স্বচ্ছ ভারত অভিযান

SRINAGAR (3)শুধুমাত্র রাস্তাঘাট পরিস্কার রাখাটই একমাত্র স্বচ্ছতার লক্ষণ কী না, আমার ঠিক জানা নেই। তবে কেউ বলেন স্বচ্ছ ভারত অভিযান তো কেউ বলেন ওটা বস্তা পচা খবর, আমার এখানে তিন বছর আগেই এই অভিযান শুরু হয়ে গেছে। তবে হাঁ আমাদের স্বচ্ছতা অভিযানটা যেহেতু আমাদের রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাই এর নামটাও একটু ভিন্ন—নির্মল বাংলা।

নামে কী বা আসে যায়, উদ্দেশ্য এক ও মহৎ। তাই এই অভিযান বিনা আরম্বরে কিছুতেই বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়। তাই একজন দেশের সবথেকে নামী একজন চিত্র তারকাকে দিয়ে পরিস্কার রাস্তার এক ফুট জায়গায় ঝাঁটা হাতে পরিস্কার করার শুটিং করালেন, তো আর একজন অন্য কোনভাবে জনগনের কাছে প্রচার। জানা গেল যে এর ও বহু আগে আর একজনও নাকি নির্মল ভারত যোজনা চালু করেছিলেন। সবাই জনগনের ভালো চান, সবই জনগনের জন্য। আরে বাবা অফ্ দি পীপল্, বাই দি পীপল্, ফর দি পীপল্ কথাটা তো এমনি এমনি আসেনি। অশিক্ষিত জনগনের ঐ এক মহা দোষ, গোটা বেদ বাক্যগুলোর মধ্যে থেকে ঠিক নিজেদের পছন্দের অংশটুকু বেছে নিয়ে চিৎকার করবে, সমালোচনা করবে। অফ্ দি পীপল্, ফর দি পীপল্ নিয়ে যত মাতামাতি করে, তার সিকি শতাংশও যদি বাই দি পীপল্ নিয়ে ভাবতো, তাহলে দেশটার চেহারাই বদলে যেত। এখন তো সবাই ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করে, বাই দি পীপল্-এর অর্থ কী তারা বোঝে না? বাই দি পীপল্, পরিস্কার বোঝা যায় জনগনের দ্বারা। জনগন দেশকে স্বচ্ছ রাখার জন্য নিজেরাই সব পরিস্কার রাখবে, পরিস্কার করবে, এটাইতো স্বাভাবিক। তা না যা শোনে, যা দেখে, সব বিশ্বাস করে কাগজে ছাপায়, সমালোচনা করে। ওগলো যে সব গুজব, অশিক্ষিতগুলো তাও বোঝে না। আর সে ফাঁদে পা না  দেওয়ার  জন্যই তো বলা— গুজব দেখবো না, শুনবো না, বলবো বা ছড়াবো না। তা শুনলে তো সে কথা। সুযোগ সুবিধা শুধু চাইলেই পাওয়া যায় না, নিতেও জানতে হয়। আর শুধু দোষ দিলে আর সমালোচনা করলে চলবে? মনে রাখতে হবে অফ্, বাই, ও ফর—তিনটির পিছনেই পীপল্, অর্থাৎ জনগন শব্দটা লেজের মতো জুড়ে দেওয়া আছে। আর তুমি তো বাপু জনগনেরই অংশ। মোদ্দা কথা হল, দু’পক্ষেরই নিজেদের চারিত্রিক পরিবর্তন না ঘটালে ও সদিচ্ছার অভাব থাকলে, সমস্ত অভিযানই ব্যর্থ হতে বাধ্য। চারটে ঘটনা শুনলেই জলের মতো পরিস্কার হয়ে যাবে যে কী রাজা কী প্রজা, আমরা সকলেই আগেও স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী ছিলাম, এখনতো আছিই, ভবিষ্যতেও থাকবো।

অনেক, অনেকগুলো বছর আগের কথা। তখন চাল নিয়ে আসা যাওয়ার ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি চলছে। ট্রেনের ছাদে, কামরার ভিতর কাঠ বা প্লাইউড খুলে গর্তের ভিতর করে, বা অন্য নানা প্রক্রিয়ায় চাল নিয়ে এসে বিক্রি করার কিন্তু বিরাম নেই। যেকোন দোষ বা পাপ যেমন পুরোহিতকে মূল্য ধরে দিলেই খন্ডন করা যায়, এক্ষেত্রেও সরকারি পুরোহিতদের মূল্য ধরে দিয়েই পাপ বা দোষ খন্ডন করার বেশ সহজ উপায়ই ছিল। তবে পুরোহিত ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায়, দোষ খন্ডনের মূল্যের হার নিয়ে নিত্য গোলযোগ লেগেই থাকতো।

গ্রাম থেকে বহু মহিলা বেশ বড় বড় চালের বস্তা মাথায় করে নিয়ে টলমল করতে করতে শহর ও শহরতলিতে এসে বিক্রি করে নিজের ও পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতো। শুনতাম গ্রামাঞ্চলের মহাজনের কাছ থেকে বাকিতে বা কিছু টাকা অগ্রিম দিয়ে চাল বয়ে নিয়ে এসে বিক্রি করে মহাজনকে তার প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হ’ত, এবং একই প্রক্রিয়ায় প্রায় রোজই চাল নেওয়ার জন্য মূল্য কিছু বেশি দিতে হলেও, এইভাবে চাল নিয়ে আসায় কোন অসুবিধাও দেখা দিত না। স্বল্প হলেও সরকারি পুরোহিতদের পাপস্খলনের মূল্য ধরে দিয়ে, প্রতিদিনের সংসার চালানোর একটা ব্যবস্থাও তারা এইভাবেই সম্পন্ন করতো।

একদিন অফিস টাইমে জনবহুল একটা রেলওয়ে স্টেশনে লোকাল ট্রেন থেকে নেমেই, তারা একটু অন্য চিত্রের সম্মুখীন হ’ল। স্টেশন প্ল্যাটফর্মে বেশ কিছু পুলিশ ও হোমগার্ড, তাদের এহেন গর্হিত অপরাধ দমনে প্রস্তুত। স্টেশনটির তিনটি  লাইন ও দুটি প্ল্যাটফর্ম। প্ল্যাটফর্ম দুটিরই পাশ দিয়ে রেলের অগভীর পাঁকে ভরা ঝিল। ট্রেন থেকে নেমেই, যে যার  বুদ্ধিমতো বাঁচার চেষ্টার প্রয়াস নিল। দু-তিনজন ভারী চালের বস্তা মাথায় নিয়ে টলমল পায়ে দুই প্ল্যাটফর্মের মধ্যবর্তী দুটি লাইন পার হয়েও লাঠি হাতে দেশ রক্ষকদের দেখে সটান চালের বস্তা মাথায় নিয়ে পাঁকে ভরা ঝিলে নেমে, এক কোমর জলে দাঁড়িয়ে কাঁদতে শুরু করে দিল। আর একজন তাদের দেখাদেখি প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রথম লাইনে নেমেই দেখলো দ্বিতীয় লাইন দিয়ে প্রবল বেগে একটি ট্রেন আসছে। চালের বস্তা মাথায় নিয়েই সে ট্রেনটির অতিক্রম করার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। এমন সময় যে লাইনের উপর সে দাঁড়িয়ে আছে সেই লাইনে, উল্টোদিক থেকে একটি ট্রেন  আসতে দেখা গেল। মহিলাটির ঠিক পিছনে পুলিশ ও হোমগার্ড তাকে ধরে দেশ বাঁচাবার জন্য প্রস্তুত। গোটা প্ল্যাটফর্মের যাত্রীরা ভয়ে চিৎকার করে তাকে লাইন থেকে চলে আসতে বললেও, সে চাল হারাবার ভয়ে উঠে আসতে সাহস করলো  না। রক্ষকরা এই অবস্থা দেখেও পিছিয়ে না এসে লাইনের ঠিক পাশে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে রইলো। সামনের লাইন দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে ট্রেন যাচ্ছে, পিছনে কর্তব্যরত পুলিশ ও হোমগার্ড। ফলে কী করা উচিৎ ভেবে না পেয়ে, সে  চালের বস্তা মাথায় নিয়েই লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে রইলো। তীব্র হুইশেল বাজাতে বাজাতে ঐ লাইনের ট্রেনটি দ্রুত গতিতে তার ওপর দিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়ে, দাঁড়িয়ে পড়লো। কোনরকম প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ ছাড়াই দেশহিতৈষী রক্ষকরা তাদের সেদিনের মতো দেশ রক্ষার পবিত্র কর্তব্য সম্পন্ন করে নিশ্চিন্তে, বিনা বাধায় ফিরে গেল। হাতের কাজ সারুন, দেশ আপনিই এগবে পন্থায় বিশ্বাসী অফিস যাত্রীরাও তাদের অফিসের অতি গুরুত্ত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে, ট্রেন  ধরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো। একমাত্র দেশদ্রোহী এক গ্রাম্য মহিলা লাইনের উপর নিথর মাংস পিন্ডের আকারে পড়ে রইলো। একনিষ্ঠ স্বচ্ছ বা নির্মল অভিযানের গুণে, দেশ আসন্ন চরম বিপদের হাত থেকে সে যাত্রায় রক্ষা পেল।

এটাও বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। ব্যস্ত শহরের এক চারমাথা রাস্তার এক পাশে কিছু ড্রাম, শক্ত পিচের টুকরো ও পিচ গলাবার লোহার গাড়ি রাখা আছে। রাস্তা মেরামতির কাজ চলছে বলে রাখা। ঠিক এই এবড়ো খেবড়ো জায়গাটার ওপর একটি ভুট্টাওয়ালা তার ছোট্ট উনন, খানকতক কাঁচা ও খানকতক সদ্য পোড়ানো ভুট্টা, ও তেল নুন লেবু নিয়ে বিক্রির চেষ্টায় বসে। সবকটা ভুট্টা বিক্রি হলেও তার লাভের পয়সা থেকে একজন মানুষের পেট ভরাবার মতো ভাত বা রুটির ব্যবস্থা হওয়াও অসম্ভব। ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে জেলার এস পি অফিস, কোর্ট, জেলা সদর পুলিশ স্টেশন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার মোটর সাইকেল চেপে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এরকম একটা অস্বচ্ছ ঘটনা দেখে আতঙ্কে শিউরে উঠলেন। গাড়ি দাঁড় করিয়ে নেমে এসে পাছে দেশ রসাতলে যায়, তাই ভুট্টা বিক্রেতাকে উঠে যাওয়ার এতটুকু সময় বা সুযোগ পর্যন্ত না দিয়ে রাস্তার ওপর লাথি মেরে উনন উল্টে ফেলে দিয়ে, কাঁচা ও পোড়া ভুট্টাগুলো পায়ের বুট দিয়ে পিষে দিয়ে সেবারের মতো দেশকে অস্বচ্ছতা ও বিপদের হাত থেকে রক্ষা করলেন। আশেপাশের মানুষজন নিশ্চুপ ভাবে সমস্ত পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা সম্বন্ধে সুনিশ্চিত হ’ল। হয়তো ঐ কর্তব্যরত অফিসারটিকে তার অসীম দেশভক্তি, কর্মনিষ্ঠা ও সাহসিকতার জন্য মনে মনে বাহবাও দিল।

বছর আষ্টেক আগে এক ব্যক্তির কলকাতার এক হাসপাতালে ওপেন হার্ট সার্জারি হবে। ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যাওয়ায়, হাসপাতালের ডাক্তাররা সত্বর অস্ত্রোপচার করার পরামর্শ দেন, ও সেইমতো কিছু ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা করিয়ে নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। ঐ ব্যক্তির এক হিতৈষী, তাকে মোটর সাইকেলের পিছনে বসিয়ে কলকাতার এক নামজাদা সংস্থায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলি করাবার জন্য বেশ সকালেই বেরিয়ে পড়ে। কলকাতার রাস্তায় যারা প্রতিদিন গাড়ি বা মোটর সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করেন তারাই ভালো জানেন, কোন রাস্তা কখন কোনদিকের জন্য ওয়ান ওয়ে। অনেক সময়েই দেখা যায়, সকালে যে রাস্তায় যেদিকে যাওয়া যায়, বিকেলের দিকে সেদিকে আর যাওয়া যায় না। তখন উল্টোদিকে যাওয়ার জন্য ওয়ান ওয়ে। যাহোক্ ঐ সকালে ভুল করে একবারে ফাঁকা ওয়ান ওয়ের রাস্তায় ঢুকেই মোটর সাইকেল চালক তার ভুল বুঝতে পেরে গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে ফিরে আসবার চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে একটু দুরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন পুলিশ তাকে দাঁড়াতে বলে। ইচ্ছা করলে গাড়ি ঘুরিয়ে সহজেই পালিয়ে আসা যেত, ওদের পক্ষে  ধরা বা গাড়ির নম্বর নোট করা, কোনটাই সম্ভব হ’ত না। তবু গাড়ির চালক দাঁড়িয়ে পড়ে তাদের সমস্ত ঘটনার কথা  বলে, ভুল স্বীকার করে। সে একথাও জানায় যে ওয়ান ওয়ে সংক্রান্ত কোন বোর্ড না থাকায়, এবং সামনে কোনদিকেই কোন গাড়ি না থাকায়, তার এই ভুল হয়েছে। কিন্তু তাতে চিড়ে না ভেজায়, অসুস্থ ব্যক্তি তার চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্ত কাগজপত্র ও এখানে আসার  কারণ বর্ণনা করে তাদের ফিরে যাবার অনুমতি দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তারা গাড়ি  সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে যতটা আগ্রহী, অন্য কাগজ দেখতে ততটাই অনাগ্রহী। যাহোক্ শেষ পর্যন্ত তাদের করুণার উদ্রেক হওয়ায় চিকিৎসা সংক্রান্ত সব কাগজপত্র দক্ষ চিকৎসকের মতো পরীক্ষা করেন। সবথেকে কনিষ্ঠ পুলিশটি বোধহয় এই গ্রুপের মুখপাত্র। তিনি এগিয়ে এসে বলেন খুবই দুঃখের বিষয়, কিন্তু বউনির সময় কিছু অন্তত দিন। পাপস্খলনের মূল্য হিসাবে পঞ্চশটি টাকা এই সরকারি পুরোহিতদের দেওয়ার পর তাঁরা আর উল্টোদিকে ফিরে না গিয়ে, সোজা এগিয়ে যেতে বলেন। শুধু তাই নয়, খুব সাবধানে যাওয়ার পরামর্শ দিতেও ভোলেন না। তরুণ প্রজন্মের এক সদাসতর্ক বীর, সাহসী, স্বচ্ছ দেশ রক্ষকের প্রচেষ্টায়, দেশ অস্বচ্ছতার কালিমার হাত থেকে সেবার কোনমতে রক্ষা পেল।

এবার একটা অন্য ঘটনা বলি। এটাও অনেক বছর আগেকার ঘটনা। একটি তিনমাথা ব্যস্ত বাসরাস্তার মোড়ে এক ব্যক্তি ধোপদুরস্ত পোষাক পরে এক ছড়া পাকা সিঙ্গাপুরি কলা হাতে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। সকাল থেকে এক নাগাড়ে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তা কর্দমাক্ত। দইয়ের মতো কাদা ও পাশের নর্দমার পাঁকে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পরেও বাস না আসায় ঐ ব্যক্তি একটি কলা ছাড়িয়ে খেয়ে রাস্তার ওপর খোলাটি ছুঁড়ে ফেললেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি প্রতিবাদ করে কলার খোলাটি রাস্তা থেকে তুলে পাশের নর্দমায় ফেলে দিতে অনুরোধ করলেন। ঐ ব্যক্তিটি তখন দ্বিতীয় কলাটি খেতে খেতে বললেন— “ও কিছু হবে না, বাসের চাকায় রাস্তার সাথে মিশে যাবে”। আশেপাশের  সমস্ত লোক বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে মজা দেখছেন। তাঁদের আচরণেই বোধহয় প্রথম ব্যক্তিটি বারকতক হাত দুলিয়ে, দ্বিতীয় কলার খোলাটিও টিপ করে প্রথম খোলাটির ঠিক পাশেই ছুঁড়ে ফেললেন। আশেপাশের সমস্ত লোক বাস বিলম্বে আসার শোক ভুলে, এই নাটকের পরবর্তী অংশটি দেখার ও শোনার জন্য হাসিহাসি মুখে একমাত্র প্রতিবাদকারী ব্যক্তিটির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। প্রচন্ড অপমানে প্রতিবাদকারী এবার বেশ কড়া সুরে প্রথম ব্যক্তিটিকে রাস্তা থেকে  কলার খোলাদু’টি তুলে পাশের নর্দমায় ফেলে দিতে বলে বললেন, “আপনি কলা খেয়ে রাস্তায় খোলা ফেলবেন, আর অন্য লোক সেই খোলায় পা দিয়ে আছাড় খাবে”? তাঁর মনে একটা ভয় ছিল এরপরও যদি কলার খোলাদুটি রাস্তা থেকে  তুলে ফেলা না হয়, তাহলে তিনি কী করবেন। এতগুলো লোকের হাসি ঠাট্টার খোরাক হবেন, না নিজেই কলার খোলাদু’টি রাস্তা থেকে তুলে পাশের নর্দমায় ফেলে দিয়ে, নিজেকে গান্ধিজীর দেশের যোগ্য নাগরিক হিসাবে পরিচিত হবেন? কিন্তু সেসব কিছুই হল না। খোলাগুলো ঠিক গরু ছাগলে খেয়ে নিত বা বাসের চাকায় থেঁতো হয়ে যেত— বলতে বলতে ঐ ব্যক্তি নীচু হয়ে রাস্তা থেকে কাদামাখা কলার খোলাদু’টো কুড়িয়ে পাশের নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।  প্রতিবাদী ব্যক্তিটিও নিশ্চিন্ত হয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন।

কিন্ত আশেপাশের উৎসাহিত দর্শকরা এরকম একটি ছোট্ট একাঙ্ক পথনাটিকা দেখবার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁদের টেলিপ্যাথির জোরেই বোধহয় ঠিক সেই সময় এক ব্যক্তির আবির্ভাব হ’ল। তিনি বোধহয় শুধুমাত্র প্রতিবাদীকে বিপদে ফেলার মানসেই, অকুস্থলে কলা খেয়ে খোলাটা রাস্তায় ফেলার জন্য হাজির হলেন। তিনি এসে পাশে দাঁড়িয়েই একটি কলা খেয়ে খোলাটি যত্ন সহকারে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেললেন। এবার কিন্তু সেই প্রথম ব্যক্তি ও আশপাশের দর্শকবৃন্দ নাটকের পরবর্তী অংশের জন্য প্রতিবাদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রতিবাদীর অবস্থা সঙ্গিন, তিনি যদি এই নতুন আগুন্তুককে কিছু না বলেন, তাহলে প্রথম ব্যক্তি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে কিছু বলতে পারেন, আবার এই নতুন আগুন্তুককে কলার খোলাটি রাস্তা থেকে তুলে পাশের নর্দমায় ফেলতে বললে, আশেপাশের লোকেরা নির্ঘাত তাঁকে মিউনিসিপালিটির রাস্তা থেকে কলার খোলা তুলে ফেলার অফিসার ভেবে বসতে পারেন। তাই কলার খোলা রাস্তাতেই পড়ে থাকলো, তিনি সেখান থেকে চলে গিয়ে কোনমতে নিজের সম্মান বাঁচালেন। এবার কিন্তু অভাগা দেশ অস্বচ্ছতার কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গেল।

সুবীর কুমার রায়।

১৫-০৯-২০১৫

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s