পাহাড়ের রোজনামচা – নবম পর্ব {লেখাটি www.amaderchhuti.com ও TOUR & TOURISTS পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত।}

DSCN9767একটু ওপরে ট্রাভেলার্স লজে আঠারো টাকা ভাড়ায়, একটা তিনটে বিছানার ঘর ভাড়া নিলাম। স্থানীয় পান্ডারা অবশ্য তাদের ঘরে থাকতে অনেক অনুরোধ করেছিল। তবু একটু আরামে থাকার আশায়, ট্রাভেলার্স লজই বুক করলাম। এখানে আমরাই একমাত্র বোর্ডার। চাবি নিয়ে নিজেদের ঘরে এলাম। তিনটে খাট, গোটা ছয়েক কম্বল দেওয়া আছে। মাধবের আবার সামান্য জ্বর এসেছে। পথে একবারও ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ খায়নি। ওকে এক ডোজ ওষুধ খাইয়ে, আমি ও দিলীপ বাইরে এলাম। চারিদিকে খুব আরাম দায়ক রদ্দুর। একটু নীচেই বাঁদিকে গঙ্গোত্রী মন্দির। এখান থেকে মন্দিরের পিছন দিকটা দেখা যায়। মন্দিরের সামনে, দুরে বরফ ঢাকা শৃঙ্গ দেখা যাচ্ছে। একবারে ডানদিকে সুদর্শন শৃঙ্গ, তার বাঁপাশে কালো, একটু বাঁকা মতো গনেশ শৃঙ্গ। কয়েকটা ছবি নিয়ে, পোস্ট্ অফিসের খোঁজে গেলাম। উত্তরকাশী থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে চিঠি লিখে এনেছিলাম। ছুটি বাড়াতে হবে। ভাবলাম আন্ডার সার্টিফিকেট্ অফ্ পোস্টিং করে পাঠাবো। মন্দিরের ডানদিকে ব্রিজ পেরিয়ে পোস্ট্ অফিস। একটা বেঞ্চে বসে এক ভদ্রলোক পরম নিশ্চিন্তে উল বুনছেন। আর কাউকে দেখলাম না। মনে হয় এই একজনই পোস্ট্ মাষ্টার জেনারল কাম পিওন। ছোট্ট অন্ধকার একটা ঘরে অফিস। অপর একটা ঘরে সম্ভবত তাঁর থাকার ব্যবস্থা। আমরা তাঁকে দু’টো আন্ডার সার্টিফিকেট্ অফ্ পোস্টিং এর ফর্ম দিতে বললাম। ভদ্রলোক জানালেন, ঐ ফর্মের কথা তিনি আগে কখনও শোনেন নি, এবং জানেন ও না। অনেকভাবে তাঁকে বোঝাবার পর, তিনি উল বোনা ছেড়ে অফিস ঘরে ঢুকে, কোনবার পার্শেল ফর্ম, কোনবার আবার অন্য কোন ফর্ম নিয়ে আসেন। এত মহা বিপদ। কোন ফর্মটাই আমাদের পছন্দ হচ্ছেনা দেখে, তিনি বেশ অসন্তুষ্ট হলেন। শেষে, দু’টো মোড়া, প্রায় পাঁপড় ভাজার মতো মড়মড়ে, লালচে রঙের ফর্ম নিয়ে এসে বললেন, এই দু’টো ফর্মই আছে, আর কোন রকম ফর্ম এখানে পাওয়া যাবে না। এই ফর্ম দু’টোই আমাদের প্রয়োজন। রঙ বদলে গেলেও কাজ চলে যাবে। তবে সোজা করে, যাতে ভাঁজ না পড়ে, সেইভাবে যত্ন করে রাখতে হবে। ফর্ম ভর্তি করে ভদ্রলোকের হাতে দিলাম। উনি জানালেন, উনি ইংরাজী পড়তে পারেন না। বললাম, আমরা পড়ে দিচ্ছি, দরকার হলে তিনি মিলিয়ে নিতে পারেন। ভদ্রলোক এবার পরিস্কার জানালেন, এভাবে করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে বললাম, আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী, আমাদের সঙ্গে আইডেন্টিটি কার্ড আছে। ভদ্রলোক এবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ডাকটিকিট লাগিয়ে, ঐ ডাকঘরের ছাপ মেরে দিয়ে, বাইরের ডাক বাক্সে ফেলে দিতে বললেন। আমরা ডাকবাক্সে চিঠি দু’টো ফেললাম কী না, তিনি সেটাও ঘাড় বেঁকিয়ে লক্ষ্য করলেন। একেই বোধহয় “জাতে মাতাল, তালে ঠিক” বলে। চিঠি পোস্ট্ করে এক চক্করে মন্দির ঘুরে দেখে, ঘরে ফিরে এলাম।

  GANGOTRI TEMPLE (2)       GANGOTRI TEMPLE        GANGOTRI TEMPLE (3)                                                                 গঙ্গোত্রী মন্দির

মাধব ঘুমচ্ছে। গায়ে এখনও জ্বর আছে। আমরাও একটু বিশ্রাম নেবার জন্য শুয়ে পড়লাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে দরজায় কড়া নেড়ে কে একজন আমাদের ডাকতে, দরজা খুলে দেখি ট্রাভেলার্স লজের একজন কর্মী। তিনি বললেন, “এই তো পাহাড় দেখার সময়, আপনারা ঘরে শুয়ে আছেন”? ঘরের বাইরে এসে দেখি, সূর্যাস্তের আভা বরফের ওপর পড়ে, লাল-হলদে রঙ ছড়াচ্ছে। ঘর থেকে মাধবকে ডেকে আনলাম। কর্মীটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ঐ দৃশ্য উপভোগ করলাম। অন্ধকার না নামা পর্যন্ত ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করলো না। শেষে ঘরে ফিরে এসে মাধবকে ঘরে একা রেখে, টাকা নিয়ে নীচের দোকানে রাতের খাবারের অর্ডার দিতে গেলাম। চা খেয়ে, রাতের পুরি তরকারী ঘরে পাঠিয়ে দিতে বলে ঘরে এসে দেখি, ঘর অন্ধকার, মাধব দরজা খুলে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমচ্ছে। ওকে ডেকে দিলাম। একজন একটা হ্যারিকেন দিয়ে গেল। এখানে বিদ্যুৎ নেই। একটু জ্বলেই হ্যারিকেনটা দপ্ দপ্ করে নিভে গেল। দেখলাম হ্যারিকেনে যথেষ্টই তেল আছে। আবার জ্বাললাম। কিছুক্ষণ ভালোভাবে জ্বলে, দপ্ দপ্ করে আবার নিভে গেল। বাইরে গিয়ে বাঁপাশে কর্মীটির ঘর থেকে অন্য একটা হ্যারিকেন বদলে আনলাম। কিন্তু আশ্চর্য, এটাও সেই একই ভাবে নিভে যাচ্ছে। দিলীপকে বললাম হয়তো অক্সিজেনের অভাব। কাচটা খুলে দিয়ে জ্বাললাম, তাতেও কোন লাভ হ’ল না। ঘর অন্ধকার রেখেই চুপ করে শুয়ে থাকলাম। একটু পরে আমি আর দিলীপ আরতি দেখতে মন্দিরে গেলাম। ঘরে ফিরে এসে আবার শুয়ে আছি, খাবার আর দিয়ে যায় না। শেষে নিজেরাই খাবার আনতে যাব বলে তৈরি হচ্ছি, দোকানদার কী একটা পাতা করে একগাদা পুরি তরকারী দিয়ে গেল। দোকানদারের কাছে শুনলাম ওটা ভূজপাতা।

এ রাস্তায় দেখেছি মোমবাতি অনেকক্ষণ জ্বলে। যে মোমবাতি কলকাতায় এক ঘন্টা জ্বলে, সেটা এসব জায়গায় স্বচ্ছন্দে দেড়-দু’ঘন্টা জ্বলবেই। একটা মোমবাতি জ্বেলে, কোনরকমে অল্প কয়েকটা পুরি খেয়ে, বাকিগুলো রেখে দিলাম। মাধবতো মাত্র দু’টো পুরি খেল। দিলীপ বললো, আগামীকাল রাস্তায় কাজে লাগবে। আমরা কিন্তু তাতে রাজি হলাম না। ঠিক হ’ল, কাল সকালে নতুন পুরি, তরকারী সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হবে। এগুলোও ফেলে না দিয়ে সঙ্গে রাখা হবে, দরকার হলে কাজে লাগানো যাবে। দোকানদার এতক্ষণ আর কিছু লাগবে কী না জানার জন্য, বসে বসে কথা বলছিল। তাকে সেইমতো অর্ডার দিয়ে, দরজা বন্ধ করে, কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। পান্ডাদের বাড়িতে না থেকে, এখানে উঠলাম একটু আরাম খোঁজার জন্য। কিন্তু এখানে বিছানায় এত পিসু, ভাবা যায় না। নাক, কান, গলা ইত্যাদি দিয়ে হেঁটে হেঁটে গিয়ে, শরীরের বিশেষ বিশেষ পছন্দের জায়গাগুলো রক্ত চোষার জন্য বেছে নিয়ে, জ্বালিয়ে দিল। হাত দিয়ে ঝেড়ে ফেললে বোধহয় চামড়া বা লোমকূপের সাথে লেপ্টে থাকছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ্ থেকে, পরিবেশ আবার শান্ত হলে, আবার আমাদের মতোই পথ পরিক্রমায় বার হচ্ছে। শুয়ে শুয়ে ঠিক করলাম, আজ এত রাতে আর কিছু করার নেই, তবে ফেরার সময় গঙ্গোত্রীতে থাকতে হলে, এখানে আর নয়। এর থেকে লালাজীর দোকানের পিসুরা অনেক ভদ্র, অনেক নির্লোভী ছিল। এদের আমাকে এত বেশি কেন পছন্দ, এরাই জানে। মাধব ও দিলীপ দিব্বি ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি রাত দুপুর পর্যন্ত পিসু নিধন নিয়ে ব্যস্ত। একবার ঘুম আসে, আবার ওদের অত্যাচারে ঘুম ভেঙ্গে যায়। এইভাবে একসময় রাত কেটে ভোর হ’ল।

আজ ত্রিশে আগষ্ট। ঘুম থেকে উঠে সুদর্শন শৃঙ্গের দর্শন লাভ করলাম। সুদর্শন শৃঙ্গ আজ ভোরের আলোয় যেন এক অন্য রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তৈরি হয়ে দোকানে এলাম। চা খেয়ে পুরি তরকারী গুছিয়ে নিলাম, সঙ্গে মাইশোর পাক গোছের একরকম মিষ্টি। এখানে এসে খবর পেলাম, যে কাল রাতে খবর পাওয়া গেছে, সত্য নারায়ণ প্রসাদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। গোয়ালীয়রের সেই ধনী যাত্রীটিকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায় নি। বড় বরফের চাঁই চাপা পড়ে সত্যনারায়ণ পান্ডা মারা গেছেন। তিনি কানে খুব কম শুনতেন, বয়স বছর পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন মতো হবে। বরফ ভেঙ্গে পড়ার আওয়াজ তিনি হয়তো শুনতে পান নি। গোয়ালীয়রের ভদ্রলোকও সম্ভবত মারাই গেছেন। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় নি। গঙ্গার জলে ভেসে গিয়েই থাকুক বা কোথাও বরফ চাপা পড়েই থাকুক, তাঁকে খোঁজা হচ্ছে। দোকানদার আমাদের সাবধান করে দিয়ে বললো, এখন বরফ গলার সময়, কাজেই আমরা যেন গোমুখের খুব কাছে না যাই। দুর থেকে দেখাই ভালো। শুনলাম এখানকার সব পান্ডারা সত্য নারায়ণের শেষকৃত্য করতে গোমুখ চলে গেছে। সব খবর শুনে পুলিশ স্টেশনে এলাম। এটা ট্রাভেলার্স লজের পাশেই। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার যে পুলিশ স্টেশনে তালা দেওয়া। শুনলাম সবাই গোমুখ চলে গেছে। ভেবে দেখলাম পুলিশের জন্য অপেক্ষা করতে গেলে, একটা দিন অন্তত নষ্ট। গঙ্গোত্রী ঝেঁটিয়ে সবাই যখন গোমুখ গেছে, তখন আমরা আর পড়ে থাকি কেন? কাজেই আমরাও সেই একই পথে পা বাড়ালাম। বুকের মধ্যে যেন কেমন একটা ভয় দানা বেঁধে উঠছে, সেটা রাস্তার বিপদের ভয়, না পুলিশের ঝামেলার ভয়, বলতে পারবো না। দোকানে দেখা হয়ে গেল ডাবরানী, গরমকুন্ডে দেখা সেই সাধু গোছের ভদ্রলোকটির সাথে, যিনি আমাদের অভিশপ্ত জীপেও সঙ্গী হয়েছিলেন। এখন জানতে পারলাম তাঁর নাম রামজী। এখানে ভৈরবঘাঁটী থেকে লঙ্কা আসার জীপ ড্রাইভারকেও চা খেতে দেখলাম। তার কাছে জানা গেল, এপথে ঐ একটাই জীপ যাতায়াত করে। আমরাও গতকাল ঐ জীপেই গঙ্গোত্রী এসেছিলাম। তাকে বললাম, আমরা আগামীকাল দুপুর নাগাদ এখান থেকে লঙ্কা ফিরবো, সে যদি দয়া করে সেই সময় জীপটা গঙ্গোত্রী নিয়ে আসে, তাহলে খুব ভাল হয়। সে জানালো, লঙ্কা থেকে গঙ্গোত্রীর প্যাসেঞ্জার না পেলে সে গঙ্গোত্রী আসে না। তবু আমাদের অনুরোধে সে এখানে জীপ নিয়ে আসার চেষ্টা করবে। এখান থেকে লঙ্কা যেতে, বা লঙ্কা থেকে ডাবরানী যেতে প্যাসেঞ্জারের অভাবে যাতে অসুবিধায় পড়তে না হয়, তাই রামজীকেও অনুরোধ করলাম আগামীকাল আমাদের সাথে লঙ্কা ফিরতে। এবার আমরা উঠে দাঁড়ালাম।

দোকানদার ও স্থানীয় কিছু পান্ডা আমাদের যাত্রার শুভ কামনা জানালো। আমরা ফিরে না আসার দেশ, গোমুখের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম। ট্রাভেলার্স লজ, পুলিশ স্টেশনের পাশ দিয়ে রাস্তা এগিয়ে চলেছে সুদর্শন ও গনেশ শৃঙ্গের দিকে। মাধব ও দিলীপকে এগিয়ে যেতে বলে গঙ্গোত্রী মন্দিরের সামনের দিক থেকে খানকতক ছবি নিলাম। কেন জানিনা, গঙ্গোত্রী মন্দিরের গঠন শৈলীতে কোথায় যেন একটা মুসলমান স্থাপত্যের নিদর্শন বা মিল আছে বলে মনে হয়। এটা অবশ্য আমার মনে হ’ল, আর সবার মনে নাও হতে পারে। সঙ্গের সেই রামের বোতলের ছিপিটার আবার প্যাঁচ কাটা। কাঁধের ঝোলা ব্যাগে একবার কাত হয়ে পড়ছে, একবার বেঁকে যাচ্ছে। পলিথিন ব্যাগে ওটাকে যত্ন করে মুড়ে রাখা সত্ত্বেও, সামান্য তরল পদার্থ ব্যাগে পড়েছে। এটা আবার এক অতিরিক্ত বোঝা। তবু ওটাকে হাতছাড়া করতেও পারছি না। কল্যানদার উপদেশ, রাত্রে ঘুমবার আগে এটা সামান্য পরিমান ওষুধের মতো খেলে, ভাল ঘুম হয়, সমস্ত ক্লান্তি দুর হয় এবং পায়খানা পরিস্কার হয়। মনে হয় না, আমরা এতদিন ধরে এত পথ ঘুরে আসছি। তাছাড়া ঠান্ডা লেগে শরীর খারাপ হলে, এটা মহৌষধের কাজ করে। ধীরে ধীরে অনেকটা পথ পার হয়ে, আমরা একটা বিরাট ঝরনার কাছে এসে হাজির হলাম। এখানে রাস্তা বেশ চওড়া। ঝরনার পাশে বসে দোকান থেকে কিনে নিয়ে আাসা পুরি ও তরকারী খেলাম। মাধব এক ডোজ ওষুধও খেয়ে নিল। ওয়াটার বটলে জল ভরে নিয়ে, গুটি গুটি পায়ে আবার এগিয়ে চললাম। কোথাও কোন লোকজন নেই। সঙ্গে রোদচশমা ছিল, কারণ অনেকেই উপদেশ দিয়েছিল, গোমুখে কালো কাচের সানগ্লাশ পড়ে থাকতে। তা নাহলে বরফের ওপর সূর্যালোক পড়ে যে উজ্জল আকার ধারণ করে, তাতে চোখের ভীষণ ক্ষতি হয়, এমন কী অন্ধ পর্যন্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। দিলীপ আবার চশমা পরে। ওর চোখের পাওয়ারও অত্যন্ত বেশি। খালি চোখে প্রায় অন্ধই বলা যায়। ফলে একই পাওয়ারের একটা কালো কাচের চশমা সে তৈরি করে নিয়ে এসেছে। আজ দিলীপ তার নতুন বানানো কালো কাচের চশমা পরে, দিলীপ কুমারের স্টাইলে রাস্তা হাঁটছে। আমরা কিন্তু রোদচশমা ছাড়াই পথ হাঁটছি। রাস্তা এখানে বেশ সরু। বাঁদিকে খাড়া পাহাড়, ডানদিকে গভীর খাদ। বহু নীচে গঙ্গা। এতটা পথ আসলাম, এখনও পর্যন্ত একটা লোকও চোখে পড়লো না। গঙ্গোত্রী থেকে ভূজবাসা প্রায় পনের কিলোমিটার পথ। ওখানেই লালবাবার আশ্রম। ওর আগে কোন বিশ্রাম নেবার বা প্রয়োজনে থেকে যাবার জায়গা নেই। ভূজবাসা থেকে গোমুখ তিন কিলোমিটার রাস্তা। অনেকটা পথ চলে এসেছি। এখানে রাস্তা বেশ সরু হলেও, রক্ষণাবেক্ষণ ভালোভাবেই করা হয় বলেই মনে হয়। এক জায়গায় একটা বেঞ্চ মতো তৈরি করা হয়েছে। আমরা একটু বিশ্রাম নিতে তিনজনে ঐ বেঞ্চে বসলাম। মনের ভিতর সেই ভয় ভয় ভাবটা এখন আর নেই। একটা কিরকম অদ্ভুত আনন্দ ও উত্তেজনা, সেই জায়গাটা দখল করে নিয়েছে। বহুদুরে সাদা বরফের চূড়া দেখা যাচ্ছে। ডানদিকে গঙ্গার ওপারে একটু দুরেও একটা পাহাড়ের চূড়ায়, হাল্কা বরফের আস্তরণ। এগিয়ে যাবার জন্য তৈরি হলাম। আমরা এখনও খালি চোখে। দিলীপ কিন্তু কালো চশমা পরেই হাঁটছে। বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে আসলাম। প্রথমে আমি, আমার একটু পিছনে মাধব, সব শেষে দিলীপ। হঠাৎ মাধবের ডাকে চমকে উঠে পিছনে ফিরে দেখি, দিলীপ কপাল চাপড়ানোর মতো ভঙ্গীতে লাঠিতে ভর দিয়ে নীচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাধবকে জিজ্ঞাসা করলাম ওর কী হয়েছে। মনে একটা ভয় হ’ল, ওর যদি এখানে এখন শরীর খারাপ হয়, তাহলে কী করবো। ওকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, আবার যতটা পথ এগিয়ে এসেছি, তাতে ফিরে যাওয়াও সম্ভব নয়। সব থেকে বড় কথা, এখানে থাকাও সম্ভব নয়। মাধব ইশারায় জানালো সে জানেনা কী হয়েছে। আমি দিলীপকে জিজ্ঞাসা করলাম তার কী হয়েছে, মাথা ঘুরছে কী না। উত্তরে দিলীপ যা বললো, তাতে আমারই মাথা ঘোরা শুরু হ’ল। দিলীপ জানালো, তার চশমাটা জামার পকেট থেকে রাস্তায় কোথায় পড়ে গেছে। যখন আমরা বেঞ্চ থেকে উঠে আসি, তখন আমি খুব ভালোভাবে দেখে নিয়েছিলাম কোন কিছু পড়ে আছে কী না। এটা আমার চিরকালের অভ্যাস। কাজেই চশমা হয় তার আগেই কোথাও পড়েছে, নয়তো সেই বেঞ্চ থেকে এখানে, যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তার মধ্যে কোথাও পড়েছে। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম বেঞ্চে বসার সময় চশমা পকেটে ছিল কিনা। সে জানালো যে সে লক্ষ্য করে নি। চশমা ছাড়া ওতো প্রায় অন্ধ। দিনের বেলা নাহয় পাওয়ার দেওয়া কালো চশমা পরে চলে গেল, কিন্তু রাতে? রাতে কালো চশমা পরে তো কিছুই দেখতে পাবে না, লোকেই বা কী বলবে? একটা চশমার জন্য ফিরে যেতে হতে পারে ভেবে, ওর ওপর এত রাগ হচ্ছে যে মনে হচ্ছে, যা হয় হোক, ওকে ফেলে এগিয়ে যাই। এত গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস, এত অসাবধানে কিভাবে নেয়? মাধবের শরীর এখন আগের থেকে অনেক ভালো। ঠিক করলাম ফেলে আসা বেঞ্চ পর্যন্ত খুঁজে দেখবো। তাও কী একটুখানি পথ? অনেকটা রাস্তা পার হয়ে এখানে এসেছি। তাছাড়া এখান থেকে বেঞ্চের মধ্যে কোথাও যে পড়েছে, তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? ওর ব্যাগ ভালো করে ঘেঁটে দেখলাম, সেখানে পাওয়া গেল না। বাধ্য হয়ে আমি বেঞ্চের দিকে এগলাম। আমার একটু পিছনে দিলীপ। ভরসা একটাই, রাস্তায় চশমা পড়লেও, কেউ কুড়িয়ে নিয়ে যাবার, বা না দেখে চশমার ওপর দিয়ে হেঁটে যাবার সম্ভাবনা নেই। ওর ভাগ্য ভালো, না আমার জানিনা, একটু এগিয়েই দেখলাম চশমাটা রাস্তার ওপর পড়ে আছে। ভাগ্য সত্যিই খুব ভালো যে খুব বেশি পিছোতে হয় নি, বা মোটা কাচ বলেই বোধহয়, পাথরের ওপর পড়েও ভাঙ্গে নি। চশমাটা কুড়িয়ে নিয়ে দিলীপের কাছে এসে ওর হাতে দিয়ে বললাম, ভালোভাবে ব্যাগে তুলে রাখতে।

   CHIRBASA        WAY TO BHUJBASA       WAY TO BHUJBASA (2)

               চীরবাসা                                  ভূজবাসার পথে                            ভূজবাসার পথে

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে, আবার এগিয়ে চললাম। রাস্তা এখানে কোথাও কোথাও অসম্ভব সরু। এইভাবে অনেকটা রাস্তা হেঁটে এসে দুরে, অনেক দুরে, বহু নীচে গঙ্গার পাশে, একটা টিনের ঘর দেখতে পেলাম। চারপাশে অনেক গাছপালা দিয়ে ঘেরা। মনে হয় এটাই চীরবাসা। এরপর তাহলে ভূজবাসা। প্রায় দশ কিলোমিটার পথ চলে এসেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই চীরবাসা পৌঁছে গেলাম। মাধবকে বললাম যত ঠান্ডাই পড়ুক, লালবাবার আশ্রমে এই রামের বোতল নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। ঠিক করলাম এখানে পাথরের আড়ালে কোথাও রেখে দিয়ে যাব। আর একটু এগিয়েই, একটা বেশ বড় পাথরে লাল রঙ দিয়ে “VIMAL” লেখা আছে দেখলাম। দু’দিকে যতদুর চোখ যায়, কোন লোকজন চোখে পড়লো না। রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট গর্ত, অনেকটা গুহার মতো হয়ে আছে। সামনে ছোট বড় অনেক পাথর। একটা বড় পাথর সরিয়ে, তার পিছনে বোতলটা সোজা করে রেখে, পাথর দিয়ে আড়াল করে, আমরা আবার এগলাম। হঠাৎ মাধব আমাকে আকাশের দিকে হাত দেখিয়ে বললো “ওটা কী বলতো”? কোথাও কিছু দেখলাম না। ওর চেষ্টায় একটু পরেই জিনিসটা দেখতে পেলাম। এখন বেলা প্রায় দশটা। সমস্ত আকাশ একবারে পরিস্কার নীল। কোথাও সাদা, কালো, এতটুকু মেঘ নেই। চারিদিকে পরিস্কার সূর্যালোক জ্বলজ্বল্ করছে। ডানদিকে পাহাড়ের একটু ওপরে, তারার মতো কী একটা জ্বলজ্বল্ করছে। বরফ নয়, কারণ পাহাড়ের উচ্চতা জিনিসটার অনেক নীচে শেষ হয়ে থেমে গেছে। মেঘ নয়, কারণ কোথাও এতটুকু মেঘ নেই। তাছাড়া ওখানে অতটুকু এবং তারার মতো গোল ও উজ্জল মেঘ হবে না। পাখি নয়, কারণ ওটা একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে। ঘুড়িও নিশ্চয় নয়, কারণ ওটা স্থির ও উজ্জল। তাছাড়া ঐ শৃঙ্গ জয় করে, ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়াবার শখ কারো মনে আসলেও আসতে পারে, কিন্তু ঘুড়ি ওড়াবার চিন্তা পাগল ছাড়া কেউ করবে না। তাহলে ওটা কী? ওটা কী কোন তারা? দিনের বেলা রোদ থাকলেও অনেক সময় চাঁদকে দেখা যায় দেখেছি, কিন্তু তারা? কাউকে বললে আমাদের পাগল বলবে। শেষ পর্যন্ত ওটা কী পদার্থ বুঝতে না পেরে, এগিয়ে যাওয়াই উচিৎ বলে মনে হ’ল। খানিকটা এগিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই পিছন ফিরলাম। বস্তুটা একই জায়গায়, একই ভাবে জ্বলজ্বল্ করছে। হঠাৎ মনে হ’ল এই রাস্তায়, পিছন দিকে ঘুরে তাকিয়ে হাঁটা উচিৎ নয়। বন্ধুদেরও ঐভাবে হাঁটতে বারণ করে, দৃষ্টি সামনে ফেরালাম। রাস্তা এখানে কোন কোন স্থানে, বার থেকে আঠারো ইঞ্চি মতো চওড়া। বাঁপাশে নরম ঝুড়ো মাটির উচু পাহাড়। তাতে ইতস্তত ছোট বড় পাথর। ডানদিকে তরোয়াল দিয়ে এক কোপে কাটা হয়েছে, এরকম প্রায় সমান খাদ নেমে গেছে বহু নীচে গঙ্গায়। পড়ে গেলে ধরবার মতো একটা ছোট আগাছা পর্যন্ত নেই। মাঝেমাঝে, যদি পা পিছলে যায় ভেবে, বাঁপাশের পাহাড়ের দেওয়ালে হাত রেখে, খুব সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে। এখানে রাস্তাও ধুলোয় ভরা, খুব মজবুত বলে মনে হয় না। এতক্ষণে উল্টোদিক থেকে একটা আদিবাসী গোছের লোককে আসতে দেখলাম। তাকে তারার মতো জিনিসটা দেখাবার চেষ্টা করলাম। মিনিট পাঁচেক চেষ্টার পরেও, সে দেখতে পেল না। আমারও আর দেখাবার ধৈর্য রইলো না। আরও বেশ কিছুটা এগিয়ে দেখলাম, কিছু লোক রাস্তা পরিস্কার করছে। এবার একটা ব্রিজ পার হয়ে, গঙ্গার আরও কাছে গেলাম। বোধহয় অন্য কোন ছোট নদীর ওপর দিয়ে ব্রিজটা পার হতে হয়। ব্রিজটা পার হয়েই, বড় বড় অনেক পাথর ফেলা একটা জায়গায় এলাম। কোন রাস্তা নেই। যে রাস্তায় এতক্ষণ হেঁটে আসছিলাম, সেটা ব্রিজ পর্যন্ত এসে হঠাৎ থেমে গেছে। এপারে কোন রাস্তা চোখে পড়ছে না। মাধবকে এদিকটা একটু দেখতে বলে, পাথরগুলোর ওপর উঠে, রাস্তা খোঁজার চেষ্টা করলাম। চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেও, এপারে কোন রাস্তা দেখতে পেলাম না। নীচে ডানদিকে, মাধবও কোন রাস্তা আবিস্কার করতে পারলো না। নীচ থেকে দিলীপ চিৎকার করে আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো, কী করবে। এত রাগ হ’ল কী বলবো। কী আর করবে, একটাই তো কাজ করবার আছে, সেটা রাস্তা খুঁজে বার করা, এবং সেটা নিজেদেরকেই করতে হবে। কারণ এখানে কাছেপিঠে কোথাও কোন লোক নেই। এতক্ষণের এই বার-তের কিলোমিটার পথে, একজন আদিবাসী ও কয়েকজন কুলি গোছের লোকের দেখা মিলেছে, তাও আবার বেশ কিছুক্ষণ আগে। নীচের দিকে নেমে এলাম এবং হঠাৎই খুঁজে পাওয়া গেল, বেশ চওড়া রাস্তাটা। আসলে ব্রিজ পার হয়েই আমরা পাথরগুলোর ওপর রাস্তা খুঁজছিলাম। পাথর ফেলা পাহাড় জাতীয় উচু ঢিবিটার পিছন দিক দিয়েই আবার রাস্তা গেছে।

মাধব ও দিলীপকে পিছনে ফেলে, এগিয়ে গেলাম। বহু দুরে একটা ছোট্ট ব্রিজ। ওটাকে ব্রিজ না বলে সাঁকো বললেই বোধহয় ঠিক বলা হবে। ওটার ওপারে গিয়ে ওদের জন্য একটু অপেক্ষা করলাম। ওদের আসতে দেখে, আবার এগলাম। হাঁটার ইচ্ছা ও আনন্দ যেন ক্রমে কমে যাচ্ছে। আর এইভাবে হাঁটতেও ভালো লাগছে না। একটু দুরে রাস্তার ওপর একটা দোকান বলে মনে হ’ল। বেশ জোরে খানিকটা এগিয়েই বোঝা গেল, ওটা আসলে একটা বড় কালো পাথর। পাশের গাছগুলোর মধ্যে ওটাকে একটা ছোট দোকান ঘর বলে মনে করেছিলাম। ফলে অপেক্ষা না করে সামনে এগিয়ে চললাম। মাধবরা অনেক পিছিয়ে পড়েছে। ওদের আর দেখতেও পাচ্ছি না। বাঁপাশে কাত হয়ে ধুলোর পাহাড় উঠে গেছে। যেন ধুলো জমা করে করে, ওটাকে উচু করে তৈরি করা হয়েছে। আমাদের এখানে যেমন বালি রাখা হয়। তবে এর উচ্চতা অনেক, এবং সেই ধুলো মাটির পাহাড়ে ইতস্তত প্রচুর ছোট বড় পাথর। হঠাৎ দেখলাম একগাদা পাথর গড়িয়ে রাস্তা পার হয়ে, খাদে চলে গেল। পাথরের আঘাতে মৃত্যু না হলেও, মাথা ঘুরে বা গড়িয়ে পড়া পাথরের ধাক্কায় খাদে চলে যাবার সম্ভাবনা যথেষ্ট। এই রকম বিপজ্জনক রাস্তাটা বেশ খানিকটা দুর পর্যন্ত গেছে, এবং সেখান থেকে অনবরত পাথর গড়িয়ে পড়ছে। আসলে একটা ছোট পাথর সরে গেলেই, পরপর ব্যালেন্সে আটকে থাকা সব পাথর, লাইন দিয়ে নেমে এসে, চোদ্দো-পনের ইঞ্চি রাস্তা পার হয়ে, গভীর খাদে গঙ্গার বুকে আশ্রয় নিচ্ছে। মাধবদের এ জায়গাটায় সতর্ক করার জন্য, দাঁড়িয়ে রইলাম। অনেকক্ষণ পরে ওরা এল। ওদের জায়গাটা দেখিয়ে বললাম, খুব তাড়াতাড়ি, পারলে ছুটে জায়গাটা পার হয়ে যেতে। প্রথমে আমি, আমার পিছনে দিলীপ, সব শেষে মাধব। একটু এগতেই, মাধব আমার নাম ধরে চিৎকার করে উঠলো। পিছনে না তাকিয়েও বুঝলাম ব্যাপারটা কী। জোরে ছুটে অনেকটা এগিয়ে গিয়ে পিছন ফিরে দেখলাম, বেশ কিছু ছোট বড় পাথর ঐ জায়গা দিয়ে গড়িয়ে নীচে নেমে গেল। বাঁপাশে ঠিক মতো লক্ষ্য রাখা হয় নি, একটুর জন্য চরম বিপদের হাত থেকে মাধবের জন্য রক্ষা পেলাম। মনে মনে ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে, আবার এগিয়ে চললাম। আস্তে আস্তে ওদের থেকে আবার অনেকটা এগিয়ে গেলাম। ঠিক করলাম আর কোথাও বিশ্রাম নেবার জন্য দাঁড়াবো না। দেখি ভূজবাসা পৌঁছনো যায় কী না। লালবাবার আশ্রমের কোন চিহ্নই কিন্তু চোখে পড়ছে না। এবার রাস্তা হঠাৎ নীচের দিকে গাংগানী-ডাবরানীর রাস্তার থেকেও বেশী অ্যাংগেলে নেমে গেছে। ছুটে নামতে শুরু করলাম। সরু রাস্তা, ছুটে নামায় যথেষ্ট ঝুঁকি আছে, তবু কম কষ্টে তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যাবে। এইভাবে অনেকটা রাস্তা ছুটে নেমে এসে ওদের জন্য দাঁড়ালাম। ওরাও বেশ জোরেই নেমে আসতে শুরু করলো। তবে মাধব ওর পায়ের ব্যথাটার জন্য ভালোভাবে নামতে পারছে না। এবার একটা বাচ্ছা ছেলেকে দেখতে পেলাম। তাকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল যে, লালবাবার আশ্রম এখান থেকে আরও এক কিলোমিটার দুরে। আসলে “ভূজবাসা শুন্য কিলোমিটার” মাইল স্টোন, বেশ খানিকটা আগেই দেখেছি। কিন্তু লালবাবার আশ্রম ঠিক ভূজবাসায় নয়, ভূজবাসা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ দুরে। গোমুখ থেকে দুই-আড়াই কিলোমিটার আগে। পিছনদিক থেকে একজন অল্প বয়সি, সাদা ধুতি সার্ট, সাদা চাদর, সাদা পাগড়ি পরিহিত সাধু এসে আমাদের সাথে মিলিত হলেন। ভদ্রলোকের হাঁটার গতিবেগ, আমাদের থেকে অনেক বেশি। তিনি জানালেন, লালবাবা তাঁর আশ্রমে নেই। গতকাল তিনি গঙ্গোত্রী গেছেন। ওখান থেকে একটা কাজে হরশীল যাবেন। কাজ না মিটলে, তিনি উত্তরকাশী যাবেন। কথায় কথায় জানতে পারলাম, ইনি লালবাবার গুরুভাই, বদ্রীনারায়ণের ওদিকে কোথায় থাকেন। এখন ইনিই আশ্রম দেখাশোনা করবেন। ভদ্রলোক এবার এগিয়ে গেলেন। বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে, বাঁদিকে রাস্তা বেঁকেই নজরে পড়লো, অনেক নীচে টিনের একটা লম্বা ঘর। ওটাই লালবাবার আশ্রম। রাস্তার ওপর বাংলায় লেখা একটা বোর্ড “লাল বিহারী দাসের আশ্রম”। বোর্ডটা দেখলাম “নিতাই” নামে একজন লিখেছে। আশ্রমের বাঁপাশে সবুজ সবজীর খেত। আমরা সোজা রাস্তা ধরে নীচের দিকে নেমে, আশ্রমে এসে পৌঁছলাম।

          BHUJBASA                                                 LAL BABA'S ASHRAM

                    ভূজবাসা                                                                      লালবাবার আশ্রম

বিরাট জায়গা নিয়ে আশ্রম ও সবজী খেত। আশ্রমের প্রায় মাঝখান দিয়ে নালার মতো কাটা, এবং ঐ নালা দিয়ে ঝরনার জল বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মাটির মেঝে, মাঝখান দিয়ে মধ্যে মধ্যে খুঁটি পুঁতে পুঁতে, দু’ভাগে ভাগ করা। একদিকে ছোট্ট মন্দির, অপর দিকে কাঠের আগুনে রান্নাবান্না, হাত সেঁকা চলছে। খুঁটির ওদিকে চটের ওপরে অনেক লোক বসে আছে। ওদিকে গেলাম। এক ভদ্রলোক আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, গঙ্গোত্রীতে আমরা পুলিশের কাছে নাম, ঠিকানা লিখে এসেছি কী না। বললাম ওখানে কেউ নেই। ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা সাদা কাগজের টুকরো বার করে, আমাদের তিনজনের নাম, ঠিকানা লিখে দিতে বললেন। বুঝলাম ইনি পুলিশের লোক। জানা গেল, সমস্ত পান্ডা ও কিছু পুলিশ গেছে সত্যনারায়ণ প্রসাদের শেষকৃত্য করতে। একজন একটা বাঁকাচোরা অ্যালুমিনিয়ামের গ্লাশে, এক গ্লাশ করে গরম চা দিয়ে গেল। চা বললে বোধহয় ভুল বলা হবে, এই মুহুর্তে এটাকে অমৃত বলাই উচিৎ হবে। আমরা জানালাম, এখনই আমরা গোমুখ ঘুরে আসতে চাই। লালবাবার গুরুভাই বললেন, খাওয়া দাওয়া করে যেতে। আমরা তবু বললাম, খেয়ে উঠে হাঁটতে কষ্ট হবে, আমরা বরং ঘুরে এসেই খাব। তিনি জানালেন, অল্প কিছু না খেয়ে যাওয়া উচিৎ হবে না। বাধ্য হয়ে খেয়ে যাওয়াই ঠিক হ’ল। পুলিশের লোকটি আমাদের বার বার সাবধান করে দিয়ে বললেন, অন্তত আধ মাইল দুর থেকে গোমুখ দর্শন করতে। ওখানকার অবস্থা মোটেই ভালো নয়। এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে। যে কোন সময় আবার বিপদ হতে পারে। কথা না বাড়িয়ে বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে, তাই হবে। এবার আমাদের বাঁকাচোরা অ্যালুমিনিয়ামের থালায় ভাত ও ডাল, খেতে দেওয়া হ’ল। অল্প করে খাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এই ভাত আমার দু’দিনের খাবার। বাধ্য হয়ে বলতেই হ’ল, এত ভাত খেতে পারবো না। গুরুভাই বললেন, “খুব অল্পই ভাত দেওয়া হয়েছে, খেয়ে নিন, তা নাহলে শরীর খারাপ হবে”। আমরা আবার বললাম, “এত ভাত এখন খেতে পারবো না, ফিরে  এসে বরং আবার খাব”। ভদ্রলোক একটা খালি থালা নিয়ে আসলেন। আমরা তিনজনেই বেশ কিছুটা করে ভাত তুলে দিয়ে খুব অল্পই ভাত নিলাম। মনে হ’ল খেতে পারবো। কিন্তু শেষে দেখি আর খেতে পারছি না। ফ্যান সুদ্ধ ভাত, অল্প খেলেই পেট ভরে যায়। দিলীপ দেখি লক্ষী ছেলের মতো সব ভাতটা দিব্বি খেয়ে নিল। আমি ও মাধব ওকে আমাদের থেকে একটু তুলে নিতে বললাম। ও রাজি হ’ল না। শেষে বাধ্য হয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধেও ঐ নালার জলে থালা ধুয়ে দিলাম। জলের স্রোতে সব ভাত, ডাল চলে যাবে। এই জলই এখানে পান করা হয়। এবার রওনা দিতে হয়। একটা ব্যাগে এক প্যাকেট খেজুর পুরে নিয়ে, ওয়াটার বটল্ ও লাঠিগুলো নিয়ে, বাকি দু’টো ঝোলা ব্যাগ খুঁটিতে টাঙ্গিয়ে রাখলাম। গুরুভাইকে বললাম, “রাস্তায় প্রয়োজন হতে পারে ভেবে, আমরা কিছু শুকনো চিড়ে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। কাজে লাগে নি। আপনার যদি আপত্তি না থাকে, ওটা রেখে দিতে পারেন”। ভদ্রলোক বললেন, “এখানে কোন কিছু দিয়ে যেতেও মানা নেই, প্রয়োজনে নিয়ে যেতেও মানা নেই”। চিড়ের প্যাকেটটা তাঁর হাতে দিয়ে বোঝামুক্ত হলাম। লালবাবার কথা অনেক পড়েছি, অনেকের কাছে অনেক শুনেওছি। এত কষ্ট করে তাঁর আশ্রমে এসেও, তাঁর সাথে দেখা হ’ল না, তাই মনে একটা দুঃখ থেকেই গেল।

আমরা গোমুখ দর্শনে বেড়িয়ে পড়লাম। সবজী বাগানের মাঝখান দিয়ে সরু রাস্তা পেরিয়ে ওপরের সেই বড় রাস্তায় পড়লাম। লালবাবার একটা টিনের বোর্ডে রাস্তার নির্দেশ দেওয়া আছে। একটু এগিয়েই দেখলাম, কয়েকজন পুলিশের লোক গোমুখের দিক থেকে আসছে। কাছে এসে তারা আমাদের সাবধান করে দিয়ে বললো, আমরা যেন অনেক দুর থেকে দেখি এবং সাদা পতাকার পরে আর না যাই। তারা আরও বললো, আমরা যেন ওপর দিয়ে না গিয়ে গঙ্গার পার দিয়ে যাই, এবং বড় পাথরের ওপর ছোট ছোট পাথর রেখে রাস্তায় চিহ্ন রেখে রেখে যাই, যে কোন্ পথে আমরা গিয়েছিলাম। তাহলে ফিরবার সময় রাস্তা চিনে ফিরে আসতে কোন অসুবিধা হবে না। তাদের সমস্ত কথায় সায় দিয়ে আমরা এগলাম। ভালোই রাস্তা, তবে প্রায় দেড় কিলোমিটার মতো পথ এগিয়েই রাস্তা শেষ। একটু দুরেই সাদা বরফের পাহাড় দেখা যাচ্ছে। ওখান থেকেই গঙ্গার জন্ম। এবার রাস্তা মানে বড় বড় এলোমেলো পাথর ফেলা। প্রায় প্রত্যেক বড় পাথরের ওপরেই ছোট ছোট পাথর রাখা। আগে যারা যারা এপথে এসেছে, যাত্রা পথের বড় পাথরের ওপর ছোট পাথর থাকুক বা না থাকুক, ওদের কথা শুনে বাধ্য ছেলের মতো নিজেরাও ছোট পাথর সাজিয়ে চিহ্ন রেখে গেছে। ফলে এটাই এখন সব থেকে অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারিদিকে খুব কম সংখ্যকই বড় পাথর আছে, যার ওপর ছোট পাথর রাখা হয় নি। যাহোক্, এখানে রাস্তা বলে কিছু নেই। পাথরের ওপর পাথর, তার ওপরে আবার পাথর ফেলে ফেলে, কেউ যেন এই রাস্তা পাহাড় তৈরি করার চেষ্টা করেছে। অনবরত পাথর গড়িয়ে পড়ে, এই রাস্তা বা পাহড়ের নতুন রূপ তৈরি হচ্ছে। আবার পাথর গড়াচ্ছে, আবার নতুন সাজে সাজছে। আমরা আগের রাখা পাথরের চিহ্ন লক্ষ্য করে, সাদা শৃঙ্গের দিকে এগলাম। এইভাবে আধ কিলোমিটার বা তার কিছু বেশি পথ পার হয়ে, সাদা পতাকাটা দেখতে পেলাম। পাথর সাজিয়ে তৈরি, বড় একটা ঢিবির মতো জায়গার ওপরে, লাঠির মাথায় পতাকাটা উড়ছে। পাথর বেয়ে ওপরে উঠলাম। দিলীপ ও মাধবকে বললাম অপেক্ষা করতে। এদিক দিয়ে এগনো সত্যিই বেশ শক্ত ও ঝুঁকির ব্যাপার। বন্ধুরা আমাকে আর এগতে বারণ করছে। ওরা কিন্তু ওখান থেকে এখনও গোমুখের আসল রূপটা দেখতেই পায় নি। কিন্তু ঢিবির ওপর পতাকাটার কাছে গিয়ে, চোখের সামনে গোমুখের রূপ দেখে, না এগিয়ে পারা যায়? গঙ্গার দিকে নেমে একবারে গোমুখের কাছে গেলাম।

WAY TO GOMUKHWAY TO GOMUKH (2)GOUMUKH

       গোমুখ যাবার পথে                     গোমুখ যাবার পথে                    গোমুখ

GOUMUKH (4)GOUMUKH (2)GOUMUKH (3)

                গোমুখ                            গোমুখ                                  গোমুখ

ওরাও এবার একই ভাবে আস্তে আস্তে আমার পাশে চলে এল। ডানদিকে বড় বড় দু’টো গহ্বর, তার বাঁপাশে দু’টো লম্বা লম্বা ফাটল। পুরো জায়গাটা কালো ধুসর রঙের। কিন্তু ওটা আসলে বরফ। বরফের রঙ কালচে সাদা কেন বুঝলাম না। ওপরেই সাদা বরফের চুড়া। আমরা দু’চোখ ভরে এই দৃশ্য শুষে নিলাম। জানিনা এ জীবনে আর দ্বিতীয়বার দেখার সুযোগ পাব কী না। নিজেদের এখন ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছে। সরু গঙ্গা ফাটল থেকে বেরিয়ে, নিজের খেয়ালে বয়ে যাচ্ছে। গঙ্গার মধ্যে অনেক বড় বড় পাথর পড়ে আছে। পাথরের ওপর উঠে অনেক ছবি তুললাম। কিন্তু এখানে গঙ্গার জল অসম্ভব রকমের ঘোলা। পাশে পাশে বরফ জমে আছে। তিনজন তিনটে ওয়াটার বটলে গঙ্গার জল ভরে নিলাম। এখানে কী ভাবে বিপদ হতে পারে, বা সত্যনারায়ণ প্রসাদ ও তাঁর সঙ্গী কী ভাবে বরফ চাপা পড়ে মারা গেলেন, তাও বোঝা গেল না। বরফ ভেঙ্গে পড়লেও তো এখানে ছিটকে আসতে পারে বলে মনে হয় না। কানে শুনতে না পেলেও, বরফ চাপা পড়লেন কিভাবে, রহস্যই থেকে গেল। আসবার পথে গঙ্গার ধারে একটু আগেই একটা শ্মশান দেখেছি। সম্ভবত ওখানেই সত্যনারায়ণ পান্ডাকে শেষবারের মতো ঘুম পারানো হয়েছে। তিনি সত্যিই ভাগ্যবান।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s