পাহাড়ের রোজনামচা – একাদশ পর্ব {লেখাটি www.amaderchhuti.com ও TOUR & TOURISTS পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

DSCN9767মাধব তিতিবিরক্ত হয়ে বললো, বাসের দরকার নেই, চল্ ট্রাভেলার্স লজ বুক করি। একটু শুয়ে থেকে বিশ্রাম নেওয়া যাক। আমি বললাম, সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত দেখবো। ক্লান্তি আমারও খুব কম লাগছে না। তবে এখনই ঘর বুক করা বোকামি হবে, কারণ দেখা যাবে ঘরও বুক করলাম, আর বাসও এসে হাজির হ’ল। তার থেকে ছ’টা পর্যন্ত এখানে বসে অপেক্ষা করে, তারপর ঘর বুক করা যাবে। ও আর কথা বাড়ালো না। আমরা আর এক দফা চা খেয়ে, দোকানের আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। দোকানটার সামনে বেশ কিছু পুরুষ ও মহিলা, বাসের অপেক্ষায় বসে আছে। একপাশে পরপর দু’টো কুঁড়েঘরের মতো, তার মধ্যেও অনেকে একই উদ্দেশ্যে বসে আছে। গতকাল থেকেই হয়তো ওরা এখানে বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা যে দোকানটায় বসে ছিলাম, তার ভিতরে একটা কাঠের মাচায়, কম্বল পেতে দু’জন শুয়ে আছে। পোষাক দেখে মনে হয়, ওরাও বাসে যাবে এবং গতকাল এখানেই রাত কাটিয়েছে। এখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে, স্থানীয় কিছু যুবক এল দোকানে আড্ডা মারতে। হঠাৎ তীব্র একটা হর্ণের আওয়াজ। নাঃ, এবার আর কোন ভুল হবার সম্ভাবনা নেই। উঃ! সে যে কী আনন্দ হ’ল, ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। মরণফাঁদ থেকে উদ্ধার করার জন্য, রথ এসে হাজির। এবার মনে হচ্ছে, আগের দু’বার এই বাসেরই হর্ণের আওয়াজ শুনেছিলাম। পথে থেমে থেমে, লোক নামিয়ে আসতে এত সময় নিল। বাসটা এসে লোক নামিয়েই, ফিরে যাবার জন্য ডাবরানীর দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ালো। আমি মহানন্দে ছুটে গিয়ে ড্রাইভারের হাতটা চেপে ধরে জিজ্ঞাসা করলাম, “বাস আজ যাবে তো”? ড্রাইভার জানালো, একটু পরেই বাস ডাবরানী ফিরে যাবে। একবারে সামনে জানালার ধারে আমাদের জায়গা রেখে, নীচে নেমে দোকানে এলাম। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, দেখি গোটাকতক মিলিটারি এসে ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে শুরু করলো। একটু পরেই জানা গেল, মিলিটারিরা বলেছে আগামীকাল সকালে হরশীল থেকে ওদের ক্যাম্পের ত্রিশ-পঁয়ত্রিশজন মিলিটারির একটা দল, ডাবরানী যাবে। কাজেই এই বাস যেন কাল সকালে ছাড়ে। সকলের সব অনুরোধকে উপেক্ষা করে, ড্রাইভার ঘোষণা করলো, বাস আজ আর যাবে না, কাল ভোরে বাস ছাড়বে। ব্যাস, হয়ে গেল বাড়া ভাতে ছাই। আমরা বললাম, কাল সকালে বাস হরশীল গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, কবে মিলিটারিরা তৈরি হবে, তবে বাস ছাড়বে? ড্রাইভার জানালো, ওরা খুব ভোরে তৈরি হয়েই থাকবে। বাস হরশীল পৌঁছলেই, ওরা বাসে উঠে পড়বে। ড্রাইভারের কথা বলার ধরণ দেখে মনে হ’ল, এ ঘটনা এখানে আকছারই ঘটে, এবং বাস নিয়ে আজ ডাবরানী ফিরে আসার ক্ষমতা বা সাহস, কোনটাই তার নেই।

হায়! বহু আকাঙ্খিত রথ হাতে পেয়েও, সব হারালাম। কাল ওদের জন্য বাস যদি দেরিতে ডাবরানী পৌঁছয়, তবে কাল আর এগনো যাবে না। রাতে আবার বুদ্ধি সিং এর তাঁবুতেই থাকতে হবে। কিন্তু কিছু করারও তো উপায় নেই। তাই সেই ট্রাভেলার্স লজেই একটা ঘর বুক করলাম। ঘরটায় চারটে বেড, তাই কুড়ি টাকা ভাড়া লাগবে। প্লাইউডের দেওয়াল, অ্যাটাচ বাথ। বেশ ভালই ব্যবস্থা, তবে সবই প্রায় অসমাপ্ত। গত বৎসর বন্যার আগে কাজ আরম্ভ হয়েছিল। বন্যার পর যাত্রী আসার সম্ভাবনা না থাকায়, কাজও বন্ধ হয়ে আছে। তাছাড়া উত্তরকাশীর সঙ্গে পরিবহণ ব্যবস্থার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকায়, মালপত্র নিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে না। ঘরটা ভিতর থেকে বন্ধ করার কোন ব্যবস্থা নেই। কেয়ারটেকার জানালো, কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, ওটা করা হয়ে ওঠে নি। অ্যাটাচ বাথটা অর্ধেক তৈরি হয়ে পড়ে আছে। ওটা এখন স্টোর রুমের কাজ করছে। বাথরুমটার ভিতর প্লাইউড ও কাঠের টুকরো, বেশ কিছু ছোট বড় টিন, সরু-মোটা নানারকম তার, এবং এটা সেটা নানা জিনিসে ভর্তি। বাথরুম ছাড়া, আর সব কাজই তো মোটামুটি শেষ, তাহলে ঐটুকু একটা ছিটকিনি লাগাতে কেন এত অনীহা, বোধগম্য হ’ল না। ঠিক করলাম, একটা বেডকে টেনে এনে দরজার সঙ্গে চেপে পেতে দেব। কেয়ারটেকার পরামর্শ দিল, দরজা ও দেওয়ালের প্লাইউডের ফাঁকে ছোট একটা পাতলা কাঠের টুকরো গুঁজে দিয়ে দরজা বন্ধ করতে, তাহলে দরজা সহজে খুলবে না। মনে মনে ঠিক করলাম, দু’রকম ব্যবস্থাই করবো। ঘর ভাড়া এখন দিতে হ’ল না। কাল সকালে যাবার সময় দিলেই হবে। ঘরে ঢুকে একটা হ্যারিকেন দিতে বলে, তিনজন তিনটে খাটে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। এত ক্লান্তিকর দিন, এর আগে কোনদিন বোধহয় কাটাতে হয় নি। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ্ শুয়ে থেকে, মালপত্র ঘরে রেখে, বাইরে থেকে তালা দিয়ে দোকানে ফিরে এলাম। বৃদ্ধ দোকানদারের সাথে দেখা হতে, দুই হাত তুলে নমস্কার করে “ডাগতার সাব্” বলে সম্বোধন করে জানালো, তার কপাল যন্ত্রণা একবারে কমে গেছে। রাতের খাবারের অর্ডার দিলাম। আজও সেই আলুর তরকারী আর রুটি। এখানে অবশ্য দেখলাম, তরকারীটা একটা প্যানে, কাঠের আগুনে বসিয়ে, একটু নেড়েচেড়ে বেশ ঘন করা হয়। এরা এটাকে তরকারী ফ্রাই বলে। রুটিগুলো একটু পাতলা পাতলা করে করতে বলে, তরকারীটা ফ্রাই করে দিতে বললাম। দোকানটায় এখন অনেকগুলো যুবকের ভিড়। দেখে তো এদের স্থানীয় বলেই মনে হয়। কোথায় থাকে কে জানে। সন্ধ্যার পর হয়তো রোজই এরা এখানে এসে ভিড় করে।

যে বাসটা এসেছিল, সেটা দেখি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমরা খুব চিন্তায় পড়লাম। একবার কেটে পড়তে পারলে, আর হয়তো দু’চার দিনের মধ্যে কোন বাসের টিকি দেখা যাবে না। এগিয়ে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানলাম, বাসটা আজই রাতে আবার ফিরে আসবে। রাস্তা পরিস্কারের কাজ করার সময়, একজনের পায়ে একটা বড় পাথর পড়ে গেছে। বাসটা তাকে হরশীল পৌঁছে দিয়ে, আবার এখানে ফিরে আসবে। খুব ভাবনা হ’ল, সত্যি কথা বলছে তো? বাস সোজা ডাবরানী চলে যাবে না তো? যাহোক্, সঙ্গে নিয়ে আসা মাখন দিয়ে, যদিও তারও অবস্থা আমাদেরই মতো কাহিল, তরকারী ফ্রাই আর রুটি খেয়ে, ক্লান্ত দেহে, লজে ফিরে এলাম। কেয়ারটেকার বললো, আমরা যেন বাথরুমটা ব্যবহার না করি। ওটার কাজ এখনও শেষ হয় নি, এবং ঐ ঘরে অনেক মালপত্র আছে। যদিও ঐ ঘরে কী কী আছে, আমাদের মোটামুটি আগেই সব দেখা হয়ে গেছে, আমরা তার কথায় সম্মতি জানিয়ে, ঘরে ঢুকে প্ল্যান মাফিক দরজা বন্ধ করলাম। একটা খাটকে টেনে এনে দরজার সাথে ঠেকিয়েও রাখলাম।

কত রাত জানিনা, বাসের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল। শুয়ে শুয়েই বুঝতে পারলাম, হরশীল থেকে বাসটা কথামতো ফিরে এল। যাক্ নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এতগুলো রাত এ যাত্রায় কাটালাম, কোথাও কোনদিন রাত্রে বাথরুম যাবার প্রয়োজন হয় নি। আজ কেয়ারটেকার বাথরুমটা ব্যবহার করতে নিষেধ করাতেই বোধহয় পেট ফুলে গেছে। একবার ছোট বাইরে না গেলেই নয়। এ যেন, “প্রস্রাব করিবেন না” লেখা দেখলে, প্রস্রাব করার প্রবনতার মতো। ঐ রাতে মোমবাতি জ্বেলে, খাট টেনে, দরজা ও দেওয়ালের খাঁজে গোঁজা কাঠের টুকরো টেনে খুলে, বাইরে যাবার ইচ্ছা কার করে? এতগুলো কাজ করতে করতেই তো ভোর হয়ে যাবে। চুপ করে শুয়ে থাকাই শ্রেয় মনে হ’ল। ঘুমও আসে না, কী করা যায় ভেবে ভেবে, ব্যাপারটা আরও তীব্র আকার ধারণ করলো। একটা কিছু না করলেই নয়। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম আলো না জ্বেলে, চুপচাপ বাথরুমেই কাজটা সারতে হবে। সেইমতো হাতড়ে হাতড়ে বাথরুমে ঢুকলাম। বাথরুমে কোথায় কী আছে দেখেছিলাম বটে, কিন্তু এখন আর মনে করতে পারলাম না। মনে করবার চেষ্টা করার মতো অবস্থাতেও নেই। বাথরুমের ভিতরে সবে একটু ঢুকেছি, তারে পা জড়িয়ে গেল। মনে পড়লো তার দেখেছিলাম বটে। অন্ধকারে নিজেকে যত তারমুক্ত করতে চাইছি, টিনের পাতে তারের ঘষা লেগে, তত বিকট আওয়াজ হতে শুরু করলো। যে কেউ ঐ নিঝূম রাতে অনেক দুর থেকেও, সে আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পাবে। অথচ যে কাজে গেছি, সে কাজ থেকে বিরত হলেও তো, ঘরের খাটে ফিরে আসতে হবে। কিন্তু আমার সামান্য নড়াচড়া, অসামান্য শব্দের সৃষ্টি করছে। সারারাত না নড়ে, ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো কী না ভাবছি। শেষ পর্যন্ত একটুও না নড়ে কাজ সেরে, মরিয়া হয়ে যা আছে কপালে ভেবে, আওয়াজ উপেক্ষা করেই তার থেকে পা ছাড়িয়ে, বিছানায় ফিরে এলাম।

আজ পয়লা সেপ্টেম্বর। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে, একবারে সামনের সিটে ও ঠিক তার পিছনের দু’জন বসার চেয়ার সিটে নিজেদের জায়গা রেখে এসে, দোকানে গেলাম। মাধব চা খেয়ে, দোকানের টেবিলের ওপর মানিব্যাগটা রেখে, আমাদের দাম দিয়ে দিতে বলে, একটু দুরে সকালের কাজ সারতে চলে গেল। একটু দুরে ট্রাভেলার্স লজের পাশেই, পরপর গোটা তিনেক পায়খানা। একটু ওপাশে মহিলাদের জন্য একই ব্যবস্থা। এখানেও ডাবরানীর মতোই ব্যবস্থা। দোকানে এখন কয়েকজন স্থানীয় যুবকের ভিড়। আমি চা খেয়ে, দিলীপকে দাম দিয়ে দিতে বলে, মাধবের মতো একই কাজে চলে গেলাম। অনেকক্ষণ পরে দিলীপ চা খেয়ে কাজ সেরে এসে বললো, “তোরা টাকা দিয়ে আসিসনি বলে চায়ের দাম দিতে পারলাম না”। শুনে তো আমার মাথা ঘুরে গেল। ও  আসার পর, অন্তত দশ-পনের মিনিট কেটে গেছে। এতক্ষণে মানিবাগ নিশ্চয় অন্য কারো পকেট সঙ্গী হয়ে গেছে। দিলীপকে বললাম ছুটে দোকানে গিয়ে, বেঞ্চের ওপর দেখতে। ও চলে গেল। ব্যাগে প্রায় শ’চারেক টাকা তো ছিলই, তাও আবার একবারে নতুন নোট। ফলে ব্যাগের মুখ সবসময় ফাঁক হয়ে থাকে। একটু পরে দিলীপ, ফেলে আসা মানিব্যাগ হাতে নিয়ে ফিরে এল। ঠিক কত টাকা ছিল, এখনই বলা সম্ভব নয়, তবে মনে হয় টাকা পয়সা ঠিকই আছে। কারণ কেউ হাত দিলে সবটাই নিয়ে নিত, কয়েকটা নোট বার করে নিত না। অথচ ব্যাগটা মাধব যেখানে রেখে এসেছিল, দোকানদার ও ঐ যুবকদের চোখ পড়তে বাধ্য। দিলীপ জানালো, দোকানে এখনও সবাই বসে গল্প করছে। ও দোকানের বেঞ্চের ওপর থেকেই ব্যাগটা নিয়ে এসেছে। এদের সততা, আমাদের অসততা কমাতে পারলো না, এটাই দুঃখ। যাহোক্ ঘর থেকে ব্যাগ, লাঠি, ওয়াটার বটলগুলো নিয়ে এসে, বাসে উঠে বসলাম। কেয়ারটেকার এসে ভাড়ার টাকা নিয়ে গেল। আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর বাসও ছাড়লো। কিন্তু এ ওঠে তো সে ওঠে না, ফলে বারবার বাস দাঁড় করাতে হচ্ছে। ড্রাইভারও বিরক্ত হচ্ছে। এখন বাসে অল্প কয়েকজন মিলিটারিও আছে। এবার বাস সত্যিই ছেড়ে দিল এবং অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই, হরশীল এসে পৌঁছল। রাস্তার বাঁপাশে মিলিটারি ক্যাম্প। ওরা তৈরি হয়েই ছিল। নানা আকারের বন্দুক, রাইফেল, ইত্যাদি অস্ত্র, গোটা ও খোলা অবস্থায় নিয়ে বাসের ভিতরে ও ছাদে চটপট্ উঠে পড়লো। এদের সঙ্গে দেখলাম মদের বোতল, রেডিও, ইত্যাদিও আছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ক্যাম্প প্রায় ফাঁকা। এরা কোথায় যাবে জানিনা, তবে এখানে বোধহয় একসাথে অনেকদিনই ছিল, কারণ যে দু’চারজন গেল না, তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে এবং মনে হ’ল তাদের চোখে জল। বাস ছেড়ে দিল। এরা কিন্তু আমাদের কোন অসুবিধা সৃষ্টি করলো না। আমরা আগের মতোই বেশ আরামে বসে আছি। একটু এগিয়েই রাস্তার ডানপাশে দেখলাম, গতকালের আহত ছেলেটাকে, একটা গাছের ডাল কেটে তৈরি স্ট্রেচারে শুইয়ে রাখা হয়েছে। জানালা দিয়ে তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। খুব কষ্ট পাচ্ছে। ওকে এই বাসে ডাবরানী নিয়ে যাবার জন্য, তার কয়েকজন সঙ্গী ড্রাইভারকে অনুরোধ করলো। ড্রাইভার জানালো, আহত ছেলেটাকে বাসে বসিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না, শুইয়ে নিয়ে যেতে হবে। অথচ বাসের ভিতরে ও ছাদে কোথাও এতটুকু জায়গা নেই, যেখানে তাকে শুইয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। ড্রাইভার অবশ্য জানালো, ডাবরানী পৌঁছেই, হয় সে নিজে বাস নিয়ে ফিরে আসবে, না হয় অন্য কাউকে বাস নিয়ে পাঠাবে, আহত যুবকটিকে ডাবরানী নিয়ে যাবার জন্য। বাস ছেড়ে দিল। স্বার্থপর আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

একটু এগিয়েই এক সাধু হাত দেখিয়ে বাস দাঁড় করালেন। তাঁকে দেখেই চিনতে পারলাম। বাসে উঠে উনি আমাদের একবারে কাছে এসে দাঁড়াতেই, ওদিকের একজন একটু সরে বসে তাঁকে বসবার জায়গা করে দিল। আমি আমার বিশুদ্ধ হিন্দীতে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা, আপ্ কী, মানে….”। মাধব আমায় বললো, “তোর হিন্দী বুঝবেন না, বাংলাতেই জিজ্ঞাসা কর”। আমি আবার বললাম, “আচ্ছা, আপ্ কী…”, ব্যাস, সাধু আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই ভাঙ্গা ফ্যাঁসফেসে গলায় বাংলায় বললেন, “ভুজবাসার লালবাবা। তা তোরা তো তিনজনে গিয়েছিলি”? আমরা দিলীপকে দেখালাম। আসলে ভুজবাসায় লালবাবার ছবি দেখায়, তাঁকে চিনতে আমাদের কোন অসুবিধা হয় নি। লালবাবা এবার জাপানি ছেলেটা আশ্রমে উঠেছিল কী না, আশ্রমে আমাদের কোন অসুবিধা হয়েছে কী না, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন শুরু করে দিলেন। বুঝলাম ভুজবাসা থেকে আসার সময় তিনি গঙ্গোত্রীতে, ক’জন যাত্রী গোমুখ গেছে বা যাবে, তারা কোথা থেকে এসেছে, ইত্যাদি সমস্ত খবরাখবর নিয়েছেন। এবার তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, গতকাল তাঁর আশ্রম থেকে সকালে ফিরে আসার সময় আমরা রুটি খেয়ে এসেছিলাম কী না। বললাম “অত সকালে কিছু খেতে ইচ্ছা করছিল না, তাই শুধু চা খেয়েই আমরা বেড়িয়ে ছিলাম”। শুনে তিনি বললেন “খুব অন্যায় করেছিলি, ওপথে খালি পেটে হাঁটতে নেই। তার মানে সারাদিন কিছু খাওয়া হয় নি”? বাধ্য হয়ে বলতেই হ’ল, “বিকেলবেলা লঙ্কা পৌঁছে ঝুড়িভাজা খেয়েছিলাম। রাতে রুটি তরকারী খেয়েছিলাম”। উনি আবার বললেন, “খুব অন্যায় করেছিস”। ভাবলাম এর নামই বোধহয় মানব সেবা। কোন রকম পয়সা কড়ি না নিয়ে, নিস্বার্থভাবে এরকম মানব সেবা আর কেউ করেন কী না জানিনা, তবে লালবাবা না থাকলে যে গোমুখ দেখার নিশ্চিন্ত সুযোগ কারো ভাগ্যে জুটতো না, অন্তত আমাদের মতো সহায় সম্বলহীন, তাঁবুহীন যাত্রীদের পক্ষে, এটা বোধহয় বলা-ই যায়। অথচ গঙ্গোত্রীতে এবং লঙ্কাতেও দেখলাম, দোকানের সবাই, বিশেষ করে স্থানীয় পান্ডারা, লালবাবাকে নিয়ে কী ঠাট্টা বিদ্রুপই না করে। হয়তো লালবাবার নিস্বার্থ মানব সেবা, স্বার্থান্বেষী এই পান্ডাদের যাত্রীদের নিয়ে রমরমা ব্যবসার প্রধান অন্তরায়, তাই এত ঈর্ষা, তাই এত বিদ্রুপ। এবার আমি তাঁকে তাঁর আশ্রমে যাওয়ার পথে দেখা তারার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। উনি বললেন, “তোরা দেখেছিস? খুব পরিস্কার আকাশ থাকলে দিনের বেলায় ওটা দেখতে পাওয়া যায়”। আমি বললাম, “ফিরবার পথে প্রায় একই রকম পরিস্কার আকাশেও ঐ তারাটা আমরা দেখতে পাই নি”। লালবাবা বললেন, “ওটার নাম পুচ্ছল। পুচ্ছল তারাকে রোজ দেখা যায় না। খুব পরিস্কার আকাশ থাকলে, মাঝে মাঝে দেখা যায়”। লালবাবার আশ্রমে এত কষ্ট করে গিয়েও তাঁকে দেখতে না পাওয়ার একটা দুঃখ বা মন খারাপের ব্যাপার ছিলই, সেই আকাঙ্খাও পুরণ হ’ল।

আমাদের এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তিদানের উদ্দেশ্যে, বাস তার নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছে। কাজেই যমুনোত্রী দেখতে পারলেই এ যাত্রা ষোল আনা পূর্ণ তো হবেই, হয়তো ফাউ হিসাবে কিছু বেশিই হবে। এই সব চিন্তা করতে করতে বেশ যাচ্ছিলাম, হঠাৎ চিন্তায় ছেদ টানলো আমাদের পরম আরাধ্য বাস দেবতাটি। ড্রাইভারের পাশে বসায়, অনেকক্ষণ থেকেই খুব পেট্রলের গন্ধ পাচ্ছিলাম। এখন বাসের ইঞ্জিন বন্ধ করে, সামনে ইঞ্জিনের ঢাকনা খুলে, ড্রাইভার জানালো, ইঞ্জিনে তেল বহনকারী পাইপটা ফেটে গেছে। বোঝ ঠ্যালা, এখনি হয়তো বলে বসবে বাস আজ আর যাবে না। ড্রাইভার সাহেব, বাসের ক্লীনার কাম কন্ডাক্টার কাম হেল্পারকে আগে এটা লক্ষ্য না করায় এবং প্রচুর তেল নষ্ট হওয়ায়, খুব একচোট গালিগালাজ করে, ওপর থেকে একটা নতুন পাইপ বার করে দিল। অনেক চেষ্টার পর ক্লীনার জানালো, মাপে গোলমাল আছে, ফিট করছে না। ড্রাইভার বাস থেকে নেমে অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও লাগাতে না পেরে, মেজাজ হারিয়ে, ক্লীনারকে গালিগালাজ করতে শুরু করে দিল। খুব ভয় পেয়ে গেলাম। হাজার হোক ঘর পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘের মতো, এ পথের বাস, জীপে একটু গোলমাল দেখলে, ভয় তো হবেই। যাহোক্, আরও বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর, পাইপটা লাগানো হলে, বাসের ইঞ্জিনে অনেক জল ঢালা হ’ল। এবার সুস্থ হয়ে, বাস ছেড়ে দিল।

লালবাবার সাথে মিলিটারিদের দেখলাম, খুব সুন্দর সম্পর্ক। তারা লালবাবাকে খুব সম্মান করে, বিনয়ের সাথে কথা বলছে। বাইরে আসা প্রসঙ্গে লালবাবা একজন যাত্রীকে বললেন, “মন্দির দেখতে চাও তো বদ্রীনারায়ণ যাও। মন্দির দেখে কী হবে? প্রকৃতির রূপ দেখতে চাও তো গোমুখ যাও, তপোবন যাও। এখন যাওয়া অনেক ঝামেলার তাই, না হলে যোশীমঠ থেকে মানস সরোবর কৈলাশ যাও”। সত্যিই তাই। কত আশা নিয়ে বদ্রীনারায়ণ গিয়েছিলাম, ঐ কী মন্দির? মন্দির আর হোটেল গায়ে গায়ে বিরাজ করছে। কেদারনাথ সেই তুলনায় সত্যিই সুন্দর, পাগল করা সৌন্দর্য। লালবাবা বললেন, হরশীলকে আগে হরপ্রয়াগ বলা হ’ত। আরও কত কথা যে তিনি বললেন। কথায় কথায় একসময় আমরা ডাবরানী এসে গেলাম। ব্যাস্ মুক্তি। এবার আর অন্য কারো ওপর নির্ভর করতে হবে না। আমাদের পা দু’টোই আমাদের সব বিপদ থেকে রক্ষা করবে। লালবাবার একটা ছবি তুলবো বলে       দিলীপের কাছ থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে তৈরি হয়েই ছিলাম। উনি বাস থেকে নেমে আমাদের চেনা বুদ্ধি সিং এর দোকানে ঢুকলেন। সঙ্গে একজন লোক। পরে শুনলাম উনি লালবাবার গুরুভাই, ডাবরানীতেই থাকেন। দেখা হয়ে গেল বুদ্ধি সিং এর সঙ্গেও। বুদ্ধি সিং অনেকক্ষণ ধরে করমর্দন করে, সমস্ত খবরাখবর নিলেন। ভালোভাবে সমস্ত ঘুরে ফিরছি শুনে, তিনি খুশি হলেন। হঠাৎ দেখা হয়ে গেল গাংগানী-গরমকুন্ডের সেই সন্দেহজনক ব্যক্তিটির সাথে। একগাল হেসে এগিয়ে এসে, সব খবর জানতে চাইলেন। ভীষণ খারাপ লাগছে। তাকে অহেতুক ঐ রকম সন্দেহ করার জন্য, নিজেদের সত্যিই খুব অপরাধী বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আমাদেরও দোষ দেওয়া যায় না, আমরা যে সভ্য শহরের লোক, ঠগ দেখে দেখে, ভালো লোকও যে দেশে থাকতে পারে, বিশ্বাস করতেই ভুলে গেছি। যাহোক্, এবার একটা দোকনে চা আর বনরুটি খেয়ে, হাঁটার জন্য তৈরি হয়ে নিলাম। হঠাৎ দেখি লালবাবা তাঁর গুরুভাইয়ের সাথে এগিয়ে আসছেন। তিনি তাঁর ছবি তুলতে দেন কী না জানিনা, তাই সরাসরি বললাম, যদি অনুমতি করেন তো আপনার একটা ছবি তুলতাম। উনি বললেন, “আমার ছবি? আমার ছবি নিয়ে কী করবি”? বললাম, বাঁধিয়ে রাখবো। উনি ছবি তুলতে বললেন। গুরুভাই, মাধব ও দিলীপকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর একটা ছবি নিলাম। মাধব তার জায়গায় আমাকে দাঁড় করিয়ে, আর একটা ছবি তুললো। তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, এগিয়ে চললাম সেই প্রাণান্তকর কষ্টের, আট কিলোমিটার রাস্তার উদ্দেশ্যে।

                        LALBABA OF GOUMUKH (3)                                    LALBABA OF GOUMUKH

       আমি, লালবাবার এক গুরুভাই, লালবাবা ও দিলীপ                               লালবাবা

এবার আর ভুল করা নেই। একটু এগিয়েই প্রথম ঝরনার জল পেট ভরে খেয়ে নিলাম। পথে আর জল পাওয়া যাবে না। ধীরে ধীরে বেশ একটা খুশির মেজাজে হেঁটে চলেছি। উল্টো দিক থেকে অনবরত মিলিটারি ঘোড়া ও খচ্চর, মাল বয়ে নিয়ে আসছে। একটা খচ্চরকে রক্তাক্ত অবস্থায়, খুব ধীরে ধীরে আসতে দেখলাম। শুনলাম সেটা খাদে পড়ে গিয়েছিল। এবার এই ফাঁদ থেকে বেরবার তাগিদেই বোধহয়, হাঁটতে সেরকম কষ্ট অনুভব করছি না। এ পথটা আবার অদ্ভুত, কোথাও সমতল রাস্তা নেই। হয় একবারে জিভ বার করে ওপরে ওঠো, না হয় একবারে সোজা নীচের দিকে নামো। আমরা এখন ওপর দিকে উঠছি। প্রথমে মাধব, তার ঠিক পিছনে আমি, সব শেষে দিলীপ। ওপর থেকে বেশ কয়েকটা খচ্চর, পিঠে অনেক মালপত্র নিয়ে, লাইন দিয়ে নেমে, আমাদের দিকে আসছে। মাধব রাস্তার একপাশে সরে দাঁড়ালো। রাস্তার ডানপাশে গভীর খাদ। অনেক নীচ দিয়ে রুপালি ফিতের মতো গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। বাঁপাশে খাড়া পাহাড় ও রাস্তার মাঝখানে একটু নীচুতে, খানিকটা কাঁচা জায়গা, হয়তো বৃষ্টি বা বর্ষার জল বয়ে যাওয়ার জন্য নালার মতো করে রাখা। যাহোক্, মাধব একপাশে সরে গিয়ে, আমাকেও সরে দাঁড়াতে বললো। আমি দেখলাম খাদের দিকে দাঁড়ানো ঠিক হবে না। নীচের ঐ সরু নালার মতো কাঁচা জমিটায় না নেমে, শরীরটাকে একটু কাত করে, খচ্চরগুলোকে যাবার জায়গা ছেড়ে দিলাম। খচ্চরগুলো পরপর মাধব ও আমাকে অতিক্রম করে চলে গেল। সামনের দিকে এগোতে যাচ্ছি, হঠাৎ কী রকম একটা আওয়াজ হতে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, দিলীপ একটা খচ্চরের মালপত্রের ধাক্কায়, বাঁপাশের সেই নীচু সমতল কাঁচা জমিতে নেমে গেছে। খচ্চরগুলোর পিছন পিছন একটা লোক, ওগুলোকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে ঠিকমতো নিয়ে যাচ্ছে। দিলীপ খুব কড়া দৃষ্টিতে ভ্রু কুঁচকে, ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, রাস্তায় উঠে এসে, আমাদের পিছন পিছন আবার ওপর দিকে হেঁটে চললো। বেশ কিছুটা পথ যাওয়ার পরে মাধব হঠাৎ আবিস্কার করলো, যে দিলীপের ওয়াটার বটলের ঢাকনা-কাম গ্লাশটা, বটলের সাথে নেই। বটলটার মুখে একটা পাতলা চাকতি চেপে বসানো থাকে। তার ওপরে গ্লাশটা প্যাঁচ দিয়ে লাগাতে হয়। কাজেই গ্লাশ বিহীন ঐ ওয়াটার বটলের কোন মূল্যই নেই। আমি বললাম খচ্চরের ধাক্কায় নিশ্চই ঢাকনাটা ওখানে পড়ে গেছে। দিলীপ আর বৃথা সময় নষ্ট না করে, আবার নীচের দিকে অকুস্থলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। আমরা পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে দিলীপ ফিরে এল বটে, তবে গ্লাশ বিহীন। ওটাকে খুঁজে পাওয়া যায় নি। এখন পর্যন্ত আমার বর্ষাতির টুপি, মাধবের লাঠির নাল, আর দিলীপের ওয়াটার বটলের গ্লাশ, তাদের নিজ নিজ প্রভুদের ত্যাগ করে, হিমালয়ে চলে গেছে। আর কে কে, কাকে কাকে ছেড়ে চলে যাবে জানিনা। দিলীপকে বললাম মন খারাপ না করে সামনের দিকে এগতে। উত্তরকাশীর আগে কিছু করার উপায় নেই। উত্তরকাশী গিয়ে বটলের মুখটা, পলিথিন সিট ও কাগজ দিয়ে ভাল ভাবে শক্ত করে বেঁধে দেব। এবার আমরা বেশ জোরে হাঁটা শুরু করলাম। আজ কিন্তু সেরকম উল্লেখযোগ্য পরিশ্রম বোধ হচ্ছে না। একসময় মাধব দেখালো কিছুটা পিছনে, নীচের দিকে লালবাবা হেঁটে আসছেন। ওনার হাঁটার গতি এত দ্রুত, যে এর মধ্যে আমাদের ধরে ফেলেছেন। এখন বুঝতে পারছি, সেদিন সন্ধ্যার সময় লালবাবার আশ্রম থেকে সত্যনারায়ণ পান্ডার দাহ শেষে, ওরা আমাদের কেন ওদের সাথে গঙ্গোত্রী নিয়ে যেতে রাজি হয় নি। আমি বেশ দ্রুত হেঁটে চলেছি। রাস্তা অনবরত বাঁক নিচ্ছে, ফলে একটু পরেই দিলীপ ও মাধব, আমার দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। কতটা পথ এইভাবে এগিয়েছি জানিনা, সামনে জনা ছয়-সাত যুবক যুবতীকে আসতে দেখলাম। সবাই বাঙালি। এই প্রথম এই রাস্তায় বাঙালি কোন মহিলা যাত্রী, যাত্রী না বলে তীর্থযাত্রীকে বলা বোধহয় ঠিক হবে, আসতে দেখলাম। ওরা নিজেরাই আলাপ শুরু করে দিল। হাওড়া-কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ওরা এসেছে। যমুনোত্রী হয়ে গঙ্গোত্রী যাচ্ছে, ক্ষমতায় কুলোলে গোমুখ যাবে। তবে এদের কথাবার্তায়, গোমুখ যাবার মতো ক্ষমতা থাকলেও, মনোবল আছে বলে মনে হ’ল না। প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্যই জানালাম। ওরা জিজ্ঞাসা করলো, ডাবরানী থেকে আজ বাস পাওয়া যাবে কী না। আমাদের অভিজ্ঞতার কথা বলে জানালাম, ভাগ্য ভাল থাকলে, প্যাসেঞ্জার পাওয়া গেলে, ড্রাইভারের মর্জি হলে, আজই বাস পাওয়া যেতে পারে। প্যাসেঞ্জার না পেলে, দশ দিনও অপেক্ষা করতে হতে পারে। ইতিমধ্যে মাধব ও দিলীপ এসে  গেছে। এই দলটার কাছে আমরা এবার যমুনোত্রীর পথ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলাম। একজন শ্রীরামপুরের যুবক জানালো, যমুনোত্রীর পথ খুবই কষ্টকর। সেই তুলনায় এ পথে কষ্ট অনেক কম। যুবকটি আরও বললো, ও পথে দেখার বিশেষ কিছু নেই, শুধু মাত্র যাওয়ার জন্যই যাওয়া। চেষ্টা করে দেখুন, পৌঁছে যেতে পারেন। ওর বাচনভঙ্গি সহ্য হ’ল না। বললাম, আমরা হেমকুন্ড সাহেব, ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্স, বদ্রীনারায়ণ, বসুধারা, ত্রিযুগীনারায়ণ, কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী ও গোমুখ হয়ে, যমুনোত্রীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছি। এতগুলো জায়গার পথের কষ্ট নিশ্চই যমুনোত্রীর পথের কষ্টের চেয়ে কিছু বেশিই হবে। কাজেই আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন, আমরা ওখানে পৌঁছে যাব। ওরা এই মরণফাঁদ থেকে কম কষ্টে, সহজে ফিরে আসুক কামনা করে, শুভেচ্ছা জানিয়ে, আমরা আবার এগিয়ে চললাম। একে গোটা রাস্তাটাই খুব চড়াই উতরাই ভাঙ্গতে হয়, তার ওপর আমরা আবার বাইপাস্ ব্যবহার করতে শুরু করলাম। ফলে প্রাণান্তকর কষ্ট হলেও, খুব তাড়াতাড়ি এগতে লাগলাম। তবু যেন যাওয়ার সময়ের কষ্টের কাছে কিছুই কষ্ট নয় বলে মনে হচ্ছে। সব জায়গায় দেখেছি, যাওয়ার সময় একটা নতুন জায়গা দেখার আগ্রহেই বোধহয়, হাঁটার কষ্ট ফেরার সময়ের তুলনায় অনেক কম বলে মনে হয়। একমাত্র এই পথে, ফাঁদ থেকে বেরবার তাগিদেই বোধহয়, ঠিক তার উল্টো অনুভুতি হচ্ছে। আসবার সময় কিছুটা এগিয়ে একটা ছোট ব্রিজ পার হতে হয়েছিল। ব্রিজটার তলায় অল্প নীচু দিয়ে কোন একটা ঝরনা বা ছোট পাহাড়ি নদীর জল, নীচে গঙ্গায় গিয়ে পড়ছে। মাধব অনেক ওপর থেকে চিৎকার করে আমায় ডেকে, খাবার জল সংগ্রহ করতে বললো। আর কিছুটা এগলেই, যাবার সময় দেখা প্রথম ঝরনাটা পাওয়া যাবে। তবু ওর কথায় দাঁড়িয়ে পড়লাম। কয়েকজন স্থানীয় ছেলে মগ হাতে ব্রিজের শেষে দাঁড়িয়ে আছে। ওরাও বোধহয় এই ব্রিজের নীচ থেকেই জল তুলে এনে পান করেছে। পাত্রটা চেয়ে নিয়ে খুব ঢালু পথ বেয়ে নেমে, খানিকটা জল এনে আমরা তিনজনই অল্প করে জল পান করলাম। পাত্রটা ফেরৎ দিয়ে আবার এগিয়ে চললাম। আরও খানিকটা পথ এগিয়ে গাংগানীর সেই জলপাই রঙের নতুন ব্রিজটা চোখে পড়লো। গতি বৃদ্ধি করে এগিয়ে গিয়ে, গাংগানীর একটু আগে একটা চায়ের দোকানে, একজনের ডাকে ঢুকলাম। আসবার সময় গাংগানী বা গরমকুন্ড থেকে একটু ওপরে উঠে অনেকগুলো সম্ভবত মিলিটারি তাঁবু দেখেছিলাম। এই দোকানটা তখন বন্ধ ছিল। এখন শুনলাম, ঐ তাঁবুতে রাতে থাকার ব্যবস্থা আছে এবং খাটিয়া ভাড়া পাওয়া যায়। যে ভদ্রলোক আমাদের ডাকলেন, তিনি বললেন, “আপনারা তো যাবার সময় গরমকুন্ডে ছিলেন। ঐ দোকানে আমি আপনাদের দেখেছিলাম”। আমরা ভালোভাবে ঘুরেছি শুনে উনি খুব খুশি হলেন। এমন সময় পাশ দিয়ে লালবাবাকে যেতে দেখলাম। ওনার আসতে এত বিলম্ব হ’ল কেন বুঝলাম না। দোকানের ভদ্রলোক লালবাবাকে চা খেয়ে যাবার জন্য ডাকলেন। লালবাবা জানালেন, গরমকুন্ডে স্নান সেরে উনি চা খাবেন। আমরা চা খেয়ে, ভদ্রলোকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, এগিয়ে গেলাম। যাবার পথে লালাজীর দোকানে একবার উঁকি দিয়ে গেলাম। লালাজীর দেখা মিললো না। আমরা ব্রিজ পার হয়ে, সোজা ভুখির উদ্দেশ্যে এগলাম।

এবারের রাস্তা ভাঙ্গা হলেও বাস রাস্তা। সঙ্গীদের বললাম পা চালাতে। সম্ভব হলে আজই ভুখি থেকে সোজা উত্তরকাশী চলে যাব। যথেষ্ট সময় হাতে আছে। একসময় আমরা ভাঙ্গা এবড়ো খেবড়ো জায়গাটা পার হয়ে, যেখানে ড্রিল করে ব্লাষ্টিং করিয়ে, পাহাড় কেটে, রাস্তা তৈরি হচ্ছে, সেই জায়গায় এসে হাজির হলাম। দুর থেকে দেখলাম কয়েকজন লোক, ঐ ব্লাষ্টিং করা জায়গাটার আগের বাঁকটায় বসে আছে। আমি ও দিলীপ আর একটু এগতেই, লোকগুলো ভাঙ্গা জায়গাটায় কর্মরত লোকগুলোর ইঙ্গিত পেয়ে এগিয়ে চললো। একটা বুলডোজার দাঁড়িয়ে আছে। ওটা ব্লাষ্টিং করে ভাঙ্গা পাহাড়ের টুকরোগুলো, গভীর খাদে ঠেলে ফেলছে। মাধবের পায়ের ব্যথাটা বোধহয় আবার বেড়েছে। চিৎকার করে ওকে তাড়াতাড়ি আসতে বললাম। বুলডোজারটা লোক চলাচলের জন্য কিছুক্ষণ কাজ বন্ধ করে দাঁড়িয়েছে। ওটা কাজ শুরু করলে আবার অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আমি প্রায় পার হয়ে গিয়ে, মাধবকে হাত নেড়ে তাড়াতাড়ি আসতে বলছি, কারণ আমি ও দিলীপ পার হয়ে গেলেও কোন লাভ নেই। মাধব না আসলে, ওর জন্য অপেক্ষা করে সেই বসে থাকতেই হবে। বুলডোজারটা আর অপেক্ষা না করে, নড়ে উঠে কাজ শুরু করে দিল। একজন পাঞ্জাবি ভদ্রলোক কাজ তদারকি করছেন। ভদ্র্রলোক আমাকে ডেকে এদিকে ফিরে আসতে বললেন। আমি ফিরে চলে এলাম। ইতিমধ্যে মাধব এসে গেছে। পাঞ্জাবি ভদ্রলোক বললেন—“একটু অপেক্ষা করে যান। এখন পার হওয়া বিপজ্জনক”। বুলডোজারটা পাথরগুলো খাদে ঠেলে না ফেলে, রাস্তার ধারে, খাদের দিকে জড়ো করে রাখছে। সম্ভবত একবারে ঠেলে সব পাথর তলার খাদে ফেলবে। ঐ জড়ো করা পাথরের ওপর দিয়েই আমাদের পার হতে হবে। অর্থাৎ একবারে রাস্তার ধারে, শেষ প্রান্ত দিয়ে যেতে হবে। ভয় হচ্ছে কোন পাথরে পা দিয়ে, পাথর সমেত খাদে না চলে যাই, কারণ সমস্ত পাথরই ভাঙ্গা ও আলগা নড়বড়ে। অনেক নীচ দিয়ে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। তলায় গড়িয়ে পড়লে গঙ্গার জল মুখে ঢোকার আগেই, গঙ্গাপ্রাপ্তি হবে। আমরা ভাঙ্গা জায়গাটা পার হবার জন্য এগলাম। প্রথমে আমি, আমার পিছনে দিলীপ ও সবশেষে মাধব। খুব সাবধানে আমরা জায়গাটা পার হয়ে এলাম। এবার রাস্তা পাকা ও বেশ ভালো। বাস যাবার উপযুক্ত। এবার আর হাঁটায় কোন অসুবিধা নেই। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা ভুখি চলে এলাম।

হায় কপাল! একটা বাসকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম না। টিকিট কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানলাম, আজ কোন বাস যাবে না। কাল ভোরে বাস ছাড়বে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আজ বাস না পাওয়া মানে পুরো একটা দিন নষ্ট। তাও আবার ভুখির মতো একটা অখ্যাত গন্ডগ্রামে। আজ উত্তরকাশী যেতে পারলে, আগামী কালই আমরা যমুনোত্রী যাবার হাঁটাপথের শুরু, সায়নাচট্টি চলে যেতে পারতাম। এখন তো মনে হচ্ছে এর থেকে গরমকুন্ডে লালাজীর দোকানে থেকে গেলেই ভালো করতাম। কোন উপায় নেই। বাঁপাশের ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে ঢুকে চায়ের অর্ডার দিলাম। এই দোকানের সাথে কথা বলে, এখানেই রাতের বিশ্র্রাম নেবার ব্যবস্থা প্রায় পাকা করে ফেললাম। এখানেও কোনরকম আমিষ খাবার পাওয়া যাবে না। তার মানে সেই রুটি আর পচা আলুর তরকারী কপালে নাচছে। একটু কিছু ভালো খাবারের জন্য, জিভ একবারে ছটফট করছে। থাকা খাওয়ার কথা পাকা করার ব্যাপারে কথা বলছি, এমন সময় একটা বাস উত্তরকাশীর দিক থেকে এসে হাজির হ’ল। আবার টিকিট কাউন্টারে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বাস আজ যাবে, তবে ঊত্তরকাশী পর্যন্ত যাবে না। আজ “ভাটোয়ারী” পর্যন্ত যাবে। ওখানে বাস কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে, সম্ভব হলে উত্তরকাশী যাবে। এখানে থাকা খাওয়ার প্রোগ্রাম চটজলদি বাতিল করে, তিনটে ভাটোয়ারী পর্যন্ত টিকিট কাটা হ’ল। কাউন্টটার থেকে উত্তরকাশী পর্যন্ত কোন টিকিট দেওয়া হচ্ছে না। ভাটোয়ারী পর্যন্ত তিনজনের সেই মোট তিন টাকা ভাড়া লাগলো। বাস পেয়েও আজ আর উত্তরকাশী বোধহয় যাওয়া হ’ল না। বাসে অনেক প্যাসেঞ্জার উঠেলেও, বাস ছাড়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। “না আঁচালে বিশ্বাস নেই” কথাটার প্রকৃত অর্থ বাস্তবে বুঝতে হলে, এইসব এলাকার বাসে চাপতে হবে। বাস ছাড়ার আগে যে কোন মুহুর্তে, আজ আর বাস যাবে না, বা বাস আজ অতদুর না গিয়ে এই জায়গা পর্যন্ত যাবে, শোনার সম্ভাবনা পদে পদে। বাসের সব প্যাসেঞ্জার তাড়াতাড়ি বাস ছাড়ার জন্য অনুরোধ করছে। দেরি হলে উত্তরকাশী যাবার আর কোন সম্ভাবনাই থাকবে না। বাসে বেশ কয়েকজন মিলিটারি যাত্রীও আছে। এমন সময় বাসটার ঠিক পিছনে, খুব উঁচু একটা ট্রাক এসে দাঁড়ালো। ট্রাকটার একবারে ওপর পর্যন্ত, কাঠের গুঁড়ি বোঝাই। একে একে মিলিটারিরা প্রায় সবাই, ট্রাক ড্রাইভারকে বলে, ট্রাকের ভিতরে ও ওপরে কাঠের গুঁড়ির ওপর চেপে বসলো। জানা গেল ট্রাকটা সোজা উত্তরকাশী যাবে। আমরাও ঠিক করলাম ট্রাক ড্রাইভারকে অনুরোধ করে, এই ট্রাকেই উত্তরকাশী চলে যাব। মাধব বললো ওতে করে যাওয়া, খুব বিপজ্জনক হবে। দিলীপের কিন্তু ট্রাকে যাবার বাপারে খুব উৎসাহ দেখলাম। আমিও বুঝতে পারছি, ঐ উঁচু ট্রাকে কাঠের ওপর কোন কিছু না ধরে অতটা পথ যাওয়া সত্যিই খুব ঝুঁকি সম্পন্ন। কিন্তু এই মুহুর্তে উত্তরকাশী যাবার জন্য, যে কোন ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। শেষ পর্যন্ত আমাদের ভাবতে ভাবতেই, অনেক সাধারণ যাত্রীও ট্রাকে গিয়ে উঠে পড়লো। ওরা ট্রাকের একবারে ওপরে, গাছের গুঁড়ির ওপর উঁচু হয়ে বসে, গাছের মোটা গুঁড়ি ধরে রয়েছে। ট্রাক একটু লাফালে, টাল সামলানো সত্যিই খুব কষ্টকর হবে। ভাবলাম, এগুলো নিয়ে ট্রাকে বসে ভাবা যাবে, আগে ট্রাকে যাবার ব্যবস্থাটা পাকা করে নেওয়া যাক। শেষ পর্যন্ত দিলীপ গিয়ে ড্রাইভারকে অনুরোধ করলো বটে, কিন্তু ওর সেই দুর্বল অনুরোধ নাকচ করে দিয়ে, ড্রাইভার জানালো, ভাটোয়ারীতে ট্রাক একটু খালি হবে, তখন সে আমাদের তার ট্রাকে তুলে নেবে। আরও বেশ কিছুক্ষণ বাস ও ট্রাক দাড়িয়ে থাকার পর কী হ’ল বুঝলাম না, বেশ কিছু লোক ট্রাক থেকে নেমে এসে আবার বাসে উঠে বসলো। একটু পরেই ট্রাকটা ছেড়ে দিল। বাস ড্রাইভার জানালো, ভাটোয়ারীর পরে পাহাড় ব্লাষ্টিং করানো হয়েছে। কাজেই ট্রাকের সব যাত্রীকেই ওখানে নেমে যেতে হবে। আজ আর কোন গাড়িকেই ভাটোয়ারীর ওদিকে যেতে দেওয়া হবে না। সামান্যই পথ, একটু পরেই আমরা ভাটোয়ারী পৌঁছে গেলাম। বাস কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিল, আজ আর বাস যাবে না। কাল ভোর বেলা বাস ছাড়বে। বাসের অফিসের সামনে অনেক প্যাসেঞ্জারের ভিড়। সকলেই বাসকে আজই উত্তরকাশী নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করছে। বাস ড্রাইভারের কথাবার্তায় বেশ বুঝতে পারছি, ও ইচ্ছা করেই আজ বাস নিয়ে যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত অত লোকের অনুরোধে, কর্তৃপক্ষ জানালো, ওদিক থেকে কোন বাস আসলে, এই বাস যাবে। ট্রাক থেকে সত্যিই সব লোককে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাধব বললো, অনেক লোক, জায়গাটাও খুবই ছোট, আগে থেকে একটা থাকার জায়গা ঠিক করা উচিৎ। কিন্তু ঐ যে, আশায় মরে চাষা। আমাদের এখনও আশা, বাস হয়তো যাবে। এর মধ্যে উত্তরকাশীর দিক থেকে সত্যিই একটা বাস এসে উপস্থিত হ’ল। কথামতো এবার আমাদের বাস ছাড়ার কথা। সমস্ত প্যাসেঞ্জার বাসে উঠে পড়লো। এবার কিন্তু ড্রাইভার অন্য্ চাল চাললো। আমাদের বাসের ড্রাইভার ও কন্ডাক্টার, ভুখিগামী বাস ড্রাইভারকে বললো, এই বাসের প্যাসেঞ্জারদের উত্তরকাশী নিয়ে যেতে। সে নিজে তার বাসে ভুখিগামী প্যাসেঞ্জারদের, ভুখি পৌঁছে দেবে। অর্থাৎ এ বাসের প্যাসেঞ্জারদের ঐ বাস, এবং ঐ বাসের প্যাসেঞ্জারদের এই বাস নিয়ে যাবে। এই ব্যবস্থায় আমাদের আপত্তি করার কিছু নেই। কিন্তু আপত্তি জানালো, ঐ বাসের ড্রাইভার। সে এই প্রস্তাবে রাজি হ’ল না। ফলে আমাদের উত্তরকাশী যাবার বাড়া ভাতে, ঐ ড্রাইভার জল ঢেলে দিল। সকলের সমস্ত অনুরোধ উপেক্ষা করে, আমাদের বাস ড্রাইভার জানালো, ওদিকের রাস্তা ভালো নেই, বাস আজ আর যাবে না। কাল খুব ভোরে বাস যাবে। ট্রাকটা চলে গেল। আমাদের অজানা, অচেনা, ছোট্ট একটা আধা শহরে বাস থেকে নামিয়ে দিয়ে, ড্রাইভার ও কন্ডাক্টার বাস কর্তৃপক্ষের অফিসে আড্ডা দিতে চলে গেল।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s