পাহাড়ের রোজনামচা – অষ্টম পর্ব {লেখাটি www.amaderchhuti.com ও TOUR & TOURISTS পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

DSCN9767এইভাবে বেলা তিনটে বেজে গেল। ঠিক করলাম আর অপেক্ষা না করে, জীপেই যাব। বাসের সেই নবাগত যুবকটি খুব আগ্রহ প্রকাশ করলো। বাসে গিয়ে সাধু গোছের লোকটাকে, গেরুয়াধারী সাধু ও তার দু’টো চেলাকে জীপে যাবার কথা বললাম। ওরা পরিস্কার জানালো এত ভাড়া দিয়ে তারা জীপে যাবে না। বললাম বাস কবে ছাড়বে তার ঠিক নেই। ওরা জানালো, ওদেরও কোন তাড়াহুড়া নেই, এখানেই দু’টো চাল ডাল সেদ্ধ করে খেয়ে থেকে যাবে। রাগ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রকাশ করলে চলবে না। কারণ ওরা না গেলে কিছুতেই ছ’জন খদ্দের হচ্ছে না। বললাম এখানে বাসে থাকতে দেওয়া হয় না, রাতে কোথাও থাকতেও তো পাঁচ-সাত টাকা খরচ হবে। তাছাড়া কবে বাস যাবে, তারও তো কোন ঠিক নেই। তাই রোজ থাকা খাওয়া বাবদ এত টাকা খরচ করার থেকে, দশটা টাকা বেশি দিয়ে জীপে চলে যাওয়াই লাভজনক। কিন্তু ভবি ভুলবার নয়, ওরা কিছুতেই রাজি হ’ল না। এইভাবে প্রায় সাড়ে তিনটে পর্যন্ত খদ্দেরের আশায় কাটালাম। গতকাল ও আজ, দু’দিনে মোট আটজন প্যাসেঞ্জার জুটেছে। কাজেই পঁচিশ-ত্রিশজন যাত্রী যোগাড় হতে কতদিন লাগতে পারে হিসাব করে, মনস্থির করলাম যেভাবে হোক জীপে যাবই। শেষ পর্যন্ত অনেক বোঝাবার পরে, সাধু যুগল ও চেলাদ্বয়, জীপে যেতে রাজি হ’ল। সামনে ড্রাইভারের পাশে জায়গা নিয়ে বসলাম। আমার পাশে আর একটা বাচ্চা ছেলে কোথা থেকে এসে আসন দখল করলো বুঝলাম না। তারপাশে, দরজার ধারে, যুবকটি বসলো। পিছনে মাধব, দিলীপ, দুই সাধু ও দুই চেলা। অবশেষে সব অশান্তির সমাপ্তি ঘটিয়ে, জীপ ছেড়ে দিল। ও মা, এবার দেখি এদিক ওদিক থেকে দু’একজন এসে জীপের পেছনে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। রাস্তায় অসংখ্য গিরগিটি এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। এখানে ওদের এত আধিপত্য কেন বুঝলাম না। রাস্তার ওপর অনেকগুলো আবার জীপ বা মিলিটারি ট্রাক চাপা পড়ে মরেও গেছে। আমরা মিলিটারি ট্রাকে অনুরোধ করে লঙ্কা যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু ওরা সাধারণ মানুষকে কখনও তাদের ট্রাকে জায়গা দেয় না জেনে, সে অনুরোধ আর করি নি। একপাল ছাগল, ভেড়া রাস্তায় চড়ে বেড়াচ্ছে। অনেক চেষ্টার পর তাদের সরিয়ে, জীপ আবার সামনে এগিয়ে চললো।

এইভাবে দেড় কিলোমিটার মতো পথ এসে, জীপের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। বন্যার আগে রাস্তা যখন স্বাভাবিক ছিল, তখন সমস্ত বাস ও জীপ উত্তরকাশী-লঙ্কা যাতায়াত করতো। উত্তরকাশীতেই গাড়িগুলোর সার্ভিসিং বা মেরামতের কাজ হ’ত। বন্যার সময় ডাবরানীর দিকে পাঁচটা বাস ও দু’টো জীপ ছিল। এগুলো আর রাস্তার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত উত্তরকাশী যেতে পারছে না। ফলে গাড়িগুলো তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমতো মেরামত করে নেয়। মিলিটারিদের সাথে এদের খুব সুসম্পর্ক, সেরকম বড় কোন অসুবিধা হলে, মিলিটারিরা তাদের কাজে যথেষ্ট সাহায্য করে। জীপ মেরামত করতে করতে, জীপের ড্রাইভার এ তথ্য জানালো। ওর কথাবার্তায় মনে হ’ল, সম্ভবত গাড়ি ও তেলই ওদের মধ্যে এত গভীর সুসম্পর্ক তৈরি করেছে। যাহোক্, ড্রাইভার ও যুবকটির চেষ্টায়, জীপ আবার সচল হয়ে অসংখ্য গিরগিটি ও ছাগল ভেড়াকে কাটিয়ে, নিজের রাস্তায় এগিয়ে চললো। পাশে গভীর খাদ। আরও দেড়-দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে, জীপ আবার দেহ রাখলো। ডাবরানী থেকে লঙ্কা ঊনচল্লিশ কিলোমিটার পথ। তিন-চার কিলোমিটার পথ আসতেই, জীপ দু’-দু’বার খারাপ হ’ল। উল্টো দিক থেকে একটা মিলিটারি ট্রাক এসে দাঁড়ালো। একজন মিলিটারি যুবক ট্রাক থেকে নেমে পড়তে, ট্রাকটা ডাবরানী চলে গেল। এই যুবকটির চেষ্টায় জীপ আবার প্রাণ ফিরে পেল। শুনলাম যুবকটি মিলিটারি ট্রাক চালায়। জীপ আবার এগিয়ে চললো। আমরাও খুব খুশি। আরও খানিকটা পথ পাড়ি দিয়ে, ডাবরানী থেকে সাত কিলোমিটার দুরে, আমাদের রথ আবার বিগড়ে গেল। আমরা জীপ থেকে রাস্তায় নেমে দাঁড়ালাম। জীপটাকে একবার পিছন দিকে, একবার সামনের দিকে ঠেলে অনেক চেষ্টা করেও, তার হৃতপিন্ড সচল করা গেল না। পাইপ দিয়ে তেল বার করে ড্রাইভার তার বুদ্ধি মতো অনেক চেষ্টা করলো। ফল কিছু হ’ল না। তখন আবার ঠেলে জীপের মুখ ডাবরানীর দিক করে, ঢালু রাস্তায় জীপ গড়িয়ে অনেকটা রাস্তা এসে বার বার স্টার্ট নেওয়ার চেষ্টা করেও, কোন সুফল পাওয়া গেল না। জীপেই মালপত্র,‌ টাকা পয়সা ছিল, আমরা হেঁটে হেঁটে জীপের কাছে এলাম। ড্রাইভার জানালো ফিল্টারে ময়লা জমেছে। সে ফিল্টার খুলে রাস্তায় বসে পরিস্কার করতে শুরু করলো। শক্ত একটা কাঠি দিয়ে খুঁটে খুঁটে, কফি রঙের জমাট বাঁধা পাথরের মতো শক্ত ময়লা বার করে, পেট্রল দিয়ে ধুয়ে ধুয়ে পরিস্কার করা হ’ল। যে পরিমান পেট্রল নষ্ট হ’ল, ভয় হচ্ছে যে জীপ চালু হলেও, তেলের অভাবে না ইঞ্জিন আবার বন্ধ হয়ে যায়। ড্রাইভার ও যুবকের চেষ্টায় ফিল্টারটা ঠিক জায়গায় লাগানো হ’ল। আমাদেরও হেল্পারের কাজ করতে হ’ল। কিন্তু এত কিছুর পরেও জীপ চালু করা সম্ভব হ’ল না। ড্রাইভার কিন্তু হাল ছেড়ে না দিয়ে, একটা পাইপ দিয়ে ট্যাঙ্ক থেকে আমাদের পেট্রল টানতে বললো। সম্ভবত সাইফন্ প্রক্রিয়ায় তেল বার করে কোন কাজ করবে। মুখ দিয়ে খুব জোরে টান দিতেই আমার মুখ, জামা, প্যান্ট পেট্রলে ভিজে গেল। ড্রাইভার আমায় সান্তনা দিয়ে বললো, পেট্রলে কাপড়ে দাগ পড়ে না। আর ভালো লাগছে না, হাল ছেড়ে দিয়ে রাস্তায় বসে পড়লাম।

এতক্ষণ চুপ করে থেকে, গেরুয়াধারী আমায় বললো— “বাঙালিবাবু, যে সব কাজে তাড়াহুড়া করে, সে সফল হতে পারে না, পূর্ণতা অর্জন করতে পারে না”। বললাম, “তা হয়তো ঠিক, তবে যে চেষ্টা করে, সে পূর্ণতা অর্জন করলেও করতে পারে, কিন্তু যে বসে থাকে, তার ভাগ্যও বসে থাকে। তারপক্ষে কোনদিনই পূর্ণতা অর্জন সম্ভব নয়”। ড্রাইভার এখনও গাড়ি চালু করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। গেরুয়াধারী পকেট থেকে একটা ছোট বই বার করে পড়ার ভান করছে। মাঝেমাঝে কান, নাক, বুক, পেটে আঙ্গুল দিয়ে প্রণাম করছে। এদিকে ক্রমশঃ সন্ধ্যা নেমে আসছে, বুঝতে পারছি সামনে সমুহ বিপদ। গেরুয়াধারী এবার ড্রাইভারকে বললো, “আমি মহাত্মা, সব কাজ সময় মতো করতে হয়। যে কাজে মন দেয় না, সময় মতো কাজ করে না, তার কখনও উন্নতি হয় না”। এই মুহুর্তে এইসব জ্ঞানবাক্য অসহ্য মনে হচ্ছে, বিরক্ত লাগছে। ড্রাইভার বেশ অসন্তুষ্ট হয়ে বললো, একটু  অপেক্ষা করুন, গাড়ি ঠিক হবেই। গেরুয়াধারী উত্তরে বললো, “এই জন্যই এই গাড়িতে আসতে চাইছিলাম না। বাঙালিরা বেশি চালাক, তাই নিজেরা এসে আমাদেরও বিপদে ফেললো। আমি মহাত্মা, আমি সব আগে থেকে বুঝতে পারি। কী বাঙালিরা, কতদুর পৌঁছলে? লঙ্কা পৌঁছে গেছ”। রাগে গা জ্বলে গেল। বললাম “তুমি শালা গরুখেকো মহাত্মা। তোমায় সঙ্গে নেওয়াটাই আমাদের চরম ভুল হয়েছে”। মাধব আমাকে এসব কথা বলতে বারণ করলো। ড্রাইভার এবার বেশ কড়া সুরে বললো, কথা না বলে একটু  চুপ করে বসুন। গাড়ি ঠিক হয়ে যাবে। গেরুয়াধারী কিন্তু চুপ করে থাকতে নারাজ। ফলে ড্রাইভারের কাজে অসুবিধা হচ্ছে। সে দম নিয়ে নতুন করে বলতে শুরু করলো, বাঙালিরা বেশি পন্ডিত হয়, তাই ফল পাচ্ছে। আমি আবার বললাম, “একবারে চুপ করে থাক্ শালা মহাত্মা”। বলিহারি মাধবের সহ্যশক্তি। চুপ করে বসে কাজ দেখছে। গেরুয়াধারী  আবার মুখ খুলতেই, দিলীপ হঠাৎ চূঊঊঊঊপ বলে চিৎকার করে ধমক দিতেই, ও কিরকম ঘাবড়ে গিয়ে মুখে কুলূপ এঁটে দিল। অবশেষে জীপ ড্রাইভার ঘোষণা করলো, জীপ আর যাবে না। যুবকটি আর সাধুরা ঠিক করলো, তারা শর্টকাট্ রাস্তায় হরশীলের দিকে হেঁটে যাবে। হরশীলের দুরত্ব কত তাও জানা নেই। তাছাড়া এই সন্ধ্যায় যাওয়া ঠিক হবে কী না, তাও বুঝতে পারছি না। যুবকটিকে জিজ্ঞাসা করলাম হরশীলে রাতে থাকা খাওয়ার জায়গা পাওয়া যাবে কী না। সে জানালো পাওয়া যেতে পারে। পাওয়া যাবেই কিন্তু বললো না। ড্রাইভারও সেরকম জোর দিয়ে কিছু বললো না। কী বিপদেই যে পড়লাম। ঠিক করলাম ডাবরানী ফিরে যাব। ওরা হরশীলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো।

ড্রাইভারকে বললাম, ডাবরানীর দিকে তো ঢালু পথ, জীপ গড়িয়ে নিয়ে চলো। সে জীপে উঠে বসলো। আমরা তিনজনে জীপ ঠেলতে শুরু করলাম। ঢালু রাস্তায় জীপ বেশ গতি নিলে, লাফিয়ে জীপে উঠে বসলাম। আবার চড়াই এর রাস্তা এলে, জিভ বার করে জীপ ঠেলতে শুরু করলাম। আবার উতরাই এর রাস্তায় এসে জীপ অসম্ভব গতিতে গড়াতে শুরু করলে, লাফিয়ে উঠে বসলাম। এইভাবে একবার ঠেলে, একবার দৌড়ে, একবার জীপে বসে আমরা পিছচ্ছি। লোকে শুনলে বলবে কী? সবাই গাড়ি নিয়ে এগোয়, আমরা পিছচ্ছি। এইভাবে একসময় অনেকটা রাস্তা উতরাই পাওয়া গেল। জীপ অসম্ভব গতিতে এগিয়ে চলেছে। অনবরত বাঁক। আমার একটাই চিন্তা, জীপে কোন হর্ণ নেই। উল্টোদিক থেকে মিলিটারি ট্রাক আসলে, চোখের নিমেষে খাদে চলে যাব। মাধবকে অফিসের কাজে গাড়ি করে অনেক ঘুরতে হয়। কাজেই ওর ধারণা থাকতে পারে ভেবে জিজ্ঞাসা করলাম, গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ থাকলে ব্রেক কাজ করে কী না। ও জানালো এ বিষয়ে ও নিশ্চিত যে, গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ থাকলেও ব্রেক কাজ করে। গলার ঝোলা ব্যাগ সিটে রেখে, জীপের বাইরে একটা পা ঝুলিয়ে, রেডি হয়ে বসলাম। প্রয়োজনে যাতে সহজেই লাফিয়ে নেমে পড়তে পারি। যাহোক্, কোন বিপদ না ঘটিয়ে জীপ রাস্তার একপাশে এসে দাঁড়ালো। ড্রাইভার বললো, জীপ আর যাবে না। এখান থেকে ডাবরানী প্রায় চার কিলোমিটার পথ। ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটতে শুরু করলাম। একসময় ডাবরানী ফেরৎ চলে এলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সারাদিনের নেট লাভ, অন্তত পাঁচজন যাত্রীকে হারানো। অর্থাৎ আমাদের তিনজনকে বাদ দিয়ে কাল আবার নতুন করে সতেরো থেকে বাইশজন নতুন যাত্রী যোগাড় করা।

DABRANI TO LANKA    ডাবরানীর পথে ফিরে আসা

ডাবরানীতে এসে একটা দোকনে বুদ্ধি সিং এর খোঁজ করলাম। যে ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বললেন আপনারা ঠিক জায়গায় এসেছেন। জিজ্ঞাসা করলাম— “আপনার নামই কী বুদ্ধি সিং”? তিনি জানালেন যে তিনি বুদ্ধি সিং নন্। বললাম আমরা উত্তরকাশী ট্রাভেলার্স লজে বুদ্ধি সিং এর নাম শুনে এসেছি। আজ রাতে আমাদের থাকার জন্য তিনটে খাটিয়া, লেপ, তোষক চাই। ভদ্রলোক যেন বিনয়ের অবতার। একগাল হেসে তিনি বললেন, আপনারা একটু কষ্ট করে বসুন। বুদ্ধি সিং এক্ষুণি এসে সব ব্যবস্থা করে দেবেন। একটু পরেই ভদ্রলোক সামনে একটা বড় তাঁবু দেখিয়ে বললেন, এখানে কষ্ট করে না বসে, আপনারা তাঁবুতে গিয়ে বিশ্রাম নিন। আমরা তাঁর কথা মতো তাঁবুর ভিতরে গিয়ে দেখলাম, দু’টো সারিতে পরপর অনেকগুলো খাটিয়া পাতা। আরও বেশ কয়েকটা দাঁড় করানো আছে। একদিকের রোতে পরপর দু’টো খাটিয়ায়, এক বয়স্ক স্বামী-স্ত্রী জায়গা নিয়েছেন। অপর দিকের রোতে পরপর তিনটে খাটিয়ায়, আমরা তিনজনে জায়গা দখল করে বসলাম। বুদ্ধি সিং এসে হাজির হলেন। আমরা তাঁকে উত্তর-কাশীর কথা বললাম। তিনি দু’হাত তুলে নমস্কার করে বেশ নতুন ধবধবে সাদা কভার লাগানো লেপ, তোষক বার করে দিলেন। এত আরামে এখানে থাকা যাবে স্বপ্নেও ভাবি নি। বুদ্ধি সিং বললেন নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করুন, কোন চিন্তা করবেন না। আমরা তাঁকে ব্যস্ত হতে বারণ করলাম। তিনি চলে গেলেন। অনেকটা জায়গা নিয়ে তাঁবুটা খাটানো হয়েছে। সুন্দর ভাবে কেটে দরজা-জানালাও করা হয়েছে। এ জায়গায় এটাকে রীতিমতো গ্র্যান্ড্ হোটেল বলা চলে।

আমরা নিজেদের খাটিয়ায় বসে অপর দিকের ঐ স্বামী-স্ত্রীর সাথে আলাপ করলাম। আজ লঙ্কা থেকে আমাদের দেখা যে অভিশপ্ত জীপটা এসেছে, ঐ জীপেই তাঁরা লঙ্কা থেকে এসেছেন। ভদ্রলোক জানালেন তিনি খুব অসুস্থ বোধ করছেন। পায়ের জুতো থেকে অনেকগুলো ফোস্কা হয়ে ঘা হয়ে গেছে। বললাম এক সাইজ বড় জুতো কেনা উচিৎ ছিল। জায়গাগুলো ভালো করে পরিস্কার করে, ওষুধ লাগাতে বললাম। ভদ্রলোক ওষুধ খেয়ে, ভালো করে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে, আমাদের সাথে গল্প শুরু করলেন। থাকেন বোম্বাই শহরে। ব্যবসা করেন। অমরনাথ হয়ে গঙ্গোত্রী গোমুখ গিয়েছিলেন। অমরনাথের আগেও অনেকগুলো জায়গা ঘুরে এসেছেন। যদিও সব জায়গায় ঘোড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। এখান থেকে যমুনোত্রী যাবেন। আরও অনেকগুলো জায়গা যাবার পরিকল্পনা আছে। তিনি জানালেন যে, তিনি বিয়াল্লিশ দিন হ’ল বাড়ি থেকে বেড়িয়েছেন। কথাবার্তায় বোঝা গেল ভদ্রলোক অগাধ পয়সার মালিক, তবে দেশ ভ্রমণের ইচ্ছাও যথেষ্ট। ভদ্রলোককে গঙ্গোত্রী, গোমুখের রাস্তাঘাট সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করলাম। তিনি জানালেন, তিনি প্রথম দিনই এখান থেকে লঙ্কাগামী বাস পেয়েছিলেন। লঙ্কা থেকে গঙ্গোত্রীর জীপও পাওয়া যাবে। আমরাই বোধহয় ঘোর পাপী, তাই ঐ রকম একজন সাধুসঙ্গেও কাজ হয় নি। ভদ্রলোক জানালেন, গোমুখ যেতে হলে, গঙ্গোত্রী পুলিশ স্টেশনে নাম, ঠিকানা ইত্যাদি লিখে, তবে যেতে দেওয়া হচ্ছে। একজন পান্ডার সাথে এক ভদ্রলোক গোমুখ গিয়েছিলেন। তাঁদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তা খুব কষ্টকর। ভূজবাসার লালবাবার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। ভদ্রলোক বললেন ঐ রকম একজন মানুষ তিনি জীবনে কোনদিন দেখেন নি। অতিথিদের তিনি দেবতাজ্ঞান করেন। ভদ্রলোক বললেন, প্রথমে তিনি লালবাবার ওপর ভীষণ বিরক্ত হয়েছিলেন। অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হয়ে তাঁরা লালবাবার আশ্রমে পৌঁছলে, লালবাবা তাঁদের অনেকটা করে চা খেতে দেন। তাঁরা কোনদিন চা পান করেন না, তাই তাঁরা চা খেতে রাজি হন নি। কিন্তু লালবাবা তাঁদের বলেন, চা খেলে শরীর ভালো থাকবে। তাঁরা এরপরও চা খেতে অস্বীকার করলে, লালবাবা তাঁদের বলেন, এখানে এসে চা পান না করলে, এখানে তাঁদের থাকতে দেওয়া হবে না। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁরা চা পান করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের ক্লান্তি দুর হয়ে যায়, এবং বেশ সুস্থও বোধ করেন। লালবাবা তাঁদের বলেন এত কষ্ট করে এখানে আসার পর গরম চা পান করলে, শরীর অনেক সুস্থ হয়ে যায়। তাই তাঁদের জোর করে চা পান করানো হ’ল। রাতে তাঁদের অনেকগুলো রুটি খেতে দেওয়া হয়। তাঁরা রুটি কমিয়ে দিতে বললেও, রুটি কমিয়ে নেওয়া হয় নি। ওখানে অত কষ্ট করে অত মূল্যবান খাবার নিয়ে যাওয়া হয়, তার জন্য কোন দাম পর্যন্ত নেওয়া হয় না। ফলে তাঁরা রুটি ফেলে দিতেও পারছেন না। ওখানে ভীষণ ঠান্ডা, তাঁর স্ত্রী লালবাবাকে জিজ্ঞাসা করেন, রাতে ক’টা কম্বল পাওয়া যাবে। উত্তরে তিনি বলেন, যতগুলো রুটি খাবে, ঠিক ততগুলো কম্বল। বাধ্য হয়ে ইচ্ছা না থকলেও তাঁরা চার-পাঁচটা করে রুটি খেয়ে নেন। রাতে কিন্তু তিনি অনেকগুলো করে কম্বল, পেতে শোবার ও গায়ে দেবার জন্য দিয়ে বলেছিলেন, “এখানে আসার পর বেশিরভাগ যাত্রীই পথশ্রমে রাত্রে না খেয়ে শুয়ে পড়তে চান। এখানে খালিপেটে এতবড় রাত কাটালে শরীর খারাপ হবেই, তাই তাঁকে ভয় দেখিয়ে খাবার নিয়ে জোর করতেই হয়”। তীর্থযাত্রীদের সুস্থ রাখার জন্য তিনি সব সময় চিন্তা করেন। তিনি ওখানে একজনের কাছে শুনেছেন যে, খুব বেশি পায়ে ব্যথা হলে, তাকে সুস্থ করার জন্য তিনি নাকি পা পর্যন্ত টিপে দেন। যাহোক্, এবার ভদ্রলোক আমাদের পরামর্শ দিলেন যে, আমরা যেন ওখানে পৌঁছেই তাঁকে জানাই যে আমরা খেয়ে এসেছি এবং শরীরও ভালো নয়, কাজেই খুব অল্প করে খাব। খেতে বসে শরীর খারাপ বললে তিনি বিশ্বাস করবেন না। এত কথা শুনে তাঁকে খুব দেখবার ইচ্ছাও হ’ল। দিলীপ ও মাধব তাঁকে জিজ্ঞাসা করলো, ভূজবাসা থেকে গোমুখ যাবার জন্য গাইড নিতে হবে কী না। আমি বললাম, দু’বৎসর আগে আমার পরিচিত একজন গোমুখ গিয়েছিল, সে বলেছে গাইড নেবার প্রয়োজন হয় না। ভদ্রলোকও বললেন, শেষ আধ মাইল কোন রাস্তা নেই বটে, তাহলেও নিজেরাই যাওয়া যায়। গাইডের প্রয়োজন হয় না। যাহোক্, তখনকার মতো আমরা কথা থামিয়ে, তাঁবুর বাইরে এলাম।

দোকানে এসে দেখি প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন আদিবাসী গোছের পুরুষ ও নারী একটা পালকির মতো কী নিয়ে, ঐ দোকানে এসে উঠেছে। দুটো লাঠির মাঝখানে পালকির মতো আকারের একটা মন্দিরের মতো ঘর। তার মধ্যে কী একটা দেবদেবী আছে। স্থানীয় কোন গ্রাম থেকে ওরা এখানে এসেছে, যাবে গঙ্গোত্রী। দেখলাম দোকানে বসে বেশ কয়েকজন হালুয়া তৈরি করছে, ঐ দেবতার প্রসাদ। দোকানদার জানালো, ইচ্ছা করলে আমরাও খেতে পারি। ভাবলাম খেয়ে দেখলে মন্দ হয় না। এটা তো মানতেই হবে, ইনি যে দেব বা দেবীই হ’ন না কেন, অত্যন্ত জাগ্রত। যাত্রীর অভাবে আমরা ভয়ঙ্কর বিপদ ও শোচনীয় কষ্টের মধ্যে আছি জানতে পেরেই, প্রয়োজনীয় সংখ্যার বেশিই লোকজনকে গঙ্গোত্রী পাঠাবার  ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আগামী কাল আমাদের লঙ্কা যাওয়া কে আটকায়? যাহোক্, আমরা আমাদের খাবারের অর্ডার দিয়ে, দোকানদারকে আগামী কালের বাসের খোঁজখবর দিতে বললাম। দোকনদার জানালো পরপর দু’দিন কোন বাস যায় নি, কাজেই কাল নিশ্চয় বাস ছাড়বে। বললাম, এরা সবাই গঙ্গোত্রী গেলে, প্যাসেঞ্জারের তো অভাব হবার কথা নয়। দোকানদার জানালো, এরা স্থানীয় মানু্‌ষ, এরা সবাই হেঁটেই যাবে। ব্যাস, বাড়া ভাতে ছাই হয়ে গেল। আমাদের মুষড়ে পড়তে দেখে, দোকানদার আশ্বাস দিয়ে জানালো, আগামী কাল পঁচিশ-ত্রিশ বস্তা ময়দা ও চার-পাঁচ টিন ডালডা নিয়ে যাওয়া হবে, ফলে বাস ছাড়বেই। প্যাসেঞ্জারের বদলে ময়দা ও ডালডা? সবই কপাল। যা খুশি, যে খুশি যাক, বাস গেলেই হ’ল। তাঁবুর ভদ্রলোক বলেছিলেন, রাতে তিনি কিছু খাবেন না। আমরা খেতে যাবার সময় তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে, তাঁর খুব উপকার হয়। তাঁর স্ত্রীকে ডাকতে গিয়ে শুনলাম, তাঁবুতেই তাঁর খাবার দিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। আমরা দোকানে ফিরে গেলাম। দোকানে গিয়ে সেই একঘেয়ে রুটি আর আলুর তরকারী, সঙ্গে অবশ্য ডাল আছে। হালুয়া আর খেলাম না। একবার ভেবেছিলাম অন্য একটা দোকান থেকে পরোটা কিনে খাব। শেষ পর্যন্ত তা আর খাওয়া হ’ল না। তাঁবুতে ফিরে এসে একটু গল্পগুজব করে শুয়ে পড়লাম। আজ আমরা সত্যিই বড় ক্লান্ত। তার ওপর এত আরামে এ পথে ঘুমবার কথা ভাবতেও পারি নি। আগে ডাবরানীতে কেউ নামতোও না। বন্যার পর সবাইকে ডাবরানী আসতেই হবে, আর প্যাসেঞ্জারের অভাবে বাস না পেলে দু’এক রাত থাকতেও হবে। ফলে বুদ্ধি সিং, বুদ্ধি করে খাসা ব্যবসা খুলে বসেছেন। অবশ্য ব্যবস্থাও খুবই ভালো করেছেন। সব থেকে বড় কথা খুব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, যেটার এপথে খুবই অভাব।

আজ ঊনত্রিশ-এ আগষ্ট। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, বুদ্ধি সিংকে তার তাঁবু ভাড়া বাবদ বার টাকা মিটিয়ে দিয়ে, একবার বাইরে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে আসবো ভাবছি, বুদ্ধি সিং বললেন, যতক্ষণ না বাস ছাড়ে এখানেই বিশ্রাম নিন। বাস ছাড়লে এখান থেকে বাসে উঠে পড়বেন। মাধব ও দিলীপ অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠেছে। ফলে তাদের চা খাওয়া ও সকালের কাজ সারা হয়ে গেছে। আমি চায়ের দোকানে গেলাম। দিলীপকে বললাম ওরা কাজ সারতে কোথায় গিয়েছিল আমাকে দেখিয়ে দিতে। দিলীপ বললো একটু দুরে যেখানে কলটায় অবিরাম জল পড়ে, সেখানে রাস্তার ধারেই কতগুলো চট্ দিয়ে ঘেরা পায়খানা আছে। দিলীপকে একটা মগ্ কোথায় পাওয়া যাবে জিজ্ঞাসা করাতে, ও কোন রকম ভণিতা না করে হিন্দীতে বললো, এ পায়খানা যাবে একে একটা লোটা দাও। দোকানদার তার কাজ করতে করতেই, চায়ের গ্লাশের একটা গ্লাশ আমার হাতে দিল। তার গ্লাশ দেওয়ার ভঙ্গী দেখে বুঝলাম, এখানে এটাই চল্। তবু আমি একটু অবাক হতে দিলীপ জানালো, ওদেরও সকালে এইসব গ্লাশ থেকেই দু’টো গ্লাশ দেওয়া হয়েছিল। সত্যি কী ভালো ও স্বাস্থ্যকর পরিষেবা। ওয়াটার বটলে এক বটল্ জল ভর্তি করে, দোকানদারের দেওয়া প্লাষ্টিক গ্লাশ হাতে করে, গাইড দিলীপকে সঙ্গে নিয়ে, নির্দিষ্ট জায়গায় গেলাম। দেখলাম চট্ দিয়ে ঘেরা পরপর তিনটে পায়খানা একই সারিতে রয়েছে। চটগুলো এত পাতলা ও পরিস্কার, যে একটার ভিতর দিয়ে পাশেরটা, এমন কী চোখের জ্যোতি ঠিক থাকলে, তার পাশেরটার ভিতরও পরিস্কার দেখা যায়। বোধহয় গল্প করার সুবিধার্থে এই ব্যবস্থা। একটু দুরে মেয়েদের জন্যও একই রকম সুব্যবস্থা। লজ্জার মাথা খেয়ে, “তিনে মিলি করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ” ভেবে একটার ভিতর ঢুকলাম। কিন্তু পায়খানাগুলো অদ্ভুত ভাবে তৈরি। দু’দিকে দু’টো তক্তা পাতা, কিন্তু তক্তাগুলো পিছন দিকে বেশ ঢালু। ফলে ওর ওপরে বসলে, পিছনের চট্ ছিঁড়ে বেশ কিছুটা নীচে, মাটিতে পড়ে যাবার সম্ভাবনা যথেষ্ট। অথচ সামনে পাতলা চট্ ছাড়া এমন কিছু নেই, যা ধরে বসা যায়। পিছন দিকে কাত হয়ে বসে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কোনরকমে কাজ সারতে হয়। যাহোক্, ওখান থেকে উদ্ধার পেয়ে, কলের জলে গ্লাশটা ধুয়ে এনে, দোকানদারকে ফেরৎ দিলাম। সে আমার দিকে না তাকিয়ে, হাত বাড়িয়ে গ্লাশটা নিয়ে, গ্লাশ রাখার জায়গায় আর সব গ্লাশের সাথে রেখে দিল। ভাবলাম আমরা যে গ্লাশে করে চা খাচ্ছি, সেগুলো কত রাজ্যের, কত মানুষের না পিছনে জল দিয়ে সাহায্য করেছে। বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।

বাস ছাড়ার কিন্তু কোন লক্ষণ দেখছি না। ভোরবেলা সেই ত্রিশ-চল্লিশ জনের আদিবাসী দলটা গঙ্গোত্রীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। জানা গেছে গতকালের সেই বাসটাই যাবে। বাসে গতকালের মতো একবারে সামনে জায়গা রেখে, এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছি। বাস ছাড়ার কোন আয়োজন চোখে পড়ছে না। চায়ের দোকানে গিয়ে খোঁজ করলাম। ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম, একটু অপেক্ষা করে দেখা হবে, যদি ভুখি থেকে কোন প্যাসেঞ্জার আসে। তবে বাস আজ যাবেই, কোন সন্দেহ নেই। গতকাল যখন জীপ খারাপ হওয়ায় হেঁটে হেঁটে ফিরছিলাম, মাধব ও দিলীপের কথাবার্তায় বুঝতে পারছিলাম, ওদের বাড়ির জন্য মন খারাপ করছে। গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী আর এবার ওদের যাবার ইচ্ছা নেই। গতকাল ঐ বাসে যখন অপেক্ষা করছিলাম, তখনও ওরা সেইরকম একটা আভাস দিয়েছিল। যার জন্য আমি সাধু গোছের লোকটাকে যমুনোত্রী সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করছিলাম। যাতে আমার কথায় ওরা বুঝতে পারে, যে আমি গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী যাবই। আমি জানি যে, আমাকে ফেলে ওদের পক্ষে ফিরে যাওয়া খুব মুশকিল। আসলে ওরা চাইছে আমি নিজে থেকে ফিরে যাবার প্রস্তাবটা পেশ করি। দিলীপ গতকাল জীপ ছেড়ে হেঁটে হেঁটে ফিরবার পথে আমায় জিজ্ঞাসা করেছিল, আমি কী করবো। শুনে ভীষণ রাগ হয়ে গিয়েছিল। মাধব একে ফিরে যাব ফিরে যাব করছে, তার ওপর ও আবার মাধবের সাথে পোঁ ধরেছে। আমি বলেছিলাম, ”আমি তোদের মতো অত সহজে ভেঙ্গে পড়তে বা হাল ছেড়ে দিতে শিখি নি। আমার মতো তোরাও আসবার সময় বলেছিলি, যতক্ষণ টাকা থাকবে ও শরীর ঠিক থাকবে, ততক্ষণ সবক’টা জায়গা না দেখে ফিরবি না। এখন পর্যন্ত সব জায়গা সহজ ভাবেই ঘোরা গেছে। এখনও এমন কিছু ঘটে নি, যে এর মধ্যেই ভেঙ্গে পড়ে ফিরে যাবার চিন্তা করতে হবে। আমাদের হাওড়া কলকাতাতেও মাঝ রাস্তায় বাস খারাপ হলে, সব প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে দেওয়া হয়। আর এখানে তো এমন হতেই পারে”। দিলীপ মাধবকে জানালো যে সে ইন্টারেষ্ট পাচ্ছে না। মাধব কী করবে তাও জানতে চাইলো। মাধব এবার আমায় জিজ্ঞাসা করলো— আমি কী করবো। আমি সরাসরি উত্তর দিলাম, “তোরা এক কাজ কর। আমায় কিছু টাকা দিয়ে, তোরা বরং ফিরে যা। আমার বাড়িতে একটা খবর দিয়ে দিস। আমি শেষ চেষ্টা না করে ফিরবো না, আর এটাই আমার শেষ কথা”। চোখের সামনে লঙ্কা, গঙ্গোত্রীর মাইল স্টোন দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি দুরত্ব, মাত্র ঊনচল্লিশ কিলোমিটার। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, ভবিষ্যতে যেখানেই যাই না কেন, দিলীপকে আর সঙ্গে নেওয়া নেই। কোথায় ও এই মুহুর্তে আমার পাশে থেকে মাধবকে মনোবল যোগাবে, উৎসাহ দেবে, তা না, মাধবকে উস্কে দিচ্ছে ফিরে যাবার জন্য। মাধবকে খুব ভালোভাবে বোঝালাম যে, আর একটু কষ্ট করলে চরম ফল আমরা লাভ করবোই। সে যেন একটু ধৈর্য ধরে আমার পাশে থাকে। পরে এ কষ্ট আর থাকবে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাধব জানালো, সে আমার সাথে বাকি জায়গাগুলো যেতে রাজি আছে।

মনে মনে বাস ছাড়ার জন্য প্রার্থনা করছি। আজও যদি বাস না যায়, তাহলে ওদের সঙ্গে রাখা সত্যিই কঠিন হবে। অবশেষে অনেকগুলো, প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বস্তা আটা বা ময়দা ও পাঁচ-ছয় টিন ডালডা, সত্যিই বাসের ছাদে ও বাসের মধ্যে তোলা হ’ল। ওঃ! কী আনন্দ, কী শান্তি যে পেলাম, বলে বোঝাতে পারবো না। বাসের মুখ ঘুরিয়ে লঙ্কার দিকে করা হ’ল। ড্রাইভার আবার বাস থেকে নেমে চলে গেল। আরও দু’কাপ করে চা শেষ করলাম। অবশেষে বাস সত্যিই ছাড়লো। আজ দেখলাম কিছু প্যাসেঞ্জারও হয়েছে। ড্রাইভারের পাশেই আমি বসেছি। আমার পাশে বাসেরই একজন কর্মী। আমার ঠিক পিছনের সিটে, ড্রাইভারের পিছনে মাধব ও দিলীপ। মাঝেমাঝেই বাসটায় কী রকম একটা বিশ্রী আওয়াজ হচ্ছে। মনে হচ্ছে বাসের ইঞ্জিন বোধহয় বন্ধ হয়ে যাবে। ভয় হ’ল, গতকাল জীপ ঠেলেছি, আজ বাস ঠেলতে হলে আর বাঁচবো না। আগে হলুদ রঙের ছিল, বর্তমানে প্রায় কালো রঙের গায়ের মোটা গেঞ্জি ও সোয়েটারটা প্যান্টের ভিতর গুঁজে পরতে হচ্ছে। এই ক’দিনেই কোমর এত সরু হয়ে গেছে যে, তা নাহলে প্যান্ট নেমে আসছে। তিনজনের বাস ভাড়া বাবদ একত্রিশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা মিটিয়ে দেওয়া হ’ল। অবশ্য তার জন্য কোন টিকিট দেওয়া হ’ল না। সেই গিরগিটি, ভেড়া ও ছাগলের পাল কাটিয়ে, বাস গতকালের সেই রাস্তার ওপর দিয়ে এগিয়ে চললো। ড্রাইভার অনবরত গীয়ার চেঞ্জ করছে এবং গীয়ারের রডটা বারবার আমার পায়ে বেশ জোরে জোরে আঘাত করছে। বাধ্য হয়ে গীয়ারের দু’দিকে দুটো পা রেখে, প্রথম শ্রেণীর সিটে কষ্টেসৃষ্টে বসে আছি। হঠাৎ, আচমকা গীয়ারের রডটা নীচের দিকে নামাতে, আমার হাতে লেগে খানিকটা কেটে, রক্ত পড়তে শুরু করলো।

হরশীল এসে বাস দাঁড়ালো। সেই ত্রিশ-চল্লিশজনের আদিবাসী দলটা এখানে এসে হাজির হয়েছে। একটা গাছে কুলের মতো কী একটা ফল, অসংখ্য ফলে আছে। ওরা পাথর ছুঁড়ে ওগুলো পাড়ছে আর টপাটপ্ মুখে পুরছে। আমার পাশে বসা বাসের লোকটাও, বাস থেকে নেমে ওগুলো পাড়তে শুরু করে দিল। আমি দু’টো ফল চাইতে, সে অনেকগুলো ফল আমার হাতে দিয়ে দিল। টক্ টক্, কষা কষা খেতে। আদিবাসী দলটা ঠিক করলো, তারা এখান থেকে এই বাসেই লঙ্কা যাবে। আগে, সকালে এটা ঠিক করলে, আমাদের এতটা সময় নষ্ট হ’ত না। ড্রাইভার জানালো, এত লোকের বাসে জায়গা হবে না। দু’দিন পরে বাস ছেড়েছে বলেই বোধহয়, আসবার পথে ভালোই প্যাসেঞ্জার হয়েছে। ওরা কিন্তু ড্রাইভারের কথায় কান না দিয়ে, বাসের ভিতরে ও ছাদে উঠে পড়লো। পালকির মতো জিনিসটা, বাসের ভিতরে ঢোকানো হ’ল। বাস ছেড়ে দিতেই তারা ভেঁপু, শিঙ্গা, ঢোল, ব্যান্ড পার্টির বাঁশির মতো দেখতে কী একটা জিনিস, একসাথে বাজাতে শুরু করে দিল। ঐ ভিড়ে কানের কাছে শিঙ্গার বিভৎস আওয়াজ, বিড়ির ধোঁয়া, সে এক নরক যন্ত্রণা। এক জায়গায় বাস দাঁড় করিয়ে, বাসের ইঞ্জিনে অনেক জল ঢালা হ’ল। ভাগ্য আমাদের খুব ভালোই বলতে হবে, নতুন কোন বিপদ না ঘটিয়ে, বাস লঙ্কায় এসে পৌঁছলো। আমরা বাস থেকে নামতেই, ডাবরানীর দিকে যাবার জন্য লঙ্কায় যে ক’জন প্যাসেঞ্জার ছিল, তাদের নিয়ে বাস ডাবরানীর উদ্দেশ্যে চলে গেল। শুনলাম কোন বাস বা জীপকে লঙ্কায় থাকতে দেওয়া হয় না, তারাও লঙ্কায় থাকতে চায় না। প্যাসেঞ্জার না পেলেও, এখানে বাস আসার সঙ্গে সঙ্গে ডাবরানী ফিরে যায়। ভয় হ’ল ফিরবার সময় আবার বাস পাব তো? কবে ডাবরানীতে প্যাসেঞ্জার জমা হবে, বা ডালডা, ময়দা ইত্যাদি লঙ্কায় নিয়ে আসা হবে, তবে বাস লঙ্কায় আসবে। আবার লঙ্কায় বাস আসার সেই শুভ মুহুর্তটাতে আমাদেরও লঙ্কায় উপস্থিত থাকতে হবে, তা নাহলে এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে, বাস ডাবরানী ফিরে যাবে। এ এক কঠিন অঙ্ক।

ছোট্ট জায়গা। পরপর দুটো মিষ্টির দোকান কাম হোটেল। ভাত, ডাল, তরকারী খেয়ে নিলাম। পালকির মতো জিনিসটাকে কাঁধে নিয়ে ঐ দলটাও এদিকে এল। তাতে কেউ পয়সা দিয়ে নমস্কার করলে, সেটাকে ঝাঁকিয়ে কাত করে ঐ ব্যক্তির বুকে বা মাথায় পালকির মতো মন্দিরটাকে ঠেকানো হচ্ছে। যেন দেবতা নিজেই কাত হয়ে আশীর্বাদ করছেন। আমরা এবার এগিয়ে গেলাম। এখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে ভৈরবঘাঁটীর চড়াই পার হতে হবে। শুনেছি খুবই কষ্টকর চড়াই। আস্তে আস্তে হেঁটে পথ চলতে শুরু করলাম। এই মুহুর্তে রাস্তা খুব কষ্টকর বলে মনে হচ্ছে না। তবে ভাত খাওয়ার পরেই হাঁটতে তো একটু কষ্ট হবেই। চারপাশে একই দৃশ্য, এই সব দৃশ্য আর নতুন করে কী দেখবো? ক্রমে মালুম পেতে শুরু করলাম, কত কষ্টের এই চড়াই। শেষে ধীরে ধীরে একসময় এই চড়াই পার হয়ে, আমরা ভৈরবঘাঁটী এসে পৌঁছলাম।

BHAIRAB GHANTI TEMPLE    ভৈরবঘাঁটী  মন্দির

রাস্তার শেষে একটা বোর্ড দেখলাম। তাতে হিন্দীতে লেখা “কষ্টকে লিয়ে ধন্যবাদ”। এ কিরকম তামাশা বুঝলাম না। এত কষ্টের পর, কষ্টের জন্য শুধু শুকনো ধন্যবাদ জানানো। এতদিনে আমাদের প্রতি ভাগ্যদেবতা বোধহয় প্রসন্ন হয়েছেন। ভৈরবঘাঁটী থেকে গঙ্গোত্রীর জীপ শুধু পাওয়াই যায় না, একটা জীপ কয়েকজন যাত্রী নিয়ে বোধহয় আমাদের জন্যই অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যেতেই আমাদের নিয়ে জীপ ছেড়ে দিল। মাত্র নয়-দশ কিলোমিটার পথ, কাজেই দেখতে দেখতেই আমরা গঙ্গোত্রী পৌঁছে গেলাম। তিনজনের ভাড়া লাগলো, আঠারো টাকা। জীপ থেকে নেমেই, গোমুখ যাবার ব্যাপারে খোঁজখবর নিলাম। স্থানীয় পান্ডারা কিন্তু আজ ওদিকে যেতে নিষেধ করলো। যদিও দু’একজন বললো চলে যেতে পারেন। আমি বললাম তাহলে আজই গোমুখ চলে যাই। এই প্রথম দেখলাম দিলীপ আমার সাথে হাত মেলালো, সেও আজই যেতে প্রস্তুত। মাধব বললো আজ যেতে রাত্রি হয়ে যাবে। আমরা বললাম, এদিকে অন্ধকার হতে অনেক দেরি হয়, আমরা অন্ধকার নামার আগে ঠিক পৌঁছে যাব। মাধব বললো রাস্তায় থাকবার জায়গা নাও পাওয়া যেতে পারে, তাই কাল সকালে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যদিও এখন সবে দুপুর, তবু শেষ পর্যন্ত আমরা আগামীকাল ভোরে রওনা হওয়াই ঠিক করলাম। একটা দোকানে বসে চা খেলাম। এখানেই শুনলাম গোয়ালীয়রের একজন বড়লোক টুরিষ্ট, গঙ্গোত্রীর সত্য নারায়ণ প্রসাদ নামে একজন পান্ডাকে সঙ্গে করে দু’দিন হ’ল গঙ্গোত্রী গেছেন। তাঁদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এখানকার বেশিরভাগ পান্ডাই, তাঁদের খোঁজে গঙ্গোত্রী গেছে। সকলেরই ধারণা, তাঁরা ওখানে মারা গেছেন। এরা আমাদের জানালো, ওখানে যেতে হলে, যাবার আগে পুলিশ স্টেশনে নাম ধাম লিখে অনুমতি নিয়ে যেতে হবে। এখন এটাই নিয়ম, ফিরতে দেরি হলে যাতে তারা খোঁজ করতে পারে। ঠিক হ’ল আগামীকাল সকালে ওখানে যাবার আগে, কাজটা সেরে নেওয়া যাবে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s