বাগা সমুদ্রতটের বিচিত্র অভিজ্ঞতা { লেখাটি Tour & Tourists পত্রিকায় প্রকাশিত }

SRINAGAR (3)নয়ের দশকের একবারে শেষে স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে দ্বিতীয়বার গোয়া গিয়ে বাগা বিচ-এ একটা সুন্দর ছোট্ট দু কামরার বাড়িতে উঠেছিলাম। সমুদ্রতট থেকে সামান্য দূরের এই ছবির মতো সুন্দর ছোট্ট বাড়িটির মালিক একজন অবসরপ্রাপ্ত মিলিটারি অফিসার, মিঃ মিরান্ডা।

দ্বিতীয় দিনেই আমারা সমুদ্রে স্নান করতে গেলাম। সমুদ্রতটের ঝুপড়িগুলোয় কিছু বিদেশি বিদেশিনী গুলতানি করলেও, সমুদ্রতট একবারে ফাঁকা। আমরা তিনজন সমুদ্রের জলে পা ডুবিয়ে পাড় ধরে একটু এগিয়েই দেখলাম জল থেকে কিছুটা ওপরে বালির ওপর একটা ছেলে আধশোয়া অবস্থায় মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে, আর অন্য দু’টো ছেলে তার পা চেপে ধরে কি করছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি আধশোয়া ছেলেটার পায়ের পাতার কাছ থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে অল্প রক্ত পড়ছে, আর অন্য দু’টো ছেলে ক্ষতস্থানে থুথু দিয়ে পরিস্কার করে, ভিজে গামছা দিয়ে মুছে প্রাথমিক চিকিৎসা করছে। আমার মনে হ’ল ছেলেটাকে কোন সামুদ্রিক সাপ কামড়েছে। সামুদ্রিক সাপ খুব বিষাক্ত হয় বলে শুনেছি, তাই ছেলে দুটোকে বললাম, “মনে হচ্ছে ওকে কোন সাপে কামড়েছে, কাজেই এতটুকু সময় নষ্ট না করে কোন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও”। সঙ্গের ছেলেদু’টি এক মুহুর্ত সময় নষ্ট না করে, তাকে পাঁজাকোলা করে ডাক্তারের খোঁজে ছুটলো। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর, ঐ নির্জন সমুদ্রে নামতে আমরা কিরকম অস্বস্তি বোধ করে স্নান না করে বাসায় ফিরে এলাম।

পরদিন নতুন মনোবল নিয়ে আবার সমুদ্রে স্নান করতে গেলাম। আজ কিন্তু আমি আমার কন্যাটিকে নিয়ে জলে নামলাম, স্ত্রী পাড়ে বসে রইলেন। এক বুক জলে আমি দাঁড়িয়ে আছি, কন্যা আজই সাঁতার শিখে আরতি সাহা হয়ে বাড়ি ফিরবার পরিকল্পনা নিয়ে, এলোপাথাড়ি হাত পা ছুঁড়ছে, এমন সময় এক ভদ্রলোক পাড়ে এসে, টাওয়েল ও তার গায়ের সবুজ রঙের PUMA লেখা বাঘের ছবি আঁকা গেঞ্জিটি খুলে রেখে, জলে নেমে সোজা আমাদের কাছে চলে এসে “হাই” বললেন। বিদেশি, তবে কোন দেশের নাগরিক বুঝতে পারছি না। ভদ্রলোক কিছুক্ষণ সাঁতার টাঁতার কেটে আবার এসে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ আমার কন্যার সাঁতার কাটার চেষ্টার ভঙ্গিমা লক্ষ করে বললেন, “ঐ ভাবে সাঁতার কাটার চেষ্টা করলে কষ্ট হবে, বুকে জলের ধাক্কা লাগার সম্ভাবনাও যথেষ্ট”। এইবার তিনি যেভাবে হাত দিয়ে জল কাটার প্রক্রিয়াটি দেখালেন, আমার বুঝতে অসুবিধা হ’ল না, যে তিনি খুব একটা সাধারণ লোক নন। ঐভাবে সাঁতার কাটা শিখতে গেলে, আগে নিয়মিত যোগব্যায়াম করে শরীরটাকে তৈরি করতে হবে। জলে দাঁড়িয়ে ঠিক কোমরের কাছ থেকে শরীরটাকে নব্বই ডিগ্রি বেঁকিয়ে উল্টো “ L” এর মতো করে জলে রেখে, অদ্ভুত ভঙ্গিমায় হাত দিয়ে জল কাটতে লাগলেন। দেখে মনে হবে মমতা শঙ্করের গ্রুপের কেউ, নৃত্য পরিবেশন করে হাতের মুদ্রা দেখাচ্ছেন। ঐভাবে কোমরের কাছ থেকে হাজার চেষ্টা করলেও, আমার পক্ষে শরীরটাকে ঐভাবে বাঁকানো সম্ভব হ’ল না। ইতিমধ্যে একটা হলুদ রঙের হেলিকপ্টার এত নীচু দিয়ে উড়ে এসে মাথার ঠিক উপর দিয়ে চলে গেল, যে তিনি কিছুটা ভয় পেয়েই বোধহয় জলে ডুব দিয়ে দিলেন।

আলাপ পর্ব শুরু করলাম। ভদ্রলোক জানালেন তিনি ইরান থেকে এসেছেন। এর আগেও তিনি এদেশে বহুবার এসেছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থেকেওছেন। এত দেশ থাকতে বারবার তিনি এদেশে কেন আসেন জিজ্ঞাসা করলে, তিনি জানালেন যে তিনি ফুটবল খেলেন, ও খেলার সুত্রেই তাঁর এদেশে আসা ও থাকা। তাঁর নাম আহমেদ সানজিরি, তিনি কলকাতার ফার্স্ট ডিভিশন ফুটবল ক্লাবে ফুটবল খেলতেন। তিনি আরও জানালেন যে তিনি হাবিব, আকবর, মাজিদ বাসকার, ইত্যাদি খেলোয়ারের সাথে প্রথম ডিভিশন ফুটবল খেলেছেন। নানা প্রসঙ্গে কথা হ’ল, এমনকী আয়াতুল্লা খোমাইনি কিরকম লোক তা নিয়েও আলোচনা হ’ল।

এবার ফেরার পালা। আমরা পাড়ে ওঠার আগেই তিনি উঠে এসে টাওয়েল দিয়ে গা মুছে সবুজ রঙের গেঞ্জিটা দুহাতে ধরে আমায় বললেন, “প্লীজ তেক্, প্লীজ তেক্”। তাঁর নিজের ভাষা বোঝার উপায় নেই। কিন্তু তিনি মনের ভাব বোঝাবার জন্য কিছু হিন্দী শব্দ মিশিয়ে অদ্ভুত সব ইংরাজী বাক্য ব্যবহার করেন। তাঁর অভিধানে সম্ভবত ‘অ্যাম’ বা ‘আর’ বলে কোন শব্দ বা ক্রিয়াপদ নেই, সবক্ষেত্রেই ইজ ব্যবহার করেন। আই ইজ, ইউ ইজ, বা দে ইজ বলে দিব্বি নির্ভয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। জানা গেল তিনি আমাদের বাড়িটার থেকে সামান্যই দূরে একটা ঘর নিয়েছেন। কথা বলতে বলতে আমরা এগোতে থাকলাম, তিনি কিন্তু তাঁর ঘরে না গিয়ে সরাসরি আমাদের বাসায় এসে হাজির হলেন। মেয়ে ও মা দুজনে দুটো বাথরূমে ঢুকে গেল। আমরা বালি মাখা ভিজে প্যান্ট পরে দু’টো চেয়ারে বসে কথা বলতে শুরু করলাম, বলা ভালো কথা বলতে বাধ্য হলাম। আমাদের দু’টো ঘরে দু’টো বাথরূম, কাজেই মেয়েদের হয়ে গেলে আমাকে বাথরূমে যেতেই হ’ল। তাঁকে ভিজে প্যান্ট পরে কতক্ষণই বা একা একা বসিয়ে রাখা যায়, আবার তাঁকে সময় দিতে গিয়ে নিজেই বা কতক্ষণ ভিজে প্যান্ট পরে বসে থাকি, তাই তাঁকেও একটা বাথরূম ব্যবহার করতে বললাম।

বাথরূম থেকে বেড়িয়ে তাঁর অনুরোধে তাঁর বাসা দেখতে বেরোলাম, তিনি খালি গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে ভিজে হাফ প্যান্ট পরে আমার সাথে চললেন। মিঃ মিরান্ডার বাড়ির থেকে তাঁর বাসার দুরত্ব খুব বেশি নয়। তবে সেটাকে বোধহয় ঝুপড়ি বলাই ভালো। সম্ভবত বিদেশি হওয়ার অপরাধে আমাদের দু’কামরার বড়িটির থেকেও তাঁর ঝুপড়ির এক কামরার ভাড়া বেশি। আমরা দু’দিন পর মহাবালেশ্বর চলে যাব শুনে তিনি অনুরোধ করলেন যে আমি যেন ঘর ছেড়ে দেবার আগে তাঁকে ওখানে থাকার একটা ববস্থা করে দিয়ে যাই, কারণ তিনি এখানে আরও কিছুদিন থাকবেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর আমি ফিরে আসার জন্য উঠে দাঁড়াতে তিনি আমায় একটু বসতে বলে উঠে গিয়ে একটা ব্যাগ থেকে একটা অ্যালবামের মতো দেখতে ফাইল বার করে নিয়ে এসে আমার হাতে দিলেন। আমি খুলে একটার পর একটা পাতা উল্টে দেখে তো অবাক। যতদূর মনে পড়ছে, তিনি তখন বোধহয় ইরানের জাতীয় ফুটবল দলের কোচ, তাছাড়া ইরানের কত রকম খেলার সাথে যে তিনি যুক্ত এবং বড় বড় পদে আছেন বলতে পারবো না। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম যে এইসব শংসাপত্র তিনি সঙ্গে করে কেন নিয়ে এসেছেন। তখন গোয়ায় রোভার্স না ডুরান্ডের সেমি ফাইনাল বা ফাইনাল, কি একটা খেলা ছিল। তিনি প্রসঙ্গটা সযত্নে এড়িয়ে গিয়ে বললেন, মাজিদ বাসকার, হাবিব তাঁর সাথে খেলেছেন। দুই হাতের দুই আঙুলে গুণ চিহ্নের মতো একটা মুদ্রা দেখিয়ে তিনি বললেন, যদিও তাঁর সাথে হাবিবের চিরকাল এরকম সম্পর্ক, তবু হাবিব তাঁকে গোয়ায় এই খেলা দেখতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। হাবিব তাঁকে গোয়ায় খেলা দেখতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, হাবিবের আমন্ত্রণে সারা দিয়ে তিনি সুদুর ইরান থেকে খেলা দেখতে এসেছেন, এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল, কিন্তু তার সাথে মূল্যবান প্রশংসাপত্রগুলো বয়ে আনার প্রয়োজন হ’ল কেন? আমার মনে হ’ল এখানে আসার পিছনে তাঁর বিশেষ কোন উদ্দেশ্য অবশ্যই আছে।

যাইহোক নিজের বাসায় ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ালে তিনি বারবার আমাকে অনুরোধ করলেন, আজ রাতের নৈশভোজ যেন আমরা তাঁর সাথে করি। শেষে বাধ্য হয়ে রাজি হয়ে পা বাড়ালাম। কিছুটা পথ তিনি সেই ভিজে প্যান্ট পরেই আমাকে এগিয়ে দিয়ে গেলেন। সন্ধ্যার পর কালাঙ্গুটে বিচে এসে তাঁর সাথে দেখা। কিছুক্ষণ সমুদ্র সৈকতে ঘোরাফেরা করে তাঁর সাথে আমরা তিনজন চললাম নৈশভোজ সারতে। একটা হোটেলে নিয়ে গিয়ে তিনি আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন যে আমরা কি খেতে ভালোবাসি। এই প্রশ্নের কি উত্তর দেবো, বাধ্য হয়ে বললাম আমরা সব খাই। তিনি চিকেন ফ্রায়াড রাইস ও চিকেনের একটা প্রিপারেশনের অর্ডার করলেন। যাইহোক, ওখানে বসেই তাঁকে পরদিন আমাদের সাথে নৈশভোজ করার ব্যাপারটা পাকা করে ফেললাম্।

পরের দিন সন্ধ্যার মুখে কালাঙ্গুটে বিচে গিয়ে মেয়ের অনুরোধে তাকে একটা ভুট্টা পোড়া কিনে দিয়ে দাম দিতে যাচ্ছি, এমন সময় তাঁর সাথে দেখা। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম সে একটা ভুট্টা খাবে কী না। উত্তরে তিনি হাতের ইশারায় ও মুখে “টোম্যাটো অ্যান্দ্ অনিয়ন ঝিরি ঝিরি ঝিরি ঝিরি” বলে যে খাবারটা পছন্দের কথা জানাতে চাইলেন, তার মর্মোদ্ধার করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হ’ল না। শেষে আমার কন্যাই আবিস্কার করলো, যে খাবারটা পাপড়িচাট নামে আমাদের এখানে পরিচিত। ভুট্টার দাম দিতে গেলে ভুট্টাওয়ালা জানালো যে দাম আমার সঙ্গীটি দিয়ে দিয়েছেন। তাঁকে টাকাটা ফেরৎ দিতে গেলে তিনি যা শুরু করলেন, সামান্য টাকার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে লোক হাসাতে ইচ্ছা করলো না। এরপর একটা দোকানে বসে আমরা চা খেলাম। উত্তপ্ত চা অত্যন্ত দ্রুত শেষ করে তিনি একটানে নিজের চেয়ারটা সরিয়ে দ্রুত কাউন্টারে গিয়ে চায়ের দাম মিটিয়ে দিলেন।

ধীরে ধীরে আমরা আমাদের বাসার দিকে এগোলাম। এই পথেই একটা নুড়ি বিছানো, স্নিগ্ধ আলোর নীচে ছাতার তলায় চেয়ার পাতা হোটেল, যাবার পথে পছন্দ করে গেছিলাম। হঠাৎ তিনি আমায় বললেন যে আজ তিনি আমাদের তাঁর দেশের মাছ খাওয়াবেন। তিনি এদেশে আসার সময় কয়েক টিন রান্না করা মাছ নিয়ে এসেছেন। শুনে আমি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। মাছ আমার অত্যন্ত পছন্দের খাদ্য সন্দেহ নেই, কিন্তু সেতো  ইলিশ, চিংড়ি, কই, মাগুর, ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ কয়েক রকমের মাছ। ইনি যে তাঁদের দেশের কী মাছ নিয়ে এসেছেন, খেতেই বা কিরকম হবে কে জানে। মাছ খাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে তাঁকে বললাম, আজ তো আমরা একসাথে একটা হোটেলে খাব, তাই আগামীকাল তাঁর আনা মাছ খেয়ে দেখা যাবে। কিন্তু আমার ইচ্ছা, আমার আশায় জল ঢেলে দিয়ে তিনি জানালেন যে টিনগুলো খুবই ছোট, কাজেই কোন অসুবিধা হবে না। আমি আশা ভোঁসলের ‘মন নিয়ে কী মরবো নাকি শেষে’ গানটার সুরে ‘ও আমি মাছ খেয়ে কী মরবো নাকি শেষে’ গাইতে গাইতে পথ চলতে শুরু করলাম। তিনি জানতে চাইলেন এটা কী গান। উত্তরে আমার কন্যা জানালো, যে এটা আমাদের দেশের একটা অত্যন্ত জনপ্রিয় গান, জাতীয় সংগীতের মতো সবাই এই গানটা পছন্দ করে। তিনি হঠাৎ আমাদের অবাক করে দিয়ে নসীব সিনেমার মহম্মদ রফির গাওয়া ‘জন জানি জনার্দন’ গানটা গাইতে শুরু করে দিলেন। আমি অবাক হয়ে তাঁকে এই গান কোথা থেকে শিখেছেন জিজ্ঞাসা করায় তিনি জানালেন যে তাঁদের দেশে মহম্মদ রফি, লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, ও কিশোর কুমার অত্যন্ত জনপ্রিয়, এবং সমস্ত জায়গায় এইসব শিল্পীর গান বাজানো হয়। শুনে বেশ গর্ব হ’ল, ভালোও লাগলো।

একসময় আমরা রাস্তার ঠিক পাশেই নির্দিষ্ট হোটেলটাতে একটা বড় ছাতার তলায় এসে বসলাম। চারিদিকে খুব ছোট ছোট রঙিন আলো জ্বলছে। অতিথিটিকে খাবার পছন্দ করতে বললাম। তিনি জানালেন যে সব রকম খাবারই তিনি পছন্দ করেন, কাজেই আমরা পছন্দ করে যেকোন খাবারের অর্ডার দিতে পারি। অর্ডার দেওয়ার আগেই তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, যে তিনি টিনের মাছ ও ব্রেড নিয়ে এখুনি ফিরে আসছেন। কিছু বোঝার আগেই তিনি আমাকে যথেষ্ট উৎকন্ঠার মধ্যে রেখে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে গেলেন। কী করবো ভেবে পেলাম না। এই টিনের কৌটোর মাছ আর ব্রেডের হাত থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায় ভেবে পেলাম না। অনেকক্ষণ সময় পার হয়ে গেল, তাঁর পাত্তা নেই। কেটে পড়বো কিনা ভাবছি, এমন সময় হাতে কনডেন্সড মিল্কের কৌটোর মতো দু’টো কৌটো ও কয়েকটা বনরুটির মতো দেখতে রুটি হাতে তিনি এসে উপস্থিত হলেন। রুটিগুলো আমাদের টেবিলের ওপর রেখে, টিনদু’টো নিয়ে হোটেলের ভিতরে চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ পরে কৌটোর মুখগুলো কেটে সামান্য গরম করা খাদ্য বস্তুটি নিয়ে আমাদের টেবিলে এসে বসে পরম যত্ন সহকারে চামচ দিয়ে মাখনের মতো রুটিতে মাখাতে শুরু করে দিলেন। প্রথম রুটিটি তিনি অত্যন্ত আপ্যায়ন করে আমার হাতে দিলেন। কি করবো ভেবে না পেয়ে আমি হোটেলে আমাদের খাবারের অর্ডার দিলাম। তিনি একটু সংকোচের সাথে আমায় বললেন, আমি যেন তাঁর জন্য কোন খাবারের অর্ডার না করি। একসাথে বসে খাওয়াটাই আনন্দের ব্যাপার, এই খাবারটি তাঁর অত্যন্ত প্রিয়, তিনি আজ রাতে এটাই খেতে চান। এই সুযোগ আমি হারাতে চাইলাম না, আমার রুটিটা তাঁকে ফেরৎ দেওয়ার চেষ্টা করে তাঁকে বললাম কাল আমি নাহয় এই জিনিসটা খেয়ে দেখবো। আজ তিনি যখন এই খেয়েই থাকবেন, তখন এটাও তাঁর খাওয়া উচিৎ। উত্তরে তিনি বললেন যে আমিও ইচ্ছা করলে তাঁর সাথে রাতে এই খাবার খেয়েই থাকতে পারি। তাঁর ঘরে আরও টিন ও ব্রেড আছে, তিনি এখুনি নিয়ে আসছেন। কোনরকমে তাঁকে আরও টিন ও ব্রেড আনা থেকে ক্ষান্ত করে, রুটি হাতে খাবারের আশায় বসে রইলাম। স্ত্রী ও কন্যা অনেক বুঝিয়ে মাছরুটি খাওয়ার হাত থেকে পরিত্রাণ পেলো।

তিনি তাঁর রুটিতে কৌটো থেকে চামচ করে খাদ্যবস্তুটি নিয়ে মাখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, আর আমি সেই সুযোগে রুটির ওপর থেকে বস্তুটিকে খুঁটে খুঁটে, ক্যারম খেলার স্টাইলে টোকা মেরে মেরে পায়ের কাছে নুড়ি পাথরের ভিতর ফেলতে শুরু করলাম। গুঁড়ো গুঁড়ো মাছের পেস্ট কেমন খেতে হবে জানি না, রুটিটাই বা কোথাকার বা কবেকার জানি না, তবে সেটা খাওয়া গেলেও যেতে পারে। ঝুঁকি না নিয়ে যত শীঘ্র সম্ভব কাজটা সারতে লাগলাম, হাতে সময় বড় কম, যা করার এখুনি করতে হবে।

খাবার দিয়ে গেল। অতিথিটিকে অল্প কিছু নিতে অনুরোধ করলাম। কিন্তু তিনি তখন চোখ বুজে পরম তৃপ্তি সহকারে মাছ মাখা রুটি চিবচ্ছেন। আমার রুটি পরিস্কারের কর্মসূচী এতক্ষণে শেষ। মাংসের কিমা হয়, খেতেও বেশ, আজ জীবনে প্রথম মাছের কিমা খেলাম। সম্ভবত সামুদ্রিক কোন মাছের ছোট্ট ছোট্ট গুঁড়ো গুঁড়ো টুকরো, ঠান্ডা ও আঁশটে গন্ধ। রুটি, ও অর্ডার দেওয়া খাবার শেষ করে দাম মিটিয়ে আমরা বাসায় ফেরার জন্য হাঁটতে শুরু করলাম। ওনার বাসা প্রথমে পড়বে, আরও বেশ কিছুটা এগিয়ে আমাদের। ঠিক করলাম রাস্তার কোন একটা দোকান থেকে আইসক্রীম কিনে ওনাকে খাওয়াবো। কিন্তু আইসক্রীমের দোকান পেতে পেতে ওনার বাসা ও আমাদের বাসা অতিক্রম করে গেলাম। এখানে আইসক্রীমের থেকে যে কোন ফরেন লিকার সহজ লভ্য। শেষে কাঙ্খিত খাদ্যটির একটা দোকান দেখে আমরা ঢুকলাম। দোকানদারকে পছন্দ মতো আইসক্রীম অর্ডার করা হ’ল। প্রথম আইসক্রীমটি তাঁর হাতে দিয়ে বাকি আইসক্রীমগুলো নেবার ফাঁকে তিনি তাঁর হাতের আইসক্রীমটি আমার কন্যার হাতে ধরিয়ে দিয়ে রাস্তায় নেমে দাঁড়িয়েছেন। তাঁকে আবার একটি আইসক্রীম দিতে গেলে তিনি জানালেন, যে তিনি আইসক্রীম খান না। শেষে চারটের পরিবর্তে তিনটি আইসক্রীম নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে দাম দিতে গেলে জানা গেল তিনি অনেকক্ষণ দাম মিটিয়ে দিয়েছেন। আমার মনে হ’ল গোয়ায় তিনি একদম একা, তাই আমাদের সঙ্গ তিনি ছাড়তে চাইছিলেন না। তাঁকে জানালাম যে আমাদের বাসায় তাঁর থাকার ব্যাপারে মিসেস মিরান্ডার সাথে কথা বলা আছে। আমরা আগামীকাল চলে যাব শুনে তিনি চুপ করে থাকলেন। আমরা নিজ নিজ বাসায় ফিরে গেলাম।

পরের দিন আমরা পানাজি হয়ে মহাবালেশ্বরের পথে রওনা দিলাম। ওখান থেকে নভি মুম্বাইতে আমার এক ঘনিষ্ট আত্মীয়র বাড়িতে দু’-চার দিন থেকে কলকাতায় ফিরে আসা। ওনার ফোন নাম্বার আমার কাছে থাকলেও আমার তখন নিজস্ব কোন মোবাইল ছিল না। যদিও জানি ভবিষ্যতে তাঁর সাথে দেখা হবার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ, তবুও আমি আমার আত্মীয়র ফোন নম্বর ও কলকাতায় আমার বাড়ির ফোন নম্বর ও ঠিকানা তাঁকে দিয়ে এসেছিলাম। ভদ্রলোক নভি মুম্বাই-এ আমার সাথে দু’বার ফোনে যোগাযোগ করেছিলেন। ব্যাস সম্পর্কের, বন্ধুত্বের, সেখানেই ইতি। পরে শুনেছিলাম তিনি নাকি ডেম্পো স্পোর্টস্ ক্লাবের ফুটবল কোচ হয়েছিলেন।

বেশ কয়েকমাস পরে, আমি তখন বাংলা-বিহার(বর্তমান ঝাড়খন্ড) সীমান্তে একটি কয়লা খনি অঞ্চলে কর্মরত, আমার স্ত্রী হঠাৎ একদিন কম্পিত গলায় জানালেন যে তিনি অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত, আমি যেন এক্ষুণি বাড়ি ফিরে আসি। আমি তখন অত্যন্ত কাজের চাপে ব্যতিব্যস্ত। একটু ভয় পেয়ে বিপদের কারণটি জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানালেন যে, কেউ একজন ফোনে জানিয়েছেন যে আহমেদ সানজিরি নামে একজন আমাদের বাড়িটা খুঁজছেন, তিনি তাঁকে সঙ্গে করে আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দিতে আসছেন।

এতদিন পর তিনি হঠাৎ খুঁজে খুঁজে আমাদের বাড়িতে আসছেন শুনে একটু অবাক হ’লাম। কিন্তু এতটা রাস্তা পাড়ি দিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে যাওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই আমি পরামর্শ দিলাম যে তিনি যদি অল্প কিছুক্ষণ থাকেন, তাহলে একটু মিষ্টি কিনে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে, আর যদি বেশিক্ষণ থাকেন, তাহলে মুরগির মাংস ভাত খাইয়ে দিতে।

রাতে ফোন করে জানলাম যে তিনি এসেছিলেন। আমি বাড়িতে নেই শুনে অল্প কিছুক্ষণ বসে চলে গেছেন। তাঁকে মিষ্টি খেতে দেওয়া হয়েছিল। সামনের সপ্তাহে ডেম্পোর খেলা আছে, তাই তিনি এখন কলকাতায়। যাবার আগে তিনি বলে গেছেন যে তাঁর টীম যদি ঐ খেলায় জিততে পারে, তাহলে তিনি আমাদের নিয়ে একদিন কোন বড় হোটেলে খেতে যাবেন।

সেই খেলায় তাঁর দল জিততে পারে নি, আমরাও তাঁর সাথে দেখা করার বা একসাথে কোন নামি হোটেলে খেতে যাওয়র সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম। তাঁর সাথে ভবিষ্যতে আর যোগাযোগ করার সুযোগ হয় নি। জানি না ভবিষ্যতে হবে কী না, বা হলেও তিনি আমায় স্মরণ করতে পারবেন কী না।

সুবীর কুমার রায়।

২০-০২-২০১৭

 

 

Advertisements

2 thoughts on “বাগা সমুদ্রতটের বিচিত্র অভিজ্ঞতা { লেখাটি Tour & Tourists পত্রিকায় প্রকাশিত }

  1. চমৎকার গল্প, সুবীরবাবু! আপনার বলার ভঙ্গির সঙ্গে বেমালুম মিলে গেছে।

    • দাদা, এটা কিন্তু গল্প নয়, এক ভদ্রলোকের সাথে হঠাৎ আলাপ হওয়া ও তাঁকে কাছ থেকে দেখার ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন বলতে পারেন। আপনি আমার লেখাটা পড়েছেন জানতে পেরে খুব খুশি হলাম।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s