হীরের টুকরো

দক্ষিণ কলকাতার এক প্রান্তে ছোট্ট দোতলা বাড়ি, দুই ভাই ও এক বাল্য বিধবা বোনের স্বপ্নের সংসার। দরিদ্রতা ছোটবেলা থেকেই সঙ্গে ছিলো সত্য, কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর বাল্য বিধবা ছোট বোন শ্বশুর বাড়ির অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাপের বাড়ি ফিরে আসার পর, তিনজনে ভালোই ছিল। স্বচ্ছল না হলেও দুই ভাইয়ের রোজগারে আগের সেই তীব্র অভাব আজ আর নেই, নিরবচ্ছিন্ন শান্তি সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে।

এর পরের ঘটনা প্রবাহ বড় দ্রুত— ছোট বোনের আগ্রহ, ইচ্ছা ও চেষ্টায় প্রথমে বড় ভাই-এর, ও তার ও বছর পাঁচেক পরে ছোট ভাই-এর বিয়ে। সম্পর্ক প্রায় আগের মতো থাকলেও, দুই ভাইয়ের হেঁসেল আলাদা। আইন সম্মত ভাবে না হলেও, দুই ভাইয়ের সমানভাবে বাড়ি ভাগ, ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন বোন ছোট ভাইয়ের সংসারেই থাকে।

সংসারের ভাঙ্গন রোধ করতেই বোধহয় ঈশ্বর এক নতুন অতিথিকে বড়ভাই-এর সংসারে পাঠালেন। বাড়ির প্রথম সন্তান, বংশ রক্ষক, তাও আবার অনেকগুলো বছর পরে, তাই বোধহয় সকলের চোখের মণি হয়ে সে সংসারে বিরাজ করতে লাগলো। শুধু মণিতেই হয়তো মন ভরলো না, তাই আদর করে তাকে সবাই সোনামণি বলে ডাকতে শুরু করলো। সাধ্যের বাইরে হলেও বাবা ও কাকা তাকে দুর্মূল্য সব পোষাক, খেলনা কিনে দিয়ে তৃপ্ত হতে শুরু করলো। পিসি নিজেও সংসার খরচ কিছু কমিয়ে আদরের সোনামণির সাধ আহ্লাদ মিটিয়ে নিজে আনন্দ পেত।

বাবা, কাকা, পিসির আদরে যত্নে সোনামণি দিব্যি বড় হতে লাগলো। পিসির সঙ্গে শ্বশুর বাড়ির কোন সম্পর্ক না থাকলেও, বাবা বা কাকার তা পুরমাত্রায় ছিল। ফলে আজ মামার বাড়ি, কাল মাসির বাড়ি, পরশু কাকিমার বাপের বাড়ি, ঘুরে ঘুরে বেরিয়ে সোনামণির দিন বেশ কাটতে লাগলো। কাকার কোন সন্তান না থাকায়, কাকিমার বাপের বাড়িতে সে নাতির আসন অলঙ্কৃত করে অতি আদরে দিনের পর দিন থেকেও যেত। সব বাড়িতেই সোনামণির সমান আদর, সমান যত্ন এবং সোনামণি যে একটি হীরের টুকরো, বংশের গর্ব, একথা একবাক্য সকলেই স্বীকার করত।

দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘুরে আসে, সোনামণির ঝোলা স্নেহ, আদর, ভালোবাসা, নানাবিধ উপহার, হিংসা বা ঈর্ষা দিয়ে এত পরিপুর্ণ হয়ে যায়, যে সেখানে শিক্ষা, সহবত আর স্থান খুঁজে পায় না। কাকিমার সাথে তার বাপের বাড়ি পাঁচ বছরের সোনামণি যেভাবে যেত, গিয়ে যা যা করতো, আজ চোদ্দ-পনেরো বছরের সোনামণিও সেই একই ভাবে যায়, একই ব্যবহার পায়, একই আচরণ করে।

বাবা মারা যাবার পরে বাইশ বছরের সোনামণি তার মায়ের সাথে থাকে। কাকা কাকিমার সাথে আগের সম্পর্ক আর নেই। থাকবে কি করে, সোনামণির ইচ্ছে অনুযায়ী কাকা তাঁর বাড়ির অংশ তার নামে লিখে দিতে অস্বীকার করলেও, তার মা কিন্তু এক কথায় লিখে দিয়েছে।

আজ হীরের টুকরো সোনামণি নিজের অংশের একটা ঘর ভাড়া দিয়ে নিজের পছন্দের বউ নিয়ে আলাদা থাকে। ক্রমে স্থান সংকুলানের অভাবের অজুহাত ও সোনামণির মানসিক অত্যাচার মা’কে কাকার সংসারে চলে আসতে বাধ্য করেছে।

আজ সংসারের সকলেরই মনে হচ্ছে সেদিন তাদের চোখে অন্ধ ভালোবাসার ঠুলি থাকায়, কাচকে তারা হীরে বলে ভুল করেছিলো। সেদিন সোনামণিকে হীরের টুকরো না ভেবে মাটির টুকরো ভাবলে হয়তো তাকে নিয়ে মাত্র কয়েকটা বছর নয়, সারাটা জীবন গর্ব করা যেত। নরম মাটির মতো তাকেও ইচ্ছা মতো, মনের মতো, একটা মানুষ তৈরি করা যেত। কিন্তু বড় দেরি হয়ে গেছে, হীরে না হয়েও নরম মাটি আজ সত্যিই হীরের মতো কঠিন হয়ে গেছে। তাকে কেটে বা ছেঁটে ফেলা যায়, ইচ্ছে মতো নতুন রূপ দেওয়া যায় না।

সুবীর কুমার রায়

০৮-০৩-২০১৭

 

Advertisements

2 thoughts on “হীরের টুকরো

  1. হীরের টুকরো সোনামনি এখন আদরে বাঁদর বাঁদরমনি হয়ে গেছে।অতি তো কিছুই ভালো নয়।অতি আদরের ফল।

  2. ধন্যবাদ। এটাই কিন্তু বাস্তবে হয়। সেই গোপাল বড় সুবোধ বালকের নব সংস্করণ……..

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s