পাহাড়ের রোজনামচা – দশম পর্ব {লেখাটি www.amaderchhuti.com ও TOUR & TOURISTS পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

DSCN9767মাধব ও দিলীপ এবার ফিরতে বললো। আমার কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না। নন্দন কাননে তাঁবু খাটিয়ে তিনজনকে থাকতে দেখেছি। মনে হচ্ছে আমরা তিনজনও যদি ওরকম তাঁবু ফেলে দু’একটা দিন এখানে থাকতে পারতাম, কী ভালো হ’ত। প্রতিদিন যে নোংরা, বীভৎস গঙ্গাকে আমরা দেখি, তার এত সুন্দর রূপ? আরও মিনিট পনের-কুড়ি ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে গঙ্গার রূপ ও পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্য উপভোগ করে, ভূজবাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মনে হ’ল স্বর্গ বলে সত্যি যদি কোথাও কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেটা নিশ্চয় এখানেই। স্বর্গ সুখ যদি পেতে হয়, সব দুঃখ জ্বালা ভুলে যদি শান্তি পেতে হয়, তাহলে এখানেই আসা উচিৎ। একটু এগিয়ে সাদা পতাকার ঢিবিতে উঠবার চেষ্টা করলাম। ঢিবিতে পা দিয়ে উঠবার চেষ্টা করলেই, ছোট বড় পাথর ওপর থেকে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। শেষে এক পা তুলে, পাথরকে নীচে গড়াতে দিয়ে, না থেমে, চটপট্ ওপরে উঠে গেলাম। ঠিক যেন একটা গড়িয়ে যাওয়া ড্রামের ওপর দিয়ে হেঁটে, এখানে এলাম। তিনটে ওয়াটার বটলই আমার কাঁধে। দিলীপও একটু চেষ্টার পর উঠে এল। মাধব পাথর পড়ার দৃশ্য দেখে আর উঠতে পারে না। অনেক চেষ্টায়, ঐ গড়ানো পাথরের মধ্যে দাঁড়িয়েই, লাঠি বাড়িয়ে ওকে টেনে তুলে আনা হ’ল। কিছুক্ষণ পরে একইভাবে বিপদ মাথায় নিয়ে, নীচে নেমে এলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, বাঁদিকে একটা উচু ঢিবির ওপর একটা প্রজাপতি ধরার জাল, হাওয়ায় উড়ছে। চিনতে পারলাম। গঙ্গোত্রী থেকে আসবার পথে এক জাপানিকে গোমুখ আসতে দেখেছিলাম, তার হাতে এরকম প্রজাপতি ধরার জাল ছিল। ওর ইংরাজী উচ্চারণ ছিল অদ্ভুত। একটা শব্দও বোঝা যায় ন। অনেক সময় নিয়ে জেনেছিলাম, সে জাপানে শিক্ষকতা করে। এখান থেকে স্যাম্পেল হিসাবে বেশ কিছু প্রজাপতি সে দেশে নিয়ে যাবে, এবং সেই জন্যই তার এখানে এত কষ্ট করে আসা। জানিনা জাপানে প্রজাপতির অভাব আছে কী না। গোমুখ যে প্রজাপতির আড়ৎ, এ তথ্যই বা সে কোথায় পেল তাও জানিনা। সত্যি, কত রকমের লোকই যে এই দুনিয়ায় আছে। আমরা কলকাতায় থাকি শুনে ও বলেছিল—“কালখাতা? এ ড্যানঝারাস্ সিতি”। ১৯৭২ সালে সে কলকাতা এসেছিল বলেই কী কলকাতাকে তার ডেঞ্জারাস সিটি বলে মনে হয়েছিল? যাহোক্‌, জাপানিটাকে দেখলাম পাথরের ধারে শুয়ে থাকতে। একটা কুলি পিঠে টেন্ট্ বয়ে এনে, এখানে খাটাচ্ছে। অর্থাৎ আজ রাতে সে এখানেই থাকবে। আমরা এবার এগলাম।

মাধব বললো পাথরের ওপর পাথর রাখা চিহ্নগুলো ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। ওকে বললাম, যে যেদিক দিয়ে এসেছে, সে সেদিকে পাথর রেখে চিহ্ন রেখে গেছে। ফলে চরিদিকে অজস্র এই চিহ্ন দেখা যাওয়ায়, আরও অসুবিধার সৃষ্টি করছে। ঐ চিহ্ন দেখে হাঁটতে গেলে গোলকধাঁধার মতো একবার ওপরে, একবার নীচে, একবার ডানদিকে, একবার বাঁদিকে ঘুরে মরতে হবে। চিহ্নের কোন প্রয়োজন নেই, গঙ্গাকে বাঁপাশে রেখে এগিয়ে গেলেই, লালবাবার আশ্রম পাওয়া যাবে। নতুন হান্টার সু এর অনেক জায়গায় আঠা খুলে ফাঁক হয়ে গেছে। একটু এগিয়ে গঙ্গার ধারে একটা পাথরের ওপর বসে, মনের সুখে খেজুর খেলাম। দিলীপকে জিজ্ঞাসা করলাম, এবার তার কেমন লাগছে? ডাবরানী থেকে এখানে আসতে না চেয়ে ফিরে যেতে চেয়েছিল বলে, আর একবার মন ভরে গালিগালাজ করলাম। ও অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে স্বীকার করলো, আমি জোর না করলে ওর এখানে আসা হ’ত না। এ দৃশ্য উপভোগ করার পর, আমি জানি আমায় কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে ওর উপায় নেই। আমি গর্ব করে বলতে পারি, ওদের থেকে আমার মানসিক জোর অনেক বেশি। আবার পথ চলা শুরু করলাম। এঁকেবেঁকে পাথর ডিঙ্গিয়ে, একসময় আমরা রাস্তায় এসে পড়লাম। বারবার পিছন ফিরে, এ জীবনে শেষবারের মতো গোমুখকে দেখতে দেখতে, একসময় লালবাবার আশ্রমের সামনে এসে হাজির হলাম। আশ্রমটা অনেক নীচে, ফলে ওখানে সূর্যালোক নেই। মনে করেছিলাম আশ্রমের ফটো পরে নেব। এখন জায়গাটা সূর্যালোকহীন। যাহোক্, শেষ পর্যন্ত আমরা আশ্রমে অক্ষত অবস্থায় ফিরতে, সমস্ত লোক ও গুরুভাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। ভাবলাম যাত্রীদের জন্য এরা সত্যি কত চিন্তা করে। শুনলাম পুলিশ ও সকালের প্রায় সব লোক গঙ্গোত্রী ফিরে গেছে। কিছুলোক এখনও আছে। এরা সত্যনারায়ণ পান্ডার শেষকৃত্য সেরে ফিরেছে। আজই গঙ্গোত্রী ফিরে যাবে। সত্যনারায়ণ পান্ডার ভাইপো নিজেও এই দলে আছে। ওদের গোমুখ থেকে ফিরে আসা পুলিশের দলটায় দেখেছিলাম বলে মনে করতে পারলাম না। তাহলে ওরা কোন দিক দিয়ে ফিরে আসলো, তাও বুঝলাম না। যাহোক্, ওদের বললাম, আমরা ওদের সাথে গঙ্গোত্রী ফিরে যেতে চাই। উত্তরে ওরা জানালো যে, ওদের হাঁটার গতি অনেক বেশি, আমরা ওদের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারবো না। অন্ধকার নেমে আসলে রাস্তায় বিপদ হতে পারে, তাই আমাদের আগামীকাল ফেরাই উচিৎ হবে। ফলে হাতে আর কোন কাজ নেই, চা খেয়ে চট্ পেতে বসে থাকলাম। আগুনের পাশে বসে থাকতে বেশ ভালোই লাগছে। একটু পরেই ঐ দলটা গঙ্গোত্রী ফিরে গেল। বসে বসে চিন্তা করছি, ভালোয় ভালোয় যমুনোত্রী যেতে পারলে বাঁচি। আজকের অভিযানের পর, দিলীপকে নিয়ে আর কোন সমস্যা হবে না। এখন আমি নিজে যেতে না চাইলেও, ওই আমায় জোর করে টেনে নিয়ে যাবে। মাধবের শরীর নতুন করে খারাপ না হলে, ওকে নিয়েও কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু আসল সমস্যা তো এই মরণফাঁদ থেকে বেরনো। আর এই ফাঁদের বিস্তৃতি তো বিশাল। এখান থেকে সেই ভুখি পর্যন্ত। ওখানে না পৌঁছনো পর্যন্ত শান্তি নেই। কবে কিভাবে ফিরবো জানিনা।

গুরুভাই আমাদের একটা বেশ বড় ঘরে নিয়ে গেলেন। আমরা আগুনের পাশ থেকে উঠে এসে, এই ঘরে এসে বসলাম। কাঠের মেঝে, কাঠের দেওয়াল। মেঝেতে কিছুটা ফাঁক ফাঁক অন্তর, সরু সরু কাঠের পাটাতন লাগানো। মনে হচ্ছে কড়ি-বরগার ছাদ যেন মেঝে হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর কারণ জিজ্ঞাসা করায় গুরুভাই জানালেন, ভিড়ের সময় যাতে কেউ বেশি জায়গা দখল করতে না পারে, তাই এ ব্যবস্থা। এক একটা ফাঁকে, এক একজনের শোবার ব্যবস্থা। ধনী, দরিদ্র, সবার জন্য একই ব্যবস্থা। এত সরু জায়গায় মোটাসোটা লোক হলে, কিভাবে শোবে ভেবে পেলাম না। ঘরে ঢুকবার ব্যবস্থাটাও ভারী অদ্ভুত। প্রথম ঘরের মধ্যে ঢুকে, ডানদিকের দেওয়ালে আর একটা দরজা দিয়ে দ্বিতীয় ঘরে যেতে হয়। আমরাও ঐ ভাবেই দ্বিতীয় ঘরে এসে উপস্থিত হলাম। দ্বিতীয় ঘরটায় কোন জানালা বা তৃতীয় দরজা নেই। প্রথম ও দ্বিতীয় ঘরের মাঝের দরজা বন্ধ করে দিলে, বাইরের এতটুকু ঠান্ডা হাওয়া, দ্বিতীয় ঘরে ঢোকার অবকাশ নেই। যাহোক্, এই দ্বিতীয় ঘরে ব্যাগ রেখে, ছোট্ট মন্দিরের মতো ঠাকুর ঘরের কাছে এলাম। আরতি শুরু হ’ল। লালবাবার গুরুভাই আরতি করছেন। মন্দিরের ভিতরে কোন চেনা জানা দেবদেবীর ছবি বা মুর্তি স্থান পায় নি। ভিতরে দেখলাম একটা হনুমান, গঙ্গাদেবী ও লালবাবার গুরুদেব, শ্রী বিষ্ণু দাসের ছবি। এখানেই শুনলাম লালবাবার গুরুদেব, শ্রী বিষ্ণু দাস বাঙালি ছিলেন। সম্প্রতি তিনি দেহ রেখেছেন। গোমুখ থেকে কিছুটা ওপরে, তপোবনে উনি আশ্রম করে থাকতেন। আরও শুনলাম, গোমুখ পেরিয়ে দুর্গম পাহাড়ি রাস্তায় চল্লিশ কিলোমিটার পথ হেঁটে, বদ্রীনারায়ণ যাওয়া যায়। যাহোক্, আরতি শেষ হ’ল। এখানে আরতি কিন্তু অনেক সময় নিয়ে, লোক দেখানো ভড়ং করা নয়। খুব অল্প সময়ের জন্যই প্রদীপ ঘুরিয়ে, আরতি শেষ।

13726692_617648125077607_1906077442459251312_n লালবাবার আশ্রমের ঘর ও রাতে  শোয়ার ব্যবস্থা

নালার জলে হাত দিয়ে মনে হ’ল, বরফ বোধহয় এর থেকে গরম। আগুনের সামনে বসে থাকাই আরামদায়ক। আশ্রমের কয়েকজন সেই একই প্রক্রিয়ায় রুটি তৈরি করছেন। বরঞ্চ এখানকার রুটি আরও স্বাস্থ্যবান। আমরা আর এক দফা চা খেলাম। মনে হয় এখানে অনেকটা চা একবারে করে, আগুনের পাশে রেখে দেওয়া হয়। যার যখন প্রয়োজন বা ইচ্ছা, পাত্রে চা ঢেলে খেয়ে, পাত্র ধুয়ে রাখে। চা শেষ হয়ে গেলে, নতুন করে আবার তৈরি করা হয়। রাত্রে এই স্বাস্থ্যবান রুটি ও সকালের সেই ডাল। এখানে একবার ডাল তৈরি হয় এবং সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত, অন্য কিছু তৈরি করা হয় না। ওটা শেষ হয়ে গেলে, আবার নতুন কিছু তৈরি করা হবে। গঙ্গোত্রীর পান্ডারা প্রায়ই এখানে আসা যাওয়া করে, ফলে বেশিদিন এ ডাল থাকবেও না।

আবার ঘরে এসে বসলাম। গুরুভাই একটা হ্যারিকেন দিয়ে যাবার সময় বলে গেলেন যে, তিনি আমাদের রাতের খাবার ঘরেই দিয়ে যাচ্ছেন, আমাদের আর কষ্ট করে ঠান্ডায় বাইরে যাবার দরকার নেই। আমরা বললাম, আমাদের কোন কষ্ট হবে না। বাইরে এসে আগুনের ধারে চট্ পেতে বসলাম। ভাবতেও অবাক লাগছে, কোথায় আমাদের বাড়ি, আর কোথায় কোন বরফের রাজ্যে, আগুনের ধারে চট্ পেতে বসে, ডাল রুটি খাচ্ছি। এই মুহুর্তে বাড়ির লোকেরা কী করছে কল্পনা করবার চেষ্টা করলাম। দু’টো মাত্র রুটি খেলাম। গুরুভাই বললেন, আমরা নিশ্চই লজ্জা করে কম খাবার খাচ্ছি। আমরা জানালাম, এই আতিথেয়তা আমরা কোনদিন ভুলবো না। এরপর লজ্জা করার কোন উপায়ই থাকে না। সত্যি সত্যিই আমাদের আর খিদে নেই। মনে মনে লালবাবা এখানে এখন নেই বলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। তিনি থাকলে দু’টো রুটি খেয়ে, এত সহজে কিছুতেই নিষ্কৃতি পেতাম বলে মনে হয় না। আবার এরকম একটা মানুষকে একবার চোখের দেখা দেখতে পেলাম না বলে, কিরকম একটা কষ্টও অনুভব করলাম। খাওয়া হয়ে গেলে, বরফ গোলা ঠান্ডা নালার জলে, নিজেরাই থালা ধুয়ে দিলাম। জল এত ঠান্ডা যে মুখে দেবার উপায় নেই, তবু ঐ ঠান্ডা জলই অনেক সময় নিয়ে বেশ কিছুটা করে পান করলাম। গুরুভাই এবার যে ঘরটায় আমরা

ছিলাম, তার বাঁপাশে একটা দরজা দিয়ে আমাদের নিয়ে গেলেন। দরজাগুলোর উচ্চতা খুব বেশি হলে, চার ফুট। দিলীপতো বারকতক মাথায় আঘাত পেল। যাহোক্, ঐ দরজা দিয়ে ঢুকে, ডানদিকে ঐ রকম আর একটা দরজা দিয়ে, আমরা আর একটা কাঠের ঘরে প্রবেশ করলাম। বাইরের সঙ্গে এ ঘরেরও কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই। ফলে এই ঘরটাও বেশ গরম। গুরুভাই তাঁর ঘর থেকে, মেঝের ঐ দু’টো পাটাতনের ফাঁকের মাপে তৈরি লম্বা, সরু তোষক ও একগাদা কম্বল বার করে দিলেন। প্রায় দু’ভাঁজ করে তোষক পেতে, তার ওপরে কম্বল পেতে, শোয়ার রাজকীয় আয়োজন করে নিলাম। গুরুভাই আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আর কম্বলের প্রয়োজন আছে কী না। আমরা জানালাম, আমাদের আর কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। এতক্ষণে গুরুভাইকে আসবার পথে দেখা তারার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি জানালেন যে, তিনি ওরকম কিছু কখনও দেখেন নি। হয়তো কোন জ্যোতি হবে, ভগবানের আশীর্বাদ হিসাবে এখানে নেমে এসেছে। ঠিক খবর পাওয়া গেল না। আমরা তিনজন পরপর শুয়ে পড়লাম। আরও দু’একজন এই ঘরে শুতে এল। এখানেও পিসুর উৎপাত যথেষ্টই আছে। এই ক’দিনে আমার সারা গায়ে কালো কালো, উচু উচু, দাগ হয়ে গেছে।

ঘুম ভেঙ্গে গেল। জানিনা ভোর হয়ে গেছে কী না। কারণ বাইরের আলো এই ঘরে প্রবেশ করতে পারে না। ঘরের বাইরে এসে দেখি, ভোর হয়ে গেছে। বেশ সুন্দর ভোরের আলোয়, দুরে গোমুখের সাদা পাহাড়, বেশ পরিস্কার নীল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আছে। আজ আগষ্ট মাসের একত্রিশ তারিখ। এবার আমাদের ফিরতে হবে। আমরা ফিরবার জন্য তৈরি হয়ে নিলাম। গুরুভাই চা খেয়ে যেতে বললেন। দেখলাম চা তৈরি হচ্ছে। চায়ের মধ্যে কী একটা কাঠের গুঁড়োর মতো দেওয়া হ’ল। জানিনা পাইন গাছের গুঁড়ো কী না, কারণ এখানকার চায়ে, একটা পাইন গছের গন্ধ পাওয়া যায়। গুরুভাই এবার ডাল, রুটি খেয়ে যেতে বললেন। আমরা অনেক কষ্টে এই সকালে ডাল রুটি খাওয়ার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেলাম। এখানে থাকা খাওয়ার জন্য কোন পয়সা লাগে না। ছোট মন্দিরটার কাছে একটা দানবাক্স আছে। ইচ্ছা হলে দান বাক্সে কিছু দেওয়া যেতে পারে। কত দেওয়া হ’ল, আদৌ দেওয়া হ’ল কী না, কেউ দেখতে বা জানতেও চাইবে না। না দিলেও কোন ক্ষতি নেই। একটা বোর্ডে দেখলাম, বড় বড় বিখ্যাত সব মানুষের নাম, যাঁরা এই আশ্রমকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, সুষ্ঠুভাবে চলার জন্য, অনেক টাকা আশ্রমকে দান করেছেন। বেশিরভাগই বাঙালির নাম। বেশ ভালো লাগলো, ঊমা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, কমল গুহ (শঙ্কু মহারাজ) ইত্যাদি অনেকের নাম লেখা আছে দেখে। এঁরা আড়াই হাজার টাকা করে দান করেছেন। আমরা সামান্য মানুষ, অতি সাধরণ লোক। তাই আমরা মাত্র পনের টাকা দানবাক্সে রেখে দিলাম।

বছর দু’এক আগে, কৌশানীতে, গান্ধী আশ্রমে আমরা অনেকে ছিলাম। ওখানেও শুনেছিলাম কোন চার্জ নেই, যার যা ইচ্ছা দেবে। অথচ বাস্তবে, আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতিদিন দশ টাকা করে চেয়ে নেওয়া হয়েছিল। আমরা সেবার তেত্রিশজন ছিলাম। চার্জ অবশ্যই নেওয়া উচিৎ, তা নাহলে আশ্রম চলবে কিভাবে? মাথাপিছু দশ টাকাও মোটেই বেশি চাওয়া হয় নি। কিন্তু কোন চার্জ নেওয়া হয় না বলে ঢাক পিটিয়ে, একটা নির্দিষ্ট হারে চার্জ বাধ্যতা মুলক ভাবে নেওয়া হলে, ব্যাপারটায় কিরকম একটা বদ গন্ধ পাওয়া যায় না কী? ওরাও মানব সেবা করে, এবং ওদের সাহায্য করার অনেক স্পনসর আছে বলেও শোনা যায়। এরা আরও বিপৎসংকুল এলাকায়, অনেক কষ্টের মধ্যে থেকে, মানব সেবা করে। এদের পিছনে সাহায্য করার কে আছে? অথচ এই দু’ই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কত ফারাক। সবজী বাগানের ওপাশে অনেক খরচ করে বিরাট পাকা বাড়ি তৈরি হচ্ছে দেখে ভেবেছিলাম, লালবাবার আশ্রমকে আরও বেশি যাত্রীর সুবিধার্থে বড় করা হচ্ছে। গুরুভাই জানালেন, উত্তর প্রদেশ সরকার ওখানে ষোল কামরার ট্রাভেলার্স লজ্ বানাচ্ছে। এখানে লালবাবার আশ্রম না থাকলে, কতজনের গোমুখ দেখার সৌভাগ্য হ’ত, সন্দেহ আছে। আজ যেহেতু অনেক যাত্রী এখানে আসতে শুরু করেছে, তাই ব্যবসার খাতিরে বড় প্রাসাদ বানানো হচ্ছে। শুনলাম এই আশ্রম, সরকারের কাছ  থেকে কোন আর্থিক সাহায্য পায় না, বরং সরকারি জমিতে আশ্রম, চাষ ও জলের ব্যবহারের জন্য, সরকারকে ট্যাক্স্ দিতে হয়। তবে মিলিটারিদের কাছ থেকে এরা অনেকভাবে সাহায্য পায় বলে গুরুভাই জানালেন। অদ্ভুত, আমার তো মনে হয় না যে, যে একবার লালবাবার আশ্রমে থেকেছে, সে শুধু আরামে থাকার জন্য, পরের বার ঐ সরকারি ট্রাভেলার্স লজে থাকবে। যাহোক্, লালবাবার ডায়েরিতে নিজেদের নাম ধাম লিখে, লালবাবার তিনটে ভিজিটিং কার্ড নিয়ে, আমরা গঙ্গোত্রীর উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম।

আবার সেই কষ্টকর রাস্তা। এবার আবার সঙ্গে খাবার জলও নেই। লালবাবার ভিজিটিং কার্ডে কলকাতায় কখন, কোথায়, কোন সময়, তাঁর সাথে দেখা করা যাবে, সব লেখা আছে। এরকম একজন মানুষকে একবার দেখতে না পাওয়ায়, মনে একটা দুঃখ নিয়েই ফিরতে হচ্ছে। ঠিক করলাম কার্ডের সময় মতো, কলকাতায় তাঁর সাথে দেখা করে আসবো। গতকাল এ রাস্তার শেষ দিকে, ভীষণ ভাবে নীচের দিকে নামতে হয়েছিল। বেশ আরামে, বিনা কষ্টে, প্রায় ছুটেই নেমেছিলাম। এবার তার কুফল ভোগ করতে হচ্ছে। উপরে উঠতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। এর আগেও লক্ষ্য করেছি, নতুন কোন জায়গায় যাওয়ার সময় খুব কষ্টকর রাস্তাও খুব একটা কষ্টকর বলে মনে হয় না। অথচ ফিরবার সময় যেন আর হাঁটার শক্তি বা ইচ্ছা থাকে না। ফিরবার সময় যেন কষ্ট আর সহ্য করা যায় না। মাধব আর দিলীপ অনেক এগিয়ে গেছে। আমি সেই বিপজ্জনক রাস্তাটার কয়েকটা ছবি তুলবো ভেবে, আস্তে আস্তে ওদের অনেক পিছন পিছন হাঁটছি। এইভাবে এক সময় সেই ধুলো পাহাড়, যেখানে বড় বড় পাথর অনবরত নীচে নেমে এসে গভীর খাদে গড়িয়ে পড়ে, যেখানে আসবার সময়, মাধবের কৃপায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছি, সেই জায়গায় এসে পৌঁছলাম। দেখি মাধব ও দিলীপ দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকার কারণ অন্য কিছু নয়, ঐ সরু বিপজ্জনক রাস্তায়, লাইন দিয়ে পরপর এক পাল গরু হেঁটে চলেছে। বিপজ্জনক রাস্তাটার ওদিক থেকে এদিক পর্যন্ত, সারিবদ্ধ গরুর পাল। যাচ্ছে গঙ্গোত্রীর দিকেই। হয়তো চীরবাসা বা অন্য কোথাও যাবে। একবারে পিছনে একটা লোক, সঙ্গে একটা বাচ্চা ছেলে। গরুগুলো কিন্তু একটুও এগচ্ছে না। ওরা না এগলে, আমাদের পার হয়ে যাবার উপায় নেই। একে অত্যন্ত সরু রাস্তা, তার ওপর গরুগুলো খাদ বাঁচিয়ে, ধুলো পাহাড় ঘেঁসে যাচ্ছে। ওদের পাশ দিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হলে, খাদের দিক দিয়ে যেতে হবে। এদের চরিত্রও সঠিক জানা নেই। একটু ঠেলে দিলে, একবারে সোজা গঙ্গায় চলে যাব। গরুর মালিক ও বাচ্চা ছেলেটা আমাদের পাশ থেকে একেবারে সামনের গরুগুলোর দিকে পাথর ছুঁড়ছে। পাথরের আঘাতে বা ভয় পেয়ে সামনের গরু একটু এগলে, গোটা লাইনটা একটু এগবে। এই চেষ্টাতেও গরুগুলো খুব একটা এগচ্ছে না। ভাবলাম, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে, জীবনে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। এ যেন মহাত্মা গান্ধী রোডের জ্যামে, বাসে করে কলেজ স্ট্রীট যাচ্ছি। লোকটা অভয় দিয়ে বললো, গরুগুলো খুব শান্ত, কোন ভয় নেই। পাশ দিয়ে চলে যেতে পারেন। অথচ সে নিজে বা তার চেলা, কেউ কিন্তু গরুগুলোর পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে, ওদের তাড়িয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে না। ওর কথাটা “মাথায় আমার শিং দেখে ভাই ভয় পেয়েছ কতই না- জানো না মোর মাথার ব্যারাম, কাউকে আমি গুঁতই না”, বা “মুগুর আমার হালকা এমন মারলে তোমার লাগবে না” গোছের সান্ত্বনা বাক্য বলে মনে হ’ল। ভয় হচ্ছে এত ধীর গতিতে গরুগুলোর পিছন পিছন বা পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে, গরুগুলো কিছু না করলেও, গতকালের মতো পাথর নেমে আসলে কী করবো? ছুটে পালাবার উপায়ও তো থাকবে না। শেষ পর্যন্ত কোন উপায় না দেখে, বাধ্য হয়ে পাশ দিয়ে এগিয়ে যাওয়াই স্থির করলাম। প্রথমে আমি, তারপর দিলীপ, সব শেষে মাধব। আমরা কিন্তু খাদের দিক দিয়ে গেলাম না। গরুগুলোর পিঠে চড় চাপড় মেরে, ডানপাশ দিয়ে, অর্থাৎ ধুলো পাহাড়ের ধার ঘেঁসে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এগিয়ে চললাম। গরুগুলো কিন্তু সত্যিই খুব শান্ত ও ভদ্র। আমাদের এগিয়ে যাবার রাস্তা না দিলেও, আক্রমন করার কোন ইচ্ছাই প্রকাশ করলো না। এরমধ্যে আবার নতুন এক বিপদ দেখা দিল। একটা গরু হঠাৎ কিরকম ভয় পেয়ে, খাদের দিকে খানিকটা কাত হয়ে নেমে গেল। গরুটা খাদে তলিয়ে গেল না। অসহায় ভাবে রাস্তায় উঠে আসার জন্য চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু হাঁচর পাঁচর করে রাস্তায় উঠে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও পা পিছলে যাওয়ায়, উঠে আসতে পারছে না। পিছন থেকে লোকটা চিৎকার শুরু করে দিল। ভয় হ’ল গরুটা তলায় চলে গেলে, তার দায় না আবার আমার ওপর বর্তায়। যাহোক্, শেষ পর্যন্ত গরুটা সম্পূর্ণ নিজের একক চেষ্টাতেই, আবার রাস্তায় উঠে আসতে সক্ষম হ’ল। আমরা ধরে প্রাণ ফিরে পেয়ে, আবার এগিয়ে চললাম। বেশ কিছুটা রাস্তা পার হয়ে এসে দেখলাম, স্থানীয় একটা ছেলে ঝরনার পাশে পাথরের ওপর বসে, কাপড় কাচছে। আমরা ঝরনার পাশে বসে, গতকালের সঙ্গে আনা পুরি ও খেজুর খেলাম। এই সাত সকালে একদিন আগেকার তৈরি ঠান্ডা, শক্ত পুরি খেতে ইচ্ছা করছে না। যে ছেলেটা কাপড় কাচছে, তাকে খানিকটা দিতে, সে জানালো যে সে খাবে না। কী আর করবো, ছুড়ে গঙ্গায় ফেলে দিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে আমরা সেই পাথর ফেলা জায়গাটায় এসে হাজির হলাম। এখানেই গতকাল আমরা রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পাথরগুলোর পিছন দিক দিয়ে পরিস্কার রাস্তা ধরে ব্রিজে এসে উঠলাম। এখান থেকে আর একবার দেখবার চেষ্টা করলাম যে কিভাবে গতকাল আমরা যাবার সময়, রাস্তা হারিয়ে গোলোকধাঁধায় ঘুরছিলাম। একসময় চীরবাসার সেই টিনের ছাদের ঘরটা চোখে পড়লো। আজকেও বেশ পরিস্কার আকাশ, সুন্দর রোদ উঠেছে।। খুব ভাল করে আগের দিনের দেখা তারার মতো জিনিসটা খুঁজলাম। গতকাল আর আজকের আবহাওয়া প্রায় একই রকম। আকাশের অবস্থা, সূর্যালোকও প্রায় একই রকম, এমন কী সময়টা এক না হলেও প্রায় কাছাকাছি, অথচ আজ কিন্তু তারাটা কোথাও দেখা গেল না। মনে মনে কিভাবে লঙ্কা থেকে ভুখি, এই মরণ ফাঁদ থেকে বার হব, সেই চিন্তা করতে করতে পথ চলছি। চীরবাসার খুব কাছে এসে, ডানপাশে লাল রঙে “VIMAL” লেখা বড় পাথরটা চোখে পড়লো। দিলীপ ও মাধব একটু আগেই এখানে এসে গেছে। দিলীপকে বোতলটা বার করে আনতে বললাম। ও জানালো যে, সে আগেই কাজটা সেরে রেখেছে। ওটাকে ব্যাগে ভালভাবে সোজা করে রেখে দিলাম। কাঁধের ব্যাগটা এখন বেশ ভারী বলে মনে হচ্ছে। কাঁধে যেন চেপে বসে যাচ্ছে। ওরা আবার এগিয়ে গেছে, আমি ধীরেসুস্থে পথ চলছি। তাড়াতাড়ি হাঁটতে গেলে বোতলটা কাত হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর ছবি তোলা আছে। একসময় ওদের আর চোখে না পড়ায়, বাধ্য হয়ে জোরে পা চালালাম। এঁকে বেঁকে বিপজ্জনক সরু রাস্তা পার হয়ে, একসময় মাধবের সাথে দেখা হ’ল। আমরা দু’জনে এবার একসাথে হাঁটতে লাগলাম। দিলীপ এগিয়ে গেছে। রাস্তা আর শেষ হয় না। এইভাবে একই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে, একসময় পুলিশ স্টেশনের কাছে এসে হাজির হলাম। পুলিশের দু’জন লোক আমাদের দেখে জিজ্ঞাসা করলেন “ফিরে এসেছেন? তিনজনেই এসেছেন তো”? আমরা জানালাম, আমরা তিনজনই ভালোভাবে ফিরে এসেছি। তাঁরা বললেন বাঁচা গেল, যেন একটা বড় চিন্তার হাত থেকে মুক্তি পেলেন। নীচে নেমে এসে, সেই চায়ের দোকানে বসে চায়ের অর্ডার দিলাম, সঙ্গে ঝুড়িভাজা।

কয়েকজন বেশ ভালো চেহারার যুবক এল। থাকে হরিদ্বার। ওখান থেকে হেঁটে গঙ্গোত্রী এসেছে। আগেও নাকি একবার হেঁটে কেদার, বদ্রী, গঙ্গোত্রী, গোমুখ, যমুনোত্রী গিয়েছিল। এবার কয়েকজনের সামনে পরীক্ষা থাকায়, অন্য কোথাও যাবে না। আমরা জানালাম, আমরা এইমাত্র গোমুখ থেকে ফিরছি। যাহোক্, চা খেয়ে দিলীপ ও মাধব গেল জীপ এসেছে কী না খোঁজ করতে। জীপ এখান থেকে কিছুটা রাস্তা আগে দাঁড়ায়। দোকানদার জানালো “গতকাল ভোরে জীপ একবার এসেছিল। তারপর থেকে জীপ আর আসে নি। আজ হয়তো আসতে পারে। প্রায় প্রতিদিনই জীপটা আসে”। রামজীকে কোথাও দেখলাম না। মাধবরা ফিরে এসে খবর দিল, জীপ আসে নি। মাধব বললো জীপের জন্য অপেক্ষা করবে। আমি ও দিলীপ, দু’জনেই হেঁটে চলে যাবার কথা বললাম। কারণ, আজ যদি লঙ্কায় ডাবরানী থেকে বাস আসে, তবে সেটা ধরতেই হবে। কবে আবার দয়া করে আসবে বলা যায় না। মাধবের দেখলাম হেঁটে যাওয়ার কোন ইচ্ছা নেই। আমাদেরও যে হাঁটতে খুব ভালো লাগছে তা নয়, তবু আজ বাস আসলে সেটা ছেড়ে দেওয়া কোনমতেই উচিৎ হবে না। দু’দিন আগে আমরা বাসে লঙ্কায় এসেছিলাম। কাজেই গতকাল না আসলেও, আজ লঙ্কায় বাস আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। প্রায় সতের কিলোমিটর পথ হেঁটে সবে এসেছি। কিন্তু সবদিক চিন্তা করে, শেষ পর্যন্ত হেঁটে যাওয়াই স্থির হ’ল। ঠিক করলাম রাস্তায় জীপ আসতে দেখলে, তাতেই চলে যাব। আস্তে আস্তে লঙ্কার দিকে পা বাড়ালাম। হাঁটতে আর ভালো লাগছে না। আগেও শুনেছি, এবার রাস্তাতেও শুনলাম, যমুনোত্রীর প্রাকৃতিক দৃশ্য নাকি মোটেই সুন্দর নয়। ওখানে নাকি কিছুই দেখার নেই। তাই বোধহয় যমুনোত্রীর জন্য কষ্ট করতেও আর ভালো লাগছে না। বন্ধুদের মানসিক অবস্থা পরখ করবার জন্য বললাম, সবাই বলছে যমুনোত্রীতে দেখার মতো কিছুই নেই, তাই ওখানে এবার তারা যেতে চায় কী না। আশ্চর্য, এবার কিন্তু ওরা দু’জনেই, যমুনোত্রী যাবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলো। মনে মনে একটু নিশ্চিন্ত হলাম। তবে জানিনা এই ফাঁদ থেকে বেরবার পর ওরা তো দুরের কথা, আমার নিজেরই কতটা ক্ষমতা বা ইচ্ছা থাকবে, যমুনোত্রী দেখার। প্রায় দশ কিলোমিটার পথ হাঁটলে, আমরা ভৈরবঘাঁটী চড়াই পৌঁছব। কয়েকজন হিন্দুস্থানী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও দেখলাম হেঁটে চলেছে। লঙ্কাগামী রাস্তা পাকা, তার ওপর খুব একটা উতরাই না হলেও, চড়াই নয়। কাজেই হাঁটার কষ্ট অনেক কম। তবু সতের কিলোমিটার পথ হেঁটে এসে, নতুন করে দশ কিলোমিটার এই পথ, তা যতই ভালো রাস্তা হোক, হাঁটতে আমাদের বেশ কষ্টই হচ্ছে। ভৈরবঘাঁটী থেকে লঙ্কা আবার প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পার হতে হবে। আসবার সময় ঐ পথে আসতে কষ্ট হয়েছে ঠিক, কিন্তু ফিরবার সময় ঐ পথে মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। রাস্তা এবার সোজা উপর দিকে উঠতে শুরু করেছে। দিলীপ একটু এগিয়ে গেছে। আমি আর মাধব খুব আস্তে আস্তে, গল্প করতে করতে চলেছি। এ রাস্তায় জীপ যায়, কাজেই বিপদের সম্ভাবনা প্রায় শুন্য। বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে ডানপাশে, ওপর থেকে একটা বড় ঝরনা নেমে এসেছে। সঙ্গে তিন-তিনটে ওয়াটার বটল্ থাকলেও, সবকটাতেই গোমুখের পবিত্র গঙ্গাজল ভরে আনা হয়েছে। এপথে জলের কষ্ট খুব একটা হবে না। কিন্তু চিন্তা হচ্ছে, ডাবরানী থেকে ভুখি পর্যন্ত জল ছাড়া যাব কী ভাবে? আসবার সময় তিনটে ওয়াটার বটল্ সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও, জল ভরে না নিয়ে আসার জন্য, প্রচন্ড জলকষ্টে ভুগেছি। আট কিলোমিটার হাঁটা পথের দুই প্রান্তে দু’টো ঝরনা। ঐ পথে ফিরবার সময় ওয়াটার বটল্ সঙ্গে থাকলেও, খাবার জল ভরে নিয়ে যাবার উপায় নেই। এখানে এখন নতুন কোন ওয়াটার বটল্ কিনতে পাওয়াও যাবে না। সঙ্গী দু’জনকে বললাম, একটা বটল্ খালি করে ঝরনার জল ভরে নেব। যমুনোত্রী থেকে বটলটায় যমুনার জল ভরে নেওয়া যাবে। ওরা কিন্তু যমুনার জল বয়ে নিয়ে যেতে রাজি হ’ল না। তিনটে বটলেই গোমুখের জল ভরে নিয়ে যেতে চায়। অগত্যা আকন্ঠ ঝরনার জল পান করে, এগিয়ে চললাম। বাঁপাশে গভীর খাদ। রাস্তার বাঁপাশে মাইল স্টোন। প্রতি কিলোমিটার রাস্তাকে, পাঁচ ভাগে ভাগ করে করে, মাইল স্টোনগুলো রয়েছে। যেমন, ভৈরবঘাঁটী ৯ কিলোমিটার। এরপর ২/৯, ৪/৯, ৬/৯, ৮/৯ । এরপর ভৈরবঘাঁটী ৮ কিলোমিটার। একটা মাইল স্টোন পার হয়ে কখন দুই দেখবো, তারপর চার দেখবো, তারপর কখন ছয় দেখবো, এই আশা নিয়ে ক্রমে এগতে লাগলাম। মনে হয় এই আশায় আমাদের হাঁটার গতিও অনেক বেড়ে গেল, অপর দিকে হাঁটার কষ্টও কিছু লাঘব হ’ল। “ধন্য আশা কুহকিনী”। আহা এই সময় যদি সুকুমার রায়ের “খুড়োর কল” একটা সঙ্গে থাকতো, তাহলে কত সুবিধাই না হ’ত।

রাস্তা একবারে ফাঁকা, কোথও কোন লোকজন নেই। সুন্দর সবুজ গাছপালা দিয়ে সাজানো নীচের খাদ যেন সেজেগুজে তার রূপপ্রদর্শন করছে। দিলীপ পাকা রাস্তা পেয়ে, বার বার অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার যেন আর শেষ নেই। এতদুর চলে এলাম, এখনও পর্যন্ত জীপটা ওদিক থেকে এল না। ওটার জন্য অপেক্ষা না করে হেঁটে যাব স্থির করেছিলাম বলে বেঁচে গেলাম। কবে যে ওটা আবার গঙ্গোত্রী আসবে ভগবান জানেন। কয়েকজন বৃদ্ধ বৃদ্ধা রাস্তার একপাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। ওঁরাও লঙ্কার দিকেরই যাত্রী। আমরা না থেমে, ওঁদের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলাম। দিলীপকে দেখা যা্ছে না। ও বোধহয় সোজা জীপ রাস্তা পেয়ে, লাগাম ছাড়া হয়ে ছুটছে। রাস্তার উভয় পাশেই, নতুন কোন দৃশ্য চোখে পড়ছে না। একপাশে খাড়া পাহাড়, অন্য দিকে খাদ। কিন্তু সবুজ বনজঙ্গলে ঢাকা খাদ এখানে খুব গভীর নয়। রাস্তায় এমন কেউ নেই, যার কাছে নতুন কোন খবর পাওয়া যায়, পাওয়া যায় একটু উৎসাহ। একমাত্র রাস্তার মাইল স্টোনগুলো ভৈরবঘাঁটী থেকে তাদের নিজ নিজ দুরত্ত্ব জানিয়ে যেন ইশারায় আমাদের বলছে, জোরে, আরও জোরে, আর বেশি পথ নেই। একটু পরেই তোমরা পৌঁছে যাবে। ওগুলোর ওপর চোখ পড়লে যেন নতুন করে উৎসাহ পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আর সামান্য কয়েকটা দিন কষ্ট করলেই, আমরা আমাদের দীর্ঘদিনের মনস্কামনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবো। বাঁপাশে রাস্তা থেকে একটু নীচে, একটা দোকান চোখে পড়লো। ওখান থেকেই আসবার সময় জীপ ছেড়ে ছিল। ওটাই ভৈরবঘাঁটী, ওর পাশেই ভৈরবঘাঁটী মন্দির। গতি বৃদ্ধি হয়ে গেল। অনেকটা পথ ঘুরে ওখানে যেতে হবে। মাধবকে বললাম রাস্তার পাশ দিয়ে, ঢালু জায়গার ওপর দিয়ে, সাবধানে নেমে আসতে। পা পিছলে যাচ্ছে, পড়ে যাবার সম্ভাবনাও যথেষ্ট। পড়ে গেলে হাত পা কেটে ছড়ে যাবে। কোনমতে দু’জনে ওপর থেকে শর্টকাটে নেমে এসে দোকানে ঢুকলাম। দিলীপ আগেই চলে এসেছে। চা, বিস্কুট দিতে বললাম। সকাল থেকে একভাবে হেঁটে আসছি। প্রায় ছাব্বিশ-সাতাশ কিলোমিটার পথ হেঁটে এখানে এসেছি। এখন পর্যন্ত পেটে একটু ঝুড়িভাজা, একটা ঠান্ডা শক্ত পুরি, খান তিন-চার খেজুর আর দু’কাপ চা পড়েছে। খিদেও পেয়েছে খুব। তবে আমার মাথায় এখন ও চিন্তার থেকেও অনেক বড় চিন্তা, আজ লঙ্কা থেকে ডাবরানী যাবার বাস পাওয়া যাবে তো? এই দোকানে আলাপ হ’ল এক ভদ্রলোকের সাথে। থাকেন দেরাদুনে। ওখানেই ব্যবসা করেন। সময় পেলেই সোজা গঙ্গোত্রী চলে আসেন। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, হাওড়া ফেরার জন্য দুন এক্সপ্রেসে সহজে রিজার্ভেশন পাওয়ার জন্য, কোথায় যাওয়া ঠিক হবে, হরিদ্বার, না দেরাদুন? ভদ্রলোক বললেন, হরিদ্বার গেলে পেয়ে যাবেন। দেরাদুন থেকে তো অবশ্যই পাবেন, কারণ মুসৌরীতে এখন খুব কম টুরিষ্ট আসেন। ভরা সীজনেও টুরিষ্টের সংখ্যা হাতে গোনা যায়। এর কারণ মাদক বর্জন আইন অনুযায়ী, মুসৌরীতে এখন সোরাব বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ওখানে ভ্রমনার্থীর ভিড় একবারে নেই। যে কোন হোটেলে বেশ সস্তায় ঘর পাওয়া যায়। ওদের মনে তাই প্রচন্ড ক্ষোভ। আমরা ঠিক করলাম, যমুনোত্রী হয়ে সোজা হরিদ্বার চলে যাব। ওখান থেকেই ফেরার টিকিট কাটা যাবে। কয়েকদিন নির্ভেজাল বিশ্রাম নিয়ে, একটু চাঙ্গা হয়ে বাড়ি ফেরা যাবে। কিন্তু সে অনেক পরের কথা, আগে তো লঙ্কা পৌঁছই।

কাঁধের ঝোলা নিয়ে রাস্তায় নামলাম। লঙ্কা থেকে ভৈরবঘাঁটী আসার সময় আমাদের খুব একটা উল্লেখযোগ্য কষ্ট হয় নি। আসবার সময় ভৈরবঘাঁটীর কাছাকাছি বেশ কিছুটা রাস্তা নেমে এসেছিলাম। রাস্তাটা সিমেন্ট দিয়ে একটু পাকা করা হয়েছে। বেশ কিছু চওড়া চওড়া সিঁড়িও আছে। এবার সেগুলো ভেঙ্গে ওপর দিকে উঠতে হবে ভাবতেই, বুকের ভিতর কেমন একটা শিরশির করে উঠলো। হাঁটার গতিও বেশ কমে গেছে। সঙ্গীদের বললাম একটু জোরে পা চালাতে। এত কষ্টের শেষে বাস ধরতে না পারলে, আফসোসের আর সীমা থাকবে না। মাধব সরাসরি জানালো যে, ওর পক্ষে আর জোরে হাঁটা সম্ভব নয়। আমি আর দিলীপ এগিয়ে গেলাম। মাধব ধীরে ধীরে পেছনে আসছে। এবার একটা ব্রিজ পার হয়ে এলাম। এখানে ডানদিক থেকে একটা নদী এসে গঙ্গার সাথে মিশেছে। শুনলাম আগে এখানে এত ভাল ব্রিজ ছিল না। যদিও এখনও এটা একটা কাঠের তৈরি ব্রিজ, তবে বেশ চওড়া ও মজবুত। আগে নাকি লম্বা লম্বা, মোটা মোটা, গাছের ডাল ফেলে এখানে ব্রিজ তৈরি করা হয়েছিল। দু’টো নদীরই প্রকৃতি এখানে খুব একটা অশান্ত নয়, তবু নীচে তাকালে কিরকম একটা গা ছমছম করে। জানতে পারলাম, ডানদিকের নদীটাকে “নীলগঙ্গা” বলা হয়। কেউ কেউ আবার ওটাকে “জাহ্নবীগঙ্গা”ও বলে। যেদিক থেকে নদীটা এসেছে, সেদিকের বাসিন্দারা, ওটাকেই আসল গঙ্গা বলে দাবি করে। নদীটার জল, গঙ্গার তুলনায় বেশ পরিস্কার ও একটু নীল। আমরা ধীরে ধীরে, দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে ও জানতে জানতে, পথ চলছি। এই দু’-তিন কিলোমিটার রাস্তার পরেই, আজকের মতো বিশ্রাম। অবশ্য যতক্ষণ না ডাবরানী যেতে পারছি, ততক্ষণ এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তি পাব না। কারণ ততক্ষণ আমরা এখানকার পরিবহণ ব্যবস্থার হাতের পুতূল। তাদের মর্জির ওপর আমরা নির্ভরশীল। এখানেও দেখছি কিছু বৃদ্ধ বৃদ্ধা রাস্তায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। নিজের মুখ আজ প্রায় দিন পনের হ’ল দেখার সৌভাগ্য হয় নি। হাত পায়ের রঙ দেখে বেশ বুঝতে পারছি, শ্রীমুখের অবস্থা কী হতে পারে। পথে বসে থাকা এই অসহায় বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের মুখে ক্লান্তির ছায়া। ওঁদের মুখমন্ডলকে আয়না হিসাবে ধরে, বুঝতে পারছি, আমাদের এই অবসাদ, এই নিরুৎসাহ ভাব, অস্বাভাবিক কিছু নয়। লঙ্কার যত কাছাকাছি আসছি, গতি যেন তত কমে আসছে। শেষে ক্লান্ত, অবসন্ন দেহে লঙ্কার সেই পুরানো মিষ্টির দোকান কাম হোটেলে এসে বেঞ্চে বসে পড়লাম। প্রথমেই খবর নিলাম, আজ বাস এসেছিল কী না। দোকানদার জানালো, গতকাল কোন বাস ডাবরানী থেকে লঙ্কায় আসে নি। আজও কোন বাস আসে নি। আজ আর কোন বাস আসার সম্ভাবনা আছে কী না জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, আজকে সম্ভবত বাস আসবে। মনে মনে একটাই সান্ত্বনা, এখান থেকে একটাও প্যাসেঞ্জার না পেলেও, বাস আসার সঙ্গে সঙ্গে ডাবরানী ফিরে যাবে।

এখন বিকেল তিনটে বাজে। জানা গেল, দোকানে এখন কোন খাবার পাওয়া যাবে না। সারাদিনের শেষে প্রধান খাদ্য হিসাবে আবার সেই ঝুড়িভাজা ও চা দিতে বললাম। বসে বসে কোমর ব্যথা হয়ে গেল। বাস বোধহয় আজ আর আসবে না। হয়তো এদিকের লোকেদের এখন ময়দা, ডালডা, ইত্যাদির বিশেষ প্রয়োজন নেই। বুঝতে পারছি বাস আসার সম্ভাবনা ক্রমশঃ কমে আসছে। বন্ধুরা দোকানেই বসে রইলো। আমি যেদিক থেকে বাস আসবে, রাস্তা ধরে সেদিকে অনেকটা পথ এগিয়ে গেলাম। হঠাৎ মনে হ’ল দুরে, গাছপালার ফাঁক দিয়ে, একটা হর্ণের আওয়াজ এল। কান খাড়া করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে মনে বেশ ফুর্তি হচ্ছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বুঝলাম, সারাক্ষণ বাসের চিন্তা, আমায় পাগল করে ছেড়েছে। আরও কিছুক্ষণ পায়চারি করে, দোকানে ফিরে এলাম। ওদের বাসের হর্ণের কথা বললাম। হঠাৎ আবার সেই হর্ণের আওয়াজ শুনলাম মনে হ’ল। এবার ওরাও আমার মতোই হর্ণের আওয়াজ শুনতে পেয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বুঝলাম, ওরাও আমার মতোই একই রোগের রোগী। এবার আমরা তিনজনেই একসাথে ভুল শুনেছি। এরমধ্যে আবার দোকানদার আমায় এসে জানালো যে, তার কপালে খুব যন্ত্রণা করছে, আমরা কোন ওষুধ দিতে পারবো কী না। এখন না হয় ঝুড়িভাজা খেয়ে কাটিয়ে দিলাম, কিন্তু রাতে থাকতে হলে, এই দোকানদার ছাড়া গতি নেই। তাই ওর সুস্থ থাকা, আমাদের থেকেও বেশি জরুরি। এসব জায়গার লোকেরা কোনদিন ওষুধ ব্যবহার করেনা, বা ব্যবহার করার সুযোগও পায় না। তাই সাধারণ মাথা ব্যথার ওষুধেই তার যন্ত্রণার উপশম হবে জানি। তবু বিজ্ঞ ডাক্তারের মতো জিজ্ঞাসা করলাম, জ্বর আছে? হাতটা ধরে নাড়ী দেখার ভান করে, তাকে একটা স্যারিডন ট্যাবলেট দিয়ে খেয়ে নিতে বললাম।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s