পাহাড়ের রোজনামচা–দ্বাদশ পর্ব {লেখাটি www.amaderchhuti.com ও TOUR & TOURISTS পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

DSCN9767ঐ অফিস ঘরের ঠিক পাশের ঘরটা, আমরা রাতের আস্তানা হিসাবে ভাড়া নিলাম। এখানে থাকার মতো কোন হোটেল নেই। ঘর বাড়ির সংখ্যাও খুব কম। কোন গেষ্ট হাউস বা ট্রাভেলার্স লজও নেই। ঘরের মালিকের সাথে কথা বলে ঠিক করলাম, আমরা তিনজন থাকবো। আর কাউকে ঘরে ঢোকানো যাবে না। মালিক জানালো ছ’টাকা ভাড়া দিলে সে রাজি আছে। আমরাও রাজি হয়ে গেলাম। ঘরের মালিক ভাঁজ করা করা কাঠের দরজা খুলে দিল। আমাদের এখানে অনেক দোকানেই এরকম দরজা দেখা যায়। এটা একটা গুদামঘর বলে বলে মনে হ’ল। এর দরজাও, দোকানের দরজার মতোই একদিক থেকে অপর দিক পর্যন্ত বিস্তৃত, এবং একদিক থেকে অপর দিক ভাঁজ করে করে খুলতে হয়। ঘরের ভিতরে একপাশে, ঘরের প্রায় অর্ধেক জায়গা জুড়ে, সম্ভবত ময়দার বস্তা, একটার ওপর একটা করে, প্রায় ছাদ পর্যন্ত সাজিয়ে রাখা আছে। পাশে দুটো চওড়া তক্তাপোশ। তক্তাপোশে গরমকুন্ডের লালাজীর দোকানের মতোই নোংরা, ময়লা, দুর্গন্ধযুক্ত তোষক পাতা ও একই মানের লেপ ভাঁজ করে রাখা আছে। ঘরের পিছন দিকে, অর্থাৎ মূল দরজার বিপরীতে আর একটা সরু দরজা, বন্ধ করা আছে। তক্তাপোশ ও ময়দার বস্তার মাঝ দিয়ে ঘরের পিছন দিকের ঐ দরজার কাছে যাওয়া যায়। রাশীকৃত ময়দার বস্তা ও তক্তাপোশের মধ্যে হাঁটাচলার জায়গা এতই কম ও সরু যে, পাশ দিয়ে পিছন দিকের দরজার কাছে যেতে গিয়ে, গোটা প্যান্টে ময়দা লেগে সাদা হয়ে গেল। ঘরের মালিক পাশ দিয়ে গিয়ে পিছনের ছোট দরজার শিকলটা খুলে দিল। এখানে বেশ গরম। রাতে এই বদ্ধ গুদাম ঘরে ঘুম আসবে বলে মনে হয় না। দরজা খুলতে পিছনে এক অপরূপ দৃশ্য চোখে পড়লো। দরজা দিয়ে বেড়িয়েই, সরু বারান্দা। আমাদের ডানপাশের বাসের অফিস ঘরেরও একই রকম একটা দরজা দিয়ে, এই বারান্দায় আসা যায়। আমাদের এই বাড়িটা যদিও একতলা, বাস রাস্তার ওপরে একই লেভেল-এ অবস্থিত, তবু পিছনের বারান্দায় দাঁড়ালে বোঝা যা্‌য়, অন্তত তিন-চার তলা উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছি। বারান্দার ঠিক পিছনেই খাদ। বেশ নীচ দিয়ে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। দোকানটার পিছনেই খাদের মতো নীচু, এবং বারান্দাটা যেন ঐ খাদের ওপর ঝোলানো। দোকানের মালিককে বিদায় করে, বারান্দায় বসে, প্রাকৃতিক শোভা দেখতে দেখতে, মনের সুখে এখান থেকে কেনা চিনাবাদাম খেলাম। আহা কী সুখ! বাদামের খোলা ফেলার কোন ঝামেলা পর্যন্ত নেই। হাত বাড়িয়ে নীচের খাদে ফেলে দিলেই হ’ল। কত সুবিধা। দোকানের মালিক নিজে থেকে উপযাচক হয়ে এসে, বেগন বা ফ্লিট জাতীয় কিছু একটা, ঘরের তক্তাপোশের উপর বেশ ভালো করে স্প্রে করে দিয়ে গেল। এতদিন অন্যান্য সব জায়গায় দেখে এসেছি, দোকান, হোটেল বা লজে, পিসু নামক ভয়ঙ্কর প্রাণীটিকে কোন ধর্তব্যের ব্যাপার বলে মনে করে না। এ বাবু আবার কিছু বলার আগেই বিছানায় স্প্রে করে দিয়ে যেতে, এখানে মহাপিসু বা রামপিসু জাতীয় কিছু আছে কী না ভেবে ভয় হ’ল। এখানে আসার সময়, বাস থেকে নেমেই একটা ছোট্ট হোটেল জাতীয় দোকানে, ডিম সাজানো আছে দেখেছিলাম। তাই বোধহয় সন্ধ্যাবেলাতেই প্রচন্ড খিদে খিদে পাচ্ছে। বাইরে যাব বলে ঘরের পিছন দিকের ছোট দরজাটা বন্ধ করে শিকল দিতে গিয়ে দেখি, শিকলটা মাপে বেশ ছোট। মালিক যে কী কায়দায় ওটা আটকে ছিল বুঝতে না পেরে, দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে, সামনের বিরাট চওড়া দরজাটা হাট করে খুলে রেখে, সমস্ত জিনিসপত্র ঘরের একপাশে রেখে, জলখাবার খেতে গেলাম। সামনের দরজা খুলে রাখার কারণ, যাতে পিছনের দরজা দিয়ে পাশের ঘরের কেউ ঢুকলে, রাস্তার লোক দেখতে পায়। রাস্তার দু’পাশে অনেক দোকান। রাস্তার ওপাশে স্টেট ব্যাঙ্ক। রাস্তার এপাশে একটু দুরেই একটা চটে ঘেরা আগের জায়গাগুলোর মতো পায়খানা। সুন্দর রাস্তা,  পাহাড় ও গঙ্গার পাশ দিয়ে চলে গেছে। আমরা তিনজন বুভূক্ষু সোজা সেই দোকানে গিয়ে, তিনটে অমলেট, পাঁউরুটি সেঁকা আর চায়ের অর্ডার দিলাম। মনটা বেশ খুশিতে ভরে গেছে। ডিমের অমলেট আমাদের উত্তরকাশী না যেতে পারার দুঃখ, অনেকটাই ভুলিয়ে দিয়েছে। রাতের খাবার কী পাওয়া যাবে খোঁজ করতে গিয়ে তো দেখি, আমাদের জন্য আরও অনেক বড় বিষ্ময় অপেক্ষা করছে। এখানেই থেকে যাব কী না ভাবতে হবে। এই দোকানে মাংস পাওয়া যায়, দাম পাঁচ টাকা প্লেট্। এক মুহর্ত সময় নষ্ট না করে, তিন প্লেট্ মাংসের অর্ডার দিয়ে, জলখাবার খেয়ে, এদিক ওদিক একটু ঘুরতে গেলাম। আকাশে বেশ মেঘ করেছে, বৃষ্টি আসলেও আসতে পারে। একটু ঘুরেফিরে, দোকানের আস্তানায় ফিরে গেলাম।

13775370_617646235077796_2563285220834788412_n ভাটোয়ারীর রাতের আস্তানা

রাত সাড়ে আটটা নাগাদ দোকানে খেতে গেলাম। এতদিন পেট ভরাবার জন্য খেতে গেছি, আজ অনেক দিন পরে, খাবার জন্য খেতে গেলাম। দোকানে গিয়ে দেখি তিনটে বেঞ্চ, তিনটেতেই খদ্দের ভর্তি। এইসব এলাকার লোকেরা যেমন পরিশ্রমী হয়, এদের আহারও সেইরকম দেখার মতো। একজন লোক সেই পুরানো কায়দায় রুটি তৈরি করে যাচ্ছে। আর একজন, এদের খাবার থালায় রুটি দিয়ে যাচ্ছে। আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি। এদের রুটির যোগান দিতে গিয়ে, দু’জনেই হাঁফিয়ে যাচ্ছে। এক একজন বোধহয়, গোটা পনের-কুড়ি করে রুটি খেয়ে নিল। কাঠের আগুনের তেজ ক্রমে কমে আসছে, আমরা দাঁড়িয়েই আছি। অন্য কোথাও যাবারও উপায় নেই, কারণ অন্য কোথাও এমন সুখাদ্য মিলবে কী না জানা নেই। এবার রুটি খাওয়া শেষ করে, ওরা চাউল আনতে বললো। তা বলুক, যা খুশি আনতে বলুক, মাংস আনতে না বললেই হ’ল। কিন্তু ভয় হ’ল রুটির মতো চাউল খেলে, আমাদের রাত এগারোটা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ভেবে। বোধহয় আমাদের তিনজনের ক্ষুধার্ত, অসহায়, অবাক হওয়া মুখগুলো লক্ষ্য করে, লজ্জায় ওরা আজকের মতো খাওয়ায় ইতি টানলো।

আমরা তিনজন মহানন্দে বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। আমাদের তিনজনকে তিনটে প্লেটে, চার টুকরো করে মাংস ও ঝোল দেওয়া হ’ল। হাওড়া কলকাতায় অমানুষ পাঁপড় নামে, এক প্রকার পাঁপড় বিক্রী হয়, ভাজলে হলদেটে গোল নলের মতো দেখতে। চার টুকরো মাংসের, তিন টুকরো করে ঐ রকম নালী। হয়তো শ্রীমান পন্টক চন্দ্রের খাদ্যনালী বা শ্বাসনালী, কিছু একটা হবে। তার থেকেও খারাপ কোন অংশের নালী হবার সম্ভাবনাও, একবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। লম্বা কোন নালীকে পিস্ পিস্ করে কেটে, মাংসের পিস্ হিসাবে খেতে দেওয়া হয়েছে। তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, নালীগুলোকে ঘষে মেজে বেশ পরিস্কার করা হয়েছে। ওর ভিতরে কোন ময়লা নেই, চোখের কাছে দুরবীনের মতো ধরলে, দুরের জিনিস একবারে পরিস্কার দেখা যায়। বাধ্য হয়ে ফেলে দিলাম। বলতে খুব লজ্জা করলেও, বলতে বাধা নেই, ফেলবার আগে চুষে নিতে কিন্তু ভুল করি নি। কাঠের উননে আগুন তখন প্রায় নিভে এসেছে। ফলে প্রায় পাঁচ-সাত মিনিট অন্তর, তিনজনের তিনটে করে আধ পোড়া, আধ কাঁচা রুটি নিয়ে আসছে। তিনজনের তিন-চারটে করে রুটি পেতেই, বেশ দেরি হয়ে গেল। অগত্যা আর রুটি খাবার আশা ত্যাগ করে উঠে পড়লাম। মাংসের কথা বলতে দোকানদার জানালো, এখানে একমাত্র সেই মাংস রাখে। উত্তরকাশী থেকে মাংস আসে। ফলে যা পাঠায় তাই নিতে হয়। মিলিটারিরা মাঝে মধ্যে পাঁঠা কাটে। তারা সমস্ত ভালো মাংস নিয়ে, তাকে এই জাতীয় মাংসই বিক্রি করে। স্থানীয় লোকেরা বাধ্য হয়ে এই মাংসই কিনে খায়। সে ইচ্ছা করে আমাদের খারাপ মাংস দেয় নি। এরপর তাকে আর কিছুই বলার থাকতে পারে না। খাওয়া সেরে মৌড়ি মুখে দিয়ে পরম সুখে গুদাম ঘরে ফিরে এলাম।

এরকম গুরুপাক খাবার পর একটু নেশা না করলে চলে না। দেখি একটাও সিগারেট সঙ্গে নেই। আমি ও মাধব, দিলীপকে গুদাম ঘরে বসিয়ে রেখে, গেলাম সিগারেটের দোকানের খোঁজে। আশেপাশে কোন দোকান খোলা নেই। অত রাতে, রাত বলতে তখন প্রায় দশটা বাজে, যে ক’টা দোকান খোলা আছে, সব ক’টা টেলারিং সপ্। এখানে এত জামা প্যান্ট কারা তৈরি করতে দেয়, ভগবান জানেন। আশা ছেড়ে দিয়ে গুদাম ঘরে ফিরে এসে দেখি, দিলীপ একজন ভদ্রলোকের সাথে তক্তাপোশে বসে কথা বলছে। আমরা ফিরে আসায়, ও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো বলে মনে হ’ল। ভদ্রলোক অনেকক্ষণ বসে আমাদের সাথে গল্প করলেন। তিনি জানালেন যে তাঁর বাবার আমল থেকে তাঁরা এখানকার বাসিন্দা। সৎপথে ব্যবসা করায়, আজ আর তাঁর কোন অভাব নেই। তাঁকে গত বৎসরের বন্যার কথা বলতেই, তিনি জানালেন, এরকম ভয়ঙ্কর বন্যা তিনি কোনদিন দেখেন নি। গত বৎসর আগষ্ট মাসের ছয় তারিখে, ভোর বেলা এখানকার লোকেরা দেখে গঙ্গা একেবারে শুকিয়ে গেছে। এখানকার লোকেরা খুব ভয় পেয়ে যায় এবং কী করা উচিৎ, তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বেলার দিকে উত্তরকাশী থেকে ডি.এম., জীপে করে গাংগানীতে জায়গাটা দেখে, সঙ্গে সঙ্গে ফিরে যান। যাবার সময় শুধু হাত নেড়ে ইশারায় সকলকে পালাতে বলেন। তারপরে সমস্ত জমা জল, প্রবল আকার ধারণ করে, ওখানার পাথর ভেঙ্গে, গাছপালা, গরু, ছাগল বয়ে নিয়ে এখানকার অনেক ঘর বাড়ি ভেঙ্গে দিয়ে চলে যায়। ভদ্রলোক আরও জানালেন, কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েক লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে ও কয়েক হাজার মানুষ, গৃহহীন হয়েছে। প্রায় রাত এগারোটা পর্যন্ত বকবক্ করে, তিনি যাবার জন্য উঠলেন। আমাদের কাছে সিগারেট নেই শুনে, তিনি নিজের কাছ থেকে বেশ কয়েকটা বিড়ি দিয়ে গেলেন।

আমরা জল খেয়ে, বাইরের বড় দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। দিলীপ জানালো ভদ্রলোক এসে তার ঘড়িটার খুব প্রশংসা করে, হাতে নিয়ে দেখতে চান এবং কত দাম ইত্যাদি খোঁজখবর করেন। ভদ্রলোকের ঘড়িটা ছিনতাই করার মতলব আছে ভেবে, ও খুব ভয় পেয়ে যায়। পরে অবশ্য সব ক্ষেত্রেই আমাদের অনুতাপ হয়। আমরা সবাইকে কলকাতার কলুষিত মন নিয়ে বিচার করি, সন্দেহ করি। এখানে পিসু আছে কী না এখনও জানার সৌভাগ্য না হলেও, ছারপোকার দৌরাত্ম্য যথেষ্টই আছে। তাদের বিছানার ওপর দিয়ে স্বপরিবারে মার্চ-পাষ্ট্ করতেও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ছারপোকারা বোধহয় পিসুর এঁটো খায় না, তাই রাতে ওরা আমাদের খুব একটা অত্যাচার করে নি। মাঝরাতে আজ আবার ছোট বাইরে যাবার প্রয়োজন দেখা দিল। দোকানের ওই বিশাল দরজা, পাট পাট করে ভাঁজ খুলে রাস্তায় যাওয়ার থেকে, পিছনের দরজা খুলে বারান্দা থেকে তিন-চারতলা নীচে কাজটা সেরে নেওয়া অনেক সুবিধাজনক। কিন্তু বাদাম ভাজার খোলা নীচে ফেলার সময় লক্ষ্য করেছিলাম, পিছন দিকের একতলায়, বা মাটিতে, ঘর আছে এবং ওখানে লোক বাস করে। কাজেই বারান্দার একদিক থেকে অপর দিক পায়চারি করতে করতে, বহু নীচে একতলায় কাজটা সেরে নিলাম, যাতে কোন আওয়াজ না হয় এবং চট করে কেউ বুঝতেও না পারে।

আজও বেশ ভোরেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। আজ সেপ্টেম্বর মাসের দুই তারিখ। আজ আমরা সম্ভবত সায়নাচট্টি পৌঁছবো। তার মানে আগামীকাল আমরা যমুনোত্রী যাচ্ছি। দিলীপ ও মাধবকে বিছানায় দেখতে পেলাম না। বালিশের তলায় দেখলাম ওদের ঘড়িদুটো রাখা আছে। ওগুলো পকেটে নিয়ে, দরজা খুলে রেখেই রাস্তায় এলাম। সকালের কাজকর্ম সেরে, হাতমুখ ধুয়ে, চা জলখাবার খেয়ে আমরা তৈরি হয়ে নিয়ে, বাসে গিয়ে নিজেদের আসন দখল করে বসলাম। ঠিক সময়েই বাস ছেড়ে দিল। আমরা তিনটে উত্তরকাশীর টিকিট বার টাকা ত্রিশ পয়সা দিয়ে কাটলাম। উত্তরকাশী ট্রাভেলার্স লজ থেকে মালপত্রগুলো নিতে হবে। বাস আবার সেই আগের দেখা রাস্তা দিয়ে উত্তরকাশীর পথে এগিয়ে চললো। একসময় আসবার পথে দেখা ড্যামটাকে বাঁপাশে রেখে, আমরা এগিয়ে গেলাম। আসবার পথে এ রাস্তা আমরা দেখে গেছি, কাজেই নতুন করে দেখার কিছু নেই। তাছাড়া ভয়ঙ্কর খাদ, সুন্দরী ঝরনা, মন মাতানো রঙ্গিন ফুল, কোন কিছুই আর আমাদের আগের মতো পাগল করছে না। মনে শুধু একটাই চিন্তা, কখন উত্তরকাশী পৌঁছব, আজ সায়নাচট্টি পৌঁছতে পারবো তো? ভাবতে ভাবতেই উত্তরকাশীতে বাস এসে দাঁড়ালো।

মাধবকে জলখাবার ও সঙ্গে নেবার জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করতে বলে, আমি ও দিলীপ, ট্রাভেলার্স লজে লাগেজ ছাড়াতে গেলাম। যাওয়ার পথে দেখা সেই অফিসার ভদ্রলোককে এখন আর দেখলাম না। যে কর্মচারীটি আমাদের মালপত্র রেখেছিল, একটু পরেই তার খোঁজ পাওয়া গেল। আমাদের দু’টো হোল্ড্-অল্ ও তিনটে সুটকেস্ আছে। যাওয়ার সময় শুনেছিলাম পার লাগেজ পার ডে একটাকা ভাড়া। সেই হিসাবে অনেক টাকাই ভাড়া নেওয়া উচিৎ। কিন্তু কর্মচারীটি আমাদের কাছ থেকে দশ টাকা ভাড়া চাইলো। ভাড়া মিটিয়ে বাইরে এলাম। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, যমুনোত্রী যেতে হলে হয় “ধরাসু” যেতে হবে, আর তা নাহলে  “বারকোট” যেতে হবে। এই দুই জায়গা থেকেই সরাসরি সায়নাচট্টি যাবার বাস পাওয়া যাবে। এও জানা গেল যে, ঐ দু’টো জায়গার মধ্যে বারকোট বেশ বড় জায়গা। কাজেই আমরা বারকোট যাব স্থির করে, কাউন্টার থেকে তিনটে বারকোটের টিকিট কাটলাম। তিনটে টিকিটের ভাড়া লাগলো, পঁচিশ টাকা আশি পয়সা। বাসের ছাদে মালপত্র গুছিয়ে রেখে, আসন দখল করে বসলাম। পছন্দ মতো সামনের দিকে ড্রাইভারের ঠিক পিছনে, বাঁদিকে আমরা তিনটে আসন দখল করলাম। এবার বাস থেকে নেমে, পাঁউরুটি, কলা ও ডিম সিদ্ধ খেয়ে, একটা ওয়াটার বটল্ কিনে তাতে জল ভরে, জল খেয়ে, বাসে এসে বসলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে বাস ছেড়ে দিল। মনে বেশ আনন্দ, শেষ পর্যায় প্রায় উপস্থিত। এখানে পৌঁছতে পারলে, এ পথের সমস্ত দর্শনীয় স্থান আমাদের দেখা হয়ে যাবে। আঁকাবাঁকা রাস্তা পার হয়ে, একসময় আমরা আবার সেই ধরাসু এসে পৌঁছলাম। আসলে ধরাসু হচ্ছে একটা জংশন। এখান থেকে একটু এগিয়েই রাস্তা দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে। একটা যাচ্ছে উত্তরকাশী হয়ে গঙ্গোত্রী, অপরটা যমুনোত্রী। এখন আমাদের ধরাসু যাবার কোন প্রয়োজন ছিল না। বোধহয় আরও কিছু যাত্রীর আশায়, বাস ধরাসু গিয়ে অহেতুক অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো। ড্রাইভারের সাথে আলাপ হ’ল। ভদ্রলোকের খুব সুন্দর ব্যবহার। দেখতে অনেকটা আমার অফিসের আর্মড-গার্ড, কল্যান সাহার মতো। আমরা নিজেদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে কথা বলার সময়, তাঁকে কল্যানদা বলে উল্লেখ করতে শুরু করলাম। এখানে একটা বড় হোটেল আছে। আমরা সেখানে সামান্য কিছু খেয়ে নিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে, কল্যানদা বাসটা অনেকটা পথ এগিয়ে নিয়ে গেলেন, বাসের মুখ ঘুরিয়ে আনার জন্য। অর্থাৎ যেদিক থেকে এসেছি, বাস আবার সেই দিকেই বেশ কিছুটা এগিয়ে, বাঁদিকে বারকোটের উদ্দেশ্যে বাঁক নেবে। আমরা দোকানেই বসে ছিলাম। বাস ঘুরিয়ে আনলে, বাসে উঠে বসলাম। সুন্দর রাস্তা, সুন্দর আবহাওয়া, ‌মনটাও বেশ ভালো আছে। আমাদের ঠিক সামনে, বাসের সব থেকে সামনে, ড্রাইভারের আসনের বাঁপাশের সিঙ্গল সিটটা একজন যুবক দখল করে বসেছে। হাতে ম্যাগাজিন, চোখে রোদ চশমা। বাস যখন বেশ কিছুটা এগিয়েছে, যুবকটি ঘুমতে শুরু করলো। আমরা ভাবছি ড্রাইভার হয়তো রেগে গিয়ে দু’টো কটু কথা শোনাবেন। ঐ সিটে বসে ঘুমনো নিষেধ। আমরা যে সিটে বসে আছি, এবং আমাদের ঠিক ডানপাশের সিটটাও, ঐ একই নিয়মের অন্তর্ভুক্ত। যাত্রীটি খুব সম্ভবত এইসব অঞ্চলেরই বাসিন্দা, সম্ভবত উত্তরকাশীর। ড্রাইভার ভদ্রলোক ঘন ঘন সিগারেট খান। তিনি পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে, যুবকটিকে দিলেন। যুবকটি খুব লজ্জা পেয়ে একটু হেসে, হাত বাড়িয়ে সিগারেটটা নিল। এই রাস্তাটার দেখছি একটা বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে রাস্তা খুব সুন্দর এবং একভাবে ওপর দিকে উঠেছে। এখনও পর্যন্ত রাস্তা কখনও নীচের দিকে নামে নি। একভাবে ওপরে উঠতে হচ্ছে বলেই বোধহয়, বাসের ইঞ্জিন থেকে একটা বিশ্রী আওয়াজ হচ্ছে। আবার সেই পুরাতন ভয়টা, মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো— বাস আবার না খারাপ হয়, আবার না বলে বসে, বাস আজ আর যাবে না। এ পথের সৌন্দর্য বেশ ভাল। রাস্তা থেকে অনেক নীচের জমিকে, খুব সুন্দর দেখতে লাগছে। দু’পাশে বড় বড় পাইন জাতীয় গাছ। আর এইসব গাছ থেকেই আসছে একভাবে সেই পোকার ডাক। কখনও বিরাম নেই। পরে দেখলাম এটা কোন পোকার ডাক নয়। ধুসর রঙের বেশ বড় আকারের গঙ্গা ফড়িং জাতীয় এক রকম পোকা, নীচের দিকে মুখ করে পিছন দিকটা ওপরের দিকে উচু করে, একভাবে দ্রুত পাখা নেড়ে চলেছে। আর তার আওয়াজেই কানে তালা লাগিয়ে দেবার মতো অবস্থা। একসাথে প্রচুর ঐ জাতীয় পোকা, বিভিন্ন গাছের ডালে বসে সব কাজ ফেলে, সারাদিন একভাবে পাখা নেড়ে চলেছে। এতে যে কী সুখ ওরা পাচ্ছে ওরাই জানে।

13710036_617646461744440_2917921280547011076_n

বাস একভাবে ওপর দিকে উঠছিল। আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই বোধহয়, এইবার শুরু হ’ল নীচে নামার পালা। একভাবে এঁকেবেঁকে, বাস নীচে নামতে শুরু করেছে। অনেকটা পথ পার হয়ে আসার পর দেখলাম, একটা গাছ কিভাবে ভেঙ্গে রাস্তার ডান দিক থেকে বাঁদিকে, রাস্তা বন্ধ করে শুয়ে আছে। গাছটা এত প্রকান্ড আকারের, যে ওটাকে ঠেলে সরিয়ে একপাশে রেখে দেবার ক্ষমতা আমাদের নেই। কল্যানদা ও কন্ডাক্টার বাস থেকে নেমে ব্যাপারটা উপলব্ধি করে, বাসের সবাইকে বাস থেকে নেমে আসতে বললেন। একে একে বাসের প্রায় সকল পুরুষ যাত্রী বাস থেকে নেমে হাত লাগালো। শেষে অনেক চেষ্টার পর, গাছটা একপাশে সরে গিয়ে, আমাদের এগিয়ে যাবার অনুমতি দিল। আমরা আবার এগিয়ে চললাম। দু’পাশের সারিবদ্ধ গাছে, রাস্তা ছায়ায় ঢাকা। রাস্তার পাশে মাইল স্টোনগুলো ক্রমশঃ বারকোটের নিকটবর্তী হওয়ার সংবাদ জানাচ্ছে। বারকোট পৌঁছতে যখন আর মাত্র দশ-বার কিলোমিটার পথ বাকি, আমাদের বাস দেহ রাখলো। এই মুহুর্তে নিজেকে বড় অসহায়, বড় দুর্বল মনে হচ্ছে। আবার সেই অশান্তি। কিন্তু দক্ষ বাস ড্রাইভার ও কন্ডাক্টারের যৌথ প্রচেষ্টায়, বাসের ইঞ্জিন আবার প্রাণ ফিরে পেল। কন্ডাক্টার রাস্তার পাশের ঝরনার জল টিনে করে এনে, বাসের ইঞ্জিনের সামনে ছেটাতে শুরু করলো। বাস থেকে অস্বাভাবিক রকমের ধোঁয়া বার হচ্ছে। বোধহয় ইঞ্জিন কোন কারণে খুব গরম হয়ে গেছে। এবার যদিও বাস ছাড়লো, ভয় কিন্তু গেল না। একটা বিশ্রী রকমের আওয়াজ করতে করতে, খুব ধীর গতিতে বাস এগিয়ে চলেছে। বেশ কিছুক্ষণ অন্তর একটা করে মাইল স্টোন অতিক্রম করছে, আর আমরা অস্থির মন নিয়ে মনে মনে ভাগ্য বিধাতার দয়া ভিক্ষা করছি— আর কয়েকটা মাইল স্টোন এগিয়ে নিয়ে চলো। আসলে ভয়টা বেশি পাওয়ার একটাই কারণ, আমাদের সঙ্গে এখন সমস্ত লাগেজ আছে। তা নাহলে এই সামান্য কয়েক কিলোমিটার রাস্তা, তাও আবার পাকা বাস রাস্তা, আমাদের কাছে এখন কোন ব্যাপার নয়। অন্তত এখন তো নয়ই। ডানপাশে একটা রাস্তাকে ফেলে, আমরা বেশ কিছুটা নীচে বারকোট এসে পৌঁছলাম।

13620169_617647661744320_532227743456880569_n

বাস থেকে মালপত্র নামিয়ে ভরদুপুরে একপাশে দাঁড়ালাম। কতদিন স্নান করি নি, অসহ্য লাগছে। খিদেও বেশ ভালোই পেয়েছে। পাশেই “রাওত” হোটেল। তিনতলা বাড়ি, এরই একটা অংশে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ্ ইন্ডিয়ার শাখা। হোটেলে ঢুকে বাসের খবর নিয়ে জানা গেল, সাড়ে তিনটে-চারটে নাগাদ, হৃষিকেশ থেকে বাস আসবে। হৃষিকেশ থেকে বাস ধরাসু হয়ে সায়নাচট্টির পথ ডানপাশে ফেলে বারকোট আসবে। তারপর আবার ব্যাক করে বাঁহাতে সায়নাচট্টির ফেলে আসা পথ ধরবে। এই সায়নাচট্টি থেকেই যমুনোত্রী যাবার হাঁটা পথের শুরু। এখানে আরও একটা সুসংবাদ পাওয়া গেল— ভালো চালের গরম ভাত ও মাংস পাওয়া যাবে। পাশেই একটা টেবিলে দেখলাম, একজন তুষার শুভ্র লম্বা লম্বা ভাত নিয়ে খাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতদিনের অতৃপ্ত ক্ষুধা চাঙ্গা হয়ে পেটের ভিতর লাফ ঝাঁপ করে বিদ্রোহ শুরু করে দিল। সময় নষ্ট না করে, তিন প্লেট মাংস আর ভাত দিতে বললাম। মাংস পাঁচ টাকা প্লেট্, হোটেল কাউন্টারে বসা লোকটা জিজ্ঞাসা করলো, মাংস কী হাফ্-হাফ্-হাফ্? অর্থাৎ হাফ্ প্লেট করে তিনজনকে দেবে কী না? এখানে বোধহয় এত দাম দিয়ে, ফুল প্লেট্ করে মাংস সচরাচর কেউ খায় না, বা খাওয়ার খুব একটা চল্ নেই। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের গুলিয়ে ফেললে চলবে কেন? আমরা পাঁচ টাকা প্লেটে খাসির খাদ্য নালী খাওয়া পাবলিক। ভালো মাংস দিলে আজ দশ টাকা প্লেট হলেও, কুছ পরোয়া নেহি, ফুল প্লেটই খাব। আধ প্লেটে মন ভরবে কেন? বললাম, “না, ফুল্-ফুল্-ফুল্, একটু দেখে দেবেন”। এবার দোকানদারও খুশি, আমরাও খুশি। তার হাবভাব দেখে মনে হ’ল, সে বোধহয় আমাদের টাটা-বিড়লা জাতীয় কেউকেটা বলে মনে করছে। যাহোক্ খাবার এল। রান্না কেমন হয়ছে এই মুহুর্তে বর্ণনা করে সময় নষ্ট করতে পারবো না, তবে মনে হচ্ছে জীবনে এত সুস্বাদু খাদ্য কখনও কোথাও খাই নি।

হোটেলের বাইরে আমাদের মালপত্র ও লাঠি সাজিয়ে রাখা আছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আশেপাশে ইতস্তত ঘুরে ফিরে, আর হোটেলে বসে বসে, একসময় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল, এল না আমদের বাস। এবার আমরা অস্থির হয়ে উঠলাম। হোটেল মালিক কিন্তু এখনও একই সুরে বলে যাচ্ছে, “বাস আসবে। এখান থেকে সায়না চট্টি সামান্যই পথ, তাই সন্ধ্যা হলেও বাস ওখানে যাবে”। বাস কিন্তু আসবে সেই হৃষিকেশ থেকে। হঠাৎ মনে হ’ল, বাসটা আমাদের আগের সব বাসের মতো রাস্তায় কোন কারণে আটকে পড়েনি তো? হোটেলের পাশেই বাঁহাতে একটা গুমটি ঘর। ওখান থেকেই বাসের টিকিট বিক্রি হয়। ওখানে গিয়ে বাসের খবর জিজ্ঞাসা করাতে, ওরাও বেশ জোরের সঙ্গেই জানালো বাস আসবে। সামনে বাঁপাশের রাস্তা ক্রমশঃ এঁকেবেঁকে উপরে উঠেছে। ঐ দিক থেকেই আমরা এখানে এসেছি। ঐ দিক থেকেই এখন বাস আসবার কথা, আবার ঐ বাসে আমরা ঐ দিকেই যাব। যতদুর লক্ষ্য করা যায়, কোন বাস আসতে দেখা যাচ্ছে কী না নজর রাখছি। নাঃ, বাস এল না, তার পরিবর্তে রাত এসে হাজির হ’ল। সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমশঃ ঘন হতে হতে, রাত্রির রূপ নিল। আশা ছেড়ে দিয়ে হোটেলে একটা ঘর নেওয়াই মনস্থ করলাম। রাওত হোটেল আমাদের তিনতলায়, ঠিক বাস রাস্তার ওপরে একটা ঘর দিল। খাটে বসে বড় জানালা দিয়ে ঠিক নীচে অসংখ্য লোকের যাতায়াত, ট্রাকের যাওয়া আসা, ইত্যাদি লক্ষ্য করতে করতে সময় কেটে যাবে, এটাই সান্ত্বনা।

বিকেল প্রায় চারটে নাগাদ, একটা লোক সাইকেল নিয়ে বিড়ি বিক্রি করতে, আমাদের হোটেলের ঠিক নীচে, বাস রাস্তার ওপর এসেছিল। লোকটার একটা হাত কাটা। সাইকেলের কেরিয়ারে একটা বেশ বড় টিনের বাক্স লাগানো। ঐ বাক্সে অসংখ্য বিড়ি। সামনে অদ্ভুত ভাবে একটা রেকর্ড প্লেয়ার লাগানো। সাইকেল দাঁড় করিয়ে, লোকটা তার ছোট্ট মাউথপিসটার মাধ্যমে, সামনের ছোট মাইকটায়, বিড়ির গুণগান গেয়ে বিজ্ঞাপন দিচ্ছিল, আর মাঝেমাঝে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে, “নাগিন” এর একটা লং প্লেয়িং রেকর্ড বাজাচ্ছিল। এই অবস্থাতেও এত দুরের হোটেলের ঘরে বসে, আমরা আমাদের ঘরের হেমন্ত মুখার্জীর কন্ঠস্বরে, এই মুহুর্তে নিজের শহরের স্বাদ, গন্ধ অনুভব করছি। রাত আরও বাড়তে, লোকটা তার সাইকেলে, সমস্ত কিছু গুছিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। এতক্ষণ লোকটাকে ঘিরে রাখা লোকের ভিড় পাতলা হয়ে গেল। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার, এত লোকের ভিড়েও, তার বিড়ি বিক্রির পরিমান কিন্তু অতি সামান্য। নাঃ, বাস আজ আর এল না। সেপ্টেম্বরের দুই তারিখ কেটে গেল। এতদিনে খুব ভালো করে সাবান শ্যাম্পু মেখে, তিনজনে পর পর অনেকক্ষণ ধরে স্নান করলাম।

হাতে অনেক সময় পেয়ে, নতুন করে মালপত্র গোছাবার জন্য সুটকেস খুললাম। আমার সুটকেসে জামাকাপড় ছাড়া, হেমকুন্ড থেকে পলিথিন ব্যাগ বয়ে নিয়ে আসা একগাদা ব্রহ্মকমল ছিল। ফুলগুলো গাছ থেকে তুলে পলিথিন ব্যাগে পুরে সুটকেসে নেবার পর থেকে, পনের দিন পরে এই প্রথম সুটকেস খোলা হ’ল। এগুলো নিয়ে আসার সময় এক ভদ্রলোকের হাতে ব্লটিং পেপার দেখে, এবং তার কাছে, ব্লটিং পেপার দিয়ে মুড়ে ফুল নিলে অনেক দিন ভালো ও টাটকা থাকে শুনে, সবজান্তা বিজ্ঞের মতো তাকে বলেছিলাম, “মৌয়া গাছের মিষ্টি ছায়া ‘ব্লটিং’ দিয়ে শুষে, ধুয়ে মুছে সাবধানেতে রাখছি ঘরে পুষে” গোছের ব্যাপার বলছেন? এখন বুঝতে পারছি, অত সহজে এই মূল্যবান ফুল নিয়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। সুটকেসটা খুলতেই, একটা তীব্র পচা গন্ধে ঘর ভরে গেল। সুটকেসের নীচের দিকটা কালো জলে ভিজে গেছে। পলিথিন ব্যাগটা বেশ খানিকটা ফেটে গেছে, না ফেটে না বলে, গলে গেছে বলাই বোধহয় ঠিক হবে। বোধহয় পচে অ্যাসিড ফর্ম করেই এটা হয়েছে। ছেঁড়া পলিথিন ব্যাগের ভিতর ফুলগুলো, পচে গলে কালো জলীয় পদার্থে পরিণত হয়েছে। আর সুটকেসের তলার অংশটা পুরো ভিজে এবং কালো রঙের দেখতে হয়ে গেছে। সমস্ত পচা ফুল সমেত পলিথিন ব্যাগটা ফেলে দিতে হ’ল। সুটকেসটাও ফেলে দিতে পারলেই বোধহয় ভালো হয়, কিন্তু এখন মাঝপথে তা সম্ভব নয়। ভিজে ন্যাকড়া দিয়ে অনেকবার ভালো করে মুছেও, সুটকেসটা পরিস্কার করা গেল না। পচা গন্ধটা সামান্য কমলো বলে মনে হয়। শেষে নীচে গিয়ে একটা দামী ভাল পাউডার কিনে এনে, নিজের গায়ে না মেখে, পরম স্নেহে আদরের সুটকেসকে অর্ধেক মাখিয়ে, কাগজ পেতে ওটাকে মোটামুটি ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হলাম। ফুলগুলো নিয়ে যেতে পারলাম না বলে খারাপও লাগছিল। অফিসের একজন আমাকে বার বার করে একটা ব্রহ্মকমল, তার জন্য কষ্ট করে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেছিল। ইচ্ছা থাকলেও, তাকে আর তার কাঙ্ক্ষিত জিনিস এনে দিতে পারলাম না।

একটু রাত করেই একতলায় হোটেলে খেতে নামলাম। আমার আজ রাতেও আবার সেই সকালের খাবার খাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বন্ধুরা একই দিনে দু’বার মাংস খেতে ভয় পেল। আমি জানি না রোজ রোজ পচা আলুর তরকারী, কাঁচা রুটি আর ঝুড়িভাজা খেলে যদি কোন ক্ষতি না হয়, তবে একদিনে দু’বার মাংস ভাত খেলে, কতটা ক্ষতি বৃদ্ধি হতে পারে। তবু তাদের ইচ্ছায়, ডিমের ঝোল ভাত খেতে রাজি হতে হ’ল। তবে হোটেল মালিক বোধহয় সব খদ্দেরের মন জুগিয়ে ব্যালান্সড্ করে চলেন। ডিমের ঝোলটা ভালোই খেতে হয়েছে। তবে ডিমের ঝোলের ভিতর থেকে ছোট সাইজ হলেও, এক টুকরো মাংস উদ্ধার হওয়ায়, রাতের খাবারটাও আমার ভালোই জমলো। বেশ বুঝতে পারছি, ডিমের ঝোলে ওবেলার মাংসের ঝোল মেশানো হয়েছে। তা হোক, ভদ্রলোককে বেশ সৎই বলতে হবে। ডিমের ঝোলে মাংসের টুকরো দিয়েছেন, মাংসের ঝোলে ডিমের টুকরো দেন নি, এবং খেতেও বেশ উপাদেয় হয়েছে। যাহোক্, কিছুক্ষণ বাস রাস্তায় পায়চারি করে, তিন তলায় নিজেদের ঘরে ফিরে এলাম। ওপরে উঠবার সময় হোটেল মালিক আশ্বাস দিলেন— আগামীকাল বাস পাওয়া যাবেই। মনে মনে, ‘তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক’ বলে, ওপরে উঠে এলাম। গল্পগুজব করে অনেকক্ষণ কাটলো। আবার আমার সঙ্গীদের মধ্যে ফিরে যাবার পুরানো ঝোঁকটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। মাধবের বক্তব্য, এখানে খরচের পরিমাণ অনেক বেশি। তাই আগামীকাল আমাদের ফিরে যাওয়াই উচিৎ। আমি বললাম, কাল  নিশ্চই বাস পাওয়া যাবে। আর বাস না পাওয়া গেলেও, জীপ বা অন্য কিছুর একটা ব্যবস্থা নিশ্চই করা যাবে। তাছাড়া খরচ তো আমাদের হাতে। ডাল ভাত খেলেই খরচ কমে যাবে। অবশ্য ঘর ভাড়া প্রতিদিন পনের টাকা করে লাগবেই। ওদের অবস্থা দেখে ভয় হ’ল, কাল বাস না এলে, যমুনোত্রী যাওয়ার আশা শেষ। ঘরের বাঁপাশের জানালা দিয়ে দুরে, অনেক দুরে, মিটমিট্ করে অনেক আলো জ্বলছে। আমাদের ধারণা, ওখানেই হয়তো যমুনোত্রী। ঘরটায় মাত্র দু’টো খাট। একটায় দিলীপ, অপরটায় আমি আর মাধব শুয়ে পড়লাম। মশার উপদ্রব উপেক্ষা করে, একসময় ঘুমিয়েও পড়লাম।

আজ সেপ্টেম্বর মাসের তিন তারিখ। বেশ ভোরে ঘুম থেকে উঠে, মুখ ধুয়ে যাবার জন্য তৈরি হয়ে নীচে নেমে এলাম। হোটেল মালিক বললেন, গতকাল নিশ্চই রাস্তায় কোথাও ধ্বসে বাস আটকে গিয়েছিল। চিন্তা করবেন না, আজ অবশ্যই বাস এসে যাবে। জিজ্ঞাসা করলাম, বাসের কোন খবর পাওয়া গেছে কী না। ওদের কথাবার্তায় মনে হ’ল, এখানে বাসের খবর ওভাবে রাখা হয় না, হয়তো রাখাও যায় না। আশ্চর্য, এই বিপজ্জনক রাস্তায়, অতগুলো প্যাসেঞ্জার নিয়ে, বাসটা কেন এল না, রাস্তায় খাদে তলিয়ে গেল কী না, জানার ইচ্ছা বা দায়িত্ব কারো নেই? জানার উপায়ও বোধহয় নেই। অনেকক্ষণ রাস্তায় অপেক্ষা করে, আবার হোটেলে ফিরে এলাম। আমার দু’জন সঙ্গী যেন বুঝে ফেলেছে যে, আজও আমাদের নিতে কোন বাস আসবে না। এবার আমি খুব নার্ভাস ফীল করতে লাগলাম। বাঁদিকের জানালা দিয়ে কোন গাড়ির আওয়াজ আসলেই, বাসের আশায় সেদিকে তাকাই। কিন্তু হয় ট্রাক, নাহয় জীপ আসে। বাসও কয়েকটা পরপর এল বটে, তবে সেগুলো সায়নাচট্টি যাবে না। রাওত হোটেলকে ডানপাশে রেখে, সেগুলো সোজা এগিয়ে যাবে। শুয়ে বসে আর সময় কাটে না। বাসও আসে না। বোর্ণভিটা আর আমসত্ত্বের ধ্বংস হতে লাগলো। এগুলো আর সংরক্ষণ করার প্রয়োজনও নেই। একসময় স্নান সেরে একতলায় খেতে গেলাম।

মানসিক কষ্ট, সময় সময় শারীরিক কষ্টের থেকেও কষ্টকর হয়, হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। কিছু না খেয়ে, সারাদিন পরিশ্রম করে, পিসু ভর্তি নোংরা বিছানায় শুয়ে, আমরা যে কষ্ট ভোগ করেছিলাম, এখন ভালো হোটেলে থেকে, ভালো খাবার খেয়ে, ভালো বিছানায় শুয়ে, তার থেকে অনেক বেশি যন্ত্রণা ভোগ করছি, সামান্য একটা বাসের অনুপস্থিতির জন্য। খাওয়া দাওয়া সেরে, আবার নিজেদের ঘরে বসে, ফিরে যাওয়া না যাওয়া, ইত্যাদি আলোচনায় বারটা, একটা, দু’টো, ক্রমে বিকেল তিনটে বাজলো, বাস কিন্তু এল না। মাধব বেশ অধৈর্য হয়ে পড়ছে। শেষে বাস আসার আশা ছেড়ে, গতকালের সেই বিড়িওয়ালার আসার অপেক্ষায় রইলাম। অন্তত তার সেই রেকর্ডের গান শুনে অনেকটা সময় কাটবে। গতকাল শুনেছিলাম, বিকেল সাড়ে তিনটে-চারটে নাগাদ বাস আসে। আমি ভাবছি আর ঘন্টা খানেকের মধ্যে যদি বাস না আসে, তবে এদের সঙ্গে ফিরে যাবার যুদ্ধে, আর হয়তো নিজেকে জিতিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। বিড়িওয়ালা তার গানের ডালি, বিড়ির ঝুলি নিয়ে, সময় মতো এসে হাজির হ’ল। গানের না বিড়ির আকর্ষণে জানিনা, লোকের ভিড়ও বাড়লো। আমরা নীচে নেমে এলাম। হোটেলের বাঁপাশে বাসের টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চা খেয়ে মাধব ওপরে চলে গেল। একটু দুরে রাস্তায় একটা জীপ দাঁড়িয়ে আছে। অনেকেই ওতে করে সায়নাচট্টি যাবার চেষ্টা করছে। মাথাপিছু দশ টাকা ভাড়া। আমি ও দিলীপ ঠিক করলাম, হোটেলে থাকতেও তো অনেক খরচ হচ্ছে, কাজেই জীপেই চলে যাব। জীপের কাছে যখন পৌঁছলাম, তখন অনেক পুরুষ ও মহিলা আসন দখল করে নিয়েছে। ড্রাইভারের সাথে কথা বললাম। সে রাজিও হ’ল, কিন্তু আমাদের অত মালপত্র, সে জীপে নিয়ে যেতে রাজি হ’ল না। রাজি হ’ল না, কারণ খদ্দেরের অভাব নেই। রাস্তার একপাশে কাল যে বাসটায় আমরা এসেছিলাম, দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের জীপ ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে, ও কী করবো ঠিক করতে করতেই, জীপটা লোক ভর্তি করে নাকের ডগা দিয়ে চলে যেতে, যমুনোত্রী যাবার শেষ আলোও নিভে গেল। আগের দিনের বাস ড্রাইভার, কল্যানদার সাথে বাস কর্তৃপক্ষের বেশ উত্তেজক আলোচনা হচ্ছে শুনলাম। কল্যানদার বক্তব্য, দু’দিন ধরে এত লোক আটকা পড়ে আছে, তার বাস তো আজ আর কোথাও যাবে না, কাজেই সে বাস নিয়ে সমস্ত প্যাসেঞ্জারকে সায়নাচট্টি পৌঁছে দিতে চায়। কর্তৃপক্ষের তাতে ভীষণ আপত্তি। আমরা মনে মনে কল্যানদার জয়লাভ কামনা করলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কল্যানদা পরাজয় বরণ করে অসহায় ভাবে ফিরে এলেন। আমরা আবার বাসের অপেক্ষায় রাস্তায় বসে রইলাম।

আরও বেশ কিছুক্ষণ পরে আমি ও দিলীপ ওপরে নিজেদের ঘরে ফিরে আসতে যাব, হঠাৎ দেখি পাল পাল লোক ছুটে গিয়ে কল্যানদার বাসে উঠছে। বাস কোথায় যাবে, আদৌ যাবে কী না, খোঁজ নেবার সময় নেই। দিলীপকে প্রায় ঠেলে বাসে উঠে জায়গা দখল করতে পাঠিয়ে, আমি ওপরে নিজেদের ঘরে ছুটলাম মালপত্র নামাতে। তখনও কিন্তু জানিনা বাস আদৌ যাবে কী না, বা গেলেও কোথায় যাবে। তবে কল্যানদা যেহেুতু সায়নাচট্টি যাবার আগ্রহ দেখিয়ে ছিলেন, তাই ধরে নেওয়া যায়, বাস সায়নাচট্টি যাচ্ছে। তবে সে চিন্তা পরে করলেও চলবে।

ওপরে এসে মাধবকে বললাম, তাড়াতাড়ি মালপত্র নামাতে। আকাশে আবার এখন বেশ মেঘ করে এসেছে। মাধব বললো, মালপত্র এখানেই রেখে যেতে। আমার তাতে একবারেই মত নেই। বললাম কোন কারণে ফিরতে দেরি হলে, প্রতিদিন পনের টাকা করে অহেতুক ভাড়া গুনতে হবে। মাধব কিন্তু সেই খরচ করেও, মালপত্র এখানেই রেখে যাওয়া ঠিক বলে মনে করলো, কারণ সায়নাচট্টিতে হয়তো মাল রাখার ভালো জায়গা নাও পাওয়া যেতে পারে। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, তবু এখানে মালপত্র রেখে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ও আমার যুক্তি মেনে না নিলেও, বেজার মুখে আমাকেই মেনে নিল। শুধু বললো, রাস্তায় বৃষ্টি নামলে বিপদে পড়তে হবে। হাতে হাতে মাল নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি আমরা নীচে নেমে এসে, হোটেলের বিল মেটালাম। হোটেল মালিক আমাদের শুভ যাত্রা কামনা করলেন। আমি বাসের ছাদে মাল সাজিয়ে রেখে, নীচে নেমে এসে দিলীপের নাম ধরে চিৎকার করেও কোন সাড়া পেলাম না। বাসে এত ভিড়, যে ওকে বাসে উঠে দেখারও কোন উপায় নেই। এই বাসে এখন অফিস টাইমের হাওড়া-কলকাতার মতো মানুষ ঝুলছে। দরজার দিকে এসে দেখলাম, দিলীপ একবারে পিছনের সিটে জানালার ধারে জায়গা দখল করে বসে আছে। ও আমাদের দেখতে পেয়ে, তাড়াতাড়ি জানালা দিয়ে উঠে পড়তে বললো। ও আমাদের জন্য জানালার ধারে একটু জায়গা রেখে বসেছে। ও আমাদের দু’জনের জন্যই দু’টো বসার জায়গা রেখে, তারপরে নিজে বসেছিল। কিন্তু ওর ডানপাশে অনেকেই ওকে ঠেলে বাঁপাশে সরিয়ে, বসার জায়গা করে নিতে চাইছে। স্বাভাবিক, কারণ তারা দেখতে পাচ্ছে এত ভিড় বাসে দিলীপের বাঁপাশে জানালার ধারে দু’জন বসার মতো জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। রোগা পটকা দিলীপ যতই ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী’ পণ করে বসে থাকুক, তারা শুনবে কেন? ক্রমাগত চাপে তখন ওর বাঁপাশে কোন মতে একজন বসার মতো জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। এদিকে বাসে এত ভিড়, যে দরজা দিয়ে উঠে ভিতরে যাবার কোন উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত জানালা দিয়ে বাসে ঢুকে, কোনক্রমে জানলার ধারে বসে পড়লাম। এবার মাধবও জানালা গলে উঠে এসে আমার বাঁপাশে, জানালার ধারে জোর করে চেপে বসে পড়লো। পাঁচ-ছ’জন বসার জায়গায়, এগিয়ে পিছিয়ে আটজন বসেছি। জানালার ধারে মাধব, তারপরে আমি, আমার পরে দিলীপ। দিলীপের ডানপাশে একবারে নোংরা কতগুলো নারীপুরুষ। ওর পাশেই একটা স্ত্রীলোকের কোলে একটা বছর বার-তের বয়সের মেয়ে।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s