এক টুকরো কৈশোর {লেখাটি বাংলায় লিখুন ও বই পোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত}

একদিন বার্ষিক পরীক্ষা শেষে আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠলাম। নতুন নতুন বই হ’ল। নতুন বই কিনে দেবার ক্ষমতা বাবার ছিল না। আমরা অনেক ভাইবোন, সকলের পড়াশোনার খরচ চালাতে, বাবা হিমশিম খেতেন। তাছাড়া তখন একটা রেওয়াজ ছিল, সেকেন্ড হ্যান্ড বই কেনা। বেশির ভাগ ছেলেমেয়েই নতুন শ্রেণীতে উঠে, ওপরের শ্রেণীর কোন ছেলে বা মেয়ের কাছ থেকে তার বইগুলো অর্ধেক দামে কিনে নিত। আর তারা নিজেরাও পুরাতন বই অর্ধেক দামে বেচে দিয়ে, তাদের নিজেদের নতুন শ্রেণীর বই একই প্রথায়, ওপরের শ্রেণীর কোন ছেলে বা মেয়ের কাছ থেকে, অর্ধেক দামেই কিনে নিত। এইভাবে প্রতিটি বই-ই বেশ কয়েকবার হাত ফেরি হ’ত। কিন্তু সেকেন্ড হ্যান্ড বই কখনও থার্ড, ফোর্থ, বা ফিফথ্ হ্যান্ড হিসাবে গণ্য হ’ত না, এবং বইয়ের দাম সব সময়েই বই এর আসল দামের অর্ধেকই থাকতো। এখনকার মতো তখন বই নিয়ে প্রকাশক, স্কুল, বা প্রশাসনের মধ্যে পার্টনারশীপ ব্যবসা চালু না থাকায়, বছর বছর বই পরিবর্তন করার রেওয়াজ একেবারেই ছিল না।

মনে পড়ে বইগুলোর পাতায় কত কী যে লেখা থাকতো। বই এর পাতায় কবিতার ছন্দে লেখা— “এই বই যেইজন করিবে হরণ, ভগবানের হাতে হবে নিশ্চিত মরণ”। খাসা কবিতা, তবে কবির পরিচয় আজও জানা হ’ল না। আবার কোন বই এর পাতায় লেখা— বই এর মালিককে চিনতে হলে ১২ পৃষ্ঠা খুলুন। ১২ পৃষ্ঠা খুলে দেখা গেল লেখা আছে— আমাকে চিনতে হলে ৫৫ পৃষ্ঠা খুলুন। ৫৫ পৃষ্ঠায় লেখা আছে— আমাকে চিনতে হলে ২১ পৃষ্ঠা খুলুন। এইভাবে বহুবার বিপুল আগ্রহে বই এর মালিকের নির্দেশ মতো সামনে পিছনে পাতা উল্টিয়ে দেখা গেল তার নাম লেখা আছে। বইটা এত পুরানো, যে খোঁজ নিলে দেখা যাবে সে হয়তো আমার বাবা বা কাকার ক্লাশমেট ছিল।

আমাদের বাড়িতে পূজাআর্চার চল, কোন কালেই ছিল না, আজও নেই। মা’কে দেখেছি এক জায়গায় কতগুলো ঠাকুর-দেবতার বাঁধানো ছবি রাখতে। ঠাকুর দেবতাদের অবস্থাও আমাদের মতোই অসচ্ছল ছিল। সামান্য ফুল বাতাসা ছাড়া, তাঁদের তেমন কিছুই জোটেনি। লক্ষীপূজার দিন আমাদের বাড়ির একটা সিঁদুর মাখা, রঙচটা লক্ষীনারায়ণের বাঁধানো ফটো কাকার বাড়ি নিয়ে যাওয়া হ’ত। কাকার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই ভালো ছিল। ঠাকুরমা সেখানেই থাকতেন। কাকার বাড়িতে খুব ধুমধাম করে লক্ষীপূজা হ’ত। আমাদের হতশ্রী, হতদরিদ্র লক্ষীনারায়ণ, সেই পূজার জায়গায় বি ক্লাশ সিটিজেনের মর্যাদায়, একপাশে বসবার অধিকার পেতেন। বড়লোক মেয়ে জামাই আর দরিদ্র ঘরজামাই ও মেয়ে, জামাই ষষ্ঠিতে একই শ্বশুর বাড়িতে, যে ধরণের বৈষম্যমুলক খাতির যত্ন পায়, এই দুই লক্ষীনারায়ণ যুগলও সেই ধরণের খাতির যত্ন পেতেন। ফলে তাঁদের কৃপাদৃষ্টি, তাঁদের আনুকুল্য, আমাদের ভাগ্যে তেমন জোটেনি। লক্ষী সারা জীবন মুখ ঘুরিয়েই থেকেছেন, নারায়ণ কী উপকারে লাগেন জানি না, তবে আমাদের জন্য তিনি কিছুই করেন নি। তাঁকে দোষ দেওয়াও যায় না। তাঁর প্রতি আমার ব্যবহার, তাঁকে হয়তো আমাদের সুনজরে দেখা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেছিল। সেকথা সময়, সুযোগ থাকলে পরে বলা যাবে। সরস্বতী বোধহয় কিছুদিন আশায় আশায় থেকেছিলেন। তাই বাবা ও বড়দিদিকে তাঁর ভান্ডার থেকে যথেষ্ট ত্রাণ সামগ্রী উজাড় করে দিতে, কার্পণ্য করেন নি। তবে সেটা যে সরস্বতীরই দান, সে কথা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারবো ন। কারণ এই দু’জনেই ছিলেন ইংরাজী ভাষায় পারদর্শী।

সুবীর কুমার রায়

০৩-০৪-২০১৭

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s