গোবরে পদ্মফুল {লেখাটি Pratilipi Bengali পত্রিকায় প্রকাশিত}

SRINAGAR (3)আমি তপনবাবুকে চিনতাম। হ্যাঁ, সেই ছোট্ট বেলা থেকেই আমি তপনবাবুকে চিনতাম। বিরাট একান্নবর্তী পরিবারের একমাত্র রোজগেরে পুরুষ। চাকরির সল্প আয়ে কোম্পানির দেওয়া কোয়ার্টার্সে নিজের স্ত্রী ও সাত সন্তান, বৃদ্ধ বাবা, মা, ভাই, ভ্রাতৃবধু ও তাদের চার সন্তান, তিন সন্তান সহ এক বাল্যবিধবা বোন, একটি অবিবাহিত বোন, ও দুই সন্তান সহ একটি কাজের বিধবা মহিলাকে নিয়ে তিনি তাঁর বিরাট সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন।

চার সন্তানের জনক, একমাত্র ভাই তুষার, শুধুমাত্র দূরে বদলি হওয়ার অজুহাতে, ঘুষ দিয়ে দাদার ব্যবস্থা করে দেওয়া ভালো চাকরিটি ছেড়ে, বিভিন্ন রকম ব্যবসা করার চেষ্টায় বৃদ্ধ পিতার শেষ পুঁজিটুকু প্রায় নিঃশেষ করে, আবার এক অবস্থাপন্ন অংশীদার জোগাড় করে অর্ডার সাপ্লায়ারের অংশীদারি ব্যবসা শুরু করেছেন।

শোনা যায় মার কাছে তাঁর সব সন্তানই নাকি সমান প্রিয়, হয়তো বা উনিশ-বিশ হয়। কিন্তু তপনবাবুর মার ছোটছেলেটির ওপর পক্ষপাতিত্ব বিশের কয়েকগুণ অধিক ছিল। ফলে নির্বিবাদী তপনবাবু শুধুমাত্র সংসারের একটি টাকা রোজগারের যন্ত্র, ও তাঁর স্ত্রীটি সংসারের প্রায় সমস্ত রকম কাজকর্ম করার পরিচারিকার ভূমিকা পালন করেই দিন যাপন করতেন।

এহেন মাতার মাতৃস্নেহে তপনবাবুর বিবাহিত জীবনটিও বড় অদ্ভুত, বড় সুন্দর, বড় সুখের ছিল। তপনবাবুর বিবাহের সময় কোন চাহিদা না থাকলেও তাঁর শ্বশুরমশাই তাঁর অতি আদরের কন্যা, সীতাকে চল্লিশ ভরি স্বর্ণালংকারে সাজিয়ে শ্বশুরালয়ে পাঠিয়ে ছিলেন। বিয়ের ঠিক সাত দিন পরেই তপনবাবুর এক বোনের বিবাহের দিন স্থির হয়ে থাকা সত্ত্বেও,  পূর্ব পরিকল্পিত ভাবেই আর সকলের মতো খাট, বিছানা, বা অন্যান্য অনেক কিছু দান সামগ্রীই স্নেহময়ী মাতাটি কেনার কোন প্রয়োজন বোধ করেন নি। হয়তো তপনবাবুর ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ লাঘব করতেই তাঁর বিবাহের দান স্বরূপ পাওয়া ঐসব সামগ্রী অব্যবহৃত রেখে সাতদিন পরে কন্যার বিবাহে দান স্বরূপ পাঠিয়ে দেন, এবং প্রায় প্রথম থেকেই কারণে অকারণে সংসারের নানা প্রয়োজনীয় এমনকী নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতেও সীতার গয়না, নগদ টাকার ভূমিকা পালন করতে থাকে। তুষারবাবু নিতান্ত পয়সার অভাবে তাঁর প্রথম সন্তানের মুখ দেখতে শ্বশুরালয়ে যেতে পারছেন না, সোনা ছাড়া প্রথম সন্তানের মুখ দেখাও যায় না, উচিৎও নয়। তুষারবাবুর স্ত্রী সংসারের ছোট বউ, তাছাড়া তার গয়নার পরিমানও সীতার মতো অঢেল নয়। সুতরাং বোলাও স্যাঁকরাকে, সীতার একটি গয়না ভেঙ্গে সন্তানের মুখ দেখার সুব্যবস্থা করে, তুষারবাবুর মুখ রক্ষা করা হ’ল।

সত্য কিনা জানি না, তবে অনেকেই বলেন, বিবাহের দানের জিনিস নাকি অন্য কারোর বিবাহে দান হিসাবে দেওয়া অমঙ্গলজনক। তপনবাবুর এই বোনটিও তিন সন্তানসহ বিধবা হয়ে, তপনবাবুর সংসারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বাল্যবিধবা বোনকে নিজের আশ্রয়ে স্থান দিতে তপনবাবু কিছুমাত্র কুন্ঠাবোধ করেন নি। কারণ তাঁর মতে শুধুমাত্র স্ত্রী ও সন্তান নিয়েই সংসার নয়, নিকট সকলকে নিয়েই সুখের সংসার হয়। সেই আপ্ত বাক্য, ‘যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন’।

তপনবাবুর গরু পোষার যথেষ্ট সখ থাকায়, কোয়ার্টার্সের পাশের ফাঁকা জমিতে গোয়ালঘর করে অতি যত্নে দুইটি গরু রেখেছিলেন। শুধু গরু পোষার খরচ নয়, গরু দুইটির তদারকিও তিনি নিজের হাতেই করতেন। বাড়িতে অনেক দুধের যোগান থাকলেও কিন্তু ভাইপো-ভাইঝি, বোনপো-বোনঝি, বৃদ্ধ পিতা-মাতা, মায় পরিচারিকা ও তার দুই সন্তানের  চাহিদা পুরণ করে, অধিকাংশ দিনই নিজের সন্তানদের দুধের স্বাদ গ্রহণ করার সৌভাগ্য হতো না। তপনবাবুর সংসারের সকলের প্রতি অসীম টান ও ভালোবাসা থাকায়, নিজের স্ত্রী সন্তানদের প্রতি আলাদা ভাবে নজর দেওয়া পছন্দও করতেন না, হয়তো বিশেষ প্রয়োজনও বোধ করেন নি। তার অর্থ কিন্তু এই নয় যে নিজের স্ত্রী সন্তানদের প্রতি তাঁর স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা বা দায়িত্ব বোধের কিছুমাত্র অভাব ছিল। সংসারের সকলের প্রয়োজনটাই মুখ্য, কারো প্রয়োজন গৌণ বলে তিনি ভাবতেও পারতেন না। আর সকলের চাহিদা মেটাতে গিয়ে নিজের স্ত্রী সন্তানের কিছু অভাব হতেই পারে। তাই এতো কিছুর পরেও কিন্তু তপনবাবুর কোনরকম ক্ষোভ বা অসন্তুষ্টির কারণ দেখা দেয় নি। কিন্তু তুষারবাবুর ব্যবসাটি ধীরে ধীরে ফুলে ফেঁপে ওঠায়, সমস্যাটা আসলো অন্য দিক থেকে। তুষারবাবুর পক্ষে এতটুকু বাসার এই কষ্ট অসহনীয় হয়ে ওঠায়, সন্তানদের কষ্টে বিচলিত হয়ে ওঠায়, অন্যত্র বাসা ভাড়া করে উঠে যাওয়া ছাড়া আর গত্যন্তর রইল না। কোন্ পিতা চায় যে তার সন্তানরা কষ্টে থাকুক? তাই তিনি দুই-আড়াই কিলোমিটার দুরে একটি বাড়ি ভাড়া করে বাড়ির আর সকলকেই তপনবাবুর সংসারে নিরাপদে রেখে উঠে গেলেন। স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে সুখের সংসারে আর কারো স্থান হ’ল না।

ভাই এর এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে তাঁর কোন উপকার না হলেও, তপনবাবু উল্লাসিত হলেন। বৃদ্ধ বাবা মা আগের মতোই তাঁর কাছে রইলেন। মায়ের মন, কোলের ছেলে কিভাবে আছে, কি খাচ্ছে, ছোট বৌমা তাকে সময় মতো ভাত রেঁধে দিতে পারছে কী না, এই চিন্তায় তিনি বড়ই মনোকষ্টে থাকতেন। ফলে ছোট বৌমা কখনও অসুস্থ হয়ে পড়লে সীতাকে রাত থাকতে উঠে নিজের সংসারের রান্নার কাজ সেরে শ্বাশুরীর নির্দেশে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ হেঁটে গিয়ে, তুষারবাবুর কষ্ট হবে বলে তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে, আবার আড়াই কিলোমিটার পথ ভেঙ্গে ফিরে এসে নিজের সংসার সামলাতে হতো।

তুষারবাবুর ব্যবসার তখন রমরমা অবস্থা। একটি বড় কারখানা, কলকাতার বুকে অফিস। কর্মচারীর প্রয়োজনও দিনে দিনে বৃদ্ধি পাওয়ায় নিজের আত্মীয় স্বজনরা বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত হ’ল। বিধবা বোনের বড় পুত্রও তখন ছোটমামার ব্যবসায় কাজ করে। ফলে কিছু আয়ের সংস্থান হওয়ায় বিধবা বোনটি শ্বশুরের ভিটায় ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে চলে গেলেন। সংসারের লোক সংখ্যা কিছু কমলো বটে, কিন্তু ততদিনে তপনবাবু সংসারের জোয়াল টানতে টানতে আকন্ঠ ঋণে জর্জরিত। সীতার গয়নাও সংসারের মঙ্গলে প্রায় নিঃশেষিত।

এর মধ্যে আবার তপনবাবুর অবিবাহিত ছোটবোন, প্রায় বেকার একজনের সাথে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে। কিন্তু অর্থহীন প্রেমের যা পরিণতি হয়, এক্ষেত্রেও তাই হতে বিলম্ব হ’ল না। বছর দুয়েকের মধ্যেই তপনবাবু খবর পেলেন যে তাঁর ছোটবোন প্রবল অর্থাভাবে লোকের বাড়ি বাসন মাজার কাজ ধরেছে। ফলে পরিবারের সম্মান বাঁচাতে নতুন করে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে ধামা ভরা মুদিখানা ও অন্যান্য সাংসারিক প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেতে লাগলো। ছোটবোন তাঁর মায়েরই সন্তান, পরমাত্মীয়, তার সংসার মানে তো নিজেরই সংসার। পরবর্তীকালে ছোট ভগ্নীপতিটিও তুষারবাবুর ব্যবসায় কর্মচারী হিসাবে নিযুক্ত হলেন।

স্বামী মারা যাওয়ার পরে তপনবাবুর মা পাকাপাকি ভাবে ছোটছেলের নিজস্ব নতুন বাসায় চলে গেলেন। বড় রাস্তার ওপর বড়লোক ছেলের নিজের বিশাল দোতলা বাড়িতে তখন তাঁর নিজের আলাদা ঘর, আলাদা রান্নাঘর। এই অতিরিক্ত সুখ স্বাচ্ছন্দের প্রতিদান স্বরূপই হয়তো তিনি দুই পক্ষের নাতি-নাতনিদের প্রতিও ভিন্ন রকম টান অনুভব করতে শুরু করেন। ক্রমে বাসে ট্রামে যাতায়াত করার কষ্ট আর সহ্য না হওয়ায়, তুষারবাবু মোটর গাড়ি কিনলেন। বাড়িতে  রেফ্রিজারেটর, টেলিফোন, একে একে সব এলো। গভর্নমেন্টের বিশেষ একটি প্রজেক্টে তিনি মাল সরবরাহ করেন। ঐ সংস্থার একজন বিশেষ অফিসারের কৃপায় মাল সরবরাহের টেন্ডারটিও তাঁর অনুকুলে যেতেও কোন অসুবিধা হয় না। দুপক্ষেরই লাভের পরিমাণ যথেষ্ট। মাঝে মাঝেই সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকারের জন্য পার্টি থ্রো হয়। ধীরে ধীরে গরম পানীয়র অভ্যাসটুকু পার্টি ছেড়ে বাড়ির অন্দর মহলে স্থান পেলো।

দিন যায়, ভাই অন্তঃপ্রাণ তপনবাবু এখন শুধুমাত্র নিজের স্ত্রী পুত্র কন্যাদের নিয়ে বসবাস করেন। সংসার খরচ ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ যোগাতে প্রতিমাসেই ঋণ করতে হয়। গরীব হওয়ার অপরাধেই হয়তো তাঁর বাসায় কেউ আসেন না। তবে প্রতি সপ্তাহে তিনি নিজে বাসভাড়ার খরচ না করে, হেঁটেই মা ও ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যান।

হঠাৎ এক বিপদের সময় অসহায় তপনবাবু তাঁর ভাইয়ের কাছে সামান্য কিছু টাকা ধার চাইলেন। তপনবাবুর বিশ্বাস ছিল যে, যে ভাইয়ের সংসার একদিন তিনি বছরের পর বছর চালিয়েছেন, আজ এই বিপদের দিনে ভাই এর কাছে কিছু টাকা পাওয়া যাবেই। পাওয়াও গেল, তবে ভবিষ্যতে টাকা পরিশোধের সম্ভাবনা যথেষ্ট ক্ষীণ বিবেচিত হওয়ায়, সীতার গলার একমাত্র ভারী হারটি ভাইয়ের কাছে বন্ধক রাখতে হ’ল। তা হোক, ভাইয়ের কাছে থাকা আর নিজের কাছে থাকা একই ব্যাপার। অল্প টাকার ব্যাপার, টাকা ফেরৎ দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসলেই হ’ল।

দিন যায়, ভাই অন্তঃপ্রাণ তপনবাবু এখন শুধুমাত্র নিজের স্ত্রী পুত্র কন্যাদের নিয়ে বসবাস করেন। সংসার খরচ ও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ যোগাতে প্রতিমাসেই ঋণ করতে হয়। গরীব হওয়ার অপরাধেই হয়তো তাঁর বাসায় কেউ আসেন না। তবে প্রতি সপ্তাহে তিনি নিজে বাসভাড়ার খরচ না করে, হেঁটেই মা ও ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যান।

হঠাৎ এক বিপদের সময় অসহায় তপনবাবু তাঁর ভাইয়ের কাছে সামান্য কিছু টাকা ধার চাইলেন। তপনবাবুর বিশ্বাস ছিল যে, যে ভাইয়ের সংসার একদিন তিনি বছরের পর বছর চালিয়েছেন, আজ এই বিপদের দিনে ভাই এর কাছে কিছু টাকা পাওয়া যাবেই। পাওয়াও গেল, তবে ভবিষ্যতে টাকা পরিশোধের সম্ভাবনা যথেষ্ট ক্ষীণ বিবেচিত হওয়ায়, সীতার গলার একমাত্র ভারী হারটি ভাইয়ের কাছে বন্ধক রাখতে হ’ল। তা হোক, ভাইয়ের কাছে থাকা আর নিজের কাছে থাকা একই ব্যাপার। অল্প টাকার ব্যাপার, টাকা ফেরৎ দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসলেই হ’ল।

বাজারে ভাইয়ের পছন্দের ভালো মাছ বা অন্যান্য কিছু দেখলে, তপনবাবু আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারতেন না। নিজের পরিবারকে বঞ্চিত করেও নিজের ছেলেদের কারো হাতে ভাইয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে শান্তি পেতেন। যদিও সেই মাছ ভাই ছুঁয়েও দেখতেন কী না সন্দেহ, কারণ আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে ভাইয়ের রুচিরও পরিবর্তন হয়েছে যথেষ্টই।

এইভাবে বেশ চলছিল, কিন্তু তপনবাবু সেদিন ভাইয়ের ব্যবহারে প্রথম আঘাত পেলেন, যেদিন ছেলের পরীক্ষার ফিজ জমা দেওয়ায় অসুবিধা দেখা দেওয়ায় তপনবাবু ভাইয়ের কাছে আবার কিছু টাকা ধার চাইলেন। ভাই টাকা দিতে অস্বীকার করায় তপনবাবু আবার অনুরোধ করেন ও তার কাছে বন্ধক রাখা হারটির কথা উল্লেখ করেন। উত্তেজিত ভাই, হয়তো বা নেশার ঝোঁকেই বলেন, “সেটাতো বিক্রি করে দিয়েছো, এক ছাগলকে কতবার কাটবে”? খালি হাতে ফিরে আসার পর, ছেলেদের তীব্র আপত্তিতে তপনবাবু এরপর থেকে ভাইয়ের কাছে যাওয়া কমাতে বাধ্য হলেন।

কর্মফল কথাটা শুনলেও আমার তাতে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস বা আস্থা নেই, তবু কাকতালীয় কিনা জানি না, এক্ষেত্রেও অবস্থার পরিবর্তন দেখা দিল। কবি বলেছেন ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়’, হয়তো তাই। তপনবাবুর তিন ছেলেই একে একে ভালো সরকারী চাকরি পাওয়ায়, এতদিনে সংসারটা আর্থিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখলো। নিজেদের মাথা গোঁজার একটা বাড়িও হ’ল। ইতিমধ্যে মেয়েদের ভালো বিয়েও হয়ে যাওয়ায়, সংসারটা একটা সুস্থ ও সুন্দর গতি পেল। অপরদিকে যার বলে বলীয়ান হয়ে তুষারবাবু ব্যবসাটিকে এই জায়গায় নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছিলেন, সেই অফিসারটি হঠাৎ অধিক লাভের সন্ধান পেয়ে তাঁর ওপর থেকে কৃপাদৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে নতুন একজন সাপ্লায়ারের ওপর ফেলায় তুষারবাবুর ব্যবসার তরীটিতে এক বিরাট ছিদ্র দেখা দিল।

তরী ডুববার সময় তরীটিকে মেরামত করে আবার সচল করার পরিবর্তে সকলেই তরীর সম্পদ আহরণ বা লুটের দিকে অনেক বেশি নজর দিলো, অবশ্য মেরামত করবার মতো ব্যবসায়িক বিদ্যাবুদ্ধিও কারো ছিল না। কেউই ব্যবসা করতে শেখেন নি, ঐ অফিসারের আশীর্বাদে বছরের পর বছর ব্যবসায়িক মুনাফা ভোগ করে এসেছেন মাত্র। ফলে ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচার আশায়, ব্যবসাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার বাসনায়, বাড়িটি ব্যাঙ্কে বন্ধক দিতে হ’ল। আশপাশের পরমাত্মীয় কর্মচরীরা এই ঘোলা জলে যে যার ক্ষমতা ও বুদ্ধিমতো মাছ ধরে তাঁকে পরিত্যাগ করে বাঁচার অন্য রাস্তা দেখলেন। টাইটানিকের মতোই ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসা একদিন সত্যিই ডুবে গেল।

প্রথম প্রথম শোকে দুঃখে নিয়মিত গরম পানীয় পানের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও, ধীরে ধীরে সংসার খরচার চাপে অত্যন্ত নিম্নমানের চা পান করাতেও অসুবিধা দেখা দিলো। বাড়ি থেকে ঠাকুর, চাকর, ড্রাইভার বিদায় হ’ল। তুষারবাবুর এই দুরবস্থায় যিনি সবথেকে বেশি কষ্ট পেলেন, তিনি আর কেউ নন্, সেই তপনবাবু। এখনও তিনি প্রতি সপ্তাহেই ভাইয়ের কাছে ছুটে যান। ভাইয়ের এর দুরবস্থায় কিছু অর্থ সাহায্য করার ইচ্ছা থাকলেও, ছেলেদের ভয়ে সেটা আর করার সাহস করেন না। অবশ্য লুকিয়ে সেটা করেন কী না জানা যায় না।

এরমধ্যে হঠাৎ তাঁদের মাতৃবিয়োগ হ’ল। তুষারবাবু যখন ঘটনাটা দাদাকে জানালেন, ততক্ষণে মৃতদেহ শ্মশানঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়ে গেছে। তপনবাবু খবর পেয়ে শ্মশানে গিয়ে দেখলেন, অনেক আগেই শবদেহ দাহ করা শুরু হয়ে গেছে। শবদাহ শেষে কাছা নিয়ে তপনবাবু বাসায় ফিরলেন।

আরও বেশ কয়েক বছর এইভাবেই কাটার পর, তপনবাবু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শে তাঁকে এক নামী হাসপাতালে ভর্তি করানো হ’ল। নামের শেষে হাসপাতাল কথাটি লেজের মতো জুড়ে থাকলেও, আসলে সেটি একটি নার্সিংহোম ছাড়া কিছু নয়। খরচের বহরও যথেষ্ট। তুষারবাবুকে খবরটা দেওয়া হ’ল, তিনি বা তাঁর বাড়ির কেউ একবার দেখা করতেও গেলেন না। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসার পরও নয়।

আবার আগের মতোই দিন কাটতে লাগলো। তপনবাবু সময় সুযোগ পেলেই ভাইয়ের বাসায় গিয়ে ভাইকে দেখে আসেন। কিন্তু বছর তিনেকের মধ্যেই তাঁকে আবার ভর্তি করতে হ’ল। কয়েকদিন পরে ফিরেও এলেন বটে, তবে এবার কিন্তু তাঁকে অ্যাম্বুলেন্স করে নয়, কাচের গাড়িতে করে বাড়ি নিয়ে আসা হ’ল। ছোটবোন এসে কান্নাকাটি করলেও, আদরের ভাইটি বা তাঁর কোন প্রতিনিধিকে কিন্তু আসতে দেখা যায় নি।

এর আরও বেশ কয়েক বছর পরে তুষারবাবুর মৃত্যু হয়। মৃতদেহের পাশে কিন্তু সেইসব আদরের আত্মীয় কর্মচারী, যাদের কাছে তিনি স্যার রূপে পরিচিত ছিলেন, দেখা গেল না। আজ তুষারবাবু নেই, তাঁর সন্তানেরা তাঁর গর্বের প্রাসাদটিকেও রক্ষা করতে পারে নি। প্রোমোটারের দয়ায় ব্যাঙ্কের ঋণ শোধ করে বাড়ি বেচে যৎসামান্য যা পেয়েছিল, সেই অর্থও নিশেঃষিত হয়ে এখন তারা প্রায় কপর্দকহীন অবস্থায় ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে দিন গুজরান করছে। হয়তো বা কর্মফল আস্বাদন করছে।

সুবীর কুমার রায়।

২৭-১১-২০১৬

Advertisements

2 thoughts on “গোবরে পদ্মফুল {লেখাটি Pratilipi Bengali পত্রিকায় প্রকাশিত}

  1. সত্যি একেই বলে যেমন কর্ম তেমনি ফল।যে যা করে তাকে তার কর্মের ফল এই জীবনেই শোধ করে যেতে হয়।এখানেও তাই হল।ভালো মানুষ দাদাকে ঠকিয়ে ছিল তাই শেষ পর্যন্ত তার নিজের ছেলেরাই পাপের ফল ভোগ করল।ঠিকই আছে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s