মনোকষ্ট { লেখাটি বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত }

ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় বছরের মাঝামাঝি বাবা কলকাতার ই.পি.এম্. রেলওয়ে বুকিং অফিসে বদলি হয়ে যান। হাওড়ার ঠিক আগের রেলওয়ে স্টেশনে আমরা একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করি। তখনও ই.এম.ইউ. কোচ চালু হয় নি, কাঠের ট্রেনে আটটা স্টেশন অতিক্রম করে প্রায় দু’মাইল পথ হেঁটে আমায় স্কুল যাতায়াত করতে হতো। রাস্তায় হঠাৎ প্রয়োজন হতে পারে ভেবে, আমার ব্যাগে মাঝে মধ্যে সামান্য কিছু পয়সা দেওয়া হতো। যদিও অতি অল্পই পয়সা, তবু সে সময় আমাদের হাতে বাবা-মা’কে পয়সা দেবার কথা ভাবাই যেত না।

মনে পড়ে, যখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তাম, তার কয়েক বছর আগে পুরানো পয়সা উঠে গিয়ে, নয়া পয়সা চালু হয়েছিল। টাকা-আনা বন্ধ হয়ে, টাকা-নয়া পয়সা চালু হয়েছিল। মা’র ঠাকুর দেবতার তাকে, একটা সিঁদুর মাখা কৌটোয়, অনেক পয়সা ছিল। কেন, কী কারণে, বলতে পারবো না, চেঙ্গাইল রেলওয়ে স্টেশনে ঐ পুরাতন পয়সা বদল করে, সম মূল্যের নয়া পয়সা দেওয়া হতো। হয়তো তখন এখনকার মতো, সর্বত্র ব্যাঙ্কের শাখা না থাকায়, রেলের ওপর এই দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। সে যাহোক্, এই তথ্য যেদিন  জানতে পারলাম, সেদিন থেকে মাঝে মধ্যেই কৌটো থেকে পুরাতন পয়সা বার করে, স্টেশনে গিয়ে পুরাতন পয়সা দিয়ে, নয়া পয়সা নিয়ে আসতাম। লক্ষীর সেই অমূল্য সম্পদ, লক্ষীর জন্য ব্যয় না করে, মনের সুখে লাল তুলো, আম লজেন্স, ল্যাক্টো-বনবন্ লজেন্স, হজমীগুলি, ইত্যাদি খাওয়ার একটা সুবন্দোবস্ত করে ফেলেছিলাম। নিজের সম্পদ অন্যকে অন্যায় ভাবে ব্যয় করতে দেখলে, কার না রাগ হয়? লক্ষীদেবীও তাই আমার প্রতি বিরূপই  হয়েছিলেন। তাঁকে দোষ দেওয়াও যায় না। কিন্তু তিনি নিজে টাকা পয়সার দেবী হয়েও, এ কাজটা নিজে করতে পারেন নি বলেই তো আমাকেই দায়িত্বটা নিতে হয়েছিল। কিন্তু তাঁর কোপে এ সুখ বেশি দিন স্থায়ী হলো না। স্টেশনে বাবার কোন সহকর্মী, বাবাকে ঘটনাটা জানান। ফলে বাবার হাতে উত্তম মধ্যম প্রহার জুটেছিল। অথচ অবশিষ্ট অচল পয়সাগুলো পাল্টে, নতুন নয়া পয়সা আনার ব্যাপারে বাবার বা লক্ষীদেবীর, কারো কোন আগ্রহ দেখি নি।

সে যাহোক্, যা বলছিলাম, এতটা পথ যাতায়াতে যদি কোন বিপদ আপদ হয় ভেবে, এই অল্প পয়সা দিয়ে একটা এমারজেন্সি ফান্ড তৈরি করা হতো। যদিও ঐ ফান্ড ভেঙ্গে কোন খাদ্যবস্তু কেনা ছাড়া, আর কী কাজে সেটা লাগতে পারে, ভেবে পেতাম না। মনে পড়ে আমার খুব ইচ্ছা ছিল, ঐ জমানো পয়সা দিয়ে বাড়ির সকলের জন্য একটা করে টিফিন কেক কিনে আনার। তখন লর্ডস কোম্পানীর টিফিন কেক ভারী সুন্দর খেতে ছিল। কিন্তু সে মনবাঞ্ছা কিছুতেই পুরণ করতে পারি নি। পরবর্তী কালে ঐ সামান্য লর্ডসের কেক-এর থেকে অনেক দামি, অনেক সুখাদ্য বাড়ির সকলের জন্য কিনে আনলেও, সেদিনের সেই মনোকষ্ট আজও ভুলতে পারলাম কই?

সুবীর কুমার রায়

০৪-০৪-২০১৭

 

Advertisements

5 thoughts on “মনোকষ্ট { লেখাটি বাংলায় লিখুন , বই পোকার কলম ও উইপোকার কলম পত্রিকায় প্রকাশিত }

  1. এই গল্প টার ওপর কিছু লিখেছিলাম,তোমার কাছে গেল কিনা বুঝতে পারছি না।এটা পেলে কিনা জানিও।Test করছি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s