বেতলা অভয়ারণ্য {লেখাটি Tour & Tourists ও Week end tours from Kolkata পত্রিকায় প্রকাশিত}

palamou-fort-37 অনেক অরণ্য দেখা হলেও, বেতলা অভয়ারণ্য যাওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সঙ্গীর অভাব, ছুটির অভাব, মশার আধিক্য, ইত্যাদি নানা কারণে বেতলা দর্শন থেকে বঞ্চিত হয়ে দীর্ঘ এতগুলো বৎসর কেটে গেল। এতদিন পরে সে সুযোগ এসে যাওয়ায়, আর উপেক্ষা না করে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে, যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি হয়ে গেলাম।

২২-১২-২০১৬ তরিখে দুপুরে ১১৪৪৮ নম্বর শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেসে আমরা ছয় জন, একটি প্রায় চার বছরের শিশুকে নিয়ে ডালটনগঞ্জের উদ্দেশ্যে আসন দখল করে বসলাম। নির্দিষ্ট স্টেশনে নাজিমুল্লা আমাদের জন্য তার জীপ্ নিয়ে অপেক্ষা করবে, তাই কথামতো ট্রেন রাত একটা বেজে দশ মিনিটে  ডালটনগঞ্জ পৌঁছলেও অসুবিধা হবার কথা নয়। বেতলা অভয়ারণ্যের ট্রী হাউসটির দুটো ঘরই তেইশ  ও চব্বিশ তারিখে আমাদের নাম বুক করা আছে, কথা আছে বাইশ তারিখে কোন বুকিং না থাকলে, রাতটা আমাদের ট্রী হাউস বা অন্যত্র কোথাও থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা নাজিমুল্লাই করে দেবে।

ট্রেন প্রায় ঠিক সময়ে হাওড়া স্টেশন পরিত্যাগ করলে, আমরা নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব ও গুলতানি করে মনের আনন্দে এগিয়ে চললাম। বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ট্রেন ধানবাদ পৌঁছলে আই.আর. সি.টি.সি. আমাদের রাতের খাবার দিয়ে যাবে, কাজেই চিন্তামুক্ত সফর বলা যেতেই পারে।

নির্দিষ্ট সময়ের বেশ কিছু পরে আমরা ধানবাদ এসে পৌছলাম। কথামতো  রাতের খাবারও আমাদের সরবরাহ করা হ’ল। দুটি ভেজ থালি ও দুটি ননভেজ থালির জন্য খরচ পড়লো ৭৮৯ টাকা, তবে খাবারের মান ও পরিমাণ, দুটোই বেশ ভালো।

একটু রাতের দিকেই নাজিমুল্লা ফোন করে জানালো, যে জঙ্গলের সব ঘর বুকিং হয়ে গেছে, কাজেই সে আমাদের অনুমতি পেলে আজ রাতটার মতো কোন হোটেলে ঘর সংরক্ষণ করে রাখবে। আমাদের হাতে এছাড়া কোন বিকল্প না থাকায় আমরা রাজি হয়ে গেলাম।

রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে অল্প সময়ের জন্য হলেও যে যার বার্থে একটু শোয়ার ব্যবস্থা করে নিলাম। আরও অনেক পরে নাজিমুল্লা আবার ফোন করে জানালো, যে আমরা যেন তাকে লাটেহার স্টেশনে পৌঁছে একবার ফোন করি। সে আরও জানতে চাইলো যে আমরা ডালটনগঞ্জ নামতে চাই,  না বারওয়াডি জংশন এ নামতে চাই। নাও ঠ্যালা, এতো “আদ্যানাথের নাম শোননি? খগেনকে তো চেনো”?-এর মতো ব্যাপার হ’ল, ডালটনগঞ্জ বা বারওয়াডি, দুটোই আমার অচেনা-অজানা জায়গা। নাজিমুল্লা জানালো ডালটনগঞ্জের ঠিক আগে বারওয়াডিতেই নেমে পড়তে, তাহলে বেতলা অনেক কাছে হবে। ট্রেন ডালটনগঞ্জ পৌঁছনোর আগেই আমরা বেতলা পৌঁছে যাব। তাই ঠিক হ’ল। আমরা এখন কোথায় আছি জেনে নিয়ে ও জানালো আমরা রাত বারোটা নাগাদ লাটেহার পৌঁছাব, লাটেহার পৌঁছে আমরা যেন তাকে আর একবার ফোন করি। মোবাইলে পৌনে বারোটা নাগাদ অ্যালার্ম দিয়ে দিলাম, অযথা ঝুঁকি নেওয়ার কোন মানে হয় না।

লাটেহার এসে তাকে ফোন করলাম। গাড়ি অনেকটাই বিলম্বে ছুটলেও এখন তার পরিমাণ অনেকটাই কমে গেছে। রাত বাড়ছে, সঙ্গে ঠান্ডাও বাড়ছে। সাথে তিনটি মহিলা ও একটা শিশু আছে, তাই একটা চিন্তা ছিলই। রাত একটা পনেরো নাগাদ নাজিমুল্লা ফোন করে জানালো যে সে বারওয়াডি রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এবার নিশ্চিন্ত। আমি দেখেছি আমার সমস্ত ভ্রমণের ক্ষেত্রেই ড্রাইভার ভাগ্য বেশ অনুকুল হয়, আর আমার বিশ্বাস, ভ্রমণের ভবিষ্যৎ ও সুস্থতা অনেকাংশেই ড্রাইভারের ওপরেই নির্ভর করে।

রাত একটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে আমরা মালপত্র নিয়ে বেশ ঠান্ডায় বারওয়াডি জংশন রেলওয়ে স্টেশনে নামলাম। নাজিমুল্লা এগিয়ে এসে করমর্দন করলো। মাঝবয়সী মানুষটির কথাবার্তায় আন্তরিকতার ছাপ যথেষ্ট। ওভারব্রিজ দিয়ে আমরা স্টেশনের বাইরে এসে হাজির হলাম। স্টেশনের বাইরেই ওর জীপ্ দাঁড়িয়ে আছে। ও নিজেই বেশ যত্ন করে জীপের পিছনে আমাদের মালপত্র সাজিয়ে রাখলো। ইতিমধ্যে এক হৃষ্টপুষ্ট বৃদ্ধ, আমাদের জীপে স্থান করে নেওয়ার চেষ্টা চালাতে শুরু করে দিয়েছেন। জীপের মাথায় মালপত্র না তোলায়, আমাদেরই দুজনকে বেশ কষ্টে পিছনে বসতে হয়েছে তার ওপর এই বৃদ্ধকে ঠাঁই দেওয়া বেশ মুশকিল। পিছনে যা জায়গা আছে, তিনটে পাতিলেবু কষ্টেসৃষ্টে রাখা যেতে পারে, কিন্তু দুটো পাতিলেবু ও একটা বাতাবি লেবু রাখা অসম্ভব। কিন্তু তাঁর হাঁটুতে সমস্যা আছে ও হাঁটুতে অস্ত্রোপচার হবে শুনে তাঁকেও জায়গা দেওয়া হ’ল। তিনি অর্ধেক ঝুলে, অর্ধেক বসে,  কোনমতে আমাদের জীপে এগিয়ে চললেন। আমরা দুধারে জঙ্গল মাঝখানে সরু মোরামের রাস্তা দিয়ে অনেকটা পথ পার হয়ে, পাকা রাস্তায় এসে উঠলে, তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে নেমে গেলেন। আমরা জীপ্ নিয়ে এগিয়ে গেলাম। আরও কিছুটা পথ গিয়ে আমরা বেতলা অভয়ারণ্যের ঠিক উল্টো দিকে হোটেল দেবযানীতে এসে উপস্থিত হলাম। অনেকটা জায়গা নিয়ে বড় বড় গাছপালা ঘেরা বাড়িটি বাইরে থেকে দেখে মন্দ লাগলো না। রাত দুটোর সময় হোটলের ভিতরে গিয়ে আমাদের জন্য সংরক্ষিত ঘর দু’টি দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। ডবল্ বেডের অর্থ যে ঠিক দু’জন শোয়ার জন্য খাট, এখানে এসে প্রথম শিখলাম। সরু সরু দুটো খাট পশাপাশি ঠেকিয়ে রাখা, তাতে তিনজন কষ্ট করেও শোয়া বেশ কষ্টকর। বেড়াতে এসে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মন কষাকষি হলে যাতে দুরত্ব বজায় রাখা যায়, তার জন্যই বোধহয় দুই খাটের জোড়া লাগা অংশে একটু উচ্চতার কাঠের বিট্ দিয়ে সীমানা নির্ণয়ের ব্যবস্থাটা বেশ সুচারু ভাবে করা। আড়াআড়ি ভাবে শুলেও পরের দিনটা টাইগার দেখার পরিবর্তে পিঠের যন্ত্রনায় ‘টাইগার বাম’ মালিশ করতে হবে। আর একটা ঘর চাওয়া হলে জানা গেল, ঘর তৈরি নেই, অর্থাৎ পরিস্কার করা নেই। আমাদের জন্য পরিস্কার করে রাখা ঘর দুটোর চেহারা দেখে, পাওয়া না গেলেও অন্য একটা ঘরের চেহারা দেখার সাধ মনে জাগলেও রাত দু’টোর সময় সেটা আর সম্ভব হ’ল না। কিছু বলারও নেই, পাঁচশ’ টাকা ভাড়ায় এর থেকে ভালো ঘর আশা করাও অন্যায়, কিন্তু খাবার জলের একটা পাত্র বোধহয় আশা করা যেতেই পারে। বাধ্য হয়ে আমরা ছয়জন বাচ্চাটাকে নিয়ে কোনমতে কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম। কষ্টটা অনেক লাঘব হ’ল, যখন “যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন” প্রবাদটা মনে পড়লো।

ভোরের আলোয় সব কষ্টের পরিসমাপ্তি হ’ল। অনেকটা জায়গার ওপর বড় বড় গাছপালা দিয়ে ঘেরা এত বড় বাড়িটা কেন যে এতটুকু রক্ষণাবেক্ষণ হয় না, ভগবান বলতে পারবেন। মালিক শুনলাম বাঙালি, কলকাতায় থাকেন, তিনি সেটা বলতে পারলেও, শেষ কবে ঘর সংযুক্ত বাথরুমগুলো পরিস্কার করা হয়েছিল, ডায়েরি না দেখে তাঁর পক্ষে বলা অসম্ভব। রাস্তার চায়ের দোকান থেকে চা খেয়ে এসে বাথরুম না গিয়ে আমরা তৈরি হয়ে নিলাম।

কথা ছিল আজ সকালে জলখাবার খেয়ে নাজিমুল্লার জীপে আমরা পালামৌ ফোর্ট দেখতে যাব, সেখান থেকে ফিরে স্নানাহার সেরে ঐ জীপেই জঙ্গল পরিদর্শন। দেবযানী হোটেলের বাইরে পাকা রাস্তার ঠিক বিপরীতে বেতলা অভয়ারণ্যের গেট দিয়ে আমাদের জীপ মালপত্র নিয়ে ট্রী হাউসের সামনে পৌঁছে দিল। গিয়ে দেখি আগের দিনের পর্যটকরা তখনও তৈরি হয়ে ঘর খালি করতে পারে নি। বড় দল, তার ওপর আবার আমাদের এলাকার দু-একজন আছে দেখছি, তাই আমাদের পালামৌ ফোর্ট দেখতে যেতে বিলম্ব হয়ে যাচ্ছে দেখে বিরক্ত লাগলেও, কিছু বলা সম্ভব হ’ল না। আরও বেশ কিছু সময় নিয়ে, ট্রী হাউসের ওপরে, নীচে, নানাভাবে নিজেদের ছবি তুলে তারা ঘর দু’টো ছেড়ে দিল। এবার শুরু হ’ল ঘর পরিস্কারের পালা। আরও বেশ কিছু সময় পরে আমরা যখন ঘর দু’টোর দখল পেলাম, তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। এরপর জলখাবার খেয়ে পালামৌ ফোর্ট ঘুরতে গেলে, ফিরে এসে দুপুরে স্নানাহার সারতে অনেক বিলম্ব হয়ে যাবে। বিশেষ করে বাচ্চাটাকে নিয়ে অসুবিধায় পড়তে হবে, কারণ তাকে খাওয়ানোর জন্য আবার রাউন্ড দি ক্লক্ সময় ব্যয় করতে হয়। দুপুরের খাওয়া শেষ করতে করতেই রাতের খাওয়ার সময় হয়ে যায়। নাজিমুল্লাকে দেখে মনে হ’ল, সে যেন দোষটা তারই বলে মনে করছে। সে আমাদের এখন সামান্য কিছু চা জলখাবার খেয়ে স্নান সেরে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে বলে জানালো, যে সে আমাদের দেড়টা নাগাদ পালামৌ ফোর্ট ও কেচকি ঘুরিয়ে নিয়ে এসে সরাসরি জঙ্গল সাফারি করিয়ে দেবে। আমরা এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু চা জলখাবার খেতে যাব কী করে, ঘরের জানালা ও ব্যালকনি থেকে অসংখ্য হরিণ ও বাঁদর দেখা যাচ্ছে। এদের ছেড়ে আমাদেরই নড়তে ইচ্ছে করছে না, বাচ্চাটাকে নিয়ে অন্যত্র যাই কিভাবে?

ষোলটা খাড়া সিঁড়ি ভেঙ্গে ট্রী হাউসের ওপর উঠে একটা বারান্দা মতো, তাতে পাশাপাশি কোয়েল ও ঔরঙ্গা নামে দুটো ঘরের দরজা। কোয়েল ও ঔরঙ্গা, এখানকার দুটি নদীর নাম। দরজা দিয়ে প্রবেশ করলে প্রতিটিতে দুটি করে ঘর আছে, একটি একশয্যা ও অপরটি দ্বিশয্যা বিশিষ্ট। পিছনে জঙ্গলের দিকে ব্যালকনি, দুটো ঘর থেকেই যাওয়া যায়। আর ঠিক তার নীচ থেকে শুরু হয়েছে হরিণ ও বাঁদরদের পিকনিক স্পট্। কথাবার্তায় যতদুর জানা গেল এখানে সম্ভবত কোয়েল বা ঔরঙ্গার যে কোন একটিকে সংরক্ষণ করা যায় না, বা দেওয়া হয় না। দুটোই সংরক্ষণ করতে হয়।

 debjani-hotel-betla-2          debjani-hotel-betla-6             betla-national-park-144

        হোটেল দেবযানী                    দেবযানী হোটেলের ভিতর                      ট্রী হাউস, বেতলা

অভয়ারণ্যের বাইরে পাকা রাস্তার ওপরে একটা দোকানে গিয়ে দেখি গরম তেলে বেশ কিছু সিঙ্গাড়া স্নান করছে। এই দৃশ্য দেখে লোভ হবে না, হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, এমন মানুষ দুনিয়ায় ক’জন আছেন, আমার জানা নেই। চা সহযোগে সঙ্গে নিয়ে আসা শুকনো খাবার ও গরম গরম সিঙ্গাড়া উদরস্থ করে, আমরা একে একে স্নান সেরে তৈরি হয়ে নিলাম।

অভয়ারণ্যের ক্যান্টিনে ভাত, ডাল, ভাজা, ডিমের ঝোল খেয়ে প্রায় দুটোর সময় একে একে জীপে গিয়ে বসলাম। এই এলাকাটা গোটাটাই জঙ্গলে ঘেরা। সেটাই স্বাভাবিক, চতুর্দিক খোলা এক হাজার ছাব্বিশ বর্গ কিলোমিটার এলাকা শাল, খয়ের, বাঁশ ও অন্যান্য গাছে ঘেরা বেতলা ন্যাশনাল পার্ক ও পালামৌ স্যাঙ্কচিউয়্যারির রাজত্ব কেচকি থেকে নেতারহাট পর্যন্ত বিস্তৃত। দু’পাশে গাছপালা জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে জীপ এগিয়ে গিয়ে একসময় আমাদের পালামৌ ফোর্টের সামনে নামিয়ে দিল। রাজা মেদিনী রায় নির্মিত এই দুর্গের ধ্বংসস্তুপ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দুপাশে ইতিহাসের সাক্ষ বহন করে গভীর জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। ডানপাশে সমতল এলাকায় মুল দুর্গ, বামপাশে পার্বত্য অঞ্চলে অনেকটা উচ্চতায় অপর দুর্গটি। বেতলা অভয়ারণ্য থেকে এখানে জীপ নিয়ে আসার সময় দেখলাম একজন লোক আমাদের জীপের পিছনে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। এতক্ষণে শুনলাম সে নাকি গাইড। নাজিমুল্লা জানালো, যে জঙ্গলে বা এখানে গাইড সঙ্গে নেওয়া এখন বাধ্যতামূলক। এই নির্জন জঙ্গলে কে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে গাইড সঙ্গে এনেছে কী না লক্ষ রাখছে জানি না, জানি না এখানে তাকে ট্যাঁকে গুঁজে নিয়ে এসে কোন কর্মে লাগবে। তবু যদি তার সাথে কোন অস্ত্র থাকতো তো বুঝতাম বন্য পশুর আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করলেও করতে পারে। ইনি শুধু রাজা মেদিনী রায়ের নাম উল্লেখ করে একটি মাত্র তথ্য জানিয়েছেন, যে সেই আমলে সমস্ত প্রজা নাকি একটা কথা বলতো—“রাজা মেদিনী রায়কা বচন, মু সে নিকলা হায় মাখন”। তবে সে আমাদের সাথে ডানপাশের মুল দুর্গটি ঘুরে দেখিয়েছে। এই জরাজীর্ণ দুর্গটির প্রায় সমস্তটাই ভেঙ্গে পড়েছে। এখন সে ফসিল হয়ে অতীতের সাক্ষ বহন করছে। বামপাশে একটা অতি সরু দরজা, ফোকর বলা-ই বোধহয় ঠিক হবে, দিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে ওঠা যায়। গঠন দেখে বুঝে নিতে হবে, যে সেটা কোনকালে সিঁড়ি ছিল। একবারে খাড়া সিঁড়িটার বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই। খুব সাবধানে পা ফেলে, হিসেব করে দুপাশের দেওয়াল ধরে ওঠানামা করতে হয়। সঙ্গের মহিলারা ওপরে ওঠার সাহস দেখাতে সাহস করলো না, অবশ্য সঙ্গের গাইডটিও তাদের ওপরে উঠতে বারণ করলো। ওপরে কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই। একবারে সরু বারান্দার মতো পথটা সামান্য কয়েক পা এগিয়েই হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে। শেষ হওয়ার কারণ অবশ্যই ভেঙ্গে পড়ে যাওয়া। আমরা তিনজন বেশ কিছু ছবি তুলে সাবধানে নেমে এসে দুর্গের ভাঙাচোরা অংশের ভিতর খানিক ঘুরলাম। একসময় এটা যে বেশ বড়, মজবুত ও গুরুত্বপূর্ণ একটা দুর্গ ছিল, সেটা বোঝার জন্য গাইডের প্রয়োজন হয় না।

   palamou-fort-3        palamou-fort-12        palamou-fort-26

                                                              পালামৌ দুর্গ

বাম দিকের দুর্গটিকে বাইরে থেকে দেখে অনেক সুস্থ মনে হলেও অত উচ্চতায় ঐ জঙ্গল ও সিঁড়ি ভেঙ্গে মহিলারা কেউ যেতে রাজি হ’ল না। গাইডও জানালো ওখানে দেখারও কিছু নেই। ঐ দুর্গ ঘুরে আসতে অনেকটাই সময় ব্যয় হবে। ততক্ষণ এই নির্জন জায়গায় মহিলা ও শিশুটিকে রেখে যাওয়াও হয়তো ঠিক হবে না। তাছাড়া এখান থেকে আমরা কেচকি যাব, সেখান থেকে ফিরে আমরা জঙ্গল সাফারি করবো, তাই আর কিছুটা সময় আশেপাশে ঘুরে আমরা জীপে উঠে বসলাম। গাইডটকে জিজ্ঞাসা করলাম “এই দুটো দুর্গে তোমাদের রাজা মেদিনী রায় উঠতেন কিভাবে”? উত্তরে গাইড সুলভ কেতায় সে জানালো, “রাজা কি আর দুর্গের ওপরে উঠতেন”? যাহোক, আমাদের জীপ কেচকির উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললো।

অনেকটা পথ এঁকে বেঁকে আমরা একসময় কেচকি এসে পৌঁছলাম। রাস্তার সৌন্দর্য সেই একই রকম। রাস্তার দুধারে ফাঁকা জমি ও বড় বড় গাছপালা দিয়ে সাজানো। কেচকি কোয়েল ও ঔরঙ্গা নদীর সঙ্গমস্থল। বাম দিকে কোয়েল ডানদিকে বেশ কিছুটা দুরে ঔরঙ্গার সাথে মিলিত হয়েছে। এপাড়টা লালচে সোনালি রঙের বালি দিয়ে কেউ যেন তৈরি করে রেখেছে। ওপাড়ে সবুজ গাছপালায় ঘেরা জায়গাটায় একটা ছোট সাদা মন্দির। বামদিকে কোয়েলের ওপর একটা ব্রিজ। নদীর দুপাড়েই সামান্য এসে থেমে গেছে। নদী পারাপারের জন্য যে ব্রিজের প্রয়োজন, সেই ব্রিজের ঠিক নদীর ওপরের অংশটুকুই নেই। না ভুল বললাম, আছে তবে নদীর বুকে শুয়ে আছে। নদীতে জল প্রায় নেই বললেই চলে। জল ভেঙ্গে ছাগল গরু নিয়ে লোক চলাচল করছে, বাচ্চা কোলে মেয়েরা চটি হাতে বিপদ মাথায় করে নদী পরাপার করছে। প্রযুক্তি, সততা, নিষ্ঠা, ও মানবিকতার দিক থেকে ঝাড়খন্ড আমাদের বাংলার থেকে বেশ কয়েক কদম পিছিয়ে আছে। কলকাতার গিরিশ পার্কের কাছে বিবেকানন্দ উড়ালপুলের বেশ কিছুটা অংশ নির্মান শেষ হওয়ার অনেক আগেই দেহ রেখে বেশ কিছু মানুষের জীবন ছিনিয়ে নিয়েছে। এই ব্রিজটি কিন্তু সেই দক্ষতা দেখাতে পারে নি। চালু হওয়ার এক বৎসরের মধ্যে সেটি নদীতে ভেঙ্গে পড়ে। নদী পারাপারের জন্য যে ব্রিজ তৈরি, ঠিক নদীর অংশটি দেহচ্যুত করে সেই ব্রিজ এখন কোয়েলের শোভাবর্ধন করছে। নদীর পাড়ে গাড়ির ভিড়। বড়দিনের ঠিক আগে বিভিন্ন দল এখানে পিকনিকের আসর বসিয়েছে। বিদ্যুতের অভাবের জন্য কিনা জানি না, তবে কান ঝালাপালা করা মাইকের উৎপাত এখানে দেখলাম না। তবে আমরা যে একই দেশের অধিবাসী বুঝতে অসুবিধা হ’ল না, কারণ আমাদের মতোই যত্ন করে তারাও নদীর পাড়ে থার্মোকল ও প্লাস্টিকের থালা, গ্লাশ, ও অন্যান্য আবর্জনা, নদীর পাড়ে নিপুণ হাতে চারিদিকে সুন্দরভাবে ছড়িয়ে রেখেছে। নদীর ধারে এই কেচকিতেই সত্যজিৎ রায় তাঁর “অরণ্যের দিনরাত্রি” সিনেমার শুটিং করেছিলেন, যদিও বাংলোটি এখন তালাবন্ধ থাকে। আরও কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে, ফটো তুলে আমরা ফেরার পথ ধরে একসময় নয় কিলোমিটার দুরে বেতলা অভয়ারণ্যের প্রবেশদ্বারের সামনে এসে উপস্থিত হলাম।

    ketchki-3      ketchki-2      ketchki-5

                                                          কেচকি

বেতলা অভয়ারণ্যে আমাদের CG 15 ZD 2873 নম্বর জীপটি নিয়ে সাফারির জন্য বন দফতরকে সম্ভবত দুটি ঘরের পর্যটক হিসাবে তিনশ’ টাকা ও ঐ একই গাইডটির জন্য একশ’ টাকা জমা দিতে হ’ল। ঘন্টা হিসাবে জীপ ভাড়া, সেটা কথা বলে ঠিক করে নেওয়াই ভালো। নাজিমুল্লা জানতে চাইলো আমরা জঙ্গলে কতক্ষণ ঘুরতে চাই। আমাদের হাতে ফিরে এসে কোন কাজ নেই। এখানে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যায় ও ভোলটেজের অবস্থাও মোটেই ভালো নয়, তাই জঙ্গলে ঘোরাই শ্রেয় মনে করে দু’ঘন্টা ঘুরে দেখাই মনস্থ করলাম। জঙ্গলের প্রবেশদ্বার খুলে দেওয়া হ’ল, আমরা নাজিমুল্লার সাথে গাইডটিকে পিছনে নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চললাম।

এখানে জঙ্গল সেরকম ঘন নয়, বেশিরভাগ জায়গাতেই অনেকটা দুর পর্যন্ত পরিস্কার দেখা যায়। সরু লাল রাস্তা দিয়ে আমরা খুব ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি। গাইড পিছনে দাঁড়িয়ে তার বিচক্ষণ ও অভিজ্ঞ দৃষ্টি দিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। রাস্তা অনেক জায়গায় ডাইনে বামে দুভাগ হয়ে গেছে। অপর দিক থেকে সিকিউরিটির গাড়িও আসতে দেখা গেল। পর্যটকের গাড়ির সংখা সামান্যই। আমরা অনেক ঘোরাঘুরি করেও বেশ কিছু হরিণ, ময়ুর, পাখি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না। সিকিউরিটি বা পর্যটকদের গাড়ির সাথে দেখা হলে তারাও মাথা বা হাত নেড়ে জানাচ্ছে, যে তারাও কিছু দেখতে পায় নি। এইভাবে নানা রাস্তা ঘুরে যখন প্রায় আশা ছেড়ে দিয়ে ফিরে আসবো ভাবছি, ঠিক তখনই উল্টো দিক থেকে একটা গাড়ি আসতে দেখলাম। এটা কোন পর্যটকদের গাড়ি না সিকিউরিটির গাড়ি ঠিক বোঝা গেল না। দলবদ্ধ পিঁপড়েরা যেমন দু’দিক থেকে এসে মুখোমুখি হলে মুখে মুখ ঠেকিয়ে সম্ভবত কুশল বিনিময় করে, এখানেও দেখলাম সব গাড়িই উল্টোদিক থেকে আসা গাড়ির ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে দুই ড্রাইভার নিজেদের মধ্যে কথা বলে। যাহোক, উল্টো দিকের গাড়ির ড্রাইভার নাজিমুল্লাকে জানালো যে হাতি দেখা গেছে। সে নির্দিষ্ট জায়গাটি উল্লেখ করে তুরন্ত যেতে বললো। নাজিমুল্লা জীপের গতি বাড়িয়ে দিয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট জায়গায় এসে পৌঁছলো। রাস্তার ঠিক ডানপাশে লতাপাতা ঘেরা জঙ্গলের মধ্যে গাছের ডাল ভাঙ্গার আওয়াজ পাওয়া গেল। জীপের পিছনে দাঁড়ানো গাইড জীপের ছাদে মৃদু শব্দ করে জীপকে সামান্য পিছিয়ে আনতে নির্দেশ দিলো। জীপ একটু পিছতেই বিশাল চেহারার হাতিটাকে দশ হাত দুরে শুঁড়ে গাছের পাতা সমেত সরু ডাল নিয়ে এগতে দেখা গেল। পিছনে গাছপালা নড়া ও গাছের ডালপালা ভাঙ্গার আওয়াজে একাধিক হাতির উপস্থিতি বুঝতে পারলেও অপর একটি হাতির কখনও মাথা, কখনও মাঝের অংশ, আবার কখনও পিছনের অংশ ছাড়া তৃতীয় কোন হাতির দর্শন পেলাম না। ছবি তোলার ঠিক সুযোগ ও পরিস্থিতি ছিল না। জীপের ছাদে গাইডের টোকা দেওয়ার নির্দেশ মতো জীপ কখনও এগিয়ে কখনও পিছিয়ে আমাদের হস্তিদর্শন পালা সমাপ্ত করলে, আমরা আবার এগিয়ে চললাম। একসময় জঙ্গলের গেট পার হয়ে আমরা ক্যান্টিনের কাছে এসে জীপ থেকে নেমে পড়লাম।

betla-national-park-117 betla-national-park-75 betla-national-park-5betla-national-park-43           betla-national-park-44        betla-national-park-40

পরের দিন সকালে আমাদের হাতির পিঠে জঙ্গল ঘোরার কথা। এখানে হাতির পিঠে জঙ্গল দর্শনে এখন খুবই সমস্যা। আজ সকালে দেবযানী হোটেলের ভিতর ফাঁকা জায়গায় এক অতি বৃদ্ধ মাহুত সমেত একটা বড় ও একটা বাচ্চা হাতিকে ঘুরতে দেখেছি। একটু বেলায় আমাদের ট্রী হাউসের ব্যালকনি থেকে ঠিক পিছনে, হরিণ ও বাঁদরদের পিকনিক স্পটের মাঠে তাদের অভিভাবকহীন ঘুরে বেড়াতে লক্ষ করেছি। এখানে দিনের বেলায় কুনকি হাতিরা শুনলাম ছাড়াই থাকে, নিজেদের মতো চরে বেড়ায়। এখানে আগে জুহি আর আনারকলি নামে দুটো কুনকি হাতি পর্যটকদের জঙ্গল ঘুরিয়ে দেখাতো। আনারকলির মৃত্যুর পর জুহি একাই প্রতিদিন সকাল ছ’টা থেকে সাতটা ও সাতটা থেকে আটটা দু’বার পর্যটক নিয়ে জঙ্গল সফর করে। আমরা ছ’জন, ফলে আমাদের দু’বারে হাতির পিঠে জঙ্গল সফর করতে হবে। প্রথমে শুনেছিলাম সফরের দিন সকালে নাকি হাতি চড়ার ব্যবস্থা পাকা করতে হয়। নাজিমুল্লা জানালো সে ব্যবস্থা করে রাখবে। একটু পরে জানা গেল পরের দিন সকালে দুটো ট্রিপই আমাদের নামে বুক করা হয়ে গেছে। ঠিক হ’ল পরদিন সকালে প্রথমে বাচ্চাটাকে নিয়ে তিনজন ঘুরে আসবে। দ্বিতীয় দফায় বাচ্চাটাকে নিয়ে অপর তিনজন ঘুরতে যাবে। সব ব্যবস্থা পাকা, আমরা নাজিমুল্লাকে নিয়ে ক্যানটিনে কফি খেতে ঢুকলাম। একটু পরে নাজিমুল্লা গুড নাইট জানিয়ে চলে গেল।

কফির কাপে সবে দুএকটা চুমুক দিয়েছি, লাইট চলে গেল। ট্রী হাউসের দেখভাল যে লোকটা করে, সেই বোধহয় এই ক্যান্টিনটা চালায়। সবসময় সে ক্যান্টিনের রান্নার জায়গায় থাকে। এই লোকটার ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ। সব কিছুতেই তার বিরক্তি, ঝাড়খন্ডে বাস করে কেন যে সবসময় মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে থাকে, ওই বলতে পারবে। আমাদের মোট চারটে ঘর, কোয়েলে দু’টো আর ঔরঙ্গায় দু’টো। দুটোরই একশয্যার খাটে কোন কম্বল নেই। তাকে দু’টো কম্বল ও বাচ্চাটার জন্য একটা বালিশের কথা বলতে সে জানালো, যে কম্বল সে এনে দেবে তবে এক একটা কম্বল প্রতিদিন পঞ্চাশ টাকা ভাড়া লাগবে। অতিরিক্ত কোন বালিশ সে দিতে পারবে না। কোয়েল বা ঔরঙ্গা দু’জন থাকার জন্য ভাড়া দেওয়া হয়, অতিরিক্ত লোকের জন্য কোন অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয় না সত্য, কিন্তু তাহলেও একশয্যার খাটটি কেন দেওয়া হয়েছে, ও তাতে বালিশ দেওয়া থাকলেও কম্বল নেই কেন, ঠিক বোঝা গেল না। দু’টো ঘর একই মেরুতে ও একই অক্ষরেখায় অবস্থিত বলেই তো মনে হ’ল। আমার কাছে ব্যাপারটা বারমুডা ট্র্যাঙ্গেলের থেকেও বড় রহস্যজনক বলে মনে হ’ল। যাহোক, রাতে মুরগির ঝোল আর রুটি ঘরে দিয়ে যাবার কথা বলে দু’টো ঘরের, অর্থাৎ কোয়েল ও ঔরঙ্গার জন্য দুটো কড়ে আঙুলের মতো মোমবাতি নিয়ে ঘরে ফিরে গেলাম। এ ক্ষেত্রেও দু’টো ঘর ও বাথরুমের জন্য একটা মোমবাতি কেন জানা গেল না।

রাতের খাবার ও দু’টো কম্বল দিয়ে গেলে, বাচ্চাটাকে তার জন্য অর্ডার করা ভাত, ডিম ও আলু সিদ্ধ খাইয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ গুলতানি করে খাওয়া দাওয়া সেরে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে পড়া গেল। কাল রাতের কষ্টের পর আজকের ব্যবস্থাটা বেশ রাজকীয়ই মনে হ’ল।

খুব ভোরে উঠে ঠান্ডার মধ্যে চার বছরের বাচ্চাটাকে তৈরি করে তিনজন প্রথম দফায় হাতি চেপে জঙ্গল দর্শন করতে চলে গেল। বাকি তিনজন পরের দফায় যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে, এমন সময় তিনজনের সাথে কাঁদতে কাঁদতে বাচ্চাটা ফিরে এলো। জানা গেল একজন ভি.আই.পি. ঝাড়খন্ড অফিসারের হঠাৎ বৌ নিয়ে হাতি চাপার সখ হয়েছে, তাই আমাদের সকালের বুকিং বাতিল করা হয়েছে। ওরা রাজা আমরা প্রজা, ওদের সখ আহ্লাদ মিটিয়ে উচ্ছিষ্ট কিছু থাকলে আমাদের ভাগ্যে জুটবে এটাই স্বাভাবিক। ওদের পিঠে না চাপিয়ে আমাদের পিঠে চাপিয়ে জঙ্গল সফর করাবে, সে সাহস বোধহয় হাতিরও নেই, তার ঘাড়েও তো একটাই মাথা। ঐ বিশেষ ব্যক্তিটিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, আমাদের রাজ্যে আগে প্রায়ই এই ঘটনা ঘটতো। ফরেস্ট্ বাংলো বুক করে যাবার মুহুর্তে জানা যেত কোন ভি.আই.পি. দেবতার বিনা পয়সায় সখ মেটাতে, পয়সা দিয়ে বুক করা নরাধমের বুকিং বাতিল করা হয়েছে। আর আমাদের দেশে ভি.আই.পি. দেবতারও তো কিছুমাত্র অভাব নেই। কোন এক বড়দা, মেজদার কাছের বা পছন্দের লোক হয়ে তাঁর সান্নিধ্যে আসতে পারলেই, ছোঁয়াচে রোগের মতো তিনিও ভি.আই.পি. বনে গিয়ে লাল বাতি লাগানো গাড়ি চাপার অধিকারী হয়ে যান। এখন খাতা কলমে যদিও এই নিয়ম উঠে গেছে বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে বিশেষ ভি.আই.পি. দেবতাটি আশপাশের অনেকগুলি গেস্ট হাউসের কোনটিতে থাকা পছন্দ করবেন জানা না থাকায়, আশপাশের সমস্ত গেস্ট হাউসের বুকিং বাতিল করার ঘটনাও তো ঘটে বা ঘটছে।

যাহোক, কাউন্টারের ব্যক্তিটিকে জিজ্ঞাসা করা হ’ল আমাদের সফর বাতিল করা হয়েছে, এটা আমাদের জানানো হয় নি কেন। তাহলে এই ভোরে ঠান্ডার মধ্যে বাচ্চাটাকে ঘুম থেকে জোর করে তুলবার কোন প্রয়োজন হতো না। ভদ্রলোক জানালেন গতকাল রাতে তিনি ফোনে তার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাঁর কিছু করার নেই। সত্যিই তো তাই, ভগবানের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা সামান্য পূজারির কোথায়?

নাজিমুল্লা ফোনে জানালো এ ক্ষেত্রে তার কিছু করার নেই, আমরা যেন আজকের দ্বিতীয় ট্রিপে ও আগামীকাল ভোরের প্রথম ট্রিপে সফর করে নেই। আগামীকাল বড়দিন, জানি না কাল আবার অন্য কোন বড়কর্তার আদরের গৃহিণীটি হাতি চাপার সখ হবে কী না। ধীরে ধীরে প্রায় সাতটা বাজলো, ভি.আই.পি. মহারাজের পাত্তা নেই। জানি না এর পর দ্বিতীয় ট্রিপে জঙ্গল দর্শনের সুযোগও পাওয়া যাবে কী না। এতদিন শুনতাম আমার ছাগল আমি যেদিক থেকে খুশি কাটবো, আজ বোধহয় আমার হাতি আমি যখন খুশি চাপবো দেখতে হবে। যা হোক ভদ্রলোকের অসীম দয়া, শেষে বেটার লেট দ্যান নেভার আপ্ত বাক্য স্মরণ করে সকলকে দর্শন দিয়ে, হাতির পিঠে সম্ভবত স্ত্রী ও আর একজনকে নিয়ে চেপে আমাদের সকলকে ধন্য করলেন। আজ জঙ্গল সফর সেরে আমাদের লোধ্ ফলস্ অথবা কোজরাম, মারোমার, ও সুগা (সুগ্গা) বাঁধ দেখতে যাওয়ার কথা। কোজরাম খুব সুন্দর জায়গা শুনেছিলাম। মাত্র পঁয়তাল্লিশটি বাড়ি নিয়ে শ’তিনেক আদিবাসীদের এই গ্রাম নাকি ছবির মতো সুন্দর। নাজিমুল্লা কোজরাম যেতে বারণ করলো। ঐ অঞ্চলে যাবার একবারে ফাঁকা রাস্তায় নাকি মাওবাদিদের ঝামেলার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। ফ্যামিলি নিয়ে ওপথে না যাওয়াই ভালো। দলে তিনজন মহিলা ও একটি শিশু আছে, তাই আমরাও কোজরামের পরিবর্তে লোধ্ ফলস্ যাওয়াই মনস্থ করলাম। অনেকটা রাস্তা জীপে যাতায়াত করতে কষ্টকর হবে বলে, নাজিমুল্লা একটা বোলেরো গাড়ি ঠিক করে রেখেছে।

যাহোক্ ঈশ্বরের অশেষ কৃপা। তিনি তাঁর অবতারটিকে হাতির পিঠে জঙ্গল দর্শন করিয়ে অবতরণের জায়গায় পৌঁছে দিলেন। কিন্তু অবতারটি বিভিন্ন পোজে নিজেদের ছবি তোলায় আরও বেশ কিছু সময় ব্যয় করলেন। অনেকেই দেখলাম এই বিরল দৃশ্যটি অবলোকন করার জন্য তাঁদের ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। শেষে দেবতারা জমিদারি দেখভাল করে বিদায় নেওয়ার পরে, অনেকটা বিলম্ব হলেও আমরা জঙ্গল সফরের সুযোগ পেলাম।

অতি বৃদ্ধ মাহুতটি অত্যন্ত ভদ্র। হাতির পিঠে জঙ্গল সফরের সময় মৃদু স্বরে তিনি এই জঙ্গলের হাতি সম্বন্ধে অনেক গল্প শোনালেন। আগে রজনী নামে একটা হাতি ছিল, এক ঝড় বৃষ্টির দিনে পাহাড়ের ওপর গিয়ে সেটা কোনভাবে নীচে গড়িয়ে পড়ে মারা যায়। বাচ্চা হাতিটার নাম রাখী, সে যখন খুবই ছোট, তখন আসামের জঙ্গলের মধ্যে ওর মা বাজ পড়ে মারা যায়। তারপর থেকে বাচ্চাটা এখানে জঙ্গল কর্তৃপক্ষের হেপাজতেই বড় হচ্ছে। জুহি নামে যে হাতিটির পিঠে আমরা সফর করছি, তার বর্তমানে ষাট বছর বয়স। ছত্রিশ বছর ধরে হাতিটি এই জঙ্গলে এই কাজ করছে। মাহুতটিকে দেখলাম দীর্ঘ সান্নিধ্যে হাতিটির প্রায় আত্মীয় হয়ে গেছেন। এই বয়সে হাতিটির পর্যটক পিঠে নিয়ে ঘুরতে খুব কষ্ট হয়, তাই কর্তৃপক্ষকে তিনি আর একটি অন্তত কুনকি হাতির ব্যবস্থা করার কথা বার বার বলে আসছেন, কিন্তু কোন ফল হয় নি। শেষে, হাতিটির ভ্রমণ দিনে দুবার মাত্র করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সত্যিই তাই, বয়সের ভারে হাতিটি সামান্য পিচ্ছিল পথে যেতে বা চড়াই পথে উঠতে টলমল করে। যেকোন সময় পড়ে যেতে পারে বলে মনে হয়। বেশ কিছু হরিণ, গোটা দুয়েক বনমুরগি ছাড়া আর কিছুই আমাদের কপালে জুটলো না। শুনলাম এই জঙ্গলে দুটি মাত্র বাঘ আছে, যদিও চুয়াল্লিশটি বাঘ আছে পড়ে এসেছিলাম। তবে বাইসনের দেখা না পেলেও বাইসন কোথায় শুয়ে থাকে, হাতি কোথায় থাকতে ভালোবাসে, ইত্যাদি জায়গা দেখিয়ে একসময় তিনি আমাদের ক্যানটিনের কাছে হাতি থেকে নামার জায়গায় পৌঁছে দিলেন।

অন্য একজন ড্রাইভার দেখলাম আমাদের জন্য বোলেরো গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে। গাড়িটি নতুন,  ড্রাইভারটির ব্যবহারও বেশ ভালো। অল্প সময়ের মধ্যে জলখাবার খেয়ে তৈরি হয়ে নিয়ে আমরা গাড়িতে এসে বসলাম।

এখানে সব রাস্তার সৌন্দর্যই প্রায় একই রকম। আমরা যে কোন জঙ্গল দর্শনে এসেছি, যেকোন রাস্তা দিয়ে গেলেই তার একটা আভাস পাওয়া যায়। আমরা একসময় কোয়েল নদীর ব্রিজের ওপর এসে গাড়ি থেকে নেমে অনেকটা সময় কাটালাম। ব্রিজটি বেশ চওড়া, নীচে কোয়েল নদীটিও ভালোই চওড়া ও সুন্দর, কিন্তু জল প্রায় নেই বললেই চলে। নদীর মাঝে মাঝেই ইতস্তত বালির চড়া। আবার শুরু হ’ল পথ চলা। বেশ কিছুটা পথ গিয়ে রাস্তার ডানপাশে দেখলাম বাঁশঝাড়। সরু সরু অনেক বাঁশ দুমড়ে মুচড়ে রাস্তার পাশে পড়ে আছে বা বাঁশঝাড়ের মধ্যেই কাত হয়ে আছে। রাস্তার ওপর চতুর্দিকে হাতির টাটকা বিষ্ঠা পড়ে আছে। ড্রাইভার জানালো গতকাল রাতে বা আজ ভোরে এখানে হাতি এসেছিল। এখানে অহরহ যত্রতত্র খাবারের খোঁজে হাতি ঘুরে বেড়ায় বলে শুনেছিলাম। গতকাল নাজিমুল্লার কাছে শুনেছিলাম, যে দু’এক দিন আগেই এখানকার কোন এক জায়গায় নাকি বাস ধরার জন্য সকালে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকার সময়, একজন হাতির আক্রমনে মারা গেছে। এখানে হাতির শিষ্টাচারের বড় অভাব, নিজে দর্শন না দিয়ে, বিষ্ঠা দর্শন করিয়ে তারা নিজ গন্তব্যে চলে গেছে।

দু’পাশে শাল, মহুয়া, ছাতিম, পলাশ, ইউক্যলিপ্টাস্ গাছ ও জঙ্গলের রাস্তা ধরে আমরা একসময় মারোমার এসে পৌঁছলাম। এখানে থাকার জায়গাটা দেখেই জায়গাটার প্রেমে পড়ে গেলাম। ঠিক করে ফেললাম পরের বার এসে মারোমারেই থাকবো। ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো জায়গাটায় দু’দিকে দুটো থাকার জায়গা। সম্ভবত মোট চারটি ঘর। এখানে এসে দেখি আমাদের ঠিক আগে যাঁরা বেতলা ট্রী হাউসে ছিলেন, তাঁরা এখানে এসে উঠেছেন। অত্যন্ত নির্জন এই মারোমারে থাকতে গেলে নিজেদের রেশন সঙ্গে নিয়ে আসতে হয় শুনলাম। মন ভরে গেল। কিছুক্ষণ এখানে কাটিয়ে আমরা লোধ্ ফলস্-এর উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম। পথে আমাদের ড্রাইভার জানালো, যে সামনে কোন এক জায়গায় দু’দিন আগে একটা লোক হাতির আক্রমণে মারা গেছে। বুঝলাম নাজিমুল্লার মুখে শোনা ঘটনাটা এখানেই কোথাও ঘটেছিল। অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে একটা গঞ্জ মতো জায়গায় হাজির হ’লাম। ড্রাইভারের কথা মতো এখানে একটা হোটেলে আমরা খাবারের অর্ডার দিয়ে গেলাম। লোধ্ ফলস্ থেকে ফেরার পথে এখানেই আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়ে সুগা বাঁধ দেখতে যাব। আমাদের গাড়িটি একবারে নতুন এবং ঝাঁ চকচকে, কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা যে পথ দিয়ে যেতে শুরু করলাম, তাতে মাথায় নানা রকম চিন্তা এসে ঘুরপাক খেতে শুরু করলো। দু’ধারে ঝোপঝাড় জঙ্গল, মাঝখান দিয়ে সরু রাস্তা। জনপ্রাণীহীন এই রাস্তায় কোন কারণে গাড়ি যদি খারাপ হয়, তাহলে কি হবে। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেল, একটা কুঁড়েঘরেরও দেখা মেলে নি। এই এলাকায় এখন কোন গোলমাল নেই শুনলেও পকেটে এতগুলো টাকা, মহিলা ও বাচ্চা নিয়ে যাওয়া, চিন্তামুক্ত হই কিভাবে? গাড়ি দাঁড় করিয়ে তুলে নিয়ে গেলে, এমনকী মেরে ফেললেও তো কেউ জানতে পারবে না। বেশ কিছু পথ যাওয়ার পর আদিবাসীদের গ্রাম পড়লো। ছোট্ট গ্রাম, অভাব বঞ্চনা হয়তো আছে, কিন্তু তারা বেশ শান্তিতেই আছে বলে মনে হ’ল। ডালটনগঞ্জ থেকে লোধ্ ফলস্ প্রায় একশ’ কুড়ি কিলো মিটার রাস্তা, নেতারহাট থেকে এর দুরত্ব প্রায় ষাট কিলো মিটার মতো। একসময় আমরা নির্বিঘ্নে লোধ ফলস্ এর গাড়ি রাখার জায়গায় এসে পৌঁছলাম। এখানে দেখলাম বেশ কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অনেকেই এখানে পিকনিক করতে এসেছে। এখান থেকে অনেক দুরের লোধ ফলসের ডান দিকটা অস্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। কিন্তু এখান থেকে তার সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটাও বোঝা যায় না।

      maromar-jharkhand-6     maromar-jharkhand-1     maromar-jharkhand-3

                                                           মারোমার

এখান থেকে পাথুরে পাহাড়ি এবড়ো খেবড়ো দুশ’ তেষট্টিটা সিঁড়ি ভেঙ্গে অনেকটা ওপরে উঠতে উঠতে লোধ ফলসকে ক্রমশ হাতের কাছে পাওয়া যায়, এবং ধীরে ধীরে একবারে তার কাছে যাওয়া যায়। এটি ঝাড়খন্ড রাজ্যের  সর্বোচ্চ ও আমাদের দেশের একুশতম উচ্চ জলপ্রপাত, এবং BURHAGHAT FALLS নামেও পরিচিত। চারশ’ আটষট্টি ফুট ওপর থেকে প্রবল বেগে পাথরের ওপর দিয়ে নীচে পড়ে একটা জলাধারের সৃষ্টি হয়েছে,  এবং ঐ জলাধারের জল তীব্র গতিতে নীচের দিকে বয়ে যাচ্ছে। জলাধারের বাঁদিকটা দিয়ে এই জলপ্রপাতের একবারে কাছে যাওয়া যায় এবং ইতস্তত ছোট বড় রঙীন পাথরের ওপর বসে সৌন্দর্য উপভোগ করা ও ছবি তোলা যায়। কিন্তু দুনিয়ায় এত জায়গা থাকতে ঠিক এই জলপ্রপাতের কাছে যাওয়ার পথে পাথরের ওপরেই মুরগি কেটে রক্ত, পালক, নাড়িভুঁড়ি ছড়িয়ে ফেলে, থার্মোকলের থালা, রান্নার পাত্র, মশলা ও সবজির পাত্র ছড়িয়ে রেখে, দু-একটা দল পিকনিকের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোথাও শান্তি নেই, ওর পাশ দিয়েই কোনমতে জলপ্রপাতের পাশে গিয়ে বসলাম। মহিলারা প্রথমে এই জায়গাটায় কষ্টের ভয়ে আসতে চাইছিল না, যদিও বাচ্চাটা দিব্যি গটগট্ করে আমাদের সাথে সমান তালে পা মিলিয়ে, শেষ পর্যন্ত চলে গেল। এই দৃশ্য দেখার পর হয়তো লজ্জায় দলের মহিলারাও এসে হাজির হ’ল। অনেকক্ষণ হৈচৈ করে, ফটো তুলে সময় কাটানোর পর গাড়ির ড্রাইভার আমাদের এবার ফিরে যাবার জন্য বললো। তাকে দিয়েও আমাদের সকলের একসাথে ছবি তুলিয়ে, একসময় আমরা ফেরার পথ ধরলাম। আবার সেই মুরগির পালক, রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ডিঙ্গিয়ে, উঁচু নীচু পাথর ভেঙ্গে, পাথর কাটা এবড়ো খেবড়ো পাহাড়ি সিঁড়ি ভেঙ্গে, একসময় আমরা আমাদের গাড়ির কাছে এসে হাজির হলাম। পিকনিক করতে আসা দলগুলো তখনও মনের আনন্দে রান্নার কাজে ব্যস্ত। আমরা গাড়িতে উঠে বসলাম।

   lodh-falls-17            lodh-falls-4lodh-falls-21                                                                  লোধ্ ফলস্

আবার সেই পুরানো রাস্তা ধরে এসে নির্জন জঙ্গলের পথ পার হয়ে, একসময় আমরা নির্দিষ্ট হোটেলের সামনে এসে গাড়ি থেকে নামলাম। রাস্তার পাশে ছোট্ট অতি সাধারণ হোটেলটার সামনের অংশে হরেক রকম লোভনীয় ভাজাভুজি সাজানো থাকলেও, লোভ সংবরণ করতেই হ’ল। জায়গাটা শুনলাম মহুয়াডাঁড় অঞ্চলে অবস্থিত। এই রাস্তা দিয়েই বেতলা থেকে গাড়ু, মারোমার, ওক্সি, মহুয়াডাঁড় হয়ে নেতারহাট যাওয়া যায় বলে শুনলাম। সামনে রাস্তার ওপর একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, আর তার চারপাশে একজন হাতে বন্দুক নিয়ে ঘোরাফেরা করছে। হোটেলটার ঠিক বিপরীতে একটা বড় বাড়ি। তার বোর্ডের লেখা থেকে তার পরিচয় পাওয়া গেল। সেটা একটা গেস্ট হাউস। গাড়িতে দেখলাম বিধায়ক লেখা। নিশ্চিন্ত হওয়া গেল কোন বাদীদের আক্রমন নয়, আশংকা হ’ল, এই ভি.আই.পি. ব্যক্তিটির জন্য না আবার বেতলা ফেরার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কেউ ভাত কেউ রুটি, সবজি, ডাল, ডিমভাজা দিয়ে আহার সেরে আজকের, হয়তো বা এবারের শেষ দ্রষ্টব্য, সুগা বাঁধের উদ্দেশ্যে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। যাওয়ার পথে গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় বাঁপাশে অনেকটা দুরে এই সুগা বাঁধ দেখিয়ে ড্রাইভার বলেছিল, ফেরার পথে সে ওর কাছে নিয়ে যাবে। বেশ কিছু পথ পাড়ি দিয়ে আমরা এসে সেই সুগা বাঁধের কাছে নামলাম। সুগা বাঁধকে আবার সুগ্গা বাঁধও বলা হয় দেখলাম। সুগা বাঁধ সম্বন্ধে ড্রাইভারকে প্রশ্ন করেও বিশেষ কিছু জানা গেল না। সে এক তোতা পাখির গল্প শুনিয়ে জানালো, সুগা কথার অর্থ নাকি তোতা পাখি। কোন একটা স্কুল থেকে বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়েদের সুগা বাঁধ জলপ্রপাতটি দেখাতে নিয়ে আসা হয়েছে। বেতলা অভয়ারণ্যেও এই একই জিনিস লক্ষ করেছিলাম, তবে সেটা বোধহয় কোন ছেলেদের স্কুল থেকে এসেছিল। সঙ্গের অভিভাবক বা শিক্ষকরা বোধহয় ট্রী হাউসটিকেও কোন দ্রষ্টব্য হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। ফলে আমরা কিছু বোঝার আগেই এক ঝাঁক বাচ্চা ছেলেতে আমাদের কোয়েল ও ঔরঙ্গা ঘরদুটো ভরে গেছিল। যাহোক্, আমরা রাস্তা থেকে ডান দিকে সুগা বাঁধের উদ্দেশ্যে নীচে নেমে গেলাম। যাওয়ার পথে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দুরে এক ঝলক দেখে সুগা বাঁধকে চিনতে পারি নি, তার সৌন্দর্য সম্বন্ধেও ভুল ধারণা পোষণ করেছিলাম। বিভিন্ন রঙের বেশ চওড়া শক্ত ও বেলে পাথরের ওপর দিয়ে এই জলপ্রপাতর জল ধীর বা মাঝারি গতিতে গড়িয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার জল জমে ছোট ছোট জলাধারের সৃষ্টি করেছে। আমরা সব জায়গা ঘুরে দিনশেষে এখানে এসে পৌঁছেছি। সূর্যের আলোর রং এখন অনেকটাই বদলে গেছে। এই অবেলাতেও এখানে বিক্ষিপ্তভাবে চড়াইভাতি করতে আসা দলের ভিড়। কিছু সারমেয়-সারমেয়ীর প্রসাদ লাভের অপেক্ষা। অনেকে এপার থেকে ওপারে পাথরের ওপর লাভ দিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এখানকার পাথরের রং দেখার মতো, তার ওপর সূর্যালোক পড়ে গলানো সোনার রঙে চারিদিক এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। ওপারে যাওয়ার চেষ্টা করে বুঝলাম জুতো ভিজে যাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। আরও অনেকক্ষণ এখানে কাটিয়ে ফিরে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি ছেড়ে দিল। ড্রাইভার জানালো এখান থেকে বেতলা পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার রাস্তা, যদিও শুনেছিলাম ষাট কিলোমিটার মতো রাস্তা।

     suga-bandh-13       suga-bandh-9       suga-bandh-8

                                                        সুগা (সুগ্গা বাঁধ)

পথে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করা হ’ল বেতলায় দেশি মুরগি পাওয়া যাবে কী না। সে জানালো বেতলা অভয়ারণ্যের ক্যান্টিনে দেশি মুরগি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তবে একটু পাশের একটা হোটেলে অর্ডার দিলে তৈরি করে দেবে। মনে মনে ঠিক করলাম আজ বাইরে থেকে রুটি আর দেশি মুরগির ঝোল বা কষা কিনে নিয়ে যাব। অভয়ারণ্যের ক্যান্টিন আজ বয়কট্ করবো। মাঝে এক জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে চা খাওয়া হ’ল। না, আর দেরি করা যাবে না। মুখ চোখ বলছে সবাই অত্যন্ত ক্লান্ত, এবার বিশ্রাম চায়। চায়ের দাম মিটিয়ে গাড়িতে এসে বসলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল, যে আজ আর কিছু দেখার নেই, আমরা বেতলায় আমাদের ট্রী হাউসে ফিরে যাচ্ছি। গাড়ির সামনে ড্রাইভারের পাশে বসে পিছন থেকে একটা আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। বাচ্চাটা আমার কোলে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আমারও ঝিমুনি আসছে। ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে বলে, আর আমি বাচ্চাটা কোল থেকে পড়ে যাবে বলে জেগে আছি। একসময় আমাদের গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করলো আমরা দেশি মুরগির অর্ডার দেব কী না। কিন্তু একে লোড শেডিং, অন্ধকারে আবার কে এখান থেকে রাতে খাবার নিতে আসবে, শুধুমাত্র বাচ্চাটার খাবার অভয়ারণ্যের ক্যান্টিন বানিয়ে দিতে রাজি হবে কী না, ইত্যাদি অনেক যদি, কিন্তু, এসে হাজির হওয়ায় দেশি মুরগির আয়ু বেড়ে গেল।

 অন্ধকারে আমাদের গাড়ি ঢোকার সাথে সাথে বুঝতে পারলাম, আজ চব্বিশ তারিখ, আগামীকাল আমরা এখান থেকে শক্তিপুঞ্জে হাওড়া ফিরে যাচ্ছি। সেই ঝাড়খন্ডবাসী, সবসময় বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে থাকা ব্যক্তিটি ক্যান্টিন থেকে প্রায় ছুটে গাড়ির কাছে এসে হাতে দু’টো রিকেট রোগগ্রস্ত মোমবাতি ধরিয়ে দিয়ে কুশল জিজ্ঞাসা করলো। আমরা তাকে রাতে দেশি মুরগি রেঁধে দিতে পারবে কী না জিজ্ঞাসা করায় সে জানালো আগে বললে সম্ভব হতো, কিন্তু এখন আর সেটা সম্ভব হবে না। তবে রুটি আর ব্রয়লার মুরগি কালকের মতো বানিয়ে দেবে। বাচ্চাটার জন্য ভাত, আলু সিদ্ধ আর ডিম সিদ্ধ বানিয়ে দিতে পারবে কী না জিজ্ঞাসা করায় সে জানালো অতটুকু বাচ্চার জন্য এটা তো তাকে করতেই হবে, তার একটা দায়িত্ব নেই? বুঝলাম সবই, তাকে আজ ও আগামী কাল টাইট দিতে গেলে, আজ রাতে ঠান্ডায় আমাদের অবস্থাও যথেষ্ট টাইট হবার সম্ভাবনা থেকেই যায়। ফলে যুদ্ধের বদলে শান্তি চুক্তি করে মোমবাতি নিয়ে ট্রী হাউসে ফিরলাম।

অদ্যই শেষ রজনী বলেই বোধহয় এখন আর কারো চোখে ঘুমের রেশ দেখতে পেলাম না। আজ দলের দু’জনের ভাগ্যে হাতির পিঠে ভ্রমণের শিকে ছেঁড়েনি। আগামীকাল ভোরে প্রথম ট্রিপে হাতি  সফরের ব্যবস্থা করা আছে। কিন্ত প্রথমত আগামীকাল বড় দিন, খ্রিস্ট ধর্মীয় মানুষদের থেকেও আমাদের এই দিনটি পালনের উৎসাহ অনেক গুণ বেশি। গুরু নানক বা স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন আমাদের কাছে শুধু ঘরে বসে ছুটি ভোগ করার জন্য, কিন্তু বড়দিনে কেক্ কাটার, পার্ক স্ট্রীটে গভীর রাত পর্যন্ত পানাহার করে কাটিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে গল্প করার, অন্যের আনন্দ হরণ করে, অন্যায় ভাবে আর সবাইকে বঞ্চিত করে, ঐ বিশেষ দিনটি নিজের বা নিজের কাছের লোকেদের আনন্দ ও প্রমোদ ভ্রমণের জন্য সংরক্ষণ করার আনন্দই যে আলাদা। তাই আগামীকালও হাতি সফরের নিশ্চয়তার অভাব ও একসাথে সবাই জঙ্গল ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করার জন্য শেষ পর্যন্ত নাজিমুল্লার জীপেই দ্বিতীয়বার জঙ্গল ভ্রমণ পাকা করা হ’ল। আর মজার ব্যাপার হ’ল, যে দু’জন আজ হাতির পিঠে জঙ্গল সফরের সুযোগ পায় নি, জীপে ভ্রমণের প্রস্তাবটা তাদের কাছ থেকেই এল। নাজিমুল্লাকে ফোনে আমাদের ইচ্ছার কথা জানালে, সে বললো আগামীকাল সকাল সাড়ে সাতটার সময় সে জীপ নিয়ে হাজির থাকবে। সকালে উঠে জীপে জঙ্গল সাফারি করে আমাদের শক্তিপুঞ্জ ধরার জন্য ডালটনগঞ্জ যেতে হবে। মালপত্র গুছিয়ে রাখা শুরু হয়ে গেল, যাতে হাতি সাফারি থেকে ফিরে এসেই ডালটনগঞ্জ যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিতে পারি। ১১৪৪৭ নম্বর শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস দুপুর একটা আটচল্লিশ-এ ডালটনগঞ্জ ছাড়ে। বাচ্চাটার রাতের খাবার দিয়ে গেল। এখন থেকে খাওয়ানো শুরু না করলে, আগামীকাল হাতির পিঠে বসে খাওয়া শেষ হবে, তাই তাকে নিয়ে ওর মা ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমাদের খাবারও কিছু পড়ে দিয়ে গেল এবং একসময় খাওয়া পর্ব শেষ করে আমরা বিছানায় আশ্রয় নিলাম।

আজ পঁচিশে ডিসেম্বর। ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে আমরা নীচে গিয়ে দেখি নাজিমুল্লা তার জীপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই বিখ্যাত গাইডটিও সব কাজ ফেলে তৈরি হয়ে এসে হাজির হয়েছে। আমরা আজও দু’ঘন্টার জন্যই জঙ্গল সফর করবো ঠিক করলাম। আগের বারের মতো কাউন্টারে জঙ্গলে ঢোকার টাকা জমা দেওয়া হ’ল। নাজিমুল্লা বললো ডালটনগঞ্জ স্টেশনের কাছেই একটা মোটামুটি ভালো হোটেল আছে। আমরা সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়ে রাতের খাবার প্যাক করে নিতে পারবো। আমাদের জীপ জঙ্গলে প্রবেশ করলো। সত্যি মিথ্যে জানি না, শুনেছি এই জঙ্গলে নাকি বারো হাজার হরিণ আছে। কিছু হরিণ দেখে একটু পথ পার হয়েছি, হঠাৎ নাজিমুল্লা আঙুল তুলে ইশারায় রাস্তার ঠিক পাশে এক দঙ্গল বাইসন দেখিয়ে কথা বলতে বারণ করলো। একটি মাত্র পুরুষ বাইসন তার বেশ কিছু স্ত্রী, বান্ধবী, ও শিশু সন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুর থেকেও শুধুমাত্র চেহারার বিশালত্ব ও অন্যদের তুলনায় তীব্র কালো রং দেখেই তাকে পুরুষ বলে চেনা যায়। আমরা এগিয়ে গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ালেও তারা কিন্তু এতটুকু সরে গেল না। তাদের অধিকারের জমির সত্ত্ব তারা আমাদের ছাড়তে রাজি নয়। ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী’ গোছের হাবভাব না দেখালেও, আমরা দশ হাত দুরে নিশ্চিন্তে খোলা জীপে বসে থাকলাম। নাজিমুল্লা জানালো পুরুষ বাইসন অনেক সময় খেপে গিয়ে গাড়িকে আক্রমণ করলেও, স্ত্রী বাইসনরা সাধারণত শান্ত প্রকৃতির হয়। বাইসন সমাজের নিয়ম মানব সমাজের বিপরীত হওয়ায়, পুরুষ বাইসনটির প্রতি ঈর্ষান্বিত হ’লাম। যাইহোক্, আমাদের মতো ম্যাদামারা পুরুষদের হাতে তাদের কোন বিপদের সম্ভাবনা নেই বুঝে, পুরুষ বাইসনটি আমাদের দু’-চারবার ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে স্ত্রীদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে, দুএকজন সুয়োরানিকে নিয়ে ধীরে ধীরে জঙ্গলে ঢুকে গেলে দুয়োরানিরা আমাদের দিকে তাকিয়ে পরম নিশ্চিন্তে জাবর কাটতে লাগলো।

এবার আমরা সাহস করে জীপ থেকে নেমে নানা ভাবে তাদের ছবি তুললাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে তারা একে একে জঙ্গলে ঢুকে গেলে আমরা এগিয়ে চললাম। পথে একটা নাদুস নুদুস বিশাল শুয়োর, আর বেশ কিছু শিয়ালকে রাস্তার ঠিক পাশে দেখলাম। শিয়ালগুলো কোন প্রজাতির জানি না, তবে আকৃতিতে বেশ ছোট ও ছবি তুলতে লজ্জা পায়। ময়ুর ও কিছু পাখি দেখারও সুযোগ পাওয়া গেল। কালকের মতো আজও ঘন্টা দুয়েক জঙ্গল পরিক্রমা করে আমরা একসময় জঙ্গলের বাইরে এসে ক্যন্টিনের সামনে নামলাম। গতকালের বোলেরোর জন্য তিন হাজার টাকা ও নাজিমুল্লার প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে আমরা বড় রাস্তার পাশে কালকের দোকানটা থেকে গরম গরম সিঙ্গাড়া আর চা খেয়ে ফিরে আসার মুখে সেই কেয়ার টেকারটি আমাদের দিকে ভি.আই.পি. আতিথেয়তা দেখিয়ে ছুটে আসলো। আজ কিন্তু তার মুখে বাংলার পাঁচের চিহ্নমাত্র খুঁজে পাওয়া গল না। তাকে জানালাম যে আমাদের সাথে বুকিং এর কাগজ বা পরিচিতি পত্র নেই, আমরা ট্রী হাউস থেকে নিয়ে আসছি। উত্তরে সে যেন ভীষণ লজ্জা পেয়েছে এমন ভান দেখিয়ে ঘাড় কাত করে বললো ওগুলোর কোন প্রয়োজন নেই। শুধু তাই নয়, নিজ হাতে চেয়ার বয়ে নিয়ে এসে সে আমাদের চেয়ারে বসতে বাধ্য করলো। আমরা তার প্রাপ্য টাকা ও কিছু বকশিশ মিটিয়ে ঘরে গেলাম।

প্রথমে জানা গেছিলো ট্রেন ঠিক সময়ে ছুটছে। কিন্তু ইতিমধ্যে ট্রেন প্রায় ঘন্টা খানেক বিলম্বে ছুটছে জানতে পেরে আমাদের তাড়াহুড়ো কিছুটা কমলো। কিছুক্ষণ পরে তৈরি হয়ে আমরা মালপত্র নিয়ে জীপে এসে বসলাম। ডালটনগঞ্জ এখান থেকে পঁচিশ কিলো মিটার রাস্তা। একসময় ঔরঙ্গা নদীর ওপর বেশ বড় ব্রিজ পেরিয়ে আমরা স্টেশনের কাছে নির্দিষ্ট হোটেলটার সামনে এসে দেখলাম সেটা বন্ধ। আবার দুরে অন্য কোন হোটেলে শুধুমাত্র খাবার জন্য যেতে ইচ্ছা করলো না। নিজামুল্লার সাথে করমর্দন করে তাকে ছেড়ে দিলাম। পাশেই একটা ছোট্ট হোটেলে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলেও রাতের জন্য কোন খাবার নেওয়া হ’ল না। পরিবর্তে ফল ও মিষ্টি কিনে নিয়ে স্টেশনে যাওয়া হ’ল। ইতিমধ্যে ট্রেন দু’ঘন্টার ওপর বিলম্বে আসছে জানা গেল।

প্রায় দু’ঘন্টা বিলম্বে আমাদের ট্রেন দু’নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে উপস্থিত হলে, আমরা ট্রেনে উঠে জায়গা দখল করলাম। ট্রেনে কয়েকজন বাঙালির সাথে আলাপ হ’ল যাঁরা এই পথে এই ট্রেনে মাসে বা দু’মাসে একবার যাতায়াত করেন। তাঁরা জানালেন যে, বরকাকানায় ট্রেন দশ মিনিট দাঁড়ায়। ঐ স্টেশনে ভাত, রুটি, ডিমের ঝোল ইত্যাদি বিক্রি হয়। তাঁরা প্রতিবার ওখানেই খেয়ে বা খাবার নিয়ে আসেন। আমরা ইচ্ছা করলে ওখান থেকে রাতের খাবার নিয়ে আসতে পারি। নির্দিষ্ট স্টেশনে চটপট্ গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে খাবার নিয়ে আসলাম। একটু রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে নিশ্চিন্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করে নেওয়া গেল। বেশ ভোরে সুস্থ শরীরে নির্বিঘ্নে হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছলাম।

সুবীর কুমার রায়

০১-০১-২০১৭

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s