একাল-সেকাল { লেখাটি অক্ষর-Akshar, Pratilipi , বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম , পাক্ষিক ‘গল্পগুচ্ছ’ , বিতর্কিত লেখনী ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত }

ছেলের চাকরির জন্য তার মার্কশীট ও অ্যাডমিট কার্ডের কপির অ্যাটেষ্টেশনের প্রয়োজন ছিল, প্রয়োজন ছিল তার চারিত্রিক প্রশংসা পত্রের। তাঁদের সময় তাঁরা এগুলো স্কুলের প্রধান শিক্ষক বা কলেজের অধ্যক্ষকে দিয়েই করিয়ে নিতেন। কিন্তু অনেকেই জানালো যে এখন নাকি তাঁদের দিয়ে কাজটা করালে, গ্রহনযোগ্য হিসাবে বিবেচিত হয় না। কিন্ত ছেলের অসুস্থতার জন্য কাজটা সুদীপ বাবুকেই করতে হবে, আর হাতে সময়ও বিশেষ না থাকায়, ওর স্কুলের প্রধান শিক্ষককে দিয়েই কাজটি করাবার মনস্থ করে ওর স্কুলে গিয়ে হাজির হলেন। সুদীপ বাবুর ধারণা কাজটা প্রধান শিক্ষককে দিয়ে করিয়ে নিতে তাঁকে বিশেষ কোন বেগ পেতে হবে না, কারণ ঐ স্কুল থেকেই তাঁর ছেলে অত্যন্ত ভালো ফল করে উত্তীর্ণ হয়েছে। তিনি নিজেও তো ঐ স্কুল থেকেই একসময় পাশ করেছিলেন। স্কুলের সকলেই তাঁকে চেনেন, সম্মান করেন।

স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হলে বেয়ারা জানালো যে প্রধান শিক্ষক একটা মিটিং-এ ব্যস্ত আছেন, তিনি যেন পরে আসেন। সুদীপ বাবু তাকে একটু জেনে আসতে অনুরোধ করলেন যে কখন তিনি আসবেন। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এসে তাঁকে প্রধান শিক্ষকের ঘরে যেতে বলায়, সুদীপ বাবু তাঁর ঘরে গিয়ে উপস্থিত হলেন।

ঘরে প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষকরা ছাড়া আরও জনা পাঁচ-ছয় ব্যক্তি আলোচনায় ব্যস্ত। এদের মধ্যে একজনকে তিনি চিনতে পারলেন, তিনি স্থানীয় একটি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি ব্যাঙ্কে টাকা তুলতে গিয়ে চার শত টাকাকে fore hundred লিখেছিলেন। সুদীপ বাবুর উপস্থিতিতেও তাঁদের আলোচনা বন্ধ না হওয়ায়, তিনি তাঁর প্রয়োজনের কথা বলে কাগজগুলো প্রধান শিক্ষকের হাতে দিলেন। প্রধান শিক্ষক তাঁর অনুরোধ রক্ষা করে, তাঁর কাজটি করার অবসরে উপস্থিত সকলের বক্তব্য সুদীপ বাবুর কানে গেল।

স্কুলের একটি নবম শ্রেণীর ছাত্রের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট উদ্ধার হওয়ায় অঙ্কের শিক্ষক মৃগেন বাবু তাকে গোটা কতক চড় কষিয়ে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখায়, অভিভাবকরা যারপরনাই অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ। বেশিরভাগ শিক্ষক ও অভিভাবকরা এর তীব্র নিন্দা করে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় রীতিমতো তাঁকে ধমক দিচ্ছেন। পরিচিত ভদ্রলোকটি দীপ্ত ভাষায় জানালেন, যে মৃগেন বাবু তাঁর স্কুলের শিক্ষক হলে সরকারি নিয়মের বিরোধিতা করে ছাত্রের গায়ে হাত তোলার জন্য তিনি কী কী করতেন। সুদীপ বাবুর মনে হ’ল, তিনি বোধহয় কোন অভিভাবক অথবা এই স্কুল কমিটির সদস্য।

বৃদ্ধ মৃগেন বাবু, যাঁর হাত দিয়ে স্কুলের বহু ছাত্র অঙ্কে অসাধারণ সব মার্কস নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে, ন্যায় বিচারের আশায় চুপ করে মাথা নীচু করে খুনের আসামির মতো বিচারকদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখ দুটি চিক্ চিক্ করছে। শিক্ষিত, ভদ্র, নম্র, প্রধান শিক্ষকও বোধহয় ঐ প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের মতো ডাকাবুকো না হওয়ায় আদালত অবমাননার ভয়ে অসহায়, নীরব।

কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে এতদিন পরে সুদীপ বাবুর হঠাৎ বেত হাতে নবীন বাবুর মুখটা মনে পড়ে গেলো। অত্যন্ত বদ রাগি নবীন বাবু তাঁদের বিজ্ঞান শিক্ষক ছিলেন। তাঁকে সবাই ভয় করলেও, শ্রদ্ধা করতো শুধুমাত্র তাঁর ছাত্রদের আন্তরিক ভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা দানের জন্য। একদিন ছুটির সময় শ্রেণী কক্ষে বেঞ্চ ভাঙ্গার অপরাধে পরদিন তিনি সুদীপ বাবুকে দোষী সাব্যস্ত করে ভীষণ ভাবে বেত্রাঘাত করেন। সুদীপ বাবু তাঁকে বোঝাবার সুযোগই পেলেন না, যে গতকাল তিনি স্কুলেই আসেন নি।

ঘটনার দিন দুয়েক পরে টিফিনের সময় তাঁকে দেখে সমস্ত ছাত্র ও শিক্ষকদের সামনেই তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, “আমি জানতাম না রে যে তুই সেদিন স্কুলেই আসিস নি। পরে শুনে আমি রাতে ঘুমোতে পারি নি। তুই আমায় ভুল বুঝিস না। রাগ করিস না রে, তুই আমার ছেলের মতো, তবু পারলে আমায় ক্ষমা করে দিস”।

বিষণ্ণ মনে সুদীপ বাবু দ্রুত পায়ে বাড়ির পথ ধরলেন।

সুবীর কুমার রায়

১১-০৩-২০১৭

 

 

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s