিয়ে জমিয়ে পিকনিকও হ’ত। এই বাড়িতে একজন অত্যন্ত শুচিবাই গ্রস্ত লোক, স্ত্রী পু্ত্র নিয়ে বসবাস করতো। তার বড় ছেলে, কচা একটু সরল সাদাসিধে কম বুদ্ধি সম্পন্ন ছিল। বয়সে আমার থেকে অনেক ছোট হলেও, পরিচিতি সুত্রে মঝেমাঝে দোকানে এসে বসতো, আমার বা ভাইয়ের সাথে গল্পগুজব করতো।

একদিন এক ভদ্রলোক দোকানে এসে মুগুর না ছাতা, কী যেন মার্কা রুমাল চাইলেন। তন্নতন্ন করে খুঁজেও নির্দিষ্ট চাহিদা মার্কা রুমাল খুঁজে পেলাম না। ভদ্রলোকেরও এক গোঁ, ঐ নির্দিষ্ট মার্কা রুমাল ছাড়া অন্য কোন রুমাল তিনি কিনবেন না। তাতে যদি জামার হাতায় মুখ মুছতে হয় সেও ভালো। যাহোক্, বাপ ঠাকুর্দার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, অন্য কোন মার্কা রুমাল না কিনে, ভদ্রলোক চলে গেলেন। ভদ্রলোক চলে যাবার পর রুমালের বাক্স গোছাতে গিয়ে ভদ্রলোকের বহু কাঙ্খিত, পূর্ব পুরুষদের কাছে প্রতিশ্রুত সেই বিশেষ মার্কা রুমাল আবিস্কৃত হ’ল। রুমালের বাক্স গোছানো মাথায় উঠলো, এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে কচাকে বললাম, “শিগগির যা, লোকটাকে খুঁজে বার করে ডেকে নিয়ে আয়। কচাও একমুহুর্ত সময় নষ্ট না করে দমকল কর্মীর মতো ছুটে বেড়িয়ে গেল লোকটাকে পাকড়াও করবার জন্য। মনে একটা পুলকিত ভাব নিয়ে কচার আগমনের অপেক্ষায় বসে থাকলাম— আজ সমান্য হলেও বিক্রি কে আটকায়? দীর্ঘক্ষণ পরে ঘেমে নেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে কচা এসে জানালো কোথাও লোকটাকে খুঁজে পাওয়া গেল না। দীর্ঘদিন অসহ্য গরমের পর কালো মেঘ করে এসেও বৃষ্টি হ’ল না। রুমাল লোকটার পকেটে স্থান পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে রুমালের বাক্সেই রয়ে গেল, আর কিছু টাকা আমাদের পকেটে স্থান পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ হারিয়ে লোকটার পকেটেই রয়ে গেল।

 দোকানে মাঝেমাঝে চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকার বিক্রি হ’ত, তবে তা অনেক দিন পর পর। বেশির ভাগ দিনই নেট সেল শূন্য। বিক্রি বাড়াবার জন্য নতুন নতুন অনেক পন্থা, অনেক ছলনার আশ্রয় নিলাম। ক্যাশ মেমোর প্যাড পাল্টে দিলাম। অনেক দিন হয়ে গেল, এখনও যদি ক্যাশ মেমো নাম্বার দশ কী এগারো হয়, লোকে কী ভাববে? তাই শেষের দিকের নাম্বার যুক্ত একটা নতুন ক্যাশ মেমোর প্যাড বার করলাম। আমার কথামতো বন্ধুবান্ধবরা মাঝেমাঝে দোকনে এসে অনেক কিছু নাড়াচড়া করে, অনেক কিছু প্যাকেট করে নিয়ে যেতে লাগলো। সবাই যদি দেখে দোকানে অনেক বিক্রি হচ্ছে, তাহলে তারাও তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস অবশ্যই হাতের কাছের দোকান থেকেই কিনতে আসবে। টাকায় টাকা আনের মতো যদি খদ্দেরে খদ্দের আনতে পারে। বন্ধুদের কাছ থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া মালগুলো আবার দোকানে ফিরে আসতো। কিন্তু এত কিছুর পরেও সুফল কিছু হ’ল না।

দোকানে খদ্দেরের দেখা না মিললেও, অন্যান্য অনেক শ্রেণীর লোকের আগমনের অভাব মোটেই ছিল না। অনেকেই দোকানে আসতো, বিভিন্ন জিনিস নামিয়ে এটা সেটার দাম জিজ্ঞাসা করে শেষে জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে, “কিছু কেনাকাটা করার আছে, একদিন আসতে হবে” বলে কথার ইতি টেনে বিদায় নিত। কেনাকাটা করতে কিন্তু তাদের কোনদিনই আসতে দেখিনি। একদিন একজন এসে এটা সেটা দেখে দাম জিজ্ঞাসা করতে করতে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলো, “আচ্ছা ঐ ওপরের তাকে লালচে রঙের বাক্সটার ওপরে যে বাক্সটা আছে, ওতে কী আছে একবার দেখি”। বিরক্ত হয়ে বললাম “ওতে কী আছে আপনার কী দরকার? আপনার কী চাই সেটা বলুন”। একটু ঘাবড়ে গিয়ে সে বললো, “না, আজকে কিছু নেব না, একদিন আসতে হবে। খদ্দেরকে জিনিস দেখাতে না চাইলে কী করে চলবে”? তাকে কোনমতে বিদায় করা হ’ল।

আর একদিন দোকানে এসে দেখি এক বৃদ্ধ, ভাইকে কাপড় প্রিন্টিং নিয়ে প্রশ্ন করছেন। ভাইও কিছু আয়ের গন্ধ পেয়ে চকচকে চোখে তাঁকে কাপড় প্রিন্টিং-এর ইতিকথা ফলাও করে বোঝাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

“আচ্ছা ভাই একটা কাপড় তিন ইঞ্চি পাড় হবে আর মাঝে বুটি বুটি হবে, কত পড়বে”?

“হ্যান্ড প্রিন্টিং হবে, না মেশিন প্রিন্ট”?

“না না, আমি তা বলছি না, আমি বলছি তিন ইঞ্চি পাড় হবে, আর মাঝে বুটি বুটি”।

“হ্যাঁ, তা তো বুঝলাম, কিন্তু প্রিন্টিং টা হ্যান্ড প্রিন্ট হবে, না মেশিন প্রিন্ট? হ্যান্ড প্রিন্ট হলে এক রকম খরচ, মেশিন প্রিন্ট হলে আর এক রকম খরচ। তাছাড়া কাপড়ের ওপরেও খরচ নির্ভর করে। আপনি কোন প্রিন্ট করাবেন বলুন”।

“আবার ছেলেমানুষি করে! আমি তো হ্যান্ড প্রিন্ট, মেশিন প্রিন্টের কথা বলছি না। আমি বলছি তিন ইঞ্চি পাড় হবে”, এবার তিনি আবার দু’টি আঙ্গুল দিয়ে তিন ইঞ্চি কতটা দেখিয়ে বললেন, “আর কাপড়ের মাঝে বুটি বুটি হবে”।

“সেটা তো বুঝেছি, কিন্তু কী প্রিন্ট করবেন সেটা তো বলুন”।

“আবার সেই ছেলেমানুষি করে। আমি তো মেশিন বা হ্যান্ড প্রিন্টের কথা বলছি না, আমি বলছি তিন ইঞ্চি পাড় হবে আর ……..”

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম, এবার দু’জনের কথাবার্তার মাঝে আমি ঢুকে পড়তে বাধ্য হয়ে বললাম, “আর মাঝে বুটি বুটি হবে এই তো? সেটা তো অনেকক্ষণ ধরে শুনছি, কিন্তু কী প্রিন্ট করবেন বাড়ি গিয়ে ঠিক করে, কাপড় সঙ্গে করে নিয়ে এসে দর জেনে যাবেন। যত্ত সব…….”।

বৃদ্ধটি এবার একটু দমে গিয়ে, পড়ে একদিন আসতে হবে বলে বিদায় নিলেন।

তবে রাতের অন্ধকারের পর দিনের আলো ফোটার মতো দুঃখের পর সুখ আসে, দুঃসময় কেটে গিয়ে সুসময়ও আসে। কবি বলেছেন “চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়”। আমাদেরও হঠাৎই সুদিন এসে হাজির হ’ল, একদিনের জন্য হলেও সুদিন তো বটেই। হঠাৎ এক ভদ্রলোক এসে বললেন, “দাদা, মাথায় বাঁধার বড় রুমাল হবে”?

হবে মানে? বিলক্ষণ হবে, একশ’ বার হবে, হাজার বার হবে। প্রথম দিন থেকে তিনটে বড় রুমাল বাড়ির তিনজন বিবাহযোগ্যা অবিবাহিত কন্যার মতো দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে বিরাজ করছে। পছন্দ করা তো দুরের কথা, কোনদিন কেউ তাদের একবার চোখের দেখা দেখতেও আগ্রহ প্রকাশ করেন নি। আজ পাত্র পক্ষের মতো ভদ্রলোক বিনা আমন্ত্রণে এসেছেন কন্যা পছন্দ করতে।

খুব উৎসাহ নিয়ে তিনটি রুমালই তাঁর সামনে মেলে ধরলাম। ভদ্রলোকের মুখ থেকে একদিন আসতে হবে শোনার জন্য প্রস্তুত হবার আগেই, কোন কথা না বলে রুমালের দাম জিজ্ঞাসা করে দাম মিটিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক বিদায় নেওয়ার আগে খাটো গলায় বললেন, “আর বলবেন না, মেয়েটার মাথায় উকুন হওয়ায় ন্যাড়া করে দিয়েছি। তাই তার মাথায় বাঁধার জন্য বড় রুমালের প্রয়োজন”। ভাবলাম জিজ্ঞাসা করি— “দাদা, আপনার আর মেয়ে নেই”? হা ভগবান, ভদ্রলোকের তিনটে মেয়ে হলে কত ভালো হ’ত, তিনটে না  হোক, অন্তত দুটো মেয়ে কেন হ’ল না। কেন তাঁর স্ত্রীর মাথায়ও উকুন হ’ল না।

ক্রমে অনিয়মিত ভাবে দোকান খোলা শুরু হ’ল। বিকালে দোকান খুলবো বলে দরজার রাক্ষুসে চাবি তিনবারের মধ্যে দু’বার ডান দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছি, এমন সময় পিছন থেকে শুনলাম “কী রে দোকান খুলছিস”? পিছন ফিরে দেখি দিলীপ, সে ব্যাতড়ে আড্ডা মারতে এসেছে। আমি জানি দোকান রাত বারটা পর্যন্ত খুলে বসে থাকলেও যা হবে, দোকান না খুললেও সেই একই ফল হবে। তাই চাবিটা ডানদিকে আর একবার না ঘুরিয়ে, বামদিকে দু’বার ঘুরিয়ে অজিতের চায়ের দোকানে গেলাম আড্ডা মারতে। ভাইও সকালের দিকে দোকানে গেলে, বিক্রি হোক না হোক সিঙ্গাড়া জিলিপীর পছনে খরচা করতে শুরু করেছে। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের মতো রায় সাম্রাজ্যের ব্যবসার পতন রোধ করতে দাদা প্রায়ই অফিস থেকে ফিরে সচক্ষে দোকানের হাল-হকিকত দেখতে যায়।

দোকানের এক কোণে একটা কাঠের তাকে বেচারা গণেশ লক্ষ্মীর মুর্তি মাকড়সার জাল আর ঝুলে ঢাকা পড়ে গেছে। ভাই একদিন বললো— “রাঙাদা এটার কি অবস্থা রে, লোকে দেখলে কী ভাববে? দোকান, দোকানের কর্মচারী, দোকানের মালিকের মতোই দোকানের ভাগ্য বিধাতাদ্বয়েরও করুণ অবস্থা। সেই উদ্বোধনের পর থেকে আপেল, কলা, গুঁজিয়া তো দুরের কথা, একটু খাবার জল পর্যন্ত তাঁদের কপালে জোটেনি। আর জুটবেই বা কিভাবে, তাঁদের কথা কারো মনেও ছিল না, প্রণাম দুরে থাক, একবার ফিরেও কেউ তাকিয়ে দেখেনি পর্যন্ত। ঈশ্বর করুণাময়, তাই এত অবহেলার পরেও মাঝেমধ্যে দশ-বিশ টাকা বিক্রির ব্যবস্থা করে দেন, নিমকহারাম মানুষ এরপরেও তাঁদের প্রতি আস্থা রাখে না, তাঁদের অস্তিত্ব বিশ্বাস করে না, নিজেকে নাস্তিক বলে গর্ববোধ করে। সে যাহোক্, দোকানে একটা ফুল ঝাড়ু ছিল, সেটা দিয়ে দোকানের ভিতর ও দোকানের ঠিক বাইরে বাস রাস্তার কিছুটা অংশ ঝাঁট দিয়ে পরিস্কার করা হ’ত। লক্ষ্মী-গণেশের দিকে তাকিয়ে খুব খারাপ লাগলো, সত্যিই খুব খারাপ দেখাচ্ছে। ফুল ঝাড়ুটা দিয়ে হাত বাড়িয়ে যেমন করে দেওয়ালে ঝুল ঝাড়ে, সেইভাবে লক্ষ্মী-গণেশের মুর্তি থেকে ঝুল ও মাকড়সার জাল পরিস্কার করে দিলাম।

আমাদের দোকানের লক্ষ্মী যে এত জাগ্রত আগে কে জানতো? মাকড়সার জাল ও ঝুলমুক্ত হয়েই তিনি দোকানের মালিককে এক বর দিয়ে ফেললেন। জীবনের সব ক্ষেত্রেই তাই হয়, দলগত ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় যে খেলোয়ারের একক প্রচেষ্টা বা একক কৃতিত্বেই জয়লাভ হোক না কেন, জয়মাল্য কিন্তু দলনেতার গলাতেই জ্বলজ্বল করে। ব্যবসা বা চাকুরির ক্ষেত্রেও সেই একই ছবি, যে কর্মচারীর পরিশ্রম বা কৃতিত্বেই উন্নতি হোক না কেন, নেপো সেই মালিক বা উর্দ্ধতন অফিসারটি।

হ্যাঁ যা বলছিলাম, মাকড়সার জালের গুটিমুক্ত হয়েই তিনি দাদাকে এক বর দিয়ে বসলেন। দিন দুয়েক পরেই দাদা অফিস থেকে লাফাতে লাফাতে বাড়ি ফিরলো। কী ব্যাপার, না অফিস যাওয়ার পথে নির্দিষ্ট রেলওয়ে স্টেশনে নেমে রেল লাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাবার পথে পাঁচশ’ টাকা কুড়িয়ে পেয়েছে। বললাম খুব ভালো খবর, খাইয়ে দে, কাশ্মীর ঘুরে আয়। ১৯৭৪ সালে কিন্তু পাঁচশ’ টাকার অনেক মূল্য ছিল। আমি এরও দু’বছর পরে পাঁচশ’ নয় টাকা মাইনেতে ব্যাঙ্কে ঢুকেছিলাম। দাদা টাকা পেয়ে খাইয়েছিল কী না মনে নেই, তবে কাশ্মীর গিয়ে টাকা অপচয় করে নি। আমাদের সাথে কোন পরামর্শ না করেই সে পরের মঙ্গল বারে মঙ্গলা হাট গিয়ে প্রচুর গেঞ্জি, ব্লাউজ, ও আরও অনেক কিছু মালপত্র কিনে এনে হাজির করলো।

আগের মাল নিয়ে কী হবে তার ঠিক নেই, নতুন মালপত্রে দোকান ভরে গেল। দাদা জানালো, সামনে পূজো আসছে, নতুন মালপত্র না হলে বিক্রি হবে কী করে? এবার আবার অন্যভাবে নতুন বিপদ দেখা দিল। মঙ্গলা হাটে কার কাছ থেকে গেঞ্জি কিনে এনেছে কে জানে, সে কিন্তু দাদার মতো একজন অভিজ্ঞ প্রকৃত বস্ত্র ব্যবসায়ীকে চিনে নিতে ভুল করে নি।

একজন খদ্দের এসে বললো, “দাদা, একটা ছত্রিশ সাইজের গেঞ্জি দিন তো”। বাক্সের গায়ে, গেঞ্জির পিছনে, সর্বত্র ছত্রিশ লেখাটা জ্বলজ্বল করছে। খুশি মনে একটা গেঞ্জি বার করে দিলাম। লোকটা গেঞ্জিটা খুলে বোকার মতো আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তার হাতের গেঞ্জির দিকে নজর যেতে আমি তো অবাক। গত সপ্তাহে যে বাচ্চাটা জন্মেছে, গেঞ্জিটা তারও ছোট হবে। আবার এমনও হয়েছে যে বত্রিশ সাইজের গেঞ্জি, কিন্তু মুষ্টিযোদ্ধা টাইসনেরও হাঁটু ঢেকে যাবে। ফলে বেদের কাছে সাপ যেমন বেতের ঝাঁপিতে  থাকে, মাঝে মাঝে দর্শকদের ঝাঁপি থেকে সাপ বার করে দেখিয়ে আবার ঝাঁপিতে তুলে রাখে, আমরাও সেরকম মাঝেমাঝে খদ্দেরকে গেঞ্জিগুলোও দেখিয়ে আবার কাগজের বাক্সেই সযত্নে পুরে রেখে দিতাম। পার্থক্য শুধু একটাই, বেদে সাপ দেখিয়ে দর্শকদের কাছ থেকে পয়সা পায়, হাততালি কুড়ায়, আর আমরা গেঞ্জি দেখিয়ে খদ্দেরদের কটুক্তি শুনি, হাসির খোরাক হই।

ক্রমে পূজো এসে গেল। একদিন আমাদের দোকানে নব্বই না এরকম কত টাকার বিক্রি হয়েছিল, এটাই আমাদের সর্বকালীন রেকর্ড সেল।

দোকানে একটু উঁচুতে নাইলন দড়ি বেঁধে রুমাল, বা কেউ শাড়ী প্রিন্ট করতে দিলে টাঙ্গিয়ে রাখা হ’ত। তিনটে বড় রুমালের একটা তবু উকুনের বদান্যতায় বিক্রি হয়েছে। তিনটে বাটিক প্রিন্টের চাদর কেনা হয়েছিল, ঠান্ডার দিন আসবে বলে সেগুলোও নাইলন দড়িতে স্থান পেল। কিন্তু চাদরের ব্যাপারে কেউ যখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এল না, তখন ঈশ্বরই তাঁর দূতকে আমাদের সাহয্যে পাঠালেন।

একদিন বাবা দোকান থেকে ফিরে বললেন—“হ্যাঁরে, দোকানে ক’টা চাদর ছিল বলতো”?

“কেন, তিনটে”।

“ছি-ছি-ছি। আমার তখনই কেমন সন্দেহ হয়েছিল। তখনই কেন যে ধরলাম না”।

এবার ঘটনাটা সবিস্তারে জানা গেল। কোন খদ্দের না আসায় অন্যান্য দিনের মতোই তিনি তাঁর দপ্তর লেখায় ব্যস্ত ছিলেন। এমন সময় তিনজন সাঁওতাল মহিলা দোকানে এসে— এই চাদরটা কত দাম, এই ব্লাউজটা কত, ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করে বাবাকে ব্যস্ত রাখে। চাদর, রুমাল, ব্লাউজ, সায়া, ইত্যাদি বাবার চোখের সামনে নাড়িয়ে নাড়িয়ে একজন দাম জিজ্ঞাসা করে। আর একজন একই ভাবে অন্য কোন জিনিস নিয়ে দাম জিজ্ঞাসা করে, কিছু কম হবে কী না, ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করে। আসলে ঐ ভাবে বাবার চোখের সামনে জিনিসগুলো মেলে ধরে, বাবার দৃষ্টিপথে বাধা সৃষ্টি করে। সেই সুযোগে তাদের মধ্যে কেউ একটা চাদর সরিয়ে ফেলে। কিছুক্ষণ পরে কোন কিছু না নিয়ে চলে যাওয়ার সময় বাবার সন্দেহ হয়, কিন্তু কোন জিনিস খোয়া গেছে কী না, ঠিক বুঝতে পারেন না।

সব শুনে দাদা দুঃখ প্রকাশ করলো, অনেকগুলো টাকা ক্ষতি হয়ে গেল বলে মন খারাপ করলো। ভাই বললো আমি থাকলে ঠিক ধরতাম। ধরতে পারলে মজা দেখিয়ে দিতাম। আমি শুধু বললাম, যাক্, তবু একটা চাদর অন্তত পাচার হ’ল।

আমাদের দোকানটার ঠিক পাশেই চা, পাঁউরুটি, আলুর দম, ঘুগনি, ডিম ভাজা ইত্যাদির দোকান। উল্টো দিকে ও পিছন দিকে দু’-দুটো মিষ্টির দোকান, প্রায় উল্টো দিকেই মাংসের দোকান, এবং পাশেই সবজি ও মাছের বাজার। কিন্তু কোথাও তেমন উল্লেখযোগ্য মাছির উৎপাত চোখে পড়েনি। কিন্তু আমাদের কাপড়ের দোকানে খদ্দেরের আগমন অত্যন্ত কম হলে কি হবে, মাছির আগমনের অভাব ছিল না। তাই সুষ্ঠভাবে এক মিনিট বসা যেত না। লোভনীয় সব জায়গা ও দোকান ছেড়ে কাপড়ের দোকানের প্রতি তাদের আসক্তির কারণ জানা ছিল না। তাই প্রায় প্রতিদিনই রাতে দোকান বন্ধ করে আর সব দোনদাররা যখন সারাদিনের বিক্রির টাকা নিয়ে বাড়ি চলে যেত, আমি আর ভাই তখন দোকানের দরজা বন্ধ করে, ন্যাকড়ায় র ফিনাইল মাখিয়ে কাপড় ঝোলাবার দড়িতে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘষে রাখতাম। এই কাজ সুসম্পন্ন হলে, ফিনাইলে জল মিশিয়ে, দোকানের ভিতর চারপাশে ছিটিয়ে, দরজায় মক্ষম তালা লাগিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতাম। না, মিথ্যে বলবো না, মাঝে মধ্যে দশ-বিশ টাকা বয়ে নিয়ে বাড়ি ফেরার ঝুঁকিও নিতে হ’ত।

আমাদের দুঃখের কথা শুনে, কে একজন একদিন দয়াপরবশ হয়ে মাছির হাত থেকে মুক্তি দিতে, বেগন বেট্ না টিউগন বেট্ নামে একটা প্যাকেট উপহার দিল। ভিতরে বোর্ণভিটার মত দেখতে, দানা দানা একরকম পদার্থ। এগুলো চৌকির ওপর চারপাশে ছিটিয়ে দিতাম। মুহুর্তে দানাগুলোর ওপর মাছির ভিড় জমে যেত। খেত না শুঁকতো ঠিক জানি না, তবে তাতে মাছি বসলেই মরে যেত। সেই মরা মাছির ওপর আরও অনেক মাছি শোক জানাতে এসে বসতো এবং বিষক্রিয়ায় না স্বজন হারাবার শোকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বলতে পারবো না, মৃত্যমুখে পতিত হ’ত। এভাবে এত মাছি মরতে শুরু করতো, যে চৌকির ওপরে পাতা চাদর, কালো মাছিতে ছেয়ে যেত। সাদা চাদরের ওপর ছোট ছোট কালো ফুল ছাপা হলে দেখতে যতই সুন্দর হোক্, ফুলগুলো মরা মাছির হলে, সে সৌন্দর্য আর খুঁজে পাওয়া যায় না, বরং লজ্জা করে ঘৃণাবোধ হয়। সে যাইহোক্, এর ফলে নতুন কাজ জুটলো— কিছুক্ষণ পর পরই কাগজে করে মরা মাছি তুলে দোকানের বাইরে রাস্তায় ফেলা। দোকানের মেঝেতেও অনেক মাছি মরে পড়ে থাকতো, ফলে সেই সুস্বাদু মরা মাছির লোভে দলে দলে লাল পিঁপড়ের আগমন শুরু করলো। সারাদিন কাপড় বিক্রির ঝামেলা, কষ্ট, বা পরিশ্রম না থাকলেও, আনুষঙ্গিক অকাজের অভাব ছিল না।

এরমধ্যে আবার এক নতুন উৎপাত এসে হাজির হ’ল। দোকানের ভিতর চারপাশের দেওয়ালে ভালো দরমার মাদুর লাগিয়ে রং করে দোকানের সৌন্দর্যবৃদ্ধি করা হয়েছিল। এই দেওয়াল ও মাদুরের মাঝখানে কিভাবে একটা চড়াই পাখি ঢুকে বেরতে না পেরে মরে গেল। প্রথমে বোঝা না গেলেও বিশ্রী পচা গন্ধের উৎসের খোঁজ করতে করতে, ব্যাপারটা জানা গেল। কিন্তু কোনমতেই পাখিটাকে  সেখান থেকে বার করে আনা সম্ভব হ’ল না। ফলে বাপারটাকে সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় রইলো না।  শোকের মতো সময় গন্ধও কমায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা আমাদের চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে দিল না। পচা গন্ধ উত্তরোত্তর বাড়তেই লাগলো, তার সাথে ফুলকপিতে যেরকম পোকা দেখা যায়, সেরকম পোকা সারা দোকানয় ঘুড়ে বেড়াতে শুরু করলো। ফলে পোকা মেরে বাইরে ফেলা ও চড়া গন্ধের ধুপ জ্বালানোর কাজটাও নতুন করে ঘাড়ে এসে চাপলো।

এইভাবে আরও বেশ কিছুদিন চলার পর, ঠিক হ’ল যে এইভাবে দোকানটাকে রেখে দেওয়া আর সম্ভব নয়। কিন্তু দোকান বন্ধ করবো বললেই তো আর বন্ধ করা যায় না। দোকনটা কাউকে হস্তান্তর, মানে গছাতে হবে। অত মালপত্রের একটা সদগতি করতে হবে, দোকানের জন্য অনেকগুলো টাকা সেলামি দেওয়া হয়েছে, তার একটা ব্যবস্থা করতে হবে। সেইমতো চেষ্টা চালানো শুরু হ’ল।

ভাইয়ের বন্ধু উত্তমের সেই কাকা, অর্থাৎ দিনেশ বললো মোহনকে বিক্রি করে দাও। মোহন একটা বড় ফার্নিচারের দোকানের মালিক, এখন তার বিরাট ব্যবসা। এখনকার মতো এত বড় ও নামী না হলেও, তখনও তার ব্যবসা সত্যিই খুব বড় ছিল। মোহনের সাথে দিনেশের একটা সুসম্পর্ক ছিল। এত সহজে দোকান বিক্রির গন্ধ পেয়ে আমরা তো হাতে চাঁদ পেয়ে গেলাম। কথায় কথায় দিনেশ জানালো যে মোহন ওখানে ফার্নিচারের একটা শোরুম করতে চায়। যদিও ব্যাতড় মোড় যেকোন ব্যবসার শোরুম করার পক্ষে আদর্শ জায়গা, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। লোকে আসবে, এটা সেটা দেখবে, তারপর কিছু কেনাকাটা করার ছিল, একদিন আসতে হবে বলে চলে যাবে। ওখানকার লোকেরা দেখতে খুবই আগ্রহী, কিনতে নয়। তবু কিছু বলতে হয় বলে দিনেশকে বললাম, অতটুকু দোকানে কাঠের ফর্নিচারের শোরুম কিভাবে করবে? উত্তরে দিনেশ জানালো, মোহন ঠিক করে নেবে, ও নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না।

আমি অবশ্য ভাবছিও না, কোনমতে দোকানটাকে অন্যের ঘাড়ে গছাতে পারলে বেঁচে যাই। কিন্তু দিনেশ যে মূল্যে দোকান বিক্রির কথা বলছে, তাতে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে আমি জানালাম যে এই দামে দোকানটা ছাড়ায় অসুবিধা আছে। দিনেশ কিন্তু দোকানটা মোহনকে দেওয়ার জন্য ভীষণ উৎসাহ দেখাতে লাগলো। তার টাকাগুলো ফেরৎ দিতে হবে, কাজেই দোকনটার একটা গতি করতে হবে। খদ্দের যখন পাওয়া গেছে, তখন দোকানটা এখনই ছেড়ে দেওয়া উচিৎ, ইত্যাদি নানা কথা বলতে শুরু করে দিল। এবার যেন তার কথাগুলোয় একটু আদেশের সুরও মিশে আছে বলে মনে হ’ল। আরও কিছু দিন এই অবস্থায় কাটার পর একদিন “আমিও তিলির বাচ্চা, কী করে টাকা আদায় করতে হয় দেখে নেব” ইত্যাদি বলতেও ছাড়লো না। শেষে বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকার পরে, অরুন সাধুখাঁরা দোকানটা নিতে চাইলো। বড়বাজারে ওদের ভোজ্য তেলের ব্যবসা, ভালোই পয়সা আছে বলে জানতাম। ব্যতড়ের দোকানটা তারা তেলের দোকান করতে চায়। সে যা খুশি তার দোকান করুক, দোকানটা কোনমতে গছাতে পারলে বাঁচি। মনে মনে শুধু ভাবলাম, ঐ তেলের অর্ধেক স্থানীয় লোককে মাখালেও তারা তেল কিনতে আসবে না।

শেষপর্যন্ত অনেক দরদস্তুর করে, দোকানটা হস্তান্তরের একটা পাকাপাকি ব্যবস্থা হ’ল।

আমি আর ভাই দোকানে ঢুকে, দরজা বন্ধ করে সমস্ত মালপত্র প্যাক করা শুরু করে দিলাম। চাদরের মধ্যে বেশ কিছু মাল বেঁধে একটা একটা করে গাঁটরি বাঁধা শুরু হ’ল। দোকানের ভিতর সাইকেলটা ঢুকিয়ে, দরজা বন্ধ করে, সাইকেলে একটা গাঁটরি ভালো  করে বেঁধে, আমি সাইকেলে বসে চালাবার জন্য প্রস্তুত হলে, ভাই দরজাটা খুলে দিত। আমি দোকানের ভিতর থেকে সাইকেল চালিয়ে গাঁটরি নিয়ে সোজা বাড়ি চলে আসতাম। এইভাবে আস্তে আস্তে সমস্ত মাল নিয়ে আসা সম্পন্ন হ’ল। দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেখে, অনেক দোকানদার আমাদের দোকানের বিখ্যাত সেই তালাটা কিনতে চাইলো।

শেষে একদিন গণেশ ও লক্ষ্মীকে সুতো দিয়ে গলায় দড়ি দেওয়ার মতো করে ঝুলিয়ে দিয়ে, চৌকি ও কাঠের আলমারি নিয়ে দোকান ফাঁকা করে চলে আসা হ’ল। ধীরে ধীরে সমস্ত মাল, চৌকি ও কাঠের আলমারি বিক্রি করে দেওয়া হ’ল, যদিও তার জন্য নামমাত্র টাকা পাওয়া গেল। দিনেশের প্রাপ্য টাকাও ফেরৎ দিয়ে দেওয়া হ’ল। ও আমার প্রতি বেশ অসন্টুষ্ট হয়েছিল। মাঝ থেকে ওর খরচায় মাঝেমাঝেই ভালোমন্দ খাওয়ার ব্যাপারটা বন্ধ হয়ে গেল। এরপর দীর্ঘদিন অরুন সাধুখাঁর ভাইকে ঐ দোকানে চুপচাপ গালে হাত দিয়ে মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখতাম। মাঝে অনেকবার হাত ফেরি হয়ে, এখন একটা পাতা চা বিক্রির দোকান হয়েছে। দোকানটাই অভিশপ্ত কী না বলতে পারবো না, তবে কোনদিন ঐ দোকানটা নিয়ে কেউ ভালোভাবে চালাতে পারেনি। আজ জায়গাটা এত উন্নত হলেও, দোকানটা কিন্তু একই রকম শ্রীহীন অবস্থায় বিরাজ করছে।

সুবীর কুমার রায়।

২২-০৬-২০১৬

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s