ভবা {লেখাটি পাক্ষিক ‘গল্পগুচ্ছ’, সুপ্ত প্রতিভা-Supto Protibha , Pratilipi Bengali , সন্দেশ Sandesh(Magazine) , ছোটগল্প – ChhotoGalpo , অক্ষর-Akshar , বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত}

DSCN9767মৃত্যুর একুশ দিনের মাথায় ভবার কাছে ঈশ্বরের ডাক পড়লো। সাধারণত মৃত্যুর একুশ দিন পরে, মানুষের পারলৌকিক কাজ হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে সেটা দশ দিন, আবার অপঘাতে মৃত্যু হলে তিন দিনের দিন কাজ হয়। ভবার ক্ষেত্রে এর কোনটাই হয় নি, হয় নি কারণ তার পারলৌকিক কাজ করার মতো এ জগতে কেউ ছিল না। খুঁজলে হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু তাদের খোঁজ না ভবা জানতো, না স্থানীয় মানুষ।

ভবা ওপারে গিয়ে জেনেছে যে এ দেশের প্রায় সব মানুষই মৃত্যুর পরে নরকে স্থান পেলেও, তাকে আর কিছু হাতে গোনা মানুষের সাথে স্বর্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কারণ তার জীবনে কোন পূণ্য সঞ্চয় না হয়ে থাকলেও পাপ বলে কিছু নেই। পাপ নেই, কারণ সারা জীবনে তার পাপ করার মতো বুদ্ধি বা ক্ষমতা, কোনটাই ছিলই না। নিত্যনতুন লাঠি হাতে যখন তখন মানুষকে তেড়ে গেলেও, কোনদিন কাউকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে, এমন কোন নথি বা অভিযোগও তার বিরুদ্ধে নেই।

ভবা ঈশ্বরের প্রতিনিধির সাথে পুনর্জন্ম বিভাগের দেবতাটির ঘরে গিয়ে হাজির হ’ল। সেখানে বেশ কিছু স্বর্গবাসীর পুনর্জন্ম নিয়ে পৃথিবীতে যাবার আগে ইন্টারভিউ ও কাউনসেলিং-এ তাদের প্রথম ইচ্ছা জানাচ্ছে। কেউ বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়, কেউ ইঞ্জিনিয়র, কেউ ব্যারিস্টার, কেউ বা আই.টি. সেক্টরে কাজ করতে চায়, তবে রাজনীতি করে এম.এল.এ., এম.পি., বা মন্ত্রী হবার চাহিদা সবার থেকে বেশি। গত জন্মের পাপ পূণ্যের মার্কসের ওপর তাদের যখন প্লেসমেন্ট দেওয়া হবে, ঠিক সেই সময় ভবা মিনতি করে জানালো, আমি আর নতুন করে মানুষ হয়ে জন্ম নিতে চাই না। গত জন্মে জীবিত অবস্থায় বিয়াল্লিশ বছরের জীবনে কিছুই দেখি নি, কিছুই বুঝি নি, কিছুই শিখি নি। কিন্তু মৃত অবস্থায় এই একুশ দিনে যা শিখলাম, একশ’ বছর বেঁচে থাকলেও তার কণামাত্র শিখতে পারতাম না। যদি আমাকে পৃথিবীতে আবার পাঠাতেই হয়, তাহলে দয়া করে মানুষের অত্যাচার ও নির্দয় ব্যবহারের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো কোন বন্যপ্রাণী হিসাবে নতুন জন্মে পৃথিবীতে পাঠান।

এরকম অদ্ভুত প্রস্তাবে সবাইকে বিব্রত ও অবাক হতে দেখে ভবা জানায়, যে গত জন্মে তার কোন কিছু বুঝবার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু মৃত্যুর সাথে সাথেই আগের দেহ পরিত্যাগ করায় তার ছোট বেলা থেকে সমস্ত ঘটনাই এখন সে স্পষ্ট দেখতে পায়, মনে করতে পারে। ছোট বেলা থেকেই সে উন্মাদ হওয়ায়, সে সারাটা জীবন রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বা প্রচন্ড শীতে রাস্তায় রাস্তায় খোলা আকাশের নীচে কাটিয়েছে। অর্ধেক দিন সে অনাহারে কাটিয়েছে, কেউ তাকে এক টুকরো রুটি দিয়ে প্রচন্ড খিদের হাত থেকে রক্ষা করে নি। প্রচন্ড জ্বরে কাবু হয়ে কষ্ট পেলে, বা অন্য কোন রোগে অর্ধমৃত হয়ে দিনের পর দিন রাস্তায় পড়ে থাকলেও, কোন ডাক্তারকে পাশ দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাবার পথে কোন রকম চিকিৎসা সংক্রান্ত সাহায্য করতে দেখেনি। পুলিশ বা প্রশাসনেরও আমাকে নিয়ে কোন দায় বা মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু আমার কদর সেই মুহুর্ত থেকে বেড়ে যায়, বলা যায় জামাই আদর পেতে শুরু করি সেই মুহর্ত থেকে, যখন বহুদিন রোগ ভোগের পর আমার দেহ থেকে প্রাণটা বেড়িয়ে যায়। আমি ভি.আই.পি. বনে গেলাম।

কত সাধারণ মানুষ এমনকী পুলিশ পর্যন্ত আমাকে দেখতে এলো। কতদিনের সখ ছিল একবার মটোর গাড়ি চাপার। কোনদিন সুযোগ হয় নি। একবার প্রবল বৃষ্টিতে রাস্তায় এক কোমর জলে একটা মোটর গাড়ি খারাপ হয়ে গেলে সবাই ঠেলছে দেখে আমিও মনের আনন্দে ঠেলবার জন্য গাড়িতে হাত লাগাই। ওঃ! গাড়িতে হাত দেওয়ার অপরাধে কী মারটাই না খেয়েছিলাম। গাড়ি না চাপতে পারার দুঃখ, গাড়িতে হাত দিয়ে মার খাওয়ার দুঃখ, ডাক্তারদের আমায় দেখে নাকে রুমাল চেপে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার দুঃখ, আমার এত বছর পর ঘুচলো, যখন দেখলাম কানে নল গুঁজে এক ডাক্তার আমারই হাতের কব্জি টিপে ধরে, পরীক্ষা করছে, যখন দেখলাম আমাকে একটা কাচের গাড়ি করে রীতিমতো শুইয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এক জায়গায় নিয়ে গিয়ে আমার কপাল, বুক, পেট, সব কেটে পরীক্ষা করা হ’ল। আমার ফটো পর্যন্ত তোলা হ’ল। আমাকে নিয়ে মানুষগুলো কত ব্যস্ত, আমার প্রতি কী সহানুভুতি। এতগুলো বছর আমি তো মানুষের কাছ থেকে শুধু একটু সহানুভুতি ছাড়া কিছুই চাই নি। পেলাম, কিন্তু বড় দেরিতে, পরপারে যাবার পরে। না আমায় এরকম মৃত মানুষ হয়েই থাকতে দিন। এই একুশ দিনেই আমি বুঝেছি জীবনের থেকে মৃত্যু অনেক শ্রেয়। জীবন্ত মানুষের ভিড়ে আর আমি ফিরে যেতে চাই না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়র, ব্যারিস্টার, আমি কিছুই হতে চাই না। আমি শুধু চাই কণামাত্র শান্তি, ভালোবাসা, প্রেম, মানবতা, যা আমি গত বিয়াল্লিশ বছর ধরে আশা করেও পাই নি। স্বর্গ, নরক, যেখানে খুশি আমায় থাকতে দিন, থাকতে দিন মৃত উলঙ্গ মানুষগুলোর সঙ্গে। যাদের মুখোশ পরে থাকার প্রয়োজন নেই, লোক ঠকিয়ে নিজের বৈভব বাড়াবার চেষ্টা নেই, মানুষ হয়েও হিংস্র শ্বাপদের মতো মানুষের রক্ত চুষে খাওয়ার মনোবৃত্তি নেই, বৃদ্ধ বিকলাঙ্গ অসহায় মানুষকে অমানুষ ভাবার মানসিকতা নেই, মেয়েদের নিজের মা, বোন, বা কন্যা ভাবতে অসুবিধা নেই।

ঈশ্বর নীরব, যে লোকটা বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গত বিয়াল্লিশটা বছর অনাহারে, অনাদরে, অনিদ্রায়, পথে পথে লাঠি হাতে নোংরা বোঁচকা কাঁধে রোদ বৃষ্টি ঝড়ে ঘুরে বেড়িয়েছে, তার মুখ থেকে এই দুঃখ, এই ক্ষোভ, এই অভিমান, তিনি আশা করেন নি। সত্যি কোথাও একটা বড় ভুল হয়ে গেছে, তিনি আজকের মতো ইন্টরভিউ মুলতুবি রাখতে বাধ্য হলেন।

সুবীর কুমার রায়।

০২-১২-২০১৬

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s