কার পাপে ? {লেখাটি গল্পগুচ্ছ , সুপ্ত প্রতিভা-Supto Protibha , Pratilipi Bengali , অক্ষর-Akshar , বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত}

 SRINAGAR (3) এক্সপ্রেস ট্রেনটা প্রবল গতিতে ছুটে চলেছে। দুটি লোয়ার, একটি মিডল্ ও একটি আপার বার্থ নিয়ে একই কিউবিকল্-এ সংরক্ষিত আসন দখল করে, চার জন পূণ্যার্থী যুবক নিজেদের মধ্যে উচ্চৈঃস্বরে গল্পে ব্যস্ত। বড় লোকের সন্তান, সম্ভবত চার বন্ধু। তাদের কথাবার্তা থেকেই জানা যায় যে তাদের পরিবারের সাথে অনেক রাজনৈতিক নেতা, এমনকী কিছু এম.এল.এ. বা এম.পি. ও পরিচিত। এদের মুখের ভাষায় কোন লাগাম নেই, এদের প্রতিটি বাক্যই বিশ শতাংশ অভিধান বহির্ভুত শব্দের বিশেষণে অলঙ্কৃত। অপর দু’টি মিডল্ ও আপার বার্থ একজন অশীতিপর বৃদ্ধ ও তাঁর পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধা স্ত্রীর। দুজনেরই হৃদয়টি উদার হলেও, হৃদযন্ত্রটি মাঝেমাঝেই শারীরিক নিয়ন্ত্রন হারিয়ে তাঁদের অসুবিধা ও অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রথম আলাপেই তাঁরা যারপরনাই মুগ্ধ, ভীত ও আতঙ্কিত। বৃদ্ধটি একটু বিনয়ের সাথেই ওদের একজনকে অনুরোধ করেন যে তাঁরা অত্যন্ত অসুস্থ, বয়েসও অনেক হয়েছে, তাই তারা যদি তাদের নীচের বার্থ দুটো রাতে ওনাদের দু’জনকে ছেড়ে দেন, তাহলে ওনাদের খুব সুবিধা হয়। কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে বড় বড় চুল, কানে দুল পরা যুবকটি মুখ বিকৃত করে বলে ওঠে “উম্ উম্ উম্, দাদুর আজ দিদিমাকে পাশে নিয়ে শোয়ার সাধ হয়েছে রে। কিন্তু দুটো সিঙ্গল বার্থ নিয়ে তো তোমার কিছু লাভ হবে না দাদুভাই, তুমি বরং টি.টি.ই. কে ডেকে একটা ডবল্ বেড বার্থের ব্যবস্থা করে দিতে বলো”।

রাগে লজ্জায় বৃদ্ধের মুখ লাল হয়ে উঠলো, বৃদ্ধা লজ্জায় শাড়ির আঁচলে মুখ ঢাকলেন। বাকি তিনজন যুবক উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলে প্রথম যুবকটি বললো “দ্যাখ, দ্যাখ, দাদু লজ্জা পাচ্ছে। আরে দাদু তোমার মতো বয়স আমাদেরও তো একদিন ছিলো না কী”? বাকি তিন যুবক এরকম একটি রসালো রসিকতায় একে অপরের গায়ে হেসে গড়িয়ে পড়লো। আশপাশের কোন যাত্রীকে কিন্তু প্রতিবাদ করতে দেখা গেল না, বরং তাদের মুচকি মুচকি হাসি বুঝিয়ে দিল, যে তারা এই জাতীয় রসিকতা খুব উপভোগ করছে।

বেশ রাতের দিকে গাড়ি থামলে, পাশের সাইড লোয়ার বার্থে একটি যুবতী এসে তার জায়গা দখল করে শোয়ার আয়োজন করতেই, সেই প্রথম যুবকটি আবার শুরু করলো “কি দিদি এত রাতে আর কষ্ট করে কি হবে, তুমি বরং আমার পাশে চলে এস, ভাগাভাগি করে পাশাপাশি শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দেই। মাইরি বলছি, আমাকে তোমার খারাপ লাগবে না”। যুবকটি এবার বেশ জোরেই গান ধরলো— হাম তুম এক কামরা মে বন্দি হো, আউর চাবি খো যায়। অপর একজন মুখের ভিতর দুটি আঙুল পুরে অদ্ভুত দক্ষতায় তীব্র একটা শিস দিয়ে দিল।

রাতদুপুরের চিৎকারে অনেকেরই ঘুম ভেঙ্গে গেল। দু-চারজন পুরুষ তাদের নিজ নিজ বার্থ থেকেই বিরক্তি প্রকাশ করলে সঙ্গের মেয়েরা বললো এটা ওদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, তাই ঝামেলায় না জড়িয়ে তাদের চুপ করে থাকাই উচিৎ। গভীর রাতে এরকম একটা অবস্থায় যুবতীটিকে সাহায্য করার লোক খুঁজে না পাওয়া গেলেও, চরিত্র নিয়ে সমালোচনা করার লোকের অভাব হলো না। ফলে এত রাতে মেয়েটার একা আসা উচিৎ হয় নি, হাত কাটা ব্লাউজ পরা উচিৎ হয় নি, মুখে ঠোঁটে এত রঙ মাখলে এই অবস্থাই হয়, ইত্যাদি নানা আলোচনার ঝড় বয়ে গেল।

হয়তো কোনরকম প্রতিবাদ না হওয়ায়, যুবকদের মেয়েটিকে বিব্রত করার উৎসাহ আরও বৃদ্ধি  পেল। একটি যুবক উঠে গিয়ে তার হাত ধরে জোর করে টেনে এনে তাদের পাশে বসাবার চেষ্টা করলো। মেয়েটির অনুনয় বিনয়, সাহায্য প্রার্থনা, প্রতিবাদ, কোনটাই যখন কোন কাজে লাগলো না,  তখন সে আত্মরক্ষার্থে ছেলেটির গালে একটা বিরাশি সিক্কার চড় কষিয়ে দিয়ে তার হাতে এক মরণ কামড় বসিয়ে দিল। আহত যুবকটি ভ্যাবাচাকা খেয়ে নিজের ক্ষতস্থান চেপে ধরে বসে পড়লো।

এ হেন গর্হিত কাজ যে একজন মহিলার পক্ষে অত্যন্ত অনুচিৎ কাজ, এবং সে নিজে ঐ যুবকটির জায়গায় থাকলে কি করতো, এই আলোচনায় যখন ট্রেনের কামরা উত্তপ্ত হয়ে উঠলো, তখন আহত যুবকটি লজ্জার হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে বন্ধুদের নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।নিজেকে কোনমতে তাদের হাত থেকে মুক্ত করে, ফুল্লরা মাসির কাছ থেকে শেখা শেষ অস্ত্রটি সে প্রয়োগ  করলো।  মেয়েটি তার পরনের শাড়িটি কোমরের ওপর তুলে ধরলো। রাগে, হতাশায়, চারজন যুবক তার ওপর চড়াও হয়ে তাকে মেঝেয় ফেলে কিল চড় লাথি ঘুঁসি মেরে আধমরা করে ফেললো। একজন আবার এই অবস্থাতেও তার বাবা দেশের কত বড় একজন নেতা, তাদের সাথে চিটিংবাজি করার ফল কী হতে পারে, জানাতে ভুললো না।

পুলিশ এলো। কি ঘটেছিল তা যুবকরাই ফলাও করে বুঝিয়ে দিল। সে যে জোর করে টাকা আদায় করতে অনেকের ওপরেই অত্যাচার করেছে, তাও জানাতে ভুললো না। বাকি সমস্ত যাত্রী দর্শক হিসাবে থাকাটাই পছন্দ করে নিল। পুলিশ রক্তাক্ত আধমরা মহিলাটিকে তুলে নিয়ে যাবার সময় বললো, “হায় রাম, এতো হিজড়া আছে। এ শালারা কোন কামে লাগে না, শুধু জ্বালাতন করে মারে। চল্ একবার, আজ তোকে ট্রেনে উঠে ঝামেলা করার উচিৎ শিক্ষা দেব”। একজন নিরীহ মানুষ, শুধুমাত্র হিজড়ে হয়ে জন্মাবার অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হয়ে গেল। জ্ঞান হারাবার আগে তার শুধু একটা কথাই মনে উদয় হলো, “হিজড়ে হয়ে জন্মাবার অপরাধে বাবা-মায়ের স্নেহ ভালোবাসা থেকে চিরকাল বঞ্চিত হয়েছি, স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাইনি, চাকরি বাকরি তো দুরের কথা, লোকের বাড়ি ঝি-এর কাজ করে পেট চালাবার সুযোগও পাইনি, আজ নিরপেক্ষ বিচার পেয়ে নিজেকে মুক্ত করতে পারবো তো? কাকে এসব বলবো, কেই বা আমার কথা শুনবে? অচ্ছুৎ হিজড়ে ছাড়া আমার তো আর কোন দ্বিতীয় পরিচয় নেই”।

পুলিশ চলে গেল, ট্রেন ছেড়ে দিতে যুবকরা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়ার বৃত্ত তৈরি করলো।

সুবীর কুমার রায়।

১৮-০৮-২০১৬

Advertisements

2 thoughts on “কার পাপে ? {লেখাটি গল্পগুচ্ছ , সুপ্ত প্রতিভা-Supto Protibha , Pratilipi Bengali , অক্ষর-Akshar , বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত}

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s