তুঙ্গনাথ-চন্দ্রশিলা {লেখাটি Tour & Tourists পত্রিকায় প্রকাশিত}

DSCN9767সেই ১৯৮৫ সালে শেষ ট্রেক করে সান্ডাকফু-ফালুট গিয়েছিলাম। তারপর এই একত্রিশটা বছরে শরীরের ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। চাকরি সুত্রে প্রত্যন্ত গ্রামে গঞ্জে থেকে, অনিয়ম অনাহারে,  বয়সের ভারে, বুক ও হৃদয়ের ওপর ছুড়ি-কাঁচির প্রয়োগে, শরীরও ভেঙ্গেছে যথেষ্টই। নতুন করে ট্রেক করার পরিবর্তে কালি কলমের সাথে বন্ধুত্ব করে, পুরানো স্মৃতিগুলোকে ঘষামাজা করে জাবর কেটে, এতগুলো বছর কেটে গেছে। অবশ্য এতগুলো বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছি, লেখালিখির সুবাদে বিভিন্ন পত্রিকা বা ভ্রমণ সংক্রান্ত গ্রুপের সাথে পরিচয়ও হয়েছে। কিন্তু মন ও দেখার ইচ্ছাটার বয়স বোধহয় বিশেষ বাড়ে নি। তবু সুযোগ, সঙ্গী ও শাসনের বেড়াজাল টপকে ট্রেক করার চিন্তাটা প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম। তাই ট্যুর অ্যান্ড ট্যুরিস্টস্ নামে একটি গ্রুপ যখন তাদের অষ্টম গ্রুপ ট্যুরে অংশ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করে, তখন প্রত্যক্ষ পরিচিতি না থাকলেও সুদীপ্ত, হিমাদ্রি, রক্তিম, অমলেন্দু, সুদীপ, ঋদ্ধিমান, বিভাস, নবীন, মোহিনী, সায়ন্তিনী, ও সোমা, এই এগারো জন সদস্যের সাথে আমিও চৌষট্টি বছর বয়সে, নিজেকে যুক্ত করে ফেললাম। অবশ্য এর আগে ২০১১ তে গুজরাটের জুনাগড়ের এক মন্দিরে অনেক সিঁড়ি ভেঙ্গে ও গতবছর লে-লাদাখ ভ্রমণ করে, নিজের শারীরিক সক্ষমতার একটা ধারণা করে নেওয়াই ছিল।

প্রায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে রেলের যাতায়াতের টিকিট, হরিদ্বার থেকে গাড়ির ব্যবস্থা, বিভিন্ন জায়গায় থাকার ব্যবস্থা পাকা করা, ইত্যাদি কাজগুলো সুদীপ্ত ও মোহিনীই সুষ্ঠ ভাবে সুসম্পন্ন করে ফেললো। তুঙ্গনাথে একটা রাত না থাকলে চন্দ্রশিলার সেই বিরল সৌন্দের্যের সূর্যদয় দেখার সুযোগ হয় না। অনেকেই বেলার দিকে চন্দ্রশিলা ঘুরে আবার ফিরে আসেন, কিন্তু তাতে চন্দ্রশিলার সৌন্দর্য উপভোগ করলেও, সূর্যদয়ের স্বাদ থেকে তাঁরা বঞ্চিত হন। অথচ এই তুঙ্গনাথে কালী কমলির চারটি ঘরের আশ্রম ছাড়া, আর থাকার জায়গা নেই বললেই ঠিক বলা হয়। আঠারোই জুলাই আমি, রক্তিম ও বিভাস, সকাল সাড়ে ন’টা থেকে কলকাতার স্টিফেন হাউস-এ লাইন দিয়ে ঘরপিছু দেড়শ’ টাকা ভাড়ায়, চারটি ঘরই আমাদের দখলে আনার ব্যবস্থা করে, বিকাল প্রায় পাঁচটার পর বাড়ি ফিরি। মোহিনী ও সুদীপ্তও আমাদের সাহায্য করতে কিছু পরে ওখানে হাজির হয়ে আমাদের সাথে শেষপর্যন্ত ছিল। এক সপ্তাহ পরে পাকা রসিদও রক্তিম সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। এবার শুধু শুভ দিনের অপেক্ষা।

এই ট্যুরে বারোজন মাত্র অংশ গ্রহণ করতে পারবে, এবং সেইমতো যাতায়াতের টিকিট, থাকার ব্যবস্থা, গাড়ির ব্যবস্থা ইত্যাদি করা হয়। এই গ্রুপের আরও দুই সদস্য-সদস্যা, সৌমি ও তার স্বামী অর্পনের অনেক পরে হঠাৎ এই একই পথে যাবার ইচ্ছা জাগায়, তারা একই লোকের অন্য একটি ছোট টাটা ইন্ডিগো গাড়ি এখান থেকেই পনেরো হাজার টাকা ভাড়ায় বুক করে। তারা যেহেতু এই গ্রুপের সদস্য হলেও গ্রুপ ট্যুরের অংশীদার নয়, তাই তারা আলাদা থাকবে, আলাদা খাবে, আলাদা গাড়িতে যাতায়াত করবে। কিন্তু তারা আমাদের সাথে হাঁটতে চেয়ে অনুরোধ জানালে, সকলেই রাজি হয়। সেইমতো তারা তৎকালে টিকিট কেটে আগের দিনই হরিদ্বার গিয়ে উপস্থিত হয়। ফেরার টিকিটও তৎকালে কেটে নেবার ব্যবস্থা পাকা করে নেয়।

নির্দিষ্ট দিনে, অর্থাৎ বারোই অক্টোবর ২০১৬, পিঠে ব্যাকপ্যাক নিয়ে যখন হাওড়া স্টেশনে পৌছলাম, তখনই বুঝতে পারলাম বয়স হয়েছে, হৃদয় আর আগের মতো পরিশ্রম করতে রাজি হচ্ছে না। বিভাসের ওপর সমস্ত পথের টুকটাক খাবার, যথা বাদাম, বিস্কুট, চকোলেট, আমসত্ত্ব, ইত্যাদি কিনে নিয়ে যাবার দায়িত্ব ছিল। সে প্রত্যেকের হাতে গ্রুপের লোগোর ছবি যুক্ত একটা করে বাক্স ধরিয়ে দিল। ১২৩৬৯ আপ কুম্ভ এক্সপ্রেস কিছু বিলম্বে ছাড়লো। গ্রুপের সবার প্রিয় বিমান ভট্টাচার্যের দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা দেখে অবাক হলাম। আমাদের অনেক সহযাত্রীর আগেই সে আমাদের বিদায় জানাতে হাওড়া স্টেশনে এসেছে, এবং ঘন্টা খানেক বিলম্বে ট্রেন ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের সঙ্গ দিয়েছে। এইজন্যই বোধহয় সে সকলের এতো প্রিয়, এতো কাছের মানুষ। তাকে ধন্যবাদ জানালাম। ধন্যবাদ জানাই শুভময় সেনগুপ্ত ও সহযাত্রিণী মোহিনীর স্বামী, সুদীপ দাসগুপ্তকে। ওরা দুজনেও শেষপর্যন্ত শুধুমাত্র ভালোবাসার টানে ট্রেন না ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের ছেড়ে এক পা-ও নড়ে নি। যাইহোক, সমস্ত পথটা হৈচৈ করতে করতে গেলেও, মনের ভিতর একটা আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছিল— আমি শেষ পর্যন্ত সবাইকে ডোবাবো নাতো, বিপদে ফেলবো নাতো?

        howrah-station-2        at-howrah-station        at-howrah-station-2

হাওড়া রেলওয়ে স্টেশন              হাওড়া রেলওয়ে স্টেশন             হাওড়া রেলওয়ে স্টেশন

আজ তেরই অক্টোবর। প্রায় ঘন্টা খানেক বিলম্বে যখন হরিদ্বার গিয়ে পৌঁছলাম, তখন গ্রুপ লিডার সুদীপ্ত স্টেশনে এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ও সেপ্টেম্বরের আঠাশ তারিখে অন্য একটা ট্রেক করতে চলে গিয়েছিল, সেই ট্রেক সুসম্পন্ন করে, আগের দিন হরিদ্বার ফিরে আমাদের অপেক্ষায় ছিল। ও ভালোভাবে সুস্থ শরীরে ফিরে না আসা পর্যন্ত ওকে নিয়ে মনে মনে একটা চিন্তা ছিলই, ঝাঁকের কই সুস্থ শরীরে ঝাঁকে ফিরে এসেছে দেখে নিশ্চিন্ত হ’লাম। গ্রুপের অপর এক সদস্য, সুদীপও আগের দিন এসে হরিদ্বার পৌঁছে, আমাদের হোটেলের কাছেই অন্য একটা হোটেলে উঠেছে। একই ট্যুরের অংশীদার হয়েও আলাদা ভাবে আগের দিন চলে আসার কারণটি কিন্তু অজানাই রয়ে গেল। হয়তো বিনা বাতানুকুল কামরায় তার স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব হ’ত। যাহোক, দু’টো অটো নিয়ে আমরা  নির্ধারিত হোটেল ‘সিটি ডিলাক্স্’ এ এসে হাজির হ’লাম। যে যার নির্ধারিত ঘরে গিয়ে, একটু বিশ্রাম নিয়ে, স্নান সেরে হর কি পৌরি ঘাটে গিয়ে হাজির হওয়া গেল। সন্ধ্যারতি অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তবে সঙ্গী হিমাদ্রির জিলিপি সহযোগে রাবড়ির আপ্যায়নে, সেই শোক অনেকটাই প্রশমিত হ’ল। ভিড় ঠেলে খানিক ঘুরে ও ছবি তুলে হোটেলে ফিরে এলাম। পথশ্রমে সবাই শ্রান্ত, তাছাড়া আগামীকাল সকাল ছ’টায় চোপ্তার উদ্দেশ্যে বেরতে হবে, তাই ডাইনিং হলে রাতের খাবার খেতে গিয়ে জানা গেল, যে দু’জনের এই হোটেলের খাবারের থেকে বাইরে গিয়ে পছন্দ মতো খাওয়ার আগ্রহ অনেক বেশি হওয়ায়, তারা বাইরে কোথাও রাতের খাবারের সন্ধানে গেছে। যাইহোক তারা ফিরে আসার কিছু পরে নিজ নিজ ঘরে বিছানায় আশ্রয় নেওয়া গেল।

         hardwar-7          hardwar-1          hardwar-17

                                                                   হরিদ্বার

আজ চোদ্দই অক্টোবর। চা খেয়ে সকাল ছ’টার মধ্যে সবাই প্রস্তুত হয়ে নিলেও, গাড়ির দেখা মিললো না। বাইশ হাজার টাকার চুক্তিতে এই গাড়ি হরিদ্বার থেকে চোদ্দ তারিখ সকালে আমাদের নিয়ে সমস্ত জায়গা ঘুরে উনিশ তারিখ রাতে হরিদ্বার ছেড়ে দেবে। এখান থেকে যথেষ্ট টাকা তাকে অগ্রীম হিসাবে পাঠানোও হয়েছিল। বার বার ফোন করে তাড়া দেওয়ার পর, দু’ঘন্টা বিলম্বে শ্রীমান টনি তার UK 08 PA 1104 নম্বর টেম্পো ট্রাভেলার গাড়ি নিয়ে হোটেলের সামনে এসে হাজির হ’ল। গাড়িটার স্বাস্থ্য বেশ ভালো ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। গাড়িতে সমস্ত মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে একসময় আমরা চোপ্তার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সৌমি ও অর্পনকে নিয়ে তাদের টাটা ইন্ডিগো গাড়িটিও আমাদের গাড়ির পিছনেই ছুটতে শুরু করলো।

বেশ কিছু পরে আমরা অলকানন্দার তীরে ‘বিয়াস’-এ একটা দোকানে চা জলখাবার খেয়ে নিলাম। আলুর পরোটা, তরকারি ও চা। ডিম না থাকায় পাশের দোকান থেকে অমলেট ভাজিয়ে নিয়ে আসাও হ’ল। কিন্তু আলুর পরোটার মান অত্যন্ত নিম্নমানের হওয়ার অপরাধে, আমাদের এক সঙ্গী তার দোকানের একটা চায়ের কাপ গাড়িতে অ্যাশট্রে হিসাবে ব্যবহার করার জন্য সবার অলক্ষে সঙ্গে নিয়ে নিলো ।

মাত্র এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েই সঙ্গিনী সোমা, সেই GUINNESS BOOK OF WORLD RECORDS এ নাম তোলার ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেললো। গাড়ির ডান দিকের আসনে বসে হাত নাড়ার কায়দায় বাম দিকের জানালা দিয়ে তার হাতের মোবাইলটি সকলকে টাটা করে বাইরে চলে গেল। দক্ষ সঙ্গী বিভাস একনাথ সোলকারের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েও, তার গতি রোধ করতে ব্যর্থ হ’ল।  অগত্যা গাড়ি দাঁড় করিয়ে তাকে খুঁজে পেতে নিয়ে আসা হ’ল, তবে তখন সেটা তিনটি অংশে পরিণত হয়েছে। আরও প্রায় আঠাশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ‘দেবপ্রয়াগ’ এসে হাজির হলাম। ক্রমে কীর্তিনগর, শ্রীনগর, অগস্তমুনি, ভিরি, কেন্দু অতিক্রম করে, সন্ধ্যার মুখে চোপ্তা শহর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার ছাড়িয়ে, ‘HIMALYAAN BIRDS RESORT(CHOPTA BULKAN)’ হোটেলে  এসে হাজির হওয়া গেল। ঘরপ্রতি পাঁচশ’ টাকা ভাড়ার চলনসই হোটেলটির আপ্যায়ন মনে রাখার মতো। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ঘরের সামনের ছোট্ট ফাঁকা জায়গাটায় সবাই জড়ো হলাম। ততক্ষণে ঐ জায়গায় গোল করে চেয়ার পেতে, কর্তৃপক্ষ বনফায়ারের আয়োজন সুসম্পন্ন করে রেখেছেন। এখানে বিদ্যুৎ নেই, বেশ কিছুক্ষণ চাঁদের ও কাঠের আগুনের আলোয় গান গেয়ে, হাসি ঠাট্টা করে কাটানো গেল। কাল বেশ ভোরে আমাদের তুঙ্গনাথ যাওয়ার কথা। আমরা তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশিলার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু ব্যাকপ্যাকে গুছিয়ে নিলাম। আগে যদি জানতাম যে সায়ন্তনী আলমারির মতো ওরকম একটা ঢাউস সুটকেস সঙ্গে নিয়ে আসবে, তাহলে আমাদের আর কষ্ট করে ব্যাগ বয়ে আনার প্রয়োজন হ’ত ন। ওর সুটকেসে হেসেখেলে খান তিনেক লাশ ঢুকিয়ে নেওয়া যায়। হোটেল কর্তৃপক্ষ আমাদের সকলের অপ্রয়োজনীয় মালপত্র একটা ঘরে রেখে যেতে বললেন। আগামী পরশু আমাদের গাড়ি এই পরিতক্ত মালপত্র গাড়িতে তুলে প্রায় দুই কিলোমিটার দুরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে, কারণ ওখান থেকেই তুঙ্গনাথ যাওয়ার যাত্রাপথের শুরু। কিছুটা সময় কাটিয়ে আমরা দোতলার ডাইনিং হলে সৌরবিদ্যুতের আলোয় রাতের খাবার খেয়ে এসে, যে যার নির্ধারিত ঘরে গিয়ে নরম কম্বলের তলায় আশ্রয় নিলাম।

আজ পনেরোই অক্টোবর। বেশ ভোরো চা খেয়ে, বালতি করে দিয়ে যাওয়া গরম জলে স্নান করে, প্রাতরাশ সেরে, হোটেলের বিল মিটিয়ে, গাড়িতে উঠে বসলাম। নির্দিষ্ট জায়গায় নেমে লাঠি সংগ্রহ করা হ’ল। বেশ মজবুত লাঠির জন্য পঞ্চাশ টাকা দিতে হ’ল। ফেরার পথে লাঠি ফেরৎ দিলে ত্রিশ টাকা ফেরৎ পাওয়া যাবে। পিঠে ব্যাকপ্যাক নিয়ে সকাল ন’টা পনেরোর সময় আমাদের তৃতীয় কেদার, তুঙ্গনাথ দর্শন পালার শুভ সুচনা হ’ল। এখান থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার হাঁটা পথ। আমাদের মধ্যে দু’তিনজন তাদের মালপত্র একটা খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও, বাকিরা নিজেদের মালপত্র নিজেরাই বয়ে নিয়ে হাঁটা শুরু করলো। খচ্চরের মালিককে সাতশ’ পঞ্চাশ টাকা দিতে হবে। পাথর ও স্ল্যাব ঢালা পথ বেশ খাড়াই ও মাঝেমাঝেই সিঁড়ি ভাঙ্গতে হলেও, আদপেই বিপজ্জনক নয়। বেশ কিছু পথ পার হয়ে, একসময় ‘ভুজগলি বুগিয়াল’-এ আসা গেল। এখানে চায়ের দোকান থেকে গরম চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে চৌখাম্বা, নন্দাদেবী, নীলকন্ঠ, কেদারনাথ পিক্ দেখার স্বর্গীয় সুখ ও আনন্দই আলাদা। রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে এখানকার নৈসর্গিক শোভা দেখে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হ’ল।

on-the-way-to-tungonath         on-the-way-to-tungonath-4          on-the-way-to-tungonath-5

                                                  চোপ্তা থেকে তুঙ্গনাথ যাওয়ার পথে

যাইহোক, আমরা যখন আরও অনেক পথ পার হয়ে প্রায় তুঙ্গনাথের দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত, তখন সঙ্গী রক্তিম ঘোষণা করলো, যে সে কালী কমলি ধর্মশালার ঘর বুকিং এর কাগজটা চোপ্তার হোটেলে ফেলে এসেছে। প্রায় তিন মাস আগে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত লাইন দিয়ে তাদের চারটি ঘরের চারটিই আমাদের জন্য বুক করা হয়েছিল। দুশ্চিন্তা নিয়ে আরও অনেক পথ, অনেক সিঁড়ি ভেঙ্গে অবশেষে দুপুর প্রায় একটার সময় ১২০৭৩ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত পৃথিবীর উচ্চতম শিব মন্দির, তৃতীয় কেদার তুঙ্গনাথ এসে পৌছলাম। বুকিং এর জেরক্স কপি আমাদের সাথেই ছিল, কোন অসুবিধা হ’ল না। দোতলা বাড়িটির উচ্চতা অত্যন্ত অল্প হলেও ওপরে দুটি ও নীচে দুটি ঘর আছে। ওপরের ঘরগুলোয় অ্যাটাচ বাথ, নীচের ঘরদুটোর পাশে পরপর দুটো বাথরুম, তবে এই বাথরুম দুটি অলিখিত ভাবে তুঙ্গনাথের সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য বোধহয় অনুমতি দেওয়া আছে। মালপত্র গুছিয়ে রেখে পাশের দোকানে চা খেতে গেলাম। এই দোকানটির একটি অতি ছোট ঘরে সৌমি ও অর্পনের থাকার ব্যবস্থা, চোপ্তার হোটেল থেকে সকালে একজন এসে করে দিয়ে গেছে। অন্ধকার ঘরটায় টর্চ হাতে না থাকলে স্পষ্ট ভাবে কিছু দেখা প্রায় অসম্ভব, তবু দেখলাম অতটুকু ঘরে তিনটি বেডের ব্যবস্থা করা আছে। শুনলাম ঘরটির ভাড়া ছয় শত টাকা। যাহোক্, মন্দির দর্শন করে, এদিক ওদিক ঘুরে, সূর্যাস্ত দেখে ঘরে ফিরে আসা হ’ল। অবাক হলেও ভালো লাগলো তুঙ্গনাথ মন্দিরের কাছে কন্যা ভ্রুণ হত্যা না করার আবেদনের বোর্ডটি দেখে। আজ লক্ষ্মীপূজো, চারিদিক জ্যোৎস্নালোকে ভেসে যাচ্ছে। রাতে আমরা ঘরের পাশেই একটা দোকানে রাতের খাবার ও কফি খেয়ে ঘরে ফিরে এলাম।

tungonath-kali-kamli-ashram

        tungonath-6               on-the-way-to-chandrashila

কালী কমলি ধর্মশালা                              তুঙ্গনাথ মন্দির                              চন্দ্রশিলা যাবার পথ

আজ ষোলোই অক্টোবর। অন্ধকার থাকতে টর্চ নিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দুরে চন্দ্রশিলার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বিভাস চন্দ্রশিলায় যাবে না ঠিক করে শুয়েছিল, কিন্তু আমাদের সবাইকে তৈরি হয়ে বেরতে দেখে মুহুর্তে তৈরি হয়ে দলে ভিড়ে গেল। গতকাল সুদীপ্ত একটি স্থানীয় লোককে পাঁচশ’ টাকায় গাইড হিসাবে ঠিক করে রেখেছিল। ধর্মশালার বাইরে রাস্তার ওপর গাইড আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। মন্দিরের ঠিক পাশ দিয়েই চন্দ্রশিলা যাবার পথ। পর্যটকদের চিনবার সুবিধার্থে পথনির্দেশের একটি বোর্ডও লাগানো আছে। অন্ধকারে টর্চের আলোয় পথ চলতে বিশেষ অসুবিধা হচ্ছে না, তবে নড়বড়ে ছোট বড় আলগা পাথুরে রাস্তা বেশ খাড়াই ও পিচ্ছিল। আজ সঙ্গে কোন লাগেজ না থাকায় অসুবিধা অনেকটাই কম। আমরা ধীরে ধীরে পাথুরে রাস্তা ভেঙ্গে এগিয়ে চললাম। পাশে রোডোডেন্ড্রন গাছের জঙ্গল, তবে এখন ফুলহীন। মাঝে মোহিনীর পথ চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারলাম। ওকে একা এই অবস্থায় ছেড়ে দিয়ে আমি এগিয়ে যেতেও পারছি না। মোহিনীর সবুজ রঙের ব্যাকপ্যাকটায় কি এমন সোনার খনি লুকানো আছে জানি না, ও সেটা কাউকে দিতে রাজি নয়, এখনও সেটা পিঠে নিয়ে এসেছে। অনেকবার ওকে ব্যাকপ্যাকটা আমায় দেওয়ার কথা বললেও ও কিছুতেই আমায় ওটা বইতে দিতে রাজি হ’ল না। ব্যাকপ্যাক নিজের পিঠে নিয়েই ‘প্রাণ যায় পর ব্যাকপ্যাক না যায়’ মনোভাব দেখিয়ে, উঠবার চেষ্টা করছে। সুদীপ্ত এইসব রাস্তায় যথেষ্ট অভিজ্ঞ, তাছাড়া ওর পিঠে মাল বওয়ার ক্ষমতাও যথেষ্ট। ও আর সবার সাথে বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে গেছে। শেষে চিৎকার করে সুদীপ্তকে ডেকে টর্চের আলোর ইশারায় আমাদের কাছে ফিরে আসতে ইঙ্গিত করতে, কোনরকম বিপদের আশঙ্কায় ও দ্রুত নীচে নেমে আসতে শুরু করলো। এমন সময় পিছনে গাইড সোমার সঙ্গে এসে উপস্থিত হ’ল। গাইডকে ব্যাকপ্যাকটা দিয়ে দিতে বললেও মোহিনীর বিশেষ ইচ্ছা দেখা গেল না। শেষে একপ্রকার আমার ধমক খেয়েই গাইডকে ব্যাকপ্যাকটি দিতে বাধ্য হয়ে, আবার এগিয়ে চললো। একসময় আমরা নির্বিঘ্নে চন্দ্রশিলার চূড়ায় এসে হাজির হ’লাম। সামান্য কিছু মানুষ আমাদের আগেই ক্যামেরা হাতে এসে উপস্থিত হয়েছেন। অত্যন্ত ঠান্ডা ও আলো-আঁধারিতে চন্দ্রশিলায় এখন এক মায়াবী পরিবেশ বিরাজ করছে। শোনা যায় রাম চন্দ্র রাক্ষসরাজ রাবণকে পরজিত করে এখানে এসে ধ্যান করেছিলেন। ১৩১২৩ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই চন্দ্রশিলায়, বাম দিকে লালচে চাঁদ টাটা সী ইউ বলে পাহাড়ের কোলে ঢোলে পড়বার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ডান দিকে প্রভাত রবি তাকে বিদায় জানাবার জন্য আগমন সংকেত দিচ্ছেন। এবার শুধু মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে হিমালয়ের ৩৬০ ডিগ্রি সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। একসময় পাহাড়ের মাথায়, চন্দ্র চন্দ্রশিলাকে বিদায় জানিয়ে পাহাড়ের পিছনে ডুব দিলেন। ডানদিক থেকে নন্দাদেবী, নন্দাঘুন্টি, কামিট, পালকি, ত্রিশুলের ওপর ধীরে ধীরে সূর্যদেব তাঁর স্নেহের পরশ দিতে শুরু করলেন। এতক্ষণ নীলকন্ঠ, চৌখাম্বা, সুদর্শন, মেরু-সুমেরু, কেদার ডুম, কেদার পিক্, শিবলিঙ্গ পর্বতচূড়ারা বিধবার বেশে দর্শন দিয়েছিলেন। সূর্যদয়ের ব্রাহ্ম মূহুর্তে একে একে সবাই লাল, হলুদ, গেড়ুয়া রঙের পোষাক পরে আবির্ভুত হয়ে সূর্যদেবের আশীর্বাদ গ্রহণ করে, নিজেরা ধন্য হয়ে আমাদেরও ধন্য হতে সাহায্য করলেন। আরও কিছু সময় কাটলো, আরও অনেক ছবি তোলা হ’ল, এবার ফেরার পালা। অতএব হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে। অনেকেই নীচে গিয়ে তুঙ্গনাথের পূজো দেবে, তারপর প্রাতরাশ সেরে মালপত্র নিয়ে চোপতা ফেরা। আজই আমরা উখিমঠ চলে যাব। বাড়ি থেকে আসার সময় রক্তিম একটা নারকেল নিয়ে এসেছিল। চন্দ্রশিলায় সেটা আছাড় মেরে ভেঙ্গে ও পাথরের ওপর পাথর সাজিয়ে ও তার মনোবাঞ্ছা পুরণের প্রার্থনা জানালো। নারকেলটা নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় ছিলাম, শেষপর্যন্ত সেটা আমার মাথায় আছাড় না মারায় চিন্তামুক্ত হয়ে ওকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, গঙ্গা মন্দির দর্শন করে আমরা ধীরে ধীরে নীচে নামতে শুরু করলাম।

chandrashila-36        chandrashila-11  chandrashila-62

                                                                   চন্দ্রশিলা

আধো অন্ধকারে যত সহজে উপরে উঠেছিলাম, চড়াই ভাঙ্গার কষ্ট না থাকলেও, এখন কিন্তু তত সহজে নীচে নামা সম্ভব হচ্ছে না। একটা হালকা পাতলা বরফের স্তর পাথর ও ঘাসের মতো ছোট ছোট গাছে ঢাকা আশপাশের পায়ে চলা পথের ওপর জমে ছিল। যাওয়ার পথে টর্চের আলোয় বুঝতেও পারিনি, অসুবিধাও হয়নি, কিন্তু এখন সেগুলো গলে গিয়ে ভীষণ পিচ্ছিল আকার ধারণ করেছে। সোমা চারবার মাত্র আছাড় খেয়ে একটুর জন্য দ্বিতীয়বার বিশ্ব রেকর্ড থেকে বঞ্চিত হ’ল। মোহিনী ও হিমাদ্রিও আছাড় খেল, বা খেতে খেতে বেঁচে গেল। খুব সাবধানে পা ফেলে ফেলে, রাম চন্দ্র বা তুঙ্গনাথ কার কৃপায় জানি না, একে একে আমরা তুঙ্গনাথ মন্দিরের কাছে নির্বিঘ্নে নেমে এলাম।

পূজো দিয়ে, প্রাতরাশ সেরে, মালপত্র নিয়ে সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ চোপ্তার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া গেল। এবার কিন্তু অনেকেরই ইচ্ছায় দুটো খচ্চরের পিঠে মালপত্র চাপানো হ’ল। অমলেন্দু ও সুদীপ্তর কড়া শাসনে আমিও বাধ্য হলাম আমার ব্যাকপ্যাক নিজের পিঠে না নিয়ে, খচ্চরের পিঠে দিয়ে ভারমুক্ত হতে। ভাড়া লাগলো আটশ’ টাকা। একে ঝাড়া হাত-পা, তাতে উতরাই এর পথ, ফলে বিনা কষ্টে মনের আনন্দে নেমে আসছি। মোহিনীর সবুজ ব্যাকপ্যাকটা যথারীতি ওর পিঠেই রয়েছে। একসময় আমরা আবার সেই ভুজগলি বুগিয়ালে এসে উপস্থিত হলাম। এবার কিন্তু সবুজ মাঠে শুয়ে বসে, চা খেয়ে, অনেকটা সময় কাটানো হ’ল। ধীরে ধীরে আমরা ৯৬০০ ফুট উচ্চতার চোপতা শহরে নেমে এলাম।

  at-bhujgoli-bugial-2          at-bhujgoli-bugialbhuj-goli-bugial-2

                                                              ভূজগলি বুগিয়াল

কথামতো টনি তার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। এই চালকটি গাড়ি ভালোই চালায়, কিন্তু সম্ভবত এ বোধহয় রামগরুড়ের বংশধর, এতটা পথে তাকে কখনও হাসতে দেখিনি। যাইহোক, খচ্চরের পিঠে বয়ে আনা আমাদের মালপত্র গাড়িতে গুছিয়ে তুলে, চা খেয়ে, উখিমঠের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া গেল। হৈহৈ করতে করতে একসময় আমরা নির্বিঘ্নে উখিমঠে এসে হাজির হলাম। জি.এম.ভি.এন. এর প্রবেশ পথটি ঘরগুলোর মতো সুন্দর নয়। আমাদের একটি ডিলাক্স দুই শয্যার ঘর, ও একটি আট শয্যার ডরমিটারি বুক করা ছিল। দু’জনের ঘরটি এক হাজার পঞ্চাশ টাকা, কর অতিরিক্ত, এবং ডরমিটারির প্রতিটি বেডের ভাড়া দুই শত কুড়ি টাকা। আর একটি ঘর আছে, কিন্তু সেটা ফাঁকা না থাকায় এই দুটি ঘরই বুক করা হয়েছিল। এখন দেখা গেল আরও একটি ফাঁকা ঘর আছে, যদিও সম্ভবত মেরামতের প্রয়োজনে সেটা কাউকে ভাড়া দেওয়া হয় না। ঐ ঘরটি ছয় শত টাকার বিনিময়ে আমাদের ব্যবহার করতে দিয়ে, কর্মচারীটি গোপনে একটা ব্যবসা করে ফেললেন। একে একে সবাই স্নান সেরে নিলাম। সায়ন্তনী ও মোহিনী একটি দুই শয্যার ডিলাক্স ঘরে, একই রকম অপর একটি ঘরে সোমা ও তার ছেলে ঋদ্ধিমান। আমরা আটজন আট শয্যা বিশিষ্ট একটি ডরমিটরিতে স্থান পাওয়ায়, আড্ডা ও গুলতানির ধরণ ও মাত্রা, স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বৃদ্ধি পেল। সৌমি ও অর্পনদের আমাদের জি.এম.ভি.এন. এর একটু আগে ভারত সেবাশ্রম সংঘ-এ থাকার ব্যবস্থা করা ছিল, কিন্তু ওরা আমাদের ঠিক পাশেই একটা হোটলে একটা ঘর পাঁচশ’ টাকায় ভাড়া নিল। আমাদের ঘরটার ঠিক পাশেই বেশ বড় ডাইনিং হল। রাতের খাবার খেয়ে যে যার ঘরে চলে গেলাম। সৌমিরাও এখানেই খেয়ে, নিজেদের হোটেলে চলে গেল। আগামীকাল ভোরে আমাদের সারিগ্রাম যাওয়ার কথা, সেখান থেকে হেঁটে দেওরিয়া তাল। আরও কিছু সময় কাটিয়ে যে যার শয্যা নিলাম।

আজ সতেরোই অক্টোবর। বেশ কিছু টি ব্যাগ ও একটা ইলেক্ট্রিক কেটলি সঙ্গে নিয়ে আসা হয়েছিল। সকাল সকাল বিভাসের তৈরি চা খেয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় প্রায় পাঁচশ’ মতো গান পেন ড্রাইভে তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাতে একটাও হাসির গান না থাকলেও, রামগরুড়ের ছানার প্রথম থেকেই সেইসব গান শোনাতে বা শুনতে আপত্তি লক্ষ করেছি। তাই উচ্চৈঃস্বরে বাজানো তার পছন্দের অদ্ভুত সব গান শুনতে বাধ্য হয়ে, একসময় সারিগ্রাম এসে উপস্থিত হ’লাম। দূরত্ব খুব বেশি নয়। এখানে হোটেল মাউন্টেন ভিউ অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের আতিথেয়তা ভোলার নয়, তবে আলুর পরোটার মান হোটেল মালিক না বিভাস, কার কৃপায় এত ভালো হ’ল বলতে পারবো না। কারণ রান্নাঘরের দায়িত্ব দেখলাম শ্রীমান বিভাস চন্দ্র পুরো মাত্রায় দখল করে নিয়েছে। গাড়ি এখানেই আগামীকাল আমাদের ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। চোপতার মতোই গাড়িতে অপ্রয়োজনীয় সব মালপত্র রেখে, ফেরার পথে মুরগির মাংস ভাতের অর্ডার দিয়ে, হোটেলের ঠিক বিপরীতে দেওরিয়া তাল যাবার গেট দিয়ে আমরা পিঠে বোঝা নিয়ে হন্টন শুরু করলাম।

   sarigram-6       on-the-way-to-deoria-tal-21        on-the-way-to-deoria-tal-11

                                                         দেওরিয়া তাল যাবার পথে

পাথরের টুকরো ফেলা বেশ খাড়াই রাস্তা, তবে সিঁড়ির উৎপাত বিশেষ নেই। হেঁটে, দাঁড়িয়ে বা বসে বিশ্রাম নিয়ে, আড্ডা দিয়ে, হাঁটতে ভালোই লাগছে। কষ্ট নিশ্চই আছে, কিন্তু দেওরিয়া তালের অবর্ণনীয় সৌন্দর্য, খুড়োর কলের মতো মনের কোণে ঝুলে থাকায়, কোন কষ্টই তেমন কষ্টকর বলে মনে হয় না। একসময় আমরা একটা খোলা জায়গায় একটা প্রাচীন শিব মন্দিরের কাছে এসে পৌঁছলাম। দলের অনেকেই এগিয়ে গেছে, আমাদের কয়েকজনের কোন তাড়া নেই, তাই জঙ্গল ও বড় বড় গাছে ঘেরা পাথুরে রাস্তায় হাঁটছি, বসছি, আড্ডা মারছি, পাখির খোঁজ করছি, আবার হাঁটছি। আরও বেশ কিছু পথ ভেঙ্গে বেশ বড় একটা চায়ের দোকান পেয়ে পিঠের বোঝা রেখে গুছিয়ে বসা গেল। এখানে দেখলাম ডিম পাওয়া যায়। দু’একজন মিনারেল ওয়াটারে পাতিলেবু চিপে খেল, এক একটা পাতি লেবুর দাম দশ টাকা। এবার শুধু রথ দেখতে যাওয়া হচ্ছে ভেবে মনটা হুহু করে উঠলো। পরে যদি আবার যাওয়ার সুযোগ পাই, তাহলে বেশ কিছু পাতিলেবু সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে কলাও বেচে, থুড়ি, পাতিলেবুও বেচে আসবো। আমরা ডিম সিদ্ধ আর চা খেয়ে উঠে পড়লাম। পথ আর বেশি নেই। এপথে বিদেশীদের আগমন দেখছি যথেষ্ট, যদিও অধিকাংশই ঘোড়ার পিঠে যাওয়াই পছন্দ করেছেন। যাইহোক, আরও বেশ কিছুটা পথ পার হয়ে দুর থেকে দেওরিয়া তালের প্রথম দর্শনেই তার প্রেমে পড়লাম। আমরা তিন কিলোমিটার পথ পার হয়ে ৭৯৯৯ ফুট উচ্চতায় দেওরিয়া তালের পাশে এসে দাঁড়ালাম। দলের বেশ কয়েকজন আগেই এসে আমাদের জন্য নির্ধারিত হীরা সিং নেগীর চারটি তাঁবু ঘিরে বসে আছে। একটি তিন+এক, দুটি দুই+এক, ও একটি দু’জনের জন্য শোয়ার ব্যবস্থা। তাঁবুর ভিতরে স্লিপিং ব্যাগ রাখা আছে। অর্পন ও সৌমির জন্য আমাদের তাঁবুগুলোর পাশেই একটা দুজনে থাকার মত তাঁবু। আমরা পিসুর হাত থেকে বাঁচতে স্লিপিং ব্যাগগুলো বাইরে এনে সবুজ মাঠে পেতে রৌদ্রে দিলাম। তাঁবুগুলো ভালো, কিন্তু লোক সংখ্যা অনুযায়ী বেশ ছোট। বিস্তীর্ণ বুগিয়ালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক তাঁবু। যারা নিজেরা সঙ্গে তাঁবু নিয়ে এসেছে, তারা তাদের পছন্দ মতো জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে নিয়েছে। বিদেশীরা তাল থেকে বেশ কিছুটা দুরে, নিজেদের থাকার তাঁবুগুলো পছন্দ করে নিয়ে বিয়ারের বোতল খুলে গুলতানি করছেন। ওদিকটায় বিদেশীরা ছাড়া অন্য কাউকে তাঁবু খাটাতে দেখলাম না। নিজেদের তাঁবুই হোক বা ভাড়ায় নেওয়া, উভয় ক্ষেত্রেই বন বিভাগকে মাথাপিছু দেড় শত টাকা দিতে হয়।

     deoria-tal-22       deoria-tal-66        deoria-tal-68

                                                                   দেওরিয়া তাল

বিভাস কয়েকজনকে নিয়ে হীরা সিং নেগীর দোকানে দুপুরের খাবার খেতে গেল। শুনলাম ভাত, ডাল আর মিক্সড্ ভেজিটেবলের বিশাল আয়োজন সমাপ্ত। আমরা কয়েকজন লেকের ধারে এসে বসলাম। সবুজ জলের বিরাট লেক, জলের গভীরতা সম্ভবত খুব কম, মাঝখানে বেশ কিছুটা ঝাঁজি হয়ে আছে। এই লেকে সূর্যদয়ের সময় দূরের পাহাড়ের চূড়ার ছায়া পড়ে। ছোট ছোট অনেক মাছ খেলে বেড়াচ্ছে। এই লেকে নাকি নাগরাজ বাস করেন, আকারেও নাকি বেশ বড়। কিন্তু তাঁর দর্শন না পাওয়ায়, হিমাদ্রির মেটালের লাঠিতে গেঁথে শিককাবাব করে খাওয়ার বাসনা পরিত্যাগ করতেই হ’ল। লেকের তিন দিকে পাহাড়ি গাছ, আর দুরে চৌখাম্বা, নীলকন্ঠ, বান্দরপুঞ্ছ, কেদার রেঞ্জকে পরিস্কার দেখা যায়। এখান থেকে জঙ্গল পথে সাত কিলোমিটার ট্রেক করে সরাসরি তুঙ্গনাথ যাওয়া যায় বলে জানা গেল। দীর্ঘক্ষণ পরেও যখন সঙ্গীদের একজনও মধ্যাণ্য ভোজন সেরে ফিরে এলো না, তখন বিলম্বের কারণ নিয়ে চিন্তা শুরু হ’ল— রাজকীয় ভোজন, না খাদ্যাভাব? আরও অনেক, অনেকক্ষণ পরে একে একে ফিরে এলে, কারো মুখে হতাশা, কারো মুখে বিদ্রোহের ছবিটা পরিস্কার লক্ষ করা গেল। হীরার খনিতে নাকি আলুর অভাব, তাই আধ সিদ্ধ চাল, পাতলা ডাল, আর বোঁটা সমেত সামান্য বেগুনের তরকারী। চাল সিদ্ধ না হলেও, বেগুন সেই দোষ খন্ডন করে এতোই সুসিদ্ধ হয়েছে, যে শবদেহ দাহ করলে যেমন নাভি কুন্ডলী ছাড়া সমস্ত দেহটা পুড়ে ছাই হয়ে যায়, বেগুনেরও নাভি কুন্ডলীর ন্যায় বোঁটা ছাড়া আর কোন কিছুর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় নি। ঐ সুখাদ্য খেতে গিয়ে তাদের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা হওয়ায় আধপেটা, হয়তো বা সিকিপেটা খেয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে ফিরে এসেছে।

এখান থেকে হীরা সিং এর টেন্ট বুক করে দু’হাজার টাকা অগ্রীম পাঠানো হয়েছিল। মাথাপিছু থাকা-খাওয়া প্রতিদিন ছয় শত টাকা, তবে খাবার জল আলাদা কিনতে হবে। যা বোঝা গেল এখানে থাকা খাওয়ার মাথাপিছু খরচ পাঁচশত টাকা থেকে হাজার টাকা, যার কাছে যেরকম কানমুলে আদায় করা যায়, এবং তাঁবুর পরিমানও যথেষ্ট। কাজেই আগে থেকে বুক না করে যাওয়াই শ্রেয়। আমরা এখানে আসার পর তার মাথার একপাশে টিকিটি দেখা গেছিল, মাঝখানে না রেখে মাথার একপাশে টিকি রাখার কারণ, হীরাই বলতে পারবে। চোখদুটো অনেকটা ট্যাঁশ গরুর মতো, হয়তো নিয়মিত ভোলানাথের প্রসাদ খাওয়ার অভ্যাস আছে। খাবারের মান নিয়ে যখন ক্ষোভের যজ্ঞের কাঠে আগুন প্রায় লাগে লাগে, তখন দেখা গেল চারজনের থাকার মতো আমাদের লালচে তাঁবুটা প্রায় খুলে পড়ার উপক্রম। অন্যান্য তাঁবুগুলো QUECHUA হলেও, এটি একেবারেই নিম্নমানের সস্তার তাঁবু।

আমাদের দলে খাদ্যমন্ত্রী নবীন হলেও, দেখা গেল তার সচিব, বিভাস এ ব্যাপারে অনেক কর্মঠ ও যোগ্য। তার কাছে জানা গেল হীরা সিং এর খাবারের মান শুধু খারাপই নয়, পরিমানেও অপ্রতুল। আধপেটা করে খেলেও জনা সাতেকের মতো খাবার আছে। সে তাই হীরার ভাইপো বাবন সিং নেগীর সাথে, ভাত, ডাল, ডিমের অমলেট, আচার ও একজন ডিম খায় না, তার জন্য আলুর চোখার মৌ চুক্তি সাক্ষর করে এসেছে। জয় তুঙ্গনাথের জয়, জয় বিভাসের জয়।

অনেক বেলায় অভুক্তরা হীরার খনি ছেড়ে বাবনের ডেরায় গিয়ে হাজির হলাম। হীরার থেকে বাবনের দোকান অনেক কাছে, দেওরিয়া তালের নিকটতম দোকানটি তার। চারপাশ খোলা বেশ বড় ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন দোকান। বিভাস হেঁসেল সামলানো ও প্রয়োজন মতো খাদ্য পরিবেশনের দায়িত্বে লেগে পড়লো। ভালো চালের ভাত, সম্ভবত বিভাসের সৌজন্যে জল ও ডালের অনুপাত হীরা সিং-এর ঠিক বিপরীত হওয়ায়, বেশ ঘন মুসুর ডাল, ডিমের অমলেট ও আচার। দলনেতা সুদীপ্ত,  আমাদের রোজকার দেখা নেতাদের মতোই ভুমিকা নিয়ে, আলুর চোখা ভোজিনী সৌমির পাশে উঠে গিয়ে ভাগ বসালো। বিভাসের হাতের গুণে খাবারের মান, পরিমান, ও স্বাদ অতুলনীয়। জায়গা অনুযায়ী দামও বেশ কমই বলা যায়। হীরার ভাইপো হয়েও বাবন লোকটি বেশ ভদ্র ও ভালো। হীরা সিংকে ডেকে পাঠালেও আর দেখা করতে না আসায়, খুলে পড়া বড় টেন্টটির পরিবর্তে দুটি ছোট ভালো টেন্ট্ লাগিয়ে দিতে বলা হল। ঠিক হ’ল, হীরা সিংকে আটজনের শোয়ার মতো তিনটি টেন্ট্ ও যে ক’জন খেয়েছে, শুধু মাত্র তার মূল্যই দেওয়া হবে। এরমধ্যে হীরা এসে উপস্থিত হ’ল, এবং বাবনকে দুটো টেন্ট খাটিয়ে দিতে বলে তালের দিকে চলে গেল। এবার দেখলাম বিভাস শুধু খাদ্য নির্বাচন নয়, রন্ধন, পরিবেশন ও হিসাব রক্ষকের ভুমিকাটিও দক্ষ হাতে সামলালো।

ফিরে এসে দেখি হীরা সিং বড় তাঁবুটা আবার ঠিকমতো খাটিয়ে দিয়েছে। লেকের চারপাশে পায়েচলা রাস্তা মতো করা আছে। ফিরে এসে বুগিয়ালে ও লেকের চারপাশে ঘুরেফিরে ও ছবি তুলে অনেকটা সময় কাটানো গেল। মাঝে সুদীপ্ত, হিমাদ্রি ও অমলেন্দুর কল্যানে বেশ কয়েকবার চা খেয়ে আসার সুযোগ পাওয়া গেল। এখানে বিদ্যুৎ বা সোলার লাইটের ব্যবস্থা নেই। আগুন জ্বালা নিষিদ্ধ, বাথরুমের কোন ব্যবস্থা নেই। লেক থেকে জল এনে, বা টিসু পেপার নিয়ে গিয়ে, গাছপালার আড়ালে কাজ সারতে হয়। লেকের অপর পাড়ে দুটো পাকা বাড়ি আছে। আমি, সুদীপ্ত, রক্তিম, হিমাদ্রি ও অমলেন্দু, লেকের অপর পারে ঘুরতে গেলাম। সেখানে ঠিক লেকের জলের কাছে আমাদের দলের হাঁটুর বয়সী সদস্য সদস্যারা গুলতানি করছে। ইচ্ছে থাকলেও নিজেদের সিং ভাঙ্গতে কুন্ঠাবোধ করলাম। দুটি পাকা বাড়ির একটি বন বিভাগের অফিস, অপরটি বাংলো। এদিকটায় ঠিক বুগিয়াল জাতীয় মাঠও নেই। বন বিভাগের অফিসটি বন্ধ এবং তার ঠিক পাশে একবারে নির্জন জায়গায় একটি মাত্র তাঁবু। একটি অল্প বয়সী দম্পতি, সম্ভবত মধুচন্দ্রিমা কাটাতে নির্জন এই বুগিয়ালের নির্জনতম জায়গাটি বেছে নিয়ে তাদের তাঁবুটি খাটিয়েছে। এখানে আলাপ হ’ল এখানকার সম্ভবত একমাত্র বনকর্মীটির সাথে। জানা গেল এখানে মাঝে মধ্যেই বন বিভাগের উচ্চ পদস্থ কর্মীরা এসে থাকেন। অমলেন্দুর প্রায় একক প্রচেষ্টায়, আমাদের দলের মেয়েদের ও প্রয়োজনে দু-একজনের বাংলোর টয়লেট ব্যবহারের অনুমতি পাওয়া গেল। ভদ্রলোক ঘরের চাবি প্রয়োজনে তাঁর কাছ থেকে চেয়ে নিতে বললেন। তালের চারিপাশে ঘুরেফিরে আরও অনেকটা সময় কাটালাম।

সন্ধ্যার ঠিক আগে চাঁদের আলো থাকা সত্ত্বেও ঝিরঝিরে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হ’ল। ইতিমধ্যে বাবন সিং তার কথামতো দুটো ছোট টেন্ট্ খাটিয়ে দিয়ে গেছে। বৃষ্টির জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেলেও সোমা, সায়ন্তিনী ও মোহিনীর জন্য নির্ধারিত তাঁবুতে প্রায় সাত আটজন বসে গানের লড়াই খেলতে শুরু করে দিলাম। এদের মধ্যে আবার নবীন ও হিমাদ্রির মতো বিশাল বপুর দু’জন আছে। একেই বোধহয় তেঁতুল পাতায় ন’জন বলে। এরমধ্যে সুদীপ্ত জানালো যে হীরা সিং জানিয়েছে যে তার অনেক খাবার নষ্ট হয়েছে, তাই তাকে আরও তিন হাজার টাকা দিতে হবে। আমি সুদীপ্তকে বললাম কিছু কম করার চেষ্টা করতে, না পারলে টাকা দিয়ে দিতে। সামান্য কিছু টাকার জন্য অশান্তি নিয়ে সময় ব্যয় করে এরকম একটা সুন্দর রাত্রি নষ্ট করার কোন মানে হয় না।

      deoria-tal-96      deoria-tal-19   deoria-tal-90

                                                                   দেওরিয়া তাল

বৃষ্টি বন্ধ হয়ে সমস্ত বুগিয়াল জ্যোৎস্নালোকে ভরে গেল। বহুদুরের পাহাড় ও গাছপালা, পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। ঠান্ডাও বেশ ভালোই। আমরা কয়েকজন মাঠে ঘুরে, ছবি তুলে, ঠাট্টা তামাশা করে, আরও অনেকটা সময় কাটিয়ে আবার একবার চা খেতে গেলাম। ঠিক হ’ল রাতের খাবার খেয়ে একবারে ফেরা যাবে। অমলেন্দু, সোমা ও ঋদ্ধিমান ছাড়া আর সকলেই এসে হাজির হ’ল। সোমা তার নিজের ও ছেলের জন্য রাতের খাবার হিসাবে সামান্য কিছু শুকনো খাবার, দুপুরেই নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অমলেন্দু না আসায় চিন্তা হ’ল। সারাটা সময় ও আমাদের সাথে ছিল। ওকে ফোন করে জানা গেল, যে ওর খিদে নেই তাই আর আসবে না। এবারও বিভাসের দয়ায় ভালোই খাবার জুটলো। আরও দু-তিনবার চা খেয়ে মাঠে ফিরে এলাম। অমলেন্দু ও সুদীপ তাদের তাঁবুতে শুয়ে পড়েছে। চাঁদের ছবি তোলা নিয়ে অনেকক্ষণ গবেষণা চললো। লাল বড় তাঁবুটা ফাঁকা পড়ে আছে, আমি আর হিমাদ্রি সুদীপ্তর তাঁবু থেকে স্লিপিং ব্যাগদুটো বার করে ওতে শোয়ার ব্যবস্থা করে নিলাম। ধীরে ধীরে যে যার তাঁবুতে আশ্রয় নিলো। ক্রমে মাঠ ফাঁকা হয়ে গেল। অনেক রাত্রি হয়েছে, কিন্তু মোহিনী আর সায়ন্তনীর আড্ডা শেষ না হওয়ায়, আমি আর হিমাদ্রি আমাদের তাঁবুতে যেতে পারছি না। শেষে প্রায় তাড়া দিয়ে ওদের সোমার তাঁবুতে ঢুকিয়ে, নিজেদের তাঁবুতে স্লিপিং ব্যাগের ভিতর আশ্রয় নিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন, সম্ভবত হীরা সিং বা তার কোন লোক, সঙ্গে দু’জন লোক নিয়ে এসে তাঁবুর বাইরে থেকে জিজ্ঞাসা করলো তাঁবুটা ফাঁকা আছে কী না। দু’জন লোকের থাকার জায়গার অভাব দেখা দিয়েছে, ফাঁকা থাকলে তাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা করা হবে। এতরাতে সে কোথা থেকে দু’জন লোক ধরে আনলো সেই জানে। তবে আমাদের যদি হীরাকে সত্যিই আরও তিন হাজার টাকা দিতেই হয়, তাহলে এই তাঁবুর অধিকারও আমাদেরই থাকে। তাই তাঁবুর চেন না খুলেই তাকে জানানো হ’ল যে ভিতরে লোক আছে। কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথা বলে তারা চলে গেল।

আজ আঠারোই অক্টোবর। বেশ ভোরে সূর্যদয় দেখার লোভে তাঁবু থেকে বেরতেই হ’ল। আগেই  অনেকে উঠে পড়েছে। উঠে দেখি আমাদের তাঁবুর গা দিয়ে জল গড়াচ্ছে, ম্যাট্রেসের নীচে অনেক জায়গায় ছোট ছোট গর্তে জল জমে আছে। আমাদের তাঁবুর চারটে স্লিপিং ব্যাগ যেহেতু মালিক না থাকায় অনাথ হয়ে পড়েছিল, আমি আর হিমাদ্রি তাই সেগুলো পেতে তার ওপর শুয়ে রাত কাটিয়ে, তাদের যোগ্য সম্মান দিয়েছিলাম। তালের ডানদিকে মাঝামাঝি একটা জায়গা পাথর দিয়ে ঘাটের মতো বাঁধানো। এখান থেকেই সবাই লেকের জলে বরফ ঢাকা পাহাড়ের চূড়ার ছায়া পড়ার ছবি তোলে। সত্যি একেই বলে জায়গার মাহাত্ম, আমার মতো আনাড়িও কাকভোরে ক্যামেরা কাঁধে গিয়ে হাজির হলাম। কিন্তু কপাল মন্দ, হালকা মেঘ থাকায় সূর্যদেব যখন ধীরে ধীরে পূব আকাশে দেখা দিলেন, তখন তাঁর লাল পোষাক ছেড়ে সাদা পোষাক পরার সময় প্রায় হয়ে গেছে। তবু তালের আয়নায় চৌখাম্বা বা অন্যান্য শিখরের মুখ দেখার বিরল ছবি, যে যার নিজের বুদ্ধিমতো ক্যামেরা বন্দি করে নিলাম। আমরা যে যার মতো গাছের আড়ালে গেলেও, অমলেন্দু ঐ বনকর্মীটির থেকে বাংলোর চাবি নিয়ে, মেয়েদের এই দুরবস্থার হাত থেকে রক্ষা করেছিল। অমলেন্দুর সাথে কস্মিনকালেও পরিচয় ছিল না, এই সামান্য কয়েকটা দিনেই এটা উপলব্ধি করেছি, যে তার মতো একজন ভ্রমণসঙ্গী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কোন কিছুতেই তাকে না বলতে শুনি নি। যেকোন পরিস্থিতিই যে মানিয়ে নিতে পারে, যেকোন অসুবিধাতেই যে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সেইতো প্রকৃত ভ্রমণসঙ্গী। এই গুণটা তার মধ্যে ষোল আনা বিরাজ করে। অমলেন্দু ও ঐ বনকর্মীটিকে দলের সবার ধন্যবাদ জানানো উচিৎ।

আরও বেশ কিছুক্ষণ মাঠে ও লেকের ধারে কাটিয়ে, যে যার মালপত্র নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। বাবন সিং এর দোকানে গরম গরম আলুর পরোটা আর চা খাওয়া শেষে বিভাস গতকাল থেকে সমস্ত হিসাব জুড়ে টাকার পরিমাণ জানালে, বাবন সিংকে টাকা মিটিয়ে দেওয়া হ’ল। আমরা ফেরার পথ ধরলাম, সুদীপ্ত ও দু-একজন হীরা সিং এর পাওনা মেটাবার জন্য অপেক্ষা করলো।

অনেকটা পথ এঁকেবেঁকে আমরা সেই শিব মন্দিরটার চত্বরে এসে হাজির হলাম। পূজারি পূজো শেষে নকুলদানা প্রসাদ দিলেন। সুদীপ্তরা এসে হাজির হ’ল। হীরাকে পাঁচশ’ টাকা কমিয়ে আড়াই হাজার টাকা দিতে হয়েছে। আজ মনে হচ্ছে, সুদীপ্ত নিশ্চই পাঁচশ’ টাকার নোট তাকে দিয়েছিল। সে যদি টাকাগুলো খরচ না করে থাকে, তাহলে বেচারার কি হাল হবে। যাইহোক, আরও একটু শুয়ে বসে আঁকাবাঁকা পাথুরে রাস্তা ভেঙ্গে, আমরা সরসরি নীচের সেই দোকনে এসে হাজির হলাম। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে ভাত, ডাল, আলুভাজা ও মুরগির সুস্বাদু ঝোল খেয়ে, তাকে বিদায় জানিয়ে, গাড়িতে গিয়ে আসন দখল করলাম। আজ এখান থেকে আমরা যাব কনকচৌরি। আগামীকাল ভোরে কার্তিক স্বামী দেখে হরিদ্বার ফিরে গিয়ে রাতের ট্রেন ধরবো।

আবার সেই ভিরি, বাসওয়ারা, চন্দ্রপুরী, ভান্ডুগ্রাম, বিজয় নগর, অগস্তমুনি, তিলওয়ারা হয়ে রুদ্রপ্রয়াগ পৌঁছলাম। এখান থেকে বামদিকে চল্লিশ কিলোমিটার দুরে কনকচৌরির পথ চলে গেছে। ডানদিক দিয়েও যাওয়া যায়, তবে সেপথে নাকি প্রায় নব্বই কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। বামদিকের রাস্তা দিয়ে স্থানীয় গাড়িদের যেতে দেওয়া হয়। আমরা অচ্ছুৎ অনাহূতের দল, তাই আমাদের গতিরোধ করা হ’ল। রক্তিমকে নিয়ে ড্রাইভার নেমে কথা বলতে গেল। বামদিকের রাস্তা দিয়ে যেতে না দিলে, কনকচৌরি পৌঁছতে বেশ বেলা হয়ে যাবে। জায়গাটা একটু ঘুরে ফিরে দেখার বিশেষ সুযোগ পাওয়া যাবে বলেও মনে হয় না, কিন্তু তার থেকেও বড় চিন্তা, এই অতিরিক্ত পঞ্চাশ কিলোমিটার পথ, শ্রীমান টনির বিখ্যাত সব গান শুনতে শুনতে যেতে হবে।

আমরা আমাদের রাজ্য নিয়ে যতই গর্ব করি না কেন, আমাদের রাজ্যের মতো দেশের সব প্রান্তের পুলিশেরই শরীরে দয়ামায়াটা একটু বেশি মাত্রাতেই আছে। তাই মাত্র পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে তিনি দয়া প্রদর্শন করলে, আমরা আবার এগিয়ে চললাম। ক্রমে দূর্গাঘর পার হয়ে অন্য আর এক চোপতায় এসে, সকলের চা খাওয়ার ইচ্ছাটা প্রবল ভাবে চাগাড় দিতে দেখা গেল। গাড়ি থামিয়ে নেমে সোমার কেনা স্থানীয় কেক্ সহযোগে চা খাওয়াটাও ভালোই হ’ল।

উখিমঠে সুদীপ্তর চটিটা হঠাৎ সম্ভবত হৃদরোগে দেহ রেখেছিল। অমলেন্দুর হাওয়াই চটিটার ওপর আবার বড় বড় করে BMW লেখা থাকায় বোধহয় অত দামি চটিতে লোম উঠে যাবার ভয় পেয়ে পায়ে গলাতে সাহস পায় নি। আর সেই অপরাধে সুদীপ্তর কোপে পড়ে আমাকে প্রায় সব সময়েই খালি পায়ে, অথবা অপরের চটি ভিক্ষা করে কাটাতে হচ্ছিল। ওর বাবরের আমলের জুতোটাও বোধহয় অক্সিজেনের অভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্টে, সামনের দিকে বেশ খানিকটা হাঁ করে প্রশ্বাস নিচ্ছিল। ভয় হচ্ছিল এবার না ওর নেকনজর আমার জুতোর ওপরে পড়ে। যাইহোক, সুদীপ্ত এখানে চটির দোকান দেখে উল্লাসিত হয়ে, লাল রঙের একটা হাওয়াই চটি কিনে ফেললো। আহা! লাল রঙের হাওয়াই চটির সাথে ততোধিক লাল জ্যাকেটের ওপর নীল রঙের ব্যাকপ্যাক পিঠে, ভাবা যায়? কবির ভাষায়- “লাল গানে নীল সুর হাসি হাসি গন্ধ” বোধহয় একেই বলে। আমি আবার আমার হারানো মানিককে ফিরে পেয়ে ধন্য হলাম।

কনকচৌরির মায়াদীপ রিসর্টে আমাদের ঘর বুক করা আছে, তিন হাজার টাকা অগ্রিম জমা দেওয়াও আছে। কনকচৌরির রাস্তা আবার টনির নেটওয়ার্কের বাইরে, বার বার গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসা করে করে, রিসর্টে ফোন করে, বিকেলের শেষ ভাগে কনকচৌরিতে মায়াদীপ রিসর্টে এসে পৌঁছলাম। গাড়ি থেকে নামতেই দেখলাম রিসর্টের লোক মাল নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। বাইরে থেকে রিসর্টটির মান বিচার করা সম্ভব নয়। দু’দিক দিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে ভিতরে ঢোকা যায়। অসাধারণ ঘর, অসাধারণ শয্যা, তবে কাল ভোর চারটের মধ্যে কার্তিক স্বামী যাওয়ার জন্য বেরিয়ে যেতে হবে, তাই পাঁচ হাজার পাঁচশ’ টাকা ভাড়ার খরচ সাপেক্ষ এই রিসর্টে আমাদের আয়ু মাত্র কয়েক ঘন্টা। অর্পন ও সৌমি এই রিসর্টের একটা পাশে একটা ঘর পেয়ে গেল।

মালপত্র ঘরে রেখে স্নান সেরে, ছোট্ট শহরটাতে একটা চক্কর দিতে যাওয়া হ’ল। কার্তিক স্বামী মন্দির জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে অন্ধকার থাকতে সূর্যদয়ের আগে যেতে হবে, এবং এপথে ভাল্লুকের উৎপাত আছে, তাই বল্লভ সিং নেগীকে আটশ’ টাকায় গাইড হিসাবে নিয়োগ করা হ’ল। বিভাস একটা দোকানে রাতের খাবার ও পরের দিন সকালের জলখাবারের ব্যবস্থা পাকা করে ফেললো। আমরা একটা চায়ের দোকানে বসে পাথরের মতো শক্ত বিস্কুট সহযোগে চা পান করতে করতে, কলেজ জীবনের আড্ডার স্বাদ গ্রহণ করলাম।

আগামীকাল ভোরে কার্তিক স্বামী ঘুরে এসে আমাদের হরিদ্বার ফিরে গিয়ে রাতে উপাসনা এক্সপ্রেস ধরার কথা। হরিদ্বারও এখান থেকে বেশ কয়েক ঘন্টার পথ, তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গাড়ি ছাড়তে হবে। হিমাদ্রির কোমরের ব্যথাটা বেশ বেড়েছে, তাই ও আর কার্তিক স্বামী মন্দিরে যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিল। সোমাও ঐ নির্দিষ্ট সময়ে যাতায়াতের ঝুঁকি নিতে চাইলো না, তাই সেও তার ছেলে ঋদ্ধিমানকে নিয়ে হোটেলেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলো।

ঘরে ফিরে এসে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য সমস্ত মালপত্র গুছিয়ে নেওয়া গেল। ততক্ষণে নীচে অর্পনদের ঘরের ঠিক সামনে একটা বড় ঘরে আগুন জ্বেলে আড্ডার পর্ব প্রস্তুত। আগুনের চারপাশে ঘিরে বসে এই ট্যুরের ভালো লাগা না লাগা ইত্যাদি নিয়ে, যে যার মতামত জানানোর পর্বও একসময় শেষ হ’ল। রাতের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে যে যার বিছানা নিলাম।

আজ উনিশে অক্টোবর। অন্ধকার থাকতেই গাইড আমাদের ডেকে দিয়ে গেল। চা খেয়ে তৈরি হয়ে হিমাদ্রির সুখনিদ্রার প্রতি হিংসাভাব পোষণ করে, রিসর্টের প্রায় পাশেই, কার্তিক স্বামী যাত্রা পথের গেটের সামনে এসে হাজির হ’লাম। গাইড একহাতে একটা ছোট্ট সোলার হ্যারিকেন মতো নিয়ে আমাদের সাথে পা মেলালো। তার পকেট থেকে মোবাইলে ভক্তিমুলক গান বাজছে। অন্ধকার পাথুরে জঙ্গলের পথে আমরা এগিয়ে চললাম। একে একে সবাই এগিয়ে গেলেও, এই প্রথম আমি হাঁটার শুরু থেকেই অস্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করতে লাগলাম। রাস্তা বেশ কিছুটা খাড়া ভাবে উঠে আবার কিছুটা সমতল। অনেক জায়গায় পাথরের রাস্তার পাশের দিকে মাটির অংশ আছে। তার ওপর দিয়ে হাঁটার পরিশ্রম অনেকটাই কম। আমাকে সামান্য কয়েক পা হেঁটেই দাঁড়াতে হচ্ছে। সকলে অনেকটা এগিয়ে গেলেও, গাইড ও মোহিনী এক মূহুর্তও আমায় সঙ্গ ছাড়া করেনি। গাইডের কাজ পথ দেখানো ছাড়াও বিপদে আপদে সঙ্গে থাকা, সে বার বার আমাকে বলছে ধীরে চলো, সূর্য উঠতে অনেক দেরি আছে, হাতে অনেক সময় আছে। মোহিনী বেশ চিন্তিত হয়ে আমার শারীরিক কষ্টের খোঁজ নিচ্ছে, জল খেতে বলছে। ও খুব চুপচাপ স্বভাবের মেয়ে, আমার থেকে হয়তো কুড়ি-বাইশ বছরের ছোট, কিন্তু ওর মধ্যে একটা মাতৃসুলভ আচরণ আমি প্রথম থেকেই লক্ষ করে এসেছি। জীবনে বহু ট্রেক করে উপলব্ধি করেছি যে, ট্রেকিং-এর সাফল্য সহযোগিতা ও সহমর্মিতার ওপর নির্ভর করে, চালাকি করে পরের ঘাড়ে নিজের মাল চাপিয়ে দেওয়া, বা একমাত্র আত্মসুখের কথা চিন্তার ওপর নয়। আরও বেশ কিছু পথ পাড়ি দিয়ে আমরা একটা টিনের চালের বেঞ্চি পাতা বিশ্রামের জায়গায় এসে হাজির হলাম। গাইড জানালো অর্ধেক রাস্তা চলে এসেছি।

    kartik-swami-3         on-the-way-to-kartik-swami-18       on-the-way-to-kartik-swami-6

                                                           কার্তিক স্বামী যাওয়ার পথে

কনকচৌরি থেকে কার্তিক স্বামী তিন কিলোমিটার পথ, অর্থাৎ আমরা দেড় কিলোমিটার মতো পথ পার হয়ে এসেছি। এখানে সায়ন্তনী ও দু-একজন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। প্রায় বছর দুয়েক পরে যাবার আগে একবার ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। সচরাচর আমি এই ডাক্তারদের একটু এড়িয়েই চলি। বাইরে, বিশেষ করে কষ্টকর ও অতি উচ্চতার কোন ভ্রমণের ব্যাপারে তাঁরা বড় নেতিবাচক মতামত জানান। এবারের ভদ্রলোকটিকে কিন্তু অন্য ঘরানার ডাক্তার বলে মনে হ’ল। তিনি কোন ওষুধ না দিয়ে আমায় হাঁটার পথে বুকে কোন কষ্ট বা যন্ত্রণা হলে, দুটো ইকোস্প্রিন খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে ফিরে আসার পরামর্শ দেন। অদ্ভুত ব্যাপার, এই ক’দিন হাঁটার পথে ইকোস্প্রিন সঙ্গে নিয়ে যেতে ভুলে গেলেও, আজ কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। সায়ন্তনি হঠাৎ ইকোস্প্রিন থাকলে একটা খেয়ে নিতে বলায়, একটা ইকোস্প্রিন খেয়ে একটু বসে আবার হাঁটার জন্য প্রস্তুত হলাম। এই মেয়েটিও আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট, আমায় কখনও কাকু, কখনও বা জ্যেঠু বলে ডাকে। সুন্দর গান গায়, এবং প্রতিটি গান চয়নের মাঝে তার একটা সুন্দর রুচি বোধের পরিচয় পাওয়া যায়। একটু বেশি কথা বললেও তার মধ্যে কৌতুক রসবোধের অভাব দেখি নি। বয়সটা বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে কোন বাধাই নয় বলে আমি বিশ্বাস করি, তাই তাকে বন্ধু হিসাবে মেনে নিতে আমার কোন অসুবিধা হয় নি। সে নিজেও আমার সাথে প্রায় সমবয়সি বন্ধুর মতোই ব্যাবহার করতে কোন কুন্ঠা বোধ করে নি।

যাইহোক, কিছুটা পথ গিয়ে ডানপাশে নীচের জঙ্গলে কিছু নড়াচড়ার শব্দে গাইড আমাদের দাঁড়াতে বলে জানালো হিরণ, অর্থাৎ হরিণ। কিন্তু তার পরেই হাঁচির মতো কিরকম একটা আওয়াজ হতে সে জানালো ভাল্লু। ভাল্লুর দেখা পেলাম না, তবে একসময় আমরা জঙ্গলে ঘেরা পাথুরে রাস্তা ভেঙ্গে মন্দিরের পূজারির বাসস্থানের কাছে চলে এলাম। এখান থেকে মন্দির অল্পই রাস্তা। এখানে পর্যটকদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। পাশেই একটি বৃদ্ধের পাথরের মুর্তি। গাইডের কাছে জানা গেল উনি বর্তমান পূজারির পিতা ছিলেন। ওনার বাড়ি গারোয়ালের শ্রীনগরে। বছর তিনেক আগে এখান থেকে মন্দিরে পূজা করতে যাওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। গাইড ও পূজারির যৌথ উদ্যোগে আমাদের জন্য চায়ের ব্যবস্থা করা হ’ল। এখানে কিন্তু চায়ের দাম হিসাবে কোন টাকা নেওয়া হ’ল না। এখানে একটা দানপাত্রে চায়ের দাম বা পূজা বাবদ যার যা ইচ্ছা দান করে। যাহোক, চা খেয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথে গাইড এখানকার মন্দির সম্বন্ধে অনেক কথা জানালো। কার্তিক ও গণেশের পৃথিবী প্রদক্ষিণের গল্প বলে সে জানালো, যে গণেশের কাছে পরাজিত হয়ে ক্ষোভে দুঃখে কার্তিক এখানে এসে তার সমস্ত মাংস, দেহ থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে দুরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তার দেহের সমস্ত মাংস তামিলনাড়ুর মুরগান স্বামীতে গিয়ে পড়ে। “ওগুলো কার্তিকের মাংস, সেটা কে এবং কিভাবে শনাক্ত করলো”? আমার এই প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে সে জানালো, মুরগান স্বামীতে একটি কার্তিকের মন্দির স্থাপিত হয়। আর তার দেহের সমস্ত হাড় এখানে থেকে যায়। এখানেও এই মন্দিরটি স্থাপিত হয়। “হাড় এখানে আর মাংস মুরগান স্বামীতে, কার্তিক তাহলে কোথায় থাকে”? আমার এই প্রশ্নেরও কোন উত্তর না দিয়ে সে জানায়, কনকচৌরির কোন লোক মন থেকে চায় না, যে এখানে বেশি পর্যটকের ভিড় হোক। তাই এরা চায় না কার্তিক স্বামীর কোন প্রচার হোক, বেশি লোক এসে জায়গাটাকে কেদারনাথের মতো দুরবস্থা করুক। কিন্তু নেট থেকে ও আমাদের মতো পর্যটকদের কাছে গল্প শুনে এখানে দিন দিন ভিড় বাড়ছে।

এবার মন্দিরটি পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। পাশে পাথরের ওপর একটা গর্ত দেখিয়ে সে জানালো এটা একটা ঢেঁকি ছিল। কার্তিকের অঙ্গরক্ষিকা, বনদেবী এই ঢেঁকিতে খাদ্যদ্রব্য পিষতেন। দুর থেকে তাঁকে দেখা গেলেও কাছে গিয়ে কেউ তাঁর দেখা পায় নি। বনদেবী মশলা বা খাদ্যদ্রব্য কোথা থেকে পেতেন, কার জন্যই বা সব কাজ ফেলে ঢেঁকিতে পিষতেন, বলতে পারবো না। তবে মন্দির দর্শন করতে যাওয়ার পথে এখনও মেয়েরা ঐ গর্তের পাশে সিঁদুর, চুড়ি, ইত্যাদি রেখে যায়। মন্দিরে যাওয়ার পথের শেষ অংশটা হঠাৎ সোজা ওপরে উঠতে দেখে আতঙ্ক হ’ল। অবশেষে বেশ কিছু  খাড়া সিঁড়ি ভেঙ্গে ৩০৫০ মিটার উচ্চতায় কার্তিক স্বামী মন্দির চত্বরে হাজির হওয়া গেল। কার্তিক স্বামী মন্দির পৌঁছনোর আগে অপর একটি মন্দিরের দর্শন পাওয়া যায়, সেটি ভৈরব মন্দির।

     on-the-way-to-kartik-swami-8        on-the-way-to-kartik-swami-5         chandrashila-4

                                                         কার্তিক স্বামী যাওয়ার পথে

এখানেও চন্দ্রশিলার মতো ৩৬০ ডিগ্রী নৈসর্গিক শোভা দেখা যায়। তবে সূর্যদয়ের অনেক আগেই হাজির হয়েও সামান্য মেঘ থাকায়, বান্দর পুন্ছ, কেদার ডোম, মেরু-সুমেরু, চৌখাম্বা, নীলকন্ঠ, দোনাগিরি, নন্দা ঘুন্টি, ত্রিশুল ও নন্দাদেবীর একশ’ ভাগ শোভা থেকে আমাদের বঞ্চিত হতে হ’ল। লোক সমাগম ভালোই হয়েছে, সবই প্রায় হাওড়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বাঙালি। চারিদেকে ঝাঁ চকচকে বাঁধানো রেলিং দিয়ে ঘেরা চাতালের ওপর ছোট্ট মন্দির। চারিপাশে অজস্র ঘন্টা বাঁধা, হয়তো সন্তান কামনায় মানত করা। চন্দ্রশিলার মতো এখান থেকেও সমস্ত শিখর পরিস্কার দেখা যায়। ছোট্ট জায়গাটা ঘুরে দেখে প্রকৃতির রঙ রূপ উপভোগ করে ও ছবি তুলে অনেকক্ষণ কাটালাম, এবার ফেরার পালা।

     kartik-swami-41       kartik-swami-32      kartik-swami-17

                                                             কার্তিক স্বামী

ধীরে ধীরে পুরানো পথ ধরে নামতে শুরু করলাম। এ পথেও রোডোডেন্ড্রন ফুলের গাছের অভাব নেই। গতকাল সন্ধ্যায় অনেক দোকানেই গুরাস সরবৎ বিক্রি হতে দেখেছিলাম। চেখেও দেখেছিলাম। সুন্দর একটা মিষ্টি গন্ধ, খেতেও মন্দ নয়। এই গুরাস সরবৎটি নাকি রোডোডেন্ড্রন ফুল থেকে তৈরি হয় এবং হৃৎপিন্ডের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী। এঁকে বেঁকে একসময় একে একে সবাই হোটেলে ফিরে এসে হরিদ্বার ফেরার জন্য তৈরি হয়ে নিলাম। রাস্তার ওপর একটা দোকানে গতকাল বিভাসের অর্ডার দেওয়া জলখাবার ও চা খেয়ে, গাড়িতে মালপত্র গুছিয়ে তুলে উঠে বসলাম।

গাড়ি ছেড়ে দিল। না, আজ আর যাওয়ার মধ্যে কোন আনন্দ নেই। আমরা নতুন কোন জায়গা দেখতে যাচ্ছি না, আমরা ফিরে যাচ্ছি। স্বর্গ থেকে নরকে সেই একই পথে ফিরে গেলেও, সেই সৌন্দর্য আর চোখে পড়ছে কই?

কনকচৌরি থেকে এঁকেবেঁকে প্রায় বিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা যখন প্রায় মালতলি নামে একটা স্কুলের কাছাকাছি এসে পৌঁছলাম, তখন আবিস্কৃত হ’ল, যে রক্তিম তার পাশবালিশের মতো কভারে ঢাকা বিদেশী স্লিপিং ব্যাগটা কনকচৌরির হোটেলে ফেলে এসেছে। জিনিসটি ভালো, ও তার অতি প্রিয়। রক্তিম এই ক’দিনেই আমার অতি প্রিয় বন্ধু হয়ে গেছে, হয়তো বা ছোট ভাই। অত্যন্ত নিরীহ এই মানুষটির কাছ থেকে ভদ্রতা শিখতে হয়। শিবতুল্য এই মানুষটির মধ্যে সব ব্যাপারে একটা সঙ্কোচ ভাব আমায় বিষ্মিত করতো। তার জন্য কারো বিন্দুমাত্র কষ্ট হোক, অসুবিধা হোক, এটা সে কখনই মেনে নিতে পারতো না। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। বলতে দ্বিধা নেই, তার মতো একটা ভাই ও বন্ধু পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ। গাড়ি দাঁড় করিয়ে হোটেলে ফোন করা হলে তারা জানালো ঘরের খাটের ওপর সেটা ছিল। এই অঞ্চলটায় গাড়ির সংখ্যা অনেক কম, তাই তাদেরই অনুরোধ করা হ’ল ব্যাগটি আমাদের পৌঁছে দিয়ে যাবার জন্য। টনির সামান্য আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আমরা রাস্তার ওপর ঘুরে ফিরে ঘন্টা খানেকের ওপর অপেক্ষা করার পর, একটা অলটো গাড়ি এসে রক্তিমের পাশবালিশ ফেরৎ দিয়ে গেল। ঐ গাড়ির চালককে মাত্র আটশ’ টাকা ও আমাদের ও অর্পনদের গাড়ির চালককে অপেক্ষা করার খেসারত হিসাবে দু’শ’ টাকা দিয়ে বালিশ উদ্ধার পর্বের সমাপ্তি হ’ল। একেই বোধহয় ঢাকের দায়ে মনসা বিকানো বলে।

    near-maltoli-2         hardwar-12      hardwar

                মালতলি                                      হরিদ্বার                                        হরিদ্বার

যাহোক আবার সেই রুদ্রপ্রয়াগ হয়ে, একসময় আমরা শ্রীনগর এসে SHIVIKA HOTEL & RESTAURANT এ বসে দুপুরের খাবার খেলাম। অবশেষে দেবপ্রয়াগের ওপর দিয়ে সাতটা নাগাদ আবার সেই হরিদ্বার। স্টেশনের একবারে কাছে পাঁচশ’ টাকায় কয়েক ঘন্টার জন্য একটা হোটেলে ছোট একটা ঘর নিয়ে, সমস্ত মালপত্র রেখে যে যার মতো গঙ্গার ঘাটের পাশে কেনাকাটা, দাদা বৌদির হোটেলে কব্জি ডোবানো, রাবড়ির মান আগের মতোই আছে কি না, ইত্যাদি পরীক্ষা করতে চলে গেল। রক্তিম বালিশ ফিরে পাওয়ার আনন্দে হিমাদ্রি, অমলেন্দু ও আমাকে রাবড়ি ও জিলিপি খাইয়ে দিলো। সবাই ফিরে এলে পাশের একটা হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে মালপত্র নিয়ে স্টেশনে যাওয়া হ’ল। অবশেষ ১২৩২৮ ডাউন উপাসনা এক্সপ্রেস প্রায় ঠিক সময়, অর্থাৎ রাত এগারোটা পঞ্চান্ন মিনিটে আমাদের নিয়ে হাওড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। রক্তিম হিসাবের খাতা নিয়ে বসলো। খচ্চরের খরচ, সারা পথের খাবার জলের খরচ, হীরা সিং এর অতিরিক্ত টাকার দাবি, ইত্যাদি বাজেটের দশ হাজার টাকার মধ্যে ধরা ছিল না। তবু হিসাব শেষে প্রত্যেকে একশ’ তিয়াত্তর টাকা করে ফেরৎ পেলো। কুড়ি তারিখটা ট্রেনে কাটলেও সেরকম হৈচৈ লক্ষ করা গেল না। একুশ তারিখ ভোর ছটায় আমরা নিরাপদে হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছলাম।

সুবীর কুমার রায়।

১০-১১-১৯১৬

Advertisements

2 thoughts on “তুঙ্গনাথ-চন্দ্রশিলা {লেখাটি Tour & Tourists পত্রিকায় প্রকাশিত}

  1. বাঃ দারুন সুন্দর ভ্রমন কাহিনী।গল্পটা পড়তে পড়তে মনের চোখ দিয়ে অনেক সুন্দর সুন্দর দৃশ্য দেখে ফেল্লাম।খুব ভালো লাগলো। ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s